Friday, 19 October 2018

সুব্রাহ্মনিয়ান চন্দ্রশেখর - নভোপদার্থবিজ্ঞানের নক্ষত্র



বিগব্যাং থেকে বিশ্বব্রহ্মান্ড সৃষ্টি হবার পর মহাবিশ্বে প্রতি মুহূর্তে ঘটে চলেছে অসংখ্য মহাজাগতিক ঘটনা। লক্ষ কোটি গ্যালাক্সির নক্ষত্রপুঞ্জ জ্বলতে জ্বলতে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে- পাশাপাশি সৃষ্টি হচ্ছে অসংখ্য ব্ল্যাকহোল বা কৃষ্ণ গহ্বর। এসব ঘটনা পৃথিবী থেকে এত দূরে ঘটে যে ওখানকার আলো পৃথিবীতে এসে পৌঁছাতে কখনো কখনো কোটি বছর লেগে যায়। কিন্তু পৃথিবীর বিজ্ঞানীরা হিসেব করে বের করে ফেলেছেন নক্ষত্রের জন্ম-মৃত্যুর নাড়ি-নক্ষত্র। শুধু তাত্ত্বিক ভিত্তি নিয়ে সন্তুষ্ট থাকা বিজ্ঞানের ধর্ম নয়। মহাকাশে ঠিক কী ঘটছে তা সরাসরি দেখার জন্য বিজ্ঞানীরা প্রচন্ড শক্তিশালী যান্ত্রিক-চোখ - ‘অবজারভেটরি’ তৈরি করে নভোযানের মাধ্যমে স্থাপন করেছেন মহাকাশে। তড়িৎচৌম্বক তরঙ্গের দৃশ্যমান তরঙ্গদৈর্ঘ্যের কম বা বেশি তরঙ্গদৈর্ঘ্যের ঘটনা আমরা দেখতে পাই না। কিন্তু মহাকাশের বেশির ভাগ ঘটনাই ঘটে অদৃশ্য আলোক তরঙ্গে। তাই তড়িৎচৌম্বক তরঙ্গের দৃশ্যমান, গামা-রে, এক্স-রে এবং ইনফ্রারেড-রে এই চার ধরনের তরঙ্গদৈর্ঘ্য শনাক্ত করার জন্য ‘ন্যাশনাল এরোনটিক্‌স এণ্ড স্পেস এডমিনিস্ট্রেশান’ বা নাসা চারটি বড় বড় অবজারভেটরি মহাকাশে স্থাপন করেছে। এদের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী অবজারভেটরি যা পৃথিবীপৃষ্ঠ থেকে প্রায় এক লক্ষ চল্লিশ হাজার কিলোমিটার দূরে মহাকাশে ভেসে ভেসে মহাজাগতিক ঘটনাবলী পর্যবেক্ষণ করছে তার নাম ‘চন্দ্র এক্স-রে অবজারভেটরি’। যাঁর নাম অনুসারে এই অবজারভেটরির নাম ‘চন্দ্র’ রাখা হয়েছে তিনি নভোপদার্থবিজ্ঞানী সুব্রাহ্মনিয়ান চন্দ্রশেখর - বিজ্ঞানী মহলে যিনি ‘চন্দ্র’ নামে পরিচিত। ১৯৯৮ সালে নাসা নতুন এক্স-রে অবজারভেটরির জন্য নাম আহ্বান করে সারা পৃথিবীর বিজ্ঞান শিক্ষার্থী ও বিজ্ঞানীদের কাছ থেকে। প্রায় ছয় হাজার মানুষ চিঠি লিখে নাম পাঠান। এর মধ্যে বেশির ভাগই বিজ্ঞানী চন্দ্রশেখরের নাম প্রস্তাব করেন। ১৯৯৮ সালের ২১ ডিসেম্বর নাসা’র সংবাদ সম্মেলনে ঘোষণা করা হয় এক্স-রে অবজারভেটরির নাম ‘চন্দ্র’। অবজারভেটরি সেন্টারের পরিচালক হার্ভি ট্যানানবাম বলেন, “বিশ্বব্রহ্মান্ডকে বোঝার জন্য সারাজীবন নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন চন্দ্রশেখর” [1]। গ্রেট ব্রিটেনের অ্যাস্ট্রোনোমার জেনারেল মার্টিন রীজের মতে - আইনস্টাইনের পর চন্দ্রই একমাত্র ব্যক্তি যিনি মহাবিশ্ব নিয়ে এত দীর্ঘসময় ধরে এবং এত গভীরভাবে ভেবেছেন। পদার্থবিজ্ঞানী ফ্রিম্যান ডাইসনের মতে চন্দ্রশেখর মহাবিশ্বকে বুঝেছিলেন আইনস্টাইনের চেয়েও সঠিকভাবে, কারণ আইনস্টাইন ব্ল্যাকহোলের অস্তিত্ব স্বীকার করেন নি। আর চন্দ্রশেখর ব্ল্যাকহোলের অস্তিত্ব প্রমাণ করেছেন [2]। নভোপদার্থবিজ্ঞানের সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র সুব্রাহ্মনিয়ান চন্দ্রশেখর পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন ১৯৮৩ সালে। নক্ষত্রের ভরের সীমা সংক্রান্ত যে গবেষণার জন্য চন্দ্রশেখর নোবেল পুরষ্কার পান সেই গবেষণার সূত্রপাত হয়েছিল ভারতে - চন্দ্রশেখরের বয়স তখন মাত্র উনিশ বছর। 

চন্দ্রশেখর নিজের জন্মতারিখ বলতেন ‘নাইন্টিন টেন নাইন্টিন টেন’ অর্থাৎ উনিশ দশ উনিশ শ’ দশ। ১৯১০ সালের ১৯ অক্টোবর ব্রিটিশ ভারতের লাহোরে (বর্তমানে পাকিস্তান) জন্ম চন্দ্রশেখরের। তামিল রীতি অনুযায়ী বংশের বড় ছেলের নাম রাখা হয় পিতামহের নাম অনুসারে। চন্দ্রশেখরের পিতামহ রামানাথন চন্দ্রশেখরন ছিলেন তামিলনাড়ুর বিশিষ্ট পন্ডিত ও পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষক। তাঁর আট সন্তানের প্রথম সন্তান হলেন চন্দ্রশেখর সুব্রাহ্মনিয়ান। (তামিল রীতি অনুসারে নামের আগে বাবার নাম বসে এবং কোন পদবী থাকে না। যেমন চন্দ্রশেখর সুব্রাহ্মনিয়ান - অর্থাৎ চন্দ্রশেখরের পুত্র সুব্রাহ্মনিয়ান।) সুব্রাহ্মনিয়ানের প্রথম পুত্রের নাম রাখা হয় চন্দ্রশেখর। নামের আগে বাবার নাম যুক্ত হয়ে পুরো নাম হলো সুব্রাহ্মনিয়ান চন্দ্রশেখর।  চন্দ্রশেখরনের দ্বিতীয় পুত্র চন্দ্রশেখর ভেঙ্কটরামনই হলেন নোবেলবিজয়ী স্যার সি ভি রামন। 

চন্দ্রশেখরের বাবা সুব্রাহ্মনিয়ান ছিলেন ব্রিটিশ সরকারের ফাইন্যান্সিয়াল সিভিল সার্ভিসের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। কাকা ভেঙ্কটরামনও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেয়ার আগপর্যন্ত ফাইন্যান্সিয়াল সিভিল সার্ভিসে কাজ করতেন। ১৯১০ সালে চন্দ্রশেখরের জন্মের সময় সুব্রাহ্মনিয়ান নর্থ ওয়েস্টার্ন রেলওয়ের ডেপুটি অডিটর জেনারেল হিসেবে লাহোরে কর্মরত ছিলেন। সুব্রাহ্মনিয়ানের স্ত্রী সীতালক্ষ্মীর খুব কম বয়সে বিয়ে হয়েছিল বলে প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা খুব একটা হয়নি, কিন্তু শিক্ষিত পরিবারের বউ হিসেবে শিক্ষার অনুকুল পরিবেশে এসে নিজে নিজেই পড়াশোনা চালিয়ে গিয়েছেন। সুব্রাহ্মনিয়ান ও সীতালক্ষ্মীর মোট দশটি সন্তানের প্রথম দুইটি কন্যাসন্তানের জন্মের পর প্রথম পুত্র চন্দ্রশেখরের জন্ম। 

সুব্রাহ্মনিয়ানের বদলির চাকরির কারণে কয়েক বছর পর পর তাঁদের বাসস্থান বদলে যেতো। ফলে চন্দ্রশেখরের প্রাথমিক পড়াশোনা শুরু হয় বাড়িতেই। এগারো বছর বয়স পর্যন্ত বাড়িতে বাবা ও প্রাইভেট টিউটরের কাছে পড়াশোনা করেছে চন্দ্রশেখর। ইচ্ছেমত গণিত ও ইংরেজির পাঠ নিয়েছে। চন্দ্রশেখরের ১২ বছর বয়সের সময় তাঁর বাবা মাদ্রাজে স্থায়ীভাবে বাস করতে শুরু করেন। মাদ্রাজের হিন্দু হাই স্কুলে চন্দ্রশেখরের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শুরু হলো বারো বছর বয়সে। কিন্তু স্কুলের বাধ্যতামূলক নীরস পড়াশোনা ভাল লাগেনি চন্দ্রশেখরের [3]। ইতিহাস, ভূগোল, সামাজিক বিজ্ঞান ইত্যাদি নীরস বিষয়ের সাথে সাথে ক’দিন পর পর ক্লাস টেস্ট, সেশনাল টেস্ট ইত্যাদি মোটেও ভাল লাগেনি তার। কিন্তু এক বছর পরই স্কুলের সিস্টেম বুঝে ফেললো চন্দ্রশেখর। স্কুলের সেরা ছাত্র হয়ে উঠতে মোটেও সময় লাগলো না। চৌদ্দ বছরে স্কুল সার্টিফিকেট পাস করে চন্দ্রশেখর ভর্তি হলেন মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সি কলেজে। 

১৯২৪ সালে চন্দ্রশেখরের বাবা মাদ্রাজের অভিজাত এলাকায় একটা বিরাট বাড়ি তৈরি করেন। বাড়িটার নাম রাখা হলো ‘চন্দ্র ভিলা’। চন্দ্রশেখরের পনেরো বছর বয়সে চন্দ্রভিলায় উঠে আসেন পরিবারের সবাই। রেলওয়ের চাকরির সুবাদে পরিবারের সবার জন্য ফ্রি রেল-পাস পেতেন সুব্রাহ্মনিয়ান। তিনি প্রতিবছর নতুন নতুন জায়গায় বেড়াতে যেতেন সবাইকে নিয়ে। এভাবে ভারতের প্রায় সব অঞ্চলেই যাওয়ার সুযোগ হয় চন্দ্রশেখরের। ইতোমধ্যে মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন ও গণিতে ডিস্টিংশান সহ উচ্চমাধ্যমিক পাস করলেন চন্দ্রশেখর। এবার গণিত বিষয়ে অনার্স পড়ার ইচ্ছে তাঁর। ভারতীয় গণিতবিদ রামানুজনের গাণিতিক প্রতিভায় মুগ্ধ চন্দ্রশেখর। মনে মনে রামানুজনকেই আদর্শ মানেন তিনি। বাবাকে বিশুদ্ধ গণিত নিয়ে পড়ার ইচ্ছের কথা জানাতেই রেগে গেলেন বাবা সুব্রাহ্মনিয়ান। পড়াশোনা, চিন্তা ও সংস্কৃতিতে অনেক উদারমনা হলেও পারিবারিক সিদ্ধান্তের ব্যাপারে খুবই কর্তৃত্বপরায়ন ছিলেন সুব্রাহ্মনিয়ান। তিনি চান চন্দ্রশেখর আই-সি-এস পরীক্ষা পাস করে ব্রিটিশ সরকারের আমলা হোক। কিন্তু চন্দ্রশেখর বাবার ইচ্ছের কাছে নতি স্বীকার করার পাত্র নন। তাঁর বাড়িতেই তো উদাহরণ আছে। তাঁর কাকা ভেঙ্কটরামন বিজ্ঞানের গবেষণা করার জন্য একাউন্ট্যান্ট জেনারেলের পদ ছেড়ে দিয়ে অর্ধেকেরও কম বেতনে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পদে যোগ দিয়েছেন। সুব্রাহ্মনিয়ান ছেলের যুক্তিতে কিছুটা দমে গেলেন। বললেন পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করলে তবু কিছুটা ভবিষ্যৎ আছে, কিন্তু বিশুদ্ধ গণিতের কোন ভবিষ্যৎ নেই ভারতবর্ষে। বাবার ইচ্ছেয় পদার্থবিজ্ঞানে অনার্স নিয়ে বিএসসিতে ভর্তি হলেন প্রেসিডেন্সি কলেজে। 

১৯২৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে কলকাতায় কাকার কাছে ছুটি কাটাতে গিয়েছিলেন চন্দ্রশেখর। কাল্টিভেশান সেন্টারের ল্যাবে যখন রামন ইফেক্ট আবিষ্কারের পরীক্ষাগুলো করছিলেন কৃষ্ণান তখন চন্দ্রশেখর প্রতিদিনই ল্যাবে যেতেন। কাকা রামনও খুব খুশি বিজ্ঞানের প্রতি চন্দ্রশেখরের গভীর আগ্রহ দেখে। সদ্য কৈশোরোত্তীর্ণ চন্দ্রশেখরের সাথে গভীর বন্ধুত্ব হয়ে গেলো বিজ্ঞানী কৃষ্ণানের। চন্দ্রশেখর চোখের সামনেই দেখলেন একটা নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞান-গবেষণা কীভাবে সম্পন্ন হয়। সেবছর অক্টোবর মাসে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটা সিরিজ বক্তৃতা দিয়ে মাদ্রাজের প্রেসিডেন্সি কলেজে বক্তৃতা দিতে এলেন আর্নল্ড সামারফেল্ড। কলকাতা থেকে এ ব্যাপারে চন্দ্রশেখরকে চিঠি লিখে জানিয়েছিলেন কৃষ্ণান। এত বড় একজন পদার্থবিজ্ঞানীর লেকচার শুনতে পারবেন ভেবে চন্দ্রশেখর ভীষণ উত্তেজিত।  তিনি ইতোমধ্যেই পড়ে ফেলেছেন সামারফেল্ডের বিখ্যাত বই ‘এটমিক স্ট্রাকচার এন্ড স্পেকট্রা লাইন্‌স’। শুধু পড়া নয় - বইতে বর্ণিত সমস্যাগুলোর সমাধানও করে ফেলেছেন নিজে নিজে। সামারফেল্ডের বক্তৃতার পরের দিন আত্মবিশ্বাসী তরুণ চন্দ্রশেখর হোটেলে গিয়ে দেখা করলেন সামারফেল্ডের সাথে। চন্দ্রশেখরের আগ্রহ আর এত কম বয়সেই পরমাণুর গঠন সম্পর্কিত জটিল ধারণাগুলো আয়ত্ব করে ফেলার ক্ষমতা দেখে মুগ্ধ হলেন সামারফেল্ড। কিন্তু তিনি যখন বললেন তাঁর ‘এটমিক স্ট্রাকচার’ বইতে বর্ণিত কোয়ান্টাম মেকানিক্সের তত্ত্বগুলো ইতোমধ্যেই পুরনো হয়ে গেছে - স্তম্ভিত হয়ে গেলেন চন্দ্রশেখর। সামারফেল্ড অনেকক্ষণ ধরে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের সাম্প্রতিক আবিষ্কারের কথা বললেন চন্দ্রশেখরকে। বললেন শ্রোডিংগার, হাইজেনবার্গ, ডিরাক ও পাউলি’র নতুন কোয়ান্টাম তত্ত্বের কথা। চন্দ্রশেখর ম্যাক্সওয়েল-বোল্টজম্যান এর ক্লাসিক্যাল স্ট্যাটিস্টিক্‌স আত্মস্থ করেছেন ইতোমধ্যে। কিন্তু সামারফেল্ড জানালেন ম্যাক্সওয়েল-বোল্টজম্যান তত্ত্বেও পরিবর্তন আসছে। সামারফেল্ড কোয়ান্টাম মেকানিক্সের আলোকে ফার্মি-ডিরাক স্ট্যাটিস্টিক্‌স সম্পর্কিত তাঁর প্রকাশিতব্য একটা গবেষণাপত্রের প্রুফ পড়তে দিলেন চন্দ্রশেখরকে। কোয়ান্টাম তত্ত্বের আলোকে পদার্থের ইলেকট্রন তত্ত্বের ওপর প্রথম পেপারটি পড়ে ফেললেন চন্দ্রশেখর প্রকাশিত হবার আগেই। 

সামারফেল্ডের সাথে সাক্ষাতের পর পদার্থবিজ্ঞানের গবেষণায় নিজেকে সঁপে দেয়ার ব্যাপারে আর কোন দ্বিধাবোধ থাকলো না। কয়েক মাসের মধ্যেই ১৯২৮ সালে ইন্ডিয়ান জার্নাল অব ফিজিক্সে প্রকাশিত হলো চন্দ্রশেখরের প্রথম গবেষণাপত্র ‘থার্মোডায়নামিক্স অব দি কম্পটন ইফেক্ট উইথ রেফারেন্স টু দি স্টার্‌স’ [4]। তারপর সামারফেল্ডের সাথে আলোচনা ও তাঁর ফার্মি-ডিরাক স্ট্যাটিস্টিক্‌স এর পেপারটির ওপর ভিত্তি করে দ্বিতীয় গবেষণাপত্রটি রচনা করেন চন্দ্রশেখর। ‘দি কম্পটন স্ক্যাটারিং এন্ড দি নিউ স্ট্যাটিস্টিক্‌স’ শিরোনামের পেপারটির বিষয়বস্তুর নতুনত্ব ও গুরুত্বের কথা চিন্তা করে চন্দ্রশেখর ভাবলেন পেপারটি রয়েল সোসাইটির প্রসিডিংস এ প্রকাশ করবেন। কিন্তু রয়েল সোসাইটির কোন ফেলোর সুপারিশ ছাড়া রয়েল সোসাইটিতে প্রকাশের জন্য কোন গবেষণাপত্র বিবেচিত হয় না। চন্দ্রশেখর চাইলেই তাঁর কাকা ভেঙ্কটরামনের মাধ্যমে পেপারটি রয়েল সোসাইটিতে পাঠাতে পারেন। কিন্তু তিনি চাননি ব্যক্তিগত পরিচিতি কাজে লাগাতে। মাদ্রাজ ইউনিভার্সিটির লাইব্রেরিতে গিয়ে নতুন আসা সায়েন্টিফিক জার্নাল খুঁজে দেখলেন রয়েল সোসাইটির ফেলো রাল্‌ফ ফাওলার ফার্মি-ডিরাক স্ট্যাটিস্টিক্‌স কাজে লাগিয়ে শ্বেত-বামনের তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করেছেন। চন্দ্রশেখর জার্নাল থেকে ঠিকানা নিয়ে রাল্‌ফ ফাওলারের কাছে তাঁর পেপারটি পাঠিয়ে দিলেন। ফাওলার এত উঁচুমানের পেপার পেয়ে খুশি হয়েই রয়েল সোসাইটিতে পাঠিয়ে দিলেন। ১৯২৯ সালে রয়েল সোসাইটির প্রসিডিংস এ প্রকাশিত হলো চন্দ্রশেখরের দ্বিতীয় গবেষণাপত্র [5]। ১৯৩০ সালে পদার্থবিজ্ঞানে অনার্স পাস করার আগেই চন্দ্রশেখরের আরো দুটো পেপার প্রকাশিত হয় ফিলোসফিক্যাল ম্যাগাজিনে। 

এদিকে ১৯২৯ সালের অক্টোবর মাসে ভারত সফরে আসেন পদার্থবিজ্ঞানী ওয়ার্নার হাইজেনবার্গ। মাদ্রাজ ইউনিভার্সিটিতেও একটা লেকচার দেবেন তিনি। কৃষ্ণানের সূত্রে মাদ্রাজে হাইজেনবার্গকে মাদ্রাজ ঘুরিয়ে দেখানোর দায়িত্ব পড়লো চন্দ্রশেখরের ওপর। উনিশ বছরের তরুণ চন্দ্রশেখরের জ্ঞানের গভীরতা ও জ্ঞান-তৃষ্ণা দেখে হাইজেনবার্গও মুগ্ধ। 

প্রেসিডেন্সি কলেজের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সবাই মুগ্ধ চন্দ্রশেখরের প্রতিভা ও গবেষণাকাজে। সবাইকে ছাড়িয়ে অন্যরকম মুগ্ধতার আবেশে জড়িয়ে গেছে তখন আরো একজন - ললিতা। ললিতা দোরাইস্বামী।। চন্দ্রশেখরদের বাড়ির কাছেই বাড়ি ললিতাদের। সেও পড়ে প্রেসিডেন্সি কলেজে, চন্দ্রশেখরের এক ইয়ার জুনিয়র। তারও বিষয় পদার্থবিজ্ঞান। চন্দ্রশেখরের তরুণ বৈজ্ঞানিক মস্তিষ্কেও ভালবাসা জন্মালো ললিতার জন্যে। 

১৯৩০ সালের জানুয়ারি মাসে এলাহাবাদে ইন্ডিয়ান সায়েন্স কংগ্রেস এসোসিয়েশানের কনফারেন্সে গেলেন চন্দ্রশেখর। সেখানে তাঁর সাথে পরিচয় হয় প্রফেসর মেঘনাদ সাহার। রয়েল সোসাইটি থেকে প্রকাশিত চন্দ্রশেখরের পেপারটি পড়ে মেঘনাদ সাহা খুব খুশি হয়েছিলেন। কিন্তু তিনি ভাবতেই পারেন নি যে এত গুরুত্বপূর্ণ পেপারটির লেখকটির বয়স এত কম। চন্দ্রশেখরকে আন্তরিকভাবে নিজের গ্রুপের গবেষকদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন। কনফারেন্সে সারা ভারত থেকে আগত বড় বড় বিজ্ঞানীর সম্মানে নিজের বাড়িতে ডিনার পার্টি দিয়েছিলেন মেঘনাদ সাহা। চন্দ্রশেখরও সমান সম্মানে নিমন্ত্রিত হলেন সেই পার্টিতে। সেদিন ভারতের প্রায় সব বিখ্যাত বিজ্ঞানীদের সভায় স্থান পাওয়া ১৯ বছর বয়সী চন্দ্রশেখরের জন্য একটা বিরাট অনুপ্রেরণা। আর এ অনুপ্রেরণায় ইন্ধন জুগিয়েছিলেন অধ্যাপক মেঘনাদ সাহা। 

এলাহাবাদ থেকে ফেরার কয়েকদিন পর প্রেসিডেন্সি কলেজের প্রিন্সিপালের অফিসে ডাক পড়লো চন্দ্রশেখরের। প্রিন্সিপাল ফিলিপ ফাইসন একটা গোপন খবর দিলেন চন্দ্রশেখরকে। তিনি জানালেন ইংল্যান্ডে পড়াশোনা করার জন্য গভমেন্ট অব ইন্ডিয়া চন্দ্রশেখরকে একটা বৃত্তি দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একটা বিশেষ ধরনের বৃত্তি- যেন চন্দ্রশেখরের জন্যই তৈরি করা হয়েছে। ১৯৩০ সালের ২২শে মে স্কলারশিপের অফিসিয়াল চিঠি হাতে এলো চন্দ্রশেখরের। চন্দ্রশেখর সিদ্দান্ত নিলেন কেমব্রিজে গিয়ে প্রফেসর রাল্‌ফ ফাওলারের তত্ত্বাবধানে পড়াশোনা করবেন। 

ইংল্যান্ডে গিয়ে পড়াশোনা করতে চাইলেই করা যেতো না তখন। কত রকমের সরকারি অনুমতি নিতে হতো। আর খরচ তো আছেই। কিন্তু চন্দ্রশেখরের বেলায় কিছুই করতে হলো না। মনে হচ্ছে ব্রিটিশ সরকারই যেন সব করে দিলো তাঁর জন্য। কিন্তু সমস্যা দেখা দিলো অন্য জায়গায়। ১৯২৮ সাল থেকে চন্দ্রশেখরের মায়ের শরীর ভালো যাচ্ছিলো না। দু’বছর ধরে সব রকমের চিকিৎসাই চললো। কিন্তু অবস্থা কেবল খারাপের দিকেই যাচ্ছে। ডাক্তার যা বললেন তাতে তিনি যে আর সুস্থ হয়ে উঠবেন তা মনে হয় না। মাকে এ অবস্থায় ফেলে বিদেশে যাওয়া কোন মতেই সম্ভব নয়। আত্মীয়-স্বজন বন্ধুবান্ধব সবাই বলছেন ইংল্যান্ড যাওয়ার সিদ্ধান্ত বাতিল করতে। চন্দ্রশেখর বুঝতে পারছেন না কী করবেন। এ অবস্থায় এগিয়ে এলেন চন্দ্রশেখরের মা নিজে। তিনি নিজের শরীরের অবস্থা জানেন। কখন মারা যাবেন কোন ঠিক নেই - কিন্তু তার জন্য ছেলে এত বড় একটা সুযোগ পেয়েও কাজে লাগাবে না? তিনি ছেলেকে বোঝালেন যে তাঁকে দেখার জন্য তাঁর আরো তিনটা ছেলে আর ছয়টা মেয়ে আছে দেশে। অবশেষে ১৯৩০ সালের ৩১ জুলাই ইংল্যান্ডের উদ্দ্যেশ্যে জাহাজে চড়ে বসলেন চন্দ্রশেখর। বাষ্পচালিত জাহাজটির নাম এস এস পিল্‌সনা। 

প্রফেসর ফাওলারের শ্বেতবামন তত্ত্ব সংক্রান্ত যত পেপার প্রকাশিত হয়েছে তার সবগুলোই গভীর মনযোগ দিয়ে পড়েছেন চন্দ্রশেখর কেমব্রিজে যাওয়ার আগেই। ফাওলারের তত্ত্ব সম্প্রসারণ করে নিজেই একটা পেপার লিখে সাথে নিয়েছিলেন জাহাজে ওঠার আগে। আর জাহাজে বসে হাত দিলেন নতুন আরেকটি পেপার লেখার কাজে। প্রফেসর রাল্‌ফ ফাওলার শ্বেত-বামন তারার ধর্মাবলী ব্যাখ্যা করেছেন ফার্মি-ডিরাক সংখ্যায়ন ব্যবহার করে। যে সব তারা জ্বলতে জ্বলতে তাদের নিউক্লিয়ার শক্তি নিঃশেষ করে ফেলেছে - সাধারণত সেই সব তারাদের হোয়াইট ডোয়ার্ফ বা শ্বেত-বামন তারা বলা হয়। এই তারাগুলোর মাধ্যাকর্ষণ-বল এত বেড়ে যায় যে তাদের ঘনত্ব সাধারণ পদার্থের চেয়ে প্রায় হাজার হাজার গুণ বেশি হয়ে পড়ে। ঘনত্ব বেড়ে গিয়ে আয়তনে ছোট হয়ে যাবার পর তারা তাপ বিকিরণ করে আস্তে আস্তে ঠান্ডা হতে শুরু করে। ফাওলার শ্বেত-বামনের ভর ও ঘনত্বের মধ্যে গাণিতিক সম্পর্ক স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছেন যা সেই সময়ের পরীক্ষামূলক ফলাফলের সাথে মিলে যায়। 

পিল্‌সনা জাহাজে বসে চন্দ্রশেখর নতুন করে ভাবতে শুরু করলেন শ্বেত-বামনের ঘনত্ব ও ভর নিয়ে। চন্দ্রশেখর দেখলেন ফাওলার ইলেকট্রনকে নন-রিলেটিভিস্টিক বা অনাপেক্ষিক কণা হিসেবে ধরে নিয়ে হিসেবের মধ্যে নিউটনিয়ান মেকানিক্স প্রয়োগ করেছেন। কিন্তু শ্বেত-বামনের কেন্দ্রে যে ইলেকট্রনগুলো এত জোরে ছুটে বেড়াচ্ছে যে তারা কিছুতেই অনাপেক্ষিক থাকতে পারে না। আইনেস্টাইনের আপেক্ষিকতার তত্ত্ব এখানে প্রয়োগ করতেই হবে। তারাদের একটা নির্দিষ্ট রাসায়নিক গঠন ধরে নিয়ে ফাওলার হিসেব করে দেখিয়েছেন শ্বেতবামনের ঘনত্ব হবে ভরের বর্গের সমানুপাতিক। একটু ভেবে দেখলেই এর সত্যতা বোঝা যায়। তারার ভর যত বেশি হবে মাধ্যাকর্ষণ বল তত বেশি হবে ফলে তারার ভেতরের পদার্থগুলো ঘন হয়ে নিজেদের মধ্যে গুটিয়ে যাবে - আর ঘনত্ব বেড়ে যাবে। ফলে তারার আয়তন খুব কমে যাবে। এত ছোট হয়ে যাবে যে তাদের আর দেখা যাবে না। সে কারণেই সূর্যের চেয়ে বেশি ভরের কোন শ্বেত-বামন তারা দেখা যায় না। চন্দ্রশেখর আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার তত্ত্ব প্রয়োগ করে দেখলেন ভরের তুলনায় শ্বেত-বামনের ঘনত্ব ফাওলারের হিসেবের তুলনায় আরো অনেক বেড়ে যায়। ভর বৃদ্ধির সাথে ঘনত্বের দ্রুত বৃদ্ধিই শুধু হয় না, একটা নির্দিষ্ট ভরের বেশি হলে ঘনত্বের পরিমাণ হয়ে যায় অসীম। ভরের এই নির্দিষ্ট সীমা-ই পরে ‘চন্দ্রশেখর লিমিট’ হিসেবে গৃহীত হয়। ভরের এই সীমা তারার রাসায়নিক উপাদানের উপর নির্ভর করে। চন্দ্রশেখর জাহাজে বসে ইংল্যান্ডে পৌঁছানোর আগেই লিখে শেষ করলেন তাঁর পেপার “দি ম্যাক্সিমাম মাস অব আইডিয়েল হোয়াইট ডোয়ার্ফ”। চন্দ্রশেখর হিসেব করে দেখিয়েছিলেন যে কোন শ্বেত-বামনের ভর সূর্যের ভরের শতকরা ৯০ ভাগের বেশি হলে তার ঘনত্ব অসীম হয়ে যাবে। পরে অবশ্য এই মান কিছুটা পরিবর্তিত হয়। বর্তমানে চন্দ্রশেখর লিমিট হলো সূর্যের ভরের দেড়গুণ। ৫৩ বছর পর ১৯৮৩ সালে চন্দ্রশেখর নোবেল পুরষ্কার পান এই কাজের জন্য যা তিনি করেছিলেন ১৯ বছর বয়সে ভারত থেকে ইংল্যান্ড যাবার পথে জাহাজে বসে। 

কেমব্রিজে গিয়ে প্রফেসর ফাওলারের সাথে দেখা করলেন চন্দ্রশেখর। ফাওলার ছিলেন ডিরাকের সুপারভাইজার। চন্দ্রশেখরের আগের বছর হোমি ভাবাও গবেষণা শুরু করেছেন ফাওলারের তত্ত্বাবধানে। চন্দ্রশেখরের সাথে ভাবার বন্ধুত্ব হয়ে যায় কয়েকদিনের মধ্যেই। ফাওলারের সাথে দেখা করেই চন্দ্রশেখর নতুন লেখা পেপারদুটো দেখালেন। প্রথম পেপার যেটাতে ফাওলারের কাজকে বিস্তৃত করা হয়েছে তা খুশি মনে মেনে নিলেন ফাওলার এবং  রয়েল সোসাইটির প্রসিডিংস এ প্রকাশের জন্য পাঠিয়ে দিলেন। কিন্তু দ্বিতীয় পেপার যেটাতে চন্দ্রশেখর ভরের সীমা হিসেব করেছেন - সেটা নিয়ে ফাওলার দ্বিধান্বিত হয়ে পড়লেন। ফাওলার বললেন পেপারটা এডওয়ার্ড মিলনি’র কাছে পাঠিয়ে মতামত নিতে। কিন্তু কয়েক মাস পরেও ফাওলার বা মিলনির কাছ থেকে কোন সাড়া পাওয়া গেলো না পেপারটির ব্যাপারে। চন্দ্রশেখর বুঝতে পারলেন যে ফাওলার হয়তো চাচ্ছেন না যে পেপারটি এখন প্রকাশিত হোক। চন্দ্রশেখর আর অপেক্ষা করলেন না। পেপারটির ছোট একটা সংস্করণ (মাত্র দুই পৃষ্ঠা) পাঠিয়ে দিলেন আমেরিকার অ্যাস্ট্রোফিজিক্যাল জার্নালে। পরের বছর অ্যাস্ট্রোফিজিক্যাল জার্নালে প্রকাশিত হলো চন্দ্রশেখরের বিখ্যাত গবেষণাপত্র [6]। 

কেমব্রিজের প্রথম বর্ষে চন্দ্রশেখর পল ডিরাকের কোয়ান্টাম মেকানিক্সের ক্লাসগুলো করলেন মনযোগ দিয়ে। পল ডিরাক যন্ত্রের মত মানুষ। প্রয়োজনের বাইরে একটা বাক্যও ব্যয় করেন না। সেকেন্ড সেমিস্টারে ফাওলার দীর্ঘ ছুটিতে গেলে পল ডিরাক হলেন চন্দ্রশেখরের ভারপ্রাপ্ত সুপারভাইজার। কোয়ান্টাম মেকানিক্সের অন্যতম জনকের কাছে কোয়ান্টাম মেকানিক্স শিখতে পেরে খুবই খুশি হলেন চন্দ্রশেখর। চন্দ্রশেখরের গবেষণা সম্পর্কে তেমন কোন আগ্রহ দেখাননি পল ডিরাক। তবে মাসে একবার নিয়ম করে নিজের অফিসে চা খেতে ডাকতেন চন্দ্রশেখরকে। রিলেটিভিস্টিক আয়োনাইজেশান ও মহাকাশ নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যাবার সময় চন্দ্রশেখরের সাথে পরিচয় হলো বিশিষ্ট নভোপদার্থবিজ্ঞানী এডওয়ার্ড মিল্‌নির সাথে। প্রফেসর মিলনি চন্দ্রশেখরের গবেষণার সাথে ইতোমধ্যেই পরিচিত। দু’জনের মধ্যে গবেষণা সহযোগিতা গড়ে উঠলো। চন্দ্রশেখরের গবেষণার স্বীকৃতি পেতে দেরি হলো না। ট্রিনিটি কলেজের একটা সম্মানজনক পুরষ্কার পেলেন তিনি। পুরষ্কারের আর্থিক মূল্য চল্লিশ পাউন্ড। পুরষ্কার পাবার পর চন্দ্রশেখরকে অভিনন্দন জানিয়ে চিঠি লিখলেন স্বয়ং আর্থার এডিংটন- নভোপদার্থবিজ্ঞানে যাঁকে ‘গুরু’ মানা নয়। এডিংটন চন্দ্রশেখরকে ১৯৩১ সালের ২৩ মে তারিখে অফিসে এসে তাঁর দেখা করার জন্য আমন্ত্রণ জানালেন। চন্দ্রশেখর যেন চাঁদ হাতে পেলেন। 

জ্যোতির্বিজ্ঞানী স্যার আর্থার এডিংটন ছিলেন কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সবগুলো অবজারভেটরির পরিচালক। সেই সময়ে অ্যাস্ট্রোনমিতে স্যার এডিংটনের অবদান এবং অর্জন এমন ছিল যে এ বিষয়ে তাঁর কথাই সবাই শেষ কথা হিসেবে মেনে নিতো সবাই। এমন এক ব্যক্তিত্বের কাছ থেকে নিমন্ত্রণ পেয়ে খুব খুশি চন্দ্রশেখর নিজেকে তৈরি করে নিচ্ছিলেন এডিংটনের সাথে কী নিয়ে আলোচনা করবেন ইত্যাদি। এমন সময় ২১ মে তারিখে চন্দ্রশেখরের হাতে একটা টেলিগ্রাম এসে পৌঁছালো। চন্দ্রশেখরের মা মারা গেছেন। চন্দ্রশেখর সপ্তাহে দুটো করে চিঠি লিখতেন তাঁর বাবার কাছে। কেমব্রিজে কী কী ঘটছে তার সব খুঁটিনাটি বর্ণনা থাকতো তাতে। মায়ের কাছেও চিঠি লিখতেন তামিল ভাষায়। মায়ের শরীর ক্রমশ খারাপ হচ্ছিলো তা জানতেন চন্দ্রশেখর। কিন্তু মায়ের মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত ছিলেন না একটুও। নিজে নিজেই সহ্য করলেন দুঃসহ কষ্ট। নদীর তীরে বসে কাঁদলেন নীরবে [3]। তারপর যুক্তি দিয়ে নিজেকে বুঝিয়ে গবেষণায় মন দেবার চেষ্টা করলেন। দু’দিন পরে নির্দিষ্ট সময়ে দেখা করলেন স্যার এডিংটনের সাথে। 

মায়ের মৃত্যুর পর কেমব্রিজে মন বসাতে কষ্ট হচ্ছিলো চন্দ্রশেখরের। গ্রীষ্মে ছুটি নিয়ে ইউরোপে ঘুরে বেড়ানোর সিদ্ধান্ত নিলেন। কিন্তু ইউরোপে গিয়ে ঘুরে বেড়ানোর বদলে জার্মানির গটিনগেন ইউনিভার্সিটিতে ম্যাক্স বর্নের সাথে গবেষণায় লেগে গেলেন। সেপ্টেম্বরে সেখান থেকে ফিরে এসে আবার কাজে লেগে পড়লেন। অ্যাস্ট্রোফিজিক্সে তাঁর অনেকগুলো পেপার প্রকাশিত হয়েছে ইতোমধ্যেই। কিন্তু মনে মনে তৃপ্তি পাচ্ছিলেন না। তিনি পড়তে চেয়েছিলেন ভৌত গণিত। কিন্তু বাবার ইচ্ছেয় পদার্থবিজ্ঞান পড়তে এসে ঘটনাচক্রে কাজ করছেন অ্যাস্ট্রোফিজিক্সে। কিন্তু তাঁর মূল ভালবাসা যে গণিত তা প্রয়োগের সুযোগ এখানে সীমিত। তাঁর ইচ্ছে করছে বিষয় বদলে তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞানের দিকে চলে যেতে যেখানে গণিতের ব্যাপক ব্যবহার আছে। ক্যাভেন্ডিশ ল্যাবে মূলধারার পদার্থবিজ্ঞানীদের মেলা। সেখানে যোগ দিতে ইচ্ছে করছে তাঁর। কিন্তু চন্দ্রশেখর কাউকে বলতে পারছেন না তাঁর মনের কথা। কথাপ্রসঙ্গে একদিন ডিরাককে বললেন যে তাঁর একঘেয়ে লাগছে কেমব্রিজের জীবন। ডিরাক তাঁকে পরামর্শ দিলেন কোপেনহেগেনে নিল্‌স বোরের ইনস্টিটিউটে গিয়ে কিছুদিন কাজ করার জন্য। চন্দ্রশেখর ডিরাকের পরামর্শ মেনে চলে গেলেন কোপেনহেগেনে। কেমব্রিজের ফর্মাল  পরিবেশ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন নিল্‌স বোরের ইনস্টিটিউট। এখানকার চমৎকার মানবিক ও উষ্ণ পরিবেশে এসে যেন প্রাণ ফিরে পেলেন চন্দ্রশেখর। 

ডিরাক ফার্মি-ডিরাক সংখ্যায়নের একটা সমস্যার কথা বলেছিলেন চন্দ্রশেখরকে। কোপেনহেগেনে এসে চন্দ্রশেখর সমস্যাটির সমাধান করতে বসলেন। দুই এর অধিক কণার ওপর প্রয়োগ করতে গেলে ফার্মি-ডিরাক সংখ্যায়নের কী কী পরিবর্তন করতে হবে - সেটাই ছিল সমস্যা। বেশ কিছুদিন কাজ করার পর চন্দ্রশেখর সমস্যাটির সমাধান করে ফেললেন। দ্রুত লিখে ফেললেন একটা পেপার। নিল্‌স বোর পেপারটি পড়ার পর সন্তুষ্ট হয়ে রয়েল সোসাইটিতে প্রকাশের জন্য পাঠিয়ে দিলেন। চন্দ্রশেখর ভাবলেন অ্যাস্ট্রোফিজিক্স থেকে থিওরেটিক্যাল ফিজিক্সে চলে আসার এটাই সুযোগ। স্বয়ং ডিরাকের একটা সমস্যার সমাধান করে ফেলা নিশ্চয় সহজ কথা নয়। কিন্তু তাঁর আশার গুড়ে বালি ঢেলে দিলেন ডিরাক। চন্দ্রশেখরের সমাধানে একটা বিরাট ভুল বের করে ফেললেন ডিরাক। চন্দ্রশেখর ব্যাপারটা বুঝতে পারার পর রয়েল সোসাইটি থেকে তাঁর পেপারটা প্রত্যাহার করে নিলেন। ১৯৩৩ সালের আগস্টে তাঁর স্কলারশিপ শেষ হয়ে যাবে। তার আগেই পিএইচডি থিসিস জমা দিতে হবে। নিজের প্রকাশিত পেপারগুলো নিয়ে বসলেন থিসিস রেডি করতে। 

প্রফেসর ফাওলার জানতেন চন্দ্রশেখরের জন্য পিএইচডি ডিগ্রি পাওয়াটা শুধুমাত্র একটা আনুষ্ঠানিকতা। কারণ চন্দ্রশেখর ছাত্রাবস্থায় যতগুলো গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছেন কেমব্রিজের অনেক অধ্যাপকেরও ততটা গবেষণাপত্র নেই। পিএইচডি’র ব্যবস্থা তো হলো। কিন্তু তারপর কী হবে? চন্দ্রশেখর নিজের বৈজ্ঞানিক ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবছেন। স্কলারশিপ শেষ হবার আগেই একটা কাজের ব্যবস্থা করতে না পারলে ভারতে ফিরে যেতে হবে। বাবাও চাপ দিচ্ছেন দেশে ফিরে যেতে। কিন্তু এখনি ভারতে ফিরতে চান না তিনি। বাবাকে লেখা চিঠিতে সরাসরি জানিয়ে দিলেন, “যদি বিএসসি ক্লাসে গিয়ে হুইটস্টোন ব্রিজ পড়াতে হয় আর প্র্যাকটিক্যাল ক্লাস করাতে হয়, তবে এসবের চেয়ে মেক্সিকোর ইতিহাস পড়ানোই ভাল হবে” [7]। চন্দ্রশেখর ভাবছেন কীভাবে ইউরোপে থাকা যায়। কোপেনহেগেন ও কেমব্রিজে তাঁর বৈজ্ঞানিক যোগাযোগ তৈরি হয়েছে অনেক। দরকার হলে কাজে লাগাবেন। এর মধ্যে স্কলারশিপের টাকা থেকে যা জমেছে তাতে কোন উপার্জন ছাড়াই আরো ছয় মাস থাকা যাবে ইউরোপে। দরকার হলে তাই করবেন। এর মধ্যে একদিন ট্রিনিটি কলেজের ফেলোশিপের বিজ্ঞপ্তি চোখে পড়লো। বিজ্ঞানের সব শাখার জন্যই উন্মুক্ত এই ফেলোশিপ। এটা যদি হয়ে যায় তাহলে আরো চার বছর কেমব্রিজে থাকা যাবে। বছরে তিন শ’ পাউন্ড বৃত্তি, ট্রিনিটি কলেজের হোস্টেলে ফ্রি থাকার ব্যবস্থা, ডায়নিং হলের উঁচু-টেবিলে বসে খাওয়ার সুযোগ। কিন্তু প্রতিযোগিতা এত তীব্র যে প্রফেসর ফাওলারও কোন আশা দেখতে পেলেন না চন্দ্রশেখরের ব্যাপারে। 

কিন্তু আশাতীত ভাবে ট্রিনিটি কলেজের ফেলোশিপ পেয়ে গেলেন চন্দ্রশেখর। রামানুজনের পরে চন্দ্রশেখরই হলেন দ্বিতীয় ভারতীয় যিনি এই ফেলোশিপ পেলেন।  চন্দ্রশেখর বুঝতে পারলেন জ্যোতির্বিজ্ঞানে তাঁর গবেষণার স্বীকৃতি পাওয়া শুরু হয়েছে। এটাই হবে তাঁর গবেষণার মূলক্ষেত্র, অন্তত পরবর্তী চার বছর। ট্রিনিটি ফেলো হিসেবে রয়েল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটিরও ফেলোশিপ পেতে সময় লাগলো না। মাসের প্রতি দ্বিতীয় শুক্রবার কেমব্রিজ থেকে ট্রেনে করে লন্ডনে গিয়ে রয়েল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটির মিটিং এ যোগ দেয়া রুটিন হয়ে গেল ডক্টর চন্দ্রশেখরের। ১৯৩৪ সালে রাশিয়া ভ্রমণের সুযোগ এলো। রাশিয়া গিয়ে শ্বেত-বামন সংক্রান্ত তাঁর পুরনো গবেষণার ব্যাপারে আবার নতুন করে উৎসাহ জেগে উঠলো। রাশিয়ায় তিনি শ্বেত-বামন তারাদের ভরের সীমা বিষয়ক বক্তৃতা দিলেন। রাশিয়ান জ্যোতির্বিজ্ঞানী ভিক্টর এম্বার্টসুমিয়ান চন্দ্রশেখরের আবিষ্কারে খুব উৎসাহ দেখালেন এবং চন্দ্রশেখরকে বললেন এ ব্যাপারে বিস্তারিত ফলাফল প্রকাশ করতে। উঠে পড়ে লাগলেন চন্দ্রশেখর। ১৯৩৪ সালের মধ্যে দুটো পেপার তৈরি হয়ে গেলো। রিলেটিভিস্টিক কোয়ান্টাম মেকানিক্সের আলোকে শ্বেত-বামনের ভর ও ঘনত্বের সীমা নিয়ে বিস্তারিত হিসেব সহ পেপারদুটো প্রকাশের জন্য রয়েল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটিতে জমা দিলেন। 

রয়েল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটির আমন্ত্রণে ১৯৩৫ সালের জানুয়ারি মাসে সোসাইটির মাসিক সভায় বক্তৃতা দেন চন্দ্রশেখর। সভায় উপস্থিত ছিলেন স্যার এডিংটন। মহা উৎসাহে চন্দ্রশেখর ব্যাখ্যা করলেন কীভাবে শ্বেতবামন তারাগুলোর ভর একটা নির্দিষ্ট সীমা অতিক্রম করলেই তাদের ঘনত্ব অসীম হয়ে যায়। চন্দ্রশেখর আশা করেছিলেন এরকম একটা আবিষ্কারের জন্য স্যার এডিংটন তাঁর প্রশংসা করবেন। কিন্তু প্রশংসার বদলে প্রশ্নবাণে জর্জরিত হলেন চন্দ্রশেখর। প্রশ্ন উঠলো তারার ভর ক্রিটিক্যাল মাস বা সংকট ভরের বেশি হলে কী অবস্থা হবে? ঘনত্ব বাড়ার সাথে সাথে তারাগুলো যখন সংকুচিত হতে শুরু করবে তখন কী হবে? শ্বেতবামন হওয়া ছাড়া আর কোন ভাবে কি তারাগুলোর মৃত্যু ঘটে? সবার সামনে প্রায় অপমান করা হলো চন্দ্রশেখরকে। চন্দ্রশেখরের সবচেয়ে কষ্ট লাগলো এডিংটন চন্দ্রশেখরকে এ ব্যাপারে কিছুই বলেন নি। অথচ এ সংক্রান্ত চন্দ্রশেখরের প্রথম পেপারটি প্রকাশিত হয়েছে চার বছর আগে, ১৯৩১ সালে। এডিংটনের মত বিরাট মাপের মানুষ যে ভাষায় চন্দ্রশেখরের সমালোচনা করলেন তাতে খুব কষ্ট পেলেন চন্দ্রশেখর। এডিংটনের মতে যে কোন তারাই শক্তিক্ষয়ের পর একসময় প্রাকৃতিক নিয়মেই মরে যাবে। সেখানে শ্বেতবামন বা ভরের সীমার কোন শর্ত থাকতে পারে না। এডিংটন বললেন, “এই মিটিং থেকে প্রাণ নিয়ে ফিরতে পারবো কি না আমি জানি না, কিন্তু আমি আমার পেপারে পরিষ্কার ভাবে দেখিয়ে দিয়েছি যে আপেক্ষিক ক্ষয় (রিলেটিভিস্টিক ডিজেনারেসি) বলে কিছুই নেই। ডক্টর চন্দ্রশেখরও এরকম ফল আগে পেয়েছিলেন, কিন্তু তাঁর সাম্প্রতিক পেপারে ঘঁষেমেজে আপেক্ষিক ক্ষয়ের সূত্র ঢুকিয়ে দিয়েছেন। তাঁর সাথে আলোচনার পর আমি এই সিদ্ধান্তে এসে পৌঁছেছি যে এটা একটা অবাস্তব আপেক্ষিক ক্ষয়ের ফর্মূলা” [8]। 

ব্রিটিশ অ্যাস্ট্রোনমিতে এডিংটনের কথার ওপরে কথা বলার সাহসে সেই সময়ে কারো ছিল না। এডিংটন যেহেতু চন্দ্রশেখরের ফর্মূলার বিরোধিতা করলেন - কেউই সাহস পেলেন না চন্দ্রশেখরের পেপারকে সমর্থন করার। ১৯৩৫ সালে ইন্টারন্যাশনাল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ইউনিয়নের মিটিং-এ এডিংটনের মতবাদই প্রাধান্য পেলো। ১৯৩৯ সালে প্যারিসে অনুষ্ঠিত শ্বেত-বামন তারা সংক্রান্ত কনফারেন্সেও একই অবস্থা। ডিরাক  সহ আরো অনেক তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞানীর সাথে পরিচয় ছিলো চন্দ্রশেখরের। তাঁরা ব্যক্তিগতভাবে চন্দ্রশেখরের তত্ত্বের প্রতি সমর্থন জানালেও এডিংটনের সাথে প্রকাশ্যে বিরোধে জড়াতে চাইলেন না। ডিরাক ১৯৪২ সালে রিলেটিভিস্টিক কোয়ান্টাম তত্ত্বের প্রতি এডিংটনের তাচ্ছিল্যের সমালোচনা করে একটা পেপার লিখলেন, কিন্তু পেপারের কোথাও চন্দ্রশেখরের ফর্মূলার কথা উল্লেখ করলেন না। চন্দ্রশেখর কারো সাথেই কোন বিরোধে জড়াতে চাইলেন না। তিনি নীরবে সরে এলেন তাঁর ফর্মূলা থেকে। এর প্রায় দুই যুগ পর ‘চন্দ্রশেখর লিমিট’ নিজের যোগ্যতাতেই প্রতিষ্ঠিত হয় এবং বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে প্রয়োজনীয় আবিষ্কারগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হয়। চন্দ্রশেখরের সীমার চেয়ে বেশি ভরের তারাগুলোর ভবিষ্যত কী? এ প্রশ্নের উত্তর সেদিন পাওয়া না গেলেও আজ আমরা সবাই জানি যে এরা ‘নিউট্রন স্টার’ কিংবা  ‘ব্ল্যাক হোল’এ রূপান্তরিত হয় [3]। 

চন্দ্রশেখরের গবেষণার ব্যাপারে এডিংটনের ঋণাত্মক মনোভাব প্রকাশিত হয়ে পড়ার পর কেমব্রিজে স্থায়ী কোন পদে নিয়োগ পাবার সম্ভাবনা খুব ক্ষীণ হয়ে পড়লো। ১৯৩৬ সালের পর তাঁর ট্রিনিটি ফেলোশিপ শেষ হয়ে যাবে। এদিকে তাঁর বাবা চাচ্ছেন তিনি যেন দেশে ফিরে যান। বাড়ির বড় ছেলে হিসেবে পারিবারিক দায়িত্বও তো আছে অনেক। এসময় কাকা রামন খবর পাঠালেন ব্যাঙ্গালোরে ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্সে সহকারী অধ্যাপক পদে যোগ দিতে চাইলে তখুনি যোগ দিতে পারেন চন্দ্রশেখর। নোবেল পুরষ্কার পাবার পর ভারতীয় পদার্থবিজ্ঞানের জগতে রামন তখন এক বিশাল মহীরুহ। চন্দ্রশেখর ভেবে দেখলেন কাকার ছায়ায় বসে গবেষণা করলে নিজের মত করে বেড়ে ওঠা হবে না কখনো। কাকাকে ‘না’ বলে দিলেন। ভারতে যদি ফিরতেই হয় তবে অন্য কোথাও। লাহোর সরকারি কলেজে গণিতের অধ্যাপক পদের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেখে দরখাস্ত করার সিদ্ধান্ত নিলেন চন্দ্রশেখর। কিন্তু জানতে পারলেন সেই পদের জন্য ইতোমধ্যেই দরখাস্ত করেছেন চন্দ্রশেখরের বন্ধু চাওলা। চাওলা খুব ভালো গণিতবিদ। চন্দ্রশেখর চাওলাকে সুযোগ করে দেয়ার ইচ্ছেয় নিজের দরখাস্ত প্রত্যাহার করে নিলেন। কিন্তু পরে জানতে পারেন যে সেখানে চাওলার বদলে অন্য কাউকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। 

১৯৩৫ সালের সেপ্টেম্বরে হার্ভার্ড কলেজ অবজার্ভেটরির পরিচালক হারলো শ্যাপলি তিন মাসের জন্য হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকচারার পদে আমন্ত্রণ জানান চন্দ্রশেখরকে। চন্দ্রশেখর আমন্ত্রণ গ্রহণ করলেন। ১৯৩৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর থেকে ১৯৩৬ সালের ২৫ মার্চ পর্যন্ত হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করলেন চন্দ্রশেখর। ওটাই ছিল তাঁর প্রথম আমেরিকা ভ্রমণ। এই ভ্রমণ খুব ফলপ্রসূ হলো। প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে আমেরিকান অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটির মিটিং এ যোগ দিলেন চন্দ্রশেখর। সেখানকার অবজারভেটরির পরিচালকের আমন্ত্রণে দশটি বক্তৃতা দিলেন। উইসকনসিনে উইলিয়াম্‌স বে’র ইয়ের্ক্‌স অবজারভেটরি পরিদর্শন করলেন। চন্দ্রশেখরের সাথে কথা বলে পরিচালকদের সবাই খুব মুগ্ধ। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় তাদের অবজারভেটরিতে যোগ দেয়ার জন্য আহ্বান করলেন চন্দ্রশেখরকে। এদিকে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও অফার এলো  ইয়ের্ক্‌স অবজারভেটরিতে রিসার্চ এসোসিয়েট হিসেবে যোগ দেয়ার জন্য। চন্দ্রশেখর ভেবে দেখলেন শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের ইয়ের্ক্‌স অবজারভেটরিতে যাঁরা আছেন তাঁদের প্রায় সবাই চন্দ্রশেখরের মতই বয়সে তরুণ। এই পরিবেশে চন্দ্রশেখর গবেষণা করতে পারবেন অনেক স্বাচ্ছন্দ্যে। কেমব্রিজে রথি মহারথিদের ভিড়ে মাঝে মাঝে অস্বস্তি লাগতো তাঁর। শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন চন্দ্রশেখর। কিন্তু যোগ দেয়ার আগে একবার দেশে যাওয়া দরকার। সেখানে ললিতা অপেক্ষা করে আছেন চন্দ্রশেখরের জন্য। 

১৯৩৬ সালে কেমব্রিজ থেকে বাড়িতে ফিরলেন চন্দ্রশেখর। ছয় বছর পরে মাদ্রাজে ফিরে সবকিছু কেমন যেন নতুন নতুন মনে হচ্ছে চন্দ্রশেখরের। ললিতা পদার্থবিজ্ঞানে এমএসসি পাস করে ব্যাঙ্গালোরে রামনের ইনস্টিটিউটে কাজ করছিলেন। ১৯৩৬ সালের ১১ সেপ্টেম্বর ললিতার সাথে চন্দ্রশেখরের বিয়ে হলো গতানুগতিকতার বাইরে গিয়ে  নিজেদের পছন্দে। চন্দ্রশেখরের বাবা ছেলের বিয়ের সিদ্ধান্ত খুশি মনেই মেনে নিয়েছেন, কিন্তু ছেলের আমেরিকা যাবার সিদ্ধান্তে খুব একটা খুশি হতে পারেন নি। তাঁর মতে বিদেশে যদি থাকতেই হয় তাহলে ইংল্যান্ডই তো ভালো। রয়েল সোসাইটির ফেলোশিপ পাওয়ার ক্ষেত্রে আমেরিকার চেয়ে বেশি কাজে আসবে ইংল্যান্ড। আত্মবিশ্বাসী চন্দ্রশেখর বাবাকে বোঝালেন যে রয়েল সোসাইটির ফেলোশিপ তিনি আমেরিকায় বসেও পেতে পারেন। আর না পেলেও তার এমন কিছু ক্ষতি হবে না। আমেরিকায় বসেই রয়েল সোসাইটির ফেলোশিপ পেয়েছিলেন চন্দ্রশেখর ১৯৪৪ সালে। 




১৯৩৭ সালে আমেরিকায় আসেন চন্দ্রশেখর ও ললিতা। শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের ইয়ের্ক্‌স অবজারভেটরিতে কাজ শুরু করলেন চন্দ্রশেখর। কাজে যোগ দিয়েই শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে জ্যোতির্বিদ্যা ও নভোপদার্থবিজ্ঞানের গ্র্যাজুয়েট প্রোগ্রাম চালু করলেন চন্দ্রশেখর। তরুণ অধ্যাপক চন্দ্রশেখরের ব্যক্তিত্ব, মেধা, প্রজ্ঞা, শিক্ষকতায় অসাধারণ দক্ষতার কথা অচিরেই ছড়িয়ে গেলো আমেরিকার শিক্ষাজগতে। সারা দেশ থেকে প্রচুর ছাত্রছাত্রী আসতে শুরু করলো চন্দ্রশেখরের ডিপার্টমেন্টে ভর্তি হবার জন্য। ১৯৪২ সালে এসোসিয়েট প্রফেসর এবং ১৯৪৪ সালে ফুল প্রফেসর হন চন্দ্রশেখর। ১৯৫২ সালে ‘মরটন ডি হাল ডিস্টিংগুইস্‌ড সার্ভিস প্রফেসর’ হন চন্দ্রশেখর। ১৯৮৫ সালে অবসর গ্রহণের পরেও এমেরিটাস প্রফেসর হিসেবে আমৃত্যু শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়েই ছিলেন চন্দ্রশেখর। ৪৮ বছরের শিক্ষকতা জীবনে একান্ন জন গবেষক পিএইচডি ডিগ্রি পান চন্দ্রশেখরের তত্ত্বাবধানে।

হার্ভার্ড, কেমব্রিজ, এম-আই-টি, প্রিন্সটন সহ পৃথিবীর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বড় বড় অফার এলেও শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে আর কোথাও যান নি চন্দ্রশেখর। ১৯৪৪ সালে হোমি ভাবা যখন টাটা ইনস্টিটিউট অব ফান্ডামেন্টাল রিসার্চ গড়ে তুলছেন - তখন চন্দ্রশেখরকে আহ্বান জানিয়েছিলেন সেখানে যোগ দেয়ার জন্য। প্রাথমিক ভাবে রাজিও হয়েছিলেন চন্দ্রশেখর। কিন্তু শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে ফুল প্রফেসর হয়ে যাবার পর ফিরিয়ে দিয়েছিলেন ভাবার অফার। 

১৯৫৩ সালে ললিতা ও চন্দ্রশেখর সিদ্ধান্ত নিলেন আমেরিকার নাগরিকত্ব গ্রহণের। ভারতে তখনো দ্বৈতনাগরিকত্ব গ্রহণযোগ্য নয়। আমেরিকার নাগরিকত্ব গ্রহণ করার সাথে সাথে ললিতা ও চন্দ্রশেখরের ভারতীয় নাগরিকত্ব বাতিল হয়ে যায়। চন্দ্রশেখরের বাবা তাঁদের এই সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারেন নি। বাবার সাথে আর দেখা হয়নি চন্দ্রশেখরের। ১৯৬০ সালে চন্দ্রশেখরের বাবা মারা যান। ১৯৬১ সালে ভারতের জাতীয় অধ্যাপক পদে যোগ দেয়ার জন্য আহ্বান করা হয় চন্দ্রশেখরকে। কিন্তু তিনি ‘আমেরিকান নাগরিক’ এই অজুহাতে এড়িয়ে গিয়েছিলেন। ১৯৬৬ সালে বিমান দুর্ঘটনায় হোমি ভাবার মৃত্যুর পর ভারতের এটমিক এনার্জি কমিশনের চেয়ারম্যান পদে যোগ দেয়ার জন্যও প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর পক্ষ থেকে অনুরোধ করা হয় চন্দ্রশেখরকে। এবারেও চন্দ্রশেখর প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করেন। পরে তিনি নিজে গিয়ে ইন্দিরা গান্ধীর কাছে ব্যাখ্যা করেন তাঁর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের কারণ। ভারতের এটমিক এনার্জি কমিশনের চেয়ারম্যান হতে গেলে ভারতের রাজনীতিকদের সাথে ভালো বোঝাপড়া থাকা দরকার, এবং তার সাথে প্রশাসনিক কাজে অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা থাকা দরকার। চন্দ্রশেখরের তা নেই। সর্বোপরি ওই পদ নিতে গেলে তাঁকে আমেরিকান নাগরিকত্ব ত্যাগ করে আবার ভারতীয় নাগরিকত্ব নিতে হতো। আমেরিকান নাগরিক হবার কারণেই চন্দ্রশেখর নোবেল পুরষ্কার পাবার পরও ভারত তা নিজেদের বলে দাবি করতে পারে না। 

চন্দ্রশেখরের গবেষণার ধরণ ছিলো ভীষণ গোছানো। কোন একটা নির্দিষ্ট বিষয়ে আগ্রহ জন্মানোর পর পাঁচ থেকে দশ বছর সেই বিষয়ের ওপর গবেষণা করেন। তারপর প্রকাশিত গবেষণাপত্রের ভিত্তিতে একটা বই লেখেন। তারপর নতুন বিষয়ে গবেষণা শুরু করেন। এভাবে প্রধানত সাতটি বিষয়ে গবেষণা করেছেন চন্দ্রশেখর। জ্যোতির্বিজ্ঞান দিয়ে শুরু করলেও কোয়ান্টাম মেকানিক্স, রিলেটিভিটি সহ পদার্থবিজ্ঞানের মূল শাখায় চন্দ্রশেখরের অবদান অনেক। 

১৯৩৬ সালের মধ্যে ৪৩টি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয় চন্দ্রশেখরের। কেমব্রিজে নক্ষত্রের গঠন ও ধর্মাবলী নিয়ে যে গবেষণা করেছিলেন ১৯৩৬ সাল পর্যন্ত, তাদের ভিত্তিতে চন্দ্রশেখর ১৯৩৭ সালে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে লিখেন তাঁর প্রথম বই “এন ইন্ট্রোডাকশান টু দি স্টাডি অব স্টেলার স্ট্রাকচার” [9]। শিকাগো ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে বইটি প্রকাশিত হয় ১৯৩৯ সালে। তারপর ১৯৩৮ থেকে ১৯৪৩ পর্যন্ত গবেষণা করেছেন মহাকাশের গতিপ্রকৃতি নিয়ে। এই ছয় বছরে ৩৭টি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন চন্দ্রশেখর। বিশ্বব্রহ্মান্ড অসংখ্য গ্যালাক্সির সমন্বয়ে গঠিত। মহাকাশে তাদের গতি বড় এলোমেলো - অনেকটা ব্রাউনিয়ান গতির মত। চন্দ্রশেখর পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে হিসেব করে মহাকাশের আপাত বিশৃঙ্খল গতিকে গাণিতিক শৃঙ্খলায় উপস্থাপন করেছেন। তাঁর গবেষণার ভিত্তিতে ১৯৪৩ সালে প্রকাশিত হয় দুটো বই ‘প্রিন্সিপলস অব স্টেলার ডায়নামিক্স’[10] ও ‘স্টকাস্টিক প্রবলেমস ইন ফিজিক্স এন্ড অ্যাস্ট্রোনমি’ [11]। 

১৯৪৩ সাল থেকে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত চন্দ্রশেখর গবেষণা করেন মহাকাশের আবহাওয়া ও পরিবেশ নিয়ে। উত্তর শক্তির বিকিরণ কীভাবে সঞ্চালিত হয় এক নক্ষত্র থেকে অন্য নক্ষত্রে কিংবা মহাকাশে - তার উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেন। এতে যুক্ত হয় মহাকাশের পরিবেশ, হাইড্রোজেনের ঋণাত্মক আয়নের কোয়ান্টাম তত্ত্ব, সূর্যালোকের উপস্থিতিতে মহাকাশে আলোর দীপ্তি ও মেরুকরণ। এই সাত বছরে ৬৪টি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয় তাঁর। এসবের ভিত্তিতে ১৯৫০ সালে প্রকাশিত হয় চন্দ্রশেখরের চতুর্থ বই “রেডিয়েটিভ ট্রান্সফার” [12]। 

১৯৫০ থেকে ১৯৬১ পর্যন্ত গবেষণা করেন হাইড্রোডায়নামিক ও হাইড্রোম্যাগনেটিক স্থায়ীত্ব বিষয়ে। মহাকাশে গ্রহাণু থেকে শুরু করে গ্যালাক্সির গতিপ্রকৃতি কেমন হবে যদি সেখানে চৌম্বকক্ষেত্রের উপস্থিতি থাকে। এই দশ বছরে তাঁর ৮৫টি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়। ১৯৬১ সালে প্রকাশিত হয় এ সংক্রান্ত বই “হাইড্রোডায়নামিক এন্ড হাইড্রোম্যাগনেটিক স্ট্যাবিলিটি” [13]। তারপর পরবর্তী সাত বছরে আরো ৬৪টি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয় চন্দ্রশেখরের। এগুলোর ভিত্তিতে ১৯৬৮ সালে ইয়েল ইউনিভার্সিটি থেকে প্রকাশিত হয় “এলিপসোইডাল ফিগার্‌স অব ইকুইলিব্রিয়াম” [14]। একাডেমিক জীবনের শেষের দিকে এসে আপেক্ষিকতার সার্বিক তত্ত্ব ও আপেক্ষিক জ্যোতির্বিদ্যা সংক্রান্ত গবেষণায় মন দেন। এর ভিত্তিতে ব্ল্যাক-হোলের গাণিতিক তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করেন চন্দ্রশেখর। শারীরিক ভাবে অসুস্থ হয়ে যাবার পরেও ১৯৬৯ থেকে ১৯৮২ সালের মধ্যে আরো ৬৬টি গবেষণা পত্র রচনা করেন তিনি। ১৯৮৩ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর সপ্তম বই “দি ম্যাথমেটিক্যাল থিওরি অব ব্ল্যাক হোল্‌স” [15]। চার শতাধিক গবেষণাপত্র রচনা করেন চন্দ্রশেখর তাঁর ৫৫ বছরের গবেষণা জীবনে। জীবনের শেষের দিকে এসে ১৯৮৭ সালে প্রকাশিত হয় গবেষণার বাইরে ভিন্ন বিষয়ের বই ‘ট্রুথ এন্ড বিউটি’। 


ন্যাশনাল মেডেল অব সায়েন্স


১৯৩০ সালে ইন্ডিয়া গভমেন্টের বিশেষ স্কলারশিপের মাধ্যমে শুরু হয়েছিল চন্দ্রশেখরের প্রতিভার স্বীকৃতি। তারপর ১৯৩৩ সালে ট্রিনিটি ফেলোশিপ, ১৯৪৪ সালে রয়েল সোসাইটির ফেলোশিপ, ১৯৪৭ সালে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাডাম’স প্রাইজ, ১৯৫২ সালে অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটির ব্রুস গোল্ড মেডেল, ১৯৫৩ সালে রয়েল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটির গোল্ড মেডেল, ১৯৫৫ সালে ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্সের মেম্বারশিপ, ১৯৫৭ সালে আমেরিকান একাডেমি অব আর্টস এন্ড সায়েন্সের রামফোর্ড মেডেল, ১৯৬২ সালে রয়েল সোসাইটির রয়েল মেডেল এবং ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল সায়েন্স একাডেমির শ্রীনিবাস রামানুজন মেডেল, ১৯৬৬ সালে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট কর্তৃক ন্যাশনাল মেডেল অব সায়েন্স, ১৯৬৮ সালে ভারতের পদ্মবিভূষণ, ১৯৭১ সালে ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্সের হেনরি ড্রেপার মেডেল, ১৯৭৩ সালে পোলিশ ফিজিক্যাল সোসাইটির স্মোলুকাউস্কি মেডেল, ১৯৭৪ সালে আমেরিকান ফিজিক্যাল সোসাইটির ড্যানি হেইনম্যান প্রাইজ, ১৯৮৩ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার, ১৯৮৪ সালে রয়েল সোসাইটির কোপলে মেডেল, জুরিখের ডক্টর টোমালা প্রাইজ, ইন্ডিয়ান ফিজিক্যাল এসোসিয়েশানের বিড়লা মেমোরিয়েল এওয়ার্ড। 


নোবেল পুরষ্কার


প্রচন্ড রকমের নিয়মনিষ্ঠ ছিলেন চন্দ্রশেখর। ভোর পাঁচটা থেকে দিন শুরু হতো তাঁর। দিনে তেরো ঘন্টা কাজ করতেন নিয়মিত। ১৯৫০ সাল থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত অ্যাস্ট্রোফিজিক্যাল জার্নালের সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন নিষ্ঠার সাথে। এই সময় এই জার্নালকে সেরা মানের জার্নালে রূপান্তরিত করেন তিনি। গবেষণাপত্রের মানের ব্যাপারে কখনো আপোষ করেন নি তিনি। অনেক প্রসিদ্ধ বিজ্ঞানীর লেখাও তিনি মানসম্মত না হওয়ায় বাতিল করে দিয়েছেন। ফলে অনেকেই তাঁকে এড়িয়ে চলতেন। গবেষণার ক্ষেত্রেও কোন ধরণের অবহেলা বা বিচ্যুতি সহ্য করতেন না তিনি। গবেষণার মানে ঘাটতি দেখলে তিনি কঠোর ভাষায় সমালোচনা করতেন। ফলে সেমিনারে তাঁর উপস্থিতি অনেকের কাছেই আরামদায়ক মনে হতো না। কিন্তু ভালো কাজের প্রশংসা করতে কার্পণ্য করতেন না কখনো। পোশাকের ব্যাপারে চন্দ্রশেখর ছিলেন ভীষণ ফর্মাল। শীত-গ্রীষ্ম যে কোন ঋতুতেই স্যুট-টাই। একবার লস আলামোসের প্রচন্ড গরমে সবাই মিলে পাহাড়ে ওঠার প্রোগ্রামেও তিনি স্যুট-টাই পরে উপস্থিত হয়েছিলেন। 

চন্দ্রশেখর ও ললিতা নিঃসন্তান ছিলেন। তাই শিশুদের প্রতি তাঁদের প্রচন্ড স্নেহ ভালবাসা প্রকাশ পেতো। চন্দ্রশেখর তাঁর সহকর্মীদের ছেলে-মেয়েদের সাথে শিশুর মত মিশতেন। এক্ষেত্রে তাঁর ফর্মালিটির বিচ্যুতি ঘটতো। 



বিজ্ঞানীদের মধ্যে স্যার আইজাক নিউটন ছিলেন চন্দ্রশেখরের আদর্শ। অবসর নেয়ার পর নিউটনের ‘প্রিন্সিপিয়া’ সাধারণ পাঠকের উপযোগী করে সহজ ভাষায় লেখার কাজে হাত দেন চন্দ্রশেখর। তাঁর মতে “ভৌতবিজ্ঞানের কোন শিক্ষার্থীর নিউটনের ‘প্রিন্সিপিয়া’ সম্পর্কে না জানা সাহিত্যের কোন শিক্ষার্থীর শেক্‌সপিয়ারকে না জানার সমান” [2]। ১৯৯৫ সালে ‘নিউটন’স প্রিন্সিপিয়া ফর দি কমন রিডার’ প্রকাশের পর চন্দ্রশেখর মন্তব্য করেছিলেন - “আমার কাজ শেষ। অনেক দিন বাঁচা হলো। এবার মরে গেলেও কোন সমস্যা নেই” [16]। এর কিছুদিন পরেই ২১ শে আগস্ট তারিখে চন্দ্রশেখর মারা যান। 

তথ্যসূত্র:
1. Press Release: CXC PR:98-04. NASA Names Premier X-Ray Observatory and Schedules Launch, chandra.harvard.edu/press/98_releases/press_122198.html.  1998  [cited 11/12/2011].
2. Freeman Dyson, Chandrashekhar's role in 20th-century science. Physics Today, 2010. 63(12): p. 44-48.
3. Kameshwar C. Wali, Chandra: A biographical portrait. Physics Today, 2010. 63(12): p. 38-43.
4. S Chandrashekhar, Thermodynamics of the Compton Effect with reference to the interior of the stars. Indian Journal of Physics 1928. 3: p. 241-250.
5. S Chandrashekhar, The Compton scattering and the new statistics. Proc. Roy. Soc. Lond. , 1929. A125: p. 231-237.
6. S Chandrashekhar, The maximum mass of ideal white dwarfs. Astrophysical Journal, 1931. 74: p. 81-82.
7. শ্যামল চক্রবর্তী, বিশ্বসেরা বিজ্ঞানী. ১৯৯৯, কলকাতা: শিশু সাহিত্য সংসদ.
8. R. J. Tayler, Subrahmanyan Chandrashekhar. Biographical memoirs of fellows of the royal society, 1996. 42(November ): p. 80-94.
9. S Chandrashekhar, An introduction to the study of stellar structure 1939, Chicago: University of Chicago Press.
10. S Chandrashekhar, Principles of stellar dynamics. 1943, Chicago: University of Chicago Press.
11. S Chandrashekhar, Stochastic problems in Physics and Astronomy. 1943, Chicago: University of Chicago Press.
12. S Chandrashekhar, Radiative Transfer. 1950, Oxford: Clarendon Press.
13. S Chandrashekhar, Hydrodynamic and Hydormagnetic stability. 1961, Oxford: Clarendon Press.
14. S Chandrashekhar, Elliopsoidal Figures of Equilibrium. 1968: Yale University Press.
15. S Chandrashekhar, The mathematical theory of black holes. 1983, Oxford: Clarendon Press.
16. Kameshwar C. Wali, Chandra A biography of S. Chandrashekhar. 1991, Chicago: The University of Chicago Press.

________
লেখাটি আমার  'উপমহাদেশের এগারজন পদার্থবিজ্ঞানী' বইতে প্রকাশিত হয়েছে।


Wednesday, 17 October 2018

আলফ্রেড নোবেলের উইল এবং নোবেল পুরষ্কার



পৃথিবীর সবচেয়ে সম্মানজনক এবং শক্তিশালী পুরষ্কারের নাম জিজ্ঞেস করলে বেশিরভাগ মানুষ নোবেল পুরষ্কারের কথাই বলেন। ১৯০১ সাল থেকে শুরু হয়ে প্রতিবছর পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, চিকিৎসাবিজ্ঞান, সাহিত্য ও শান্তিতে অবদানের জন্য নোবেল পুরষ্কার দেয়া হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান, ও রসায়নের গবেষণায় সাফল্যের সর্বোচ্চ স্বীকৃতি নোবেল পুরষ্কার। সাহিত্যে যিনি নোবেল পুরষ্কার পান - তাঁর পাঠকপ্রিয়তা অনেক সময় হঠাৎ করেই বেড়ে যায়। বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার কাজে সহায়তার জন্য নোবেল শান্তি পুরষ্কার পান যে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান - নোবেল পুরষ্কার পাবার সাথে সাথে সেই ব্যক্তির বা প্রতিষ্ঠানের গুরুত্ব ও মর্যাদা বেড়ে যায় অনেকগুণ; অনেক ক্ষেত্রে তাঁদের রাজনৈতিক ক্ষমতাও বেড়ে যায়। অবশ্য সাহিত্য ও শান্তিতে নোবেল পুরষ্কার যাঁরা পান তাঁদের নিয়ে অনেক সময় নানারকম বিতর্কও তৈরি হয়। তবে সেই বিতর্কে নোবেল পুরষ্কারের মর্যাদা একটুও কমে না, বরং বেড়ে যায়। এমন মর্যাদাকর পুরষ্কার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যাঁর সারাজীবনের সঞ্চিত অর্থ ও সম্পদে - তিনি আলফ্রেড নোবেল। ১৯৬৮ সাল থেকে আলফ্রেড নোবেলের সম্মানে অর্থনীতিতেও পুরষ্কার দেয়া হচ্ছে। কিন্তু অর্থনীতির পুরষ্কার মূল নোবেল পুরষ্কার নয়। নোবেলের উইলে অর্থনীতিতে পুরষ্কার দেয়ার কোন কথা ছিল না এবং নোবেলের সঞ্চিত অর্থ-সম্পদ থেকেও অর্থনীতির পুরষ্কারের অর্থ দেয়া হয় না। 

১৮৯৫ সালের ২৭ নভেম্বর তারিখে আলফ্রেড বার্নহার্ড নোবেল তাঁর উইলে স্বাক্ষর করেছিলেন। সুইডিশ ভাষায় হাতে লেখা চার পৃষ্ঠার উইলে নোবেলের সারাজীবনের সঞ্চিত ধন-সম্পদের বিলিবন্টনের ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট নির্দেশ আছে। দেখা যাক আলফ্রেড নোবেলের উইলে ঠিক কী কী লেখা আছে। মূল সুইডিশ থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেছে নোবেল কমিটি। আমি ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদ করলাম। 







উইলের পূর্ণ-বিবরণ:

আমি, নিম্নস্বাক্ষরকারী, আলফ্রেড বার্নহার্ড নোবেল, এই মর্মে সজ্ঞানে স্বেচ্ছায় ঘোষণা করছি যে আমার মৃত্যুর পর আমার অর্জিত সম্পদের বিলি-বন্টন সম্পর্কে এখানে বর্ণিত বিবরণই হবে আমার অন্তিম ইচ্ছা।  আমার মৃত্যুর পর:

আমার ভাই রবার্ট নোবেলের দুই ছেলে হালমার নোবেল ও লুডভিগ নোবেল - তাদের প্রত্যেককে আমি দুই লক্ষ ক্রাউন করে দিয়ে যাচ্ছি। 

আমার ভাতিজা ইমানুয়েল নোবেলকে দেয়া হবে তিন লক্ষ ক্রাউন, এবং আমার ভাইঝি মিনা নোবেলকে দেয়া হবে এক লক্ষ ক্রাউন। 

আমার ভাই রবার্ট নোবেলের মেয়ে - ইনগিবোর্গ ও টায়রা - দুজনের প্রত্যেককে এক লক্ষ ক্রাউন করে দেয়া হবে। 

বর্তমানে প্যারিসের সেন্ট ফ্লোরেন্টিন রোডের ১০ নম্বর বাড়িতে মিসেস ব্র্যান্ডের সাথে অবস্থানরত মিসেস ওলগা বোয়েতগারকে দেয়া হবে এক লক্ষ ফ্রাংক। 

মিসেস সোফি ক্যাপি ভন ক্যাপিভার যতদিন বেঁচে থাকবেন ততদিন তাঁকে বছরে ছয় হাজার হাঙ্গেরিয়ান ফ্লোরিন দেয়া হবে। তাঁর ঠিকানা ভিয়েনার অ্যাংলো-ওয়েস্টেরেইসিসে ব্যাংকে দেয়া আছে। ঐ ব্যাংকই তাঁর কাছে তাঁর বাৎসরিক বরাদ্দ পাঠিয়ে দেবেন। সেজন্য আমি হাঙ্গেরিয়ান স্টেট বন্ডের মাধ্যমে ঐ ব্যাংকে দেড় লক্ষ ফ্লোরিন জমা রেখেছি।

বর্তমান স্টকহোমের ২৬ নম্বর স্টুরগ্যাটেন নিবাসী মিস্টার আলারিক লিয়েদবেককে দেয়া হবে এক লক্ষ ক্রাউন। 

বর্তমানে প্যারিসের দ্য লুবেক রোডের ৩২ নম্বর বাড়িতে অবস্থানরত মিস এলিস অ্যান্টুন যতদিন বেঁচে থাকবেন বছরে আড়াই হাজার ফ্রাংক করে পাবেন। তাছাড়া তাঁর নিজের যে আটচল্লিশ হাজার ফ্রাংক বর্তমানে আমার কাছে জমা আছে তাও তাঁকে ফেরত দেয়া হবে। 

আমেরিকার টেক্সাসের ওয়াটারফোর্ড নিবাসী মিস্টার আলফ্রেড হ্যামন্ডকে দেয়া হবে দশ হাজার আমেরিকান ডলার। 

মিস এমি উইংকেলমান ও মিস মেরি উইংকেলমান, ঠিকানা: ৫১ পটসড্যামারেস্ট্রেসে, বার্লিন। এই দুজনকে পঞ্চাশ হাজার ফ্রাংক করে দেয়া হবে। 

মিসেস গাউসের, ঠিকানা: ২ বিস বুলেভার্ড দু ভিয়াদুক, নিমস, ফ্রান্স; পাবেন এক লক্ষ ফ্রাংক। 

আমার  স্যান রেমোর ল্যাবোরেটরিতে কর্মরত আমার কর্মচারী অগাস্তে অসওয়ার্ল্ড ও তার স্ত্রী আলফন্সে টুরন্যান্ড - দুজনের প্রত্যেকে আজীবন বছরে এক হাজার ফ্রাংক করে পাবেন। 

আমার প্রাক্তন কর্মচারী জোসেফ গিরারডট, ঠিকানা: ৫ প্লেস স্ট্রিট, লরেন্ট, সালোন্‌স স্যু সাওন যতদিন বেঁচে থাকবে বছরে পাঁচ শত ফ্রাংক করে পাবে। 

আমার প্রাক্তন মালী জাঁ লেকফ, বর্তমান ঠিকানা: মিসেস ডেসোট্টার, রিসেভ্যুর কুরালিস্তে, মেসনিল, অউব্রি পাওর ইকোওয়েন, এস এন্ড ও, ফ্রান্স; যতদিন বেঁচে থাকবে বছরে তিন শত ফ্রাংক করে পাবে। 

মিস্টার জর্জেস ফারেনবাখ, ঠিকানা: ২, রু কম্পিয়েঁজ, প্যারিস; ১লা জানুয়ারি ১৮৯৬ থেকে ১লা জানুয়ারি ১৮৯৯ পর্যন্ত বছরে পাঁচ হাজার ফ্রাঙ্ক করে অবসরভাতা পাবেন। 

আমার ভাইয়ের ছেলেমেয়ে হালমার, লুডভিগ, ইনগিবার্গ ও টায়রা - তাদের প্রত্যেকের জন্য বিশ হাজার ক্রাউন করে আমার কাছে জমা আছে। তাদের প্রত্যেককে এই অর্থ ফেরত দেয়া হবে। 

আমার বাকি সব সম্পদের বিলিবন্টন করা হবে এভাবে:

আমার মূলধন যা আমার নির্বাহী কর্মকর্তারা নিরাপদে বিনিয়োগ করেছেন তা দিয়ে একটা তহবিল গঠন করা হবে। এই তহবিল থেকে বার্ষিক যে সুদ পাওয়া যাবে তা প্রতি বছর পুরষ্কার হিসেবে ভাগ করে দেয়া হবে তাদেরকে যাঁরা আগের বছর মানুষের কল্যাণে সর্বোচ্চ অবদান রেখেছেন। বার্ষিক অর্জিত মোট সুদকে সমান পাঁচ ভাগে ভাগ করে: এক ভাগ দেয়া হবে সেই ব্যক্তিকে যিনি পদার্থবিজ্ঞানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার বা উদ্ভাবন করবেন; এক ভাগ দেয়া হবে সেই ব্যক্তিকে যিনি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাসায়নিক আবিষ্কার বা উন্নয়ন করবেন; এক ভাগ দেয়া হবে সেই ব্যক্তিকে যিনি শরীরতত্ত্ব কিংবা চিকিৎসাবিজ্ঞানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার করবেন; এক ভাগ দেয়া হবে সেই ব্যক্তিকে যিনি কোন আদর্শ স্থাপনের লক্ষ্যে সাহিত্যে সবচেয়ে ভালো কাজ করবেন; এবং এক ভাগ দেয়া হবে সেই ব্যক্তিকে যিনি দুটি দেশের মধ্যে বন্ধুত্ব সৃষ্টির লক্ষ্যে, সেনাবাহিনীর বিলুপ্তি বা সৈন্যসংখ্যা কমানোর লক্ষ্যে, শান্তি সম্মেলনের আয়োজন ও প্রচারের লক্ষ্যে সবচেয়ে বেশি কিংবা সবচেয়ে ভালো কাজ করবেন। 

পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়নের পুরষ্কার দেবে সুইডিশ অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেস; শরীরতত্ত্ব কিংবা চিকিৎসাবিজ্ঞানের পুরষ্কার দেবে স্টকহোমের ক্যারোলিন ইন্সটিটিউট; সাহিত্যের পুরষ্কার দেবে অ্যাকাডেমি ইন স্টকহোম; এবং শান্তি পুরষ্কার দেবে নরওয়ের পার্লামেন্ট (স্টরটিং) কর্তৃক নিয়োজিত পাঁচ সদস্যের এক কমিটি। 

এই পুরষ্কার দেয়ার জন্য মনোনয়নের ক্ষেত্রে কোন ধরনের জাতীয়তার প্রতিবন্ধকতা থাকবে না; স্ক্যানডিন্যাভিয়ান হোক বা না হোক, যোগ্যতম ব্যক্তিই এই পুরষ্কার পাবে এটাই আমার ইচ্ছা। 

আমার উইল কার্যকর করার জন্য আমি দু'জন নির্বাহী কর্মকর্তা নিয়োগ করছি: মিস্টার র্যা গনার শোলম্যান, ঠিকানা: বফর্স, ভার্মল্যান্ড; এবং মিস্টার রুডল্‌ফ লিজেকুইস্ট, ঠিকানা: ৩১ মাল্মস্কিলন্যাডসগ্যাটান, স্টকহোম ও বেংগটস্ফোরে উড্ডেভেলার কাছে। এই কাজের জন্য তাঁরা যে কষ্ট করবেন তার ক্ষতিপূরণ হিসেবে মিস্টার র্যাগগনার শোলম্যানকে এক লক্ষ ক্রাউন দিচ্ছি কারণ তাঁকেই এই কাজে বেশি সময় দিতে হবে; এবং মিস্টার রুডল্‌ফ লিজেকুইস্টকে পঞ্চাশ হাজার ক্রাউন দিচ্ছি। 

বর্তমানে আমার সম্পদের মধ্যে আছে কিছু অংশ আছে প্যারিস এবং সেন্ট রেমোতে রিয়েল এস্টেট হিসেবে; আর আমানত হিসেবে জমা আছে: ইউনিয়ন ব্যাংক অব স্টকল্যান্ডের গ্লাসগো এবং লন্ডন শাখায়; প্যারিসের কম্পটয়ের ন্যাশনাল ডি-স্কম্পটি, এবং আলফেন মেসিন অ্যান্ড কোম্পানিতে; প্যারিসের স্টকব্রোকার এম ভি পিটার অব ব্যাংক ট্রান্স-আটলান্টিকে; বার্লিনের ডিরেকশান ডার ডিসকনটো গেশেলস্ক্রাফ্‌ট  এবং জোসেফ গোল্ডস্মিডট অ্যান্ড কোম্পানিতে; রাশিয়ান সেন্ট্রাল ব্যাংকে এবং পিটারসবুর্গে মিস্টার ইমানুয়েল নোবেলের কাছে; গুটেনবার্গ ও স্টকহোমে স্ক্যানডিনাভিস্কা ক্রেডিট আক্টিয়েবোলাগেটে; এবং প্যারিসের ৫৯ নম্বর মালাকফ অ্যাভিনিউতে রক্ষিত আমার স্ট্রং-বক্সে। এগুলো ছাড়াও আছে প্যাটেন্ট, প্যাটেন্ট ফি বা রয়্যালটি থেকে আয়। আমার নির্বাহীরা এই  হিসেবের পূর্ণ বিবরণ আমার দলিলপত্র থেকে খুঁজে বের করবেন। 

আমার এই উইলটিই হলো একমাত্র বৈধ উইল। আমার মৃত্যুর পর যদি এর আগে করা কোন উইল খুঁজে পাওয়া যায় তাহলে সেগুলো বৈধ বলে গণ্য হবে না। 

সবশেষে আমার বিশেষ ইচ্ছা এই যে আমার মৃত্যুর পর কোন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার আমার শিরা কেটে দেখবেন এবং আমার মৃত্যুর ব্যাপারে নিশ্চিত হবেন। তারপর আমার দেহ কোন শ্মশানে নিয়ে গিয়ে পুড়িয়ে ফেলা হবে। 

স্বাক্ষর
প্যারিস, ২৭ নভেম্বর, ১৮৯৫
আলফ্রেড বার্নহার্ড নোবেল
_____________
আমরা নিম্নস্বাক্ষরকারীগণ এই মর্মে ঘোষণা করছি যে মিস্টার আলফ্রেড বার্নহার্ড নোবেল সুস্থ মস্তিষ্কে, স্বেচ্ছায় ঘোষণা করেছেন যে উপরে বর্ণিত উইলটি তাঁর শেষ উইল। তিনি আমাদের সবার সামনে উইলে স্বাক্ষর করেছেন, এবং আমরাও সবাই সবার সামনে উইলে স্বাক্ষর করলাম। 

সিগার্ড এরেনবোর্গ
অবসরপ্রাপ্ত ল্যাফটেন্যান্ট
প্যারিস: ৮৪ বুলেভার্ড হাউসম্যান

আর ডাব্লিউ স্ট্রেলেনার্ট
সিভিল ইঞ্জিনিয়ার
৪, প্যাসেজ ক্যারোলিন

থস নরডেনফেল্ট
কনস্ট্রাক্টর
৮, রু অবার, প্যারিস

লিওনার্ড হাওয়াস
সিভিল ইঞ্জিনিয়ার
৪, প্যাসেজ ক্যারোলিন

Sunday, 14 October 2018

আইরিন কুরি - দশম পর্ব (শেষ পর্ব)


রাতে হেলেন আর পিয়ের ঘুমিয়ে পড়লে ফ্রেড আইরিনকে বললেন, “ব্যাকপ্যাকগুলো গুছিয়ে নাও। আমরা কাল সকালেই বেরিয়ে পড়বো।”
“কোথায় যাবো আমরা?”
“সুইজারল্যান্ডে। গোপনে চলে যেতে হবে আমাদের। অবস্থা কিন্তু আরো খারাপ হবে।”
“পালিয়ে যাবো?”
“উপায় নেই। ছেলে-মেয়েদের কথা তো ভাবতে হবে। জার্মানরা পরাজয় আঁচ করতে পারছে। ওরা এখন ফরাসি বিজ্ঞানীদের সবাইকে মেরে ফেলার পরিকল্পনা করছে। ফ্রান্সকে মেধাশূন্য করে দেয়ার পরিকল্পনা করছে তারা। কিন্তু আমাদের তো দায়িত্ব আছে - দেশের জন্য নিজেদের বাঁচিয়ে রাখা। ভেবে দেখো আইরিন। আমাদের কী করা উচিত?”
আইরিন বুঝতে পারলেন। চারজনের দরকারি জিনিসপত্র গুছিয়ে ব্যাকপ্যাক রেডি করে রাখলেন। খুব ভোরে উঠে ছেলে-মেয়ে আর স্বামীর হাত ধরে বেরিয়ে পড়লেন সুইজারল্যান্ডের উদ্দেশ্যে। 
ফ্রান্স আর সুইজারল্যান্ডের সীমান্তে গিয়ে ফ্রেড আইরিনের হাত ধরে বললেন, “এবার আমি তোমাদের কাছ থেকে বিদায় নেবো আইরিন।”
“তুমি যাবে না আমাদের সঙ্গে?”
“না। আমি এখান থেকে ফ্রন্টে চলে যাবো। আমি একজন সৈনিক। আমাদের রেজিস্ট্যান্স ফোর্স সীমান্তে অপেক্ষা করছে। আমেরিকান সৈন্যরা আসতে শুরু করেছে। আমরা তাদের সাথে যোগ দেবো। তোমরা অন্য সবার সাথে নিরাপদেই সুইজারল্যান্ডে চলে যাবে। আশা করি যুদ্ধের পর দেখা হবে আমাদের।”
আইরিন জানেন ফ্রেডকে বাধা দেয়া যাবে না। হেলেন আর পিয়েরকে আদর করে বিদায় নিয়ে চলে গেলেন ফ্রেড। 
ছেলে-মেয়েদের নিয়ে আইরিনের সুইজারল্যান্ডে পৌঁছানোর খবর কীভাবে যেন প্রচারিত হয়ে গেছে বহির্বিশ্বে। আমেরিকার ‘মেরি কুরি ট্রাস্ট ফান্ড’ তাঁদের জন্য বেশ কিছু ডলার পাঠিয়ে দিয়েছে। ১৯২১ সালে মেরি কুরিকে রেডিয়াম উপহার দেয়ার জন্য ফান্ড গঠন করেছিলেন মেসি মেলোনি। সেখানে যা কিছু অবশিষ্ট ছিল সব আইরিনকে পাঠিয়ে দিয়েছেন তাঁরা। মায়ের মৃত্যুর পরেও এই দুঃসময়ে মায়ের দান এসে গেছে আইরিনের হাতে। 
১৯৪৪-এর ডিসেম্বরে জার্মান সৈন্যরা ফ্রান্স ছেড়ে চলে গেলো। আইরিনরা সবাই প্যারিসে ফিরে এলেন। ১৯৪৫-এ আমেরিকা পারমাণবিক বোমা বানালো। হিরোশিমা-নাগাসাকি ধ্বংস হয়ে গেলো পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণে। নিউক্লিয়ার ফিশান প্রক্রিয়া কাজে লাগিয়ে এই বোমাগুলো বানানো হয়েছে। আইরিন নিজেও ফিশান প্রক্রিয়া আবিষ্কারের সাথে জড়িত ছিলেন। নিজেকে এ কারণে অপরাধী মনে করতে শুরু করেছেন তিনি। 
যুদ্ধের পর ফ্রেড ফ্রান্সের হিরো হয়ে গেলেন। ‘কমান্ডার অব দি লিজিয়ন অব অনার’ নিযুক্ত হলেন তিনি। ১৯৪৬ সালে পারমাণবিক শক্তির নিয়ন্ত্রণের জন্য ‘অ্যাটমিক এনার্জি কমিশন’ গঠিত হলো। ফ্রেড কমিশনের চেয়ারম্যান নিযুক্ত হলেন, আইরিন কমিশনের সদস্য মনোনীত হলেন। ফ্রেড কমিশনের প্রশাসনিক কাজে তাঁর দক্ষতার ছাপ রাখতে শুরু করেছেন, আইরিন বৈজ্ঞানিক দিক দেখাশোনা করেন। 
পারমাণবিক শক্তি প্রকল্পের কাজ চলছে। ফ্রান্স ইউরোপের প্রথম অ্যাটমিক রিঅ্যাক্টর স্থাপনের কাজ হাতে নিয়েছে। প্রথম প্ল্যান্টের নাম দেয়া হয়েছে জোয়ি (ZOE)। হেভি ওয়াটার আর ইউরেনিয়াম ১৯৩৯ সালেই সংগ্রহ করে রেখেছিলেন ফ্রেড। এখন নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে পুরোদমে। 
বিশ্ব-শান্তি প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে জড়িত হচ্ছেন ফ্রেডেরিক ও আইরিন। তেজষ্ক্রিয়তার শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের প্রতি জোর দিচ্ছেন তাঁরা। আমেরিকার ‘অ্যান্টি-ফ্যাসিস্ট রিফিউজি কমিটি’র আমন্ত্রণে স্প্যানিশ রিফিউজিদের সাহায্যের জন্য ১৯৪৮ সালের মার্চে আমেরিকা গেলেন আইরিন। 
আগে মায়ের সাথে যখন গিয়েছিলেন বিপুল সম্বর্ধনা পেয়েছিলেন আমেরিকায়। কিন্তু এবার অন্যরকম অভিজ্ঞতা হলো তাঁর। প্যারিস থেকে বিমানে নিউইয়র্কের লা গোয়ার্ডিয়া এয়ারপোর্টে ইমিগ্রেশন অফিসারেরা আইরিনকে আটক করে এলিস আইল্যান্ডের হাজতে নিয়ে গেলেন। আইরিন তাঁর স্বভাব মতই শান্ত। হাজতে রাত কাটাতে গিয়ে আবিষ্কার করলেন সেখানকার ব্যবস্থা খুব একটা ভালো নয়। 
পরদিন ফরাসি দূতাবাসের কর্মকর্তারা ছুটে এলেন। ফরাসি সরকার তীব্র নিন্দা জানালেন এই ঘটনার। নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী, ফ্রান্সের অ্যাটমিক এনার্জি কমিশনের সদস্য, কমিশনের চেয়ারম্যানের স্ত্রী, রেডিয়াম ইনস্টিটিউটের ডিরেক্টর আইরিন কুরিকে আটকে রাখায় আমেরিকান সরকারের বিরুদ্ধে নিন্দার ঝড় উঠলো। উপর মহলের আদেশে আইরিনকে ছেড়ে দেয়া হলো। কী কারণে তাঁকে আটক করা হয়েছিল তা কর্তৃপক্ষ না জানালেও সবাই অনুমান করলেন যে কমিউনিস্ট সন্দেহে আইরিনকে আটক করা হয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আমেরিকা কমিউনিস্ট আতঙ্কে ভুগতে শুরু করেছে। 
এলিস আইল্যান্ডের হাজত থেকে বেরিয়ে আইরিন একটা টেক্সি নিয়ে চলে গেলেন রিফিউজি কমিটির অফিসে। তাঁরা তো ভীষণ অবাক। আগের দিন তাঁরা এয়ারপোর্টে গিয়ে ফিরে এসেছেন। 
“মাদাম আপনি নিজেই চলে এসেছেন! আমাদের ফোন করলে তো আমরা গিয়ে নিয়ে আসতাম আপনাকে।”
“নিয়ে আসতে হবে কেন? আমার কাছে তো ঠিকানা আছে আপনাদের।”
আইরিন রিফিউজিদের সমর্থনে বেশ কিছু সমাবেশে বক্তৃতা করলেন। তারপর প্রিন্সটনে আইনস্টাইনের সাথে দেখা করলেন। আইনস্টাইনও বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার একজন জোরালো সমর্থক। 

আইরিন জুলিও-কুরি ও আইনস্টাইন


১৯৪৮ সালে আইরিন ও ফ্রেডের মেয়ে হেলেন একুশ বছরের তরুণী। সরবোন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি পাস করেছে। রূপে গুণে অদ্বিতীয়া হেলেন ভালোবাসে সহপাঠী মাইকেলকে। মাইকেল পল লাঁজেভির নাতি (ছেলের ছেলে)। মাদাম কুরির নাতনির সাথে মঁসিয়ে লাঁজেভির নাতির বিয়ে - এর চেয়ে ভালো সম্পর্ক আর কী হতে পারে? 

১৯৪৮ সালের ৪ঠা নভেম্বর হেলেন আর মাইকেলের বিয়ে হয়ে গেলো। আইরিন তখন ভীষণ অসুস্থ। ম্যাস্টয়ডাইটিসে ভুগছিলেন। অপারেশন দরকার। কিন্তু মেয়ের বিয়ের জন্য অপারেশন পিছিয়ে দিয়েছিলেন। হেলেনের বিয়ের পরেই অপারেশন হলো আইরিনের। মাথায় ব্যান্ডেজ নিয়েই বাড়িতে চলে এলেন তিনি। 
ফ্রেড পারমাণবিক প্রকল্পের কাজ প্রায় শেষ করে এনেছেন। ১৯৪৮ সালের ডিসেম্বরে চালু হলো পাঁচ কিলোওয়াট শক্তি সম্পন্ন ‘জোয়ি’। এই প্রাথমিক প্রকল্পের সাফল্য বড় মাপের প্রকল্প হাতে নিতে সহায়তা করলো। ক্রমে ক্রমে ফ্রান্সের বিদ্যুৎ শক্তির সিংহভাগ পারমাণবিক শক্তি থেকেই উৎপাদিত হয় যার সূচনা করেছিলেন ফ্রেডেরিক জুলিও-কুরি। 
প্রত্যেক গ্রীষ্মকালেই লা’কোয়েস্টে ছুটি কাটাতে যান ফ্রেড ও আইরিন। সেখানে তাঁরা একটা অ্যাপার্টমেন্ট কিনে ‘কুরি হাউজ’ নাম দিয়েছেন। বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিয়ে, মাছ ধরে আনন্দে কাটে কয়েক দিন। ১৯৪৯ সালের এমনি এক দিনে আড্ডায় আলোচনা হচ্ছিলো প্রেম-ভালোবাসা বিষয়ে। ফ্রেড ভালোবাসা সম্পর্কে অনেক ভালো ভালো কথা বলছিলেন। তিনি যে আইরিনকে কত ভালোবাসেন তার সরস বর্ণনা দিচ্ছিলেন। আইরিন সাধারণত এসব আলোচনায় শ্রোতা হিসেবেই থাকেন - কখনো কোন মন্তব্য করেন না। কিন্তু সেদিন ফ্রেডের কথা শুনে হঠাৎ আইরিন বললেন, “আচ্ছা, তোমাদেরকে একটা কথা জিজ্ঞেস করি। বিবাহিত পুরুষ তাদের ওয়ালেটে কার ছবি রাখে?”
“স্ত্রীর”
“ফ্রেড আমাকে এত ভালোবাসে বললো - তার ওয়ালেটে কার ছবি আছে?”
“অবশ্যই তোমার” - বন্ধুদের একবাক্যে উত্তর। 
“ফ্রেড, তোমার ওয়ালেটটা খুলে এদের দেখাও।”
ফ্রেড কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে ওয়ালেট খুলে দেখান - সেখানে আইরিনের বদলে বিশাল একটা মাছের ছবি। অপ্রস্তুতের হাসি হেসে ফ্রেড বললেন, “লা’কোয়েস্টে এত বড় মাছ আর কেউ ধরেনি।”
ফরাসি সরকারের ওপর আমেরিকান সরকারের প্রভাব ও চাপ বাড়তে শুরু করেছে। আমেরিকান সরকার কমিউনিস্ট ফোবিয়ায় ভুগছে। তার ধারাবাহিকতায় ১৯৫০ সালের ২৮শে এপ্রিল ফ্রেঞ্চ অ্যাটমিক এনার্জি কমিশন থেকে ফ্রেডকে বরখাস্ত করা হলো। ফ্রেডের অপরাধ - তিনি ফ্রান্সের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য। মানসিকভাবে খুব হতাশ হয়ে পড়লেন ফ্রেড। তাঁর শরীরেও তেজষ্ক্রিয়তার প্রভাব দেখা দিতে শুরু করেছে। খুবই অসুস্থ হয়ে পড়লেন ফ্রেড। 
এর কিছুদিন পর ২১শে মে হেলেন ও মাইকেলের প্রথম সন্তান ফ্রাঁসোয়ার জন্ম হয়। নাতনির মুখ দেখে হতাশা কিছুটা কাটিয়ে উঠলেন ফ্রেড। 
অ্যাটমিক এনার্জি কমিশন থেকে আইরিনকে বরখাস্ত করা না হলেও ১৯৫১ সালের ১০ই জানুয়ারি তাঁর মেয়াদ শেষ হবার পর তাঁকে কমিশন থেকে বাদ দেয়া হয়। সরবোন বিশ্ববিদ্যালয় এবং রেডিয়াম ইনস্টিটিউটের ডিরেক্টরের পদ এখনো আছে তাঁর। কিন্তু শরীর তাঁরও খুব খারাপ। এক সময়ের এত ভালো অ্যাথলিট আইরিন নানারকম রোগে ভুগছেন। 
১৯৫১ সালের ২৫শে জুলাই হেলেনের ছেলে ইভিসের জন্ম হয়। আইরিন ও ফ্রেড তাঁদের নাতি-নাতনির সাথে সময় কাটান যতটুকু পারেন। ফ্রাঁসোয়ার বয়স দু’বছর হতে না হতেই তাকে সাঁতার শেখানোর জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েন আইরিন। 
১৯৫৫ সালে লিউকেমিয়া ধরা পড়ে আইরিনের। সারাজীবন এক্স-রে আর রেডিয়াম পোলোনিয়ামের তেজষ্ক্রিয়তার সাথে থাকতে থাকতে ব্লাড-ক্যান্সার হয়ে গেছে তাঁর। হাসপাতালে ভর্তি হতে হলো তাঁকে। ফ্রেড প্রায় সারাক্ষণই আইরিনের বেডের কাছে চুপচাপ বসে থাকেন। আইরিন জানেন তাঁর সময় দ্রুত শেষ হয়ে আসছে। যতক্ষণ জেগে থাকেন ফ্রেডের দিকে তাকিয়ে থাকেন। ফ্রেড তাঁর হাত ধরে জিজ্ঞেস করেন, “খুব কষ্ট হচ্ছে?”
“আমার নিজের জন্য কোন কষ্ট নেই ফ্রেড। আমি তো জীবনে যা যা চেয়েছি সবই পেয়েছি। কষ্ট হচ্ছে তোমার জন্য।”
“আমার জন্য কেন?”
“আমি মরে গেলে তুমি একা হয়ে যাবে। অবশ্য একা নাও হতে পারো - লা’কোয়েস্টের সাগরে বড় বড় মাছ আছে। সেগুলো ধরবে আর ছবি তুলে ওয়ালেটে রাখবে। দেখি তোমার ওয়ালেটটা।”
ফ্রেড চুপচাপ ওয়ালেট বের করে আইরিনের হাতে দেন। আইরিন কাঁপা কাঁপা হাতে ওয়ালেট খুলে মাছের ছবিটা দেখেন। ফ্রেড বলেন, “তোমার কি ধারণা আমি শুধু মাছই দেখি?”
“না, তুমি এটাও দেখো” - মাছের ছবির নিচ থেকে আরেকটি ছবি বের করেছেন আইরিন। তিরিশ বছর আগের আইরিনের গ্র্যাজুয়েশানের ছবি। সরবোনের কালো গাউন পরে এক হাতে ফুল আর অন্যহাতে সার্টিফিকেট নিয়ে উজ্জ্বল চোখে দাঁড়িয়ে আছে তরুণী আইরিন। 

“ছবিটা যে ওখানে থাকে তুমি জানতে?”
“হ্যাঁ”
“তবে সেদিন সবার সামনে মাছের ছবি নিয়ে ওরকম করলে কেন?”
আইরিন চোখ বন্ধ করে বিড়বিড় করে বলেন, “শুধু গুনগুন করলে হয় না, মাঝে মাঝে গলা ছেড়ে গাইতে হয়।”
১৯৫৬ সালের ১৭ই মার্চ মারা যান আইরিন জুলিও-কুরি। ২১শে মার্চ সরবোন বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রীয় শোকসভা অনুষ্ঠিত হয় তাঁর স্মরণে। 

আইরিন ও ফ্রেডেরিক জুলিও-কুরি


আইরিনের মৃত্যুর পর ফ্রেড ছেলে পিয়েরের সাথে তাঁদের স্‌সোর বাড়িতেই দিন কাটাতে থাকেন। ফ্রেডের লিভারের তিন চতুর্থাংশই নষ্ট হয়ে গেছে  অত্যধিক তেজষ্ক্রিয়তায়। এ অবস্থাতেও আইরিনের শূন্যপদে যোগ দিলেন তিনি। সরবোনের প্রফেসর পদ এবং রেডিয়াম ইনস্টিটিউটের ডিরেক্টর পদে নিযুক্ত হলেন ফ্রেডেরিক জুলিও-কুরি। রেডিয়াম ইনস্টিটিউটের সম্প্রসারণ ঘটছে। নিউক্লিয়ার ইনস্টিটিউট চালু করলেন ফ্রেড। 
১৯৫৮ সালের গ্রীষ্মকালে পাকস্থলীর সমস্যাও দেখা দেয় ফ্রেডের। হেপাটাইটিসের অপারেশান হয় ১০ই আগস্ট। অস্ত্রোপচারের চারদিন পর ১৪ই আগস্ট মারা যান ফ্রেডেরিক জুলিও-কুরি। 

পরিশিষ্ট

আইরিন ও ফ্রেডের ছেলে-মেয়ে দু’জনই পরবর্তীতে বিখ্যাত বিজ্ঞানী হয়েছেন - হেলেন নিউক্লিয়ার পদার্থবিজ্ঞানী এবং পিয়ের জীব-পদার্থবিজ্ঞানী।
১৯৫৭ সালে হেলেন তাঁর বাবার প্রতিষ্ঠিত ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার ফিজিক্সে যোগ দেন। ফ্রান্সের পার্লামেন্টে সায়েন্টিফিক এডভাইজরি কমিটির সদস্য ছিলেন তিনি অনেক বছর।
হেলেনের ছেলে ইভিসও একজন জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। 
আইরিন ও ফ্রেড জুলিও-কুরির ছেলে পিয়ের জুলিও কলেজ দ্য ফ্রান্সের প্রফেসর এবং সেলুলার বায়োলজি ডিপার্টমেন্টের হেড। ফ্রেঞ্চ একাডেমি অব সায়েন্সের সদস্যপদ লাভ করতে কোন অসুবিধাই হয়নি তাঁর। তিনি আমেরিকান একাডেমি অব সায়েন্সেরও সদস্য। 
ইভ কুরি সারাজীবন একা থাকার সিদ্ধান্ত নিলেও বিয়ে করেছিলেন ১৯৫৪ সালে ৫০ বছর বয়সে। তাঁর স্বামী হেনরি ল্যাবোইসি ইউনিসেফের পরিচালক ছিলেন এবং ১৯৬৫ সালে নোবেল শান্তি পুরষ্কার পেয়েছেন। ইভ ১০২ বছর বেঁচেছিলেন। ২০০৭ সালের ২২শে অক্টোবর ইভ কুরি মারা যান তাঁর নিউ ইয়র্কের অ্যাপার্টমেন্টে।
১৯৯৪ সালে রেডিয়াম ইনস্টিটিউটের কুরি মিউজিয়ামের নতুন নাম হয় - ‘দি মিউজিয়াম এন্ড আর্কাইভস ফর দি রেডিয়াম ইনস্টিটিউট, পিয়ের এন্ড মেরি কুরি, এন্ড ফ্রেডেরিক এন্ড আইরিন জুলিও-কুরি’। 

__________
আইরিন কুরির কাহিনি প্রকাশিত হয়েছে রেডিয়াম ভালোবাসা বইতে




Friday, 12 October 2018

আইরিন কুরি - নবম পর্ব



নোবেল বক্তৃতা দেবার সময় পদার্থবিজ্ঞানের অংশ বললেন আইরিন, আর রসায়নের অংশ বললেন ফ্রেড। সাংবাদিকদের সব প্রশ্নের উত্তর মহাউৎসাহে ফ্রেডই দিলেন। ফ্রেড প্রশংসা পেতে পছন্দ করেন, মিডিয়া কভারেজ তাঁর খুবই ভালো লাগে। আইরিন কিছুক্ষণ পরেই উৎসাহ হারিয়ে ফেললেন। 

সংবাদ সম্মেলন শেষে আইরিনকে নোবেল অনুষ্ঠানের কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিলো না। শেষে ফ্রেড নোবেল ফাউন্ডেশানের লাইব্রেরিতে গিয়ে দেখলেন আইরিন এক কোণায় বসে নিবিষ্টমনে বই পড়ছেন। 

নোবেল পুরষ্কারের টাকা দিয়ে আইরিন স্‌সোতে তাঁর বাবার বাড়িটা নতুন করে তৈরি করালেন। বাড়িতে ফুলের বাগান, ছেলে-মেয়েদের খেলার মাঠ সবকিছুর ব্যবস্থা করলেন। নোবেল পুরষ্কার পাবার পর স্বাভাবিকভাবেই আইরিন ও ফ্রেডেরিকের সামাজিক মর্যাদা আরো বেড়ে গেলো। তিনি ফ্রান্সের বিখ্যাত গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘কলেজ দ্য ফ্রেঞ্চ’-এর প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দিলেন। ফ্রান্সের প্রথম সাইক্লোট্রন তৈরির উদ্‌যোগ গ্রহণ করলেন ফ্রেডেরিক।  

এদিকে ফ্রান্সে তখন প্রগতিশীল পপুলার ফ্রন্ট ক্ষমতায় এসেছে। সমাজতন্ত্রী প্রেসিডেন্ট লিওন ব্লাম মেয়েদের ক্ষমতায়নে বিশ্বাস করেন। কিন্তু ফ্রান্সে তখনো মেয়েদের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়নি। [ফ্রান্সে মহিলারা ভোট দেয়ার অধিকার পায় ১৯৪৬ সালে।] প্রেসিডেন্ট ব্লাম শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করলেন, শ্রমজীবীদের বেতন ও সুযোগ-সুবিধা বাড়ালেন। 

ফ্রান্সের বিজ্ঞান-গবেষণা বাড়ানোর জন্য প্রফেসর জাঁ পেরির উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ‘ন্যাশনাল ব্যুরো অব সায়েন্টিফিক রিসার্চ’। জাঁ পেরি আইরিনের বাবা-মা’র ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। জাঁ পেরির পরামর্শে প্রেসিডেন্ট ব্লাম ফ্রেডেরিককে ‘ন্যাশনাল ব্যুরো অব সায়েন্টিফিক রিসার্চ’র ডিরেক্টর নিযুক্ত করলেন। 

ফ্রান্সের বিজ্ঞান গবেষণা আরো গতিশীল করার লক্ষ্যে ব্লাম সরকার কিছু পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন। সে ব্যাপারে আলোচনা করার জন্য একদিন প্রেসিডেন্টের পিএস এসে ফ্রেডেরিককে ডেকে নিয়ে গেলেন প্রেসিডেন্টের অফিসে। সন্ধ্যায় বাড়িতে ফিরলে আইরিন জিজ্ঞেস করলেন, “প্রেসিডেন্ট নিশ্চয় তোমাকে বড় কোন দায়িত্ব দিয়েছেন?”
“না, আমাকে দেননি, তোমাকে দিয়েছেন।”
“তার মানে?”
“মানে তোমাকে মন্ত্রী হতে হবে। বিজ্ঞান মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিতে হবে তোমাকে।”
“তুমি সিরিয়াস?”
“ইয়েস মাদাম। তুমি আবারো আমার বস হয়ে গেলে।”
“কীভাবে?”
“আমার ব্যুরো তোমার মন্ত্রণালয়ের অধীনে।”
“আমার কি এ দায়িত্ব নেয়া উচিত?”
“ইয়েস বস্‌। দেশের কাজে যোগ্য ব্যক্তিরা এগিয়ে না এলে চলবে কীভাবে? ফ্রান্সের ইতিহাসে তুমিই হবে প্রথম মহিলা মন্ত্রী।”

মন্ত্রী আইরিন কুরি


পরদিন প্রেসিডেন্টের অফিসে মন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন আইরিন জুলিও-কুরি। তিনি সহ মোট তিন জন মহিলা মন্ত্রী নিযুক্ত হয়েছেন। আইরিনকে রেডিয়াম ইনস্টিটিউটের গবেষণা থেকে ছুটি নিতে হলো। সম্পূর্ণ নতুন এই প্রশাসনিক কাজে এসে সবকিছু একেবারে গোড়া থেকেই শুরু করতে হলো আইরিনকে। দায়িত্ব নিয়ে তা ঠিকমত পালন না করার মানুষ আইরিন নন। 

প্রতিদিন সকালে অফিসে এসে দেখেন তাঁর টেবিলে শত শত চিঠি ফাইল করে রাখা। চিঠিগুলোর বেশির ভাগই বিভিন্ন বিষয়ের জন্য ‘আবেদন’। আইরিন দেখলেন সবগুলো চিঠির উত্তর দিতে গেলে তাঁর আর কিছু করার সময় থাকবে না। বেশির ভাগ চিঠিরই লেখক উল্লেখ করছেন যে  মেরি কুরির মেয়ে মন্ত্রী হয়েছে, সুতরাং তাঁদের সব আবেদনই পূর্ণ হবে। মেরি কুরির মেয়ের প্রতি এতটাই বিশ্বাস সবার! 

আবার প্রচুর চিঠি আসে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হয়ে যাবার জন্য, বিভিন্ন কিছুর উদ্বোধন করার জন্য। আইরিন কিছু কিছু চিঠির উত্তর লিখতে গিয়ে দেখেন যে মন্ত্রী হিসেবে নিজেকে লিখতে হচ্ছে না কিছুই। তিনি শুধু নির্দেশ দেবেন, নির্দেশ অনুযায়ী লিখে দেবার লোক আছে। আইরিন লিখতে নির্দেশ দেন, “আপনাদের সভায় গিয়ে প্রধান অতিথি হবার এবং বক্তৃতা দেবার মত সময় এবং ইচ্ছে কোনটাই আমার নেই।” 

প্রবীণ অভিজ্ঞ পি-এস বিনীতভাবে বলেন, “মাদাম, এভাবে সরাসরি তো কেউ বলেন না। শুরুতে তাদের আমন্ত্রণের জন্য ধন্যবাদ দিয়ে পরে যেতে না পারার জন্য দুঃখপ্রকাশ করতে হয়”।
“কেন? তারা তো ধন্যবাদ পাবার মতো কোন কাজ করেননি। আর আমি তো দুঃখ পাচ্ছি না যে দুঃখ প্রকাশ করবো। আমার তো আসলে বলা উচিত এভাবে আমার সময় নষ্ট করার জন্য আমি বিরক্ত।”

আইরিন দেখেন মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকরা সারাদিন বসে থাকে খবর সংগ্রহের জন্য। আইরিন যা করেন সবকিছুই তাদের জন্য খবর। আইরিনের দাপ্তরিক চিঠির ভাষা নিয়েও বড় বড় বিশ্লেষণী প্রতিবেদন প্রকাশিত হচ্ছে প্রতিদিন। সাংবাদিকদের ওপর তাঁর ক্ষোভ ছোটবেলা থেকেই। এখন এসব অপ্রয়োজনীয় ব্যাপারে এত সময় ও শ্রম নষ্ট হচ্ছে দেখে ক্ষুব্ধ হন তিনি। 
কিন্তু দেশের উপকার হবে এমন কোন ব্যাপারে সিদ্ধান্ত এবং ব্যবস্থা নিতে দেরি করেন না আইরিন। একদিন একটা চিঠি পেলেন সিভ্‌রের ‘স্কুল অব ফিজিক্স ফর গার্লস’র ডিরেক্টরের কাছ থেকে। ডিরেক্টর জানাচ্ছেন তাঁর স্কুলের মেয়েরা পড়ালেখায় খুবই পরিশ্রমী। সবাই পড়াশোনা করছে ভবিষ্যতে পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষক হবার জন্য। কিন্তু পদার্থবিজ্ঞানের নতুন নতুন আবিষ্কারের সাথে সংগতি রেখে তাদের গবেষণাগারের কোন উন্নয়ন করা হয়নি গত চল্লিশ বছর। বিজ্ঞানমন্ত্রী এ ব্যাপারে কোন ব্যবস্থা নিতে পারেন কিনা। 
চিঠির পুরোটা পড়ার আগেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন আইরিন। এই স্কুলে তাঁর মা শিক্ষকতা করেছেন অনেক বছর। সেই সময়ও ভালো কোন গবেষণাগার ছিল না এই স্কুলে। তাঁর মা স্কুলের শেড ব্যবহার করেছিলেন গবেষণার কাজে। গত চল্লিশ বছরেও কোন ব্যবস্থা হয়নি! আইরিনের মন্ত্রণালয় অবশ্যই এই স্কুল শুধু নয়, এরকম সব স্কুলেই বিজ্ঞান শিক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় গবেষণাগারের ব্যবস্থা করবে। চিঠির শেষে ডিরেক্টরের নাম দেখে চমকে উঠলেন আইরিন। ইউজিনি কটন! 
আইরিনের মনে পড়ে - তাঁর মায়ের ছাত্রী ছিলেন ইউজিনি। প্রায়ই তাদের বাসায় যেতেন ইউজিনি। ভীষণ আদর করতেন আইরিনকে। একেবারে ছোটবেলায় আইরিন যখন সবে সাইকেল চালানো শিখতে শুরু করেছে - ইউজিনি আইরিনের সাইকেল ধরে ধরে আইরিনের সাথে হাঁটতেন। কত গল্প করতেন তখন। আইরিনের স্পষ্ট মনে আছে ইউজিনি বলছেন - “অনেক বছর আগে বিশাল বিশাল ডাইনোসর ছিল এই পৃথিবীতে।”
“তুমি ডাইনোসর দেখেছো?”
“না আইরিন। আমি অত বুড়ো নই।”
“তাহলে গ্র্যানপি ডাইনোসর দেখেছে। গ্র্যানপি অনেক বুড়ো।”
আইরিন ইউজিনির সাথে দেখা করলেন। 
মন্ত্রীসভায় আইরিনের সততা আর স্পষ্টবাদিতা অনেকেরই অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ালো। ছয় মাস ধরে কাজ করার পরও ডিপ্লোম্যাটিক ভাষা ও আচরণ আয়ত্ত্ব করতে পারলেন না আইরিন। তিনি বুঝতে পারছেন তাঁর একার পক্ষে পুরো সিস্টেম বদলানো সম্ভব নয়। তাঁর মনে হচ্ছে তিনি ভুল জায়গায় এসে পড়েছেন, তাঁর বদলে ফ্রেড মন্ত্রী হলেই ভালো করতেন। কারণ ফ্রেড ক্ষমতার স্বাদ বোঝেন। 
আইরিনের ইচ্ছে করছে বাবা-মা’র মতো সরবোনের প্রফেসর হতে। প্রফেসর হবার সব যোগ্যতা তাঁর আছে। নোবেল পুরষ্কার পাবার পর পৃথিবীর যে কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর হতে পারেন তিনি। কিন্তু সরবোনের প্রফেসরশিপ পেতে হলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন লাগে। আইরিন ভাবলেন তিনি যদি এখন দরখাস্ত করেন তাহলে তাঁর সহকর্মী শিক্ষামন্ত্রী কোন কিছু না দেখেই তাঁকে অনুমোদন দিয়ে দেবেন। এটা অনুচিত হবে ভেবে তিনি মন্ত্রীত্বে ইস্তফা দিলেন। মন্ত্রীপরিষদের সবাই হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন।
আইরিন রেডিয়াম ইনস্টিটিউটের পুরনো পদে ফিরে গেলেন। সেখান থেকে সরবোনে প্রফেসর পদের জন্য দরখাস্ত করলেন এবং সমস্ত আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে সরবোনের প্রফেসর পদে যোগ দিলেন। রেডিয়াম ইনস্টিটিউটের পদটিও তাঁর থাকলো। অধ্যাপনা ও গবেষণার জগতে ফিরে এলেন আইরিন। কিন্তু ফ্রেডের সাথে যৌথ গবেষণা আর সম্ভব হলো না। ফ্রেড ‘কলেজ দ্য ফ্রেঞ্চ’ ও ‘ব্যুরো অব সায়েন্টিফিক রিসার্চ’ নিয়ে ব্যস্ত। ফ্রেড ‘ল্যাবরেটরি অব অ্যাটমিক সিন্থেসিস’ নামে নতুন একটা গবেষণাকেন্দ্র তৈরি করেছেন। অ্যাটমিক নিউক্লিয়াস সংক্রান্ত নতুন নতুন গবেষণা চলছে সেখানে। ফ্রান্সের নিউক্লিয়ার গবেষণা পরিচালিত হচ্ছে আইরিন ও ফ্রেডেরিকের হাত দিয়ে। 
১৯৩৮ সালে আইরিন খুব অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তাঁর শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। যক্ষা তাঁকে ছাড়ছে না। যেদিন সুস্থ থাকেন সেদিন ল্যাবে যান, পরের দিন আবার অসুস্থ হয়ে পড়েন। কিন্তু এর মধ্যেও তিনি ইউরেনিয়াম নিয়ে নতুন পরীক্ষা চালাচ্ছেন। এনরিকো ফার্মি জুলিও-কুরির কৃত্রিম তেজষ্ক্রিয়তা সৃষ্টির প্রক্রিয়া কাজে লাগিয়ে ইউরেনিয়ামের মধ্যে নিউট্রন প্রবেশ করিয়ে তেজষ্ক্রিয় ইউরেনিয়াম আইসোটোপ তৈরি করতে পেরেছেন এবং দেখেছেন সেখান থেকে প্রচুর তেজষ্ক্রিয় বিকিরণ ঘটছে। 
আইরিনও একই রকমের পরীক্ষা করলেন তাঁর ল্যাবে। তাঁরাও একই রেজাল্ট পেলেন। কিন্তু তাঁরা ঠিকভাবে ব্যাখ্যা করতে পারলেন না কী হচ্ছে আসলে। তাঁদের গবেষণাপত্র পড়ে একই পরীক্ষা চালালেন জার্মান বিজ্ঞানী লিসা মেইটনার, অটো হান ও ফ্রিট্‌জ স্ট্রসম্যান। তাঁরাও একই রেজাল্ট পেলেন। লিসা মাইটনার তাঁর ভাইপো অটো ফ্রিসের সাথে আলোচনা করে বুঝতে পারলেন যে ভারী ইউরেনিয়াম আইসোটোপ ভেঙে অপেক্ষাকৃত হাল্‌কা তেজষ্ক্রিয় নিউক্লিয়াসে পরিণত হচ্ছে - যা ক্রমাগত চলতে থাকবে - যা ‘নিউক্লিয়ার ফিশান প্রসেস’ নামে পরিচিতি লাভ করে। 
এই নিউক্লিয়ার ফিশান প্রসেস নিয়ে ভীষণ উৎসাহিত হয়ে উঠলেন ফ্রেডেরিক। ফিশান পদ্ধতিতে প্রচুর শক্তি উৎপন্ন হয়। পারমাণবিক নিউক্লিয়াস হতে পারে বিপুল পরিমাণ শক্তির উৎস। ফ্রেড জানেন ফ্রান্স সমস্ত জ্বালানি তেল আর এক তৃতীয়াংশ কয়লা বিদেশ থেকে আমদানি করে। সেক্ষেত্রে পারমাণবিক নিউক্লিয়াস থেকে ভবিষ্যতের জ্বালানি শক্তির জোগান দেয়ার লক্ষ্যে ফ্রেডেরিক ইউরেনিয়াম সংগ্রহ করতে শুরু করলেন।  ১৯৩৯ সালের মধ্যে তিনি প্রায় নয় টন খনিজ ইউরেনিয়াম কেনার ব্যবস্থা করেন বেলজিয়ামের খনি থেকে। কিন্তু সেগুলো দিয়ে কিছু করার আগেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে গেলো।
১৯৪০ সালের জুন মাসে ফ্রান্সে জার্মান সৈন্য মার্চ করতে শুরু করেছে। আইরিন নিজে অসুস্থ, বাচ্চাদের নিয়ে ভীষণ আতঙ্কে আছেন। মনে পড়ছে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় তাঁর বয়স ছিল সতেরো। মা তাকে নিয়ে যুদ্ধের মধ্যেই যুদ্ধাহতদের চিকিৎসা দেয়ার জন্য বেরিয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু এখন আইরিন তাঁর তেরো বছরের মেয়ে হেলেন আর আট বছরের ছেলে পিয়েরের জন্য দুশ্চিন্তা করছেন। আইরিন বুঝতে পারছেন তাঁর সাহস তাঁর মায়ের চেয়ে অনেক কম। কিন্তু আইরিনের বড় চিন্তা হচ্ছে জার্মানদের হাত থেকে রেডিয়াম ইনস্টিটিউট রক্ষা করবেন কীভাবে। 
ইভ যুদ্ধের সংবাদ সংগ্রহের জন্য রণক্ষেত্রে চলে গেছেন। দেশে-বিদেশে ঘুরে বেড়াচ্ছেন তিনি। ভারতে গিয়ে মহাত্মা-গান্ধী, নেহেরু আর জিন্নাহ্‌র সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ইভ। 
যুদ্ধ শুরু হবার সাথে সাথে ফ্রেড যুদ্ধে যাবার জন্য প্রস্তুত। মিলিটারি আর্টিলারির ক্যাপ্টেন হিসেবে দায়িত্ব নিতে গেলেন। কিন্তু তাঁকে আরো বড় দায়িত্ব দেয়া হলো। তাঁকে ‘ডিরেক্টর অব ওয়ার রিসার্চ স্টাফ’-এর দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। কিন্তু ফ্রান্স তেমন কোন প্রতিরোধ গড়ে তোলার আগেই প্যারিস জার্মানদের দখলে চলে গেলো। ফ্রেডের ল্যাবে জার্মান সৈন্য এসে ইউরেনিয়াম আর হেভি ওয়াটারের খোঁজ করতে লাগলো। তাদের কাছে তথ্য আছে যে ফ্রেড অ্যাটমিক রিঅ্যাক্টর তৈরির জন্য তেজষ্ক্রিয় পদার্থ সংগ্রহ করেছেন। জার্মানি সেগুলো দখল করতে চায়। ফ্রেড আগেই ওসব লুকিয়ে রেখেছিলেন নিরাপদ জায়গায়। জার্মান সৈন্যরা তাঁর ল্যাবে তালা লাগিয়ে দিলো। 
ফরাসি সরকার নাৎসিদের নির্দেশে চলছে। স্বাধীনতাকামীদের জীবন দুঃসহ হয়ে উঠছে। ফ্রেড ও লাঁজেভির মত মানুষেরা গোপন প্রতিরোধ বাহিনী গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন। কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দিয়েছেন তাঁরা। যে কোন মুহূর্তে জার্মান সৈন্যরা তাঁদের তুলে নিয়ে যেতে পারে। শীতকাল চলে আসছে। নাৎসিরা ফ্রান্সের সমস্ত কয়লা জার্মানিতে নিয়ে যাচ্ছে। শীতকালে ফায়ার-প্লেসে আগুন জ্বলবে না কোন ফরাসির বাড়িতে। ছেলে-মেয়েদের নিরাপদ জায়গায় পাঠিয়ে দেয়ার চিন্তা করছেন আইরিন ও ফ্রেড। পিয়ের এখনো ছোট - তাই হেলেনকেই তাঁরা সুইজারল্যান্ডে এক বন্ধুর বাড়িতে পাঠিয়ে দিলেন। 
নাৎসিদের সমালোচনা করার অপরাধে পল লাঁজেভিকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হলো। তারপর তাঁকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়া হলো জার্মান ক্যাম্পে। ফ্রেডের অনেক বন্ধুকে জার্মানরা হত্যা করেছে - যাদের মধ্যে লাঁজেভির মেয়ের স্বামীও ছিলেন। ফ্রেডের গতিবিধির ওপর জার্মানরা নজর রাখছে। ১৯৪১ সালের জুন মাসে জার্মানরা রাশিয়ায় ঢুকতে শুরু করেছে।
একদিন খুব সকালে ফ্রেড ও আইরিনের বাড়ির কলিংবেল বেজে উঠলো। সাদা পোশাকে ফরাসি পুলিশ। নাৎসিরা ফরাসিদের ওপর অত্যাচার করার জন্য ফরাসিদেরই ব্যবহার করতে শুরু করেছে।
“আপনাকে আমাদের সাথে একটু পুলিশ হেডকোয়ার্টারে যেতে হবে মঁসিয়ে।”
“আইরিন, আমার জন্য অপেক্ষা করো না। পিয়েরকে কিছু বলার দরকার নেই।”
আইরিন দরজায় দাঁড়িয়ে দেখলেন তাঁর স্বামীকে নিয়ে চলে গেলো পুলিশের জিপ। কখন ফিরবে ফ্রেড, কিংবা আদৌ ফিরবে কিনা কিছুই জানেন না আইরিন। কিন্তু চিন্তা করে কী হবে। আইরিন সারাদিন পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত থাকার চেষ্টা করলেন। পিয়েরকে বাবার ব্যাপারে কিছুই বললেন না। কিন্তু মনে মনে সারাক্ষণ আশা করছেন ফ্রেড ফিরবেন, আবার আশংকাও করছেন যদি না ফেরে? 
গভীর রাতে ফ্রেড ফিরে এলেন। বিধ্বস্ত দেখাচ্ছে তাঁকে। নাৎসিরা তাঁকে সারাদিন ধরে মানসিক অত্যাচার করেছে। প্রশ্নের পর প্রশ্ন। একটা প্রশ্ন একশ’ বার করে করা। মেজাজ ঠিক রাখা দায় হয়ে পড়ে। ভবিষ্যতে অবস্থা আরো কত খারাপ হতে পারে ভেবে আতঙ্কিত ফ্রেড ও আইরিন।
আইরিনের স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বিগ্ন ফ্রেড। তিনি আইরিন আর পিয়েরকে সুইজারল্যান্ডে পাঠিয়ে দিতে চান। কিন্তু আইরিন ফ্রেডকে ছেড়ে কিছুতেই যাবেন না। ফ্রেড জানেন আইরিনের সিদ্ধান্ত বদলানো যায় না। হেলেনও মা-বাবা-ভাইকে ছেড়ে সুইজারল্যান্ডে বেশিদিন থাকতে না পেরে ফিরে এসেছে বাড়িতে। 
ছদ্ম-জার্মান শাসনে ফ্রান্স চলছে। এমনভাবে চলছে যেন কিছুই হয়নি। স্কুল কলেজ অফিস আদালত চলছে। সবকিছু স্বাভাবিক আছে প্রমাণ করার জন্য ফ্রেঞ্চ একাডেমি অব সায়েন্স ফ্রেডকে একাডেমির সদস্যপদ দিয়েছে। আইরিনও দরখাস্ত করেছিলেন, কিন্তু যে কারণে তেত্রিশ বছর আগে মাদাম কুরিকে সদস্যপদ দেয়নি এবং আইন পাস করিয়ে রেখেছে যে একাডেমিতে কোনদিনই কোন মহিলাকে একাডেমির সদস্যপদ দেয়া হবে না, সেই কারণ দেখিয়ে আইরিনের দরখাস্ত বাতিল করা হলো। [আইরিন তারপর থেকে প্রতিবছরই নিয়মিত দরখাস্ত করে গেছেন একই রেজাল্ট দেখার জন্য।]
হেলেনের স্কুলের পরীক্ষা হয়ে গেলো। এবার তার সরবোন ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হবার কথা। মা-বাবার মতোই বিজ্ঞানী হবার ইচ্ছে হেলেনের। ১৯৪৪ সালে প্যারিসে ব্যাপক ধরপাকড় শুরু হয়েছে। পল লাঁজেভির কোন খবর পাওয়া যাচ্ছে না। একদিন ভোরে আবার পুলিশ এলো বাড়িতে। ফ্রেডকে আবার তুলে নিয়ে গেল নাৎসি ক্যাম্পে। সন্ধ্যার পর বিধ্বস্ত হয়ে ফিরে এসে আইরিনকে জানালেন, “আমাকে আমার সব পদ থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে।”

Tuesday, 9 October 2018

আইরিন কুরি - অষ্টম পর্ব


১৯৩০ সালে জুলিও-কুরিরা প্রতিযোগিতা করছিলেন পৃথিবীর অন্যান্য নিউক্লিয়ার বিজ্ঞানীদের সাথে। যে কজন বিজ্ঞানী তখন পরমাণুর নিউক্লিয়াস নিয়ে গবেষণা করছিলেন তাঁরা হলেন ইংল্যান্ডে আর্নেস্ট রাদারফোর্ড, বার্লিনে লিজা মেইটনার, এবং কোপেনহ্যাগেনে নিল্‌স বোর। তখন পর্যন্ত নিউক্লিয়াসের ধারণা ছিল এরকম: পরমাণুতে শুধু ইলেকট্রন আর প্রোটন আছে। নিউট্রন সম্পর্কে কোন ধারণাই ছিল না কারো।
            
আইরিনের মা পোলোনিয়াম আবিষ্কার করেছিলেন ১৮৯৮ সালে। রেডিয়াম ও পোলোনিয়াম ছিল মেরি কুরির সন্তানের মত। আইরিন ও ফ্রেড প্রচুর পোলোনিয়াম উৎপাদন করেন রেডিয়াম ইনস্টিটিউটে। এই পোলোনিয়াম খুবই বিষাক্ত। ফুসফুস, প্লিহা ও যকৃতের খুব ক্ষতি করে এর তেজষ্ক্রিয় গ্যাস। ফ্রেড ও আইরিন ক্রমে ক্রমে এই বিষে আক্রান্ত হচ্ছিলেন। ইতোমধ্যে তেজষ্ক্রিয়তার বিষে মাদাম কুরির শরীরের সমস্ত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নষ্ট হয়ে গেছে। তিনি ভীষণ অসুস্থ। তারপরেও একটু সুস্থ বোধ করলেই তিনি ইনস্টিটিউটে চলে আসেন।
            
১৯৩২ সালে আইরিন রেডিয়াম ইনস্টিটিউটের গবেষণা-প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেন। এসময় গবেষণাগারের জন্য একটা আধুনিক হফম্যান ইলেকট্রোমিটার কেনা হয় যার সাহায্যে বাতাসে তেজষ্ক্রিয়তার ফলে সৃষ্ট ইলেকট্রিক চার্জের পরিমাপ করা যায়। ফ্রেড দিনরাত খেটে এই ইলেকট্রোমিটার বসানোর কাজ করছেন। এদিকে ডাক্তারের নিষেধ সত্ত্বেও আবার মা হতে চলেছেন আইরিন।
            
এসময় জার্মান ফিজিসিস্ট ওলাল্টার বোথের একটা পেপার পড়ে খুব উৎসাহিত হয়ে ওঠেন আইরিন। বেরিলিয়ামের সাথে আলফা কণার সংঘর্ষ ঘটানোর পর দেখা গেলো বেরিলিয়াম থেকে কিছু একটা বেরিয়ে দুই সেন্টিমিটার পুরু সীসার পাত ভেদ করে চলে গেলো। বেরিলিয়াম থেকে এত শক্তিশালী কী বেরোচ্ছে? এটা কি কোন নতুন ধরনের গামা রশ্মি?    আইরিন অসুস্থ শরীরে এই নতুন ধরনের গামা রশ্মি পরীক্ষা করে দেখতে শুরু করলেন। তিনি বেরিলিয়ামের পাশে তেজষ্ক্রিয় পোলোনিয়াম রাখলেন। দেখলেন বেরিলিয়াম থেকে শক্তিশালী রশ্মি বের হয়ে সীসার পাত ভেদ করে চলে যাচ্ছে। এবার সামনে নানারকম পদার্থ রেখে পরীক্ষা করা হলো। প্যারাফিন ওয়াক্স (মোম) রেখে দেয়া হলো। মোম কার্বন আর হাইড্রোজেনে ভর্তি - প্রোটনের সমৃদ্ধ উৎস। দেখা গেলো মোম থেকে প্রোটন বেরোল প্রায় আলোর বেগের এক দশমাংশ বেগে। এর কারণ কী? প্রোটনকে এত জোরে  ছুঁড়ে দেবার কাজ করছে কে? আইরিন আর ফ্রেড মনে করলেন এটা নতুন ধরনের শক্তিশালী গামা রশ্মি। দ্রুত গবেষণাপত্র প্রকাশ করলেন জুলিও-কুরি।

তাঁদের পেপার পড়ে রাদারফোর্ড বুঝতে পারলেন ভুলটা কোথায়। গামা রশ্মির কোন ভর নেই। তাই গামার পক্ষে প্রোটনের মত ভারী কণাকে ছুঁড়ে ফেলে দেয়া সম্ভব নয়। তার মানে নিউক্লিয়াসে প্রোটন ছাড়াও আরো কিছু আছে যা প্রোটনের মতোই ভারী।
            
ক্যাভেন্ডিশ ল্যাবে রাদারফোর্ডের ছাত্র জেমস চ্যাডউইক আইরিন ও ফ্রেডের পরীক্ষাটা করে একই ফল পেলেন। কিন্তু ফলাফল ব্যাখ্যা করলেন সঠিকভাবে। আবিষ্কৃত হলো নিউক্লিয়াসের আরেকটি উপাদান - নিউট্রন। অল্পের জন্যই নিউট্রন আবিষ্কারের কৃতিত্বটা আইরিন ও ফ্রেডের হাত থেকে ফস্কে চলে গেলো জেম্‌স চ্যাডউইকের হাতে। [নিউট্রন আবিষ্কারের জন্য ১৯৩৫ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন চ্যাডউইক।]
            
১৯৩২ সালে আইরিন ও ফ্রেডের দ্বিতীয় সন্তানের জন্ম হলো। আইরিন তাঁর বাবার নাম অনুসারে ছেলের নাম রাখলেন পিয়ের। হেলেন আর পিয়ের মাদাম কুরির চোখের মণি হয়ে উঠলো। সময় পেলেই মাদাম নাতি-নাতনিদের সাথে খেলতে চেষ্টা করেন। তাঁর কাজের অনেকটুকুই এখন আইরিন সামলাচ্ছেন। তবুও তিনি রেডিয়াম ইনস্টিটিউটে যাওয়া থামাচ্ছেন না। ১৯৩৩ সালের সলভে কনফারেন্সে যোগ দেবার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি।
            
এদিকে পিয়েরের জন্মের পর আইরিন আরো দুর্বল হয়ে পড়েছেন। পঁয়ত্রিশ বছর বয়সেই তাঁকে অনেক বয়স্কা মনে হচ্ছে। যক্ষা থেকে মুক্তি পাচ্ছেন না কিছুতেই। কিন্তু কোনকিছুই তাঁকে ঘরে আটকে রাখতে পারলো না। তিনি কাজে ফিরে গেলেন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। ল্যাবে গিয়েই নতুন পরীক্ষায় হাত দিলেন।
            
নিউট্রন আবিষ্কৃত হবার পর ইতালিয়ান পদার্থবিজ্ঞানী এনরিকো ফার্মি পারমাণবিক নিউক্লিয়াসের গবেষণায় বিপুল সম্ভাবনা দেখতে পেলেন। আইরিন ও ফ্রেড উইলসন ক্লাউড-চেম্বার ব্যবহার করে নিউট্রন নিয়ে পরীক্ষা করার পরিকল্পনা করলেন। তাঁরা দেখলেন ক্লাউড-চেম্বারে ইলেকট্রন-ট্র্যাকের পাশাপাশি নতুন ধরনের ট্র্যাক দেখা যাচ্ছে - যা শুধুমাত্র সম্ভব যদি ইলেকট্রনের চার্জ পজিটিভ হয়। আইরিন ও ফ্রেডের আগে এ পরীক্ষা আর কেউ করেননি এবং এই পজিটিভ ইলেকট্রনের অস্তিত্ব সম্পর্কেও কেউ জানতেন না। তবে তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞানী পল ডিরাক পজিটিভ ইলেকট্রনের সম্ভাবনার কথা প্রকাশ করেছিলেন। ডিরাকের পেপার আইরিন ও ফ্রেডের চোখে পড়েনি।
            
পজিটিভ চার্জের ট্র্যাক দেখে তাঁদের ফলাফল সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করতে ব্যর্থ হলেন আইরিন ও ফ্রেড। কিন্তু ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে (ক্যালটেক) কার্ল এন্ডারসন আইরিন ও ফ্রেডের পরীক্ষাটা করে একই রেজাল্ট পেলেন এবং সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করলেন যে এগুলো পজিট্রনের ট্র্যাক। আরো একটা যুগান্তকারী আবিষ্কারের কৃতিত্ব থেকে বঞ্চিত হলেন আইরিন ও ফ্রেড। [পজিট্রন আবিষ্কারের জন্য ১৯৩৬ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার পেলেন কার্ল এন্ডারসন।]
            
পরপর দুবার সঠিক পরীক্ষণের মাধ্যমে আইরিন ও ফ্রেড নিউট্রন ও পজিট্রন আবিষ্কারে প্রধান ভূমিকা রেখেছেন। বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানীদের কাছে আইরিন ও ফ্রেডের গ্রহণযোগ্যতা অনেকগুণ বেড়ে গেলো। ১৯৩৩ সালের সল্‌ভে কনফারেন্সে আমন্ত্রিত হলেন তাঁরা। সল্‌ভে কনফারেন্সে আমন্ত্রিত হওয়া মানে বিশ্বস্বীকৃতি পাওয়া। মাদাম কুরি তো সল্‌ভে কনফারেন্সের জন্মলগ্ন থেকে শুরু করে সবগুলো কনফারেন্সেই আমন্ত্রিত হয়েছেন। আইরিন ও ফ্রেডের এটাই প্রথম।
            
কনফারেন্সে যাবার আগে অনেকগুলো পরীক্ষা করলেন তাঁরা। পোলোনিয়ামের সামনে অ্যালুমিনিয়ামের পাতলা পাত রেখে দেখেছেন পোলোনিয়াম থেকে আলফা পার্টিক্যল এসে অ্যালুমিনিয়াম পাতে ধাক্কা দিয়ে সেখান থেকে নিউট্রন ও পজিট্রন বের করে দিচ্ছে। বার বার পরীক্ষা করে একই রেজাল্ট পেয়েছেন আইরিন ও ফ্রেড।

১৯৩৩ সালের সল্‌ভে কনফারেন্সে আইরিন ও মাদাম কুরি


১৯৩৩ সালের অক্টোবরে ব্রাসেল্‌সে সল্‌ভে কনফারেন্সে আইরিন ও ফ্রেডের পরীক্ষার ফলাফল উপস্থাপন করলেন ফ্রেড। আইরিন কথা বলতে পছন্দ করেন না, তাই তিনি চুপচাপ বসে আছেন অন্যান্য বিজ্ঞানীদের সাথে। কনফারেন্সে চল্লিশ জন আমন্ত্রিত বিজ্ঞানীর মধ্যে বিশ জন নোবেল বিজয়ী। চল্লিশ জনের মধ্যে মাত্র তিনজন নারী বিজ্ঞানী - মাদাম কুরি, আইরিন আর লিজা মাইটনার। 
ফ্রেডের বক্তৃতার পর লিজা মাইটনার উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “আমি নিজে বেশ কয়েক বার এই পরীক্ষাগুলো করে দেখেছি, কিন্তু একবারও কোন নিউট্রন বের হবার প্রমাণ পাইনি। সুতরাং জুলিও-কুরির ফলাফল বিশ্বাসযোগ্য নয়।” 
লিজা মাইটনার বিখ্যাত পরীক্ষণ-বিজ্ঞানী। তাঁর প্রভাব অনেক বেশি। তাই অনেকেই নবীন বিজ্ঞানী আইরিন ও ফ্রেডের ফলাফল বিশ্বাস করলেন না। কিন্তু নিল্‌স বোর ও উল্‌ফগং পাউলি ফ্রেড ও আইরিনের ফলাফলে খুবই খুশি। তাঁরা আইরিন ও ফ্রেডের কাজ খুবই সম্ভাবনাময় বলে মত দিলেন। 
প্যারিসে ফিরে মাদাম কুরি আবার অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তাঁর গলব্লাডার অপারেশন করাতে হলো। পজিট্রনের দুঃখ ভুলতে আইরিন একটা বই লিখলেন - ‘লা ইলেকট্রন-পচিটিফ’ বা ‘দি পজিটিভ ইলেকট্রন’। ১৯৩৪ সালের শুরুতে আইরিন ও ফ্রেড পুরোদমে কাজ শুরু করেছেন পোলোনিয়াম আর অ্যালুমিনিয়ামের পাত নিয়ে। তাঁরা দেখতে পেলেন পোলোনিয়ামের আলফা পার্টিক্যল অ্যালুমিনিয়ামের সাথে বিক্রিয়া করে নতুন ধরনের তেজষ্ক্রিয়তা তৈরি করছে। কীভাবে হচ্ছে? 
অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষা করে তাঁরা নিশ্চিত হলেন যে পোলোনিয়াম থেকে আলফা পার্টিক্যল বের হয়ে অ্যালুমিনিয়ামের নিউক্লিয়াসের সাথে সংঘর্ষ ঘটায়। তাতে অ্যালুমিনিয়ামের নিউক্লিয়াস থেকে একটি নিউট্রন বেরিয়ে আসে - ফলে অ্যালুমিনিয়াম নিউক্লিয়াস রূপান্তরিত হয় একটি তেজষ্ক্রিয় ফসফরাস নিউক্লিয়াসে। কয়েক মিনিট পর এই তেজষ্ক্রিয় ফসফরাস থেকে একটি পজিট্রন বের হয় - ফসফরাস নিউক্লিয়াস তার তেজষ্ক্রিয়তা হারিয়ে পরিণত হয় একটি সিলিকন নিউক্লিয়াসে। তার মানে তাঁরা কৃত্রিম তেজষ্ক্রিয়তার সন্ধান পেয়েছে! 
ফ্রেড তো খুশিতে আত্মহারা। আইরিনও খুশি - তবে তাঁর তেমন কোন উচ্ছ্বাস নেই। ফ্রেড ছুটে গিয়ে মাদামকে খবর দিলেন। আবার ছুটে এসে আইরিনকে চুমু খেয়ে ছুটলেন ইপিসিআইতে পল লাঁজেভিকে খবর দিতে। একটু পর লাঁজেভিকে সাথে নিয়ে ল্যাবে এসে দেখলেন মাদাম ইতোমধ্যে আইরিনের কাছ থেকে জেনে নিচ্ছেন কী কী ঘটেছে। 
আইরিন ও ফ্রেড পুরো পরীক্ষাটা আবার করলেন মাদাম কুরি আর পল লাঁজেভির সামনে। পল লাঁজেভি আইরিন ও ফ্রেডকে অভিনন্দন জানালেন। আর মাদাম কুরিকে অভিনন্দন জানিয়ে বললেন, “এবার আরো দুটো নোবেল পুরষ্কার আসছে কুরি পরিবারে”। 
পরের বছরই পল লাঁজেভির কথা সত্যি হয়েছে। কিন্তু মাদাম কুরি তা দেখে যেতে পারেননি। কৃত্রিম তেজষ্ক্রিয়তা আবিষ্কারের পর আইরিন ও ফ্রেড স্কি করতে স্যাভোই পাহাড়ে যাবার সময় মাদাম কুরি ছেলেমানুষের মত বায়না ধরলেন মেয়ের সাথে যাবার জন্য। কিছুতেই বোঝানো গেলো না ৬৬ বছর বয়স্কা শিশু মেরিকে। স্কি না করলেও বরফঢাকা পাহাড়ে উঠে হাঁটাহাঁটি করলেন তিনি এবং আছাড় খেয়ে পড়লেন। প্যারিসে নিয়ে এসে হাসপাতালে ভর্তি করাতে হলো তাঁকে। 
একটু সুস্থ হয়ে বাড়িতে এসে মে মাসে শুধু একবারের জন্য ইনস্টিটিউটে পা রেখেছিলেন মেরি। তারপর আর হাঁটাচলা করতে পারেননি। ইভ সব কাজকর্ম ছেড়ে বাড়িতে মায়ের সেবা করতে লাগলেন। ত্রিশ বছর বয়সী ইভ বেশ কয়েকটি ভালোবাসার সম্পর্ক ভাঙা-গড়ার মধ্য দিয়ে গিয়ে একা থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছেন। আইরিন ও ফ্রেড হেলেন ও পিয়েরকে নিয়ে প্রতিদিনই মাকে দেখতে আসেন। বিছানায় শুয়ে শুয়ে মা ইনস্টিটিউটের সব খবর জানতে চান। 
 
অনেক ডাক্তার এসে মেরিকে দেখে যাচ্ছেন। রোগ নির্ণয়ে নানারকম মতামত দিচ্ছেন। এখন বলা হচ্ছে তিনি মারাত্মক যক্ষায় আক্রান্ত। বাড়ির চেয়ে হাসপাতালেই ভালো থাকবেন। বিজ্ঞানী হিসেবে মাদাম যতটা ভালো রোগী হিসেবে ততটাই খারাপ। তিনি ডাক্তারের কোন পরামর্শ মেনে চলেন না। দুই বোন অনেক জোর করে মা-কে হাসপাতালে নিয়ে গেলেন। কিন্তু ক’দিন পর ডাক্তাররা বললেন তাঁর ফুসফুসের চেয়েও বড় সমস্যা তাঁর রক্তে। রক্ত পরীক্ষা করার পর ধরা পড়লো - লিউকেমিয়া। মাদাম কুরির তৃতীয় সন্তান রেডিয়ামের প্রতি ভালোবাসার ফল তাঁর ব্লাড ক্যান্সার।
আইরিন প্রতিদিনই অফিসে যাচ্ছেন, সব কাজ করছেন ঠিকমত। কিন্তু মায়ের জন্য তাঁর বুক ভেঙে যাচ্ছে। নিজের কষ্টের কথা বলার অভ্যাস নেই বলে কাউকেই বলতে পারছেন না মা তাঁর জীবনে কতখানি। জুলাইয়ের তিন তারিখ মায়ের অবস্থা খুবই খারাপ হয়ে গেলো। তিনি কাউকে আর চিনতে পারছিলেন না। ১৯৩৪ সালের ৪ঠা জুলাই সকালে মাদাম কুরি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। 
মাদাম কুরির মৃত্যুর পর রেডিয়াম ইনস্টিটিউটের দায়িত্ব নেন আইরিন। গবেষণার সাথে সাথে প্রশাসনিক কাজও বেড়ে যায় অনেক। ফ্রেডের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিচয় এখন অনেক বেশি বিস্তৃত। জার্মানিতে নাৎসিদের উত্থান ঘটেছে। আইনস্টাইন সহ অনেক বিজ্ঞানী জার্মানি ছেড়ে চলে গেছেন। ফ্রেড কমিউনিস্ট পার্টির কাজকর্মে জড়িয়ে পড়তে শুরু করেছেন। 
১৯৩৫ সালে রসায়নে নোবেল পুরষ্কার পেলেন আইরিন ও ফ্রেডেরিক জুলিও-কুরি। একই বছর নিউট্রন আবিষ্কারের জন্য পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন জেম্‌স চ্যাডউইক। ডিসেম্বরের ১০ তারিখ স্টকহোমে নোবেল পুরষ্কার নেবার সময় সারাক্ষণই মায়ের কথা মনে পড়ছিল আইরিনের। চব্বিশ বছর আগে মায়ের সাথে এসেছিলেন আইরিন মায়ের নোবেল পুরষ্কার অনুষ্ঠানে। আজ যদি মা বেঁচে থাকতেন! পুরষ্কার দেবার সময় রাজা পঞ্চম গুস্তাভও মাদামের কথা বললেন আইরিনকে। 

Sunday, 30 September 2018

আইরিন কুরি ।। সপ্তম পর্ব



 পরদিন সকালে নাস্তা করার সময় মাকে বললেন আইরিন, “মি, আমি এন্‌গেজড।”
চমকে উঠলেন মাদাম কুরি - “হোয়াট?”
“আমি এন্‌গেজড। আমার বয়স এই সেপ্টেম্বরে আটাশ হবে। আমার এখন বিয়ে করা উচিত। প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে আমি এন্‌গেজড হয়েছি।”
“কার সাথে?”
“মঁসিয়ে জুলিও”
“ফ্রেডেরিক জুলিও? কিন্তু তার তো কোন ডিগ্রি নেই। একজন ল্যাব-অ্যাসিস্ট্যান্টের বউ হয়ে জীবন কাটাবি?”
“আমি তো তার ডিগ্রিকে বিয়ে করবো না মি। তাছাড়া এখন তার ডিগ্রি নেই, ডিগ্রি হবে। সে তার গ্র্যাজুয়েশানের প্রস্তুতি নিচ্ছে।”
“ভালো” - বলে চুপ করে গেলেন মাদাম। তাঁর চোখেমুখে হতাশার চিহ্ন খেয়াল করলেন না আইরিন।

মাদাম কুরি কাউকে কিছু না বললেও ফ্রেড আর আইরিনের সম্পর্ক নিয়ে কানাঘুষা শুরু হয়ে গেছে রেডিয়াম ইনস্টিটিউটে। ফ্রেডের চেয়ে শিক্ষায় পদমর্যাদায় সিনিয়র অনেকেই আছেন সেখানে। তাঁরা ফ্রেডের ভাগ্যে ঈর্ষান্বিত হয়ে বলাবলি করতে লাগলো - ফ্রেড রাজকন্যা আর রাজত্ব দুটোই দখল করার জন্য ইনস্টিটিউটে এসেছেন। আইরিনের এসবে কিছু এসে যায় না। কিন্তু ফ্রেড কিছুটা অস্বস্তিতে পড়েন যখন সহকর্মীরা তাঁর পিঠ চাপড়ে দেন। 

ফ্রেড নিজেকে সবদিক দিয়েই আইরিনের যোগ্য করে গড়ে তোলার চেষ্টা করতে থাকেন। ১৯২৫ সালের জুলাই মাসে সরবোন ইউনিভার্সিটি থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন ফ্রেড। 

গবেষণাগারে আইরিন ও ফ্রেড

১৯২৬ সালে বিয়ের প্রস্তুতি নিতে শুরু করলেন ফ্রেড ও আইরিন। জুন মাসের পাঁচ তারিখ ফ্রেডের মা মাদাম কুরির সাথে দেখা করলেন। মাদাম খুবই আন্তরিক ব্যবহার করলেন মাদাম জুলিওর সাথে। জুনের বিশ তারিখ আইরিন গেলেন ফ্রেডদের বাসায় সবার সাথে লাঞ্চ করতে। ফ্রেডের বাড়ির সবাই খুব পছন্দ করলেন আইরিনকে। আইরিন কারো সাথে তেমন কোন কথা না বললেও তাঁর আন্তরিক সোজাসাপ্টা আচরণে সবাই বেশ খুশি হলেন। 

২৪শে জুন কুরি পরিবার আর জুলিও পরিবার একসাথে ডিনারে গেলো। ফ্রেডকে খুবই পছন্দ হলো ইভের। তার মনে হলো আইরিনের শুষ্ক নীরস সাদাকালো জীবনের ক্যানভাস রঙে রঙে ভরিয়ে দিতে পারবেন ফ্রেড। কিন্তু মাদামের গাম্ভীর্য আইরিনের চোখে না পড়লেও ইভের চোখ এড়ালো না। 

লা’কোয়েস্টে প্রতিবছর সামারে ছুটি কাটাতে যান আইরিন ও ইভ। এ’বছর ইভের বদলে ফ্রেডকে সাথে নিয়ে গেলেন আইরিন। লা’কোয়েস্টের ফিশিং বোটে ইচ্ছেমতো মাছ ধরলেন ফ্রেড। লা’কোয়েস্টের প্রায় প্রত্যেকের সাথেই পরিচয় হয়ে গেলো ফ্রেডের। জেলেদের সাথে তো রীতিমত বন্ধুত্ব হয়ে গেলো তাঁর। 

আইরিন তাঁর বিয়ের তারিখের ব্যাপারে উদ্বিগ্ন। লা’কোয়েস্ট থেকে প্যারিসে মাকে চিঠি লিখলেন আইরিন, “মি, আমাদের বিয়ের তারিখ এখনো তুমি ঠিক করে দাওনি। তোমার কোপেনহ্যাগেনে যাবার আগে বিয়েটা হয়ে গেলে ভালো হয়। কোপেনহ্যাগেন থেকে তোমার ফিরে আসার পরে হলে হয়তো আরো ভালো হতো, কিন্তু তখন ইনস্টিটিউটে পরীক্ষা চলবে। আমার মনে হয় অক্টোবরের নয় তারিখে বিয়ে হলে সবদিক দিয়ে ভালো হয়। তুমি তাড়াতাড়ি তোমার মত জানাও। আমি সেই মত টাউন হল বুকিং দেবো।” 

আইরিনের কথামতোই সবকিছু ঠিক হলো। ১৯২৬ সালের ৯ই অক্টোবর দুপুরে বিয়ে হয়ে গেলো আইরিন কুরি ও ফ্রেডেরিক জুলিওর। খুবই অনানুষ্ঠানিকভাবে বিয়ে হবার কথা থাকলেও দেখতে দেখতে বেশ বড় অনুষ্ঠান হয়ে গেলো। জুলিও পরিবারের সবাই, কুরি পরিবারের সবাই, সহকর্মী বিজ্ঞানীরা, সিটি মেয়র সহ বড় বড় সরকারি অফিসারের অনেকেই বিয়েতে এসেছিলেন। লাঞ্চের পর ফ্রেড আইরিনের সাথে আইরিনদের বাসায় গেলেন। তারপর সব অতিথিরা চলে গেলে নিজেও চলে গেলেন তাঁর নিজের বাসায়। আইরিন রয়ে গেলেন তাঁর মি’র সাথে। 

পরদিন সকালে ইভকে নিয়ে মাদাম কুরি চলে গেলেন কোপেনহ্যাগেনে। ফ্রেড চলে এলেন আইরিনের বাড়িতে। সেখানেই শুরু হলো তাঁদের দাম্পত্য জীবন। বিয়ের প্রথম কয়েক মাস ফ্রেড ও আইরিন মাদাম কুরির বাসাতেই ছিলেন। 

ফ্রেড ও আইরিন

আইরিনের বিয়ের পর মাদাম বেশ গম্ভীর হয়ে গেছেন। ফ্রেডকে তিনি সহজে মেনে নিতে পারছেন না। আইরিনকে মাদাম বলেছেন ম্যারেজ অ্যাগ্রিমেন্ট করিয়ে নিতে - কারণ তিনি বিশ্বাস করতে পারছেন না ফ্রেডের সাথে আইরিনের বিয়ে টিকবে। 

পুরুষ-শাসিত ফ্রান্সের আইন অনুযায়ী স্ত্রীর সমস্ত সম্পদ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা থাকে স্বামীর হাতে। মেরির ধারণা ফ্রেড আইরিনকে ছিনিয়ে নিয়েছেন তাঁর নিজের কাছ থেকে। স্বামীর মৃত্যুর পর ক্রমে ক্রমে আইরিন হয়ে উঠেছিলেন তাঁর অবলম্বন। কিন্তু মাদামের মনে হচ্ছে ফ্রেডের সাথে পরিচয়ের পর থেকে আইরিন ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে। অভিমানে মাদাম কতগুলো ছেলেমানুষী কাজ করতে শুরু করলেন। 

যেমন একদিন আমেরিকা থেকে কয়েকজন বিজ্ঞানী এসেছেন রেডিয়াম ইনস্টিটিউটে। মাদাম তাঁদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়ার জন্য ইনস্টিটিউটের গবেষক ও অ্যাসিস্ট্যান্টদের সবাইকে মিটিং রুমে ডাকলেন। সবাই এসে পাশাপাশি দাঁড়ালেন। মাদাম একে একে পরিচয় দিচ্ছিলেন - “ইনি ডক্টর লুইস - আমাদের ল্যাব টু’র ডিরেক্টর, ইনি ডক্টর সল্‌সবেরি - মাস্টার্স প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর, ইনি ডক্টর কুরি - রিসার্চ ইনচার্জ, ইনি মঁসিয়ে টেপার, ….” এভাবে যখন ফ্রেডের নাম বলার পালা এলো তখন এমন ভাব করলেন যেন ফ্রেডকে দেখতেও পাননি। ফ্রেডকে বাদ দিয়ে পরের জনের পরিচয় দিতে শুরু করলেন। কিন্তু ফ্রেডের উজ্জ্বল উপস্থিতি ভিজিটরদের চোখ এড়ায় না। যখন তাঁরা মাদামকে ফ্রেড সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন - মাদাম দায়সারা ভাবে জবাব দেন - “ওই লোকটা? আইরিন ওই লোকটাকে বিয়ে করেছে”। 

কিন্তু মাদামের অভিমান চোখেই পড়ছে না আইরিনের। তিনি তাঁর স্বামীর সাথে নতুন জীবন নিয়ে ব্যস্ত। স্বামীর জন্য রান্না করতে গিয়ে আইরিন আবিষ্কার করলেন তিনি এত কিছু শিখেছেন জীবনে - কিন্তু রান্না শিখতে ভুলে গেছেন। তবে কোন সমস্যা নেই। দেখা গেলো ফ্রেড চমৎকার রান্না করেন। অবশ্য রান্না করার সময় রান্নাঘর এত  অগোছালো করে ফেলেন যে অস্বস্তি লাগে। রান্না শেষে ফ্রেড ভয়ে ভয়ে গোছানোর চেষ্টা করেন। আইরিনের খুব মজা লাগে এসব দেখে। রান্নাঘর থেকে মাঝে মাঝে উচ্চস্বরে হাসির শব্দ শোনা যেতে লাগলো যা এই বাসায় আগে কখনো শোনা যায়নি। ইভ বাসায় থাকলে সেও যোগ দেয় তাদের সাথে। কিন্তু মাদাম একেবারেই একা হয়ে গেলেন।   

কয়েক মাস পর মাদাম আইরিনের হাতে একটা অ্যাপার্টমেন্টের চাবি তুলে দিলেন বিয়ের উপহার হিসেবে। তাঁদের বর্তমান বাসা থেকে কাছেই সরবোন অ্যানেক্সে একটা ছয়তলা ভবন কিনেছিলেন মাদাম কুরি, জাঁ পেরি আর ফ্রান্সিস বোরেল - এই তিন বন্ধু মিলে। প্রতি তলায় একটা করে অ্যাপার্টমেন্ট। তিন তলায় পাঁচ রুমের বিশাল অ্যাপার্টমেন্টে উঠে গেলেন আইরিন ও ফ্রেড। ছয় তলায় আইরিনের ছোটবেলার বন্ধু আলিনও থাকেন তাঁর স্বামী ও ছেলে-মেয়েকে নিয়ে। বেশ ভালোভাবেই শুরু হলো আইরিন ও ফ্রেডের সংসার। 

কিন্তু বিজ্ঞান-সমাজে ফ্রেডের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে সমস্যা দেখা দিলো। আইরিন ইতোমধ্যেই বিজ্ঞানী হিসেবে অনেকদূর এগিয়ে গেছেন। অনেকগুলো গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়ে গেছে তাঁর। কিন্তু ফ্রেড এখনো মাস্টার্সও পাস করেননি। অনেকেই প্রকাশ্যে বলাবলি করতে লাগলো এই বিয়ে ফ্রেডের ওপরে উঠার সিঁড়ি,  ক্যারিয়ার বাগানোর জন্য আইরিনকে বিয়ে করেছেন ফ্রেড। 

ফ্রেড রেগে যান এসব শুনে। বিয়ের পরেও আইরিন ‘কুরি’ নামে তাঁর পেপার প্রকাশ করতে থাকেন। মিডিয়াতে এই জুটি জুলিও-কুরি হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। আইরিনের সাথে কথা বলে ফ্রেড নিজের পদবীর সাথে স্ত্রীর পদবী লাগিয়ে ‘জুলিও-কুরি’ হয়ে যান। 

মায়ের কাছ থেকে আলাদা থাকতে শুরু করার পর মাদাম কুরির মনের অবস্থা বুঝতে পারেন ফ্রেড। তিনি আইরিনকে বোঝান - “আমাদের কিন্তু প্রতিদিনই একবার মাদামের বাসায় যাওয়া উচিত, তাঁর সাথে ডিনার করা উচিত।”
“মি কি সেটা পছন্দ করবেন?”
“তুমি কি মি’র পছন্দ অপছন্দ বুঝতে পারো? তুমি কি বুঝতে পারছো যে তিনি এখন কতটা একা হয়ে গেছেন? তিনি ভাবছেন আমি তোমাকে তাঁর কাছ থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে এসেছি। তোমার উচিত তাঁকে বুঝিয়ে দেয়া যে এখনো তুমি তাঁরই আছো। তাঁর মেয়ে পর হয়ে যায়নি বরং মেয়ের মাধ্যমে তিনি একটা ছেলে পেয়েছেন।”
“সেটা তো ঠিকই, কিন্তু তাঁকে বোঝাতে হবে কেন? মি পৃথিবীর এত কঠিন কঠিন জিনিস বোঝেন, আর এই ব্যাপারটা বোঝেন না?”
“স্নেহ ভালোবাসার ব্যাপারটা হলো অনেকটা সঙ্গীতের মতো। শুধু মনে মনে গুনগুন করলে হয় না, মাঝে মাঝে গলা ছেড়ে গাইতে হয়।”

আইরিনও ব্যাপারটা বুঝতে পারলেন। ফ্রেডের কাছ থেকে অনেক মানবিক ব্যাপার শিখছেন আইরিন যা আগে তাঁর চোখেও পড়তো না। সপ্তাহের মধ্যে বেশ কয়েকদিনই মেরির সাথে ডিনার করেন ফ্রেড ও আইরিন। আস্তে আস্তে মেরি সহজ হতে থাকেন ফ্রেডের সাথে। 

১৯২৭ সালে ফ্রেড সরবোন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিজ্ঞানে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। একই বছর তাঁদের প্রথম সন্তান হেলেনের জন্ম হয়। নাতনির মুখ দেখার পর মাদাম কুরির সব অভিমান জল হয়ে যায়। তিনি নাতনিকে একদিন না দেখলে ছটফট করতে থাকেন। 

মা হবার পর আইরিন যক্ষায় আক্রান্ত হলেন। ডাক্তার বললেন ‘কমপ্লিট রেস্ট’ নিতে হবে। এটাও বললেন যে ভবিষ্যতে আর মা হওয়া চলবে না। কয়েক সপ্তাহ রেস্ট নিয়ে শিশু হেলেনকে নার্সের হাতে দিয়ে ল্যাবে ফিরলেন আইরিন। ল্যাবে ডক্টরেটের জন্য পূর্ণোদ্যমে গবেষণা করছেন ফ্রেড। আইরিন সুপারভাইজ করছেন তাঁকে। 

১৯৩০ সালে ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করলেন ফ্রেডেরিক জুলিও-কুরি। তাঁর থিসিসের শিরোনাম ছিল, “ইলেকট্রোকেমিক্যাল প্রপার্টিজ অব রেডিওঅ্যাক্টিভ কম্পাউন্ডস অব পোলোনিয়াম”। 

রেডিয়াম ইনস্টিটিউটে ফ্রেড ও আইরিন যে বেতন পান তাতে ঠিকমত সংসার চলে না তাঁদের। মায়ের দেয়া অ্যাপার্টমেন্টটা না থাকলে তাঁদের অবস্থা যে কী হতো বলা যায় না। এতদিন ফ্রেডের একাডেমিক ডিগ্রি ছিল না। এখন ডক্টরেট হবার পর ফ্রেড ইন্ডাস্ট্রিতে চলে চাকরি নিয়ে চলে যাবেন ঠিক করলেন। কিন্তু ইন্ডাস্ট্রিতে গবেষণা করার তেমন সুযোগ নেই।

সরকারের উচ্চপর্যায়ের অনেকের সাথে পরিচয় হয়েছে ফ্রেডের। জার্মানিতে ফ্যাসিস্ট নাৎসিদের উত্থান ঘটছে। ফ্রেড সরকারি চ্যানেলে বোঝাতে সক্ষম হন যে বিজ্ঞান গবেষণায় প্রচুর বাজেট না দিলে ভবিষ্যতে ফ্যাসিস্টদের ঠেকানো যাবে না। সরকার একটা বড় অংকের রিসার্চ গ্রান্ট দেয় ফ্রেডকে। ইন্ডাস্ট্রিতে চলে যাবার সিদ্ধান্ত বাতিল করে ফ্রেড আইরিনের সাথে পূর্ণকালীন গবেষণা শুরু করেন। 

ফ্রেড আর আইরিনের টিম-ওয়ার্ক খুবই ভালো চলছিল। ফ্রেড ফিজিসিস্ট হলেও তাঁর ডক্টরাল থিসিস ছিল কেমিস্ট্রিতে। আর আইরিন কেমিস্ট, কিন্তু তাঁর থিসিস ছিল পিওর ফিজিক্সের ওপর। ফ্রেড যেকোন ব্যাপারেই দ্রুত চিন্তা করে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন, আবার ঘনঘন সিদ্ধান্ত বদলানও। কিন্তু আইরিন সেরকম নন। অনেক ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নেন বলে সিদ্ধান্ত নিতে তাঁর অনেক দেরি হয়। গবেষণায় সাফল্য এলে সকলের প্রশংসা পেতে পছন্দ করেন ফ্রেড, কিন্তু বিরাট সাফল্যেও কোন ভাবান্তর হয় না আইরিনের। 

Tuesday, 25 September 2018

আইরিন কুরি ।। ষষ্ঠ পর্ব



রেডিয়াম ইনস্টিটিউট থেকে আইরিনদের বাসা খুব বেশি দূরে নয়। সরবোন ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাসের পেছনের রাস্তা দিয়ে ল্যাটিন কোয়ার্টারের পাশ দিয়ে লা ট্যুরনেল ব্রিজ পার হয়ে বিখ্যাত নটর ডেম ক্যাথিড্রালের সামনে দিয়ে হেঁটে প্রতিদিনই বাসায় ফেরেন আইরিন।

এই পথে হাঁটার সময় আইরিনের অদ্ভুত একটা অনুভূতি হয়। মনে হয় মায়ের পথেই হাঁটছেন তিনি। তাঁর মা পোল্যান্ড থেকে এসে এই সরবোন ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময় এই ল্যাটিন কোয়ার্টারের একটা চিলেকোঠায় থাকতেন।

ফ্রেড আজ সাথে চলেছেন। ফ্রেড শুধু কাজের কথাই বলে যাচ্ছেন আজ, ক্লাউড চেম্বারের কথা, পোলোনিয়ামের কথা, রেডিয়ামের কথা। বাড়ির দরজায় আসার পরেও কথা শেষ হলো না তাঁর। বাকিটা পরের দিন হবে বলে বিদায় নিয়ে চলে এলেন। তাঁকে আবার অনেকদূর ঘুরে যেতে হবে নিজের বাসায়।

পরের দিনও ঠিক সময়ে কাজ শেষ করে বাইরে এসে সিঁড়ির কাছে বসে রইলেন ফ্রেড। ঘন্টাখানেক পর আইরিনকে সিঁড়ি দিয়ে নামতে দেখে এগিয়ে গেলেন। আবার একই পথে দু’জনের পাশাপাশি হাঁটা। নটর ডেম ক্যাথিড্রালের সামনে এসে ফ্রেড হঠাৎ প্রসঙ্গ পরিবর্তন করে বললেন, “নটর ডেমের বাইরের চেয়ে ভেতরটাই বেশি সুন্দর লাগে আমার কাছে। আপনার কেমন লাগে?”
“আমি জানি না”
“বুঝলাম না”
“অর্থাৎ আমি কখনো নটর ডেমের ভেতরে ঢুকে দেখিনি।”
“কেন?”
“ইচ্ছে করেনি।”
“আমার খুব জানতে ইচ্ছে করছে আপনার অনিচ্ছার কারণ কী।”
“বারো বছর বয়স পর্যন্ত আমি আমার গ্র্যানপির কাছে মানুষ হয়েছি। তাঁর কাছেই আমি পেয়েছি আমার জীবন-দর্শন। রাষ্ট্রীয় দখলদারিত্ব উপনিবেশ এগুলোকে খুবই ঘৃণা করি আমি। চার্চ যে ধর্মের নামে মানুষকে প্রতিনিয়ত শোষণ করছে, রাষ্ট্রের সব কাজে হস্তক্ষেপ করছে তা আমি জানি। আমার মা আমাদের দু’বোনকে ধর্মহীনভাবে বড় করেছেন। বলেছেন, আমি তোমাদের ওপর কোন ধর্মের বোঝা চাপিয়ে দিতে চাই না। তোমরা বড় হয়ে যখন বুঝতে শিখবে তখন যার যা খুশি অনুসরণ করবে। আমি যখন থেকে নিজে নিজে বুঝতে শিখেছি আমার দাদুর শিক্ষা মানবতাকেই আমার ধর্ম হিসেবে মানি। পৃথিবীর সবগুলো ক্যাথিড্রালে লক্ষ লক্ষ ফ্রাঙ্ক খরচ করে নানারকম চিত্রকর্ম, শিল্পকর্ম স্থাপন করা হয়। মূল উদ্দেশ্য কিন্তু এক - অলৌকিক ঈশ্বর বা যিশুখ্রিস্টের মহিমা প্রচার করা। আমি কখনোই কোন ধর্মীয় স্থানে এ পর্যন্ত ঢুকিনি, ভবিষ্যতেও ঢোকার ইচ্ছে নেই।”
“আপনি যিশুখ্রিস্টকে বিশ্বাস করেন না?”
“না। সব মানুষ পাপী, যিশু তাদের উদ্ধারকর্তা জাতীয় কথাবার্তা বিশ্বাস করার মতো নির্বোধ আমি নই।”
 
প্রায় প্রতিদিনই একসাথে হাঁটতে বেরোচ্ছেন ফ্রেড ও আইরিন। চেনা পথ দিয়ে বাড়ি ফেরার বদলে প্যারিসের অপরিচিত গলি দিয়েও হাঁটতে শুরু করেছেন তাঁরা। বিজ্ঞান ছাড়াও ধর্ম, সমাজ, রাজনীতি, শ্রেণিসংগ্রাম এবং কবিতা নিয়েও আলোচনা শুরু হলো তাঁদের মধ্যে। ফ্রেড আবিষ্কার করলেন আইরিন কবিতা পছন্দ করেন। অনেকগুলো ফ্রেঞ্চ, জার্মান ও ইংরেজি কবিতা তাঁর মুখস্থ।

যে আইরিনকে সবাই বরফের মূর্তি মনে করেন, সেই আইরিনের ভেতর একটা নতুন আইরিনের সন্ধান পান ফ্রেড। এই নতুন আইরিনের সাথে পাহাড়ে বেড়াতে যান ফ্রেড, স্কি করেন, সাঁতার কাটেন, টেনিস খেলেন। আবার একই সাথে গবেষণাও করেন। যদিও আইরিন ফ্রেডকে সরাসরি বলেন, “আপনাকে দেখলে মোটেও বিজ্ঞানী বলে মনে হয় না। আপনার চেহারা বড় বেশি মিলিটারি টাইপ।”

১৯২৫ সালে আইরিন সরবোন বিশ্ববিদ্যালয়ে ডক্টরাল থিসিস জমা দিয়েছেন - ‘আলফা রে অব পোলোনিয়াম’ শিরোনামে। থিসিস উৎসর্গ করেছেন তাঁর মাকে - ‘টু মাদাম কুরি বাই হার ডটার এন্ড পিউপিল’। আইরিন থিসিস ডিফেন্ড করতে গেলেন একটা ঢিলেঢালা ব্যাগি ড্রেসের ওপর কালো একাডেমিক গাউন পরে।

অডিটোরিয়ামে প্রায় হাজার দর্শক উপস্থিত রেডিয়াম-কন্যার বক্তৃতা শোনার জন্য। আইরিন যদিও সমাবেশ পছন্দ করেন না, কোন ধরনের টেনশান ছাড়াই তিনি বক্তৃতা করলেন। তিনি যা জানেন তা এত ভালো জানেন যে সেটা নিয়ে কোনদিনই কোন উৎকন্ঠায় ভোগেন না। আইরিনের পরীক্ষকদের ওপর মানসিক চাপ পড়বে ভেবে মাদাম কুরি যাননি সেই অনুষ্ঠানে।

পরীক্ষকদের সবার ভূয়সী প্রশংসার ভেতর দিয়ে ডক্টরেট ডিগ্রি পেলেন আইরিন কুরি। সরবোন থেকে রেডিয়াম ইনস্টিটিউটে ফিরেই চমকে উঠলেন আইরিন। সেখানে আইরিনের জন্য সংবর্ধনার আয়োজন করে ফেলেছেন ফ্রেড। ল্যাবরেটরির বিকারে করে শ্যাম্পেন পান করার মধ্য দিয়ে শেষ হলো সংবর্ধনা অনুষ্ঠান।




এতদিন ধরে ফ্রেডের সাথে মেলামেশা করতে করতে আইরিনের ভেতর অনেক কিছু পরিবর্তন হয়েছে। জীবনে প্রেম-ভালোবাসার কোন স্থান ছিল না তাঁর। কিন্তু ফ্রেড যেন নতুন দরজা খুলে দিয়েছেন তাঁর জীবনে। তিনি ফ্রেডকে নিয়ে গভীরভাবে ভাবছেন। ফ্রেড তো অনেক আগে থেকেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন বিয়ে যদি করেন তো আইরিনকেই করবেন।

ডক্টরেটের পর আইরিনকে নিয়ে মাদাম ব্রাজিলে গেছেন। ইনস্টিটিউটে গিয়ে আইরিনকে না দেখে কাজে মন বসাতে পারেন না ফ্রেড। তিনি আইরিনকে চিঠি লেখেন, “আমি এতদিন ভাবতাম গবেষণাকেই আমি বেশি ভালোবাসি। এখন তোমাকে না দেখতে পেয়ে বুঝতে পারছি আমি গবেষণার চেয়েও তোমাকেই বেশি ভালোবাসি। তুমি আছো বলেই আমার গবেষণা আছে। তুমি কাছে না থাকলে আমার সবকিছুই খালি খালি লাগে। তুমি যে আমার জীবনের সাথে মিশে গেছো তা কি তুমি জানো?”
চিঠি পেয়ে আইরিন ঠিক বুঝতে পারলেন না কী করবেন। তিনি সবসময় বস্তুনিষ্ঠ ব্যাপারে অভ্যস্ত। এরকম ভাবালুতার সাথে তাঁর পরিচয় নেই। ফ্রেড তাঁকে ভালোবাসে সেটা লিখেছে স্পষ্ট করে। কিন্তু বিয়ের প্রস্তাব তো এটা নয়। আইরিন বস্তুনিষ্ঠভাবে ভাবতে সাচ্ছন্দ্য অনুভব করেন। তিনি ভেবে দেখলেন ভালোবাসা যখন হয়েছে তখন বিয়ে করে ফেলাই ভালো। তাঁর মা একই সাথে বিশ্বসেরা বিজ্ঞানী আবার দুটো সন্তানের মা। মাদামের মেয়ে হয়ে আইরিনও নিশ্চয় বিজ্ঞান ও সংসার দুটোই সামলাতে পারবেন। তাছাড়া স্বামী হিসেবে খুব একটা খারাপ হবেন না ফ্রেড। 
কাজ শেষে বাসায় ফেরার সময় ফ্রেডের সাথে খোলাখুলি কথা বললেন আইরিন।
“তোমার চিঠি আমি পেয়েছি।”
“কিন্তু চিঠির জবাব আমি পাইনি।”
“চিঠিতে একটি প্রশ্ন তুমি করেছিলে - আমি যে তোমার জীবনের সাথে মিশে গেছি তা আমি জানি কিনা। সে প্রশ্নের উত্তরে কী লিখতে হয় আমি জানি না। ফ্রেড, এই ব্যাপারগুলো আমার কাছে ভীষণ জটিল বলে মনে হয়। সরাসরি বলো - তুমি কি আমাকে বিয়ে করতে চাও?”
“হ্যাঁ চাই চাই চাই।”
“একটা শব্দ এতবার বলছো কেন?”
“আমার ইচ্ছের প্রাবল্য বোঝানোর জন্য বলছি মাদ্‌মাজেল। আমার মনে হচ্ছে আমি আজ চাঁদ হাতে পেয়েছি।”
“সবকিছুতে কেন যে তুমি চাঁদের উপমা দাও বুঝতে পারি না। আলফা পার্টিক্যলকে তুমি চাঁদে নিয়ে যাও। আজ বলছো তুমি চাঁদ হাতে পেয়েছো। চাঁদের আয়তন কত জানো?”
“তোমার বিজ্ঞান দিয়ে ভালোবাসা বোঝার চেষ্টা করো না মাদ্‌মাজেল। ওটা আমার হাতেই ছেড়ে দাও। আমি তোমাকে বুঝিয়ে দিচ্ছি চাঁদ হাতে পাওয়া বলতে কী বোঝায়” - বলতে বলতে গভীর আবেগে আইরিনকে জড়িয়ে ধরেন ফ্রেড। সময় থেমে যায়, চন্দ্রগ্রস্তের মত তিরতির করে কাঁপতে থাকেন আইরিন।

[সপ্তম পর্ব পড়ার জন্য ক্লিক করুন এখানে]

Latest Post

এমি নোইটার – আইনস্টাইন যুগের গণিতবিদ

  আমালি এমি নোইটার ছিলেন বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে মৌলিক গণিতবিদদের একজন। বিশুদ্ধ গণিত এবং তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞান উভয় ক্ষেত্রেই তাঁর গবেষণা...

Popular Posts