Tuesday, 12 May 2026

প্রিয় ফাইনম্যান ২০২৬


 

এই বালকটির জন্ম ১৯১৮ সালের ১১ মে নিউইয়র্ক শহরে। ছবিটি তার আট-নয় বছর বয়সে তোলা। সেদিন কেউ কি ভাবতে পেরেছিল এই অশ্বারোহী বালক একদিন পদার্থবিজ্ঞান শৃঙ্গের শীর্ষে আরোহন করবেন!! 

পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার পেয়ে বিশ্ববিখ্যাত হয়েছেন যাঁরা, তাঁরা সবাই যে তাঁদের বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার বা উদ্ভাবনের তত্ত্ব এবং তথ্য সহজভাবে সবার জন্য ব্যাখ্যা করতে পারেন তা কিন্তু নয়। তাঁরা সবাই যে খুব ভালো শিক্ষক – সেটাও বলা যায় না। বিজ্ঞানী হতে গেলে কোনো বিষয় গভীরভাবে বোঝার ক্ষমতা থাকতে হয়। কিন্তু নিজে বুঝলেই যে অন্যকে বোঝানো যাবে – তা কিন্তু নয়। ভালো শিক্ষক হতে গেলে অন্যকে বোঝানোর বিশেষ ক্ষমতা থাকতে হয়। শিক্ষকতা, বিশেষ করে বিজ্ঞান বিষয়ের শিক্ষকতার জন্য দরকার হয় বিশেষ শৈল্পিক দক্ষতা। যার মাধ্যমে কোনো ধরনের তত্ত্ব বা তথ্যের বিকৃতি না ঘটিয়েই জটিল জিনিসকে সহজভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। এই বিশেষ দক্ষতা সবার থাকে না। 

আলবার্ট আইনস্টাইনের ক্লাস করার সুযোগ যাঁরা পেয়েছেন তাঁদের কারোরই মনে হয়নি যে আইনস্টাইন খুব ভালো পড়াতেন। কেমব্রিজে আইজাক নিউটনের ক্লাসগুলি ছিল ভীষণ বিরক্তিকর। ছাত্রদের বেশিরভাগই তাঁর ক্লাসে উপস্থিত থাকতো না। প্রফেসর পল ডিরাকের ক্লাস ছিল আরো রোবটিক। ক্লাসে তিনি তাঁর নিজের লেখা কোয়ান্টাম মেকানিক্সের বই থেকে হুবহু ব্ল্যাকবোর্ডে লিখতে থাকতেন। বইয়ের বাইরে একটি শব্দও উচ্চারণ করতেন না। 

আবার বিজ্ঞান অত্যন্ত সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেন যাঁরা – তাঁরা শিক্ষক হিসেবে অত্যন্ত জনপ্রিয় হলেও – তাঁদের অনেকেরই নিজস্ব কোনো আবিষ্কার বা উদ্ভাবন নেই। তাই একই ব্যক্তি বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানী এবং শিক্ষক হিসেবেও অনন্য – এরকম উদাহরণ খুব বেশি নেই। কিন্তু একেবারেই যে নেই – তাও নয়। অতি দুর্লভ যে ক’টি উদাহরণ পদার্থবিজ্ঞানে আছে – তাঁদের শুরুতেই আসবে রিচার্ড ফাইনম্যানের নাম। ক্যালটেকে তিনি পদার্থবিজ্ঞানের স্নাতক ১ম ও ২য় বর্ষের ছাত্রদের যে ক্লাসগুলি নিয়েছিলেন সেগুলি থেকেই সৃষ্টি হয়েছে পদার্থবিজ্ঞানের অমর টেক্সটবুক – ফাইনম্যান লেকচারস অব ফিজিক্স। 

পদার্থবিজ্ঞানের এই রকস্টার বিজ্ঞানীর হাত দিয়ে আবিষ্কৃত হয়েছে – কোয়ান্টাম ইলেকট্রোডায়নানিক্স। আবার তাঁর উদ্ভাবিত ফাইনম্যান ডায়াগ্রাম দিয়ে সাব-অ্যাটমিক মিথষ্ক্রিয়ার জটিল পদ্ধতি যত সহজভাবে বোঝা যায় – এখনো পর্যন্ত অন্য কোনো পদ্ধতিতে এত সম্পূর্ণভাবে বোঝা যায় না। এই বিশ্ববিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী শিক্ষক হিসেবেও ছিলেন অত্যন্ত জনপ্রিয়। বিজ্ঞানকে নিজের মতো করে বোঝা এবং বোঝানোর অদ্ভুত ক্ষমতা ছিল তাঁর। 

পৃথিবীর অনেক দেশেই বিজ্ঞান পড়া এবং পড়ানোর মধ্যে যে বোঝার ঘাটতি রয়ে যায় – তা তিনি অনুধাবন করেছিলেন ব্রাজিল সফরে গিয়ে। তিনি দেখেছিলেন সেই দেশে হাজার হাজার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থী পদার্থবিজ্ঞান পড়ে – কিন্তু সেই তুলনায় কোনো পদার্থবিজ্ঞানী তৈরি হয় না সেইসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে। তিনি যদি কোনোভাবে আমাদের বাংলাদেশে যেতেন – তাহলেও একই ধরনের চিত্র দেখতে পেতেন। 

ফাইনম্যান আন্তরিকভাবেই চাইতেন বিজ্ঞান শিক্ষা যেন আনন্দময় হয়। সত্যিকারের শিক্ষালাভের জন্য শিক্ষার্থীদের তিনি বলতেন, “প্রচলিত নীরস পাঠ্যবই দেখে হতাশ হয়ো না। মাঝে মাঝে বইটি বন্ধ করে দাও। তারপর বইতে যা লেখা আছে তা নিজের ভাষায়, নিজের ভাবনায় বোঝার চেষ্টা করো। বই তোমাকে তথ্য দেয়, কিন্তু তোমার কল্পনা তাতে প্রাণ সঞ্চার করতে পারে।“

১১ মে রিচার্ড ফাইনম্যানের জন্মদিন।

শুভ জন্মদিন প্রিয় বিজ্ঞানী, প্রিয় শিক্ষক!!

No comments:

Post a Comment

Latest Post

প্রিয় ফাইনম্যান ২০২৬

  এই বালকটির জন্ম ১৯১৮ সালের ১১ মে নিউইয়র্ক শহরে। ছবিটি তার আট-নয় বছর বয়সে তোলা। সেদিন কেউ কি ভাবতে পেরেছিল এই অশ্বারোহী বালক একদিন পদার্থবি...

Popular Posts