Sunday 31 July 2022

নোবেলজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী চন্দ্রশেখর

 



মহাবিশ্বের মহাজাগতিক কাজকর্ম পর্যবেক্ষণ করার জন্য অনেকগুলি শক্তিশালী টেলিস্কোপ মহাকাশে স্থাপন করা হয়েছে। কোটি আলোকবর্ষ দূর থেকে ছুটে আসা মহাজাগতিক তড়িৎচুম্বক তরঙ্গ শনাক্ত এবং বিশ্লেষণ করে মহাজাগতিক ঘটনার প্রমাণ সংগ্রহ করার জন্য মহাকাশেই স্থাপন করা হয়েছে ‘অবজারভেটরি’ বা মানমন্দির। এদের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী অবজারভেটরি যা পৃথিবীপৃষ্ঠ থেকে প্রায় এক লক্ষ চল্লিশ হাজার কিলোমিটার দূরে মহাকাশে ভেসে ভেসে মহাজাগতিক ঘটনাবলী পর্যবেক্ষণ করছে তার নাম ‘চন্দ্র এক্স-রে অবজারভেটরি’। যাঁর নাম অনুসারে এই অবজারভেটরির নাম রাখা হয়েছে তিনি আমাদের উপমহাদেশের সন্তান জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানী সুব্রাহ্মনিয়ান চন্দ্রশেখর - বিজ্ঞানী মহলে যিনি ‘চন্দ্র’ নামে পরিচিত। 

১৯৯৮ সালে নাসা তাদের নতুন এক্স-রে অবজারভেটরির জন্য নাম আহ্বান করে সারা পৃথিবীর বিজ্ঞানশিক্ষার্থী ও বিজ্ঞানীদের কাছ থেকে। প্রায় ছয় হাজার মানুষ চিঠি লিখে নাম পাঠান। এর মধ্যে বেশির ভাগই বিজ্ঞানী চন্দ্রশেখরের নাম প্রস্তাব করেন। ১৯৯৮ সালের ২১ ডিসেম্বর নাসার সংবাদ সম্মেলনে ঘোষণা করা হয় এক্স-রে অবজারভেটরির নাম রাখা হবে ‘চন্দ্র’। অবজারভেটরি সেন্টারের পরিচালক হার্ভি ট্যানানবাম বলেন, “বিশ্বব্রহ্মান্ডকে বোঝার জন্য সারাজীবন নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন চন্দ্রশেখর।“ ব্রিটিশ অ্যাস্ট্রোনোমার জেনারেল মার্টিন রিজের মতে - আইনস্টাইনের পর চন্দ্রই একমাত্র ব্যক্তি যিনি মহাবিশ্ব নিয়ে এত দীর্ঘসময় ধরে এবং এত গভীরভাবে ভেবেছেন। পদার্থবিজ্ঞানী ফ্রিম্যান ডাইসনের মতে চন্দ্রশেখর মহাবিশ্বকে বুঝেছিলেন আইনস্টাইনের চেয়েও সঠিকভাবে, কারণ আইনস্টাইন ব্ল্যাকহোলের অস্তিত্ব স্বীকার করেননি, আর চন্দ্রশেখর ব্ল্যাকহোলের অস্তিত্ব প্রমাণ করেছেন।  জ্যোতির্বিজ্ঞানের সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র সুব্রাহ্মনিয়ান চন্দ্রশেখর পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন ১৯৮৩ সালে। নক্ষত্রের ভরের সীমা সংক্রান্ত যে গবেষণার জন্য তিনি নোবেল পুরষ্কার পান সেই গবেষণার সূত্রপাত হয়েছিল এই উপমহাদেশে ১৯২৯ সালে - চন্দ্রশেখরের বয়স তখন মাত্র উনিশ বছর।

চন্দ্রশেখর নিজের জন্মতারিখ বলতেন ‘নাইন্টিন টেন নাইন্টিন টেন’ অর্থাৎ উনিশ দশ উনিশ শ’ দশ। ১৯১০ সালের ১৯ অক্টোবর ব্রিটিশ ভারতের লাহোরে (বর্তমানে পাকিস্তান) জন্ম চন্দ্রশেখরের। চন্দ্রশেখরের বাবা সুব্রাহ্মনিয়ান ছিলেন ব্রিটিশ সরকারের ফাইন্যান্সিয়াল সিভিল সার্ভিসের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। কাকা ভেঙ্কটরামনও (নোবেলজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী সি ভি রামন) কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেয়ার আগপর্যন্ত ফাইন্যান্সিয়াল সিভিল সার্ভিসে কাজ করতেন। ১৯১০ সালে চন্দ্রশেখরের জন্মের সময় সুব্রাহ্মনিয়ান নর্থ ওয়েস্টার্ন রেলওয়ের ডেপুটি অডিটর-জেনারেল হিসেবে লাহোরে কর্মরত ছিলেন। বদলির চাকরির কারণে কয়েক বছর পর পর তাঁদের বাসস্থান বদলে যেতো। ফলে চন্দ্রশেখরের প্রাথমিক পড়াশোনা শুরু হয় বাড়িতেই। এগারো বছর বয়স পর্যন্ত বাড়িতে বাবা ও প্রাইভেট টিউটরের কাছে পড়াশোনা করেছে চন্দ্রশেখর। ইচ্ছেমত গণিত ও ইংরেজির পাঠ নিয়েছে। চন্দ্রশেখরের ১২ বছর বয়সের সময় তাঁর বাবা মাদ্রাজে স্থায়ীভাবে বাস করতে শুরু করেন। চৌদ্দ বছরে স্কুল সার্টিফিকেট পাস করে চন্দ্রশেখর ভর্তি হলেন মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সি কলেজে। পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন ও গণিতে ডিস্টিংশানসহ উচ্চমাধ্যমিক পাস করলেন চন্দ্রশেখর। পদার্থবিজ্ঞানে অনার্স নিয়ে বিএসসিতে ভর্তি হলেন প্রেসিডেন্সি কলেজে।

১৯২৮ সালের অক্টোবর মাসে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটা সিরিজ বক্তৃতা দিয়ে মাদ্রাজের প্রেসিডেন্সি কলেজে বক্তৃতা দিতে এলেন আর্নল্ড সামারফেল্ড। এত বড় একজন পদার্থবিজ্ঞানীর লেকচার শুনতে পারবেন ভেবে চন্দ্রশেখর ভীষণ উত্তেজিত।  তিনি ইতোমধ্যেই পড়ে ফেলেছেন সামারফেল্ডের বিখ্যাত বই ‘অ্যা্টমিক স্ট্রাকচার অ্যা্ন্ড স্পেকট্রা লাইন্‌স।‘ শুধু পড়া নয় - বইতে বর্ণিত সমস্যাগুলোর সমাধানও করে ফেলেছেন নিজে নিজে। 

সামারফেল্ডের বক্তৃতার পরের দিন আত্মবিশ্বাসী তরুণ চন্দ্রশেখর হোটেলে গিয়ে দেখা করলেন সামারফেল্ডের সাথে। চন্দ্রশেখরের আগ্রহ আর এত কম বয়সেই পরমাণুর গঠন সম্পর্কিত জটিল ধারণাগুলো আয়ত্ব করে ফেলার ক্ষমতা দেখে মুগ্ধ হলেন সামারফেল্ড। কিন্তু তিনি যখন বললেন তাঁর ‘অ্যা্টমিক স্ট্রাকচার’ বইতে বর্ণিত কোয়ান্টাম মেকানিক্সের তত্ত্বগুলো ইতোমধ্যেই পুরনো হয়ে গেছে - স্তম্ভিত হয়ে গেলেন চন্দ্রশেখর। সামারফেল্ড অনেকক্ষণ ধরে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের সাম্প্রতিক আবিষ্কারের কথা বললেন চন্দ্রশেখরকে। বললেন শ্রোডিংগার, হাইজেনবার্গ, ডিরাক ও পাউলির নতুন কোয়ান্টাম তত্ত্বের কথা। চন্দ্রশেখর ম্যাক্সওয়েল-বোল্টজম্যান এর ক্লাসিক্যাল স্ট্যাটিস্টিক্‌স আত্মস্থ করেছেন ইতোমধ্যে। কিন্তু সামারফেল্ড জানালেন ম্যাক্সওয়েল-বোল্টজম্যান তত্ত্বেও পরিবর্তন আসছে। সামারফেল্ড কোয়ান্টাম মেকানিক্সের আলোকে ফার্মি-ডিরাক স্ট্যাটিস্টিক্‌স সম্পর্কিত তাঁর প্রকাশিতব্য একটা গবেষণাপত্রের প্রুফ পড়তে দিলেন চন্দ্রশেখরকে। কোয়ান্টাম তত্ত্বের আলোকে পদার্থের ইলেকট্রন তত্ত্বের ওপর প্রথম পেপারটি পড়ে ফেললেন চন্দ্রশেখর প্রকাশিত হবার আগেই। 

সামারফেল্ডের সাথে সাক্ষাতের পর পদার্থবিজ্ঞানের গবেষণায় মনপ্রাণ ঢেলে দিলেন চন্দ্রশেখর। কয়েক মাসের মধ্যেই ১৯২৮ সালে ইন্ডিয়ান জার্নাল অব ফিজিক্সে প্রকাশিত হলো চন্দ্রশেখরের প্রথম গবেষণাপত্র ‘থার্মোডায়নামিক্স অব দি কম্পটন ইফেক্ট উইথ রেফারেন্স টু দি স্টার্‌স।’

তারপর সামারফেল্ডের সাথে আলোচনা ও তাঁর ফার্মি-ডিরাক স্ট্যাটিস্টিক্‌স এর পেপারটির ওপর ভিত্তি করে দ্বিতীয় গবেষণাপত্রটি রচনা করেন চন্দ্রশেখর। ‘দি কম্পটন স্ক্যাটারিং অ্যা্ন্ড দি নিউ স্ট্যাটিস্টিক্‌স’ শিরোনামের পেপারটির বিষয়বস্তুর নতুনত্ব ও গুরুত্বের কথা চিন্তা করে চন্দ্রশেখর ভাবলেন পেপারটি রয়েল সোসাইটির প্রসিডিংস এ প্রকাশ করবেন। কিন্তু রয়েল সোসাইটির কোন ফেলোর সুপারিশ ছাড়া রয়েল সোসাইটিতে প্রকাশের জন্য কোন গবেষণাপত্র বিবেচিত হয় না। চন্দ্রশেখর চাইলেই তাঁর কাকা ভেঙ্কট রামনের মাধ্যমে পেপারটি রয়েল সোসাইটিতে পাঠাতে পারেন। কিন্তু তিনি চাননি ব্যক্তিগত পরিচিতি কাজে লাগাতে। মাদ্রাজ ইউনিভার্সিটির লাইব্রেরিতে গিয়ে নতুন আসা সায়েন্টিফিক জার্নাল খুঁজে দেখলেন রয়েল সোসাইটির ফেলো রাল্‌ফ ফাওলার ফার্মি-ডিরাক স্ট্যাটিস্টিক্‌স কাজে লাগিয়ে শ্বেত-বামনের তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করেছেন। চন্দ্রশেখর জার্নাল থেকে ঠিকানা নিয়ে রাল্‌ফ ফাওলারের কাছে তাঁর পেপারটি পাঠিয়ে দিলেন। ফাওলার এত উঁচুমানের পেপার পেয়ে খুশি হয়েই রয়েল সোসাইটিতে পাঠিয়ে দিলেন। ১৯২৯ সালে রয়েল সোসাইটির প্রসিডিংস এ প্রকাশিত হলো চন্দ্রশেখরের দ্বিতীয় গবেষণাপত্র।  ১৯৩০ সালে পদার্থবিজ্ঞানে অনার্স পাস করার আগেই চন্দ্রশেখরের আরো দুটো পেপার প্রকাশিত হয় ফিলোসফিক্যাল ম্যাগাজিনে। 

সেবছরই স্কলারশিপ নিয়ে ইংল্যান্ডে রওনা হলেন চন্দ্রশেখর কেমব্রিজে গিয়ে প্রফেসর রাল্‌ফ ফাওলারের তত্ত্বাবধানে পড়াশোনা করার জন্য। প্রফেসর ফাওলারের শ্বেতবামন তত্ত্ব সংক্রান্ত যত পেপার প্রকাশিত হয়েছে তার সবগুলোই গভীর মনযোগ দিয়ে পড়েছেন চন্দ্রশেখর কেমব্রিজে যাওয়ার আগেই। ফাওলারের তত্ত্ব সম্প্রসারণ করে নিজেই একটা পেপার লিখে সাথে নিয়েছিলেন জাহাজে ওঠার আগে। আর জাহাজে বসে হাত দিলেন নতুন আরেকটি পেপার লেখার কাজে। প্রফেসর রাল্‌ফ ফাওলার শ্বেত-বামন নক্ষত্রের ধর্মাবলী ব্যাখ্যা করেছেন ফার্মি-ডিরাক সংখ্যায়ন ব্যবহার করে। 

যে সব নক্ষত্র জ্বলতে জ্বলতে তাদের নিউক্লিয়ার শক্তি নিঃশেষ করে ফেলেছে - সাধারণত সেই সব নক্ষত্রদের হোয়াইট ডোয়ার্ফ বা শ্বেত-বামন বলা হয়। এই নক্ষত্রগুলির মাধ্যাকর্ষণ-বল এত বেড়ে যায় যে তাদের ঘনত্ব সাধারণ পদার্থের চেয়ে হাজার হাজার গুণ বেশি হয়ে পড়ে। ঘনত্ব বেড়ে গিয়ে আয়তনে ছোট হয়ে যাবার পর সেগুলি তাপ বিকিরণ করে আস্তে আস্তে ঠান্ডা হতে শুরু করে। ফাওলার শ্বেত-বামনের ভর ও ঘনত্বের মধ্যে গাণিতিক সম্পর্ক স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছেন যা সেই সময়ের পরীক্ষামূলক ফলাফলের সাথে মিলে যায়। 

জাহাজে বসে চন্দ্রশেখর নতুন করে ভাবতে শুরু করলেন শ্বেত-বামনের ঘনত্ব ও ভর নিয়ে। ফাওলার ইলেকট্রনকে নন-রিলেটিভিস্টিক বা অনাপেক্ষিক কণা হিসেবে ধরে নিয়ে হিসেবের মধ্যে নিউটনিয়ান মেকানিক্স প্রয়োগ করেছেন। কিন্তু শ্বেত-বামনের কেন্দ্রে ইলেকট্রনগুলো এত জোরে ছুটে বেড়াচ্ছে যে তারা কিছুতেই অনাপেক্ষিক থাকতে পারে না। আইনেস্টাইনের আপেক্ষিকতার তত্ত্ব এখানে প্রয়োগ করতেই হবে। নক্ষত্রগুলির একটি নির্দিষ্ট রাসায়নিক গঠন ধরে নিয়ে ফাওলার হিসেব করে দেখিয়েছেন শ্বেতবামনের ঘনত্ব হবে ভরের বর্গের সমানুপাতিক। একটু ভেবে দেখলেই এর সত্যতা বোঝা যায়। নক্ষত্রের ভর যত বেশি হবে মাধ্যাকর্ষণ বল তত বেশি হবে ফলে নক্ষত্রের ভেতরের পদার্থগুলি ঘন হয়ে নিজেদের মধ্যে গুটিয়ে যাবে - আর ঘনত্ব বেড়ে যাবে। ফলে নক্ষত্রের আয়তন খুব কমে যাবে। সেগুলি এত ছোট হয়ে যাবে যে তাদের আর দেখা যাবে না। সে কারণেই সূর্যের চেয়ে বেশি ভরের কোন শ্বেত-বামন নক্ষত্র দেখা যায় না। 

চন্দ্রশেখর আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার তত্ত্ব প্রয়োগ করে দেখলেন ভরের তুলনায় শ্বেত-বামনের ঘনত্ব ফাওলারের হিসেবের তুলনায় আরো অনেক বেড়ে যায়। ভর বৃদ্ধির সাথে ঘনত্বের দ্রুত বৃদ্ধিই শুধু হয় না, একটা নির্দিষ্ট ভরের বেশি হলে ঘনত্বের পরিমাণ হয়ে যায় অসীম। ভরের এই নির্দিষ্ট সীমা-ই পরে ‘চন্দ্রশেখর লিমিট’ হিসেবে গৃহীত হয়। ভরের এই সীমা নক্ষত্রের রাসায়নিক উপাদানের উপর নির্ভর করে।

চন্দ্রশেখর জাহাজে বসে ইংল্যান্ডে পৌঁছানোর আগেই লিখে শেষ করলেন তাঁর পেপার “দি ম্যাক্সিমাম মাস অব আইডিয়েল হোয়াইট ডোয়ার্ফ।“ তিনি হিসেব করে দেখিয়েছিলেন যে কোন শ্বেত-বামনের ভর সূর্যের ভরের শতকরা ৯০ ভাগের বেশি হলে তার ঘনত্ব অসীম হয়ে যাবে। পরে অবশ্য এই মান কিছুটা পরিবর্তিত হয়। বর্তমানে চন্দ্রশেখর লিমিট হলো সূর্যের ভরের ১.৪ গুণ। 

এর ৫৩ বছর পর ১৯৮৩ সালে চন্দ্রশেখর নোবেল পুরষ্কার পান এই কাজের জন্য যা তিনি করেছিলেন মাত্র ১৯ বছর বয়সে ভারত থেকে ইংল্যান্ড যাবার পথে জাহাজে বসে।

কেমব্রিজে গিয়ে প্রফেসর ফাওলারের সাথে দেখা করলেন চন্দ্রশেখর। ফাওলারের সাথে দেখা করেই তিনি নতুন লেখা পেপারদুটো দেখালেন। প্রথম পেপার যেটাতে ফাওলারের কাজকে বিস্তৃত করা হয়েছে তা খুশি মনে মেনে নিলেন ফাওলার এবং  রয়েল সোসাইটির প্রসিডিংস এ প্রকাশের জন্য পাঠিয়ে দিলেন। কিন্তু দ্বিতীয় পেপার যেটাতে চন্দ্রশেখর ভরের সীমা হিসেব করেছেন - সেটা নিয়ে ফাওলার দ্বিধান্বিত হয়ে পড়লেন। ফাওলার বললেন পেপারটা এডওয়ার্ড মিলনির কাছে পাঠিয়ে মতামত নিতে। কিন্তু কয়েক মাস পরেও ফাওলার বা মিলনির কাছ থেকে কোন সাড়া পাওয়া গেলো না পেপারটির ব্যাপারে। চন্দ্রশেখর বুঝতে পারলেন যে ফাওলার হয়তো চাচ্ছেন না যে পেপারটি এখন প্রকাশিত হোক। চন্দ্রশেখর আর অপেক্ষা করলেন না। পেপারটির ছোট একটা সংস্করণ (মাত্র দুই পৃষ্ঠা) পাঠিয়ে দিলেন আমেরিকার অ্যাস্ট্রোফিজিক্যাল জার্নালে। পরের বছর অ্যাস্ট্রোফিজিক্যাল জার্নালে প্রকাশিত হলো চন্দ্রশেখরের বিখ্যাত গবেষণাপত্র – দি ম্যাক্সিমাম মাস অব আইডিয়েল হোয়াইট ডোয়ার্ফ (অ্যাস্ট্রোফিজিক্যাল জার্নাল, (১৯৩১) সংখ্যা ৭৪, পৃ ৮১-৮২)। 

রিলেটিভিস্টিক আয়োনাইজেশান ও মহাকাশ নিয়ে গবেষণা করে ১৯৩৩ সালে পিএইচডি সম্পন্ন করলেন চন্দ্রশেখর। এরপর ট্রিনিটি কলেজের ফেলোশিপ পেলেন। রামানুজনের পরে চন্দ্রশেখরই হলেন দ্বিতীয় ভারতীয় যিনি এই ফেলোশিপ পেলেন।  ১৯৩৪ সালের মধ্যে রিলেটিভিস্টিক কোয়ান্টাম মেকানিক্সের আলোকে শ্বেত-বামনের ভর ও ঘনত্বের সীমা নিয়ে বিস্তারিত হিসেবসহ দুটো পেপার প্রকাশের জন্য রয়েল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটিতে জমা দিলেন। রয়েল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটির আমন্ত্রণে ১৯৩৫ সালের জানুয়ারি মাসে সোসাইটির মাসিক সভায় বক্তৃতা দেন চন্দ্রশেখর। সভায় উপস্থিত ছিলেন স্যার আর্থার এডিংটন। জ্যোতির্বিজ্ঞানে সেই সময় এডিংটনের কথাই শেষ কথা। এডিংটন চন্দ্রশেখরের গবেষণাকে স্বীকৃতিতো দিলেনই না, বরং অপমান করলেন। এডিংটনের মতে যে কোন তারাই শক্তিক্ষয়ের পর একসময় প্রাকৃতিক নিয়মেই মরে যাবে। সেখানে শ্বেতবামন বা ভরের সীমার কোন শর্ত থাকতে পারে না।

এর প্রায় দুই যুগ পর ‘চন্দ্রশেখর লিমিট’ নিজের যোগ্যতাতেই প্রতিষ্ঠিত হয় এবং বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে প্রয়োজনীয় আবিষ্কারগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হয়। চন্দ্রশেখরের সীমার চেয়ে বেশি ভরের তারাগুলোর ভবিষ্যত কী? এ প্রশ্নের উত্তর সেদিন পাওয়া না গেলেও আজ আমরা সবাই জানি যে এরা ‘নিউট্রন স্টার’ কিংবা  ‘ব্ল্যাক হোল’এ রূপান্তরিত হয়।

এডিংটনের কারণে ইংল্যান্ডের কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি পাবার সম্ভাবনা শূন্য হয়ে গিয়েছিল চন্দ্রশেখরের। ১৯৩৫ সালে তিনি পাড়ি দিলেন আমেরিকায়। চার মাস কাজ করলেন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে। এরপর যোগ দিলেন শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৪২ সালে অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর এবং ১৯৪৪ সালে ফুল প্রফেসর হন চন্দ্রশেখর। ১৯৫২ সালে ‘মরটন ডি হাল ডিস্টিংগুইস্‌ড সার্ভিস প্রফেসর’ হন। ১৯৮৫ সালে অবসর গ্রহণের পরেও এমেরিটাস প্রফেসর হিসেবে আমৃত্যু শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়েই ছিলেন চন্দ্রশেখর। ৪৮ বছরের শিক্ষকতা জীবনে একান্ন জন গবেষক পিএইচডি ডিগ্রি পান চন্দ্রশেখরের তত্ত্বাবধানে। ১৯৯৫ সালের ২১ শে আগস্ট চন্দ্রশেখর মারা যান।


তথ্যসূত্র

আর জে টেইলরের ‘সুব্রাহ্মনিয়ান চন্দ্রশেখর: বায়োগ্রাফিক্যাল মেমোরিজ অব ফেলোজ অব দি রয়েল সোসাইটি (১৯৯৬), কামেশ্বর সি ওয়ালির ‘চন্দ্র: এ বায়োগ্রাফিক্যাল পোট্রেট’ (২০১০), প্রদীপ দেবের ‘উপমহাদেশের এগারজন পদার্থবিজ্ঞানী (২০১৭)। 

______________
বিজ্ঞানচিন্তা মে ২০২২ সংখ্যায় প্রকাশিত








No comments:

Post a Comment

Latest Post

Memories of My Father - Part 4

  This is my first photo taken with my father. At that time, I had just moved up to ninth grade, my sister was studying for her honors, and ...

Popular Posts