Friday, 27 March 2026

রন্টজেনের জন্মদিনে

 

আমাদের সময়ের স্কুলের বিজ্ঞান বইতে এক্সরেকে বলা হতো  রঞ্জন রশ্মি। এক্স রশ্মি যিনি আবিষ্কার করেছিলেন – তাঁর নাম ‘রঞ্জন’ বলেই জানতাম আমরা। জার্মান উচ্চারণে যা ‘রন্টগেন’ – আক্ষরিক ইংরেজি অনুবাদে তা হয়ে উঠেছে রন্টজেন। পৃথিবীতে প্রতি বছর শুধুমাত্র রোগনির্ণয়ের জন্যই এক্স-রে করা হয় চারশ কোটির বেশি। চিকিৎসায় ব্যবহৃত সিটি-স্ক্যান, ফ্লুরোস্কোপি, ইন্টারভেনশনাল রেডিওলজি, রেডিওথেরাপি ইত্যাদি হিসেবে ধরলে বছরে এক্স-রের সংখ্যা দাঁড়াবে ছয় শ কোটিরও বেশি।

এর বাইরে এক্স-রের অন্যান্য ব্যবহারগুলি যদি ধরি – প্রত্যেকটি এয়ারপোর্টে নিরাপত্তা চেকিং, সীমান্তের চেকিং, বিভিন্ন কলকারখানায় ব্যবহৃত এক্স-রে ইত্যাদি সব ধরলে বছরে প্রায় পনের শ কোটির বেশি এক্স-রে করা হয়। সেই ১৮৯৫ সালের নভেম্বরে রন্টজেন এক্স-রে আবিষ্কারের ঘোষণা দেয়ার পর থেকেই এক্স-রের ব্যবহার দিনদিন বেড়েই চলেছে।

রন্টজেন যদি এক্স-রে আবিষ্কারের প্যাটেন্ট নিতেন – তিনি কিংবা তাঁর কোম্পানি যে কী পরিমাণ ধনসম্পদের মালিক হয়ে যেতেন তা বলাই বাহুল্য। রন্টজেনকে অনেকেই বলেছিলেন এক্স-রে আবিষ্কারের প্যাটেন্ট নিতে। কিন্তু তিনি তাতে সাড়া দেননি। তিনি বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার নিয়ে ব্যবসা করতে রাজি হননি।

এক্স-রে’র আবিষ্কারক প্রফেসর উইলহেলম রন্টজেন এতটাই মাটির মানুষ ছিলেন যে – তিনি কখনোই চাননি যে তাঁর নাম কেউ জানুক। সবাই যখন প্রস্তাব করেছিল তাঁর আবিষ্কারের নাম তাঁর নামেই রাখা হোক – তিন রাজি হননি। আমেরিকানরা যদিও এক্স-রেকে ‘রন্টজেন রে’ বলেন মাঝে মাঝে, কিন্তু রণ্টজেনের দেয়া ‘এক্স-রে’ নামটিই রয়ে গেছে সবখানে।

এক্স-রে আবিষ্কার নিয়ে শুধুমাত্র একবার বৈজ্ঞানিক বক্তৃতা দিয়েছিলেন রন্টজেন। এরপর শত অনুরোধেও তাঁকে রাজি করানো যায়নি আর কোনো বৈজ্ঞানিক বক্তৃতায়। এক্স-রে আবিষ্কারের উপর গবেষণাপত্রও তিনি প্রকাশ করেছেন মাত্র একটি-ই। কিন্তু তাঁর আবিষ্কারের প্রভাব এতটাই বেশি যে প্রথম নোবেল পুরষ্কার তাঁর হাতে তুলে দিতে খুব বেশি ভাবতে হয়নি নোবেল কমিটিকে।

১৮৪৫ সালের ২৭ মার্চ জার্মানির লেনেপ শহরে তাঁর জন্ম। ছোটবেলা কেটেছে নেদারল্যান্ডে। ইউট্রেক্‌ট টেকনিক্যাল স্কুলে পড়াশোনা করেছিলেন, কিন্তু ফাইনাল পরীক্ষায় পাস করতে পারেননি। সার্টিফিকেট ছাড়াই তাঁকে স্কুল ত্যাগ করতে হয়েছিল। এরপর জুরিখের পলিটেকনিক্যালে  ভর্তি হয়েছিলেন। লেখাপড়া তিনি করেছেন নিজের মতোই। আহামরি কোনো ভালো রেজাল্ট তিনি কোনদিনই করেননি। চুপচাপ নিজের মতো নিখুঁত কাজ করতে ্পছন্দ করতেন তিনি। নিজের স্ত্রী বার্থা ছাড়া তেমন কোনো বন্ধুও ছিল না তাঁর। ১৯১৯ সালে বার্থার মৃত্যুর পর একেবারে একা হয়ে পড়েন তিনি।  প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানিতে মারাত্মক মুদ্রাস্ফিতি হয়। সেই সময় প্রায় নিঃস্ব হয়ে পড়েন তিনি। এক্স-রের প্যাটেন্ট নিলে যিনি হতে পারতেন পৃথিবীর সেরা ধনীদের একজন, তাঁকেই জীবনের শেষের দিকে পড়তে হয়েছে নিদারুণ অর্থকষ্টে। ১৯২৩ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি তাঁর মৃত্যু হয়।

ভীষণ নিভৃতচারী এই বিজ্ঞানী বিখ্যাত হতে চাননি কোনদিন। তাই বিখ্যাত হয়ে যাবার পর খ্যাতির বিড়ম্বনা থেকে বাঁচার জন্য আরো নিভৃতচারী হয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর সমস্ত গবেষণা তাঁর মৃত্যুর পর পুড়িয়ে ফেলার ব্যবস্থা করে গিয়েছিলেন তিনি।

আমি এক্স-রে নিয়ে সরাসরি পড়াশোনা করছি গত আঠারো বছর ধরে। প্রতিদিন অনুভব করছি কী গভীরভাবেই না আমরা রন্টজেনের কাছে ঋণী। 

No comments:

Post a Comment

Latest Post

Beyond the Rankings: What Makes a City Truly Liveable

  Before my day had even begun, I received a message from a friend. Attached to it was a Prothom Alo photo card proclaiming: “Three of the ...

Popular Posts