ধীরে ধীরে চোখের আলো নিভে আসছিলো রিস হিবার্টের। পৃথিবীর আলো দেখার আশা ছেড়েই দিতে হয়েছিল তাঁকে। দু’বছর আগেও বেশ সুস্থ স্বাভাবিক ছিলেন তিনি। ইংল্যান্ডের বেডফোর্ড শায়ারের স্থানীয় একটি কোম্পানির কাস্টমার সার্ভিস ম্যানেজার রিস হিবার্ট। বেশ স্বাস্থ্যবান, স্বাস্থ্যসচেতন মানুষ। শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা সব ঋতুতেই নিয়ম করে হাঁটতে যান। ২০২৪-এর ডিসেম্বরের একদিন হাঁটতে গিয়ে হঠাৎ খিঁচুনি হয়ে জ্ঞান হারিয়ে পথে লুটিয়ে পড়েন বরফের উপর। হাসপাতালে নিয়ে যাবার পর ব্রেন স্ক্যান
করার পর দেখা গেল তাঁর পিটুইটারি গ্ল্যান্ডে এক সেন্টিমিটারের বড় আকারের একটি টিউমার। আধুনিক চিকিৎসাতেও তেমন কোন উন্নতি হচ্ছিল না। হরমোনের তীব্র ভারসাম্যহীনতার পাশাপাশি পিটুইটারি গ্ল্যান্ডের ভিতর ক্রমাগত বাড়তে থাকা টিউমারটি কাছেই অপটিক্যাল নার্ভে প্রচন্ড চাপ দিচ্ছিলো, ফলে কমছিল তাঁর দৃষ্টিশক্তি। হাঁটার সময় বার বার হোঁচট খেয়ে পড়ে যাচ্ছিলেন বলে লাঠি হাতে হাঁটতে হচ্ছিলো মাত্র ৪৮ বছর বয়সেই। সার্জারি ছাড়া অন্য কোন উপায় নেই। কিন্তু যেখানে তাঁর টিউমারটির অবস্থান – সেখানে সার্জারি করার ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি। একটু এদিক ওদিক হলেই অপটিক্যাল নার্ভ কাটা পড়বে এবং রিস হিবার্ট চিরতরে অন্ধ হয়ে যাবেন। লন্ডনের ন্যাশনাল হসপিটাল ফর নিউরোলজি অ্যান্ড নিউরোসার্জারির বিশেষজ্ঞ সার্জনরাও এই ঝুঁকি নিতে সাহস পাচ্ছিলেন না। কিন্তু তাঁদের আশার আলো দেখালো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।২০২৬
সালের মে মাসে লন্ডনের ন্যাশনাল হসপিটাল ফর নিউরোলজি অ্যান্ড নিউরোসার্জারির অপারেশন
থিয়েটারে চিকিৎসাবিজ্ঞান যেন নীরবে প্রবেশ করল এক নতুন যুগে। ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের
নিউরোসার্জারির প্রফেসর এবং ন্যাশনাল হসপিটালের বিশেষজ্ঞ নিউরোসার্জন হানি মার্কাস
এবং নিউরোসার্জিক্যাল রেসিডেন্ট ও ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের গবেষক ড্যানিয়েল খান মিলে
রিস হিবার্টের পিটুইটারি গ্ল্যান্ডের টিউমারটি অপসারণের জটিল সার্জারি করলেন। কিন্তু
তাঁদের সঙ্গে অপারেশন থিয়েটারে ছিল আরেকটি অদৃশ্য সহকারী—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এআই।
ইউনিভার্সিটি
কলেজ লন্ডনের হকস ইন্সটিটিউটে তৈরি করা হয়েছে এ ধরনের জটিল অপারেশনে সক্ষম এআই। এই
যান্ত্রিক মডেলকে বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত করে তোলা হয়েছে পিটুইটারি গ্ল্যান্ডের সার্জারির
কয়েক হাজার ভিডিও ডেটা বিশ্লেষণের মাধ্যমে। এই প্রশিক্ষিত এআই রিস হিবার্টের অপারেশনের
সময় যে এন্ডোস্কোপিক ভিডিওগুলি সরাসরি নেয়া হচ্ছিল - তার প্রতি মুহূর্তের নিখুঁত বিশ্লেষণ
করছিল। মস্তিষ্কের যেখানে পিটুইটারি গ্ল্যান্ড, গুরুত্বপূর্ণ রক্তনালি এবং দৃষ্টিশক্তি
নিয়ন্ত্রণকারী অপটিক নার্ভ কয়েক মিলিমিটারের ব্যবধানে পাশাপাশি অবস্থান করছে —যেখানে
সামান্য ভুলও অন্ধত্ব, স্ট্রোক, এমনকি মৃত্যুর কারণ হতে পারে—সেখানে এআই গুরুত্বপূর্ণ
স্নায়ু ও রক্তনালি শনাক্ত করে কালার কোডিং করছিল এবং সার্জনকে মস্তিষ্কের বিপজ্জনক
এলাকা এড়িয়ে যেতে সাহায্য করছিল। এআই এখানে নিজে অস্ত্রোপচারের ছুরি ধরেনি এবং সিদ্ধান্তও
নেয়নি। প্রফেসর হানি মার্কাস ও তাঁর দলই সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে ছিলেন। কিন্তু পৃথিবীতে
প্রথমবারের মতো লাইভ এআই যেন সার্জনের চোখের সঙ্গে যোগ করেছিল আরেক জোড়া ডিজিটাল চোখ।
এআই-এর
সহায়তায় অস্ত্রোপচার করে সফলভাবে রিস হিবার্টের টিউমারটি অপসারণ করা হয়। তাঁর দৃষ্টিশক্তি
পুরোপুরি রক্ষা পায়। অপারেশনের কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে যান রিস হিবার্ট।
মানুষ
চিকিৎসকের দক্ষতা ও বিচক্ষণতার সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই যৌথ প্রচেষ্টা আমাদের
দেখিয়ে দেয় – আধুনিক চিকিৎসায় এআই এর সক্রিয় অংশগ্রহণ আর দূরের ভবিষ্যতের কোনো ব্যাপার
নয়, ইতোমধ্যেই তা ঢুকে পড়েছে বিশ্বের আধুনিক অপারেশান থিয়েটারে। মেশিন লার্নিং আর আর্টিফিশিয়েল
ইন্টেলিজেন্স মিলে এখন অসাধ্য সাধন করার পথ দেখাতে শুরু করেছে চিকিৎসাবিজ্ঞানে। আমরা
এই নতুন দিগন্তকে যান্ত্রিক বুদ্ধিমত্তা নামে ডাকবো।
যান্ত্রিক
বুদ্ধিমত্তা নীরবে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের অন্যতম প্রভাবশালী সহায়কে পরিণত হয়েছে,
অথচ এর যাত্রা এখনও কেবল শুরু। চলুন দেখা যাক স্বাস্থ্যসেবায় এআই বর্তমানে কোথায়
দাঁড়িয়ে আছে, আগামী পাঁচ থেকে দশ বছরে কোথায় গিয়ে পৌঁছাবে।
চিকিৎসাসেবায় যান্ত্রিক বিপ্লব
চিকিৎসাক্ষেত্রে
এআই নতুন নয়। ১৯৭০-এর দশকেই রোগ সংক্রমণ শনাক্ত করার জন্য তৈরি করা হয়েছিল যান্ত্রিক
এক্সপার্ট সিস্টেম। ডেস্কটপ কম্পিউটার যুগের শুরু থেকে বিশেষ করে ১৯৯০-এর দশক থেকে
কম্পিউটারের সাহায্যে শনাক্তকরণ সফটওয়্যার স্তন ক্যান্সার শনাক্তকরণের লক্ষ্যে ম্যামোগ্রাম
বিশ্লেষণ করছে। এখন ডিপ লার্নিং এবং এআই সমন্বয়ে সেই কৌশল আরো উন্নত এবং স্বয়ংক্রিয়
হয়ে উঠেছে। রোগীর তথ্যের এক্স-রে বা অন্যান্য চিত্র নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করে ডাটা সংগ্রহ
করে সেখান থেকে বিভিন্ন প্যাটার্ন শিখে যান্ত্রিক বুদ্ধিমত্তা এখন বাস্তব প্রযুক্তি
তৈরি করেছে যা দিয়ে রোগ নির্ণয় হয়ে উঠছে স্বয়ংক্রিয় এবং অত্যন্ত দ্রুত এবং নিখুঁত।
বিশ্বব্যাপী নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলি প্রতিবছর শত শত যান্ত্রিক বুদ্ধিমত্তার প্রযুক্তি
অনুমোদন করছে বাজারজাত করার জন্য।
যুক্তরাষ্ট্রের
ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফডিএ) ১৯৯৫ সালে প্রথম এআই-সক্ষম চিকিৎসাযন্ত্র
অনুমোদন করে। পরবর্তী দুই দশকে বছরে একটু দুটি করে অনুমোদন দিত। কিন্তু ২০১৫ সাল থেকে
ডিপ-লার্নিংভিত্তিক ইমেজিং সরঞ্জাম তৈরি হতে
শুরু করল বেশ দ্রুত গতিতে। সংযুক্ত গ্রাফ থেকে দেখা যাচ্ছে ২০১৫ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে
এআই ও মেশিন লার্নিং সংযুক্ত চিকিৎসাযন্ত্রের অনুমোদনের সংখ্যা বিপুল হারে বেড়েছে।
![]() |
| এফডিএ অনুমোদিত নতুন যন্ত্রের সংখ্যা |
এই
যন্ত্রগুলোর অধিকাংশই রোগ নির্ণয়ের প্যারামিটার পরিমাপের ক্ষেত্রে স্বয়ংসম্পূর্ণ, কিন্তু স্বাধীন রোগনির্ণায়ক যন্ত্র
নয়। এদের বেশিরভাগই নির্দিষ্ট কাজের সিদ্ধান্ত-সহায়ক সরঞ্জাম। এই বুদ্ধিমান সফ্টওয়ারগুলি
রেডিওগ্রাফ, ম্যামোগ্রাফ, আলট্রাসনোগ্রাফ, সিটি এবং এমআরআই ইমেজ বিশ্লেষণ করে সন্দেহজনক
এবং অস্বাভাবিক কোন স্বাস্থ্যঝুঁকি দেখলে তা চিহ্নিত করে চিকিৎসকের নজরে নিয়ে আসতে
সক্ষম। এই প্রযুক্তিকে কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে তা এখনো চিকিৎসকের নিয়ন্ত্রণাধীন।
রোগনির্ণয়ে যান্ত্রিক চোখ
রোগনির্ণয়ে সহায়তা করার জন্য যত ধরনের
যান্ত্রিক বুদ্ধিমত্তা নির্ভর চিকিৎসাযন্ত্র উদ্ভাবিত হয়েছে তাদের বেশিরভাগই ব্যবহৃত
হচ্ছে রেডিওলজিতে। কার্ডিওলজি এবং নিউরোলজিতেও এদের ব্যবহার আস্তে আস্তে বাড়ছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের
অন্যান্য শাখার চেয়ে রেডিওলজি দ্রুত এআই গ্রহণ
করেছে। তার কারণ, ইমেজিং ঠিক সেই ধরনের ডেটা, যেখানে ডিপ লার্নিং সবচেয়ে ভালো কাজ
করে। এখন পর্যন্ত এফডিএ-অনুমোদিত সব এআই/এমএল যন্ত্রের প্রায় তিন-চতুর্থাংশই রেডিওলজিতে।
রেডিওগ্রাফ দেখে অস্বাভাবিকতা পর্যবেক্ষণ
ও পরিমাপ করে রোগনির্ণয় যেকোনো রেডিওলজিস্টই করতে পারেন। তবে সেখানে যান্ত্রিক বুদ্ধিমত্তা
ব্যবহারের বিশেষত্ব কী? এর বিশেষত্ব অনেক গভীরে। যান্ত্রিক বুদ্ধিমত্তার অ্যালগরিদম
বুকের সিটি স্ক্যান দেখে ফুসফুসে কোনো ক্যান্সার টিউমারের লক্ষণ আছে কি না সেটাও খুঁজে
বের করতে পারে। কার্ডিওগ্রাম থেকে স্ট্রোকের কোন লক্ষণ দেখলে তা অগ্রাধিকার দিয়ে কার্ডিওলজিস্টকে
সতর্ক করে দিতে পারে রোগীর ব্যাপারে। চোখের ব্যাপারে বিশেষ প্রশিক্ষণ নেই এমন টেকনোলজিস্টের
তোলা রেটিনার ছবি দেখেও যান্ত্রিক বুদ্ধিমত্তা সেখান থেকে ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি শনাক্ত করতে পারে যদি তেমন
কোনো সম্ভাবনা দেখে। মানুষের তুলনায় অনেক বেশি দক্ষতার সাথে রোগের লক্ষণ নির্ণয় করতে
পারে যান্ত্রিক বুদ্ধিমত্তা [১]।
যান্ত্রিক বুদ্ধিমত্তা কোনোভাবেই বিশেষজ্ঞ
চিকিৎসকদের বুদ্ধিমত্তাকে খাটো করছে না, বা চ্যালেঞ্জ করছে না। যথোপযুক্ত যান্ত্রিক
সুবিধা এবং পর্যাপ্ত সময় পেলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরাও সঠিকভাবে রোগনির্ণয় করতে পারেন।
কিন্তু মূল সমস্যা হলো পর্যাপ্ত সময়। একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসককে যে পরিমাণ রোগী দেখতে
হয়, তাতে কোন্ রোগীর রোগের তীব্রতা কত বেশি, এবং কার আগে কার চিকিৎসাসেবা জরুরি তা
নির্ণয় করা অনেক সময়েই দুরুহ হয়ে ওঠে। যান্ত্রিক বুদ্ধিমত্তা চিকিৎসকের এই জটিল দুরুহ
কাজগুলি বেশ সহজে সহজ করে তুলতে পারে। রোগীর ডিজিটাল স্ক্যানগুলি দেখার সাথে সাথে যান্ত্রিক
বুদ্ধিমত্তা রোগের তীব্রতা এবং চিকিৎসাসেবার প্রয়োজনীয়তারও সময়বিন্যাস করে ফেলতে পারে।
প্যাথলজি, ডার্মাটোলজি, কার্ডিওলজিতেও একইভাবে যান্ত্রিক বুদ্ধিমত্তা ব্যস্ত চিকিৎসকের
কাজের তালিকায় অগ্রাধিকার-নির্ধারক সহকারি হিসেবে ভূমিকা রাখছে।
কোলোনস্কোপিতে এআই
চিকিৎসা প্রক্রিয়ার মধ্যেই সক্রিয় পর্যবেক্ষক হয়ে উঠছে এআই। কোলোনোস্কোপিতে
চিকিৎসককে এন্ডোস্কোপ পরিচালনার পাশাপাশি বৃহদন্ত্রের ভেতরের পৃষ্ঠ পরীক্ষা করতে হয়।
ছোট পলিপ কখনো কখনো বাদ পড়তে পারে, বিশেষ করে যখন সেগুলো খুব সূক্ষ্ম বা অল্প সময়ের
জন্য দৃশ্যমান হয়। জি-আই জিনিয়াস মেডিকেল সিস্টেম কোলোনোস্কোপির সময় তৈরি হওয়া লাইভ
ভিডিওতে মেশিন লার্নিং সংযুক্ত করেছে। এটি এন্ডোস্কোপিক ইমেজ ক্রমাগত বিশ্লেষণ করে
এবং কোনো পলিপ বা সন্দেহজনক ক্ষতের মতো কিছু শনাক্ত করলে মনিটরে সেই অংশের চারপাশে
একটি দৃশ্যমান চিহ্ন দেখায়। এরপর চিকিৎসক ওই অঞ্চলটি আরও সতর্কভাবে পরীক্ষা করতে পারেন।
সন্দেহজনক ক্ষত বা টিউমার শনাক্ত করতে এই এআই/মেশিন লার্নিং ভিত্তিক সিস্টেম একটি সহায়ক
প্রযুক্তি – যা কোলন ক্যান্সার শনাক্তকরণে চিকিৎসকদের সহায়তা করছে। এখানে যান্ত্রিক
বুদ্ধিমত্তা কার্যত এমন একটি অতিরিক্ত পর্যবেক্ষকের ভূমিকা পালন করে, যে ক্লান্ত হয়
না, মনোযোগ হারায় না এবং প্রক্রিয়াটির যান্ত্রিক কাজের চাপে বিভ্রান্ত হয় না – যা
মানুষ ডাক্তারের ক্ষেত্রে হতেই পারে।
স্বয়ংক্রিয় রোগনির্ণয়ে যান্ত্রিক বুদ্ধিমত্তা
শুধুমাত্র অস্বাভাবিকতা খুঁজে বের করা
থেকে এগিয়ে গিয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে রোগ নির্ণয় করে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত দেয়া শুরু করেছে
যান্ত্রিক বুদ্ধিমত্তা। এর একটি যুগান্তকারী
উদাহরণ হলো IDx-DR, যা রেটিনার ছবি থেকে ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি শনাক্ত করার জন্য
তৈরি একটি এআই সিস্টেম। ৯০০ জন রোগীর উপর পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে IDx-DR প্রচলিত
মেডিকেল রেফারেন্স স্ট্যান্ডার্ড অনুসারে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি শনাক্ত
করতে পারে শতকরা ৯০ ভাগেরও বেশি সঠিকভাবে [২]। এই যান্ত্রিক ব্যবস্থা ২০১৮ সালে এফডিএ
অনুমোদন পায় বিশ্বের প্রথম স্বয়ংক্রিয় এআই ডায়াগনস্টিক সিস্টেম হিসেবে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের
অভাব আছে যেসব এলাকায়, উপযুক্ত ট্রেনিং এবং কোয়ালিটি কন্ট্রোলের নিশ্চয়তা দিয়ে এই যান্ত্রিক
বুদ্ধিমত্তা সেখানে উন্নত রোগনির্ণয়ের বিকল্প হতে পারে।
প্যাথোলজিতে যান্ত্রিক বুদ্ধিমত্তা
প্যাথলজি এমন একটি ক্ষেত্র যেখানে দৃশ্যমান তথ্যের ব্যাখ্যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্যাথোলজির একটি স্লাইডের ইমেজে বিপুল পরিমাণ তথ্য থাকতে পারে। কোটি কোটি কোষ থেকে
ক্যান্সার কোষ খুঁজে বের করে একজন প্যাথোলজিস্টকে উচ্চতর ম্যাগনিফিকেশানে স্লাইডের
আগাগোড়া তন্নতন্ন করে খুঁজতে হয়। ভীষণ দুরুহ এই কাজটি করতে গেলে চোখের উপরও প্রচন্ড
চাপ পড়ে। যান্ত্রিক বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে প্রোস্টেট ক্যান্সারের কোষ খুঁজে বের করার
উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে Paige Prostate ডায়াগনস্টিক সিস্টেম। এই সফটওয়্যার প্যাথলজিতে
ডিজিটাইজড প্রোস্টেট নিডল-বায়োপসি স্পেসিমেন-এ সন্দেহজনক প্রোস্টেট ক্যান্সার কোষ শনাক্ত
করতে পারে [৩]।
রেডিওথেরাপিতে যান্ত্রিক বুদ্ধিমত্তা
রোগ নির্ণয়ের সীমা অতিক্রম করে এখন চিকিৎসা পরিকল্পনাতেও প্রবেশ করছে যান্ত্রিক
বুদ্ধিমত্তা। রেডিওথেরাপি এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। আধুনিক রেডিয়েশান অনকোলজি প্রধানত নির্ভর করে অত্যন্ত উন্নত ইমেজিং, সেগমেন্টেশান,
ডোসিমেট্রি এবং অপটিমাইজেশানের ওপর। রেডিওথেরাপি শুরু করার আগে চিকিৎসকেরা সাধারণত
CT বা MRI ইমেজে টিউমার এবং আশপাশের অর্গান এট রিস্ক বা যেসব স্বাভাবিক কোষ রেডিয়েশান
দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে তাদের সীমানা নির্ধারণ করেন। শরীরের কোন অংশে চিকিৎসা
হচ্ছে তার ওপর নির্ভর করে শত শত সিটি ইমেজের স্লাইসে কনটোর বা এলাকা চিহ্নিত করে ডিজিটাল স্লাইসের উপর
টিউমারের সীমানা আঁকতে হতে পারে। এসব কনটোর-এ ভুল বা অসামঞ্জস্য পরবর্তীতে রেডিয়েশানের
ডোজের হিসেবকে প্রভাবিত করতে পারে।
যান্ত্রিক বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে তৈরি অটোম্যাটিক সেগমেনটেশান এখন এই প্রাথমিক
কাজের বড় অংশ সম্পাদন করতে পারে। সম্প্রতি ২০২৬ সালের জুলাই মাসে ভ্যারিয়ানের AI
Contouring VA10A-কে রেডিয়েশান থেরাপির জন্য রেডিওলজিক্যাল ইমেজ প্রসেসিং সফটওয়্যার
হিসেবে এফডিএ অনুমোদন পেয়েছে [৪]।
শুরু থেকে প্রতিটি এনাটমিক্যাল স্ট্রাকচার হাতে এঁকে দেওয়ার পরিবর্তে এআই সিস্টেম
প্রাথমিক কন্টোর তৈরি করতে পারে, এরপর যোগ্য ক্লিনিশিয়ানরা সেগুলো পরীক্ষা করেন, প্রয়োজনে
সংশোধন করেন এবং অনুমোদন দেন।
ভবিষ্যতে যান্ত্রিক বুদ্ধিমত্তার এই অগ্রগতি আরও
সমন্বিত ব্যবস্থার দিকে নিয়ে যেতে পারে।
যান্ত্রিক বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন রোবট
২০২২ সালে জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটির গবেষকেরা স্মার্ট টিস্যু অটোনোমাস রোবট
(STAR) ব্যবহার করে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক অর্জন করেছেন। যান্ত্রিক বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন এই সিস্টেমটি ল্যাপ্রোস্কোপিক ইনটেসটেনাইল অ্যানাসটোমোসিস, অর্থাৎ
অন্ত্রের দুটি প্রান্তকে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে যুক্ত করার কাজ অত্যন্ত নিপুণভাবে করতে
পারে [৫]। ইনটেসটাইনাল অ্যানাসটোমোসিস একটি অত্যন্ত জটিল সার্জিক্যাল কাজ। সেলাইয়ের
মধ্যবর্তী দূরত্ব, টান এবং অবস্থান খুব সতর্কভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। অন্যদিকে অন্ত্র
নরম, বিকৃতিযোগ্য এবং সামান্য নড়াচড়াতেই
এর অবস্থার পরিবর্তন হয়। সামান্য ভুলও এর নিঃসরণ বা অন্যান্য গুরুতর জটিলতার কারণ হতে
পারে। STAR-এর মধ্যে যান্ত্রিক দৃষ্টি, টিস্যু ট্র্যাকিং, সার্জিক্যাল প্ল্যানিং এবং
রোবোটিক কন্ট্রোলের সমন্বয় সাধন করা হয়েছে।
সিস্টেমটি সম্ভাব্য সার্জিক্যাল প্ল্যান তৈরি করতে এবং প্রক্রিয়াটির বড় অংশ
স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পাদন করতে পারে। STAR প্রমাণ করেছে যে মেশিন ভিজ্যুয়েল ফিডব্যাক
ব্যবহার করে শরীরের অভ্যন্তরে পরিবর্তনশীল পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে নমনীয় জীবন্ত
টিস্যুর ওপর ধারাবাহিক ও অত্যন্ত নির্ভুল জটিল কাজ সম্পাদন করতে পারে।
যান্ত্রিক বুদ্ধিমত্তার নিকট ভবিষ্যৎ
ভবিষ্যতের অপারেটিং থিয়েটার আজকের তুলনায় ভিন্ন ধরনের হয়ে যাবে। অস্ত্রোপচারের
আগের CT ও MRI স্বয়ংক্রিয়ভাবে একত্রিত হয়ে রোগীর একটি ত্রিমাত্রিক মডেল তৈরি করবে।
যান্ত্রিক বুদ্ধিমত্তা গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের গঠন শনাক্ত করে সর্বোত্তম সার্জারির জন্য
তৈরি হতে পারবে। অস্ত্রোপচারের সময় ক্যামেরা, আলট্রাসাউন্ড এবং ফ্লোরোসেন্স ইমেজিং
এই এনাটমিক্যাল ম্যাপ ক্রমাগত হালনাগাদ করতে থাকবে। রোবোটিক যন্ত্রপাতি কোষের চলাচল ও শারীরবৃত্তিক
সিগনাল পর্যবেক্ষণ করতে করতে পুনরাবৃত্তিমূলক কিংবা অত্যন্ত সূক্ষ্ম কাজ স্বয়ংক্রিয়ভাবে
সম্পাদন করতে পারবে। চিকিৎসক সার্জন সামগ্রিক কার্যপদ্ধতি তত্ত্বাবধান করবেন এবং অপ্রত্যাশিত
বা জরুরি পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞের দরকার হলে দায়িত্ব নেবেন।
অন্যান্য ক্ষেত্রেও একই ধরনের পরিবর্তন ঘটতে থাকবে। ক্যান্সারের চিকিৎসার সময়
টিউমার ছোট হয়ে গেলে বা অঙ্গের অবস্থান পরিবর্তিত হলে রেডিওথেরাপি সিস্টেম স্বয়ংক্রিয়ভাবে
ট্রিটমেন্ট রিপ্ল্যান করতে পারবে। ইনিটেনসিভ
কেয়ার ডাটা ক্রমাগত বিশ্লেষণ করে যান্ত্রিক বুদ্ধিমত্তা অতিদ্রুত ক্ষতিকর কোনকিছু স্পষ্ট
হওয়ার আগেই তা শনাক্ত করতে পারবে। ডিজিটাল প্যাথোলজি সিস্টেম পুরো স্লাইড পরীক্ষা
করে প্যাথলজিস্টকে সন্দেহজনক অঞ্চল দেখিয়ে দিতে পারবে। মেডিক্যাল ইমেজিং ডিজিটাল ক্লিনিক্যাল ইমেজ থেকে
এমন কোয়ান্টিটেটিভ ডাটাসেট তৈরি করতে পারবে যা ক্লিনিসিয়ান ও ইন্টেলিজেন্ট এলগরিদম
যৌথভাবে বিশ্লেষণ করবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনটি আসবে মানুষের চিকিৎসার ধারণায়। চিকিৎসাবিজ্ঞান
এমন একটি সময়ের দিকে এগোচ্ছে যখন কেবল তথ্য সংরক্ষণ ও প্রদর্শন নয়, যান্ত্রিক বুদ্ধিমত্তা
রোগীর তথ্য এবং ডাটা পর্যবেক্ষণ করতে, ব্যাখ্যা করতে, রোগের পূর্বাভাস দিতে, চিকিৎসার সুপারিশ করতে এবং ক্রমশ সরাসরি চিকিৎসার
কাজ সম্পাদন করতে সক্ষম হবে।
তথ্যসূত্র
১।
U.S. Food and Drug
Administration. FDA permits marketing of clinical decision support software
for alerting providers of a potential stroke in patients. U.S. FDA (2018).
২। Abràmoff, M. D., Lavin, P. T.,
Birch, M., Shah, N., & Folk, J. C. Pivotal trial of an autonomous AI-based
diagnostic system for detection of diabetic retinopathy in primary care
offices. npj Digital Medicine, 1, 39 (2018).
৩। U.S. Food and Drug
Administration. Paige Prostate, De Novo DEN200080. U.S. FDA (2021).
৪। U.S. Food and Drug
Administration. AI Contouring (VA10A), Varian Medical Systems, 510(k)
K261306. Decision July 10, 2026.
৫। Saeidi, H., Opfermann, J. D.,
Kam, M., et al. Autonomous robotic laparoscopic surgery for intestinal
anastomosis. Science Robotics, 7(62), eabj2908 (2022).
doi:10.1126/scirobotics.abj2908.
৬। Kim, J. W. B., Chen, J.-T.,
Hansen, P., et al. SRT-H: A hierarchical framework for autonomous surgery
via language-conditioned imitation learning. Science Robotics, 10(104),
eadt5254 (2025). doi:10.1126/scirobotics.adt5254.
_____________
বিজ্ঞানচিন্তা সেপ্টেম্বর ২০২৬ সংখ্যায় প্রকাশিত









No comments:
Post a Comment