Saturday 6 June 2020

ছিন্ন পাতার সাজাই তরণী - পর্ব ৩৩

33

এক লেড়কি কো দেখা তো এইসা লাগা …”  

সবগুলি পিকনিকের  বাসেই মনে হয়  এই গানটাই বাজছে আজ। এখন পিকনিকের সিজন চলছে। জানুয়ারি ফেব্রুয়ারি মাসের শুক্রবার মানেই পিকনিক। এবছর অবশ্য ফেব্রুয়ারি মাসে পিকনিক করা যাবে না। কারণ রমজান শুরু হয়ে যাবে। সেজন্যই সম্ভবত আজ সারা রাস্তায় অনেকগুলি পিকনিকের বাস। ভাড়াকরা বাসের সামনে বড় ব্যানার লাগানো হবে, আর বাসের ছাদে মাইক লাগিয়ে চড়া ভলিউমে হিন্দি গানের ক্যাসেট চালিয়ে দেয়া হবে। এটাই সম্ভবত পিকনিকের নিয়ম। কিন্তু আমাদের বাস সেই নিয়ম মানছে না। বাসের ভেতর মোটামুটি রকমের হাসি ঠাট্টা চলছে। তবে গানবাজনা করার মতো পরিবেশ এখনো তৈরি হয়নি। সাত সকালে উঠে নিশ্চয় কেউ “এক লেড়কি কো দেখা তো অ্যাইসা লাগা” – গাইবে না।

ড্রাইভারছাড়া এয়ারফোর্সের আর কেউ নেই বাসে। শুধুমাত্র শিক্ষকদের জন্য এয়ারফোর্সের একটা বাস জোগাড় করতে পারা সহজ কথা নয়। পিকনিক কমিটির ডেপুটি হেড ছোলাইমান স্যার বসেছেন আমার সামনের সিটে। তাঁকে বললাম, “বাসের জন্য ধন্যবাদ স্যার।“

“এয়ারফোর্স টিচারদের বাঁশ দিয়েছে সেটাই তো আশ্চর্যের।“ – লাইলুন্নাহার ম্যাডাম বললেন। তিনি বাসকে যে বাঁশ বলেন তা জানা না থাকলে শুনতে অন্যরকম লাগতো। কিন্তু রিফাৎ আরা ম্যাডাম বলেই ফেললেন, “বাঁশতো তারা আমাদের সব সময়েই দিচ্ছে আপা। হাহাহা।“

সবাই হা হা করে হেসে উঠলেন। আজকের বাস-জার্নিটা অন্যদিনের চেয়ে আলাদা। অন্যদিন বাসে কথা বলা যায় না। আজ মনে হচ্ছে সব কথা পুষিয়ে নিচ্ছে সবাই। প্রতিদিন যে যেখান থেকে উঠেন সেখান থেকে উঠলেন বাসে। নাসরীন ম্যাডাম বাসে উঠে এদিক ওদিক তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন, “রিফাৎ আপা, সুচরিত আসেননি?”

“সুচরিতকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। বিতর্কের সবকিছু তার কাছে।“ – রিফাৎ আরা ম্যাডাম বললেন। নাসরীন ম্যাডাম হায় হায় করে উঠলেন। মনে হচ্ছে পিকনিকে যাওয়ার চেয়েও বিতর্কের স্ক্রিপ্ট লেখার গুরুত্ব অনেক বেশি তাঁদের কাছে। সুচরিত স্যার তো আমাকে বিপদে ফেললেন দেখি।

সিমেন্ট ক্রসিং-এর পর থেকেই আমাদের পিছু নিলো আরেকটি পিকনিকের বাস। তাদের মাইকে অনেকক্ষণ থেকে বিভিন্ন রকমভাবে বাজছে “কুছ না কহো” – একটা গান এত রকম করে গাইবার দরকার কী? হিন্দি বুঝি না বলেই হয়তো এরকম লাগছে। শব্দের অত্যাচারে উঠে দাঁড়িয়ে পেছনে তাকিয়ে দেখলাম – তাদের ব্যানারে লেখা আছে – বনভোজন – নন্দনকানন যুব সংঘ। সম্ভবত পতেঙ্গা সি-বিচে যাচ্ছে। কর্ণফুলির পাড়ের এই রাস্তাটি কিছুটা সরু। তবুও ইচ্ছা করলেই তারা আমাদেরকে ওভারটেক করে চলে যেতে পারে। কিন্তু আমাদের ড্রাইভারের মনে হয় রাস্তা ছেড়ে দেবার ইচ্ছে নেই। এসব ব্যাপারে ড্রাইভারদের ইগো নাকি অনেক বেশি থাকে। রাস্তায় তাদের কেউ ওভারটেক করলে তাদের মেজাজ বিগড়ে যায়।

ভেবেছিলাম গাড়ি আগে কলেজে যাবে। কিন্তু দেখা গেলো শাহীন গেট পার হয়ে চলে যাচ্ছে সামনে। ছোলাইমান স্যার বললেন, “গাড়ি এখন কলেজে যাবে না। আমাদের আগে নামিয়ে দিয়ে তারপর যাবে।“

মেরিন একাডেমির নিজস্ব ঘাট আছে এদিকে। আমাদের বাস থামলো সেখানে। আমাদের পেছনের বাসটিও থেমে গেছে। স্যার ম্যাডামরা একে একে নামছেন। হঠাৎ রিফাৎ আরা ম্যাডাম জোরে চিৎকার করে উঠলেন, “এই তো সুচরিত।“

বাস থেকে নেমে দেখলাম সুচরিত স্যার হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছেন রিফাৎ আরা ম্যাডাম আর নাসরীন বানু ম্যাডামের সামনে, আর ম্যাডামরা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছেন।

“কীভাবে এলেন? আমাদের আগে চলে এসেছেন? কোথায় ছিলেন? কী হয়েছিল?” – অনেক প্রশ্ন করা হচ্ছে তাঁকে।

জানা গেলো তিনি আমাদের সাথে সাথে এসেছেন। আমাদের পেছনের বাসে ছিলেন তিনি। নন্দনকানন যুব সংঘের সদস্য নিশ্চয় তিনি। যাক – তিনি এসে গেছেন। আমার আংশিক মুক্তি ঘটলো। নইলে পিকনিকের পুরো সময়টাই আমার যেতো বিতর্কের যুক্তি খুঁজতে খুঁজতে।

আমাদের নামিয়ে দিয়ে বাস চলে গেছে বেইজে। সেখান থেকে আমাদের অন্যান্য স্যার-ম্যাডামদের নিয়ে আসবে। শীতের কর্ণফুলি অনেক শান্ত এখন। অনেকগুলি ছোট ছোট নৌকা দেখা যাচ্ছে। আরেকটু সামনে গেলেই সাগরের মোহনা। প্রতিদিন কলেজে আসি – অথচ গত এক বছরে এদিকে আসিনি আর। সবাই এলে মেরিন একাডেমির বোটে করে আমরা কর্ণফুলির ওই পাড়ে যাবো।

একটু পরেই এয়ারফোর্স অফিসারদের একটা গাড়ি এসে থামলো একটু দূরে। দেখা গেলো প্রিন্সিপাল স্যার নামলেন গাড়ি থেকে। নেমে গাড়ির দরজা ধরে দাঁড়িয়ে রইলেন। অন্যদিকের দরজা খুলে নামলেন একজন হৃষ্টপুষ্ট লম্বা ফর্সা মানুষ। প্রিন্সিপাল স্যার গাড়ির দরজা বন্ধ করে দ্রুত তাঁর সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। মনে হচ্ছে কোন প্রভাবশালী অফিসার হবেন।

“নতুন ওসি-অ্যাডমিন।“ – অঞ্জন স্যার বললেন ফিসফিস করে। “ছোলাইমান ভাই, চলেন দেখা করে আসি।“

“কেন? পাম দেয়ার জন্য?” – ছোলাইমান স্যার হাসতে হাসতে বললেন।

দেখা গেলো প্রিন্সিপাল স্যার অফিসারকে নিয়ে আমাদের দিকে আসছেন। নীল জিন্স আর লাল টি-শার্টের উপর একটা খাকি রঙের জ্যাকেট পরেছেন অফিসার। মুখের দিকে তাকালে সবচেয়ে আগে চোখে পড়ে তাঁর গোঁফ। মনে হচ্ছে তাঁর ফর্সা নাকের নিচে একটা মোটা কালো বিছা আটকে আছে।  আমার হঠাৎ সুকুমার রায়ের কবিতার লাইন মনে পড়লো – “নোংরা ছাঁটা খ্যাংরা ঝাঁটা বিচ্ছিরি আর ময়লা,
এমন গোঁফত রাখত জানি শ্যামবাবুদের গয়লা।“

কিন্তু আমার মনের খবর তিনি জানলে আমার চাকরির বারোটা বাজিয়ে দেবেন। যাঁরা গোঁফ রাখেন – তাঁরা যে তাঁদের গোঁফকে কী পরিমাণ ভালোবাসেন! সুচরিত স্যার যে সুযোগ পেলেই নিজের গোঁফে তা দেন – তা কি এমনিতে দেন? এই মোছো অফিসারটিও নিশ্চয় “গোঁফ দিয়ে যায় চেনা” টাইপের মানুষ।

বেইজের ভেতরের স্যার-ম্যাডামরা তাঁদের ছেলে-মেয়েদের নিয়ে চলে এসেছেন। মেরিন একাডেমির বোটে করে বেশিক্ষণ লাগলো না ওপারে পৌঁছাতে। মেরিন একাডেমির লম্বা সুন্দর জেটি ঝকঝক করছে সকালের ঝলমলে রোদে। কিছুদূর আসার পরেই দেখলাম জেটির উপর দাঁড়িয়ে আছেন হুমায়রা ম্যাডাম আর পার্সা লোহানী। মুহূর্তেই পার্সা আর রেহনুমা উধাও হয়ে গেল। হুমায়রা ম্যাডাম পরিচয় করিয়ে দিলেন তাঁর হাজব্যান্ড লোহানী সাহেবের সাথে। একাডেমির কর্তাব্যক্তি তিনি।

প্রায় ১০০ একরের বিশাল এলাকাজুড়ে এই মেরিন একাডেমি। এখানে দশ বছর আগে উচ্চমাধ্যমিক পাস করার পর একবার এসেছিলাম আমার বন্ধু সুমনের সাথে, ভর্তি পরীক্ষার ফরম নিতে। তখন বেশি কিছু দেখা হয়নি এখানে। ঘাট থেকে অফিসে গিয়ে ফরম নিয়েই চলে গিয়েছিলাম। এত বেশি ডকুমেন্ট চেয়েছিল যে ফরমই জমা দিইনি আর। তাই ভর্তিপরীক্ষাও দেয়া হয়নি। হুমায়রা ম্যাডামের কল্যাণে একাডেমির পরিচালক নিজে এসে আমাদের খাতিরযত্ন করলেন। একাডেমিক ভবনের সবকিছু ঘুরিয়ে দেখালেন।

স্যার-ম্যাডামদের ছেলেমেয়েরা দল বেঁধে ছুটোছুটি খেলাধুলা করছে। একটু পরেই দেখা গেলো রিফাৎ আরা ম্যাডাম, নাসরীন বানু ম্যাডাম আর সুচরিত স্যার একটা টেবিলে বসে গেছেন বিতর্কের স্ক্রিপ্ট লেখার কাজে। আমি সেখানে না গিয়ে বাচ্চাদের খেলাধুলা দেখার দিকে মনযোগী হলাম।

“ইকি, শোন, এদিকে আসো।“ – অঞ্জন স্যারের ডাকে কাছে এলো নয়-দশ বছরের একটি মেয়ে।

“তুমি প্রদীপ স্যারকে চেনো? স্যারকে সালাম দাও।“

“স্লামালাইকুম স্যার। স্যারকে চিনি তো স্যার। স্যার আমাদের ক্লাসে অংক করান।“ – ইকির কথাবার্তা খুব স্পষ্ট এবং জোরালো। মনে হচ্ছে অঞ্জন স্যারকে অনেকদিন থেকেই চেনে সে।

“তাহলে তোমাকে একটা অংক দিই। দেখি কেমন অংক শিখেছো। তোমাকে এক লিটার পানি আনতে হবে খালি হাতে। কোন পাত্র ব্যবহার করতে পারবে না। কীভাবে আনবে?” – অঞ্জন স্যার বললেন। এই প্রশ্নের উত্তর তো আমিও জানি না। খালি হাতে এক লিটার পানি কীভাবে আনা যাবে? পাত্র তো লাগবে। কেটে পড়বো নাকি এখান থেকে। অঞ্জন স্যার যদি আমাকে এই প্রশ্নের উত্তর দিতে বলেন, তাহলে তো ছেলে-মেয়েদের সামনে লজ্জা পাবো। কিন্তু ইকি কী উত্তর দেয় দেখা যাক।

“সোজা ব্যাপার স্যার। এক লিটার পানিকে জমিয়ে বরফ করে ফেলবো। তারপর সেই বরফকে হাতে করে নিয়ে আসবো।“ – ইকির সপ্রতিভ উত্তর।

বরফ আর পানি কেমিক্যালি এক হলেও ফিজিক্যালি এক নয় – বলতে চাচ্ছিলাম। কিন্তু তার আগেই অঞ্জন স্যার বললেন, “ভেরি গুড। ভেরি ইন্টিলিজেন্ট।“

“থ্যাংক ইউ স্যার” – বলে ইকি ছুটে চলে গেলো। অঞ্জন স্যার আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি ইকিকে চেনো তো?”

“ক্লাস ফাইভে পড়ে। কিন্তু তার নাম যে ইকি তা জানতাম না।“

অঞ্জন স্যার খুব অবাক হলেন আমার কথা শুনে।

“কী বলো? তুমি ভাইস প্রিন্সিপাল ম্যাডামের মেয়েকে চেনো না? আশ্চর্য। এটুকু খবরও না রাখতে পারলে চলবে কীভাবে?” – অঞ্জন স্যার আমার জন্য চিন্তিত হয়ে পড়লেন।

“স্যার, রিফাৎ আরা ম্যাডাম আপনাকে ডাকছেন।“ দেখলাম আমাদের বিতর্কের দলনেতা তানজীবা সুলতানা রীমা।

“রীমা, তুমি এখানে?”

“আমাদের বাসা এখানে স্যার।“

ভালোই হলো। বিতর্কের স্ক্রিপ্ট লেখার সময় বিতার্কিকরা থাকলে যুক্তিগুলো খুব সহজেই অনুধাবন করতে পারে তারা।

খাওয়া-দাওয়ার পর মেরিন একাডেমির আশেপাশে ঘুরে বেড়ানো হলো। রীমাদের বাসায় যাওয়া হলো। হুমায়রা ম্যাডামের বাসায় যাওয়া হলো। কী সুন্দর এখানকার অফিসারদের বাসাগুলি। আকারে আয়তনে স্থাপত্যে প্রকাশিত আভিজাত্য।

সন্ধ্যা নামার আগেই কর্ণফুলির এপারে চলে এলাম একাডেমির বোটে। মোছো অফিসার চলে গেলেন তাঁর অফিসিয়াল গাড়িতে প্রিন্সিপাল স্যারকে সাথে নিয়ে। আমরা আমাদের জন্য নির্ধারিত গাড়িতে চলে এলাম শহরে। হোসনে আরা ম্যাডামও এলেন আমাদের সাথে। আসার সময় সবার অনুরোধে ছোলাইমান স্যার গান গাইলেন, “ছোড় ছোড় ডেউ তুলি, বাইরে ছোড় ছোড় ডেউ তুলি, লুসাই পাহার-তুন নামি এরে যার গই কর্ণফুলি।“

উনার গানে সম্ভবত নাইট্রাস অক্সাইড উৎপন্ন হয়েছিল গাড়ির ভেতর। সবাই হো হো করে হাসতে শুরু করলো।

>>>>>>>>>> 

পিকনিকের একদিন পরেই শুরু হলো দু’দিন ব্যাপী বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা। অনেকগুলো ইভেন্ট আগে হয়ে গিয়েছিল। গত বছরের স্পোর্টস-এ আমি থাকতে পারিনি। এবারই প্রথম দেখছি এর জাঁকজমক। নানারঙের ফেস্টুনে সাজানো হয়েছে ষোল কোয়ার্টারের মাঠ। সামিয়ানা টাঙিয়ে তৈরি করা হয়েছে বিভিন্ন হাউজের ছেলে-মেয়ে ও শিক্ষকদের বসার জায়গা। হাউজ-টিচাররা ছেলে-মেয়েদের সাথে তাল মিলিয়ে আনন্দ উদ্‌যাপন করছে।

সকালে ওসি-এডমিনের প্রধান আতিথ্যে বর্ণাঢ্য প্যারেড হয়ে গেলো। একে একে দৌড়ের ইভেন্টগুলি হলো। যে হাউজ পয়েন্ট পাচ্ছে সেই হাউজে আনন্দধ্বনি হচ্ছে। সোফা ইত্যাদি দিয়ে অতিথিদের জন্য বসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। মাইকে ধারাবিবরণী দিচ্ছেন রিফাৎ আরা ম্যাডাম। খেলাধুলার বিভিন্ন ইভেন্ট সম্পর্কে তাঁর ধারা বর্ণনা শুনে বোঝা যাচ্ছে তাঁর ক্রীড়া-জ্ঞান অত্যন্ত গভীর।

দুপুরে শিক্ষকদের জন্য কলেজেই খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এসব ব্যাপারে হোসনে আরা ম্যাডাম খুবই দক্ষ। সন্ধ্যায় গাড়ি দেয়া হলো শহরে আসার জন্য।

ফাইনালের দিন পুরষ্কার দিতে এলেন ঘাঁটি অধিনায়ক। তাঁর উপস্থিতিতে ছেলে-মেয়েদের যেমন খুশি সাজ, ম্যাডামদের মিউজিক্যাল চেয়ার প্রতিযোগিতা হলো। সবার শেষে স্যারদের দৌড় প্রতিযোগিতা।

স্যারদের দৌড় প্রতিযোগিতায় আমাদের প্রিন্সিপাল স্যার গতবছর চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলেন বলে শুনেছি। তিনি এবছরও রেডি। নিয়ম করা হয়েছে সব স্যারকেই দৌড়াতে হবে ১০০ মিটার। নো এক্সসেপশান। নাসির স্যার, সাঈদ স্যার, ফারুকী স্যার, মহিউদ্দিন স্যার, কিংবা আবুল কাশেম স্যার – সবাইকেই দৌড়াতে হবে। ছাত্র-ছাত্রীদের উৎসাহ দেখে বোঝা যাচ্ছে তারা ভীষণ মজা পাচ্ছে স্যারদের কান্ডকারখানায়। সবাই খালি পায়ে দৌড়াবেন। আমি চুপচাপ সরে পড়তে চাইলাম, কিন্তু স্টুডেন্টরাই আমাকে পালাতে দিলো না। দৌড় দিতে হয় দিলাম। দেখা গেলো ফারুকী স্যার, বিমল স্যার, সুপাল স্যার, এমনকি সুচরিত স্যারও দশ মিটার গিয়েই আর গেলেন না। আমি কোন রকমে দৌড় শেষ করলাম। প্রিন্সিপাল স্যার ফার্স্ট হয়েছেন, শংকর স্যার সেকেন্ড, আর আবুল হোসেন খান থার্ড।

সব শিক্ষককে একটা করে চিনা-মাটির প্লেট পুরষ্কার দেয়া হলো।

বাসে করে ফেরার সময় আলী হায়দার স্যার শংকর স্যারকে বললেন, “নব্বই মিটারের মাথায় গিয়ে ওরকম থেমে যাওয়ার অর্থ কী ছিল?”

“পায়ে সমস্যা হয়েছিল।“

“নাকি প্রিন্সিপাল স্যারকে সাইড দিচ্ছিলেন?”

“আপনার তো ওসব দেখার কথা না।“

“আমি কেন, সবাই দেখেছে।“

“দরকার মতো সাইড দেয়াটাও খেলাধুলার নিয়মের মধ্যে পড়ে। মনে রাইখেন। হাহাহা।“

খুবই দরকারি কথা বললেন শংকর স্যার। দুনিয়াতে টিকে থাকতে গেলে কত ধরনের সাইড যে নিতে হয়, দিতে হয়।

“প্রদীপ, তুমি কি চুড়ি পরেছো?” – হঠাৎ হোসনে আরা ম্যাডামের প্রশ্নে অবাক হয়ে তাকালাম তাঁর দিকে। আমি চুড়ি পরতে যাবো কেন? তবুও নিশ্চিত হবার জন্য হাতের দিকে তাকালাম। বাম হাতে একটা ঘড়ি আছে, ডান হাতে কিছু নেই। চুড়ি পরিনি তো। আমি কিছু বলার আগেই হোসনে আরা ম্যাডাম আবার জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কি শীর্ষেন্দুর চুরি বইটা পড়েছো?”

এবার বুঝলাম। আমি কী শুনতে কী শুনেছি।

“না ম্যাডাম, পড়িনি।“

“এই নাও, পড়ো।“

আমার দিকে একটি বই এগিয়ে দিয়ে হোসনে আরা ম্যাডাম বললেন, “বইটি তোমার জন্য কিনেছিলাম অনেকদিন আগে। পাপ্পুর রেজাল্টের পর। তোমাদের দোয়ায় ছেলে ভালো রেজাল্ট করেছে।“

“থ্যাংক ইউ ম্যাডাম। পাপ্পু কোথায় ভর্তি হচ্ছে?”

“ল পড়বে বলছে।“

“ল পড়লে সে খুব ভালো করবে ম্যাডাম।“

>>>>>>>>>>>>>>> 

ফেব্রুয়ারির শুরু থেকে রমজান উপলক্ষে কলেজ ছুটি হয়ে গেল। রমজানের মধ্যে বিতর্কের কোয়ার্টার ফাইনালের রেকর্ডিং হলো। ঈদের পর কলেজ খুললে সুচরিত স্যারের কাছ থেকে বিস্তারিত জেনেছি – শাহীন কলেজ কোয়ার্টার ফাইনালে ভিকারুননিসা নুন স্কুলকে হারিয়ে সেমি ফাইনালে উঠে গেছে। দরিদ্র বিশ্বে শিশুশ্রমের অধিকার দেয়ার পক্ষে বলে জিতে আসাটা মোটেই সহজ ছিল না। আমাদের বিতার্কিকরা ধরতে গেলে অসাধ্য সাধন করেছে। তাদের পেছনে রিফাৎ আরা ম্যাডাম, নাসরীন বানু ম্যাডাম, আর সুচরিত স্যার যেভাবে শ্রম দিয়েছেন তার তুলনা হয় না। বিতর্কের সভাপতি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আহাদুজ্জামান মোহাম্মদ আলী। বিতর্কের ফলাফলের পর ভিকারুননিসা নুন স্কুলের ছাত্রীরা সভাপতিকে ঘিরে ধরে প্রশ্ন করেছিল – এটা কীভাবে সম্ভব? উত্তরে তিনি বলেছিলেন, বিতর্কে তো প্রস্তাব বাস্তবায়িত হচ্ছে না, প্রস্তাবের পক্ষে কিংবা বিপক্ষে কতটা জোরালো যুক্তি দেয়া হয়েছে, যুক্তি খন্ডন করা হয়েছে তা বিবেচনা করা হয়েছে। সেই বিচারে শাহীন কলেজ বেশি ভালো করেছে, তাই জিতেছে।

বিতর্কে জেতা উপলক্ষে শুনেছি কলেজে একটি টেলিভিশন কেনা হচ্ছে – চব্বিশ ইঞ্চি রঙিন।

>>>>>>>>>>>>>>>>>>> 

টিফিন আওয়ারে সাঈদ স্যার বললেন, “আমাদের জামান ভাইয়ের গুনাহ্‌ মাফ হয়ে গেছে।“

কলেজে যুক্তিবিদ্যা বিষয়ের প্রথম শিক্ষক নিযুক্ত হয়েছেন জামান সাহেব। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন জামান সাহেব। বেশ লম্বা সুদর্শন মিতভাষী ভদ্রলোক। যুক্তিবিদ্যার মানুষ হলেও কোন কিছুতেই তেমন কোন যুক্তি দিতে দেখা যায়নি তাঁকে। আগে নাসির স্যার যে চেয়ারে বসতেন – জামান সাহেব সেই চেয়ারেই বসেন। টিচার্স রুমের আলোচনায় তিনি মুখ টিপে হাসেন – কিন্তু অংশ নেন না। যুক্তিবিদ্যার শিক্ষক না হয়ে মনোবিজ্ঞানের শিক্ষক হলে তাঁকে আরো বেশি মানাতো। সাঈদ স্যারের কথা শুনে জামান সাহেব মুখ টিপে হাসছেন।

সাঈদ স্যারের ভাষায় গুনাহ মাফ হয়ে যাবার অর্থ হচ্ছে – জামান সাহেব শাহীন কলেজ থেকে চলে যাচ্ছেন। জিজ্ঞেস করলাম, “এত তাড়াতাড়ি চলে যাচ্ছেন?”

“তিনি তো আর তোমার মতো পাপী নন। হাহাহা। ঢাকায় চাকরি হয়ে গেছে তার।“ সাঈদ স্যার হাসতে হাসতে বললেন।

“একটা কথা সম্ভবত আপনারা কেউ জানেন না। এতদিন বলা হয়নি কাউকে। এখন তিনি চলে যাচ্ছেন। এখন বলা যায়। তিনি আমাদের প্রিন্সিপাল স্যারের ভাই।“

আমরা সবাই অবাক হয়ে গেলাম। প্রিন্সিপাল স্যারের সাথে কোন মিল নেই জামান সাহেবের। অঞ্জন স্যারের দিকে তাকিয়ে মনে হলো – তিনি জানতেন এই তথ্য। কলেজের সব খবর তিনি কীভাবে পান এটাও একটা রহস্য।

পরের দিনই প্রিন্সিপাল স্যারের অফিসে ঘরোয়াভাবে বিদায় দেয়া হলো জামান স্যারকে।

কিছুদিন পর যুক্তিবিদ্যার শিক্ষক হিসেবে যোগ দিলেন তৃপ্তি বড়ুয়া ম্যাডাম।।

মাত্র কিছুদিনের ব্যবধানে অনেকেই কলেজ ছাড়ছেন। জীববিজ্ঞানের শাহনাজ ম্যাডাম পদত্যাগ করেছেন। শুনেছি অনেক ক্ষোভ থেকেই তিনি পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাঁর জায়গায় যোগ দিয়েছেন প্রাণিবিজ্ঞানের পপি বড়ুয়া।

এর কিছুদিন পর হঠাৎ জানা গেলো সুচরিত স্যার পদত্যাগ করেছেন।


পরের পর্ব >>>>>>>>>>>>>

<<<<<<<<<<<আগের পর্ব

No comments:

Post a Comment

Latest Post

Memories of My Father - Part 4

  This is my first photo taken with my father. At that time, I had just moved up to ninth grade, my sister was studying for her honors, and ...

Popular Posts