Sunday, 10 July 2022

বিশ্ববীণা বাজে যেথায় - ৩

 


সপ্তাহের সাতদিনই আমার ক্যাম্পাসে কাটে। খুব সিরিয়াসলি পড়াশোনা করছি ভাবার কোন কারণ নেই। যে বাসায় সাবলেট থাকি – সেখানে ছোট্ট একটা রুমের বাইরে বাথরুম ছাড়া আর কোথাও যাবার উপায় নেই। ডিপার্টমেন্টে আমার রুমে যখন-তখন আসা যায়। ছুটির দিনে কেউ থাকে না – মনে হয় পুরো বিল্ডিং-টাই আমার। কিন্তু একদম কেউ যে থাকে না তা নয়। রিসার্চ-স্টুডেন্টদের কেউ না কেউ থাকেই। তবে আমার ফ্লোরে কাউকে তেমন দেখা যায় না ছুটির দিনে।

রোববার সকালে মেলবোর্ন সেন্ট্রাল আর ভিক্টোরিয়া মার্কেটে একটা চক্কর দিয়ে ক্যাম্পাসের কাছাকাছি আসতেই মনে হলো উৎসব চলছে সারা ক্যাম্পাস জুড়ে। গতকাল বিকেল থেকেই কিছু কিছু আয়োজন চোখে পড়েছিল। কী হচ্ছে ঠিক বুঝতে পারিনি। এখন দেখছি দলে দলে লোকজন আসছে ক্যাম্পাসে। ক্যাম্পাসের সবগুলি বিল্ডিং আজ খোলা। নানা রঙের ব্যানার ফেস্টুনে ছেয়ে গেছে ক্যাম্পাস। এখানে ওখানে বড় বড় ব্যানারে লেখা – ডিসকভারি ডে। আজ কি মেলবোর্ন ইউনিভার্সিটির জন্মদিন? ১৮৫৩ সালের আজকের দিনেই কি এই বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়েছিল?

টিপটিপ বৃষ্টি হচ্ছে। শীতকালে বৃষ্টি হওয়া মেলবোর্নের বৈশিষ্ট্য। এই বৃষ্টিকে এখানে কেউ পাত্তা দেয় বলে মনে হয় না। অনেক প্রশ্ন আর ভেজা ছাতা মাথায় নিয়ে সোয়ান্সটন স্ট্রিট আর এলগিন স্ট্রিটের কোণা দিয়ে ফিজিক্স বিল্ডিং-এ ঢুকলাম। আজ ছুটির দিনেও তালা খুলতে হলো না। ডিসকভারি ডে উপলক্ষে সবকিছু খোলা।

বিল্ডিং-এর ভেতরে বাইরের উৎসবের কোন রেশ নেই। লিফ্‌ট দিয়ে ছ’তলায় উঠে বুঝতে পারলাম কেউ আসেনি এখানে। করিডোরের লাইট নেভানো। অন্যদিন দিনের বেলায়ও লাইট জ্বলে এখানে। রুমে ঢুকে আমার টেবিলের দিকে তাকিয়ে একটু অপরাধবোধ হলো। বইপত্র যেগুলি এক সপ্তাহ আগে খুলেছিলাম – এখনো সেভাবেই হা করে আছে।

ফাঁকিবাজি ব্যাপারটা যে ছোঁয়াচে তা আবারো প্রমাণিত হলো। এই প্রমাণ সংগ্রহের জন্য দূরে যাবার দরকার নেই, আমার নিজের দিকে তাকানোই যথেষ্ট। আমার সিনিয়র সহপাঠী ম্যান্ডি ক’দিন থেকে ডিপার্টমেন্টে আসছে না। আর জিনেট সকালে এসে ডেস্কে ব্যাগ রেখে, কিছুক্ষণ টেবিলে রাখা ছোট ছোট খেলনাগাড়িগুলি নিয়ে খেলাধূলা করে রুম থেকে বের হয়ে যায়। সারাদিন আর দেখা যায় না তাকে। এই ব্যাপারটাই ছোঁয়াচে রোগের মতো আমাকেও ধরে ফেলেছে। কেন্‌ ইওরোপে যাবার পর দু’দিন যেতে না যেতেই মনে হচ্ছে আমার পায়ে চাকা গজিয়ে গেছে। আমি কনকনে ঠান্ডাকে পাত্তা না দিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি মেলবোর্ন শহরের অলিতে গলিতে।

কেন্‌ ইওরোপে যাবার পর ম্যান্ডি শুধু একদিন এসেছিল। তারপর কোথায় যেন হাওয়া হয়ে গেছে। তার ডেস্কে রাজ্যের কাগজপত্র, কোকের খালি ক্যান, একজোড়া জুতা। পড়ার টেবিলে এভাবে জুতা তুলে রাখতে আর কাউকে দেখিনি। শুনেছি তার পিএইচডির তৃতীয় বর্ষ চলছে। তাহলে তো তার শীঘ্র থিসিস জমা দেয়ার কথা। কিন্তু সে ব্যাপারে তার ভেতর কোন তাড়া দেখছি না।

জিনেটের সাথে আমার যেদিন পরিচয় হলো – সেদিন সে দীর্ঘ ছুটি থেকে ফিরেছে। ডিপার্টমেন্টে সে খুবই পপুলার। সে যতক্ষণ রুমে থাকে – সারাক্ষণ কেউ না কেউ আসে তার কাছে, আর হাহা-হিহি করে অনবরত কী কী নিয়ে গল্প করতে থাকে। এদের উচ্চারণের বেশিরভাগই আমি বুঝতে পারি না। তারাও সেটা জানে, সেজন্য রুমে আমার উপস্থিতিকে তারা মোটেও গ্রাহ্য করে না। জিনেট পিএইচডি শুরু করেছে দু’বছর হয়ে গেল, অথচ এখনো নাকি কিছুই এগোয়নি তার প্রজেক্ট। কিন্তু তাতে তার কোন উদ্বেগ আছে বলে মনে হচ্ছে না। ডেস্কে সে একা থাকলে খেলনা গাড়ি নিয়ে খেলতে বসে। খেলনা গাড়ি নিয়ে শিশুরা ছাড়া আর বড়রাও যে নিয়মিত খেলতে বসে এটাও আগে দেখিনি কখনো।

কেনের পোস্টডক্টরেট ফেলো ডক্টর পিটার ডর্টসম্যানও গেছেন কেনের সাথে। এখন বেশিরভাগ সময়েই পুরো রুমটা আমার নিজের দখলে থাকে। বিশাল কম্পিউটার পড়ে থাকে চোখের সামনে। কিন্তু আমার চোখ চলে যায় নিজের টেবিল ছেড়ে কম্পিউটার-টেবিলের উপর দিয়ে জানালায়। এই জানালা দিয়ে ক্যাম্পাসের অনেকবিল্ডিং-এর চূড়া দেখা যায়, আরো দেখা যায় মেলবোর্ন সেন্ট্রালের বিশাল গম্বুজ। এদিকে তাকালেই মনে হয় এরা আমাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে।

লেখাপড়া না করে রাস্তায় বেরিয়ে পড়তে মনের ভেতর একটু খচখচ করলেও – যাযাবর মন, ফাঁকিবাজ মন আমাকে বোঝায় – ম্যান্ডি আর জিনেট কি পড়াশোনা করছে? তোমার সুপারভাইজার তো যাবার সময় কোন পড়া দিয়ে যাননি যে বসে বসে পড়তে হবে। তাছাড়া নতুন জায়গায় এসে রুমে বসে থাকলে হবে? পথঘাট চিনে নিতে হবে না?

পথঘাট চিনে নেয়ার জন্য পথেঘাটে ঘুরে বেড়ালে অন্যদের কী হয় জানি না – আমার অদ্ভুত এক আনন্দ হয়। সেটা চট্টগ্রাম কিংবা ঢাকা শহরেও যেমন হয়, এখানে মেলবোর্নেও হচ্ছে। যেটুকু জায়গা নিয়ে মেলবোর্ন শহরের সিবিডি বা সেন্ট্রাল বিজনেজ ডিস্ট্রিক্ট, ম্যাপে দেখা যাচ্ছে তার চেয়েও বেশি জায়গা নিয়ে মেলবোর্ন ইউনিভার্সিটির পার্কভিল ক্যাম্পাস। একটা একটা করে এই ক্যাম্পাসের সবগুলি রাস্তায় হাঁটছি, সবগুলি বিল্ডিং-এ ঢু মারতে শুরু করেছি। আজ সকালেও মেলবোর্ন সেন্ট্রাল আর ভিক্টোরিয়া মার্কেটে ঘুরে এসেছি। ভিক্টোরিয়া মার্কেটে অবশ্য গিয়েছিলাম কাজের খোঁজে। কাজ হয়নি।

ওখান থেকে আসার সময় ভেবেছিলাম রুমে বসে কিছুক্ষণ লেখাপড়া করার চেষ্টা করবো। কিন্তু জানালায় দাঁড়িয়ে দেখছি নিচে ক্যাম্পাসজুড়ে লোকজনের মেলা। দেখে আসা দরকার, কী হচ্ছে। যাবার আগে টেবিলের বইগুলি কি বন্ধ করে যাবো?

“হ্যাই, ইউ আর হিয়ার টুডে!”

খোলা দরজা দিয়ে ঝড়ো হাওয়ার মতো রুমে ঢুকে পড়েছে ইভন। ইভন পার্টিক্যাল ফিজিক্সে পিএইচডি করছে প্রফেসর রে ভলকাসের কাছে। প্রফেসর রে’র অফিস করিডোরের শুরুতে। লিফ্‌ট থেকে বের হলেই তাঁর সাথে চোখাচোখি হয়ে যায়। তিনি গম্ভীর মানুষ, কখনো কথা বলেননি আমার সাথে, হাসেনওনি। কিন্তু তাঁর ছাত্রী ইভন প্রচন্ড হাসিখুশি মানুষ। ইভন দৈর্ঘ্যে-প্রস্থে ক্লাস সিক্স-সেভেনের বাচ্চার মতো ছোটখাট। চেহারায় চৈনিক ছাপ আছে। কিন্তু কথাবার্তায় খাঁটি অস্ট্রেলিয়ান। আমার সাথে তার পরিচয় হয়েছে সপ্তাহ খানেক আগে। ফার্স্ট ইয়ারের ফিজিক্স ল্যাবের ডেমনেস্ট্রেশনে সে আমার পাশের ল্যাবে ছিল। সেখানে একটু করে হাই-হ্যালো হয়েছে। আমার একই ফ্লোরে কয়েকটা রুম পরেই তার রুম। সেদিন বিকেলে সে হঠাৎ রুমে এসে আমাকে বললো, “এক থেকে বারোর মধ্যে যে কোন একটি সংখ্যা বলো।“

“নয়।“

“যে কোনো একটা সব্‌জির নাম বলো।“

“আলু।“

“তুমি একটা জটিল মানুষ। সরল মানুষেরা সাত আর গাজর বলে।“

এ ধরনের আপাত-মনস্তাত্ত্বিক প্রশ্ন আমরা কত শুনেছি আগে। সংখ্যা – সাত, ফুল – গোলাপ ইত্যাদি। ইভন কী কারণে আমার মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষা নিলো তা জানতে চাইনি। এরপর থেকে দেখা হলেই ইভন অনেক কথা বলে।

ইভনকে জিজ্ঞেস করলাম, “কী হচ্ছে আজ ক্যাম্পাসে?”

“ডিসকভারি ডে। স্কুলের ছেলেমেয়েদের জন্য ইউনিভার্সিটিতে কী কী সাবজেক্ট পড়ানো হয়, ভর্তি হতে গেলে কী কী সাবজেক্ট লাগে ইত্যাদি দেখানোর জন্য।“

মাথামুন্ডু কিছুই বুঝলাম না। স্কুলের ছেলেমেয়েরা ইউনিভার্সিটির ভর্তি নিয়ে এখন কী কারণে মাথা ঘামাবে? তাছাড়া ইউনিভার্সিটি তো হবে রহস্যময় জায়গা। সেখানে কী হয় – তা তারা জানবে কেন? কিন্তু আমরা যেভাবে দেখেছি – সেভাবে তো এখানে হয় না। ইভনের কাছ থেকে মোটামুটি একটা ধারণা পাওয়া গেল।

অস্ট্রেলিয়ায় স্কুল পর্যায়ের শিক্ষাব্যবস্থা রাজ্যসরকারের অধীনে। অস্ট্রেলিয়ার ছয়টি রাজ্য আর দুইটি টেরিটরির শিক্ষাব্যবস্থা আলাদা-আলাদা। সিলেবাস এবং সাবজেক্টে মিল এবং অমিল দুটোই আছে। বারো বছর স্কুল-শিক্ষার পর রাজ্যজুড়ে একটি পরীক্ষা হয় – যেটা আমাদের দেশের উচ্চ মাধ্যমিকের সমতুল্য। এখানে অর্থাৎ ভিক্টোরিয়া রাজ্যে এই পরীক্ষার নাম ভিক্টোরিয়া সার্টিফিকেট অব এডুকেশন বা ভিসিই। নিউ সাউথ ওয়েলস রাজ্যে ওটার নাম আমাদের মতোই – এইচএসসি। এই পরীক্ষায় প্রাপ্ত নম্বরের ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করানো হয়।

ইভন কিছুক্ষণ বকবক করার পর চলে গেল। জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখলাম বৃষ্টি বন্ধ হয়ে গেছে। একটু রোদের আভাসও দেখা যাচ্ছে। তবে এই রোদে কোন উত্তাপ নেই। কিন্তু বৃষ্টি বন্ধ হয়েছে তাতেই আমি খুশি। বাইরে বের হলাম।

এখানে রাস্তাঘাট এত ঝকঝকে পরিষ্কার রাখে কীভাবে সেটা যতটুকু আশ্চর্যের, তার চেয়েও অবাক হচ্ছি ক্যাম্পাসের এতগুলি বিল্ডিং-এর সবগুলি ভেতরে-বাইরে এত ঝকঝকে কীভাবে আছে! কোথাও কোন দেয়ালে কোন স্লোগান লেখা নেই। এদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে কি ছাত্ররাজনীতি নেই? কোন পার্টি নেই? কোনো মিছিল-মিটিং-সমাবেশ কিছুই দেখছি না ক্যাম্পাসে। অথচ বিশাল তিনতলা ভবন আছে – স্টুডেন্ট ইউনিয়ন হাউজ।

স্টুডেন্ট ইউনিয়নের সর্বশেষ যে অভিজ্ঞতা আমার আছে সেটা চাকসু – চিটাগং ইউনিভার্সিটি সেন্ট্রাল স্টুডেন্ট ইউনিয়ন। এখানেও আছে উমসু – ইউনিভার্সিটি অব মেলবোর্ন স্টুডেন্ট ইউনিয়ন। ইউনিয়ন হাউজের দেয়ালে দেখলাম জায়গা নির্দিষ্ট করে দেয়া আছে – বিজ্ঞাপন দেয়ার জন্য। ইউনিয়নের নির্বাচন হয় প্রতিবছর সেপ্টেম্বরে। তার মানে সামনের মাসে নির্বাচন – অথচ কোন উত্তেজনা নেই কোথাও। ছাত্র হিসেবে আমারো তো ভোটাধিকার আছে এখানে। কিন্তু এখনো তো কেউ ভোট চাইতে এলো না। এখানে ভোট চায় কীভাবে? কীভাবে চলে নির্বাচনী প্রচারণা? মাথায় কত প্রশ্ন আসে দিচ্ছে না কেউ জবাব তার – অবস্থা আমার।

লাঞ্চটাইম – ইউনিয়ন হাউজ গমগম করছে। নিচের তলায় বিশাল এক ফুডকোর্ট – অনেকগুলি খাবারের দোকান। চায়নিজ, মালয়শিয়ান, মেক্সিকান, ইন্ডিয়ান – কতো রকমের কতো দেশের যে খাবার। সবগুলি আউটলেটের সামনে লম্বা লাইন। বেশিরভাগই স্কুলের ছেলে-মেয়েরা, সাথে তাদের মা-বাবা।

বিশ্ববিদ্যালয় কীভাবে চলে তা দেখার সবচেয়ে বড় সুযোগ এই ডিসকভারি ডে-তে। নামটা যথার্থ হয়েছে। আজকেই আবিষ্কার করা যাবে কোথায় কী হচ্ছে এখানে।

স্কুল পাস করার পর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য দরখাস্তের প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করা হয় সরকারিভাবে। ভিক্টোরিয়ান টারিশিয়ারি এডমিশান সেন্টার বা ভিট্যাক রাজ্যের সবগুলি স্কুলে ভর্তির দরখাস্তের ফরম পূরণ করার জন্য যা যা লাগে সব ব্যবস্থা করে দেয়। ভিসিই বা এইচএসসি পরীক্ষা হবার আগেই পছন্দমতো বিশ্ববিদ্যালয়ের অপশন দিয়ে ভর্তির দরখাস্ত পাঠিয়ে দিতে হয়। একজন শিক্ষার্থী পছন্দের ক্রমানুসারে অনেকগুলি বিশ্ববিদ্যালয়ের চয়েজ দিতে পারে। এখন কে কী পড়তে চায়, কেন পড়তে চায়, কোথায় পড়বে, কোন্‌ বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন্‌ বিভাগে কী কী সুবিধা এসব না জেনে অপশন দেবে কীভাবে? সেজন্যই এসব জানানোর ব্যবস্থা হলো ডিসকভারি ডে।

রাজ্যের সবগুলি বিশ্ববিদ্যালয় আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসে রবিবারগুলিতে এই আয়োজন করে। এমনভাবে তারিখ ঠিক করা হয় যেন একদিনে একাধিক বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিসকভারি ডে না পড়ে। শিক্ষার্থীরা নিজেদের চোখে দেখে যায় তাদের ভালো লাগা, ভালো না লাগা। কোন্‌ সাবজেক্টে ভর্তি হতে গেলে কেমন রেজাল্ট করতে হয়, কী কী সাবজেক্ট নিতে হয়। পাস করার পর কোথায় কোথায় চাকরির সুযোগ পেতে পারে, কিংবা আরো উচ্চতর শিক্ষা নেবার কী কী সুযোগ আছে – সব তথ্য তারা সরাসরি একদিনেই পেয়ে যায়।

পরীক্ষার আগে ভর্তির দরখাস্ত পূরণ করার পর – পরীক্ষা শেষ হলে পছন্দের ক্রম পরিবর্তন করার একটি সুযোগ দেয়া হয় – যাতে শিক্ষার্থীরা তাদের পরীক্ষার সম্ভাব্য ফলাফল বিবেচনা করে পছন্দের ক্রম পরিবর্তন করতে পারে। এরপর এইচএসসির রেজাল্ট বের হলে সেই রেজাল্ট সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতেও চলে যায়। তখন বিশ্ববিদ্যালয়গুলি দরখাস্ত এবং রেজাল্টের ভিত্তিতে অফার লেটার পাঠায় শিক্ষার্থীদের কাছে। যারা ভালো তারা একাধিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অফার পায়। তখন তারা বেছে নেয় – কোথায় ভর্তি হবে।

পুরো ব্যাপারটা আমার জন্যও ভীষণ নতুন। আমিও ঘুরতে লাগলাম এক বিল্ডিং থেকে অন্য বিল্ডিং-এ, এক ডিপার্টমেন্ট থেকে অন্য ডিপার্টমেন্টে। মেডিসিন ফ্যাকাল্টিতে ভীড় সবচেয়ে বেশি। এমনিতেই মেলবোর্ন ইউনিভার্সিটি র‍্যাংকিং-এর দিক থেকে  অস্ট্রেলিয়ার এক নম্বর। এবছর ১৯৯৮ সালে সামগ্রিকভাবে মেলবোর্ন ইউনিভার্সিটির ওয়ার্ল্ড র‍্যাংকিং ১৯। মেডিসিনে এই র‍্যাংক আরো সামনের দিকে। এখানে ডাক্তারি পড়ার স্বপ্ন তাই অনেকের। ভিসিইতে র‍্যাংক শতকরা নিরানব্বই এর উপরে না থাকলে মেডিসিনে ভর্তি হওয়া প্রায় অসম্ভব। মেডিসিনে বিভিন্ন প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে। এনাটমি মিউজিয়ামে শরীরের অলিগলি দেখে এলাম। ফিজিওলজিতে দেখলাম ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপের সাহায্যে শরীরের এক একটি কোষের গঠন এবং তাতে অনুজীব কীভাবে আক্রমণ করে। ইঞ্জিনিয়ারিং ফ্যাকাল্টিতে গেলাম। এদেশে মাঝারি মানের রেজাল্ট নিয়েও ইঞ্জিনিয়ারিং-এ ভর্তি হওয়া যায় জেনে আমার আকাশ থেকে পড়ার অবস্থা। কমার্সে ভর্তি হতে যত নম্বর লাগে, তার চেয়েও কম নম্বর লাগে ইঞ্জিনিয়ারিং-এ ভর্তি হতে।

উইলসন হলে প্রফেশনাল ইনফরমেশান দেয়ার জন্য অনেকগুলি সরকারি এবং বহুজাতিক নিয়োগ সংস্থার কর্মকর্তারা এসেছেন দরকারি তথ্য দিতে। আগামী বছরগুলিতে দেশের চাকরির বাজার কেমন হবে, কোম্পানিগুলি কোন্‌ কোন্‌ পোস্টে লোক নেবে, নিয়োগের জন্য কী কী বিষয়ের দিকে নজর দিতে হবে ইত্যাদি বলে দিচ্ছেন যারা ভবিষ্যতে পাস করে বের হবে তাদেরকে। এবছর যারা ক্লাস ইলেভেনে আছে, দুবছর পর তারা ইউনিভার্সিটিতে আসবে। পাস করে বের হতে আরো তিন-চার বছর। অর্থাৎ আগামী পাঁচ-ছয় বছর পর কোন্‌ কোন্‌ পেশার চাহিদা বাড়বে, কতজন লোক দরকার হবে, কী কী স্কিল দরকার হবে – সব তথ্য আগেভাগে জানা থাকলে পাস করার পর কাউকেই তো বেকার থাকতে হবে না। শুনলাম, যে সাবজেক্টের কোন চাহিদা থাকে না, ইউনিভার্সিটিগুলি নাকি সেই সব সাবজেক্ট বন্ধ করে দেয়।


বিশ্ববীণা বাজে যেথায় - ২

 


দক্ষিণ গোলার্ধে এক মাস কেটে গেলো। আক্ষরিক অর্থেই খুব ঠান্ডাভাবে দিন কাটছে এই নতুন দেশে এসে। আগস্ট মাসের এই সময়ে বাংলাদেশে শ্রাবণ-ভাদ্রের তালপাকা গরম। আর এখানে হাঁড়কাঁপানো শীত। তার উপর গোমড়ামুখো আকাশ থেকে যখন-তখন বৃষ্টি ঝরছে। তবে এই বৃষ্টিকে কিছুতেই ‘ঝরঝর বরিষে বারিধারা’ বলা যাবে না। বাংলাদেশের বৃষ্টির সৌন্দর্য এখানে নেই।

জুন জুলাই আগস্ট – এই তিন মাস এখানে অফিসিয়াল উইন্টার। অনেকে বলে মেলবোর্নে নাকি সারাবছরই উইন্টার থেকে যায় – কোনো না কোনোভাবে। বাংলাদেশে শীতের যে আলাদা একটা আরাম আছে – এখানে সেই আরাম নেই। অবশ্য তাসের দেশ-এ রবিঠাকুর আরামের অভ্যাসকে তুলোধোনা করেছেন। বলেছেন ‘ব্যাঙের আরাম এঁদো কুয়োর মধ্যে।‘ কুয়োর ব্যাঙ হয়ে মোটামুটি আরামেই তো ছিলাম। কিন্তু সেই আরাম ত্যাগ করে যখন নতুন দেশে এসেই পড়েছি – তখন আর আগের আরাম আশা করি কীভাবে। তাসের দেশের রাজপুত্রের মতো আমিও যদি আশা করতে পারতাম -

“অচিন মনের ভাষা,
শোনাবে অপূর্ব কোন্‌ আশা,
বোনাবে রঙিন সুতোয় দুঃখসুখের জাল,
বাজবে প্রাণে নতুন গানের তাল,
নতুন বেদনায় ফিরব কেঁদে হেসে।“

কিন্তু মনের ভাষা বোঝা তো দূরের কথা, মুখের ভাষাই বুঝতে পারছি না এদের। মুখের মধ্যে মার্বেল নিয়ে কথা বললে যেরকম শোনায় এদের উচ্চারণ আমার কাছে সেরকমই মনে হয়। পরিচিত শব্দগুলিও কেমন যেন অদ্ভুত লাগে। “হোয়াডিউ ডু টু-ডাই” শুনে মনে হয়েছিল – এটা কী ধরনের প্রশ্ন? আমি মরার জন্য কী করি? টুডে যে এখানে টু-ডাই তা আমি কোন ইংরেজিতে পাইনি। “হাউয়াইয়া”  যে ‘হাউ আর ইউ’ তা বুঝতে আমার কয়েক সপ্তাহ লেগেছে। তার উপর আছে ইংরেজি বাগধারা; এরা এত বেশি ব্যবহার করে কথার মধ্যে! সেদিন ম্যান্ডিকে জিজ্ঞেস করছিলাম কম্পিউটার থেকে প্রিন্ট-আউট কীভাবে নিতে হয়। আমাদের রুমে একটা কম্পিউটার আছে, কিন্তু কোন প্রিন্টার নেই। জবাবে ম্যান্ডি বললো, “হ, ইট্‌স অ্যা পিস অব কেক।“ আমাদের ডিপার্টমেন্টে মাঝে মাঝে কেক-পেস্ট্রি-ডোনাট এসব খাওয়ানো হয়, বিশেষ করে সেমিনারের আগে। আমি ভাবলাম ম্যান্ডি সেরকম কোন কেকের সন্ধান দিচ্ছে আমাকে। আমি সরল মনে জিজ্ঞেস করলাম, “হোয়ার ইজ দ্য কেক?” আমার অবস্থা দেখে ম্যান্ডি হো হো করে হেসে উঠেছিল। তারপর ইংরেজি বাগ্‌ধারা সম্পর্কে কিছুক্ষণ জ্ঞান বিতরণ করলো। শেখার মধ্যে লজ্জা থাকতে নেই – বলা সহজ। কিন্তু লজ্জা ত্যাগ করে যেকোনো শিক্ষা যে কারো কাছে থেকে সহজভাবে নিতে পারার মতো শক্তি অর্জন করা সহজ নয়। ম্যান্ডির সামনে কী যে লজ্জা লাগছিলো আমার। এত লজ্জা সংকোচ নিয়ে কীভাবে আশা করি যে  “বাজবে প্রাণে নতুন গানের তাল?”

রুমের তালা খোলার সময় দেখলাম কেনের অফিস বন্ধ। ইওরোপে গেছেন তিনি। সম্ভবত কোন কনফারেন্সে। আমাদের রুমের আর কেউ এখনো আসেনি। ফিজিক্স বিল্ডিং-এর ছয় তলার এই ৬১২ নম্বর রুমে আমরা চারজন বসি। ম্যান্ডি আর জিনেট পিএইচডি করছে, আমি রিসার্চ মাস্টার্স, আর ইমাজিন অনার্স। রুমের চার কোণায় চারটি ডেস্ক। ভেতরের দেয়াল ঘেঁষে আরেকটা টেবিল, সেখানে বিশাল এক কম্পিউটার। কম্পিউটারের আবার নামও আছে এখানে। এটার নাম হিগ্‌স। হিগ্‌স কী বস্তু এখনো জানি না। এই কম্পিউটারটি নাকি আমাদের গ্রুপের – অর্থাৎ Theory Q  বা কোয়ান্টাম থিওরি গ্রুপের। আমার সুপারভাইজার কেন্‌ অ্যামোস এই গ্রুপের হেড। গ্রুপের আরেকজন প্রফেসর হলেন লেস অ্যালেন। তাঁর সাথে পরিচয় হয়েছে, কিন্তু তাঁর তত্ত্বাবধানে যারা গবেষণা করছে তাদের কারো সাথে এখনো পরিচয় হয়নি। ম্যান্ডি কেনের ছাত্রী। সে হিসেবে আমার সতীর্থ। জিনেট আর ইমাজিন প্রফেসর হলেনবার্গের ছাত্রী। প্রফেসর হলেনবার্গকে এখনো দেখিনি।

যাই হোক, এই কম্পিউটারটি বেশিরভাগ সময় ব্যবহার করেন কেনের পোস্ট-ডক্টরেট ফেলো পিটার ডর্টসম্যান। ছোট-খাট সাইজের লম্বাচুলের এই মানুষটিকে দেখলে আঠারো-উনিশ বছরের ছেলে বলে মনে হয়। কিন্তু তিনি পিএইচডি করেছেন ১৯৯২ সালে। তারপর গত ছয় বছর ধরে পোস্টডক্টরেট ফেলো হিসেবে গবেষণা করছেন কেনের সাথে। অন্যদিন তিনি এতক্ষণে এসে কাজ শুরু করে দেন। আজ আসেননি। তিনিও কেনের সাথে ইওরোপে গেছেন কিনা জানি না।

এই রুমের কম্পিউটারটা আমি দিনের বেলায় ব্যবহার করি না। চার তলার কম্পিউটার রুমে তিরিশটা কম্পিউটার আছে ফিজিক্সের গবেষকদের ব্যবহারের জন্য। সেখানেই চলে যাই যখন সময় পাই। আজ রুমে কেউ নেই বলে হিগ্‌স কম্পিউটারে লগ ইন করলাম। এই কম্পিউটারের মাথামুন্ডু এখনো কিছুই ঠিকমতো বুঝি না। বই দেখে দেখে কমান্ড দিয়ে হাতড়ে হাতড়ে এগোতে হচ্ছে।

বাংলাদেশে আমার কম্পিউটার ব্যবহারের ইতিহাস বিবেচনা করলে আমাকে কম্পিউটার-নিরক্ষর বলা চলে। সেই ইতিহাস খুবই সংক্ষিপ্ত। আমার বন্ধু দেবাশিস আর মহিউদ্দিন কম্পিউটার শেখানোর স্কুল খুলে ফেলেছিল আমি অনার্স পাস করার আগেই। যীশু, প্রদীপ, অজিত – এরা কম্পিউটার প্রোগ্রামিং শিখেছে অনার্স পরীক্ষা দিয়ে। কিন্তু আমি কোন আগ্রহই দেখাইনি। মাস্টার্সের থিসিস করার সময় ‘ওয়ার্ড পারফেক্ট’ শিখেছিলাম দেবাশিস আর মহিউদ্দিনের স্কুলে। তখনো মাউস আসেনি সেখানে। কমান্ড মোডে ছোট্ট চৌদ্দ ইঞ্চি স্ক্রিনে টাইপ করতে শিখেছিলাম। কয়েক বছরের মধ্যেই সব ভুলেও গিয়েছি। ততদিনে আমার আরেক বন্ধু অঞ্জন কম্পিউটার কোম্পানিতে জয়েন করে কিছুদিন পর ইনফরমেশান টেকনোলজির ম্যানেজার হয়ে গিয়েছে। নিজেই একটা কম্পিউটার কোম্পানি খুলেছে মোমিন রোডে। আমি সেখানে গিয়ে মেলবোর্ন ইউনিভার্সিটিতে পাঠানোর জন্য ই-মেইল টাইপ করতাম ওয়ার্ড পারফেক্টের জ্ঞান কাজে লাগিয়ে। এখানে আসার আগে অঞ্জন আমাকে শিখিয়ে দিয়েছে কীভাবে ইমেইল করতে হয়। মোমিন রোডের মাথার বইয়ের দোকান কথাকলি থেকে “ইমেইল করার নিয়মকানুন” নামে বাংলায় লেখা একটি বইও কিনে নিয়ে এসেছি। কিন্তু সেই বই কিংবা পূর্বজ্ঞানের কিছুই এখানে কাজে লাগাতে পারছি না। কারণ এখানকার কম্পিউটারগুলির অপারেটিং সিস্টেম আমি আগে কখনো দেখিনি। এখানে মাউস আছে। কিন্তু সামান্য পরিচয় ছিল যে উইন্ডোজের সাথে – আমার নাগালের মধ্যে যে ক’টা কম্পিউটার আছে তাদের কোনটাতেই উইন্ডোজ নেই। ইউনিক্স অপারেটিং সিস্টেম সবগুলিতে। এই অপারেটিং সিস্টেম নাকি ফ্রি। বাংলাদেশে সবাই উইন্ডোজ ব্যবহার করে শুনে সেদিন জিনেট প্রশ্ন করেছিল, “ফ্রি ও-এস ব্যবহার করে না! বাংলাদেশ কি অনেক ধনী দেশ নাকি?” আমি কোন উত্তর দিইনি। কম্পিউটারের অপারেটিং সিস্টেম কী জিনিস সেটাই তো জানি না এখনো।

“হেই প্রাডিব, ডু ইউ নো হোয়ার ইজ কেন্‌ টুডাই?”

ঘাড় ফিরিয়ে দেখলাম ম্যান্ডি রুমে ঢুকে বৃষ্টি-ভেজা টকটকে লাল জ্যাকেট খুলে চেয়ারে ঝুলিয়ে রাখছে। কেন্‌ যে ইওরোপে গেছেন তা সম্ভবত ম্যান্ডি জানে না। ইংরেজি বাক্য গঠন করতে আমার অনেক সময় লাগে। প্রক্রিয়াটি এখনো অনেক দীর্ঘ আমার কাছে। ইংরেজি প্রশ্ন শুনে মনে মনে সেটার বাংলা অনুবাদ করার পর বুঝতে পারি। তারপর বাংলায় তার উত্তর তৈরি করে সেই উত্তরের ইংরেজি অনুবাদ করার পর তা উচ্চারণ করতে করতে অনেক দেরি হয়ে যায়। ততক্ষণে শ্রোতার মনযোগ অন্যদিকে চলে যেতে পারে। কিন্তু আজ দেখলাম ম্যান্ডি অপেক্ষা করছে আমার উত্তরের জন্য। জ্যাকেটের পর এখন সে সোয়েটারটাও খুলতে শুরু করেছে। ইউনিভার্সিটির সবগুলো বিল্ডিং শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বলে রুমের ভেতর সোয়েটার-জ্যাকেট ছাড়াও থাকা যায়। আমি যে বাসায় থাকি – সেখানে রুম হিটিং-এর কোন ব্যবস্থা নেই। ফলে কনকনে ঠান্ডায় কম্বল মুড়ি দিয়ে বসে থাকতে হয়। সেই তুলনায় ইউনিভার্সিটিতে অনেক আরাম। তাই যতক্ষণ পারি আমি ইউনিভার্সিটিতেই থাকি। কিন্তু এখানেও আমাকে জ্যাকেট পরে থাকতে হচ্ছে সারাক্ষণ। ম্যান্ডি যেরকম ভারী জ্যাকেট পরে এসেছে আমার জ্যাকেট সেরকম নয়। অনার্স থার্ড ইয়ারে পড়ার সময় হকার্স মার্কেট থেকে যে সেকেন্ড হ্যান্ড জ্যাকেট কিনেছিলাম – আট বছর পরেও সেটা আমাকে উষ্ণতা দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এদেশের ছেলে-মেয়েদের মনে হচ্ছে শীতের অনুভূতি কম।

“হোয়াট হ্যাপেন? হোয়ার ইজ কেন্‌?”

ম্যান্ডি দুটো আবরণ খুলে ফেলে এখন পাতলা একটা টি-শার্ট পরে আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। আর আমি তার দিকে নির্লজ্জের মতো তাকিয়ে আছি। থতমত খেয়ে বললাম, “ইওরোপ, লাস্ট থার্স ডে।“

“লাকি বাস্টার্ড।“

শব্দ প্রয়োগের এই স্বেচ্ছাচারিতা বুঝতেও ঝামেলা হয় আমার। ম্যান্ডি নিশ্চয় কেনের জন্ম পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তুলছে না এখানে। তবে এখানে বাস্টার্ড বলার অর্থ কী? দরকারই বা কী? ম্যান্ডি এর পর যেসব কথাবার্তা বললো তাতে বোঝা গেল – কেন্‌ প্রতি বছর শীতকালে ইওরোপে চলে যান। ওখানে এখন গ্রীষ্মকাল। জার্মানি, ফ্রান্স, হাঙ্গেরিতে তাঁর গবেষক বন্ধুরা আছেন। তাঁদের আতিথ্য গ্রহণ করেন। আর ওখানে যখন শীতকাল থাকে – তখন উনারা এখানে চলে আসেন অস্ট্রেলিয়ান গ্রীষ্ম উপভোগ করার জন্য। ম্যান্ডি কেনের এই সুযোগে ভীষণ ঈর্ষান্বিত। ম্যান্ডিকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। শুনে আমারও ঈর্ষা হচ্ছে।

“কেন্‌ যেহেতু নেই, আমার আর এখানে থাকার দরকার নেই। আমি বাসায় চলে যাবো।“ কয়েক মিনিটের মধ্যেই আবার সোয়েটার-জ্যাকেট পরে চলে গেলো ম্যান্ডি। সুপারভাইজার না থাকলে ফাঁকিবাজি তাহলে এরাও করে?

দশটা থেকে প্রফেসর লেস অ্যালেনের স্ক্যাটারিং থিওরির ক্লাসটা করতে হবে। ওটা মূলত অনার্সের কোর্স। এখানকার অনার্সের সাথে আমাদের অনার্সের পার্থক্য আছে। আমরা তো ফার্স্ট ইয়ার থেকেই অনার্সের ছাত্র। কিন্তু এখানে তিন বছর পড়ে বিএসসি পাস করার পর এক বছরে অনার্স কোর্সে ভর্তি হতে হয়। বিএসসিতে কমপক্ষে শতকরা পঁচাত্তর ভাগ নম্বর পেতে হয় অনার্সে ভর্তি হবার জন্য। এক বছরের অনার্স কোর্সের প্রথম সেমিস্টার কোর্সওয়ার্ক। চারটি কোর্স নিতে হয়। পরের সেমিস্টার থিসিস। অনার্স পাস করার পর সরাসরি পিএইচডি-তে ভর্তি হওয়া যায়। অনার্সে শতকরা আশি ভাগ নম্বর পেলে ফার্স্ট ক্লাস। ফার্স্ট ক্লাস অনার্স থাকলে পিএইচডি করার জন্য স্কলারশিপ পাওয়া যায়। এদেশের ছেলেমেয়েদের জন্য রিসার্চ-ডিগ্রি সম্পূর্ণ ফ্রি। ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্টরা যেখানে বছরে সতেরো-আঠারো হাজার ডলার টিউশন ফি দিয়ে পড়ছে, সেখানে এদেশের ছেলেমেয়েদের জন্য তা সম্পূর্ণ ফ্রি। তবুও নাকি এদেশের ছেলেমেয়েরা পিএইচডি করতে আগ্রহী হয় না তেমন। তা অবশ্য দেখতেই পাচ্ছি। এবার ফিজিক্সে অনার্স করছে বিশ জনেরও কম। স্ক্যাটারিং থিওরি ক্লাসে আছে মাত্র সাত জন। আমিসহ আট জন হয়েছি।

লেস অ্যালেনের ক্লাস করতে গিয়ে আবার নতুন করে বুঝতে পারলাম যে অনার্স-মাস্টার্সে কোয়ান্টাম মেকানিক্স পড়ার পরেও আমি তার কলকব্জা কিছুই বুঝতে পারিনি। অথচ এই বাচ্চা-বাচ্চা ছেলেমেয়েগুলি জটিল সমীকরণের সবকিছুই বুঝে।

ক্লাসে যে সাত-জন আছে সবার বয়সই একুশ-বাইশের মধ্যে। এরা আঠারো বছরে ফার্স্ট ইয়ারে ভর্তি হয়, একুশে গ্রাজুয়েট, বাইশে অনার্স, পঁচিশ-ছাব্বিশে পিএইচডি কমপ্লিট করে ফেলে যারা করতে চায়। তবে বেশিরভাগই স্নাতক পাস করেই চাকরিতে ঢুকে যায়। একুশ-বাইশ বছরের তরুণ-তরুণীদের মাঝে একত্রিশ বছরের নিজেকে খুবই বুড়ো মনে হয়। তবে লেখাপড়ার জন্য বয়সের যে কোন বাধা এদেশে নেই তা নিজের চোখেই দেখতে পাচ্ছি। ফার্স্ট ইয়ার ফিজিক্সের ল্যাব-ক্লাস নিচ্ছি আমি এই সেমিস্টারে। সেখানে ইঞ্জিনিয়ারিং কোর্সের একজন ছেলে আছে যার বয়স পঞ্চাশের কম নয়। আমি আগ্রহ নিয়ে তার সাথে কথা বলেছি। এমবিএ পাস করে কর্পোরেট চাকরি করেছে অনেক বছর। এখন ইচ্ছে হয়েছে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার। ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এ ভর্তি হয়েছে এবছর।

দরজায় টোকার শব্দে দরজার দিকে তাকালাম। ম্যান্ডি রুমের দরজা খোলা রেখেই চলে গিয়েছে। এখন দরজার সামনে বিশাল একটা ফোল্ডার নিয়ে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছেন প্রফেসর লেস অ্যালেন। 

“লেট্‌স গো টু ক্লাস।“

“ইয়েস স্যার।“

“ওহ্‌ নট অ্যাগেইন। নো স্যার প্লিজ।“

আমাদের দেশে শিক্ষকদের নাম ধরে ডাকার কথা আমরা স্বপ্নেও ভাবতে পারি না। আর এখানে আসার এক মাসের মধ্যেই নাম ধরে ডাকার সংস্কৃতি আয়ত্ব হয়ে যাবে? লেসের অফিস এই ফ্লোরের একেবারে অন্য মাথায়। তিনি সেখান থেকে হেঁটে এসে আমাকে ডেকে নিয়ে যাচ্ছেন ক্লাস করার জন্য। এ কোন্‌ দেশে এলাম?


বিশ্ববীণা বাজে যেথায় - ১

 


আজ সকাল আটটায় ডিপার্টমেন্টে এসে নিজের ডেস্কে বসে পড়াশোনা করার চেষ্টা করছিলাম। এতদিন স্কুল থেকে ইউনিভার্সিটি পর্যন্ত সবপর্যায়েই সর্বোচ্চ ফাঁকিবাজী করেও কোন রকমে পার পেয়ে গিয়েছি। সারাবছর পড়াশোনা না করে পরীক্ষার ডেট দিলে পরীক্ষা পেছানোর আন্দোলন করেছি। গৎবাঁধা কিছু প্রশ্নের উত্তর লাইনের পর লাইন মুখস্থ করে পরীক্ষার খাতায় লিখে দিয়ে পাস করে ফেলেছি। কিন্তু এখানে তো সে সুযোগ নেই। মুখস্থ করে কি গবেষণা করা যায়? বুঝতে পারছি এখানে ফাঁকিবাজি চলবে না। তাই একটু সিরিয়াস হয়ে পড়তে বসেছি্লাম।

মাইক্রোস্কোপিক অপটিক্যাল থিওরি সম্পর্কে কিছুটা পড়েছিলাম মাস্টার্সের নিউক্লিয়ার ফিজিক্সে। পড়া মানে স্যার যেভাবে ক্লাসে এসে রয় এন্ড নিগমের নিউক্লিয়ার ফিজিক্স বই থেকে লাইনের পর লাইন বোর্ডে লিখে গেছেন, আমরাও লাইনের পর লাইন মুখস্থ করেছি। কিন্তু শিখিনি কিছুই। এখন মজা বেরোচ্ছে। এই থিওরির ভিত্তিতে লেখা গবেষণাপত্রগুলোর মাথামুন্ড কিছুই বুঝতে পারছি না। লাইব্রেরি থেকে রয় এন্ড নিগমের বইটা নিয়ে এলাম। পুরনো বই দেখলে হয়তো মাথার জট কিছুটা খুলবে। বইয়ের অপটিক্যাল মডেল অধ্যায়ে অনেকবার রেফারেন্স হিসেবে এসেছে কেন্‌ অ্যামোসের নাম। তখন তো এসব রেফারেন্সের দিকে চোখও পড়েনি। নিউক্লিয়ার থিওরির এই বিখ্যাত প্রফেসর কেন্‌ অ্যামোসের কাছে গবেষণা শুরু করেছি ভাবতেই কেমন একটা ভালোলাগা ঘিরে ধরলো আমাকে। মনের ভেতর স্বপ্নের পাখিরা ডানা মেলতে শুরু করলো- ‘একদিন আমিও…’ ঠিক তখুনি মাথার ওপর আলতো ব্যাগের বাড়ি।

“হেই প্রাডিব। ইউ আর স্লিপিং হিয়ার?”

মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে চোখ তুলে তাকালাম ম্যান্ডির দিকে। ম্যান্ডি ব্যস্ত হাতে জ্যাকেটের চেইন খুলছে আর খিলখিল করে হাসছে।

“গুড মর্নিং ম্যান্ডি।”

“মর্নিং। ডিড ইউ গো হোম লাস্ট নাইট?”

এই মেয়ে কি বিদ্রুপ করছে আমাকে? জানতে চাচ্ছে আমি রাতে এখানে ঘুমিয়েছি কি না? এ জাতীয় প্রশ্নের যুৎসই উত্তর দেবার মত ইংরেজি আমার জানা নেই। কোন রকমে বললাম, “আমি ঘুমাচ্ছিলাম না। পড়ছিলাম।”

“আমি জানি। মজা করছিলাম তোমার সাথে। আমি কী ঠিক করেছি জানো? এখন থেকে এই রুমেই বসবো। এটাই আমার ডেস্ক। এতদিন ওদিকে চার নম্বর রুমে বসতাম। ওখানেও আমার একটা ডেস্ক আছে। এখন থেকে এখানে বসবো কেন জানো? মনে হচ্ছে এখানে সময়টা অনেক মজায় কাটবে। তুমি কি মজা করতে পছন্দ করো? পিক্‌ যে চলে যাচ্ছে তুমি জানো? পিকের সাথে পরিচয় হয়েছে না? পিক্‌ মানে পিটার...”

ম্যান্ডির সাথে পরিচয় হয়েছে মাত্র গতকাল। অথচ সে এমন ভাবে কথা বলছে যেন শৈশব থেকেই দেখছে আমাকে। অস্ট্রেলিয়ানরা জাতিগতভাবে বেশ খোলামেলা স্বভাবের। কিন্তু ম্যান্ডি মনে হচ্ছে তার চেয়েও বেশি। এত কথা যে কীভাবে বলে মেয়েটা!

সকাল ন’টা থেকে সাড়ে দশটা পর্যন্ত ম্যান্ডির বক-বক শুনতে শুনতে কাবুলিওয়ালার মিনির কথা মনে পড়লো। রবীন্দ্রনাথের কাবুলিওয়ালা শুরু হয়েছে এভাবে, “আমার পাঁচ বছর বয়সের ছোটো মেয়ে মিনি এক দন্ড কথা না কহিয়া থাকিতে পারে না। পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করিয়া ভাষা শিক্ষা করিতে সে কেবল একটি বৎসর কাল ব্যয় করিয়াছিল, তাহার পর হইতে যতক্ষণ সে জাগিয়া থাকে এক মুহূর্ত মৌনভাবে নষ্ট করে না।” মিনির আদলে ম্যান্ডিকে নিয়েও লেখা যায়- “আমার পঁচিশ-ছাব্বিশ বছর বয়সের সহপাঠিনী ম্যান্ডি এক দন্ড কথা না কহিয়া থাকিতে পারে না। আমার সহিত পরিচয় হইবার পর একটা মাত্র দিন অতিবাহিত হইয়াছে। এর পর হইতে যতক্ষণ সে আমার ডেস্কের পাশে কম্পিউটারের সামনে বসিয়াছে, এক মুহূর্ত মৌনভাবে নষ্ট করে নাই।”    

ম্যান্ডি কম্পিউটার দখল করে বসে আছে দেখে পিটার এসে ‘হাই ম্যান্ডি, হাই প্রাডিব’ বলে একটু এদিক ওদিক তাকিয়ে চলে গেছেন। আমি ভেবেছিলাম পিটারকে দেখে ম্যান্ডি কম্পিউটার ছেড়ে উঠে যাবে। আমি হলে তাই করতাম। কিন্তু ম্যান্ডি পিটারকে পাত্তাই দিলো না। কম্পিউটারের পর্দায় চোখ রেখে অনবরত কথা বলেই চলেছে। 

কোন কাজ সে আসলে করছে না। ইন্টারনেটে কিছুক্ষণ সাজ-পোশাক দেখেছে। এখন ওয়ার্ল্ড জিওগ্রাফি সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করছে। 

“হেই প্রাডিব, ইউ আর ফ্রম ব্যাঙলাড্যাশ- রাইট?”

“ইট্‌স বাংলাদেশ ম্যান্ডি। বাং-লা-দে-শ। নট ব্যাঙলাড্যাশ। বাংলা ইজ আওয়ার ল্যাংগুয়েজ এন্ড কালচার, দেশ মিন্‌স কান্ট্রি।”

ম্যান্ডিকে বাংলাদেশ সম্পর্কে জ্ঞান দিতে গিয়ে এই শীতের সকালেও ঘাম বের হয়ে যাবার জোগাড়। আমার ইংরেজি শব্দের ভান্ডার যে এত ছোট আগে বুঝতে পারিনি।

ম্যান্ডি ইন্টারনেটে বাংলাদেশ সম্পর্কিত অনেক তথ্য বের করে পড়তে শুরু করেছে আর একটু পর পর আমাকে জিজ্ঞেস করছে-বাংলাদেশের কোথায় বাড়ি তোমাদের? চিটাগং শব্দের অর্থ কী? এত ছোট একটা দেশে তোমরা এত বেশি মানুষ কীভাবে থাকো?

তার প্রশ্নের উত্তরে “যদি হয় সুজন, তেঁতুল পাতায় নয় জন” জাতীয় কিছু একটা বলতে পারতাম। কিন্তু তেঁতুলের ইংরেজি জানা না থাকায় কিছু না বলে চুপ করে রইলাম।

“আই নিড এ কাপ অব কফি। ডু ইউ ওয়ান্ট?”

“থ্যাংক ইউ ম্যান্ডি।”

“ইয়েস থ্যাংক ইউ, অর নো থ্যাংক ইউ?”

“নো থ্যাংক ইউ।”

“ওকেই”

কাঁধ ঝাঁকিয়ে চলে গেলো ম্যান্ডি। সে কি একটু মনক্ষুন্ন হলো?  সুন্দরী মেয়েরা নাকি কোন প্রস্তাবেই ‘না’ শুনতে অভ্যস্ত নয়।

পৌনে এগারোটায় পিটার এসে দাঁড়ালেন রুমের সামনে। কেনের কলোকুইয়াম এগারোটায়। পিটার বললেন, “তুমি কি জানো যে কলোকুইয়ামের আগে ফ্রি খাবারের ব্যবস্থা আছে?”

“তাই নাকি? কোথায়?”

“চলো। উপরের স্টাফ রুমে।”

কেন্‌ও বেরোলেন একই সময়ে। সাত তলায় উঠে হেড অব দি স্কুলের অফিসের সামনে স্টাফ রুম। ফিজিক্স ডিপার্টমেন্টের ম্যানেজার মিকি দেখিয়েছিলেন সেদিন। এর মধ্যেই ভীড় জমে গেছে সেখানে। টেবিলে রাখা ডোনাটের উপর প্রায় হামলে পড়ছে সবাই। আমি কেন্‌ আর পিটারের পাশে দাঁড়িয়ে আছি। বাকি সব মুখ এখনো অপরিচিত।

“গুডাকেন্‌, হোয়াট ইয়া টাকিন টু ডাই?”

প্রশ্নকর্তার দিকে তাকিয়ে কিছুটা অবাক হলাম। চোখে পুরু চশমা, মাথায় ধবধবে সাদা চুল, বাচ্চাদের মত মুখ, পরনে হাফ-শার্ট আর হাফ-প্যান্ট। প্যান্ট-টা কাঁধের সাথে বেল্ট দিয়ে আটকানো। কেনের একেবারে কাছে এসে দাঁড়িয়েছেন তিনি। বুঝতে চেষ্টা করছি তিনি কেন্‌কে কী জিজ্ঞেস করলেন। ‘টু ডাই’ কথাটা প্রায়ই শোনা যায় এখানে। সবাই শুধু শুধু মৃত্যুর কথা বলবে কেন? নিশ্চয় শুনতে ভুল করছি আমি। দেখি কেন্‌ কী উত্তর দেন।

“হাই জেফ্‌। হাউ থিংস?”

“থিংস আ ফাইন। কান্ট কম্‌প্লাইন। সো হোয়াট ইয়া টাকিন টু ডাই?”

“সাম নিউ স্টাফ, পিটার এন্ড মি ডুয়িং লেইট্‌লি”

তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “প্রাডিব ইজ স্টার্টিং সুন। প্রাডিব, মিট জেফ। এ ভেরি গুড ফ্রেন্ড অব মাইন।“

জেফের সাথে হ্যান্ডশেক করতে করতে হঠাৎ পরিষ্কার হয়ে গেলো ‘টু-ডাই’মানে কী। হায়রে অস্ট্রেলিয়ান উচ্চারণ - ‘ডে’ যদি ‘ডাই’ হয়ে যায় কীভাবে বুঝবো! ‘হোয়াট ইয়া টাকিন টু ডাই’ অর্থাৎ ‘হোয়াট ইউ টকিং টুডে?” গতকাল ম্যান্ডি যখন জিজ্ঞেস করেছিল ‘হ্যাভ ইয়া কাম টু-ডাই?’- ভেবেছিলাম ঠাট্টা করে জানতে চাচ্ছে মরতে এসেছি কি না। অথচ সে জিজ্ঞেস করছিলো “আজকে এসেছো?”

এগারোটা বাজার পাঁচ মিনিট আগে হারকাস থিয়েটারে এসে ঢুকলাম সবার সাথে। একটা ব্যাপার খেয়াল করলাম, ডোনাট খাওয়ার জন্য যারা এসেছিলেন তাদের অনেকেই মাঝপথে হাওয়া হয়ে গেছেন। বিনেপয়সার বৈজ্ঞানিক বক্তৃতা শোনার আগ্রহের চেয়ে বিনেপয়সার খাবারের প্রতি মানুষের আগ্রহ বেশি থাকবে এটাই স্বাভাবিক। তবুও এখানে এটা আশা করিনি।

কেনের বক্তৃতা শুরু হবার পর বুঝতে পারলাম এরকম খটমটে বৈজ্ঞানিক বক্তৃতা শোনার আগ্রহ সবার হবার কথা নয়। বিষয়ভিত্তিক কোন পূর্ব-ধারণা ছাড়া এ ধরনের বক্তৃতা বোঝা সম্ভব নয়। নিউক্লিয়ার থিওরি সম্পর্কে কিছুটা ধারণা থাকা সত্ত্বেও আমি তেমন কিছুই বুঝতে পারলাম না। বক্তৃতা শেষে প্রশ্নোত্তর পর্বটা মূল বক্তৃতার চেয়েও আকর্ষণীয়। প্রশ্ন করার জন্যও একটা ন্যূনতম জ্ঞান দরকার হয়। আমি জানি না আমার সে পরিমাণ জ্ঞানার্জন কবে হবে বা আদৌ হবে কি না।

লাঞ্চের সময় স্টুডেন্ট সাপোর্ট সেন্টারে গিয়ে পার্ট-টাইম জবের বিজ্ঞপ্তিগুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়লাম। বেশ ভীড় এখানে। আমার মত সবারই চাকরি দরকার। বাংলাদেশে ছাত্রাবস্থায় পার্ট-টাইম চাকরি বলতে টিউশনিই বুঝতাম। এখানে মনে হয় টিউশনি ব্যাপারটাই নেই। স্কুল কলেজ ইউনিভার্সিটিতেই কি সবকিছু পড়িয়ে দেয়া হয়? গৃহশিক্ষক লাগে না এদেশে?

বেবি সিটারের চাহিদা মনে হচ্ছে অনেক বেশি। কয়েকজন সম্ভাব্য চাকরিদাতার ঠিকানা ও টেলিফোন নম্বর লিখে নিয়ে এলাম। রুমে যখন কেউ থাকবে না তখন ফোন করতে হবে। কারো সামনে ফোন করতে গেলে সংকোচে গলা দিয়ে শব্দ বেরোবে না। ম্যান্ডির সামনে তো নয়ই।

বলা হয়েছে বিকেল পাঁচটার পর ফোন করতে। পাঁচটা বাজার অনেক আগেই রুম খালি হয়ে গেছে। ম্যান্ডি চলে গেছে আমি লাইব্রেরি থেকে ফিরে আসার একটু পরে। কেন্‌ চলে গেছেন পৌনে পাঁচটার দিকে। যাবার সময় আমার রুমে উঁকি দিয়ে ‘গুড নাইট’ বলে গেছেন। যদিও বাইরে দিনের আলো নিভে গেছে, তবুও বিকেল পৌনে পাঁচটায় কি শুভরাত্রি বলা চলে? কিন্তু না বলেও তো উপায় নেই। ইংরেজির নিয়মে বিদায়ের সময় তো আর গুভ ইভনিং বা শুভসন্ধ্যা বলা যায় না।

পাঁচটা বাজার কিছুক্ষণ পর রুমের দরজা বন্ধ করে টেলিফোন নিয়ে বসলাম। খাতায় যেভাবে লিখে এনেছি সে অর্ডারেই ফোন করা শুরু করলাম। প্রথমটা ডেফ্‌নি জোন্‌স।

“হ্যালো, মে আই স্পিক টু ডেফ্‌নি জোন্‌স প্লিজ”

“স্পিকিং। হু ইজ ইট?”

বললাম, “ম্যাডাম, বেবি সিটারের বিজ্ঞপ্তি দেখে ফোন করছি।”

ও প্রান্তে কিছুক্ষণ কোন সাড়াশব্দ নেই।

“ম্যাডাম, হ্যালো, হ্যালো, ম্যাডাম।”

“সরি, দি পজিশান ইজ নো লংগার এভয়েলেভল।”

কী সুন্দর কথা। চাকরিটি এখন আর খালি নেই। মানে হলো আমাকে পছন্দ হয়নি ম্যাডাম ডেফ্‌নি জোন্‌সের। নো প্রোবলেম। দ্বিতীয় নম্বরে ডায়াল করলাম।

“হ্যালো, আই এম কলিং এবাউট দি বেবি সিটার পজিশান। মে আই স্পিক টু নিকি ফার্নান্ডেজ প্লিজ।”

“স্পিকিং। হোয়াট্‌স ইওর নেম?”

ভদ্রমহিলার উচ্চারণে ইন্ডিয়ান টান। নিকি ফার্নান্ডেজ কি ভারতীয় নাম? শ্রীলংকানও হতে পারেন। বললাম, “আমার নাম প্রদীপ দেব”

“মনে হচ্ছে ঠিক মত শুনতে পাচ্ছি না। আপনিই কি চাকরিপ্রার্থী?”

“হ্যাঁ, আমার বিশেষ অভিজ্ঞতা আছে শিশু-রক্ষণাবেক্ষণ কাজে।”কথাটা মিথ্যে নয়। আমার ভাগ্নে-ভাগ্নি-ভাইজি বাবু-রুপু-পূজা তাদের কয়েক ঘন্টা বয়স থেকে শুরু করে এক মাস আগেও আমার তত্ত্বাবধানে থেকেছে কোন না কোন সময়। ছোটবেলায় তারা অবলীলায় প্রাকৃতিক কাজ-কর্ম সেরেছে আমার কোলে, গায়ে, মাথায়। এখানে কাজে লাগবে জানলে আসার সময় দিদি আর বৌদির কাছ থেকে বেবি সিটার হিসেবে অভিজ্ঞতা ও কর্মদক্ষতার সনদপত্র নিয়ে আসতে পারতাম।

“আপনার নাম প্রদীপ দেব। কিন্তু আপনার গলার স্বর ঠিক মেয়েদের মত লাগছে না। আপনার কি ঠান্ডা লেগেছে?”

“না ম্যাডাম। আমার ঠান্ডা লাগেনি। আমার গলা মেয়েদের মত লাগছে না কারণ আমি মেয়ে নই। আমি পুরুষ।”

“কিন্তু এ কাজ তো মেয়েদের।”

“ম্যাডাম, বিজ্ঞপ্তিতে তো এরকম কিছু লেখা নেই।”

“সরি মিস্টার দেব। আইনগত কারণে বিজ্ঞপ্তিতে অনেক কিছু লেখা যায় না। বেবি সিটিং আসলে মেয়েদের কাজ। আমি একটা ছোট্ট বেবি কেয়ার সেন্টার চালাই। সেখানে একদম বাচ্চা বাচ্চা শিশুদের দেখাশোনা করার কাজ। আমি খুব দুঃখিত মিস্টার দেব।”

লাইন কেটে গেলো। বাকি নম্বরে ফোন করার কোন মানে হয় না। বেবি সিটিং মিশন সম্পূর্ণ ব্যর্থ। ‘ফেইলিওর ইজ দি পিলার অব সাকসেস’ বাক্যটি যদি সত্য হয় তাহলে আমার ভবিষ্যৎ সাফল্যের ভিত্তিতে আরো কয়েকটা পিলার যোগ হলো আজ! যে হারে ব্যর্থ হচ্ছি তাতে তো মনে হচ্ছে কয়েক দিনের মধ্যেই আমার সাফল্যের ক্ষেত্র পিলারময় হয়ে যাবে। কিন্তু শুধুমাত্র পিলার দিয়ে কি বিল্ডিং তৈরি করা যায়?


Thursday, 9 June 2022

আবহাওয়ার গাণিতিক মডেল

 



অনেকেই বলেন -  আজকাল সবকিছু অনিশ্চিত হয়ে উঠছে, কখন কী হবে তা আগে থেকে কিছুই বলা যাচ্ছে না – ইত্যাদি। কিন্তু একটু ভেবে দেখলেই বোঝা যাবে যে আধুনিক বিজ্ঞানের কল্যাণে এখন অনেক কিছুরই পূর্বাভাস এত সঠিকভাবে দেয়া সম্ভব হচ্ছে – যা বিশ বছর আগেও এতটা নিখুঁতভাবে দেয়া সম্ভব হতো না। আবহাওয়ার কথা ধরা যাক। কোথায় কখন ঝড় উঠবে, বৃষ্টি হবে, রোদ থাকবে কি মেঘ – সবই আগে থেকে সঠিকভাবে বলে দেয়া সম্ভব হচ্ছে। বর্তমান যুগে উন্নত দেশে আবহাওয়ার পূর্বাভাস প্রায় অক্ষরে অক্ষরে মিলে যায়। কীভাবে সম্ভব হচ্ছে আবহাওয়ার পরিবর্তন সম্পর্কে এরকম ভবিষ্যতবাণী করা?

শিল্পযুগ শুরু হবার পর গত একশ বছরে পৃথিবীর বায়ুমন্ডলে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বেড়ে গেছে শতকরা চল্লিশ ভাগ। পৃথিবীর যে গড় তাপমাত্রা গত এক হাজার বছর ধরে প্রায় স্থির ছিল – সেই গড় তাপমাত্রা হঠাৎ এক ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে গেছে। যেভাবে এগোচ্ছে তাতে বিজ্ঞানীরা হিসেব করে দেখেছেন যে এই একবিংশ শতাব্দীর মধ্যেই পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা আরো দুই থেকে তিন ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে যাবে। ফলে পৃথিবীর জলবায়ুতে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটবে। যেখানে প্রচুর পানি আছে – সেখানে বন্যার প্রাবল্য বেড়ে যাবে, অন্যদিকে যেখানে পানির অভাব, সেখানে আরো খরা হবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ বেড়ে যাবে ব্যাপক হারে। পরিবর্তনের এই যে পূর্বাভাস দেয়া হচ্ছে – তা কীভাবে সম্ভব হচ্ছে?

এর মূলে রয়েছে আধুনিক বিজ্ঞান। আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেয়ার জন্য আবহাওয়াবিদ্‌রা যে তিনটি প্রধান বিষয়ের উপর নির্ভর করেন – সেগুলি হলো পর্যবেক্ষণ, কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত আবহাওয়া মডেল, এবং আবহাওয়ার বিজ্ঞান ও বৈজ্ঞানিক অভিজ্ঞতা। বায়ুমন্ডলের চাপ, তাপ, জলীয় বাষ্পের পরিমাণ, বায়ু-প্রবাহের গতিপথ ও বেগ ইত্যাদি একেক জায়গায় একেক রকম হয়ে থাকে। এগুলির পরিবর্তনও হয় দ্রুত। তাই একেক জায়গার আবহাওয়া একেক রকম। বর্তমানে অনেকগুলি আধুনিক স্যাটেলাইট পৃথিবীর চারপাশে অনবরত ঘুরে ঘুরে আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ করছে এবং পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের আবহাওয়া-দপ্তরে অনবরত তথ্য পাঠাচ্ছে। এই তথ্যগুলিকে কম্পিউটার মডেলের মধ্যে প্রবেশ করিয়ে আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেয়া হয়।

আবহাওয়ার কম্পিউটার মডেল হলো আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেয়ার প্রধান অবলম্বন। আবহাওয়ার পরিবর্তনে পদার্থবিজ্ঞানের যতগুলি নিয়ম কাজ করে তার সবগুলি গাণিতিক সমীকরণের মিশ্রণে তৈরি হয়েছে এই মডেল। বায়ুমন্ডলের তাপ, চাপ, আর্দ্রতা, বায়ুপ্রবাহ, তাপের বিকিরণ, শোষণ, আপেক্ষিক তাপ, আপেক্ষিক আর্দ্রতা ইত্যাদি হাজারো প্যারামিটারের যে কোনোটারই পরিবর্তনে বদলে যেতে পারে স্থানীয় আবহাওয়া। তবে কতটুকু বদল হবে তা হিসেব করার জন্য পৃথিবীর জলবায়ুর গাণিতিক মডেল দরকার হয়। সেই মডেলে কোটি কোটি উপাত্ত বিশ্লেষণ করা হয় খুবই কম সময়ের মধ্যে। এই কাজের জন্য সুপার-কম্পিউটার ব্যবহার করা হচ্ছে এখন। অস্ট্রেলিয়ার আবহাওয়ার গাণিতিক মডেল হিসেব করার জন্য যে সুপার-কম্পিউটার ব্যবহার করা হয় সেটা প্রতি সেকেন্ডে ১৬০০ ট্রিলিয়ন হিসেব করতে পারে।

পদার্থবিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠিত নিয়ম কাজে লাগিয়ে বিজ্ঞানীরা জলবায়ু পরিবর্তনের গাণিতিক মডেল তৈরি করেছেন। ষাটের দশকের সরল একমাত্রিক মডেল থেকে শুরু হয়ে ক্রমাগত উন্নত হতে হতে সেগুলি বর্তমানের সুপার কম্পিউটার প্রযুক্তির যুগে প্রায়-নিঁখুত বহুমাত্রিক মডেলে পরিণত হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের পূর্বাভাস দেয়ার কার্যকর মডেল তৈরিতে যুগান্তকারী ভূমিকা রেখেছেন আমেরিকার প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটির প্রফেসর সুকুরু মানাবে এবং জার্মানির ম্যাক্স প্লাংক ইন্সটিটিউট অব মেটিওরলজির প্রফেসর ক্লাউস হাসেলমান। এজন্য তাঁদেরকে ২০২১ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার দেয়া হয়েছে। কিন্তু এই পথে বিজ্ঞানীদের পদচারণা শুরু হয়েছিল অনেক অনেক বছর আগে।

আবহাওয়া কিংবা জলবায়ুর পূর্বাভাস দেয়ার কাজ প্রথম শুরু হয়েছিল প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে। খ্রিস্টপূর্ব ৫৮০ সালে গ্রিক দার্শনিক থেলিস পূর্ববর্তী বছরগুলির ফসলের পরিমাণ হিসেব করে আবহাওয়ার পূর্বাভাস দিয়েছিলেন। তবে সেই পূর্বাভাস ছিল অনেকটাই অভিজ্ঞতানির্ভর। এরপর খ্রিস্টপূর্ব ৩৫০ সালে অ্যারিস্টটল প্রথম বিজ্ঞানভিত্তিক আবহাওয়া-মডেল তৈরি করার চেষ্টা করেছিলেন। তিনি সূর্যের তাপে পানি বাষ্প হয়ে মেঘ তৈরি করার ব্যাপারে সঠিক ধারণা দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি বিশ্বাস করতেন যে পৃথিবীকে কেন্দ্র করে সূর্য ঘুরছে, এবং মহাবিশ্বের সবকিছুই আগুন, পানি, বাতাস আর মাটি দিয়ে তৈরি। ফলে তাঁর দেয়া ধারণাগুলি পরবর্তীতে পরিত্যক্ত হয়। কিন্তু অ্যারিস্টটলের হাতেই আবহাওয়াবিজ্ঞানের নামকরণ হয় ‘মেটিওরলজি’ যা এখনো ব্যবহৃত হচ্ছে। গ্রিক শব্দ ‘মেটিওরস’-এর অর্থ হলো আকাশের উপরে। সেই সময় আকাশ থেকে যা কিছু আকাশে থাকে বা আকাশ থেকে নেমে আসে – যেমন মেঘ, বৃষ্টি – সবকিছুকেই বলা হতো মেটিওর।

ফরাসি পদার্থবিজ্ঞানী জোসেফ ফুরিয়ার পৃথিবীর বায়ুমন্ডল উত্তপ্ত হওয়ার কারণ আবিষ্কার করেন আজ থেকে প্রায় দু’শ বছর আগে। তিনিই প্রথম ব্যাখ্যা করেছিলেন গ্রিনহাউজ ইফেক্টের ব্যাপারটা। সূর্যের আলো পৃথিবীর বায়ুমন্ডল ভেদ করে পৃথিবীতে এসে পৌঁছায়। এই আলোর বেশিরভাগ পৃথিবীপৃষ্ঠ শোষণ করে নেয়। এই শক্তি শোষণ করার পর পৃথিবীপৃষ্ঠ উত্তপ্ত হয়ে অতিরিক্ত শক্তি বিকিরণ পদ্ধতিতে বের করে দেয়। পৃথিবীপৃষ্ঠ থেকে যে শক্তি বেরিয়ে আসে – পৃথিবীর বায়ুমন্ডল সেটা শোষণ করে নেয়। ফলে বায়ুমন্ডলের তাপমাত্রা বেড়ে যায়। শক্তির আদান-প্রদানের এই পদ্ধতিতে একটা সূক্ষ্ম পরিবর্তন ঘটে। সূর্যের যে আলো পৃথিবীতে আসে – তার শক্তি অনেক বেশি। আলোর কোয়ান্টাম তত্ত্ব অনুযায়ী সেই আলোর কম্পাঙ্ক বেশি, তরঙ্গদৈর্ঘ্য কম। কম তরঙ্গদৈর্ঘ্যের কারণে আলো সহজেই পৃথিবীর বায়ুমন্ডল ভেদ করে পৃথিবীতে চলে আসতে পারে। কিন্তু ভূপৃষ্ঠ থেকে যে শক্তি নির্গত হয় – তা হয় তাপের আকারে। এই শক্তির তরঙ্গদৈর্ঘ্য বেশি, কম্পাঙ্ক কম। ফলে এগুলি পৃথিবীর বায়ুমন্ডল ভেদ করে মহাশূন্যের দিকে চলে যেতে পারে না, বায়ুমন্ডলে বাধা পেয়ে আবার পৃথিবীতেই ফিরে আসে। ফলে পৃথিবীর বায়ুমন্ডলের তাপমাত্রা বাড়তে থাকে। এই ব্যাপারটাই গ্রিনহাউজ ইফেক্ট। এই প্রক্রিয়াটি খুবই জটিল। অসংখ্য প্যারামিটার বা সূচক এখানে জড়িত। তার সবগুলিকে হিসেব করে একটা মডেলের আওতায় নিয়ে আসা সহজ নয়। বিজ্ঞানীরা বছরের পর বছর ধরে এই জটিল কাজটি করার চেষ্টা করছেন।

আবহাওয়ার গতিপ্রকৃতি বোঝার জন্য একমাত্রিক গাণিতিক মডেলে বাতাসের তাপমাত্রার পরিবর্তন, আর্দ্রতার পরিমাণ, বাতাসের বেগ, মেঘের ঘনত্ব ইত্যাদি প্যারামিটার যুক্ত করে পৃথিবীর জলভাগ ও স্থলভাগের সাথে এসবের পরিবর্তন কীভাবে ঘটে তার পদার্থবৈজ্ঞানিক হিসেবগুলি বিবেচনায় নেয়া হয়। এরকম একমাত্রিক মডেলে আবহাওয়া পরিবর্তনের সম্ভাবনার কথা বলা যায়, কিন্তু তাতে ফাঁক থেকে যায় অনেকখানি।

বাতাসে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার কারণে পৃথিবীর তাপমাত্রা বেড়ে যাচ্ছে – এরকম কথা আমরা প্রায়ই শুনি আজকাল। কথাটি সত্য। বাতাসে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পরিমাণের সাথে যে তাপমাত্রার পরিবর্তনের সরাসরি সম্পর্ক আছে তা প্রথম আবিষ্কার করেছিলেন সুইডেনের পদার্থবিজ্ঞানী সান্তে আরহেনিয়াস – একশ বছরেরও বেশি আগে উনিশ শতকের শেষের দিকে। ১৮৯৪ সালে আরহেনিয়াসের মডেল ছিল জলবায়ু পরিবর্তনের সর্বপ্রথম গাণিতিক মডেল। আরহেনিয়াস ১৯০৩ সালে রসায়নে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছিলেন। স্বাভাবিক বাতাসে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ শতকরা মাত্র ০.০৪৬ ভাগ, আর জলীয় বাষ্পের পরিমাণ শতকরা এক ভাগের মতো। ভূ-পৃষ্ঠ থেকে যে তাপ বের হয় তা বাতাসের এই জলীয় বাষ্প ও কার্বন-ডাই-অক্সাইড মিলে শোষণ করে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেয়। পৃথিবীতে প্রাণের উদ্ভব এবং জীবন ধারণের জন্য এই তাপ শোষণ প্রক্রিয়া খুবই দরকারি। কার্বন-ডাই-অক্সাইড ও জলীয়বাষ্প যদি তাপ শোষণ না করতো তাহলে পৃথিবীপৃষ্ঠের গড় তাপমাত্রা হতো মাইনাস আঠারো ডিগ্রি সেলসিয়াস। হিমাঙ্কের নিচে সেই তাপমাত্রায় প্রাণের উদ্ভব হয়তো হতোই না। আরহেনিয়াস তাঁর গাণিতিক মডেলের সাহায্যে হিসেব করে দেখিয়েছেন যে বাতাসের কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ যদি কমে গিয়ে অর্ধেক হয়ে যায়, তাতে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা পাঁচ থেকে ছয় ডিগ্রি কমে যেতে পারে। ফলে পৃথিবীতে আবার বরফ যুগ নেমে আসতে পারে। আবার কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বেড়ে গেলেও পৃথিবীর জলবায়ুর ব্যাপক পরিবর্তন ঘটবে। যার কিছু কিছু আমরা এখন দেখতে পাচ্ছি।

আমেরিকার ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোস্ফেরিক  অ্যাডমিনিস্ট্রেশানের আগের নাম ছিল ইউনাইটেড স্টেটস ওয়েদার ব্যুরো। এই ব্যুরোর জিওফিজিক্যাল ফ্লুইড ডায়নামিক্স ল্যাবোরেটরি (জিএফডিএল) জলবায়ুর একমাত্রিক মডেল উদ্ভাবন করেছিল ১৯৬০ সালের শুরুর দিকে। এই মডেল ছিল বিকিরণ ও পরিচলনের সাম্যাবস্থার সমীকরণের উপর ভিত্তি করে উদ্ভাবিত। জলবায়ুর পরিবর্তনে মূল ভূমিকা রাখে চার ধরনের তাপ বিনিময় প্রক্রিয়া। (১) সূর্য থেকে আলোর বিকিরণ পৃথিবীতে এসে পৌঁছায়। এই স্বল্প তরঙ্গদৈর্ঘ্যের বিকিরণ পৃথিবীপৃষ্ঠে শোষিত হয়। (২) এরপর তাপ আকারে সেই বিকিরণ পৃথিবী থেকে উপরের দিকে চলে যায়। তখন তার তরঙ্গদৈর্ঘ্য বেড়ে যায়। এই দীর্ঘ তরঙ্গদৈর্ঘ্যের বিকিরণ অনেকটুকুই বায়ুমন্ডলের নিচের স্তরের তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেয়। (৩) এরপর দেখা হয় পৃথিবীপৃষ্ঠ থেকে কতটুকু তাপ নির্গত হয়, এবং (৪) বাতাসের পরিচলন প্রক্রিয়ায় কতটুকু তাপ বায়ুমন্ডলে ছড়িয়ে পড়ে।

এই একমাত্রিক মডেলের প্যারামিটারের সাথে বাতাসের কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পরিবর্তনের ব্যাপারটা যোগ করে পদার্থবিজ্ঞানী স্যুকুরো মানাবে ১৯৬৭ সালে জলবায়ু পরিবর্তনের একমাত্রিক মডেলের একটি সরল পরীক্ষা বেশ সফলভাবে সম্পন্ন করেছিলেন। তিনি ভূপৃষ্ঠ থেকে চল্লিশ কিলোমিটার উঁচু একটি বায়ুস্তম্ভ ধরে এই পরীক্ষা চালিয়েছিলেন। পৃথিবীপৃষ্ঠ থেকে এই উচ্চতায় ওজোনস্তর। পৃথিবীপৃষ্ঠ থেকে যে তাপ বিকীর্ণ হয় তা এই স্তরেই শোষিত হয়ে বায়ুমন্ডলের উষ্ণতা বাড়িয়ে দেয়। স্যুকুরো মানাবে হিসেব করে দেখতে চাইলেন বাতাসে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পরিমাণের তারতম্য ঘটলে বায়ুমন্ডলের তাপমাত্রার কী পরিবর্তন ঘটে। সেই সময়ের কম্পিউটারের কয়েক শ ঘন্টা সময় লাগলো তাঁর মডেল দিয়ে পৃথিবীর বায়ুমন্ডলের তাপমাত্রার পরিবর্তন হিসেব করতে। কিন্তু হিসেবে যা দেখা গেলো তা অত্যন্ত দরকারি একটি হিসেব। বাতাসে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ যদি দ্বিগুণ হয়ে যায় – তাহলে পৃথিবীর বায়ুমন্ডলের গড় তাপমাত্রা দুই ডিগ্রি বেড়ে যাবে। ১৯৬৭ সালে মানাবে এই মডেল প্রকাশ করেন। এটা ছিল তাঁর একমাত্রিক মডেলের পরীক্ষা। পরবর্তী কয়েক বছরে তিনি তাঁর একমাত্রিক মডেলকে ত্রিমাত্রিক মডেলে রূপান্তরিত করে আরো অনেকগুলি পরীক্ষা করলেন। তাঁর ত্রিমাত্রিক মডেল প্রকাশিত হয় ১৯৭৫ সালে।

আমাদের প্রতিদিনের আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেয়ার জন্য যে মডেলটি অপরিহার্য সেটা হলো জেনারেল সার্কুলেশান মডেল বা জিসিএম। ১৯৫৬ সালে আমেরিকান পদার্থবিজ্ঞানী নরমান ফিলিপ্‌স প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্সটিটিউট ফর এডভান্সড স্টাডিজ-এ এই মডেলের সূচনা করেন। পদার্থবিজ্ঞানের মৌলিক সূত্র কাজে লাগিয়ে বায়ুমন্ডলের উপরের স্তর ও নিচের স্তরে বাতাসের গতিবেগ এবং তাপমাত্রার স্থানীয় পরিবর্তন হিসেব করা হয় এই মডেলে। ছোট ছোট ভৌগোলিক এলাকা ধরে নিয়ে সেখানে সৌরবিকিরণের পরিমাপ হিসেব করা হয় বিকিরণের সূত্র প্রয়োগ করে। বাতাসের গতিপ্রকৃতি হিসেব করার জন্য ব্যবহার করা হয় গতির সমীকরণ। তাপের বিকিরণ ও সঞ্চালন হিসেব করা হয় তাপগতিবিদ্যার সমীকরণ অনুসারে। বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিচলন হিসেব করা হয় তরল বা বায়বীয় পদার্থের ইকোয়েশান অব কন্টিনিউটি বা ধারাবাহিকতার সমীকরণ প্রয়োগে।

প্রথম জিসিএম-এর সাফল্যের পর পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের গবেষণাগারে এই মডেলকে স্থানীয়ভাবে আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেয়ার উপযোগী করে তোলা হয় নিজ নিজে দেশের আঞ্চলিক উপাত্তগুলি মডেলে প্রয়োগ করার পর। বর্তমানে কম্পিউটারের ব্যাপক শক্তিবৃদ্ধির সুযোগে এবং স্যাটেলাইটসহ অন্যান্য প্রযুক্তির সমন্বয়ে আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেয়ার মডেলগুলি এতটাই উন্নত হয়ে উঠেছে যে এখন আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনেক ক্ষেত্রেই অক্ষরে অক্ষরে ফলে যাচ্ছে।

 

তথ্যসূত্র:

১। সুকুরু মানাবে ও অ্যান্থনি ব্রকোলি, বিয়ন্ড গ্লোবাল ওয়ার্মিং হাউ নিউমেরিক্যাল মডেলস রিভিল্ড দ্য সিক্রেটস অব ক্লাইমেট চেঞ্জ’, প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটি প্রেস, ২০২০।

২। ক্যাথলিন সিয়ার্স, ওয়েদার ১০১, আদমস মিডিয়া, ২০০৮।

_________________

বিজ্ঞানচিন্তা এপ্রিল ২০২২ সংখ্যায় প্রকাশিত




Saturday, 21 May 2022

অস্ট্রেলিয়ার নির্বাচন ২০২২

 



অস্ট্রেলিয়ার ফেডারেল ইলেকশান হয়ে গেল একটু আগে। এখন ভোট গণনা শুরু হয়েছে। এ নিয়ে বেশ কয়েকটি নির্বাচনে ভোট দেয়া হয়ে গেলো এই দেশে। অস্ট্রেলিয়ার বেশির ভাগ নাগরিকের  মতোই আমারও রাজনীতির ব্যাপারে তেমন কোন আগ্রহ নেই। কিন্তু ভোট দেয়া এখানে বাধ্যতামূলক। তাই দিতে হয়। কিন্তু এদেশে নির্বাচনের ব্যাপারটা আমার কাছে খুবই খুশির ব্যাপার বলে মনে হয়। নাগরিক অধিকার বলে উচ্চকন্ঠ হতে দেখা যায় প্রায় সব দেশেই। কিন্তু নাগরিক দায়িত্বের ব্যাপারটা সেভাবে গুরুত্ব পায় না। এখানে নাগরিক দায়িত্বের ব্যাপারটাতে গুরুত্ব দেয়া হয়। এই দায়িত্ব পালন করা বাধ্যতামূলক।

এখানে ভোট দিতে গেলে যেসব ব্যাপার দেখে আমার আনন্দ লাগে সেগুলির মধ্যে আছে – ভোট কেন্দ্রের কোথাও কোন পুলিশ নেই, নির্বাচন কমিশননিযুক্ত নিরস্ত্র কর্মীরাই ভোট পরিচালনা করে, নির্বাচনী সহিংসতা নামক কোন ব্যাপার এখানে ঘটে না, ভোট দিয়েছি কি না প্রমাণ করার জন্য আঙুলে কোন কালি লাগানো হয় না –– একবার ভোট দিয়ে আরেকবার যে দিতে যাবে না সেই বিশ্বাসে নাগরিকের সততা ও দায়িত্বকে সম্মান করা হয় সবখানে, বেশিরভাগ কেন্দ্রেই কোন পরিচয়পত্রও দেখাতে হয় না; কেবল নাম-ঠিকানা বললেই হয়, এমপি পদে যে আসনে যতজন প্রার্থী হন – তাদের সবাইকেই ভোট দিতে হয় পছন্দ অনুসারে ১, ২, ৩ ইত্যাদি লিখে। অর্থাৎ প্রত্যেক প্রার্থীই ভোট পান – শুধু যিনি সবচেয়ে বেশি মানুষের প্রথম পছন্দ তিনিই জিতেন।

আর কয়েক ঘন্টা পরেই চূড়ান্ত হয়ে যাবে – বর্তমান প্রধানমন্ত্রী আবার দায়িত্বে আসবেন, নাকি লেবার পার্টি সরকার গঠন করবে। যেই করুক, অন্যদল তাকে অভিনন্দন জানিয়ে হাসিমুখে সরে যাবে।

ইন্টারন্যাশনাল বেস্ট প্র্যাকটিস বলে একটা ব্যাপার আছে। পৃথিবীর উন্নত ব্যবস্থাগুলিকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের ব্যবস্থাকে আরো উন্নত করার অবিরাম চেষ্টার নামই সত্যিকারের উন্নতি। অস্ট্রেলিয়ায় সরকারের মেয়াদ তিন বছর নির্ধারণ করা হয়েছে এজন্য যে দীর্ঘদিন দায়িত্বে থাকলে দায়িত্বে অবহেলার ভাব চলে আসে, দায়িত্বকে ক্ষমতা বলে ভাবতে শুরু করে। দুর্নীতিও হতে পারে। কম মেয়াদী হলে নির্বাচিতদের ভয় থাকে – কিছুদিন পরেই দায়িত্ব হারানোর। এদেশের রাজনীতিকরা জনগণকে সমীহ করেন, কারণ জনগণের ভোটেই আছে তাঁদের রাজনৈতিক ভবিষ্যত। এদেশে ক্ষমতার অপব্যবহার করলে, দুর্নীতি করলে – রাজনৈতিক দলগুলি তাদেরকে বহিস্কার করতে বাধ্য হয়। না হলে তাদের আবার নির্বাচিত হবার সম্ভাবনা শূন্য হয়ে যায়। দুর্নীতিবাজকে ভোটের মাধ্যমে উপড়ে ফেলার দায়িত্বটা তখন নাগরিকরাই নেয়।

আমার প্রশ্ন হলো এরকম একটা কল্যাণকর সমাজব্যবস্থা যদি অস্ট্রেলিয়া তৈরি করতে পারে, কানাডা পারে, ইওরোপের অনেক দেশ পারে – পৃথিবীর অনেকগুলি দেশ পারে না কেন?


Tuesday, 17 May 2022

নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী ভেঙ্কি রামকৃষ্ণন

 



আমাদের শরীরের মূল নক্‌শা বা ব্লু-প্রিন্ট থাকে আমাদের ডিএনএ-তে। বলা চলে শারীরিক কার্যাবলির সবকিছু নিয়ন্ত্রিত হয় মূলত ডিএনএ দ্বারা। এই ডিএনএ’র আণবিক গঠন আবিষ্কৃত হয়েছে বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি। ১৯৬২ সালে ফ্রান্সিস ক্রিক, জেম্‌স ওয়াটসন এবং মরিস উইলকিন্‌স চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন ডিএনএর গঠন আবিষ্কারের জন্য। ডিএনএর গঠন আবিষ্কারের পর জীবের শারীরবৃত্তিক কাজকর্মের গতিপ্রকৃতি নিঁখুতভাবে জানার অনেকগুলি পথ খুলে গেল।

শরীরের তথ্যনির্দেশ জমা থাকে জিনে। এই তথ্যনির্দেশ কার্যকর করার জন্য তথ্যগুলি কপি করে কোষের বাইরের অংশে পাঠানো হয়। সেখানে এগুলি প্রয়োজনীয় প্রোটিন তৈরির নির্দেশ দেয়। মূলত বিভিন্ন ধরনের প্রোটিন মিলে আমাদের শারীরিক কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ করে। এই তথ্য কপি করার ব্যাপারটাকে বলা হয় ট্রান্সক্রিপশান। ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জীবকোষ থেকে শুরু করে অতিকায়  ডায়নোসর – সব রকমের জীবনের জন্যই এই ট্রান্সক্রিপশান অপরিহার্য। ট্রান্সক্রিপশান বা তথ্যনির্দেশ যদি কোষের বাইরে আসতে না পারে বা কপি করা না হয়, তাহলে কোষগুলি বুঝতে পারে না কী করতে হবে। ফলে দেহের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে জীবকোষের মৃত্যু হয়। এই ট্রান্সক্রিপশানের সময় যদি কোন গন্ডগোল হয়, তবে কোষগুলির বাইরে ভুল তথ্যনির্দেশ চলে আসে। ফলে নানারকম রোগের উৎপত্তি হতে পারে, বিশেষ করে কোষঘটিত রোগ – যেমন ক্যান্সার।

এই ট্রান্সমিশান কীভাবে ঘটে তার পারমাণবিক পর্যায়ের নিখুঁত পদ্ধতি আবিষ্কার করে ২০০৬ সালে রসায়নে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন বিজ্ঞানী রজার কর্নবার্গ। ডিএনএর পাশাপাশি আমরা জেনেছি আরএনএর কথা। ডিএনএ-তে যেমন সিঁড়ির মতো পাশাপাশি দুটো স্ট্র্যান্ড থাকে, আরএনএতে থাকে একটি স্ট্র্যান্ড। প্রধানত তিন ধরনের আরএনএ পাওয়া যায় – ম্যাসেঞ্জার আরএনএ (এমআরএনএ), রাইবোজোমাল আরএনএ (আরআরএনএ), এবং ট্রান্সফার আরএনএ (টিআরএনএ)। রজার কর্নবার্গ আবিষ্কার করেছিলেন ডিএনএর তথ্যনির্দেশ কীভাবে এমআরএনএ-তে যায় যেখান থেকে কোষগুলি দরকারি প্রোটিন তৈরির নির্দেশ পায়।

তখনো পর্যন্ত আরআরএনএগুলি কীভাবে কাজ করে – অর্থাৎ রাইবোজোমের আণবিক গঠন নিঁখুতভাবে জানা সম্ভব হয়নি। রাইবোজোমকে বলা হয় জীবকোষের প্রোটিন তৈরির কারখানা। এই রাইবোজোমের কার্যপদ্ধতি হলো কোষের কাজগুলির মধ্যে সবচেয়ে জটিল কাজ। রাইবোজোম এই জটিল কাজগুলি কীভাবে করে তা আবিষ্কার করেছেন যে তিনজন বিজ্ঞানী – তাঁদের একজন হলেন ভেঙ্কটরামন রামকৃষ্ণন – যাকে পরিচিতরা সবাই ভেঙ্কি বলে ডাকেন।

রাইবোজোমের কার্যপ্রণালী আবিষ্কার করার জন্য ২০০৯ সালে রসায়নে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন অ্যাডা ইওনাথ, থমাস স্টিজ এবং ভেঙ্কটরামন রামকৃষ্ণন। তাঁদের আবিষ্কারের ফলেই শরীরের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম কাজকর্মের অনেক অজানা জটিল রহস্য উন্মোচিত হয়েছে। আমরা এখন জানি কীভাবে ডিএনএ/আরএনএ থেকে প্রোটিন তৈরির নির্দেশ আসে, এবং রাইবোজোম কীভাবে যথাসময়ে যথামাত্রায় যথাযথ প্রোটিন তৈরি করে। একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে আবিষ্কৃত এসব তথ্য কাজে লাগিয়ে তৈরি করা সম্ভব হয়েছে অনেক নতুন অ্যান্টি-বায়োটিক। সাম্প্রতিক করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে অতিদ্রুত ভ্যাক্সিন তৈরি করা সম্ভব হয়েছে রাইবোজোমের কাজকর্ম ভালোভাবে জানা ছিল বলেই।

পারমাণবিক পর্যায়ে গেলে পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, জীববিজ্ঞান – বিজ্ঞানের এরকম শাখাপ্রশাখার মধ্যে খুব বেশি বিভেদ থাকে না। রসায়নে নোবেলজয়ী এই বিজ্ঞানী ভেঙ্কি রামকৃষ্ণন ছিলেন তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞানী। পদার্থবিজ্ঞানে পিএইচডি করার পর তিনি জীববিজ্ঞানে গবেষণা শুরু করেছিলেন। সেখান থেকেই তিনি সাফল্যের চূড়ায় উঠেছেন, নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন। শুধু তাই নয়, তিনিই ছিলেন রয়েল সোসাইটির সাড়ে তিন শ বছরের ইতিহাসে প্রথম অশ্বেতাঙ্গ প্রেসিডেন্ট। 

বিজ্ঞানীদের সবচেয়ে বনেদী আর গৌরবজনক সংগঠন হলো লন্ডনের রয়েল সোসাইটি। ১৬৬২ সালে প্রতিষ্ঠিত এই সংগঠনের ফেলোশিপ পাওয়াটা বিজ্ঞানীদের জন্য খুবই গৌরবজনক ব্যাপার। স্যার আইজাক নিউটন, স্যার হামফ্রে ড্যাভি, থমাস হাক্সলি, লর্ড কেলভিন, লর্ড রেলে, আর্নেস্ট রাদারফোর্ড, উইলিয়াম ব্র্যাগ, প্যাট্রিক ব্ল্যাকেট প্রমুখ বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী যারা রয়েল সোসাইটির প্রেসিডেন্ট মনোনীত হয়েছিলেন, তাঁদের পাশে রয়েল সোসাইটির এপর্যন্ত একমাত্র প্রেসিডেন্ট স্যার ভেঙ্কটরামন রামকৃষ্ণন যার জন্ম আমাদের উপমহাদেশে।

ভেঙ্কটরামন রামকৃষ্ণন - ভেঙ্কির জন্ম তামিলনাড়ুর চিদাম্বরমে ১৯৫২ সালে। তাঁর বাবা সিভি রামকৃষ্ণন এবং মা রাজলক্ষ্মী – দু’জনই ছিলেন জীববিজ্ঞানের অধ্যাপক। ছোটবেলা থেকেই বিজ্ঞানের পরিমন্ডলে বড় হয়েছেন ভেঙ্কি। তাঁর জন্মের সময় তার বাবা আমেরিকার উইসকনসিনে পোস্টডক্টরেট গবেষণা করছিলেন। আর্থিক সামর্থ্যের অভাবে তিনি সন্তানসম্ভবা স্ত্রীকে তামিলনাড়ুতে রেখে গিয়েছিলেন। রাজলক্ষ্মীকে সাথে নিয়ে গেলে ভেঙ্কি জন্মসূত্রে আমেরিকান হতে পারতেন। বাবা পোস্টডক্টরেট করে ফিরে আসার পর মা গেলেন কানাডায় পিএইচডি করার জন্য। তখন বাবাও সাথে গেলেন দেড় বছরের ভেঙ্কিকে নানা-নানীর জিম্মায় রেখে। ফিরে আসার পর তারা চিদাম্বরম থেকে বরোদায় চলে গেলেন সেখানকার বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিয়ে।

বরোদায় ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলে লেখাপড়া শুরু হলো ভেঙ্কির। ১৯৫৯ সালে ভেঙ্কির ছোটবোন ললিতার জন্ম হয়। ১৯৬০-৬১ সালে বাবা-মায়ের অস্ট্রেলিয়ায় ফেলোশিপ নিয়ে আসার সুবাদে এক বছর অস্ট্রেলিয়ার এডেলেইডের স্কুলে পড়াশোনা করে ভেঙ্কি। আবার ভারতে ফিরে গিয়ে স্কুলের পড়াশোনা শেষ করলো। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে কী নিয়ে পড়াশোনা করবে স্থির করতে পারছিলেন না ভেঙ্কি। তাঁর বাবা চাচ্ছিলেন ছেলে ডাক্তার হোক। ডাক্তারিতে ভর্তির জন্য প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় টিকেছিল ভেঙ্কি। ইঞ্জিনিয়ারিং-এর চরম প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় টিকে আই-আই-টিতে ভর্তির জন্য মনোনীত হয়েছিলেন তিনি। কিন্তু মেডিকেল কলেজে পড়াশোনাটাকে খুব একটা আকর্ষণীয় মনে হলো না ভেঙ্কির কাছে- কারণ সেখানে অনেক জিনিস মুখস্থ করতে হয়। তাঁর কাছে মৌলিক বিজ্ঞানের পড়াশোনাকেই অনেক বেশি আকর্ষণীয় মনে হলো। সেইসময় মৌলিক বিজ্ঞানে পড়াশোনায় উৎসাহিত করার জন্য ভারত সরকার একটা আকর্ষণীয় বৃত্তি দিচ্ছিলো মেধাবী শিক্ষার্থীদের। ভেঙ্কি সেই বৃত্তি নিয়ে বরোদা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হলেন বিএসসি কোর্সে।

বিএসসি পাস করার পর তিনি আমেরিকার ওহাইও ইউনিভার্সিটিতে পদার্থবিজ্ঞানে পিএইচডি গবেষণা শুরু করলেন। দুই বছর কোর্সওয়ার্ক করার পর  অধ্যাপক তমোইয়াসু তানাকার তত্ত্বাবধানে সলিড-স্টেট ফিজিক্সের তত্ত্বীয় গবেষণা শুরু করলেন। কিন্তু গবেষণা শুরুর কিছুদিন পরেই মনে হলো তিনি ভুল বিষয়ে ভর্তি হয়েছেন। সায়েন্টিফিক আমেরিকানে জীববিজ্ঞানের নিত্যনতুন আবিষ্কারের কাহিনি পড়তে পড়তে ভেঙ্কির মনে হলো পদার্থবিজ্ঞানের আবিষ্কার হচ্ছে শামুকের গতিতে, কিন্তু জীববিজ্ঞানের নতুন নতুন আবিষ্কার হচ্ছে ব্যাঙের মতো লাফিয়ে লাফিয়ে। পদার্থবিজ্ঞানে কোন উত্তেজনাই পাচ্ছেন না তিনি। তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞানের দীর্ঘ জটিল সমীকরণ ও গাণিতিক হিসেবে তিনি কোন আনন্দ পাচ্ছিলেন না। কিন্তু অন্য কোন বিষয়ে যে চলে যাবেন সেই সুযোগও নেই। এই বিষয়ে তিন বছরের বেশি সময় ব্যয় করেছেন তিনি। যে জীববিজ্ঞানকে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার সময় অযৌক্তিক মুখস্থ করার বিষয় বলে মনে করেছিলেন, এখন মনে হচ্ছে সেখানেই আছে অনেক বেশি উত্তেজনার খোরাক।

গবেষণায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলার পর ভেঙ্কি পড়াশোনা বাদ দিয়ে হাইকিং করতে লাগলেন, গান শুনতে লাগলেন, দাবা খেলতে শুরু করলেন। ইচ্ছেমতো ঘুরে বেড়ানোর সময় তাঁর সাথে পরিচয় হলো ভেরা রোজেনবারির সাথে। ভেরা ফাইন আর্টসের ছাত্রী। পেইন্টিংস নিয়ে পড়াশোনা করছিলেন। সত্তরের দশকের শুরুতে ওহাইও বিশ্ববিদ্যালয়ে খুব বেশি নিরামিষভোজী ছিল না। ভেরা ছিলেন নিরামিষাশী, ভেঙ্কিও। তাঁদের মধ্যে বন্ধুত্ব হয়ে গেল। ক্রমে বন্ধুত্ব থেকে প্রেম। ভেরা ছিলেন ডিভোর্সি। তাঁর পাঁচ বছর বয়সী একটা মেয়েও আছে। ১৯৭৫ সালে তেইশ বছর বয়সী ভেঙ্কি তাঁর চেয়ে বয়সে বড় ভেরাকে বিয়ে করে ঘরসংসার শুরু করলেন। ভেঙ্কির পিএইচডি তখনো শেষ হয়নি। কোন উপার্জন নেই। ভেরা নিজের পড়াশোনার পাশাপাশি ছোটদের জন্য বই লিখতে শুরু করলেন। তাঁর ভেরা সিরিজের বইগুলি শিশুরা খুবই পছন্দ করে।

ঘরসংসার, স্ত্রী এবং সৎকন্যার দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে তিনি ইচ্ছের বিরুদ্ধেই পদার্থবিজ্ঞানে পিএইচডি শেষ করলেন। সেই সময় তাঁদের সন্তান রামনের জন্ম হয়। তিনি জীববিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করার ব্যাপারে মনস্থির করে ফেললেন। জীববিজ্ঞানের যেসব খুঁটিনাটি ব্যাপার নিয়ে তিনি জানতে আগ্রহী, তারজন্য সবচেয়ে ভালো হয় যদি ডাক্তারিতে ভর্তি হতে পারেন। ভারতে ডাক্তারি পড়ার সুযোগ পেয়েও পড়েননি। এখন আমেরিকায় পিএইচডি শেষ করার পর ডাক্তারি পড়ার জন্য ভর্তি পরীক্ষা দিলেন। এম-ক্যাটে অনেক ভালো ফলাফল করার পরেও তিনি কোন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডাক পেলেন না। ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয় মৌখিক সাক্ষাৎকারের জন্য ডেকেছিল। কিন্তু ভেঙ্কি যখন বললেন যে তিনি ডাক্তারি করবেন না, শুধুমাত্র শরীরের বিজ্ঞান সম্পর্কে ভালোভাবে জানার জন্য ডাক্তারি পড়তে চান, তাকে ভর্তি হবার সুযোগ দেয়া হলো না।

ডাক্তারিতে ভর্তি হতে ব্যর্থ হয়ে তিনি জীববিজ্ঞানে পিএইচডি করার জন্য দরখাস্ত করতে শুরু করলেন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিন্তু বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ই ফিজিক্সে পিএইচডি করা একজনকে আরেকটি পিএইচডি করার জন্য অনুমতি দিলো না। মাত্র তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় তাকে পিএইচডি কোর্সে ভর্তির অফার দিলো। তিনি ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া সান দিয়েগোতে ভর্তি হলেন। জীববিজ্ঞানের গবেষণার কোন নিয়মকানুন তিনি জানতেন না। সবকিছু একেবারে গোড়া থেকে শিখতে শুরু করলেন। পরের বছর গবেষণাগারে কীভাবে গবেষণা করতে হয় তা শিখে ফেলার পর তাঁর মনে হলো এবার তাঁর পিএইচডি থিসিস লেখার কোন দরকার নেই। তিনি সরাসরি জীববিজ্ঞানের গবেষণাই শুরু করতে পারেন।

ইয়েল ইউনিভার্সিটিতে অধ্যাপক পিটার মুরের সাথে রাইবোজোম সংক্রান্ত গবেষণা করার জন্য পোস্টডক্টরেট শুরু করলেন। বছরখানেক পোস্টডক গবেষণার পর তাঁর একটা স্থায়ী পদের দরকার হলো। কিন্তু পঞ্চাশটির অধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে দরখাস্ত করার পরেও কোন সাড়া পেলেন না। পদার্থবিজ্ঞান থেকে পিএইচডি করে জীববিজ্ঞানে গবেষণা করছেন এরকম কাউকে নিয়োগ দেবার ব্যাপারে কোন বিশ্ববিদ্যালয়ই খুব একটা আগ্রহী হলো না। শুধুমাত্র ওক রিজ ন্যাশনাল ল্যাবে একটি টেকনিশিয়ানের পদ পাওয়া গেল। সেখানে যোগ দিয়ে দেখলেন স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ খুব বেশি নেই সেখানে। কিছুদিন পরেই তাঁকে আবার চাকরি খোঁজায় মন দিতে হলো। ইয়েলে নিউট্রন স্ক্যাটারিং-এর মাধ্যমে রাইবোজোম সংক্রান্ত গবেষণা করছিলেন তিনি। সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ব্রুকহ্যাভেন ন্যাশনাল ল্যাবে তাঁর চাকরি হলো। ব্রুকহ্যাভেনে তিনি গবেষণার স্বাধীনতা পেলেন। রাইবোজোম সংক্রান্ত গবেষণার ফলাফলও পেতে শুরু করলো।

ব্রুকহ্যাভেনে স্থায়ী গবেষক পদে নিয়োগ পেলেন তিনি। পদার্থবিজ্ঞানের এক্স-রে ক্রিস্টালোগ্রাফির প্রয়োগে রাইবোজোমের আণবিক গঠন সম্পর্কে অনেক নতুন ফলাফল পাওয়া গেল। ভেঙ্কি এই ব্যাপারে আরো গভীরভাবে জানার জন্য তিনি ব্রুকহ্যাভেন থেকে ছুটি নিয়ে ১৯৯১ সালে ইংল্যান্ডের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের মলিকিউলার বায়োলজি ল্যাবে গেলেন। সেখানে তিনি বিজ্ঞানী জন ফিঞ্চের তত্ত্বাবধানে কাজ শুরু করলেন। এক বছর সেখানে গবেষণা করে তিনি রাইবোজোমাল প্রোটিনের ক্রিস্টালোগ্রাফির অনেক নতুন কিছু শিখলেন। ব্রুকহ্যাভেনে ফিরে তিনি শুধুমাত্র ক্রিস্টালোগ্রাফি ও রাইবোজোম নিয়ে গবেষণা করতে চাইলেন। কিন্তু আকাঙ্খিত স্বাধীনতা পেলেন না। তিনি অন্য জায়গায় চলে যাবার সিদ্ধান্ত নিলেন।

ভেঙ্কি যোগ দিলেন উটাহ্‌ ইউনিভার্সিটির বায়োকেমিস্ট্রি ডিপার্টমেন্টে। সেখানেই তিনি রাইবোজোমের বেশ কয়েকটি প্রোটিনের গঠন আবিষ্কার করলেন। তিনি দেখলেন এ কাজে প্রচুর ফান্ডিং দরকার। উটাহ বিশ্ববিদ্যালয়ে সেটা অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা ক্ষীণ। ভবিষ্যত চিন্তা করে তিনি ইংল্যান্ডের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করার সিদ্ধান্ত নিলেন। আমেরিকান ভেঙ্কি চলে এলেন ইংল্যান্ডে। সেখানেই তিনি রাইবোজোমের সাবইউনিট 30S এর আণবিক গঠন নির্ণয়ের মূল গবেষণা শুরু করেন।

সেই সময় একই বিষয়ে ইসরায়েলে গবেষণা করছিলেন অ্যাডা ইয়োনাথ। এক ধরনের প্রতিযোগিতা শুরু হলো ভেঙ্কি ও অ্যাডার মধ্যে। ভেঙ্কি ক্রিস্টালোগ্রাফির সবচেয়ে সূক্ষ্ম পরীক্ষা করার জন্য চলে গেলেন আমেরিকার আর্গন ন্যাশনাল ল্যাবের এডভান্সড ফোটন সোর্স ফ্যাসিলিটিতে। ভেঙ্কি তাঁর গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করলেন ২০০০ সালে। এই কাজের জন্য ২০০৯ সালের রসায়নে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন ভেঙ্কি। রাইবোজোমের আণবিক গঠন আবিষ্কারের জন্য ভেঙ্কির সাথে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন অ্যাডা ইয়োনাথ এবং ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্ট্রাকচারাল বায়োলজিস্ট থমাস স্টিজ।

এপর্যন্ত মাত্র পাঁচজন বিজ্ঞানী নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন আমাদের উপমহাদেশ থেকে। সিভি রামন, হরগোবিন্দ খোরানা, আবদুস সালাম, চন্দ্রশেখর সুব্রাহ্মনিয়ানের পর  ভেঙ্কি রামকৃষ্ণন। ভেঙ্কির আবিষ্কারের প্রয়োগ সুদুরপ্রসারী। তাঁর আবিষ্কারের ফলে এখন আরো অনেক শক্তিশালী এবং কার্যকর অ্যান্টিবায়োটিক তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে।

ভেঙ্কি রামকৃষ্ণনকে ব্রিটিশ নাগরিকত্বও দেয়া হয়। ব্রিটিশ সরকার তাঁকে নাইট উপাধি দেয় ২০১২ সালে। যদিও ভেঙ্কি কখনো ‘স্যার’ উপাধি ব্যবহার করেননি। ২০১০ সালে তাঁকে ভারত সরকার পদ্মবিভূষণ উপাধিতে সম্মানিত করে। ২০১৫ সালে ভেঙ্কি রয়েল সোসাইটির প্রেসিডেন্ট মনোনীত হন। ২০২০ সাল পর্যন্ত তিনি সম্মানের সাথে এই দায়িত্ব পালন করেন। করোনা মহামারির সময়ে কোভিড ভ্যাক্সিন উদ্ভাবন ও উদ্বুদ্ধকরণে ভেঙ্কি রামকৃষ্ণন উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন।

তথ্যসূত্র:

ভেঙ্কটরামন রামকৃষ্ণন, ফ্রম চিদাম্বরম টু কেমব্রিজ – এ লাইফ ইন সায়েন্স ২০০৯; পিএনএএস সেপ্টেম্বর ২০, ২০১১।

_______________

বিজ্ঞানচিন্তা মার্চ ২০২২ সংখ্যায় প্রকাশিত







চেতন ভগতের 400 Days

 



ইংরেজি ভাষায় যে ক’জন ভারতীয় লেখক উপন্যাস লিখে জনপ্রিয়তা পেয়েছেন – চেতন ভগত তাঁদের অন্যতম। শুধুমাত্র অন্যতম বললে কম বলা হবে, চেতন ভগতের লেখা সবগুলি উপন্যাস খুবই পাঠকপ্রিয় হয়েছে। কোন্‌ বই কতটা ভালো লেগেছে পাঠকের – তা বিচারের প্রধান মাপকাঠি হলো সেই বইয়ের কত কপি বিক্রি হয়েছে। চেতন ভগতের প্রতিটি বই বিক্রি হয় দশ লক্ষ কপিরও বেশি। সে তো গেলো মূল ইংরেজিতে। অন্যান্য ভাষাতেও তাঁর বইয়ের বৈধ-অবৈধ অনেক অনুবাদ হচ্ছে। বৈধ অনুবাদ হচ্ছে মূল লেখক এবং/অথবা মূল প্রকাশকের অনুমোদিত অনুবাদ, আর অবৈধ অনুবাদ হচ্ছে – যে অনুবাদের কথা লেখক/প্রকাশক জানেনও না।

চেতন ভগতের লেখা কেন এত মানুষের ভালো লাগছে? তাঁর লেখার সাহিত্যমূল্য কোন স্তরের? এই প্রশ্নের উত্তর দেয়া সহজ নয়। কারণ গল্প-উপন্যাসের মান বিচার করার ব্যাপারটা বস্তুনিষ্ঠ নয়। একেকজনের ভালো লাগার কারণ একেক রকম। নোবেল পুরষ্কার প্রাপ্ত সাহিত্যিকের লেখাও যে সবার ভালো লাগবে তার কোন নিশ্চয়তা নেই।

আর কে নারায়ণের প্রত্যেকটি উপন্যাস কালোত্তীর্ণ, কিন্তু সেভাবে জনপ্রিয় নয়। জনপ্রিয় হবার উপাদান চেতন ভগত খুব ভালো করেই জানেন কীভাবে পাঠকপ্রিয় হওয়া যায়। তাঁর লেখার ভাষা, ঘটনার বর্ণনা, সংলাপ পড়ার সময় মনে হয় বই নয়, সিনেমা পড়ছি। সিনেমার বিজ্ঞাপনের মতো করেই তিনি তাঁর বই প্রকাশের আগে বইয়ের বিজ্ঞাপন প্রচার করেন।

চেতন ভগতের সবগুলি বই থেকেই সিনেমা তৈরি হয়েছে এবং হচ্ছে। তিনি নিজেও সিনেমার চিত্রনাট্য লেখেন। তাঁর প্রথম বই Five Point Someone অবলম্বনে আমির খানের বিখ্যাত সিনেমা Three Idiots তৈরি হলেও সেই সিনেমাতে চেতন ভগতকে সেভাবে স্বীকৃতি দেয়া হয়নি। তারপর থেকে তিনি অনেক বেশি সতর্ক। নিজে সরাসরি যুক্ত থাকেন চিত্রনাট্য তৈরিতে।

তার উপন্যাসগুলির লক্ষ্য থাকে ইংরেজিপড়ুয়া তরুণ উচ্চমধ্যবিত্ত এবং উচ্চবিত্ত পাঠকদের মন জয় করা। আধুনিক প্রেম, যৌনতা, এবং ভারতীয় তরুণরা যেসব  সমস্যার সামনে প্রায় প্রতিদিন পড়ে – সেগুলিকেই তুলে আনেন কাহিনি-বিন্যাসে, বর্ণনায় এবং সংলাপে।

তাঁর সাম্প্রতিক বইগুলি সরাসরি থ্রিলার। The girl in room 105, One arranged murder, এবং 400 days  - রোমাঞ্চকর থ্রিলার গোত্রের। কেশব আর সৌরভ – দুই বন্ধু – গোয়েন্দা। অপেশাদার গোয়েন্দা। এদেরকে দিয়েই জটিল রহস্যের সমাধান করিয়ে নিচ্ছেন চেতন ভগত। কেশবের জবানীতেই ঘটনা এগোয়।

400 days এর কাহিনি আবর্তিত হয়েছে একটি বারো বছরের মেয়ের অপহরণের ঘটনাকে কেন্দ্র করে। দাদাবাড়ির নিরাপদ বাড়ি থেকে রাতের বেলা উধাও হয়ে যায় আলিয়া-মনীশ দম্পতির বারো বছর বয়সী কন্যা সিয়া। রাতের বেলা নিজের ছোট বোন সুহানা আর চাচাতো ভাইদের সাথে এক রুমে ঘুমিয়েছিল সিয়া। কিন্তু সকালে দেখা গেলো সিয়া উধাও। কেউ জানে না সে কোথায়। কেবল সুহানা বললো রাতে কেউ একজন এসে ছুরি দেখিয়ে সিয়াকে নিয়ে গেছে। সুহানার বয়স মাত্র পাঁচ। সে ঘুমের ঘোরে কী দেখেছে ঠিকমতো বলতেও পারে না। আলিয়া-মনীশ অত্যন্ত ধনী ব্যবসায়ী। টাকা-পয়সা প্রভাব-প্রতিপত্তির অভাব নেই। কিন্তু পুলিশ-গোয়েন্দা কেউই কিছু করতে পারলো না। ধরে নেয়া হয় যে সিয়াকে মেরে ফেলা হয়েছে। সবাই হাল ছেড়ে দিলেও সিয়ার মা আলিয়া হাল ছেড়ে দেয় না। আলিয়া মেয়ের খোঁজ করার জন্য কেশব আর সৌরভের সাহায্য চায়। মূলত কেশবেরই সাহায্য চায়। কেশব সৌরভকেও কাজে লাগায়।

প্রচলিত গোয়েন্দা-কাহিনীর চেয়ে চেতন ভগতের স্টাইল কিছুটা ভিন্ন। এখানে আলিয়া ও মনীশের প্রেম-কাহিনীর বিশদ বিবরণ আছে। আবার কেশব আর আলিয়াও পরস্পর প্রেমে পড়ে যায়। এই প্রেম ভারতীয় রক্ষণশীল টাইপের প্রেম নয়। উদ্দাম ইওরোপিয়ান স্টাইলের প্রেম – যেখানে মনের সাথে, অনেকটা মনের আগেও শরীর এগোয়। শরীরের ব্যাপারে কোন ধরনের জড়তা দেখা যায় না চেতন ভগতের নায়ক-নায়িকাদের। সে রক্ষণশীল মধ্যবিত্ত সতেরো বছরের মেয়ে আলিয়া হোক – কিংবা ত্রিশ বছরের গৃহবধূ আলিয়া হোক।

তবে এখানেও আছে প্রচলিত পদ্ধতি – কেউই সন্দেহের উর্ধ্বে নয়, আবার শেষপর্যন্ত দেখা যায় – যার দিকে সন্দেহের তীর কম ছোড়া হয়েছে সে-ই দোষী। তবে ভারতীয় পুলিশকে যেরকম অদক্ষ প্রমাণ করা হয়েছে – জানি না এত বাস্তব সমস্যার সমাধান তারা কীভাবে করেন।

চেতন ভগতের লেখা পাঠককে টেনে রাখে এটাই সবচেয়ে বড় গুণ তাঁর লেখার। আর কোন নতুন কারণ খুঁজে পাচ্ছি না। 400 Days স্বতন্ত্র কিছু নয়, রহস্যও আহামরি রকমের কোন বৈশিষ্ট্যপূর্ণ নয়। কিন্তু তাঁর ভাষা চমৎকার। অহেতুক বর্ণনার বাহুল্য নেই। সেন্স অব হিউমার অসাধারণ।

কিন্তু গল্পের বিচার করলে বলতে হয় - আজকাল ভালো গোয়েন্দা গল্পের অভাব দেখা দিয়েছে, নাকি গোয়েন্দাগল্প বেশি পড়ার কুফল বুঝতে পারছি না। 



Wednesday, 11 May 2022

মন্ত্রীত্ব এবং সারমেয় সমাচার

 


আচ্ছা, আপনি কাসুন্দি চিনেন? খেয়েছেন কখনো? আমি খাইনি, চিনিও না। বাংলা একাডেমির ব্যবহারিক বাংলা অভিধানে দেখলাম কাসুন্দি হলো সরিষার তৈরি আচার বিশেষ। কাসুন্দি পুরনো হলে কী হয়? ঝাঁজ কমে যায়? নাকি স্বাদ চলে যায়? নিশ্চয় কিছু একটা হয়, নইলে পুরনো কাসুন্দির কথা আসতো কোত্থেকে। পুরনো কাসুন্দি বলতে কী বোঝায় তা আমরা জানি।

তাহলে একটু পুরনো কাসুন্দি ঘাঁটা যাক। পাঁচ-ছয় বছরের পুরনো কথা। অস্ট্রেলিয়া দেশের ভিক্টোরিয়া রাজ্যের প্রভাবশালী মন্ত্রী ছিলেন স্টিভ হারবার্ট। ট্রেনিং অ্যান্ড স্কিলস মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব ছিল তাঁর। বড়ই সুখে-শান্তিতে-মন্ত্রীত্বে দিন কাটছিলো তাঁর। কিন্তু একদিন তাঁর মন্ত্রীত্ব চলে গেল। কী অপরাধ? তিনি তাঁর সরকারি গাড়িতে তাঁর দুটো পোষা কুকুরকে চড়িয়েছেন। জি, এটাই অপরাধ। আপনি হাসছেন? সে আপনি হাসতে পারেন, কিন্তু অস্ট্রেলিয়ানদের কাছে এই ব্যাপারটি হাস্যকর ছিল না মোটেও। তারা বিশ্বাস করে মন্ত্রীদের সরকারি গাড়ি দেয়া হয় সরকারি কাজে ব্যবহারের জন্য। নিজের পরিবারের লোকজন কিংবা পোষা সারমেয়কে চড়াবার জন্য নয়।


এই কুকুরদুটোকে গাড়িতে চড়াবার কারণেই স্টিভ হারবার্টের মন্ত্রীত্ব চলে যায়



সাংবাদিকরা এই খবর হৈ হৈ করে প্রচার করলো। বিরোধীদল সংসদে ঝড় তুললো এই ইস্যুতে। মন্ত্রীর বাড়ি হলো পার্কডেলে। সেখান থেকে ট্রেনথাম-এ তার ছুটি কাটানোর বাড়ির দূরত্ব প্রায় এক শ কিলোমিটার। এই এক শ কিলোমিটার ভ্রমণের জন্য সারমেয়দের পেছনে জনগণের ট্যাক্সের পয়সা খরচ হয়েছে ১৯২ ডলার ৮০ সেন্ট। মন্ত্রী সেই পরিমাণ ডলার নিজের পকেট থেকে সরকারি কোষাগারে জমা দিয়ে অসংখ্যবার ক্ষমা চাওয়ার পরেও ক্ষমা পাননি। তাঁকে পদত্যাগ করতে হয়েছে। কারণ তিনি সরকারি সম্পদের অপব্যবহার করেছেন।

মন্ত্রী বললেই আমরা যেরকম এলাহী ব্যাপার, অফুরন্ত ক্ষমতা বলে মনে করি – অস্ট্রেলিয়ার মন্ত্রীদের কিংবা তাঁদের আত্মীয়স্বজনের সেই সুখ নেই। ক্ষমতার আসল মজা তো তার অবৈধ ব্যবহারে। ক্ষমতার অপব্যবহারই যদি করা না যায়, তাহলে ক্ষমতার আর মূল্য কী??

এই পুরনো কাসুন্দির সাথে অন্য কোন দেশের মন্ত্রীর কিংবা তাদের স্ত্রীর কিংবা তাদের আত্মীয়স্বজনের কিংবা তাদের সারমেয়দের পুরনো কিংবা নতুন কোন কাসুন্দিরই কোন সম্পর্ক নেই।

অস্ট্রেলিয়ান সংবাদপত্রে প্রকাশিত লিংক:

দ্য এজ



Latest Post

Emmy Noether: A Mathematician of the Einstein Era

  Amalie Emmy Noether was one of the most original mathematicians of the twentieth century. Her research had a profound influence on both pu...

Popular Posts