Tuesday, 8 September 2026

আলমাস দিনারের দিন শেষ

 


চট্টগ্রাম শহরের সিনেমাহলগুলি যখন একের পর এক বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল, তখনো কোনোরকমে টিম টিম করে জ্বলছিল আলমাস ও দিনার সিনেমার বাতিগুলি। কোভিডের সময়েও হয়তো ক্ষীণ আশা ছিল – মহামারী শেষে আবার বাজবে বেল, উঠবে পর্দা। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। এবার গিয়ে দেখলাম কফিনের শেষ পেরেক মারা হয়ে গেছে। ভবনের বাইরে যেখানে সাঁটা থাকতো বিশাল পোস্টার, নিয়ন আলোয়

ঝলমল করতো “আলমাস” “দিনার” – সেখানে দুর্ভিক্ষের রাস্তায় পড়ে থাকা কঙ্কালের মতো হা হয়ে আছে বিবর্ণ ন্যাড়া কাঠামো, তার নিচে জাহিদ স্যারের রসায়ন, মোখতার স্যারের বাংলা কোচিং এবং তারও সাথে চালের গুঁড়োর বিজ্ঞাপন। অনেকক্ষণ ধরে খেয়াল করলে কোনোরকমে পড়া যায় একদম উপরের সাইনবোর্ডে লেখা নাম – আলমাস দিনার।

মনটা হু হু করে উঠলো। ইদানীং স্মৃতিকাতর হয়ে যেখানেই যাচ্ছি – দেখছি বদলে গেছে সব। চট্টগ্রাম কলেজের যে হোস্টেলে কেটেছে আমার কৈশোরের কয়েকটি বছর, সেই হোস্টেলগুলি সব বন্ধ হয়ে আছে বছরের পর বছর। দরজা-জানালা সব খুলে খুলে পড়ে যাচ্ছে। সরকারি জিনিস বলেই হয়তো!

হোস্টেল বন্ধ হয়ে যাওয়াতে যত কষ্ট পেয়েছি, তার চেয়েও বেশি কষ্ট লাগলো সিনেমা হল বন্ধ হয়ে যাওয়াতে। হওয়াটাই স্বাভাবিক। গ্রাম থেকে শহরে আসার উপলক্ষটা পড়াশোনা হলেও – প্রতি সপ্তাহে সিনেমা দেখাই হয়ে উঠেছিল আমার প্রধান লক্ষ্য। হোস্টেল থেকে কয়েক মিনিট হাঁটলেই ছিল গুলজার সিনেমা। বেশিরভাগ সিনেমা গুলজারেই দেখা হতো। কিন্তু গুলজার পেরিয়ে মেডিকেল কলেজের হোস্টেলের সামনে দিয়ে হেঁটে চট্টেশ্বরী রোডে এলেই পৌঁছে যাওয়া যেতো আলমাস ও দিনারে।

সেই সময় ঝাড়বাতির জৌলুস ছিল এই হলগুলির লবিতে, সিঁড়িতে। চট্টগ্রাম শহরের অভিজাত সিনেমা হল বলতে বোঝাতো এই দুটো সিনেমা হলকে। পরে যখন বনানী কমপ্লেক্স তৈরি হয় – তখন বনানীকে বিলাসবহুল সিনেমা হল বলা হলেও আলমাস-দিনারের আভিজাত্যে টান পড়েনি একটুও।

দিনারে তখন ইংরেজি সিনেমা চলতো, মাঝে মাঝে হংকং-চায়নার কুংফু-কারাতে সিনেমা। ইংরেজি বুঝতাম না বলে দিনারে খুব বেশি ঢোকা হতো না আমার, তবে  আমার রুমমেট তাপস সাথে থাকলে দিনারেই ঢুকতে হতো।

গুলজার আর আলমাসে সবসময় ভিন্ন ভিন্ন সিনেমা চলতো। তাই দেখা যেতো শুক্রবারে গুলজারের সিনেমা দেখা হয়ে গেলে, অন্য কোনদিনে আলমাসে আসতেই হতো। বেশি দামের টিকেট কেনার সামর্থ্য সবসময় থাকতো না। বেশিরভাগ সময়েই ফ্রন্ট স্টলের টিকেট কেটে – মাঝে মাঝে একেবারে সামনের সারিতে বসেও সিনেমা দেখেছি।

আলমাসে দেখা আমার প্রথম সিনেমা ছিল সুভাষ দত্তের “সবুজ সাথী’। ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময়, পাস করার পর, দেশের বাইরে আসার পরেও যতবার দেশে গিয়েছি – সুযোগ পেলেই এই সিনেমা হলে ঢুকেছি। সর্বশেষ দেখেছিলাম ২০১৭ সালে বদরুল আনাম সৌদের গহীন বালুচর। বাড়ির সবাইকে নিয়ে যেদিন সিনেমাটি দেখতে যাই – হলের দুরবস্থা দেখে মনটা খারাপ হয়ে গিয়েছিল। সেদিন সুবর্ণা মুস্তফাসহ সিনেমার পরিচালক-অভিনেতা অভিনেত্রী অনেকেই এসেছিলেন হলে। কিন্তু হলের শব্দ সঞ্চালন, ছবির প্রক্ষেপণ সবকিছুর এতই খারাপ অবস্থা ছিল – বুঝতেই পারছিলাম যে হলটির মৃত্যুঘন্টা বেজে গেছে।

তবুও ক্ষীণ আশা ছিল – আবার হয়তো সবকিছু নতুনভাবে সাজানো হবে। কিন্তু কী নিয়ে সাজানো হবে? হলে চালানোর মতো, মানুষকে হলমুখী করার মতো সিনেমা তৈরি করতে না পারলে হল কেন রাখবেন হলের মালিকরা? অন্যদেশের সিনেমাও চলতে দেয়া হবে না, নিজেরা সিনেমা তৈরি করতেও জানবেন না, অথচ আশা করবেন হলগুলি সব চালু থাকবে, তা কি হয়?

হয় না, তাই যা হয় – তা হচ্ছে। সিনেমা হলগুলি মরে যাচ্ছে। আর আমার কষ্ট হচ্ছে। এখন চট্টগ্রামে পুরনো হলগুলির শুধু একটিই অবশিষ্ট আছে – সেটি সিনেমাপ্যালেস। এটার আয়ুও আর কতদিন -জানি না।

==============

১১.০৩.২০২৩

No comments:

Post a Comment

Latest Post

Ken Amos — My Teacher My Mentor

  For many people, another kind of student life begins after the formal years of schooling, college, and university degrees have come to an ...

Popular Posts