স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের
ডিগ্রি লাভের শিক্ষাজীবন শেষ হবার পরে আরেকটি ছাত্রজীবন শুরু হয় অনেকের। বিশেষ করে
যারা লেখাপড়াকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করে। সেই অনেকের দলে আমিও আছি। নিজের ইচ্ছেতেই আমি
চিরছাত্রত্ব গ্রহণ করেছি। কিন্তু এপথের দিশা পেয়েছি যাঁদের কাছে তাঁদের অন্যতম প্রফেসর
কেন্ অ্যামোস। আমার শিক্ষক, আমার গুরু।
প্রাতিষ্ঠানিক ছাত্রজীবনে ক্লাসরুমে যেসব শিক্ষকের কাছে শেখার সুযোগ আমি পেয়েছি – সকলেই
আমার নমস্য। সব শিক্ষকই শ্রদ্ধেয়, কিন্তু কোন কোন শিক্ষক তাঁর বিশেষত্বের কারণে বিশেষ আসন লাভ করেন শিক্ষার্থীর জীবনে। মেলবোর্ন ইউনিভার্সিটির স্কুল অব ফিজিক্সে যখন পিএইচডি করার সুযোগ পাই – আমার সুপারভাইজার আমি নিজে বেছে নিইনি। আমার কোনো ধারণাই ছিল না সেসময় কীভাবে সুপারভাইজার ঠিক করতে হয়। বিশ্ববিদ্যালয় আমাকে একটি স্কলারশিপের সাথে একজন সুপারভাইজারও দিয়েছিলেন। তিনি কেন্ অ্যামোস। এই মানুষটি আমাকে বদলে দিয়েছেন কি না জানি না, কিন্তু আমাকে পথ দেখিয়েছেন – নিউক্লিয়ার ফিজিক্সের পাশাপাশি জীবনের দর্শনেরও পথ।পিএইচডির গ্র্যাজুয়েশানের
সন্ধ্যায় তিনি বলেছিলেন, “ডিগ্রি লাভের জন্য পড়াশোনা করেছো এতদিন। সেই পড়াশোনায় চাপ
ছিল, দায়িত্ব ছিল, তাড়া ছিল। আনন্দ কতটুকু পেয়েছো জানি না। এবার সুযোগ এসেছে আনন্দের
জন্য লেখাপড়া করার, রয়ে সয়ে উপভোগ করে পড়াশোনা করার।“
পরীক্ষা পাসের
চাপহীন লেখাপড়া যে কী আনন্দের হতে পারে – তা কেন্ অ্যামোসকে দেখে বুঝেছিলাম। অস্ট্রেলিয়ার
বিশ্ববিদ্যালয়ে অবসর গ্রহণের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। একজন একাডেমিক যদি সুস্থ মনে এবং
শরীরে কাজ করে যেতে চান, তাহলে আজীবন কাজ করে যেতে পারবেন। কেন্ অ্যামোস বয়স ষাট হবার
সাথে সাথে অবসর নেবার ঘোষণা দিলেন। কাগজেপত্রে অবসর নিলেন ঠিকই, কিন্তু সোমবার থেকে
শুক্রবার সকাল-সন্ধ্যা নিয়মিত অফিসে আসেন, সারাদিন বুঁদ হয়ে লেখাপড়া করেন। গবেষণা করেন,
পেপার লেখেন। জিজ্ঞেস করলাম, কাজই যদি করবেন – অবসর নিলেন কেন?
‘অবসর নিলাম
– নতুনদের সুযোগ দেয়ার জন্য। আমি অবসর না নিলে আরেকজনকে তো নিয়োগ দেবে না ডিপার্টমেন্টে।
আর এখন তো আমার আর বেতনের দরকার নেই। যতদিন বাঁচবো, আমার সুপার থেকে চলে যাবে।‘
মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে
কেন্ অ্যামোস ত্রিশ বছর অধ্যাপনা করেছেন সবেতন, এরপর আরো ২৬ বছর নিয়মিত গবেষণা করেছেন
বিনা বেতনে। তিন শতাধিক গবেষণাপত্র, বই লেখার পাশাপাশি সম্পাদনা করেছেন গবেষণা জার্নাল।
নিউক্লিয়ার থিওরির অপটিক্যাল মডেল-এর অন্যতম পথিকৃৎ তিনি।
মেলবোর্নে যেকোন
বিষয় নিয়ে আলোচনা করার জন্য ছুটে যেতাম তাঁর কাছে। ‘যেতাম’ লিখতে হচ্ছে বলে বুকটা ভেঙে
যাচ্ছে। ক’দিন আগেও বর্তমান কাল ছিল যে ক্রিয়াপদ – তা এখন অতীত কাল হয়ে গেছে। কত কথাই
বলেছি মানুষটার সাথে। কিন্তু একবারও বলা হয়নি, প্রিয় শিক্ষক আমার – কতটা ভালোবাসি আপনাকে।
ইউনিভার্সিটি অব মেলবোর্নের স্কুল অব ফিজিকস – আপনাকে কতটা মনে রাখবে আমি জানি না।
কিন্তু আপনার সংস্পর্শে আসা বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা শিক্ষার্থীরা মনে রাখবে অবশ্যই।

No comments:
Post a Comment