Sunday, 27 September 2026

গুগলের জন্মদিনে

 

২৭ সেপ্টেম্বর গুগলের প্রাতিষ্ঠানিক জন্মদিন।  এ তারিখটি অবশ্য কিছুটা প্রতীকী। Google Inc. আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৯৮ সালের ৪ সেপ্টেম্বর। শুরুর সাত বছর ছোট্ট নতুন কোম্পানিটির জন্মদিন পালিত হয়েছে সেপ্টেম্বরের বিভিন্ন দিনে। ৪, ৭, ৮, ২৬ সেপ্টেম্বর গুগলের জন্মদিন পালন করার পর ২০০৬ সাল থেকে ২৭শে সেপ্টেম্বর গুগল তার আনুষ্ঠানিক জন্মদিন হিসেবে উদ্‌যাপন করে আসছে। সেই হিসেবে এবছর গুগলের বয়স হলো ২৮ বছর।

মানবসভ্যতার ইতিহাসে আটাশ বছর খুব দীর্ঘ সময় নয়। এই অল্প সময়ের মধ্যেই গুগল বদলে দিয়েছে পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের জ্ঞান অনুসন্ধান, যোগাযোগ, ভ্রমণ, পড়াশোনা, কেনাকাটা, কাজ এবং বিনোদনের ধরন। আরও গভীরভাবে বললে, গুগল বদলে দিয়েছে তথ্যের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক।

 

ইন্টারনেটে অনুসন্ধান

গুগলের উৎপত্তির কারণ বুঝতে হলে ফিরে যেতে হবে ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ের ইন্টারনেটে। তখন ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছিল। হাজার হাজার, পরে লক্ষ লক্ষ ওয়েবপেজ তৈরি হচ্ছিল। কিন্তু ইন্টারনেটে এত বিপুল তথ্যের ভিড়ে প্রয়োজনীয় ও নির্ভরযোগ্য তথ্য খুঁজে পাওয়া ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছিল।

সে সময়ও বিভিন্ন সার্চ ইঞ্জিন ছিল। সেগুলি কোনো বিশেষ শব্দ আছে এমন ওয়েবপেজ খুঁজে দিতে পারত। কিন্তু কোন্‌ ওয়েবপেজ বেশি গুরুত্বপূর্ণ, বেশি উপযোগী কিংবা বেশি বিশ্বাসযোগ্য— তা নির্ধারণে সেগুলি খুব দক্ষ ছিল না।

স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই স্নাতকোত্তর গবেষক ল্যারি পেজ ও সের্গেই ব্রিন সমস্যাটিকে একটু ভিন্নভাবে দেখতে শুরু করলেন। ধরা যাক, দুটি বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্রে একই বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। কোন গবেষণাপত্রটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তা কীভাবে বোঝা যাবে?

একটি উপায় হলো দেখা— অন্য গবেষকেরা কোন গবেষণাপত্রটিকে বেশি উদ্ধৃত করছেন। শুধু তাই নয়, কোনো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাপত্র থেকে পাওয়া একটি উদ্ধৃতির মূল্য হয়তো অপেক্ষাকৃত অপরিচিত গবেষণাপত্রের উদ্ধৃতির চেয়ে বেশি।

পেজ ও ব্রিন বুঝলেন, ওয়েবেও একই ধরনের যুক্তি প্রয়োগ করা যেতে পারে।

একটি ওয়েবপেজ থেকে অন্য একটি ওয়েবপেজে দেওয়া হাইপারলিংককে অনেকটা বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্রের উদ্ধৃতির মতো বিবেচনা করা যায়। যে পৃষ্ঠায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ ওয়েবপেজ থেকে লিংক এসেছে, সেটি নিজেও গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

এই ধারণা থেকেই তৈরি হলো বিখ্যাত PageRank অ্যালগরিদম।

তাঁদের পরীক্ষামূলক সার্চ ইঞ্জিনটির প্রথম নাম ছিল BackRub, কারণ সেটি এক ওয়েবপেজের সঙ্গে অন্য ওয়েবপেজের সংযোগ বা ‘back link’ বিশ্লেষণ করত।

পরে তাঁরা নাম বদলে রাখলেন Google। গুগল নামটির উৎস গণিতের googol শব্দটি—অর্থাৎ ১-এর পরে ১০০টি শূন্য বসালে যে বিশাল সংখ্যা পাওয়া যায়। পৃথিবীর প্রায় অকল্পনীয় পরিমাণ তথ্যকে সংগঠিত করার যে স্বপ্ন তাঁরা দেখছিলেন, তার সঙ্গে যথার্থ নাম গুগল। এভাবেই জন্ম নিল গুগল।

 

একটি প্রায় ফাঁকা সাদা পৃষ্ঠা

প্রথম দিকের গুগল হোমপেজ দেখলে অবাক হতে হয়। তখনকার অনেক ইন্টারনেট পোর্টাল ছিল সংবাদ, বিজ্ঞাপন, আবহাওয়া, ডিরেক্টরি, নানা রঙের লেখা ও ঝলমলে গ্রাফিকে ঠাসা। অথচ গুগলের পৃষ্ঠায় প্রায় কিছুই ছিল না। একটি লোগো। একটি সার্চ বক্স। আর দু-একটি ট্যাব।

কিন্তু সেই সরল সাদা পর্দার পেছনে কাজ করছিল অত্যন্ত জটিল একটি ব্যবস্থা, যা ওয়েবপেজ সংগ্রহ, সূচিবদ্ধ এবং গুরুত্ব অনুযায়ী বিন্যস্ত করত।

ব্যবহারকারীরা দ্রুতই একটি বিষয় বুঝতে পারলেন— অন্য অনেক সার্চ ইঞ্জিনের তুলনায় গুগল তাদের প্রয়োজনীয় তথ্য দ্রুত এবং তুলনামূলকভাবে দক্ষতার সাথে খুঁজে দিচ্ছে।

গুগলের ঘোষিত লক্ষ্যও ছিল বিরাট: পৃথিবীর তথ্যকে সংগঠিত করা এবং সেই তথ্যকে সর্বজনীনভাবে প্রবেশযোগ্য ও উপযোগী করে তোলা।

 

বিজ্ঞাপনের মহাশক্তি

একটি সার্চ ইঞ্জিন পরিচালনা করা মোটেও সস্তা কাজ নয়। এর জন্য প্রয়োজন বিপুলসংখ্যক কম্পিউটার সার্ভার, ডেটা সেন্টার, প্রকৌশলী এবং দ্রুতগতির ইন্টারনেট অবকাঠামো।

কিন্তু এসবের খরচ আসবে কোথা থেকে?

গুগলের উত্তরটি হয়ে উঠল ডিজিটাল যুগের সবচেয়ে সফল ব্যবসায়িক মডেলগুলোর একটি— মানুষ কী খুঁজছে, তার সঙ্গে সম্পর্কিত বিজ্ঞাপন দেখানো।

সব ব্যবহারকারীকে একই বিজ্ঞাপন দেখানোর বদলে গুগল মানুষের অনুসন্ধানের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল রেখে বিজ্ঞাপন দেখাতে শুরু করল। কেউ যদি প্যারিসের হোটেল খোঁজেন, তিনি দেখতে পারেন হোটেলের বিজ্ঞাপন। কেউ যদি ডিজিটাল ক্যামেরা খোঁজেন, তাঁর সামনে আসতে পারে ক্যামেরার বিজ্ঞাপন।

সার্চ ও লক্ষ্যভিত্তিক বিজ্ঞাপনের এই সংযোগ গুগলকে একটি মেধাবী বিশ্ববিদ্যালয়-গবেষণা প্রকল্প থেকে বিশ্বের সবচেয়ে লাভজনক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের একটিতে পরিণত করল।

২০০৪ সালে গুগল শেয়ারবাজারে প্রবেশ করে। কিন্তু তত দিনে এটাও স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল—সার্চ ইঞ্জিন গুগলের গল্পের কেবল প্রথম অধ্যায়।

 

জিমেইল এবং বর্ধিষ্ণু গুগল-জগৎ

২০০৪ সালের ১ এপ্রিল গুগল ঘোষণা করল Gmail। দিনটি ছিল এপ্রিল ফুলস ডে। Gmail ব্যবহারকারীদের জন্য এক গিগাবাইট বিনামূল্যের ই-মেইল স্টোরেজ দেওয়ার ঘোষণা করেছিল গুগল - সে সময় যা প্রায় অবিশ্বাস্য। তাই প্রথমে অনেকে ভেবেছিলেন, এটি হয়তো গুগলের এপ্রিল ফুলের রসিকতা। কিন্তু তা ছিল না।

Gmail গুগলের একটি গুরুত্বপূর্ণ দর্শনের পরিচয় দিল: যে কাজগুলো এত দিন ব্যক্তিগত কম্পিউটারে সীমাবদ্ধ ছিল, সেগুলো ধীরে ধীরে ইন্টারনেটের মাধ্যমে করা সম্ভব।

২০০৫ সালে এলো Google Maps। হঠাৎ করেই ওয়েব ব্রাউজার একটি জীবন্ত মানচিত্রে পরিণত হলো। মানচিত্র টেনে সরানো যায়, বড়-ছোট করা যায়, স্যাটেলাইট ছবি দেখা যায়।

এরপর স্মার্টফোনের আবির্ভাব Google Maps-কে আরও শক্তিশালী করে তুলল। পৃথিবীর একটি বড় অংশের মানুষের পকেটে সব সময় থাকা একটি নেভিগেশন ব্যবস্থা হয়ে উঠল এটি।

এরই মধ্যে গুগল দুটি প্রতিষ্ঠান কিনে নেয়, যেগুলো পরবর্তী সময়ে তার ভবিষ্যৎ বদলে দেয়। ২০০৫ সালে Android এবং ২০০৬ সালে YouTube।

তখন হয়তো কেউই পুরোপুরি বুঝতে পারেনি, এই দুটি অধিগ্রহণ কত বড় পরিবর্তন আনবে। Android পরবর্তী সময়ে বিশ্বের প্রধান স্মার্টফোন অপারেটিং সিস্টেমগুলোর একটিতে পরিণত হয়। আর YouTube হয়ে ওঠে মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ভিডিও, সংগীত, শিক্ষা এবং বিনোদনভিত্তিক প্ল্যাটফর্মগুলোর একটি।

গুগল তখন আর শুধু এমন একটি ওয়েবসাইট নয়, যেখানে মানুষ তথ্য খুঁজতে যায়। ধীরে ধীরে এটি হয়ে উঠলো ইন্টারনেটের অবকাঠামোর একটি অংশ।

 

ক্রোম এবং ব্রাউজারের লড়াই

২০০৮ সালে গুগল চালু করল Chrome।

একটি সার্চ ইঞ্জিন কোম্পানি কেন আবার ওয়েব ব্রাউজার তৈরি করবে? এর পেছনের যুক্তি ছিল স্পষ্ট। মানুষের কম্পিউটার ব্যবহারের ক্রমবর্ধমান অংশ তখন ওয়েব ব্রাউজারের মধ্যেই চলে আসছিল। ই-মেইল, ডকুমেন্ট, মানচিত্র, ভিডিও, কেনাকাটা এবং সামাজিক যোগাযোগ—সবকিছু ক্রমেই অনলাইনে স্থানান্তরিত হচ্ছিল। যদি ব্রাউজার হয় ইন্টারনেটে প্রবেশের প্রধান দরজা, তবে সেই দরজার নির্মাণেও গুগল অংশ নিতে চেয়েছিল।

Chrome পরবর্তী সময়ে বিশ্বের সবচেয়ে ব্যবহৃত ব্রাউজারগুলোর একটিতে পরিণত হয়। একই সঙ্গে Google Search, Gmail, Maps, YouTube, Drive, Photos এবং অন্যান্য সেবা কোটি কোটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে ওঠে।

একটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে এত বিপুলসংখ্যক মানুষের প্রতিদিনের কর্মকাণ্ডে এত গভীরভাবে প্রবেশ করা মানব ইতিহাসে বিরল ঘটনা।

 

জেনিফার লোপেজের পোশাক এবং Google Images-এর জন্ম

২০০০ সালে গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানে গায়িকা ও অভিনেত্রী জেনিফার লোপেজ একটি বিখ্যাত সবুজ Versace পোশাক পরে হাজির হন। তারপর অসংখ্য মানুষ গুগলে সেই পোশাকটির ছবি খুঁজতে শুরু করেন।

কিন্তু তখন Google Search মূলত টেক্সটভিত্তিক ওয়েব লিংক দেখাত। মানুষ শুধু পোশাকটি সম্পর্কে লেখা পড়তে চায়নি। তারা পোশাকটি দেখতে চেয়েছিল। এই বিপুল চাহিদাই Google Images তৈরির অন্যতম অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠে। ২০০১ সালে চালু হয় Google Images।

এই ছোট ঘটনাটির মধ্যে গুগলের বিবর্তনের একটি বড় বৈশিষ্ট্য লুকিয়ে আছে। মানুষ যখনই ইন্টারনেটের কাছে নতুন ধরনের কোনো প্রশ্ন করেছে, গুগলকে তখন নতুন ধরনের উত্তর দেওয়ার পদ্ধতি তৈরি করতে হয়েছে।

শব্দ থেকে এলো ছবি। ঠিকানা থেকে এলো মানচিত্র। কাছাকাছি জায়গা খোঁজার প্রয়োজন থেকে এলো অবস্থানভিত্তিক মোবাইল সার্চ। মুখে বলা প্রশ্ন থেকে গুরুত্ব পেল ভয়েস রিকগনিশন। ছবি থেকে এলো ভিজ্যুয়াল সার্চ। আর ক্রমশ জটিল হতে থাকা মানুষের প্রশ্ন গুগলকে ঠেলে দিল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দিকে।

 

অনুসন্ধান কাজে ঢুকে পড়ল মেশিন লার্নিং

গুগলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হঠাৎ করে ChatGPT আসার পর জন্ম নেয়নি। বরং বহু বছর ধরেই AI ধীরে ধীরে গুগলের বিভিন্ন সেবায় প্রবেশ করছিল।

আমরা গুগলে কোনো শব্দ ভুল বানানে লিখলে যে “Did you mean?” ধরনের সংশোধনী পরামর্শ দেখি, তা ছিল গুগলের প্রাথমিক মেশিন-লার্নিং প্রয়োগগুলোর একটি।

এরপর ধীরে ধীরে মেশিন লার্নিং গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে— অনুবাদে, কথা শনাক্তকরণে, ছবি চেনায়, স্প্যাম শনাক্তকরণে, বিজ্ঞাপন ব্যবস্থায় এবং সার্চ ফলাফল নির্ধারণে।

Google Translate-এর অনুবাদ ক্রমশ স্বাভাবিক হতে থাকে। Google Photos ছবিতে বস্তু ও মানুষ চিনতে শেখে। স্মার্টফোন মানুষের মুখে বলা নির্দেশ বুঝতে শেখে।

আর Google Search শুধু মানুষ কী শব্দ লিখছে সেটি নয়, বরং মানুষ আসলে কী জানতে চাইছে, তা বোঝার চেষ্টা করতে শুরু করে। অর্থাৎ গুগল ধীরে ধীরে শুধু তথ্য খুঁজে দেওয়া থেকে তথ্যের অর্থ বোঝার দিকে এগিয়ে যেতে শুরু করলো।

 

গুগল যখন গুগলের চেয়েও বড় হয়ে গেল

২০১৫ সালের মধ্যে গুগল এত ধরনের প্রকল্পে জড়িয়ে পড়লো যে কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতারা পুরো প্রতিষ্ঠানটিকে নতুনভাবে সাজানোর সিদ্ধান্ত নেন।

গঠন করা হয় নতুন মূল কোম্পানি Alphabet Inc. Google Search, Android, YouTube, Maps, Gmail এবং পরিচিত অন্যান্য সেবা মূল Google-এর মধ্যেই থাকে।

অন্যদিকে স্বয়ংচালিত গাড়ি কিংবা বিভিন্ন পরীক্ষামূলক প্রকল্প আলাদা প্রতিষ্ঠান হিসেবে Alphabet-এর অধীনে কাজ করার সুযোগ পায়।

ভারতীয় বংশোদ্ভূত প্রকৌশলী সুন্দর পিচাই, যিনি Chrome ও Android-এর বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন, ২০১৫ সালে Google-এর প্রধান নির্বাহী হন।

২০১৯ সালে ল্যারি পেজ ও সের্গেই ব্রিন দৈনন্দিন ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ালে সুন্দর পিচাই Alphabet-এরও প্রধান নির্বাহী হন।

স্ট্যানফোর্ডের দুই শিক্ষার্থী যে প্রকল্প শুরু করেছিলেন ইন্টারনেটে তথ্য খোঁজার পদ্ধতি উন্নত করতে, তা তত দিনে একটি সার্চ ইঞ্জিনের সীমা বহুদূর অতিক্রম করেছে।

 

মোবাইল ফার্স্ট থেকে এআই ফার্স্ট

এর মধ্যেই প্রযুক্তিজগতে আরেকটি বড় পরিবর্তন শুরু হয়ে গেছে। প্রায় এক দশক ধরে প্রযুক্তি শিল্পের কেন্দ্রবিন্দু ছিল স্মার্টফোন। কোম্পানিগুলো বলত, তাদের ভবিষ্যৎ হলো “mobile first”।

গুগল এরপর আরেক ধরনের ভবিষ্যতের কথা বলতে শুরু করল—“AI first”।

মোবাইল যুগে প্রশ্ন ছিল: কীভাবে সবার পকেটে কম্পিউটিং শক্তি পৌঁছে দেওয়া যায়?

AI যুগে প্রশ্নটি হয়ে দাঁড়াল: কীভাবে কম্পিউটার মানুষের ভাষা, ছবি, ধরণ, প্রেক্ষাপট এবং উদ্দেশ্য বুঝতে পারবে?

আধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিকাশে গুগলের গবেষকেরা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। নিউরাল নেটওয়ার্ক, ভাষা মডেল এবং বিশেষ করে Transformer architecture-এর বিকাশে গুগল-সংশ্লিষ্ট গবেষণা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

আজকের অনেক জেনারেটিভ AI প্রযুক্তির ভিত্তিতেই রয়েছে এই Transformer ধারণা। কিন্তু এরপর প্রযুক্তিজগতে এলো বড় এক ধাক্কা।

 

ChatGPT-এর ধাক্কা

২০২২ সালের শেষ দিকে OpenAI সাধারণ মানুষের জন্য ChatGPT উন্মুক্ত করে দিলে কোটি কোটি মানুষ নতুন ধরনের একটি তথ্যব্যবস্থার সঙ্গে পরিচিত হয়। এখানে মানুষ শুধু কয়েকটি কীওয়ার্ড লিখে ওয়েবসাইটের তালিকা পাচ্ছে না, বরং তারা স্বাভাবিক ভাষায় প্রশ্ন করছে এবং প্রায় মানুষের মতো লিখিত উত্তর পাচ্ছে।

গুগলের জন্য বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ প্রায় পঁচিশ বছর ধরে যে পদ্ধতি গুগলের অস্তিত্বের ভিত্তি ছিল, জেনারেটিভ AI সেই পদ্ধতিকেই প্রশ্নের মুখে ফেলল।

আগের মডেলটি ছিল: প্রশ্ন → সার্চ ইঞ্জিন → ওয়েবপেজ।

জেনারেটিভ AI সামনে আনল নতুন সম্ভাবনা: প্রশ্ন → AI → সরাসরি উত্তর।

গুগল দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানাল। Google Brain এবং DeepMind-কে একত্র করে তৈরি করা হলো Google DeepMind। গুগলের জেনারেটিভ AI মডেলগুলোর প্রধান পরিবার পরিচিত হলো Gemini নামে।

এরপর AI দ্রুত গুগলের বিভিন্ন সেবার মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। Search-এ AI-নির্মিত সারসংক্ষেপ দেখা যেতে শুরু করল। Gmail লেখা তৈরিতে সাহায্য করতে শুরু করল। Google Workspace ডকুমেন্ট ও উপস্থাপনা তৈরিতে সহায়তা করতে লাগল। Android-এর ভেতরে প্রবেশ করল Gemini।

AI শুধু লেখা নয়— ছবি, ভিডিও, শব্দ এবং বিভিন্ন ধরনের তথ্য একসঙ্গে বিশ্লেষণ করতে শিখতে শুরু করল।

Google Search-ও বদলাতে শুরু করল। এটি আর শুধু এমন একটি ব্যবস্থা নয়, যা প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট খুঁজে দেয়। ক্রমশ এটি এমন একটি ব্যবস্থায় রূপ নিচ্ছে, যা বহু উৎসের তথ্য ব্যবহার করে উত্তর তৈরি করার চেষ্টা করে।

 

‘Google করা’ এখন একটি ক্রিয়াপদ

গুগলের সবচেয়ে বড় সাংস্কৃতিক সাফল্য শুধু তার আয় কিংবা বাজারমূল্যে ধরা যায় না। তার নামটাই এখন একটি ক্রিয়াপদে পরিণত হয়েছে। মানুষ বলতে শুরু করেছে—“Google it.” “গুগলে খুঁজে দেখো।”

একসময় একটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে যথেষ্ট পরিশ্রম করতে হতো। একজন শিক্ষার্থীকে লাইব্রেরিতে যেতে হতো। একজন ভ্রমণকারীকে মানচিত্র বা অ্যাটলাস দেখতে হতো। স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্যের জন্য এনসাইক্লোপিডিয়া খুলতে হতো। গবেষককে মুদ্রিত সূচি বা গ্রন্থপঞ্জি ঘাঁটতে হতো। কোনো ফোন নম্বর জানতে টেলিফোন ডিরেক্টরি খুঁজতে হতো।

অথচ মাত্র কয়েক দশকের মধ্যে পৃথিবীর বিরাট জনগোষ্ঠী এমন এক অভ্যাসে অভ্যস্ত হয়ে গেল, যেখানে প্রায় যেকোনো প্রশ্ন একটি ছোট আয়তাকার বাক্সে লিখে কয়েক সেকেন্ডের ভগ্নাংশের মধ্যে উত্তর প্রত্যাশা করা যায়।

এই সুবিধা নিঃসন্দেহে অসাধারণ। কিন্তু এর ফলে নতুন সামাজিক ও বৈজ্ঞানিক প্রশ্নও তৈরি হয়েছে।

কোন্‌ তথ্যকে উপরে দেখানো হবে? কোন উৎসকে বিশ্বাসযোগ্য বলা হবে? একটি অ্যালগরিদম একজন ব্যবহারকারী সম্পর্কে কতটা তথ্য জানবে? ব্যক্তিগত তথ্য কীভাবে সুরক্ষিত থাকবে?

মানুষ যদি কোনো ওয়েবসাইটে না গিয়ে সার্চ পেজেই উত্তর পেয়ে যায়, তবে সংবাদমাধ্যম, লেখক ও ওয়েব প্রকাশকদের কী হবে? ভুল তথ্য থেকে নির্ভরযোগ্য তথ্য আলাদা করা হবে কীভাবে?

আর জেনারেটিভ AI-এর যুগে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হয়তো আরও গভীর। কম্পিউটার যখন শুধু তথ্যের উৎস খুঁজে দেয় না, বরং নিজেই উত্তর লিখে দেয়, তখন জ্ঞান অনুসন্ধানের অর্থ কীভাবে বদলে যায়?

এসব আর কেবল প্রকৌশলগত প্রশ্ন নয়। এসব এখন জ্ঞান, সমাজ, অর্থনীতি এবং ক্ষমতা সম্পর্কিত প্রশ্ন।

 

গুগলের ২৮তম জন্মদিন

২০২৬ সালে ২৮তম জন্মদিনে দাঁড়িয়ে গুগলকে ১৯৯৮ সালের সেই ছোট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রায় তুলনাই করা যায় না। Search এখনও তার কেন্দ্রস্থলে রয়েছে। কিন্তু এর চারপাশে তৈরি হয়েছে বিশাল এক প্রযুক্তি-জগৎ—Android, Chrome, YouTube, Gmail, Maps, Photos, Workspace, Google Cloud, Pixel ডিভাইস এবং ক্রমবর্ধমানভাবে Gemini কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।

গুগলের দৃশ্যমান পরিচয়েও AI যুগের ছাপ পড়েছে। ২০২৫ সালে প্রতিষ্ঠানটি পরিচিত চার রঙের ‘G’ লোগোতে আরও উজ্জ্বল গ্রেডিয়েন্ট নকশা চালু করে, যাকে তারা AI যুগে গুগলের বিবর্তনের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরে।

তবে এত পরিবর্তনের মধ্যেও একটি বিস্ময়কর ধারাবাহিকতা রয়েছে।

গুগলের পুরো ইতিহাসের কেন্দ্রে রয়েছে মানুষের একটি অত্যন্ত পুরোনো অভ্যাস—প্রশ্ন করা।

১৯৯৮ সালে প্রযুক্তিগত সমস্যাটি ছিল—কোটি কোটি ওয়েবপেজের মধ্যে প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠাটি কীভাবে খুঁজে পাওয়া যাবে?

আজ সমস্যাটি অনেক বেশি উচ্চাকাঙ্ক্ষী। একটি AI ব্যবস্থাকে হয়তো প্রশ্নটি বুঝতে হবে, বিভিন্ন ধরনের তথ্য বিশ্লেষণ করতে হবে, সেগুলোর মধ্যে সম্পর্ক খুঁজে বের করতে হবে, যুক্তি প্রয়োগ করতে হবে এবং শেষে মানুষের জন্য একটি ব্যবহারযোগ্য উত্তর তৈরি করতে হবে।

ফলে ল্যারি পেজ ও সের্গেই ব্রিনের সেই পরিচিত সার্চ বক্সটি ধীরে ধীরে অন্য কিছুতে পরিণত হচ্ছে। সার্চ এখন ক্রমশ কথোপকথনে রূপ নিচ্ছে।

গুগলের প্রথম ২৮ বছরের ইতিহাস প্রধানত ছিল মানুষকে তথ্য খুঁজে পেতে সাহায্য করার ইতিহাস। পরবর্তী অধ্যায়টি হয়তো হবে—যন্ত্রকে তথ্য এত ভালোভাবে বুঝতে শেখানো, যাতে সেই তথ্য মানুষ আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারে। এই রূপান্তর শেষ পর্যন্ত Google Search-এর জন্মের মতোই বৈপ্লবিক হবে কি না, তা এখনই বলা সম্ভব নয়।

তবে ইতিহাসটির মধ্যে একটি চমৎকার বৃত্ত যেন সম্পূর্ণ হচ্ছে। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থী আরও ভালোভাবে প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়ার জন্য যে প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছিলেন, সেই প্রতিষ্ঠান আজ তার অস্তিত্বের সবচেয়ে বড় প্রযুক্তিগত প্রশ্নের মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে - কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে ‘জ্ঞান অনুসন্ধান’ বলতে আসলে কী বোঝাবে?এই অনুসন্ধান-পথের শেষ কোথায়?


No comments:

Post a Comment

Latest Post

গুগলের জন্মদিনে

  ২৭ সেপ্টেম্বর গুগলের প্রাতিষ্ঠানিক জন্মদিন।   এ তারিখটি অবশ্য কিছুটা প্রতীকী। Google Inc. আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৯৮ সালের ৪ সে...

Popular Posts