Monday, 10 September 2018

নতুন বই নতুন লেখক



বাংলাদেশের লেখক, প্রকাশক ও পাঠকের প্রাণের মেলা একুশের বইমেলা। লেখকদের প্রাণের মেলা - কারণ তাঁদের সন্তানসম বইগুলোর বেশিরভাগই পাঠকের মুখ দেখে এই বইমেলায়। প্রকাশকদের প্রাণের মেলা - কারণ তাঁদের সারাবছরের লাভ উঠে আসে এই একটি মেলাতেই। বাংলা একাডেমির হিসেব মতে ২০১৮ সালের বইমেলায় প্রায় ৭৫ কোটি টাকার বই বিক্রি হয়েছে। প্রকাশক সমিতি অবশ্য তার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বলেছে বাংলা একাডেমি বিক্রির পরিমাণ বাড়িয়ে বলেছে। আসলে বিক্রি হয়েছে ৪০ কোটি টাকার বই। 

বাংলাদেশের বই প্রকাশকরা কিছুতেই কত কপি বই ছাপানো হয়েছে, কত কপি বিক্রি হয়েছে তার সঠিক হিসাব প্রকাশ করতে চান না পাছে লেখক টাকা চেয়ে বসেন। কারণ হাতেগোণা কয়েকজন লেখককে ছাড়া আর কাউকেই কোন লেখক-সম্মানী দেন না বাংলাদেশের বেশিরভাগ প্রকাশক। তো ২৮ দিনের মেলায় ৪০ কোটি টাকার বই বিক্রি হওয়াটাও কম কিসে - যেখানে সবাই আজকাল  facebook ছাড়া আর কোন book পড়তে আগ্রহী নয় বলে অভিযোগ শোনা যায়।

এবারের বইমেলায় শুনেছি প্রায় সাড়ে চার হাজার নতুন বই প্রকাশিত হয়েছে। কোন কোন 'বোদ্ধা' লেখক/সমালোচক তাঁদের আকাশছোঁয়া নাক সিঁটকে বলতে শুরু করেছেন - এত বই অথচ তেমন মানসম্মত বই কোথায়? 'নতুন' লেখকদের সম্পর্কে এসব 'পুরনো' লেখকদের তাচ্ছিল্য দেখলে মনে হয় - তাঁরা এই সাড়ে চার হাজার বইয়ের সবগুলো পড়ে ফেলেছেন। বইয়ের মান যাচাইয়ের কি কোন সর্বজনগ্রাহ্য পদ্ধতি আছে? সব পাঠকের যে সব রকমের বই পছন্দ হবে তার কি কোন নিয়ম আছে? আর আমার ব্যক্তিগত মত হচ্ছে লেখকের কোন 'নতুন' 'পুরনো' হয় না। অনেক বছর ধরে লিখছেন এমন লেখককেও নতুন লেখাই লিখতে হয়। নতুন বই-ই প্রকাশ করতে হয়। 

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যাঁরা লেখেন - তাঁদের বই প্রকাশিত হলেও অনেকের গাত্রদাহ হয়। গায়ের ঝাল মেটানোর জন্য লম্বা প্রবন্ধ লিখে ফেলেন তার বই প্রকাশের নিন্দা করে। নিজের কাজে মনযোগী না হয়ে অন্যের কাজের সমালোচনা করাটা অনেক সহজ এবং এই কাজে আমরা জাতিগতভাবে প্রসিদ্ধি লাভ করেছি। তাই কোন লেখা না পড়ে শুধুমাত্র লেখকের নাম বা পরিচিতির ভিত্তিতেই লেখার সমালোচনা করতে বসে যাই। এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তা হয়ে যায় ব্যক্তিনিন্দা। 

বইমেলা উপলক্ষে প্রকাশিত নতুন বইয়ের সংখ্যা সাড়ে চার হাজার শুনে অনেকেই বলতে শুরু করেছেন 'অ্যাত্তো বেশি' বই দিয়ে আমরা কী করবো? বইমেলার পরে সারা বছরে খুব বেশি হলে আর পাঁচ শ নতুন বই প্রকাশিত হবে। তাহলে বছরে প্রায় পাঁচ হাজার নতুন বই। ষোল কোটি মানুষের দেশে এই সংখ্যা কি খুব বেশি? আমেরিকার লোকসংখ্যা আমাদের মাত্র দ্বিগুণ। অথচ সেখানে বছরে নতুন বই প্রকাশিত হয় তিন লাখ - যা আমাদের ৬০ গুণ। জাপানের জনসংখ্যা আমাদের চেয়ে অনেক কম - সেখানে বছরে ৮২ হাজার নতুন বই প্রকাশিত হয়। অস্ট্রেলিয়ার জনসংখ্যা মাত্র দুই কোটি ত্রিশ লাখ। সেখানে বছরে ২৮ হাজার নতুন বই প্রকাশিত হয়। মালয়েশিয়াতে ১৫ হাজার, ইরানে ৭২ হাজার, এমনকি ছোট্ট দ্বীপ হংকং-এ বছরে প্রায় ১৪ হাজার নতুন বই প্রকাশিত হয়। আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতে বছরে প্রায় এক লক্ষ নতুন বই প্রকাশিত হয়। নতুন বইয়ের সংখ্যার দিক থেকে আমরা এখনো অনেকদূর পিছিয়ে আছি।

অনেক লেখক নিজের টাকায় বই প্রকাশ করেন। এই ব্যাপারটাকে বাংলাদেশের 'বড়' 'বড়' লেখকেরা এতটাই নিন্দনীয় ব্যাপার বলে প্রচার করতে শুরু করেছেন যেন বইমেলায় প্রথম বই প্রকাশ করাটা খুব লজ্জার ব্যাপার। প্রকাশকরাও অনেক 'বড়' 'বড়' কথা বলেন - তাঁরা ভালো পান্ডুলিপি পান না - ইত্যাদি। 'ভালো' পান্ডুলিপি কাহাকে বলে, কয় প্রকার ও কী কী? কেউ কি নির্দিষ্ট করে বলতে পারবেন? নিজের টাকায় টিভি নাটক বানালে সমস্যা হয় না, সিনেমা তৈরি করলে সমস্যা হয় না, চিত্রপ্রদর্শনী করলে কোন সমস্যা নেই, গানের ডিস্ক প্রকাশ করলে সমস্যা নেই - কেবল বই প্রকাশ করলেই সমস্যা? বাংলাদেশে হুমায়ূন আহমেদের অনেক আগে থেকেই জনপ্রিয় মাসুদ রানা সিরিজের সবগুলো বই কাজী আনোয়ার হোসেন নিজেই প্রকাশ করেছেন।

বাংলাদেশের 'বড়' 'বড়' লেখকরা বই লিখে সম্মানী পান এবং অনেকে এই সম্মানীর জন্যেও লেখেন। কিন্তু কোন কিছু পাবেন না জেনেও শুধুমাত্র লেখার প্রতি ভালোবাসা থেকে যাঁরা লেখেন, বই প্রকাশ করেন এবং নিজের চেষ্টায় সেই বই পাঠকের কাছে পোঁছে দেন - তাঁদের সব বই পড়া হয়তো সবার পক্ষে সম্ভব নয়, কিন্তু লেখক হিসেবে ন্যূনতম যে সম্মান তাদের পাওনা - সেই সম্মান থেকে যেন আমরা তাঁদের বঞ্চিত না করি।

Saturday, 8 September 2018

চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় "কেউ কথা রাখেনি"


সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের রচনা পৃথিবীর অনেক ভাষায় রূপান্তরিত হওয়া উচিত। বিশ্বজনীন ভাষায় যাঁদের দখল আছে, তাঁরা তা করছেন কিছু কিছু। বিশ্বজনীন ভাষায় আমার তেমন দখল নেই, কিন্তু চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষা আমার প্রাণের ভাষা। তাই সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের বিখ্যাত কবিতা 'কেউ কথা রাখেনি' চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় রূপান্তরিত করলাম। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষা - পড়ার ভাষা নয়, শোনার ভাষা। তাই শুনে দেখুন।






Thursday, 6 September 2018

বইয়ের দাম




"বইমেলার ছবি দেখেছো?"

"দেখলাম তো। সেজেগুঁজে একেবারে নতুন সাদা-কালো বর্ণমালা শাড়ি পরে। পার্লারে গিয়েছিলে নাকি মেলায় যাবার আগে?"

"যাবো না? একুশে ফেব্রুয়ারিতে বইমেলায় যাবো - ভূতের মতো যাবো নাকি? একুশের ফ্যাশান ফলো করতে হবে না?"

"কী বই কিনলে?"

"কিনবো কীভাবে? তোমার বইগুলোর যা দাম! দুই তিনশ' টাকার নিচে কোন বইই নেই। কেনার উপায় আছে?"

"তবে কী করলে?"

"ঘুরলাম। কিছু সেল্‌ফি তুললাম। আর পিৎজা-হাটে গিয়েছিলাম।"

"বইমেলায় পিৎজা-হাট?"

"আরে না। বেইলি রোডে। বন্ধুদের সাথে গিয়েছিলাম।"

"দাম কেমন ওখানে?"

"খুব একটা বেশি না, চলে। আমরা চারজনে খেয়েছি তো - তেইশ শ পঞ্চাশ টাকায় হয়ে গেছে।"

"দুই হাজার তিন শ পঞ্চাশ টাকা!"

"আসলে দুই হাজার তিন শ টাকা। পঞ্চাশ টাকা টিপ্‌স দিয়েছি। ওয়েটারটা খুব কিউট ছিল। হা হা হা।"

সে হাসে। এরকম হাসিখুশি তরুণ-তরুণীর সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে এতে আমার খুশি হবার কথা। কিন্তু পারছি না। কোথাও একটা যন্ত্রণা হচ্ছে।

সৈয়দ মুজতবা আলী আজ থেকে ৬৫ বছর আগে 'বই কেনা' প্রবন্ধটিতে লিখেছিলেন:

বাঙালির "মুখে ঐ এক কথা 'অত কাঁচা পয়হা কোথায়, বাওয়া, যে বই কিনব?'
কথাটার মধ্যে একটুখানি সত্য - কনিষ্ঠাপরিমাণ - লুকনো রয়েছে। সেইটুকু এই যে, বই কিনতে পয়সা লাগে - ব্যস্‌। এর বেশি আর কিছু নয়।
            বইয়ের দাম যদি আরো কমানো যায়, তবে আরো অনেক বেশি বই বিক্রি হবে সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। তাই যদি প্রকাশককে বলা হয়, 'বইয়ের দাম কমাও', তবে সে বলে 'বই যথেষ্ট পরিমাণে বিক্রি না হলে বইয়ের দাম কমাবো কি করে?'
            'কেন মশাই, সংখ্যার দিক দিয়ে দেখতে গেলে বাঙলা পৃথিবীর ছয় অথবা সাত নম্বরের ভাষা। এই ধরুন ফরাসি ভাষা। এ ভাষায় বাঙলার তুলনায় ঢের কম লোক কথা কয়। অথচ যুদ্ধের পূর্বে বারো আনা, চৌদ্দ আনা, জোর পাঁচ সিকে দিয়ে যে-কোন ভাল বই কেনা যেত। আপনারা পারেন না কেন?'
            'আজ্ঞে, ফরাসি প্রকাশক নির্ভয়ে যে-কোন ভালো বই এক ঝটকায় বিশ হাজার ছাপাতে পারে। আমাদের নাভিশ্বাস ওঠে দু'হাজার ছাপাতে গেলেই, বেশি ছাপিয়ে দেউলে হব নাকি?'
            তাই এই অচ্ছেদ্য চক্র। বই সস্তা নয় বলে লোকে বই কেনে না, আর লোকে বই কেনে না বলে বই সস্তা করা যায় না।
............
বাঙালির মতো "এরকম অদ্ভুত সংমিশ্রণ আমি ভূ-ভারতের কোথাও দেখিনি। জ্ঞানতৃষ্ণা তার প্রবল, কিন্তু কেনার বেলা সে অবলা। আবার কোনো কোনো বেশরম বলে, 'বাঙালির পয়সার অভাব' বটে? কোথায় দাঁড়িয়ে বলছে লোকটা এ-কথা? ফুটবল মাঠের সামনে দাঁড়িয়ে, না সিনেমার টিকিট কাটার 'কিউ' থেকে?"
......

৬৫ বছরে একটুও কি বদলেছে আমাদের বই কেনার অভ্যাস? বদলেছে নিশ্চয়। এখন আমরা ফুটবল খেলি না, খেলা দেখিও না। আর সিনেমা হলগুলোর বেশিরভাগ বন্ধ হয়ে গেছে। এখন আমরা ক্রিকেট দেখি। আর ফাস্ট ফুড খাই আর সোশাল মিডিয়া করি।

এই ৬৫ বছরে সবকিছুর দাম বেড়েছে, মানুষের বেতনও বেড়েছে, ক্রয়ক্ষমতাও বেড়েছেসোনার দাম বেড়েছে, জমির দাম বেড়েছে। এখন অবশ্য সেগুলো সবাই কিনতে পারেন না। কিন্তু সবাই যেগুলো কিনতে পারেন, যেমন চাল - দাম বেড়েছে প্রায় তিরিশ গুণ, মাছের দাম বেড়েছে প্রায় দুইশ' গুণ। সেই তুলনায় বইয়ের দাম বেড়েছে খুব বেশি হলে বিশ গুণ। কিন্তু সবাই দোষ দেয় শুধু বইয়ের দামের। 

বাংলাদেশে যে বড় পিৎজা তিন হাজার টাকা দাম দিয়ে কিনে খাবার জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে থাকে মানুষ, সেই পিৎজা অস্ট্রেলিয়ায় দশ ডলার মানে ছয় শ টাকায় পাওয়া যায়। অস্ট্রেলিয়ায় একটি দুইশ' পৃষ্ঠার বইয়ের দাম কমপক্ষে বিশ ডলার অর্থাৎ বারো শ টাকাআর বাংলাদেশে একটা দুই শ পৃষ্টার বইয়ের দাম সবচেয়ে বেশি হলে তিন শ টাকা। অস্ট্রেলিয়ার পাঁচ গুণ দাম দিয়ে পিৎজা খাবার মানুষ আছে বাংলাদেশে অথচ চার ভাগের এক ভাগ দাম দিয়ে বই কেনার মানুষ খুঁজে পাওয়া যায় না।


এর মাঝেও অনেক ব্যতিক্রমী মানুষ আছেন যারা বই কেনেন। মূলত তাঁদের জন্যই বই-প্রকাশকেরা এখনো বইয়ের মেলা করতে সাহস পান।

"ভেবে-চিন্তে অগ্র-পশ্চাৎ বিবেচনা করে বই কেনে সংসারী লোক। পাঁড় পাঠক বই কেনে প্রথমটায় দাঁতমুখ খিঁচিয়ে, তারপর চেখে চেখে সুখ করে করে, এবং সর্বশেষে সে কেনে ক্ষ্যাপার মত, এবং চুর হয়ে থাকে তার মধ্যিখানে। এই একমাত্র ব্যসন, একমাত্র নেশা যার দরুন সকালবেলা চোখের সামনে সারে সার গোলাপী হাতি দেখতে হয় না, লিভার পচে পটল তুলতে হয় না।"

Wednesday, 5 September 2018

আয়নাবাজি



 আয়নাবাজি দেখলাম। খুব ভালো লাগলো। বাংলাদেশের সিনেমা দেখে এত ভালো অনেকদিন লাগেনি। আমি  সিনেমাবোদ্ধা নই। সিনেমা দেখে বিজ্ঞজনোচিত সমালোচনা করার মতো পড়াশোনাও আমার নেই। আমি সিনেমা দেখি আনন্দ পাবার জন্য। বই পড়ে যেরকম আনন্দ পাওয়া যায়, কিংবা গান শুনে, খেলা দেখে, কিংবা দেশ-ভ্রমণে - সেরকম আনন্দ। বাংলাদেশের অনেক সিনেমা দেখে আমি আনন্দ যেমন পেয়েছি, তেমনি আবার অনেক সিনেমার পুরোটা দেখাও একটা বিরাট কষ্টের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। অমিতাভ রেজা চৌধুরির আয়নাবাজি দেখে খুবই আনন্দ পেলাম। কী যে ভালো লাগলো, মনে হচ্ছে আরো অনেকবার দেখলেও আনন্দ কমবে না একটুও।

কেন ভালো লাগলো এই সিনেমাটা? গল্প? নির্মাণশৈলী? চিত্রগ্রহণ? সংলাপ? চিত্রনাট্য? সংগীত? অভিনয়? এক কথায় বলা চলে সবকিছুই ভালো। তবে যদি একের পর এক লিখতে হয়, তাহলে সবচেয়ে প্রথমে লিখবো সংলাপ। বাংলা সিনেমায় এরকম স্বাভাবিক সংলাপ আমি অনেকদিন শুনিনি। হালকা থেকে ভারী সব সংলাপই প্রাণবন্ত। কয়েকটি উদাহরণ:

"হলিউড - এটা কি কাঠের দোকান?"
...
"আমার দুধের বাচ্চা কি জেল খাটতে পারবে? জেলখানায় কি এসি আছে?"
...
"আমি দৈনিক পত্রিকা পড়ি না।"
...
"ফাঁসি আয়নাদেরই হয়।"
...
"রাজনীতি তো সবচেয়ে বড় অভিনয়। দেশ একটা মঞ্চ। সামনে হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ জনতা।"
...
"মালয়েশিয়া যেতে তো আমার কোন ভিসা লাগে না। অনেক জায়গা জমি কেনা আছে সেখানে।"




তারপর আসে অভিনয়। সব চরিত্রই অনবদ্য। চঞ্চল চৌধুরি সত্যিই আয়নার মতো অভিনয় করেছেন। যখন যে চরিত্র সামনে রাখা হয়েছে সেই চরিত্রই ফুটে উঠেছে আয়নায়। সিনেমার অভিনয় সম্পর্কে সত্যজিৎ রায় বলেছেন - "সিনেমায় যদি কোন অভিনেতা ভাল অভিনয় না করতে পারেন, সেটা পরিচালকের দোষ। পরিচালক অভিনয় আদায় করে নিতে পারেননি, অথবা অভিনেতা নির্বাচন করতে ভুল করেছেন।" আয়নাবাজিতে পরিচালক অমিতাভ রেজা চৌধুরি প্রত্যেক অভিনেতার কাছ থেকেই যা চেয়েছেন আদায় করে নিয়েছেন। হলিউড স্টুডিওর ছোট্ট ছেলেটা থেকে শুরু করে সংলাপবিহীন পাগল চরিত্রটাও।

হৃদি চরিত্রটা সত্যিই হৃদয়ে গেঁথে যায়। যুক্তির কাঁচি দিয়ে কাটলে হয়তো টিকবে না কিছুই, কিন্তু পর্দায় হৃদি রূপে নাবিলার উপস্থিতি চারদিক স্নিগ্ধ করে দেয়। বাবা মেয়ের সম্পর্কটা কী যে সুন্দর সহজ আন্ডারস্ট্যান্ডিংটু বিউটিফুল টু বি ট্রু।

"সিংগেল লাইফ কেমন চলছে?"
"ওয়ান্ডারফুল।"
"ডাবল হবার ইচ্ছে আছে?"
"আপাতত নেই।"
"বাপের হোটেলে ক'দিন খাবি?"
"যতদিন বেঁচে আছি।"
"আর আমি ফুড়ুৎ করলে?"
"তখন একটা ভাতের হোটেল দেবো। নাম দেবো বাপের হোটেল।"

সাধারণ বাংলা সিনেমায় প্রেমের মুহূর্তগুলো বড় বেশি আরোপিত, বড় বেশি নাটকীয়। রোমান্টিক সংলাপগুলো যতটা রোমাঞ্চকর তার চেয়ে বেশি বিরক্তিকর। আর আয়নাবাজির মত অসাধারণ সিনেমায় মুহূর্তগুলোও অসাধারণ।

"কাপ অব ক্যাপাচিনো"
"কোন চিনি?"
... ... ...
"এরপর থেকে কোথাও গেলে আমাকে বলে যাবেন।"
... ......
"প্রতিদিন এখানে এসে দুপুরের খাবার খাবো।"
"তাই নাকি? কতদিন?"
"যতদিন নদী থাকে।"
............
"সকালে কখন ওঠ?" ... "তুমি আগে, না সূর্য?"
............
"আয়না পাগলা, আমার সাথে এসব চলবে না।"

সংলাপগুলো পড়লে মনে হয় কত সাধারণ, অথচ কী অসাধারণ রোমান্টিক মুহূর্ত তৈরি করেছেন চঞ্চল ও নাবিলা।

আর তাতে অনুঘটকের কাজ করেছে সংগীত। কী অপূর্ব সুরের কাজ অর্ণবের।

"ধীরে ধীরে যাওনা সময়
আরো ধীরে বও।
আরেকটুক্ষণ রওনা সময়
একটু পরে যাও।"




আয়না তার মায়ের সাথে কথা বলে; যে মা মারা গেছে অনেক বছর আগে। চরিত্রের এই অংশটা হিচককের "সাইকো"র নরম্যান বেইট্‌সকে মনে করিয়ে দেয়।

চলচিত্র সমালোচকদের অনেকেই সিনেমার বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। আমার কাছে সিনেমা সিনেমাই - তথ্যচিত্র নয়। তাই ফাঁসির আসামী কীভাবে প্রতিদিন কারাগারের মধ্যে নিখুঁত ছদ্মবেশ ধারণ করতেন, নকল চুল-দাড়ি লাগাতেন তা নিয়ে প্রশ্ন আমি করি না। ক্ষমতাশালীদের হাত অনেক লম্বা। কিন্তু একটা অসম্পর্কিত অমূলক প্রশ্ন জাগে, সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরি বা মতিউর রহমান নিজামীদের মত ক্ষমতাশালীদের ঠিকঠাক ফাঁসি হয়েছে তো?

পুলিশ অফিসারের অতি-নাটকীয় সংলাপ "বিসিএস সেকেন্ড, পুলিশের চাকরি এমনি এমনি করছি না..." শুনে একটু হাসি অবশ্য পেয়েছে। বিসিএস সেকেন্ডদের এত ক্ষমতা!

সিনেমায় কিছু কিছু মুহূর্ত থাকে - যাতে চোখে পানি এসে যায়। কখনো আনন্দে, কখনো বেদনায় মুহূর্তগুলো দেখতে দেখতে আমি কাঁদি। আয়নাবাজি দেখে কান্না আসেনি কোন দৃশ্যেযদিও গানের এই লাইনটা বড়ই সুন্দর - "জানি জীবন গল্পে অনেক ধাঁধা, একটু হাসি অনেক কাঁদা।"

অনেক অস্কার পুরষ্কার পাওয়া ছবিও দেখার সময় মাঝে মাঝে মনে হয় - ছবিটা শেষ হচ্ছে না কেন? আবার এমন অনেক ভালো লাগা সিনেমা আছে দেখতে দেখতে মনে হয় - সময় থেমে যাক। আয়নাবাজি দেখতে দেখতে তার গানের মতোই মনে হয়েছে, 

"ধীরে ধীরে যাও না সময়
আরো ধীরে বও।
আরেকটুক্ষণ রও না সময়
একটু পরে যাও।।"

Tuesday, 4 September 2018

পরানের গহীন ভিতর এক নাট্যকার




"যদি মানবিক অনুভূতিগুলোকে স্থানভেদে, পাত্রভেদে, কালভেদে ভিন্ন ভিন্নভাবে প্রকাশ করতে না পারো তবে কবিতা নির্মাণ তোমার কাজ নয়।"

আজ থেকে প্রায় ছাব্বিশ বছর আগে কথাগুলো বলেছিলেন সৈয়দ শামসুল হক। না, ঠিক আমাকে নয় - বলেছিলেন আমার এক বন্ধুর বোনকে। কবিযশোপ্রার্থী তরুণীটি সেই সময় দৈনিক একাধিক 'কবিতা নির্মাণ' করছিল অসীম ধৈর্যের সাথে। মানবিক অনুভূতিগুলো সে প্রকাশ করার চেষ্টা করছিল কবিতায়। কিন্তু আমার কথা ভিন্ন। সুকুমার মানবিক অনুভূতি - আনন্দ-বেদনা-ক্রোধ-ঈর্ষা-প্রেম-অভিমান ভিন্ন ভিন্ন ভাবে তো দূরের কথা, কোনভাবে প্রকাশেই আমি সক্ষম নই। তাই কবিতার নির্মাণ-শিল্পে আমার স্থান হয়নিসৈয়দ হকের দেহাবসানের খবর পাবার পর অনুভূতিশূন্য আমার মনে পড়লো ছাব্বিশ বছর আগের সেই দিনটির কথা। সৈয়দ শামসুল হককে সেদিন প্রথম দেখেছিলাম একেবারে হাতছোঁয়া দূরত্বে দাঁড়িয়ে।

১৯৯০'এর প্রথম দিকে তখন এরশাদের স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক আন্দোলনের পাশাপাশি প্রবল সাংস্কৃতিক আন্দোলন চলছে বাংলাদেশের সবখানে। চট্টগ্রাম মুসলিম ইন্সটিটিউট হলের প্রতিবাদী কবিতা উৎসবে এসেছিলেন সৈয়দ হক। কবিতা পড়ার চেয়েও কবিতা শোনার প্রতি আমার আগ্রহ ছিল বেশি। প্রতিবাদী কবিতাগুলো তখন আগুনের মতো জ্বালা ধরাতো আমাদের তরুণ ধমনীতে। আমার কাছে কবির চেয়েও আকর্ষণীয় ছিল আবৃত্তিকার। যেমন নাট্যকারের চেয়েও অভিনেতা জনপ্রিয়। অনুষ্ঠান শুরুর অনেক আগে গিয়ে ঘুরঘুর করে কবি মহাদেব সাহা ও ত্রিদিব দস্তিদারকে পাশ কাটিয়ে অটোগ্রাফ নিচ্ছিলাম ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছ থেকে। বন্ধু টেনে নিয়ে গেলো হলের ভেতর যেখানে একেবারে সামনের সারিতে বসে কথা বলতে বলতে অটোগ্রাফ দিচ্ছিলেন সৈয়দ শামসুল হক। দেখলাম আরো অনেকের সাথে দাঁড়িয়ে উঠতি তরুণী-কবি হা করে গিলছে কবি-বাণী। কবিতা কীভাবে লিখতে হয়, কীভাবে লিখতে হয় না, কীভাবে গড়ে ওঠে কবিতার শরীর, কবিতার মন - অনেক কিছুই বলেছিলেন সৈয়দ হক। সেসবের বেশিরভাগই ভুলে গেছি। অনুভূতির ব্যাপারটা যে ভুলে যাইনি সেটা বুঝতে পারলাম আজ সৈয়দ হকের মৃত্যুর পর।




বাংলা সাহিত্যের সবগুলো শাখায় হাত দিয়েছেন সৈয়দ হক, এবং সোনা ফলিয়েছেন। তাঁর কবিতা, উপন্যাস, গান, নাটক, অনুবাদ সম্পর্কে বিষয়ভিত্তিক জ্ঞানগর্ভ আলোচনা চলবে অনেকদিন। ইতোমধ্যেই তাঁর নাটক নিয়ে অ্যাকাডেমিক গবেষণা হয়েছে - বাংলাদেশে তো বটেই, অন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়েও। ১৯৯৯ সালে অস্ট্রেলিয়ার উলংগং ইউনিভার্সিটিতে "থ্রি বাংলাদেশি প্লেস কনসিডার্‌ড ইন পোস্টকলোনিয়াল কনটেক্স" (Three Bangladeshi Plays considered in postcolonial context) থিসিসে সৈয়দ শামসুল হকের "নুরলদিনের সারাজীবন" কাব্যনাটকের ওপর আলোকপাত করেছেন খাইরুল হক চৌধুরি। শিল্পকলা সম্পর্কিত এধরনের গভীর আলোচনা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আমি শুধু তাঁকে কীভাবে দেখেছি কীভাবে চিনেছি সেটুকুই বলতে পারি।

সৈয়দ শামসুল হক যে কত বড় কবি এবং নাট্যকার সে সম্পর্কে প্রথম ধারণা পাই চট্টগ্রাম কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক ক্লাসে। তখন গ্রাম থেকে শহরে এসেছি কলেজে পড়ার জন্য। থাকি হোস্টেলে। পড়াশোনা করি বা না করি, ক্লাস কোনটাই মিস করি না। বাংলা ক্লাসগুলো থাকতো বিকেলের দিকে। সায়েন্সের টিচাররা সেই সময় তাঁদের বাসায় বাসায় টিউশনির দোকান খুলতেন। অনেকেই বাংলা ইংরেজি ক্লাসগুলো বাদ দিয়ে সায়েন্সের সাবজেক্ট প্রাইভেট পড়তে যেতো। ক্লাসের পড়াই আমার ঠিকমতো করতে ইচ্ছে করে না, আবার টিউশনির দোকানে যাবো বিদ্যা কিনতে? আমি এবং আমার মতো আরো কয়েকজন বাংলা ক্লাসও করতাম। আমাদের সেকশানে বাংলা পড়াতেন সিরাজ স্যার। তিনি অবশ্য তাঁর পুরো নাম আ ফ ম সিরাজউদ্দৌলা চৌধুরি বলতেই পছন্দ করতেন। তিনি নিজেও কবি - অন্য কবিদের সন্ধানও দিতেন। একদিন দেখা গেলো পঁচাত্তর জনের ক্লাসে আমরা মাত্র তেরো জন উপস্থিত হয়েছি। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, "বাকি সবাই কি 'মানসম্মান' দেখতে গেছে?"
            
তখন চট্টগ্রামে অনেকগুলো সিনেমা হল। চট্টগ্রাম কলেজের খুব কাছেই গুলজার সিনেমা হল। প্রতি সপ্তাহে একাধিক সিনেমা দেখা আমার 'অবশ্য কর্তব্য'র তালিকায় আছে। শাবানা অভিনীত বাণিজ্যিক ছবি মানসম্মান মুক্তি পেয়েছিল ঈদ উপলক্ষে। প্রথম শো'তেই দেখে ফেলেছি। তাই স্যারের কথায় বেশ উৎসুক হয়ে উঠলাম। স্যার বললেন, "এই সিনেমাটা ভালো হওয়া উচিত। এর কাহিনি নেয়া হয়েছে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের দেবী চৌধুরানি উপন্যাস থেকে। আর চিত্রনাট্য লিখেছেন সৈয়দ শামসুল হক। সিনেমাটা আমি দেখেছি - কিন্তু অভিনেতা অভিনেত্রীর নামগুলো ছাড়া অন্যদের নামও যে পড়তে হয় সে বোধ তখনো জন্মায়নি। সিরাজ স্যার বললেন সৈয়দ শামসুল হকের কথা। তিনি যে কত বড় কবি, উপন্যাসিক, চিত্রনাট্যকার, গীতিকার আরো কত কী। বললেন আরেকটি সিনেমার কথা - যেটা নাকি অনেকগুলো জাতীয় পুরষ্কার পেয়েছে। "বড় ভালো লোক ছিল"- সিনেমাটা মুক্তি পেয়েছিল আমি শহরে আসার আগে। নইলে মিস হবার কথা নয়। পরে টিভিতে দেখেছি। সৈয়দ হকের লেখা "হায় রে মানুষ রঙিন ফানুস, দম ফুরাইলে ফুস" গানটি খুবই জনপ্রিয়। সৈয়দ হক জাতীয় চলচিত্র পুরষ্কার পেয়েছিলেন এই সিনেমার সংলাপ লেখার জন্য।
            
শিল্পকলার যে শাখার প্রতি আমার সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ জন্মেছিল তা হলো মঞ্চনাটক। গ্রামে সারারাত জেগে নাটক করতাম। না যাত্রা, না থিয়েটার - একটা রঙিন কাপড় ঝোলানো মঞ্চে দাঁড়িয়ে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক টানে তারস্বরে চিৎকার করতে করতে অনেক নাটকীয় মুহূর্ত তৈরি করতাম। শহরে আসার পর হঠাৎ স্বাধীনতা পেয়ে প্রথম কয়েক বছর শুধু সিনেমা দেখে কাটিয়েছি। তারপর যেদিন প্রথম গ্রুপ থিয়েটারের নাটক দেখলাম - মনে হলো একটা নতুন জগৎ খুলে গেলো চোখের সামনে। দেখলাম থিয়েটারের "যুদ্ধ এবং যুদ্ধ"। নাট্যকার সৈয়দ শামসুল হক। মাত্র দুই ঘন্টার একটা নাটক যে এত শক্তিশালী হতে পারে - আমার কোন ধারণাই ছিল না।
            
১৯৮৭ সাল তখন। এরশাদ স্বৈরাচার চালাচ্ছে, আর সামরিক আচ্ছাদনের আড়ালে জামায়াত শিবির প্রসারিত হচ্ছে। চট্টগ্রাম শহরের বেশিরভাগ কলেজ শিবিরের দখলে চলে গিয়েছিল আগেই। ১৯৮৬'র নভেম্বর মাসে তারা দখল করলো চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। সেই সময় চট্টগ্রাম শিল্পকলা একাডেমিতে দেখলাম "যুদ্ধ এবং যুদ্ধ"। নাট্যকার সৈয়দ শামসুল হকের ভক্ত হয়ে পড়লাম আমি। পরের কয়েক বছরে যখনই সুযোগ পেয়েছি - মঞ্চনাটক দেখেছি। দেখেছি "পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়", "নূরলদীনের সারাজীবন", "ঈর্ষা"।

কাব্য-নাটকের সাথে আগেও পরিচয় ছিল। ইন্ডিয়ান কিছু যাত্রাপালা ছিল কাব্যনাটকের ধরনে রচিত। পৌরাণিক নাটক "রাবণ বধ"-এ "ত্রিদিব কম্পিত আজি বীরত্বে আমার। তবু আজ প্রাণে জাগে ভীতি, কে যেন বলিছে ডাকি অন্তর হইতে - রে দশানন ..." ইত্যাদি দীর্ঘ সংলাপ মুখস্থ করে আউড়েছি খোলা মঞ্চে কয়েক হাজার দর্শকের সামনে। কিন্তু সেই সংলাপের সাথে নুরলদিনের সংলাপের কত পার্থক্য! একেকটা শব্দের কী জোর, কী আবেদন!

            নূরলদীনের কথা মনে পড়ে যায়
            যখন শকুন নেমে আসে এই সোনার বাংলায়
            নূরলদীনের কথা মনে পড়ে যায়
            যখন আমার দেশ ছেয়ে যায় দালালেরই আলখাল্লায়;
            নূরলদীনের কথা মনে পড়ে যায়
            যখন আমার স্বপ্ন লুট হয়ে যায়;
            নূরলদীনের কথা মনে পড়ে যায়
            যখন আমার কন্ঠ বাজেয়াপ্ত করে নিয়ে যায়;
            নূরলদীনের কথা মনে পড়ে যায়
            যখন আমারই দেশে এ আমার দেহ থেকে রক্ত ঝরে যায়
            ইতিহাসে, প্রতিটি পৃষ্ঠায়।

          
বুঝলাম স্থান-কাল-পাত্রভেদে অনুভূতি প্রকাশ বলতে তিনি কী বুঝিয়েছিলেন। ১৭৮০'র দশক আর ১৯৮০'র দশকে কত মিল। বিদ্রোহের প্রয়োজন এখনো ততোটাই তীব্র।

           
কিন্তু আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে "ঈর্ষা"। মাত্র তিনটি চরিত্র। সর্বমোট সাতটি সংলাপে দুইঘন্টারও বেশি সময় ধরে টান টান উত্তেজনা। একেকটা সংলাপের দৈর্ঘ্য সাত-আট পৃষ্ঠা। কী অভিনয় জামাল উদ্দিন হোসেন, সারা জাকের আর খালেদ খানের। মানবিক অনুভূতি প্রকাশের কী সূক্ষ্ম অথচ কী তীব্র ভঙ্গি! সেই থেকে আমার প্রিয় নাট্যকার সৈয়দ শামসুল হক।

            
তারপর কত সময় চলে গেছে। তাঁকে দ্বিতীয় এবং শেষ বার দেখেছি ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে। চট্টগ্রামের তির্যক নাট্যদলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে শেক্‌সপিয়ারের অনুবাদ বিষয়ে বক্তৃতা দিতে এসেছিলেন। কাছ থেকে শুনেছি তাঁর বক্তৃতা। শেক্‌সপিয়ারের নাটকের এত সার্থক বাংলা অনুবাদ তাঁর মতো করে আর কেউ করতে পারেননি। উৎপল দত্ত ছিলেন শেক্‌সপিয়ারের নাটকের দিক্‌পাল। তিনি নিজে স্বীকার করে গেছেন সৈয়দ শামসুল হকের সার্থক অনুবাদের কথা। একেকটা শব্দের যথার্থতা নিয়ে দিনের পর দিন ভেবেছেন সৈয়দ হক। সেদিন তিনি বলেছিলেন - বাংলা সাহিত্যে যদি কেউ পথ খুঁজে না পায় - তাহলে রবীন্দ্রনাথ পথ দেখাবেন। অনুবাদ করার সময় অনেক শব্দ তিনি খুঁজে পেয়েছেন রবীন্দ্রনাথে। আবার বলেছেন সেই অনুভূতি প্রকাশের ভিন্নতার প্রয়োজনীয়তা, মাত্রা রক্ষার প্রয়োজনীয়তা- বহুমাত্রিক হবার জন্য মাত্রাজ্ঞান থাকার প্রয়োজনীয়তার কথা।

            
লেখকরা যখন একটা উচ্চতায় পৌঁছে যান - আত্মবিশ্বাসের প্রাবল্যে তাঁরা কিছুটা শিথিল হয়ে যান মাঝে মাঝে। কিন্তু সৈয়দ হকের রচনার বুননে আশি বছর বয়সেও কোন শৈথিল্য দেখা যায়নি। অসুস্থ শরীরে শেষ সময়ে নিজেই বুঝতে পেরেছিলেন যে জীবন নাটকের শেষ দৃশ্য চলছে - মঞ্চের আলো নিভে যাবে একটু পরেই। সেই সময়ের সবটুকু তিনি ঢেলেছেন নতুন সৃষ্টির নির্মাণ-কল্পে। শব্দের কারিগর কখনোই থেমে থাকেননি।

            
দেড় যুগ আগে যখন একটা স্যুটকেস হাতে বেরিয়ে পড়েছিলাম পৃথিবীর পথে আমার দিদি একটা বই রেখে দিয়েছিল আমার হ্যান্ডব্যাগের সাইড-পকেটে। বইটা দৈর্ঘ্য-প্রস্থ-আর পুরুত্বে সাধারণ বইয়ের থেকে অনেক ছোট, কিন্তু অনেক ঢাউশ বইয়ের চেয়েও তীব্র -সৈয়দ হকের "পরানের গহীন ভিতর"।  তেত্রিশটি সনেট আছে বইটিতে, আর আছে কবির আঁকা কয়েকটি স্কেচ। কতবার যে কবিতাগুলো পড়েছি। প্রতিবারই কেমন যেন মোচড় দিয়ে ওঠে পরানের গহীন ভেতর। ভাষাটা কবির আঞ্চলিক, অথচ মনে করিয়ে দেয় আমার শেকড়ের কথা -

            "এ বড় দারুণ বাজি, তারে কই বড় বাজিকর
            যে তাঁর রুমাল নাড়ে পরানের গহীন ভিতর।"

Sunday, 2 September 2018

আইনস্টাইনের অটোগ্রাফ



১৯৫০ সালে ডাচ কার্টুনিস্ট ভাইরিনগেনের (Wieringen) একটা কার্টুন জনপ্রিয় হয়েছিল। কার্টুনে দেখা যাচ্ছে ইউরোপের বিজ্ঞ প্রফেসররা 'আইনস্টাইন-সমস্যা'র সমাধান করতে গিয়ে পাগল হয়ে যাচ্ছেন। একজন মাথার চুল ছিঁড়ছেন, একজন নিজের কপালে পিস্তল ঠেকিয়ে আত্মহত্যায় উদ্যত হয়েছেন। আর সাদামাটা আইনস্টাইন উদাস ভাবে দাঁড়িয়ে আছেন এক কোণায় - যেন কোন কিছুতেই কিছু যায় আসে না তাঁর। 


ডাচ কার্টুনিস্ট ভাইরিঙ্গেনের কার্টুন


আইনস্টাইন তাঁর সার্বিক আপেক্ষিকতার তত্ত্ব প্রকাশ করেছিলেন ১৯১৬ সালে। 'আনালেন ডের ফিজিক' এর ৪৯ সংখ্যায় ৫৩ পৃষ্ঠার ঢাউস গবেষণাপত্রে আইনস্টাইন জেনারেল থিওরি অব রিলেটিভিটি বা আপেক্ষিকতার সার্বিক তত্ত্বের গোড়াপত্তন করেছিলেন। আইনস্টাইন তাঁর এই তত্ত্বকে যতই প্রকৃতির স্বাভাবিক সাধারণ নিয়ম বলে প্রতিষ্ঠা করেছেন - ততই বিজ্ঞদের মাথা খারাপ হয়ে যাবার অবস্থা - তাঁর তত্ত্বের জটিলতায়।


আপেক্ষিকতার সার্বিক তত্ত্ব প্রকাশিত হবার এগারো বছর আগে ১৯০৫ সালে আইনস্টাইন প্রকাশ করেছেন তাঁর আরো চারটি যুগান্তকারী গবেষণাপত্র - যেগুলোর মাধ্যমে আইনস্টাইন 'আইনস্টাইন' হয়ে উঠেছিলেন। স্পেশাল থিওরি অব রিলেটিভিটি বা আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্ব - যা থেকে স্থান ও কালের পারস্পরিক নির্ভরশীলতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্বের প্রবন্ধটি ছিল ১২১ পৃষ্ঠার। পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় সমীকরণ E = mc2 প্রকাশিত হয়েছিল ১৯০৫ সালে। মাত্র আড়াই পৃষ্ঠার ছোট্ট একটা পেপারে আইনস্টাইন এই সমীকরণের মাধ্যমে ভরের নতুন সূত্র দিয়েছিলেন - 'বস্তুর ভর হলো তার ভেতরের শক্তির পরিমাপ'। একই বছরে প্রকাশিত আরো একটি পেপারে আইনস্টাইন শক্তি ও কম্পাঙ্কের মধ্যেই সমানুপাতিকতার সম্পর্ক E = hf (যেখানে f হচ্ছে কম্পাঙ্ক, আর h হলো প্ল্যাংকের ধ্রুবক) এর ভিত্তিতে ফটো-ইলেকট্রিক ইফেক্টের তাত্ত্বিক সম্পর্ক স্থাপন করেন। সতের বছর পর ১৯২২ সালে এই ফটো-ইলেকট্রিক ইফেক্টের তত্ত্বের জন্যই আইনস্টাইন নোবেল পুরষ্কার পেয়েছিলেন। কিন্তু যখন তিনি পেপারগুলো লেখেন তখন শুধুমাত্র জীবনধারণের জন্য প্যাটেণ্ট অফিসে কেরানিগিরি করছিলেন তিনি।


১৯০২ থেকে ১৯০৮ সাল পর্যন্ত সুইজারল্যান্ডের বার্ন শহরে প্যাটেন্ট অফিসে কাজ করেছেন আইনস্টাইন। তার আগের কয়েক বছর হন্যে হয়ে চাকরি খুঁজেছেন। পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে টিউশনি খুঁজেছেন। নিয়মিত কোন ছাত্রও পাননি পড়াবার জন্য। ক্লাস প্রতি মাত্র দুই ফ্রাংক দিয়েও কেউ পড়তে আসেনি আইনস্টাইনের কাছে। পরে আবার বিজ্ঞাপন দিয়ে প্রতি ঘন্টায় তিন ফ্রাংকের বিনিময়ে একজন ছাত্রকে পড়িয়েছিলেন কিছুদিন। প্যাটেন্ট অফিসের চাকরিটি পাওয়ার জন্যও তাঁকে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। বন্ধুর প্রভাবশালী বাবার সুপারিশ লেগেছে একটা তৃতীয় শ্রেণির চাকরি পাবার জন্য।

প্যাটেন্ট অফিসে সারাদিন কাজ করার পর সন্ধ্যাবেলা বাড়িতে ফিরে স্ত্রী আর সন্তানকে একপ্রকার বঞ্চিত করেই নিজের গবেষণা নিয়ে বসেছেন। পেপার লিখেছেন। প্রকাশ করেছেন। তার মধ্যেও সামান্য কিছু বেশি অর্থের জন্য প্রাইভেট টিউশনিও করেছেন। ১৯০৫ সালের ২৪ অক্টোবর থেকে ২১ নভেম্বর পর্যন্ত লুসিন শ্যাভেন নামে একজন ছাত্রকে চার দিন পড়ানো বাবত আঠারো ফ্রাংক নিয়ে নিজের হাতে নিচের রশিদটি  লিখে দিয়েছিলেন আইনস্টাইন। 

আইনস্টাইন প্রাইভেট টিউশনির টাকা নিয়ে রসিদ দিতেন

আইনস্টাইনের নিজের হাতের লেখা বা অটোগ্রাফের কোন চাহিদাই সেদিন কারো ছিলো না। আইনস্টাইন নিজেও কোনদিন বিখ্যাত হবার স্বপ্ন দেখেননি। শুধু চেয়েছিলেন শান্ত কোন পরিবেশে কোন একটা কোণে চুপচাপ বসে নিজের মনে কাজ করতে, প্রকৃতির নিয়ম কানুন বোঝার চেষ্টা করতে। 
অনেক সংগ্রাম আর চড়াই উৎরাই পেরিয়ে আইনস্টাইন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হতে পেরেছিলেন। স্বাধীন চিন্তার একটা প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি পেয়েছিলেন। প্রকৃতিকে তাঁর মতো করে আর কেউই বুঝতে পারেননি। কিন্তু শান্তিপ্রিয় মানুষটির শান্তি নষ্ট হয়ে যাবার জোগাড় হলো বিখ্যাত হয়ে ওঠার পর থেকে।


১৯১৯ সালে তাঁর সার্বিক আপেক্ষিকতার তত্ত্বের সত্যতা পরীক্ষামূলকভাবে প্রমাণিত হয়। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অবজারভেটরির পরিচালক স্যার আর্থার এডিংটন সূর্যের অভিকর্ষজ ক্ষেত্রের টানে যে তারার আলো বেঁকে যায় তা পর্যবেক্ষণ করেন। এই সংবাদ প্রকাশিত হবার সাথে সাথে আইনস্টাইন রাতারাতি পৃথিবীবিখ্যাত হয়ে ওঠেন। আইনস্টাইনের তত্ত্ব যে সবাই খুব বুঝে গেলেন তা নয়। বরং তাঁর তত্ত্বের দুর্বোধ্যতাই তাঁকে আরো বিখ্যাত করে তুললো। বৈজ্ঞানিক কাজের সর্বোচ্চ স্বীকৃতি নোবেল পুরষ্কার পেলেন ১৯২২ সালে।  তারপর থেকেই প্রচারমাধ্যমে আইনস্টাইন নিত্য-স্মরণীয় হয়ে উঠলেন। 

খ্যাতির শীর্ষে উঠে যেতে সময় লাগলো না আইনস্টাইনের। এসব ক্ষেত্রে যা হয় - নানারকম মিথ তৈরি হতে থাকে আইনস্টাইনকে ঘিরে। আইনস্টাইন অবশ্য মিডিয়ার এসব প্রচারে তেমন গুরুত্ব দেন না। (তখন অবশ্য টেলিভিশনের দৌরাত্ম্য ছিল না। আইনস্টাইনকে টিভি টকশো করতে হয়নি)। কিন্তু আইনস্টাইন কোন পাবলিক সমাবেশে গেলেই অটোগ্রাফের জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়েন অনেকেই। (অবশ্য এখন ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালের অটোগ্রাফ নেয়ার জন্য যেরকম ভীড় হয় - আইনস্টাইনের ক্ষেত্রে তার শতাংশও হতো না।) এই অটোগ্রাফ সংগ্রহকারীদের হাত থেকে বাঁচতে চাইতেন আইনস্টাইন। তিনি জানতেন যে এই অটোগ্রাফ সংগ্রহকারীদের বেশির ভাগেরই তাঁর বিজ্ঞানের প্রতি কোন ভালোবাসা নেই। কেবল বিখ্যাত ব্যক্তির স্বাক্ষর সংগ্রহ করতে পারলে বা পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তুলতে পারলে নিজেদের সামাজিক মূল্য খানিকটা বাড়ে বলেই অটোগ্রাফ সংগ্রহের জন্য ভীড়। 

আইনস্টাইন অটোগ্রাফ সংগ্রহকারীদের ওপর খুবই বিরক্ত হতেন। 'ভক্ত' বলতেই ব্যক্তিগত ভক্তির প্রশ্ন আসে। ব্যক্তিপূজায় বিশ্বাসী ছিলেন না আইনস্টাইনঅটোগ্রাফ সংগ্রহের নামে গায়ের ওপর উঠে পড়াটাকে তিনি কিছুতেই মেনে নিতে পারতেন না। খ্যাতিমানরা প্রকাশ্যে আনন্দ প্রকাশ করতে পারেন কিন্তু বিরক্তি প্রকাশ করতে পারেন না। আইনস্টাইন অটোগ্রাফ শিকারিদের হাত থেকে বাঁচার জন্য একটা উপায় বের করলেন। তিনি ঘোষণা দিলেন তাঁর অটোগ্রাফ নিতে হলে পয়সা খরচ করতে হবে। তিনি একটা ফরম ছাপলেন অটোগ্রাফ সংগ্রহকারীদের জন্য। ফরমে অটোগ্রাফ সংগ্রহের নিয়ম বেঁধে দেয়া হলো - কোন দাতব্য প্রতিষ্ঠানে চাঁদা দিয়ে চাঁদার রসিদ দেখালে তবেই আইনস্টাইন অটোগ্রাফ দেবেন - নইলে নয়। আমেরিকায় স্থায়ীভাবে চলে যাবার আগ পর্যন্ত এই নিয়ম চালু রেখেছিলেন আইনস্টাইন। 


আইনস্টাইনের অটোগ্রাফ নিতে হলে এই ফরম পূরণ করতে হতো


১৯৩৩ সালে হিটলারের ইহুদি বিদ্বেষের কারণে উদ্বাস্তু হয়ে আমেরিকায় যাবার পর আইনস্টাইন আর কখনো ফিরেননি জার্মানিতে। কয়েক বছর পর আমেরিকার নাগরিকত্ব নিলেও মনে প্রাণে আমেরিকান হয়ে ওঠতে পারেননি আইনস্টাইন। কারো পক্ষেই সম্ভব নয় নিজের জন্মভূমিকে ভুলে গিয়ে পুরোপুরি অন্য দেশের হয়ে যাওয়া। কিন্তু কোন কিছুতেই থেমে যাওয়া আইনস্টাইনের স্বভাববিরুদ্ধ। জীবন সম্পর্কে তাঁর দর্শন ছিলো অত্যন্ত পরিষ্কার। তিনি বলতেন - 'জীবন হলো সাইকেলে চড়ার মতো - যতক্ষণ চালাতে থাকবে চমৎকার দু'চাকার উপর বসে থাকতে পারবে, থামলেই পড়ে যাবে'। 



Thursday, 30 August 2018

আইনস্টাইনের খাবারদাবার




কবি-সাহিত্যিকদের ব্যক্তিগত খাবার-দাবার সম্পর্কিত গবেষণা প্রায়ই হয়ে থাকে। রবীন্দ্রনাথের খাদ্যরুচি কেমন ছিল, কয়টি পদ দিয়ে তিনি রাতের ভোজন সারতেন, প্রাতঃরাশে রুটি খেতেন নাকি লুচি, ইত্যাদি প্রসঙ্গও খুবই গুরুত্ব পায় রবীন্দ্র-আলোচনায়। হুমায়ূন আহমেদ খেতে ভালোবাসতেন, খাওয়াতে ভালোবাসতেন, রান্না ও খাবারের প্রতি তাঁর বিশাল আগ্রহের কথাও খুব জানা যায়। ড. আনিসুজ্জামান কিংবা আবু হেনা মোস্তফা কামালের কঠিন-পানীয়প্রীতির কথাও অজানা নয়। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ও খেতে পছন্দ করতেন, কঠিন-পানীয় পেলে তো কথাই ছিল না। নতুন নতুন খাবার সে কাঁচা ঝিনুকই হোক কিংবা ব্যাঙের স্যুপ, সুনীল খেতেন খুব আগ্রহ নিয়ে। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় যে খাদ্যের ব্যাপারে কট্টর রক্ষণশীল- অনুকূল ঠাকুরের বাণী সহযোগে সিদ্ধ চাল-ডাল ছাড়া আর কিছুই তেমন খান না, আমেরিকায় যাবার সময়েও গামছা বেঁধে নিজের চাল-ডাল সাথে নিয়ে যান, তাও আমরা জানি। কিন্তু বিজ্ঞানীদের প্রসঙ্গ যখন আসে তখন তাঁদের বৈজ্ঞানিক অবদান এতটাই প্রাধান্য পায় যে তাঁরা কী খান, কী পান করেন, কী কী খেতে ভালোবাসেন, কী কী খাবারের গন্ধও সহ্য করতে পারেন না এসব ধর্তব্যের মধ্যে আসে না। তবে কোন বিজ্ঞানী যদি তাঁর বৈজ্ঞানিক সীমারেখা ছাপিয়ে ঢুকে পড়েন একেবারে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে তখন তাঁর ব্যক্তিগত জীবনযাপন নিয়ে আমাদের কৌতূহল হয়। আইনস্টাইনের ক্ষেত্রে তেমনটিই হয়েছে।

আইনস্টাইনের মতো এতটা প্রচার আর কোন বিজ্ঞানীই পাননি কখনো। আইনস্টাইনের আবিষ্কার পদার্থবিজ্ঞানের মৌলিক ভাবনাকে বদলে দিয়েছে, মহাবিশ্বের অজানা রহস্য সন্ধানে তাঁর আপেক্ষিকতার তত্ত্বকে এড়িয়ে চলার কোন উপায় নেই। এটা তো বৈজ্ঞানিক সত্য। এর বাইরে বিশাল সংখ্যক মানুষ আছেন যাঁরা আইনস্টাইন ঠিক কী আবিষ্কার করেছেন তা হয়তো ঠিকমতো বলতে পারবেন না, কিন্তু আইনস্টাইনের বড় ফ্যান। আইনস্টাইন সম্পর্কে এত বেশি ঘটনা ও মিথ প্রচারিত হয়েছে প্রচারমাধ্যম এবং লোকের মুখে মুখে - যে আইনস্টাইন নিজেও এক এক সময় আশ্চর্য হয়ে গেছেন ওসব দেখে এবং শুনে। ১৯৪৯ সালের ফেব্রুয়ারির ১২ তারিখ আইনস্টাইন তাঁর বন্ধু ম্যাক্স ব্রডকে লেখা চিঠিতে এ প্রসঙ্গে বলেন, "আমার সম্পর্কে ইতোমধ্যে এত বেশি মিথ্যা আর বানানো কথা প্রচার করা হয়েছে যে আমি যদি ওসবের দিকে মনযোগ দিতাম তাহলে এতদিনে আমাকে কবরে ঢুকে যেতে হতো।"

এত প্রচারের মধ্যেও আইনস্টাইনের খাওয়াদাওয়া সম্পর্কে কিন্তু তেমন কোন মিথ বা গুজব কিছুই নেই। কারণ খাবার-দাবারের ব্যাপারে আইনস্টাইন ছিলেন একেবারে যাচ্ছেতাই সাধারণ মানের। আইনস্টাইন পেটের ক্ষুধা মেটানোর জন্য খেতেন, রসনার তৃপ্তির জন্য নয়। খাবার সময়েও তিনি এত অন্যমনস্ক থাকতেন যে কী খাচ্ছেন ঠিক খেয়ালও করতেন না।

ছোটবেলায় আইনস্টাইনের মা পলিন ভালোমন্দ রান্না করে ছেলেকে খাওয়াতেন। কিন্তু ছোটবেলা থেকেই কোন খাবারের প্রতিই বিশেষ কোন আগ্রহ ছিল না আইনস্টাইনের। তারপর কিশোর বয়স থেকেই তো আইনস্টাইন বাড়ির বাইরে। স্কুলের দিনগুলি খুব একটা সুখের কাটেনি তাঁর। খাবার-দাবারের ব্যাপারটা তাই কোনদিনই সেরকম ভাবে উপভোগ করার অভ্যেস তৈরি হয়নি।

পলিটেকনিকে পড়ার সময় মিলেইভার প্রেমে পড়ার পর মাঝে মাঝে হোস্টেল রুমে আইনস্টাইনের জন্য রান্না করতেন মিলেইভা। কিন্তু আইনস্টাইন বৈজ্ঞানিক আলোচনা কিংবা প্রেমে এতটাই মশগুল থাকতেন যে মিলেইভা কী রান্না করেছেন তা খেয়ালও করতেন না। সেই সব দিনগুলিতে চুমু ছাড়া আর কোন কিছুই আগ্রহ নিয়ে খেতেন না আইনস্টাইন।


মিলেইভা ও আইনস্টাইন


১৯০০ সালে পড়ালেখা শেষ হবার পর থেকে প্রায় তিন বছর একটা চাকরির জন্য হন্যে হয়ে চেষ্টা করেছেন আইনস্টাইন। সেই সময়টাতে কিছুই তেমন করতে না পেরে বিজ্ঞাপন দিয়ে টিউশনি খুঁজেছেন। যেকোন খন্ডকালিন চাকরির খবর পেলেও ছুটে গেছেন সেখানে। অনেক চেষ্টার পর এক বন্ধুর সুপারিশে ১৯০১ সালের মে জুন ও জুলাই - এই তিন মাসের জন্য একটা ছুটিজনিত পদে শিক্ষকতার চাকরি পান আইনস্টাইন। উইন্টারথুর টেকনিক্যাল স্কুলের কাছাকাছি একটা এক রুমের বাসা ভাড়া করে আইনস্টাইন স্কুলে পড়াতে শুরু করলেন। সেই সময় তিনি যখন যা পেতেন তাই খেতেন।

দ্রুত শেষ হয়ে গেলো তিন মাসের চাকরি। আরেকটা চাকরির চেষ্টা শুরু করলেন উইন্টারথুরের বাসা থেকেই। ওখান থেকে পনেরো মাইল দূরে জার্মান সীমান্তঘেঁষা সুইজারল্যান্ডের শ্যাফুসেন নামক গ্রামে একটা চাকরির খবর পাওয়া গেলো। আইনস্টাইনের বন্ধু কনরাড হ্যাবিশ্‌ট চাকরিটার খবর দিয়েছেন। চাকরিটিও আহামরি কিছু নয়। স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষায় ফেল করা একজন ছাত্রকে প্রাইভেট পড়িয়ে পাস করিয়ে দেয়া। উইন্টারথুরের পাট চুকিয়ে আইনস্টাইন চলে গেলেন শ্যাফুসেনে। গিয়ে দেখলেন ওটা একটা প্রাইভেট বোর্ডিং স্কুল। ধনী লোকের গাধা টাইপ ছেলেদের স্কুল সার্টিফিকেট পাস করিয়ে দেয়ার একটা প্রাইভেট প্রকল্প। জ্যাকব নুয়েশ নামে মিলিটারি মেজাজের একজন লোক এই প্রকল্পের পরিচালক। মাসিক দেড়শো ফ্রাঙ্ক বেতন ঠিক হলো আইনস্টাইনের জন্য। আইনস্টাইন আরেকটু বেশি বেতনের আশা করেছিলেন। কিন্তু এই দেড়শো ফ্রাঙ্কের চাকরিও তিনি আর কোথায় পাবেন। তবে এখানে তিন বেলা খাওয়া-দাওয়া ফ্রি। খেতে হয় নুয়েশের বাড়িতে।

যে ছেলেকে পড়াতে হবে তার নাম লুইস ক্যাহেন। ধনী মায়ের সন্তান লুইস গণিতে মহাগর্দভ। আইনস্টাইন যত্ন করে নিজের সহজাত এলোমেলো ঢিমেতাল পদ্ধতিতে পড়ানো শুরু করলেন লুইসকে। লুইস এতদিন শুধু মিলিটারি মেজাজের শিক্ষকই দেখেছে। আইনস্টাইনের মতো ভোলাভালা শিক্ষক পেয়ে বেশ খুশি হয়ে গেলো সে। আইনস্টাইনের সাথে বেশ বন্ধুত্ব হয়ে গেলো তার। ক্রমে আইনস্টাইন জানতে পারলেন লুইসের পড়াশোনার জন্য তার মা বছরে চার হাজার ফ্রাঙ্ক দেন নুয়েশের হাতে। আর নুয়েশ আইনস্টাইনকে দিচ্ছেন মাসে দেড়শো করে! তার মানে বছরে ২২০০ ফ্রাঙ্ক মেরে দিচ্ছেন নুয়েশ? আইনস্টাইনের টাকার টানাটানি চলছে তখন ভীষণ। হঠাৎ রেগে গেলেন তিনি। নুয়েশকে গিয়ে বললেন, "লুইসের মায়ের কাছ থেকে চার হাজার নিয়ে আমাকে শুধু আঠারো শ' দিতে লজ্জা করে না আপনার?"

নুয়েশ বুঝতে পারলেন কী বলতে চাইছেন আইনস্টাইন। কিন্তু চোরদের গলা সব কালেই বড় হয়। নুয়েশ বাজখাঁই বলায় বললেন, "কী বললেন? আমি টাকা মেরে দিচ্ছি? আপনি যে তিন বেলা আমার বাড়িতে খাচ্ছেন তা কি আকাশ থেকে আসছে? সেজন্য খরচ হচ্ছে বছরে আড়াই হাজারেরও বেশি। লুইসের মা যা দিচ্ছে তার চেয়েও বেশি খরচ হয়ে যাচ্ছে আমার।"

আইনস্টাইন অবাক হয়ে গেলেন। নুয়েশের বাড়িতে তিন বেলায় তিনি যা খান তাতে মাসে বড় জোর বিশ-পঁচিশ ফ্রাঙ্ক লাগতে পারে। আইনস্টাইন পরিষ্কার বুঝতে পারলেন নুয়েশ একজন নির্লজ্জ মিথ্যাবাদীও বটে। 

আইনস্টাইন নুয়েশকে বললেন, "আপনি যে খাবার আমাকে দেন ওসব অখাদ্য। আমি আপনার বাড়িতে খাবো না। আপনি ওই বারো মাসের বাইশ শ' অর্থাৎ মাসে ১৮৩ ফ্রাঙ্ক করে আমাকে দিয়ে দেবেন।"
" না, তা হবে না। আপনাকে আমার বাড়িতেই খেতে হবে।"
"না, ওই অখাদ্য আমি খাই না।" - 

এই প্রথম আইনস্টাইন খাদ্যাখাদ্য বিচার করেছেন। তাও ঠিক খাদ্যের জন্য নয়, একটা অন্যায়ের প্রতিবাদ করার জন্য। আইনস্টাইন জোর দিয়ে বললেন, "তাহলে অন্য চাকরিতে যোগ দিতে হবে আমাকে। আপনার বাড়িতে খেয়ে আমার পোষাচ্ছে না।"

আইনস্টাইন জেদের বশে বলে ফেলেছেন বটে যে চাকরি ছেড়ে দেবেন। কিন্তু মনে মনে জানেন যে চাকরি ছেড়ে দিলে তিনি চলতে পারবেন না। এদিকে নুয়েশ ভয় পেয়ে গেছেন যে তাঁর কুকীর্তির কথা লুইসের মায়ের কানে গেলে অর্থ আর মান দুটোই যাবে। তাই আইনস্টাইনের সাথে একটা রফায় এলেন নুয়েশ। ঠিক হলো আইনস্টাইন হোটেলে খাবেন। তাতে যা বিল আসবে তা নুয়েশ মিটিয়ে দেবেন। কিন্তু হোটেলে খেতে গিয়েও আইনস্টাইন প্রতিদিনই একটা স্যুপ কিংবা সাধারণ কিছু খাবার খেয়ে চলে আসেন।

নুয়েশ আইনস্টাইনকে কোনদিনই সহ্য করতে পারেননি। বার্নের প্যাটেন্ট অফিসে আইনস্টাইনের চাকরি হচ্ছে হবে করতে করতেও অনেকদিন চলে গেলো। নুয়েশ জানতে পারলেন যে চাকরির বাজারে আইনস্টাইনের দাম খুব একটা নেই। তাছাড়া এও জানতে পারলেন যে আইনস্টাইন লুইসকে বার্নে নিয়ে যাবার পরিকল্পনা করছেন। নুয়েশ তা হতে দিতে পারেন না। তিনি আইনস্টাইনকে বরখাস্ত করলেন।

প্যাটেন্ট অফিসে চাকরি হবার ব্যাপারে অনেকটাই নিশ্চিন্ত আইনস্টাইন। কিন্তু তার জন্য আরো কতদিন অপেক্ষা করতে হবে তা জানেন না তিনি। চাকরি হারিয়ে বার্নে চলে এলেন আইনস্টাইন। বার্নে একটা বাসা ভাড়া করে তাতে ছাত্র পড়াবার বিজ্ঞাপন দিলেন। আইনস্টাইনের 'পড়াইতে চাই' বিজ্ঞাপন দেখে একজন মাত্র ছাত্র এসেছিলেন - মরিস সলোভাইন। পরে মরিস আইনস্টাইনের বন্ধু হয়ে ওঠেন। আরেক বন্ধু হ্যাবিশ্‌ট বার্নেই থাকতেন। আইনস্টাইন হ্যাবিশ্‌ট আর সলোভাইনকে নিয়ে প্রতিষ্ঠা করলেন অলিম্পিক একাডেমি। তিন সদস্যের এই একাডেমিতে দিন-রাত বিজ্ঞানচর্চা চলে।


কনরাড হ্যাবিশ্‌ট, মরিস সলোভাইন, ও আলবার্ট আইনস্টাইন


জ্ঞানচর্চা অব্যাহত গতিতে চললেও উপার্জনের কিন্তু কোন উপায় হয়নি তখনো। আইনস্টাইনের জমানো টাকা ক্রমেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। ঠিকমতো খাবারই জোটে না - এমন অবস্থা। আইনস্টাইন বেশ কয়েকদিন ধরে শুধু রুটি খেয়ে থাকছেন দেখে বন্ধুদের খুব কষ্ট হলো। তাঁরা প্ল্যান করলেন আইনস্টাইনের জন্মদিনে তাঁকে ক্যাভিয়ার খাওয়াবেন।



১৯০২ সালের ১৪ মার্চ আইনস্টাইনের ২৩তম জন্মদিনে বার্নে আইনস্টাইনের বাসায় বসেছে অলিম্পিক একাডেমির আসর। পূর্ব-পরিকল্পনা অনুযায়ী ক্যাভিয়ার এনে প্লেটে সাজিয়ে আইনস্টাইনের সামনে রেখেছেন সলোভাইন ও হ্যাবিশ্‌ট। তাঁদের দুজনের খুব ইচ্ছে - ক্যাভিয়ার খেয়ে আইনস্টাইনের কী প্রতিক্রিয়া হয় তা দেখার। এদিকে আইনস্টাইন বস্তুর জড়তার ধর্ম নিয়ে চিন্তা করছেন বেশ কয়েকদিন থেকে। তিনি ঠিক করে রেখেছেন সেদিন সেটা নিয়ে আলোচনা করবেন। 

সলোভাইন আর হ্যাবিশ্‌ট সামনে আসার সাথে সাথেই আইনস্টাইন শুরু করে দিয়েছেন তাঁর আলোচনা। খেতে খেতেই বলে চলেছেন প্রোপার্টি অব ইনারশিয়া প্রসঙ্গে। আলোচনা শেষ হবার আগেই প্লেটের খাবার শেষ হয়ে হেলো। 

হ্যাবিশ্‌ট জিজ্ঞেস করলেন, "তুমি আজ কী খেয়েছো বুঝতে পেরেছো?"
"কী খেলাম আজ?"
"ক্যাভিয়ার"
"ক্যাভিয়ার! ওটা ক্যাভিয়ার ছিলো? আগে বললে না কেন? বস্তুটাকে একটু ভালো করে তাকিয়ে দেখতাম। আহা হা, ক্যাভিয়ার। দেখলে তো কেমন চাষার মতো খেলাম! ক্যাভিয়ারের অপমান হলো আজ।"

সলোভাইন আর হ্যাবিশ্‌ট ভাবলেন ক্যাভিয়ারের কথা আগেই আইনস্টাইনকে জানিয়ে দেয়া উচিত ছিল। কিছুদিন পরে তারা আবার ক্যাভিয়ার নিয়ে এলেন আইনস্টাইনের জন্য। আইনস্টাইন খেতে শুরু করতেই তাঁরা চিৎকার করে স্লোগান দিতে শুরু করলেন, "কী খাচ্ছে আইনস্টাইন?" 
"ক্যাভিয়ার, ক্যাভিয়ার"।


জেনেশুনে ক্যাভিয়ার খাওয়ার পরেও আইনস্টাইনের মধ্যে তেমন কোন প্রতিক্রিয়া দেখা গেলো না। বরং সলোভাইন আর হ্যাবিশ্‌টের ছেলেমানুষী উচ্ছ্বাস দেখে তিনি বিরক্ত হয়ে বললেন, "ক্যাভিয়ার খেতে ভালো তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু তা নিয়ে ওরকম লাফালাফি করার মতো কিছু নেই ক্যাভিয়ারের মধ্যে।" 
সলোভাইন ও হ্যাবিশ্‌ট বুঝলেন ভালো খাবার-দাবারের সমঝদার আর যেই হোন - আইনস্টাইন নন।

বিয়ের পর মিলেইভা খাবারদাবারের ব্যাপারে আইনস্টাইনকে কিছুটা ভদ্র বানানোর চেষ্টা যে করেননি তা নয়। নানা রকম রান্না করতেন মিলেইভা। কিন্তু আইনস্টাইনের অনাগ্রহ এতটাই বেশি যে তাঁকে খাইয়ে কোন আনন্দ পাওয়া যায় না। বিয়ের আগে চুমু খাওয়ার ব্যাপারে কিছুটা উৎসাহ থাকলেও বিয়ের পর আইনস্টাইনের সেই উৎসাহেও ভাঁটা পড়েছে। 

আইনস্টাইন ইতোমধ্যে বিখ্যাত হয়ে গেছেন। ১৯০৫ সালে প্রকাশিত তাঁর পাঁচটি গবেষণাপত্র বিশ্বে আলোড়ন তুলেছে। বার্লিন ইউনিভার্সিটির প্রফেসর হয়েছেন আইনস্টাইন। স্পেশাল থিওরি অব রিলেটিভিটির পর জেনারেল থিওরি অব রিলেটিভিটি নিয়ে গবেষণা করছেন দিনরাত। মিলেইভার দিকে ফিরে তাকানোর আগ্রহও নেই আইনস্টাইনের। তবে তাঁর নতুন আগ্রহ দেখা দিয়েছে তাঁর চেয়ে চার বছরের বড় মাসতুতো বোন এলসার প্রতি। 

১৯১৩-১৪ সাল দুই শিশুপুত্রকে নিয়ে মিলেইভা আলাদা হয়ে বার্লিন ছেড়ে চলে যান সুইজারল্যান্ডে। বার্লিনের বাসায় একা আইনস্টাইন কাজ করছেন জেনারেল থিওরি অব রিলেটিভিটি নিয়ে। নাওয়া-খাওয়ার সময় নেই তাঁর। যখন প্রচন্ড ক্ষুধা লাগে কিছু একটা রাঁধতে হয় তাঁকে। রান্নাঘরে যথাসম্ভব কম সময় কাটানোর জন্য কিছু সংক্ষিপ্ত রন্ধনপ্রণালী আবিষ্কার করলেন আইনস্টাইন। দোকান থেকে কেনা স্যুপের টিন খুলে তা একটা পাত্রে ঢেলে চুলায় বসিয়ে দেন। স্যুপের সাথে ডিমটাও সিদ্ধ হয়ে যায়। একদিন এলসার মেয়ে মার্গট গিয়ে দেখেন আইনস্টাইন স্যুপের মধ্যে ডিম ভেঙে খাচ্ছেন। স্যুপে দেয়ার আগে ডিমটা যে ধোয়া দরকার সেদিকে কোন খেয়াল নেই তাঁর। মার্গটের প্রায় বমি এসে গেলো আইনস্টাইনের খাওয়া দেখে।

এলসার সাথে বিয়ের পরেও আইনস্টাইনের খাওয়া-দাওয়ার তেমন কোন উন্নতি হয়নি। তারপর অনেক বছর পরে আইনস্টাইন যখন প্রিন্সটনে চলে গেলেন তাঁর জার্মানির জীবন-যাপনের সাথে আমেরিকান জীবন-যাপনে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটলেও খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারটা আগের মতোই এলোমেলো রয়ে যায়। আইনস্টাইনের সেক্রেটারি হেলেন ডুকাস আইনস্টাইনকে চোখে চোখে রাখেন, আড়াল করে রাখেন সব উটকো ঝামেলা থেকে। কিন্তু আইনস্টাইন নিজের পড়ার ঘরে এলোমেলো যাচ্ছেতাই রকমে থাকতে পছন্দ করেন। মার্সার স্ট্রিটের দোতলা বাড়ি থেকে নিচে নেমে এসে আশেপাশের ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের সাথে ভাব করেন আইনস্টাইন। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা জানেও না আইনস্টাইন কত বড় বিজ্ঞানী, কত বড় সেলিব্রেটি।

পাশের বাড়ির আট বছর বয়সী মেয়ের সাথে বেশ ভাব আইনস্টাইনের। বাড়ির দরজা খোলা পেলেই মেয়েটা সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠে সোজা আইনস্টাইনের পড়ার ঘরে ঢুকে যায়। আইনস্টাইন মেয়েটিকে অংক শেখাতে শুরু করেন। একদিন মেয়েটির খোঁজে সেখানে হাজির হয় মেয়েটির চৌদ্দ বছর বয়সী বড় বোন জেন সুইং এবং তার বান্ধবী। নিচের তলার বসার ঘরে সবকিছু চমৎকার সাজানো গোছানো। কিন্তু দোতলায় আইনস্টাইনের পড়ার ঘরে ঢুকে জেন অবাক হয়ে গেলো। এত অগোছালো ঘর সে আগে কখনো দেখেনি। টেবিল চেয়ার ঘরের মেঝে সবখানেই এলোমেলো কাগজ, খাতা, বইপত্র ডাঁই করে রাখা। আইনস্টাইনের পোশাক পরিচ্ছদ, মাথার চুল সবই এলোমেলো। ঘরের মাঝামাঝি একটা লম্বা টেবিলে বই খাতা খোলা কলমের পাশে খাবারের ময়লা প্লেট। ঘরের এক কোণে একটা ময়লা স্টোভ। দেখে মনে আইনস্টাইন এই ঘরেই রান্নাবান্না করে খান।

কিশোরী জেন ও তার বান্ধবীকে দেখে আইনস্টাইন খুশি হয়ে গেলেন। জিজ্ঞেস করলেন, "তোমরা কি আমার সাথে লাঞ্চ করতে চাও?"
আইনস্টাইন কী খান এবং কী খাওয়ান দেখার ইচ্ছেয় জেন বললো, "অবশ্যই"।
"তবে বসে যাও।"

জেনকে বসতে বলেই আইনস্টাইন কোণার স্টোভটা টেনে নিয়ে এলেন ঘরের মাঝখানে। জেন কোথাও বসার জায়গা দেখলো না। কারণ ঘরের দুটো চেয়ারের উপরেই বইয়ের স্তূপ। আইনস্টাইন ক্যান ওপেনার দিয়ে একটা একটা করে তিনটা স্যুপের ক্যান খুললেন। তারপর একটা একটা করে ক্যান স্টোভের উপর রেখে গরম করলেন। বই খাতার স্তূপ থেকে হাতড়ে হাতড়ে কয়েকটি ময়লা চামচ বের করে ক্যানের ভেতর দিয়ে গরম ক্যানগুলো এগিয়ে দিলেন জেন ও তার বান্ধবীর দিকে - "খাও"। 

জেন ও তার বান্ধবীর বমি এসে যাবার অবস্থা। তারা মুখে হাত চাপা দিয়ে দেখে যে আইনস্টাইন আরাম করে ক্যান থেকে স্যুপ খাচ্ছেন। স্যুপ লেগে গেছে তাঁর গোঁফে, গোঁফ থেকে টপ টপ করে ঝরে পড়ে সোয়েটার ভিজিয়ে দিচ্ছে। সেদিকে কোন নজর নেই আইনস্টাইনের, তিনি অনবরত কথা বলে যাচ্ছেন গণিতের নিয়মকানুন প্রসঙ্গে।

আইনস্টাইন মদ পান করতে পছন্দ করতেন না। অ্যালকোহলের প্রতি কোন আগ্রহই তাঁর ছিল না। নোবেল পুরষ্কার পাবার পর তিনি যখন সেলিব্রেটিদেরও সেলিব্রেটি হয়ে গেছেন, তখন এক আমেরিকান সাংবাদিক তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, "আমেরিকায় মদের ওপর ট্যাক্স যে বাড়ছে তাতে আপনার প্রতিক্রিয়া কী?"

আইনস্টাইন তাৎক্ষণিকভাবে উত্তর দিলেন, "মদের ট্যাক্স বাড়ুক বা কমুক তাতে আমার কিছু যায় আসে না। কারণ আমাকে মদ পান করতে হয় না।" 

পানি ছাড়া আর যে পানীয় আইনস্টাইন পান করতেন তা হলো কফি। কিন্তু কফির ব্যাপারেও তাঁর কোন বিশেষ পছন্দ অপছন্দ ছিল না। যে কোন কফি হলেই তাঁর চলতো।

একটা নেশাই আইনস্টাইনের ছিল - তা হলো পাইপ টানা। আইনস্টাইন পাইপ ধরেছিলেন ১৮৯৯ সালে বিশ বছর বয়সে। আর ছাড়তে পারেননি। বিজ্ঞানী হিসেবে যে আইনস্টাইন ছিলেন প্রচন্ড উত্তেজক, খাদ্যাভ্যাসে সেই আইনস্টাইনই ছিলেন ভীষণ একঘেঁয়ে। তাতে অবশ্য বিজ্ঞান-জগতের কোন ক্ষতি হয়েছে বলে মনে হয় না। 




Latest Post

সরকারি চাকরিতে উচ্চতার শর্ত

  সম্প্রতি প্রকাশিত ৩৮তম বিসিএস পরীক্ষার বিজ্ঞপ্তিটা পড়ে আবারো কিছুটা স্মৃতিকাতর হয়ে পড়লাম। বিসিএস পরীক্ষার সাথে আমার একটি অদ্ভুত অন্যরকম অন...

Popular Posts