Monday, 5 January 2026

শ্বেতবিবর: তাত্ত্বিক ভিত্তি ও ক্রমবিকাশ

 


ব্ল্যাকহোল বা কৃষ্ণবিবর সম্পর্কে আমাদের অনেকেরই ধারণা আছে। আমরা জানি যে আমাদের সূর্যের ভরের তিনগুণেরও বেশি ভরবিশিষ্ট নক্ষত্রের মৃত্যু হলে তা অভিকর্ষণ বলের টানে সংকুচিত হতে হতে ব্ল্যাকহোল বা কৃষ্ণবিবরে পরিণত হয়। প্রফেসর জামাল নজরুল ইসলাম তাঁর বিখ্যাত ‘কৃষ্ণবিবর’ বইতে ব্ল্যাকহোলের সংজ্ঞা দিয়েছেন এভাবে, “একটি নক্ষত্রের ভর সূর্যের ভরের তিন গুণের বেশি হলে নিউট্রনের ফার্মি চাপ এবং অন্যান্য বহির্মুখী চাপ অন্তর্মুখী মাধ্যাকর্ষণ বল সামলাতে পারে না। তাই নক্ষত্রটির সংকোচন শুরু হয় এবং অবশেষে তা অতি ক্ষুদ্র আয়তনের প্রচন্ড ঘন অবস্থায় পৌঁছায়। আইনস্টাইনের অভিকর্ষের তত্ত্ব অনুসারে যখন নক্ষত্রের পদার্থ একটা নির্দিষ্ট ছোটো আয়তনে আসে তখন তার সঙ্গে বাইরের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। কেননা কোনো আলোকরশ্মি অথব তড়িৎ-চুম্বক তরঙ্গ বা কোনো বস্তুকণা সেই নক্ষত্র থেকে বাইরে আসতে পারে না। মাধ্যাকর্ষণ বল সব কিছুকে ভিতরের দিকে টেনে নেয়। নক্ষত্রের এই অবস্থাকে কৃষ্ণবিবর বলা হয়” [১]।

কৃষ্ণবিবরের রহস্য সম্পর্কে গবেষণা করেছেন এবং করছেন অসংখ্য বিজ্ঞানী। কিন্তু এই রহস্যকে জনপ্রিয় করে তুলেছেন যাঁরা তাঁদের মধ্যে সবার আগে আসে স্টিফেন হকিং-এর নাম। তাঁর জনপ্রিয় বইগুলিতে তিনি সহজ ভাষায় সকৌতুকে বর্ণনা দিয়েছেন কীভাবে ব্ল্যাকহোলে টেলিভিশন সেট, হিরের আংটি কিংবা জঘন্যতম শত্রুকেও [even your worst enemies] চিরতরে ফেলে দেয়া যায় [২]।

কৃষ্ণবিবর থেকে কোনোকিছুই এমন কি আলো পর্যন্ত বের হতে পারে না। ফলে কৃষ্ণবিবরের ভেতর কী হচ্ছে তা দেখার কোন উপায় নেই। কৃষ্ণবিবরে প্রবেশের মুখে সর্বশেষ যে অবস্থান পর্যন্ত দেখা যায় – তার নাম ইভেন্ট হরাইজন বা ঘটনাদিগন্ত। ১৯৭৪ সালে স্টিফেন হকিং আবিষ্কার করেছেন যে কৃষ্ণবিবরের ঘটনাদিগন্ত  থেকে কিছু বিকিরণ নির্গত হয় যা হকিং রেডিয়েশান নামে পরিচিতি লাভ করেছে। কিন্তু ঘটনাদিগন্তের পরেই পয়েন্ট অব নো রিটার্ন। তারপর আর কোনোকিছুরই ফিরে আসার কোন উপায় নেই। ঘটনা দিগন্তের ওপারে শুধুই অন্ধকার কৃষ্ণগহ্বর।

কিন্তু এর উল্টোটাও কি ঘটতে পারে? এমন কোন কিছু কি আছে যা কৃষ্ণবিবরের বিপরীত, অর্থাৎ যেখান থেকে শুধুই নির্গত হতে থাকবে, কোন কিছু প্রবেশ করতে পারবে না? এমনই এক আশ্চর্য সম্ভাবনার কথা তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞানীরা বলতে শুরু করেছেন বেশ কয়েক বছর ধরে। ব্ল্যাকহোলের বিপরীতে যার নাম দেয়া হয়েছে হোয়াইট হোল। ব্ল্যাকহোল নাম রাখার একটি প্রধান কারণ ছিল যে এটি থেকে আলোও বের হতে পারে না, সবই নিকষ অন্ধকার। কিন্তু হোয়াইট হোল নাম রাখার কারণ মনে হতে পারে ব্ল্যাক হোলের বিপরীতার্থক। তবে আশ্চর্যের ব্যাপার হলো এই – হোয়াইট হোল শব্দবন্ধ ব্যবহৃত হয়েছে ব্ল্যাক হোলেরও আগে। সে ইতিহাসে আমরা একটু পরে আসছি। 

হোয়াইট হোল বা শ্বেতবিবরের তাত্ত্বিক সম্ভাবনাকে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন যাঁরা, বর্তমানে তাঁদের সামনের সারিতে রয়েছেন ইতালিয় পদার্থবিজ্ঞানী কারলো রোভেল্লি। সাধারণ পাঠকের বোধযোগ্য করে ইতালিয়ান ভাষায় লেখা তাঁর জনপ্রিয় বই ‘বুকি বিয়ানকি’র ইংরেজি অনুবাদ ‘হোয়াইট হোলস’ প্রকাশিত হয়েছে ২০২৩ সালে [৩]। [প্রখ্যাত অনুবাদক এবং বিজ্ঞানলেখক আবুল বাসার বইটির বাংলা অনুবাদ করেছেন।] এই বইতে কারলো রোভেল্লি সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করেছেন কীভাবে কৃষ্ণবিবরের বিপরীতে শ্বেতবিবরও থাকতে পারে। কৃষ্ণবিবরে সবকিছুই ঢুকে যায়, শ্বেতবিবরে কিছুই ঢুকতে পারে না। কৃষ্ণবিবর থেকে কিছুই বের হতে পারে না, শ্বেতবিবর থেকে সবকিছুই বের হয়ে আসে। কৃষ্ণবিবরে সময়ের প্রবাহ যেদিকে, শ্বেতবিবরে সময়ের প্রবাহ তার বিপরীত। এখানেই শ্বেতবিবরের বাস্তবতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। কারলো রিভেল্লি ব্যাখ্যা করেছেন কীভাবে পদার্থবিজ্ঞানের তত্ত্ব সময়ের এই বিপরীতমুখী যাত্রাকে সমর্থন করে।

সিনেমা নাটকের কল্পকাহিনিতে আমরা প্রায়ই দেখি বর্তমান থেকে অতীতের ঘটনাগুলি পর্যায়ক্রমে দেখানো হয়। বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনিতে টাইম-ট্রাভে্ল বা সময়-ভ্রমণ করে অতীতের কোন ঘটনা পরিবর্তন করে দিয়ে ভবিষ্যৎ বদলে দেয়ার ব্যাপারও আমরা সিনেমায় দেখি। দেখি আর আক্ষেপ করি – আহা, বাস্তবে যদি এমন সম্ভব হতো! বাস্তবে সম্ভব হয় না, কারণ সময়কে পেছনের দিকে ফেরানো যায় না। ক্যামেরায় ধারণকৃত ঘটে যাওয়া ঘটনা উল্টোদিকে টেনে আমরা ঘটনার শেষ থেকে শুরু পর্যন্ত দেখতে পারি, কিন্তু যা ঘটে গেছে তা ‘ঘটেনি’ করে দিতে পারি না। এখানেই আমাদের বড় আক্ষেপ। এই যে সময়ের তীর শুধু সামনের দিকে যায় – কোন ধরনের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা ছাড়াই আমরা সবাই তা বুঝতে পারি। কিন্তু সময়ের এই সাদামাটা ধারণা ১৯০৫ সালে এক ধাক্কায় বদলে দিয়েছেন জার্মানির প্যাটেন্ট অফিসের এক কনিষ্ঠ কেরানি – আলবার্ট আইনস্টাইন।

আইনস্টাইনের স্পেশাল থিওরি অব রিলেটিভিটি বা আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্ব থেকে আমরা দেখি ‘পরম সময়’ বলে কিছু নেই। বরং সময় আপেক্ষিক, দর্শকের গতির সাথে সময় বদলে যায়। সেখান থেকে শুরু হয় স্থান-কাল এর ধারণা। স্পেশাল থিওরি অব রিলেটিভিটির দশ বছর পর আইনস্টাইন যখন তাঁর জেনারেল থিওরি অব রিলেটিভিটি বা আপেক্ষিকতার সার্বিক তত্ত্ব প্রকাশ করলেন পুরো মহাবিশ্বের পদার্থবিজ্ঞান বদলে গেল। শত বছরের পুরনো নিউটনের গতিসূত্র, মহাকর্ষ সূত্র রাতারাতি পুরনো হয়ে গেল। এরপর মহাবিশ্বের হিসেবনিকেষ নতুন করে করতে হলো। সময় আর শুধুমাত্র সময় থাকলো বা, জুড়ে গেল স্থানের সাথে; শুরু হয়ে গেল স্থান-কালের ভিত্তিতে মহাকর্ষের হিসেব, মহাবিশ্বের গতির হিসেব।

আইনস্টাইনের আপেক্ষিতার সার্বিক তত্ত্বের প্রধান সমীকরণ হলো আইনস্টাইনের ফিল্ড ইকুয়েশন বা ক্ষেত্র-সমীকরণ। সংক্ষেপে এই সমীকরণ লেখা যায় এভাবে:

এখানে Gmn হলো আইনস্টাইন টেনসর – যেটা মহাকর্ষ বলের প্রভাবে স্থান-কালের বক্রতার প্রতিনিধিত্ব করে।  L হলো মহাজাগতিক ধ্রুবক – যা শূন্যস্থানের শক্তির ঘনত্ব নির্দেশ করে। gmn  হলো মেট্রিক টেনসর যা স্থান-কালের বক্রতার জ্যামিতি নির্দেশ করে। Tmn  হলো শক্তির টেনসর – যা স্থান-কালে বস্তু ও শক্তির অবস্থান নির্দেশ করে। G হলো মহাকর্ষ ধ্রুবক, c হলো শূন্যস্থানে আলোর বেগ। আপেক্ষিকতার সার্বিক তত্ত্বের মূল ব্যাপার হলো স্থান-কালের বক্রতার পরিমাণ পদার্থের মোট শক্তি ও ভরবেগের সমানুপাতিক। বস্তুর শক্তি ও ভরবেগের পরিমাণ যত বেশি হবে স্থান-কালের বক্রতাও তত বেড়ে যাবে।

আইনস্টাইনের এই তত্ত্ব থেকেই আবিষ্কৃত হয়েছে ব্ল্যাকহোলের তত্ত্ব। শুধু ব্ল্যাকহোল নয়, হোয়াইট হোলেরও জন্ম হয়েছে আইনস্টাইনের জেনারেল থিওরি অব রিলেটিভিটি থেকে। হোয়াইট হোলকে বলা হচ্ছে ব্ল্যাক হোলের অবহেলিত জমজ বোন। যার সম্ভাবনার দিকে এতদিন বিজ্ঞানীরা নজর দেননি।

১৯১৫ সালের শেষের দিকে আইনস্টাইনের জেনারেল থিওরি অব রিলেটিভিটির ক্ষেত্র সমীকরণ প্রকাশিত হবার মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ১৯১৬ সালের শুরুতে সেই সমীকরণের সার্থক সমাধান করে ফেলেছিলেন একজন জার্মান সৈনিক লেফটেন্যান্ট কার্ল শোয়ার্জশিল্ড। তিনি অঘূর্ণনশীল গোলকের ক্ষেত্রে স্থান-কালের মাত্রার পরিমাপ হিসেব করে দেখিয়েছেন স্থান-কালের বক্রতা যখন বাড়তে থাকে, ঘটনা-দিগন্তের ব্যাসার্ধ কমতে থাকে। ঘটনা-দিগন্তের ব্যাসার্ধ কমতে কমতে যদি একটি নির্দিষ্ট মাত্রা অতিক্রম করে, তখন সেখান থেকে কোনোকিছুরই আর বের হবার ক্ষমতা থাকে না। ঘটনাদিগন্তের এই ব্যাসার্ধকে সোয়ার্জশিল্ড ব্যাসার্ধ বলা হয়।

সোয়ার্জশিল্ড ব্যাসার্ধের হিসেব আমরা সহজভাবে স্কেপ-ভেলোসিটি বা মুক্তিবেগের সমীকরণ থেকে করতে পারি। যদি কোন বস্তু M ভর এবং r ব্যাসার্ধ বিশিষ্ট কোন গ্রহের মহাকর্ষ বল অতিক্রম করে চলে যেতে যায়, তাহলে তার ন্যূনতম গতিবেগ (ve) হতে হবে,

 

আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্ব অনুযায়ী কোন বস্তুর সর্বোচ্চ গতি কিছুতেই আলোর গতির চেয়ে বেশি হতে পারে না। সেক্ষেত্রে যদি আলোর গতিই ধরে নিই মুক্তিবেগের সমান, তাহলে লেখা যায়, ve = c

সেক্ষেত্রে সমীকরণটি দাঁড়ায়,

যেখান থেকে আমরা পেতে পারি, ব্যাসার্ধ , এটিই সোয়ার্জশিল্ড ব্যাসার্ধ।

আইনস্টাইন কিছুতেই মেনে নিতে চাননি যে মহাবিশ্বের নক্ষত্রগুলির এরকম সংকোচন সম্ভব যেখান থেকে এমন অবস্থা তৈরি হবে যে সংকুচিত নক্ষত্র থেকে আলোও বের হয়ে আসতে পারবে না আর। আইনস্টাইন নিজের তৈরি তত্ত্ব থেকে উদ্ভূত সম্ভাবনাকে অস্বীকার করে গেছেন বাস্তবতার দোহাই দিয়ে। সেই সময় অবশ্য কেউই ‘ব্ল্যাক হোল’ শব্দবন্ধ ব্যবহার করেননি।

আইনস্টাইন যখন দেখলেন যে তাঁর ক্ষেত্রসমীকরণ থেকে মহাবিশ্বে সিঙ্গুলারিটিরর তত্ত্ব তৈরি হচ্ছে – তিনি তাঁর বিকল্প তত্ত্ব খোঁজা শুরু করলেন। ১৯৩৫ সালে তিনি তাঁর সহকর্মী নাথান রোজেনের সাথে যৌথভাবে প্রকাশ করলেন নতুন তত্ত্ব – যেখানে দেখালেন একটি স্থান-কাল বক্র হতে হতে সিঙ্গুলারিটিতে পৌঁছে যাবার আগেই আরেকটি স্থান-কালের সাথে যুক্ত হয়ে যেতে পারে খুবই ক্ষীণ সেতুর মাধ্যমে। ‘দ্য পার্টিক্যাল প্রোবলেম ইন দ্য জেনারেল থিওরি অব রিলেটিভিটি’ শীর্ষক গবেষণাপত্রটি ১৯৩৫ সালে প্রকাশিত হয় আমেরিকার ফিজিক্যাল রিভিউতে [৪]। পরবর্তীতে এই তত্ত্ব আইনস্টাইন-রোজেন ব্রিজ নামে বিখ্যাত হয়েছে। আইনস্টাইন-রোজেনের ব্রিজ মূলত দুটো স্থান-কালকে যুক্ত করে দেয়। কিন্তু কীভাবে?

আইনস্টাইন এমনভাবে তত্ত্বটি তৈরি করেছেন যেখানে সিঙ্গুলারিটি তৈরি হচ্ছে না ঠিকই, কিন্তু এক স্থান-কাল থেকে অন্য স্থান-কালে প্রবেশ করতে গেলেই ব্রিজটি গাণিতিকভাবে ধ্বসে যায়। আইনস্টাইনের মৃত্যুর দু’বছর পর ১৯৫৭ সালে এই ঘটনাগুলির সম্ভাব্যতা বর্ণনা করতে গিয়ে আমেরিকান পদার্থবিজ্ঞানী জন হুইলার বিধ্বস্ত নক্ষত্রের ভেতর [তখনো ব্ল্যাক-হোল শব্দ চালু হয়নি] দুটো স্থান-কাল একটি ব্রিজের মাধ্যমে সংযুক্ত হওয়াকে তুলনা করলেন আপেলের ভেতর পোকায় কাটা সুরঙ্গের সাথে। সেখান থেকেই চালু হয়ে গেল ওয়ার্ম-হোল কথাটি, যাকে আমরা বাংলায় কীটগহ্বর বা কীটবিবর বলতে পারি। কিন্তু এ ধরনের গর্তের ভেতর দিয়ে বর্তমান থেকে অতীতে চলে যাবার কোনো সুযোগ নেই।

ওয়ার্ম-হোলের অস্থায়িত্ব এবং এটির অবস্থান সিঙ্গুলারিটির কাছাকাছি হওয়াতে বাস্তবে এর দেখা পাওয়া অসম্ভব। কিন্তু এধরনের আর কী কী সম্ভাবনা আছে তা খুঁজে দেখার ব্যাপারে আগ্রহ উস্কে দেয় আইনস্টাইন-রোজেন ব্রিজ তত্ত্ব। ১৯৬০ সালে আমেরিকান গাণিতিক পদার্থবিজ্ঞানী মার্টিন ডেওভিড ক্রুস্‌কাল এবং অস্ট্রিয়ান গণিতবিদ জর্জ জেকারিস (Szekeres) স্বতন্ত্রভাবে নতুন গাণিতিক কো-অর্ডিনেট সিস্টেম আবিষ্কার করেন যার সাহায্যে দুটো স্থান-কালের অবস্থাকে ঘটনা-দিগন্তের সীমার বাইরে নিয়ে গিয়ে যুক্ত করে দেয়া যায়। এটি মূলত আইনস্টাইন-রোজেন ব্রিজের আরেকটি রূপ যেখানে দুটো আলাদা বিশ্বের সংযোগ ঘটছে একটি ব্রিজের মাধ্যমে। এটি করতে গিয়ে দেখা গেল ব্রিজের একদিকে সবকিছু ঢুকে যাচ্ছে কিন্তু কিছুই বের হতে পারছে না, অন্যদিক সবকিছু বের হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু কিছুই ঢুকতে পারছে না। বোঝাই যাচ্ছে মাঝখানের ব্রিজে সময়ের গতিপথ বদলে যাচ্ছে।

ব্রিটিশ পদার্থবিজ্ঞানী রজার পেনরোজ ১৯৬০ সালে স্থান-কালের সাময়িক পরিস্থিতির বিভিন্ন ধরনের সম্ভাবনার চিত্র আঁকতে শুরু করলেন – যেগুলিকে আমরা এখন পেনরোজ ডায়াগ্রাম হিসেবে জানি। তিনি দেখালেন যে সোয়ার্জশিল্ড ব্যাসার্ধ থেকেই দুই ধরনের ঘটনাদিগন্ত পাওয়া সম্ভব – একটি ভবিষ্যত সময়ের সিগনাল টেনে রাখে, অর্থাৎ কোন কিছুই বের হয়ে আসতে দেয় না (বাস্তব সময়), অন্যটি কোন কিছুই ভেতরে যেতে দেয় না, কিন্তু সবকিছু বের করে দেয়। এটি অবাস্তব, কারণ কোনকিছু গ্রহণ না করেই কীভাবে উগরে দেবে?

সোভিয়েত পদার্থবিজ্ঞানী ইগর নভিকভও অনেক বছর ধরে গবেষণা করছিলেন আইনস্টাইনের ক্ষেত্র-সমীকরণের সম্ভাব্য সব ধরনের দিক নিয়ে। ক্রুস্‌কাল-জেকারিস স্থানাঙ্ক ব্যবস্থায় তিনি দেখলেন ওয়ার্ম-হোল আসলে গাণিতিকভাবে দুটো ভিন্ন ভিন্ন দিকে চলমান জগতকে জুড়ে দিচ্ছে। এক দিক থেকে সবকিছু ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে, আবার অন্য এক দিক থেকে সবকিছু বের হয়ে আসছে। যেখান থেকে সবকিছু বের হয়ে আসছে – তিনি সেই জগতের নাম দিলেন হোয়াইট হোল। সেটা ১৯৬৪ সালের কথা। তখনো কিন্তু ব্ল্যাক-হোলের নাম ব্ল্যাক-হোল হয়নি। ব্ল্যাক-হোল নামটি চালু হয়েছে ১৯৬৭ সালে। জন হুইলার এই নামকরণ করেন।

হোয়াইট হোলের নাম আগে রাখা হলেও – ব্ল্যাকহোলের মতো এতটা মনযোগ হোয়াইট হোল পায়নি। তার অনেকগুলি কারণ আছে। কারণ হোয়াইট হোলের বাস্তব ভিত্তি এখনো নড়বড়ে। প্রধান সমস্যা হলো সময়ের দিক। গাণিতিকভাবে সময় অতীতের দিকে চলতে পারলেও বাস্তবে এর সম্ভাব্যতা মেনে নেয়া অস্বাভাবিক।

মহাবিশ্বের পরিণতি মূলত সময়ের পরিণতি। তাই মহাবিশ্বের ইতিহাস আসলে সময়ের ইতিহাস। স্টিফেন হকিং তাঁর বিখ্যাত বই ‘আ ব্রিফ হিস্ট্রি অব টাইম’-এ সময়ের দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। বাস্তব জগতে সময়ের কয়েক ধরনের দিক আছে – থার্মোডায়নামিক্স বা তাপগতিবিদ্যার দিক, কসমোলজিক্যাল বা সৃষ্টতাত্ত্বিক দিক, এবং সাইকোলজিক্যাল বা মনস্তাত্ত্বিক দিক। এদের মধ্যে শুধুমাত্র মনস্তাত্ত্বিক সময়ই যেকোনো সময়ে অতীত বর্তমান যেকোনো দিকে চলে যেতে পারে। আমরা বর্তমানে বসে অতীতের স্মৃতিচারণ করতে পারি। তবে ভবিষ্যত দেখতে পাই না।

সময়ের সাথে তাপগতিবিদ্যার সম্পর্ক অত্যন্ত দৃঢ় এবং ঋজু। সময়ের সাথে এনট্রপি বাড়ে। অর্থাৎ যতই সময় যায় – এনট্রপি বাড়তেই থাকে। এনট্রপির পরিমাণ কমানো কিছুতেই সম্ভব নয়। শ্বেতবিবরে সময় বর্তমান থেকে অতীতের দিকে যায়। যদি এটি বাস্তব হয়, এনট্রপির পরিমাণও কমতে হবে। কিন্তু তা অসম্ভব বলেই শ্বেতবিবরের বাস্তবতা প্রশ্নবিদ্ধ।

সময়ের কসমোলজিক্যাল তীর সামনের দিকেই ছুটে চলছে – মহাবিশ্ব ক্রমশ সম্প্রসারিত হচ্ছে। শ্বেতবিবর সার্বিকভাবে বাস্তব হলে অতীতমুখি সময়ের টানে মহাবিশ্বের সংকোচন হওয়া উচিত। এভাবে ক্রমশ মহাবিশ্ব একসময় চুপসে যাবে। কিন্তু প্রচলিত প্রতিষ্ঠিত বিজ্ঞানের কাঠামোয় তা অসম্ভব।

স্বাভাবিকভাবেই এখনো শ্বেতবিবর পাওয়া যায়নি বা পাওয়ার আশাও করছেন না কেউ। কিন্তু তাত্ত্বিকভাবে ব্ল্যাকহোলের ভেতরেই হোয়াইট হোলের পরিস্থিতি তৈরি হবার সম্ভাবনা আছে। পদার্থবিজ্ঞানী কারলো রোভেল্লি হোয়াইট হোলের তত্ত্বে দৃঢভাবে বিশ্বাসী। তিনি বিশ্বাস করেন, শ্বেতবিবরের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে মহাবিশ্বে।

ধরা যাক হকিং রেডিয়েশানের কথা। কৃষ্ণবিবর থেকে যদি হকিং রেডিয়েশানের মাধ্যমে কৃষ্ণবিবর কোনো একসময় উবে যায়, তখন কী হবে? তার ভেতরের শক্তি ও তথ্যের কী হবে তখন? জেনারেল রিলেটিভিটি অনুযায়ী ব্ল্যাকহোল থেকে কোন তথ্য বের হতে পারবে না। আবার কোয়ান্টাম মেকানিক্স অনুযায়ী কোন তথ্যই মুছে যেতে পারে না। তখন কী হবে? কারলো রোভেল্লিসহ আরো বেশ কয়েকজন বিজ্ঞানীর ধারণা, নক্ষত্রের মৃত্যু হয়ে যেভাবে ব্ল্যাকহোল তৈরি হয়, তেমনি যদি ব্ল্যাকহোলের মৃত্যু হয়, তখন সেখান থেকে তৈরি হবে হোয়াইট হোল। ব্ল্যাকহোল ও হোয়াইটহোলের মধ্যে সংযোগ হতে পারে ওয়ার্মহোলের মাধ্যমে। তখন ব্ল্যাকহোলে রক্ষিত সব তথ্য হোয়াইট হোল থেকে বের হয়ে আসবে।

এই ধারণা খুবই চিত্তাকর্ষক, তাতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু এর পেছনে সুনির্দিষ্ট গ্রহণযোগ্য বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব না থাকলে তা আমরা মানব কেন?

কার্লো রোভেলিসহ অনেক বিজ্ঞানী এখন কাজ করছেন লুপ কোয়ান্টাম গ্রাভিটির তত্ত্ব প্রতিষ্ঠায়। এই তত্ত্ব প্রতিষ্ঠিত হলে শ্বেতবিবরের পথ অনেকটা সুগম হতে পারে। জেনারেল থিওরি অব রিলেটিভিটি অনুযায়ী মহাকর্ষ স্থান-কালের বক্রতার উপর নির্ভরশীল। কিন্তু মহাকর্ষ বল চিরায়ত নিরবচ্ছিন্ন বল। কিন্তু ব্ল্যাকহোলের ভেতর স্থান যখন খুবই ক্ষুদ্র মাত্রায় চলে আসে তখন স্থান-কাল বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তখন সেখানে ক্লাসিক্যাল ফিজিক্সের বদলে কোয়ান্টাম ফিজিক্সই বেশি কার্যক্ষম বলে মনে হয়। লুও কোয়ান্টাম গ্রাভিটির মূল উদ্দেশ্য হলো জেনারেল রিলেটিভিটি এবং কোয়ান্টাম মেকানিক্সের মধ্যে একটি কার্যকর সম্পর্ক স্থাপন করা।

সেজন্য দরকার স্থান-কালকে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের নিয়মে বিচ্ছিন্নভাবে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কোয়ান্টাম এককে প্রকাশ করা। প্ল্যাংক দৈর্ঘ্য (~১০-৩৫ মিটার) হলো ক্ষুদ্রতম বাস্তব দৈর্ঘ্য। ‘লুপ’ হলো মহাকর্ষ ক্ষেত্রের কোয়ান্টাম স্টেট। এই লুপগুলি স্পিন নেটওয়ার্ক তৈরি করে যা দিয়ে কোয়ান্টাম লেভেলে স্থান-কাল নির্দেশ করে। লুপ কোয়ান্টাম গ্রাভিটিতে স্থান-কালের জন্য কোন অতীতের দরকার নেই, অর্থাৎ এখানে স্থান-কাল অবিচ্ছিন্ন নয় বলে কোয়ান্টাম স্টেট থেকেই স্থান-কালের উৎপত্তি হতে পারে। স্থান ও কালের সমন্বয় এখানে ঘটে স্পিন নেটওয়ার্ক বা স্পিন-ফোমের মাধ্যমে। স্পিন ফোম হলো স্থান-কালের কোয়ান্টাম ডায়নামিক্স। প্ল্যাংক স্কেলে স্থান-কালের নির্ভরযোগ্য বর্ণনার জন্য জন হুইলার ‘কোয়ান্টাম ফোম’ ব্যবহার করেছিলেন। স্পিন-ফোম গাণিতিকভাবে কোয়ান্টাম ফোমেরই অনুরূপ।

লুপ কোয়ান্টাম গ্রাভিটির তত্ত্ব সার্থক হলে ব্ল্যাকহোলের একমুখি পরিণতি ‘সিংগুলারিটি’ থামানো যাবে, এবং ব্ল্যাকহোল থেকে হোয়াইট হোল পাবার যুক্তি বাস্তবগ্রাহ্য হবে। কিন্তু গাণিতিকভাবে সার্থক হলেই যে বাস্তবে শ্বেতবিবর পাওয়া যাবে তা বলা যায় না। তার জন্য অপেক্ষা করতে হতে পারে আরো অনেক বছর।

 

তথ্যসূত্র

[১] জামাল নজরুল ইসলাম, কৃষ্ণবিবর, বাংলা একাডেমি, ঢাকা, ১৯৮৫, পৃ ৩২।

[২] স্টিফেন হকিং, ব্ল্যাক হোলস দ্য বিবিসি রেইথ লেকচারস, ব্যানটাম বুক্‌স, লন্ডন, ২০১৬, পৃ ১৭। [বাংলা অনুবাদ – আবুল বাসার]

[৩] কারলো রোভেল্লি, হোয়াইট হোলস [ইতালিয়ান থেকে ইংরেজি অনুবাদক সাইমন কারনেল], রিভেরহেড বুক্‌স, নিউইয়র্ক, ২০২৩। [বাংলা অনুবাদ – আবুল বাসার।]

[৪] আলবার্ট আইনস্টাইন ও নাথান রোজেন, ফিজিক্যাল রিভিউ, ভল্যুম ৪৮, সংখ্যা ১, পৃ ৭৩-৭৭।

-----------------

বিজ্ঞানচিন্তা নভেম্বর ২০২৫ সংখ্যায় প্রকাশিত










No comments:

Post a Comment

Latest Post

White Holes – Theoretical Foundations and Evolution

  Many of us are familiar with black holes. We know that when a star with a mass more than three times that of our Sun dies, it keeps collap...

Popular Posts