Sunday, 4 September 2022

রোজালিন ইয়ালো: নোবেলজয়ী চিকিৎসা-পদার্থবিজ্ঞানী

 




আমাদের শরীরের মতো এত জটিল স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র আর একটিও নেই। শরীরের ছোটখাট সমস্যাগুলির সমাধান শরীর নিজে নিজেই করে ফেলে। অনেক সময় আমরা জানতেও পারি না শরীরের স্বাভাবিক রাসায়নিক উপাদানের কী পরিবর্তন ঘটছে। কিন্তু যখনই শরীরের কোন সমস্যা শরীর নিজে নিজে ঠিক করে ফেলতে পারে না, তখন বিভিন্ন উপসর্গের মাধ্যমে শরীর সংকেত দিতে থাকে যে কোথাও কোন সমস্যা দেখা দিয়েছে। তখন দরকার হয় চিকিৎসার। বৈজ্ঞানিক চিকিৎসার জন্য সবচেয়ে জরুরি হলো সঠিকভাবে রোগ নির্ণয়। রোগনির্ণয়ের জন্য বর্তমানে যেসব উন্নত বৈজ্ঞানিক রাসায়নিক পদ্ধতি ব্যবহার করা হয় তার একটি হলো রেডিওইমিউনোএসে (radioimmunoassay) বা আর-আই-এ (RIA)। এই পদ্ধতির মাধ্যমে আমাদের শরীরের রক্ত এবং অন্যান্য তরল পদার্থের মধ্য অন্য কোন পদার্থ ঢুকে গেলে – তা যত সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম পরিমাণেই হোক না কেন – তা শনাক্ত করা সম্ভব হয়। শ্বাস-প্রশ্বাসে, খাবারের সাথে, এবং আরো বিভিন্নভাবে আমাদের শরীরে অনবরত ঢুকছে রোগজীবাণু, ভাইরাসছাড়াও আরো অসংখ্য ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান। রক্ত এবং অন্যান্য তরলের সাথে মিশে গিয়ে এগুলি সারা শরীরে ছড়িয়ে যায়। আর-আই-এ পদ্ধতিতে এই উপাদানগুলির উপস্থিতি এবং পরিমাণ সঠিকভাবে নির্ণয় করা যায়। আর-আই-এ পদ্ধতি উদ্ভাবনের ফলে চিকিৎসাবিজ্ঞানের একটি নতুন দিগন্ত খুলে যায়। সম্ভব হয় শরীরের বিভিন্ন হরমোনের মাত্রা মেপে দেখার। কোন ওষুধ রোগীর শরীরে কাজ করছে কী না, ভিটামিন শরীরের উপাদানের সাথে মিশতে পারছে কি না, কিংবা ভাইরাস আক্রান্ত হলে তা কোন্‌ মাত্রায় কতটুকু ক্ষতি করছে এবং তার প্রতিষেধক দিলে তা কার্যকর হচ্ছে কি না সবকিছুই মেপে দেখা সম্ভব হয়েছে এই আর-আই-এ উদ্ভাবনের ফলে। ওষুধের সঠিক মাত্রা নির্ধারণে অগ্রদূতের ভূমিকা পালন করেছে এই পদ্ধতি। ১৯৫৯ সালে এই পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন পদার্থবিজ্ঞানী রোজালিন ইয়ালো এবং ডাক্তার সোলোমন বারসন। চিকিৎসাবিজ্ঞানের এই যুগান্তকারী আবিষ্কারের জন্য রোজালিন ইয়ালো পেয়েছেন ১৯৭৭ সালের চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার। অথচ কর্মজীবনের শুরুতে হতদরিদ্র মা-বাবার সন্তান রোজালিন একটি শিক্ষকতার চাকরি চেয়েও পাননি। কাজ শুরু করেছিলেন স্টেনোগ্রাফার হিসেবে। একাগ্রতা, অধ্যবসায় এবং কঠোর পরিশ্রমের ফলে রোজালিন হয়ে উঠেছেন বিশ্বের প্রথম সারির চিকিৎসা-পদার্থবিজ্ঞানী। 

ইহুদি মা-বাবার সন্তান রোজালিনের জন্ম নিউইয়র্ক শহরে ১৯২১ সালের ১৯ জুলাই। তাঁর মা-বাবা পূর্ব ইওরোপ থেকে আমেরিকায় এসেছিলেন অভিবাসী হয়ে। সীমিত সামর্থ্যের মধ্যে কোনো রকমে খেয়ে পরে বেঁচে থাকার জন্য সংগ্রাম করছিলেন রোজালিনের মা-বাবা। বড় কোন স্বপ্ন দেখার সাহসও তাঁরা দিতে পারেননি তাঁদের সন্তানদের। নিজেরা বেশিদূর পড়াশোনা করতে পারেননি। কিন্তু বুঝতে পেরেছেন সন্তানদের লেখাপড়া শেখাতে পারলে জীবনসংগ্রামে তারা হেরে যাবে না। 

আমেরিকার শিক্ষাব্যবস্থায় ভালো ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য বিনামূল্যে পড়াশোনা করার অনেক স্কুল আছে। নিউইয়র্কের ব্রংকস-এর সাধারণ সরকারি স্কুলেই পড়াশোনা রোজালিনের। হাইস্কুলে রসায়নের প্রতি আকৃষ্ট হন রোজালিন। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের পড়াশোনার জন্যও তাঁকে খুঁজতে হয়েছিল বিনাবেতনে পড়াশোনা কোথায় করা যায়। নিউইয়র্কের হান্টার কলেজ ছিল নিউইয়র্ক সিটির মিউনিসিপালিটি পরিচালিত বিনাবেতনে পড়ার কলেজ, যেখানে দরিদ্র পরিবারের মেয়েদের পড়াশোনা করার সুযোগ দেয়া হতো। হান্টার কলেজে স্নাতক পর্যায়ের পড়াশোনা করতে এসে রোজালিনের ভালো লেগে যায় পদার্থবিজ্ঞান। মেরি কুরির সন্তান ইভ কুরির লেখা মেরি কুরির জীবনী তখন প্রকাশিত হয়েছে। সেই বই পড়ে রোজালিন নিজেকে মেরি কুরির আদর্শে তৈরি করার অনুপ্রেরণা পেলেন। তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ডামাডোল শুরু হয়ে গেছে। নিউক্লিয়ার ফিজিক্সের রমরমা তখন শুরু হয়ে গেছে। সেই সময় নিউক্লিয়ার ফিশানের জনক এনরিকো ফার্মির লেকচার শোনার সুযোগ হলো রোজালিনের। পদার্থবিজ্ঞান,  বিশেষ করে নিউক্লিয়ার ফিজিক্সের প্রতি গভীর ভালোবাসা তৈরি হলো রোজালিনের। মা-বাবা যতই বলুন যে একটা শিক্ষকতার চাকরি পেলেই চলবে, রোজালিন মনস্থির মনস্থির করে ফেলেছেন সুযোগ পেলে পদার্থবিজ্ঞানের গবেষণাই করবেন জীবনে। ১৯৪১ সালে রসায়ন ও পদার্থবিজ্ঞান মেজর নিয়ে স্নাতক পাশ করলেন হান্টার কলেজ থেকে। 

কিন্তু পদার্থবিজ্ঞানের গবেষণা করতে গেলে তো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাগবে, পদার্থবিজ্ঞানে পিএইচডি করতে হবে। পড়াশোনার খরচ চালানোর জন্য বৃত্তি লাগবে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করলেন রোজালিন। কিন্তু সব বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই সরাসরি প্রত্যাখ্যানপত্র পেলেন তিনি। স্নাতকে এত ভালো রেজাল্ট করার পরও কোন বিশ্ববিদ্যালয় তাকে ভর্তির সুযোগ দিচ্ছে না কেন জানতে গিয়ে উত্তর পেলেন – একে তো মেয়ে, তার উপর ইহুদি। শুধুমাত্র একারণেই তাঁর দরখাস্ত বাতিল করে দেয়া হচ্ছিল। 

তাঁর মা-বাবা চেয়েছিলেন মেয়ে যদি কোনোভাবে লেখাপড়া শিখে কোনো একটা স্কুলে শিক্ষকতার চাকরি পায় তাহলে কোনোরকমে খেয়ে পরে বেঁচে থাকতে পারবে। কিন্তু স্কুলের শিক্ষকতার জন্য দরখাস্ত করেও কোন ফল হলো না। অনেকে পরামর্শ দিলেন স্টেনোগ্রাফি শিখে নিলে স্টেনোগ্রাফার হিসেবে কেরানির চাকরি পাওয়া যেতে পারে। রোজালিন বাধ্য হয়ে তাই শুরু করলেন। কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োকেমিস্ট্রির প্রফেসর রুডলফ শোয়েনহেইমারের স্টেনোগ্রাফার হিসেবে কাজ শুরু করলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে না পারলেও সান্তনা এই যে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকের অফিসে বসে কাজ করছেন। 

অবশেষে একটা সুযোগ এলো রোজালিনের জন্য। তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়, আমেরিকা যুদ্ধে জড়িয়ে গেছে। আমেরিকার ছেলেদের অনেকেই যুদ্ধে যোগ দেয়ার কারণে অনেক সিট খালি থেকে যাচ্ছিল। তখন শূন্যতা পূরণ করার জন্য মেয়েদেরকে সুযোগ দেয়া হয়। সেই সুযোগে ইলিনয় ইউনিভার্সিটির আরবানা-শ্যামপেইন ক্যাম্পাসে গ্রাজুয়েট স্কুলে ভর্তির সুযোগ পান রোজালিন। ১৯১৭ সালে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হবার পর থেকে রোজালিনের আগে আর কোন মেয়ে পদার্থবিজ্ঞানে ভর্তি হয়নি সেখানে। রোজালিন ছিলেন পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের প্রথম মেয়ে শিক্ষার্থী। একটা অ্যাসিস্ট্যান্টশিপও পেয়েছিলেন তিনি। স্নাতক পর্যায়ের ফিজিক্সের ক্লাস নিতেন তিনি। তখন ফিজিক্স ডিপার্টমেন্ট ছিল ইঞ্জিনিয়ারিং ফ্যাকাল্টির অধীনে। ফ্যাকাল্টির চারশ’র অধিক অধ্যাপক ও শিক্ষা-সহকারীর মধ্যে রোজালিনই ছিলেন একমাত্র মেয়ে। 

এখানে তাঁর সাথে পরিচয় হয় আরন ইয়ালোর সাথে। আরনও ছিলেন ইহুদি পরিবারের সন্তান। আরনের বাবা ছিলেন নিউইয়র্কের ইহুদি ধর্মযাজক। ১৯৪৩ সালে আরন ও রোজালিনের বিয়ে হয়। পরের চার বছরের মধ্যে তাঁদের দুই সন্তান – বেনজামিন ও ইলানার জন্ম হয়। অন্যান্য সব কাজের মতোই ঘরসংসারও খুব মনযোগ দিয়ে ভালোবেসে করতেন রোজালিন। 

১৯৪৫ সালে নিউক্লিয়ার ফিজিক্সে পিএইচডি সম্পন্ন করেন রোজালিন। দুর্দান্ত ভালো রেজাল্ট করার পরও তিনি কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের কোথাও কোন চাকরি পেলেন না। অনেক দরখাস্ত ব্যর্থ হবার পর প্রথম কাজ শুরু করলেন নিউইয়র্ক সিটির ফেডারেল টেলিকমিউনিকেশান কোম্পানিতে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে। তারপর হান্টার কলেজে যোগ দেন পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষক হিসেবে। এরপর ব্রোংক্‌স এর ভ্যাটেরান্স অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (ভিএ) হাসপাতালের নিউক্লিয়ার মেডিসিনের গবেষক হিসেবে ১৯৪৭ সালে। এখানেই তিনি গবেষণা শুরু করলেন চিকিৎসাবিজ্ঞানে রেডিও-আইসোটোপের ব্যবহার সম্পর্কে। 

চিকিৎসাবিজ্ঞানে রেডিও-আইসোটোপের ব্যবহার তখন মাত্র শুরু হয়েছে। রোজালিন দেখতে পাচ্ছেন নিউক্লিয়ার মেডিসিনের বিপুল সম্ভাবনাময় ভবিষ্যত। কিন্তু তাঁর একজন গবেষণা-সহযোগী দরকার যিনি চিকিৎসাবিজ্ঞান সম্পর্কে জানেন। এই কাজের জন্য তিনি বেছে নেন ভিএ হাসপাতালে সদ্য যোগ দেয়া ইন্টার্নি ডাক্তার সোলোমন বারসনকে। ডাক্তার সোলোমন বারসনের সাথে রোজালিনের অচ্ছেদ্য গবেষণা-বন্ধন তৈরি হয়। পরবর্তী বিশ বছরেরও বেশি সময় তাঁরা একসাথে গবেষণা করেছেন। ১৯৭২ সালে ডাক্তার সোলোমন হার্ট অ্যাটাকে মারা যান। 

১৯৫০ এর দশকের শুরুতে রোজালিন ও সোলোমন রক্তে আয়োডিন ও এলবুমিনের বিপাক প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করার পদ্ধতি উদ্ভাবন করলেন। রোগীর শরীরে রেডিও-আইসোটোপ সংযুক্ত রাসায়নিক (রেডিওফার্মাসিউটিক্যাল) ইনজেকশানের মাধ্যমে প্রয়োগ করার পর রোগীর রক্তের তেজস্ক্রিয়তা পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায় সময়ের সাথে তেজস্ক্রিয় বিকিরণের মাত্রা কীভাবে ক্রমশ কমে আসে। অতিদ্রুত কমে এলে বুঝতে হবে বিপাক প্রক্রিয়া দ্রুত হচ্ছে, আর বিকিরণের হার যদি কম হয়, বুঝতে হবে বিপাক ধীরগতিতে হচ্ছে। 

ডায়াবেটিসের মূল কারণ যে ইনসুলিনের দ্রুত বিপাক – সেই ধারণা চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মনে এলেও তখনো তা প্রমাণ করার উপায় জানা ছিল না। রোজালিন ডায়াবেটিক রোগীদের নিয়ে গবেষণা শুরু করলেন। তিনি ডায়াবেটিক রোগীর শরীরে রেডিও-আইসোটোপের বিকিরণের হার পর্যবেক্ষণ করে দেখলেন যে ডায়াবেটিক রোগীদের মধ্যে ইনসুলিনের বিপাকের হার অনেক বেশি। অর্থাৎ ডায়াবেটিক রোগীর শরীর থেকে ইনসুলিন দ্রুত ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে যাচ্ছে। তিনি এবার রোগীদের দুভাগে ভাগ করলেন। একভাগকে ইনসুলিন ইনজেকশান দেয়া হলো। অন্যভাগকে ইনসুলিন দেয়া হলো না। দেখা গেলো যাদেরকে ইতোমধ্যে ইনসুলিন দেয়া হয়েছে তাদের রক্তের ইনসুলিন বিপাকের হার, যাদেরকে আগে ইনসুলিন দেয়া হয়নি তাদের রক্তের ইনসুলিন বিপাকের হারের চেয়ে অনেক কম। তার মানে দাঁড়ালো শরীরে ইনসুলিন দেয়া হলে সেই ইনসুলিন রোগীর শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি করে যা ইনসুলিনের বিপাক-প্রক্রিয়ার হার কমিয়ে দিয়ে শরীর থেকে ইনসুলিন ক্ষয়ের অস্বাভাবিক মাত্রাকে স্বাভাবিক করতে সাহায্য করে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই আবিষ্কার একটি যুগান্তকারী আবিষ্কার। কিন্তু রোজালিন ও সোলোমন যখন তাঁদের গবেষণালব্ধ ফলাফল দ্য জার্নাল অব ক্লিনিক্যাল ইনভেস্টিগেশন-এ প্রকাশের জন্য পাঠালেন, জার্নালের রিভিউয়াররা তা সরাসরি বাতিল করে দেন। এই প্রত্যাখ্যানে একটুও দমে গেলেন না রোজালিন। বরং আরো উৎসাহ নিয়ে আরো অনেক বিস্তারিত গবেষণা তিনি করলেন। সেখান থেকেই আবিষ্কার করলেন আর-আই-এ পদ্ধতি। সেই প্রত্যাখ্যানের চিঠি তিনি যত্ন করে রেখে দিয়েছিলেন সারাজীবন। বিশ বছর পর ১৯৭৭ সালে তিনি যখন তাঁর এই গবেষণার জন্য চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার পেলেন, তাঁর নোবেল বক্তৃতায় তিনি সেই প্রত্যাখ্যানপত্র দেখিয়েছিলেন। 

রোজালিন শিক্ষাজীবনে রসায়ন পড়েছেন, নিউক্লিয়ার ফিজিক্সে পিএইচডি করেছেন, কিন্তু  জীববিজ্ঞানের কোন কোর্স করেননি। অথচ তিনি নিজে নিজে পড়াশোনা করে এত বেশি ফিজিওলজি এবং মেডিসিনের জ্ঞান অর্জন করেছিলেন যে তাঁর সমসাময়িককালের কোন ডাক্তারেরও এত জ্ঞান ছিল না। 

নোবেলজয়ী রোজালিনের গবেষণাগারটি ছিল অত্যন্ত সাধারণ। শুরু করেছিলেন হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতাকর্মীর ঝাড়ু-বালতি ইত্যাদি পরিচ্ছন্নতা কাজের সরঞ্জাম রাখার একটা ছোট্ট ঘরকে গবেষণাগারে রূপান্তরের মাধ্যমে। পরবর্তীতে তার কিছুটা উন্নতি হলেও খুব দরকারি যন্ত্রপাতি ছাড়া আর কোন বাহুল্য সেখানে ছিল না। সেরকম রোজালিনও ছিলেন সারাজীবন সাদামাটা। নোবেল পুরষ্কার পাবার আগেও যা ছিলেন, পরেও তাঁর সহজ-সরল সাদামাটা জীবনযাপনের কোন পরিবর্তন হয়নি। সপ্তাহে সবাই যেখানে চল্লিশ ঘন্টার বেশি কাজ করেন না, রোজালিন সপ্তাহে আশি ঘন্টা কাজ করতেন। তাঁর ল্যাবের কাছেই ছোট্ট একটা বাড়িতে স্বামী আর দুই সন্তানকে নিয়ে তিনি থাকতেন। এত গবেষণার ফাঁকেও তিনি বাড়ির কাজ করতেন। প্রথম সন্তানের বয়স এক মাস হবার আগেই তিনি সন্তান কোলে নিয়ে ল্যাবের কাজে যোগ দিয়েছেন। দ্বিতীয় সন্তানের বেলাতেও তাই করেছেন। দুপুরে ল্যাব থেকে বের হয়ে বাসায় গিয়ে শিশু সন্তানদের জন্য খাবার তৈরি করে খাইয়ে আবার ল্যাবে এসেছেন। তিনি নারী-পুরুষের সমান অধিকারে বিশ্বাস করতেন। তিনি বলতেন, নারী ও পুরুষের মধ্যে শুধুমাত্র একটাই পার্থক্য আছে – সেটা হলো নারী সন্তান জন্ম দিতে পারে, পুরুষ পারে না। এছাড়া অধিকারের ক্ষেত্রে আর কোন পার্থক্য থাকা উচিত নয়। 

১৯৯১ সালে সত্তর বছর বয়সে হাসপাতালের গবেষকের চাকরি থেকে অবসর নিতে হয় তাঁকে। তারপর বেঁচে ছিলেন আরো বিশ বছর। তখনো তাঁর পড়াশোনা, গবেষণা থেমে থাকেনি। ২০১১ সালের ৩০ মে তাঁর জীবনাবসান হয়। 


তথ্যসূত্র – সিমন গ্লিক, ন্যাচার, সংখ্যা ৪৭৪, ২০১১; সিয়াং ইয়ং ট্যান, সিঙ্গাপুর মেডিক্যাল জার্নাল, সংখ্যা ৬০, ২০১৯; নোবেল পুরষ্কার ওয়েবসাইট। 

___________
বিজ্ঞানচিন্তা জুলাই ২০২২ সংখ্যায় প্রকাশিত






Friday, 26 August 2022

সাম্প্রদায়িকতার শাস্তি

 


ছবির এই মানুষটির নাম ব্রিজিড হেইউড। দু’সপ্তাহ আগেও তিনি অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব নিউ ইংল্যান্ডের ভাইস চ্যান্সেলর ছিলেন। আগস্টের পাঁচ তারিখ তাঁর চাকরি চলে গেছে। এত বড় পদের চাকরি থেকে বরখাস্ত করার কিছুটা সম্মানজনক উপায় হলো – পদত্যাগপত্র জমা নেয়া। আগস্টের পাঁচ তারিখ তাঁর পদত্যাগপত্র গৃহীত হয়েছে। তাঁর অপরাধ কী? না, কিছু কিছু দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের মতো তিনি কোন দুর্নীতি করেননি, স্বজনপোষণ করে স্ত্রী-পুত্র-কন্যা-জামাতা-ভাইপো-ভাইজিকে নিয়োগ দেননি। তিনি যেটা করেছেন, সেটা আমাদের দেশে হয়তো কোন অপরাধই নয়। তিনি নিজের মুখ থেকে থুতু আঙুলে লাগিয়ে একটি বাদামী মেয়ের কপালে ডলতে ডলতে বলেছিলেন, দ্যাখো তোমার গায়ের চামড়ার রঙ কত ময়লা!

ঘটনাটি ঘটেছিল এবছর ৮ মার্চ – আন্তর্জাতিক নারী দিবসে। আর্মিডেলে – যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়টি অবস্থিত – একটি ক্লাবে আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালন করা হচ্ছিলো। ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর ব্রিজিড হেইউড সেই অনুষ্ঠানে আলোচকদের প্যানেলে ছিলেন। স্থানীয় স্কুলগুলি থেকে অনেক মেয়েকেও আনা হয়েছিল সেই অনুষ্ঠানে। ষোল বছর বয়সী স্কুলছাত্রীটি অভিবাসী মা-বাবার সন্তান, জন্মসূত্রে অস্ট্রেলিয়ান। জন্মসূত্রেই গায়ের বাদামী রঙ পেয়েছে। সেটা তার অপরাধ – শ্বেত চামড়ার অধিকারী ব্রিজিড হেইউইয়ের কাছে? অথচ ব্রিজিডের গায়ের বর্ণ সাদা হবার জন্য তাঁর নিজের কি কোন কৃতিত্ব আছে? বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ভিসি হবার পরেও তাঁর সেই সামান্য যুক্তিবোধ কাজ করলো না?

তিনি হয়তো ভেবেছিলেন এটা নিয়ে কেউ কোন আপত্তি করবে না। কিন্তু সেই ব্রিটিশ যুগ কি আছে – যেই যুগে ব্রিটিশরা লাথি মারলে ভারতীয়রা জিভ দিয়ে তাদের জুতো পরিষ্কার করে দিতো বাধ্য হয়ে? অস্ট্রেলিয়া শত বছর অস্ট্রেলিয়ান অশ্বেতাঙ্গ আদিবাসীদের উপর অত্যাচারের চূড়ান্ত করার পর এখন ক্রমশ সভ্য হচ্ছে। সাম্প্রদায়িকতা প্রদর্শনের বিরুদ্ধে এখানে আইনকানুন খুব কড়া। অভিবাসীরা এসব আইনকানুনের খবর রাখেন, বাধ্য হয়েই রাখেন। মেয়েটির স্কুলেও পড়ানো হয় সব মানুষের সমান অধিকারের কথা। সে চুপ করে রইলো না। সে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ করেছে ভাইস চ্যান্সেলর ব্রিজিড হেইউডের কাছে।

এদেশে যে যত বড় ক্ষমতাশালী – আইনকানুন তাকে তত বেশি মেনে চলতে হয়। মিডিয়াগুলি স্বাধীন। ফলে একজন সাধারণ মানুষ আইন ভাঙলে মিডিয়া দেখেও না দেখার ভান করতে পারে নিউজভ্যালু কম হবার কারণে। কিন্তু একজন প্রভাবশালী যদি আইন ভাঙে – তাহলে আর রক্ষা নেই। সেজন্যই দেখা যায় কোভিড-১৯ এর লকডাউনের সময় মুখে মাস্ক ছাড়া পেট্রোল পাম্প থেকে তেল নেয়ার কারণে উপপ্রধানমন্ত্রীকে ফাইন করা হয়।

যেহেতু এধরনের সাম্প্রদায়িকতার অভিযোগ আনা হয়েছে ভাইস-চ্যান্সেলরের বিরুদ্ধে, এবং ভিডিও ফুটেজও আছে – শেষ রক্ষা হলো না কোনভাবেই। ভিসি ব্রিজিড হেইউড পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। আদালতের বিচারে তিনি দোষী সাব্যস্ত হতে এখনো অনেক দেরি আছে। কিন্তু ভাইস-চ্যান্সেলরের মতো একটি পদের বিরুদ্ধে এধরনের অভিযোগ উঠলে তা প্রাথমিক তদন্তে যদি দেখা যায় একেবারে ভিত্তিহীন নয়, তখন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ চুপ করে থাকতে পারে না। এখানে বলে রাখা ভালো, অস্ট্রেলিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলি চলে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব পরিচালনা বোর্ডের মাধ্যমে। সরকার সেখানে মাথা গলাতে পারে না। সুতরাং এদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিদের সরকারি লেজুড়বৃত্তি করতে হয় না। আসলে লেজুড়বৃত্তি করে লাভ হলে হয়তো এখানেও করতো।

এরকম শাস্তির নজির থাকলেই কি মানুষের মন থেকে সাম্প্রদায়িক মনোভাব মুছে যাবে? সম্প্রদায়ভুক্ত মানুষ পুরোপুরি সাম্প্রদায়িকতামুক্ত হতে পারে না। কোনো না কোনোভাবে যত সামান্য পরিমাণেই হোক না কেন তা প্রকাশিত হয়ে পড়ে। সাম্প্রদায়িকতা বলতে যদিও আমরা শুধুমাত্র ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা বুঝি, কারণ ওটা নিয়েই সবচেয়ে বেশি গন্ডগোল দেখতে আমরা অভ্যস্ত, কিন্তু বর্ণসাম্প্রদায়িকতা আরো মারাত্মক। বাংলাদেশের কথা যদি ধরি – আমাদের গায়ের বর্ণ মোটামুটিভাবে সবারই একই রকম। সেখানে গাত্রবর্ণ দেখে ধর্মনির্ণয় অসম্ভব। ধর্মীয় পরিচয় আমি ইচ্ছে করলে প্রকাশ নাও করতে পারি। কিন্তু আমার গাত্রবর্ণ লুকানোর তো কোন ব্যবস্থা নেই। আমেরিকায় বর্ণসাম্প্রদায়িকতার ফলে সংঘর্ষ প্রায়ই ঘটে, এই একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়েও। আফ্রিকান-আমেরিকান জাতিগোষ্ঠী কয়েক প্রজন্ম ধরে আমেরিকায় জন্ম নেয়ার পরেও, একজন কৃষ্ণাঙ্গ আটবছর ধরে সেই দেশের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করলেও – বর্ণবিদ্বেষ মুছে যায়নি। বিশ্বায়নের ফলে ভারতীয় উপমহাদেশের বাদামী বর্ণের মানুষগুলি যখন পৃথিবীময় ছড়িয়ে পড়েছে – তখন তাদেরকেও এখন প্রায়ই বর্ণসাম্প্রদায়িকতার কদর্য অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যেতে হচ্ছে। আমেরিকা কানাডা ইওরোপ অস্ট্রেলিয়ার মতো শ্বেতাঙ্গশাসিত দেশে তো বটেই, আফ্রিকার মতো কৃষ্ণাঙ্গ শাসিত দেশেও বাদামীরা বর্ণবাদের শিকার হচ্ছে যথেষ্ট কালো নয় বলে।

আবার বাদামীরা যে নিজেদের ভেতর কী পরিমাণ বর্ণসাম্প্রদায়িক তা আর নতুন করে বলার দরকার আছে বলে মনে হয় না। চট্টগ্রাম কলেজে উচ্চমাধ্যমিক পড়ার সময় একজন প্রভাবশালী স্যার আমাকে প্রত্যেক ক্লাসেই সম্বোধন করতেন “এই কালাইয়া” বলে। অনেক বছর আগের সেই পরিস্থিতির কি এখন কোন উন্নতি হয়েছে?


Saturday, 13 August 2022

মহাজাগতিক রশ্মি

 


১৮৯৫ সালে এক্স-রে আবিষ্কৃত হবার পরবর্তী এক দশকের মধ্যেই পদার্থবিজ্ঞানের জগৎ নতুন নতুন তথ্য, তত্ত্ব, কণা এবং রশ্মিতে ভরে উঠতে লাগলো। পরের বছরই আবিষ্কৃত হলো তেজস্ক্রিয় বিকিরণ বা রেডিওঅ্যাকটিভিটি। ঠিক তার পরের বছর ১৮৯৭ সালে জানা গেলো ইলেকট্রন হলো পদার্থের সবচেয়ে মৌলিক কণা। যদিও ইলেকট্রন যে নেগেটিভ চার্জ বহন করে তা কয়েক শ বছর আগে থেকেই জানা ছিল, কিন্তু তার অন্যান্য ধর্মগুলি সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ তখন মাত্র হাতে এলো। দৃশ্যমান আলো সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের ধারণা কয়েক হাজার বছর আগে থেকে আছে। সেই ধারণাকে সুনির্দিষ্ট পদার্থবিজ্ঞানের সূত্রে রূপ দেয়া হয়ে গেছে ততদিনে। দৃশ্যমান আলো যে বিদ্যুৎচুম্বকীয় তরঙ্গ বা ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ওয়েভ তা বিজ্ঞানী জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েলের সমীকরণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এক্স-রে আবিষ্কারেরও ত্রিশ বছর আগে। কিন্তু অদৃশ্য এক্স-রে কিংবা গামা-রে’র শক্তি এবং গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে জানার তখনো শুরু। বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকেই পদার্থবিজ্ঞানের জগৎ অজানা রশ্মি ও কণাময় হয়ে উঠলো। এই অদৃশ্য রশ্মিগুলির শক্তি বিকিরণের তীব্রতা এবং যে পদ্ধতিতে এরা বিভিন্ন পদার্থের দেয়াল ভেদ করে অনায়াসে চলে যাচ্ছে তার অন্তর্গত বৈজ্ঞানিক রহস্য আবিষ্কারের জন্য অধীর হয়ে উঠলেন সারাপৃথিবীর পদার্থবিজ্ঞানীরা। আমাদের উপমহাদেশের বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসুও ছিলেন সেই বিজ্ঞানীদের দলে।

তখন নতুন নতুন রশ্মি এবং কণা আবিষ্কারের ধুম লেগে গেছে। কিছুদিন পর পরই বিজ্ঞানীদের মনে হচ্ছে আরো নতুন কোন রশ্মির সন্ধান পাওয়া গেছে। কিন্তু কেউ একজন ঘোষণা দিলেই তো আর আবিষ্কার হয়ে যায় না। একজন কোন কিছু আবিষ্কার করলে, কী পদ্ধতিতে আবিষ্কার করেছেন তা জানাতে হয়। একই পদ্ধতিতে অন্যরাও যদি সেই আবিষ্কারের ফল পায় – তবেই বলা যায় যে আবিষ্কারটি সঠিক আবিষ্কার। ১৯০৩ সালে ফরাসি পদার্থবিজ্ঞানী প্রসপার ব্লন্ডলট ঘোষণা দিলেন তিনি নতুন এক ধরনের রশ্মি আবিষ্কার করেছেন। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তিনি বেশ কয়েকটি পেপার লিখে ফেললেন কীভাবে তিনি এই নতুন রশ্মির বিকিরণ আবিষ্কার করেছেন। পাঁচ বছর আগে মেরি কুরি নতুন তেজস্ক্রিয় মৌল আবিষ্কার করে নিজের জন্মভূমির নামে নামকরণ করেছিলেন পোলোনিয়াম। প্রসপার ব্লন্ডলটও সেভাবে ফ্রান্সের যে শহরে তিনি জন্মেছেন সেই শহরের নামে তাঁর রশ্মির নাম দিলেন ন্যান্সি রশ্মি বা এন-রে। তাঁর শহরে হৈ চৈ পড়ে গেল। ফ্রেন্স একাডেমি অব সায়েন্স তাঁকে পঞ্চাশ হাজার ফ্রাঙ্ক পুরষ্কার দিয়ে ফেললো। দ্রুত বিখ্যাত হয়ে গেলেন তিনি। কিন্তু সমস্যা হয়ে গেল যখন এন-রশ্মি নিয়ে পৃথিবীর অন্যান্য জায়গার বিজ্ঞানীরাও কাজ শুরু করলেন। ব্লন্ডলট যে পদ্ধতিতে এন-রশ্মি আবিষ্কার করেছেন বলে দাবি করেছেন তাঁর গবেষণাপত্রে, অন্যান্য বিজ্ঞানীরা একই পদ্ধতি বার বার ব্যবহার করেও এন-রশ্মির অস্তিত্ব খুঁজে পেলেন না। স্বাভাবিকভাবেই এন-রশ্মির দাবি বাতিল হয়ে গেল। তবুও ন্যান্সি শহরের অনেকেই বিশ্বাস করতে থাকলেন যে তাঁদের বিজ্ঞানী আবিষ্কার ঠিকই করেছেন, অন্যান্য বিজ্ঞানীরা ষড়যন্ত্র করে তার স্বীকৃতি দিতে চাচ্ছে না।

সে যাই হোক, এক্স-রে গামা-রে নিয়ে তখন প্রচুর গবেষণা চলছে পৃথিবীজুড়ে। গোল্ড-লিফ ইলেকট্রোস্কোপ বা স্বর্ণপাত তড়িৎবীক্ষণ যন্ত্র ব্যবহার করে চার্জিত কণার অস্তিত্ব এবং পরিমাণ নির্ণয় করা তখন নিয়মিত ব্যাপার। স্কটিশ বিজ্ঞানী চার্লস উইলসন তখন প্রচুর গবেষণা করছেন কীভাবে অদৃশ্য বিকিরণ ও চার্জ শনাক্ত করা যায়। উইলসন ছিলেন ইলেকট্রন আবিষ্কারক জোসেফ জন থমসনের (জে জে থমসন) ছাত্র। ক্যাভেন্ডিস ল্যাবে কাজ করার সময় তিনি খেয়াল করলেন তাঁর স্বর্ণপাত তড়িৎবীক্ষণ যন্ত্র মাঝে মাঝে কিছু চার্জ শনাক্ত করছে যখন আশেপাশে কোন চার্জিত বস্তু কিংবা তেজস্ক্রিয় পদার্থ নেই যেখান থেকে চার্জ কিংবা বিকিরণ নির্গত হতে পারে। অনেক খুঁজে পেতেও এর কারণ বের করতে পারলেন না উইলসন। এই ঘটনা আরো অনেক ল্যাবেই দেখা গেল। বৈদ্যুতিক চার্জগুলি যে কুলম্বের সূত্র মেনে চলে সেই চার্লস কুলম্বও শতাধিক বছর আগে এরকম রহস্যময় কিছু লক্ষ্য করেছিলেন। তিনি দেখেছিলেন তাঁর চার্জিত গোলক – কোন কারণ ছাড়াই চার্জ হারাচ্ছে। এই রহস্যময় ঘটনার কোন সুনির্দিষ্ট সমাধান করা যায়নি। তবে বিজ্ঞানীরা মোটামুটি ধরে নিয়েছেন যে আমাদের পৃথিবী নিজেই যেহেতু তেজস্ক্রিয় নক্ষত্র থেকে উৎপন্ন হয়েছে, বিগত সাড়ে চারশ কোটি বছর ধরে বিকিরণের পরেও এখনো কিছুটা তেজস্ক্রিয়তা রয়ে গেছে এর ভেতর। সেই বিকিরণই মাঝে মাঝে ধরা দিচ্ছে তড়িৎবীক্ষণ যন্ত্রে।

কিন্তু ধোঁয়াশে ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট থাকা বিজ্ঞানীদের ধর্ম নয়। এই রহস্য উন্মোচনে কাজ করছিলেন অনেকেই। ততদিনে তেজস্ক্রিয় বিকিরণের মৌলিক ধর্ম সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা জেনে গেছেন। তেজস্ক্রিয় পদার্থ থেকে দূরে গিয়ে তেজস্ক্রিয়তা মাপলে তেজস্ক্রিয়তার পরিমাণ কমে যায়। কোন জায়গায় তেজস্ক্রিয় বস্তু রেখে তার এক মিটার দূরে ডিটেক্টর রাখলে যে পরিমাণ তেজস্ক্রিয়তা পাওয়া যাবে, দুই মিটার দূরে রেখে মাপলে তেজস্ক্রিয়তার পরিমাণ হবে চার ভাগের একভাগ। তেজস্ক্রিয়তার পরিমাণ দূরত্বের বর্গফলের বিপিরীত অনুপাত। পৃথিবীর ভেতরের তেজস্ক্রিয়তার অস্তিত্বই যদি বিদ্যুৎবীক্ষণ যন্ত্রে ধরা পড়ছে হবে – তাহলে পৃথিবীপৃষ্ঠ থেকে যত উপরের দিকে এই বিদ্যুৎবীক্ষণ যন্ত্র নিয়ে যাওয়া হবে, তেজস্ক্রিয়তা তত কমে যাবে। বিদ্যুৎবীক্ষণ যন্ত্র ভূমির সমতলে যে পাঠ দেবে, ভূমি থেকে উপরে তার চেয়ে কম পাঠ দেবে। বিভিন্নভাবে এই পরীক্ষা করে দেখা হলো – কিন্তু উচ্চতার কারণে পাঠের কোন পার্থক্য দেখা গেলো না। তখন ভাবা হলো সামান্য দূরত্বের পার্থক্যে কিছু হবে না। দূরত্ব বাড়াতে হবে। ১৯১০ সালে জার্মান পদার্থবিজ্ঞানী থিওডর বুল্‌ফ আইফেল টাওয়ারের উপরে উঠে পরীক্ষা চালালেন। ফল হলো উল্টো। দেখা গেলো আইফেল টাওয়ারের নিচে তড়িৎবীক্ষণ যন্ত্রে যে পাঠ পাওয়া গেল, তিন শ মিটার উপরে আইফেল টাওয়ারের চূড়ায় সেই বিকিরণ শনাক্তের সেই পাঠ অনেক বেশি। তাহলে এটা নিশ্চিত হলো যে এই তেজস্ক্রিয়তার উৎপত্তি পৃথিবীতে নয়, পৃথিবীর বাইরে। কিন্তু কোথায়?


ভিক্টর হেস


অস্ট্রিয়ান পদার্থবিজ্ঞানী ভিক্টর হেস তখন ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ গবেষক। তিনি ঠিক করলেন আরো অনেক উঁচুতে উঠে পরীক্ষা চালাবেন। ১৯১১ সালে আকাশের দিকে উপরে উঠার তখনকার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা ছিল বেলুন। তিনি বেশ কয়েক বছর ধরে অনেকগুলি পরীক্ষা করলেন বেলুনে চড়ে। সাড়ে চারশ মিটার উচ্চতা থেকে শুরু করে পাঠ নিতে নিতে তিনি উঠলেন পাঁচ কিলোমিটারেরও বেশি উচ্চতায়। দেখলেন যতই উপরের দিকে উঠছেন, তেজস্ক্রিয়তার পরিমাণ ততই বাড়ছে। তার মানে এই তেজস্ক্রিয়তা পৃথিবীর বায়ুমন্ডল ভেদ করে আসছে পৃথিবীর বাইরে থেকে। তবে কি সূর্য থেকে আসছে? তাহলে দিনের বেলার পাঠ আর রাতের বেলার পাঠে পার্থক্য থাকবে। ভিক্টর হেস রাতের বেলায়ও পরীক্ষা চালালেন। অন্ধকারে যখন সূর্যের আলো বেলুনের আশেপাশে কোথাও নেই, তখনো দেখা গেলো তেজস্ক্রিয়তার পরিমাণ একটুও কমছে না। ঘটনা কী? তবে কি সূর্যও নয়, আরো দূরের কোন নক্ষত্র থেকে আসছে এই তেজস্ক্রিয়তা? সূর্যগ্রহণের ফলে কোন তারতম্য দেখা যায় কিনা পরীক্ষা করার জন্য ১৯১২ সালের ১৭ এপ্রিল পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণের সময় বেলুনে চড়ে তড়িৎবীক্ষণ যন্ত্রের পাঠ নিলেন ভিক্টর হেস। কিন্তু ফলাফলে কোন তারতম্য দেখা গেল না। ১৯১৩ সাল নাগাদ বিজ্ঞানীরা মেনে নিলেন যে পৃথিবীর বাইরে এমনকি সূর্যের থেকেও দূরে মহাকাশের গভীর নক্ষত্রপুঞ্জ থেকে পৃথিবীর বায়ুমন্ডলের বর্ম ভেদ করে চলে আসছে এই আশ্চর্য রশ্মি। আরো প্রায় বারো বছর পরে ১৯২৫ সালে বিজ্ঞানী রবার্ট মিলিক্যান এই রশ্মির নাম দিলেন কসমিক রে – বাংলায় আমরা যাকে মহাজাগতিক রশ্মি বলছি। ১৯৩৬ সালে মহাজাগতিক রশ্মির আবিষ্কারক হিসেবে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার পেলেন ভিক্টর হেস।

রবার্ট মিলিক্যান যতই বলুন যে কসমিক রে আসলেই রে – মানে আলোকরশ্মির মতো তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গের অংশ – বিজ্ঞানীরা সম্পূর্ণরূপে সন্তুষ্ট হতে পারলেন না। কসমিক রে এক্স-রে কিংবা গামা-রে’র চেয়েও বেশি শক্তিশালী এবং এদের পেনিট্রেটিং পাওয়ার বা ভেদ করে যাওয়ার ক্ষমতাও অনেক বেশি। মিলিক্যান বললেন কসমিক রে তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গেরই বড়ভাই – যাদের কম্পাঙ্ক এক্স-রে ও গামা-রের কম্পাঙ্কের চেয়ে বেশি, আর তরঙ্গদৈর্ঘ্য এক্স-রে ও গামা-রে’র তরঙ্গদৈর্ঘ্যের চেয়ে কম। মিলিক্যান বিশ্বখ্যাত আমেরিকান বিজ্ঞানী, ইলেকট্রনের চার্জ সঠিকভাবে মেপে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন ১৯২৩ সালে। তাঁর কথা অনেকেই মেনে নেবেন এটা ঠিক। কিন্তু বিজ্ঞানে প্রমাণ ছাড়া কারো কথাই কেউ মেনে নেয় না। মিলিক্যানের কথাও অনেক বিজ্ঞানীর বিশ্বাস হলো না। তাঁরা পরীক্ষা করে দেখতে চাইলেন কসমিক রে আসলেই রে, নাকি মহাকাশ থেকে ছুটে আসা কোন চার্জিত কণা।

ততদিনে ইলেকট্রন ও প্রোটন সম্পর্কে সবাই জেনে গেছেন। নিউট্রন তখনো স্বীকৃতি পায়নি। কসমিক রে যদি মহাকাশ থেকে ছুটে আসা রশ্মি হয়, আলোকের অংশ হয়, তাহলে সেই ফোটন পৃথিবীর সবজায়গায় সমানভাবে ছড়িয়ে পড়ার কথা। কারণ ফোটন যেহেতু চার্জহীন, সেহেতু তারা কোন ধরনের বিদ্যুৎক্ষেত্র কিংবা চুম্বকক্ষেত্র দ্বারা বিক্ষিপ্ত হবে না। কিন্তু যদি তারা চার্জিত কণা হয়, তাহলে পৃথিবীর চুম্বকক্ষেত্রের প্রভাব তাদের গতির উপর অবশ্যই পড়বে। তাহলে দেখা যাবে পৃথিবীর মেরুর দিকে কসমিক রে বেশি ধরা পড়বে।   

ঠিক তাই হলো। অনেক বিজ্ঞানীই এই পরীক্ষা করলেন। নোবেলজয়ী আমেরিকান পদার্থবিজ্ঞানী আর্থার কম্পটন প্রমাণ করলেন যে কসমিক রে আসলে রে নয়, পার্টিক্যাল। ১৯৩০ থেকে ১৯৪৫ সালের মধ্যে প্রচুর গবেষণা হয়েছে কসমিক রে’র বিকিরণ নিয়ে। প্রমাণিত হয়েছে কসমিক রে’র শতকরা নব্বই ভাগ কণাই হলো প্রোটন, আর সাথে কিছু (৯%) আলফা পার্টিক্যাল বা হিলিয়াম নিউক্লিয়াস। বাকি এক ভাগ বিটা পার্টিক্যাল বা ইলেকট্রন। সুতরাং এদেরকে মহাজাগতিক রশ্মি না বলে মহাজাগতিক কণা বলা উচিত। কিন্তু কসমিক রে নামটা ততদিনে প্রচলিত হয়ে গেছে বলে তা আর বদলানো হলো না।

কিন্তু এত বিপুল পরিমাণ চার্জিত কণার উৎস কোথায়? আমাদের কাছের নক্ষত্র সূর্যই যে একমাত্র উৎস নয়, তা প্রমাণিত হয়ে গেছে অনেক আগেই। এই মহাজাগতিক কণাগুলির উৎস সন্ধান করতে গিয়ে খুলে গেছে মহাকাশ গবেষণার আরো অনেক নতুন নতুন দিক। মহাকাশের অতল গহ্বরে কোটি আলোকর্ষ দূরে ঘটে যাওয়া সুপারনোভা বিস্ফোরণ, ব্ল্যাকহোলের উৎপত্তি এসব মহাজাগতিক ঘটনা থেকে উৎপন্ন মহাজাগতিক কণাগুলির অংশবিশেষ আমাদের পৃথিবীতে এসে পৌঁছাচ্ছে। এদের কিছু কিছু কণার শক্তি লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডারে উৎপন্ন সবচেয়ে শক্তিশালী কণার চেয়েও বেশি শক্তিসম্পন্ন। এদের উৎপত্তির রহস্যের কিনারা এখনো করা যায়নি। কসমিক রে’ আবিষ্কারের এক শ বছরেরও বেশি অতিক্রান্ত হয়ে গেছে, এখনো এর আদ্যোপান্ত জানা যায়নি।

২০১৭ সালে নাসা ইন্টারন্যাশনাল স্পেস স্টেশনে আইস-ক্রিম (ISS-CREAM International Space Station – Cosmic Ray Energies and Mass) পরীক্ষা চালিয়েছে তিন বছর ধরে। মহাকাশ স্টেশন থেকে চালানো এই পরীক্ষায় দেখতে চেয়েছে সুপারনোভা বিস্ফোরণ থেকেই বেশিরভাগ কসমিক রে’র উৎপত্তি কিনা, আর কসমিক রে’র সব শক্তির বর্ণালী কোন একটি নির্দিষ্ট নিয়মে ব্যাখ্যা করা যায় কিনা। তথ্য এবং উপাত্ত বিশ্লেষণ এখনো চলমান। মহাকাশের রহস্য উন্মোচনে কসমিক রে’র ভূমিকা ক্রমশ বাড়ছে।

কিন্তু পৃথিবীতে যেসব কসমিক রে প্রতিনিয়ত আসছে তাদের ফলে আমাদের শরীরের কি ক্ষতি হচ্ছে? পৃথিবীতে আমরা প্রতি বছর গড়ে প্রায় পাঁচ মিলিসিভার্ট বিকিরণ শোষণ করি। তার মধ্যে মাত্র দশমিক চার মিলিসিভার্ট আসে মহাজাগতিক কণা থেকে। আলাদাভাবে এই কণাগুলি আমাদের শরীরের তেমন কোন ক্ষতি করে না, কারণ এই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কণাগুলির শক্তি অত্যন্ত বেশি বলে এরা আমাদের শরীরের একদিক দিয়ে ঢুকে অন্যদিক দিয়ে বের হয়ে যায় প্রায়-আলোর গতিতে। তাই পৃথিবীপৃষ্ঠে এগুলি থেকে ক্ষতির সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে।

তথ্যসূত্র: টুডুর স্টানেভ, হাই এনার্জি কসমিক রেজ, স্প্রিংগার (২০১০); বব বারম্যান, ঝ্যাপ্‌ড, লিটল ব্রাউন কোম্পানি (২০১৭); আইজাক আসিমভ, আন্ডারস্ট্যান্ডিং ফিজিক্স, বার্নিস অ্যান্ড নোবল (১৯৬৬)।

_______________

বিজ্ঞানচিন্তা জুন ২০২২ সংখ্যায় প্রকাশিত






Wednesday, 10 August 2022

শারমিন আক্তার সাথীর 'কিছু সাদা টিউলিপ'

 



ইয়ামিন আর প্রকৃতির ভালোবাসার গল্প ‘কিছু সাদা টিউলিপ’। দু’জন দুই পথের, দুই ধর্মের, দুই প্রকৃতির মানুষ – কিন্তু ভালোবাসার টানে মিলে যায় এক পথের মোহনায়; ভালোবাসার পথ। দোর্দন্ডপ্রতাপ ক্ষমতাসীন দুর্নীতিবাজ এমপি মজিবর শাহ – চোরাচালানসহ যাবতীয় দুষ্কর্ম করে থাকেন। এসব কাজে তার ভাগনে ইয়ামিন তার ডানহাত। ক্ষমতাশালী মামা থাকলে যা হয় – তা বুঝে নিতে আমাদের সমস্যা হয় না। এই ইয়ামিনের প্রেমে পড়ে যায় একটি বিউটি পার্লারের মালিক খ্রিস্টান তরুণী প্রকৃতি। শুরুতে এক তরফা। ইয়ামিন এসে প্রকৃতির বিউটি পার্লারে ভাঙচুর চালায়। পরে তার ক্ষতিপূরণ দেয়। এতেই হয়তো ইয়ামিনের একটা কোমল মনের পরিচয় পায় প্রকৃতি। তাতেই ভালো লাগা। কাহিনিতে এমপি সাহেবের জীবন আছে। এমপি সাহেব তার আপন শালীকে একা পেয়ে ধর্ষণ করে। সেই ঘটনা চাপা দিতে এমপির স্ত্রী তার বোনের সাথে স্বামীর বিয়ে পড়িয়ে দেয়। সে নিয়ে দুই বোনের টানাপোড়েন আছে। ওদিকে প্রকৃতির মা-বাবা, ভাই-বোনের কথা আছে। সব মিলিয়ে কাহিনি এগিয়ে চলে চূড়ান্ত পরিণতির দিকে। মিলনাত্মক পরিণতি আকাঙ্খিত থাকলেও শেষ পর্যন্ত বিরহে পরিণত হয়।

বইটি প্রকাশিত হয়েছে ২০২১ সালের বইমেলায়। অনেকে নতুন লেখক পুরনো লেখক এভাবে ভাগ করে ফেলেন। আমি মনে করি লেখকদের মধ্যে নতুন পুরনোতে ভাগ হয় না। যে কোনো লেখকই যখন নতুন কোন লেখা নিয়ে আসেন, তখন তো তিনি নতুনই। শারমিন আক্তার সাথীর আর কোনো লেখা আগে পড়িনি। 

শারমিন আক্তার সাথীর এই উপন্যাসের কাহিনি সোজাসাপ্টা। সংলাপগুলি মাঝে মাঝে অহেতুক দার্শনিকতায় আক্রান্ত হলেও খুব বেশি ঝামেলা করে না। কিছু কিছু দার্শনিক উক্তি বেশ জোরালো। যেমন, ‘পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় স্বার্থ হচ্ছে ভালোবাসা। আর আমরা আমাদের জীবনে বহু মানুষ, প্রাণী বা বস্তুকে ভালোবাসি, তারাও আমাদের ভালোবাসে। সে হিসেবে আমরা সবাই স্বার্থপর।‘

বইটি প্রকাশ করেছে তাম্রলিপি। কিন্তু বানান কেন নির্ভুল করা যাচ্ছে না, বুঝতে পারছি না। প্রুফ রিডার এবং সম্পাদকরা কেন এগুলি দেখেন না? একটা জায়গায় লেখক হয়তো পান্ডুলিপিতে নোট লিখে রেখেছিলেন, “এখানের একটা অংশ বাড়তি কাগজে লিখে দিলাম”। সেটাই ছাপানো হয়ে গেছে বইয়ের অংশ হিসেবে (পৃ ৭৫)!

প্রকৃতির স্বপ্ন ছিল নেদারল্যান্ডে গিয়ে সাদা টিউলিপের বাগান দেখে আসার। ইয়ামিন তার সেই স্বপ্নপূরণের স্বপ্ন দেখেছিল। স্বপ্ন পূরণ হয়নি বলেই এই কাহিনির সমাপ্তি যুক্তিযুক্ত মনে হয়েছে। 


Sunday, 31 July 2022

নোবেলজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী চন্দ্রশেখর

 



মহাবিশ্বের মহাজাগতিক কাজকর্ম পর্যবেক্ষণ করার জন্য অনেকগুলি শক্তিশালী টেলিস্কোপ মহাকাশে স্থাপন করা হয়েছে। কোটি আলোকবর্ষ দূর থেকে ছুটে আসা মহাজাগতিক তড়িৎচুম্বক তরঙ্গ শনাক্ত এবং বিশ্লেষণ করে মহাজাগতিক ঘটনার প্রমাণ সংগ্রহ করার জন্য মহাকাশেই স্থাপন করা হয়েছে ‘অবজারভেটরি’ বা মানমন্দির। এদের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী অবজারভেটরি যা পৃথিবীপৃষ্ঠ থেকে প্রায় এক লক্ষ চল্লিশ হাজার কিলোমিটার দূরে মহাকাশে ভেসে ভেসে মহাজাগতিক ঘটনাবলী পর্যবেক্ষণ করছে তার নাম ‘চন্দ্র এক্স-রে অবজারভেটরি’। যাঁর নাম অনুসারে এই অবজারভেটরির নাম রাখা হয়েছে তিনি আমাদের উপমহাদেশের সন্তান জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানী সুব্রাহ্মনিয়ান চন্দ্রশেখর - বিজ্ঞানী মহলে যিনি ‘চন্দ্র’ নামে পরিচিত। 

১৯৯৮ সালে নাসা তাদের নতুন এক্স-রে অবজারভেটরির জন্য নাম আহ্বান করে সারা পৃথিবীর বিজ্ঞানশিক্ষার্থী ও বিজ্ঞানীদের কাছ থেকে। প্রায় ছয় হাজার মানুষ চিঠি লিখে নাম পাঠান। এর মধ্যে বেশির ভাগই বিজ্ঞানী চন্দ্রশেখরের নাম প্রস্তাব করেন। ১৯৯৮ সালের ২১ ডিসেম্বর নাসার সংবাদ সম্মেলনে ঘোষণা করা হয় এক্স-রে অবজারভেটরির নাম রাখা হবে ‘চন্দ্র’। অবজারভেটরি সেন্টারের পরিচালক হার্ভি ট্যানানবাম বলেন, “বিশ্বব্রহ্মান্ডকে বোঝার জন্য সারাজীবন নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন চন্দ্রশেখর।“ ব্রিটিশ অ্যাস্ট্রোনোমার জেনারেল মার্টিন রিজের মতে - আইনস্টাইনের পর চন্দ্রই একমাত্র ব্যক্তি যিনি মহাবিশ্ব নিয়ে এত দীর্ঘসময় ধরে এবং এত গভীরভাবে ভেবেছেন। পদার্থবিজ্ঞানী ফ্রিম্যান ডাইসনের মতে চন্দ্রশেখর মহাবিশ্বকে বুঝেছিলেন আইনস্টাইনের চেয়েও সঠিকভাবে, কারণ আইনস্টাইন ব্ল্যাকহোলের অস্তিত্ব স্বীকার করেননি, আর চন্দ্রশেখর ব্ল্যাকহোলের অস্তিত্ব প্রমাণ করেছেন।  জ্যোতির্বিজ্ঞানের সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র সুব্রাহ্মনিয়ান চন্দ্রশেখর পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন ১৯৮৩ সালে। নক্ষত্রের ভরের সীমা সংক্রান্ত যে গবেষণার জন্য তিনি নোবেল পুরষ্কার পান সেই গবেষণার সূত্রপাত হয়েছিল এই উপমহাদেশে ১৯২৯ সালে - চন্দ্রশেখরের বয়স তখন মাত্র উনিশ বছর।

চন্দ্রশেখর নিজের জন্মতারিখ বলতেন ‘নাইন্টিন টেন নাইন্টিন টেন’ অর্থাৎ উনিশ দশ উনিশ শ’ দশ। ১৯১০ সালের ১৯ অক্টোবর ব্রিটিশ ভারতের লাহোরে (বর্তমানে পাকিস্তান) জন্ম চন্দ্রশেখরের। চন্দ্রশেখরের বাবা সুব্রাহ্মনিয়ান ছিলেন ব্রিটিশ সরকারের ফাইন্যান্সিয়াল সিভিল সার্ভিসের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। কাকা ভেঙ্কটরামনও (নোবেলজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী সি ভি রামন) কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেয়ার আগপর্যন্ত ফাইন্যান্সিয়াল সিভিল সার্ভিসে কাজ করতেন। ১৯১০ সালে চন্দ্রশেখরের জন্মের সময় সুব্রাহ্মনিয়ান নর্থ ওয়েস্টার্ন রেলওয়ের ডেপুটি অডিটর-জেনারেল হিসেবে লাহোরে কর্মরত ছিলেন। বদলির চাকরির কারণে কয়েক বছর পর পর তাঁদের বাসস্থান বদলে যেতো। ফলে চন্দ্রশেখরের প্রাথমিক পড়াশোনা শুরু হয় বাড়িতেই। এগারো বছর বয়স পর্যন্ত বাড়িতে বাবা ও প্রাইভেট টিউটরের কাছে পড়াশোনা করেছে চন্দ্রশেখর। ইচ্ছেমত গণিত ও ইংরেজির পাঠ নিয়েছে। চন্দ্রশেখরের ১২ বছর বয়সের সময় তাঁর বাবা মাদ্রাজে স্থায়ীভাবে বাস করতে শুরু করেন। চৌদ্দ বছরে স্কুল সার্টিফিকেট পাস করে চন্দ্রশেখর ভর্তি হলেন মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সি কলেজে। পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন ও গণিতে ডিস্টিংশানসহ উচ্চমাধ্যমিক পাস করলেন চন্দ্রশেখর। পদার্থবিজ্ঞানে অনার্স নিয়ে বিএসসিতে ভর্তি হলেন প্রেসিডেন্সি কলেজে।

১৯২৮ সালের অক্টোবর মাসে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটা সিরিজ বক্তৃতা দিয়ে মাদ্রাজের প্রেসিডেন্সি কলেজে বক্তৃতা দিতে এলেন আর্নল্ড সামারফেল্ড। এত বড় একজন পদার্থবিজ্ঞানীর লেকচার শুনতে পারবেন ভেবে চন্দ্রশেখর ভীষণ উত্তেজিত।  তিনি ইতোমধ্যেই পড়ে ফেলেছেন সামারফেল্ডের বিখ্যাত বই ‘অ্যা্টমিক স্ট্রাকচার অ্যা্ন্ড স্পেকট্রা লাইন্‌স।‘ শুধু পড়া নয় - বইতে বর্ণিত সমস্যাগুলোর সমাধানও করে ফেলেছেন নিজে নিজে। 

সামারফেল্ডের বক্তৃতার পরের দিন আত্মবিশ্বাসী তরুণ চন্দ্রশেখর হোটেলে গিয়ে দেখা করলেন সামারফেল্ডের সাথে। চন্দ্রশেখরের আগ্রহ আর এত কম বয়সেই পরমাণুর গঠন সম্পর্কিত জটিল ধারণাগুলো আয়ত্ব করে ফেলার ক্ষমতা দেখে মুগ্ধ হলেন সামারফেল্ড। কিন্তু তিনি যখন বললেন তাঁর ‘অ্যা্টমিক স্ট্রাকচার’ বইতে বর্ণিত কোয়ান্টাম মেকানিক্সের তত্ত্বগুলো ইতোমধ্যেই পুরনো হয়ে গেছে - স্তম্ভিত হয়ে গেলেন চন্দ্রশেখর। সামারফেল্ড অনেকক্ষণ ধরে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের সাম্প্রতিক আবিষ্কারের কথা বললেন চন্দ্রশেখরকে। বললেন শ্রোডিংগার, হাইজেনবার্গ, ডিরাক ও পাউলির নতুন কোয়ান্টাম তত্ত্বের কথা। চন্দ্রশেখর ম্যাক্সওয়েল-বোল্টজম্যান এর ক্লাসিক্যাল স্ট্যাটিস্টিক্‌স আত্মস্থ করেছেন ইতোমধ্যে। কিন্তু সামারফেল্ড জানালেন ম্যাক্সওয়েল-বোল্টজম্যান তত্ত্বেও পরিবর্তন আসছে। সামারফেল্ড কোয়ান্টাম মেকানিক্সের আলোকে ফার্মি-ডিরাক স্ট্যাটিস্টিক্‌স সম্পর্কিত তাঁর প্রকাশিতব্য একটা গবেষণাপত্রের প্রুফ পড়তে দিলেন চন্দ্রশেখরকে। কোয়ান্টাম তত্ত্বের আলোকে পদার্থের ইলেকট্রন তত্ত্বের ওপর প্রথম পেপারটি পড়ে ফেললেন চন্দ্রশেখর প্রকাশিত হবার আগেই। 

সামারফেল্ডের সাথে সাক্ষাতের পর পদার্থবিজ্ঞানের গবেষণায় মনপ্রাণ ঢেলে দিলেন চন্দ্রশেখর। কয়েক মাসের মধ্যেই ১৯২৮ সালে ইন্ডিয়ান জার্নাল অব ফিজিক্সে প্রকাশিত হলো চন্দ্রশেখরের প্রথম গবেষণাপত্র ‘থার্মোডায়নামিক্স অব দি কম্পটন ইফেক্ট উইথ রেফারেন্স টু দি স্টার্‌স।’

তারপর সামারফেল্ডের সাথে আলোচনা ও তাঁর ফার্মি-ডিরাক স্ট্যাটিস্টিক্‌স এর পেপারটির ওপর ভিত্তি করে দ্বিতীয় গবেষণাপত্রটি রচনা করেন চন্দ্রশেখর। ‘দি কম্পটন স্ক্যাটারিং অ্যা্ন্ড দি নিউ স্ট্যাটিস্টিক্‌স’ শিরোনামের পেপারটির বিষয়বস্তুর নতুনত্ব ও গুরুত্বের কথা চিন্তা করে চন্দ্রশেখর ভাবলেন পেপারটি রয়েল সোসাইটির প্রসিডিংস এ প্রকাশ করবেন। কিন্তু রয়েল সোসাইটির কোন ফেলোর সুপারিশ ছাড়া রয়েল সোসাইটিতে প্রকাশের জন্য কোন গবেষণাপত্র বিবেচিত হয় না। চন্দ্রশেখর চাইলেই তাঁর কাকা ভেঙ্কট রামনের মাধ্যমে পেপারটি রয়েল সোসাইটিতে পাঠাতে পারেন। কিন্তু তিনি চাননি ব্যক্তিগত পরিচিতি কাজে লাগাতে। মাদ্রাজ ইউনিভার্সিটির লাইব্রেরিতে গিয়ে নতুন আসা সায়েন্টিফিক জার্নাল খুঁজে দেখলেন রয়েল সোসাইটির ফেলো রাল্‌ফ ফাওলার ফার্মি-ডিরাক স্ট্যাটিস্টিক্‌স কাজে লাগিয়ে শ্বেত-বামনের তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করেছেন। চন্দ্রশেখর জার্নাল থেকে ঠিকানা নিয়ে রাল্‌ফ ফাওলারের কাছে তাঁর পেপারটি পাঠিয়ে দিলেন। ফাওলার এত উঁচুমানের পেপার পেয়ে খুশি হয়েই রয়েল সোসাইটিতে পাঠিয়ে দিলেন। ১৯২৯ সালে রয়েল সোসাইটির প্রসিডিংস এ প্রকাশিত হলো চন্দ্রশেখরের দ্বিতীয় গবেষণাপত্র।  ১৯৩০ সালে পদার্থবিজ্ঞানে অনার্স পাস করার আগেই চন্দ্রশেখরের আরো দুটো পেপার প্রকাশিত হয় ফিলোসফিক্যাল ম্যাগাজিনে। 

সেবছরই স্কলারশিপ নিয়ে ইংল্যান্ডে রওনা হলেন চন্দ্রশেখর কেমব্রিজে গিয়ে প্রফেসর রাল্‌ফ ফাওলারের তত্ত্বাবধানে পড়াশোনা করার জন্য। প্রফেসর ফাওলারের শ্বেতবামন তত্ত্ব সংক্রান্ত যত পেপার প্রকাশিত হয়েছে তার সবগুলোই গভীর মনযোগ দিয়ে পড়েছেন চন্দ্রশেখর কেমব্রিজে যাওয়ার আগেই। ফাওলারের তত্ত্ব সম্প্রসারণ করে নিজেই একটা পেপার লিখে সাথে নিয়েছিলেন জাহাজে ওঠার আগে। আর জাহাজে বসে হাত দিলেন নতুন আরেকটি পেপার লেখার কাজে। প্রফেসর রাল্‌ফ ফাওলার শ্বেত-বামন নক্ষত্রের ধর্মাবলী ব্যাখ্যা করেছেন ফার্মি-ডিরাক সংখ্যায়ন ব্যবহার করে। 

যে সব নক্ষত্র জ্বলতে জ্বলতে তাদের নিউক্লিয়ার শক্তি নিঃশেষ করে ফেলেছে - সাধারণত সেই সব নক্ষত্রদের হোয়াইট ডোয়ার্ফ বা শ্বেত-বামন বলা হয়। এই নক্ষত্রগুলির মাধ্যাকর্ষণ-বল এত বেড়ে যায় যে তাদের ঘনত্ব সাধারণ পদার্থের চেয়ে হাজার হাজার গুণ বেশি হয়ে পড়ে। ঘনত্ব বেড়ে গিয়ে আয়তনে ছোট হয়ে যাবার পর সেগুলি তাপ বিকিরণ করে আস্তে আস্তে ঠান্ডা হতে শুরু করে। ফাওলার শ্বেত-বামনের ভর ও ঘনত্বের মধ্যে গাণিতিক সম্পর্ক স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছেন যা সেই সময়ের পরীক্ষামূলক ফলাফলের সাথে মিলে যায়। 

জাহাজে বসে চন্দ্রশেখর নতুন করে ভাবতে শুরু করলেন শ্বেত-বামনের ঘনত্ব ও ভর নিয়ে। ফাওলার ইলেকট্রনকে নন-রিলেটিভিস্টিক বা অনাপেক্ষিক কণা হিসেবে ধরে নিয়ে হিসেবের মধ্যে নিউটনিয়ান মেকানিক্স প্রয়োগ করেছেন। কিন্তু শ্বেত-বামনের কেন্দ্রে ইলেকট্রনগুলো এত জোরে ছুটে বেড়াচ্ছে যে তারা কিছুতেই অনাপেক্ষিক থাকতে পারে না। আইনেস্টাইনের আপেক্ষিকতার তত্ত্ব এখানে প্রয়োগ করতেই হবে। নক্ষত্রগুলির একটি নির্দিষ্ট রাসায়নিক গঠন ধরে নিয়ে ফাওলার হিসেব করে দেখিয়েছেন শ্বেতবামনের ঘনত্ব হবে ভরের বর্গের সমানুপাতিক। একটু ভেবে দেখলেই এর সত্যতা বোঝা যায়। নক্ষত্রের ভর যত বেশি হবে মাধ্যাকর্ষণ বল তত বেশি হবে ফলে নক্ষত্রের ভেতরের পদার্থগুলি ঘন হয়ে নিজেদের মধ্যে গুটিয়ে যাবে - আর ঘনত্ব বেড়ে যাবে। ফলে নক্ষত্রের আয়তন খুব কমে যাবে। সেগুলি এত ছোট হয়ে যাবে যে তাদের আর দেখা যাবে না। সে কারণেই সূর্যের চেয়ে বেশি ভরের কোন শ্বেত-বামন নক্ষত্র দেখা যায় না। 

চন্দ্রশেখর আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার তত্ত্ব প্রয়োগ করে দেখলেন ভরের তুলনায় শ্বেত-বামনের ঘনত্ব ফাওলারের হিসেবের তুলনায় আরো অনেক বেড়ে যায়। ভর বৃদ্ধির সাথে ঘনত্বের দ্রুত বৃদ্ধিই শুধু হয় না, একটা নির্দিষ্ট ভরের বেশি হলে ঘনত্বের পরিমাণ হয়ে যায় অসীম। ভরের এই নির্দিষ্ট সীমা-ই পরে ‘চন্দ্রশেখর লিমিট’ হিসেবে গৃহীত হয়। ভরের এই সীমা নক্ষত্রের রাসায়নিক উপাদানের উপর নির্ভর করে।

চন্দ্রশেখর জাহাজে বসে ইংল্যান্ডে পৌঁছানোর আগেই লিখে শেষ করলেন তাঁর পেপার “দি ম্যাক্সিমাম মাস অব আইডিয়েল হোয়াইট ডোয়ার্ফ।“ তিনি হিসেব করে দেখিয়েছিলেন যে কোন শ্বেত-বামনের ভর সূর্যের ভরের শতকরা ৯০ ভাগের বেশি হলে তার ঘনত্ব অসীম হয়ে যাবে। পরে অবশ্য এই মান কিছুটা পরিবর্তিত হয়। বর্তমানে চন্দ্রশেখর লিমিট হলো সূর্যের ভরের ১.৪ গুণ। 

এর ৫৩ বছর পর ১৯৮৩ সালে চন্দ্রশেখর নোবেল পুরষ্কার পান এই কাজের জন্য যা তিনি করেছিলেন মাত্র ১৯ বছর বয়সে ভারত থেকে ইংল্যান্ড যাবার পথে জাহাজে বসে।

কেমব্রিজে গিয়ে প্রফেসর ফাওলারের সাথে দেখা করলেন চন্দ্রশেখর। ফাওলারের সাথে দেখা করেই তিনি নতুন লেখা পেপারদুটো দেখালেন। প্রথম পেপার যেটাতে ফাওলারের কাজকে বিস্তৃত করা হয়েছে তা খুশি মনে মেনে নিলেন ফাওলার এবং  রয়েল সোসাইটির প্রসিডিংস এ প্রকাশের জন্য পাঠিয়ে দিলেন। কিন্তু দ্বিতীয় পেপার যেটাতে চন্দ্রশেখর ভরের সীমা হিসেব করেছেন - সেটা নিয়ে ফাওলার দ্বিধান্বিত হয়ে পড়লেন। ফাওলার বললেন পেপারটা এডওয়ার্ড মিলনির কাছে পাঠিয়ে মতামত নিতে। কিন্তু কয়েক মাস পরেও ফাওলার বা মিলনির কাছ থেকে কোন সাড়া পাওয়া গেলো না পেপারটির ব্যাপারে। চন্দ্রশেখর বুঝতে পারলেন যে ফাওলার হয়তো চাচ্ছেন না যে পেপারটি এখন প্রকাশিত হোক। চন্দ্রশেখর আর অপেক্ষা করলেন না। পেপারটির ছোট একটা সংস্করণ (মাত্র দুই পৃষ্ঠা) পাঠিয়ে দিলেন আমেরিকার অ্যাস্ট্রোফিজিক্যাল জার্নালে। পরের বছর অ্যাস্ট্রোফিজিক্যাল জার্নালে প্রকাশিত হলো চন্দ্রশেখরের বিখ্যাত গবেষণাপত্র – দি ম্যাক্সিমাম মাস অব আইডিয়েল হোয়াইট ডোয়ার্ফ (অ্যাস্ট্রোফিজিক্যাল জার্নাল, (১৯৩১) সংখ্যা ৭৪, পৃ ৮১-৮২)। 

রিলেটিভিস্টিক আয়োনাইজেশান ও মহাকাশ নিয়ে গবেষণা করে ১৯৩৩ সালে পিএইচডি সম্পন্ন করলেন চন্দ্রশেখর। এরপর ট্রিনিটি কলেজের ফেলোশিপ পেলেন। রামানুজনের পরে চন্দ্রশেখরই হলেন দ্বিতীয় ভারতীয় যিনি এই ফেলোশিপ পেলেন।  ১৯৩৪ সালের মধ্যে রিলেটিভিস্টিক কোয়ান্টাম মেকানিক্সের আলোকে শ্বেত-বামনের ভর ও ঘনত্বের সীমা নিয়ে বিস্তারিত হিসেবসহ দুটো পেপার প্রকাশের জন্য রয়েল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটিতে জমা দিলেন। রয়েল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটির আমন্ত্রণে ১৯৩৫ সালের জানুয়ারি মাসে সোসাইটির মাসিক সভায় বক্তৃতা দেন চন্দ্রশেখর। সভায় উপস্থিত ছিলেন স্যার আর্থার এডিংটন। জ্যোতির্বিজ্ঞানে সেই সময় এডিংটনের কথাই শেষ কথা। এডিংটন চন্দ্রশেখরের গবেষণাকে স্বীকৃতিতো দিলেনই না, বরং অপমান করলেন। এডিংটনের মতে যে কোন তারাই শক্তিক্ষয়ের পর একসময় প্রাকৃতিক নিয়মেই মরে যাবে। সেখানে শ্বেতবামন বা ভরের সীমার কোন শর্ত থাকতে পারে না।

এর প্রায় দুই যুগ পর ‘চন্দ্রশেখর লিমিট’ নিজের যোগ্যতাতেই প্রতিষ্ঠিত হয় এবং বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে প্রয়োজনীয় আবিষ্কারগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হয়। চন্দ্রশেখরের সীমার চেয়ে বেশি ভরের তারাগুলোর ভবিষ্যত কী? এ প্রশ্নের উত্তর সেদিন পাওয়া না গেলেও আজ আমরা সবাই জানি যে এরা ‘নিউট্রন স্টার’ কিংবা  ‘ব্ল্যাক হোল’এ রূপান্তরিত হয়।

এডিংটনের কারণে ইংল্যান্ডের কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি পাবার সম্ভাবনা শূন্য হয়ে গিয়েছিল চন্দ্রশেখরের। ১৯৩৫ সালে তিনি পাড়ি দিলেন আমেরিকায়। চার মাস কাজ করলেন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে। এরপর যোগ দিলেন শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৪২ সালে অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর এবং ১৯৪৪ সালে ফুল প্রফেসর হন চন্দ্রশেখর। ১৯৫২ সালে ‘মরটন ডি হাল ডিস্টিংগুইস্‌ড সার্ভিস প্রফেসর’ হন। ১৯৮৫ সালে অবসর গ্রহণের পরেও এমেরিটাস প্রফেসর হিসেবে আমৃত্যু শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়েই ছিলেন চন্দ্রশেখর। ৪৮ বছরের শিক্ষকতা জীবনে একান্ন জন গবেষক পিএইচডি ডিগ্রি পান চন্দ্রশেখরের তত্ত্বাবধানে। ১৯৯৫ সালের ২১ শে আগস্ট চন্দ্রশেখর মারা যান।


তথ্যসূত্র

আর জে টেইলরের ‘সুব্রাহ্মনিয়ান চন্দ্রশেখর: বায়োগ্রাফিক্যাল মেমোরিজ অব ফেলোজ অব দি রয়েল সোসাইটি (১৯৯৬), কামেশ্বর সি ওয়ালির ‘চন্দ্র: এ বায়োগ্রাফিক্যাল পোট্রেট’ (২০১০), প্রদীপ দেবের ‘উপমহাদেশের এগারজন পদার্থবিজ্ঞানী (২০১৭)। 

______________
বিজ্ঞানচিন্তা মে ২০২২ সংখ্যায় প্রকাশিত








Friday, 22 July 2022

জোসেলিন বেল

 


১৯৬৭ সালে এই আইরিশ তরুণীর বয়স ছিল মাত্র চব্বিশ বছর। তরুণীর নাম জোসেলিন বেল। ইউনিভার্সিটি অব গ্লাসগো থেকে ফিজিক্সে বিএসসি পাস করে কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটিতে প্রফেসর অ্যান্টনি হিউইশের তত্ত্বাবধানে অ্যাস্ট্রোফিজিক্সে পিএইচডি গবেষণার মাঝামাঝি সময় তখন জোসেলিনের। ফিজিক্সের একটি আলাদা শাখা হিসেবে তখনো সেভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি অ্যাস্ট্রোফিজিক্স। রেডিও অ্যাস্ট্রোনমার অ্যান্টনি হিউইশ তখনো তেমন প্রভাবশালী কেউ নন।

 গবেষণার বেশিরভাগ কাজ একেবারে গোড়া থেকেই করতে হচ্ছিল জোসেলিনকে। অনেক খেটেখুটে একটি রেডিওটেলিস্কোপ বানিয়েছেন জোসেলিন। তার জন্য একশ মাইলের বেশি লম্বা তামার তার জুড়তে হয়েছে নিজের হাতে কেম্ব্রিজের কাছে মাঠের মধ্যে। সেই যন্ত্র দিনের পর দিন, রাতের পর রাত জেগে চালিয়েছেন। মহাকাশ থেকে ভেসে আসা ডাটা বিশ্লেষণ করেছেন হাতে আঁকা গ্রাফ পেপারের মধ্যে। যেগুলি একটির পর একটি জুড়লে কয়েক মাইল লম্বা হবে। লক্ষ লক্ষ ডাটা বিশ্লেষণ করে জোসেলিন দেখলেন মহাকাশের বিশেষ অঞ্চল থেকে একটি নির্দিষ্ট সময় পর পর অস্বাভাবিক সিগনাল পাওয়া যাচ্ছে। অনেক বিশ্লেষণ করে জোসেলিন নিশ্চিত হলেন যে এই সিগনাল আসছে আমাদের সৌরজগতের বাইরের মহাকাশ থেকে। আবিষ্কৃত হলো পালসার। 

পরপর চারটি পালসার আবিষ্কৃত হলো জোসেলিনের হাত দিয়ে। অ্যাস্ট্রোফিজিক্সের নতুন দিগন্ত খুলে গেল। তরুণী জোসেলিন এই আবিষ্কারের ফলাফল প্রকাশ করলেন, থিসিস লিখলেন, পিএইচডি ডিগ্রি পেলেন। কিন্তু ঠিক ওইটুকুই। এর সাত বছর পর ১৯৭৪ সালে যখন পালসার আবিষ্কারের জন্য পদার্থবিজ্ঞানের নোবেল পুরষ্কার দেয়া হলো, জোসেলিনের নামও উল্লেখ করা হলো না। পুরষ্কারটি দেয়া হলো জোসেলিনের থিসিস সুপারভাইজার অ্যান্টনি হিউইশকে। শুধুমাত্র কমবয়সী একটি মেয়ে বলেই কি আবিষ্কারের কৃতিত্ব থেকে বঞ্চিত করা হয়েছিল জোসেলিনকে? ঠিক তাই। 

জোসেলিন যদি সেখানেই থেমে যেতেন - তাহলে হয়তো তাঁর কথা কেউ মনেও রাখতো না আজ। জোসেলিন সেখানে থেমে থাকেননি। তিনি আরো অনেক বেশি পরিশ্রম করে অনবরত গবেষণার মাধ্যমে নিজেকে প্রমাণ করেছেন বার বার। নোবেল পুরষ্কার ছাড়া বিজ্ঞানের গবেষণার অন্য যেসব গুরুত্বপূর্ণ পুরষ্কার আছে তিনি তার সবগুলিই পেয়েছেন। পদার্থবিজ্ঞানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংগঠনগুলির ফেলো নির্বাচিত হয়েছেন। মেয়েদের বিজ্ঞান গবেষণায় উদ্বুদ্ধ করার কাজে তিনি এই ৮১ বছর বয়সেও তারুণ্যের শক্তিতে নিবেদিত। 

প্রফেসর জোসেলিন বেলকে কয়েকবার দেখার এবং তার সেমিনারে অংশ নেয়ার সুযোগ আমার হয়েছে। একটি মানুষের মধ্যে কী বিপুল পরিমাণ শক্তি থাকলে তিনি বলতে পারেন, "আমি নোবেল পুরষ্কার পাইনি তো কী হয়েছে, আমার আবিষ্কৃত পালসার তো পেয়েছে!" 

ফান্ডামেন্টাল ফিজিক্স ফাউন্ডেশান ২০১৮ সালে তাঁকে তিরিশ লক্ষ ডলার অর্থমূল্যের 'স্পেশাল ব্রেকথ্রু প্রাইজ' দিলে তিনি পুরো টাকাটাই দিয়ে দিয়েছেন মেয়েদেরকে গবেষণাবৃত্তি দেয়ার জন্য। 

১৯৪৩ সালের ১৫ জুলাই নর্থ আয়ারল্যান্ডের বেলফাস্টে জন্মেছিলেন জোসেলিন। জন্মদিনে সকল বিজ্ঞানপ্রেমীর পক্ষ থেকে তাঁকে জানাই শ্রদ্ধা। কামনা করছি তাঁর কর্মময় জীবন আরো দীর্ঘ হোক।

Thursday, 21 July 2022

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌনহয়রানি

 


সারা পৃথিবীতেই শিক্ষাঙ্গনকে শিক্ষার্থীদের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ অঙ্গন হিসেবে ধরে নেয়া হয়। সন্তান যেমন তার মায়ের বুকে নিরাপদে থাকে, তেমনি শিক্ষার্থীরাও তাদের ক্যাম্পাসে সবচেয়ে নিরাপদে থাকার কথা। যে শিক্ষায়তন থেকে আমরা শিক্ষা লাভ করি, সেই শিক্ষাঙ্গনকে আমরা সারাজীবন সম্মান করি আলমা ম্যাটার হিসেবে। আলমা ম্যাটার শব্দযুগলের আক্ষরিক অর্থ অনেকটা ধাত্রী মায়ের মতো – যে আমাদের আদরযত্নে লালনপালন করে, শিক্ষা দিয়ে, নিরাপত্তা দিয়ে কাজের জন্য উপযুক্ত করে তোলে। শিক্ষাঙ্গনের ভালোমন্দ সবকিছুই নির্ভর করে তার নীতিনির্ধারকদের উপর। বাংলাদেশের  বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিনির্ধারকরা ভীষণ ক্ষমতাবান। পৃথিবীর বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়গুলি থেকে সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়ে তাঁরা বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। উন্নত দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলি কীভাবে চলে তা তাঁদের না জানার কথা নয়। নীতিনির্ধারকদের সদিচ্ছা থাকলে শিক্ষাঙ্গনে যৌন হয়রানিসহ যেকোনো ধরনের অন্যায়ের প্রতিরোধ শুধু নয়, নির্মূল করাও যে অসম্ভব নয়, তা সবাই জানে। কিন্তু বড়কর্তারা লোভের বশে, আর ছোটকর্তারা বড় হতে পারবে না এই ভয়ের বশে সবসময়ই একটা নতজানু নীতি বজায় রেখেছে। পৃথিবীর সব বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসেই – যেখানে কোন অন্যায় ঘটনা প্রায় হয় না বললেও চলে – সেখানকার ক্যাম্পাসেরও বিভিন্ন জায়গায় জরুরি ফোনবুথ থাকে। একটা বোতাম টিপলেই  নিরাপত্তা রক্ষীদের কাছে ফোন চলে যায়। নিরাপত্তা রক্ষীরা সেখানে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে বেতন নেয়ার কথা চিন্তাও করতে পারে না। কোন ঘটনা ঘটলে, বা ঘটার উপক্রম ঘটলেও – তা ধামাচাপা না দিয়ে সেই ঘটনার পুঙ্খানুপুংখ তদন্ত করা হয়, এবং সেরকম ঘটনা যেন আর কখনো না ঘটে তার ব্যবস্থা করা হয়।

আমার প্রিয় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের সাথে একই রকমের একাধিক ঘটনা ঘটেছে। গত পঞ্চাশ বছরে অনেকবার ঘটেছে। অথচ ক্যাম্পাস ছাত্রীদের জন্য নিরাপদ করার কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। প্রতিটি ঘটনার পর শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামলে যেকোনোভাবে – শক্তি দিয়ে কিংবা মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে আন্দোলন থামানো হয়েছে, কিন্তু প্রতিকারের ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। কষ্ট লাগে – যখন দেখি যারা এক সময় শিক্ষার্থী হিসেবে এই একই অন্যায়ের প্রতিকার চেয়ে আন্দোলন করেছিলেন, তাঁরা এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের হর্তাকর্তা হবার পর হাত গুটিয়ে বসে আছেন আরো উপরে উঠার সিঁড়ির দিকে তাকিয়ে।

রাতারাতি হঠাৎ সবকিছু ঠিকঠাক হয়ে যাবে এটা আশা করার কোন উপায় নেই। ক্যাম্পাসে ঢুকে যারা শিক্ষার্থীদের সম্ভ্রম নষ্ট করার চেষ্টা করতে পারে, তাদের মতো নষ্ট মানুষ কীসের ক্ষমতার জোরে বুক ফুলিয়ে ক্যাম্পাসে ঘোরে তা সবাই জানে। নষ্টরা যে পার্টির ছায়াতেই থাকুক, তাদের নষ্ট বলে পরিত্যাগ করার সৎ সাহস বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিনির্ধারকদের কেন থাকবে না?

আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুজ শিক্ষার্থীরা অন্যায়ের প্রতিবাদ করছে দেখে ভালো লাগছে। আশা করি একদিন তারা যখন নীতিনির্ধারক হবে, তাদের এই প্রতিবাদী মনোভাব অটুট থাকবে।
*প্রতিবাদের ছবিটি নিয়েছি তন্ময় শাওনের ওয়াল থেকে।

Tuesday, 19 July 2022

একজন হুমায়ূন আহমেদ

 



মুনীর চৌধুরী সে কোন যুগে বলে গিয়েছিলেন – মানুষ মরে গেলে পচে যায়, বেঁচে থাকলে বদলায়।  দশ বছর হয়ে গেলো হুমায়ূন আহমেদ মারা গেছেন। এই দশ বছর ধরে আমরা যাঁরা বেঁচে আছি, প্রত্যেকেই বদলে গেছি কোনো না কোনোভাবে। উগ্র সাম্প্রদায়িকতার কাছে, নির্লজ্জ দুর্নীতিবাজদের কাছে নতজানু হতে হতে আমরা ভূমির সাথে মিশে গিয়েছি। আমাদের মধ্যে অনেকেই শারীরিকভাবে বেঁচে থাকলেও মানসিকভাবে মরে পচে গেছি। কিন্তু মৃত্যুর দশ বছর পরেও হুমায়ূন আহমেদ এখনো সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। মানুষ আর লেখকের মধ্যে পার্থক্য এখানেই। লেখকরা মরেন না। আসলে লেখকের মূল পরিচয় তো তাঁর লেখায়, লেখাগুলি বেঁচে থাকে। লেখার সাথে লেখকও।

বিজ্ঞানে কিছুটা সাহিত্য থাকতেও পারে, কিন্তু সাহিত্য বিজ্ঞান নয় কিছুতেই। সাহিত্য পুরোপুরি সৃষ্টিশীল কাজ। সেখানে পুনরাবৃত্তির খুব একটা কদর নেই। আর সাহিত্যের বিচারের ব্যাপারটা মোটেও বস্তুনিষ্ঠ নয়। বিজ্ঞানে যেটা ভুল – সেটা সবার কাছেই ভুল। কিন্তু সাহিত্যে ভুল বলে কিছু নেই। ভালোমন্দ লাগার ব্যাপারটাও পাঠকের নিজস্ব ব্যাপার। সাহিত্যের যে বই একেবারে অ্যাকাদেমি পুরষ্কার পেয়ে আকাশে উঠে গেছে, সেই বইও অনেক পাঠকের কাছে তীব্র বিবমিষাময় মনে হতে পারে। অনেক পাঠকের যে বই ভালো লাগে, সেই বই পাঠকপ্রিয় হয়, সেই লেখক প্রিয় লেখক হয়ে উঠেন। সেখানে যখন দেখা যায় একজন লেখক, আরেকজন লেখককে বলছেন – খারাপ লেখক – প্রশ্ন জাগে – ভালো-খারাপ মাপার মাপকাঠিটি কী ভাই? হুমায়ূন আজাদ হুমায়ূন আহমেদকে “অপন্যাসিক” বলতেন। ব্যক্তিগত মতামতের ভিত্তিতে তা তিনি বলতেই পারেন। তার অর্থ এই নয় যে হুমায়ূন আজাদ হুমায়ূন আহমেদের চেয়ে ভালো লেখক। কার কোন্‌ লেখককে ভালো লাগবে তার তো কোন নিয়ম নেই। ভালো লাগার স্বাধীনতা সবার আছে। যে লেখা পড়ে আনন্দ পাওয়া যায় – সেই লেখা যদি মানুষ পড়ে – লেখককে যদি মাথায় তুলে রাখতে চায়, তাহলে দোষের কী আছে? হুমায়ূন আহমেদকে বাংলাদেশের বেশিরভাগ পাঠক মাথায় তুলে রেখেছেন। মৃত্যুর দশ বছর পরেও তাঁর অবস্থান সেখানেই।

তাঁর প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস নন্দিত নরক প্রকাশিত হয়েছিল ডক্টর আহমদ শরীফের লেখা ভূমিকাসহ। সেই ১৯৭২ সালে আর কোন উপন্যাসে এরকম অন্য বিখ্যাত মানুষের ভূমিকা প্রকাশিত হয়েছিল আমার জানা নেই। ডক্টর আহমদ শরীফ সেই ভূমিকায় লিখেছিলেন, “মাসিক মুখপত্রের প্রথম বর্ষের তৃতীয় সংখ্যায় গল্পের নাম ‘নন্দিত নরকে’ দেখেই আকৃষ্ট হয়েছিলাম। কেননা ঐ নামের মধ্যেই যেন একটি নতুন জীবনদৃষ্টি, একটি অভিনব রুচি, চেতনার একটি নতুন আকাশ উঁকি দিচ্ছিল। লেখক তো বটেই, তাঁর নামটিও ছিল আমার সম্পূর্ণ অপরিচিত। তবু পড়তে শুরু করলাম ঐ নামের মোহেই। পড়ে আমি অভিভূত হলাম। গল্পে সবিস্ময়ে প্রত্যক্ষ করেছি একজন সূক্ষ্মদর্শী শিল্পীর, একজন কুশলী স্রষ্টার পাকা হাত। বাঙলা সাহিত্যক্ষেত্রে এক সুনিপুণ শিল্পীর, এক দক্ষ রূপকারের, এক প্রজ্ঞাবান দ্রষ্টার জন্মলগ্ন যে অনুভব করলাম।“ বাংলা সাহিত্যে যে বিপুল সম্ভাবনা নিয়ে শুরু করেছিলেন শিল্পী হুমায়ূন আহমেদ, পরবর্তী চল্লিশ বছর ধরে তিনি বাংলাদেশের গল্প-উপন্যাস-নাটকে ফসলের বান বইয়ে দিয়েছিলেন।

নন্দিত নরকে পড়ে সাহিত্যিক আবুল ফজল লিখেছিলেন, “লেখকের যেন কোন বক্তব্য নেই, কোন দৃষ্টিকোণ নেই, আশ্চর্য এক নির্লিপ্তির সাথে তুমি তোমার গল্প বলে গেছ। গল্প বলা তো নয়, এ যেন ছবি আঁকা। যাতে একটি রেখাও অযথা টানা হয়নি। আমাকে সবচে বিস্মিত করেছে তোমার পরিমিতিবোধ আর সংযম। এত অল্প বয়সে রচনায় এমন সংযম খুব কম দেখা যায়। তোমার লেখনী জয়যুক্ত হোক।“ হুমায়ূন আহমেদের লেখনী যেভাবে জয়যুক্ত হয়েছে, বাংলাদেশের সাহিত্যে অন্য কোন লেখকের ক্ষেত্রে ততটা ঘটেনি।

হুমায়ূন আহমেদ এর লেখার সমালোচনা করতে গিয়ে প্রায়ই দেখা যায় – ব্যক্তি হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়। ব্যক্তি হুমায়ূন আহমেদের জীবনযাপন, বিশ্বাস, প্রেম-ভালোবাসা-বিবাহ এসব নিয়ে কথা বলা যাবে না তা নয়। অবশ্যই যাবে। জনপ্রিয় মানুষের ব্যক্তিগত জীবন ব্যক্তিগত গন্ডির বাইরে চলে আসবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তার ভিত্তিতে তাঁর লেখার বিচার করা অবিচারেরই নামান্তর। আর একজন লেখকের সব লেখাই সবার ভালো লাগবে – সেটা আশা করাও কোন কাজের কথা নয়।

নন্দিত নরকে শেষ হয়েছে এভাবে - “ভোর হয়ে আসছে। দেখলাম চাঁদ ডুবে গেছে। বিস্তীর্ণ মাঠের উপরে চাদরের মতো পড়ে থাকা ম্লান জ্যোৎস্নাটা আর নেই।“ ওখান থেকেই শুরু হয়ে গিয়েছিল হুমায়ূন আহমেদের সাহিত্যের ভুবন।


Sunday, 10 July 2022

বিশ্ববীণা বাজে যেথায় - ৫

 


স্কুলের বাংলা দ্বিতীয় পত্রে আমাদের কত রকমের ভাব যে সম্প্রসারণ করতে হতো মনে আছে তোমার? কঠিন জমাট ভাবকে টেনে টেনে লম্বা করার নামই ছিল ভাবসম্প্রসারণ। টান দিলেই রাবার সম্প্রসারিত হয়, তাপ দিলে বস্তু। কিন্তু ভাব সম্প্রসারিত হয় কীভাবে? ওটা নিয়ে অনেক তর্ক করতাম আমরা এক সময়। তুমি বলতে মনের ভাব সম্প্রসারণের জন্য দরকার মনের টান। কিন্তু সে যে ভাবের চেয়েও কঠিন। তাই কার ভাব কে সম্প্রসারণ করে! আমার হরলাল রায়ের বাংলা ব্যাকরণ ও রচনা বই ছিল। সেখান থেকেই হুবহু খেয়ে নিয়ে পরীক্ষার খাতায় উগরে দিয়ে আসতাম। মনে আছে, সেই যে – ‘তরুলতা সহজেই তরুলতা, পশুপক্ষী সহজেই পশুপক্ষী, কিন্তু মানুষ প্রাণপণ চেষ্টায় তবে মানুষ’? এই জটিল কথাগুলি কে লিখেছিলেন সেই সময় সেই প্রশ্ন মনেও আসেনি। চেনা জায়গা, চেনা মানুষ আর এতগুলি বছর ফেলে আসার পর এতদিনে রবীন্দ্র রচনাবলিতে পেলাম এই কথাগুলি।

কিন্তু পড়তে পড়তে মনে হলো – এই যে রবীন্দ্রনাথ বলে দিলেন তরুলতা সহজেই তরুলতা, পশুপক্ষী সহজেই পশুপক্ষী – আসলেই কি তাই? এদেশে তরুলতা ও পশুপক্ষীর যত্নআত্তির জন্য কত মানুষ, কত প্রতিষ্ঠান কাজ করছে, কত হাজার হাজার ডলার খরচ হচ্ছে! এদেশে নাকি পশুপাখিদের জন্যও মনের ডাক্তার আছে, বিনোদনের ব্যবস্থা আছে। কুকুর হাঁটানোর চাকরি করতে গিয়ে যে কুকুরের তাড়া খেয়ে পালিয়ে এসেছিলাম সেই ঘটনা তো তোমাকে বলেছি।

একইভাবে মাথার ভেতর আরেকটা প্রশ্ন ঘুরছে – একটি বিশ্ববিদ্যালয় কীভাবে বিশ্ব-বিদ্যালয় হয়ে ওঠে? ইউনিভার্সের সাথে মিল রেখেই কি ইউনিভার্সিটি নামটি এসেছে? জ্ঞানচর্চার মহাবিশ্ব – বিশ্ববিদ্যালয়! সেই কখন কোন্‌ যুগে ল্যাটিন শব্দ ইউনিভার্সিটাস থেকে ইউনিভার্সিটি কথাটার বিবর্তন ঘটেছে। সাড়ে চারশ কোটি বছরের মধ্যবয়স্ক এই পৃথিবীর জ্ঞান-বিজ্ঞান-প্রযুক্তির যত আবিষ্কার-উন্নতি-উদ্ভাবন ঘটেছে তার প্রায় সবকিছুই ঘটেছে পৃথিবীর বিভিন্ন ইউনিভার্সিটিতে। নতুন চিন্তার উন্মেষ ঘটানোই তো বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ। সহজ কথায় বলাই যায় – মনের যে কোনো ভাবনাচিন্তার উন্মেষ এবং সম্প্রসারণ করা বিশ্ববিদ্যালয়েরই কাজ। এখানে এই কাজটি দিনরাত হচ্ছে দেখে কেমন যেন একটা কষ্ট হচ্ছে। সাত বছর যে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছি – সেখানে দেখেছি সময়ের কী অপচয়, মেধার কী অপচয়। অবশ্য এখানে না এলে ভাবতাম ওটাই বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক অবস্থা। জানতেই পারতাম না যে মেধা, মনন ও জীবনীশক্তির কী সাংঘাতিক অপচয় হয়ে চলেছে সেখানে।

কিছু জায়গা নিয়ে অনেকগুলি বিল্ডিং প্রতিষ্ঠা করে দিলেই তো একটা প্রতিষ্ঠান হয়ে যায় না। সেখানে যারা কাজ করেন, তাদের কাজের মাধ্যমেই তা প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠে। ১৮৫৫ সালের ১৩ এপ্রিল মেলবোর্ন ইউনিভার্সিটির আনুষ্ঠানিক ক্লাস শুরু হয়েছিল। সেদিন শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল মাত্র ষোল জন। তাদের মধ্যে মাত্র চারজন শিক্ষার্থী যথাসময়ে ডিগ্রি সম্পন্ন করেছিল। সেখান থেকে শুরু হয়ে এক শ বছরের মধ্যেই বিশ্বসেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের মানে পৌঁছে যেতে পেরেছে একটা বিশ্ববিদ্যালয় কিসের শক্তিতে – যে শক্তি আমাদের নেই? আশ্চর্যের ব্যাপার হলো ১৮৫৫ থেকে ১৯৩৪ পর্যন্ত দীর্ঘ আশি বছরে যে দশ জন শিক্ষাবিদ মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলরের দায়িত্ব পালন করেছেন – তাঁদের কেউই কোন বেতন নেননি। আশি বছর ধরে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলরের পদ ছিল অবৈতনিক। এসব পড়ি আর অবাক হই।

মাত্র দু’মাস হলো মেলবোর্ন ইউনিভার্সিটির ছাত্র হয়েছি। এই দুই মাসে আমি যতগুলি সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, পাবলিক লেকচার অ্যাটেন্ড করার সুযোগ পেয়েছি আগে সাত বছরেও পাইনি। তাও শুধুমাত্র ফিজিক্স ডিপার্টমেন্টে। ইউনিভার্সিটির প্রত্যেকটা ডিপার্টমেন্টেই হাজার রকমের জ্ঞানযজ্ঞ চলছে সারাবছর। ছাত্র-অছাত্র সবার জন্যই তা উন্মুক্ত। যে কেউ যে কোনো সেমিনারে ঢুকে বসে যেতে পারে। জুলাই মাসের প্রত্যেক শুক্রবার সন্ধ্যেবেলা ফিজিক্স ডিপার্টমেন্টের জুলাই লেকচার সিরিজ চলে। ডিপার্টমেন্টের প্রফেসররা পদার্থবিজ্ঞানের সাম্প্রতিক আবিষ্কারগুলি সেখানে এমনভাবে আলোচনা করেন যেন সবাই বুঝতে পারে। এই শীতের মধ্যেও কানায় কানায় ভর্তি হয়ে যায় বিরাট লেকচার থিয়েটার। আগস্টের প্রতি বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় চলেছে ফিজিক্স জিমনিশিয়াম। জিমনিশিয়াম শুনে আমি প্রথমে ভেবেছিলাম ব্যায়াম করাবে। পরে দেখলাম মগজের ব্যায়াম। সেখানে স্কুলের শিক্ষার্থীদের জন্য পদার্থবিজ্ঞানের লেকচার দিচ্ছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিখ্যাত প্রফেসররা। স্কুলের শিক্ষার্থীদের জন্য হলেও তাদের অভিভাবকরাও আসেন তাদের সাথে লেকচার শুনতে। আমি এই সুযোগও ছাড়িনি। প্রফেসররা কী চমৎকার করে যে ব্যাখ্যা করেন বিষয়গুলি। পদার্থবিজ্ঞানের ভেতরের এই যে মজা – তা আমরা কেন পাইনি? আমাদের স্যার-ম্যাডামরা কেন ক্লাসে এসেই শুধু সমীকরণের পর সমীকরণ লিখতে থাকেন? পদার্থবিজ্ঞান মানে কি শুধুই সমীকরণ?  

সেদিন সন্ধ্যায় গিয়েছিলাম আর্কিটেকচার বিল্ডিং-এ পাবলিক লেকচার শুনতে। সন্ধ্যাবেলার পাবলিক লেকচারগুলি সবার জন্য উন্মুক্ত। এখানে জ্ঞানভিত্তিক বক্তৃতা শোনার জন্য কী ভীড় যে হয় তা নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাসই করতাম না। আর্কিটেকচার বিল্ডিং-এর নিচের তলায় অনেকটা ভূগর্ভস্থ লেকচার থিয়েটার – প্রিন্স ফিলিপ থিয়েটার। প্রায় বারো শ সিটের থিয়েটার হল – কানায় কানায় ভরে গিয়েছিল মহাবিশ্বের আকার-আকৃতি সম্পর্কে জানতে। গণিতের প্রফেসর ওয়াল্টার নিউম্যান এই পাবলিক লেকচার দিলেন ‘What Shape is the Universe?’ প্রসঙ্গে। ১৯০০ সালে গণিতবিদ ডেভিড হিলবার্ট কিছু গাণিতিক সমস্যার তালিকা প্রকাশ করেছিলেন – যেগুলি পুরো বিংশ শতাব্দীজুড়ে আলোচিত হয়েছে। সেখান থেকে একটা প্রশ্ন উঠে আসে – তা হলো গাণিতিকভাবে মহাবিশ্বের আকার এবং আকৃতি মাপা কীভাবে সম্ভব? এখানে নাম্বার থিওরি কীভাবে কাজ করে? খুবই খট্মটে গাণিতিক বিষয়। অথচ পুরো ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করলেন কোন ধরনের জটিল গাণিতিক সমীকরণ ছাড়াই। চকচকে টাকের মধ্যবয়স্ক প্রফেসর নিউম্যানের বাচনভঙ্গি খুবই সুন্দর। তবে অঙ্গভঙ্গি খুবই বিচিত্র। কথা বলার সময় তিনি এক পা সামনে আসেন, আবার এক পা পেছনে সরে যান। দেড়ঘন্টা ধরে তিনি অবিরাম কথা বলার সাথে সাথে এই পদসঞ্চালনও করেছেন বিরামহীন। তবে আমি ছাড়া সম্ভবত আর কেউ এই ব্যাপারটা খেয়ালও করেনি। এখানে কীভাবে হাত-পা নাড়ালো তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো কী বলা হলো।

এখানে রিসার্চ ডিগ্রিতে ভর্তি হতে পারলে কোন বাধ্যতামূলক কোর্সওয়ার্ক থাকে না। আমারও নেই। তবে প্রফেসর লেস অ্যালেনের স্ক্যাটারিং থিওরির কোর্সটা করছি – যদি কিছু বুঝতে পারি এই আশায়। খুব একটা সুবিধা সেখানে করতে পারছি না। কোয়ান্টাম মেকানিক্সের গাণিতিক ভিত্তি সেভাবে গড়ে ওঠেনি আমার। সেখানে ফাঁকির যে ফাঁকফোকরগুলি মুখস্থ করে ঢেকে দিয়েছিলাম, সেগুলি এখন বিরাট বিরাট গর্ত হয়ে আমাকে গিলতে আসছে। এর মধ্যে প্রফেসর দশটা প্রোবলেমের একটা সেট দিয়েছেন সমাধান করার জন্য। এক সপ্তাহ সময়। আমার জন্য বাধ্যতামূলক নয়, তবে ক্লাসের অন্যরা কোর্সওয়ার্কের স্টুডেন্ট – তাদের জন্য বাধ্যতামূলক। এই অ্যাসাইনমেন্টের নম্বর যোগ হবে তাদের ফাইনাল পরীক্ষার নম্বরের সাথে। দু’সপ্তাহ পরে ফাইনাল পরীক্ষা।

অনেকক্ষণ ধরে বোঝার চেষ্টা করার পর মনে হলো স্ক্যাটারিং থিওরির প্রোবলেমগুলির সমাধান করা আমার সাধ্যের বাইরে। মন বললো – যেহেতু বাধ্যতামূলক নয়, সেহেতু অ্যাসাইনমেন্ট জমা না দিলেই হলো। কিন্তু কোথায় যেন একটু আত্মসম্মানেও লাগছে। প্রফেসর অ্যালেন নিশ্চয় কেন্‌কে বলবেন। চেষ্টা করে দেখা যাক একবার। ফিজিক্স রিসার্চ লাইব্রেরির কয়েকটা শেল্‌ফভর্তি কোয়ান্টাম মেকানিক্সের বই। এগুলি ঘাঁটতে থাকলে কোথাও না কোথাও কোনো না কোনো সমাধানের পথ বের হয়ে আসবে।

আজ সন্ধ্যাবেলা কার্ড পাঞ্চ করে লাইব্রেরিতে ঢুকেছিলাম। ভেবেছিলাম আমি ছাড়া আর কেউ থাকবে না সেখানে – যত বই আছে সব ঘেঁটে ফেলবো আজ। কিন্তু ঢুকে দেখি র‍্যাচেলসহ ক্লাসের আরো পাঁচজন ছেলে-মেয়ে সাইলেন্ট স্টাডিরুমের ফ্লোরের কার্পেটে বইয়ের স্তূপ বানিয়ে তার চারপাশে বসে শলাপরামর্শ করছে। ভাবলাম চুপি চুপি বের হয়ে আসবো। কিন্তু তারা আমাকে দেখে ফেললো। আমাকেও যোগ দিতে হলো অ্যাসাইনমেন্টের শলাপরামর্শে। এটা গ্রুপ অ্যাসাইনমেন্ট নয়, অথচ সবাই একসাথে আলোচনা করছে কীভাবে সমস্যার সমাধান করা যায়। ব্যাপারটা খুব ভালো লাগলো আমার। বিজ্ঞান একক সাধনার ব্যাপার নয়। যে ব্যাপারটা আমার সবচেয়ে ভালো লাগলো সেটা হচ্ছে এদের সাবলীলতা। তাদের প্রতি আমার কিছুটা সংকোচ থাকলেও আমার প্রতি তাদের কোন সংকোচ নেই। আমার গায়ের বর্ণ কিংবা ভুল উচ্চারণ কিছুতেই যেন তাদের কিছু যায় আসে না। এই ব্যাপারটা তারা কোথায় শিখলো? তাদের প্রত্যেকেরই বয়স আমার চেয়ে কমপক্ষে আট-নয় বছর কম। অথচ কত বেশি উদার তারা এই বয়সেই।

পরবর্তী এক সপ্তাহের মধ্যে অ্যাসাইনমেন্ট লিখে জমা দিলাম। ভুল-শুদ্ধ যাই হোক, কাজের কাজ এটুকু হয়েছে যে অনেকগুলি বইপত্র সিরিয়াসলি ঘাঁটা হয়েছে।

সোমবার সকালে যে কান্ডটি ঘটেছে তার জন্য আমি তৈরি ছিলাম না। ডেস্কে বসে কী করবো ভেবে ওঠার আগেই প্রফেসর লেস অ্যালেন রুমে ঢুকলেন। তাঁর হাতে আমার অ্যাসাইনমেন্ট। শুক্রবার বিকেলে জমা দিয়েছি, এর মধ্যেই তিনি দেখে ফেলেছেন? ছুটির দিনেও কি ছুটি কাটান না এঁরা?

“প্রাডিব, আই অ্যাম নট শিওর অ্যাবাউট সামথিং হিয়ার। ক্যান ইউ সি ইট?”

আমি ভুল করেছি, তিনি সেটা কেটে দেবেন – সেটাই তো নিয়ম। তিনি তা না করে আমার সাথে আলোচনা করতে এসেছেন আমি কেন এবং কীভাবে লিখেছি যা লিখেছি। কোয়ান্টাম মেকানিক্সের অনিশ্চয়তার তত্ত্ব এই ক্ষেত্রেও যে প্রযোজ্য হবে তা ভাবিনি। অনেকক্ষণ ধরে তিনি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে ব্যাখ্যা করলেন আমি যা লিখেছি তা কোথায় শুদ্ধ, কোথায় কম-শুদ্ধ। তিনি ভুল হয়েছে বললেন না একবারও। বললেন – লেস কারেক্ট। এরকম ব্যাপার যে ফিজিক্সে থাকতে পারে তাও জানতাম না। আরো আশ্চর্যের ব্যাপার হলো – যে সমস্যাগুলি তিনি সমাধান করতে দিয়েছেন তার সবগুলিই গবেষণার নতুন সমস্যা – যাদের সুনির্দিষ্ট কোন উত্তর এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ভুল করার পরেও কোন ধরনের লজ্জার অনুভূতি হলো না এই প্রথম। দেশে ভাইভাতে একটা প্রশ্নের উত্তর তাৎক্ষণিকভাবে দিতে না পারলে স্যাররা যেভাবে ধমক দিয়ে লজ্জা দিয়ে বুঝিয়ে দিতেন যে আমরা পদার্থবিজ্ঞান পড়ার উপযুক্ত নই – এখানে সেরকম কোন ব্যাপারই নেই।

প্রফেসর লেস অ্যালেন রুম থেকে বের হবার সময় বলে গেলেন দু’সপ্তাহ পরে পরীক্ষা, এবং পরীক্ষা হবে ওপেন বুক।


বিশ্ববীণা বাজে যেথায় - ৪

 



আলীবাবা ও চল্লিশ চোরের কাহিনি নিশ্চয়ই মনে আছে তোমার। চোরদের গুপ্ত গুহায় ঢুকে ধনরত্ন হীরা-জহরতের পাহাড় দেখে আলীবাবার ভাই কাসেমের যে অবস্থা হয়েছিল, এখানে লাইব্রেরিগুলির বইয়ের সমুদ্রে ঢুকে আমার সেই অবস্থা হচ্ছে বলা যায়। রবীন্দ্রনাথ লাইব্রেরি প্রবন্ধে যা যা বলেছেন মনে হচ্ছে এতদিনে তা উপলব্ধি করতে পারছি - “লাইব্রেরির মধ্যে আমরা সহস্র পথের চৌমাথার উপরে দাঁড়াইয়া আছি। কোনো পথ অনন্ত সমুদ্রে গিয়াছে, কোনো পথ অনন্ত শিখরে উঠিয়াছে, কোনো পথ মানবহৃদয়ের অতলস্পর্শে নামিয়াছে। যে যে-দিকে ধাবমান হও, কোথাও বাধা পাইবে না।“

গত কয়েক সপ্তাহ ধরে আমি বাধাহীনভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছি একটার পর একটা লাইব্রেরিতে। বিষয়ভিত্তিক গবেষণায় ‘পথ হারাবো বলেই আমি পথে নেমেছি’ বলার সুযোগ নেই। সেখানে স্বেচ্ছাচারিতার সুযোগ আছে, কিন্তু নিলেই বিপদ। লাইব্রেরির সহস্র পথের চৌমাথায় দাঁড়িয়ে পথ চিনতে ভুল করলে অহেতুক সময় নষ্ট হবে। এসব জানা থাকা সত্ত্বেও আমি মুক্তপাঠের আনন্দে মেতে উঠেছি, যে আনন্দ পুরোপুরি পাবার জন্য কিছুটা লক্ষ্যবিহীন স্বেচ্ছাচারীও হতে হয়। এক্ষেত্রে এখন আমি পুরোপুরি স্বেচ্ছাচারী হয়ে উঠেছি। লাইব্রেরি থেকে এক সাথে ষাটটা বই ধার করে বাসায় নিয়ে যাওয়া যাবে জেনে পুস্তকনির্বাচনে প্রয়োজনের চেয়েও ভালো লাগাকে প্রশ্রয় দিতে শুরু করেছি। ভ্রমণ, মনস্তত্ত্ব, সমাজবিজ্ঞান, ইতিহাস এসবের সাথে নিউক্লিয়ার ফিজিক্সের দূরতম সম্পর্কও নেই, কিন্তু আমি হাত ভর্তি করে ফেলেছি এ ধরনের বইতে। ব্যাইলিউ লাইব্রেরির উপরের তলার একদিক থেকে শুরু করে মাঝামাঝি পর্যন্ত আসতেই হাত ভর্তি হয়ে গেছে। সামনে আরো শত শত তাকে সারি সারি বই চোখ পাকিয়ে তাকিয়ে আছে।

এই ক্যাম্পাসে অনেকগুলি লাইব্রেরি। প্রত্যেকটি ডিপার্টমেন্টেই আছে বিষয়ভিত্তিক রিসার্চ লাইব্রেরি। ফিজিক্স বিল্ডিং-এর ছয় তলায় আমাদের ফ্লোরেই ফিজিক্স রিসার্চ লাইব্রেরি। ওখানে ফিজিক্সের দরকারি সব জার্নালের সবগুলি সংখ্যা পাওয়া যায়। আমার অন্য কোনো লাইব্রেরিতে যাওয়ারই দরকার নেই। কিন্তু দরকারের গন্ডিতে বন্দী থাকতে কি ভালো লাগে? ফিজিক্স লাইব্রেরিতে দিনরাত চব্বিশ ঘন্টা যে কোনো সময়েই ঢুকতে পারি ইলেকট্রনিক কার্ড দিয়ে। কিন্তু অন্য লাইব্রেরিগুলিতে নির্ধারিত সময়ের বাইরে আমার প্রবেশাধিকার নেই। তাই যখনই সুযোগ পাচ্ছি – একটার পর একটা লাইব্রেরিতে ঢু মেরে দেখছি কী কী বিষয়ের বই আছে সেখানে। কম্পিউটারে লাইব্রেরির ক্যাটালগ থেকেই জানা যায় কোথায় কী বই আছে। কিন্তু বইয়ের গায়ে হাত দিয়ে দেখার যে আনন্দ তা থেকে নিজেকে বঞ্চিত করি কেন।

এই কাজটি আমি বাংলাদেশে যে ক’টা লাইব্রেরিতে ঢুকতে পেরেছি – সব জায়গায় করেছি। সবগুলি বইয়ের তাক ঘুরে ঘুরে দেখেছি কোথায় কী বই আছে। পুরো চট্টগ্রাম শহরে যতগুলি লাইব্রেরি আছে তার চেয়ে অনেক বেশি লাইব্রেরি আছে মেলবোর্ন ইউনিভার্সিটির এই পার্কভিল ক্যাম্পাসে। গত তিন সপ্তাহে আমি সবগুলো লাইব্রেরিতে ঢু মেরেছি। এদের মধ্যে অনেকগুলি লাইব্রেরিতে আমার আর না গেলেও চলবে। যেমন আমাদের বিল্ডিং থেকে বের হয়ে ওল্ড জিওলজি বিল্ডিং-এর সামনে আর্কিটেকচার বিল্ডিং-এর দোতলার লাইব্রেরিতে সব বিল্ডিং ডিজাইনের বই – আর যেতে হবে না সেখানে। কেমিস্ট্রি, ম্যাথস, বায়োলজি ওসবেও আর যেতে হবে না। কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এর পেছনে লাল রঙের পুরনো মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিল্ডিং-এর ইঞ্জিনিয়ারিং লাইব্রেরিতেও আর যেতে হবে বলে মনে হয় না।

গ্র্যাটান স্ট্রিট পার হয়ে ইউনিভার্সিটি স্কোয়ারের সামনে মেলবোর্ন বিজনেস স্কুল। এটা নাকি পৃথিবীর প্রথম পাঁচটি বিজনেস স্কুলের একটি। পৃথিবীর অনেক বড় বড় কোম্পানির এক্সিকিউটিভরা এখানে আসে এমবিএ করার জন্য। মেডিসিনের টিউশন ফি’র চেয়েও বেশি বিজনেস স্কুলের টিউশন ফি। এখানেও একটি খুব হাই ফাই লাইব্রেরি আছে। সেই লাইব্রেরিতেও ঘুরে এসেছি। খটখটে বিজনেস পেপারে ভর্তি। আমার আর যেতে হবে না ওখানে।

বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টের ভেতরের লাইব্রেরিগুলি ছাড়াও আলাদা আলাদা সম্পূর্ণ বিল্ডিং নিয়ে যে তিনটি বিশাল লাইব্রেরি আছে এই ক্যাম্পাসে সেগুলি হলো ইস্টার্ন রিসোর্স সেন্টার বা ই-আর-সি লাইব্রেরি, ব্যাইলিউ লাইব্রেরি আর বায়োমেডিক্যাল লাইব্রেরি। এগুলিতে একবার করে ঢুকেই বুঝতে পেরেছি বার বার যেতে হবে।

ব্যাইলিউ লাইব্রেরিতে আজকের আগেও কয়েকবার এসেছি। প্রথমবার এসেছিলাম এখানে পার্টটাইম কাজের জন্য। কাজ হয়নি। আজ এসেছি বই দেখার জন্য। কত লাখ বই যে এখানে আছে!

মেলবোর্ন ইউনিভার্সিটির সবচেয়ে বড় লাইব্রেরি এই ব্যাইলিউ লাইব্রেরি। অস্ট্রেলিয়ান ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদ উইলিয়াম ব্যাইলিউর টাকায় এই লাইব্রেরি তৈরি হয়েছে। বিশাল পাঁচতলা এই লাইব্রেরি বিল্ডিংটি তৈরি হয়েছে ১৯৫৮ সালে। দেখে মনে হয় না যে এই বিল্ডিং-এর বয়স চল্লিশ হয়ে গেছে। পাঁচ তলা বিল্ডিং-এর দোতলা পর্যন্ত মাটির নিচে। একেবারে নিচের তলায় আছে দুষ্প্রাপ্য সব ছবি, গানের রেকর্ড, পত্রিকা। লিটল ম্যাগাজিনে ভর্তি এর পরের তলা। সব ঘুরে ঘুরে দেখতে দেখতে এলাম পঞ্চম তলায়। এখানেই মূল সংগ্রহশালা।

ঘুরে ঘুরে দেখতে দেখতে অনেকগুলি বই হাতে উঠে এলো। ইস্যু করে নিয়ে যেতে হবে। আরো বই দেখতে দেখতে ইংরেজি ছাড়া অন্য ভাষায় লেখা বইয়ের অংশে এলাম। ফরাসি, জার্মানের কাছাকাছি রাশিয়ান আর চায়নিজ ভাষায় লেখা বইও পাওয়া গেল। আমার চোখ দ্রুত ঘুরছে, ক্ষীণ একটা আশা মনে জেগে উঠেছে। আশাতীতভাবে পরের সারিতেই দেখা দিলেন রবীন্দ্রনাথ। “শঙ্খের মধ্যে যেমন সমুদ্রের শব্দ শুনা যায়, তেমনি এই লাইব্রেরির মধ্যে কি হৃদয়ের উত্থানপতনের শব্দ শুনিতেছ?” কী এক আশ্চর্য সুখে হৃদয় আন্দোলিত হয়ে উঠলো। রবীন্দ্র জন্ম শতবার্ষিকী উপলক্ষে ১৯৬১ সালে বিশ্বভারতী থেকে প্রকাশিত রবীন্দ্র রচনাবলির সবগুলি খন্ডই আছে এখানে। তার পাশে অন্নদাশংকর রায়ের সত্যাসত্য উপন্যাসের চার খন্ড, বিভূতিভূষণের পথের পাঁচালী, সুবোধ ঘোষের ভারত প্রেমকথা, আর ত্রৈলোক্যনাথ রচনাবলীর এক খন্ড। মাত্র এই ক’টা বাংলা বই – তাতেই মনে হচ্ছে আমি সোনার খনি পেয়ে গেছি। এখানে এই বই কীভাবে এলো তার ইতিহাস আমি জানি না। নিশ্চয় কোন বাঙালি শিক্ষাবিদ এই বইগুলি আনার ব্যবস্থা করেছেন। আমি কৃতজ্ঞ তাঁর কাছে। এতক্ষণ যেসব বই হাতে নিয়েছিলাম সেগুলি রেখে দিলাম লাইব্রেরির ট্রলিতে। রবীন্দ্র রচনাবলীতে হাত দিলাম। ভীষণ ভারী এক এক খন্ড। এক সাথে পাঁচ খন্ডের বেশি নেয়া গেল না। কাল আবার আসতে হবে। সবগুলি বই বাসায় নিয়ে গিয়ে পড়তে হবে। বাংলা থেকে দূরে না গেলে বোঝা যায় না বাংলার জন্য কেমন তৃষ্ণা জাগে। 




Latest Post

Emmy Noether: A Mathematician of the Einstein Era

  Amalie Emmy Noether was one of the most original mathematicians of the twentieth century. Her research had a profound influence on both pu...

Popular Posts