নোবেল পুরষ্কারের ইতিহাসে বিশেষ সম্মানের স্থানে অধিষ্ঠিত আছে ফ্রান্সের কুরি পরিবার। কারণ এই পরিবারের পাঁচজন সদস্য ছয়টি নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন। মেরি কুরিকে সারাপৃথিবী চেনে নোবেলজয়ী প্রথম নারী হিসেবে। মেরি কুরি এখনো পর্যন্ত একমাত্র নারী যিনি দুবার নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন – ১৯০৩ সালে পদার্থবিজ্ঞানে এবং ১৯১১ সালে রসায়নে। রেডিওঅ্যাকটিভিটি বা তেজস্ক্রিয়তা আবিষ্কার এবং গবেষণার জন্য ১৯০৩ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন হেনরি
বেকোয়ারেল, পিয়ের কুরি এবং মেরি কুরি। তেজস্ক্রিয় রেডিয়াম এবং পোলোনিয়াম আবিষ্কারের জন্য মেরি কুরিকে রসায়নে নোবেল পুরষ্কার দেয়া হয়েছে ১৯১১ সালে। পিয়ের কুরি যদি সেইসময় বেঁচে থাকতেন, তিনিও আরেকটি নোবেল পুরষ্কার পেতেন – কারণ রেডিয়াম ও পোলোনিয়াম আবিষ্কারের জন্য মেরি কুরির সাথে তিনিও অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন দিনের পর দিন। পিয়ের ও মেরি কুরির প্রথম সন্তান আইরিন কুরি এবং তাঁর স্বামী ফ্রেদেরিক জুলিও-কুরি রসায়নে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন ১৯৩৫ সালে। জীবদ্দশায় পিয়ের কুরি মেরি কুরির চেয়েও বেশি উজ্জ্বল ছিলেন পদার্থবিজ্ঞানী হিসেবে। মেরি কুরির সাথে পরিচয়ের অনেক আগেই তিনি আবিষ্কার করেছেন ক্রিস্টালের পাইজোইলেকট্রিক ধর্ম। আবিষ্কার করেছেন চৌম্বকপদার্থে তাপমাত্রার প্রভাব।ডাক্তার ইউজিন কুরি ও মিসেস সোফিয়েক্লেরা দেপাউলির দ্বিতীয় সন্তান পিয়ের কুরির জন্ম প্যারিসে ১৮৫৯ সালের ১৫ই মে। পিয়েরের বড় ভাই জাকো পিয়েরের চেয়ে তিন বছরের বড়। ছোটবেলা থেকেই ভীষণ হাসিখুশি আনন্দ আর স্বাধীনতার মধ্য দিয়ে বড় হয়েছেন পিয়ের। বাবা ইউজিন ডাক্তারি পাস করে প্যারিসের মিউজিয়াম অব ন্যাচারাল হিস্ট্রিতে কাজ শুরু করেন। ডাক্তারি প্র্যাকটিসের বদলে তিনি চিকিৎসাবিজ্ঞানের গবেষক হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সেরকম কোন সুযোগ না পেয়ে জীবিকার তাগিদে রোগী দেখার কাজ শুরু করতে হলো। নিজের ব্যক্তিগত সুখের কথা কখনোই ভাবতেন না ডাক্তার ইউজিন। খুবই সাদাসিধে জীবনযাপনে অভ্যস্ত ইউজিন নিজের ছেলেদের ভেতরও সেই পরার্থপরতার উন্মেষ ঘটাতে পেরেছিলেন। তখনকার ফ্রান্সের প্রাতিষ্ঠানিক স্কুলের শিক্ষা-ব্যবস্থার প্রতি আস্থা ছিল না ইউজিনের। তিনি তাঁর ছেলেদের স্কুলে পাঠাননি একদিনের জন্যও। বাড়িতেই তাদের পড়াশোনার ব্যবস্থা করেছিলেন উন্মুক্ত পরিবেশে। ধরতে গেলে তাদের যা ভালো লাগে তাই পড়েছে তারা ছোটবেলায় এবং সেভাবে লেখাপড়ার প্রতি ভালোবাসা তৈরি হয়েছে। একই সাথে ভালোবাসা তৈরি হয়েছে প্রকৃতির প্রতিও।
চৌদ্দ বছর বয়সে পিয়ের বাড়িতে গণিতের শিক্ষক হিসেবে পেলেন ফ্রান্সের বিশিষ্ট গণিতজ্ঞ আলবার্ট ব্যাজিলকে। প্রফেসর ব্যাজিল পিয়েরের মধ্যে গাণিতিক ও বৈজ্ঞানিক যুক্তির প্রতি ভালোবাসা জাগিয়ে তোলেন। পিয়েরের লেখাপড়া দ্রুতগতিতে চলতে শুরু করলো। ষোল বছর বয়সে এইচ-এস-সির সমতুল্য পরীক্ষায় পাস করে সরবোন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেন পিয়ের। আঠারো বছরের মধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্স ডিগ্রির সমতুল্য ডিগ্রি পেয়ে গেলেন। গবেষণা করার জন্য পিএইচডি কোর্সে ভর্তি হতে ইচ্ছে আছে, কিন্তু বাড়িতে টাকা-পয়সার অভাব খুব। বড়ভাই জাকো সরবোনের খনিজবিদ্যার ল্যাবোরেটরিতে টেকনিশিয়ান হিসেবে কাজ করছেন। পিয়েরও পদার্থবিদ্যার ল্যাবোরেটরির অ্যাসিস্ট্যান্ট পদে যোগ দিলেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজের শেষে নিজেদের গবেষণা শুরু করলেন পিয়ের ও জাকো। তিন বছরের মধ্যেই তাঁরা দুভাই মিলে পদার্থবিজ্ঞানের একটি উল্লেখযোগ্য আবিষ্কার ‘পাইজোইলেকট্রিক ইফেক্ট’ আবিষ্কার করে ফেললেন। গ্রিক শব্দ পাইজো - মানে চাপ দেয়া। তাঁরা দেখলেন কিছু কিছু ক্রিস্টালে চাপ প্রয়োগ করলে বৈদ্যুতিক বিভব তৈরি হয়। আবার বিপরীতক্রমে যখন একই ক্রিস্টালকে বৈদ্যুতিক ক্ষেত্রের মধ্যে রাখা হয় ক্রিস্টালের ওপর চাপ তৈরি হয়ে তা সংকুচিত হয়ে যায়। পদার্থবিজ্ঞানের সাম্যতার তত্ত্বে এটা নতুন সংযোজন। পাইজোইলেকট্রিক থিওরি কাজে লাগিয়ে পিয়ের ও জাকো তৈরি করলেন কোয়ার্টজ ইলেকট্রোমিটার - যা অতি ক্ষুদ্র বিদ্যুৎপ্রবাহও মাপতে পারে। বর্তমানে কোয়ার্টজ ঘড়ি, মাইক্রোফোন, ট্রান্সডিউসার সহ অসংখ্য ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতিতে পাইজোইলেকট্রিসিটি ব্যবহার করা হয়।
সরবোন ইউনিভার্সিটির ল্যাবরেটরি টেকনিশিয়ান হিসেবে পিয়ের কুরির বেতন ছিল যাচ্ছেতাই রকমের কম। তাছাড়া তাঁর কাজেরও কোন একাডেমিক স্বীকৃতি নেই। তিনি ভালো কোন প্রতিষ্ঠানে কাজ খুঁজছিলেন যেখানে কমপক্ষে স্বাধীনভাবে গবেষণা করার সুযোগ থাকবে, থাকবে গবেষণাগারের সুবিধা। ১৮৮৩ সালে ইকোল মিউনিসিপেল দ্য ফিজিক অ্যাট কিমিয়ে ইন্ডাস্ট্রিয়েল্স (ইপিসিআই)-এ যোগ দেন পিয়ের। সরবোনের মত বড় প্রতিষ্ঠান এটা নয়। তবে কাজের স্বাধীনতা আছে। পরীক্ষামূলক কাজ করার সুযোগ বেশি না থাকাতে পিয়ের তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞানের কাজে হাত দিলেন। চৌম্বকত্ব নিয়ে কাজ শুরু করলেন তিনি। পদার্থের চৌম্বক ধর্ম ও তাপমাত্রার মধ্যে একটা সম্পর্ক আবিষ্কার করলেন তিনি। একটা নির্দিষ্ট তাপমাত্রার উপরে গেলে চৌম্বক পদার্থের ধর্মের মধ্যে ব্যাপক পরিবর্তন দেখা যায়। পদার্থবিজ্ঞানে এই তাপমাত্রাকে তাঁর নামানুসারে ‘কুরি তাপমাত্রা’ বলা হয়।
১৮৮৯ থেকে ১৮৯১ সালের মধ্যে তিনি তৈরি করেন পিরিয়ডিক প্রিসিশান ব্যালেন্স - যা দিয়ে অতিসূক্ষ্ম ভরের তারতম্য মাপা সম্ভব। মাইক্রোমিটারের কাঁটার সামান্য বিচ্যুতি - যা খালি চোখে দেখা যায় না - তা মাপার জন্য মাইক্রোমিটারের সাথে মাইক্রোস্কোপের সংযোগ ঘটান তিনি। পরবর্তীতে মেরি কুরির সাথে রেডিয়াম ও পোলোনিয়াম আবিষ্কারের সময় বিশেষ কাজে লেগেছিলো এই ‘কুরি ব্যালেন্স।
১৮৯৪ সালে পিয়ের যখন চৌম্বক পদার্থের ধর্মের সাথে তাপমাত্রার সম্পর্ক নিয়ে কাজ করছিলেন, সেইসময় একদিন সরবোনের প্রফেসর জোসেফ কাওয়ালস্কি তাঁর সাথে পরিচয় করিয়ে দেন সরবোনের কৃতী ছাত্রী মারিয়া স্ক্লোদভস্কা ওরফে মেরির। মেরির মেধা এবং ব্যক্তিত্বের প্রতি প্রচন্ডভাবে আকৃষ্ট হন পিয়ের কুরি। অচিরেই তাঁদের যৌথ বৈজ্ঞানিক আলোচনা শুরু হয় এবং ব্যক্তিগত সম্পর্কও।
১৮৯৫ সালের মার্চ মাসে পিয়ের কুরি ‘ম্যাগনেটিক প্রপার্টিজ অব বডিজ অ্যাট ডাইভার্স টেম্পারেচার’ শীর্ষক থিসিস জমা দিলেন সরবোন বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিজিক্স ডিপার্টমেন্টে। জুন মাসে কৃতিত্বের সাথে ডক্টরেট ডিগ্রি পেয়ে গেলেন পিয়ের। তার কয়েকদিন পরেই মেরি ও পিয়েরের এনগেজমেন্ট হয়ে গেলো। ১৮৯৫ সালের ২৬শে জুলাই পিয়েরের মা-বাবার বাড়ির কাছে স্সো টাউন হলে রেজিস্ট্রি করে বিয়ে হলো মেরি ও পিয়েরের। পোল্যান্ডের মারিয়া স্ক্লোদভস্কা হয়ে গেলেন ফ্রান্সের মেরি কুরি।
![]() |
| বিয়ের দিন মেরি ও পিয়ের কুরি |
১৮৯৬ সালের শেষের দিকে মেরি যোগ দিলেন প্যারিসের একটি মেয়েদের স্কুলে পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষক হিসেবে। ১৮৯৭ সালের সেপ্টেম্বরে জন্ম নেয় পিয়ের ও মেরির প্রথম কন্যা আইরিন। তার দুসপ্তাহ পর পিয়েরের মায়ের মৃত্যু হয় স্তন ক্যান্সারে। পিয়েরের বাবা তখন চলে আসেন পিয়ের আর মেরির বাসায়। ছোট্ট আইরিনকে দেখাশোনার দায়িত্ব তিনি তুলে নেন নিজের হাতে।
পিয়ের কৃস্টালের গঠনের ওপর চৌম্বকত্বের প্রভাব নিয়ে গবেষণা করছেন। মেরি পদার্থবিজ্ঞানে ডক্টরেট করার জন্য উপযুক্ত বিষয় খুঁজছেন। মেরির আগে শুধু ফ্রান্সে নয় - পুরো ইউরোপেই কোন মেয়ে ডক্টরেট করেননি। পিয়ের সমানে উৎসাহ দিচ্ছেন মেরিকে।
গবেষণা করার জন্য বিষয় নির্বাচন করতে গিয়ে পদার্থবিজ্ঞানের গবেষণাপত্রগুলো পড়তে পড়তে একটা গবেষণার প্রতি মেরির গভীর আগ্রহ সৃষ্টি হলো। ফ্রান্সের বিজ্ঞানী হেনরি বেকোয়ারেলের গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছে ১৮৯৬ সালে। এর আগের বছর ১৮৯৫ সালে জার্মান বিজ্ঞানী উইলহেল্ম রন্টগেন এক্স-রে আবিষ্কার করে সারা পৃথিবীতে আলোড়ন সৃষ্টি করে ফেলেছেন। হেনরি বেকোয়ারেল চেষ্টা করছিলেন এক্স-রেকে কাজে লাগানোর। ফটোগ্রাফিক ফিল্ম এর উপর এক্স-রে নিয়ে পরীক্ষা করতে গিয়ে বেকোয়ারেল দেখলেন ইউরেনিয়াম থেকে স্বতস্ফূর্তভাবে এক প্রকার রশ্মি নির্গত হয়, যা দৃশ্যমান আলোর চেয়ে শক্তিশালী। এই রশ্মি এক্স-রের মতোই শক্ত ধাতব পদার্থ ভেদ করে ফটোগ্রাফিক প্লেটের ওপর ছাপ রাখতে পারে। কিন্তু এক্স-রে এবং এই অজানা রশ্মি এক নয়।
বেকোয়ারেল এই সময় শুধু এইটুকু জানতেন যে অদৃশ্য শক্তিশালী রশ্মিগুলো বের হয়। কিন্তু রশ্মিগুলো কী বা কেন ওগুলো বের হয় তা নিয়ে আর কেউ মাথা ঘামাননি। এমন কি বেকোয়ারেল নিজেও আর উৎসাহ দেখাননি। মেরি খুবই উৎসাহিত হয়ে উঠলেন এই রশ্মির উৎস সন্ধানে। সমস্ত অজানা প্রশ্ন যেন মেরির জন্যই অপেক্ষা করছিলো। মেরি যে স্কুলে শিক্ষকতা করেন সেই স্কুলের স্টোররুমটাকে গবেষণাগার হিসেবে ব্যবহার করার অনুমতি পেলেন। ছোট্ট সেই রুমটা এত স্যাঁতস্যাঁতে এবং ঠান্ডা যে অনেক যন্ত্রপাতি ঠিকমত কাজ করে না। তারপরও মেরি চেষ্টার ত্রুটি করেননি এতটুকু।
পিয়ের ও জাকো অনেকদিন আগে যে সুবেদি ইলেকট্রোমিটার বানিয়েছিলেন, মেরি সেটাকে কাজে লাগালেন বেকোয়ারেলের আবিষ্কৃত ইউরেনিয়ামের রশ্মিগুলোর শক্তিমাত্রা পরিমাপ করার জন্য।
দিনের পর দিন বিভিন্ন ধাতুর নমুনা নিয়ে পরীক্ষার পর পরীক্ষা করে মেরি দেখলেন যে রশ্মিগুলোর শক্তিমাত্রা নির্ভর করে নমুনায় ইউরেনিয়ামের পরিমাণের উপর। এই পরিমাণ যত বেশি হবে রশ্মিগুলোর শক্তিমাত্রাও তত বেশি হবে। ইউরেনিয়ামের সাথে কী মেশানো আছে, বা নমুনাটি শুষ্ক কিংবা ভেজা, শক্ত কিংবা দানাদার, ঠান্ডা বা গরম, এই সমস্ত অনুষঙ্গের উপর মোটেও তা নির্ভর করে না, শুধু নির্ভর করে নমুনায় কতটুকু ইউরেনিয়াম আছে তার উপর।
ইউরেনিয়াম ছাড়া আর কোন মৌল তেজষ্ক্রিয় রশ্মি ছড়ায় কিনা জানার জন্য মেরি সেই সময় পর্যন্ত জানা সবগুলো ধাতুই পরীক্ষা করে দেখলেন। দেখলেন ইউরেনিয়ামের মত থোরিয়াম থেকেও তেজষ্ক্রিয় রশ্মি বের হয়। উৎসাহিত হয়ে মেরি আরো পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করলেন। এবার বিভিন্ন ধরনের যৌগ নিয়ে পরীক্ষা করে দেখতে লাগলেন যদি তেজষ্ক্রিয়তা পাওয়া যায়। বালি, পাথর, খনিজ কিছুই বাদ গেলো না। একদিন ঘটলো অপ্রত্যাশিত এক ঘটনা।
পিচব্লেন্ড পরীক্ষা করতে গিয়ে দেখলেন ইউরেনিয়ামের চেয়ে চারগুণ শক্তিশালী তেজষ্ক্রিয় রশ্মি বের হচ্ছে। মাপতে ভুল করলেন না তো? আবার পরীক্ষা করলেন। বার বার, দশবার, বিশবার - প্রতিবারই একই ফল পাওয়া গেল। পরীক্ষা নির্ভুল। পিচব্লেন্ডে এমন কোন তেজষ্ক্রিয় মৌল আছে যা থোরিয়াম বা ইউরেনিয়ামের চেয়ে ভিন্ন এবং অধিক তেজষ্ক্রিয়। কিন্তু বিজ্ঞানীরা যেসব মৌলের কথা জানেন সেসব মৌলের সবগুলোকেই তো তিনি পরীক্ষা করে দেখেছেন। তবে কি নতুন কোন মৌলের সন্ধান পেতে চলেছেন তিনি? উত্তেজিত হয়ে উঠলেন মেরি।
উত্তেজনা ছড়িয়ে গেল পিয়েরের মধ্যেও। তিনি নিজের গবেষণা একপাশে সরিয়ে রেখে এগিয়ে এলেন মেরির গবেষণায় সাহায্য করতে। শুরু হলো দিনরাত্রি পরিশ্রম। ১৮৯৮ সালের ৬ই জুন পাওয়া গেল একটি তেজষ্ক্রিয় নতুন মৌল যার তেজষ্ক্রিয়তা ততটা শক্তিশালী নয়। তাহলে? আরো একটা মৌল নিশ্চয় আছে। আবার কাজ। ১৮৯৮ সালের ডিসেম্বরে পাওয়া গেল সেই অতিশক্তিশালী মৌল - মেরি যার নাম রাখলেন রেডিয়াম। আগে পাওয়া মৌলটির নাম রাখলেন জন্মভূমি পোল্যান্ডের নামানুসারে পোলোনিয়াম।
মেরি ও পিয়েরের
আগে আর কেউ দেখেননি রেডিয়াম। একতাল পিচব্লেন্ডের মধ্যে একটিমাত্র বালুকণার মত রেডিয়াম
বর্তমান। তার শক্তিই এতো! কিন্তু বৈজ্ঞানিক প্রমাণ দেখাতে গেলে তো মোটামুটি কিছু পরিমাণ
রেডিয়াম আলাদা করা দরকার। তারজন্য তাদের দরকার প্রচুর পরিমাণ পিচব্লেন্ড। পিয়ের ও মেরি
খুঁজতে লাগলেন কোথায় পাওয়া যাবে প্রচুর পিচব্লেন্ড। জানা গেলো অস্ট্রিয়ার একটি কারখানায়
বর্জ্য হিসেবে পিচব্লেন্ড পাওয়া যায় এবং তারা তা ফেলে দেয়। কিন্তু তা বলে অন্য একটা
দেশে গিয়ে টন টন পিচব্লেন্ড নিয়ে আসা তো সম্ভব নয়। সরকারি দপ্তরে অনেক দেনদরবার করে
পিয়ের হাঙ্গেরিয়ান সরকারের অনুমোদন পেলেন কয়েক টন পিচব্লেন্ড নিয়ে আসার। হাঙ্গেরিয়ান
কর্মকর্তারা মনে করলেন পিয়ের ও মেরি পাগল হয়ে গেছেন - তাই পয়সা খরচ করে মাটি নিয়ে যাচ্ছেন
ফ্রান্সে।
এদিকে আরেক সমস্যা দেখা দিলো। মেরির স্কুলের যে ভাঙা শেডে এতদিন কাজ করেছেন - তা এত ছোট যে সেখানে কাজ করা তো দূরের কথা পিচব্লেন্ড রাখার জায়গাও হবে না। কাজের জায়গা দরকার মেরি ও পিয়েরের। সমস্ত যোগাযোগ কাজে লাগিয়ে সরবোন ইউনিভার্সিটির কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করলেন পিয়ের ও মেরি।
সরবোনের এলিট কর্মকর্তারা পিয়ের ও মেরিকে পাগল-দম্পতি হিসেবে নামকরণ করে ফেলেছে। সবাই আড়ালে হাসি-তামাশা করে পিয়ের ও মেরিকে নিয়ে। তাঁরা কোন সাহায্য করলেন না। পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়নের নতুন পরিচালক প্রফেসর গ্যাব্রিয়েল আরো এককাঠি এগিয়ে গিয়ে ডিপার্টমেন্টে নোটিশ জারি করে দিয়েছেন - তাঁর অনুমতি ছাড়া কেউ যেন পিয়ের-মেরির সাথে কথা না বলেন। সরবোনের কোন ল্যাবে জায়গা হলো না মেরি ও পিয়েরের।
শেষ পর্যন্ত উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে মেরি ও পিয়েরকে সরবোন বিশ্ববিদ্যালয় যে জায়গাটি কাজ করার জন্য দিতে সম্মত হলো তা একটা পরিত্যক্ত শেড - যা মেডিকেল ফ্যাকাল্টির মর্গ হিসেবে ব্যবহার করা হতো। এখন তার ছাদ ফুটো, মেঝে ভাঙা। গরমের দিনে উত্তপ্ত চুলা হয়ে ওঠে ঘরটি আর শীতে পানি জমে বরফ হয়ে হয়ে। অনন্যোপায় হয়ে সেখানেই কাজ শুরু করলেন মেরি ও পিয়ের।
গ্রীষ্মের প্রচন্ড গরমে সিদ্ধ হতে হতে, শীতে প্রচন্ড ঠান্ডায় বরফ হতে হতে মেরি আর পিয়ের কাজ করতে লাগলেন। দিনের পর দিন, রাতের পর রাত। এক খাবলা পিচব্লেন্ড নিয়ে সোডার দ্রবণে মিশিয়ে সিদ্ধ করার পর পানিতে দ্রবণীয় এবং অদ্রবণীয় অংশ পৃথক করেন। পরে অদ্রবণীয় অংশকে এসিডে দ্রবীভূত করেন। তার সাথে বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ মিশিয়ে অনাকাঙ্খিত বস্তুকে একটার পর একটা আলাদা করে ফেলে দেন। এইভাবে বিরামহীন মিশ্রণ, দ্রবীভূতকরণ, তাপন, ছাঁকন, বিশুদ্ধীকরণ, কেলাসন চলতে থাকলো। যে কোন মৌল আলাদা করার পর পিয়ের তাঁর ইলেকট্রোমিটারে তেজষ্ক্রিয়তার মাত্রা মেপে দেখেন। পরীক্ষণীয় পিচব্লেন্ডের অবশেষ যতই কমতে থাকে তেজষ্ক্রিয়তার পরিমাণ ততই বাড়তে থাকে। বস্তা বস্তা পিচব্লেন্ড ছেঁকে তাঁরা বিন্দু বিন্দু রেডিয়াম সংগ্রহ করতে লাগলেন।
১৮৯৯ সালে কাজ শুরু করেছিলেন তাঁরা। ১৯০২ সালে দীর্ঘ পঁয়তাল্লিশ মাস পর কুরি দম্পতি এক ডেসিগ্রাম (এক গ্রামের দশ ভাগের এক ভাগ) পরিমাণ বিশুদ্ধ রেডিয়াম সংগ্রহ করতে সমর্থ হলেন। সারা পৃথিবীর বিজ্ঞানীরা আশ্চর্য হয়ে গেলেন এই অত্যাশ্চর্য শক্তিশালী তেজষ্ক্রিয় মৌলের আবিষ্কারে। রেডিয়ামের উজ্জ্বল নীলাভ আলোর মতই আলোকিত হয়ে উঠলেন মেরি ও পিয়ের কুরি।
এই গবেষণার ভিত্তিতে সরবোন ইউনিভার্সিটিতে ডক্টরাল থিসিস জমা দিলেন মেরি কুরি। ১৯০৩ সালের ১২ জুন বিজ্ঞানের ইতিহাসে নতুন মাইলফলক স্থাপন করলেন মেরি কুরি - শুধু সরবোন বিশ্ববিদ্যালয় নয় - পুরো ইউরোপের প্রথম নারী ডক্টরেট হয়ে। বছরের শেষে আনন্দের সংবাদ আসে সুইডেনের নোবেল কমিটির কাছ থেকে। ১৯০৩ সালের পদার্থবিজ্ঞানের নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন যৌথভাবে হেনরি বেকোয়ারেল, পিয়ের এবং মেরি কুরি।
পিয়ের অনেক বেশি খুশি হন এই সংবাদে। কারণ এর কিছুদিন আগে নোবেল কমিটির এক সদস্য সুইডেনের গণিতবিদ ম্যাগনাস মিট্যাগ-লেফ্লার পিয়েরকে চিঠি লিখে জানিয়েছিলেন যে নোবেল কমিটি নোবেল পুরষ্কারের জন্য বিবেচনা করছে বেকোয়ারেল ও পিয়েরের নাম। মেরি কুরির নাম নেই কোথাও। মিট্যাগ-লেফ্লার বিজ্ঞানে মেয়েদের অংশগ্রহণের পক্ষে কাজ করেন। তিনি মেরির যোগ্য পুরষ্কার থেকে মেরিকে বঞ্চিত করার চেষ্টা সহজে মেনে নিতে পারেননি। পিয়ের তাঁকে জানিয়ে দিয়েছেন তেজষ্ক্রিয়তার কাজের জন্য নোবেল পুরষ্কার প্রাপ্য হলে তা পিয়ের ও মেরি দুজনেরই প্রাপ্য। নোবেল কমিটি পিয়েরের চিঠিকে গুরুত্ব দিয়েছে।
এত অর্জনের পরেও পিয়ের বা মেরির কোন একাডেমিক স্বীকৃতি নেই। পিয়ের নোবেল পুরষ্কার পাবার পরেও ইপিসিআইর ‘অধ্যাপক’ নন - একজন ল্যাবোরেটরি টেকনিশিয়ান মাত্র। আর মেরি কুরি একটা মেয়েদের হাইস্কুলের ফিজিক্সের শিক্ষক। এদিকে সারাপৃথিবীর প্রচারমাধ্যমে প্রচারিত হয়ে চলেছে মেরি ও পিয়েরের অর্জনের খবর। তার চেয়েও বেশি প্রচারিত হচ্ছে এই যে তাঁরা কীরকম কষ্ট করে একটা ভাঙা শেডের মধ্যে গবেষণাকাজ চালিয়েছেন। ইপিসিআই কর্তৃপক্ষ পিয়ের কুরিকে দ্রুত প্রফেসর পদে প্রমোশন দিল। ফরাসি সরকার নিজেদের লজ্জা ঢাকার জন্য পিয়েরকে সরবোন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রফেসর পদে নিয়োগের প্রস্তাব দিলেন। পিয়ের সেই প্রস্তাবে রাজি হবার আগে শর্ত দিলেন - তাঁর ল্যাবোরেটরি লাগবে। সরকার শর্ত মেনে নিল। সরবোন বিশ্ববিদ্যালয়ে দুটো পদ তৈরি হলো পিয়ের কুরির জন্য অধ্যাপক পদ আর মেরি কুরির জন্য তাঁর গবেষণা সহকারির পদ।
১৯০৪ সালের ৬ই ডিসেম্বর মেরি ও পিয়েরের দ্বিতীয় কন্যা ইভ কুরির জন্ম হয়। আইরিন ও ইভকে নিয়ে বৃদ্ধ ইউজিন কুরির আনন্দে সময় কাটে। মেরি ও পিয়ের একাডেমিক ও বৈজ্ঞানিক কাজকর্মে ব্যস্ত। নোবেল পুরষ্কারের টাকার একটা অংশ দিয়ে তাঁরা একটা গবেষণা-কেন্দ্র গড়ে তোলার কাজে হাত দিয়েছেন। সরবোনে তেজষ্ক্রিয়তা সংক্রান্ত নতুন কোর্স তৈরি করছেন পিয়ের। মেরিও চিকিৎসাবিজ্ঞানে তাঁর রেডিয়ামের ভবিষ্যৎ ব্যবহারের সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণা করছেন, গবেষণাপত্র রচনা করছেন।
১৯০৬ সাল এসে
গেলো। সরবোনে পিয়েরের ল্যাব এখনো তৈরি হয়নি। সরকারের নানা টালবাহানা চলছে তো চলছেই।
পিয়ের ব্যক্তিগতভাবে বিভিন্ন ধনীলোকের কাছে আবেদনও করেছেন। কিন্তু তেমন কোন সাড়া মেলেনি।
বিজ্ঞানের সুফল ভোগ করে সবাই, প্রশংসা করে কেউ কেউ, কিন্তু বিজ্ঞানের উন্নয়নে গাঁটের
পয়সা খরচ করতে রাজি নয় কেউ।
![]() |
| ল্যাবে পিয়ের কুরি |
১৯০৬ সালের
১৯ এপ্রিল দ্রুত রাস্তা পার হতে গিয়ে হঠাৎ পা পিছলে পড়ে গেলেন পিয়ের। একটি ঘোড়ার গাড়ির
চাকায় থেৎলে গেলো তাঁর মাথা। সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যু হলো তাঁর। মাত্র ৪৭ বছর বয়সে থেমে
গেল বিপুল সম্ভাবনাময় বিজ্ঞানী পিয়ের কুরির জীবন।
তথ্যসূত্র:
১। ক্লিফোর্ড
পিকোভার, দ্য ফিজিক্স বুক, স্টারলিং, নিউইয়র্ক, ২০১১।
২। প্রদীপ দেব,
রেডিয়াম ভালোবাসা, মীরা প্রকাশন, ঢাকা, ২০১৪।
৩। মেরি কুরি,
পিয়ের কুরি, ডোভার পাবলিকেশন্স, নিউইয়র্ক, ১৯৬৩।








No comments:
Post a Comment