Wednesday, 2 September 2026

কোয়ান্টাম কম্পিউটার: বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী নাকি বিদ্যুৎখেকো

 


আজ থেকে মাত্র চল্লিশ বছর আগেও পৃথিবীতে মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা ছিল হাতেগোণা। ধরা যাক ১৯৮০র দশকের কথা। মোবাইল ফোন তখনও মানুষের দৈনন্দিন কাজকর্মের অংশ হওয়াতো দূরের কথা, সাধারণ মানুষের আশেপাশেও ছিল না। সেই সময় পৃথিবীতে বিদ্যুৎ শক্তির মোট ব্যবহারের পরিমাণ ছিল বছরে প্রায় ৭,৩০০ টেরা-ওয়াট-আওয়ার (TWh)। [১ টেরা-ওয়াট = ১ মিলিয়ন মেগা-ওয়াট = ১ লক্ষ কোটি ওয়াট]। ২০২৪ সালের মধ্যে মোবাইল ফোন, স্মার্টফোন, পারসোনাল কম্পিউটিং, ক্লাউড

কম্পিউটিং, ডেটা স্ট্রিমিং, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বৈশ্বিক ডেটা সেন্টার ইত্যাদি হাজারো বিদ্যুৎ-নির্ভর প্রযুক্তির উত্থানের পর বিশ্বব্যাপী বিদ্যুতের ব্যবহার বেড়ে দাঁড়ায় ২৭,০০০ টেরা-ওয়াট-আওয়ারেরও বেশি। ১৯৯০ সালে পৃথিবীতে মোট মোবাইল-ফোন গ্রাহক ছিল মাত্র এক কোটি বিশ লাখের মতো। অর্থাৎ পৃথিবীর জনসংখ্যার প্রতি দশ হাজার মানুষের মধ্যে মাত্র ২৪ জনের মোবাইল ফোন ছিল। অথচ ২০২৪ সালের মধ্যে পৃথিবীর মোট মোবাইল ফোন গ্রাহকের সংখ্যা দাঁড়ায় ৯১০ কোটিতে, যা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার চেয়েও একশ কোটি বেশি।

শুধুমাত্র মোবাইল ফোন বা কম্পিউটারের ব্যবহারের কারণেই যে বিশ্বের বিদ্যুৎ-চাহিদা বেড়ে গেছে তা নয়। স্বতন্ত্রভাবে এই যন্ত্রগুলি খুব বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার করে না। কিন্তু এই স্বল্প বিদ্যুৎ-চাহিদার যন্ত্রগুলিও তাদের চারপাশে বিশাল এক সহায়ক অবকাঠামো তৈরি করেছে – যেমন, মোবাইল টাওয়ার, নেটওয়ার্ক, ক্লাউড সার্ভার, ডেটা সেন্টার, কুলিং সিস্টেম, সফটওয়ার প্লাটফর্ম ইত্যাদি – যেগুলি নিরবিচ্ছিন্নভাবে চালাতে প্রচুর বিদ্যুৎশক্তির দরকার হয়।

এখন যখন আমাদের পৃথিবী প্রচলিত কম্পিউটিং থেকে কোয়ান্টাম কম্পিউটিং-এর দিকে বিপুল আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছে, একটি প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই আমাদের মনে আসে – সেটি হলো কোয়ান্টাম কম্পিউটার কি প্রচলিত কম্পিউটারের চেয়ে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী হবে, নাকি বিদ্যুৎ-খাদক হবে যার চাহিদার জোগান দিতে দিতে পৃথিবীর বিদ্যুৎ-খাতের নাভিশ্বাস উঠবে!

এই প্রশ্নের উত্তর খুব সোজাসাপ্টাভাবে দেয়া সম্ভব নয়। কারণ নিজে ছোট হয়েও মোবাইল ফোন বা কম্পিউটার যেখানে একটি নিবিড় বিদ্যুৎ-চাহিদা সম্পন্ন ইকোসিস্টেমের জন্ম দিয়েছে, সেখানে কোয়ান্টাম কম্পিউটারের শক্তি চাহিদার হিসেব করতে বসলে আমাদের এটুকু মনে রাখতেই হবে যে – কোয়ান্টাম চিপ নিজে আকারে ছোট হতে হতে পারে, কিন্তু তাকে ঘিরে যে অবকাঠামো গড়ে উঠবে – সেই অবকাঠামো চালানোর জন্য কী পরিমাণ বিদ্যুৎ লাগবে – সেটাই নির্ধারণ করবে কোয়ান্টাম কম্পিউটিং বিদ্যুৎ-সাশ্রয়ী হবে, না বিদ্যুৎ-খাদক হবে (১-৪)।


কোয়ান্টাম কম্পিউটিং কি পরিবেশ-বান্ধব হবে?

কোয়ান্টাম কম্পিউটারকে আমরা এখনই এমন এক বিপ্লবী প্রযুক্তি হিসেবে ধরে নিচ্ছি যা অনেক সমস্যার সমাধান প্রচলিত কম্পিউটিং-এর তুলনায় অনেক বেশি দক্ষভাবে এবং অনেক কম সময়ে দিতে পারবে। কিন্তু কিসের বিনিময়ে? এখান থেকেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে: কোয়ান্টাম কম্পিউটিং কি সামগ্রিকভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহার কমাবে, নাকি ভবিষ্যতের কোয়ান্টাম-কম্পিউটিং ডেটা সেন্টারগুলো বিদ্যুৎ গ্রিডের ওপর আরেকটি নতুন ও বড় চাপ হয়ে দাঁড়াবে?

এর উত্তর সহজ নয়। কোয়ান্টাম প্রসেসর—অর্থাৎ যে চিপে প্রকৃত কোয়ান্টাম গণনা হয়—নিজে হয়তো তুলনামূলক কম শক্তি ব্যবহার করে। কিন্তু এই প্রসেসরকে সচল রাখতে যে সম্পূর্ণ সহায়ক ব্যবস্থা প্রয়োজন হয়—অতি-নিম্ন তাপমাত্রায় শীতলীকরণ, লেজার, মাইক্রোওয়েভ নিয়ন্ত্রণ ইলেকট্রনিক্স, ত্রুটি সংশোধনের হিসাব-নিকাশ, ক্লাসিক্যাল সার্ভার, নেটওয়ার্কিং এবং ডেটা-সেন্টার অবকাঠামো—তা যথেষ্ট বিদ্যুৎ-খেকো হতে পারে। তাই কোয়ান্টাম কম্পিউটিংকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে "সবুজ কম্পিউটিং" বা পরিবেশ বান্ধব কম্পিউটিং ভাবা ঠিক হবে না। এর প্রকৃত টেকসই প্রযুক্তি হয়ে ওঠা নির্ভর করবে বেশ কয়েকটি বিষয়ের ওপর: কোন্‌ ধরনের কোয়ান্টাম প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে, তা কোন্‌ কাজে প্রয়োগ করা হচ্ছে, সহায়ক সিস্টেমগুলো কতটা দক্ষ, এবং কোয়ান্টাম কম্পিউটারকে শুধু সেই সমস্যাগুলোতেই ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, যেখানে সত্যিকারের কোয়ান্টাম সুবিধা আছে। এই ব্যাপারগুলি সুনির্দিষ্ট হতেও সময় লাগবে কোয়ান্টাম কম্পিউটিং কাজ শুরু করার পরেও আরো অনেক বছর।


ইতিহাস থেকে শিক্ষা

মোবাইল ফোনের ইতিহাস এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা কিংবা সতর্কবার্তা আমাদের দেয়। একজন মানুষের হাতে থাকা একটি মোবাইল ফোন নিজে ঘরের ফ্রিজ, এয়ার কন্ডিশনার বা বৈদ্যুতিক গাড়ির তুলনায় খুবই কম বিদ্যুৎ ব্যবহার করে। কিন্তু সেভাবে ভাবলে আমাদের চলবে না। মোবাইল ফোন স্বতন্ত্রভাবে কাজ করে না। এটি পুরো নেটওয়ার্কের সাথে যুক্ত। মোবাইল-ফোন নেটওয়ার্ক শুধু হাতে-ধরা কোটি কোটি যন্ত্র যোগ করেনি—এটি একটি সম্পূর্ণ বৈশ্বিক ডিজিটাল ইকোসিস্টেম তৈরি করেছে। এই ইকোসিস্টেমের মধ্যে রয়েছে সেলুলার বেইজ স্টেশন, ফাইবার নেটওয়ার্ক, রাউটার, ক্লাউড সার্ভিস, স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম, অ্যাপ স্টোর, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থা এবং বিশাল ডেটা সেন্টার।

এর জন্য কী পরিমাণ বিদ্যুৎ লাগে সেই সংখ্যা দেখলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে। ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সির হিসাব অনুযায়ী, ২০২২ সালে ডেটা ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্কগুলো বিদ্যুৎ ব্যবহার করেছে প্রায় ২৬০ থেকে ৩৬০ টেরা-ওয়াট-আওয়ার। যা সারা পৃথিবীর মোট বিদ্যুৎ ব্যবহারের শতকরা প্রায় এক থেকে দেড় শতাংশ। এর মধ্যে মোবাইল নেটওয়ার্কই মোট শক্তি ব্যবহারের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশের জন্য দায়ী [৪]। এর পাশাপাশি,  শুধুমাত্র ২০২৪ সালে পৃথিবীর ডেটা সেন্টারগুলো বিদ্যুৎ ব্যবহার করেছে প্রায় ৪১৫ টেরা-ওয়াট-আওয়ার। এর পরিমাণ আমাদের বাংলাদেশের সারা বছরের বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় দ্বিগুণ। বৈশ্বিক বিদ্যুৎ চাহিদার শতকরা প্রায় দেড় ভাগ ব্যবহার করছে ডেটা সেন্টারগুলি। ২০৩০ সালের মধ্যে এই পরিমাণ দ্বিগুণেরও বেশি হয়ে প্রায় ৯৪৫ টেরা-ওয়াট-আওয়ারে পৌঁছাতে পারে [৫]।

মোবাইল ফোনের বিদ্যুৎ-ব্যবহারের তুলনা কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের ক্ষেত্রে কেন গুরুত্বপূর্ণ? কারণ মোবাইল ফোনের ব্যাপক ব্যবহারকারী হিসেবে একক যন্ত্র থেকে কীভাবে একটি পুরো সিস্টেম কাজ করে তা বুঝতে সুবিধে হবে। স্মার্টফোন আসলে শুধু একটি ফোন নয়—এটি একটি বিশাল ডিজিটাল অবকাঠামোর দৃশ্যমান প্রান্তমাত্র। ঠিক একইভাবে, কোয়ান্টাম কম্পিউটারও শুধু একটি কোয়ান্টাম চিপ নয়—এটি একটি জটিল হাইব্রিড অবকাঠামোর দৃশ্যমান অংশমাত্র। ভবিষ্যতের একটি কোয়ান্টাম ডেটা সেন্টারে একসঙ্গে যুক্ত থাকবে অনেকগুলি সিস্টেম: ক্রায়োজেনিক রেফ্রিজারেটর (যা কোয়ান্টাম কম্পিউটার সিস্টেমকে অতি-নিম্ন তাপমাত্রায় কাজ করতে সহায়তা করবে), লেজার, ভ্যাকুয়াম সিস্টেম, মাইক্রোওয়েভ ইলেকট্রনিক্স, কোয়ান্টাম প্রসেসর, ক্লাসিক্যাল কন্ট্রোল সিস্টেম, রিয়েল-টাইম ত্রুটি-সংশোধন প্রসেসর, স্টোরেজ, নেটওয়ার্কিং এবং প্রচলিত উচ্চ-ক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটিং সিস্টেম – যাদের সমন্বিত বিদ্যুৎ-চাহিদা হবে প্রচুর।

 

বিট বনাম কিউবিট

কোয়ান্টাম কম্পিউটারে শক্তি-ব্যবহারের পরিমাপ বোঝার জন্য আমাদের শুরুতেই জানা দরকার প্রচলিত কম্পিউটার ও কোয়ান্টাম কম্পিউটারের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য কোথায়।

প্রচলিত কম্পিউটারের মূল ইনপুট হলো বাইনারি ডিজিট বা বিট, যেখানে প্রতিটি বিটের মান নির্দিষ্টভাবে হয় ০ অথবা ১। এই কম্পিউটারের শক্তি ব্যবহার মূলত আসে কয়েকটি উৎস থেকে: বিপুল সংখ্যক ট্রানজিস্টরের সুইচিং, প্রসেসর ও মেমোরির মধ্যে তথ্য স্থানান্তর, তথ্য সংরক্ষণ, এবং সিস্টেম থেকে তাপ অপসারণ। আধুনিক উচ্চ-ক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটিং ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় সবচেয়ে বড় বিদ্যুৎ খরচ হয় GPU, CPU, মেমোরি সিস্টেম, নেটওয়ার্কিং যন্ত্রপাতি এবং কুলিং থেকে। এ কারণেই প্রচলিত ডেটা সেন্টার ইতিমধ্যে একটি বড় বিদ্যুৎ-খেকো হিসেবে সমস্যা হয়ে উঠেছে। ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সির তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পৃথিবীর  ডেটা-সেন্টারগুলির বিদ্যুৎ ব্যবহার বছরে প্রায় ১২%হারে বেড়েছে, যা সামগ্রিক বিদ্যুৎ-চাহিদা বৃদ্ধির হারের তুলনায় অনেক বেশি [৫]।

কোয়ান্টাম কম্পিউটার এখানে ভিন্ন পথে চলে, কারণ এরা সাধারণ বিটের বদলে কিউবিট ব্যবহার করে। একটি কিউবিটকে সহজভাবে বোঝার একটি উপায় হলো: প্রচলিত বিট যেখানে যেকোনো এক মুহূর্তে শুধু ০ অথবা ১—এই দুইয়ের একটি মান ধারণ করতে পারে, সেখানে একটি কিউবিট একই সঙ্গে ০ এবং ১-এর একটি মিশ্র অবস্থায় থাকতে পারে, যাকে বলা হয় সুপারপজিশন। এছাড়া একাধিক কিউবিট এমনভাবে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে যে একটির অবস্থা পরিবর্তন হলে অন্যটির অবস্থাও তাৎক্ষণিকভাবে প্রভাবিত হয়—এই ঘটনাকে বলে কোয়ান্টাম এনট্যাঙ্গলমেন্ট। এই দুটি বৈশিষ্ট্য মিলিয়ে কোয়ান্টাম কম্পিউটার অনেকগুলি সম্ভাবনার হিসাব একইসঙ্গে অনুসন্ধান করতে পারে। যেখানে প্রচলিত কম্পিউটারকে সেগুলো একে একে পরীক্ষা করতে হয়।

এই বৈশিষ্ট্যের কারণে, নীতিগতভাবে, কোয়ান্টাম সিমুলেশন, কোয়ান্টাম কেমিস্ট্রি, ম্যাটেরিয়ালস ডিজাইন, ক্রিপ্টোগ্রাফি-সম্পর্কিত অ্যালগরিদম, অপটিমাইজেশন এবং কিছু নির্দিষ্ট স্যাম্পলিং সমস্যায় কোয়ান্টাম কম্পিউটার প্রচলিত কম্পিউটারের তুলনায় অনেক কম ধাপে সমাধান খুঁজে পেতে পারে। ফলে একটি কার্যকর কোয়ান্টাম কম্পিউটার কিছু নির্দিষ্ট সমস্যা অনেক কম বিদ্যুৎ-খরচ করে সমাধান করতে পারে। কিন্তু সেটা সম্পূর্ণ চিত্র নয়।

 

স্বতন্ত্র চিপ নয়, হাইব্রিড মেশিন

আমাদের মনে রাখা দরকার যে বর্তমান সময়ের কোয়ান্টাম কম্পিউটার প্রচলিত কম্পিউটারের সাধারণ বিকল্প নয়। এগুলো মূলত বিশেষায়িত অ্যাকসেলারেটর, যা প্রচলিত কম্পিউটারের সঙ্গে মিলেমিশে কাজ করে। যেমন, আইবিএম এর কোয়ান্টাম সিস্টেম-টু এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে অনেকগুলি কোয়ান্টাম প্রসেসিং ইউনিট একসাথে প্রচলিত ডেটা-সেন্টারের সিস্টেমের সাথে যুক্ত হতে পারে। সেখানে কোয়ান্টাম কম্পিউটারের ক্রায়োজেনিক অবকাঠামো, কনভেনশানাল রানটাইম সার্ভার এবং মড্যুলার কিউবিট-কন্ট্রোল ইলেকট্রনিক্স একসঙ্গে কাজ করে [৬]। অর্থাৎ একটি বাস্তব কোয়ান্টাম কম্পিউটার কেবল একটি চিপ নয়, বরং একটি হাইব্রিড সিস্টেম যেখানে কোয়ান্টাম প্রযুক্তি এবং প্রচলিত প্রযুক্তি একসাথে কাজ করে।

 

হার্ডওয়্যার নির্ভরতা

কোয়ান্টাম কম্পিউটারের শক্তি-ব্যবহারের পরিমাণ ও পদ্ধতি মূলত নির্ভর করে কোন্‌ হার্ডওয়্যার প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করা হচ্ছে তার ওপর—এবং এখানেই সবচেয়ে বেশি ভুল বোঝাবুঝি হয়। ভিন্ন ভিন্ন ধরনের কিউবিট প্রযুক্তির শক্তি-চাহিদাও ভিন্ন ভিন্ন।

সুপারকন্ডাকটিং কিউবিট: আইবিএম ও গুগল কোয়ান্টাম কম্পিউটিং সিস্টেম সুপারকন্ডাকটিং কিউবিট ব্যবহার করে। এগুলোকে সচল রাখতে হয় প্রায় পরম শূন্য তাপমাত্রার (absolute zero) কাছাকাছি তাপমাত্রার পরিবেশে। আইবিএম-এর কোয়ান্টাম প্রসেসরগুলোকে পরম শূন্যের চেয়ে মাত্র দশমিক শূন্য এক ডিগ্রি বেশি তাপমাত্রায় রাখতে হয়, যার জন্য অত্যন্ত জটিল ক্রায়োজেনিক ব্যবস্থা দরকার হয় [৬]।

ট্র্যাপড-আয়ন কিউবিট: এই সিস্টেম চালানোর জন্য দরকার হয় অতি-উচ্চ শক্তির ভ্যাকুয়াম এবং লেজার সিস্টেম।

নিউট্রাল-অ্যাটম কিউবিট: এটিও লেজার ও ভ্যাকুয়াম সিস্টেমের ওপর নির্ভরশীল।

ফোটনিক কিউবিট: এই সিস্টেমের প্রসেসরের জন্য অতি নিম্ন তাপমাত্রার দরকার না হলেও খুবই শক্তিশালী অপটিক্যাল সিস্টেম এবং কিছু কিছু ডিজাইনে ক্রায়োজেনিক ডিটেক্টর দরকার হতে পারে।

সিলিকন স্পিন কিউবিট: প্রচলিত সেমিকন্ডাকটর পদ্ধতির সমন্বিত রূপ হলেও কিউবিট সিস্টেম কার্যকর রাখতে ক্রায়োজেনিক পরিবেশ দরকার হয়।

হার্ডওয়্যার বৈচিত্র্যের কারণে, নির্দিষ্ট প্রযুক্তি উল্লেখ না করে সার্বিকভাবে কোয়ান্টাম কম্পিউটারের বিদ্যুৎ চাহিদার ব্যাপারে অনুমান বিভ্রান্তিকর হতে পারে—কারণ একেক প্রযুক্তির শক্তি-চাহিদার ধরন সম্পূর্ণ আলাদা। তবে প্রত্যেক কোয়ান্টাম সিস্টেমেই আনুষঙ্গিক হার্ডওয়্যারের জন্য যে বিদ্যুৎ চাহিদা – তার পরিমাণ প্রচলিত কম্পিউটিং সিস্টেমের চেয়ে বেশি বই কম নয়।

 

যন্ত্রনির্ভর নয়, ফলাফল নির্ভর

প্রচলিত কম্পিউটার ও কোয়ান্টাম কম্পিউটারের সরাসরি তুলনা করা কঠিন, কারণ এদের বিদ্যুৎ-খরচের মাত্রা যন্ত্রভেদে ভিন্ন ভিন্ন হয়। একটি ল্যাপটপ কম্পিউটার কয়েক ওয়াটেই চলতে পারে। একটি ডেস্কটপ কম্পিউটারের লাগে কয়েক শ ওয়াট। একটি সার্ভার কয়েক কিলোওয়াট, আর একটি শীর্ষস্থানীয় সুপারকম্পিউটার বহু মেগাওয়াট বিদ্যুৎশক্তি ব্যবহার করতে পারে। তাই প্রতিটি কম্পিউটারে কত ওয়াট বিদ্যুৎ লাগে – এই প্রশ্ন খুব একটা অর্থবহ নয়। প্রশ্ন হওয়া উচিত প্রতিটি কার্যকর ফলাফল পেতে মোট কত বিদ্যুৎ শক্তি খরচ হচ্ছে। একটি ছোট, ত্রুটিপূর্ণ (noisy) কোয়ান্টাম কম্পিউটার হয়তো একটি সুপারকম্পিউটারের চেয়ে অনেক কম বিদ্যুৎ ব্যবহার করে, কিন্তু যদি সেটি কোনো বাস্তব-উপযোগী সমস্যা সঠিকভাবে সমাধান করতেই না পারে, তাহলে তার প্রকৃত শক্তি-দক্ষতা আসলে দুর্বল। কারণ তার কাছ থেকে কোনো ব্যবহারযোগ্য ফলাফলই পাওয়া যাচ্ছে না। বিপরীতে, একটি বড় ও নির্ভরযোগ্য কোয়ান্টাম কম্পিউটার একবারে যথেষ্ট বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার করলেও, যদি সেটি এমন একটি সমস্যা মাত্র কয়েক ঘণ্টায় সমাধান করতে পারে যা একটি  সুপারকম্পিউটারের বছরের পর বছর সময় লাগত, তাহলে কোয়ান্টাম কম্পিউটারের প্রতিটি সমাধানে ব্যবহৃত মোট শক্তি তুলনামূলকভাবে প্রচলিত কম্পিউটারের চেয়ে অনেক কম।

এই পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, এবং এখানেই মোবাইল-ফোনের উদাহরণটি আবার প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। মোবাইল-ফোন যুগে মানুষের হাতে থাকা যন্ত্রটি বিদ্যুৎ ব্যবহারের প্রধান কারণ নয়। বরং নেটওয়ার্ক ও ক্লাউড অবকাঠামোই হলো বিদ্যুৎ চাহিদার আসল বিষয়। একইভাবে, কোয়ান্টাম-কম্পিউটিং যুগেও কিউবিট-চিপ হয়তো বিদ্যুৎ ব্যবহারের প্রধান উৎস হবে না; বরং শীতলীকরণ, নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, ত্রুটি সংশোধন এবং ক্লাসিক্যাল সহায়ক অবকাঠামোই প্রধান ভূমিকা নিতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, বড় আকারের কোয়ান্টাম কম্পিউটিং সিস্টেমে কুলিং-সহ কোয়ান্টাম ডেটা-সেন্টারের মোট বিদ্যুৎ শক্তির ব্যবহারের পরিমাণ এতই বেশি হতে পারে যে এটি  একটি বড় উদ্বেগে পরিণত হতে পারে। গবেষণায় আরও দেখা যায় যে কোয়ান্টাম কম্পিউটিং সিস্টেমে  যন্ত্রপাতি ঠান্ডা রাখতে যে বিদ্যুৎ শক্তির দরকার হবে তা সরাসরি কম্পিউটিং-এর জন্য প্রয়োজনীয় শক্তির তুলনায় অনেক বেশি হতে পারে [৭]।

 

বিদ্যুৎখেকো ত্রুটি সংশোধন

কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের একটি প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো কোয়ান্টাম এরর কারেকশান বা ত্রুটি সংশোধন। কিউবিট অত্যন্ত স্পর্শকাতর। তাপমাত্রার পরিবর্তন, তড়িৎচুম্বক তরঙ্গের পরিবর্তন, মহাজাগতিক রশ্মির প্রভাব, কোয়ান্টাম স্টেটের সামান্য বিচ্যুতি কিংবা পরিবেশের সঙ্গে অনাকাঙ্ক্ষিত মৃদু মিথস্ক্রিয়ার কারণেও কিউবিট সহজেই বিঘ্নিত হতে পারে। এই বিঘ্ন ঠেকানো না গেলে কোনো অবস্থাতেই নির্ভুল ফলাফল পাওয়া সম্ভব নয়। এই বিঘ্ন ঠেকাতে ক্রমাগত পরিমাপ, সংশোধন ও হিসেব করার প্রয়োজন হয়। ফলে ফলাফল পাওয়ার আগেই অনেক শক্তির ক্ষয় হয়। এবং ক্রমাগত বিদ্যুৎ শক্তির জোগান দিতে হয়। গুগল-এর উইলো চিপ এক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখিয়েছে। সিস্টেমের আকার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ত্রুটির হার উল্লেখযোগ্য হারে কমানো সম্ভব হয়েছে এই চিপে। তবে গুগল নিজেও জোর দিয়ে বলেছে, শুধু কিউবিটের সংখ্যা বাড়ানো নয়, বরং প্রতিটি কিউবিটের গুণগত মান উন্নত করাই কোয়ান্টাম কম্পিউটিং-এ বেশি গুরুত্বপূর্ণ [৮]। এর কারণ হলো, ভবিষ্যতে একটি সম্পূর্ণ নির্ভরযোগ্য (fault-tolerant) কোয়ান্টাম কম্পিউটার তৈরি করতে একটি একক নির্ভরযোগ্য "লজিক্যাল কিউবিট" তৈরির জন্যও অনেকগুলো প্রকৃত ("ফিজিক্যাল") কিউবিট প্রয়োজন হতে পারে। ফলে শুধু কিউবিটের সংখ্যাই নয়, তার সঙ্গে পরিমাপ, কন্ট্রোল পালস, ক্লাসিক্যাল ডিকোডিং অপারেশন এবং কুলিং-চাহিদাও একসঙ্গে বেড়ে যায়। এর জন্য শক্তির চাহিদাও বেড়ে যায়।

 

বিদ্যুৎ সাশ্রয় কি সম্ভব?

কোয়ান্টাম কম্পিউটিং সিস্টেম কি বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী হতে পারে? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার জন্য অনেক ধরনের গবেষণা করা হচ্ছে। সাম্প্রতিক কিছু  গবেষণার ফলাফল ইঙ্গিত দেয় যে নির্দিষ্ট কিছু সমস্যায় কোয়ান্টাম কম্পিউটার বিদ্যুৎ-সাশ্রয়ী হতে পারে। তবে এটি সব ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আসে না। বিজ্ঞানী মেইয়ার ও ইয়ামাসাকি প্রচলিত কম্পিউটিং এবং কোয়ান্টাম কম্পিউটিং-এর বিদ্যুৎ-শক্তি ব্যবহারের তুলনা করার জন্য একটি তাত্ত্বিক কাঠামো তৈরি করেছেন। তারা সাইমনস প্রোবলেম নামের একটি সুপরিচিত কোয়ান্টাম-কমপ্লেক্সিটি সমস্যার সমাধানে দেখিয়েছেন যে কোয়ান্টাম কম্পিউটিং সেখানে নাটকীয় হারে বিদ্যুৎ-শক্তি সাশ্রয় করতে পারে [৯]। অন্যদিকে অন্য গবেষণায় দেখা যাচ্ছে যে কোয়ান্টাম কম্পিউটিং-এ বিদ্যুৎ সাশ্রয় মূলত নির্ভর করে কোয়ান্টাম গেট এর বিশুদ্ধতা এবং কিউবিটের কোয়ান্টাম এনট্যাঙ্গলমেন্টের মাত্রার ওপর। বর্তমান প্রজন্মের কিছু ত্রুটিপূর্ণ (noisy) কোয়ান্টাম কম্পিউটিং সিস্টেম এবং মাঝারি মাত্রার এনট্যাঙ্গলমেন্ট-যুক্ত সমস্যার সমাধানের জন্য প্রচলিত টেনসর-নেটওয়ার্ক সিমুলেশন কম্পিউটার  প্রকৃত কোয়ান্টাম হার্ডওয়্যারের চেয়ে বেশি বিদ্যুৎ-সাশ্রয়ী হতে পারে [১০]। সুতরাং দেখা যাচ্ছে কোয়ান্টাম কম্পিউটিং-এ বিদ্যুৎ-সাশ্রয় নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষ, সর্বজনীন নয়।

তবে কি ভবিষ্যতে কোয়ান্টাম কম্পিউটিং ডেটা সেন্টার বিদ্যুৎ-চাহিদার ওপর বাড়তি চাপ প্রয়োগ করবে? অদূর ভবিষ্যতে, সামগ্রিকভাবে সম্ভবত করবে না। কারণ বর্তমানে প্রচলিত কম্পিউটিং এবং এআই ডেটা সেন্টার ইতিমধ্যেই বৈশ্বিক স্কেলে কাজ করছে, আর কোয়ান্টাম ডেটা সেন্টার এখনো সীমাবদ্ধ এবং তুলনামূলকভাবে বিরল। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে উত্তরটি নির্ভর করবে কীভাবে এই কোয়ান্টাম প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে তার ওপর। যদি কোয়ান্টাম কম্পিউটার শুধু বেছে নেওয়া উচ্চ-মূল্যের সমস্যায় ব্যবহৃত হয়—যেমন ড্রাগ ডিসকভারি, ম্যাটেরিয়ালস ডিজাইন, কোয়ান্টাম কেমিস্ট্রি, নিউক্লিয়ার ফিজিক্স, লজিস্টিকস, ক্রিপ্টোগ্রাফি এবং জলবায়ু মডেলিং—তাহলে প্রতি সমাধানে গড় শক্তি-ব্যবহার আসলে কমতে পারে। কিন্তু যদি কোয়ান্টাম ডেটা সেন্টার বড় মাত্রার ক্রায়োজেনিক ওভারহেড, দুর্বল ব্যবহারের হার (utilisation) এবং অতিরিক্ত ত্রুটি-সংশোধন বোঝা নিয়ে অদক্ষভাবে বিস্তৃত হতে থাকে, তাহলে এগুলো উল্লেখযোগ্যভাবে নতুন বিদ্যুৎ-চাহিদা তৈরি করতে পারে।

প্রি-মোবাইল ও পোস্ট-মোবাইল যুগের উদাহরণ আমাদের হাতে আছে। এই মোবাইল প্রযুক্তির যুগে মোবাইল ফোন শুধু কোটি কোটি যন্ত্র চার্জ করার বিদ্যুৎ যোগ করেনি—এটি তৈরি করেছে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ, ক্লাউড স্টোরেজ, ভিডিও স্ট্রিমিং, ডিজিটাল পেমেন্ট, লোকেশন সার্ভিস এবং AI-চালিত অ্যাপ্লিকেশনের একটি সম্পূর্ণ জগৎ।  এই জগতে বিদ্যুৎ-চাহিদা বেড়ে গেছে জ্যামিতিক হারে। একইভাবে, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং হয়তো শুধু কোয়ান্টাম প্রসেসর চালানোর বিদ্যুৎ যোগ করবে না—এটি বিশেষায়িত ডেটা-সেন্টার অবকাঠামোর একটি সম্পূর্ণ নতুন স্তর তৈরি করবে। সেই অবকাঠামো শেষ পর্যন্ত টেকসই হবে কি না, তা নির্ভর করবে সেই প্রযুক্তি কীভাবে ব্যবহার করা হবে তার ওপর।


টেকসই কোয়ান্টাম কম্পিউটিং-এর পাঁচটি অগ্রাধিকার

সঠিক দক্ষতার সাথে কোয়ান্টাম কম্পিউটিং ব্যবহৃত না হলে পুরো সিস্টেমটাই হয়ে উঠতে পারে ভীষণ রকমের বিদ্যুৎ চাহিদাসম্পন্ন। তাই কোয়ান্টাম কম্পিউটিং সার্বিকভাবে শুরু হবার শুরু থেকেই এর বিদ্যুৎ-সাশ্রয়ী হয়ে ওঠার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। এজন্য কোয়ান্টাম কম্পিউটিং-এর পাঁচটি মূল অগ্রাধিকারের কথা বলা হচ্ছে।

১. শক্তি-দক্ষতাকে মূল মাপকাঠি করা: কোয়ান্টাম হার্ডওয়্যার ডিজাইনে শক্তি-দক্ষতাকে একটি প্রধান বিচার্য বিষয় হিসেবে নিতে হবে। কোয়ান্টাম কম্পিউটিং-এ শুধু কিউবিট-সংখ্যা এবং গেট-ফিডেলিটি নয়, বরং প্রতি লজিক্যাল অপারেশনে কত জুল শক্তি খরচ হচ্ছে, প্রতি অ্যালগরিদমে কত জুল, প্রতি কিউবিটে কুলিং-এর জন্য কত শক্তি, এবং প্রতি কার্যকর ফলাফলে কত শক্তি—এসবও পরিমাপ করা উচিত। প্রকৃত বিবেচ্য বিষয় হওয়া উচিত একটি সঠিক ও কার্যকর উত্তর পেতে সম্পূর্ণ কোয়ান্টাম সিস্টেম মোট কত শক্তি ব্যবহার করছে।

২. ক্রায়োজেনিক দক্ষতা উন্নত করা: সুপারকন্ডাক্টিং ও অনেক স্পিন-কিউবিট সিস্টেমের ক্ষেত্রে কুলিং-এই সবচেয়ে বেশি শক্তি খরচ হয়। উন্নত ক্রায়োস্ট্যাট, ভালো তাপীয় প্যাকেজিং, তাপ-নিঃসরণ কমানো, ক্রায়োজেনিক মাল্টিপ্লেক্সিং এবং কন্ট্রোল ইলেকট্রনিক্স—এর প্রযুক্তির উন্নয়নে নিম্ন-তাপমাত্রার তাপীয় লোড কমানোর দিকে নজর দিতে হবে। কারণ তাপমাত্রা কমাতে যে বিদ্যুৎ খরচ হবে তা মূল কম্পিউটিং-এর খরচের চেয়ে বেশি।

৩. ত্রুটি সংশোধন পদ্ধতি আরও দক্ষ করা: যদি প্রতিটি লজিক্যাল কিউবিটের জন্য হাজার হাজার ফিজিক্যাল কিউবিট প্রয়োজন হয়, তাহলে বড় আকারের যন্ত্রের শক্তি-চাহিদা দ্রুত বেড়ে যাবে। উন্নত কিউবিট ফিডেলিটি, ভালো ত্রুটি-সংশোধনকারী কোড, দ্রুততর পরিমাপ, কার্যকর ডিকোডিং অ্যালগরিদম এবং কম-শক্তি-খরচের কন্ট্রোল ইলেকট্রনিক্স— এসব অর্জিত হলে কোয়ান্টাম কম্পিউটিং-এর বিদ্যুৎ-চাহিদা কমবে।

৪. কোয়ান্টাম কম্পিউটার নির্বাচিতভাবে ব্যবহার করা: যে কাজ প্রচলিত কম্পিউটার অধিক দক্ষতার সঙ্গে করতে পারে, সেই কাজে কোয়ান্টাম প্রসেসর ব্যবহার করা উচিত নয়। এই অর্থে কোয়ান্টাম কম্পিউটারকে ক্লাসিক্যাল ডেটা সেন্টারের সর্বজনীন বিকল্প হিসেবে না দেখে, বরং একটি বিশেষায়িত অ্যাকসেলারেটর হিসেবে দেখাই যুক্তিসঙ্গত।

৫. সঠিক বিদ্যুৎ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা: AI ও ক্লাউড ডেটা সেন্টারের জন্য এখন যেসব প্রযুক্তি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে—নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ সংগ্রহ, শক্তি সংরক্ষণ, গ্রিড-সচেতন সময়সূচি, দক্ষ কুলিং, স্বচ্ছ প্রতিবেদন এবং উন্নত পাওয়ার-ইউসেজ-এফেক্টিভনেস—এসব কৌশল কোয়ান্টাম কম্পিউটিং-এর ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য হওয়া উচিত। যেহেতু ২০৩০ সালের মধ্যে ডেটা-সেন্টারের  বিদ্যুৎ-চাহিদা দ্রুত বেড়ে যাবে, তাই ভবিষ্যতের কোয়ান্টাম সিস্টেম এমন জায়গায় পরিকল্পনা করা উচিত, যেখানে পরিচ্ছন্ন বিদ্যুৎ, কুলিং অবকাঠামো এবং গ্রিড-ক্ষমতা সহজলভ্য [৫]।

এসবের পাশাপাশি প্রয়োজন কোয়ান্টাম কম্পিউটিং সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা। সাধারণ আলোচনায় শুধু কোয়ান্টাম চিপের সঙ্গে সুপারকম্পিউটারের তুলনা করা হয়। কিন্তু কোয়ান্টাম কম্পিউটিং-এর রেফ্রিজারেশন, কন্ট্রোল ইলেকট্রনিক্স, ক্যালিব্রেশন, ক্লাসিক্যাল প্রি-প্রসেসিং এবং পোস্ট-প্রসেসিং-এর শক্তি-ব্যয় বাদ পড়ে যায়। সঠিক তুলনার জন্য সম্পূর্ণ সিস্টেম ও সম্পূর্ণ কাজ—দুটোই বিবেচনায় নিতে হবে। কোয়ান্টাম কম্পিউটিং সত্যিকারের শক্তি-সাশ্রয়ী তখনই হবে, যখন এর অ্যালগরিদমিক সুবিধা এর প্রকৃত ও অবকাঠামোগত বাড়তি খরচকে ছাড়িয়ে যেতে পারবে।

কোয়ান্টাম কম্পিউটার নির্বাচিত কিছু সমস্যায় প্রচলিত কম্পিউটারের তুলনায় অনেক কম ধাপ ব্যবহার করে বিদ্যুৎ-শক্তির চাহিদা কমানোর সম্ভাবনা রাখে। এর ফলে ভবিষ্যতে নির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক, শিল্প এবং ক্রিপ্টোগ্রাফিক কাজের ক্ষেত্রে এগুলো ক্লাসিক্যাল সুপারকম্পিউটারের তুলনায় অনেক বেশি শক্তি-দক্ষ হয়ে উঠতে পারে। তবে এই সুবিধা স্বয়ংক্রিয় নয়। কোয়ান্টাম কম্পিউটিং আরও টেকসই একটি কম্পিউটিং ভবিষ্যতের অংশ হতে পারে তখনই, যখন শুরু থেকেই প্রযুক্তির নকশায় বিদ্যুৎ-সাশ্রয়কে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। উন্নত কিউবিট, কম কুলিং-ওভারহেড, দক্ষ ত্রুটি সংশোধন, কোয়ান্টাম প্রসেসরের নির্বাচিত ব্যবহার, এবং ভবিষ্যতের কোয়ান্টাম ডেটা সেন্টারের জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে কোয়ান্টাম কম্পিউটিং সিস্টেম বিদ্যুৎ-সাশ্রয়ী হতে পারে। কিন্তু এর অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার পুরো সিস্টেমকে করে ফেলতে পারে ভীষণ বিদ্যুৎখেকো – যার জোগান দিতে গিয়ে উন্নয়নশীল দেশগুলি হিমশিম খাবে।

 

তথ্যসূত্র

[১] Statista, "Global electricity consumption 1980–2024," 2026. [Online]. Available: https://www.statista.com/topics/6462/global-electricity/

[২] Worldmapper, "Mobile subscriptions 1990," 1990 data summary. [Online]. Available: https://worldmapper.org/maps/mobile-subscription-1990/

[৩] International Telecommunication Union, "Facts and Figures 2024: Subscriptions," 2024. [Online]. Available: https://www.itu.int/itu-d/reports/statistics/2024/11/10/ff24-subscriptions/

[৪] International Energy Agency, "Data centres and data transmission networks," 2023. [Online]. Available: https://www.iea.org/energy-system/buildings/data-centres-and-data-transmission-networks

[৫] International Energy Agency, "Energy demand from AI," 2025. [Online]. Available: https://www.iea.org/reports/energy-and-ai/energy-demand-from-ai

[৬] IBM, "IBM Quantum Computing: Hardware and roadmap," 2026. [Online]. Available: https://www.ibm.com/quantum/hardware

[৭] M. J. Martin, C. Hughes, G. Moreno, E. B. Jones, D. Sickinger, S. Narumanchi, and R. Grout, "Energy use in quantum data centers: Scaling the impact of computer architecture, qubit performance, size, and thermal parameters," *IEEE Transactions on Sustainable Computing*, vol. 7, no. 4, pp. 864–874, 2022. [Online]. Available: https://arxiv.org/abs/2103.16726

[৮] Google Quantum AI, "Meet Willow, our state-of-the-art quantum chip," 2024. [Online]. Available: https://blog.google/technology/research/google-willow-quantum-chip/

[৯] F. Meier and H. Yamasaki, "Energy-consumption advantage of quantum computation," *PRX Energy*, 2025. [Online]. Available: https://arxiv.org/abs/2305.11212

[১০] D. Jaschke and S. Montangero, "Is quantum computing green? An estimate for an energy-efficiency quantum advantage," *arXiv preprint*, arXiv:2205.12092, 2022. [Online]. Available: https://arxiv.org/abs/2205.12092

-----------------------

বিজ্ঞানচিন্তা জুলাই ২০২৬ সংখ্যায় প্রকাশিত









No comments:

Post a Comment

Latest Post

Quantum Computers: Energy-Efficient or Power-Hungry?

  Only forty years ago, the number of mobile-phone users in the world was tiny. Consider the 1980s. Mobile phones were not yet part of peopl...

Popular Posts