Monday, 17 November 2025

প্রহেলিকাময় কোয়ান্টাম তত্ত্ব

 


“কোয়ান্টাম জগত বলে আসলে কিছুই নেই। কোয়ান্টাম দশার অস্তিত্ব আছে শুধু আমার মাথার ভেতর যা দিয়ে আমি অঙ্ক করি। কোয়ান্টাম অবস্থা বড়জোর কিছু তথ্যের বর্ণনা দেয় – বাস্তব জগতের সাথে তাদের খুব একটা মিল নেই।“ – কথাগুলি শুনে মনে হতে পারে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া কোন শিক্ষার্থী কোয়ান্টাম মেকানিক্সের দুর্বোধ্যতায় বিরক্ত হয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছে। কিন্তু আমাদের অবাক করে দিয়ে অতি সম্প্রতি কোয়ান্টাম মেকানিক্স সম্পর্কে এই কথাগুলি বলেছেন ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানী আন্তন সাইলিঙ্গার (Anton Zeilinger), যিনি ২০২২ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন কোয়ান্টাম মেকানিকসের নীতির পরীক্ষণ-প্রমাণের জন্য।

বিংশ শতাব্দীর বিজ্ঞানের সবচেয়ে সফল তত্ত্বগুলির অন্যতম হলো কোয়ান্টাম তত্ত্ব। আধুনিক প্রযুক্তির বেশিরভাগই – কম্পিউটার চিপ থেকে শুরু করে চিকিৎসাবিজ্ঞানে প্রাণরক্ষাকারী জটিল যন্ত্রপাতির সবকিছুতেই কোয়ান্টাম তত্ত্ব কাজে লাগছে। আমাদের শরীরের অতিসূক্ষ্ম কোষের জটিল কাজকর্ম ব্যাখ্যা হোক, কিংবা হোক মহাবিশ্বের রহস্য উন্মোচন – সবকিছুতেই সফলভাবে কাজ করছে কোয়ান্টাম তত্ত্ব। এমন এক কার্যকর তত্ত্বের বাস্তব কোন জগত নেই বলার অর্থ কি পুরো কোয়ান্টাম তত্ত্বকেই অস্বীকার করা? নোবেলজয়ী কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানী যদি কোয়ান্টাম জগত অস্বীকার করেন, তবে আমরা কোথায় যাই!

কোয়ান্টাম তত্ত্বের দুর্বোধ্যতা সম্পর্কে বিভিন্ন ধরনের সাবধানবাণী দিয়েছেন আইনস্টাইন-ফাইনম্যানের মতো মহাবিজ্ঞানীরা। কিন্তু তাতে কি কোয়ান্টাম তত্ত্ব থেমে গেছে, কিংবা ভুল প্রমাণিত হয়ে গেছে? উত্তর হলো – না। গত একশ বছর ধরে কোয়ান্টাম তত্ত্ব বিজ্ঞানের জগতে দাপটের সঙ্গে উত্তরোত্তর শক্তিশালী হয়েছে। ২০২৫ সাল পদার্থবিজ্ঞানের কোয়ান্টাম বর্ষ হিসেবে পালিত হচ্ছে। এবং সেকারণেই বিজ্ঞানীরা নতুন করে ভাবতে বসেছেন – কোয়ান্টাম তত্ত্ব আসলে কী! বাস্তব জগতের সাথে তার সম্পর্ক কেন এত গোলমেলে!

বিজ্ঞানী সাইলিঙ্গারের মতো সব বিজ্ঞানীই যে কোয়ান্টাম জগতকে অস্বীকার করছেন তা নয়। প্যারিসের পদার্থবিজ্ঞানী আলেন আসপেক্ট (Alain Aspect)-  যিনি একই ধরনের কোয়ান্টাম গবেষণার জন্য সাইলিঙ্গারের সাথেই নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন – এব্যাপারে একমত হননি। প্রফেসর আসপেক্ট মনে করে কোয়ান্টাম জগত পুরোপুরি বাস্তব, তবে প্রকৃতির মতোই রহস্যময় এর আচরণ।

কোয়ান্টাম তত্ত্ব ও বাস্তব জগত সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা আবার আলোচনায় সরব হয়েছেন সম্প্রতি বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানসাময়িকী নেচার-এর একটি সমীক্ষার প্রেক্ষিতে। কোয়ান্টাম জগত সম্পর্কে খোদ কোয়ান্টাম তত্ত্বের গবেষকরাই কী ভাবেন, কীভাবে ব্যাখ্যা করেন এই জগতের নিয়মকানুন – সেটা খুঁজে বের করার জন্য একটি ব্যাপক সমীক্ষা চালায় নেচার। পনের হাজার কোয়ান্টাম গবেষকের কাছে সমীক্ষার প্রশ্নপত্র পাঠানো হয়। এই গবেষকদের প্রত্যেকেই কোয়ান্টাম তত্ত্বের সক্রিয় গবেষক এবং সাম্প্রতিক সময়ে তাঁদের একাধিক গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে। শুধু তাই নয়, কোয়ান্টাম মেকানিক্সের মূল চাবিকাঠি শ্রোডিঙ্গার সমীকরণের শতবর্ষ উদ্‌যাপন উপলক্ষে জার্মানির হেলিগোল্যান্ড দ্বীপের অনুষ্ঠানে যেসব কোয়ান্টাম মহারথীরা উপস্থিত ছিলেন তাঁদের কাছেও রাখা হয়েছিল প্রশ্নগুলি।

পনের হাজার বিজ্ঞানীকে প্রশ্ন পাঠানো হলেও মাত্র এগারো শ কোয়ান্টাম বিজ্ঞানী তাঁদের মতামত জানিয়েছেন কোয়ান্টাম তত্ত্ব সম্পর্কে। প্রায় চৌদ্দ হাজার বিজ্ঞানী এসব প্রশ্নের উত্তর দেয়ার তাগিদও অনুভব করেননি। তবুও এধরনের সমীক্ষার মধ্যে নেচারের এই সমীক্ষাটিই এখনো পর্যন্ত সবচেয়ে বড়। সমীক্ষার ফলাফলে দেখা গেছে – গবেষকরা এখনো ব্যাপকভাবে একমত হতে পারেননি কীভাবে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের আড়ালে থাকা বাস্তবতা ব্যাখ্যা করা যায়। তাতে এটাই আবারো প্রমাণিত হয় যে কোয়ান্টাম তত্ত্ব এখনো প্রহেলিকাময়।

বিজ্ঞানে এশিয়া মহাদেশের প্রথম নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী সিভি রামন বিজ্ঞান ও অবিজ্ঞানের পার্থক্য বোঝাতে গিয়ে মন্তব্য করেছিলেন – বিজ্ঞানে একটি সুনির্দিষ্ট প্রশ্নের একটিই সঠিক উত্তর থাকে। কিন্তু যা কিছু বিজ্ঞান নয়, সেখানে একটি প্রশ্নের অনেকগুলি সঠিক উত্তর থাকতে পারে। কোয়ান্টাম তত্ত্বে আমরা একই প্রশ্নের অনেকগুলি সঠিক সমাধানের সম্ভাবনা দেখতে পাই। সিভি রামনের হিসেব কট্টরভাবে মানতে গেলে বলতে হয় – বিজ্ঞান হিসেবে কোয়ান্টাম তত্ত্ব মোটেও কট্টরপন্থী নয়। এতে বহুত্ববাদের স্থান আছে।

কোয়ান্টাম মেকানিক্সের সঠিক ব্যাখ্যা কীভাবে করা হবে সেটা নিয়ে বিজ্ঞানীরা দ্বিধাবিভক্ত হলেও কোয়ান্টাম মেকানিকস প্রয়োগের নিয়মগুলি সুনির্দিষ্ট। যেমন কোনো ঘটনার সম্ভাব্য পরিণতি সম্পর্কে অনুমান করতে গেলে কোয়ান্টাম মেকানিক্স একসাথে একাধিক সম্ভাব্য অবস্থার সুপারপজিশন বর্ণনা করে। এদের কোয়ান্টাম অবস্থা বর্ণনার সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি হলো ওয়েভ ফাংশান। শ্রোডিংগারের সমীকরণের সাহায্যে সমাধানযোগ্য ওয়েভ ফাংশান গঠন করে সমীকরণের সমাধান করতে পারলে ঘটনার সম্ভাব্য পরিণতি জানা যায়। কিন্তু ঘটনার ফলাফল কী হলো তা যখন পর্যবেক্ষণ করা হয় – তখন কোয়ান্টাম জগতের সম্ভাবনার ওয়েভ ফাংশান ভেঙে গিয়ে বাস্তব অবস্থা তৈরি করে যাতে একাধিক ঘটনার সুপারপজিশনের বদলে একটিমাত্র বাস্তব অবস্থা দেখা যায়। উদাহরণ হিসেবে শ্রোডিঙ্গারের বিখ্যাত বিড়ালের কথা ধরা যাক। যখন বিড়ালটি বাক্সের ভেতর থাকে এবং আমরা বিড়ালের প্রকৃত অবস্থা দেখতে পাই না – তখন বিভিন্ন অবস্থা বিবেচনায় বিড়ালটির প্রাণের ওয়েভ ফাংশান হতে পারে একই সাথে ‘বেঁচে আছে’ এবং ‘মরে গেছে’র সুপারপজিশন। কিন্তু বাক্স খুলে যখন দেখবো – তখন দেখতে পাবো একটি মাত্র অবস্থা -  বিড়ালটি হয় বেঁচে আছে, না হয় মরে গেছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, পর্যবেক্ষণ করলে কোয়ান্টাম ওয়েভ ফাংশান ধ্বসে পড়ে। এখানেই প্রশ্ন জাগে – কোয়ান্টাম জগত বলতে আমরা কি ধরে নেবো যে ওটা অদৃশ্য জগত?

নেচারের সমীক্ষায় ওয়েভ ফাংশান সম্পর্কে  প্রশ্ন করা হয়েছিল – যে ওয়েভ ফাংশান কোন বস্তুর কোয়ান্টাম অবস্থার গাণিতিক বর্ণনা দেয় – তার কি বাস্তব কোন ভিত্তি আছে? শতকরা মাত্র ৩৬ ভাগ বিজ্ঞানী মনে করেন যে ওয়েভ ফাংশান বাস্তব জগতের প্রতিনিধি। তাও মাত্র ১৭ শতাংশ মনে করেন যে এটি পুরোপুরি বাস্তব, ১৯ শতাংশ মনে করেন এটি আংশিক বাস্তব। কিন্তু ৪৭ শতাংশ বিজ্ঞানী মনে করেন যে ওয়েভ ফাংশান শুধুওমাত্র একটি গাণিতিক উপকরণ যার সাহায্যে কোয়ান্টাম মেকানিকসের গাণিতিক সমস্যার সমাধান করা যায়, বাস্তবে তার কোনো অস্তিত্ব নেই। আট শতাংশ বিজ্ঞানী মনে করেন ওয়েভ ফাংশান আসলে পরীক্ষার ফলাফলে ব্যক্তিগত ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটানোর উপাদান, অর্থাৎ এর সাহায্যে কোয়ান্টাম পরীক্ষার ফলাফল নিয়ন্ত্রণ করা যায়! আরো আশ্চর্যের বিষয় হলো – বাকি শতকরা ১০ ভাগ বিজ্ঞানীর ৮ ভাগ মনে করেন ওয়েভ ফাংশান অন্যকিছু, এবং দুই ভাগের কোন ধারণাই নেই ওয়েভ ফাংশান কী জিনিস।

 

বস্তুর যে চিরায়ত ধারণা, তার সাথে কোয়ান্টাম বস্তুর ধারণার সাথে কি কোন বিরোধ আছে? সোজাসুজি বলতে গেলে কোয়ান্টাম বস্তু আর ক্লাসিক্যাল বস্তুর মধ্যে কি কোন নির্দিষ্ট সীমানা আছে যেটা পার হলে কোয়ান্টাম বস্তু ক্লাসিক্যাল বস্তু হয়ে যাবে, কিংবা ক্লাসিক্যাল বস্তু কোয়ান্টাম হয়ে যাবে? এই প্রশ্নেও বিজ্ঞানীরা বিভক্ত হয়ে গেছেন। শতকরা ৪৫ ভাগ মনে করেন সীমানা আছে (যার মধ্যে ৪০ ভাগ মনে করেন খুবই সুনির্দিষ্ট সীমানা আছে, ৫ ভাগ মনে করেন সীমানা আছে, তবে সুনির্দিষ্ট নয়)। ৪৫ শতাংশ বিজ্ঞানী মনে করেন কোন সীমানা নেই ক্লাসিক্যাল ও কোয়ান্টাম বস্তুর মাঝখানে। বাকি দশ শতাংশ নিশ্চিত নন। 



কোয়ান্টাম তত্ত্বের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর পর্যবেক্ষক নির্ভরতা। কোয়ান্টাম মেকানিক্স কণার আচরণের সম্ভাবনার কথা বলতে পারে, কিন্তু সুনির্দিষ্টভাবে কী হবে তা বলতে পারে না। সুনির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে কণাটিকে দেখতে হবে। এটা নিয়ে ঘোরতর আপত্তি তুলেছিলেন স্বয়ং আইনস্টাইন। কোয়ান্টাম রহস্যে বিরক্ত হয়ে আইনস্টাইন তাঁর জীবনীকার আব্রাহাম পেইজকে প্রশ্ন করেছিলেন, “আচ্ছা, তুমি কি বিশ্বাস করো যে যখন তুমি চাঁদের দিকে তাকাও তখনি শুধু চাঁদের অস্তিত্ব আছে, আর অন্য সময়ে নেই?” আইনস্টাইন প্রশ্ন তুললেও কোয়ান্টাম বিজ্ঞানীরা মেনে নিয়েছেন যে চাঁদের মতো বড় আকারের বস্তুর প্রসঙ্গে এরকম প্রশ্ন খাটে না। কিন্তু ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কণার যে ধর্ম কোয়ান্টাম মেকানিক্স দিয়ে ব্যাখ্যা করতে হয় – সেখানে দেখা যায় – কোন একটি কণা কীরকম আচরণ করবে তা নির্ভর করে তার দর্শকের ওপর।

এই পুরনো প্রশ্নটি আবার উত্থাপন করা হয়েছিল নেচারের সমীক্ষায়। বিজ্ঞানীরা সেখানেও একমত হতে পারেননি। শতকরা ৫৬ ভাগ বিজ্ঞানী মনে করেন যে কোয়ান্টাম ঘটনার পরিমাপ পর্যবেক্ষক-নির্ভর। শতকরা ৯ ভাগ মনে করেন যে পর্যবেক্ষকদের শুধুমাত্র তাকিয়ে দেখলেই চলবে না, কী ঘটছে সে ব্যাপারে সচেতন থাকতে হবে, অর্থাৎ ঘটনার আদ্যোপান্ত বুঝতে হবে। কিন্তু ২৮ শতাংশ মনে করেন কোয়ান্টাম ঘটনার পরিমাপেও কোন পর্যবেক্ষকের দরকার নেই। আট শতাংশ নিশ্চিত নন পর্যবেক্ষণের দরকার আছে কি নেই।

 

 

কোয়ান্টাম তত্ত্বের ভিত্তি স্থাপিত হয়েছে যেসব পরীক্ষণের ভেতর দিয়ে, ডাবল স্লিট পরীক্ষণ তাদের অন্যতম। ইলেকট্রন যে কণা এবং তরঙ্গ উভয় ধর্মই প্রদর্শন করে তার প্রমাণ পাওয়া যায় এই পরীক্ষণে। দুটো মাইক্রোস্কোপিক চিড়যুক্ত পর্দার দিকে যদি ইলেকট্রনের প্রবাহ পাঠানো হয়, এবং পর্দার অন্য পাশে ডিটেক্টরের সাহায্যে পর্দার চিড়ের ভেতর দিয়ে আসা ইলেকট্রনগুলির প্যাটার্ন রেকর্ড করলে দেখা যায় – একই ইলেকট্রন তরঙ্গের আকারে দুইটি চিড়ের ভেতর দিয়ে গিয়ে নিজেই নিজের তরঙ্গের সাথে ইন্টারফিয়ারেন্স তৈরি করেছে। কিন্তু আলাদা আলাদাভাবে শুধুমাত্র যে কোনো একটি চিড়ের পেছনে ডিটেক্টর বসিয়ে ইলেকট্রনের প্যাটার্ন পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় ইলেকট্রনগুলি কণার মতো চিড়ের ভেতর দিয়ে গিয়ে একই সরলরেখায় গিয়ে পড়েছে। এই পরীক্ষণের ফলাফলকে সত্য ধরে নিয়েই কোয়ান্টাম তত্ত্ব এগিয়েছে – যার মাধ্যমে আমরা কণা-তরঙ্গের দ্বৈতসত্ত্বা মেনে নিই।

নেচারের সমীক্ষায় এই পরীক্ষণের ফলাফল সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়েছিল – যখন কেউ পর্যবেক্ষণ করছে না, তখন কি ইলেকট্রনগুলি দুইটি চিড়ের ভেতর দিয়েই যায়? ৪৮ শতাংশ বিজ্ঞানী এই প্রশ্নে বিরক্তি প্রকাশ করেছেন। বলেছেন কোয়ান্টাম বস্তুর ক্ষেত্রে এরকম প্রশ্ন অবান্তর। অন্যদিকে ৩১ শতাংশ বিজ্ঞানী মনে করেছেন হ্যাঁ, আর ১৪ শতাংশ বিজ্ঞানী মনে করেছেন – না। ছয় শতাংশ বিজ্ঞানী নিশ্চিত নন কীভাবে এই ইলেকট্রনগুলি উভয় চিড়ের ভেতর দিয়ে যায়, সেখানে পর্যবেক্ষণের ভূমিকা আছে কি নেই।

 

 

কোয়ান্টাম তত্ত্বের প্রতিষ্ঠিত ঘটনাগুলি সম্পর্কেও কোয়ান্টাম বিজ্ঞানীরা একমত হতে পারছেন না, এর চেয়ে আশ্চর্যের আর কী হতে পারে। এটি ইঙ্গিত করে যে গবেষকদের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিভাজন রয়েছে—একদিকে আছেন যারা ‘বাস্তববাদী’ (realist) দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেন, অর্থাৎ সমীকরণগুলিকে বাস্তব জগতে প্রতিফলিত মনে করেন তারা; অন্যদিকে আছেন যারা জ্ঞাতবাদী’ (epistemic) দৃষ্টিভঙ্গি অনুসরণ করেন, অর্থাৎ যাদের মতে কোয়ান্টাম পদার্থবিদ্যা কেবলমাত্র তথ্য নিয়েই কাজকারবার করে, বাস্তবতার সাথে মিল না থাকলেও।

কোয়ান্টাম জগতকে কীভাবে বাস্তব জগতের প্রেক্ষিতে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে সেই প্রশ্নের উত্তরে বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে গেছেন। নেচারের এই সমীক্ষায় গবেষকদের প্রশ্ন করা হয়েছিল, তাঁদের মতে কোয়ান্টাম ঘটনাবলী ও পারস্পরিক ক্রিয়ার সর্বোত্তম ব্যাখ্যা কোনটি — অর্থাৎ তত্ত্বের গণিতকে বাস্তব জগতের সঙ্গে সম্পর্কিত করার জন্য বিজ্ঞানীরা যে বিভিন্ন প্রচেষ্টা করেছেন, তার মধ্যে তাঁদের পছন্দের কোনটি। সবচেয়ে বড় অংশের উত্তর (৩৬%) ছিল কোপেনহেগেন ব্যাখ্যার পক্ষে। তাঁদের উত্তরের বিষয়ে আত্মবিশ্বাস নিয়ে প্রশ্ন করা হলে, মাত্র ২৪% মনে করেন যে তাঁদের পছন্দের ব্যাখ্যাটিই সঠিক; বাকিরা একে কেবল যথাযথ বা কিছু পরিস্থিতিতে কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করেছেন।

 

 

অনেক গবেষকের এক প্রশ্নের উত্তরের সাথে সম্পূরক প্রশ্নের উত্তরের অসঙ্গতি লক্ষ্য করা গেছে। তার মানে কি এই যে অনেক কোয়ান্টাম গবেষক কেবল কোয়ান্টাম তত্ত্ব ব্যবহার করেন, কিন্তু এর প্রকৃত অর্থ নিয়ে গভীরভাবে ভাবেন না! মার্কিন পদার্থবিজ্ঞানী এই পদ্ধতির নাম দিয়েছিলেন – শাট আপ আন্ড ক্যালকুলেট!!

এই যে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের জনপ্রিয় ব্যাখ্যা – কোপেনহেগেন ব্যাখ্যা – এটি আসলে কী? কোয়ান্টাম তত্ত্বে কোনো বস্তুর আচরণকে চিহ্নিত করা হয় তার ওয়েভফাংশন দ্বারা। আরভিন শ্রোডিঙ্গার তাঁর বিখ্যাত সমীকরণের মাধ্যমে কোয়ান্টাম ওয়েভ ফাংশানের প্রচলন করেছেন একশ বছর আগে। ওয়েভফাংশন একটি কোয়ান্টাম অবস্থার যতগুলি সম্ভাবনা থাকতে পারে তার সবগুলির গাণিতিক সুপারপজিশনের ধারণা দেয়। কোয়ান্টাম মেকানিকসের এসব ব্যাখ্যা দিয়েছেন কোয়ান্টাম মেকানিক্স আবিষ্কৃত হয়েছে যাদের হাতে তাঁরাই - শ্রোডিঙ্গার, হাইজেনবার্গ, নিলস বোর। কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ে কোয়ান্টাম মেকানিকসের মৌলিক গবেষণা হয়েছিল বলেই কোয়ান্টাম মেকানিক্সের এই মূল ব্যাখ্যাটার নাম দেয়া হয়েছে কোপেনহেগেন ব্যাখ্যা। এই ব্যাখ্যায় কোয়ান্টাম মেকানিক্সে পর্যবেক্ষকের ভূমিকা প্রধান। মৌলিক কণাগুলি এখানে কণা এবং তরঙ্গ উভয় ধর্ম প্রদর্শন করে। কোয়ান্টাম টানেলিং এবং কোয়ান্টাম এনটেঙ্গেলমেন্ট এই ব্যাখ্যায় স্বীকৃত। তাই এটি বহুল জনপ্রিয়ও বটে।

কিন্তু এর প্রধান দুর্বলতা হলো – বাস্তব জগতের সাথে মেলাতে গেলে এই ব্যাখ্যাকে পুরোপুরি বিজ্ঞান বলে মনে হয় না। কারণ এই ব্যাখ্যা বাস্তব ঘটনার সম্ভাবনার কথা বলে – সুনির্দিষ্টভাবে আগে থেকেই বলে দিতে পারে না আসলে কী ঘটবে। কিন্তু কোপেনহেগেন-প্রিয় বিজ্ঞানীদের কাছে এটিই বাস্তব। ফলে বিজ্ঞানীদের মধ্যে আরেকটু বেশি বাস্তববাদী দলের উদ্ভব ঘটেছে যাঁরা মনে করেন – ওয়েভ ফাংশান কেবলই একটি গাণিতিক উপকরণ যা গাণিতিক সমস্যার সমাধান করার জন্য ব্যবহৃত হয়। বাস্তবে ওয়েভ ফাংশান দেখা সম্ভব নয়, কারণ দেখতে গেলেই ওয়েভ ফাংশান ধ্বসে পড়ে। তারই প্রতিফলন দেখা গেছে নেচারের সমীক্ষায় যেখানে ১৭ শতাংশ বিজ্ঞানী একটি জ্ঞাতবাদী ব্যাখ্যায় সমর্থন দিয়েছেন। জ্ঞাতবাদী এই অর্থে যে ওয়েভ ফাংশানগুলি তৈরি করা হয় একজন পর্যবেক্ষকের দৃষ্টিভঙ্গিতে – মানে আগে থেকেই ধারণা করে নেয়া হচ্ছে ফলাফল কী হতে পারে।

কোয়ান্টাম বিজ্ঞানীদের সবচেয়ে অস্বস্তির কারণ ঘটে যখন বলা হয় যে ওয়েভ ফাংশানগুলি ধ্বসে পড়ে যখন সেদিকে তাকানো হয়। ১৯৫৭ সালে মার্কিন পদার্থবিদ হিউ এভারেট এই সমস্যা থেকে মুক্তির লক্ষ্যে প্রস্তাব করেন মেনি ওয়ার্ল্ড বা বহুবিশ্ব তত্ত্বের। তাঁর মতে কণা প্রকৃতপক্ষে একধরণের অর্থে একাধিক স্থানে একই সময়ে উপস্থিত থাকে। একটি বিশ্বে পর্যবেক্ষক যখন কণার পরিমাপ করবেন, তিনি কেবল একটি ফলাফল দেখবেন। কিন্তু তাতে ওয়েভফাংশন কখনও প্রকৃতপক্ষে ধ্বসে যায় না। বরং এটি অনেক বিশ্বে বিভক্ত হয়ে যায়, প্রতিটি ভিন্ন ফলাফলের জন্য একটি নতুন বিশ্ব তৈরি হয়। এই বিশ্বও যে কাল্পনিক বিশ্ব তাতে কোন সন্দেহ নেই। সমীক্ষায় দেখা গেছে ১৫ শতাংশ বিজ্ঞানী কোয়ান্টাম বহুবিশ্ব তত্ত্বের ধারণা পছন্দ করেন।

যতই দিন যাচ্ছে বিজ্ঞানীরা নতুন নতুন ধারণা নিয়ে হাজির হচ্ছেন। তবে কোয়ান্টাম তত্ত্ব যে এখনো অসম্পূর্ণ তা অনেকটাই প্রমাণিত। কারণ কোয়ান্টাম মেকানিক্স ইতিহাসের সবচেয়ে পরীক্ষামূলকভাবে যাচাই করা তত্ত্বগুলোর মধ্যে একটি হলেও, এর গণিত মাধ্যাকর্ষণ (gravity) বর্ণনা করতে পারে না। বিজ্ঞানীরা আশা করছেন যে কোনো একদিন আরো উন্নততর কোয়ান্টাম মেকানিক্স উদ্ভূত হয়ে তার বর্তমানের খামতি পূরণ করবে।

 

তথ্যসূত্র

১। বিজ্ঞানচিন্তা অক্টোবর ২০২২

২। ন্যাচার, ১২ আগস্ট ২০২৫

৩। সায়েন্টিফিক আমেরিকান, ৮ আগস্ট ২০২৫

=============

বিজ্ঞানচিন্তা সেপ্টেম্বর ২০২৫ সংখ্যায় প্রকাশিত








No comments:

Post a Comment

Latest Post

FLASH Radiotherapy: A New Possibility in Cancer Treatment

  Cancer is the disease before which humanity feels the most helpless. Every year, the number of cancer patients continues to rise at an ala...

Popular Posts