১৯৪২। দ্বিতীয়
বিশ্বযুদ্ধের রুদ্ধ্বশ্বাস সময়। ম্যানহাটান প্রজেক্টের পারমাণবিক বোমার মূল উপাদান
ইউরেনিয়াম ও প্লুটোনিয়াম তৈরি হচ্ছে বেশ কয়েকটি
গোপন রিঅ্যাকটরে। কলম্বিয়া নদীর দক্ষিণ-পূর্ব দিকে হ্যানফোর্ড রিঅ্যাক্টর তৈরি হয়েছে
প্লুটোনিয়াম উৎপাদনের উদ্দেশ্যে। কিন্তু দেখা গেল রিঅ্যাক্টর চালু করার পর চেইন রিঅ্যাকশান
শুরু হবার একটু পরেই রিঅ্যাকটর নিজে নিজে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। বার বার ঘটছে এই ঘটনা। চিন্তায়
পড়ে গেলেন প্রকল্প পরিচালক এনরিকো ফার্মি। তিনি নিজে নিউট্রনের মিথষ্ক্রিয়া আবিষ্কার
করে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন মাত্র চার বছর আগে। নিউট্রনের নাড়ি-নক্ষত্র তাঁর জানা থাকার
কথা। তিনি বুঝতে পারছিলেন রিঅ্যাকটরের ভেতর চেইন-রিঅ্যাকশান শুরু হবার পর যেসব ফিশান
প্রডাক্ট তৈরি হচ্ছে সেগুলিই কোনো না কোনো ভাবে নিউট্রন শোষণ করে নিচ্ছে – ফলে চেইন-রিঅ্যাকশান
বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কোন্ ফিশান প্রডাক্ট এর জন্য দায়ি তা কিছুতেই তিনি নিশ্চিত
করে বলতে পারছেন না। প্রজেক্টের অন্যান্য বিজ্ঞানী ও ইঞ্জিনিয়ারদের কাছেও এই প্রশ্নের
উত্তর নেই – তবে সবারই একই পরামর্শ, “মিস উ-কে জিজ্ঞেস করুন।“
কে এই মিস উ?
জানা গেলো মাত্র তিরিশ বছর বয়সী এই চীনা তরুণীর নাম চিয়েন-শিউং উ। দু’বছর আগে পিএইচডি
সম্পন্ন করেছেন সাইক্লোট্রনের উদ্ভাবক আর্নেস্ট লরেন্সের তত্ত্বাবধানে। ১৯৩৯ সালে পদার্থবিজ্ঞানে
নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী আর্নেস্ট লরেন্স ছিলেন ম্যানহাটান প্রজেক্টের অন্যতম প্রধান বিজ্ঞানী
– রেডিয়েশান ল্যাবের তত্ত্বাবধায়ক। তাঁর ল্যাবেই আবিষ্কৃত হয়েছে প্লুটোনিয়াম। এনরিকো
ফার্মি যোগাযোগ করলেন মিস্ চিয়েন-শিউং উ-এর সাথে। ফার্মির পাঠানো ডাটা বিশ্লেষণ করে
মিস উ হ্যানফোর্ড রি-অ্যাকটরের সমস্যার কারণ বের করে ফেললেন। ফিশান প্রোডাক্টে জেনন-১৩৫
আইসোটোপ তৈরি হবার সাথে সাথে দ্রুত নিউট্রন শোষণ করতে থাকে। তখন রিঅ্যাক্টরে চেইন-রিঅ্যাকশান
ঘটানোর জন্য প্রয়োজনীয় নিউট্রনের অভাব থেকে রিঅ্যাকটর বন্ধ হয়ে যায়।
মিস উ’র প্রতিভা
আর নিউক্লিয়ার ফিজিক্সে গভীর ব্যবহারিক জ্ঞান দেখে মুগ্ধ হয়ে গেলেন। হ্যানফোর্ড রিঅ্যাকটরের
সমস্যার সমাধান করে ফেলা গেল চিয়েন-শিউং উ’র সহায়তায়। এনরিকো ফার্মি ম্যানহাটান প্রজেক্টের
প্রধান বিজ্ঞানী রবার্ট ওপেনহেইমারকে অনুরোধ করতেই তিনি রাজি হয়ে গেলেন ম্যানহাটান
প্রজেক্টের বিশেষজ্ঞ বিজ্ঞানী হিসেবে চিয়েন-শিয়ং উ-কে নিয়োগ দিতে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের
সেই সময়ে নিউক্লিয়ার পদার্থবিজ্ঞানের এমন সব পরীক্ষণ ঘটানো হয়েছে যা অন্য স্বাভাবিক
সময়ে হয়তো সম্ভব হতো না। পারমাণবিক বোমা তৈরির প্রকল্প ‘ম্যানহাটান প্রজেক্ট’ এতটাই
গোপনীয় ছিল যে এর গবেষণাগারগুলিতে যাঁরা কাজ করতেন তাঁদেরও বেশিরভাগ জানতেনই না কোন্
বৃহত্তর প্রকল্পের অধীনে তাঁরা কাজ করছেন। ১৯৪২ থেকে ১৯৪৫ পর্যন্ত প্রায় এক লক্ষ তিরিশ
হাজার মানুষ কাজ করেছেন ম্যানহাটান প্রজেক্টে। এঁদের মধ্যে ছিলেন মাত্র দেড় থেকে দুই
হাজার ইঞ্জিনিয়ার ও বিজ্ঞানী। কিন্তু মূল বৈজ্ঞানিক প্রকল্পের উদ্ভাবন ও গবেষণা প্রকল্পগুলি
তত্ত্বাবধান করেছেন মাত্র শ’খানেক বিজ্ঞানী – যাঁদের অনেকেই ছিলেন সেই সময় ইওরোপ থেকে
নির্বাসিত বিশ্বখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী। চিয়েন-শিউং উ ছিলেন প্রথম এবং একমাত্র চীনা বিজ্ঞানী
যিনি ম্যানহাটান প্রজেক্টে কাজ করেছেন। ইউরেনিয়াম-২৩৮ থেকে ইউরেনিয়াম-২৩৫ আইসোটোপ চিয়েন-শিউং উ শুধুমাত্র সেখানেই যে প্রথম ছিলেন তা
নয়, পরবর্তীতে পদার্থবিজ্ঞানের ইতিহাসে তিনি
এমন অনেক মাইলফলক স্থাপন করেছেন যেগুলি থেকে তিনি পরিচিতি পেয়েছেন “ফার্স্ট লেডি অব
ফিজিক্স”, “কুইন অব নিউক্লিয়ার রিসার্চ” হিসেবে। মেরি কুরির সাথে তুলনা করে তাঁকে
“চায়নিজ মেরি কুরি” বলে ডাকা হয়।
চীনের সাংহাই-এর
কাছে লিউহি নামে ছোট্ট একটি গ্রামে চিয়েন-শিউং উ-র জন্ম ১৯১২ সালের ৩১ মে। তার বাবা
জং-ই উ ছিলেন ইঞ্জিনিয়ার। ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনা এবং স্বাধীন জ্ঞান অর্জনের প্রতি তিনি
ছিলেন বিশেষ যত্নবান। মেয়েদের শিক্ষার বিস্তার ঘটানোর জন্য তিনি নিজেই একটি স্কুল স্থাপন
করেছিলেন এবং নিজের মেয়ের পড়াশোনা শুরু হলো সেই স্কুলে। ১৯২৩ সালে এই স্কুলের প্রাথমিক
পর্যায়ের পড়াশোনা শেষ করার পর চিয়েন-শিউং ভর্তি হলো সুচাউ স্কুল ফর গার্লস-এ। মেয়েদের
এই বোর্ডিং স্কুল থেকে চিয়েন-শিউং ‘নরমাল স্কুল প্রোগ্রাম’-এ স্নাতক হলেন ১৯২৯ সালে।
এই প্রোগ্রাম হলো শিক্ষক তৈরির প্রকল্প। চীনে শিক্ষার প্রসারের লক্ষ্যে আদর্শ শিক্ষক
তৈরি করার জন্য একেবারে স্কুল থেকেই এই প্রকল্প শুরু করা হয়েছিল। ‘নরমাল স্কুল প্রোগ্রাম’এর
বিশেষ লেখাপড়া শেষ করার পর এক বছর সাংহাই গং সু পাবলিক স্কুলে পড়াশোনা করেন চিয়েন-শিউং।
১৯৩০ সালে ন্যানজিং-এর
ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হন চিয়েন-শিউং। শুরুতে গণিতে ভর্তি হলেও দ্বিতীয়
বর্ষে পদার্থবিজ্ঞানে চলে আসেন তিনি। কোয়ান্টাম মেকানিক্সের বিপ্লব শুরু হবার সাথে
সাথে নিউক্লিয়ার ফিজিক্সসহ পদার্থবিজ্ঞানের জগতে যে আলোড়ন চলছিল তাতে ভীষণভাবে আকৃষ্ট
হলেন চিয়েন-শিউং। ১৯৩৪ সালে অনার্সসহ রেকর্ডমার্কস নিয়ে পদার্থবিজ্ঞানের স্নাতক ডিগ্রি
লাভ করলেন চিয়েন-শিউং।
১৯৩৫-৩৬ সালে
এক্স-রে ক্রিস্টালোগ্রাফির গবেষণা শুরু করেন চিয়েন-শিউং। পদার্থবিজ্ঞানের গবেষণাই ধ্যান-জ্ঞান
হয়ে উঠছে তাঁর। ইওরোপে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা শুরু হয়ে গেছে। আইনস্টাইনসহ ইওরোপের
বিজ্ঞানীদের অনেকেই আমেরিকায় চলে গেছেন। চিয়েন-শিউং-ও তাঁর চাচার আর্থিক সহায়তায় ১৯৩৬
সালে চলে এলেন আমেরিকায়। ঠিক করে রেখেছিলেন মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ে গ্রাজুয়েট প্রোগ্রামে
ভর্তি হবেন। সেখানে ভর্তি হবার আগে তিনি গেলেন ইউনিভার্সিটি অব ক্যালফোর্নিয়ার বার্কলে
ক্যাম্পাসে। সেখানে তাঁর সাথে পরিচয় হয় আরেকজন চীনা ছাত্র লুক চিয়া ইউয়ানের সাথে। ফিজিক্স
ডিপার্টমেন্ট ঘুরিয়ে দেখানোর সময় লুক চিয়া ইউয়ান চিয়েন-শিউং-কে নিয়ে গেলেন প্রফেসর
আর্নেস্ট লরেন্সের অফিসে। চিয়েন-শিউং-এর সাথে পদার্থবিজ্ঞানের সাম্প্রতিক গবেষণা নিয়ে
সামান্য কথাবার্তা বলেই লরেন্স তাঁর প্রতিভার পরিচয় পেলেন। কিন্তু যখন শুনলেন চিয়েন-শিউং
মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করতে ইচ্ছুক, বেশ অবাক হয়ে তিনি বললেন, “কিন্তু মিশিগান
তো এখনো ফিমেল স্টুডেন্ট ভর্তি করাচ্ছে না।“
চিয়েন-শিউং
এই তথ্য জানতেন না। মিশিগানে যাওয়ার আর কোন অর্থ হয় না। আর্নেস্ট লরেন্সের তত্ত্বাবধানেই
পিএইচডি কোর্সে ভর্তি হয়ে গেলেন চিয়েন-শিউং। আর্নেস্ট লরেন্সের ল্যাবে প্রফেসর এমিলিও
সেগ্রের সাথে গবেষণা করতে করতে নিউক্লিয়ার ফিশানে বিশেষ দক্ষতা অর্জন করেছেন চিয়েন-শিউং।
১৯৪০ সালে তিনি পিএইচডি অর্জন করেন। তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল ইউরেনিয়ামের ফিশান প্রডাক্ট।
তাঁর দক্ষতাই কাজে লেগে গিয়েছিল ম্যানহাটান প্রজেক্টে।
পিএইচডি অর্জনের
পর ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়াতে গবেষণার কাজে যোগ দিতে ইচ্ছুক ছিলেন চিয়েন-শিউং।
কিন্তু তখনো আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অধ্যাপনা বা স্থায়ী গবেষকের পদে মেয়েদের
কিংবা এশিয়ান বা আফ্রিকান কৃষ্ণাঙ্গদের নিয়োগ দিতে চাইতো না। কিন্তু ১৯৪২ সালে বিশ্বযুদ্ধের
সময় পদার্থবিজ্ঞানীরা প্রায় সবাই যুদ্ধের বিভিন্ন প্রকল্পে ব্যস্ত। পড়ানোর কাজে তখন
আন্তর্জাতিক প্রতিভার কাউকে কাউকে নিয়োগ দেয়া শুরু হয়েছে। চিয়েন-শিউং চাকরি পেলেন মেয়েদের
কলেজ - স্মিথ কলেজে। ক্যালিফোর্নিয়া ছেড়ে ম্যাচাচুসেট্স-এ যেতে হলো তাঁকে। তাতে বেশ
সুবিধাই হলো। আমেরিকায় এসে যে চীনা ছেলের সাথে তাঁর প্রথম পরিচয় হয়েছিল – সেই লুক চিয়া
ইউয়ানের সাথে তার প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। ১৯৩৭ সালে ক্যালটেক থেকে পিএইচডি সম্পন্ন
করার পর তিনি প্রিন্সটনে চাকরি পেয়েছেন রাডার প্রকল্পে। ১৯৪২ সালে চিয়েন-শিউং বিয়ে
করেন লুক চিয়া ইউয়ানকে।
স্মিথ কলেজে
পড়ানোর কাজে কোন অসুবিধা হচ্ছিলো না চিয়েন-শিউং-এর। কিন্তু সেখানে গবেষণার তেমন কোন
সুবিধা ছিল না। তাই ১৯৪৩ সালে প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটিতে একটি গবেষণা পদে যোগ দেয়ার
সুযোগ পেতেই তিনি স্মিথ কলেজের চাকরি ছেড়ে প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটিতে যোগ দেন। চিয়েন-শিউং
ছিলেন প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বপ্রথম নারী অধ্যাপক। তাঁর আগে আর কোনো নারীকে
শিক্ষক পদে নিয়োগ দেয়নি প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়।
চিয়েন-শিউং
এর প্রতিভার পরিচয় পেয়ে এনরিকো ফার্মি এবং রবার্ট ওপেনহেইমার তাঁকে ম্যানহাটান প্রজেক্টে
সিনিয়র সায়েন্টিস্ট পদে নিয়োগ দেন ১৯৪৪ সালের মার্চ মাসে। কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে
এই প্রজেক্টে তিনি ইউরেনিয়াম আলাদা করার জন্য গ্যাস ডিফিউশান প্রসেস এবং নিউট্রনের
মিথষ্ক্রিয়া কাজ তদারক করেন। পাশাপাশি তিনি নিউক্লিয়ার বিকিরণ পরিমাপের জন্য উন্নত
গাইগার কাউন্টার তৈরিতেও কাজ করেন।
যুদ্ধ শেষ হবার পর ১৯৪৬ সালে চিয়েন-শিউং কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট হিসেবে। ১৯৫২ সালে অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর এবং ১৯৫৮ সালে ফুল প্রফেসর হন। এরপর কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়েই কাটে তাঁর সমগ্র কর্মজীবন।
কলাম্বিয়া
বিশ্ববিদ্যালয়ের চীনা তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী সুং-দাও লি-র সাথে ব্যক্তিগত পরিচয়
ছিলো উ-র। ১৯৫০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে লি
এবং আরেক চীনা তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী চেন-নিং ইয়াং মৌলিক কণা পদার্থবিজ্ঞানের একটি
কাল্পনিক সূত্র—“প্যারিটি সংরক্ষণ সূত্র” (Law of Conservation of Parity)—নিয়ে প্রশ্ন
তোলেন। পরীক্ষামূলক ফলাফল বিশ্লেষণ করে তাঁরা
নিশ্চিত হন যে এই সূত্রটি তড়িৎচৌম্বকীয় পারস্পরিক ক্রিয়া এবং শক্তিশালী নিউক্লিয়ার
বলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কিন্তু দুর্বল নিউক্লিয়ার বলের ক্ষেত্রে এটি কখনো পরীক্ষা
করা হয়নি, এবং তাঁদের তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ দেখায় যে এই ক্ষেত্রে সূত্রটি সম্ভবত সত্য
নাও হতে পারে। অর্থাৎ প্যারিটির বিচ্যুতি ঘটতে পারে। কিন্তু পরীক্ষামূলকভাবে প্রমাণিত
না হলে তাঁদের আবিষ্কার মূল্যহীন। লি ও ইয়াং কাগজ-কলমে একাধিক পরীক্ষার নকশা তৈরি
করেন, যা ল্যাবরেটরিতে প্যারিটির সংরক্ষণ পরীক্ষা করতে পারে। এরপর লি পরীক্ষাটি বাস্তবায়নের
জন্য যন্ত্রপাতি নির্বাচন, নির্মাণ, স্থাপন এবং পরীক্ষণ-পদ্ধতি নির্ধারণে প্রফেসর উ-এর
সহযোগিতা কামনা করেন।
উ একটি পরীক্ষার
পরিকল্পনা করেন যেখানে তেজস্ক্রিয় কোবাল্ট-৬০-এর একটি নমুনা তরল গ্যাস ব্যবহার করে
অত্যন্ত নিম্ন তাপমাত্রায় (ক্রায়োজেনিক তাপমাত্রা) ঠান্ডা করা হয়। কোবাল্ট-৬০ আইসোটোপ
বিটা কণার নির্গমনের মাধ্যমে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। অত্যন্ত নিম্ন তাপমাত্রা প্রয়োজন ছিল
কোবাল্ট পরমাণুগুলোর তাপীয় কম্পন প্রায় শূন্যে নামিয়ে আনার জন্য। পাশাপাশি তিনি
কোবাল্ট-৬০ নমুনার ওপর একটি নিরবচ্ছিন্ন চৌম্বক
ক্ষেত্র প্রয়োগ করেন, যাতে পরমাণুর নিউক্লিয়াসগুলোর স্পিন একই দিকে সারিবদ্ধ হয়।
এই ক্রায়োজেনিক পরীক্ষার জন্য তরল গ্যাস সংক্রান্ত বিশেষজ্ঞ সুবিধা দরকার হয়, যা
ছিল ন্যাশনাল ব্যুরো অব স্ট্যান্ডার্ডস (NBS)-এ। তাই তিনি তাঁর যন্ত্রপাতি নিয়ে মেরিল্যান্ডে
অবস্থিত NBS সদর দপ্তরে গিয়ে পরীক্ষাটি সম্পন্ন করেন।
লি ও ইয়াং-এর
তাত্ত্বিক হিসেব অনুযায়ী, যদি প্যারিটির সংরক্ষণ সূত্র সত্য না হয়, তবে কোবাল্ট-৬০
থেকে নির্গত বিটা কণাগুলো অসমমিতভাবে নির্গত হবে। উ-এর পরীক্ষার ফলাফল দেখায় যে বাস্তবেই
তা-ই ঘটে—দুর্বল নিউক্লিয়ার পারস্পরিক ক্রিয়ায় প্যারিটি সংরক্ষিত হয় না। পরবর্তীতে
কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর সহকর্মীরাও ভিন্ন পরীক্ষার মাধ্যমে এই ফলাফল নিশ্চিত
করেন। ফিজিক্যাল রিভিউর একই সংখ্যায় দুটি গবেষণাপত্রের মাধ্যমে ফলাফল প্রকাশিত হওয়ার
পর বিশ্বের বিভিন্ন গবেষণাগারেও তা নিশ্চিত করা হয়। প্যারিটি ভঙ্গের এই আবিষ্কার হাই-এনার্জি
ফিজিক্স এবং স্ট্যান্ডার্ড মডেলের বিকাশে এক যুগান্তকারী অবদান রাখে। তাঁদের তাত্ত্বিক
কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ লি ও ইয়াং ১৯৫৭ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।
কিন্তু কোনো এক অদৃশ্য কারণে উ-কে নোবেল পুরষ্কার থেকে বঞ্চিত করা হয়, অথচ উ-ই লি ও
ইয়াং এর তত্ত্ব পরীক্ষাগারে প্রমাণ করেন। তেইশবার মনোনয়ন পাবার পরও চিয়েন-শিউং উ নোবেল
পুরষ্কার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন এটি নোবেল পুরষ্কার কমিটির কলংক হিসেবে ইতিহাসে রয়ে গেছে।
নোবেল পুরষ্কার পাবার সব শর্ত পূরণ করা সত্ত্বেও যাঁরা নোবেল বঞ্চিত হয়েছেন, তাঁদেরকে
যোগ্য সম্মান দেয়ার উদ্দেশ্যেই ১৯৭৮ সাল থেকে চালু হয়েছে উল্ফ পুরষ্কার। পদার্থবিজ্ঞানে
প্রথম উল্ফ পুরষ্কার অর্জন করেছিলেন প্রফেসর উ।
এনরিকো ফার্মির
বিটা-ক্ষয় তত্ত্বের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য পরীক্ষণ-প্রমাণ দেন প্রফেসর উ। তাঁর রচিত “বিটা
ডিকে” বইটিকে এখনো নিউক্লিয়ার ফিজিক্সের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য রেফারেন্স বই হিসেবে ধরা
হয়।
কোয়ান্টাম এন্টেংগেলমেন্ট
এর বিখ্যাত আইনস্টাইন-পোডলস্কি-রোজেন (EPR) গবেষণাপত্রের সূত্র ধরে বিপরীতমুখী দুইটি
ফোটনের কোয়ান্টাম পোলারাইজেশনের পারস্পরিক সম্পর্ক পরীক্ষামূলকভাবে নিশ্চিত করেন প্রফেসর
উ। এটিই ছিল কোয়ান্টাম পূর্বাভাসের প্রথম পরীক্ষামূলক প্রমাণ।
পদার্থবিজ্ঞানের
জগতে প্রফেসর উ ম্যাডাম উ নামে খ্যাতিলাভ করেছেন। ১৯৫৮ সালে তিনি ন্যাশনাল একাডেমি
অব সায়েন্সের ফেলোশিপ পেয়েছেন। তিনি ছিলেন প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটির ইতিহাসের সর্বপ্রথম
নারী ডিএসসি ডিগ্রী অর্জনকারী। ১৯৭৫ সালে তিনি আমেরিকান ফিজিক্যাল সোসাইটির প্রেসিডেন্ট
নির্বাচিত হয়েছিলেন। আমেরিকান ফিজিক্যাল সোসাইটির তিনিই ছিলেন প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট।
সে বছরই তিনি অর্জন করেন আমেরিকার ন্যাশনাল মেডেল অব সায়েন্স।
১৯৯৭ সালের
১৬ ফেব্রুয়ারি চিয়েন-শিউং উ-র মৃত্যু হয়। আমৃত্যু তিনি একাডেমিক এবং অন্যান্য সব প্রতিষ্ঠানে
নারীদের সমান অধিকারের পক্ষে কাজ করে গেছেন।
২০২১ সালে আমেরিকান ডাকবিভাগ তাঁর সম্মানে ‘ফরএভার ইউএসএ’ সিরিজের ডাকটিকেট চালু করেন। আমেরিকান ডাক-বিভাগের ইতিহাসে এপর্যন্ত মাত্র আটজন পদার্থবিজ্ঞানী এই সম্মান পেয়েছেন। আলবার্ট আইনস্টাইন, এনরিকো ফার্মি, রিচার্ড ফাইনম্যান, রবার্ট মিলিক্যান, জন বারডিন, মারিয়া গোয়েপার্ট মেয়ারদের সারিতে তাঁর নাম লেখা হলো আরো একবার।
তথ্যসূত্র
১। ফিজিক্স
টুডে,ভল্যুম ৭৭, সংখ্যা ১২, ডিসেম্বর ২০২৪।
২। রুথ হাউইজ,
দেয়ার ডে ইন দ্য সান: ওম্যান অব দ্য ম্যানহাটান প্রজেক্ট, টেম্পল ইউনিভার্সিটি প্রেস,
ফিলাডেলফিয়া, ১৯৯৯।
৩। সাই-চিয়েন
চিয়াং, ‘ম্যাডাম উ চিয়েন-শিউং: দ্য ফার্স্ট লেডি অব ফিজিক্স’, ওয়ার্ল্ড সায়েন্টিফিক,
২০১৩।
৪। বায়োগ্রাফিক্যাল
এনসাইক্লোপিডিয়া অব সায়েন্টিস্ট, ওয়ার্ল্ড বুক্স, শিকাগো ২০০৩।
৫। আনা রেজার
ও লেইলা ম্যাকনিল, ‘ফোর্সেস অব ন্যাচার দ্য ওম্যান হু চেইঞ্জড সায়েন্স’, ফ্রান্সিস
লিংকন, লন্ডন, ২০২১।
_____________
বিজ্ঞানচিন্তা মার্চ ২০২৬ সংখ্যায় প্রকাশিত








No comments:
Post a Comment