Saturday 18 April 2020

জগদীশচন্দ্র বসু - পর্ব ২৫


বেলাশেষে

শরীর ভেঙে পড়ছে জগদীশচন্দ্রের। এখনো তিনি বিজ্ঞান-মন্দিরের আচার্য। বিজ্ঞান-মন্দিরের উন্নতির জন্য কাজ করে যাচ্ছেন অবিরাম। ট্রানজেকশানের প্রধান সম্পাদক তিনি। পেপার দেখার কাজ করে যাচ্ছেন নিষ্ঠার সাথে। কোয়ালিটির সাথে আপোষ করার মানুষ নন তিনি। বিজ্ঞান-মন্দিরের আরো দুটো ছোট শাখা খুলেছেন তিনি। দার্জিলিং-এর বাড়ী 'মায়াপুরী'তে একটি এবং অন্যটি ফলতায় গঙ্গার তীরে একটি বাড়িতে। গরমের সময় তিনি থাকেন দার্জিলিং-এ। শীতকালে থাকেন গিরিডিতে। তাছাড়া সপ্তাহের শেষে ফলতায় যান। উলুবেড়িয়ায় একটি ডাকবাংলো তিনি পেয়েছেন সরকারি বরাদ্দ হিসেবে। সেখানেও থাকেন মাঝে মাঝে। বন্ধু ডাক্তার নীলরতন সরকার তাঁকে বেশি কাজ করতে নিষেধ করেছেন। কিন্তু কাজের চাপ ও নেশা এড়ানো কঠিন।
১৯৩১ সালের ১৪ এপ্রিল কলকাতা পূরসভার পক্ষ থেকে নাগরিক সম্বর্ধনা দেয়া হয় জগদীশচন্দ্রকে। সাহিত্য, বিজ্ঞান ও শিল্পে প্রতিভার স্বীকৃতি দেয়ার লক্ষ্যে ১৯২৫ সালে আরম্ভ হয়েছিল "শ্রীসয়াজীরাও গায়কোয়ার প্রাইজ অ্যান্ড অ্যানুইটি" নামে একটি বৃত্তি। এককালীন এক হাজার টাকা এবং তারপর বার্ষিক বারো শ' টাকা করে এই বৃত্তি দেয়া হলো জগদীশচন্দ্রকে ১৯৩১ সালের ২৮ মার্চ। খুশিমনে এই বৃত্তি গ্রহণ করলেন জগদীশচন্দ্র।
          ১৯৩১ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ৭০তম জন্মবার্ষিকী। এ উপলক্ষে সমগ্র দেশবাসীর পক্ষ থেকে কলকাতায় কবিকে গণসম্বর্ধনা দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। কমিটির সভাপতি করা হয় জগদীশচন্দ্রকে। এ উপলক্ষে প্রকাশিত হয় স্মারক গ্রন্থ "Golden Book of Tagore"। জগদীশচন্দ্র এই স্মারকগ্রন্থে তাঁর কাছের বন্ধুর সাথে সুসম্পর্কের পাশাপাশি বিশ্বে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবদানের কথাও স্মরণ করেন। কিন্তু ১৯৩১ সালের ২৭ ডিসেম্বর তারিখে অনুষ্ঠিত এই রবীন্দ্রজয়ন্তী উৎসবে উপস্থিত থাকতে পারেননি জগদীশচন্দ্র। জগদীশচন্দ্রের ৭০তম জন্মবার্ষিকীতে যেমন উপস্থিত থাকতে পারেননি রবীন্দ্রনাথ, এখানেও ঠিক সেরকমই হলো। গিরিডি থেকে শুভেচ্ছা-বাণী পাঠিয়েছিলেন জগদীশচন্দ্র। সেটাই পাঠ করা হলো অনুষ্ঠানে।
          দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পায়ঁতারা শুরু হয়ে গেছে। ব্রিটিশ সরকারের ওপর ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের চাপও বাড়ছে। এ অবস্থায় সরকার ব্যাপক ব্যয়-সংকোচন নীতি গ্রহণ করলেও এতদিন উপর মহলের সাথে জগদীশচন্দ্রের ভালো সম্পর্কের কারণে বিজ্ঞান-মন্দিরের বার্ষিক এক লক্ষ টাকা বরাদ্দে কোন টান পড়েনি। কিন্তু প্রাদেশিক সরকারে এ নিয়ে খুব সমালোচনা শুরু হয়েছে। পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটি মন্তব্য করেছে, "সরকার যখন সব জায়গায় গবেষণা বৃত্তি বন্ধ করে দিয়েছে, এমনকি পুসার একান্ত দরকারি কৃষি-গবেষণার খরচও দেয়া যাচ্ছে না, সেখানে বসু-বিজ্ঞান-মন্দিরের উচিত সরকারের ব্যয়-সংকোচন নীতি বিনাবাক্যে মেনে নেয়া।"
          ভারত-সচিবের পক্ষেও আর সম্ভব হচ্ছে না বিজ্ঞান-মন্দিরের জন্য বছরে এক লক্ষ টাকা করে দেয়ার পক্ষে কথা বলা। তবুও ১৯৩২-৩৩ সালের জন্য বিজ্ঞান-মন্দিরের জন্য ৫৩ হাজার টাকা দেয়া হলো। জগদীশচন্দ্র বেশ চিন্তিত হয়ে পড়লেন। কীভাবে খরচ কমাবেন এত বড় প্রতিষ্ঠানের!
          উচ্চ রক্তচাপ ও অন্যান্য আরো শারীরিক উপসর্গ দেখা দিতে শুরু করলো জগদীশচন্দ্রের। ৭৫ বছর বয়সে সেটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। এর মধ্যেই ১৯৩৩ সালে বেনারস হিন্দু ইউনিভার্সিটি এবং ১৯৩৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সম্মানসূচক ডিএসসি ডিগ্রি প্রদান করে জগদীশচন্দ্রকে।
          ১৯৩৫ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজ সম্বর্ধনা দেয় জগদীশচন্দ্রকে। ৫০ বছর আগে প্রেসিডেন্সি কলেজে যোগ দিয়েছিলেন জগদীশচন্দ্র। সে উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলার তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী আজিজুল হক।
          ১৯৩৭ সালের ২রা নভেম্বর রায়বাহাদুর এ এন মিত্রের আমন্ত্রণে শীতকালীন অবকাশ যাপনের জন্য বিহারের গিরিডিতে আসেন জগদীশচন্দ্র। তখন তিনি উচ্চরক্তচাপে ভুগছিলেন এবং শরীর ক্রমশ খারাপের দিকে যাচ্ছিল। পরিকল্পনা ছিল ২৮শে নভেম্বর কলকাতায় ফিরে এসে ৩০শে নভেম্বরের জন্মোৎসব ও বিজ্ঞান মন্দিরের প্রতিষ্ঠা দিবসের অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন। কিন্তু তা আর হয়ে ওঠেনি। ২৩শে  নভেম্বর সকাল আটটায় গিরিডিতে রায় বাহাদুর এ এন মিত্রের বাড়িতে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যান উপমহাদেশের বিজ্ঞান গবেষণার জনক স্যার জগদীশচন্দ্র বসু।
          দ্রুত সংবাদ ছড়িয়ে পড়লো। গিরিডি থেকে তাঁর দেহ নিয়ে আসা হলো কলকাতায়। মহানগরীর রাজপথে শোকযাত্রা শেষে তাঁর শেষকৃত্য সম্পাদিত হয়।
          জগদীশচন্দ্র বসু মৃত্যুর আগে যে উইল করে গেছেন সেখানে নিবেদিতার স্মৃতি রক্ষার্থে এক লক্ষ টাকা রেখে গেছেন অবলা বসু সেই টাকা দিয়ে তাঁদের স্থাপিতবাণী মন্দিরনিবেদিতা হলনির্মাণ করান

বিড়লা ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড টেকনোলজিক্যাল মিউজিয়ামে জগদীশের মূর্তি


No comments:

Post a Comment

Latest Post

Memories of My Father - Part 2

  In our childhood and even in our adulthood, there was no tradition of celebrating birthdays. We didn't even remember when anyone's...

Popular Posts