Tuesday 23 June 2020

মেঘনাদ সাহা - পর্ব ২৪



সাংসদ মেঘনাদ সাহা 

১৯৫১ সালে স্বাধীন ভারতের প্রথম লোকসভার সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন মেঘনাদ সাহা। উত্তর-কলকাতার আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি।

          মেঘনাদ সাহার মতো বিজ্ঞানী লোকসভায় কী করছে? এই প্রশ্ন এখনো আলোচিত হচ্ছে, তখনো হয়েছে। এমনকি লোকসভাতেই লোকসভার অনেক সদস্য বলেছেন লোকসভা মেঘনাদ সাহার আসল জায়গা নয়। পার্লামেন্টে এখনো যেখানে বাজে কথার ঝুড়ি উপড়ে দেয়া হয় সেখানে সেই সময় মেঘনাদ সাহা দেখিয়েছিলেন একজন জনপ্রতিনিধিকে কীরকম লেখাপড়া করতে হয়, ভবিষ্যৎদ্রষ্টা হতে হয় এবং বুঝতে হয় কীভাবে দেশের সমৃদ্ধি আসবে।

          পৃথিবীর উন্নত দেশের সংসদে নোবেল পুরষ্কারপ্রাপ্ত বিজ্ঞানীরা সদস্য হয়েছেন, রাষ্ট্রের দিকনির্দেশনায় ভূমিকা রেখেছেন। সেখানে আমাদের তথা ভারতীয় উপমহাদেশের সংসদে মেঘনাদ সাহা ছিলেন ব্যতিক্রম।

          মেঘনাদ সাহাকে তৎকালীন তাঁর সংসদীয় সহকর্মীদের কেউই বুঝতে পারেননি। প্রায় সবাই তাঁকে ভয় পেয়েছেন এবং শেষে শত্রু  বলে মনে করেছেন। তাই সংসদে যখন বৈজ্ঞানিকভাবে বিশ্লেষণ করে তিনি কোন বিলের বিপক্ষে বলেছেন তখন সাংসদরা ব্যক্তি মেঘনাদের বিরোধিতা করেছেন। তারা সবাই একজোট হয়ে বলেছেন - মেঘনাদ সাহা ল্যাবোরেটরি ছেড়ে সংসদে এসে ভুল করেছেন, তাঁর অবিলম্বে ল্যাবেই ফিরে যাওয়া উচিত।

          জনপ্রতিনিধি হওয়ার কোন স্বপ্ন মেঘনাদের ছিল না। কিন্তু বিজ্ঞানী হিসেবে তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন স্বাধীন ভারতে বিজ্ঞানের পসার ঘটবে, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে শিল্পের বিকাশ ঘটবে, ভক্তির চেয়ে যুক্তির প্রাধান্য দেয়া হবে। পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য হিসেবে দেশের ভবিষ্যৎ রূপরেখা নিয়ে অনেক কাজ করেছিলেন প্রফেসর সাহা। কিন্তু স্বাধীনতার পর দেখলেন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু রাষ্ট্রের কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার ক্ষমতা আছে এমন কোন কমিটিতে তাঁকে রাখেননি।

          বিভিন্ন কাজের মধ্যদিয়ে প্রফেসর সাহা বুঝতে পেরেছিলেন যে জনগণের জন্য সত্যিকারের কিছু করার ক্ষমতা জনপ্রতিনিধিদেরই সবচেয়ে বেশি থাকে। এবং সেই প্রতিনিধি নির্বাচিত হয় গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে - অর্থাৎ ভোটের মাধ্যমে। কিন্তু সরাসরি নির্বাচনে দাঁড়ানোর কোন ইচ্ছা তাঁর হয়নি আগে কোনদিন। নিঃস্বার্থভাবে দেশের মানুষের জন্য কাজ করে গেছেন তিনি।

          শিল্পোন্নত ইওরোপের উন্নয়নের মডেল ছিল তাঁর কাছে আদর্শ। যৌবনে জার্মানি ছিল তাঁর স্বপ্নের দেশ। তারপর সোভিয়েত ইউনিয়ন। ১৯৪৫ সালে সোভিয়েত অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সের ২২০তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষে  অ্যাকাডেমির প্রেসিডেন্ট কোমারভের কাছ থেকে আমন্ত্রণ পেয়ে তিনি সোভিয়েত ইউনিয়ন ভ্রমণ করেন। সোভিয়েত ইউনিয়নের সমাজ ব্যবস্থা ও রাষ্ট্রনীতি দেখে মুগ্ধ হন তিনি। সোভিয়েত মডেলকেই তাঁর কাছে শ্রেষ্ঠ মডেল বলে মনে হয়। ১৯৪৭ সালে সোভিয়েত ভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি বই লিখেন মাই এক্সপেরিয়েন্স ইন সোভিয়েত রাশিয়া

          ১৯৪৭-এর স্বাধীনতার ফলে দেশভাগ হয়ে গেছে। মেঘনাদ সাহার জন্মভূমি রাতারাতি হয়ে গেছে ভিন্ন আরেকটি দেশ - পূর্ব পাকিস্তান। সেখান থেকে তাঁর আত্মীয়স্বজনসহ দলে দলে শরণার্থী সবকিছু ফেলে শুধুমাত্র প্রাণটা হাতে নিয়ে চলে এসেছে পশ্চিমবঙ্গে। হাজার হাজার শরণার্থীকে পুনর্বাসনের জন্য তিনি বেঙ্গল রিলিফ কমিটি গঠন করলেন। দিনরাত পরিশ্রম করে, লোকবল সংগ্রহ করে, অনুদান সংগ্রহ করে হাজার হাজার উদ্বাস্তু অসহায় মানুষের আশ্রয়, খাদ্য, চিকিৎসা ও শিক্ষার ব্যবস্থা করতে সহায়তা করলেন।


মুর্শিদাবাদের বহরমপুরে রিফিউজি গার্লস হোম ফাউন্ডেশানের উদ্যোগে মহারানি কাশীশ্বরী বালিকা বিদ্যালয়ের ভিত্তি স্থাপন অনুষ্ঠানে মেঘনাদ সাহা


উদ্বাস্তু মেয়েদের জন্য স্কুলের ভিত্তি-স্থাপন করছেন মেঘনাদ সাহা (৮ মে ১৯৫০)



স্বাধীনতার পর ১৯৪৭ থেকে ১৯৫১ পর্যন্ত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে যাঁরা ছিলেন তাঁদের বেশিরভাগই কংগ্রেসের নেতা। তাঁরা অন্ধভাবে গান্ধীবাদী। স্বাধীনতার আগে নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর মতো কয়েকজন নেতা ছিলেন যাঁদের চিন্তাভাবনার সাথে মেঘনাদ সাহার চিন্তা মিলতো। কিন্তু সুভাষচন্দ্র বসুর অন্তর্ধানের পর সেরকম নেতা আর বেশি নেই। পন্ডিত নেহেরু খুবই বিচক্ষণ মানুষ। গুণীর কদর করতে জানেন। কিন্তু গুণীদের মধ্যে মতবিরোধ থাকে সবচেয়ে বেশি। নেহেরু শিক্ষা, বিজ্ঞান, শিল্পোন্নয়ন ইত্যাদি বিষয়ে মেঘনাদ সাহাকে গুরুত্ব দেন। কিন্তু সাহা নিজেকে  আর নেহেরুর কাছের মানুষ বলে ভাবতে পারছেন না।

 

২৬ আগস্ট ১৯৫০। যাদবপুরে সেন্ট্রাল গ্লাস অ্যান্ড সিরামিক রিসার্চ ইন্সটিটিউট উদ্বোধন করেন পন্ডিত নেহেরু। শান্তিস্বরূপ ভাটনগরের সাথে প্রফেসর মেঘনাদ সাহাও গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রেখেছেন এই রিসার্চ ইন্সটিটিউটে।



অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাজকর্মে খুবই হতাশ ছিলেন মেঘনাদ সাহা। দেশে বৃহৎ-স্কেলের শিল্পায়নের কোন কার্যকর পদক্ষেপই নিতে পারেনি তারা স্বাধীনতার চার বছরের মধ্যে। নদী শাসন ও বন্যা নিয়ন্ত্রণেও কোন উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারেনি। শিক্ষা, চিকিৎসা কোন খাতেই তেমন কোন অগ্রগতি চোখে পড়ছে না। সাহা নিরলসভাবে প্রবন্ধ লিখে সমালোচনা করেই যাচ্ছেন।

          এ অবস্থায় প্রফেসর সাহার কাছে এলেন নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর বড়ভাই ব্যারিস্টার শরৎচন্দ্র বসু। প্রেসিডেন্সি কলেজের ছাত্র থাকাবস্থা থেকেই শরৎ বসুর সাথে পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা প্রফেসর সাহার। অন্তর্বতীকালীন সরকারের মন্ত্রীপরিষদের সদস্য ছিলেন শরৎচন্দ্র বসু। তিনি প্রফেসর সাহাকে বললেন, "দেখো, তুমি দেশের জন্য যা করতে চাও এবং যেভাবে করতে চাও তা করতে হলে তোমাকে নির্বাচনে জিতে সংসদ সদস্য হতে হবে। তখন প্ল্যানিং কমিশন, শিল্পায়ন, নদী শাসন, বন্যা নিয়ন্ত্রণ যা যা করতে চাও তার সবকিছুতেই তোমার কথা সরকার গুরুত্ব দিয়ে শুনতে বাধ্য হবে।"

          প্রফেসর সাহা ভেবে দেখলেন কথাটা সত্যি। কিন্তু কংগ্রেস পার্টি কি তাঁকে মনোনয়ন দেবে? কংগ্রেসের মূল রাজনীতি - চরকায় সুতা কাটা, খদ্দর পোশাক পরা, কুটিরশিল্প নিয়ে সন্তুষ্ট থাকা এসবে কোন বিশ্বাস নেই তাঁর।

          প্রফেসর সাহা নির্বাচন করবেন শুনে কংগ্রেসের কিছু স্থানীয় নেতা তাঁর সাথে দেখা করতে এসে সরাসরি জিজ্ঞেস করলেন, "কংগ্রেসের চরকা ও খাদি সম্পর্কে আপনার মত কি পাল্টেছে? আপনি কি এখন চরকা ও খাদির পক্ষে কথা বলতে পারবেন?"

          "অবশ্যই না।"

          "কেন?"

          "কারণ আমি বিশ্বাস করি এবং প্রমাণ করে দিতে পারি যে চরকা ও গরুর গাড়ির মত এই সব প্রাগৈতিহাসিক প্রযুক্তিকে যারা উন্নয়নের সোপান মনে করে তাদের মনমানসিকতা ভীষণ অবৈজ্ঞানিক এবং কুসংস্কারাচ্ছন্ন। তাদের হাতে দেশের ভার পড়লে তারা দেশকে অন্ধকারের দিকে টেনে নিয়ে যাবে।"

          "এই যদি আপনার মত হয়, তাহলে আপনি কখনোই কংগ্রেস পার্টির মনোনয়ন পাবেন না।"

          "চরকা আর খাদি মেনে নেয়া যদি আপনাদের শর্ত হয়, তাহলে আপনাদের পার্টির মনোনয়ন আমি চাই না। আপনাদের স্লোগানের চেয়ে আমার বিজ্ঞান আমার কাছে অনেক বেশি প্রিয়।"

          কংগ্রেস পার্টি থেকে খদ্দর পরা চরকা-কাটা বিত্তশালী এক নেতাকে মনোনয়ন দেয়া হলো উত্তর-পশ্চিম কলকাতা আসনে। আর সেই আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে দাঁড়ালেন অধ্যাপক মেঘনাদ সাহা। ১৯৫২ সালে স্বাধীন ভারতের প্রথম লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের প্রভাবশালী প্রার্থীকে বিপুল ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করে উত্তর-পশ্চিম কলকাতা আসনে লোকসভার সদস্য নির্বাচিত হলেন অধ্যাপক সাহা। কংগ্রেস বেশিরভাগ আসনে জিতে সরকার গঠন করেছে। স্বাভাবিকভাবেই প্রফেসর সাহা হয়ে গেলেন সরকারবিরোধী এমপি। ১৯৫৩ সালে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাঁর অবসর নেয়ার কথা। সে হিসেবে তিনি তাঁর অর্জিত লম্বা ছুটি নিলেন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।


লোকসভায় জয়ের পর ছেলেমেয়েদের সাথে নবনির্বাচিত এমপি মেঘনাদ সাহা। (বাম থেকে ডানে) বসাসন্তোষ বিস্কুট ফ্যাক্টরির মালিক, সংঘমিত্রা (ছোট মেয়ে), মেঘনাদ সাহা, ড শান্তিময় চ্যাটার্জি (ছাত্র)। দাঁড়ানো: ড ধর্মব্রত দাস (বড় জামাই), সংহিতা দাস (নাতনি) (কোলে), প্রসেনজিৎ (ছোট ছেলে), ড অজিত সাহা (বড় ছেলে)।



বিপুল উৎসাহে কাজে ঝাঁপিয়ে পড়লেন সাংসদ মেঘনাদ সাহা। প্রত্যক্ষ রাজনীতির কোন অভিজ্ঞতা তাঁর ছিল না। তিনি বিজ্ঞানী। এতদিন বৈজ্ঞানিক বিষয় নিয়ে গবেষণা করেছেন। এবার দেশের সমস্যা নিয়ে গভীর গবেষণা শুরু করে সংসদে উপস্থাপন করতে শুরু করলেন।

          ১৯৫২ সালের ১৩ মে শপথ গ্রহণ করার পর  থেকে ১৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৬ তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত তিন বছর নয় মাস সময়ে সংসদে যতগুলো অধিবেশন বসেছে তার সবগুলো অধিবেশনে নিয়মিত অংশগ্রহণ করেছেন তিনি। লোকসভায় সক্রিয় সদস্য হিসেবে কার্যকরী ভূমিকা রেখেছেন শিক্ষায়, শিল্প-নীতিতে, নদী ও বন্যা নিয়ন্ত্রণে এবং বিশেষ করে পারমাণবিক শক্তি সংক্রান্ত নীতিতে। সংসদে দেয়া তাঁর সবগুলো বক্তৃতা তাঁর পুঙ্খানুপুঙ্খ গবেষণার ফসল। লোকসভায় দেয়া তাঁর বক্তৃতার পূর্ণবিবরণ প্রকাশিত হয়েছে এশিয়াটিক সোসাইটি থেকে ১৯৯৩ সালে।[1]

          সেই সংসদের উচ্চকক্ষ রাজ্যসভায় কংগ্রেস মনোনীত সদস্য হয়েছিলেন সত্যেন বসু। এটা একটা অদ্ভুত যোগাযোগ - এই দুই বন্ধু একই সাথে পড়াশোনা করেছিলেন, একই সাথে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেছিলেন, এবং একই সময়ে ভারতের প্রথম সংসদের সদস্যও হয়েছিলেন।

          সংসদীয় রীতিনীতি সম্পর্কে কোন পূর্ব-অভিজ্ঞতা ছিল না মেঘনাদ সাহার। তিনি প্রচুর পড়াশোনা করে সংসদে উপস্থাপিত বিলের পক্ষে বিপক্ষে যুক্তি তৈরি করতেন এবং প্রচুর সময় নিয়ে তা বিস্তারিতভাবে সংসদে উপস্থাপন করতেন। তাই মাঝে মাঝে সংসদের স্পিকার তাঁকে থামিয়ে দিতে বাধ্য হতেন। কারণ বেঁধে দেয়া সময়ের মধ্যে বক্তব্য শেষ করতে তিনি পারতেন না। যে কোন বিষয়ের প্রতি তাঁর কোন যুক্তির কারণ ব্যাখ্যা করতেন তিনি। মাঝে মাঝে এমনও হয়েছে, যে বিল ইতোমধ্যেই পাস হয়ে গেছে সেই বিলের বিপক্ষেও তিনি সংসদে বক্তৃতা দিতে শুরু করেছেন।

          সংসদে তাঁর বক্তৃতাগুলোর প্রধান বিষয় ছিল শিক্ষা, নদী ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ, শিল্প ও বাণিজ্য, পারমাণবিক শক্তি, শরণার্থী পুনর্বাসন ইত্যাদি। মেঘনাদ সাহার নেতৃত্বে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য যে কাজ সম্পন্ন হয়েছে তার একটি হলো দিনপঞ্জিকা সংস্কার এবং অন্যটি হলো নদী সংস্কার ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ।

          ১৯৫২ সালে ভারত সরকারের সায়েন্টিফিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চ কাউন্সিলের অধীনে পরিচালিত  দিনপঞ্জিকা সংস্কার কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন অধ্যাপক সাহা। সারা ভারতে প্রায় ত্রিশ রকমের ক্যালেন্ডার প্রচলিত ছিল সেই সময়। বিভিন্ন ধর্মের, সংস্কৃতির এবং রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রতিফলন ছিল এই দিন-পঞ্জিকাগুলোতে। এগুলোকে বিচার বিশ্লেষণ করে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য প্রমিত দিন-পঞ্জিকা তৈরি করার দুরূহ কাজ সফল ভাবে সম্পাদনা করেছিলেন অধ্যাপক সাহা ও তাঁর কমিটি।

          জ্যোতির্বিজ্ঞান সংক্রান্ত অনেক গবেষণা করে প্রফেসর সাহার পঞ্জিকা সংস্কার কমিটি প্রস্তাব করেছিলেন প্রাচীন 'শকাব্দ' চালু করার জন্য। ইংরেজি সন থেকে ৭৮ বাদ দিলে শকাব্দ পাওয়া যায়। প্রস্তাব করা হয় - চৈত্র মাস হবে বছরের প্রথম মাস। চৈত্র থেকে ভাদ্র পর্যন্ত প্রতি মাস হবে ৩১ দিন, এবং বাকি মাসগুলো হবে ৩০ দিনে। ১৯৫৪ সালে জেনিভায় ইউনেস্কোর ১৮তম অধিবেশনে 'বিশ্ব পঞ্জিকা সংস্কার' এর ভারতীয় প্রস্তাব উপস্থাপন করেছিলেন মেঘনাদ সাহা।

          একেবারে ছোটবেলা থেকেই নদীভাঙন, জলাবদ্ধতা, বন্যা এসবের সাথে সংগ্রাম করে বড় হয়েছেন মেঘনাদ সাহা। ১৯২৩ সালের প্রলয়ংকরী বন্যায় সমগ্র পূর্ববঙ্গের মানুষ ভীষণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের নেতৃত্বে রিলিফ কমিটি গঠন করে ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনে সহায়তা করেছিলেন মেঘনাদ সাহা। তারপরও কয়েক বছর পর পর বন্যা হয়েছে এই অঞ্চলে। ১৯৩১ ও ১৯৩৫ সালে বন্যা হয়েছে। ১৯৪৩ সালে বন্যার পানি পুরো কলকাতাকে বাকি দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছিল। প্রফেসর সাহা বন্যার কারণ ও প্রতিকার সম্পর্কে অনেকগুলো প্রবন্ধ লিখে সরকারকে সচেতন করেছিলেন সেই সময়। সরকার  সেই বছর দামোদর ভ্যালি তদন্ত কমিটি গঠন করে। সেই তদন্ত কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন বর্ধমানের মহারাজা। আর প্রফেসর সাহা ছিলেন কমিটির অন্যতম সদস্য। তিনি অনেক গবেষণা করে প্রস্তাব করেন যে আমেরিকার টেনেসি নদী নিয়ন্ত্রণের জন্য টেনেসি ভ্যালি অথরিটির অনুরূপ দামোদর ভ্যালি কর্পোরেশন গঠন করা দরকার। ১৯৪৮ সালের মার্চ মাসে দামোদর ভ্যালি কর্পোরেশান গঠিত হয়। প্রফেসর সাহা স্থায়ীভাবে বন্যা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার অগ্রগতির জন্য নদী গবেষণা কেন্দ্র গড়ে তোলার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেছিলেন।

          সাংসদ হিসেবে প্রতিটি মুহূর্ত দেশের কাজে ব্যস্ত ছিলেন মেঘনাদ সাহা। সংসদীয় সফরে তিনি বিদেশে গিয়েছেন আবার ছুটে বেড়িয়েছেন দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। বিরোধী দলীয় সদস্য হিসেবে ক্ষমতাসীনরা যা করতে পারেন তা করার ক্ষমতা তাঁর ছিল না বটে, কিন্তু সরকারের যে কোন ভুল সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন সবসময় উচ্চকন্ঠ। সরকারের যেকোন ভুল-সিদ্ধান্তের কঠোর সমালোচনা করে সায়েন্স এন্ড কালচারে সাহার প্রবন্ধ অব্যাহত ভাবে প্রকাশিত হতে থাকলো।

 

লন্ডনে সংসদীয় দলের সাথে মেঘনাদ সাহা এমপি (১৯৫৪)


১৯৫৪ সালে প্রেসিডেন্ট রাজেন্দ্র প্রসাদ এর সাথে মেঘনাদ সাহা ও এম পি উষানাথ চ্যাটার্জি



সোভিয়েত ইউনিয়নের বিখ্যাত বিজ্ঞানী কাপিৎজা এবং সোভিয়েত স্পেস সায়েন্টিস্ট ডক্টর আনা ম্যাসেভিচের সাথে মেঘনাদ সাহা (মস্কো, জুলাই ১৯৫৫)


আয়ারল্যান্ডের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইয়ামন ডি ভ্যালেরার সাথে মেঘনাদ সাহা (ডাবলিন, আগস্ট ১৯৫৫)




বাংলা ও বিহার সংযুক্তির প্রতিবাদে কলকাতার ময়দানে বক্তৃতা করছেন মেঘনাদ সাহা (১৯৫৫)


কলকাতার  সিনেট হলে বাংলা ও বিহার সংযুক্তির প্রস্তাব প্রত্যাহার করার দাবির পক্ষে বক্তৃতা করছেন মেঘনাদ সাহা এমপি (জানুয়ারি ১৯৫৬)



১০১ লোদি রোড, দিল্লিতে সাহার বাসভবন - এম পি হোস্টেল। এখানেই ছিলেন তিনি ১৯৫৩ সাল থেকে ১৯৫৬ সালে মৃত্যুর আগের দিন পর্যন্ত




[1] Santimay Chatterjee and Jyotirmoy Gupta (Compiled and Edited by), Meghnad Saha in Parliament, The Asiatic Society, Calcutta, 1993.

No comments:

Post a Comment

Latest Post

Memories of My Father - Part 4

  This is my first photo taken with my father. At that time, I had just moved up to ninth grade, my sister was studying for her honors, and ...

Popular Posts