আমাদের এই বিশাল
মহাবিশ্বের যে বিপুল কর্মযজ্ঞ চলছে – এই যে প্রচন্ড গতিতে ধাবমান কয়েক শত কোটি গ্যালাক্সি,
গ্যালাক্সির ভেতর কোটি কোটি নক্ষত্র, ব্ল্যাকহোল, নক্ষত্রগুলির চারপাশে ঘূর্ণায়মান
গ্রহ-উপগ্রহ – সবকিছুকে অদৃশ্য মহাকর্ষ বলের মাধ্যমে টেনে রাখাসহ সমস্ত মহাজাগতিক কাজকর্ম
নিয়ে প্রচন্ড বেগে চলমান এই মহাবিশ্বের শক্তির উৎস কী? কোত্থেকে আসছে এই বিপুল পরিমাণ
শক্তি?কোন্ প্রক্রিয়ায় তৈরি হচ্ছে এই শক্তি? এক শব্দে যদি এই প্রশ্নের উত্তর দিতে
হয়, এর উত্তর হবে – ফিউশন।
মহাবিশ্বের
নক্ষত্রগুলির ভেতর অনবরত ফিউশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যে শক্তি উৎপন্ন হচ্ছে সে শক্তিতেই
মহাবিশ্ব চলছে। আমাদের সৌরজগতের সবগুলি গ্রহের শক্তির প্রধান উৎস আমাদের সূর্য। সূর্য
থেকে প্রতি সেকেন্ডে ৩.৮ x ১০২৬ জুল শক্তি মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ছে। তার দুইশ
কোটি ভাগের একভাগ মাত্র আমাদের পৃথিবীতে এসে পৌঁছায়। অতটুকু শক্তি কি আমাদের পৃথিবীর
জন্য যথেষ্ট? একটু হিসেব করে দেখা যাক। বর্তমানে আমাদের পৃথিবীর মোট শক্তির চাহিদা
বছরে প্রায় ৬.১ x ১০২০ জুল। সূর্য থেকে পৃথিবীতে শক্তি আসে প্রতি সেকেন্ডে
প্রায় ১.৭ x ১০১৭ জুল, যা এক ঘন্টায় দাঁড়ায় ৬.১২ x ১০২০ জুল।
দেখা যাচ্ছে সমগ্র পৃথিবীর সারা বছরের সব কাজকর্ম চালানোর জন্য যে পরিমাণ শক্তির দরকার
হয়, সূর্য থেকে তা মাত্র এক ঘন্টায় চলে আসে আমাদের পৃথিবীতে।
তাহলে সারাবছর
ধরে সূর্য থেকে যে শক্তি আমাদের পৃথিবীতে আসে – সেগুলি কোথায় যায়? পৃথিবী সূর্য থেকে
যে শক্তি শোষণ করে তার শতকরা প্রায় ত্রিশ ভাগ বিকিরণের মাধ্যমে আবার মহাকাশে ফিরে যায়।
বাকি সত্তর ভাগ খরচ হয় – সমস্ত প্রাকৃতিক ঘটনার পেছনে। অবিরাম মহাকর্ষ বলের জোগান দেয়ার
জন্য শক্তি লাগে, বিশাল সমুদ্রের পানি পরিচালনার জন্য শক্তি লাগে, মেঘ বৃষ্টি বাদল
ঘূর্ণিঝড় সাইক্লোন টাইফুন এসবের পেছনে শক্তি খরচ হয়। যেসব ঘটনাকে আমরা প্রাকৃতিক ঘটনা
বলি – সেসবের সব শক্তিই আমরা পাই আমাদের প্রাকৃতিক নক্ষত্র থেকে।
কিন্তু পৃথিবীতে
যে আটশ কোটি মানুষ এবং কোটি কোটি কোটি (১০২১)
অন্যান্য প্রাণি বাস করছে -তাদের যে দৈনন্দিন কাজের জন্য শক্তির চাহিদা, সেই শক্তির
জোগান আসছে কোত্থেকে? নক্ষত্রগুলি ফিউশন প্রক্রিয়ায় শক্তি উৎপাদন করে। কিন্তু গ্রহগুলিতে
স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেরকম শক্তি উৎপাদিত হয় না। সেই শক্তি জোগাড় করে নিতে হয় সেই গ্রহের
বাসিন্দাদেরই। মহাবিশ্বে পৃথিবী ছাড়া অন্য কোন গ্রহে প্রাণের সন্ধান এখনো পাওয়া যায়নি।
তাই অন্য সব গ্রহের কথা বাদ দিয়ে আমরা দেখি আমাদের পৃথিবীতে শক্তির চাহিদা কেমন এবং
বর্তমানে তার জোগান ঘটছে কীভাবে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির
যুগ শুরু হবার আগে মানুষ ও অন্যান্য প্রাণি প্রকৃতির উপরই নির্ভর করতো তাদের প্রয়োজনীয়
শক্তির জন্য। মানুষ এবং মানুষের গৃহে পালিত কিছু প্রাণি ছাড়া অন্যান্য সব প্রাণি এখনো
পুরোপুরিই প্রকৃতিনির্ভর। কিন্তু মানুষ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে যতই উন্নত হচ্ছে – তাদের
শক্তির চাহিদা বাড়ছে এবং এই চাহিদা মেটানোর জন্য নতুন নতুন পদ্ধতির উদ্ভাবন করছে।
বর্তমানে পৃথিবীর
আটশ কোটি মানুষের জন্য বছরে প্রায় ৬ X ১০২০ জুল শক্তি লাগে। ২০৫০ সালের
মধ্যে এই শক্তির চাহিদা দ্বিগুণ হয়ে যাবে। বর্তমানে এই চাহিদার শতকরা প্রায় ত্রিশ ভাগ
আসে তরল জ্বালানি থেকে (পেট্রোলিয়াম ইত্যাদি), পঁচিশ ভাগ আসে কয়লা থেকে, পঁচিশ ভাগ
আসে প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে, বাকি বিশ ভাগ আসে নিউক্লিয়ার ও অন্যান্য উৎস (সৌরশক্তি,
বায়ুশক্তি, পানিশক্তি ইত্যাদি) থেকে।
দেখা যাচ্ছে
মোট শক্তির চাহিদার আশি ভাগই পূরণ হচ্ছে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে। কিন্তু পৃথিবীতে জীবাশ্ম
জ্বালানির পরিমাণ দ্রুতই কমছে এবং এক সময় এই জ্বালানি শেষ হয়ে যাবে। শুধু তাই নয়, জীবাশ্ম
জ্বালানি থেকে যে দূষণ ঘটে তার ক্ষতিকর প্রভাবে বদলে যাচ্ছে পৃথিবীর পরিবেশ। তাই শক্তির
বিকল্প উৎসের খোঁজ চলছে অনেক বছর থেকে – যে উৎস বিপুল শক্তি জোগাবে ঠিকই, কিন্তু কোন
ধরনের দূষণ ঘটাবে না।
জ্বালানি উৎসের
গ্রহণযোগ্যতার মাপকাঠি নির্ধারিত হয় প্রধানত পাঁচটি পরিমাপকের (প্যারামিটার) ভিত্তিতে।
পরিমাপকগুলি হলো আবহাওয়ার উপর নির্ভরশীলতা, কার্বন-ডাই-অক্সাইড নিঃসরণের পরিমাণ, সরবরাহের
পরিমাণ, উৎপাদিত বর্জ্যের পরিমাণ, এবং উৎপাদন ব্যয়। জীবাশ্ম জ্বালানি – তেল, গ্যাস
ও কয়লা থেকে উৎপাদিত শক্তি আবহাওয়ার উপর নির্ভর করে না ঠিক, তবে প্রচুর কার্বন ডাই
অক্সাইড নিঃসরণ ঘটায়, সরবরাহের পরিমাণও অফুরন্ত নয়, প্রচুর জ্বালানি-বর্জ্য উৎপাদন
করে এবং উৎপাদন ব্যয়ও অনেক।
জীবাশ্ম-জ্বালানির
সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো প্রচুর কার্বন-ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ ঘটিয়ে এটি মারাত্মকভাবে পরিবেশ
দূষণ ঘটায়। তাই দীর্ঘদিন ধরে জীবাশ্ম জ্বালানির বিকল্প উৎসের পক্ষে কাজ চলছে এবং বিকল্প
উৎস থেকে বিদ্যুত-শক্তি উৎপাদনের মাত্রা ধীরে ধীরে বাড়ছে।
জীবাশ্ম জ্বালানির
বিকল্প যেসব উৎস থেকে বিদ্যুৎ শক্তি বর্তমানে উৎপাদন করা হচ্ছে তাদের মধ্যে তাদের মধ্যে
আছে নিউক্লিয়ার শক্তি, সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি, পানিশক্তি ইত্যাদি। এগুলি কার্বন-ডাই-অক্সাইড
নিঃসরণ ঘটায় না বটে, তবে এদের স্রবরাহ অফুরন্ত নয়, এদের উৎপাদন খরচও অনেকক্ষেত্রে অনেক
বেশি। সৌরশক্তি এবং বায়ুশক্তি পুরোপুরি আবহাওয়া-নির্ভর। নিউক্লিয়ার শক্তির সবচেয়ে বড়
দুর্বলতা হচ্ছে এর উৎপাদন ব্যয় এবং তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জটিলতা।
এদের সবার বিপরীতে
একমাত্র ফিউশন শক্তিই জ্বালানি উৎসের গ্রহণযোগ্যতার সবগুলি পরিমাপক ভালোভাবে পূরণ করতে
পারে। যদি যথাযথ প্রযুক্তির মাধ্যমে বানিজ্যিকভাবে ফিউশন শক্তি উৎপাদন করা সম্ভব হয়।
যে ফিউশন শক্তি
নক্ষত্রের শক্তি জোগায়, সেই ফিউশন শক্তিকে বাণিজ্যিকভাবে তৈরি করা ক্ষুদ্র আকারের কৃত্রিম
সূর্য তৈরি করার সমান। আশ্চর্যজনক হলেও সত্য, বিজ্ঞানীরা এক্ষেত্রে অনেকদূর এগিয়ে গেছেন।
আশা করা হচ্ছে ২০৪০ সালের মধ্যে সীমিত পরিসরে হলেও ফিউশন শক্তির বাণিজ্যিক উৎপাদন সম্ভব
হবে।
দেখা যাক ফিউশন
শক্তি উৎপাদনের বিভিন্ন ধাপগুলি কী কী। আমরা আগেই উল্লেখ করেছি, ফিউশন শক্তির উৎপাদন
প্রক্রিয়া সূর্যের ভেতর শক্তি উৎপাদনের প্রক্রিয়ার অনুরূপ। সূর্যে যে ফিউশন অনবরত ঘটে
চলেছে তার প্রক্রিয়াটি দেখে নেয়া যাক। সূর্যের কেন্দ্রে যেখানে ফিউশন প্রক্রিয়া ঘটে
সেখানকার তাপমাত্রা প্রায় পনের মিলিয়ন ডিগ্রি সেলসিয়াস বা দেড় কোটি ডিগ্রি সেলসিয়াস।
এরকম ভয়ানক উচ্চ তাপমাত্রায় সমস্ত পদার্থ থাকে প্লাজমার আকারে। এই প্লাজমার ভেতর একটি
প্রোটন আরেকটি প্রোটনের সাথে মিলিত হয়। আমাদের মনে রাখতে হবে, দেড় কোটি ডিগ্রি সেলসিয়াস
তাপমাত্রার পরিবেশে কুলম্বের নিয়ম কাজ করে না। অর্থাৎ একই ধরনের চার্জ পরস্পরকে বিকর্ষণ
করে না। তাই একটি প্রোটন আরেকটি প্রোটনের সাথে যুক্ত হতে পারে।
প্রোটন আসলে
হাইড্রোজেন নিউক্লিয়াস – যেখানে কোন নিউট্রন নেই। এখন দুটো প্রোটন মিলিত হবার পর তাদের
একটি প্রোটন নিউট্রনে পরিণত হয় এবং একটি পজিট্রন ও একটি ইলেকট্রন নিউট্রিনো বের হয়ে
আসে। হাইড্রোজেন নিউক্লিয়াসের ভেতর তখন একটি প্রোটন ও একটি নিউট্রন থাকে। হাইড্রোজেনের
এই আইসোটোপের নাম ডিউটেরিয়াম। ডিউটেরিয়ামের নিউক্লিয়াসের নাম ডিউটেরন। এরপর ধারাবাহিক
ফিউশন প্রক্রিয়ায় এই ডিউটেরনের সাথে আরেকটি প্রোটন বা হাইড্রোজেন নিউক্লিয়াসের মিলন
ঘটে। ফলে নিউক্লিয়াসের ভেতর দুটো প্রোটন এবং একটি নিউট্রন থাকে যা হিলিয়াম-৩ আইসোটোপ।
এরকম দুটো হিলিয়াম-৩ আইসোটোপ পরস্পর যুক্ত হয়ে তৈরি হয় হিলিয়াম-৪ পরমাণু এবং দুটো প্রোটন
(হাইড্রোজেন নিউক্লিয়াস)। এরকম প্রোটন-প্রোটন চেইন-রিঅ্যাকশান অনবরত চলতে থাকে। প্রত্যেকবার
১২.৯ মিলিয়ন ইলেকট্রন-ভোল্ট শক্তি উৎপাদিত হয়। একই সাথে কোটি কোটি কোটি বার ফিউশন ঘটার
ফলে প্রতি সেকেন্ডে বিপুল পরিমাণ শক্তি উৎপন্ন হয়।
ফিউশন বিক্রিয়া
মূলত নিউক্লিয়ার বিক্রিয়া। এখানে শক্তি উৎপন্ন হয় আইনস্টাইনের E=mc2 সমীকরণ
থেকে। দুটো নিউক্লিয়াস যখন ফিউশন প্রক্রিয়ায় এক হয়ে নতুন একটি নিউক্লিয়াসের জন্ম হয়
– তখন সেই নিউক্লিয়াসের পারমাণবিক ভর অন্য দুটি নিউক্লিয়াসের আলাদা আলাদা ভরের যোগফলের
চেয়ে কিছুটা কম হয়। এই দুই ভরের পার্থক্য খুব কম হলেও সেই সামান্য ভরকে আলোর বেগের
বর্গফল দিয়ে গুণ করলে যে শক্তি পাওয়া যায় তা বিশাল।
ফিউশন প্রক্রিয়া
বিভিন্ন পরমাণুর সাথে বিভিন্ন ভাবে হতে পারে। তার কয়েকটি উদাহরণ এবং প্রতিটি ফিউশন
প্রক্রিয়ায় উৎপাদিত শক্তির পরিমাণ নিচে দেয়া হলো।
|
ফিউশন প্রক্রিয়া |
উৎপাদিত শক্তির পরিমাণ |
|
ডিউটেরিয়াম + ডিউটেরিয়াম = ট্রিটিয়াম
+ হাইড্রোজেন |
৪.০৪ মিলিয়ন ইলেকট্রন-ভোল্ট |
|
ডিউটেরিয়াম + ডিউটেরিয়াম = হিলিয়াম-৩
+ নিউট্রন |
৩.২৭ মিলিয়ন ইলেকট্রন-ভোল্ট |
|
ডিউটেরিয়াম + ট্রিটিয়াম = হিলিয়াম-৪
+ নিউট্রন |
১৭.৬ মিলিয়ন ইলেকট্রন-ভোল্ট |
|
হিলিয়াম-৩ + হিলিয়াম-৩ = হিলিয়াম-৪
+ ২Xপ্রোটন |
১২.৯ মিলিয়ন ইলেকট্রন-ভোল্ট |
|
হিলিয়াম-৩ + লিথিয়াম-৬ = হাইড্রোজেন
+ ২Xহিলিয়াম-৪ |
১৬.৮৮ মিলিয়ন ইলেকট্রন-ভোল্ট |
দেখা যাচ্ছে
ডিউটেরিয়াম (D) এবং ট্রিটিয়ামের (T) মধ্যে ফিউশন প্রক্রিয়ায় (D-T) সবচেয়ে বেশি শক্তি
উৎপাদিত হয়। ফলে কৃত্রিম ফিউশনের ক্ষেত্রে এই D-T বিক্রিয়াকে কাজে লাগানোই সবচেয়ে সুবিধাজনক
বলে ধরে নেয়া হয়।
সূর্যের যে
পরিবেশে ফিউশন প্রক্রিয়া ঘটে সেই পরিবেশ পৃথিবীর ল্যাবে বা নিউক্লিয়ার রি-অ্যাকটরে
তৈরি করতে পারাটাই পৃথিবীতে কৃত্রিম সূর্য তৈরি করে ফিউশন শক্তি উৎপাদনের সবচেয়ে বড়
চ্যালেঞ্জ।
ফিউশন রি-অ্যাকটর:
ফিউশন রি-অ্যাকটর
এমনভাবে তৈরি করা হয় যেখানে হালকা পারমাণবিক পরমাণুর নিউক্লিয়াস নিউক্লিয়ার ফিউশনের
মাধ্যমে পরস্পরের সাথে যুক্ত হয়ে অপেক্ষাকৃত ভারি পরমাণু তৈরি করবে এবং প্রক্রিয়ার
বাই-প্রডাক্ট হিসেবে ফিউশন শক্তি উৎপন্ন করবে।
সূর্যে এক থেকে
দেড় কোটি ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার প্লাজমাতে ফিউশন বিক্রিয়া ঘটে। কিন্তু পৃথিবীতে
সেই তাপমাত্রায় ক্রমাগত ফিউশন বিক্রিয়া ঘটানো সম্ভব নয়। কারণ সূর্যের বিশাল ভরের কারণে
মাধ্যাকর্ষণের চাপ পৃথিবীর তুলনায় হাজার কোটি গুণ বেশি। সেখানে উচ্চ চাপের কারণে অপেক্ষাকৃত
কম তাপমাত্রায় (এক থেকে দেড় কোটি ডিগ্রি সেলসিয়াস) প্লাজমা তৈরি হয়। কিন্তু পৃথিবীর
কম বায়ুমন্ডলীয় চাপে ফিউশন ঘটানোর মতো প্লাজমা তৈরি করতে হলে তাপমাত্রা লাগবে সূর্যের
চেয়েও কমপক্ষে দশ গুণ বেশি, অর্থাৎ প্রায় দশ থেকে পনেরো কোটি ডিগ্রি সেলসিয়াস। ফিউশন
রি-অ্যাকটরগুলিকে সেই বিপুল তাপমাত্রা সহ্য করার ক্ষমতা থাকতে হবে।
সেজন্য ফিউশন
রি–অ্যাকটরের জন্য প্রথমেই প্রয়োজন দশ থেকে পনের কোটি ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা সহ্য
করতে পারবে এমন পদার্থের তৈরি বিশাল পাত্র যেখানে ফিউশন বিক্রিয়া ঘটানোর জন্য প্লাজমা
রাখা যাবে।
ডিউটেরিয়াম-ট্রিটিয়াম
প্লাজমা জ্বালানি সরবরাহ করা হয় সেই পাত্রে। ডিউটেরিয়াম হলো হাইড্রোজেনের আইসোটোপ।
সমুদ্রের পানিতে স্বাভাবিকভাবেই ডিউটেরিয়াম পাওয়া যায়। প্রতি সাড়ে ছয় হাজার হাইড্রোজেন
পরমাণুতে একটি ডিউটেরিয়াম পাওয়া যায়। সমুদ্রের পানি থেকে ইলেকট্রোলাইসিসের মাধ্যমে
ডিউটেরিয়াম অক্সাইড বা ভারী পানি তৈরি করে সেখান থেকে ডিউটেরিয়াম পাওয়া যায়। কিন্তু
ট্রিটিয়াম প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া যায় না, তাই তৈরি করে নিতে হয়। ফিউশন রিঅ্যাকটরের ভেতরই
ট্রিটিয়াম তৈরির ব্যবস্থা রাখা হয় লিথিয়াম ব্রিডিং ব্ল্যাংকেটের মাধ্যমে। ফিউশন প্লাজমা
চেম্বারের চারপাশে এই লিথিয়াম ব্ল্যাংকেট লাগানো থাকে। প্রাথমিক ডিউটেরিয়াম-ট্রিটিয়াম
প্লাজমা থেকে ফিউশন বিক্রিয়া শুরু হলে বাই-প্রোডাক্ট হিসেবে যে নিউট্রন উৎপন্ন হয় তা
লিথিয়াম ব্ল্যাংকেটের লিথিয়ামের সাথে ফিউশন ঘটিয়ে তৈরি করে হিলিয়াম-৪ নিউক্লিয়াস এবং
ট্রিটিয়াম। এই ট্রিটিয়াম ডিউটেরিয়ামের সাথে ফিউশন ঘটায়।
কোটি তাপমাত্রার
প্লাজমা এবং সেখানকার তীব্রশক্তি সম্পন্ন নিউক্লিয়ার ফিশান পাত্রের ভেতর ধরে রাখা আরেকটি
বড় টেকনিক্যাল চ্যালেঞ্জ। প্রধানত তিন ভাবে এই চ্যালেঞ্জের মোকাবেলা করা যায়; (১) ম্যাগনেটিক
কনফাইনমেন্ট ফিউশন (এমসিএফ), (২) ইনারশিয়াল কনফাইনমেন্ট ফিউশন (আইসিএফ), এবং (৩) ম্যাগনেটো-ইনারশিয়াল
ফিউশন (এমআইএফ)।
এমসিএফ শ্রেণির
রিঅ্যাকটরে অত্যন্ত শক্তিশালী চুম্বকক্ষেত্রের মাধ্যমে প্লাজমা ধরে রাখা হয়। ডিউটেরিয়াম-ট্রিটিয়াম
ফিউশনের ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি বেশ কার্যকর। বাণিজ্যিকভাবে ফিউশন শক্তি উৎপাদনের বড় বড়
প্রকল্পগুলিতে এখন এই পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে।
আইসিএফ শ্রেনির
রিঅ্যাকটরে অত্যন্ত উচ্চশক্তির লেজার অথবা কণা-প্রবাহ ব্যবহার করে ফিউশন ধরে রাখার
ব্যবস্থা করা হয়। ন্যানো-সেকেন্ড সময়ের ভেতর প্লাজমার তাপমাত্রা দশ কোটি ডিগ্রির বেশি
হয়ে যায়। লেজারের সাহায্যে সেখানে ঘটানো ফিউশনের ঘটনাগুলিকে মাইক্রোস্কেলের পারমাণবিক
বিস্ফোরণের সাথে তুলনা করা যায়। পরীক্ষাগারে ছোট স্কেলে এটি ঘটানো সম্ভব হলেও এখনোপর্যন্ত
বড় স্কেলে ঘটানো সম্ভব হয়নি।
এমআইএফ পদ্ধতি
মূলত এমসিএফ এবং আইসিএফ এর শংকর, যেখানে প্লাজমা ধরে রাখার জন্য চুম্বকক্ষেত্র ব্যবহার
করা হয়, আবার আইসিএফ-এর মতো অত্যন্ত দ্রুত সংকোচনের মাধ্যমে ফিউশনের পরিবেশ তৈরি করা
হয়।
ফিউশন রিঅ্যাকটরের
জন্য অত্যন্ত উচ্চমাত্রার চুম্বকক্ষেত্র তৈরি করতে হয়। উচ্চতাপমাত্রার সুপারকন্ডাক্টিং
ম্যাগনেটের মাধ্যমে এটি করা যায় – তবে সেটিও খুবই চ্যালেঞ্জিং। কারণ আমরা জানি উচ্চ
তাপমাত্রায় চুম্বকশক্তি কমে যায়।
ফিউশন রি-অ্যাক্টরের
ভেতর প্লাজমার তাপমাত্রা দশ কোটি ডিগ্রি পর্যন্ত ওঠানো মোটেই সহজ কাজ নয়। চেষ্টা করা
হচ্ছে উচ্চ কম্পাঙ্কের তড়িৎচুম্বক তরঙ্গের মাধ্যমে প্লাজমা-কণার ভেতর উচ্চমাত্রার রেজোনেন্স
তৈরি করে তাপমাত্রা ওঠানোর। উচ্চ-শক্তির নিউট্রন প্রবাহের মাধ্যমে প্লাজমায় শক্তি সরবরাহ
করে সেই শক্তিকে তাপশক্তিতে রূপান্তরের মাধ্যমেও এই চেষ্টা চালানো হচ্ছে। কিন্তু সূর্যের
চেয়েও দশ গুণ বেশি তাপমাত্রা তৈরি করা এবং সেই তাপমাত্রা ধরে রাখার কাজ মোটেও সহজ নয়।
কিন্তু বিজ্ঞানীরা ইতিমধ্যেই পরীক্ষণ রিঅ্যাকটরে প্লাজমার তাপমাত্রা দশ থেকে বিশ কোটি
ডিগ্রি পর্যন্ত ওঠাতে সক্ষম হয়েছেন। কিন্তু সমস্যা হলো এই তাপমাত্রা দীর্ঘ সময়ের জন্য
ধরে রাখা।
প্লাজমার তাপমাত্রা
দশ কোটি ডিগ্রিতে তোলা এবং ধরে রাখার কাজ সম্পন্ন হবার পরের ধাপ হলো প্লাজমায় যখন ফিউশন
ঘটে – তার মিথষ্ক্রিয়ার ফলে যে উচ্চ শক্তির প্রচন্ড গতির নিউট্রন বের হয়ে আসে – তাদেরকে
রি-অ্যাকটরের ভেতর আটকে রাখা। রি-অ্যাকটরের ভেতরের দেয়ালে লিথিয়াম ব্রিডিং ব্লাংকেট
দেয়া হয় – যেগুলি দুটো কাজ একসাথে করে। প্রথমত তীব্রবেগে ধাবমান নিউট্রনগুলিকে আটকায়,
এবং সেই নিউট্রনগুলিকেই লিথিয়ামের সাথে ফিউশন ঘটিয়ে তৈরি করে ট্রিটিয়াম – যা রিঅ্যাকটরের
জ্বালানি হিসেবে কাজ করে।
রিঅ্যাকটরের
ভেতর ফিউশন প্রক্রিয়ায় যেসব অবাঞ্চিত বাই-প্রোডাক্ট তৈরি হয় সেগুলিকে বের করে দেয়ার
ব্যবস্থা করা হয় ডাইভাটরের মাধ্যমে। অতিরিক্ত তাপমাত্রাও নিয়ন্ত্রণ করা হয় ডাইভাটরের
মাধ্যমে।
রিঅ্যাক্টরের
প্লাজমা ধরে রাখার জন্য যে উচ্চশক্তির সুপারকন্ডাক্টিং ম্যাগনেট ব্যবহার করা হয় সেগুলিকে
কর্মক্ষম রাখার জন্য সেগুলির তাপমাত্রা কিছুতেই বাড়তে দেয়া যায় না। চুম্বকের তাপমাত্রা
চার ডিগ্রি কেলভিনের (মাইনাস ২৬৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস) বেশি হয়ে গেলে সুপারকন্ডাক্টিং ক্ষমতা
নষ্ট হয়ে যায়। তাই এই চুম্বক-সিস্টেমকে দশ কোটি ডিগ্রি তাপমাত্রার প্লাজমা থেকে আলাদা
করে রাখা হয় ক্রায়োস্ট্যাটের সাহায্যে।
ফিউশনের ফলে
যে শক্তি তৈরি হয় – সেই বিপুল শক্তি উৎপন্ন হয় তাপ আকারে। উৎপন্ন তাপকে পানি, হিলিয়াম
ও কার্বন-ডাই-অক্সাইডের উত্তপ্ত বাষ্পের মাধ্যমে বিশাল টারবাইনে স্থানান্তর করা হয়।
ফলে সেই টারবাইনের ঘূর্ণনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ তৈরি হয়।
ফিউশন রিঅ্যাকটর - টোকাম্যাক
ফিউশন রিঅ্যাকটরের
বেশ কিছু ডিজাইন নিয়ে বিজ্ঞানীরা কাজ করলেও সবচেয়ে কার্যকর এবং এখনো পর্যন্ত সবচেয়ে
সফল ফিউশন রিঅ্যাকটরের নাম টোকাম্যাক। ১৯৫০ এর দশকের শেষের দিকে তদানীন্তন সোভিয়েত
ইউনিয়নের বিজ্ঞানীরা টোকাম্যাক উদ্ভাবন করেছেন। মূল রাশিয়ান শব্দ ‘টোকাম্যাক’ বলতে
বোঝায় ‘টরোইডাল চেম্বার উইথ ম্যাগনেটিক কয়েলস’। এ ধরনের রিঅ্যাকটরে প্লাজমা একটি ডোনাট
আকৃতির (টরোইডাল) পথে ঘুরে ঘুরে চুম্বকক্ষেত্র দ্বারা আটকে থাকে বলে এদের নাম হয়েছে
টোকাম্যাক।
টোকাম্যাক রিঅ্যাকটরে
প্লাজমা তৈরি করা হয় হাইড্রোজেন গ্যাস উত্তপ্ত করার মাধ্যমে। দশ কোটি ডিগ্রি তাপমাত্রার
প্লাজমা ধরে রাখার মতো ধাতব পাত্র তৈরি করা অসম্ভব। তাই উত্তপ্ত প্লাজমা ধরে রাখার
ব্যবস্থা করা হয় উচ্চশক্তির চুম্বকক্ষেত্রের মাধ্যমে। বর্তমান ও ভবিষ্যতের অনেকগুলি
ফিউশন শক্তি প্রকল্পের রিঅ্যাক্টর টোকাম্যাক প্রকৃতির।
ফিউশন শক্তির
বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ প্রকল্পগুলি
আইটিইআর
ফিউশন শক্তি
উৎপাদনের চলমান প্রকল্পগুলির মধ্যে সবচেয়ে বড় এবং প্রতিশ্রুতিশীল প্রকল্প হচ্ছে ‘ইন্টারন্যাশনাল
থার্মোনিউক্লিয়ার এক্সপেরিমেন্টাল রিঅ্যাকটর বা সংক্ষেপে আইটিইআর’। এই প্রকল্পটি ফিউশন
শক্তির উৎপাদন গবেষণার সবচেয়ে বড় প্রকল্প। বিশ্বের প্রভাবশালী অনেক দেশ এই প্রকল্পের
সাথে যুক্ত। ইওরোপিয়ান ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, ভারত, জাপান এবং দক্ষিণ
কোরিয়া এই প্রকল্পের অর্থায়ন করছে। এই প্রকল্পের পরিকল্পনা, গবেষণা এবং নির্মাণ বাবদ
প্রায় আড়াই হাজার কোটি ইওরো (প্রায় তিনশ পঞ্চাশ হাজার কোটি টাকা) বাজেট ধরা হয়েছে।
প্রকৃত খরচ এর চেয়ে বেশি হতে পারে।
এই প্রকল্প
কিন্তু ফিউশন পাওয়ার প্ল্যান্ট নয়, অর্থাৎ এখান থেকে উৎপন্ন বিদ্যুৎ শক্তি কোন গ্রিডে
যুক্ত হবে না। এই বৈজ্ঞানিক প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে বাণিজ্যিক পদ্ধতিতে ফিউশন
শক্তি উৎপাদনের জন্য যে বৈজ্ঞানিক জ্ঞান ও কারিগরি দক্ষতা অর্জন করতে হবে তা খতিয়ে
দেখা। যদি এই প্রকল্প সফল হয়, তাহলে বানিজ্যিক পদ্ধতিতে ফিউশন শক্তি উৎপাদনের লক্ষ্যে
বৃহত্তর প্রকল্প হাতে নেয়া হবে। তখন তৈরি হবে প্রথম প্রজন্মের ডেমো পাওয়ার প্ল্যান্ট।
দক্ষিণ ফ্রান্সে
এই প্রকল্পের রিঅ্যাকটরের নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছে ২০০০ সাল থেকে। ২০২০ সালের মধ্যে
মূল কাঠামোর নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। এখন উচ্চক্ষমতা সম্পন্ন চুম্বক, ভ্যাকুয়াম ভেসেল,
ক্রায়োস্টেট সাপোর্ট সিস্টেম স্থাপনের কাজ চলছে। আশা করা হচ্ছে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে
(২০২৬ থেকে ২০২৮) আশা করা হচ্ছে বিশুদ্ধ ডিউটেরিয়াম ব্যবহার করে প্রথম প্লাজমা তৈরির
কাজ সম্পন্ন করা যাবে। ২০৩০ থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে হাইড্রোজেন ও ডিউটেরিয়ামের মিথষ্ক্রিয়ায়
ইঞ্জিনিয়ারিং স্কেলে প্লাজমার ভূমিকা পরীক্ষা করে দেখা সম্ভব হবে। লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে
২০৪০ সালের মধ্যে ডিউটেরিয়াম ও ট্রিটিয়ামের মধ্যে ফিউশন ঘটিয়ে ট্রিটিয়াম ব্রিডিং ও
লিথিয়াম ব্লাংকেট এবং তাপ শোষণ পরীক্ষা করার। আইটিইআর-এর মূল লক্ষ্য পূরণ হলে ২০৪৫
থেকে ২০৫০ সাল নাগাদ বাণিজ্যিক পদ্ধতিতে ফিউশন শক্তির ডেমো রিঅ্যাক্টর নির্মাণের প্রকল্প
হাতে নেয়া হবে।
জেইটি (জয়েন্ট
ইউরোপিয়ান টোরাস)
১৯৭০ সালের
শেষের দিকে ইওরোপিয়ান ফিউশন গবেষক দলের উদ্যোগে শুরু হয়েছিল জয়েন্ট ইওরোপিয়ান টোরাস
(জেইটি) প্রকল্প। মূল উদ্দেশ্য ছিল বৃহত্তর স্কেলে ডিউটেরিয়াম ও ট্রিটিয়ামের ফিউশন-এর
টোকাম্যাক রিঅ্যাকটর তৈরি করা। ইংল্যান্ডে এর নির্মাণ কাজ শুরু হয় ১৯৮৩ সালে। সেই সময়
পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ফিউশন রি-অ্যাক্টর প্রজেক্ট ছিল এই জেইটি প্রজেক্ট। ১৯৯১ সালে এই
রি-অ্যাক্টরে প্রথম ডিউটেরিয়াম-ট্রিটিয়াম পরীক্ষা শুরু হয়। এই টোকাম্যাক রিঅ্যাক্টরেই
সর্বপ্রথম ব্যবহার করা হয় ডিউটেরিয়াম-ট্রিটিয়াম জ্বালানি। ১৯৯০ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত
অনেকগুলি পরীক্ষণের মাধ্যমে প্লাজমা ফিজিক্স ও ফিউশন রিঅ্যাকটরের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত
উন্নয়নে সরাসরি অবদান রেখেছে এই জেইটি। ২০০৯ সাল থেকে জেইটি থেকে গবেষণার স্কেলে ফিউশন
শক্তি পাওয়া যাচ্ছে। এই প্রকল্প এখনো চলমান এবং এখান থেকে প্রাপ্ত বৈজ্ঞানিক উপাত্ত
পরবর্তী প্রকল্পগুলির নির্মাণ ও অগ্রগতিতে অবদান রাখছে।
আন্তর্জাতিক
ও ইওরোপিয় ইউনিয়নের প্রকল্প ছাড়াও জাপান, চীন এবং কোরিয়ার নিজস্ব কয়েকটি প্রকল্প চালু
আছে। ১৯৮৫ সালে জাপান জেটি-৬০ প্রকল্প শুরু করেছিল। ২০০০ সালে সেই প্রকল্প আরো উন্নত
করে ইওরোপিয়ান ইউনিয়নের সাথে যৌথভাবে শুরু করে জেটি-৬০ এসএ । বাণিজ্যিক রিঅ্যাকটরের
প্রস্তুতি হিসেবে এই প্রকল্প উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন প্লাজমা পরীক্ষা করে দেখছে।
১৯৯০ এর দশকে
দক্ষিণ কোরিয়া শুরু করেছে ফিউশন শক্তি প্রকল্প কোরিয়া সুপারকন্ডাক্টিং টোকাম্যাক এডভান্সড
রিসার্চ প্রকল্প – কেস্টার। ২০০৬ সালে চীন শুরু করেছে দক্ষিণ কোরিয়ার অনুরূপ চায়না
এক্সপেরিমেন্টাল এডভান্সড সুপারকন্ডাক্টিং টোকাম্যাক প্রকল্প – ইস্ট। ফিউশন শক্তি উৎপাদনের
জন্য রিঅ্যাক্টরের সবগুলি ধাপ পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে এই প্রকল্পগুলোতে।
এগুলি ছাড়াও
আমেরিকা ও কানাডার বেশ কিছু প্রাইভেট কোম্পানি ফিউশন শক্তি উৎপাদনের লক্ষ্যে বেশ কিছু
বৈজ্ঞানিক প্রকল্প চালাচ্ছে।
ডেমো ফিউশন
প্ল্যান্ট নির্মাণেও এগিয়ে চলেছে অনেকগুলি দেশ এবং প্রতিষ্ঠান। কানাডার জেনারেল ফিউশন
প্ল্যান্ট ২০৩০-এ ম্যাগনেটাইজড টার্গেট ফিউশন প্ল্যান্ট তৈরির পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে।
চীন হাতে নিয়েছে ‘চায়নিজ ফিউশন ইঞ্জিনিয়ারিং ডেমো রিঅ্যাক্টর (সিএফইডিআর) প্রকল্প।
এই প্রকল্প পরীক্ষণ পাওয়ার প্ল্যান্ট এবং বাণিজ্যিক পাওয়ার প্ল্যান্টের মধ্যে কারিগরী
সেতুবন্ধন তৈরি করবে।
ইওরোপিয়ান ইউনিয়নের
ইওরোপিয়ান ডেমোনেস্ট্রেশান পাওয়ার প্ল্যান্ট (ইইউ-ডেমো) প্রকল্প লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে
৩০০ থেকে ৫০০ মেগাওয়াট ফিউশন বিদ্যুৎ শক্তি উৎপাদনের। জার্মানির ফোকাসড এনার্জি তৈরি
করছে লেজার নিয়ন্ত্রিত ইনারশিয়াল ফিউশন প্ল্যা্নট – লাইট হাউজ।
ইসরায়েল তৈরি
করছে খুবই ছোট আকৃতির কমপ্যাক্ট মডিউলার ফিউশন সিস্টেম যা থেকে ১০ থেকে ২০ মেগাওয়াট
বিদ্যুৎ উৎপন্ন হবে। জাপান তৈরি করছে ফিউশন বাই অ্যাডভান্সড সুপারকন্ডাক্টিং টোকাম্যাক
– ফাস্ট, যা থেকে তৈরি হবে ৫০ থেকে ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। কোরিয়া, সুইডেন, যুক্তরাজ্য
এবং রাশিয়ার অনেকগুলি কোম্পানি ফিউশন শক্তির প্রকল্প শুরু করেছে।
যে গতিতে ফিউশন
শক্তি উৎপাদনের জন্য গবেষণা এবং কারিগরী প্রকল্পগুলি এগিয়ে চলছে তাতে আশা করা যায় ২০৫০
সাল থেকে বাণিজ্যিকভাবে ফিউশন শক্তি উৎপাদন শুরু হবে যে শক্তি হতে অফুরন্ত এবং পরিবেশ
সহায়ক। মানুষ পৃথিবীতেই তৈরি করে ফেলছে ছোট আকারের কৃত্রিম নক্ষত্র – এ যেন সত্যি সত্যিই
আকাশের তারাকে মাটিতে নামিয়ে আনা।
তথ্যসূত্র
১। আমির শাহজাদ
সম্পাদিত ‘ফিউশন এনার্জি’, ইনটেকওপেন, লন্ডন, ২০২০।
২। আই-এ-ই-এ
ওয়ার্ল্ড ফিউশন আউটলুক, ভিয়েনা, ২০২৩, ২০২৪, ২০২৫।
৩। অ্যালেইন
বেকুলেট, স্টার পাওয়ার, এমআইটি প্রেস, ২০২১।
৪। ‘ব্রিংইং
ফিউশন টু দ্য ইউএস গ্রিড, ন্যাশনাল একাডেমি প্রেস, ওয়াশিংটন ডিসি, ২০২১।
৫। iter.org
৬। প্রফেসর
লুসি গ্রিন, ফিফটিন মিলিয়ন ডিগ্রিজ, পেঙ্গুইন বুক্স, ২০১৭।
===================
বিজ্ঞানচিন্তা ডিসেম্বর ২০২৫ সংখ্যায় প্রকাশিত









No comments:
Post a Comment