Tuesday 23 June 2020

মেঘনাদ সাহা - পর্ব ২৭



মেঘনাদ সাহা: স্বামী ও পিতা

 

বিজ্ঞানী, অধ্যাপক, সংগঠক, বিপ্লবী, সাংসদ পরিচয়ের তুলনায় পারিবারিক মেঘনাদ সাহা অনেকটাই আড়ালে রয়ে গেছেন। তাঁর জীবন ও কর্ম সম্পর্কে প্রকাশিত বইগুলোতে তাঁর পারিবারিক জীবন সম্পর্কে তেমন কোন তথ্য পাওয়া যায় না। ১৯৯৯ সালে প্রকাশিত মেঘনাদ সাহার তৃতীয় কন্যা চিত্রা রায়ের লেখা থেকে অধ্যাপক সাহার কিছুটা ঘরোয়া পরিচয় পাওয়া যায়।[1]

          ১৯১৮ সালে বিক্রমপুরের রাধারাণীর সাথে বিয়ে হয় মেঘনাদের। মেঘনাদের বয়স তখন ২৫, আর রাধারাণীর মাত্র ১৪। মেঘনাদ তখন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকচারার, ডিএসসির থিসিস জমা দিয়েছেন। আর রাধারাণীর পড়াশোনা ক্লাস সিক্স পর্যন্ত। ধনী বাবার আদর যত্নে মানুষ হওয়া কিশোরী রাধারাণী বিদ্বান স্বামীর ঘর করতে এসে স্বামীর মতকেই নিজের মত বলে মেনে নিয়েছেন প্রথম থেকেই।

          বিয়ের আগে রাধারাণীকে আনুষ্ঠানিকভাবে দেখতে গিয়েছিলেন মেঘনাদ, প্রচলিত নিয়মে পাত্রী দেখা যাকে বলে। কিশোরী রাধারাণীকে যুবক মেঘনাদ প্রশ্ন করেছিলেন বঙ্কিম চন্দ্রের উপন্যাস থেকে। সেই সময় মেঘনাদ বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাস পড়েছেন। ইংরেজি ক্ল্যাসিক সাহিত্য পড়েছেন। কালিদাসের মেঘদূত পড়েছেন মূল সংস্কৃতে। জার্মান ভাষা শিখেছিলেন বলে জার্মান সাহিত্যও পড়েছিলেন প্রচুর। তাঁর মেধা ও মননের সাথে তাল মেলানোর মতো পড়াশোনা রাধারাণীর ছিল না। কিন্তু তিনি সারাজীবন ছিলেন স্বামী মেঘনাদের সব কথার নীরব শ্রোতা এবং অকুন্ঠ সমর্থক।

          বিয়ের এক বছর পরেই ১৯১৯ সালে মেঘনাদ স্ত্রীকে দেশে রেখে ইওরোপে চলে যান শিক্ষাবৃত্তি নিয়ে। ফিরলেন দুই বছর পর ১৯২১ সালে। রাধারানী তখন ১৭তে পা দিয়েছেন। তাঁদের সত্যিকারের সংসার জীবন শুরু হয়েছে তারপর থেকে। ১৯২২ সালের ৩১ আগস্ট প্রথম সন্তানের বাবা-মা হলেন মেঘনাদ ও রাধারাণী। প্রথম সন্তানের নাম রাখা হলো অজিত কুমার সাহা। ছেলে অজিতকে একেবারে নিজের মতো করে গড়ে তুলেছেন মেঘনাদ সাহা।

          কলকাতায় অজিতের জন্মের পর ১৯২৩ সালে মেঘনাদ সাহা এলাহাবাদ ইউনিভার্সিটিতে যোগ দিয়ে এলাহাবাদে থেকেছেন ১৫ বছর। এলাহাবাদে তাঁদের আরো দুই ছেলে এবং চার মেয়ের জন্ম হয়েছে। সব ছেলেমেয়েকেই লেখাপড়া শিখিয়ে উচ্চশিক্ষিত করে গড়ে তুলতে পেরেছেন রাধারাণী ও মেঘনাদ।

          তবে প্রথম সন্তান অজিতের প্রতি মেঘনাদ সাহার ছিল সবচেয়ে বেশি টান। অজিতের ভেতর তিনি নিজেকে পুনর্নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন এবং অনেকটাই সফল হয়েছিলেন। এলাহাবাদ ইউনাইটেড প্রভিন্স থেকে ১৯৩৫ সালে মাত্র ১২ বছর বয়সে ম্যাট্রিকুলেশান পাস করেছিলেন অজিত। তারপর ১৯৩৬ সালে ইওরোপে যাওয়ার সময় অজিতকে সাথে নিয়ে গিয়েছিলেন মেঘনাদ। সুইজারল্যান্ডের একটা বোর্ডিং স্কুলে আট মাস ছিল অজিত। বিদেশের সংস্কৃতি ও ভাষার সাথে এভাবেই পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন ছেলের। যাওয়ার পথে অনেক ইতিহাসের সাক্ষী অনেক প্রাচীন নিদর্শন দেখিয়েছেন।

 

মেঘনাদ সাহার বড় ছেলে প্রফেসর অজিত কুমার সাহা (১৯২২ - ১৯৯১)


১৯৩৮ সালে অজিত এলাহাবাদ থেকে  উচ্চমাধ্যমিক পাস করার পর সবাইকে নিয়ে কলকাতায় চলে আসেন। ১৯৪১ সালে কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে গণিতে অনার্স নিয়ে বিএসসি এবং ১৯৪২ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিজ্ঞানে এমএসসি পাস করেন অজিত। নিজের হাতে ছেলেকে গবেষণা শিখিয়েছেন প্রফেসর সাহা। তাঁর তত্ত্বাবধানে নিউক্লিয়ার স্পেকট্রোস্কোপির উপর গবেষণা করে ডিএসসি ডিগ্রি লাভ করেন ১৯৪৬ সালে। অজিতের বয়স তখন মাত্র ২৪ বছর। বাবার মতোই প্রেমচাঁদ রায়চাঁদ বৃত্তি নিয়ে ইংল্যান্ডে যান অজিত। সেখান থেকে ফিরে এসে ১৯৫১ সালে যোগ দেন ইন্সটিটিউট অব নিউক্লিয়ার ফিজিক্সে। ১৯৫৬ সালে সেখানকার প্রফেসর হন। সেই বছর প্রফেসর সাহার মৃত্যু হলে ইন্সটিটিউটের নাম হয় 'সাহা ইন্সটিটিউট অব নিউক্লিয়ার ফিজিক্স'। ১৯৮০ সালে ইন্সটিটিউটের ডিরেক্টর হয়েছিলেন অজিত সাহা।

          মেঘনাদ ও রাধারাণীর দ্বিতীয় সন্তান রণজিৎ সাহার জন্ম ১৯২৪ সালে। রণজিৎ ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হয়েছিলেন। কাজ করেছেন টাটা হাইড্রোইলেকট্রিক্সে।

          তৃতীয় সন্তান ঊষারাণীর জন্ম ১৯২৬ সালে। পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করেছেন। ১৯ বছর বয়সে বিয়ে হয়ে যায়। বিয়ের পর এমএসসি পাস করে। কিন্তু গৃহবধূ হিসেবেই জীবন কেটে যায় তার।

          চতুর্থ সন্তান কৃষ্ণার জন্ম ১৯২৯ সালে। তুখোড় ছাত্রী ছিলেন কৃষ্ণা। ডাক্তারি পড়ার সময় বিয়ে হয়ে যায় ২০ বছর বয়সে। বিয়ের পর এমবিবিএস পাস করেন।

          পঞ্চম সন্তান চিত্রার জন্ম ১৯৩১ সালে। ইংরেজি সাহিত্যে এম এ। তারপর পিএইচডি করে সরকারি কলেজের অধ্যাপক।

          ষষ্ঠ সন্তান প্রসেনজিৎ-এর জন্ম ১৯৩৪ সালে। ভূতত্ত্ববিদ্যায় পিএইচডি করেছেন। সেন্ট্রাল গ্লাস অ্যান্ড সিরামিক রিসার্চ ইন্সটিটিউট এর ডেপুটি ডিরেক্টর ছিলেন।

          সপ্তম এবং শেষ সন্তান সঙ্ঘমিত্রার জন্ম ১৯৪৫ সালে। বাবার মৃত্যুর সময় বয়স ছিল মাত্র ১১ বছর। ইতিহাস নিয়ে পড়াশোনা করেছেন। দিল্লির একটি কলেজে ইতিহাসের অধ্যাপক।

          এলাহাবাদে একটি তিনতলা বড় বাড়ী তৈরি করিয়েছিলেন মেঘনাদ। এই বাড়িতে তিনটি অংশ ছিল। এক অংশে নিজের ছেলেমেয়েদের সাথে তিনি থাকতেন। অন্য অংশটা ছিল আত্মীয়স্বজন এবং অতিথিদের জন্য। ছোটবেলায় যা কষ্ট করেছিলেন তা তিনি পরে কৃতজ্ঞতার সাথে শোধ করতে চেয়েছেন সবাইকে সাহায্য করে। চাকরির খোঁজে আশ্রয়ের খোঁজে যখন যে আসতেন মেঘনাদের বাড়ির দরজা তাদের জন্য সবসময় খোলা থাকতো। কেউ কেউ ওখানে থেকে চাকরিও করতো। আরেকটি অংশে থাকতো রিসার্চ স্টুডেন্টরা। যাদের হোস্টেলে থাকার অসুবিধা ছিল তারা এই বাড়িতেই চলে আসতো। রাধারাণী এসব ব্যাপারে কখনোই স্বামীকে বাধা দেননি। তিনি হাসিমুখে সবার দেখাশোনা করতেন।

          ছেলেমেয়েদের সাথে খুব একটা কথাবার্তা বলতেন না মেঘনাদ সাহা। একটা দূরত্ব বজায় রাখতেন। বেশিরভাগ সময় যদি কিছু বলার থাকতো তিনি স্ত্রীকে বলতেন। ছেলেমেয়েরা তাদের মায়ের কাছ থেকে শুনতো যা শোনার। ছেলেমেয়েদের কখনও চিঠিও লেখেননি। যখন দেশের বাইরে ছিলেন - চিঠি যা লিখেছেন স্ত্রীকেই লিখেছেন। প্রিয় ছাত্রদের লিখেছেন কয়েকটা।

          সময় পেলেই ছেলেমেয়েদের গম্ভীর উপদেশ দিতেন। ছেলেমেয়েদের ব্যায়াম করতে বলতেন। এলাহাবাদে থাকতে কঠোর রুটিন মেনে চলতেন। কলকাতায় আসার পর সেই রুটিন কিছুটা সহজ হয়েছিল। কলকাতায় এসে ছেলেমেয়েদের নিয়ে মাঝে মাঝে পার্কে যেতেন। ছেলেমেয়েরা খেলতো। তিনি স্ত্রীর সাথে পার্কে হাঁটতেন কিছু সময়।

          এলাহাবাদে গঙ্গা যমুনার সঙ্গমস্থলে প্রয়াগ। সেখানে মেঘনাদ যেতেন ছেলেমেয়ে ও স্ত্রীকে সাথে নিয়ে। তিনি নাস্তিক ছিলেন। পূণ্য করার উদ্দেশ্যে তিনি যেতেন না। কিন্তু নদীতে স্নান করতে খুব পছন্দ করতেন তিনি। প্রতিবছর মাঘমেলা ও কুম্ভমেলার সময় এলাহাবাদের বাড়িতে প্রচুর আত্মীয় স্বজন আসতেন। মেঘনাদের বাড়ির দরজা আত্মীয়স্বজনদের জন্য সবসময় খোলা থাকতো। আর রাধারাণী হাসিমুখে স্বামীর আদেশ পালন করতেন। অতিথিসেবা করতেন। আত্মীয়স্বজনদের সাথে ছেলেমেয়েরাও প্রয়াগে যেতো। কিন্তু বাড়িতে কোন ধর্মচর্চা ছিল না বললেই চলে।

          মেঘনাদের বাড়িতে কোন ঠাকুরঘর ছিল না। ছেলেমেয়েরাও নিজেদের ইচ্ছামত ধর্ম বেছে নেয়ার বা না নেয়ার স্বাধীনতা পেয়ে বড় হয়েছে। রাধারাণী ছিলেন ধর্মভীরু। অন্যান্য গৃহস্থ বধূর মতো তারও একটা ঠাকুরঘরের ইচ্ছা থাকলেও কখনো স্বামীর ইচ্ছের বিরুদ্ধে যাননি। নিজের মনে ঘরের এক কোণে বসে প্রার্থনা করতেন তিনি।

          সাত সন্তানের মধ্যে মেঘনাদ প্রথম ছেলে অজিতের পড়াশোনার ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি উৎসাহ ও যত্ন নিয়েছেন। বাকিরা অনেকটা নিজে নিজেই বড় হয়ে গেছে। মেঘনাদ মাঝে মাঝে ভুলেও যেতেন কে কোন ক্লাসে পড়ে। কিন্তু মাঝে মাঝে তিনি ছেলেমেয়েদের কাছে ডেকে বসাতেনও। তাদের রবীন্দ্রনাথের কবিতা পড়তে বলতেন বা শেক্‌সপিয়ারের নাটকের অংশবিশেষ। তবে সিনেমা বা সংগীতের প্রতি কোন আকর্ষণ ছিল না মেঘনাদের। সিনেমা দেখাকে সময় নষ্ট বলে মনে করতেন তিনি। জীবনে মাত্র দু'বার সঙ্গীতের আসরে গিয়েছিলেন। একবার ১৯৩৮ সালে এলাহাবাদে দীলিপ রায়ের গান শুনতে গিয়েছিলেন। অন্যবার ১৯৫২ সালে রাষ্ট্রপতি ভবনের সরকারি অনুষ্ঠানে বাধ্য হয়ে গান শুনতে হয়েছিল।

          কষ্ট করে যারা বড় হন, সেই কষ্টের দিনগুলিকে তাঁরা গর্বের সাথে স্মরণ করেন। মেঘনাদও করতেন। ছেলেমেয়েরা আলসেমি করছে দেখলে তিনি তাঁর নিজের কষ্টের কথা বলতেন কীভাবে কত কষ্ট করে বড় হয়েছেন।

 

কার্নেগি ট্রাস্ট ফেলোশিপ পেয়ে ইওরোপ ও আমেরিকা সফরে যাওয়ার সময় এলাহাবাদ রেলওয়ে স্টেশনে। রাধারাণী, মেঘনাদ সাহার কোলে ছোট ছেলে প্রসেনজিৎ, ফুলের মালা গলায় অজিত (তাকেও সাথে নিয়ে গিয়েছিলেন) এবং তার পাশে কৃষ্ণা।


মেঘনাদ প্রায় সময় বাইরে থাকতেন। দেশে বিদেশে যেতে হতো তাকে অনেক কাজে। ১৯৩৬ সালে আমেরিকা যাবার সময় অজিতকে সাথে নিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু অন্য কোন ছেলে-মেয়েকে সাথে করে দেশের বাইরে কোথাও নিয়ে যাননি। স্ত্রীকেও নিয়ে যাননি একবারও। দেশের বাইরে বেশি দিনের জন্য গেলে সেখান থেকে চিঠি লিখে ছেলেমেয়েদের খোঁজ খবর নিতেন মেঘনাদ। বিদেশ থেকে তাঁর স্ত্রীকে লেখা চিঠিগুলিতে তাঁর ব্যক্তিগত আবেগের কিছুটা ধরা পড়ে।

          ১৯২৭ সালে ইওরোপে যাওয়ার জাহাজে বসে এবং ইওরোপের বিভিন্ন জায়গা থেকে বেশ কিছু চিঠি লিখেছিলেন তিনি। চিঠিগুলো ছিল খুবই সংক্ষিপ্ত অথচ ভীষণ আন্তরিক। এখানে কয়েকটি চিঠি দেয়া হলো।

 

 

I. S. S. Pilsna May 13, 1927

কল্যাণীয়াসু,

            কাল বোম্বাই থেকে বেলা ১১টায় বেরিয়েছি। এডেনের দিকে যাচ্ছি। ১৬ই মে এডেন পৌঁছবার কথা।

            জাহাজখানা ছোট, বেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, যেন মেজে-ঘসে ঝকঝকে করে রেখেছে। যুদ্ধের পূর্বে ইহা অস্ট্রিয়ানদের দখলে ছিল, এখন ইতালিয়দের দখলে আসিয়াছে। জাহাজের নিম্নশ্রেণির কর্মচারিরা প্রায় সকলেই অস্ট্রিয়ান। তাহাদের মাতৃভাষা জার্মান, সুতরাং জার্মানই ভালো বোঝে, ইংরেজি কষ্টেসৃষ্টে বলিতে বা বুঝিতে পারে। আমি জার্মানেই চালাচ্ছি।

            এই দুইদিন চারদিকে শুধু নীল জল, আর কিছুই দেখা যাচ্ছে না। মাঝে মাঝে দূরে দুই-একখানা জাহাজ দেখা যায়।

 

            16th May       

আজ Gulf of Aden এ পড়িলাম। এখানে সমুদ্র একেবারে পুকুরের মত শান্ত। রাত্রি ৮টায় এডেন পৌঁছিব। এ কয়দিন শুধু জল ছাড়া আর কিছু দেখিতে পাই নাই। আজ নানারকম পাখি উড়িয়া আসিয়া জাহাজের ওপর বসিতেছে। দূরে আরবের পাহাড়গুলি চক্রবাল-রেখায় অস্পষ্ট দেখা যাইতেছে। এবার লোহিত সমুদ্রের (Red Sea) পালা আরম্ভ হইবে।

            খোকাদের দেখেশুনে রাখবে। যেন তাহারা পরস্পর বেশি মারামারি করে না। তাহাদের ছেড়ে মনটা ভাল লাগিতেছে না। আশাকরি সকলে ভাল আছে।

 

Red Sea, May 17

এডেন হইতে প্রেরিত আমার পূর্বের চিঠি বোধহয় পাইয়াছ। ১৬ই তারিখে রাত ১০টায় আমরা এডেন পৌঁছি। অনেকদূর হইতে আলোকমালা শোভিত এডেন শহর সমুদ্রের কোলে ভারী সুন্দর দেখাচ্ছিল। এডেন শহরটি পাহাড় কেটে সমুদ্রের কোলে স্থাপনা করা হইয়াছে। ইহাকে "প্রাচ্যের চাবি" বলা হয়। মরুভূমির ওপর দগ্ধ পাহাড়, কোথাও একগাছা ঘাস বা গাছপালার চিহ্ন নাই। শহরের একাংশে জল সঞ্চয়ের জায়গা। জল এখানে মহামূল্যবান জিনিস। গ্যালন হিসাবে বিক্রি হয়।       যেখানে জল ধরার চৌবাচ্চা আছে, সেই স্থান দেখিতে গেলাম। চৌবাচ্চার পাশেপাশে গাছপালা লাগানো হইয়াছে। একটি বটগাছও দেখিলাম।

            এই স্থান হইতে পরে সরকারি  বাগান দেখিতে গেলাম। যাইতে যাইতে দূরে সাদা স্তূপ দেখিতে পাইলাম। মোটরচালক বলিল যে ঐগুলি লবণের স্তূপ। সমুদ্রের জল ধরিয়া শুকাইয়া ফেলিলে লবণ পড়ে থাকে। এবং সেই লবণ স্তূপাকার করিয়া রাখা হয়, পরে জাহাজে বোঝাই হইয়া চালান হয়। ইহাই আমাদের দেশের করকচ লবণ। "নুনচিনির স্বদেশীর" সময় এই লবণই লোকে স্বদেশী লবণ বলিয়া কিনিত। পরে বাতিঘর এবং শহর দেখিয়া প্রায় চারটায় জাহাজে ফিরিলাম।

          ভোরের সময় এডেন ছাড়িলাম। আটটার সময় Straights of Babel Mandab-এর ভিতর দিয়া লোহিত সাগরে পড়িলাম। একধারে আরব, অন্যদিকে আফ্রিকা, দুইই দগ্ধ পাহাড়ময়, মধ্যস্থল দিয়া এই সঙ্কীর্ণ জলপ্রণালী, ৫/৬ মাইলের বেশি চওড়া হবে না। জলের নিচে অনেক মগ্ন পাহাড় রয়েছে, সুতরাং জাহাজ বা নৌকা চালান খুবই বিপজ্জনক। পূর্বে এইস্থানে বহু জাহাজ ও নৌকা মারা যেত, এইজন্য নাম Gate of Tears

          লোহিত সাগরের নাম 'লোহিত' হইল কেন বোঝা কঠিন, কারণ জল অতি গভীর নীল। প্রথম দিকটা খুবই সঙ্কীর্ণ, দুদিকেই পাহাড় দেখা যায়। জাহাজের সঙ্গে সঙ্গে গাঙচিল (Sea Gull) উড়িয়া আসিতেছে, এবং নাবিকেরা তাহাদিগকে ছোট ছোট পাউরুটির টুকরা ছুঁড়িয়া ফেলিতেছে। মাঝে মাঝে ছোট ছোট 'উড্ডীয়মান মৎস্য' দেখা যাইতেছে।

         

May 21, 1927 Suej Canal

আমরা এ কয়দিনে Red Sea অতিক্রম করে আজ সুয়েজের খালে পৌঁছিতেছি। লোহিত সমুদ্র পুকুরের মত শান্ত, নিস্তরঙ্গ ছিল।

 

21 Noon 

সুয়েজ শহর ক্রমেই বাড়িয়া চলিতেছে। দুধারে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন সাদা ধবধবে বাড়ি। ১৯২১ সালে যখন প্রথম দেখি, তখন ইহা অতি অপরিষ্কার, নোংরা ছিল। খালে ঢুকিতে জলের রঙ ক্রমশই পাতলা হইতে লাগিল। খালের ভিতর সবুজাভ নীল।

            আমার জাহাজে বেশ কেটে যাচ্ছে। বাসায় সকলে কেমন আছে জানাবে। খোকারা আশা করি ভাল আছে।

 

The Mediterranean Sea

May 22 - May 26

আজ আমরা ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিচ্ছি। আর দুদিন পরে ইতালির বন্দর Brindisi শহরে উপস্থিত হইব। তার পরদিন Venice, সেখানেই যাত্রা শেষ।

ভূমধ্যসাগরের জল গাঢ় নীল, আকাশ অতি পরিষ্কার।

 

May 23

আজ আমরা প্রসিদ্ধ ক্রীটদ্বীপের নিকট দিয়া যাচ্ছি। দ্বীপটি অত্যন্ত বড়, প্রায় দুইশত মাইল লম্বা। সমস্ত দিনই দূর হইতে পর্বতশ্রেণী দেখা যাচ্ছে। কতগুলি পর্বত খুব উঁচু, কারণ মাথায় বরফ দেখা গেল। সন্ধ্যার সময় আমরা দ্বীপের পশ্চিম-দক্ষিণ কোণা ঘেঁষে গেলাম। দূরে পর্বতের কোলে ছোট ছোট গ্রাম দেখা যাচ্ছিল।

            ক্রীট দ্বীপ ইতিহাসে অত্যন্ত বিখ্যাত। ইহা প্রাচীন গ্রীক সভ্যতার আদিস্থান। এইস্থানে রাজা Minos রাজত্ব করিতেন। Thesens & Ariadne-র গল্প পড়ে থাকবে। বহুকাল তুর্কীর অধীনে থেকে ইহা আবার গ্রীসের সহিত যুক্ত হচ্ছে। বিখ্যাত গ্রীক রাজনীতিক Venizclos ক্রীটের লোক।

 

24th May

আজ আমরা গ্রীসের পশ্চিমকোণা ঘেঁষে যাচ্ছি। Ionian সমুদ্রে পড়িলাম। এখানে সাতটি বড় দ্বীপ, এবং ছোট ছোট অনেক দ্বীপ আছে। প্রসিদ্ধ ইংরেজ কবি Byron তাঁহার Isles of Greece কবিতায় এই দ্বীপগুলিকে বর্ণনা করে গেছেন।

            দ্বিপ্রহরে আমরা Cephalonia এবং Ithaca নামক দুইটি দ্বীপের মধ্যবর্তী সঙ্কীর্ণ প্রণালী অতিক্রম করিলাম। এই জায়গাটা ভারী সুন্দর। দুধারে সমুদ্র হইতে প্রায় খাড়া ৩০০/৪০০ ফুট উঁচু পাহাড়ে উঠেছে, মধ্যে মাইল দুই এক প্রশান্ত সঙ্কীর্ণ জলপ্রণালী। দুইটি দ্বীপই বেশ উর্বরা মনে হইল, জাহাজ হইতেই পর্বতগাত্রে অবস্থিত ছোট ছোট গ্রাম ও শস্যক্ষেত্র দেখা যাচ্ছিল। এই স্থানে "Reverberated Echoes" অর্থাৎ পুনঃ পুনঃ প্রতিধ্বনি দেখান হইল। জাহাজ হইতে একবার Whistle দিলে তাহা দুইদিকে পর্বতগাত্রে পুনঃপ্রতিফলিত হইতে থাকে, এবং তিন চারিবার প্রতিধ্বনি শোনা যায়।

            Ithaca দ্বীপ গ্রীক পুরাণে অত্যন্ত বিখ্যাত। গ্রীসের আদিকবি Homer তাঁহার Odyssey নামক জগৎবিখ্যাত মহাকাব্যে Ithaca-র রাজা Ulysses-এর সমুদ্রভ্রমণ কাহিনী বর্ণনা করেছেন এবং তাহার স্ত্রী Penelop ১২ বছর কিরূপে স্বপুত্র Telemachusসহ শত্রু ও তাঁহার পাণিগ্রহণ প্রার্থী অপরাপর যোদ্ধাগণের চক্রান্ত ব্যর্থ করেন তাহা বর্ণনা করেছেন। কথিত আছে যে, Ulysses যখন ১৫/২০ বৎসর অনুপস্থিতির পর, ভিক্ষুকবেশে দেশে প্রত্যাবর্তন করেন, তাঁহার এক কুকুর Argus-ই তাহাকে চিনিতে পারে।

            Ithaca দ্বীপ অতিক্রম করিয়া আবার খোলা সমুদ্রে প্রবেশ করিলাম। এইস্থানে আমরা Anticyclone-এর ধাক্কায় পড়িলাম। সমুদ্র প্রায় ২০/৩০ হাত উঁচু ঢেউয়ে পূর্ণ, বাতাসও ভয়ানক, আমাদের জাহাজ ভয়ানক দোল খাইতে লাগিল।

         

25th May

আজ ভোরে Brindisi পৌঁছিলাম। Brindisi ইতালীর ইতিহাস বিখ্যাত বন্দর, রোমানদের সময় হইতে এই শহর বিখ্যাত। পূর্বে বিলাতি mail Brindisi হইয়া যাইত। দূরে সমুদ্র হইতে বন্দরের সাদা বাড়ীগুলি ছবিতে আঁকার ন্যায় দেখা যাচ্ছিল। আজ Adriatic সমুদ্র পাড়ি দিচ্ছি। এখন সমুদ্র শান্তমূর্তি ধারণ করিয়াছে।

 

26th May, 1927

The adriatic sea

আজ আমরা Venice-এর নিকটবর্তী হচ্ছি। মধ্যযুগে Venice অতি পরাক্রান্ত ও সমৃদ্ধশালী রাজ্য ছিল। পূর্বের সহিত প্রতীচ্যের সমুদয় বাণিজ্য Venice-এর ভিতর দিয়া যাইত। Cape of Good Hope অর্থাৎ উত্তমাশা অন্তরীপ ঘুরিয়া ভারতবর্ষে আসিবার পন্থা আবিষ্কারের পর হইতেই প্রাচ্যের বাণিজ্য পর্তুগিজ, ইংরেজ ও অন্যান্য পশ্চিম ইউরোপীয় জাতিদের হস্তগত হয়, এবং Venice-র অধোগতি আরম্ভ হয়।

             Venice-র সমৃদ্ধির সময় তাহার প্রতাপে সমস্ত পূর্ব-প্রতীচ্য কাঁপিত। এখানে সাধারণত এ প্রণালীতে রাজ্য শাসন হইত। শাসনকর্তাকে Duke বলিত। Merchent of Venice নিশ্চয়ই পড়িয়াছ। Duke বৎসরে একদিন সমুদ্রকে রাণী কল্পনা করিয়া তাহার সহিত পরিণীত হইতেন। ইংরেজ কবি Wordsworth Venice-র কথা লিখিয়া গিয়াছেন:

Once did she hold the gorgeous East in Thee

And was Mistress of the West!

Venice, The Eldest Child of liberty.

 

Venice May 26

আজ আমরা Venice-এ পৌঁছলাম। অনেক দূর হইতেই ভেনিসের বড় বড় বাড়ী দেখা যায়। Grand Canal-এর ভিতর দিয়া আস্তে আস্তে জাহাজ Jetty-তে প্রবেশ করিল। দুধারে দ্বীপের ওপর বড় বড় বাড়ী। Customs-এ জিনিসপত্র নামাইল। তারপর Customs Examination হইলে আমরা gondola করিয়া station-এ গেলাম। ভেনিস সমুদ্রের ওপরে কয়েকটি দ্বীপের ওপর। বাড়ীগুলি জল হইতে উঠিয়াছে। অন্য শহরে যেখানে রাস্তা, এখানে তাহার পরিবর্তে খাল। সুতরাং নৌকা দিয়া সর্বত্র যাতায়াত করিতে হয়। নৌকাগুলি এলাহাবাদের নৌকার মত।

            Venice থেকে Lausanne-এর ticket নিলাম। দ্বিতীয় শ্রেণীতে বড় ভীড়। দুধারে ইতালীর উর্বরা সমস্ত শস্যক্ষেত্র বেশ বাগানের মত দেখাচ্ছিল। Padova, Verona, Vicenja প্রভৃতি বিখ্যাত শহর পেরিয়ে রাত আটটাতে Milan পৌঁছিলাম।

         

Paris, June 1

প্যারিসে আজ তিন চার দিন আছি। আর সপ্তাহখানেক পরে London যাব।

আমার শরীর বেশ আছে। খোকাদের দেখেশুনে রাখবে। আমি খোকার[2] জন্য একটি Meccano পাঠিয়েছি। এটা খেলাচ্ছলে শিক্ষা। তোমাদের কুশল সংবাদ লিখিবে।

 

45 Fitz John's Avenue Hampstead

N. W. 3 London

15th June 1927

তোমার চিঠিতে মূরলীর[3] আরোগ্য সংবাদ জেনে নিশ্চিন্ত হইলাম। এ কয়দিন খুব দুর্ভাবনায় থাকা গেছে। খোকাদের স্কুলে পাঠাবে। বাড়িতে থাকিলে কিছু শিখিবে না। খুকি[4] আশাকরি এতদিনে কথা ভাল বলিতে শিখিয়াছে। আমি আর এক সপ্তাহ London-এ আছি। পরে Norway যাচ্ছি।

 

July 2, 1927

From Stockholm in Sweden

আমি সূর্যগ্রহণ দেখিবার জন্য নরওয়ে গিয়াছিলাম। সে যাত্রা সার্থক হয়েছে।

            আমি এখান থেকে Copenhagen হয়ে Berlin যাচ্ছি। আপাতত জুলাই মাসটা বার্লিনেই থেকে কিছু কাজ করব মনে করছি। প্রায় এক মাস ঘোরা গেল, এখন আর ভাল লাগছে না, বিশেষতঃ যখন খোকাদের কথা মনে পড়ে। এখানে বড় একলা। বার্লিনে তবু দেশী লোক দুই-একজনকে অন্তত পাব, এবং পুরানো জানাশুনা লোকও আছে।

            আমি ভাল আছি, কোন চিন্তা করিবে না। খোকাদের কথা সমস্ত চিঠিতেই লিখিবে। তাহারা স্কুলে যাচ্ছে কিনা লিখিও।

 

Berlin-July 19, 1927

গত সপ্তাহে তোমার প্রেরিত আমাদের Group Photograph পাইয়া খুব সুখী হইলাম। Photograph-খানা তেমন ভাল না হইলেও বিদেশের পক্ষে যথেষ্ট। বড় খোকার ছবি তেমন স্পষ্ট উঠে নাই।

            খোকারা আশাকরি রীতিমত স্কুলে যাচ্ছে এবং স্কুলে যাওয়াতে তাহারা বোধহয় ভাল থাকে। কলিকাতায় বর্ষাকালে জ্বর ও ডেঙ্গু বড় বেশি হয়- সাবধানে থাকবে। জল গরম করিয়া খাওয়াবে, এবং মশারী টাঙিয়ে শোয়াবে। ছোটখুকী এখন কেমন আছে?

            বার্লিনে এই ছয় বৎসর পরে এসেছি। অনেক পরিবর্তন হয়েছে। রাস্তাঘাট আগের চেয়ে বেশী পরিষ্কার, লোক-জনদের অবস্থাও ঢের ভাল। আমি এখানে মাসাবধি অন্তত আছি। পরে সুইজারল্যান্ড হয়ে ইটালী যাব। ১লা অক্টোবর জাহাজ নেওয়ার কথা, এবং ১৭ই অক্টোবর বোম্বাই পৌঁছিব। খোকার জন্য কতকগুলি stamp পাঠাইলাম। তাহার stamp-এর পুস্তকে যেন সমস্ত আঁটিয়া রাখে। এখানে এখন আপাতঃ অনেক বাঙ্গালী আছে। সুতরাং সঙ্গীর অভাব হয় নাই।

 

১৯২৭ সালে ইওরোপ যাওয়ার আগের দিন তোলা ছবি। ইতালিয়ান সরকারের আমন্ত্রণে বিজ্ঞানী ভোল্টার মৃত্যু শতবার্ষিকী উপলক্ষে কনফারেন্সে আমন্ত্রিত হয়েছিলেন অধ্যাপক মেঘনাদ সাহা। বাম থেকে - দ্বিতীয় পুত্র রনজিৎ কুমার সাহা, মেঘনাদ সাহা, প্রথম পুত্র অজিত কুমার সাহা, রাধারাণী সাহা, প্রথম কন্যা উষারাণী সাহা। (এই ছবিটি পরে বিদেশে মেঘনাদের কাছে পাঠানো হয়। তিনি চিঠিতে তার উল্লেখ করেছেন)


                     

Berlin

Magdeburger Platz 1,

bei Indo Europaische Handel-gesellschaft,

C/O B. N. Dasgupta

July 26, 1927

গত সপ্তাহে তোমার চিঠি পাইয়া বিস্তারিত অবগত হইলাম। প্রাণশঙ্করবাবু Meccano পৌঁছিয়ে দিয়েছেন জেনে সুখী হইলাম। এই জিনিসটার দাম অনেক - প্রায় ৪০ টাকা। সুতরাং এর দুটা দুজনের জন্য কিনে দেওয়া যায় না। সুতরাং মুরলী বা খুকীর জন্য কিছু দিতে পারি নাই। যাওয়ার সময়ে তাহাদের জন্য কিছু নিয়ে যাব। আপাততঃ কলিকাতা হইতে কিছু কিনে দিও।

 

 

Berlin-Halensee

bei Fran Gehrat Bolle

Aug 15, 1927

গত দুই সপ্তাহে তোমাদিগকে ভাল করিয়া চিঠি লিখিতে পারি না। তাহার কারণটা এতদিন তোমাদের কাছে লুকাইয়াছিলাম। গত ২৮শে জুলাই আমার Hernia-র জন্য অপারেশন হয়। অনেকদিন ধরিয়াই Hernia-তে কষ্ট পাইতেছিলাম, এখানে এসে ডাক্তার দেখাইলাম। ডাক্তার বলিলেন যে এখন অপারেশন না করিলে ভবিষ্যতে অনেক কষ্ট পেতে হবে। এখানে দু'তিন জন ভারতীয় ডাক্তার ছাত্রও আছেন। সকলের পরামর্শে অপারেশন করা গেল।

            অপারেশনের সময় আমাকে Chloroform করে নাই। জার্মেনীতে আজকাল এক নূতন ঔষধ আবিষ্কার হয়েছে - Local anasthesia -  তাহা কোন জায়গায় লাগাইলে সে জায়গা অবশ হইয়া যায়। সেই ঔষধ প্রয়োগ করিয়া আমার অস্ত্রোপচার করা হয়। যখন কাটে তখন আমার সম্পূর্ণ জ্ঞান ছিল। কোন কষ্ট হয় নাই। শুধু nervours fear হচ্ছিল। কাটার জন্য কোন কষ্টই হয় নাই। তারপরে হাসপাতালে প্রায় ১২ দিন থাকি। এখন সম্পূর্ণ সারিয়া গেছে এবং রীতিমত রাস্তায় বাহির হইতেছি। ডাক্তার বলিয়াছেন যে আরও দিন পনের বিশ্রাম নিতে হইবে, তাহা হইলে সম্পূর্ণ নিরাময় হইয়া যাইবেন।

            এখানে একটি বৃদ্ধা জার্মান মহিল আছেন, তাঁহার স্বামী ছিলেন অধ্যাপক। এঁরা সেবা-শুশ্রুষায় আমার স্বাস্থ্য পুনরায় লাভ করেছি - দুর্বলতা সেরে গেছে। এখানেই আরও দিন পনের থেকে ইটালী যাব, কারণ এমন যত্ন আর কোথাও পাব না। এই বৃদ্ধা ঠিক মায়েরই মত যত্ন করে।

            আমার এই অপারেশনের সময় আমার ভারতীয় বন্ধুগণ ঠিক ভাই-এর মত সেবাশুশ্রুষা করিয়াছে। শ্রীযুক্ত ধীরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্ত (ইনি ব্যবসা করেন), ডাঃ বিমল চন্দ্র গুহ, ডাঃ জ্যোতিষচন্দ্র রায়, ডাঃ সুরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য - ইহারা দুবেলা এসে আমার তত্ত্ব নিতেন। সুতরাং বিদেশে আছি বলিয়া তেমন কিছু বোধ করিতে হয় নাই।

            এই অপারেশনে প্রায় ৭০০ টাকার মত খরচ হয়েছে। সুতরাং কাহারও জন্য কিছু আনতে পারব মনে হয় না। আমাকেও ভবিষ্যতের জন্য ব্যয়-সংক্ষেপ করে চলতে হবে।

            তুমি আমার জন্য ভাবিত হইও না। খোকাদের যত্ন করে দেখেশুনে রাখবে। অবসর মত ইংরেজী লেখাপড়া করবে। নিজে চেষ্টা করে কত লোক লেখাপড়া শিখেছে। এখন ভাদ্রমাস পড়েছে, কলিকাতায় বড় ডেঙ্গুজ্বর ও পেটের অসুখ হয়। জল ফুটাইয়া খাইবে।

         

Sept 6, 1927

Berlin

কাল ইটালী যাত্রা করিতেছি। জিনিসপত্র গোছানো নিয়ে বড় ব্যস্ত তাই বেশী কিছু লিখিতে পারিলাম না। প্রায় পনর দিন যাবৎ তোমাদের চিঠিপত্র না পাইয়া বড় ব্যস্ত আছি।

 

Como, 11th September

আমি তিনচারি দিন হইল বার্লিন ছেড়ে কোমো শহরে আসিয়াছি। এ স্থান জগদ্বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক ভল্টার জন্মস্থান। ভল্টা প্রথমে বিদ্যুৎ আবিষ্কার করেন। তাঁহার শততম মৃত্যুতিথি উপলক্ষে মহা উৎসব হইতেছে। পৃথিবীর সমস্ত স্থান হইতে বিখ্যাত বৈজ্ঞানিকগণ এসে সমবেত হয়েছে। আমারও এই উপলক্ষে নিমন্ত্রণ তাহা নিশ্চয়ই জান।

 

From Rome

Sept 19, 1927

তোমার গত সপ্তাহের চিঠি পাইয়াছি। তোমার শরীর খারাপ শুনিয়া অত্যন্ত চিন্তিত আছি। শরীরের দিকে রীতিমত যত্ন করিবে।

            গত সপ্তাহে Como শহরে আমাদের সমস্ত সভার অধিবেশন হইয়াছে। Como একটি সুন্দর নীলজলপূর্ণ হ্রদের উপর, চারিদিকে পর্বতবেষ্টিত। এখানে সুইজারল্যান্ড শেষ হইয়াছে। ইতালী আরম্ভ হইয়াছে। এমন মনোরম স্থান খুব কম দেখা যায়। ১০০ বৎসর পূর্বে এই স্থানে বৈজ্ঞানিক Volta বর্তমান ছিলেন। তিনি বিদ্যুৎ (Electricity)  আবিষ্কার করেন। তাঁহার মৃত্যুতিথি উপলক্ষে বিশ্বের সমস্ত বৈজ্ঞানিকগণ সমবেত হইয়া তাঁহার আত্মার উদ্দেশ্যে শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন। বৈজ্ঞানিকগণের এতবড় সভা আর হয় নাই। পৃথিবীর যে সমস্ত বৈজ্ঞানিকের কথা শুধু কাগজে পড়িতাম তাহাদের সকলের সহিত চাক্ষুষ আলাপ-পরিচয় ও অন্তরঙ্গতা হইল। আর ইতালীয়গণ আমাদের সম্মান, সম্বর্ধনার কিছু ত্রুটি করে না। রোজই নানারকম প্রদর্শনী, চা ও সান্ধ্যভোজনে নিমন্ত্রণ, ঠিক যেন জামাইর আদরে ছিলাম।

            গতকল্য আমরা রোমে আসিয়াছি। আমাদের ভারতীয়দের মধে আমি, অধ্যাপক দেবেন্দ্রমোহন বসু ও তাঁহার স্ত্রী 'আলো ও ছায়া' প্রণয়িত্রী শ্রীযুক্তা কামিনী রায় নামক একটি বর্ষিয়সী মহিলা (কবি বলিয়া ইঁহার খ্যাতি আছে), আমরা  তিনজন এখানে আছি। এখানে আরও চারদিন ব্যাপিয়া উৎসব আছে। আগামী বৃহস্পতিবার উৎসবের পালা শেষ হইবে। এখানে সপ্তাহখানেক থাকিয়া Naples, Pompeii হইয়া Brindisi যাব। Brindisi হইতে ৩রা অক্টোবর জাহাজে উঠিব।

            আমার স্বাস্থ্য খুবই ভাল আছে। খোকাখুকীদের দেখেশুনে রাখবে।

 

১৯৩৬ সালে কার্নেগি ফেলোশিপ নিয়ে ইওরোপ ভ্রমণে যাওয়ার সময় বড় ছেলে অজিতকে সাথে নিয়ে গিয়েছিলেন মেঘনাদ সাহা। সেই সময়ে তাঁর স্ত্রীকে লেখা কয়েকটি চিঠি এখানে দেয়া হলো:

Geneva, April 3, 1936

89 Rue du Lausanne, Switzerland

আজ আমরা Munich হইতে জেনেভা পৌঁছিয়াছি। খোকা যে স্কুলে থাকিবে, তাহা দেখিতে গিয়াছিলাম। অপর পৃষ্ঠায় যে ছবি দেখিতেছ, তাহাতে দুইজন বৃদ্ধ আছেন, তন্মধ্যে একজন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। অন্যজন, যে স্কুলে খোকা থাকিবে তাহার Director Dr Paul Gaheeb.

 


 

April 4, 1936

Geneva,

89 Rue du Lausanne, Switzerland

কাল স্কুল দেখিতে গিয়াছিলাম। জায়গাটি  Geneva হইতে রেলে ১৫ মিনিটের পথ। স্কুল দেখে খুব ভালই লাগিল।। জার্মেনী, ফ্রান্স ইত্যাদি নানাদেশের ছেলে আছে, একটি ভারতীয় ছেলেও আছে। খোকাকে এখানে রেখে যাচ্ছি। এখানে অনেক ছেলে আছে। আশা করি খোকা বেশ স্ফূর্তিতেই থাকিবে।

            ডাঃ দাস[5] ও তাঁহার স্ত্রী আমাকে বলেছেন যে তাঁহারা সর্বদাই খোকার তত্ত্বাবধান করিবেন। কাজেই তোমার কোন আশঙ্কার কারণ নাই।

 

Oxford

232 Woodstock Road

April 21, 1936

আমি গতকল্য লন্ডন হইতে এখানে আসিয়াছি। London-এর গোলমাল মোটেই ভাল লাগছিল না। Oxford ছোট শহর, Allahabad-এর অর্ধেক হইবে, কোন হট্টগোল নাই। নিরিবিলি কাজ করা যায়।

            এখানে অধ্যাপকদের সাথে বিশেষ মিলামিশা হয়েছে।

 

Oxford

232 Woodstock Road

May 20, 1936 

তোমার ১১ই মে-র চিঠি পাইলাম। আমার Nobel prize পাওয়ার খবর সম্পূর্ণ ভুয়ো, কেহ গল্প রচনা করিয়াছে। এ'তে কোনরকম বিশ্বাস করিও না। তবে খবরের কাগজে একটু নাম হয়, তাহা মন্দ নয়।

            আমি আমেরিকা যাওয়ার অনুমতি পাইয়াছি। ৩০শে জুন নাগাদ আমেরিকা যাইব। এবং প্রায় আড়াই মাস সেখানে থাকিব।

         

Oxford

May 27, 1935[6] 

তোমার ১৫ তারিখের চিঠি পাইলাম। ছবিখানা বেশ হইয়াছে। বাচ্চুর[7] চেহারা চমৎকার উঠিয়াছে। আমি বাঁধাইয়া রাখিতেছি। খোকার চিঠি পাইয়াছি। মুরুলী পরীক্ষায় ভাল করিয়াছে জানিয়া সুখী হইলাম।


১৯৩৬ সালে অজিতকে নিয়ে মেঘনাদ সাহার ইওরোপে যাবার পরে তোলা ছবি।

চিত্রা, উষা, রণজিৎ, কৃষ্ণা, এবং রাধারাণীর কোলে প্রসেনজিৎ। [এই ছবিটি মেঘনাদ সাহাকে পাঠানো হয়েছিল। চিঠিতে তিনি এই ছবিটির কথা লিখেছেন।]


Harowich

June 13, 1936

আজ ডেনমার্ক যাচ্ছি। কাল রাত পাঁচটার সময় কোপেনহাগেন পৌঁছাইব। আমি ২১শে তারিখে রওনা হইয়া ২৩শে আবার লন্ডন আসিব। ১লা জুলাই Queen Mary জাহাজে আমেরিকা রওনা হইব।

 

 

June 14, 1936

Copenhagen

অদ্য কোপেনহাগেন আসিয়া পৌঁছিলাম। কোপেনহাগেন বেশ বড় শহর। লোকসংখ্যা প্রায় সাত লক্ষ। ডেনমার্কের প্রায় এক-চতুর্থাংশ লোকে রাজধানীতে থাকে। ডেনমার্ক ছোট্ট দেশ, এদের না আছে উপনিবেশ, বা খনিজ সম্পদ। আমাদের দেশের মত শুধু কৃষিকার্যের উপর নির্ভর করে। কিন্তু কৃষিকাজে এরা অসাধারণ নৈপুণ্য দেখাইয়াছে। এখানেই সমবায় প্রথার আরম্ভ এবং এখান হইতে প্রচুর পরিমাণে ডিম, মাখন, রুটি বিদেশে রওনা হয়। ডেনীশ মাখন ও ডিম ব্যতীত ইংল্যান্ডের চলে না। ইংল্যান্ডে চাষবাস প্রায় নাই বললেই চলে, প্রায় শতকরা ৯০ জন লোক শহরবাসী, ব্যবসা ও শিল্পকার্যে নিযুক্ত। সুতরাং সমস্ত খাদ্যদ্রব্যই বাহির হইতে কিনিতে হয়। ডেনমার্কই প্রধানতঃ ইওরোপ ইংল্যান্ডের খাদ্য সরবরাহ করে।

            অত্যন্ত ক্ষুদ্র দেশ হইলেও ডেনমার্কে অনেক বড়লোক জন্মেছেন। সেদিন Royal SocietySecretary Sir A. V. Hill, ইনি নিজে একজন বৈজ্ঞানিক, নোবেল প্রাইজ পাইয়াছেন[8], আমাকে বলিলেন যে - per sq. cm. ডেনমার্ক এত বড় বড় বৈজ্ঞানিকের জন্ম দিয়াছে, আর কোনও দেশে তত বৈজ্ঞানিকের আবির্ভাব হয় নাই। বর্তমানে ডেনমার্কের Niels Bohr পদার্থবিজ্ঞানে অতি বিখ্যাত গবেষক। ইংল্যান্ড, জার্মেনী, ফ্রান্স ইত্যাদি বড় বড় দেশ হইতে প্রথিতনামা বৈজ্ঞানিকগণ আলোচনা ও পরিচালনা পাওয়ার (discussion and guidance) জন্য Bohr-র নিকট আসেন।

 

Universitets Institute for Troretisk Fysik

 

Blegdamsvej 15

Kobenhavn Q

June 20, 1936

 

তোমার ৪ঠা জুনের চিঠি পাইলাম। বাড়ীর খবর সব ভাল জেনে আশ্বস্ত হইলাম। আজ লন্ডন ফিরে যাচ্ছি। এখানকার conference  শেষ হইয়াছে। ১লা জুলাই Queen Mary  জাহাজে আমেরিকা রওনা দিব।

            খোকার চিঠিগুলি পাঠাইলাম। সে খুব স্ফূর্তিতে আছে। ডাক্তার দাস ও মিসেস দাস তাহাকে বেশ যত্ন করেন এবং প্রায়ই তাহার সম্বন্ধে আমাকে চিঠি লিখে জানান। সে ক'খানা ফরাসী বই পড়েছে, এবং এখন জার্মান আরম্ভ করেছে।

            এখানে এখন বেশ গরম। প্রায় 900FLecture Room-এ বসে ঘামতে হয়।

S. S. Parkeston

June 23, 1936

অদ্য কোপেনহাগেন হইতে লন্ডন ফিরে যাচ্ছি। আজই অপরাহ্ন ৫টায় লন্ডন পৌঁছিব। সমুদ্র বেশ শান্ত, কোন কষ্ট নাই। এই জাহাজে পরিচিত দুইজন Physicist আছেন, Peerls and Oliphant. কাজেই বেশ গল্প-গুজবে সময় কেটে যাচ্ছে।

 

London, Berkeley St.

C/O Thos cook & Sons

30, 6/36

আজ আমি Queen Mary  জাহাজে আমেরিকা রওনা হচ্ছি। ৭ই জুলাই পৌঁছিব। খোকা বাড়ী যাওয়ার জন্য বায়না ধরেছিল। কাল জেনিভার সাথে Telephone-এ কথাবার্তা কহিয়া তাহাকে ঠিক করিয়াছি। এখান থেকে বেশ চমৎকার শোনা যায়।

            আজ আমি ভীষণ ব্যস্ত।

            আশা করি আগামী মেইলে বাচ্চুর আরোগ্যের খবর পাব।

 

 

July 1

Cunard White Star

R. M. S. "Queen Mary"

আজ এই জাহাজে বসে লিখছি। এ জাহাজ এক বিরাট কান্ড,  the eye has never seen anything like it - সাততলা জাহাজ, লিফ্‌টে উঠতে হয় - প্রায় ১/৪ মাইল লম্বা।

            বাচ্চু কেমন আছে জানাবে।

 

 

Harvard College Observatory

Cambridge, Massachusetts

Aug 7, 1936

তোমার ২০শে জুলাই তারিখের Air Mail চিঠি পাইলাম। বাচ্চু খানিকটা ভাল হইয়াছে জানিয়া আশ্বস্ত হইলাম। আশা করি তুমি এতদিনে এলাহাবাদ আসিয়াছ। আমি যতটা খাটিতে পারি, আমার চেয়ে ২০ বৎসর কম বয়েসের লোকে তাহার অর্ধেক পারে না। এখানে বসে পাঁচ-ছয়টা paper লিখেছি।

 

CARNEGIE INSTITUTION OF WASHINGTON

MOUNT WILSON OBSERVATORY

PASADENA, CALIFORNIA

 

Aug, 23, 1936

New York, Philadelphia

আমি ১৪ তারিখে বোস্টন ছাড়িয়া Washington - St. Louis Flag-staff - Grand Canyon   হইয়া আজ Mount Wilson-এ পৌঁছিয়াছি। এখানে ৪ দিন থাকিব। পরে Boston ফিরে যাব।

            তোমার ২রা আগস্টের চিঠি পেয়েছি। বাচ্চু কেমন আছে জানাবে। খোকার চিঠি পেয়েছি। সে ভাল আছে।

 

 

Harvard College Observatory

Cambridge, Massm U. S. A

Sept 3, 1936

আমি প্রায় সমস্ত আমেরিকা প্রদক্ষিণ করিয়া কাল এখানে ফিরে এসেছি। এখানে Harvard University-র ত্রিশতাব্দীক উৎসব আরম্ভ হইয়াছে, আজ আমার বক্তৃতা হইল। খুবই বাহবা পাইলাম। কাগজের cutting  পরে পাঠাব।

 

 

Park Central Hotel

New York

Sept 17/1936

কাল Boston-Cambridge হইতে এখানে এসেছি। এখানে যে হোটেলে আছি, তাহা একটি sky-scraper,  ৩০ তলা, আমি ২৩ তলায় প্রায় ৩০০ ফিট উপরে আছি। প্রত্যেক ঘরের সহিত Bathroom, Radio ইত্যাদি আছে।

 

Cunard White Star

R. M. S. Queen Mary

Sept 27, 1936

২৩শে সেপ্টেম্বর তারিখে আমাদের জাহাজ New York  ছাড়ে। আগামীকল্য ২৮শে বিকাল London পৌঁছিব। আমি আমেরিকা ছাড়ার পূর্বে আমেরিকার প্রবাসী ভারতীয়েরা আমাকে এক বিরাট ভোজ দিয়া অভ্যর্থনা করে। তাহাতে অনেক বিখ্যাত আমেরিকান উপস্থিত ছিলেন।

London

Imperial Hotel

Russell Square

Sept 29, 1936

I reached london yesterday. As you know, I shall leave for India from Marseilles on 7th Oct.

              I shall leave London on Oct 3 to pick up khoka from Geneva. We are sailing by the S. S. Tuscania anchor  line which is expected to reach Bombay on Oct 21st. We shall stop at Port Said and Aden to pick up mails. Prof. Sisir Kumar Mitra of the Cal. Unic. College is also sailing with us.

              I am sorry to hear that you are in bad health. Please take good care of your health and try to look plump and healthy when I come. Take good care of the children.

 

 

Imperial Airways Ltd.

Airway Terminus,

Victoria Station,

London S. W. 1

Passenger's Waiting Room

Oct 3, 1936

 

আজ আমি Aeroplane-এ Geneva যাচ্ছি। আশাকরি নিরাপদে পৌঁছিব। ২২শে অক্টোবর Bombay পৌঁছিবার কথা।

 

Geneva

Oct 5, 1936

কল্যাণীয়াসু -

I came to Geneva by aeroplane. From London I flew to Basle by a big aeroplane over England, the English Channel, France, to the Swiss border in three and half hours. The English Channel appears just like a big and wide river. France is very fine from air with wide green patches intersected by motor roads which appear like silver lines, thin streams. The cities look like a collection of play houses.

              From Basle, I came to Geneva by railway.

              Tomorrow, We leave for Marseilles where we take our boat, S. S. Tuscania. Khoka bade goodbye to his friends and teachers in the school. He looks quite nice of plump. He has grown a bit.

              I did not receive your letter this week and I am a bit anxious. The Dases have been very nice to us, and they have kept us guests for both occasions. Mrs. Das has been more than a mother to Khoka during his stay here. They are coming to India about January, and we must have them in our house.

              We hope you are all right.

Yours truly

Meghnad Saha

 

দেশের ভেতর ছেলেমেয়েদের নিয়ে কয়েকবার বেড়াতে গেছেন মেঘনাদ। ছেলেমেয়ে ও অন্যান্য আত্মীয়স্বজনসহ কাশ্মিরে গিয়ে অনেক পুরনো নিদর্শন ও মন্দির দেখে এসেছেন। দেবতায় ভক্তি না থাকলেও কৌতূহল ছিল তাঁর অনেক।

 

কাশ্মির ভ্রমণ। মার্তন্ড মন্দির। ১৯৩৮


১৯৩৮ সালে কলকাতায় চলে আসার পর সাউদার্ন অ্যাভেনিউতে বাড়ি করেন প্রফেসর সাহা। বাড়িটি ছিল রবীন্দ্র সরোবরের কাছে। সাঁতার কাটার জন্য একটি সুইমিং ক্লাবে ভর্তি হয়েছিলেন মেঘনাদ। অ্যান্ডারসন ক্লাব। ছেলেমেয়েদেরও সাঁতার শিখিয়েছিলেন তিনি।

 

কলকাতায় মেঘনাদ সাহার বাড়ি। ১২/১ কেয়াতলা লেন। পরে এর নাম হয় ১২৫ সাউদার্ন অ্যাভেনিউ। মেঘনাদ সাহার মৃত্যুর পর এই রোডের নাম হয় ডক্টর মেঘনাদ সাহা সরণি। তখন ঠিকানা হয় ১২৫ ডক্টর মেঘনাদ সাহা সরণি। ১৯৪১ থেকে ১৯৫৬ পর্যন্ত এখানেই ছিলেন অধ্যাপক সাহা।


১৯৪২ সালে যুদ্ধের জন্য জাপানী বোমার ভয়ে কলকাতা খালি করে দেয়া হয়। তখন এক বছরের জন্য রাজশাহীতে চলে গিয়েছিলেন মেঘনাদ তাঁর পরিবার নিয়ে। তখন পদ্মা নদীতে সাঁতার কাটতেন মেঘনাদ। ছেলেমেয়েদেরও সাঁতার শিখিয়েছেন সেই সময়। ছোটবেলা থেকে পানি দেখে পানিতে হেঁটে সাঁতার কেটে বড় হয়েছেন মেঘনাদ। ছোটবেলার কষ্টের কথা ছেলেমেয়েদের বলতেন তিনি।

          কোন একজন যদি ভীষণ বিদ্বান হন এবং সাফল্যের শীর্ষে পৌঁছে যান, তখন সবাই আশা করেন তাঁর ছেলেমেয়েরাও সেরকম বিদ্বান ও সফল হবে। ফলে প্রত্যাশা বেড়ে যায়। ছেলেমেয়েদের ওপর দায়িত্ব বেড়ে যায়। ফলে একটা বাড়তি চাপ নিয়ে বড় হতে হয় ছেলেমেয়েদের।  মেঘনাদের ছেলেমেয়েদের ওপরও সেই বাড়তি চাপ ছিল।

          আট বছর বয়সে চিত্রা স্কুল ম্যাগাজিনে একটি রচনা লিখেছিল। অন্য সব বাবার মতো মেঘনাদও মেয়ের মধ্যে সাহিত্য প্রতিভা দেখতে পেয়েছিলেন বা স্বপ্ন দেখেছিলেন। তারপর চিত্রার ওপর চাপ আসে আরো ভালো রচনা লেখার। এই বাড়তি চাপে স্বতস্ফূর্ততা ব্যাহত হয়।

          সোভিয়েত ইউনিয়ন ভ্রমণের সময় মেঘনাদ রাশিয়ান মেয়েদেরকে ছেলেদের পাশাপাশি কোদাল শাবল নিয়ে মাটি কোপাতে দেখেছেন, কৃষি কাজ করতে দেখেছেন। বাড়িতে এসে নিজের মেয়েদেরও তাই করতে বলতেন। কোদাল হাতে বাগানে নামিয়ে দিলেন। কিন্তু বাচ্চা মেয়েদের বিদেশের গল্প শুনতে যত উৎসাহ থাকবে, বাগানের মাটি কোপাতে কি সেই উৎসাহ থাকবে? মেঘনাদ এই ব্যাপারটা বুঝতে চাইতেন না।

          ১৯৪৬ সালে ইংল্যান্ডের সায়েন্স কংগ্রেসে গিয়েছিলেন মেঘনাদ সাহা। সেখান থেকে ফেরার পথে নিয়ে চিত্রার জন্য নিয়ে এসেছিলেন প্যাঙ্গুইন প্রকাশিত জর্জ বার্নাড শ'র নাটকের সংগ্রহ। চিত্রা খুব খুশি হয়েছিল সেই সেট পেয়ে। কিন্তু বাবা তাকে ডেকে প্রশ্ন করেন, "মেজর বারবারা কি পড়েছো?" বারবারার মতো আদর্শবান মেয়েকে মেঘনাদের ভালো লাগবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তিনি যখন বললেন, "এটার ভিত্তিতে ভারতে কী কী হচ্ছে লেখো। ধর্মের নামে যেসব প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে তাদের উদ্দেশ্য ও প্রভাব সম্পর্কে লেখো।" একজন ষোল বছরের কিশোরীর পক্ষে তা খুব একটা সহজ ছিল না। উৎসাহব্যঞ্জকও ছিল না।

          সংসারের সমস্ত দায়িত্ব পালন করতেন রাধারাণী। তাঁর ছেলেমেয়েরা কখনো তাঁকে মন খারাপ করতে দেখেনি। শুধু একবার দেখেছিল যখন ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর অনেক আত্মীয় স্বজন এসে বাড়িতে উঠেছে। সংসার চালানো খুবই কঠিন হয়ে পড়েছিল সেই সময়। রাধারাণীর উপর মেঘনাদের নির্দেশ ছিল - কোন কাজের সমালোচনা করা যাবে না। তিনি করতেনও না। সারা দিন কী কী হলো তা মেঘনাদ বলতেন স্ত্রীকে। আর স্ত্রী চুপচাপ শুনতেন। মেঘনাদ স্ত্রীর উপর নির্ভর করতেন অনেক ব্যাপারে। বাইরে যারা ভীষণ কঠিন, সেই কঠিন মানুষদেরও একটা অবলম্বন লাগে। রাধারাণী ছিলেন তাঁর অবলম্বন। রাধা তাঁর স্বামীর কৃতিত্ব ও সাফল্যে খুবই গৌরবান্বিত ছিলেন।

          মেঘনাদ তাঁর ছেলেদের বিদেশে গিয়ে উচ্চশিক্ষা নেওয়াটাকে যতটা  গুরুত্ব দিয়েছিলেন, মেয়েদের উচ্চশিক্ষাকে শুরুতে ততটা গুরুত্ব দেননি। তিনি গুরুত্ব দিয়েছিলেন মেয়েদের নির্দিষ্ট সময়ে বিয়ে দেওয়াকে। তারপর যতদূর খুশি পড়াশোনা করো কোন আপত্তি নেই। সেই হিসেবে তিনি উষা ও কৃষ্ণাকে ১৮-১৯ বছর বয়সে বিয়ে দিয়েছেন। মেয়েদের চাকরি বা পেশাও খুব একটা গুরুত্ব পায়নি তখন। নিজে গান পছন্দ করতেন না, কিন্তু মেয়েদের কিছু গান শিখিয়েছিলেন বিয়ের জন্য উপযুক্ত করার জন্য।

          কিন্তু তৃতীয় মেয়েকে যখন পড়াশোনা শেষ করার আগে বিয়ে দেয়ার চেষ্টা করলেন বাধা পেলেন নিজের মেয়ের কাছ থেকে। চিত্রা প্রতিবাদ করতে শিখে গিয়েছিলেন। চিত্রা পিএইচডি করেছেন, তারপর সরকারি কলেজের অধ্যাপনা। তারপর নিজের পছন্দে বিয়ে করেছেন। এসব করার পর বাবা খুশিই হয়েছিলেন। মেয়েদের সম্পর্কে তাঁর মতের আমূল পরিবর্তন ঘটেছিল।  

           

বড় ছেলে অজিতে ইংল্যান্ড যাত্রার আগের দিন। পেছনে দাঁড়ানো: কৃষ্ণা, রাধারাণী, অজিত। বসাঊষা, চিত্রা, মেঘনাদ সাহার কোলে ঊষার ছেলে অমিতাভ। সামনে বসা - সঙ্ঘমিত্রা ও প্রসেনজিৎ। দ্বিতীয় ছেলে রনজিৎ সাহা তখন ইংল্যান্ডে ছিলেন।



চিত্রা বাড়িতে যে বিপ্লব ঘটালো তার পথ ধরে প্রসেনজিৎও এগোলো। বড় দুই ছেলে অজিত ও রণজিৎ-কে নিজের পছন্দ করা মেয়ের সাথে বিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু ছোট ছেলে প্রসেনজিৎ পাস করার পর নিজের পছন্দের মেয়েকে বিয়ে করবে ঠিক করলো। মেঘনাদ ছেলের সিদ্ধান্ত খুশিমনেই মেনে নিয়েছিলেন। অবশ্য ১৯৫৬ সালে ছেলের বিয়ের আয়োজন করার আগেই তার মৃত্যু হয়।

            ১৯৪৯ সালে ইউনিভার্সিটি কমিশনের রিপোর্ট লেখার জন্য কমিশনের সব সদস্য তাদের পরিবার নিয়েই গিয়েছিলেন যেন পিকনিক করতে করতে রিপোর্ট লিখতে পারেন। কৃষ্ণা, চিত্রা আর প্রসেনজিৎ গিয়েছিল মেঘনাদের সাথে। বিশাল প্রাসাদে অন্য অনেকের সাথে থেকে বেশ আনন্দ পেয়েছিল সবাই। তখন বাবাকে বেশ কাছে পেয়েছিল কৃষ্ণা, চিত্রা ও প্রসেনজিৎ।

 

মেয়ে কৃষ্ণা ও চিত্রার সাথে মেঘনাদ (১৯৪৯ মে-জুন সিমলা)



১৯৫২ সালের নির্বাচনের সময় চিত্রার বয়স ছিল ২১। চিত্রা তার বাবার পোলিং এজেন্ট হয়েছিলেন। এম-পি হবার পর মেঘনাদ তাঁর পরিবারের সদস্যদের নিয়ে গিয়েছিলেন দিল্লিতে।

          অধ্যাপক সাহা সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকতেন কোন না কোন কাজ নিয়ে। যে কোন বিষয় নিয়েই অস্থির হয়ে উঠতেন। সেই তুলনায় রাধারাণী ছিলেন একেবারেই শান্ত। কখনোই কোন ব্যাপারে সিদ্ধান্ত দিতেন না তিনি। ভালো বা মন্দ কিছুই বলতেন না। তাঁর বিশ্ববিখ্যাত স্বামী পরিবারের বাইরে বিশ্বের আর কোন অফিসিয়্যাল কাজে তাঁকে নিয়ে যাননি। কোন বৈজ্ঞানিক অধিবেশনেও নয়, বিদেশেও নয়। এর জন্য রাধারাণীর কোন অভিমানও প্রকাশ পায়নি কোনদিন।



[1] Chitra Roy, Life with Meghnad Saha, http://www.lifestylemac.com/life-with-meghnad-saha.

    cited on 05/08/2011

[2] বড়ছেলে অজিতের ডাকনাম খোকা

[3] মেজ ছেলে রণজিত

[4] বড় মেয়ে ঊষা

[5] ডাঃ রজনীকান্ত দাস

[6] সাল ভুল লিখেছিলেন। এটা ১৯৩৬ হবে।

[7] ছোট ছেলে প্রসেনজিৎ

[8] ১৯২২ সালে চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন।

No comments:

Post a Comment

Latest Post

Hendrik Lorentz: Einstein's Mentor

  Speaking about Professor Hendrik Lorentz, Einstein unhesitatingly said, "He meant more to me personally than anybody else I have met ...

Popular Posts