Saturday, 18 April 2020

জগদীশচন্দ্র বসু - পর্ব ২৫


বেলাশেষে

শরীর ভেঙে পড়ছে জগদীশচন্দ্রের। এখনো তিনি বিজ্ঞান-মন্দিরের আচার্য। বিজ্ঞান-মন্দিরের উন্নতির জন্য কাজ করে যাচ্ছেন অবিরাম। ট্রানজেকশানের প্রধান সম্পাদক তিনি। পেপার দেখার কাজ করে যাচ্ছেন নিষ্ঠার সাথে। কোয়ালিটির সাথে আপোষ করার মানুষ নন তিনি। বিজ্ঞান-মন্দিরের আরো দুটো ছোট শাখা খুলেছেন তিনি। দার্জিলিং-এর বাড়ী 'মায়াপুরী'তে একটি এবং অন্যটি ফলতায় গঙ্গার তীরে একটি বাড়িতে। গরমের সময় তিনি থাকেন দার্জিলিং-এ। শীতকালে থাকেন গিরিডিতে। তাছাড়া সপ্তাহের শেষে ফলতায় যান। উলুবেড়িয়ায় একটি ডাকবাংলো তিনি পেয়েছেন সরকারি বরাদ্দ হিসেবে। সেখানেও থাকেন মাঝে মাঝে। বন্ধু ডাক্তার নীলরতন সরকার তাঁকে বেশি কাজ করতে নিষেধ করেছেন। কিন্তু কাজের চাপ ও নেশা এড়ানো কঠিন।
১৯৩১ সালের ১৪ এপ্রিল কলকাতা পূরসভার পক্ষ থেকে নাগরিক সম্বর্ধনা দেয়া হয় জগদীশচন্দ্রকে। সাহিত্য, বিজ্ঞান ও শিল্পে প্রতিভার স্বীকৃতি দেয়ার লক্ষ্যে ১৯২৫ সালে আরম্ভ হয়েছিল "শ্রীসয়াজীরাও গায়কোয়ার প্রাইজ অ্যান্ড অ্যানুইটি" নামে একটি বৃত্তি। এককালীন এক হাজার টাকা এবং তারপর বার্ষিক বারো শ' টাকা করে এই বৃত্তি দেয়া হলো জগদীশচন্দ্রকে ১৯৩১ সালের ২৮ মার্চ। খুশিমনে এই বৃত্তি গ্রহণ করলেন জগদীশচন্দ্র।
          ১৯৩১ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ৭০তম জন্মবার্ষিকী। এ উপলক্ষে সমগ্র দেশবাসীর পক্ষ থেকে কলকাতায় কবিকে গণসম্বর্ধনা দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। কমিটির সভাপতি করা হয় জগদীশচন্দ্রকে। এ উপলক্ষে প্রকাশিত হয় স্মারক গ্রন্থ "Golden Book of Tagore"। জগদীশচন্দ্র এই স্মারকগ্রন্থে তাঁর কাছের বন্ধুর সাথে সুসম্পর্কের পাশাপাশি বিশ্বে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবদানের কথাও স্মরণ করেন। কিন্তু ১৯৩১ সালের ২৭ ডিসেম্বর তারিখে অনুষ্ঠিত এই রবীন্দ্রজয়ন্তী উৎসবে উপস্থিত থাকতে পারেননি জগদীশচন্দ্র। জগদীশচন্দ্রের ৭০তম জন্মবার্ষিকীতে যেমন উপস্থিত থাকতে পারেননি রবীন্দ্রনাথ, এখানেও ঠিক সেরকমই হলো। গিরিডি থেকে শুভেচ্ছা-বাণী পাঠিয়েছিলেন জগদীশচন্দ্র। সেটাই পাঠ করা হলো অনুষ্ঠানে।
          দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পায়ঁতারা শুরু হয়ে গেছে। ব্রিটিশ সরকারের ওপর ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের চাপও বাড়ছে। এ অবস্থায় সরকার ব্যাপক ব্যয়-সংকোচন নীতি গ্রহণ করলেও এতদিন উপর মহলের সাথে জগদীশচন্দ্রের ভালো সম্পর্কের কারণে বিজ্ঞান-মন্দিরের বার্ষিক এক লক্ষ টাকা বরাদ্দে কোন টান পড়েনি। কিন্তু প্রাদেশিক সরকারে এ নিয়ে খুব সমালোচনা শুরু হয়েছে। পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটি মন্তব্য করেছে, "সরকার যখন সব জায়গায় গবেষণা বৃত্তি বন্ধ করে দিয়েছে, এমনকি পুসার একান্ত দরকারি কৃষি-গবেষণার খরচও দেয়া যাচ্ছে না, সেখানে বসু-বিজ্ঞান-মন্দিরের উচিত সরকারের ব্যয়-সংকোচন নীতি বিনাবাক্যে মেনে নেয়া।"
          ভারত-সচিবের পক্ষেও আর সম্ভব হচ্ছে না বিজ্ঞান-মন্দিরের জন্য বছরে এক লক্ষ টাকা করে দেয়ার পক্ষে কথা বলা। তবুও ১৯৩২-৩৩ সালের জন্য বিজ্ঞান-মন্দিরের জন্য ৫৩ হাজার টাকা দেয়া হলো। জগদীশচন্দ্র বেশ চিন্তিত হয়ে পড়লেন। কীভাবে খরচ কমাবেন এত বড় প্রতিষ্ঠানের!
          উচ্চ রক্তচাপ ও অন্যান্য আরো শারীরিক উপসর্গ দেখা দিতে শুরু করলো জগদীশচন্দ্রের। ৭৫ বছর বয়সে সেটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। এর মধ্যেই ১৯৩৩ সালে বেনারস হিন্দু ইউনিভার্সিটি এবং ১৯৩৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সম্মানসূচক ডিএসসি ডিগ্রি প্রদান করে জগদীশচন্দ্রকে।
          ১৯৩৫ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজ সম্বর্ধনা দেয় জগদীশচন্দ্রকে। ৫০ বছর আগে প্রেসিডেন্সি কলেজে যোগ দিয়েছিলেন জগদীশচন্দ্র। সে উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলার তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী আজিজুল হক।
          ১৯৩৭ সালের ২রা নভেম্বর রায়বাহাদুর এ এন মিত্রের আমন্ত্রণে শীতকালীন অবকাশ যাপনের জন্য বিহারের গিরিডিতে আসেন জগদীশচন্দ্র। তখন তিনি উচ্চরক্তচাপে ভুগছিলেন এবং শরীর ক্রমশ খারাপের দিকে যাচ্ছিল। পরিকল্পনা ছিল ২৮শে নভেম্বর কলকাতায় ফিরে এসে ৩০শে নভেম্বরের জন্মোৎসব ও বিজ্ঞান মন্দিরের প্রতিষ্ঠা দিবসের অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন। কিন্তু তা আর হয়ে ওঠেনি। ২৩শে  নভেম্বর সকাল আটটায় গিরিডিতে রায় বাহাদুর এ এন মিত্রের বাড়িতে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যান উপমহাদেশের বিজ্ঞান গবেষণার জনক স্যার জগদীশচন্দ্র বসু।
          দ্রুত সংবাদ ছড়িয়ে পড়লো। গিরিডি থেকে তাঁর দেহ নিয়ে আসা হলো কলকাতায়। মহানগরীর রাজপথে শোকযাত্রা শেষে তাঁর শেষকৃত্য সম্পাদিত হয়।
          জগদীশচন্দ্র বসু মৃত্যুর আগে যে উইল করে গেছেন সেখানে নিবেদিতার স্মৃতি রক্ষার্থে এক লক্ষ টাকা রেখে গেছেন অবলা বসু সেই টাকা দিয়ে তাঁদের স্থাপিতবাণী মন্দিরনিবেদিতা হলনির্মাণ করান

বিড়লা ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড টেকনোলজিক্যাল মিউজিয়ামে জগদীশের মূর্তি


জগদীশচন্দ্র বসু - পর্ব ২৪




বৈজ্ঞানিক সফর - ১০, ১১

১৯২৯ সালের মাঝামাঝি দশম বৈজ্ঞানিক সফরে লন্ডন এসে পৌঁছান জগদীশচন্দ্র। নতুন ভারতসচিব উইলিয়াম ওয়েজউড বেন জগদীশচন্দ্রকে সম্বর্ধনা জানিয়ে ইন্ডিয়া অফিসে একটি বক্তৃতাসভার আয়োজন করেন। জগদীশচন্দ্র সেখানে বৈজ্ঞানিক বক্তৃতা দেন। ভারতবর্ষে তখন স্বাধীনতার আন্দোলন তুঙ্গে। ইন্ডিয়া অফিসের সভায় সে প্রসঙ্গেও কথা হয়।
          জগদীশচন্দ্র বসু নিজেকে আশ্চর্য উপায়ে স্বাধীনতার আন্দোলন থেকে দূরে রেখে সরকারের পক্ষ থেকে তাঁর বিজ্ঞান-মন্দিরের জন্য সুযোগ সুবিধা আদায় করেছেন। 'ভারতের গণ-অসন্তোষ' সম্পর্কে তাঁকে যখন প্রশ্ন করা হয় তখন তিনি উত্তর দেন অর্থনৈতিক সঙ্কট-ই এর জন্য দায়ী এবং বিজ্ঞান সম্মত উপায়ে প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণের দ্বারাই এই সমস্যার সমাধান সম্ভব।[1] ভারতে যে স্বাধীনতার সংগ্রাম চলছে সে প্রসঙ্গে তিনি কিছুই বলেননি।
          জুলাই মাসের মাঝামাঝি জগদীশচন্দ্র লন্ডন থেকে ভিয়েনায় যান ইন্টেলেকচুয়াল কো-অপারেশান কমিটির অধিবেশনে যোগ দেয়ার জন্য। কয়েকদিনের সমাবেশ শেষে তিনি খুব অসুস্থ হয়ে পড়েন। এই বয়সে এত ধকল সহ্য করা তো সহজ কথা নয়। ফিনল্যান্ড অ্যাকাডেমি অব সায়েন্স জগদীশচন্দ্রকে সম্মানিত সদস্যপদ দিয়ে সম্মানিত করে এসময়। ১৯২৯ সালে প্রকাশিত হয় জগদীশচন্দ্রের ১৪তম ও শেষ বই Growth and Tropic Movements of Plants.
          ১৯৩০ সালে শেষবারের মতো ইন্টেলেকচুয়াল কো-অপারেশান কমিটির অধিবেশনে যোগ দেয়ার জন্য ভিয়েনা যান জগদীশচন্দ্র। ওটাই ছিল তাঁর কমিটির সদস্যপদের শেষ বছর। এতদিন কমিটির সভাপতি ছিলেন বিখ্যাত গাণিতিক পদার্থবিজ্ঞানী লরেঞ্জ। তাঁর মৃত্যুর পর কমিটির নতুন সভাপতি হয়েছেন অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির গ্রিক-সাহিত্যের অধ্যাপক গিলবার্ট মারে। আর সহ-সভাপতি হয়েছেন নোবেল-বিজয়ী বিজ্ঞানী মেরি কুরি। তাঁদের সাথে পরিচয় এবং সৌহার্দ্যপূর্ণ আলোচনা হয় জগদীশচন্দ্রের। মেরি কুরির শরীরও তখন খুব একটা ভালো যাচ্ছিলো না। কমিটিতে সেবছর জগদীশচন্দ্রের শেষ বছর হিসেবে গত পাঁচ বছর ধরে কমিটিতে জগদীশচন্দ্রের অবদানের জন্য ধন্যবাদ জানানো হয়।
          জার্মান অ্যাকাডেমি ফর সায়েন্টিফিক রিসার্চ জগদীশচন্দ্রকে মেম্বারশিপ প্রদান করে সম্মান জানায়।
          ১৯৩০ সালটা ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের বিজ্ঞানের জন্য একটি নতুন মাইলফলক। এবছর পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন চন্দ্রশেখর ভেঙ্কট রামন। শুধু ভারত নয়, সমগ্র এশিয়ায় বিজ্ঞানে প্রথম নোবেল পুরষ্কার পেলেন ভারতীয় বিজ্ঞানী রামন।


চন্দ্রশেখর ভেঙ্কট রামন




         
তিনি তাঁর পুরো গবেষণা করেছেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় এবং মহেন্দ্রলাল সরকারের কাল্টিভেশান সেন্টারে। জগদীশচন্দ্রের পরোক্ষ ছাত্র এবং সহকর্মী ছিলেন রামন। কাল্টিভেশান সেন্টারে জগদীশচন্দ্র বসুও বিজ্ঞান-বক্তৃতা দিয়েছিলেন তাঁর ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি - জগদীশচন্দ্র কখনোই রামনের গবেষণার ব্যাপারে কোন আগ্রহ দেখাননি। এমনকি তাঁর নোবেল পুরষ্কার পাবার ব্যাপারটি নিয়েও কিছু বলেছেন বলে শোনা যায়নি।



[1] লন্ডন টাইম্‌স, ২০ জুলাই ১৯২৯।

জগদীশচন্দ্র বসু - পর্ব ২৩



৭০তম জন্মদিন

১৯২৮ সালে জগদীশচন্দ্রের বয়স হলো ৭০ বছর। কিন্তু সমানে কাজ করে যাচ্ছেন তিনি। তাঁর ত্রয়োদশ গ্রন্থ Motor Mechanism of Plants প্রকাশিত হয় এবছর। তাঁর বিজ্ঞান-মন্দিরের বয়সও ১১ বছর হয়ে গেলো।
          ৩০শে নভেম্বর সত্তর বছর পূর্তি উপলক্ষে ১লা ডিসেম্বর বসু বিজ্ঞান মন্দিরে সম্বর্ধনা দেয়া হয় জগদীশচন্দ্রকে। বাংলার প্রায় সব বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব উপস্থিত ছিলেন সেই সভায়। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অসুস্থতার কারণে উপস্থিত থাকতে পারেননি। তবে তিনি "শ্রীযুক্ত জগদীশচন্দ্র বসু" শীর্ষক একটি দীর্ঘ কবিতা লিখে পাঠান। অনুষ্ঠানে সেই কবিতাটি পাঠ করা হয়:

            "যেদিন ধরণী ছিল ব্যথাহীন বাণীহীন মরু,
          প্রাণের আনন্দ নিয়ে, শঙ্কা নিয়ে, দুঃখ নিয়ে, তরু
          দেখা দিল দারুণ নির্জনে। কত যুগ যুগান্তরে
          কান পেতে ছিল স্তব্ধ মানুষের পদশব্দ তরে
          নিবিড় গহন তলে। যবে এল মানব অতিথি,
          দিল তারে ফুল ফল, বিস্তারিয়া দিল ছায়াবীথি।
          ... ... ... ...।"[1]

ভারত এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মনিষীরা শুভেচ্ছা-বাণী পাঠান জগদীশচন্দ্রের ৭০তম জন্মদিন উপলক্ষে। ভিয়েনার বিখ্যাত উদ্ভিদবিজ্ঞানী প্রফেসর মোলিশ তখন বিজ্ঞান-মন্দিরে সম্মানিত অতিথি। জগদীশচন্দ্র বসুর জন্মদিন এবং বিজ্ঞান-মন্দিরের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে তিনি কলকাতায় চলে এসেছেন। সেবার তিনি এক বছর বিজ্ঞান-মন্দিরে থেকে জগদীশচন্দ্রের গবেষণাগুলো দেখেছেন এবং পরে ভিয়েনায় গিয়ে তা প্রয়োগ করেছেন।
          জগদীশচন্দ্রের প্রেসিডেন্সি কলেজের এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্রদের অনেকেই এসেছিলেন সেই অনুষ্ঠানে। এলাহাবাদ থেকে এসেছিলেন অধ্যাপক মেঘনাদ সাহা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গিয়েছিলেন সত্যেন বসু। জগদীশচন্দ্রের ভাগনে অধ্যাপক দেবেন্দ্রমোহন বসুও ছিলেন সেখানে।


ছাত্রদের সাথে জগদীশচন্দ্র বসু। সামনে বসা মেঘনাদ সাহা, জগদীশচন্দ্র বসু, জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ; পেছনে দাঁড়ানো স্নেহময় দত্ত, সত্যেন্দ্রনাথ বসু, দেবেন্দ্রমোহন বসু, নিখিল রঞ্জন সেন, জ্ঞানেন্দ্র নাথ মুখোপাধ্যায়, ও নগেন্দ্রচন্দ্র নাগ।





[1] প্রবাসী, পৌষ ১৩৩৫। 'বনবাণী' গ্রন্থের ২য় কবিতা।

জগদীশচন্দ্র বসু - পর্ব ২২


বৈজ্ঞানিক সফর - ৬, ৭, ৮, ৯

পঞ্চম বৈজ্ঞানিক সফর শেষ করে দেশে ফেরার পর বিজ্ঞান-মন্দিরের গবেষণায় নতুন প্রাণের সঞ্চার হয়। অতি দ্রুত সেখানে উদ্ভাবিত হয় অনেকগুলো নতুন যন্ত্র। ম্যাগনেটিক রেডিওমিটার, কন্ডাক্টিভিটি ব্যালান্স, ফটোসিন্থেটিক রেকর্ডার প্রভৃতি যন্ত্রেই মৌলিক গবেষণার প্রমাণ। খুব কম সময়ের মধ্যেই শতাধিক পরীক্ষা শেষ করে ফলাফলগুলো লিখে ফেলেন জগদীশচন্দ্র। গবেষণাপত্রের পাশাপাশি সপ্তম গ্রন্থ Life Movements in Plants, Volumes III and IV (in one volume) প্রকাশিত হয় ১৯২১ সালে এবং পরের বছর অষ্টম গবেষণাগ্রন্থ The ascent of Sap প্রকাশিত হয়।
          এই সময় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিশ্বভারতীর ভাইস-প্রেসিডেন্ট হবার অনুরোধ জানিয়ে চিঠি লেখেন জগদীশচন্দ্রকে:
            "বিশ্বভারতীকে এইবার সাধারণের হাতে সমর্পণ করে দিচ্ছি। তোমাকে এর ভাইস-প্রেসিডেন্ট আসনে বসাতে চাই। সম্মতি লিখে পাঠিয়ো। বেশী দায়িত্ব নেই, কেবল তোমার নামের সঙ্গে যোগ না থাকলে চলবে না - সময় যদি পাও এই সূত্রে কাজের যোগও ঘটবে। ভেবেছিলুম দার্জিলিঙে তোমাদের পাড়ায় ঘুরে আসব, অমনি তোমাকে বিশ্বভারতীর constitution দেখিয়ে সভ্য করে আসব।"
            জগদীশচন্দ্র রবীন্দ্রনাথের এই আহ্বানে সম্মতি দিয়েছিলেন।
          ১৯২৩ সালে ষষ্ঠবারের মত ইওরোপে যান জগদীশচন্দ্র। এবার সাথে নিয়ে যান নতুন যন্ত্র ফটোসিন্থেটিক রেকর্ডার। উদ্ভিদের ক্লোরোফিল সূর্যের আলোর সহায়তায় পানি ও কার্বন-ডাই-অক্সাইড থেকে খাদ্য তৈরি করে। এই প্রক্রিয়ার নাম সালোক-সংশ্লেষণ বা ফটোসিন্থেসিস। জগদীশচন্দ্রের এই রেকর্ডার সালোক-সংশ্লেষণের মাত্রা পরিমাপ করতে পারে।   
          এই যন্ত্রটির উপরের অংশে একটি ছোট কাচের নলের পাশে একটি সরু ইউ-টিউব সংযুক্ত থাকে। ইউ-টিউবটির বাইরের মুখ ফানেলের আকারে নির্মিত। কাচের নলের উপরের মুখটি দরকার মতো খোলা ও বন্ধ করা যায়। নলের নিচের অংশটি একটি রবারের ছিপির মধ্যে প্রবেশ করানো থাকে। একটি পানিপূর্ণ কাচের শিশির মধ্যে জলজ উদ্ভিদ ভর্তি করে কাচের নল সহ ছিপিটা মুখে এঁটে বসানো হয়। এরপর ফানেলের মুখে ছোট্ট একটি পারদ-বিন্দু দেয়া হয়। পারদ-বিন্দুটি ইউ-টিউবের মধ্যে বাতাস ঢোকার পথ বন্ধ করার ভাল্‌বের কাজ করে। ভাল্‌বযুক্ত ইউ-টিউবের অংশটিকে বাব্‌লার বলা হয়। শিশিটিকে সূর্যের আলোতে রাখলে উদ্ভিদের সালোক-সংশ্লেষণ প্রক্রিয়া চলতে থাকে। এর ফলে নির্গত অক্সিজেন শিশির উপরের অংশে জমা হয়ে পারদের ভাল্‌বটির উপর চাপ দেয়। এই চাপ একটা নির্দিষ্ট সীমা অতিক্রম করলে পারদের ভাল্‌বটি উপরে উঠে গিয়ে কিছু পরিমাণ অক্সিজেন বেরিয়ে যাবার পথ করে দেয়।

স্বয়ংক্রিয় ফটোসিন্থেটিক রেকর্ডার। S- বাব্‌লার; E- প্লাটিনাম তার, পারদবিন্দু M-এর উপর অবস্থিত; D-ড্রাম; W-তড়িৎ-চুম্বকীয় লেখনী।


এভাবে কিছুক্ষণ পর পর ভাল্‌বটি উপরে উঠে গিয়ে প্রত্যেক বার সমপরিমাণ অক্সিজেন নির্গত হতে সাহায্য করে। পারদ-বিন্দুটির ঠিক উপরে দুটি সূক্ষ্ম প্লাটিনামের তার এমনভাবে বসানো থাকে যেম ভাল্‌বটি উপরে ওঠা মাত্রই ঐ প্লাটিনামের তার দুটিকে একসঙ্গে স্পর্শ করতে পারে। তার ফলে বৈদ্যুতিক সংযোগ স্থাপিত হয় এবং শিশিটির পাশে রাখা একটি তড়িৎ-চৌম্বকীয় লেখনীর সাহায্যে ঘুরন্ত ড্রামের উপর একটি করে বিন্দু আঁকা হয়ে যায়। এই বিন্দুর সংখ্যা এবং সময় হিসেব করে সালোক-সংশ্লেষণের হার নির্ণয় করা যায়।
[1]
          ইওরোপের বিজ্ঞানীরা তাঁর এই যন্ত্র দেখে খুবই বিস্মিত হন। এবারো তিনি বক্তৃতা করেন লন্ডন ইউনিভার্সিটি কলেজে (১৫/১১/১৯২৩), লীড্‌স ইউনিভার্সিটি (২০/১১/১৯২৩), লন্ডন ইম্পেরিয়াল কলেজ অব সায়েন্স (২৬/১১/১৯২৩), রয়েল সোসাইটি অব মেডিসিন (৬/১২/১৯২৩) এবং আরো অনেক বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে।  
          ১৯২৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে প্রফেসর অলিভার লজের আমন্ত্রণে লন্ডনের ইন্ডিয়া হাউজে বক্তৃতা দিলেন জগদীশচন্দ্র। দর্শকদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী রামজে ম্যাকডোনাল্ড, জর্জ বার্নাড শ, ভারতের প্রাক্তন গভর্নর জেনারেল হার্ডিঞ্জ প্রমুখ। মন্টেগুর বদলে নতুন ভারতসচিব হয়েছেন লর্ড অলিভিয়ার। মন্টেগুর মতো তিনিও জগদীশচন্দ্রের গুণমুগ্ধ। প্রধানমন্ত্রী রামজে ম্যাকডোনাল্ড মাত্র ক'দিন আগে প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন (২২/১/১৯২৪)। তিনি শুনেছেন জগদীশচন্দ্রের গবেষণার কথা। তাই নিজে এসেছেন তাঁর বক্তৃতা শুনতে।

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী রামজে ম্যাকডোনাল্ড (১৯২৪)


সেই বক্তৃতায় জগদীশচন্দ্র তাঁর বিখ্যাত ফটোসিন্থেটিক বাবলারের কার্যপদ্ধতি ব্যাখ্যা করেন। উদ্ভিদ সালোক-সংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় সূর্যালোক থেকে যে অক্সিজেন তৈরি করে বের করে দেয় তা কাজে লাগিয়ে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে গাছের জৈব প্রক্রিয়ার পরিমাপ করা হয় এ যন্ত্রের সাহায্যে। চোখের সামনে এ প্রক্রিয়া ঘটতে দেখে বক্তৃতা শেষে জর্জ বার্নাড শ প্রধানমন্ত্রীর দিকে তাকিয়ে মন্তব্য করলেন:
            এই বিজ্ঞানী শীঘ্রই হয়তো এমন কোন যন্ত্র উদ্ভাবন করবেন যা দিয়ে রাজনীতিবিদদের কার্যক্ষমতা যন্ত্রলিপির সাহায্যে এঁকে দেখাবেন এবং বিভিন্ন কাজে তাঁদের দক্ষতাও নিখুঁতভাবে পরীক্ষা করতে সক্ষম হবেন।

জর্জ বার্নাড শ


         
ইন্ডিয়া-হাউজে বক্তৃতার কিছুদিন পর সরকারি দপ্তর থেকে জগদীশচন্দ্রকে একটি চিঠি দিয়ে জানানো হয় যে লিগ অব ন্যাশন্‌স এর ইন্টেলেকচুয়াল কো-অপারেশান কমিটিতে ভারতীয় প্রতিনিধি হিসেবে তাঁর নাম প্রস্তাব করা হয়েছে। পরবর্তী পাঁচ বছরের জন্য জগদীশচন্দ্র বসু হবেন সেই কমিটির সদস্য।
          লিগ অব ন্যাশন্‌স-এর ইন্টেলেকচুয়াল কো-অপারেশান কমিটি গঠিত হয়েছে ১৯২২ সালে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের প্রথিতযশা শিল্পী, সাহিত্যিক, বিজ্ঞানীদের নিয়ে গঠিত এই কমিটির উদ্দেশ্য ছিল পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মধ্যে বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পর্ক গড়ে তোলা। এতদিন কোন ভারতীয় সেই কমিটিতে ছিলেন না। জগদীশচন্দ্র বসুই হলেন সেই কমিটির প্রথম ভারতীয় সদস্য।
          মার্চের শেষে ব্রাসেল্‌স-এ এই কমিটির একটি সভা ছিল। কিন্তু সময়ের অভাবে জগদীশচন্দ্র সেই সভায় যোগ দিতে পারেননি। ফ্রান্সের বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে বক্তৃতা দিয়ে এপ্রিল মাসে দেশে ফিরে আসেন জগদীশ।
          ১৯২৪ সালে দেশে ফিরেই তিনি প্রকাশ করেন তাঁর নবম গ্রন্থ - Physiology of Photosynthesis.
            ১৯২৪-এর ডিসেম্বরে পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তৃতা দেন জগদীশ।
          ১৯২৫ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের পদ গ্রহণের জন্য অনুরোধ করা হয় জগদীশচন্দ্রকে। কিন্তু তিনি প্রশাসক হবার চেয়ে গবেষক হওয়াটাকেই বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করে সেই প্রস্তাব ধন্যবাদের সাথে প্রত্যাখ্যান করেন।
          বসু-বিজ্ঞান-মন্দিরের জন্য সরকারি অর্থসাহায্য বছরে এক লক্ষ টাকা থেকে না বাড়লেও সেই এক লক্ষ টাকা প্রতি বছর পাবার সরকারি অঙ্গীকার পাওয়া গেছে। ১৯৩১-৩২ সাল পর্যন্ত সরকারি এই অনুদান বলবৎ ছিল।
          লিগ অব ন্যাশন্‌স এর ইন্টেলেকচুয়াল কমিটির সভায় যোগদানের জন্য ১৯২৬-এর এপ্রিলে ইওরোপে যান জগদীশচন্দ্র। শুধু কমিটি মিটিং নয়, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বৈজ্ঞানিক বক্তৃতাও ছিল তাঁর কাজের অঙ্গ।
          ইতোমধ্যে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে সরকার পরিবর্তন হয়ে গেছে। রামজে ম্যাকডোনাল্ডের পর প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন কনজারভেটিভ পার্টির স্ট্যানলি ব্যাল্‌ডুইন। লেবার দলের প্রধানমন্ত্রী রামজে ম্যাকডোনাল্ড দেখা করেছিলেন জগদীশচন্দ্রের সাথে। ব্যালডুইনও জগদীশচন্দ্রকে তাঁর অফিসে আমন্ত্রণ করে দীর্ঘ অন্তরঙ্গ আলোচনা করলেন ইংল্যান্ড ও ভারতবর্ষের মধ্যে সুসম্পর্ক বিষয়ে।

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্ট্যানলি ব্যাল্‌ডুইন (১৯২৬)


জগদীশচন্দ্র ভারতের স্বাধীনতা চাইতেন ঠিকই কিন্তু তেমন উগ্র জাতীয়তাবাদী ছিলেন না। নিজের সুযোগ-সুবিধা ঠিকমতো পেলে তিনি ব্রিটিশ শাসনেও সন্তুষ্ট। তাই তিনি যেটা করলেন সেটা হলো তাঁর বিজ্ঞান-মন্দিরে সরকারি অনুদান যেন ঠিকমতো থাকে এবং সেটা যে ভারতবর্ষে বিজ্ঞান-চর্চার জন্য দরকারি তা বললেন। এটাও বললেন যেন সরকার ভারতের তরুণদের কর্মক্ষেত্র প্রসারের ব্যবস্থা নেয়।
          লন্ডন থেকে প্যারিসে গেলেন জগদীশ। সেখানে সরবোঁ বিশ্ববিদ্যালয় ও ন্যাচারাল হিস্ট্রি অব মিউজিয়ামে বক্তৃতা দেন। সেখান থেকে গেলেন বেলজিয়ামে। বেলজিয়ামের রাজা ও রানি কলকাতা গিয়ে বসু-বিজ্ঞান-মন্দির পরিদর্শন করেছিলেন। তখন জগদীশচন্দ্রের কাজে মুগ্ধ হয়ে আমন্ত্রণ জানিয়ে এসেছিলেন বেলজিয়ামে আসার জন্য। ব্রাসেল্‌স বিশ্ববিদ্যালয়ে জগদীশচন্দ্রের বক্তৃতা সভায় সভাপতিত্ব করেছিলেন বেলজিয়ামের রাজা অ্যালবার্ট। বক্তৃতার পর জগদীশের সম্মানে রাজকীয় ভোজসভার আয়োজন করা হয়। সেখানে রাজপরিবারে সদস্যদের সাথে অন্তরঙ্গ আলোচনা হয় জগদীশচন্দ্র ও অবলার। সেই সভায় জগদীশচন্দ্রকে বেলজিয়ামের রাজকীয় সম্মান কমান্ডার অব দি অর্ডার অব লিওপোল্ড উপাধিতে সম্মানিত করা হয়।


বেলজিয়ামের রাজা অ্যালবার্ট (১৯২৬)


১৯২৬ সালের ২৬শে জুলাই জেনিভায় লিগ অব ন্যাশন্‌স এর ইন্টেলেকচুয়াল কো-অপারেশান কমিটির অধিবেশনে যোগ দেন জগদীশচন্দ্র। এই কমিটিতে এটাই ছিল তাঁর প্রথম উপস্থিতি। কমিটির সবাই জগদীশচন্দ্রকে স্বতস্ফূর্ত অভিবাদন স্বাগতম জানালেন।
          অধিবেশন শেষ হবার পর জেনিভা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমন্ত্রণে সেখানে বক্তৃতা দেন জগদীশচন্দ্র। সেই বক্তৃতা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন আলবার্ট আইনস্টাইন ও পদার্থবিজ্ঞানী লরেঞ্জ। আইনস্টাইন এর দু'বছর আগে কাজ করেছেন জগদীশবসুর ছাত্র সত্যেন বসুর সাথে। তিনি জগদীশচন্দ্রের বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের পরিচয় পেয়ে মুগ্ধ হয়ে মন্তব্য করেছিলেন, জগদীশচন্দ্র পৃথিবীকে যেসব অমূল্য তত্ত্ব উপহার দিয়েছেন, তার যে কোনটির জন্যে বিজয়স্তম্ভ স্থাপিত হওয়া উচিত।
          সপ্তম বৈজ্ঞানিক সফর শেষ করে ১৯২৬ সালের অক্টোবরে দেশে ফেরেন জগদীশচন্দ্র। সেই বছরই প্রকাশিত হয় তাঁর দশম গ্রন্থ Nervous mechanism of plants.
          ১৯২৭ সালের জানুয়ারি মাসে লাহোরে অনুষ্ঠিত ভারতীয় বিজ্ঞান কংগ্রেসের সভাপতিত্ব করেন জগদীশচন্দ্র।
          ইন্টেলেকচুয়াল কো-অপারেশান কমিটির বার্ষিক অধিবেশনে যোগ দেয়ার জন্য ১৯২৭ সালের এপ্রিলে আবার ইওরোপ যাত্রা করেন জগদীশচন্দ্র। এটা তাঁর অষ্টম বৈজ্ঞানিক সফর। মে মাসের ৬ তারিখ তিনি ফ্রান্সের মার্শেল্‌স-এ পৌঁছেন। ফ্রান্সের দক্ষিণ অঞ্চলের কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা দেন তিনি এবার। বিশ্ববিখ্যাত ফরাসী সাহিত্যিক রোমাঁ রোঁলা বসু-দম্পতিকে নিমন্ত্রণ করেন নিজের বাড়িতে এবং নিজের লেখা বই উপহার দেন জগদীশচন্দ্রকে।

জগদীশচন্দ্র বসু (১৯২৬)

 
ফ্রান্স থেকে জগদীশ আসেন ইংল্যান্ডে। কিছুদিন আগে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর একাদশ গ্রন্থ Plant autographs and their revelationsবইটি ব্যাপক সমাদৃত হয়েছে ইংল্যান্ডে। ডেইলি এক্সপ্রেস পত্রিকা বইয়ের রিভিউতে জগদীশচন্দ্রকে প্রকৃতির রহস্য উন্মোচনে নিউটন ও গ্যালিলিওর সমকক্ষ বলে মন্তব্য করেছে। জুন মাসে জগদীশচন্দ্র ইন্টারন্যাশনাল হোমিওপ্যাথিক কংগ্রেস উপলক্ষে লন্ডনের কিংস হলে 'Mechanism of Life' শীর্ষক বক্তৃতা দেন। সেখানে উপস্থিত হয়ে জর্জ বার্নাড শ নিজের এক সেট বই জগদীশচন্দ্রকে উপহার দেন। বইতে তিনি লিখেছিলেন, "From the least to the greatest of living biologist. G. Bernard Shaw to Sir Jagadish Bose."
          তারপর লন্ডন থেকে জেনিভা যান জগদীশ। জুলাই মাসে ইন্টেলেকচুয়াল কো-অপারেশান কমিটির অধিবেশনে যোগ দেন।
          ১৯২৭ সালে লন্ডনের লং ম্যান অ্যান্ড গ্রিন কোম্পানি জগদীশচন্দ্রের পদার্থবিজ্ঞান বিষয়ক গবেষণাপত্রগুলোর সংকলন Collected physical papers প্রকাশ করে। তাঁর অন্যান্য বইয়ের মতো এই সংকলনটিও ব্যাপক পাঠকপ্রিয়তা পায়।
          প্রতি বছর জগদীশচন্দ্রের জন্মদিন ৩০ নভেম্বর বিজ্ঞান-মন্দিরের প্রতিষ্ঠা দিবস পালন করা হয়। সেদিন বিজ্ঞান-মন্দিরের বার্ষিক সভায় বিজ্ঞান-মন্দিরের সারা বছরের গবেষণার সারসংক্ষেপ প্রকাশ করা হয়।
          ১৯২৮ সালের মে মাসে আবার ইওরোপে যাত্রা করেন জগদীশচন্দ্র। এটা তাঁর নবম বৈজ্ঞানিক সফর। ইন্টেলেকচুয়াল কো-অপারেশান কমিটির সদস্য হিসেবে অধিবেশনে যোগ দেয়ার জন্য গত তিন বছর ধরে তিনি ভিয়েনা যাচ্ছেন। কিন্তু তিনি তাঁর বিদেশ-ভ্রমণকে বৈজ্ঞানিক মিশনে পরিণত করেছেন প্রতিবারই। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীদের সাথে আলোচনা করে বিজ্ঞান-মন্দিরের গবেষণার সুযোগ বাড়ানোও তাঁর অন্যতম লক্ষ্য।
          এবার বিশেষ আমন্ত্রণে তিনি ভিয়েনা ও মিউনিখ বিশ্ববিদ্যালয়ে দুটো বক্তৃতা দেন। ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেক্টর অধ্যাপক মোলিশের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক জগদীশচন্দ্রের। এবছর অধ্যাপক মোলিশের তৎপরতায় ভিয়েনা অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সের সদস্য মনোনীত হয়েছেন জগদীশচন্দ্র। ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিক্যাল ফ্যাকাল্টি অনেক ভারতীয় ভেষজ উদ্ভিদের রোগনাশক গুণ সম্পর্কে জানার জন্য জগদীশচন্দ্রের গবেষণা গুরুত্ব দিয়ে অনুসরণ করছে।
          ভিয়েনা থেকে জার্মানির মিউনিখে আসেন জগদীশ। সেখানে বক্তৃতা দিয়ে এবং বিশিষ্ট বিজ্ঞানীদের সাথে গবেষণা-আলোচনা শেষ করে গেলেন জেনিভায়। সেখানে ইন্টেলেকচুয়াল কো-অপারেশান কমিটির অধিবেশন শেষ করে দেশে ফেরার যখন প্রস্তুতি নিচ্ছেন তখন মিশরে যাবার আমন্ত্রণ পান। মিশরের কৃষি-মন্ত্রী তখন জেনেভায় ছিলেন। তারই উদ্যোগে মিশর সরকারের আমন্ত্রণে ১৩ই সেপ্টেম্বর মিশরের আলেকজান্দ্রিয়ায় বাদশাহ ফুয়াদের আতিথ্য গ্রহণ করেন জগদীশচন্দ্র। রয়্যাল জিওগ্রাফিক্যাল সোসাইটি অব ইজিপ্টের সম্মেলনে বক্তৃতা দেন তিনি।
          সেপ্টেম্বরের শেষে তিনি দেশে ফিরে আসেন।



[1] শ্রী বিমলেন্দু মিত্র, শ্রী আশুতোষ গুহঠাকুরতা, শ্রী বিনয়কৃষ্ণ দত্ত, আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু, ২য় খন্ড, বসু বিজ্ঞান মন্দির, ১৯৬৫। পৃ ১৫৭-১৫৮। 

Friday, 17 April 2020

অব্যক্ত: জগদীশচন্দ্র বসু পর্ব ২১




অব্যক্ত

জগদীশচন্দ্র বসুকে বাংলা ভাষায় পপুলার সায়েন্স বা জনপ্রিয় বিজ্ঞান রচনার পথিকৃৎ বলা যায়। বর্তমানকালে সাধারণত দেখা যায় যাঁরা মৌলিক বিজ্ঞানের গবেষণা করেন তাঁরা জনপ্রিয় বিজ্ঞান তেমন লেখেন না। বিদেশী ভাষায় কিছু উল্লেখযোগ্য ব্যতিক্রম থাকলেও বাংলা ভাষায় সেরকম কোন উদাহরণ নেই। জগদীশচন্দ্র বসু ছিলেন ব্যতিক্রম। তিনি একেবারে শিশুদের জন্যেও লিখেছেন কয়েকটি বাংলা বিজ্ঞান-রচনা। আর সাধারণ মানুষের জন্যেও লিখেছেন বেশ কয়েকটি। তাছাড়া বিভিন্ন অনুষ্ঠান উপলক্ষে তিনি যে সব বাংলা বক্তৃতা দিয়েছেন সেগুলোর সাহিত্য-মূল্যও অসীম। দুই শতাধিক মৌলিক গবেষণাপত্র, চৌদ্দটি গবেষণা-গ্রন্থের বিশাল ইংরেজি রচনার পাশে সামান্য কয়েকটি বাংলা রচনা সংখ্যার দিক থেকে হয়তো বেশি নয়, কিন্তু তার গুরুত্ব অনেক। তাঁর বাংলা রচনাগুলো বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত হয়েছে মুকুল, দাসী, প্রবাসী, সাহিত্য, ভারতবর্ষ ইত্যাদি সাহিত্য-পত্রিকায়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অনেকদিন থেকে বলে আসছিলেন সেগুলোকে গ্রন্থাকারে প্রকাশ করার জন্য।
          ১৯২১ সালে (আশ্বিন ১৩২৮) জগদীশচন্দ্রের বাংলা রচনাগুলির সংকলন গ্রন্থ 'অব্যক্ত' প্রকাশিত হয়। অব্যক্ত'র প্রথম প্রকাশক ছিলেন গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় অ্যান্ড সন্স, কলিকাতা। মূল্য ছিল আড়াই টাকা। ১৯৩৮ সালে বইটির দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়। বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ বইটি প্রকাশ করে ভাদ্র ১৩৫৮ ও পৌষ ১৩৬৪ বাংলায়। ১৯৫৮ সালের ৩০ নভেম্বর আচার্য জগদীশচন্দ্র বসুর জন্মশতবার্ষিক সমিতি 'অব্যক্ত'র শতবার্ষিক সংস্করণ প্রকাশ করে পুলিন বিহারী সেনের সম্পাদনায়। বইটির দাম রাখা হয়েছিল সাড়ে তিন টাকা। ১৯৮৯ সালের জুন মাসে বসু বিজ্ঞান মন্দির অব্যক্ত'র পঞ্চম সংস্করণ প্রকাশ করে। ভারত ও বাংলাদেশের আরো অনেক প্রকাশক 'অব্যক্ত' প্রকাশ করেছেন নিজেদের প্রকাশনী থেকে কপিরাইটের আওতামুক্ত হয়ে যাবার সুবাদে।
          প্রথম প্রকাশের পর বইটির রবীন্দ্রনাথকে পাঠিয়ে জগদীশচন্দ্র লিখেছিলেন, "আজ জোনাকির আলো রবির প্রখর আলোর নিকট পাঠাইলাম।"
          রবীন্দ্রনাথ উত্তরে ২৪/১১/১৯২১ তারিখে লিখেছিলেন:
          "তোমার অব্যক্ত'র অনেক লেখাই আমার পূর্ব-পরিচিত এবং এগুলি পড়িয়া বার বার ভাবিয়াছি যে যদিও বিজ্ঞানবাণীকেই তুমি তোমার সুয়োরাণী করিয়াছ তবুও সাহিত্য সরস্বতী সে পদের দাবী করিতে পারিত; কেবল তোমার অনবধানেই সে অনাদৃত হইয়া আছে।"
          অব্যক্ত'র ভূমিকায় জগদীশচন্দ্র সেই ১৯২১ সালেই উল্লেখ করেছিলেন মাতৃভাষায় ভাব প্রকাশের গুরুত্ব:
            "প্রায় ত্রিশ বৎসর পূর্বে আমার বৈজ্ঞানিক ও অন্যান্য কয়েকটি প্রবন্ধ মাতৃভাষাতেই লিখিত হইয়াছিল। তাহার পর বিদ্যুৎ-তরঙ্গ ও জীবন সম্বন্ধে অনুসন্ধান আরম্ভ করিয়াছিলাম এবং সেই উপলক্ষে বিবিধ মামলা-মোকদ্দমায় জড়িত হইয়াছি। এ বিষয়ের আদালত বিদেশে, সেখানে বাদ-প্রতিবাদ কেবল ইওরোপীয় ভাষাতেই গৃহীত হইয়া থাকে।"
          বিজ্ঞানের ভাষার আন্তর্জাতিকতা অর্থাৎ ইংরেজি ভাষাতেই যে বিজ্ঞান বিশ্ব-দরবারে গৃহীত হয় তা তাঁর কথাতে তখন থেকেই স্পষ্ট। বাংলায় যে তিনি আর বেশি লেখার সময় পাননি তার কারণ তাঁর ব্যস্ততা। মাতৃভাষায় বিজ্ঞানচর্চা না করতে পারাটাকে তিনি মনে করতেন, "জাতীয় জীবনের পক্ষে ইহা অপেক্ষা অপমান আর কী হইতে পারে?"
          এর প্রতিকারের জন্য তিনি দেশে বৈজ্ঞানিক আদালত স্থাপনের চেষ্টা করেছিলেন বলে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু এই শত বছর পরেও আমাদের দেশে বৈজ্ঞানিক আদালত বলে কিছু প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
          বাংলায় লেখার জন্য উৎসাহ কম ছিল না জগদীশচন্দ্রের। তাঁর ছাত্র রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় ছিলেন 'দাসী' ও 'প্রদীপ' নামে দুটো পত্রিকার সম্পাদক। তিনি 'প্রদীপ' পত্রিকায় নিয়মিত লেখার জন্য জগদীশচন্দ্রকে অনুরোধ করেছিলেন। জগদীশ উত্তর দিয়েছিলেন:
            "আমি তোমার কাগজে লিখিতে পারিলে বাস্তবিকই সুখী হইতাম। কিন্তু নানা কার্যে জড়িত হইয়া আমি এখন অনেক সুখে বঞ্চিত হইয়াছি। আমি যে কার্যে বৃত হইয়াছি, তাহার কুলকিনারা দেখিতে পাই না - অনেক সময়েই কেবল অন্ধকারে ঘুরিতে হয়। বহু ব্যর্থ প্রযত্নের পর কদাচ অভীষ্টের সাক্ষাৎ পাই।"[1]
          জগদীশচন্দ্র প্রথম বাংলায় লিখতে শুরু করেন ইংল্যান্ড থেকে পড়াশোনা শেষ করে দেশে ফেরার পর। সঞ্জীবনী পত্রিকায় তা প্রকাশিত হয়। ওটা ছিল অনেকটা ভ্রমণ-কাহিনির মতো। ইংল্যান্ডে ফসেট পরিবারে তিনি যে আদর-যত্ন পেয়েছিলেন তার বিবরণ।
          শিশু-কিশোরদের জন্য মাসিক সচিত্র মুকুল পত্রিকা প্রকাশিত হয় মূলত জগদীশচন্দ্রের উৎসাহে। রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় ও যোগীন্দ্রনাথ সরকার প্রকাশ করেছিলেন মুকুল। সেখানে নিয়মিত লেখার কথা ছিল জগদীশচন্দ্রের। অবলা বসুও কিছু প্রবন্ধ লিখেছিলেন সেখানে। মুকুলে লেখার ব্যাপারে জগদীশচন্দ্র ১৯০০ সালের ১৬ মার্চ রবীন্দ্রনাথকে লিখেছিলেন:
          "লেখার জন্য আমার উপর বিশেষ তাড়া। আমি বলিয়াছি যদি আমার গৃহিনী আগামীবারে আমার সহিত শিলাইদহ উপস্থিত হন, তাহা হইলে যতদিন থাকিব ততদিন মুকুলের জন্য আপনার এক একটি লেখা পাইব। গৃহিনীর journalistic instinct অতিশয় প্রবল দেখিতেছি। বিশেষত শ্রীযুক্তা সরলা দেবী নির্বাপিত অগ্নিতে ইন্ধন দিয়া গিয়াছেন।"
          জগদীশচন্দ্র ও অবলা বসু মুকুলে যেসব প্রবন্ধ লিখেছিলেন পরে তা "প্রবন্ধাবলী" নামে প্রকাশিত হয়েছিল।
          জগদীশচন্দ্রের হাতের সাহিত্য-সরস্বতীকে চিনতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভুল হবার কথা নয়। মাঝে মাঝে উচ্ছ্বাসের আধিক্য থাকলেও জগদীশচন্দ্রের বাংলা রচনায় উচ্চ-মার্গের সাহিত্যিক উপাদানের অভাব ছিল না। তাঁর সবচেয়ে যেটা আকর্ষণীয় সেটা হলো বিজ্ঞানের জটিল বিষয় সহজ করে বলা। কয়েকটি উদাহরণ দেয়া যাক।
            তরঙ্গের কম্পন বা ফ্রিকোয়েন্সির সাথে মানুষের অনুভূতির সম্পর্ক বোঝাতে গিয়ে তিনি কত সহজ ভাবেই বলেছেন:
          "সেতারের তার যতই ছোটো করা যায়, সুর ততই চড়া হয়। যখন প্রতি সেকেন্ডে বায়ু ৩০,০০০ বার কাঁপিতে থাকে তখন কর্ণে অসহ্য অতি উচ্চসুর শোনা যায়। তার আরও ক্ষুদ্র করিলে হঠাৎ শব্দ থামিয়া যাইবে। তখনও তার কাঁপিতে থাকিবে, তরঙ্গ উদ্ভুত হইবে; কিন্তু এই উচ্চ সুর আর কর্ণে ধ্বনি উৎপাদন করিবে না।"
          তাপ ও আলোর সম্পর্ক বোঝাতে গিয়ে বলেছেন:
          "যে স্পন্দন ত্বক দ্বারা অনুভব করি তাহার নাম উত্তাপ; আর যে কম্পনে দর্শনেন্দ্রিয় উত্তেজিত হয় তাহাকে আলোক বলিয়া থাকি।"
          একেবারে শিশুদের জন্য কী সহজভাবে তিনি বুঝিয়েছেন 'গাছের কথা' প্রবন্ধে গাছের জীবনের কথা: 
          "জীবিত বস্তুতে গতি দেখা যায়; জীবিত বস্তু বাড়িয়া থাকে। কেবল ডিমে জীবনের কোনো চিহ্ন দেখা যায় না। ডিমে জীবন ঘুমাইয়া থাকে। উত্তাপ পাইলে ডিম হইতে পাখির ছানা জন্মলাভ করে। বীজগুলি যেন গাছের ডিম; বীজের মধ্যেও এরূপ গাছের শিশু ঘুমাইয়া থাকে। মাটি, উত্তাপ ও জল পাইলে বীজ হইতে বৃক্ষশিশুর জন্ম হয়।"
          উদ্ভিদের জন্ম ও মৃত্যু প্রবন্ধে লিখেছেন:
          "আমরা যেরূপ আহার করি, গাছও সেইরূপ আহার করে। আমাদের দাঁত আছে, আমরা কঠিন জিনিস খাইতে পারি। ছোটো ছোটো শিশুদের দাঁত নাই; তাহার কেবল দুধ খায়। গাছেরও দাঁত নাই, সুতরাং তাহারা কেবল জলীয় দ্রব্য কিংবা বাতাস হইতে আহার গ্রহণ করিতে পারে। মূল দ্বারা মাটি হইতে গাছ রস শোষণ করে। চিনিতে জল ঢালিলে চিনি গলিয়া যায়। মাটিতে জল ঢালিলে মাটির ভিতরের অনেক জিনিস গলিয়া যায়। গাছ সেই সব জিনিস আহার করে। গাছের গোড়ায় জল না দিলে গাছের আহার বন্ধ হইয়া যায়, ও গাছ মরিয়া যায়।"
          শিশুদের জন্য এরচেয়ে সরলভাবে বিজ্ঞান বোঝানো কি সম্ভব? তবে মাঝে মাঝে অতিসরলীকরণের ফলে কিছু কিছু ব্যাপার দুর্বোধ্য হয়ে গেছে যা শিশুদের ভুল তথ্য দেয়ার সম্ভাবনা তৈরি করেছে। যেমন 'উদ্ভিদের জন্ম ও মৃত্যু' প্রবন্ধের এক জায়গায় আছে:
          "গাছের শরীরে সূর্যের কিরণ আবদ্ধ হইয়া আছে। কাঠে আগুন ধরাইয়া দিলে যে আলো ও তাপ বাহির হয়, তাহা সূর্যেরই তেজ। গাছ ও তাহার শস্য আলো ধরিবার ফাঁদ। জন্তুরা গাছ খাইয়া প্রাণ ধারণ করে, গাছে যে সূর্যের তেজ আছে তাহা এই প্রকারে আবার জন্তুর শরীরে প্রবেশ করে। শস্য আহার না করিলে আমরাও বাঁচিতে পারিতাম না। ভাবিয়া দেখিতে গেলে, আমরাও আলো আহার করিয়া বাঁচিয়া আছি।"
          এখান থেকে শিশুরা আলো ও শক্তি সম্পর্কে ভুলতথ্য পাবে - জগদীশচন্দ্র তা নিশ্চয় চাননি। বিজ্ঞানে অতিসরলীকরণের এটাই বিপদ।
          জগদীশচন্দ্রের বাংলা-বিজ্ঞান-রচনার আরেকটি উল্লেখযোগ্য উপাদান হলো তাঁর কৌতুকপ্রিয়তা। তাঁর সেন্স অব হিউমার সত্যিই চমৎকার। 'অদৃশ্য আলোক' রচনা থেকে দুটো উদাহরণ দেয়া যাক।
            হীরা ও চীনা-বাসনের আলো শোষণ ও প্রতিসরণ করা প্রসঙ্গে হীরার মূল্য ও চীনা-বাসনের মূল্যের বর্তমান পার্থক্য সম্পর্কে বর্তমানে হীরার উচ্চমূল্যের কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি লিখছেন:
            "প্রথমবার বিলাত যাইবার সময় অত্যন্ত কুসংস্কার হেতু চীনাবাসন স্পর্শ করিতে ঘৃণা হইত। বিলাতে সম্ভ্রান্ত ভবনে নিমন্ত্রিত হইয়া দেখিলাম যে, দেওয়ালে বহুবিধ চীনা-বাসন সাজানো রহিয়াছে। ইহার এমন কি মূল্য যে, এত যত্ন? প্রথমে বুঝিতে পারি নাই, এখন বুঝিয়াছি ইংরেজ ব্যবসাদার। অদৃশ্য আলো দৃশ্য হইলে চীনা-বাসন অমূল্য হইয়া যাইবে। তখন তাহার তুলনায় হীরক কোথায় লাগে! সেদিন শৌখিন রমণীগণ হীরকমালা প্রত্যাখ্যান করিয়া পেয়ালা-পিরিচের মালা সগর্বে পরিধান করিবেন এবং অচীনধারিণী নারীদিগকে অবজ্ঞার চক্ষে দেখিবেন।"
          আলোর পোলারাইজেশান বা একমুখীকরণ সম্পর্কিত অনেক পরীক্ষা করেছিলেন জগদীশচন্দ্র। পাটের আঁশের ভেতর আলো একদিকে প্রবেশ করিয়ে অন্য দিক দিয়ে বের হবার সময় খেয়াল করেছেন যে পোলারাইজেশান হচ্ছে। মানূষের চুল নিয়েও এরকম পরীক্ষা করেছিলেন বিলাতে গিয়ে। তার বর্ণনা দিচ্ছেন তিনি:
            "আলো একমুখী করিবার অন্য এক উপায় আবিষ্কার করিতে সমর্থ হইয়াছিলাম। যদিও এলোমেলোভাবে আকাশ-স্পন্দন রমণীর কেশগুচ্ছে প্রবেশ করে, তথাপি বাহির হইবার সময় একেবার শৃঙ্খলিত হইয়া থাকে। বিলাতের নরসুন্দরদের দোকান হইতে বহু জাতির কেশগুচ্ছ সংগ্রহ করিয়াছিলাম। তাহার মধ্যে ফরাসী মহিলার নিবিড় কৃষ্ণকুন্তল বিশেষ কার্যকরী। এ বিষয়ে জার্মান মহিলার স্বর্ণাভ কুন্তল অনেকাংশে হীন। প্যারিসে যখন এই পরীক্ষা দেখাই তখন সমবেত ফরাসী পন্ডিতমন্ডলী এই নতুন তত্ত্ব দেখিয়া উল্লসিত হইয়াছিলেন। ইহাতে বৈরী জাতির উপর তাহাদের প্রাধান্য প্রমাণিত হইয়াছে, ইহার কোন সন্দেহই রহিল না। বলা বাহুল্য, বার্লিনে এই পরীক্ষা প্রদর্শনে বিরত হইয়াছিলাম।"
          এখানে এটাও উল্লেখ করা দরকার যে আলোর পোলারাইজেশান প্রক্রিয়ার যে সহজ ব্যাখ্যা জগদীশচন্দ্র দিয়েছেন বাংলা ভাষায় এর চেয়ে প্রাঞ্জল ব্যাখ্যা এ-পর্যন্ত আর কোথাও দেখা যায়নি। ব্যাখ্যাটা তিনি দিয়েছেন 'বক-কচ্ছপ সংবাদ' নামে একটি গল্পের মাধ্যমে।
         


"মনে কর, দুই দল জন্তু মাঠে চরিতেছে- লম্বা জানোয়ার বক ও চেপ্‌টা জীব কচ্ছপ। সর্বমুখী অদৃশ্য আলোকও এইরূপ দুই প্রকারের স্পন্দনসঞ্জাত। দুই প্রকারের জীবদিগকে বাছিবার সহজ উপায়, সম্মুখে লোহার গরাদ খাড়াভাবে রাখিয়া দেওয়া। জন্তুদিগকে তাড়া করিলে লম্বা বক সহজেই পার হইয়া যাইবে, কিন্তু চেপ্‌টা কচ্ছপ গরাদের এ-পাশে থাকিবে। প্রথম বাধা পার হইবার পর বকবৃন্দের সম্মুখে যদি দ্বিতীয় গরাদ সমান্তরালভাবে ধরা যায়, তাহা হইলেও বক তাহা দিয়া গলিয়া যাইবে। কিন্তু দ্বিতীয় গরাদখানাকে যদি আড়ভাবে ধরা যায়, তাহা হইলে বক আটকাইয়া থাকিবে। এইরূপে গরাদ অদৃশ্য আলোর সম্মুখে ধরিলে আলো একমুখী হইবে। দ্বিতীয় গরাদ সমান্তরালভাবে ধরিলে আলো উহার ভিতর দিয়াও যাইবে, তখন দ্বিতীয় গরাদটা আলোর পক্ষে স্বচ্ছ হইবে। কিন্তু দ্বিতীয় গরাদটা আড়ভাবে ধরিলে আলো যাইতে পারিবে না, তখন গরাদটা অস্বচ্ছ বলিয়া মনে হইবে। যদি আলো একমুখী হয় তাহা হইলে কোনো কোনো বস্তু একভাবে ধরিলে অস্বচ্ছ হইবে; কিন্তু ৯০ ডিগ্রি ঘুরাইয়া ধরিলে তাহার ভিতর দিয়া আলো যাইতে পারিবে।"
          বাংলা ভাষায় প্রথম বৈজ্ঞানিক রহস্য লেখার কৃতিত্বও জগদীশচন্দ্র বসুকে দেয়া যায়। তাঁর লেখা কল্পকাহিনী 'নিরুদ্দেশের কাহিনী' 'কুন্তলীন পুরষ্কার' প্রবর্তনের প্রথম বছর প্রথম পুরষ্কার পায়। এটার একটা ছোট্ট ইতিহাস আছে।             বাংলা সাহিত্যে এইচ বোস প্রবর্তিত কুন্তলীন পুরষ্কার একটা বিশেষ ভূমিকা রেখেছে এক সময়। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, প্রভাত কুমার মুখোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সবাই কুন্তলীন পুরষ্কারের জন্য গল্প লিখেছিলেন বিভিন্ন সময়ে। এর প্রবর্তক এইচ বোসের পুরো নাম হেমেন্দ্র মোহন বসু। ব্যক্তিগত সম্পর্কে তিনি ছিলেন জগদীশচন্দ্র বসুর ভাগনে।
            জগদীশচন্দ্রের দিদি স্বর্ণপ্রভার স্বামী আনন্দমোহন বসু ও ছোটবোন সুবর্ণপ্রভার স্বামী মোহিনীমোহন বসুর দাদা  হরমোহন বসুর ছেলে হেমেন্দ্রমোহন বসু। হরমোহন বসু বিলাত থেকে উচ্চশিক্ষিত হয়ে দেশে ফিরে এসে ময়মনসিংহে মোক্তারি করতেন। তাঁর ছেলে হেমেন্দ্রমোহন ছিলেন আরো করিৎকর্মা।
            তিনি ভারতে অনেক নতুন শিল্পের সূচনা করেছিলেন। তিনি ছিলেন কলকাতায় পারফিউম তৈরির অগ্রদূত। তাঁর একটি বিখ্যাত পারফিউম ছিল 'দেলখোস'। চুলের সুগন্ধী তেল আবিষ্কার করে নাম দিয়েছিলেন 'কুন্তলীন'। ভারতীয় উপমহাদেশে প্রথম পানের মশলা বাজারজাত করেন তিনি। সেই মশলার নাম ছিল 'তাম্বুলিন'। এগুলির বাজারজাত করার জন্য তিনি রবীন্দ্রনাথকে দিয়ে বিজ্ঞাপন লিখিয়ে নিয়েছিলেন:
"কেশে মাখ "কুন্তলীন"।
রুমালেতে "দেলখোস"।।
পানে খাও "তাম্বুলীন"।
ধন্য হোক এইচ্‌ বোস।।"
রবীন্দ্রনাথের নামে আরেকটি বিজ্ঞাপন প্রচারিত হতো:
          "কুন্তলীন ব্যবহার করিয়া এক মাসের মধ্যে নূতন কেশ হইয়াছে।"
            এইচ বোস ভারতে প্রথম সাইকেল ও মোটর গাড়ির ব্যবসাও শুরু করেছিলেন। ভয়েস রেকর্ডিং বা শব্দ গ্রাহক যন্ত্রের বাণিজ্যিক প্রসারে এইচ বোসের অবদান অনেক। ১৯০৫ সালে তিনি ফনোগ্রাফের ব্যবসা শুরু করেন। ধর্মতলা স্ট্রিটে "দি টকিং মেশিন হল" স্থাপন করেন তিনি।


এইচ বোসের বিজ্ঞাপন


বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে ব্যাপক আন্দোলনের সময় ১৯০৬ সালে তিনি প্রথম ফনোগ্রাফিক রেকর্ড যা সেই সময় সিলিন্ডার রেকর্ড নামে পরিচিত ছিল - বাণিজ্যিকভাবে বাজারজাত করেন। "এইচ বোসের রেকর্ড" নামে পরিচিত সেই রেকর্ডে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, দ্বিজেন্দ্রলাল রায় গান রেকর্ড করেছিলেন। "সার্থক জনম আমার", "এবার তোর ভরা গাঙে", "ও আমার দেশের মাটি", "আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে" এইচ বোসের রেকর্ডে প্রথম বাজারে এসেছিল। ১৯০৬ সালে ইন্ডাস্ট্রিয়াল এক্সিবিশান অব ক্যালকাটায় এইচ বোসের ফনোগ্রাফিক রেকর্ড স্বর্ণপদক লাভ করে। উল্লেখ্য সেখানে প্রধান বিচারক ছিলেন জগদীশচন্দ্র বসু। সিলিন্ডার রেকর্ড থেকে ডিস্ক রেকর্ডের উত্তরণেও এইচ বোস অগ্রদূত ছিলেন।[2]
          কুন্তলীন তেলের প্রচারের উদ্দেশ্যেই ১৩০৩ বাংলায় (১৯০৬ ইংরেজি) চালু হয়েছিল কুন্তলীন পুরষ্কার। গল্পগুলির জন্য শর্ত ছিল যে গল্পে কুন্তলীন তেলের উল্লেখ থাকতে হবে। প্রথম বারেই 'নিরুদ্দেশের কাহিনী' নামে একটি কল্প-গল্প লিখে পাঠান জগদীশচন্দ্র। স্বজনপ্রীতি এড়ানোর জন্য তিনি গল্পে লেখকের নাম উল্লেখ করেননি; এবং সাথে একটা কাগজে লিখিত অনুরোধ করেছিলেন যদি গল্পটি পুরষ্কার পায়, তবে যেন সেই টাকা ব্রাহ্ম সমাজের অন্তর্গত রবিবাসরীয় নীতিবিদ্যালয়ে দান করা হয়। জগদীশচন্দ্রের গল্পটি প্রথম পুরষ্কার পায়। ওটা যে তাঁর গল্প ছিল তা অনেক বছর পর্যন্ত কেউ জানতেই পারেনি। 'অব্যক্ত' প্রকাশিত হবার পর দেখা গেলো গল্পটি অনেক পরিবর্তিত হয়ে 'পলাতক তুফান' নামে সেখানে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
          'নিরুদ্দেশের যাত্রা' কিংবা 'পলাতক তুফান' গল্পটিকে সার্থক বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী বলা যায় কি না তা নিয়ে বিতর্ক চলতে পারে। তবে বিষয়বস্তুর অভিনবত্ব ছিল নিঃসন্দেহে - বঙ্গোপসাগরে প্রচন্ড ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাস পাওয়ার পর ঘূর্ণিঝড় আসার ঠিক কয়েক মিনিট আগেই ঘূর্ণিঝড়টি উধাও হয়ে যায়। কেন কীভাবে কোথায় যায় তা কেউ বলতে পারে না। সবাই বিজ্ঞানকে দোষ দিতে থাকে। বলতে থাকে আবহাওয়া দপ্তরের অকর্মণ্যতা ইত্যাদি। কিন্তু আসল ঘটনা হলো তখন বঙ্গোপসাগরে একটি জাহাজ চলছিলো এবং সেই জাহাজের একজন যাত্রীর ব্যাগে এক শিশি কুন্তলীন তেল ছিল। তিনি শিশির সব তেল সমুদ্রের ঘূর্ণিঝড়ের প্রকাণ্ড ঢেউয়ের ওপর ঢেলে দেন। এই এক শিশি কুন্তলীন তেলেই সমুদ্র শান্ত হয়ে যায়।  
          অব্যক্ত গ্রন্থের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো জগদীশচন্দ্রের বাংলা বক্তৃতাগুলি। বিশেষ করে বিজ্ঞান-মন্দির উদ্বোধনের দিন তিনি যে বক্তৃতা দিয়েছিলেন সেটা এখনো যে কোন বাঙালির জন্য অনুপ্রেরণা।



[1] রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়, প্রদীপ, মাঘ ১৩০৪।
[2] Amitabha Ghosh, Indian Journal of History of Science, 29 (1), 1994.



Latest Post

সরকারি চাকরিতে উচ্চতার শর্ত

  সম্প্রতি প্রকাশিত ৩৮তম বিসিএস পরীক্ষার বিজ্ঞপ্তিটা পড়ে আবারো কিছুটা স্মৃতিকাতর হয়ে পড়লাম। বিসিএস পরীক্ষার সাথে আমার একটি অদ্ভুত অন্যরকম অন...

Popular Posts