Sunday 12 September 2021

আইরিন কুরি - নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী

 



পদার্থবিজ্ঞানের জগতে বেশ কয়েকটি যুগান্তকারী আবিষ্কারের সমসাময়িক সময়ে আইরিনের জন্ম। উইলহেল্‌ম রন্টগেনের এক্স-রে আবিষ্কারের দু’বছর পর, হেনরি বেকোয়ারেলের তেজষ্ক্রিয়তা আবিষ্কারের পরের বছর ১৮৯৭ সালের ১২ সেপ্টেম্বর পিয়ের ও মেরি কুরির প্রথম সন্তান আইরিন কুরির জন্ম। নির্ধারিত সময়ের প্রায় চার সপ্তাহ আগে জন্ম হয় আইরিনের। মেরি কুরি তখন প্যারিসের মেয়েদের স্কুলে ফিজিক্সের শিক্ষক এবং পিয়ের কুরি ইকোল মিউনিসিপেল দ্য ফিজিক অ্যাট কিমিয়ে ইন্ডাস্ট্রিয়েল্‌স (ইপিসিআই) এর ফিজিক্স ল্যাবের প্রধান। আইরিনের জন্মের দু’সপ্তাহ পর তার দিদিমা (পিয়েরের মা) মারা যান। কিছুদিন পর পিয়ের তাঁর বাবাকে নিজেদের কাছে নিয়ে আসেন। ডাক্তার ইউজিন কুরি বুকে তুলে নেন নাতনি আইরিনকে। দাদুর সাথে গভীর আত্মিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে আইরিনের।

গবেষণা ও পড়ানোর কাজে খুব ব্যস্ত আইরিনের মা-বাবা। পিয়ের কুরি গবেষণা করছেন কৃস্টালের চৌম্বক-ধর্ম নিয়ে। মেরি কুরি তাঁর ডক্টরেট ডিগ্রির গবেষণার জন্য কাজ শুরু করেছেন সদ্য আবিষ্কৃত তেজষ্ক্রিয়তার ধর্মের ওপর। দিনরাত পরিশ্রম করে নতুন ধরনের তেজষ্ক্রিয় পদার্থের সম্ভাবনা দেখতে পেয়েছেন মেরি। আইরিনের জন্মের পর সামান্য কয়েক সপ্তাহ বিশ্রামের পর দ্রুত কাজে ফিরে গেছেন তিনি। ১৮৯৮ সালের জুন মাসে পাওয়া গেলো নতুন তেজষ্ক্রিয় মৌল - নিজের জন্মভূমির নামানুসারে মেরি যার নাম রেখেছেন পোলোনিয়াম। পরবর্তী ছয় মাসের মধ্যে পাওয়া গেলো আরো শক্তিশালী নতুন মৌল রেডিয়াম। আইরিনের মতো রেডিয়াম-পোলোনিয়ামও যেন মেরির সন্তান। আইরিনের মা-বাবা আইরিনের চেয়েও বেশি সময় দিতে লাগলেন রেডিয়ামকে।

দাদুর কোলে-পিঠেই বেড়ে উঠছে আইরিন। শুধুমাত্র ছুটির দিনে কিছুটা সময় মা-বাবাকে কাছে পায়। তার বয়স যখন পাঁচ-ছয় বছর মা-বাবা আরো ব্যস্ত হয়ে যান। দেখা যায় সন্ধ্যাবেলা বাসায় ফিরে ডিনারের পর আবার গবেষণায় ফিরে যাবার জন্য প্রস্তুত হতে থাকেন। আইরিন তখন কান্নাকাটি শুরু করে। মা তাকে কোলে নিয়ে ঘুম পাড়ানোর চেষ্টা করেন। অভিমান হয় ছোট্ট আইরিনের। মা-বাবা কেন তার কাছ থেকে দূরে থাকে সব সময়? অনেক সময় ঘুমের ভান করে মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে থাকে। মা তখন তাকে দাদুর কোলে দিয়ে বাবার সাথে বেরিয়ে যান কাজে। আইরিন চোখ খুলে দেখে দাদুর মুখ। 

মা-বাবা ও দাদুর সাথে আইরিন


দাদু আইরিনকে বোঝান - মা-বাবার গবেষণার কাজ কত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁরা এমন কিছু আবিষ্কার করেছেন যা দিয়ে পৃথিবীর কোটি মানুষের উপকার হবে। নিজের স্বার্থের কথা চিন্তা না করে মানুষের উপকারের চেষ্টা করার নামই যে মানব-ধর্ম তা আইরিনের মাথার মধ্যে ঢুকিয়ে দেন তার দাদু। মা-বাবার কথা শুনতে শুনতে ‘ল্যাবরেটরি’, ‘রেডিওএক্টিভিটি’, ‘রেডিয়াম’, ‘পোলোনিয়াম’ ইত্যাদি শব্দের সাথে খুবই পরিচিত হয়ে যায় ছোট্ট আইরিন।

১৯০৪ সালের ডিসেম্বরে আইরিনের ছোটবোন ইভের জন্ম হয়। আইরিনের একজন খেলার সাথি হলো। পাশের বাসার প্রফেসর জাঁ পেরির ছেলে-মেয়ে আলিন ও ফ্রান্সিস আইরিনের ভালো বন্ধু। আইরিন তাদের সাথেও খেলে। কিন্তু অপরিচিত কারো সাথে আইরিন কথাই বলতে চায় না। যতই বড় হচ্ছে তার এই সমস্যা বাড়ছে। মেরি কুরি মেয়ের এই সমস্যা কাটানোর জন্য বাড়িতে অনেক বন্ধুবান্ধব ডেকে পার্টি দিয়েছেন - যেন তাদের ছেলে-মেয়েদের সাথে আইরিনের বন্ধুত্ব হয়। কিন্তু আইরিন তাদের কারো সাথেই কোন কথা বলে না। বাইরের কারো সামনে সে হাসেও না, গম্ভীর হয়ে থাকে।

১৯০৬ সালের এপ্রিলে আইরিনের বয়স যখন সাত – আইরিনের বাবা পিয়ের কুরি রাস্তা পার হতে গিয়ে ঘোড়ার গাড়ির চাকায় পিষ্ট হয়ে মারা যান। সাড়ে আট বছর বয়সেই বাবাকে হারিয়ে আরো গম্ভীর হয়ে গেলো আইরিন। দাদু যথাসম্ভব শোক সামলে নাতনিদের দেখাশোনা করতে লাগলেন আগের মতোই। মা প্যারিসের বাসা বদলে সবাইকে নিয়ে চলে গেলেন স্‌সোতে। সেখানে তাদের নতুন বাসায় বেশ বড় একটা বাগান আছে। মা আইরিনকে বাগানের একটা অংশ দিয়ে দিলেন ইচ্ছেমত বাগান করার জন্য। সাত বছরের আইরিন নিজের হাতে বাগান করা শুরু করে - তাকে সাহায্য করেন দাদু। 

কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যেই দাদুর শরীর ক্রমশ খারাপ হয়ে যেতে শুরু করলো। বিছানা থেকে উঠতে পারেন না। বারো বছরের কিশোরী আইরিন যখনই সময় পাচ্ছে দাদুর সেবা করার চেষ্টা করছে। 
১৯১০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে দাদু মারা যান। আইরিনের পৃথিবীটা শোকে স্তব্ধ হয়ে যায়। বাবার মৃত্যুর পর দাদু ছিল তার বন্ধু, শিক্ষক আর পথপ্রদর্শক। দাদুর কাছ থেকে যে ভালোবাসা, দেশপ্রেম, মানবতার শিক্ষা আইরিন পেয়েছে তার তুলনা নেই। দাদুকে হারিয়ে আইরিনের হঠাৎ ভয় করতে শুরু করলো - মাকেও যদি কোনদিন এমনি ভাবে হারাতে হয়! না, সে তার মা ও ছোট বোনকে দেখে রাখবে। 
দাদুর মৃত্যুর পর বাসাটা পুরুষ-শূন্য হয়ে গেল। মেরি দুটো কন্যাকে মানুষ করার জন্য যা যা লাগে সব ব্যবস্থা করলেন। মেয়েদের নিজের মাতৃভাষা পোলিশ শেখানোর উদ্দেশ্যে বাসায় পোলিশ গভর্নেস রাখলেন। ইভ ও আইরিন ফরাসির পাশাপাশি পোলিশ ভাষাতেও দক্ষ হয়ে উঠছে।

মেয়েদের শারীরিক স্বাস্থ্যের প্রতি কড়া নজর মেরির। তিনি বিশ্বাস করেন ছেলেমেয়েদের শরীর সুগঠিত হলে কোন রোগজীবাণু তাদের আক্রমণ করতে পারবে না, মানসিক বিকাশও অনেক ভালোভাবে হবে। মেয়েদেরকে সাইকেল কিনে দিয়েছেন - তারা ইচ্ছেমতো সাইকেলে চেপে ঘুরে বেড়ায় উন্মুক্ত প্রান্তরে। সাঁতার কাটা, ঘোড়ায় চড়া, নৌকা চালানো, স্কেটিং, স্কিইং, জিমনেস্টিক্‌স সবকিছু শিখিয়েছেন মেয়েদের। আইরিন দেখেছে - যে সাইকেলে চড়া তার মায়ের এত প্রিয় ছিল, স্বামীর মৃত্যুর পর একটা দিনের জন্যেও আর সাইকেলে চড়েননি তার মা।

ফ্রান্সের স্কুলের গতানুগতিক শিক্ষাপদ্ধতির ওপর কোন আস্থা ছিল না মেরি কুরির। তিনি দেখছেন ফ্রান্সের স্কুলের শিক্ষার্থীরা দিন-রাত গাধার মত পরিশ্রম করছে, মুখস্থ করছে, পরীক্ষা দিচ্ছে - কিন্তু শিখছে না কিছুই। তিনি এই সিস্টেমের অবসান করতে না পারলেও নিজের মেয়েদের এই শিক্ষার নামে ‘কলুর বলদ’ বানাবার বিপক্ষে। তাঁর কাছের বন্ধু ও সহকর্মীদের নিয়ে তিনি একটা অপ্রাতিষ্ঠানিক কো-অপারেটিভ স্কুল-ব্যবস্থার চালু করলেন। 

ছয় জন প্রফেসরের দশজন ছেলেমেয়েকে নিয়ে শুরু হলো তাঁদের প্রচেষ্টা। প্রতি সপ্তাহে একেক জন প্রফেসর একেক বিষয়ে ক্লাস নেন। পদার্থবিজ্ঞানী জাঁ পেরি এবং পল লাঁজেভি পড়াতেন ফিজিক্যাল কেমিস্ট্রি ও গণিত। মেরি কুরি পড়াতেন এক্সপেরিমেন্টাল ফিজিক্স।  সাহিত্য, শিল্পকলা, সাধারণ বিজ্ঞান, ইংরেজি, জার্মান ইত্যাদি পড়ানোর জন্য সেসব বিষয়ের বিশেষজ্ঞকে নিয়ে আসা হতো। একেক সপ্তাহে একেক প্রফেসরের বাড়িতে ক্লাস বসতো। দশজন ছেলেমেয়ের প্রত্যেকে প্রত্যেকের বন্ধু হয়ে যায়। আইরিনও খুব সহজ ছিল তার এসব বন্ধুদের সাথে। এই দশজনের বাইরে আইরিনের সারাজীবনে আর কোন ফ্রেন্ডসার্কেল গড়ে ওঠেনি।

আড়াই বছর চলার পর কো-অপারেটিভ স্কুলটি আর চললো না। প্রফেসররা নানা কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। স্কুল উঠে গেলেও মেরি কুরি তাঁর ফিজিক্স স্কুলের একটা রুমে প্রতি বৃহস্পতিবার ছেলে-মেয়েদের সারাদিন পড়াতেন। মেরি বিশ্বাস করেন মৌলিক বিজ্ঞানে ভালো করতে হলে পদার্থবিজ্ঞান ও গণিত বোঝার কোন বিকল্প নেই।

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা-পদ্ধতিকে অপছন্দ করলেও প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রিকে অস্বীকার করার উপায় নেই। উচ্চ মাধ্যমিকের সমতুল্য পরীক্ষা দেয়ার জন্য আইরিনকে একটি প্রাইভেট স্কুলে ভর্তি করে দেয়া হলো। দু’বছর সেই স্কুলে পড়ার পর উচ্চমাধ্যমিক পাস করে আইরিন।

মা যে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক গবেষণায় ব্যস্ত থাকেন তা কিছুটা আন্দাজ করতে পারে আইরিন। কিন্তু মা যে বিশ্বসেরা বিজ্ঞানী তা বুঝতে পারে মায়ের সাথে স্টকহোমে গিয়ে। ১৯১১ সালে দ্বিতীয় বার নোবেল পুরষ্কার পেলেন মাদাম কুরি। প্রথমবার ১৯০৩ সালে যখন বাবার সাথে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছিলেন মা - তখন অসুস্থতার কারণে বাবা-মা কেউই স্টকহোমে আসতে পারেননি। এবার রসায়নে নোবেল পুরষ্কার পাবার পর প্যারিসের প্রেসের শত কুৎসা অপবাদ আক্রমণের পরেও মা একটুও দমে যাননি। মাথা উঁচু করে সুইডেনে এসেছেন নিজের যোগ্যতার স্বীকৃতি - নোবেল পুরষ্কার নিতে। 
অডিটোরিয়ামের চোখ ঝলসানো আলোয় সঙ্গীত মূর্ছনায় এবং প্রচন্ড করতালির সাথে রাজা পঞ্চম গুস্তাভের কাছ থেকে মা যখন নোবেল মেডেল নিচ্ছিলেন - গর্বে বুক ভরে গেছে আইরিনের। কিন্তু সেদিন একবারের জন্যও সে ভাবেনি যে চব্বিশ বছর পর তার নিজের জীবনেই সেরকম কোন ঘটনা ঘটবে।

মা নিজের কাজে এতই ব্যস্ত থাকেন যে আইরিন ও ইভ পুরোপুরি স্বনির্ভর হয়ে গেলো। বাসার কাজকর্ম দেখাশোনার জন্য একজন গভর্নেস আছেন - তিনি রান্নাবান্না ও অন্যান্য কাজ করেন। আইরিন ও ইভ দুজনই যে যার নিজের কাজ করে নেয়। দুবোন দুরকম, দুজনের ইন্টারেস্টও দুরকম।
আইরিন তার বাবার মতোই খুব সল্পভাষী, ধীরস্থির এবং গভীর চিন্তাশীল। বৈজ্ঞানিক যুক্তিতে সবকিছু বিবেচনা করে দেখে আইরিন। কোন ব্যাপারেই সময় নষ্ট করার পক্ষপাতী নয় আইরিন। ফ্যাশনেবল প্যারিসে যেখানে মেয়েরা নিত্যনতুন ড্রেস আর রূপচর্চার পেছনে টাকা আর সময় খরচ করতে দু’বার চিন্তা করে না - সেখানে আইরিন কোন ধরনের প্রসাধন তো দূরের কথা ভালো কোন ড্রেসও কিনেনি কখনো। ঢিলেঢালা আরামদায়ক ও কাজ করতে সুবিধাজনক পোশাকই আইরিনের পছন্দ। তার জামার হাতায় পকেট থাকতো রুমাল রাখার জন্য। সময় বাঁচাবার জন্য তার সুন্দর কোঁকড়া চুল সে নিজেই কেটে ছোট করে রাখতো।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় যুদ্ধের প্রথম দশ দিনের মধ্যেই প্রায় তিন লাখ ফরাসি সৈন্য নিহত হয়, আহত হয় আরো বেশি। যুদ্ধাহত সৈনিকদের শরীর থেকে বুলেট বের করে আনতে আর্মি-সার্জনদের অনেক সমস্যা হয়। শরীরের নানা জায়গায় অস্ত্রোপচার করতে হয় - ফলে অনেক সময় সৈন্যদের প্রাণ বাঁচানো যায় না। মাদাম কুরি একটা উপায় বের করলেন। শরীরে বুলেটের অবস্থান নির্ণয় করার জন্য এক্স-রে ব্যবহার করা যায় কিনা দেখলেন তিনি। 
এক্স-রে’র বয়স তখন মাত্র পনেরো বছর। এক্স-রে তৈরি ও রেডিওগ্রাফ প্রযুক্তির সূচনা হয়েছে মাত্র। মাদাম কুরি মিলিটারি ইঞ্জিনিয়ারিং ও হেল্‌থ ইউনিটকে কাজে লাগিয়ে বিশটি এক্স-রে ইউনিট তৈরি করালেন। দুর্গম যুদ্ধক্ষেত্রের অস্থায়ী হাসপাতালে বিদ্যুৎ সরবরাহ থাকে না। মেরি কুরি বিশটি ছোট ট্রাকের মধ্যে জেনারেটর সহ এক্স-রে ইউনিট বসিয়ে এরকম হাসপাতালে সরবরাহ করার ব্যবস্থা করলেন। 
যুদ্ধাহতদের চিকিৎসা সেবা দেয়ার জন্য ফরাসি মেয়েরা নার্সিং ট্রেনিং নিচ্ছিলো। আইরিনও নার্সিং ট্রেনিং নিলো। ইতোমধ্যে মাদাম গাড়ি চালানো শিখে নিয়েছেন। আইরিনকে সাথে নিয়ে নিজে ভ্রাম্যমান এক্স-রে ইউনিট চালিয়ে দুর্গম হাসপাতালে পৌঁছে যান তিনি। এক্স-রে মেশিন সম্পর্কিত প্রয়োজনীয় তত্ত্বীয় ও ব্যবহারিক জ্ঞান তিনি আইরিনকে দেন গাড়ি চালাতে চালাতেই। আইরিন দ্রুত শিখে নেয় সব।

১৯১৫ সালের ১২ সেপ্টেম্বর আইরিনের বয়স আঠারো হবার পর মাদাম তাকে কয়েকটা এক্স-রে ইউনিটের দায়িত্ব দিয়ে দিলেন। এক্স-রে ইউনিট বসানো, সার্জনকে রোগীর এক্স-রে নিতে সাহায্য করা, সৈনিকদের এক্স-রে মেশিন চালানোর ট্রেনিং দেয়া সব করতে লাগলো আইরিন একা। যুদ্ধাহত সৈনিকেরা পরমা সুন্দরী আইরিনকে সত্যি সত্যিই গ্রিক শান্তির দেবী ‘আইরিন’ হিসেবেই দেখতে শুরু করলেন। 

এক্স-রে ইউনিট নিয়ে কাজ করছেন মেরি ও আইরিন কুরি



আমেরিকান সৈন্যরা ফ্রান্সে এসেছে যুদ্ধে সহায়তা করার জন্য। তারাও যোগ দেয় আইরিনের ট্রেনিং ক্লাসে। তরুণ সৈন্যরা আইরিনকে দেখে চোখ ফেরাতে পারে না। তাদের মধ্যে হুড়োহুড়ি লেগে যায় আইরিনের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য। কিন্তু স্বভাব-গম্ভীর আইরিন ট্রেনিং দেবার সময় প্রয়োজনের অতিরিক্ত একটা শব্দও উচ্চারণ করে না।  
যুদ্ধ চলাকালীন সময়েই ফরাসি সৈনিকেরা বুঝতে পেরেছেন মাদাম কুরি ও রেডিয়াম ইনস্টিটিউটের গুরুত্ব কতখানি। তারা রেডিয়াম ইনস্টিটিউটকে সম্ভাব্য আক্রমণ থেকে রক্ষা করার জন্য চারপাশে বালির বস্তা দিয়ে বাংকার তৈরি করে ট্যাংক নিয়ে পাহারা বসালো। সুন্দর নতুন বিল্ডিং-এর চারপাশে এরকম বিশ্রী বালির বস্তা দেখে আইরিনের মন খারাপ হয়ে গেল। সে বালির বস্তার ওপর সুন্দর করে ফুলের টব বসিয়ে দিলো। 
১৯১৮ সালে যুদ্ধ শেষ হবার পর আইরিনকে মিলিটারি মেডেল প্রদান করা হয় যুদ্ধে তার অবদানের জন্য। কিন্তু মাদাম কুরিকে কোন রাষ্ট্রীয় সম্মান দেয়া হলো না। 
কিছুদিন পর সরবোন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করে আইরিন। আরো দু’বছর পর পদার্থবিজ্ঞান ও গণিতে মাস্টার্স ডিগ্রি লাভ করেন আইরিন।

আইরিন তেজষ্ক্রিয়তার ধর্ম সংক্রান্ত বিজ্ঞানকে ভালোবেসে ফেলেছেন। মা মাদাম কুরি আইরিনকে তাঁর সহকারী হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন রেডিয়াম ইনস্টিটিউটে। গবেষণা বেশ ভালো লাগতে শুরু করেছে তাঁর। তেজষ্ক্রিয় বস্তুর আভা দেখে বাচ্চা মেয়ের মত খুশি হয়ে উঠেন আইরিন। বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের গুরুত্বের চেয়েও আবিষ্কারের আনন্দটা অনেক বেশি দরকারি তাঁর কাছে। প্রতিযোগিতা ও সাফল্যে কিছু যায় আসে না তাঁর। বাবার পর্যায়ের কাজ তিনি করতে পারবেন কিনা সে ব্যাপারে কোন মাথাব্যথা তাঁর কখনোই ছিল না। তবে বাবার মত আইরিন বিজ্ঞান পড়েন প্রকৃতিকে জানার আনন্দে, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ভালোভাবে উপভোগ করার জন্য।

মায়ের সাথে ল্যাবরেটরিতে আইরিন



সহকর্মীদের সাথে ল্যাবে কাজ করার সময় আইরিন ভীষণ কড়া। জ্ঞানে এবং শারীরিক দক্ষতায়ও তিনি সবার চেয়ে এগিয়ে। ২৫ বছর বয়সেই তিনি অনেক বেশি জানেন। কিন্তু সামাজিক মেলামেশায় অভ্যস্ত না হবার কারণে তাঁর কথাবার্তা ভীষণ চাঁছাছোলা। তিনি কোদালকে শুধু কোদালই বলেন না - কোদালের খুঁত থাকলে তাও বলেন। বাড়ির লোকের সাথে মাঝে মাঝে হাসলেও - বাইরের কারো সামনে কখনোই হাসেননি আইরিন। অনেকে আইরিনকে অহংকারী ভেবে ভুল বোঝেন। ঈর্ষাতুর অনেকে মনে করেন ডিরেক্টরের মেয়ে হবার কারণে আইরিন ডাঁট দেখান। আড়ালে অনেকে তাঁকে ‘প্রিন্সেস বলেও ডাকেন। কিন্তু আইরিনের কিছুতেই কিছু যায় আসে না। আইরিন জানেন তাঁর বৈজ্ঞানিক ক্ষমতা কতটুকু। কিন্তু সে নিয়ে কোন অহংকার তাঁর নেই।

আইরিনকে কখনো কোন বিষয় নিয়ে রাগতে দেখেনি কেউ। আইরিন জীবনে কোনদিন মিথ্যা কথা বলেননি, কোনদিন কাউকে ইম্প্রেস করতে চান নি। তিনি যা তিনি তাই।

রেডিয়াম ইনস্টিটিউটে মায়ের তত্ত্বাবধানে ডক্টরেট ডিগ্রির জন্য গবেষণা শুরু করলেন আইরিন। মায়ের আবিষ্কৃত পোলোনিয়াম থেকে যে আলফা পার্টিক্যাল বের হয় তার ধর্ম বিশ্লেষণ শুরু করলেন তিনি। তাঁর গবেষণার মূল প্রতিপাদ্য হলো পদার্থের ভেতর দিয়ে যাবার সময় আলফা পার্টিক্যল কেন গতি হারায় এবং কীভাবে গতি হারায় তা খুঁজে বের করা। ১৯২১ সালে আইরিন কুরির প্রথম গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়। ইনস্টিটিউটের চিফ অব স্টাফ ফারনান্দ হলউইকের সাথে একের পর এক পরীক্ষণ চলতে থাকে আইরিনের।

১৯২৪ সালের নভেম্বরে ডক্টরেট ডিগ্রির জন্য থিসিস লিখছেন আইরিন। থিসিসে তিনি যেসব পরীক্ষালব্ধ ফলাফল বিশ্লেষণ করেছেন তার সবকিছুই নতুন। সেই সময় পোলোনিয়াম সম্পর্কে যত পরীক্ষা আইরিন করেছেন পৃথিবীর আর কোথাও কেউ ততটা করেননি।

 ১৯২৫ সালে আইরিন সরবোন বিশ্ববিদ্যালয়ে ডক্টরাল থিসিস জমা দিয়েছেন - ‘আলফা রে অব পোলোনিয়াম শিরোনামে। থিসিস উৎসর্গ করেছেন তাঁর মাকে - ‘টু মাদাম কুরি বাই হার ডটার এন্ড পিউপিল। আইরিন থিসিস ডিফেন্ড করতে গেলেন একটা ঢিলেঢালা ব্যাগি ড্রেসের ওপর কালো একাডেমিক গাউন পরে। 


ডক্টর আইরিন কুরি


অডিটোরিয়ামে প্রায় হাজার দর্শক উপস্থিত রেডিয়াম-কন্যার বক্তৃতা শোনার জন্য। আইরিন যদিও সমাবেশ পছন্দ করেন না, কোন ধরনের টেনশান ছাড়াই তিনি বক্তৃতা করলেন। তিনি যা জানেন তা এত ভালো জানেন যে সেটা নিয়ে কোনদিনই কোন উৎকন্ঠায় ভোগেন না। আইরিনের পরীক্ষকদের ওপর মানসিক চাপ পড়বে ভেবে মাদাম কুরি যাননি সেই অনুষ্ঠানে। পরীক্ষকদের সবার ভূয়সী প্রশংসার ভেতর দিয়ে ডক্টরেট ডিগ্রি পেলেন আইরিন কুরি।

১৯২৬ সালের ৯ই অক্টোবর বিয়ে হলো আইরিন কুরি ও ফ্রেডেরিক জুলিওর। ফ্রেডেরিক জুলিও মেরি কুরির ইন্সটিটিউটে গবেষণা করছিলেন। সেখানে গবেষণা করতে করতেই আইরিন ও ফ্রেডেরিকের মধ্যে ভালোবাসার সম্পর্ক তৈরি হয়। বিয়ের পর ফ্রেডেরিক নিজের পদবির সাথে কুরি পদবিও জুড়ে নেন। তখন থেকে তাদের পদবি হয় জুলিও-কুরি। বিয়ের পর আইরিন ও ফ্রেডেরিকের যৌথ গবেষণা আরো বেগবান হয়।

গবেষণারত আইরিন ও ফ্রেডেরিক

১৯২৭ সালে ফ্রেড সরবোন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিজ্ঞানে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। একই বছর তাঁদের প্রথম সন্তান হেলেনের জন্ম হয়। ১৯৩০ সালে ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করলেন ফ্রেডেরিক জুলিও-কুরি। তাঁর থিসিসের শিরোনাম ছিল, “ইলেকট্রোকেমিক্যাল প্রপার্টিজ অব রেডিওঅ্যাক্টিভ কম্পাউন্ডস অব পোলোনিয়াম” । 

১৯৩২ সালে আইরিন ও ফ্রেডের দ্বিতীয় সন্তানের জন্ম হলো। আইরিন তাঁর বাবার নাম অনুসারে ছেলের নাম রাখলেন পিয়ের। হেলেন আর পিয়ের মাদাম কুরির চোখের মণি হয়ে উঠলো। সময় পেলেই মাদাম নাতি-নাতনিদের সাথে খেলতে চেষ্টা করেন। তাঁর কাজের অনেকটুকুই এখন আইরিন সামলাচ্ছেন। তবুও তিনি রেডিয়াম ইনস্টিটিউটে যাওয়া থামাচ্ছেন না। ১৯৩৩ সালের সলভে কনফারেন্সে যোগ দেবার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি। 

এদিকে পিয়েরের জন্মের পর আইরিন আরো দুর্বল হয়ে পড়েছেন। পঁয়ত্রিশ বছর বয়সেই তাঁকে অনেক বয়স্কা মনে হচ্ছে। যক্ষা থেকে মুক্তি পাচ্ছেন না কিছুতেই। কিন্তু কোনকিছুই তাঁকে ঘরে আটকে রাখতে পারলো না। তিনি কাজে ফিরে গেলেন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। ল্যাবে গিয়েই নতুন পরীক্ষায় হাত দিলেন।

নিউট্রন আবিষ্কৃত হবার পর ইতালিয়ান পদার্থবিজ্ঞানী এনরিকো ফার্মি পারমাণবিক নিউক্লিয়াসের গবেষণায় বিপুল সম্ভাবনা দেখতে পেলেন। আইরিন ও ফ্রেড উইলসন ক্লাউড-চেম্বার ব্যবহার করে নিউট্রন নিয়ে পরীক্ষা করার পরিকল্পনা করলেন। তাঁরা দেখলেন ক্লাউড-চেম্বারে ইলেকট্রন-ট্র্যাকের পাশাপাশি নতুন ধরনের ট্র্যাক দেখা যাচ্ছে - যা শুধুমাত্র সম্ভব যদি ইলেকট্রনের চার্জ পজিটিভ হয়। আইরিন ও ফ্রেডের আগে এ পরীক্ষা আর কেউ করেননি এবং এই পজিটিভ ইলেকট্রনের অস্তিত্ব সম্পর্কেও কেউ জানতেন না। তবে তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞানী পল ডিরাক পজিটিভ ইলেকট্রনের সম্ভাবনার কথা প্রকাশ করেছিলেন। ডিরাকের পেপার আইরিন ও ফ্রেডের চোখে পড়েনি। 

পজিটিভ চার্জের ট্র্যাক দেখে তাঁদের ফলাফল সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করতে ব্যর্থ হলেন আইরিন ও ফ্রেড। কিন্তু ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে (ক্যালটেক) কার্ল এন্ডারসন আইরিন ও ফ্রেডের পরীক্ষাটা করে একই রেজাল্ট পেলেন এবং সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করলেন যে এগুলো পজিট্রনের ট্র্যাক। আরো একটা যুগান্তকারী আবিষ্কারের কৃতিত্ব থেকে বঞ্চিত হলেন আইরিন ও ফ্রেড। [পজিট্রন আবিষ্কারের জন্য ১৯৩৬ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার পেলেন কার্ল এন্ডারসন।] 

পরপর দু’বার সঠিক পরীক্ষণের মাধ্যমে আইরিন ও ফ্রেড নিউট্রন ও পজিট্রন আবিষ্কারে প্রধান ভূমিকা রেখেছেন। বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানীদের কাছে আইরিন ও ফ্রেডের গ্রহণযোগ্যতা অনেকগুণ বেড়ে গেলো। ১৯৩৩ সালের সল্‌ভে কনফারেন্সে আমন্ত্রিত হলেন তাঁরা। সল্‌ভে কনফারেন্সে আমন্ত্রিত হওয়া মানে বিশ্বস্বীকৃতি পাওয়া। মাদাম কুরি তো সল্‌ভে কনফারেন্সের জন্মলগ্ন থেকে শুরু করে সবগুলো কনফারেন্সেই আমন্ত্রিত হয়েছেন। আইরিন ও ফ্রেডের এটাই প্রথম।

কনফারেন্সে যাবার আগে অনেকগুলো পরীক্ষা করলেন তাঁরা। পোলোনিয়ামের সামনে অ্যালুমিনিয়ামের পাতলা পাত রেখে দেখেছেন পোলোনিয়াম থেকে আলফা পার্টিক্যল এসে অ্যালুমিনিয়াম পাতে ধাক্কা দিয়ে সেখান থেকে নিউট্রন ও পজিট্রন বের করে দিচ্ছে। বার বার পরীক্ষা করে একই রেজাল্ট পেয়েছেন আইরিন ও ফ্রেড।

১৯৩৩ সালের অক্টোবরে ব্রাসেল্‌সে সল্‌ভে কনফারেন্সে আইরিন ও ফ্রেডের পরীক্ষার ফলাফল উপস্থাপন করলেন ফ্রেড। আইরিন কথা বলতে পছন্দ করেন না, তাই তিনি চুপচাপ বসে আছেন অন্যান্য বিজ্ঞানীদের সাথে। কনফারেন্সে চল্লিশ জন আমন্ত্রিত বিজ্ঞানীর মধ্যে বিশ জন নোবেল বিজয়ী। চল্লিশ জনের মধ্যে মাত্র তিনজন নারী বিজ্ঞানী - মাদাম কুরি, আইরিন আর লিজা মাইটনার।


১৯৩৩ সালের সল্‌ভে কনফারেন্সে আইরিন ও মাদাম কুরি

১৯৩৪ সালের শুরুতে আইরিন ও ফ্রেড পুরোদমে কাজ শুরু করেছেন পোলোনিয়াম আর অ্যালুমিনিয়ামের পাত নিয়ে। তাঁরা দেখতে পেলেন পোলোনিয়ামের আলফা পার্টিক্যল অ্যালুমিনিয়ামের সাথে বিক্রিয়া করে নতুন ধরনের তেজষ্ক্রিয়তা তৈরি করছে। কীভাবে হচ্ছে? 

অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষা করে তাঁরা নিশ্চিত হলেন যে পোলোনিয়াম থেকে আলফা পার্টিক্যল বের হয়ে অ্যালুমিনিয়ামের নিউক্লিয়াসের সাথে সংঘর্ষ ঘটায়। তাতে অ্যালুমিনিয়ামের নিউক্লিয়াস থেকে একটি নিউট্রন বেরিয়ে আসে - ফলে অ্যালুমিনিয়াম নিউক্লিয়াস রূপান্তরিত হয় একটি তেজষ্ক্রিয় ফসফরাস নিউক্লিয়াসে। কয়েক মিনিট পর এই তেজষ্ক্রিয় ফসফরাস থেকে একটি পজিট্রন বের হয় - ফসফরাস নিউক্লিয়াস তার তেজষ্ক্রিয়তা হারিয়ে পরিণত হয় একটি সিলিকন নিউক্লিয়াসে। তার মানে তাঁরা কৃত্রিম তেজষ্ক্রিয়তার সন্ধান পেয়েছে!

১৯৩৪ সালের ৪ঠা জুলাই সকালে মাদাম কুরি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

১৯৩৫ সালে রসায়নে নোবেল পুরষ্কার পেলেন আইরিন ও ফ্রেডেরিক জুলিও-কুরি।

নোবেলজয়ী আইরিন ও ফ্রেডেরিক জুলিও-কুরি


নোবেল বক্তৃতা দেবার সময় পদার্থবিজ্ঞানের অংশ বললেন আইরিন, আর রসায়নের অংশ বললেন ফ্রেড। সাংবাদিকদের সব প্রশ্নের উত্তর মহাউৎসাহে ফ্রেডই দিলেন। ফ্রেড প্রশংসা পেতে পছন্দ করেন, মিডিয়া কভারেজ তাঁর খুবই ভালো লাগে। আইরিন কিছুক্ষণ পরেই উৎসাহ হারিয়ে ফেললেন। সংবাদ সম্মেলন শেষে আইরিনকে নোবেল অনুষ্ঠানের কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিলো না। শেষে ফ্রেড নোবেল ফাউন্ডেশানের লাইব্রেরিতে গিয়ে দেখলেন আইরিন এক কোণায় বসে নিবিষ্টমনে বই পড়ছেন।

এদিকে ফ্রান্সে তখন প্রগতিশীল পপুলার ফ্রন্ট ক্ষমতায় এসেছে। সমাজতন্ত্রী প্রেসিডেন্ট লিওন ব্লাম মেয়েদের ক্ষমতায়নে বিশ্বাস করেন। কিন্তু ফ্রান্সে তখনো মেয়েদের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়নি। [ফ্রান্সে মহিলারা ভোট দেয়ার অধিকার পায় ১৯৪৬ সালে।] প্রেসিডেন্ট ব্লাম শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করলেন, শ্রমজীবীদের বেতন ও সুযোগ-সুবিধা বাড়ালেন। 

ফ্রান্সের বিজ্ঞান-গবেষণা বাড়ানোর জন্য প্রফেসর জাঁ পেরির উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ‘ন্যাশনাল ব্যুরো অব সায়েন্টিফিক রিসার্চ’। জাঁ পেরি আইরিনের বাবা-মার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। জাঁ পেরির পরামর্শে প্রেসিডেন্ট ব্লাম ফ্রেডেরিককে ‘ন্যাশনাল ব্যুরো অব সায়েন্টিফিক রিসার্চ’র ডিরেক্টর নিযুক্ত করলেন। আর আইরিন কুরিকে করলেন বিজ্ঞান মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী। আইরিন কুরি হলেন ফ্রান্সের প্রথম মহিলা মন্ত্রী। 

পরদিন প্রেসিডেন্টের অফিসে মন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন আইরিন জুলিও-কুরি। তিনি সহ মোট তিন জন মহিলা মন্ত্রী নিযুক্ত হয়েছেন। আইরিনকে রেডিয়াম ইনস্টিটিউটের গবেষণা থেকে ছুটি নিতে হলো। সম্পূর্ণ নতুন এই প্রশাসনিক কাজে এসে সবকিছু একেবারে গোড়া থেকেই শুরু করতে হলো আইরিনকে। দায়িত্ব নিয়ে তা ঠিকমত পালন না করার মানুষ আইরিন নন।

মন্ত্রীসভায় আইরিনের সততা আর স্পষ্টবাদিতা অনেকেরই অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ালো। ছয় মাস ধরে কাজ করার পরও ডিপ্লোম্যাটিক ভাষা ও আচরণ আয়ত্ত্ব করতে পারলেন না আইরিন। তিনি বুঝতে পারছেন তাঁর একার পক্ষে পুরো সিস্টেম বদলানো সম্ভব নয়। তাঁর মনে হচ্ছে তিনি ভুল জায়গায় এসে পড়েছেন, তাঁর বদলে ফ্রেড মন্ত্রী হলেই ভালো করতেন। কারণ ফ্রেড ক্ষমতার স্বাদ বোঝেন।

আইরিনের ইচ্ছে করছে বাবা-মার মতো সরবোনের প্রফেসর হতে। প্রফেসর হবার সব যোগ্যতা তাঁর আছে। নোবেল পুরষ্কার পাবার পর পৃথিবীর যে কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর হতে পারেন তিনি। কিন্তু সরবোনের প্রফেসরশিপ পেতে হলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন লাগে। আইরিন ভাবলেন তিনি যদি এখন দরখাস্ত করেন তাহলে তাঁর সহকর্মী শিক্ষামন্ত্রী কোন কিছু না দেখেই তাঁকে অনুমোদন দিয়ে দেবেন। এটা অনুচিত হবে ভেবে তিনি মন্ত্রীত্বে ইস্তফা দিলেন। মন্ত্রীপরিষদের সবাই হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন।

আইরিন রেডিয়াম ইনস্টিটিউটের পুরনো পদে ফিরে গেলেন। সেখান থেকে সরবোনে প্রফেসর পদের জন্য দরখাস্ত করলেন এবং সমস্ত আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে সরবোনের প্রফেসর পদে যোগ দিলেন। রেডিয়াম ইনস্টিটিউটের পদটিও তাঁর থাকলো। অধ্যাপনা ও গবেষণার জগতে ফিরে এলেন আইরিন। কিন্তু ফ্রেডের সাথে যৌথ গবেষণা আর সম্ভব হলো না। ফ্রেড ‘কলেজ দ্য ফ্রেঞ্চ’ ও ‘ব্যুরো অব সায়েন্টিফিক রিসার্চ’ নিয়ে ব্যস্ত। ফ্রেড ‘ল্যাবরেটরি অব অ্যাটমিক সিন্থেসিস’ নামে নতুন একটা গবেষণাকেন্দ্র তৈরি করেছেন। অ্যাটমিক নিউক্লিয়াস সংক্রান্ত নতুন নতুন গবেষণা চলছে সেখানে। ফ্রান্সের নিউক্লিয়ার গবেষণা পরিচালিত হচ্ছে আইরিন ও ফ্রেডেরিকের হাত দিয়ে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ফ্রেডেরিক যুদ্ধে যোগ দেন। ছেলে-মেয়ে ও আইরিনকে পাঠিয়ে দেন সুইজারল্যান্ডে। ফ্রেডের নেতৃত্বে ফ্রান্সে গঠিত হয় পারমাণবিক গবেষণাগার। যুদ্ধের পর ফ্রেড ফ্রান্সের হিরো হয়ে গেলেন। ‘কমান্ডার অব দি লিজিয়ন অব অনার’ নিযুক্ত হলেন তিনি। ১৯৪৬ সালে পারমাণবিক শক্তির নিয়ন্ত্রণের জন্য ‘অ্যাটমিক এনার্জি কমিশন’ গঠিত হলো। ফ্রেড কমিশনের চেয়ারম্যান নিযুক্ত হলেন, আইরিন কমিশনের সদস্য মনোনীত হলেন। ফ্রেড কমিশনের প্রশাসনিক কাজে তাঁর দক্ষতার ছাপ রাখতে শুরু করেছেন, আইরিন বৈজ্ঞানিক দিক দেখাশোনা করেন।

১৯৫০ এর দিকে ফরাসি সরকারের ওপর আমেরিকান সরকারের প্রভাব ও চাপ বাড়তে শুরু করেছে। আমেরিকান সরকার কমিউনিস্ট ফোবিয়ায় ভুগছে। তার ধারাবাহিকতায় ১৯৫০ সালের ২৮শে এপ্রিল ফ্রেঞ্চ অ্যাটমিক এনার্জি কমিশন থেকে ফ্রেডকে বরখাস্ত করা হলো। ফ্রেডের অপরাধ - তিনি ফ্রান্সের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য। মানসিকভাবে খুব হতাশ হয়ে পড়লেন ফ্রেড। তাঁর শরীরেও তেজষ্ক্রিয়তার প্রভাব দেখা দিতে শুরু করেছে। খুবই অসুস্থ হয়ে পড়লেন ফ্রেড। 

অ্যাটমিক এনার্জি কমিশন থেকে আইরিনকে বরখাস্ত করা না হলেও ১৯৫১ সালের ১০ই জানুয়ারি তাঁর মেয়াদ শেষ হবার পর তাঁকে কমিশন থেকে বাদ দেয়া হয়। সরবোন বিশ্ববিদ্যালয় এবং রেডিয়াম ইনস্টিটিউটের ডিরেক্টরের পদ এখনো আছে তাঁর। কিন্তু শরীর তাঁরও খুব খারাপ। এক সময়ের এত ভালো অ্যাথলিট আইরিন নানারকম রোগে ভুগছেন।

১৯৫৫ সালে লিউকেমিয়া ধরা পড়ে আইরিনের। সারাজীবন এক্স-রে আর রেডিয়াম পোলোনিয়ামের তেজষ্ক্রিয়তার সাথে থাকতে থাকতে ব্লাড-ক্যান্সার হয়ে গেছে তাঁর। হাসপাতালে ভর্তি হতে হলো তাঁকে। 
১৯৫৬ সালের ১৭ই মার্চ মারা যান আইরিন জুলিও-কুরি। 

তথ্যসূত্র:
প্রদীপ দেব, রেডিয়াম ভালোবাসা, মীরা প্রকাশন, ঢাকা, ২০১৪। 




4 comments:

  1. অসাধারণ উপস্থাপন। অনেক কিছু জানতে পারলাম। ধন্যবাদ লেখক কে।

    ReplyDelete
  2. আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ লেখাটি পড়ার জন্য।

    ReplyDelete
  3. বিজ্ঞান নিয়ে তথ্যবহুল স্বতঃস্ফূর্ত আরামদায়ক লেখা।পড়ে খুব ভালো লাগলো।ধন্যবাদ প্রদীপ দেব স্যারকে।ভালবাসা আর শুভেচ্ছা নিবেন।

    ReplyDelete
  4. অনেক ধন্যবাদ আপনাকেও লেখাটি পড়ার জন্য।

    ReplyDelete

Latest Post

Memories of My Father - Part 6

  The habit of reading books was instilled in us from a young age, almost unknowingly. There was no specific encouragement or pressure for t...

Popular Posts