Tuesday, 16 May 2023

ইনজি লেমান – পৃথিবীর প্রথম ভূপদার্থবিজ্ঞানী

 


ভূমিকম্পের পূর্বাভাস এখনো সঠিকভাবে দেয়া সম্ভব না হলেও, কী কারণে ভূমিকম্প হয় তা আজ আমরা জানি। পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ গঠন সঠিকভাবে জানার পর ভূমিকম্পের সঠিক কারণ খুঁজে বের করা সহজ হয়েছে। পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ পদার্থবিজ্ঞানিক কাজকর্ম নিয়ে জিওফিজিক্স বা ভূপদার্থবিজ্ঞান নামে পদার্থবিজ্ঞানের যে আলাদা একটি শাখা তৈরি হয়েছে, তার প্রধান স্থপতি ছিলেন একজন নারী পদার্থবিজ্ঞানী – ইন্‌জি লেমান (Inge Lehmann)। তিনি ছিলেন পৃথিবীর প্রথম ভূপদার্থবিজ্ঞানী। পৃথিবীর কেন্দ্রে যে কঠিন ধাতব গোলক আছে তার বাইরে একটি তরল স্তরের অস্তিত্ব যে থাকতেই হবে – সেটা প্রথম দাবি করেছিলেন ইন্‌জি লেমান। তাঁর নামানুসারে সেই স্তরের নাম দেয়া হয়েছে লেমান ডিসকন্টিনিউটি। 

ইন্‌জি লেমানের জন্ম ১৮৮৮ সালের ১৩মে ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে। ইন্‌জির বাবা আলফ্রেড জর্জ লুদভিগ লেমান ছিলেন মনোবিজ্ঞানী, মা আইডা ছিলেন গৃহবধু। সেইসময় পৃথিবীজুড়ে মেয়েদের লেখাপড়াকে তেমন কোন উৎসাহ বা গুরুত্ব দেয়া না হলেও ইওরোপের কিছু কিছু স্কুলে মেয়েদের শিক্ষাকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হতো। ডেনমার্কে এরকম একটি স্কুলে লেখাপড়া করেছিলেন ইন্‌জি। সেই স্কুলের প্রধান ছিলেন হানা এডলার – যিনি ছিলেন পদার্থবিজ্ঞানী নিল্‌স বোরের খালা। ইন্‌জির লেখাপড়া এবং গবেষণায় সবচেয়ে বেশি প্রভাব রেখেছিলেন যে দু’জন মানুষ তাঁরা ছিলেন - তাঁর বাবা এবং শিক্ষক হানা এডলার। 

স্কুলের পরীক্ষায় সর্বোচ্চ র‍্যাংক নিয়ে ১৯০৭ সালে  কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেন ইন্‌জি। গণিত, রসায়ন ও পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে স্নাতক পর্যায়ের পড়াশোনা শুরু করলেও – তাঁর শারীরিক অবস্থা ছিল খুবই দুর্বল। কেমব্রিজে গেলে কিছুটা ভালো থাকবেন এই আশায় ১৯১০ সালে কেমব্রিজের নিউন্যাম কলেজে গেলেন গণিত নিয়ে পড়তে। কিন্তু বছরখানেক পরেই তাঁকে ফিরে আসতে হলো শারীরিক দুর্বলতার কারণে। কোপেনহেগেনে ফিরে এসেও লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হলো না। একটা ইন্সুরেন্স কোম্পানিতে কেরানির চাকরি নিলেন। সেখানে কাজ করলেন ১৯১৮ সাল পর্যন্ত। এই সাত বছরে তিনি ইন্সুরেন্সের কাজ করতে করতে গাণিতিক হিসেবে বেশ দক্ষতা অর্জন করেছেন। শরীর কিছুটা সুস্থ হলে ত্রিশ বছর বয়সে আবার লেখাপড়া শুরু করলেন কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ে। বত্রিশ বছর বয়সে গণিত ও ভৌতবিজ্ঞানে স্নাতক পর্যায়ের একটি ডিগ্রি লাভ করলেন। 

এরপর পাঁচ বছর কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত ও পরিসংখ্যানের অধ্যাপক জোহান স্টিফেনসেনের সহকারি হিসেবে কাজ করার পর ডেনিশ গণিতজ্ঞ নিলস এরিক নুরলুন্ডের সহকারি হিসেবে কাজ শুরু করলেন ১৯২৫ সালে। প্রফেসর নুরলুন্ড মাধ্যাকর্ষণের সাথে পৃথিবীর ঘূর্ণন এবং অন্যান্য জ্যামিতিক হিসেবের গবেষণা করছিলেন – যাকে বলা হয় জিওডেসি। ভূমিকম্পের ডাটা বিশ্লেষণ করে তাদের সাথে পৃথিবীর অন্যান্য আনুসঙ্গিক পরিবর্তনের ডাটার সম্পর্ক নির্ণয় ছিল ইন্‌জির প্রধান কাজ। এই কাজ করতে করতেই ১৯২৮ সালে চল্লিশ বছর বয়সে ইন্‌জি স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করলেন। প্রফেসর নুরলুন্ডের নেতৃত্বে ডেনমার্কে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে জিওডেসিক ইন্সটিটিউট। ইন্‌জি সেই প্রতিষ্ঠানে ভূমিকম্পবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান হিসেবে যোগ দিলেন। 

১৯৩৬ সালে ইন্‌জি লেমান সর্বপ্রথম ভূমিকম্পের প্রাইমারি ওয়েভ বা পি-ওয়েভের সঠিক বৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যা করেন। তিনি সঠিকভাবে প্রমাণ দেন যে পৃথিবীর কেন্দ্রের কঠিন ধাতব গোলকের বাইরে একটি নমনীয় স্তর আছে। ১৯২৯ সালে নিউজিল্যান্ডে ৭ দশমিক ৩ মাত্রার ভয়াবহ ভূমিকম্প হয়েছিল। সেই ভূমিকম্পের হাজার হাজার ডাটা বিশ্লেষণ করে পি-ওয়েভের বৈশিষ্ট্য এবং সেখান থেকে পৃথিবীর গঠনের অভ্রান্ত প্রমাণ দিয়েছিলেন ইন্‌জি কোন ধরনের কম্পিউটারের সাহায্য ছাড়াই। সে সময় কম্পিউটারের অস্তিত্ব ছিল না। ১৯৭১ সালে সর্বপ্রথম কম্পিউটারের সাহায্যে আধুনিক পদ্ধতিতে ডাটা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে ইন্‌জির হিসেব ছিল নির্ভুল। 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানি ডেনমার্ক দখল করে নেয়। ইন্‌জির গবেষণা ধরতে গেলে বন্ধই ছিল সেই সময়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তিনি আবার গবেষণা শুরু করেন। একটি ইন্সটিটিউটের প্রধান হওয়া সত্ত্বেও, জিওফিজিক্যাল সোসাইটির দু’বার নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হওয়া সত্ত্বেও ইউনিভার্সিটির প্রফেসর হতে পারেননি ইন্‌জি লেমান শুধুমাত্র নারী হবার কারণে। 

১৯৫৩ সালে ৬৫ বছর বয়সে ইন্সটিটিউট থেকে অবসর গ্রহণ করলেন ইন্‌জি। তারপর বেশ কয়েক বছর তিনি আমেরিকায় গিয়ে গবেষণা করেছেন। ১৯৬৯ সালে তিনি রয়েল সোসাইটির ফেলোশিপ পান। 

ছোটবেলা থেকে শুরু করে সারাজীবনই ইন্‌জি ছিলেন প্রচন্ড লাজুক, নিজের মনে একা থাকতেই পছন্দ করতেন। প্রাতিষ্ঠানিক সহকর্মী ছাড়া ব্যক্তিগত কোন বন্ধুত্ব তিনি তৈরি করেননি কারো সাথে। ১০৪ বছর বেঁচেছিলেন তিনি – মূলত একাই। ১৯৯৩ সালের ২১ফেব্রুয়ারি তাঁর মৃত্যু হয়। 


নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী ডরোথি হজকিন

 


ছবির মানুষটির হাতের আঙুলগুলির দিকে তাকান। বয়সের কারণে তাঁর হাত-পায়ের আঙুল এভাবে বেঁকে যায়নি, একুশ-বাইশ বছর বয়সেই তিনি আক্রান্ত হয়েছেন ক্রনিক রিউম্যাটয়েড আর্থাইটিসে। তখন থেকেই হাত-পায়ের আঙুলে প্রচন্ডরকমের ব্যথা ও ক্রমশ বেঁকে যাওয়াকে সহ্য করতে হয়েছে তাঁকে আমৃত্যু। এরকম ব্যথা আর কুঁকড়ে যাওয়া হাত-পা নিয়েই তিনি ক্রমাগত গবেষণা করেছেন। এই মানুষটি ডরোথি ক্রোফুট হজকিন। যিনি এক্স-রে কৃস্টালোগ্রাফি প্রয়োগ করে আবিষ্কার করেছেন

Thursday, 11 May 2023

রিচার্ড ফাইনম্যান

 


১১মে রিচার্ড ফাইনম্যানের জন্মদিন। ১৯১৮ সালের ১১ মে নিউ ইয়র্কে জন্মগ্রহণ করেন বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে ডায়নামিক পদার্থবিজ্ঞানী রিচার্ড ফাইনম্যান। এম-আই-টি থেকে বিএসসি ডিগ্রি পান ১৯৩৯ সালে। প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি ১৯৪২ সালে। কর্নেল ইউনিভার্সিটিতে তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক ছিলেন ১৯৪৫ থেকে ১৯৫০ পর্যন্ত। তারপর ১৯৫০ থেকে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ক্যালটেকে অধ্যাপনা করেছেন। কোয়ান্টাম ইলেকট্রো-ডায়নামিক্স এর অন্যতম জনক তিনি। ১৯৬৫ সালে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন যে কাজের জন্য - মাত্র তেইশ বছর বয়সেই সে কাজের সূত্রপাত। পৃথিবীর প্রথম পারমাণবিক প্রকল্প - ম্যানহাটান প্রজেক্টের হিউম্যান-কম্পিউটার হিসেবে কাজ করেছেন ফাইনম্যান। যে ন্যানো-টেকনোলজির প্রয়োগ এখন ওষুধ থেকে শুরু করে জীবনের হাজারো ক্ষেত্রে সেই ন্যানো-টেকনোলজির প্রাথমিক ধারণার উৎপত্তি ফাইনম্যানের হাতে। মৌলিক কণার কার্যকলাপ বোঝার জন্য ফাইনম্যান-ডায়াগ্রাম সবচেয়ে কার্যকরী পদ্ধতি। পদার্থবিজ্ঞানের এমন কোন শাখা নেই যেখানে ফাইনম্যান উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেননি। পদার্থবিজ্ঞানের জগতে ফাইনম্যানের মত এমন ভালো শিক্ষক আর কখনো পাওয়া যাবে কি না সন্দেহ। পদার্থবিজ্ঞানের সবচেয়ে ক্লাসিক টেক্সট বইয়ের নাম ‘ফাইনম্যান লেকচার অন ফিজিক্স’ যা রচিত হয়েছে তাঁর ক্যালটেকের ক্লাসরুমে দেয়া লেকচারগুলো থেকে। আইনস্টাইনের পরে ফাইনম্যানই ছিলেন বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে সৃষ্টিশীল বহুমাত্রিক পদার্থবিজ্ঞানী। ১৯৮৮ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি মৃত্যু হয় ফাইনম্যানের।

রিচার্ড ফাইনম্যানের এই সংক্ষিপ্ত জীবনকথা আজ আমরা সবাই জানি। এখন যারা বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞান পড়ছে, আমি জানি তাদের মধ্যে রিচার্ড ফাইনম্যানের নাম শোনেনি এমন একজনও নেই। তাদের মধ্যে অনেকেই ‘ফাইনম্যান লেকচার অন ফিজিক্স’ পড়ে ফিজিক্স শিখছে। আমার অনুজা সতীর্থ আশরাফি নিতু রিচার্ড ফাইনম্যানের ‘সিক্স ইজি পিসেস’ অনুবাদ করে প্রকাশ করেছে তার ছাত্রাবস্থায়। আরেক অনুজ উচ্ছ্বাস তৌসিফও স্বতন্ত্রভাবে অনুবাদ করেছে এই বই। অনেকগুলি মুদ্রণ হয়েছে এই বইয়ের। বাংলা ভাষায় রিচার্ড ফাইনম্যানের অন্যান্য বইও অনুদিত হচ্ছে। রিচার্ড ফাইনম্যান বাংলাদেশেও এখন খুবই জনপ্রিয়। 

কিন্তু আমার অনুজ সতীর্থদের কাছে এখন অবিশ্বাস্য শোনালেও সত্যি যে আমাদের সময়ে আমাদের শিক্ষকরা একবারও রিচার্ড ফাইনম্যানের নাম উচ্চারণ করেননি আমাদের ক্লাসে। রিচার্ড ফাইনম্যানের বই এবং কাজের সাথে আমার প্রথম পরিচয় ঘটে দেশের বাইরে পড়তে এসে। ফাইনম্যানের আশ্চর্য বিজ্ঞান ও ব্যক্তিত্বে যতই মুগ্ধ হয়েছি – ততই আফসোস হয়েছে – আগে কেন জানিনি তাঁর সম্পর্কে। কেমন যেন একটা ক্ষোভ জন্মেছিল। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা সেই সময় সিলেবাসের বাইরে অনেক কথা বলতেন – সেগুলির বেশিরভাগই ছিল হয় রাজনীতি, নয় ধর্ম সম্পর্কে। অথচ বিজ্ঞানীদের কাজকর্ম সম্পর্কে ধরতে গেলে কিছুই থাকতো না। সবচেয়ে আক্ষেপের বিষয় হচ্ছে – আমরা যখন ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হই, ফাইনম্যান তখনো বেঁচে ছিলেন। সেকেন্ড ইয়ারে ওঠার আগেই তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যুর খবরও কোন গুরুত্ব পায়নি আমাদের ডিপার্টমেন্টের কারো কাছে। তখন হয়তো যোগাযোগের এত সুবিধা ছিল না। তাই এখনকার শিক্ষার্থীদের প্রতি আমার কিছুটা ঈর্ষাও কাজ করে – কত্তো বেশি জানার সুযোগ এখন তাদের আছে!

কিন্তু এখন যখন দেখি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার পুরোটাই তথ্য এবং তত্ত্ব মুখস্থ করার শিকলে আবদ্ধ হয়ে গেছে খুবই কষ্ট লাগে। আধুনিক প্রযুক্তির কী সাংঘাতিক অপচয় ঘটছে সেখানে। পদার্থবিজ্ঞানের জটিল সমীকরণগুলি, ধ্রুবকগুলির মান এখনো পরীক্ষায় মুখস্থ লিখতে হয়। অথচ তথ্য মুখস্থ করার মধ্যে যে কোন বিজ্ঞান তো দূরের কথা – জ্ঞানই অর্জিত হয় না – তা ফাইনম্যান নিজের ছোটবেলার অভিজ্ঞতার উদাহরণ দিয়ে লিখে গেছেন। 

The making of a scientist প্রবন্ধে তিনি লিখেছেন, “আমার বাবা পাখি সম্পর্কে আমাকে অনেক কিছু শিখিয়েছেন। তিনি বলেছেন- “দেখেছো পাখিটা? এটা হলো স্পেন্সার’স ওয়ার্বলার”। আমি জানতাম যে পাখিটার আসল নাম তিনি জানেন না। বাবা বললেন- “ইতালিয়ান ভাষায় এটা হলো ছুট্টু ল্যাপিটিডা। পর্তুগিজ ভাষায় বম ডা পেইডা। চায়নিজরা বলে চুং-লং-তা। জাপানিরা বলে কাতানো তেকেদা। এভাবে পৃথিবীর সবগুলো ভাষায় তুমি এই পাখিটার নাম জানতে পারো। কিন্তু এই নাম মুখস্ত করা যখন শেষ হবে - তখন? দেখবে পাখিটা সম্পর্কে তুমি কিছুই জানো না। তুমি আসলে জেনেছো পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মানুষ পাখিটাকে কী নামে ডাকে।“

আজ ফাইনম্যানের জন্মদিনে আশা করছি – অদূর ভবিষ্যতে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার খোলনলচে বদলে যাবে। আমাদের দেশেও ফাইনম্যানের মতো বিজ্ঞানী তৈরি হবার পরিবেশ সৃষ্টি হবে। 


প্রকৃতিবিদ ডেভিড অ্যাটেনবরো

 


প্রকৃতি এবং প্রকৃতির প্রাণিদের বিচিত্র জগতের সাথে আমাদের পরিচয় ঘটানোর ক্ষেত্রে স্যার ডেভিড অ্যাটেনবরো শুধু পথিকৃতই নন, এই ৯৭ বছর বয়সেও এক্ষেত্রে তাঁর সমকক্ষ কেউ নেই। ব্রিটিশ প্রকৃতিবিদ এবং টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব ডেভিড অ্যাটেনবরোর জন্ম ১৯২৬ সালের ৮মে লন্ডনে। তাঁর বাবা ফ্রেডেরিক অ্যাটেনবরো ছিলেন লেস্টার ইউনিভার্সিটি কলেজের প্রিন্সিপাল। ফ্রেডেরিক ও মেরি আটেনবরোর তিন পুত্রের মধ্যে দ্বিতীয় পুত্র ডেভিড। ডেভিডের বড়ভাই রিচার্ড অ্যাটেনবরো ছিলেন নামকরা চিত্রাভিনেতা এবং পরিচালক। ছোটভাই জন অ্যাটেনবরো ছিলেন ইতালিয়ান আলফা রোমিও গাড়িপ্রস্তুতকারক সংস্থার ব্রিটিশ অফিসের হেড। 

ডেভিড অ্যাটেনবরো কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লেয়ার কলেজ থেকে প্রাণিবিজ্ঞান ও ভূতত্ত্ববিজ্ঞানে মাস্টার্স ডিগ্রি লাভ করেন ১৯৪৭ সালে। ১৯৪৭ থেকে ১৯৪৯ পর্যন্ত তিনি ব্রিটিশ রয়েল নেভিতে ছিলেন এবং ল্যাফটেন্যান্ট র‍্যাংক পাবার পর নৌবাহিনী থেকে চলে আসেন। ১৯৪৯ থেকে ১৯৫২ পর্যন্ত তিনি কাজ করেন একটি প্রকাশনা সংস্থায় সহকারি সম্পাদক হিসেবে। ১৯৫২ সালে তিনি বিবিসি টেলিভিশনে যোগ দেন শিক্ষানবিস প্রযোজক হিসেবে। 

১৯৫৪ সালে তিনি শুরু করেন বন্য প্রাণিদের নিয়ে প্রথম তথ্যচিত্র ‘জু কোয়েস্ট’। পশ্চিম আফ্রিকার বন্যপ্রাণিদের নিয়ে কাজ শুরু। তারপর একের পর এক তথ্যচিত্র নির্মাণ করে গেছেন পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে নিরলসভাবে। ১৯৫৪ থেকে ১৯৬৪ পর্যন্ত দশ বছরে ৪৮টি পর্ব প্রচারিত হয় – জু কোয়েস্টের। ১৯৬৫ থেকে ১৯৭২ পর্যন্ত বিবিসি টেলিভিশনের উচ্চপর্যায়ের প্রশাসনের দায়িত্বে ছিলেন ডেভিড অ্যাটেনবরো। তারপর তিনি বিবিসি থেকে পদত্যাগ করে স্বাধীনভাবে তথ্যচিত্র তৈরি এবং লেখায় মনোনিবেশ করেন। ১৯৭৫ সালে তিনি আদিবাসিদের নিয়ে সাত পর্বের তথ্যচিত্র ‘দ্য ট্রাইবাল আই’ তৈরি করে। ১৯৭৬ থেকে ১৯৭৯ সালের মধ্যে তিনি তৈরি করেন ‘লাইফ অন আর্থ’। পৃথিবীর উদ্ভবের পর থেকে উদ্ভিদ, প্রাণিকুল, মানুষ কীভাবে বিবর্তিত হতে হতে বর্তমান রূপ লাভ করেছে – তার চাক্ষুষ প্রমাণ তিনি হাজির করেন তেরো পর্বের এই তথ্যচিত্রে। এরপর ১৯৮৪ সালে ‘দ্য লিভিং প্ল্যানেট’, ১৯৯০ সালে ‘দ্য ট্রায়ালস অব লাইফ’, ১৯৯৫ সালে ‘দ্য প্রাইভেট লাইফ অব প্ল্যান্টস’, ১৯৯৮ সালে ‘দ্য লাইফ অব বার্ডস’, ২০০২ সালে ‘দ্য লাইফ ব ম্যামালস’, ২০০৫ সালে ‘লাইফ ইন দি আন্ডারগ্রাউন্ড’, ২০০৭ সালে ‘লাইফ ইন কোল্ড ব্লাড’। শুধু তথ্যচিত্র নয়, অনেকগুলি প্রামাণ্য বই তিনি লিখেছেন – যেগুলি পরিবেশ ও প্রাণিবিজ্ঞানকে এগিয়ে নিয়ে গেছে অনেকদূর। 


এই ছবিটি ২০১৫ সালের মার্চ মাসে তোলা। ইউনিভার্সিটি অব অক্সফোর্ড স্টিফেন হকিং ও ডেভিড অ্যাটেনবরোকে ‘বডলি মেডেল’ প্রদান করে বিজ্ঞান ও সাহিত্যে অসাধারণ অবদানের জন্য। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির লাইব্রেরিয়ান রিচার্ড ওভেনডেন হকিং ও অ্যাটেনবরোর হাতে এই পুরষ্কার তুলে দিয়েছিলেন। 


এই সাতানব্বই বছর বয়সেও তিনি সক্রিয়। আজীবন কাজ করে গেছেন এই পৃথিবীর পরিবেশ রক্ষায় এবং পৃথিবীকে কীভাবে আরো সুন্দর করা যায় এই চেষ্টায়। সাধারণ মানুষকে বিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহী করে তুলতে অবদান রাখার জন্য ২০০৩ সালে তিনি পেয়েছেন রয়েল সোসাইটির ‘মাইকেল ফ্যারাডে পুরষ্কার’। ডেভিড অ্যাটেনবরো হলেন এখনো পর্যন্ত একমাত্র ব্যক্তি যিনি ব্রিটিশ একাডেমির টেলিভিশন পুরষ্কার পেয়েছেন টেলিভিশন মাধ্যমের শুরু থেকে এপর্যন্ত কারিগরি উন্নতির সবগুলি ধাপে – সাদা-কালো, রঙিন, হাই-ডেফিনেশান, থ্রি-ডি এবং ফোর-কে সব রেজ্যুলেশনে। তিন বার ‘এমি অ্যাওয়ার্ড’ তিনি তথ্যচিত্রে অতুলনীয় ধারাবর্ণনার জন্য। 

আজ ৮মে এই মানুষটির ৯৭তম জন্মদিন। 

শুভ জন্মদিন স্যার ডেভিড অ্যাটেনবরো। 


জ্যোতির্বিজ্ঞানী সিসিলিয়া পাইন

 


গ্যালিলিও, নিউটন, কিংবা আইনস্টাইনকে বিজ্ঞানে যেরকম গুরুত্ব দেয়া হয়, সেরকম গুরুত্ব পাওনা ছিল জ্যোতির্বিজ্ঞানী সিসিলিয়া পাইন-এর। নক্ষত্রগুলির গাঠনিক উপাদান যে হিলিয়াম আর হাইড্রোজেন - তার প্রথম প্রমাণ দিয়েছিলেন সিসিলিয়া পাইন। আলোকবর্ষ দূরের নক্ষত্ররাজির উপাদান বিশ্লেষণে তিনিই প্রথম পারমাণবিক তত্ত্ব প্রয়োগ করেছিলেন। জ্যোতির্বিজ্ঞানে তাঁর অবদান সম্পর্কে যতটুকু স্বীকৃতি তিনি পেয়েছেন তার জন্য কঠোর পরিশ্রম তো করতে হয়েছেই - শুধুমাত্র মেয়ে হবার কারণে তাঁর প্রাপ্য সম্মান পেতেও তাঁকে করতে হয়েছে সীমাহীন সংগ্রাম। 

সিসিলিয়া পাইনের জন্ম ১৯০০ সালের ১০মে ইংল্যান্ডের বাকিংহামশায়ারে। চার বছর বয়সে বাবাকে হারান। তাঁর মা অনেক কষ্ট করে তাঁকে লেখাপড়া শিখিয়েছেন। কেমব্রিজের নিউন্যাম কলেজে বোটানি, কেমিস্ট্রি ও ফিজিক্স নিয়ে বিএসসি পড়ার সময় বিজ্ঞানী আর্থার এডিংটনের লেকচার শুনে তিনি পদার্থবিজ্ঞানের প্রতি আকৃষ্ট হন। সেইসময় ফিজিক্সের ক্লাসে তিনি ছিলেন একমাত্র মেয়ে। শুধুমাত্র সেই কারণে ক্লাসের ছেলেরা তাঁকে টিটকিরি মারতো। শুধু ছাত্ররা নয়, শিক্ষকরাও হাসিঠাট্টা করতো সিসিলিয়াকে নিয়ে। স্বয়ং আর্নেস্ট রাদারফোর্ড, হ্যাঁ ঠিক পড়ছেন, সেই রাদারফোর্ড যিনি পরমাণুর নিউক্লিয়াস আবিষ্কার করেছেন, প্রোটন আবিষ্কার করেছেন, তিনিও তাঁর পুরুষালি মনোভাব দমন করতে পারেননি সেদিন। রাদারফোর্ডের ক্লাসে নিয়মিত হাসিঠাট্টার পাত্রী হতে হয়েছে সিসিলিয়াকে। তবুও তিনি ফিজিক্স ছেড়ে দেননি। 

পাস করার পর ইংল্যান্ডের কোথাও তখন মেয়ে-পদার্থবিজ্ঞানীর সম্মানজনক চাকরি ছিল না। মেরি কুরি তখনও সারা ইওরোপে একমাত্র মহিলা পদার্থবিজ্ঞানী। আমেরিকায় তখন মেয়েদের জন্য কিছুটা সুযোগ বেশি ছিল ইংল্যান্ডের চেয়ে। সিসিলিয়া আমেরিকা গেলেন পদার্থবিজ্ঞানে যদি কোন সুযোগ পাওয়া যায়। 

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় তখনো আমেরিকার সেরা বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু হার্ভার্ড ছিল প্রচন্ড রকমের নারীবিদ্বেষী বিশ্ববিদ্যালয়। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ট অ্যাবট লরেন্স লাওয়েল লিখিতভাবে আদেশ জারি করেছিলেন - হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে কোন নারীকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হবে না। স্নাতকোত্তর পর্যায়ে পড়াশোনার জন্য কোন মেয়েকে ভর্তি করানো হতো না তখন। 

সিসিলিয়া পড়াশোনা করলেন রেডক্লিফ কলেজে। এই কলেজটি মেয়েদের জন্য তৈরি করা হয়েছিল। 

হার্ভার্ড কলেজ অবজারভেটরির ডিরেক্টর হারলো শাপলি তখন মেয়েদের কে কাজ দিয়েছিলেন অবজারভেটরিতে। মেয়েদের জন্য গবেষণার সুযোগও তৈরি করছিলেন ধীরে ধীরে। সিসিলিয়া সেই গবেষণা-প্রকল্পে যোগ দিলেন। সিসিলিয়ার পিএইচডি গবেষণার কাজ এতই ভালো হয়েছিল যে আমেরিকার জ্যোতিপর্দার্থবিজ্ঞানী অটো স্ট্রুভ মন্তব্য করেছিলেন, 'সিসিলিয়ার পিএইচডি থিসিসের মতো এত উন্নতমানের থিসিস এর আগে কখনো লেখা হয়নি।" 

পিএইচডি ডিগ্রি দেয়ার জন্য হার্ভার্ডে আবেদন করার পরও অনুমোদন পাওয়া যায়নি। হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি তখনো কোন মেয়েকে পিএইচডি দেয়ার বিরুদ্ধে। 

১৯২৭ থেকে ১৯৩৮ পর্যন্ত শাপলির সহকারি হিসেবে অত্যন্ত কম বেতনে কাজ করতে হয়েছে সিসিলিয়াকে। সেই বেতনও তাঁকে দেয়া হতো যন্ত্রপাতি কেনার টাকা থেকে। কারণ কোন মেয়েকে সহকারি হিসেবেও নিয়োগ করার অনুমোদন ছিল না। 

কত দীর্ঘ সংগ্রামের পর অবশেষে ১৯৫৬ সালে সিসিলিয়া পাইন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর হিসেবে নিয়োগ পান। সিসিলিয়া ছিলেন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম নারী প্রফেসর। জ্যোতির্বিজ্ঞানে তাঁর অবদানের তালিকা অনেক দীর্ঘ। আমরা আজ নক্ষত্রগুলির রাসায়নিক গঠন জানি সিসিলিয়া পাইনের দৌলতে। 

আজ ১০মে সিসিলিয়া পাইনের জন্মদিন। 

শুভ জন্মদিন সিসিলিয়া।


Monday, 8 May 2023

গীতবিতান পাঠ - ১

 রবিঠাকুরের গীতবিতানের ভূমিকা।



Sunday, 7 May 2023

সত্যজিৎ রায়ের "মোল্লা নাসীরুদ্দীনের গল্প" - পাঠ

 সত্যজিৎ রায় মোল্লা নাসীরুদ্দীনের গল্পগুলি লিখেছিলেন শিশুদের জন্য। সেন্স অব হিউমার - সূক্ষ্ম হাস্যরসবোধ থাকলে এই অণুগল্পগুলির রস আস্বাদন করা সহজ এবং অনেক বেশি আনন্দদায়ক। গল্পগুলি পড়ার সময় অনেক আনন্দ পেয়েছি। 




Sunday, 30 April 2023

মারিয়েটা ব্লাউ – প্রথম যুগের কণাপদার্থবিজ্ঞানী

 


বিজ্ঞানের জগতকে আমরা যতটা বস্তুনিষ্ঠ বলে ভাবি, আসলে কিন্তু তা নয়। বিজ্ঞানের জগতে বিজ্ঞানীরা সবাই প্রচন্ড স্বার্থপর। নিজেদের কৃতিত্বের এতটুকু ছাড় দিতে তাঁরা রাজি নন, কিন্তু অন্যের কৃতিত্ব প্রায়ই তারা অস্বীকার করেন, এবং সুযোগ থাকলে নিজের বলে চালিয়ে দিতে পিছপা হন না। সে কারণেই বিজ্ঞানীদের মধ্যে নিজেদের ভাবনা, যেকোনো ছোটখাট আবিষ্কার ঘটা করে প্রচার করার সংস্কৃতি চালু আছে। উদ্ভাবনের প্যাটেন্ট পাবার জন্য লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করা হয়। সেখানে যাদের প্যাটেন্ট জোগাড় করার পদ্ধতিগত টাকা খরচ করার মতো সামর্থ্য থাকে না, তাদের প্যাটেন্ট চলে যায় সামর্থ্যবান কোম্পানির দখলে। প্যাটেন্ট অ্যাটর্নিদের ফি অনেক। বিজ্ঞানীদের মধ্যেও আছে প্রাতিষ্ঠানিক জাতপ্রথা। বাংলাদেশের অখ্যাত কোন কলেজের কোন শিক্ষক বা শিক্ষার্থীর পক্ষে কোন একটি গবেষণাপত্র কোন নামী জার্নালে প্রকাশ করতে যে পরিমাণ বেগ পেতে হবে, হার্ভার্ড কিংবা এম-আই-টির কোন শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে তার শতাংশ কষ্ট করতে হবে না। বিজ্ঞানী সত্যেন বসুর পক্ষেও আইনস্টাইনের সাহায্য ছাড়া গবেষণাপত্র প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি। এই জাতপ্রথা উচ্ছেদ করার জন্য গবেষণা সাময়িকীগুলো অনেক ধরনের ডাবল ব্লাইন্ড রিভিউ ব্যবস্থার প্রচলন করেছে – যেখানে রিভিউরাররা গবেষণাপ্রবন্ধের লেখকবিজ্ঞানীদের নাম পরিচয় জানতে পারেন না। কিন্তু রেফারেন্স লিস্ট থেকেই মোটামুটি বোঝা যায় – কোন্‌ প্রবন্ধ কোত্থেকে এসেছে। তাছাড়া ইদানীং যেকোনো নামী গবেষণাসাময়িকীতে প্রকাশনার জন্য গৃহীত হবার পরেও যে পরিমাণ পাবলিকেশান ফি দিতে হয়, তা অস্বাভাবিক রকমের বেশি। যেমন নেচার সাময়িকীতে একটি প্রবন্ধ প্রকাশের জন্য প্রায় সাত-আট হাজার ডলার দিতে হয়। এই পরিমাণ টাকা একজন দরিদ্র অথচ মেধাবী বিজ্ঞানীর পক্ষে জোগাড় করা সম্ভব হয় না। তখন তাঁর খুব যুগান্তকারী আবিষ্কার হয়তো কোন ফ্রি জার্নালে প্রকাশিত হয় – যা নামী বিজ্ঞানীদের কারো চোখেই পড়ে না। 

এত কথা মনে হলো অস্ট্রিয়ার কণা পদার্থবিজ্ঞানী মারিয়েটা ব্লাউর কথা স্মরণ করে। তাঁর আবিষ্কৃত  ফটোগ্রাফিক প্লেটের মাধ্যমে পারমাণবিক কণা শনাক্ত করার পদ্ধতি ব্যবহার করে বিজ্ঞানী সিসিল পাওয়েল নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন ১৯৫০ সালে, অথচ মারিয়েটার অবদানের কথা তিনি স্বীকারই করেননি। 

মারিয়েটা ব্লাউ জন্মেছিলেন অস্ট্রিয়ার এক মধ্যবিত্ত ইহুদি পরিবারে ১৮৯৪ সালের ২৯ এপ্রিল। ১৯১৯ সালে ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিজ্ঞানে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করার পরেও তিনি কোনো চাকরি পাননি অস্ট্রিয়ার কোথাও। গবেষণা ছিল তাঁর ধ্যানজ্ঞান। তাই গবেষণা করার সুযোগ আছে এরকম কোন চাকরি খুঁজছিলেন তিনি। ১৯২১ সালে বার্লিনের একটি এক্স-রে টিউব তৈরি করার কারখানায় যোগ দেন। সেখানে তিনি অনেক কাজ শেখেন, কিন্তু রুটিন কাজের বাইরে স্বাধীনভাবে গবেষণার সুযোগ খুব একটা ছিল না। তাই ১৯২৩ সালে ভিয়েনায় ফিরে এসে বিনাবেতনে গবেষণা শুরু করলেন ভিয়েনার রেডিয়াম রিসার্চ ইন্সটিটিউটে। সেখানেই তিনি পরবর্তী আট বছর ধরে গবেষণা করে ফটোগ্রাফিক ইমালশানের মাধ্যমে নিউক্লিয়ার কণা শনাক্ত করার পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন। ১৯৩৭ সালে তিনি শনাক্ত করেন মহাকাশের নক্ষত্র থেকে ছুটে আসা কসমিক রে বা মহাজাগতিক রশ্মি। অথচ ১৯৫০ সালে এই পদ্ধতির সাহায্যে মেসন কণা শনাক্তকরণের জন্য নোবেল পুরষ্কার দেয়া হয় ব্রিটিশ বিজ্ঞানী সিসিল পাওয়েলকে। 

১৯৩৮ সালে মারিয়েটা ব্লাউকে কাজ থেকে শুধু নয়, দেশ থেকেও তাড়িয়ে দেয়া হয় শুধুমাত্র ইহুদি হবার অপরাধে। এদেশ থেকে ওদেশে পালাতে পালাতে শেষপর্যন্ত আইনস্টাইনের সুপারিশ এবং সহায়তায় তিনি মেক্সিকোতে একটি চাকরি পান। অস্ট্রিয়া থেকে পালিয়ে যাবার সময় তিনি তাঁর গবেষণার কাগজপত্র সাথে করে নিয়ে যাচ্ছিলেন। হামবুর্গ এয়ারপোর্টে জার্মান সৈনিকেরা তাঁর সব কাগজপত্র কেড়ে নেয়। পরে তাঁর এই গবেষণার অনেককিছুই হারথা ওয়ামবাখার ও জর্জ স্টেটার নিজেদের নামে প্রকাশ করেন। অথচ এই দুইজন ছিলেন মারিয়েটা ব্লাউর সহকারি। হারথা ছিলেন তাঁর সরাসরি ছাত্রী। নাৎসি সমর্থক এই দুজন হিটলারের জার্মানিতে নিউক্লিয়ার বিজ্ঞানী হিসেবে অনেক নাম করেছিলেন।

মারিয়েটা ব্লাউয়ের মতো অনেকেই এখনো বিভিন্নভাবে বঞ্চিত হচ্ছেন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে।  এই বঞ্চনার কথা অনেক সময় কেউ জানতেও পারে না। 


Tuesday, 18 April 2023

মাসুদ রানা ০০৭ - শত্রু ভয়ঙ্কর

 




এই বইটি একটু একটু করে পড়তে দীর্ঘদিন লেগেছে। থ্রিলার একটানে পড়ে ফেলার কথা। টানটান উত্তেজনা থাকার কথা। ক্লাস নাইন-টেন-ইলেভেনে যেভাবে দস্যু বনহুর পড়তাম, এখনো সেভাবে পড়তে পারলে বেশ লাগতো। এখন যে ভেতরের পাঠক মরে গেছে তা নয়, কিন্তু এখন কেমন যেন নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ চলে এসেছে অনেক। কাজও বেড়েছে, একসাথে অনেক কাজ করার মাল্টি টাস্কিং নামে এক অভ্যাস তৈরি হয়েছে। তাতে যে খুব কাজ হয়ে যায় তা নয়। তবে অনেক কাজই শুরু হয়, কোনোটাই ঠিকমতো শেষ হয় না। পল ডিরাক যে একসাথে একটির বেশি কাজ কখনোই করতেন তা – তার সুফল তিনি হাতে হাতে পেয়েছিলেন। 

মাসুদ রানা সিরিজের সপ্তম বই ‘শত্রু ভয়ঙ্কর’ প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৬৭ সালে। হয়তো আমার জন্মেরও আগে। ক্লাস টেনে পড়ার সময় সুশান্ত যখন কাঞ্চন নগর থেকে পটিয়ায় এসে মাসুদ রানার বই কিনে নিয়ে যেতো, তখন আমি পটিয়াতে ছিলাম। ইচ্ছে করলে মাসুদ রানা পড়তে পারতাম। কিন্তু আমি সেসময় দস্যু বনহুরই শুধু পড়েছি। কেন যে মাসুদ রানা তখন পড়িনি জানি না। এখন এই বয়সে যখন মানুষ ভারী ভারী বই পড়ে বিজ্ঞজনোচিত আচরণ করে, আমি তখন কৈশোরের স্মৃতিকাতরতা নিয়ে মাসুদ রানা পড়ি। তাতে মাসুদ রানার আরোপিত বীরত্বে যতটা যা আমোদিত হই, তার চেয়েও বেশি ফিরে আসে আমার কৈশোরের স্মৃতি। 

শত্রু ভয়ংকর কবে পড়তে শুরু করেছিলাম মনে নেই। শেষ করলাম কুবার পিডিতে গিয়ে। মেলবোর্ন থেকে এডেলেইড যাবার পথে এয়ারপোর্ট আর প্লেনে বসেও পড়েছি। ফোনে গাদা গাদা বই থাকে, এটা যে কী পরিমাণ সুবিধা দেয়!

এবার আসি শত্রু ভয়ঙ্করের কথায়। পাকিস্তানের স্পাই মাসুদ রানাকে ইস্তাম্বুলে পাঠানো হয় মূলত রাশিয়ার আণবিক বোমা এম-৩১৫ – যা চুরি হয়ে গেছে তা খুঁজে বের করার জন্য। সেজন্য নানারকম নাটকীয় ঘটনা ঘটায়। ইস্তাম্বুলে খুনের অপরাধে বিচার হবার সময় যে সুন্দরী যোহরা হাসানকে সাথে নিয়ে পালায়। যেরকম ধারণা করা হয়, সেরকমই ঘটে – যোরা রানাকে ভালোবেসে ফেলে। স্বাভাবিক। এদিকে যোরার বাবাকে জিম্মি করে ফেলে ইস্তাম্বুলের মাফিয়া চিফ ইয়াকুব বে। 

মাসুদ রানা, জাহাজ, জাহাজের ভেতর যুদ্ধ যুদ্ধ, এবং সবশেষে মধুরেন সমাপয়েৎ। আলাদা করে কেমন লেগেছে বলার কোন মানে হয় না। 


Monday, 17 April 2023

লিওনার্দো দা ভিঞ্চি

 



যে দুটি চিত্রকর্মকে সর্বকালের সেরা চিত্রকর্ম বলে মনে করা হয় তাদের প্রথমটি হলো ‘মোনালিসা’, আর দ্বিতীয়টি ‘দ্য লাস্ট সাপার’। দুটোরই চিত্রকর ছিলেন লিওনার্দো দা ভিঞ্চি। শুধু চিত্রশিল্পী নন, তিনি ছিলেন শিল্পকলার নতুন প্রথার তাত্ত্বিক পথপ্রদর্শক, স্থপতি, মঞ্চসজ্জাবিদ, প্রকৌশলী, গণিতজ্ঞ, পদার্থবিদ, ভূগোলবিদ, ভূতত্ত্ববিদ, শরীরতত্ত্ববিদ। চতুর্দশ শতাব্দীর ইওরোপের রেনেসাঁ যুগের ইতিহাসের সবচেয়ে প্রতিভাশালী মানুষ ছিলেন লিওনার্দো দা ভিঞ্চি। 

ইতালির ফ্লোরেন্স শহরের কাছাকাছি ভিঞ্চি নামক উপশহরে জন্ম বলেই লিওনার্দোর নাম হয়ে গেছে লিওনার্দো দা ভিঞ্চি। ইওরোপে নামের সাথে পারিবারিক নাম যোগ করার নিয়ম তখনো চালু হয়নি। সুনির্দিষ্ট পরিচিতির উদ্দেশ্যে অনেকে নামের সাথে জন্মস্থানের নাম জুড়ে দিতেন – যেমন ভিঞ্চি শহরের লিওনার্দো হলেন লিওনার্দো দা ভিঞ্চি। অনেকে নামের সাথে যোগ করে নিতেন তাঁদের পেশা; যেমন মাইকেল শুমেইকার – অর্থাৎ জুতার কারিগর মাইকেল ইত্যাদি। 

ভিঞ্চি শহরের তরুণ নোটারি পাবলিক  পিয়েরো  ভালোবেসেছিলেন এক চাষীর মেয়ে ক্যাটেরিনাকে। সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যবধানের কারণে পিয়েরো ও ক্যাটেরিনার প্রণয় পরিণয়ে গড়ায়নি। কিন্তু তাদের ভালোবাসার সন্তান লিওনার্দোর জন্ম হয়েছে ১৪৫২ সালের ১৫ এপ্রিল। বিবাহবহির্ভূত সন্তানের সামাজিক মর্যাদা খুব একটা ছিল না তখন। লিওনার্দোর শৈশব ছিল গ্লানিকর। ক্যাটারিনার বিয়ে হয়ে যায় একজন চাষীর সাথে, যিনি লিওনার্দোর দায়িত্ব নিতে অস্বীকার করেন। পিয়েরোও বিয়ে করেছেন অন্য একজন সম্ভ্রান্ত রমণীকে। শিশু লিওনার্দোকে আদর দেয়ার কোন দায়িত্বই তাঁর ছিল না। পিয়েরো তাঁর সন্তান লিওনার্দোকে কিছু মাসোহারা দিয়ে পিতার দায়িত্ব পালন করেছিলেন। হাতের কাজ শেখার ব্যবস্থা করেছিলেন যেন কাজ করে খেতে পারে লিওনার্দো। 

সারাজীবন নতুন নতুন কাজ শিখেছেন এবং কাজ করেছেন লিওনার্দো। পনের বছর বয়সে ফ্লোরেন্সের নামকরা চিত্রশিল্পী আন্দ্রিয়া ডেল ভেরোচ্চিওর সহকারী নিযুক্ত হয়ে পরবর্তী দশ বছর ধরে কাজ শেখেন তাঁর কাছে। শিখলেন কীভাবে ছবি আঁকতে হয়, মূর্তি বানাতে হয়, শিখলেন ধাতু গলিয়ে বিভিন্ন ধরনের অলংকার প্রস্তুতির কাজ, আর নতুন নতুন স্থাপত্যবিদ্যা। 

১৪৭৭ সাল থেকে স্বাধীনভাবে কাজ শুরু করার পর মিলান শহরের ডিউক লুদোভিকো স্ফোরজার নজরে আসেন। স্ফোরজা লিওনার্দোকে শহরের অনেক কাজ দেন। ১৪৮২ থেকে ১৪৯৯ পর্যন্ত লিওনার্দো অনেকগুলি ছবি আঁকেন, যেগুলি পরবর্তীতে খুবই বিখ্যাত হয়েছে। এসময় তিনি অনেক মঞ্চ, সরকারি ভবন, নগর পরিকল্পনা, সামরিক অস্ত্র, কলকারখানার যন্ত্রপাতি ইত্যাদি অনেককিছুর বিস্তারিত নকশা তৈরি করেন। শতাধিক নোটবইয়ের পাতার পর পাতা ভরে ওঠে তাঁর করা নকশায়। এর বেশিরভাগই লোকচক্ষুর আড়ালে থেকে যায় পরবর্তী চারশ বছর। 

মিলানের ডিউকের জন্য কাজ করার সময়েই তিনি আঁকেন ‘দ্য লাস্ট সাপার’ – যা আঁকতে কয়েক বছর সময় লেগে যায়। লিওনার্দো অনেক ধরনের কাজ শুরু করতেন একই সাথে, যার বেশিরভাগই শেষ করা হতো না। 

১৪৯৯ সালে ফ্রান্স মিলান দখল করে নিলে মিলানের ডিউক লুদোভিকো ক্ষমতা হারালো, ফলে লিওনার্দোও কর্মহীন হয়ে পড়েন। পরবর্তী সতেরো বছর ধরে তিনি ইতালির বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়িয়েছেন কাজের সন্ধানে এবং বিভিন্ন সময়ে কাজ করেছেন বিভিন্ন প্রভাবশালীর অধীনে। প্রভাবশালী শাসক, নির্মম মিলিটারি শাসক, পোপ, ব্যবসায়ী অনেকের জন্যই নানারকম কাজ তাঁকে করতে হয়েছে। ১৫০৩ সালে তিনি শুরু করেছিলেন তাঁর মোনালিসা ছবির কাজ। ১৫০৬ সালে এই ছবির কাজ শেষ হয়। লিওনার্দো অবশ্য ভাবতেও পারেননি যে এই ছবিটি একদিন পৃথিবীবিখ্যাত হবে। ১৫০৬ সালে ৫৪ বছর বয়সে তিনি এনাটমি বিষয়ে পড়াশোনা শুরু করেন এবং এনাটমিক্যাল স্কেচ করতে শুরু করেন। সেগুলি এতটাই নিখুঁতভাবে এঁকেছিলেন যে পরবর্তী শত বছর ধরে চিকিৎসাবিজ্ঞানের শিক্ষার্থীরা এই স্কেচগুলি থেকে এনাটমি শিখেছেন। 

১৫১৬ সালে ফ্রান্সের রাজা লিওনার্দোকে ফ্রান্সের প্রধান চিত্রকর, প্রকৌশলী এবং স্থপতির পদে নিয়োগ দেন। এই পদে কাজ করতে করতে ফ্রান্সের রাজা ফ্রান্সিসের প্রিয়পাত্র হয়ে ওঠেন লিওনার্দো। দিনরাত কাজ করতে করতে শরীর ভেঙে পড়েছে লিওনার্দোর। শরীরের ডানভাগ অসাড় হয়ে পড়েছে। কিন্তু তারপরেও কাজ করে যাচ্ছেন অবিরাম। এভাবে কাজ করতে করতেই ১৫১৯ সালের ২ মে মৃত্যু হয় লিওনার্দো দা ভিঞ্চির। লিওনার্দো দা ভিঞ্চি কখনো বিয়ে করেননি, কারো সাথে তাঁর ঘনিষ্ঠতা ছিল কি না তাও জানা যায়নি। জীবিত অবস্থায় যতটা পরিচিতি তিনি পেয়েছিলেন – তার চেয়ে হাজারগুণ পরিচিতি তিনি পেয়েছেন তাঁর মৃত্যুর পর। যত দিন যাচ্ছে তাঁর কাজের নতুনভাবে মূল্যায়ন হচ্ছে। সময়ের সাথে তিনি হয়ে উঠছেন আরো প্রাসঙ্গিক।


Latest Post

চাঁদের নাম লুনা - প্রথম পর্ব

চাঁদের নাম লুনা ক্লাসে ঢুকে আমাকে দেখেই হৈ চৈ করে উঠলো ফারজানা, স্বাতী আর চিত্রা। তিনজনই আজ এক সাথে এসেছে।             "ওয়াও নয়ন, তোকে ...

Popular Posts