Monday, 26 October 2020

যে গ্রহে সূর্য উঠে পশ্চিম দিকে - পর্ব ৬

 


পঞ্চম অধ্যায়

গ্রহের গতি সম্পর্কিত কেপ্‌লারের সূত্র 

গ্রহগুলোকে ক্রমাগত পর্যবেক্ষণ করতে করতে জার্মান বিজ্ঞানী জোহানেস্‌ কেপলার (Johannes Kepler) সৌরজগতের গ্রহগুলোর কক্ষপথ, কক্ষপথে গ্রহের গতি, এবং মোট ঘূর্ণনকাল সম্পর্কিত তিনটি যুগান্তকারী সূত্র প্রকাশ করেন। প্রথম দুইটি সূত্র প্রকাশ করেন ১৬০৯ সালে এবং তৃতীয় সূত্রটি প্রকাশ করেন ১৬১৯ সালে। এই সূত্রগুলি প্রয়োগ করে বিজ্ঞানীরা সৌরজগতের গ্রহগুলোর অনেক দরকারি তথ্য হিসেব করে বের করেছেন। দেখা যাক কেপ্‌লারের এই তিনটি সূত্র কী কী।

 

কেপ্‌লারের প্রথম সূত্র: উপবৃত্তাকার কক্ষপথের সূত্র

(Law of Elliptic Orbits)

 

প্রত্যেক গ্রহ সূর্যকে কেন্দ্র করে সূর্যের চারপাশে উপবৃত্তাকার পথে ঘুরে।

         

আমরা জানি বৃত্তের একটি মাত্র কেন্দ্র থাকে, কিন্তু উপবৃত্তের দুটো কেন্দ্র থাকে। এই কেন্দ্র দুটোকে বলে ফোকাসবিন্দু। এই দুটো ফোকাসবিন্দুর যে কোন একটিতে সূর্যকে রেখে গ্রহগুলো সূর্যের চার পাশে উপবৃত্তাকার পথে ঘুরে। এই ফোকাসবিন্দু দুটোর মধ্যে দূরত্ব যত কম হবে উপবৃত্তটি ততই বৃত্তের মতো হয়ে যাবে। যখন এই দুটো ফোকাসবিন্দুর মধ্যবর্তী দূরত্ব শূন্য হয়ে যাবে - তখন তারা এক সাথে মিলে গিয়ে একটি বিন্দুতে পরিণত হয়ে যাবে - এবং সেই বিন্দুটা হবে বৃত্তাকার পথের কেন্দ্র। আর উপবৃত্ত তখন হয়ে পড়বে পুরোপুরি বৃত্ত। তখন উপবৃত্তের উৎকেন্দ্রিকতা (eccentricity) হয় সবচেয়ে কম (শূন্য)। আবার এই ফোকাসবিন্দু দুটোর মধ্যবর্তী দূরত্ব যত বাড়তে থাকবে উপবৃত্তটি ততই চ্যাপ্টা হতে থাকবে। তখন উপবৃত্তের উৎকেন্দ্রিকতাও বাড়তে থাকে।

 

চিত্র 5: সূর্যের চারপাশে গ্রহের উপবৃত্তাকার কক্ষপথ

 

গ্রহগুলোর মধ্যে বুধের কক্ষপথই সবচেয়ে চ্যাপ্টা। ফলে বুধের উৎকেন্দ্রিকতা সবচেয়ে বেশি। তার ফলে দেখা যায় - বুধ এক সময় সূর্যের খুব কাছে চলে আসে, আবার এক সময় সূর্য থেকে অনেক দূরে চলে যায়। গ্রহ থেকে সূর্যের সবচেয়ে কাছের বিন্দুকে ইংরেজিতে বলে পেরিহেলিয়ন (perihelion) আর বাংলায় বলে অনুসুর বিন্দু। আবার গ্রহ থেকে সূর্যের সবচেয়ে দূরের বিন্দুকে ইংরেজিতে বলে  অ্যাপহেলিয়ন (aphelion) আর বাংলায় বলে অপসুর বিন্দু।

কেপলারের দ্বিতীয় সূত্র: সমান ক্ষেত্রফলের সূত্র

(Law of Equal Areas)

সূর্য ও গ্রহের মধ্যে একটি সরল রেখা টানলে গ্রহের কক্ষপথে সেই সরলরেখাটি সমান সময়ে সমান ক্ষেত্রফল অতিক্রম করে।

নিচের চিত্র দেখো। ক্ষেত্রফল-১ = ক্ষেত্রফল-২। সেক্ষেত্রে P1 থেকে P2 পর্যন্ত যেতে যে সময় লাগে, P3  থেকে P4 পর্যন্ত যেতে একই সময় লাগবে।

 

চিত্র 6: গ্রহ সমান সময়ে সমান ক্ষেত্রফল অতিক্রম করে

 

কিন্তু P1 থেকে P2' দূরত্ব P3 থেকে P4' দূরত্বের চেয়ে বেশি। তাই P1 থেকে P2 পর্যন্ত যেতে গ্রহ যে বেগে চলবে P3  থেকে P4 পর্যন্ত যেতে তার চেয়ে অনেক আস্তে চলবে। তাই কক্ষপথে গ্রহের বেগ সব জায়গায় সমান নয়। গ্রহ যখন সূর্যের কাছাকাছি আসে তখন দ্রুত চলে, আর যখন সূর্য থেকে দূরে চলে যায় তখন আস্তে চলে।

 

কেপলারের তৃতীয় সূত্র: পর্যায় কালের সূত্র

(Law of Periods) 

যে গ্রহ সূর্যের যত কাছে থাকে কক্ষপথে সেই গ্রহ তত দ্রুত বেগে চলে। কক্ষপথে কোন গ্রহের পর্যায় কাল[1] (T)-এর বর্গফল (T2) সূর্য থেকে ঐ গ্রহের গড় দূরত্ব (R)-এর ঘনফল (R3)-এর সমানুপাতিক।




চিত্র 7: গ্রহের পর্যায়কালের বর্গ সূর্য থেকে গ্রহের গড় দূরত্বের সমানুপাতিক।

 

 

কেপলারের তৃতীয় সূত্রকে গাণিতিক ভাষায় লিখলে দেখা যায়:

 



 

এখানে মনে রাখা দরকার যে পর্যায় কালের একক হতে হবে বছর, আর গ্রহ থেকে সূর্যের গড় দূরত্বের একক হতে হবে অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ইউনিট (AU)। সূর্য থেকে পৃথিবীর দূরত্বকে এক অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ইউনিট দূরত্ব ধরা হয়। সূর্য থেকে পৃথিবীর দূরত্ব ১৫ কোটি কিলোমিটার। সুতরাং 1 AU = 150000000 km. G হলো নিউটনের মহাকর্ষ ধ্রুবক (G = 6.67408 × 10-11 m3 kg-1 s-2 )M1 এবং  M2 হচ্ছে যথাক্রমে সূর্যের ভর এবং গ্রহের ভর।

          কেপ্‌লারের সূত্র প্রয়োগ করে শুক্র গ্রহের কক্ষপথের বৈশিষ্ট্য এবং গতি বিজ্ঞানীরা হিসেব করেছেন। র‍্যাডার এবং বিশেষ টেলিস্কোপ ব্যবহার করে শুক্র গ্রহের আরো অনেকগুলো বৈশিষ্ট্য জানা গেছে। চলো দেখি সেগুলো কী কী।



[1] কক্ষপথে সূর্যের চারপাশে এক বার ঘুরে আসতে গ্রহের যে সময় লাগে তাকে  পর্যায় কাল বলে।

Sunday, 25 October 2020

যে গ্রহে সূর্য উঠে পশ্চিম দিকে - পর্ব ৫



চতুর্থ অধ্যায়

শুক্র গ্রহের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

সূর্য ও তার গ্রহগুলোর উৎপত্তি সম্পর্কে আমরা একটু আগেই আলোচনা করেছি (পৃষ্ঠা ২৫-৩৩)। গ্যালাক্সির নেবুলায় লক্ষ লক্ষ সূর্যের সাথে আমাদের সূর্যও যখন গঠিত হলো তখন তার উপাদানের কিছু অবশিষ্ট অংশ থেকে উৎপন্ন হয়েছে সূর্যের গ্রহগুলো। ভারী, কঠিন এবং বেশি ঘনত্বের গ্রহ হিসেবে সূর্যের দ্বিতীয় গ্রহ শুক্র এবং তৃতীয় গ্রহ পৃথিবী গঠিত হয়েছে। প্রায় একই সময়ে গঠিত হয়েছে বলে পৃথিবী ও শুক্র গ্রহের বয়স সমান; প্রায় ৪৬০ কোটি বছর।

          শুক্র ও পৃথিবীর আকার ও আয়তন প্রায় সমান। প্রায় একই সময়ে জন্ম এবং দুটো গ্রহকে দেখতে একই রকমের মনে হয় বলে শুক্র ও পৃথিবীকে টুইন সিস্টার্স বলা হতো। কিন্তু পৃথিবীর বিবর্তন যেভাবে হয়েছে শুক্র গ্রহের বিবর্তন হয়েছে তার চেয়ে অনেক বেশি দ্রুত গতিতে। বিজ্ঞানীরা প্রমাণ পেয়েছেন যে শুক্র গ্রহে এক সময় প্রচুর পানি ছিল। কিন্তু দ্রুতই সেই পানির সমুদ্র শুকিয়ে গেছে। পানি নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার সাথে সাথে বিবর্তনের গতি গেল বন্ধ হয়ে। পৃথিবীর মতো কোন টেকটোনিক প্লেট গঠিত হতে পারেনি শুক্র গ্রহে। জৈব বিবর্তন ঘটেনি। ফলে বায়ুমন্ডলের কার্বন-ডাই-অক্সাইড শোষণ করার মত কিছু না থাকাতে শুক্রের বায়ুমন্ডল ভর্তি হয়ে আছে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের ঘন আবরণে। কার্বন-ডাই-অক্সাইডের মেঘের কারণে গ্রহটি প্রচন্ড গরম। বাইরের গ্যাসের স্তরে আলো প্রতিফলিত হয়ে শুক্র গ্রহকে একটি উজ্জ্বল গ্রহে পরিণত করেছে।

          এই গ্রহের বাকি ইতিহাস হলো মানুষের ইতিহাস। এই গ্রহটিকে মানুষ কীভাবে দেখেছে, কীভাবে জেনেছে তার ইতিহাস। চলো দেখি গত সাড়ে তিন হাজার বছরে মানুষ ও শুক্র গ্রহের মধ্যে কী কী প্রধান ঘটনা ঘটেছে।

 

3600 বছর আগে

ব্যবিলনিয়ার[1] জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা শুক্র গ্রহের উপস্থিতি লক্ষ্য করেছিলেন বলে তাদের পুরনো রেকর্ডে দেখা যাচ্ছে।

 

3500 বছর আগে

ব্যবিলনিয়রা শুক্র গ্রহকে আকাশের অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্র হিসেবে গণ্য করতে শুরু করে।

 

2700 বছর আগে

গ্রিকরা ভোরে সূর্যোদয়ের আগে যে  শুক্র গ্রহকে দেখা যায় আর সন্ধ্যায় সূর্যাস্তের সময় যে শুক্রকে দেখা যায় তাদের আলাদা আলাদা দুটো নক্ষত্র বলে মনে করেছিল। তারা ভোরেরটার নাম দিয়েছিল ফসফরাস (phosphorus), সন্ধ্যারটার নাম দিয়েছিল হেস্পারাস (hesperus)



 

2500 বছর আগে

গ্রিক দার্শনিক ও গণিতজ্ঞ পাইথাগোরাস (Pythagoras) ধারণা দেন যে ফসফরাস ও হেস্পারাস আসলে একই বস্তু যা পৃথিবী ও সেই বস্তুর ঘূর্ণনের কারণে একবার ভোরে দেখা যায় এবং আবার সন্ধ্যায় দেখা যায়।

 

2000 বছর আগে

চীনা দার্শনিকরা শুক্র গ্রহকে নক্ষত্র মনে করে। উজ্জ্বলতার কারণে তারা এই নক্ষত্রের নাম দেয় মেটাল স্টার বা ধাতব নক্ষত্র।

 


1610

বিজ্ঞানী গ্যালিলিও তাঁর টেলিস্কোপের সাহায্যে শুক্র গ্রহের বিভিন্ন দশা পর্যবেক্ষণ করেন। চাঁদের মত শুক্র গ্রহও যে সময়ের সাথে বিভিন্ন দশা প্রাপ্ত হয়, পৃথিবীর আকাশে তার আকারের পরিবর্তন হয় গ্যালিলিও তা সর্বপ্রথম পর্যবেক্ষণ করেন এবং প্রকাশ করেন।

 

 


1627

জার্মান বিজ্ঞানী জোহানেস কেপলার সর্বপ্রথম ট্রানজিট অব ভেনাসের ধারণা দেন। এর আগে গ্যালিলিও ধারণা দিয়েছেন যে গ্রহগুলো সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘুরছে। পৃথিবী যেমন সূর্যের চারপাশে ঘুরছে, শুক্র গ্রহও সূর্যের চারপাশে ঘুরছে। এভাবে ঘুরতে ঘুরতে শুক্র গ্রহ যখন পৃথিবী ও সূর্যের সাথে এক লাইনে চলে আসে তখন তাকে ট্রানজিট অব ভেনাস বলে। তিনি হিসেব করে দেখিয়েছিলেন যে 1631 সালে শুক্র গ্রহের ট্রানজিট ঘটবে। কিন্তু তিনি হিসেব করতে ভুল করেছিলেন। তিনি বুঝতে পারেননি যে সেই ট্রানজিট ইওরোপ থেকে দেখা যাবে না।



1639

প্রথমবার শুক্র গ্রহের ট্রানজিট পর্যবেক্ষণ করা হয়। ব্রিটিশ জ্যোতির্বিজ্ঞানী জেরিমিয়া হরোক্স (Jeremiah Horrocks) সর্বপ্রথম শুক্র গ্রহের ট্রানজিট পর্যবেক্ষণ করেন। শুক্র গ্রহের ট্রানজিট একবার হবার ৮ বছর পর আবার হয়। এরপর  

আবার ট্রানজিটের জন্য অপেক্ষা করতে হয় প্রায় একশ বছরের বেশি।





1672

ইতালির জ্যোতির্বিজ্ঞানী জিওভান্নি ডোমেনিকো ক্যাসিনি (Giovanni Domenico Cassini) দাবি করেন যে তিনি শুক্র গ্রহের একটি উপগ্রহ আবিষ্কার করেছেন। পরে অবশ্য দেখা যায় যে শুক্র গ্রহের কোন উপগ্রহ নেই।

 

1961

রাশিয়ান মহাকাশযান ভেনেরা-1 (Venera-1) শুক্র গ্রহের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। কিন্তু শুক্র গ্রহে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়।

 

1962

আমেরিকার মহাকাশযান ম্যারিনার-2 শুক্র গ্রহের পাশ দিয়ে উড়ে যায় এবং সেখান থেকে শুক্র গ্রহের বেশ কিছু তথ্য সংগ্রহ করে।

 

1966-1969

রাশিয়ান মহাকাশযান ভেনেরা-3, 4, 5, & 6 শুক্রগ্রহের পাশ দিয়ে উড়ে গিয়ে শুক্র গ্রহ সম্পর্কে অনেক তথ্য পাঠায়।

 

1970

রাশিয়ান মহাকাশযান ভেনেরা-7 প্রথমবারের মত সফলভাবে শুক্র গ্রহে অবতরণ করে।

 

1975

রাশিয়ান নভোযান ভেনেরা-9 শুক্র গ্রহ থেকে সরাসরি পৃথিবীতে ছবি পাঠাতে সক্ষম হয়।

 

1978

পাইওনিয়ার ভেনাস প্রজেক্টের আওতায় আমেরিকা দুটো নভোযান পাঠায় শুক্র গ্রহে।

 

1990

আমেরিকার মহাকাশযান ম্যাগেলান (Magellan) শুক্র গ্রহের ভূমিতে জরিপ চালায় এবং শতকরা 98 ভাগ ভূমির উপরিতলে কী কী আছে তা রেকর্ড করে।

1998-99

মহাকাশযান ক্যাসিনি-হাইগেন্‌স শুক্রের পাশ দিয়ে যায় এবং শুক্র সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে।

 

2006

ইওরোপিয়ান স্পেস এজেন্সির মহাকাশযান ভেনাস এক্সপ্রেস শুক্রগ্রহে গিয়ে পৌঁছায়।

 

2010

জাপান মহাকাশ গবেষণা সংস্থার মহাকাশযান আকাৎসুকি (Akatsuki) এবং ইকারোস (Ikaros) শুক্র গ্রহের পাশ দিয়ে উড়ে যায়।

 

2015

ইওরোপিয়ান স্পেস এজেন্সির মহাকাশযান ভেনাস এক্সপ্রেসের কার্যক্রম শেষ হয়। জাপানি মহাকাশযান আকাৎসুকি শুক্র গ্রহের চারপাশে ঘুরতে শুরু করে।


দেখা যাচ্ছে শুক্র গ্রহ সম্পর্কে সব ধরনের বৈজ্ঞানিক তথ্য পাওয়ার জন্য বিজ্ঞানীরা কাজ করে যাচ্ছেন অনেক অনেক বছর ধরে। আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে স্বয়ংনিয়ন্ত্রিত মহাকাশযান এখন দূর দূরান্তের গ্রহগুলোতে পাঠানো হচ্ছে। কিন্তু বিজ্ঞানের এরকম উৎকর্ষতারও অনেক আগে বিজ্ঞানীরা মহাকাশের নক্ষত্র ও তাদের গ্রহ-উপগ্রহগুলোর গতি, কক্ষপথ, প্রতিফলিত আলোকরশ্মির ধর্ম ইত্যাদি পরীক্ষা করতে করতে গ্রহগুলোর অনেকগুলো ভৌত ধর্ম এবং মৌলিক তথ্য আবিষ্কার করেন।

          সৌরজগতের গ্রহগুলোর গতি এবং কক্ষপথ বুঝতে হলে আমাদের জানা দরকার কেপ্‌লারের সূত্রগুলো। দেখা যাক এই সূত্রগুলো কী কী।



[1] বর্তমানে ইরাক

Friday, 23 October 2020

যে গ্রহে সূর্য উঠে পশ্চিম দিকে - পর্ব ৪

 


তৃতীয় অধ্যায়

 শুক্র সম্পর্কে প্রাচীন বিশ্বাস

 

উপরের ছবিটি প্রায় দু'হাজার বছর আগে আঁকা রোমানদের দেবী ভেনাসের ছবির প্রতিকৃতি। হাজার বছর আগে মানুষের জ্ঞান ও কারিগরী দক্ষতা আজকের মত এত উন্নত ছিল না। প্রকৃতিকে পর্যবেক্ষণ করতে করতেই মানুষ আবিষ্কার করেছে প্রাকৃতিক রহস্য। যে রহস্যের কোন উত্তর মানুষের হাতে ছিল না - তখন মানুষ সেখানে কল্পনার আশ্রয় নিতো। সেই কল্পনা থেকে সৃষ্টি হয়েছে নানারকম দেব-দেবীর উপকথা এবং বিভিন্ন রকমের বিশ্বাস। যে প্রাকৃতিক শক্তিকে মানুষ জয় করতে পারতো না, কিন্তু করতে চাইতো - সেই প্রাকৃতিক শক্তির পেছনে এক বা একাধিক দেবতা আছে বলে কল্পনা করে নিতো মানুষ। সে দেবতাদের তারা নাম দিয়েছে, সেই দেবতাদের মূর্তি গড়েছে, ছবি এঁকেছে। দেবতাদের নিয়ে গল্প তৈরি করেছে এবং দেখা গেছে কিছু অলৌকিক ক্ষমতা থাকলেও বেশিরভাগ দেবতার আচরণ একেবারে মানুষের মত। মানুষের মতই দেবতাদের ক্ষুধা পায়, দেবতারা ঘুমায়, দেবতাদের ছেলেমেয়ে হয়, তাদের রাগ আছে, হিংসা আছে, ভালোবাসা আছে। দেবতারা মানুষের উপকার করে আবার ক্ষতিও করে। আকাশের গ্রহ উপগ্রহ নক্ষত্র - সবকিছুকেই দেবতা বলে মনে করেছে প্রাচীন কালের মানুষ। নিজেদের সব কাজের জন্যই মানুষ কোন না কোন দেবতার আশ্রয় নিয়েছে।

          পৃথিবীতে মানুষের উদ্ভব হবার অনেক আগেই অন্যান্য অনেক প্রাণি ও উদ্ভিদের উদ্ভব হয়েছে। মানুষের বেঁচে থাকার সব প্রাকৃতিক উপাদানই তখন পৃথিবীতে ছিল। খাবার পানি, বিশুদ্ধ বাতাস, গাছের ফল সব। কিন্তু প্রকৃতির সাথে সংগ্রাম করতে হয়েছে মানুষের। আকাশের দেখেছে উজ্জ্বল সূর্য। সেই সূর্য তাপ দেয়, আলো দেয়। সেই সূর্য এক দিক থেকে আকাশে আসে, তারপর অন্যদিক দিয়ে চলে যায়। যখন রাত আসে - অন্ধকারে মানুষ ভয় পায়। কারণ অন্যান্য প্রাণীরা অন্ধকারে আক্রমণ করে মানুষকে। সেই অন্ধকার থেকে মুক্তি দেয় সূর্য। তাই সূর্য মানুষের আদিদেবতা। পৃথিবীর সব সংস্কৃতিতেই সূর্য একটি দেবতা। রাতের বেলা চাঁদ আলো দেয়। চাঁদও দেবতা হলো। কত গল্প কাহিনির উৎপত্তি হলো চন্দ্রসূর্য সম্পর্কে। অন্যান্য তারা সম্পর্কেও। আকাশ দেখতে দেখতে খালি চোখেই মানুষ অনেক কিছু পর্যবেক্ষণ করেছে। দেখেছে কালো মেঘ সূর্যকেও ঢেকে দিতে পারে - তার মানে মেঘের যে দেবতা সে সূর্যের চেয়েও বড় - এরকম ইত্যাদি অনেক গল্প। আকাশে সূর্য ও চাঁদের পরেই উজ্জ্বলতার দিক থেকে শুক্রের স্থান। এই উজ্জ্বল বস্তুটি নিয়েও প্রাচীন মানুষের অনেক রকমের গল্প ও বিশ্বাস ছিল। খুব সংক্ষেপে দেখা যাক - কী ধরনের গল্প প্রচলিত ছিল শুক্র গ্রহ সম্পর্কে।

          অনেক ভারতীয় পন্ডিত মনে করেন শুক্র গ্রহ নাম হওয়ার কারণ হলো এর উজ্জ্বলতা। শুক্লতা থেকে শুক্র শব্দটি এসেছে। ভারতীয় উপমহাদেশের পৌরাণিক কাহিনিতে শুক্রকে দানবদের গুরু বলে বিবেচনা করা হয়। পুরাণে মানুষের জন্য যা কিছু ভালো - তার কৃতিত্ব দেয়া হয় দেবতাদের, আর মানুষের জন্য যা কিছু ক্ষতিকর - তার দায় নিতে হয় দানবদের। দেবতাদের গুরু হলেন বৃহস্পতি। পুরাণে সৌরজগতের সব গ্রহকেই এক একজন দেবতা বলে ধরে নেয়া হয়। বৃহস্পতি দেবতাদের গুরু এবং শুক্র দানবদের গুরু বলে বৃহস্পতি ও শুক্রের মধ্যে সম্পর্ক ভালো নয়। শুক্রকে দানবরা যে গুরু মানে তার মূল কারণ হচ্ছে শুক্রের মৃতসঞ্জীবনী ক্ষমতা। অর্থাৎ শুক্র নাকি মৃতকে জীবিত করে ফেলতে পারেন। কিছুদিন পরপরই দেবতা ও দানবদের মধ্যে যুদ্ধ লেগে যায়। দেবতারা দানবদের মেরে ফেললে শুক্র সেই মৃত দানবদের আবার জীবিত করে দেন। কিন্তু দেবতাদের গুরু বৃহস্পতির তো সেই ক্ষমতা নেই। তাই দেবতাদের কাছে বৃহস্পতির তো প্রেস্টিজ থাকে না। সেক্ষেত্রে বৃহস্পতি যে শুক্রকে পছন্দ করবে না তা তো স্বাভাবিক।

          শুক্র গ্রহকে সূর্যোদয়ের আগে ও সূর্যাস্তের ঠিক পরপর কিছুক্ষণ দেখা যায়। কিন্তু মাঝরাতে কখনোই দেখা যায় না পৃথিবীর আকাশে। এই ব্যাপারটা লক্ষ্য করেছে প্রাচীন কালের মানুষ। পুরাণে এর কারণ ব্যাখ্যা করা হয়েছে বেশ চমকপ্রদ গল্পের মাধ্যমে। পুরাণে শুক্রের আরেক নাম পরশুরাম। তিনি খুবই ক্ষমতাশালী ব্রাহ্মণ। তিনি প্রচন্ড গতিসম্পন্ন। ভোরে গিয়ে পূর্বাকাশে উঠেন, সন্ধ্যায় গিয়ে পশ্চিমাকাশে উঠেন। মধ্যরাতে মাঝ আকাশের স্বর্গের পার্টিতে যোগ দেন। এই স্বর্গের মালিক তিনি নিজে। কিন্তু অযোধ্যার রাজা রামচন্দ্রের উপর তার অনেক রাগ। কারণ রামচন্দ্র রাজা জনকের বাড়িতে গিয়ে হরধনু ভঙ্গ করে সীতাকে বিয়ে করে। হরধনু ভেঙে ফেলতে অনেক শক্তি লাগে। রাম সেই শক্তির পরিচয় দিয়েছেন। পরশুরাম নিজেকে রামের চেয়ে বেশি শক্তিশালী মনে করেন। উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া একটি পাওয়ারফুল ধনু পরশুরামেরও ছিল। স্বয়ং বিষ্ণু সেই ধনু দিয়েছিলেন পরশুরামের বাবার বাবাকে। পরশুরাম রামকে চ্যালেঞ্জ করেন। রাম যদি বিষ্ণুর দেয়া এই ধনু ভেঙে ফেলতে পারে - তবেই তিনি মেনে নিতে পারেন যে রামের শক্তি আছে। রাম এই চ্যালেঞ্জে অনেক রেগে গেলেন। তিনি ধনু তুলে তাতে তীর সংযোগ করে পরশুরামকে বললেন, 'ব্রাহ্মণ বলে আপনাকে আমি হত্যা করবো না। কিন্তু আপনার অহংকার ভেঙে দেবো। হয় আপনার স্বর্গ ধ্বংস করে ফেলবো, নয়তো আপনার গতি নষ্ট করে দেবো। আপনিই ঠিক করেন কোন্‌টা করবো'। পরশুরাম বললেন, 'গতি নষ্ট করে দিলে তো আমি আকাশে ছুটাছুটি করতে পারবো না। আপনি আমার স্বর্গ ধ্বংস করে দেন।' রাম তাই করলেন। মাঝ আকাশের স্বর্গ ধ্বংস হয়ে যাওয়াতে পরশুরাম তথা শুক্র গ্রহকে আর মাঝ আকাশে মাঝরাতে দেখা যায় না, কেবল ভোরে ও সন্ধ্যায় দেখা যায়। চমৎকার গল্প। কিন্তু বাস্তব কারণের সাথে এর কোন মিল নেই।

          শুক্র গ্রহের ভেনাস (venus) নামটি এসেছে রোমানদের ভালোবাসার দেবী ভেনাসের নাম থেকে। সৌরজগতের সবগুলো গ্রহের নামই এসেছে গ্রিক বা রোমান লোককাহিনি থেকে। গ্রহগুলোর মধ্যে শুধুমাত্র শুক্র গ্রহের নামই হয়েছে কোন দেবীর নামে। অন্য সবগুলো গ্রহের নামকরণ করা হয়েহে পুরুষ দেবতার নামে। সে হিসেবে সৌরজগতের গ্রহগুলোর মধ্যে শুধুমাত্র শুক্র গ্রহই নারী গ্রহ, আর সবগুলোই পুরুষ গ্রহ। কিন্তু ভারতীয় পুরাণে শুক্র গ্রহও একটি পুরুষ গ্রহ।

          গ্রিকরা সূর্য ও চাঁদের পর আকাশের সবচেয়ে উজ্জ্বল সুন্দর বস্তুটাকে তুলনা করেছিল তাদের সবচেয়ে সুন্দর দেবী আফ্রোদিতির সাথে। তাই তারা এই গ্রহটির (তখনো জানতো না যে এটা একটি গ্রহ) নাম দিয়েছিল আফ্রোদিতি। আফ্রোদিতির জন্ম সম্পর্কে অনেক মজার গল্প আছে। অনেকে বলে থাকেন আফ্রোদিতির জন্ম হয়েছিল ইউরেনাসের শরীরের একটি অংশ থেকে। আবার অনেকে বলে থাকেন আফ্রোদিতির জন্ম ফেনা থেকে। গ্রিক শন্দ আফ্রোস (aphros) অর্থ ফেনা। সমুদ্র থেকে তাঁর উদ্ভব হয়েছে বলে ধরে নেয়া হয়। পরবর্তীতে রোমানরা তাদের ভালোবাসার দেবী ভেনাসের নাম অনুসারে শুক্রগ্রহের নাম রাখে ভেনাস। গ্রিকদের যিনি আফ্রোদিতি, রোমানদের তিনি ভেনাস।

          বিখ্যাত ইতালিয়ান চিত্রকর সান্দ্রো বত্তিচেল্লি ১৪৮০ সালে আঁকা তাঁর 'দি বার্থ অব ভেনাস' ছবিতে দেখিয়েছেন অপরূপ রূপবতী ভেনাস একটি বিশাল ঝিনুকের খোলের উপর দাঁড়িয়ে আছেন। বাতসের দেবতা জোরে বাতাস দিচ্ছে ভেনাসের গায়ে। সেই বাতাসে উড়ছে ভেনাসের দীর্ঘ সোনালী চুল।


চিত্র 4: বত্তিচেল্লির 'দি বার্থ অব ভেনাস' ছবি থেকে ভেনাসের মুখ

 

মূল ছবি থেকে ভেনাসের মুখটা দেখানো হলো উপরের ছবিতে। ফ্লোরেন্সের উফিজি গ্যালারিতে আসল ছবিটি সংরক্ষিত আছে। এই ছবির অসংখ্য কপি সব জায়গায় পাওয়া যায়।

          রোমান কল্পকাহিনিতে আছে - ভেনাসের সৌন্দর্যে সব দেবতারাই মুগ্ধ এবং সবাই তাকে বিয়ে করতে চায়। কিন্তু কাউকেই পাত্তা দেয় না সুন্দরী ভেনাস। (সুন্দরীরা কোন কালেই কাউকে পাত্তা দেয়নি।) দেবতাদের গুরু বৃহস্পতি অর্থাৎ জুপিটার ভেবেছিলেন ভেনাস অন্তত তাকে না করবে না। কিন্তু জুপিটারও পাত্তা পেলো না। জুপিটার রেগে গেলো। সে কিনা দেবতাদের নেতা, তাকেই না করলো ভেনাস। এত সাহস! নারীস্বাধীনতায় বিশ্বাস করে না এসব পুরুষ দেবতারা। জুপিটার সব দেবতাদের হাত করে ভেনাসকে জোর করে বিয়ে দিলো আগুনের দেবতা হিফিস্টাসের সাথে। সব দেবতারাই সুদর্শন হবে এমন কোন কথা নেই। হিফিস্টাস ছিলেন কদাকার। স্বাভাবিকভাবেই ভেনাসের জন্য এটা ছিল একটা বিরাট শাস্তি। হিফিস্টাসের জন্যও এটা শাস্তি ছিল। কারণ ভেনাস কখনোই হিফিস্টাসকে ভালোবাসতে পারেনি। হিফিস্টাসকে ভেনাসের মন পাওয়ার জন্য সাইপ্রাসে খুব সুন্দর প্রাসাদ তৈরি করে দেন। সাইপ্রাসের পশ্চিম উপকুলে বেশ কিছু বড় বড় পাথর এখনো 'আফ্রোদিতির পাথর' নামে পরিচিত। পর্যটকদের অনেকেই এগুলো দেখতে যায়। অনেকে বিশ্বাস করে এই পাথরগুলোর চারপাশে সাঁতার কাটলে আফ্রোদিতি বা ভেনাসের মতো সৌন্দর্য লাভ করা যায়। যাই হোক, ভেনাসের যেসব কাহিনি প্রচলিত আছে তাতে দেখা যাচ্ছে ভেনাসের সাথে মঙ্গলগ্রহ থেকে শুরু করে সবগুলো গ্রহের সাথেই ভালোবাসার সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। আমাদের মঙ্গলগ্রহ সম্পর্কে আলোচনায় সেসব কথা আবার আসবে।

 

শুক্র গ্রহের প্রতীক

 

মৌলিক পদার্থগুলিকে ইংরেজি বর্ণের সাহায্যে সংকেত দিয়ে লেখা হয় সেটা তোমরা জানো। যেমন মৌলিক পদার্থ তামা বা কপারের সংকেত হলো Cu। অক্ষরের বদলে অনেকক্ষেত্রে প্রতীক দিয়েও এদের নির্দেশ করা হয়। তামা বা কপারের যে প্রতীক, প্ল্যানেট ভেনাস বা শুক্র গ্রহেরও একই প্রতীক। জীববিজ্ঞানে স্ত্রীবাচক প্রতীক হলো একটি বৃত্তের নিচে লাগানো একটি যোগ চিহ্ন। শুক্র গ্রহের  প্রতীক হলো এই স্ত্রীবাচক প্রতীক। শুক্র গ্রহের এই প্রতীক হওয়ার কারণ খুবই স্পষ্ট। সৌরজগতের গ্রহগুলোর মধ্যে শুধুমাত্র ভেনাস বা শুক্র গ্রহের নামকরণ করা হয়েছে একজন নারীর নামে। তাই এই গ্রহের প্রতীক নারীর প্রতীক।

          আমরা এই বইয়ের আরো পরে দেখবো যে শুক্র গ্রহের সবগুলো জায়গা, পাহাড়-পর্বত, গহ্বর, আগ্নেয়গিরি কিংবা উপরিতলের অন্যান্য অংশের সবগুলোর নামকরণ করা হয়েছে নারীদের নামে। সেখানে ইংল্যান্ডের রানিদের নাম যেমন আছে, তেমনি আছে ক্লিওপেট্রার নাম। আছে মেরি উলস্টোনক্রাফট, সিমন দ্য ব্যুভেয়র-এর মতো নারীবাদী লেখকদের নাম। আছেন লেখক আগাথা ক্রিস্টি, বিয়াট্রিক্স পটার প্রমুখ। আছেন বিজ্ঞানী আইরিন জুলিও-কুরি, লিজা মেইটনার।   এ বিষয়ে আমরা আরো বিস্তারিত আলোচনা করবো পরে। তার আগে দেখে নিই শুক্র গ্রহের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস। এ ইতিহাস শুক্র গ্রহের বৈজ্ঞানিক ইতিহাস। 

পর্ব - ৫

Thursday, 22 October 2020

যে গ্রহে সূর্য উঠে পশ্চিম দিকে - পর্ব ৩

 



পৃথিবীর আকাশে শুক্র

 

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অনেকগুলো কবিতায় শুকতারার কথা আছে। যেমন স্ফুলিঙ্গে আছে:

হাসিমুখে শুকতারা,

লিখে গেল ভোররাতে।

                                                           আলোকের আগমনী

                                                           আঁধারের শেষপাতে।

 

খুব ভোরে সূর্য উঠার আগে পুবাকাশে শুকতারা দেখা যায়। আবার সন্ধ্যাবেলা পশ্চিমাকাশে দেখা যায় সন্ধ্যাতারা। সন্ধ্যাতারার কথাও রবীন্দ্রনাথের কবিতায় গানে কতভাবে এসেছে। যেমন বিচিত্র পর্যায়ের গানে আছে:

 

মাটির প্রদীপখানি আছে মাটির ঘরের কোলে,
সন্ধ্যাতারা তাকায় তারি আলো দেখবে বলে॥

 

পৃথিবীর আকাশে সবচেয়ে উজ্জ্বল যে বস্তুটিকে আমরা দিনের বেলায় প্রতিদিন দেখি তা হলো সূর্য। আর রাতের বেলায় দেখি জ্বলজ্বলে চাঁদ। চাঁদের নিজের আলো নেই, কিন্তু সূর্যের আলো চাঁদের গায়ে প্রতিফলিত হয়ে পৃথিবীতে আসে বলে আমরা চাঁদকে দেখতে পাই পৃথিবী থেকে। সূর্য এবং চাঁদের পর তৃতীয় যে উজ্জ্বল বস্তুটি পৃথিবীর আকাশে দেখা যায় - সেটা শুক্রগ্রহ। মানুষ হাজার বছর ধরে এগুলো দেখছে। সূর্য উঠার আগে পূর্বাকাশে এই গ্রহকে দেখা যায় বলে তার নাম দিয়েছে মর্নিং স্টার, যাকে আমরা বাংলায় বলি শুকতারা। আবার সূর্য ডোবার পর পশ্চিমাকাশে এই গ্রহকে দেখা যায় বলে তার নাম দিয়েছে ইভনিং স্টার, যাকে আমরা বাংলায় বলি সন্ধ্যাতারা। শুকতারা এবং সন্ধ্যাতারা যে দুটো আলাদা জিনিস নয় - সেটাও মানুষ জেনেছে মাত্র কয়েক শ বছর আগে। আর শুকতারা বা সন্ধ্যাতারা যে তারা বা নক্ষত্র নয়, সেটাও মানুষ জেনেছে মাত্র কয়েক শ' বছর আগে। শুক্রগ্রহ পৃথিবীর সবচেয়ে কাছের গ্রহ। কাছের গ্রহ বলেই কি শুক্র গ্রহকে এত উজ্জ্বল দেখায় আকাশে? আসলে ঠিক তা নয়। নক্ষত্র গ্রহ কিংবা উপগ্রহের উজ্জ্বলতার কিছু বৈজ্ঞানিক কারণ আছে।

          আগের পৃষ্ঠার ছবিতে দেখা যাচ্ছে পৃথিবীর আকাশে শুক্রগ্রহ আরেকটি উজ্জ্বল নক্ষত্র স্পাইকার (spica) চেয়ে বেশি উজ্জ্বল। এর কারণ হচ্ছে শুক্রগ্রহের আলবিডো (albedo) অনেক বেশি। কোন গ্রহ উপগ্রহ কতটা উজ্জ্বল তা পরিমাপ করার জন্য বিজ্ঞানীরা যে কথাটি ব্যবহার করে তা হলো আলবিডো। সূর্য থেকে আলো এসে যখন কোন গ্রহ বা উপগ্রহের উপর পড়ে - তখন গ্রহ বা উপগ্রহটি সেই আলোর কিছু অংশ শোষণ করে ফেলে এবং কিছু অংশ প্রতিফলন পদ্ধতিতে ফিরিয়ে দেয়। সূর্যের আলোর শতকরা যত ভাগ গ্রহ বা উপগ্রহ থেকে প্রতিফলিত হয়ে ফিরে আসে সেই পরিমাপকে বলে আলবিডো।

          আমাদের পৃথিবীর আলবিডো 0.33, অর্থাৎ সূর্য থেকে যে পরিমাণ আলো পৃথিবীতে আসে তার শতকরা 33 ভাগ পৃথিবীপৃষ্ঠ থেকে প্রতিফলিত হয়। চাঁদের আলবিডো সেই তুলনায় অনেক কম; মাত্র 0.12। অর্থাৎ চাঁদের পৃষ্ঠ থেকে সূর্যের আলোর মাত্র 12 ভাগ প্রতিফলিত হয়। পৃথিবী থেকে চাঁদকে যেরকম উজ্জ্বল দেখায়, পৃথিবীর বাইরে থেকে পৃথিবীকে চাঁদের তিনগুণ বেশি উজ্জ্বল দেখাবে। শুক্রগ্রহের আলবিডো 0.76। শুক্রের পৃষ্ঠ থেকে সূর্যের আলোর শতকরা 76 ভাগ প্রতিফলিত হয়। দেখা যাচ্ছে শুক্রগ্রহ চাঁদের চেয়ে ছয় গুণেরও বেশি উজ্জ্বল। শুক্রগ্রহের উচ্চ তাপমাত্রা এবং ঘন বায়ুমন্ডলের কারণে সূর্যের আলো খুব বেশি শোষিত হয় না বলেই সেখান থেকে আলোর প্রতিফলন বেশি হয়। শুক্র গ্রহের চারপাশে ঘন গ্যাসের আস্তরণের ফলে সূর্যালোক সেখানে বাধাপ্রাপ্ত হয় এবং বেশিরভাগই প্রতিফলিত হয়ে যায়।

          শুক্রের বায়ুমন্ডল সম্পর্কে আমরা বিস্তারিত আলোচনা করবো একটু পরে। তার আগে দেখে নিই বিভিন্ন সংস্কৃতি ও সভ্যতায় শুক্র গ্রহ সম্পর্কে কী কী ধারণা ছিল। শুক্র গ্রহকে কেন সবচেয়ে সুন্দর দেবীর সাথে তুলনা করা হতো?

Latest Post

রাজকন্যে সবিতা

  আমার মা ছিলেন নিরক্ষর, বাবার পড়ালেখা চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত। লেখাপড়া করতে পারেননি বলে লেখাপড়ার প্রতি প্রচন্ড ভালোবাসা ছিল বাবার। তাই নিজের ...

Popular Posts