Saturday 18 April 2020

জগদীশচন্দ্র বসু - পর্ব ২৬


ব্যক্তি জগদীশ
         
স্যার জগদীশচন্দ্র বসুর বিজ্ঞান-গবেষণা ও কর্মজীবনের যে পরিচয় আমরা পেলাম তাতে বোঝা যায় বাঙালীদের মধ্যে এত বড় কর্মযোগী মানুষ কদাচিৎ দেখা যায়। কিন্তু ব্যক্তি হিসেবে কেমন ছিলেন জগদীশচন্দ্র বসু? যে কোন মানুষ সম্পর্কেই এ ধরনের প্রশ্নের উত্তর দেয়া সহজ নয়। কারণ মানুষ প্রকৃতিগতভাবেই খুব জটিল প্রাণী। আর জগদীশচন্দ্র বসুর ব্যক্তিত্ব ছিলো প্রখর রূপে জটিল।
          তাঁর গবেষণার সবটাই নিজের হাতে করা। এত যুগান্তকারী আবিষ্কার তিনি করেছেন - তাতে তাঁকে ঘিরে একটা শক্তিশালী বৈজ্ঞানিক দল গড়ে ওঠার কথা। কিন্তু তা হয়নি। তাঁর সরাসরি কোন গবেষক-ছাত্র ছিল না। দেবেন্দ্রমোহন বসু, সত্যেন বসু, মেঘনাদ সাহা, শিশির মিত্র প্রমুখ জগদীশচন্দ্রকে শিক্ষক হিসেবে সম্মান করতেন। জগদীশচন্দ্র পদার্থবিজ্ঞানের ক্লাসে পড়িয়েছেন এঁদের সবাইকে। কিন্তু কাউকেই নিজের গবেষণার সহযোগী করে নেননি। ফলে জগদীশচন্দ্র বসুর গবেষণার ধারাবাহিকতা রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। তাছাড়া তাঁর গবেষণাপত্রগুলোর সবগুলোই ছিল পরীক্ষামূলক ফলাফলের প্রকাশ। পদার্থবিজ্ঞানের তাত্ত্বিক ভিত্তি আলোচনাকে তিনি এড়িয়ে গেছেন সম্পূর্ণভাবে। ফলে তাঁর গবেষণার মূল বিস্তৃত হয়নি যতটা হওয়া উচিত ছিল।
          তিনি দুই শতাধিক গবেষণাপত্র লিখেছেন, বই লিখেছেন চৌদ্দটা। এগুলোর জন্য বৈজ্ঞানিক-পরীক্ষানিরীক্ষা করতে হয়েছে হাজার হাজার। লক্ষ লক্ষ ডাটা পয়েন্ট বিশ্লেষণ করতে হয়েছে। এগুলো সব একার পক্ষে করা সম্ভব নয়। আমাদের এটাও মনে রাখতে হবে যে সেই সময় কোন কম্পিউটার ছিল না। সবকিছুই হাতে-কলমে করতে হয়েছে। এসবের জন্য প্রচুর সহকারীর সাহায্য নিয়েছেন জগদীশচন্দ্র। কিন্তু কাউকেই তিনি তাঁর গবেষণার কৃতিত্বের ভাগ দেননি।
          নিবেদিতা যে তাঁর প্রথম চারটি বই এবং অনেকগুলো গবেষণাপত্র লিখে দিয়েছিলেন সেটা আমরা জানি। কিন্তু জগদীশচন্দ্র একবারের জন্যেও নিবেদিতার অবদান স্বীকার করেননি।
          কাউকেই যখন কৃতিত্ব দিচ্ছিলেন না, তখন বাধ্য হয়ে আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় বলেছিলেন জগদীশচন্দ্রকে যে কাজটা ঠিক হচ্ছে না। এই যে এত ছেলেমেয়ে কাজ করছে তাদের কাজের স্বীকৃতি থাকবে না? এটা বিজ্ঞানের সাধারণ নীতিবোধের পরিপন্থি। তখন জগদীশচন্দ্র কয়েকটি গবেষণাপত্রে কারো কারো নাম উল্লেখ করেছেন Assisted by হিসেবে। অথচ তাঁর না জানার কথা নয় যে বৈজ্ঞানিক গবেষণায় যা হয়ে থাকে তা হলো কোলাবোরেশান - অ্যাসিস্ট্যান্স নয়।
          আমরা বলতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি যে জগদীশচন্দ্রকে কত কষ্ট করে গবেষণা করতে হয়েছে। বাঙালী বলে, ভারতীয় বলে কত অসুবিধায় পড়তে হয়েছে। কিন্তু একটু তলিয়ে দেখলেই আমরা দেখতে পাই, তিনি তাঁর কর্মজীবনে সরকারী খরচে এগারো বার বিদেশে গেছেন গবেষণার কাজে এবং গবেষণা বাড়াতে। বছরের পর বছর তিনি ডেপুটেশানে থেকেছেন ইওরোপে। ইংরেজ সরকারের বেশিরভাগ কর্তা-ব্যক্তিই তাঁকে সহযোগিতা করেছেন। সে হিসেবে তাঁর সমসাময়িক প্রফুল্ল চন্দ্র রায়কে কষ্ট করতে হয়েছে আরো অনেক বেশি। কিন্তু প্রফুল্লচন্দ্রের হাত দিয়ে বাংলায় গড়ে উঠেছিল কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রি। কিন্তু জগদীশচন্দ্রের হাত দিয়ে কোন ইন্ডাস্ট্রি তো দূরের কথা, সার্বজনীন বিজ্ঞান-গবেষণাগারও গড়ে ওঠেনি। বসু-বিজ্ঞান মন্দির তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন, কিন্তু নিজেই বলেছেন যে ওটা যতটা না পরীক্ষাগার তার চেয়ে বেশি হলো মন্দির। বৈদিক মন্ত্র পড়ে তিনি সেই মন্দিরের আচার্য হয়েছেন এবং তাঁর সহকারীদের মন্ত্র পাঠ করিয়ে 'দীক্ষা' দিয়েছেন।
          বসু বিজ্ঞান মন্দিরে তিনি যাঁদের নিয়োগ দিয়েছেন বা তার আগেও যাঁদের নিয়োগ করেছেন নিজের সহকারী হিসেবে - তাদের কারোরই শিক্ষাগত যোগ্যতা বেশি ছিল না। তিনি চাইতেন না যে তাঁর সহকারীরা কেউ উচ্চতর শিক্ষা নিয়ে তাঁর সমকক্ষ হোক। নগেন্দ্রচন্দ্র নাগকে তিনি বসু-বিজ্ঞান-মন্দিরের উপ-পরিচালক নিযুক্ত করেছিলেন। তিনি ছিলেন ডাক্তার। বৈজ্ঞানিক গবেষণায় তাঁর কোন ব্যুৎপত্তি ছিল না। জগদীশচন্দ্র বেঁচে থাকতেই তাঁর মৃত্যু হয়। বসু বিজ্ঞান মন্দির স্থাপিত হবার আগে থেকেই জগদীশচন্দ্রের কাজের সহকারী ছিলেন গুরুপ্রসন্ন দাস, সুরেন্দ্র চন্দ্র দাস, নরেন্দ্রনাথ সেন, নরেন্দ্রনাথ নিয়োগী - এঁদের কারোরই উচ্চ ডিগ্রি ছিল না। বিজ্ঞান-মন্দির স্থাপনের পর নিয়োগ পেয়েছিলেন গোপাল চন্দ্র ভট্টাচার্য, বিনয় কৃষ্ণ দত্ত, আশুতোষ গুহ-ঠাকুরতা। এঁদেরও কারো উচ্চ ডিগ্রি ছিল না। আশ্চর্যের বিষয় এই যে জগদীশচন্দ্র নিজেই চাইতেন যেন এঁরা কেউ আর পড়াশোনা না করেন।
          দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় পর্যন্ত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ব্যবস্থা ছিল এই যে কোনও কলেজে বা বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠানে কাজের অভিজ্ঞতা থাকলে সেই প্রতিষ্ঠানের প্রধানের সার্টিফিকেট নিয়ে সরাসরি বিএসসি বা এমএসসি পরীক্ষা দেয়া যেতো। এমনকি মহেন্দ্রলাল সরকারের ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশান ফর দি কালটিভেশান অব সায়েন্সে বিজ্ঞান বক্তৃতা শুনে এবং সেখানে ল্যাবোরেটরির অভিজ্ঞতা থাকলেও পরীক্ষা দেয়া যেতো। বসু বিজ্ঞান মন্দিরে বছরের পর বছর কাজ করার পরেও কেউই পরীক্ষা দিতে পারেননি শুধুমাত্র জগদীশচন্দ্র চাননি বলে। একবার স্যার লায়ন্‌স নরেন্দ্রনাথকে ইঞ্জিনিয়ারিং এ স্কলারশিপ দিয়ে বিদেশে নিয়ে গিয়ে উচ্চতর প্রশিক্ষণের সুযোগ দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু জগদীশচন্দ্র অনুমতি দেননি। বলেছিলেন, "তুমি যা জানো বা করতে পারো, ওদেশে গিয়ে কি তার চেয়ে বেশি কিছু শিখবে? যেতে হবে না।"[1]
          জগদীশচন্দ্রের সাথে মানিয়ে চলতে না পেরে বেশ কয়েকজন বিজ্ঞান-মন্দির ছেড়ে চলে যান। নরেন্দ্র সেন ও নরেন্দ্র নিয়োগী ফিরে যান প্রেসিডেন্সি কলেজে। বশীশ্বর সেন বিবেকানন্দর এক আমেরিকান শিষ্যা - গারট্রুড এমারসনকে বিয়ে করে ফেলেন। গারট্রুড ছিলেন একজন ধনাঢ্য বিধবা। বশীশ্বর সেন তাঁর টাকায় বিবেকানন্দ ল্যাবরেটরিজ নামে নিজেই একটি ইন্সটিটিউট গড়ে তোলেন। এটি একটি প্রতিষ্ঠিত কৃষি গবেষণা কেন্দ্রে রূপান্তরিত হয়। ভারতের স্বাধীনতার পর সেটা কেন্দ্রীয় সরকারের অনুদান পায়।
          জগদীশচন্দ্র ভারতীয় বিজ্ঞানের উন্নতির কথা বলতেন সত্য। কিন্তু আসলে চাইতেন শুধু নিজের গবেষণার উন্নতি। তা না হলে রামনকে তিনি এত অপছন্দ করতে পারতেন না। প্রেসিডেন্সি কলেজে তাঁর বর্তমানেই রামন ও তাঁর গ্রুপ গবেষণা শুরু করেছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। অথচ সেই সময় শুরু হলো আঞ্চলিকতার কোন্দল। রামনকে অবাঙালি বলে কোনঠাসা করতে চেয়েছেন জগদীশচন্দ্র তো বটেই - এমনকি মেঘনাদ সাহাও। জগদীশচন্দ্র বসুকে মাথায় তুলে নেচেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। অথচ রামন সম্পর্কে জগদীশচন্দ্রের দেখাদেখি রবীন্দ্রনাথও কোন প্রশংসা কখনো করেননি। এমনকি রামন নোবেল পুরষ্কার পাবার পরেও নয়।
          জগদীশচন্দ্র এতবার বিদেশে গেছেন। তৎকালীন ইওরোপের প্রায় সব বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী ও শারীরবিজ্ঞানীর সংস্পর্শে তিনি এসেছিলেন। কিন্তু আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের ক্রমবিবর্তন এবং নতুন বিজ্ঞানের প্রতি যে তাঁর জানার আগ্রহ ছিল তার কোন প্রমাণ আমরা পাই না। ১৮৯৪ থেকে ১৯০১/০২ পর্যন্ত তিনি পদার্থবিজ্ঞানের একটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় ক্ষেত্রে গবেষণা করেছেন এবং উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছেন। অথচ সেই একই ফিল্ডের যুগান্তকারী আবিষ্কার হলো ইলেকট্রন-এর আবিষ্কার। ১৮৯৭ সালে ইলেকট্রন আবিষ্কার করেন জে জে থমসন। থমসনের সাথে ব্যক্তিগত পরিচয় ছিল জগদীশচন্দ্রের। অথচ নিজের গবেষণার কোথাও তিনি ইলেকট্রন আবিষ্কারের পরের ইফেক্ট নিয়ে কাজ করেননি। ১৯১১ সালে যখন প্রোটন আবিষ্কৃত হয় এবং পুরো পদার্থবিজ্ঞানের ভিত্তিই নতুন করে তৈরি হতে থাকে - তার আগেই তিনি চলে গেছেন উদ্ভিদবিদ্যার গবেষণায়। কিন্তু ১৮৯৬ সালে আবিষ্কৃত হয়েছে রেডিও-অ্যাক্টিভিটি। এই বিষয়ে প্রধান বিজ্ঞানী হেনরি ব্যাকোয়ারেল ও মেরি কুরির সাথেও পরিচয় হয়েছিল জগদীশের। অথচ তিনি তেজষ্ক্রিয়তার বিজ্ঞানকে একটুও আত্মস্থ করেননি। তার প্রমাণ - তাঁর বিনা আলোকে ছবি তোলার দাবি। একটা অশ্বত্থ গাছের পাতার মধ্যে তড়িৎ-তরঙ্গ চালনা করে ফটোগ্রাফিক প্লেটে পাতাটির ছবি তুলেছিলেন তিনি। কিন্তু এই ঘটনার ব্যাখ্যা দিয়েছেন ভুল। তিনি বলেছেন ইলেকট্রিসিটির ফলে পাতার সুপ্ত তেজস্ক্রিয়তা জেগে উঠেছে। অথচ ততদিনে এটা প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে যে তেজস্ক্রিয়তার সুপ্ত বা জাগ্রত অবস্থা থাকে না। বাইরের কোন কিছু দিয়েই তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা প্রভাবিত করা যায় না।
          গাণিতিক দক্ষতা ছিল না জগদীশচন্দ্রের। কিন্তু তাঁর uncommon common sense বা অসাধারণ সাধারণ জ্ঞান ছিল যে কোন বিষয়ে। খুব কম মানুষের মধ্যেই এই গুণ দেখা যায়।
          রবীন্দ্রনাথ ও জগদীশচন্দ্রের মধ্যে যে বন্ধুত্ব সেটা খুব বিরল। এরকম প্রবল ব্যক্তিত্ববান দুজন মানুষের মধ্যে এত দীর্ঘদিন এরকম বন্ধুত্ব টিকে থাকা সহজ কথা নয়। জগদীশচন্দ্রের জন্য রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের যে ত্যাগ ও চেষ্টা দেখা যায়, সে তুলনায় রবীন্দ্রনাথের জন্য জগদীশচন্দ্রের চেষ্টা ততটা দেখা যায় না। রবীন্দ্রনাথ যখন বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় গড়ার জন্য খাটছেন তখন জগদীশচন্দ্র ভেবেছেন - রবীন্দ্রনাথ সম্ভবত বিজ্ঞান-মন্দিরের জন্য ততটা খাটছেন না।
          জগদীশচন্দ্র রবীন্দ্রনাথের সাথে অনেক মজাও করেছেন অনেক সময়। বিশ্বভারতীর রবীন্দ্রভবন থেকে প্রকাশিত রবীন্দ্রবীক্ষার ৪৭তম সংকলনে প্রকাশিত প্রশান্তচন্দ্র মহ্লানবীশের দিনলিপি থেকে একটা মজার ঘটনার কথা জানা যায়। জগদীশচন্দ্র বসুর প্রেসিডেন্সি কলেজের ছাত্র ছিলেন হরেন মুখার্জি। তিনি তখন বি এ ক্লাসের ছাত্র। হরেন মুখার্জির কাছে শোনা এই ঘটনা। একদিন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রেসিডেন্সি কলেজে গেলেন জগদীশচন্দ্রের সাথে দেখা করতে। জগদীশচন্দ্র জানতেন যে রবীন্দ্রনাথ যাবেন সেখানে। তিনি ছাত্রদেরও বলে রেখেছিলেন। কিন্তু যেই খবর পেলেন যে রবীন্দ্রনাথ আসছেন, জগদীশচন্দ্র তখনি একটা এক্সপেরিমেন্ট শুরু করলেন এবং এমন ভাব করে রইলেন যেন তন্ময় হয়ে এক্সপেরিমেন্ট করার কারণে কবি-বন্ধুর উপস্থিতি টেরই পাননি। রবীন্দ্রনাথ তো জগদীশচন্দ্রের একাগ্রতা দেখে মুগ্ধ হয়ে গেলেন।
          আরেকবার জগদীশচন্দ্র রবীন্দ্রনাথকে বললেন, "বন্ধু, তুমি আমার বোস ইন্সটিটিউটকে বিশ হাজার টাকা দাও, আর আমি তোমার বিশ্বভারতীকে বিশ হাজার টাকা দিই।"
          রবীন্দ্রনাথ বুঝতে না পেরে জিজ্ঞেস করলেন, "তাতে লাভ কী?"
          জগদীশচন্দ্র উত্তর দিলেন, "লোকে দেখবে যে আমরা পরস্পরকে সাহায্য করলাম।"[2]
          শান্তিনিকেতনের রবীন্দ্রভক্ত সাহেব অ্যান্ড্রুজ যিনি দীনবন্ধু অ্যান্ড্রুজ নামে পরিচিত ছিলেন - জগদীশচন্দ্র তাঁকে মনে করতেন ব্রিটিশ সরকারের গুপ্তচর। রবীন্দ্রনাথকে একথা বলার পর রবীন্দ্রনাথ তা বিশ্বাস করেননি। ফলে ১৯১৪ সালের পর আর একদিনও শান্তিনিকেতনে যাননি জগদীশচন্দ্র। ব্রিটিশ চরকে রবীন্দ্রনাথ নিজের কাছে রেখেছেন সে কারণেই তাঁর রাগ ছিল? নাকি রবীন্দ্রনাথ তাঁর অনুমানে সায় দেননি সেই কারণে রাগ? মনে হয় শেষেরটাই। কারণ ব্রিটিশদের সাথে সবচেয়ে বেশি ঊঠাবসা ছিল জগদীশচন্দ্রের।
          এ প্রসঙ্গে আরো একটা ঘটনা এখানে উল্লেখযোগ্য - ১৯১৯ সালে পাঞ্জাবে জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর 'স্যার' উপাধি ত্যাগ করেছিলেন। সেই উপলক্ষে জগদীশচন্দ্র তাঁকে এক লাইনের একটা  চিঠি লিখে সমর্থন জানিয়েছিলেন ২/৬/১৯১৯ তারিখে। লিখেছিলেন, "বন্ধু তুমি ধন্য।" কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো দু'বছর আগে ১৯১৭ সালে জগদীশচন্দ্র বসু নিজেও ব্রিটিশ সরকারের "স্যার" উপাধি পেয়েছেন। তিনি কিন্তু তা পরিত্যাগ করেননি।  
          জগদীশচন্দ্র ছিলেন কর্মবীর। তিনি বিশ্বাস করতেন নিজ কর্তব্যে। এক্ষেত্রে তাঁর আদর্শ ছিল মহাভারতের কর্ণ। কর্ণ চরিত্রটিকে তিনি খুব পছন্দ করতেন। রবীন্দ্রনাথকে তিনি লিখেছিলেন, "ভীষ্মের দেবচরিত্রে আমরা অভিভূত হই, কিন্তু কর্ণের দোষগুণ মিশ্রিত অপরিপূর্ণ জীবনের সহিত আমাদের অনেকটা সহানুভূতি হয়।" তাঁর প্রভাবেই রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন 'কর্ণ-কুন্তী সংবাদ'-এর মতো বিখ্যাত কবিতা।
          মৈত্রেয়ী দেবীর লেখায় জগদীশচন্দ্রের জীবন-সায়াহ্নের একটি ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। দার্জিলিং-এর মায়াপুরীতে একটি পার্টিতে বাবা সুরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্তের সাথে গিয়েছে বারো-তেরো বছরের কিশোরী মৈত্রেয়ী। পার্টিতে সে ঘুরঘুর করছিলো জগদীশচন্দ্রের অটোগ্রাফ নেবে বলে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অটোগ্রাফ সহজেই পেয়ে গেছে। রবিঠাকুর শুধু অটোগ্রাফই দেননি, সাথে একটা ছবিও এঁকে দিয়েছেন। এবার আচার্য জগদীশচন্দ্র বসুর অটোগ্রাফ নিতে পারলে তাকে আর পায় কে। গুটি গুটি পায়ে বিজ্ঞানাচার্যের কাছে গিয়ে অটোগ্রাফের খাতা মেলে ধরে "একটা সই দেবেন?" বলতেই জগদীশচন্দ্র গর্জন করে উঠলেন: "এটা কি জন্তুর থাবা যে যেখানে সেখানে পড়বে? আমি ছেলে-ছোকরাদের সই দিই না, যারা গবেষণা করেছে, কাজকর্ম করেছে তাদের দিই।"[3]
          এটা কিন্তু জগদীশচন্দ্রের মেজাজের সামগ্রিক চিত্র নয়। এই জগদীশচন্দ্রই কিন্তু ছেলে-ছোকরাদের সাথে দাপাদাপি করেছেন পদ্মার চরে। রথীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিচারণে আমরা তা দেখেছি। নিজের কোন সন্তান না থাকার একটা কষ্ট তো তাঁর ছিলই। কিন্তু তা কখনোই প্রকাশ করেননি তিনি। শোককে নিরবে সহ্য করার শক্তি তাঁর ছিল।
          জগদীশচন্দ্রের ছিল অবিশ্বাস্য রকমের যান্ত্রিক দক্ষতা। সামান্য উপকরণকে কাজে লাগিয়ে সূক্ষ্ম কাজের উপযোগী সরল যন্ত্রপাতি তিনি তৈরি করতে পারতেন। স্বদেশীয় সাধারণ মানুষদের কর্মদক্ষতা দেখলে তিনি তা কাজে লাগাতে চেষ্টা করতেন। এ প্রসঙ্গে একটা ঘটনা উল্লেখযোগ্য: প্রেসিডেন্সি কলেজে নিজের অফিসে একদিন বিকেল বেলা বসে কাজ করছেন জগদীশচন্দ্র। এসময় মলিন পোশাকের উস্কুখুস্কু এক লোক এসে ঢুকলো। দেখে চিনতে পারলেন জগদীশচন্দ্র। লোকটার নাম নানকুরাম। প্রেসিডেন্সি কলেজের বেয়ারার কাজ করতো। কিন্তু অকর্মন্যতার অভিযোগে তার চাকরি যায়। এখন সংসার চলছে না দেখে আবার এসেছে যদি চাকরিটা পাওয়া যায়। লোকটার করুণ অবস্থা দেখে দয়া হলো জগদীশের। প্রিন্সিপালকে বলে নানকুরামকে আবার বেয়ারার চাকরি দেয়া হলো। কিছুদিন পর ল্যাবের একটি ডায়নামো নষ্ট হলে নানকুরাম যন্ত্রটি মেরামত করার অনুমতি চায়। জগদীশচন্দ্র অবাক হয়ে অনুমতি দেন। দেখতে চান সে কী করে। দেখা গেলো নানকুরাম খুব সহজেই যন্ত্রটি মেরামত করে ফেললো। কীভাবে করলো জিজ্ঞেস করলে সে উত্তর দিলো এর আগে ডায়নামোটি আরেকবার খারাপ হয়েছিল। তখন মিস্ত্রী যখন ওটা মেরামত করছিলো তখন নানকুরাম দেখেছে কীভাবে কী করতে হয়। পরে এই নানকুরামকে দিয়েও অনেক যন্ত্র তৈরি করিয়েছেন জগদীশচন্দ্র। নানকুরাম ছাড়াও মালেক, পুঁটিরাম, জামশেদ, ও রজনীকান্তের মতো অল্পশিক্ষিত কারিগরদের শিখিয়ে নিয়ে গবেষণার যন্ত্রপাতি বানিয়েছেন জগদীশচন্দ্র।
          তাঁর বৈজ্ঞানিক গবেষণার যে ধারা ছিল তা বড় বেশি পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণ নির্ভর। পদার্থবিজ্ঞানে তাঁর গবেষণার সময়-কাল খুব বেশি ছিল না, কিন্তু তাঁর পদার্থবিজ্ঞানের গবেষণাগুলিই পরে অনেক নতুন বিজ্ঞানের পথ প্রদর্শক হয়েছে।
          জগদীশচন্দ্র বসু নিজের মতের ব্যাপারে যে অনমনীয় ছিলেন তা আমরা তাঁর সব কাজেই দেখেছি। সেই ছোটবেলায় টাট্টু ঘোড়ার দৌড় থেকে শুরু করে ইওরোপীয় বিজ্ঞানীদের আসরেও দেখেছি তিনি পিছু হটেননি কখনো। এই ব্যাপারটাই তাঁকে নিয়ে গেছে সামনে, এনে দিয়েছে সাফল্য।
           তাইতো আইনস্টাইনের মতো মানুষও স্বীকার করেছেন,
জগদীশচন্দ্র পৃথিবীকে যেসব অমূল্য তত্ত্ব উপহার দিয়েছেন, তার যে কোনটির জন্যে বিজয়স্তম্ভ স্থাপিত হওয়া উচিত।



[1] সুবীর কুমার সেন, ব্যক্ত অব্যক্ত, পৃ ৫১।
[2] নিত্যপ্রিয় ঘোষ, ব্যক্ত অব্যক্ত, পৃ ২৮০।
[3] মৈত্রেয়ী দেবী, স্বর্গের কাছাকাছি।


No comments:

Post a Comment

Latest Post

Memories of My Father - Part 4

  This is my first photo taken with my father. At that time, I had just moved up to ninth grade, my sister was studying for her honors, and ...

Popular Posts