Wednesday, 9 September 2026

দীপু সানার মৃত্যুর জন্য আসলে কে দায়ী?

 


ঢাকা শহরের বড়লোকরা যখন বড় বড় বাড়ি বানান কত লক্ষ কোটি টাকা খরচ করেন, পাল্লা দিয়ে জেল্লা বাড়ান দালান কোঠার। কিন্তু লক্ষ লক্ষ সাধারণ মানুষ যারা তাঁদের নির্মাণাধীন ইমারতের পাশ দিয়ে, নিচে দিয়ে হেঁটে যান – তাদের জীবনের নিরাপত্তার জন্য সামান্য কয়েকটি টাকা খরচ করে নিরাপদ বেষ্টনির ব্যবস্থা করেন না। 

ভবন নির্মাণ আইনে জনগণের নিরাপত্তা সম্পর্কে কত ভালো ভালো কথাবার্তা লেখা আছে। সেগুলি শুধু লেখাতেই আছে। তাই তো কিছুদিন পর পর উপর থেক ইট পড়ে রড পড়ে প্রাণ যায় পথচারির। তাতে যাদের যায় – তাদেরই সবকিছু যায়। যাদের দায় নেবার কথা তাদের কিছুই যায় আসে না। 

শান্তিনগর এলাকায় গত সন্ধ্যায় (১০ জানুয়ারি ২০২৪) দীপু সানার মর্মান্তিক মৃত্যুতেও মনে হয় না কারো কিছু যায় আসে। এবার হয়তো পথচারীদেরই নিজের উদ্যোগে মাথায় সেফ্‌টি হ্যাট পরে চলাচল করতে হবে – তাতে যদি জীবন বাঁচে। 


ঘটনার বিবরণ

২০২৪ সালের ১০ জানুয়ারি, বুধবার। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা দীপান্বিতা বিশ্বাস, যিনি দীপু সানা নামে পরিচিত ছিলেন, প্রতিদিনের মতো কাজ শেষে সদরঘাটের কর্মস্থল থেকে অফিসের বাসে রওনা হন।  তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী এবং ২০১৭ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকে যোগ দিয়েছিলেন। 

সন্ধ্যায় অফিসের বাস থেকে শান্তিনগরে নেমে তিনি মগবাজারের বাসার দিকে হেঁটে যাচ্ছিলেন। বাসা কাছাকাছি হওয়ায় নিয়মিতই এই পথটুকু হাঁটতেন।  সাড়ে সাতটার দিকে সিদ্ধেশ্বরী–মৌচাক এলাকার নিউ সার্কুলার রোডে ফখরুদ্দীন বিরিয়ানি ও পার্টি সেন্টারের সামনের ফুটপাত দিয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎ ওপর থেকে একটি ভারী, ইট-আকৃতির কংক্রিটের ব্লক তাঁর মাথায় এসে পড়ে। তিনি সঙ্গে সঙ্গে রাস্তায় লুটিয়ে পড়েন।

স্থানীয় লোকজন তাঁকে কাছের সিরাজুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। পরে তাঁর মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। মাত্র ৩৭ বছর বয়সে নিভে গেল দীপান্বিতার জীবনপ্রদীপ।


ইটটি কোথা থেকে এল? - ঘটনার পর এটিই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।

প্রাথমিক সংবাদে বলা হয়েছিল, পাশের কোনো নির্মাণাধীন ভবন থেকে ইট পড়ে থাকতে পারে। কিন্তু পুলিশ ঘটনাস্থল পরীক্ষা করে দেখতে পায়, যেখানে তিনি পড়ে যান, ঠিক তার পাশের ভবনগুলো তখন নির্মাণাধীন ছিল না। ঘটনাস্থলের ওপরে মগবাজার–মৌচাক ফ্লাইওভার রয়েছে।

সিসিটিভি ফুটেজে স্পষ্ট দেখা যায়—দীপু সানা ফুটপাত ধরে হাঁটছেন এবং আচমকা ওপর থেকে একটি কংক্রিটের ব্লক সরাসরি তাঁর মাথায় এসে পড়ছে। কিন্তু ক্যামেরায় ব্লকটির উৎস দেখা যায়নি। পুলিশের একজন কর্মকর্তা জানান, বস্তুটি সাধারণ ইট নয়; এটি ফুটপাত নির্মাণে ব্যবহৃত সিমেন্টের খাঁজকাটা ইট-আকৃতির ব্লক।

পরবর্তী পর্যায়ে পুলিশের ধারণা হয়, ব্লকটি সম্ভবত ফ্লাইওভারের উপর থেকে পড়েছে। ফ্লাইওভারের উপর দিয়ে যাওয়া কোনো যানবাহন থেকে এটি পড়ে থাকতে পারে কি না অথবা কেউ সেটি ফেলেছিল কি না—সে প্রশ্নেও তদন্ত হয়। তবে দীপু সানাকে লক্ষ্য করে কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে ব্লক ছুড়েছে—এমন প্রমাণ প্রাথমিক তদন্তে পাওয়া যায়নি।


১১ জানুয়ারি ২০২৪: হত্যা মামলা

পরদিন, ১১ জানুয়ারি ২০২৪, দীপু সানার স্বামী তরুণ কুমার বিশ্বাস রমনা মডেল থানায় মামলা করেন।  পুলিশ সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে এবং ব্লকটির উৎস ও দায়ী ব্যক্তিকে শনাক্ত করার চেষ্টা শুরু করে।

আদালত প্রথমে মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ পর্যন্ত সময় দেয়।


১১ জানুয়ারি: জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের হস্তক্ষেপ

ঘটনার মাত্র একদিন পর জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিষয়টি আমলে নেয়। কমিশন ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনারকে নির্দেশ দেয়, কারও অবহেলার কারণে এই মৃত্যু ঘটেছে কি না তা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে। একই সঙ্গে রাজউক এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের কাছে জানতে চাওয়া হয়, ভবন নির্মাণের সময় সেফটি নেটসহ প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং ইমারত নির্মাণ বিধিমালা বাস্তবায়নে তারা কী ব্যবস্থা নিয়ে থাকে। কমিশন এমন ঘটনাকে “মর্মান্তিক” বলে উল্লেখ করে এবং পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থার অভাবে এ ধরনের মৃত্যুর পুনরাবৃত্তি হচ্ছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করে।


১৩ জানুয়ারি: সহপাঠীদের প্রতিবাদ

দীপু সানা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন। তাঁর মৃত্যুর সুষ্ঠু তদন্ত ও দায়ীদের বিচারের দাবিতে ১৩ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে তাঁর সাবেক সহপাঠী ও শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন করেন।


২৫–২৯ জানুয়ারি ২০২৪: হাইকোর্টে রিট

ঘটনাটি শুধু একটি ফৌজদারি মামলার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মোস্তাফা মোশাররফ হোসেন জনস্বার্থে হাইকোর্টে একটি রিট করেন।

রিটে দীপু সানার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানের জন্য উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত কমিটি, দায়ীদের শনাক্ত ও শাস্তি এবং তাঁর পরিবারকে ১০ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশনা চাওয়া হয়। মামলার নিষ্পত্তির আগ পর্যন্ত অন্তত ৫০ লাখ টাকা অন্তর্বর্তী ক্ষতিপূরণের আবেদনও করা হয়েছিল।

২৯ জানুয়ারি ২০২৪ বিচারপতি মোস্তফা জামান ইসলাম ও বিচারপতি মো. আতাবুল্লাহর হাইকোর্ট বেঞ্চ রুল জারি করেন। আদালত জানতে চান, রাজধানীর ফুটপাত সাধারণ মানুষের চলাচলের জন্য নিরাপদ রাখতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতাকে কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, রাজউক, ঢাকা জেলা প্রশাসন ও ডিএমপিসহ সংশ্লিষ্টদের রুলের জবাব দিতে বলা হয়। তবে ওই পর্যায়ে আদালত কোনো অন্তর্বর্তী ক্ষতিপূরণের আদেশ দেননি।


 তদন্ত প্রতিবেদন বারবার পিছিয়ে যায়

পুলিশ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তদন্ত শেষ করতে পারেনি।

১৮ ফেব্রুয়ারিতে প্রতিবেদন জমা না হওয়ায় সময় বাড়িয়ে ৩১ মার্চ ২০২৪ করা হয়।

৩১ মার্চেও প্রতিবেদন না আসায় পরবর্তী তারিখ হয় ২০ মে।

২০ মে প্রতিবেদন জমা না হওয়ায় তারিখ চলে যায় ৯ জুলাই ২০২৪।

৯ জুলাইও প্রতিবেদন দিতে না পারায় আদালত নতুন তারিখ নির্ধারণ করেন ১৯ আগস্ট ২০২৪।

এই দীর্ঘ সময়েও তদন্তকারীরা ব্লকটির উৎস কিংবা দায়ী ব্যক্তিকে শনাক্ত করতে পারেননি।


তদন্ত যায় ডিবির হাতে

মামলাটি প্রথমে রমনা থানা পুলিশ তদন্ত করলেও পরে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ—ডিবি তদন্তভার পায়। ডিবির রমনা বিভাগের এসআই মো. ইরফান খান দীর্ঘ সময় মামলাটি তদন্ত করেন।


৩০ এপ্রিল ২০২৫: পুলিশ চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়

শেষ পর্যন্ত ৩০ এপ্রিল ২০২৫ ডিবি আদালতে একটি চূড়ান্ত প্রতিবেদন (final report) জমা দেয়।

তদন্তের সারকথা ছিল অস্বাভাবিক: ভিডিও ও অন্যান্য প্রমাণে দেখা যাচ্ছে একটি ব্লক উপর থেকে দীপু সানার মাথায় পড়েছে এবং তাঁর মৃত্যু ঘটেছে। তদন্তকারী কর্মকর্তার মতে, ঘটনাটিকে নিছক দুর্ঘটনা বলে এড়িয়ে যাওয়া যায় না। কিন্তু কে ব্লকটি ফেলেছে বা ঘটনার সঙ্গে কে জড়িত—তা প্রমাণ করার মতো সুনির্দিষ্ট সাক্ষ্য বা প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

ফলে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র বা চার্জশিট না দিয়ে পুলিশ চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করে।

তদন্ত কর্মকর্তা পরে বলেন, তাঁরা দীর্ঘদিন চেষ্টা করেও অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে শনাক্ত করতে পারেননি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ইচ্ছাকৃতভাবে কেউ ব্লকটি ফেলেছিল কি না—সেটিও প্রমাণ করা সম্ভব হয়নি।


 স্বামীর নারাজি: “প্রকৃত ঘটনা কী, আমরা জানতে চাই”

পুলিশের চূড়ান্ত প্রতিবেদন মেনে নেননি দীপু সানার স্বামী তরুণ কুমার বিশ্বাস। তিনি আদালতে নারাজি আবেদন করেন।

তাঁর বক্তব্য ছিল, পুলিশ যদি বলে হত্যার কোনো ক্লু পাওয়া যায়নি, তবু পরিবার জানতে চায় প্রকৃতপক্ষে কী ঘটেছিল? কীভাবে একটি কংক্রিটের ব্লক এত উপর থেকে একজন পথচারীর মাথায় এসে পড়ল এবং এর জন্য কেউ দায়ী কি না—এই প্রশ্নের উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত মামলাটি শেষ হয়ে যাওয়া উচিত নয় বলে তাঁর অবস্থান।


৩০ অক্টোবর ২০২৫: আদালত পুনরায় তদন্তের নির্দেশ দেয়

নারাজি আবেদনের প্রেক্ষিতে ৩০ অক্টোবর ২০২৫ ঢাকার অ্যাডিশনাল চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আওলাদ হোসাইন মুহাম্মদ জোনায়েদ পুলিশের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে মামলাটি শেষ করে দেননি।

আদালত ডিবি পুলিশের একজন ইন্সপেক্টর পদমর্যাদার কর্মকর্তাকে মামলাটি অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেন। অর্থাৎ, মামলাটি আবার সক্রিয় তদন্তে ফিরে যায়।


জানুয়ারি ২০২৬: দুই বছর পরও তদন্ত শেষ হয়নি

৩০ জানুয়ারি ২০২৬ প্রকাশিত বিডিনিউজ২৪-এর বিস্তারিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, আদালতের পুনঃতদন্তের নির্দেশের পরও ডিবি তখন পর্যন্ত তদন্ত শেষ করতে পারেনি।

দীপু সানার স্বামী তরুণ কুমার বিশ্বাসের আক্ষেপ ছিল—তদন্ত কর্মকর্তা বদলাচ্ছেন, কিন্তু তদন্ত শেষ হচ্ছে না। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে ঘটনা ঘটিয়ে থাকলে তাকে আইনের আওতায় আনা হোক; আবার কোনো নির্দোষ ব্যক্তিও যেন হয়রানির শিকার না হন।

২০২৬ সালের জানুয়ারির শেষ দিকে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার একটি তারিখ থাকলেও ডিবি আবার প্রতিবেদন দিতে পারেনি। ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানা তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পরবর্তী তারিখ নির্ধারণ করেন ৫ মার্চ ২০২৬।


তাহলে এখন পর্যন্ত কী জানা গেল?

দীপু সানার মৃত্যুর সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনও প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি।

তিনি যে কংক্রিটের ব্লকের আঘাতে মারা গেছেন, তা সিসিটিভিতে দৃশ্যমান। কিন্তু ব্লকটি কোন ভবন থেকে, ফ্লাইওভার থেকে, কোনো যানবাহন থেকে, নাকি কোনো ব্যক্তির হাত থেকে এসেছিল—তা পুলিশ নিশ্চিত করতে পারেনি। কাউকে অভিযুক্ত করা যায়নি। প্রথম তদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন পরিবার প্রত্যাখ্যান করার পর আদালত আবার তদন্তের নির্দেশ দেয়।

৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত প্রকাশ্য সংবাদসূত্র খুঁজে আমি ৫ মার্চ ২০২৬-এর পর নতুন তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল, কোনো ব্যক্তিকে অভিযুক্ত করা, বিচার শুরু হওয়া বা মামলাটি নিষ্পত্তি হওয়ার নির্ভরযোগ্য সংবাদ পাইনি। 


কেন ঘটনাটি গুরুত্বপূর্ণ

দীপু সানার মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়। ঢাকার মতো শহরে একজন নাগরিক নির্ধারিত ফুটপাত দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় উপর থেকে একটি নির্মাণসামগ্রী পড়ে মারা যাবেন, অথচ দুই বছর পরও বস্তুটি কোথা থেকে এল বা কার অবহেলায় মৃত্যু হলো তা শনাক্ত করা যাবে না! 


No comments:

Post a Comment

Latest Post

একজন হাসিখুশি মানুষ - মেহের আপা

  মেহেরআপার সাথে আমার পরিচয় হয়েছিল প্রায় ত্রিশ বছর আগে শাহীন কলেজে যোগ দেয়ার পর। তখন বিমান বাহিনীর একটি বাসে আমরা শহর থেকে কলেজে যেতাম প্রতি...

Popular Posts