Saturday 13 June 2020

মেঘনাদ সাহা - পর্ব ৩


হাই স্কুল

জুনিয়র স্কুলে এত ভালো রেজাল্ট করার পর মেঘনাদের লেখাপড়ায় আর বাধা দিলেন না মেঘনাদের বাবা জগন্নাথ সাহা। বাড়ি থেকে পঁয়তাল্লিশ কিলোমিটার দূরে ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলে ভর্তির ব্যাপারেও কোন আপত্তি করলেন না তিনি।

            ১৯০৫ সালে বারো বছর বয়সে ঢাকায় এলো মেঘনাদ। কলেজিয়েট স্কুলের হোস্টেলে থাকার ব্যবস্থা হলো। মাসিক চার টাকা সরকারি বৃত্তি ছাড়াও পূর্ব-বঙ্গ বৈশ্য সমিতি থেকে পাওয়া গেলো মাসিক দুটাকা বৃত্তি। মাত্র ছয় টাকা দিয়ে সারা মাসের থাকা-খাওয়া আর লেখাপড়ার খরচ কীভাবে চালাবে মেঘনাদ? ভেবে অস্থির হয়ে গেলেন মেঘনাদের দাদা জয়নাথ। নিজে জুটমিলে কাজ করে বেতন পান মাত্র বিশ টাকা। সেখান থেকেই মাসে পাঁচ টাকা করে ভাইয়ের জন্য পাঠাতে শুরু করলেন জয়নাথ। মাসিক এগারো টাকায় ভালোভাবেই চলে যাচ্ছিলো মেঘনাদের।

            ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলে সহপাঠীদের মধ্যে নিখিল রঞ্জন সেন[1] ও সুরেন্দ্র কুমার রায়ের[2] সাথে বেশ বন্ধুত্ব হয়ে গেলো মেঘনাদের। লেখাপড়া বেশ ভালোই চলছিল। কিন্তু হঠাৎ করে একটা বড় রকমের সমস্যায় পড়ে গেলো মেঘনাদ।

            ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন শুরু হয়েছে। লর্ড কার্জনের বাংলা ভাঙার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে নানারকম আন্দোলন চলছে দেশব্যাপী। মেঘনাদের মনে বিপ্লবের টান আছে সত্যি, কিন্তু তার চেয়েও বেশি আছে যুক্তিবোধ। পড়ালেখা ছাড়া আর কোন দিকে মন দেয়ার সময় বা ইচ্ছে কোনটাই নেই মেঘনাদের। কিন্তু তার ইচ্ছের বিরুদ্ধেও অনেক কিছু ঘটে গেলো। একদিন স্কুলে যাবার পর অনেকের সাথে মেঘনাদকেও আলাদা করে লাইনে দাঁড় করানো হলো। তাদের অপরাধ - তারা খালি পায়ে স্কুলে এসেছে। মেঘনাদের জুতো কেনার টাকা নেই। সে খালি পায়েই স্কুলে আসে প্রতিদিন। কিন্তু সেদিনটা ছিল অন্যরকম।

            বাংলার গভর্নর ব্যামফিল্ড ফুলারের আগমণ উপলক্ষে ঢাকায় ছাত্ররা প্রতিবাদ-মিছিল বের করেছে। পায়ে জুতো না-পরাটাও ছিল প্রতিবাদের অংশ। কলেজিয়েট স্কুলে খালি-পায়ের ছেলেদের ধরে শাস্তির ব্যবস্থা করা হলো। অনেকের সাথে মেঘনাদকেও স্কুল থেকে বহিস্কার করা হলো। বাতিল করা হলো তার বৃত্তি। এখন কোথায় যাবে মেঘনাদ?

            তখন ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন চলছে সারাদেশে। সরকারি  স্কুল-কলেজে যে রকম বহিস্কারের ধুম চলছে - সাথে সাথে বেসরকারি  স্কুল-কলেজেও চলছে বহিস্কৃত ছাত্রদের ভর্তির ব্যবস্থা। ঢাকার কিশোরীলাল জুবিলি স্কুলে বিনাবেতনে মেঘনাদের ভর্তির ব্যবস্থা হলো। স্কুলটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন কিশোরীলাল রায়। মহারানি ভিক্টোরিয়ার রাজত্বের রজত জয়ন্তী বা সিলভার জুবিলি উপলক্ষে তিনি স্কুলের নাম রেখেছিলেন কিশোরীলাল জুবিলি।

 

কিশোরীলাল জুবিলি স্কুল (১৯৭০ সালে তোলা ছবি)


মেঘনাদকে একটা বৃত্তিও দেওয়া হলো থাকা-খাওয়া চালানোর জন্য। কলেজিয়েট স্কুলের হোস্টেল থেকে বের হয়ে আসতে হয়েছিল। এবার আরমানিটোলায় একটি মেসে থাকার ব্যবস্থা হলো।

            স্কুলে অনেক ভালো ভালো শিক্ষকের সংস্পর্শে আসার সুযোগ হয়েছিল মেঘনাদের। প্রবোধচন্দ্র সেনগুপ্ত, গণিতের শিক্ষক সতীশ চন্দ্র মুখার্জি, সংস্কৃতের পন্ডিত রজনীকান্ত আমিন, শক্তি ঔষধালয়ের প্রতিষ্ঠাতা মথুরা মোহন চক্রবর্তী প্রমুখ। প্রবোধচন্দ্র সেনগুপ্ত পরবর্তীতে কলকাতার বেথুন কলেজের অধ্যাপক হয়েছিলেন এবং জ্যোতির্বিদ্যা ও গণিতের গবেষণায় অনেক অবদান রেখেছিলেন। মেঘনাদের মনে জ্যোতির্বিদ্যার প্রতি আগ্রহ তিনিই জাগিয়েছিলেন।

            স্কুল জীবনের শেষের দিকে ঢাকা ব্যাপ্টিস্ট মিশনের বাইবেল ক্লাসে যোগ দিলো মেঘনাদ। ব্যাপ্টিস্ট মিশন পরিচালিত দেশ-ব্যাপী বাইবেল পরীক্ষায় মেঘনাদ প্রথম স্থান অধিকার করে একশ টাকা পুরষ্কার পেলো। টাকাটার খুব দরকার ছিল মেঘনাদের। ১৯০৯ সালে সারা পূর্ব-বাংলায় প্রথম স্থান অধিকার করে এন্ট্রান্স পাশ করলো মেঘনাদ।




ঢাকা কলেজ 

এবার কলেজের পড়াশোনা শুরু হলো ঢাকা কলেজের বিজ্ঞান বিভাগে। তখন ঢাকা কলেজের প্রিন্সিপাল ছিলেন প্রফেসর আর্চবোল্ড। রসায়ন পড়াতেন প্রফেসর হরিদাস সাহা ও ডক্টর ওয়াট্‌সন। পদার্থবিজ্ঞান পড়াতেন বি এন  দাস, গণিতের অধ্যাপক ছিলেন নরেশ ঘোষ ও কে পি বসু।

          ঢাকা কলেজে পড়ার সময় মেঘনাদ সাহার প্রথম বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয় কলেজ ম্যাগাজিনে - হ্যালির ধুমকেতু সম্পর্কে। বিজ্ঞান ও গণিতের প্রতি আগ্রহ তাঁর একেবারে প্রাইমারি স্কুল থেকে। কলেজের লাইব্রেরিতে যত বই আছে পারলে তার সবই পড়ে ফেলে মেঘনাদ।

          তখন কলকাতায় অনেক কলেজে অতিরিক্ত একটা ঐচ্ছিক বিষয় নেয়া যেতো। শতকরা ৬০ ভাগের বেশি নম্বর পেলে সেই নম্বর মূল বিষয়ের নম্বরের সাথে যোগ হতো। কলকাতার বাইরের কলেজগুলোকে তখন মফস্বলের কলেজ হিসেবে গণ্য করা হতো। মফস্বলের কলেজে অতিরিক্ত ঐচ্ছিক বিষয় নেয়ার সুযোগ ছিল না। ফলে পরীক্ষার ফলাফলে মফস্বলের শিক্ষার্থীরা কলকাতার শিক্ষার্থীদের চেয়ে অনেকটাই পিছিয়ে থাকতো।

          ঢাকা কলেজে তখনো পর্যন্ত অতিরিক্ত ঐচ্ছিক বিষয় কেউ নেয়নি। মেঘনাদ অতিরিক্ত বিষয় হিসেবে জার্মান ভাষা নিয়ে প্রাইভেটে পড়তে শুরু করলো। রসায়নের প্রফেসর নগেন্দ্রনাথ সেন ভিয়েনা থেকে ডক্টরেট করে ফিরে এসেছেন সেই সময়। তিনি ভালো জার্মান জানতেন। তিনি মেঘনাদকে জার্মান ভাষা শেখালেন। উচ্চ-মাধ্যমিকে অতিরিক্ত বিষয় হিসেবে জার্মান ভাষার পরীক্ষা দিলো মেঘনাদ।

          ১৯১১ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করলেন মেঘনাদ সাহা। উচ্চ মাধ্যমিকে সমগ্র পূর্ব-বাংলায় প্রথম স্থান এবং কলকাতাসহ সমগ্র বাংলায় তৃতীয় স্থান অধিকার করলেন মেঘনাদ।

          এবার বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের পড়াশোনা। 




[1] পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত গণিতের অধ্যাপক।

[2] পরে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এর প্রফেসর ও যাদবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের সুপার।

No comments:

Post a Comment

Latest Post

Memories of My Father - Part 2

  In our childhood and even in our adulthood, there was no tradition of celebrating birthdays. We didn't even remember when anyone's...

Popular Posts