Tuesday, 20 October 2020

যে গ্রহে সূর্য উঠে পশ্চিম দিকে - পর্ব ২

 


দ্বিতীয় অধ্যায়

সূর্যের দ্বিতীয় গ্রহ

 

আমাদের সৌরজগতের গ্রহগুলো সূর্যকে কেন্দ্র করে সূর্যের চারপাশে ঘুরছে। সূর্য থেকে দূরত্বের ভিত্তিতে বুধের পরেই শুক্র গ্রহের অবস্থান। সে হিসেবে সূর্যের দ্বিতীয় গ্রহ হলো শুক্র। পৃথিবী গ্রহের একদিকে আছে শুক্র গ্রহ, আর অন্যদিকে আছে মঙ্গল গ্রহ। শুক্র ও মঙ্গল - পৃথিবীর এই দুই প্রতিবেশীর মধ্যে শুক্র গ্রহই হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে কাছের গ্রহ। সূর্য ও চাঁদের পর শুক্রই হলো সবচেয়ে উজ্জ্বল বস্তু যা নিয়মিতভাবে পৃথিবীর আকাশে আলো ছড়ায়।

          শুক্র গ্রহ দূরত্বের ভিত্তিতে পৃথিবীর সবচেয়ে কাছের গ্রহ তো বটেই, আরো অনেক বৈশিষ্ট্যেও শুক্র ও পৃথিবী খুবই কাছাকাছি। শুক্র গ্রহের ভর পৃথিবীর ভরের 82%, ব্যাস পৃথিবীর ব্যাসের 95%। শুক্র গ্রহের উপাদানের গড় ঘনত্ব পৃথিবীর উপাদানের গড় ঘনত্বের প্রায় সমান। সৌরজগতের অন্য কোন গ্রহের সাথে আমাদের পৃথিবীর এত মিল নেই। আকার আয়তন ঘনত্বে পৃথিবীর সাথে এত মিলের কারণেই শুক্রকে পৃথিবীর জমজ বোন বলা হয়ে থাকে। কিন্তু পৃথিবীর পরিবেশের সাথে তার পরিবেশের তেমন কোন মিল নেই। শুক্র গ্রহের আবহাওয়া ও পরিবেশ এতটাই বিষাক্ত যে তাকে অনেকেই নরক বা দোজখের পরিবেশের সাথে তুলনা করে থাকে। শুক্র সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা এপর্যন্ত যা কিছু জেনেছেন তার মধ্য থেকে সবচেয়ে দরকারি বিষয়গুলো একে একে বলছি তোমাদের। শুরুতেই দেখা যাক সৌরজগৎ ও তার গ্রহগুলোর উৎপত্তি কীভাবে হলো।


সূর্য ও তার গ্রহগুলোর উৎপত্তি

সাড়ে চারশ' কোটি বছর আগে আমাদের সূর্য এবং তার গ্রহগুলোর কোন অস্তিত্ব ছিলো না। কিন্তু মহাবিশ্বের উৎপত্তি হয়ে গেছে আরো এক হাজার কোটি বছর আগে বিগ ব্যাং বা মহাবিস্ফোরণের মাধ্যমে। মহাবিস্ফোরণের আগে প্রকৃতির সবগুলো ফোর্স বা বল একসাথে মিলেমিশে সমন্বিত অবস্থায় ছিল। তাকে ইউনাইটেড ফোর্স বা সমন্বিত বল বলা হয়। বিগ ব্যাং সংঘটিত হবার কয়েক মিনিটের মধ্যেই মহাবিশ্ব দ্রুত বড় হতে শুরু করে এবং ইউনিফাইড ফোর্স বা সমন্বিত বল থেকে গ্র্যাভিটি বা মহাকর্ষ বল[1] আলাদা হয়ে যায়।

          মহাবিশ্বে তখন যে পদার্থগুলোর অস্তিত্ব ছিল তাদের বেশিরভাগই ছিল ডার্ক ম্যাটার বা কৃষ্ণ পদার্থ। ডার্ক ম্যাটার দেখা যায় না। প্রচন্ড  তাপেও এগুলো থেকে কোন আলো বের হয় না। কিন্তু পারমাণবিক পদার্থ বা প্রচলিত পদার্থ যেগুলো দেখা যায় - সেগুলো উত্তপ্ত হলে আলো বিকিরণ করে। মহাবিস্ফোরণে যে প্রচণ্ড শক্তি-প্রবাহ সৃষ্টি হয়েছিলো তাতে বেশিরভাগ পদার্থ এবং কৃষ্ণ-পদার্থ দূরে দূরে সরে গেলেও সামান্য কিছু পদার্থ পরস্পরের কাছাকাছি রয়ে গিয়েছিল। এগুলো থেকেই পরবর্তীতে সব গ্যালাক্সি এবং নক্ষত্র গঠিত হয়েছে।

          মহাবিস্ফোরণের পর এক হাজার কোটি বছরে কোটি কোটি গ্যালাক্সি তৈরি হয়ে গেছে এবং সেই গ্যালাক্সিগুলোতে জন্ম নিয়েছে অসংখ্য নক্ষত্রপুঞ্জ। সেই নক্ষত্রগুলোর মধ্য থেকে অনেক নক্ষত্র আবার ধ্বংসও হয়ে গেছে সেখানে। তাদের ধ্বংসাবশেষ থেকে জন্ম নিয়েছে আরো সূর্য-গ্রহ-উপগ্রহ ইত্যাদি। বিগ-ব্যাং ছাড়া বাকি সব মহাজাগতিক ঘটনাই ঘটেছে গ্যালাক্সির ভেতর। আমাদের সূর্য যে গ্যালাক্সিতে জন্ম নিয়েছে তার নাম মিল্কিওয়ে।

          মিল্কিওয়েকে মহাকাশে বিশাল আকৃতির একটা চাকতি বলা যায় যেখানে রয়েছে কোটি কোটি নক্ষত্র। এই চাকতিটা এত বড় যে এর একদিক থেকে অন্যদিকে আলো যেতে সময় লেগে যায় প্রায় এক লক্ষ বছর। অর্থাৎ এর ব্যাস এক লক্ষ আলোকবর্ষ।[2] গ্যালাক্সির মাঝখানে ডিমের কুসুমের মতো উঁচু গোলাকার একটা জায়গা আছে যার ব্যাস তেইশ হাজার আলোকবর্ষ। গ্যালাক্সির বাইরের দিকের একটা অংশ চাকার মতো ঘুরছে। চাকাটির পুরুত্ব প্রায় এক হাজার আলোকবর্ষ। মিল্কিওয়ের ভেতর আছে কোটি কোটি নক্ষত্র যাদের বেশিরভাগই আকার আয়তনে সূর্যের মতো। কোন কোনটা সামান্য বড়, আবার কোন কোনটা সামান্য ছোট। কোটি কোটি নক্ষত্র এক সাথে আছে বলে ভেবো না যে তারা সব গাদাগাদি করে আছে। গ্যালাক্সিগুলো এত বড় যে একটা সূর্য থেকে অন্য সূর্যের মধ্যে যে দূরত্ব তাতে একটার আলো অন্যটাতে যেতে কয়েক বছর লেগে যায়।

          এই গ্যালাক্সির মাঝখানে যে দ্বীপ আছে সেখানে যেসব নক্ষত্র আছে তাদের বেশিরভাগই বুড়ো নক্ষত্র। তাদের আশেপাশে কোন গ্যাস বা নক্ষত্রের ধূলো নেই যা দিয়ে নতুন নক্ষত্র বা গ্রহ তৈরি হতে পারে। কিন্তু গ্যালাক্সির চাকতির বাইরের দিকে হলো নক্ষত্রের নার্সারি। সেখানে শিশু নক্ষত্র থেকে বয়স্ক নক্ষত্র সবাই আছে। আছে নতুন নক্ষত্র তৈরি হবার প্রচুর মাল-মসলা গ্যাস আর পুরনো নক্ষত্রের ধ্বংসাবশেষ।

          মিল্কিওয়ের সবচেয়ে বুড়ো নক্ষত্রের বয়স প্রায় বারোশ' কোটি বছর। বিগ-ব্যাং ঘটেছিলো প্রায় সাড়ে চৌদ্দশ' কোটি বছর আগে। তার মানে বিগ-ব্যাং ঘটার আড়াই শ' কোটি বছরের মধ্যেই নক্ষত্র তৈরি হয়ে গিয়েছিল। বিজ্ঞানীরা আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে হিসেব করে দেখেছেন যে সূর্য ও তার গ্রহগুলোর বয়স সাড়ে চারশ' কোটি বছরের বেশি নয়। তার মানে আমাদের সৌরজগৎ তৈরি হবার আগের সাড়ে আটশো কোটি বছরের মধ্যে আরো অনেক সূর্যের জন্ম হয়েছে, মৃত্যু হয়েছে। সে হিসেবে সৌরজগৎ সৃষ্টি প্রকৃতির কোন নতুন ঘটনা নয়।

          বিগ-ব্যাং এর পর যে বিশাল কসমিক ওয়েভ বা মহাজাগতিক তরঙ্গের সৃষ্টি হয়েছিল তার কিছুটা এখনো এই সাড়ে চৌদ্দ শ' কোটি বছর পরেও মহাকাশে রয়ে গেছে। এগুলোকে কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড রেডিয়েশান বলা হয়। জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এসব তরঙ্গ বিশ্লেষণ করে প্রমাণ পেয়েছেন যে বিগ-ব্যাং থেকে যেসব পারমাণবিক পদার্থ সৃষ্টি হয়েছিল তার শতকরা 75 ভাগই ছিলো হাইড্রোজেন আর মাত্র 25 ভাগ ছিলো হিলিয়াম। তাছাড়া সৃষ্টি হয়েছিল বিপুল পরিমাণ ডার্ক ম্যাটার যেগুলো দেখা যায় না।

          প্রথম দিকের নক্ষত্রগুলো তৈরি হয়েছিল হাইড্রোজেন ও হিলিয়ামের সমন্বয়ে। পরে নক্ষত্রগুলো নিজেদের অভিকর্ষজ চাপে বিস্ফোরিত হয়েছে। প্রত্যেকটা নক্ষত্রই একেকটা পারমাণবিক চুল্লির মতো যাদের ভেতর চলে পারমাণবিক বিক্রিয়া। নক্ষত্রের বিস্ফোরণের ফলে আরো গ্যাস ও নতুন যৌগ যোগ হয় মহাকাশে। মহাকাশে সেগুলো ভাসতে থাকে বছরের পর বছর। তারপর অন্য কোন নক্ষত্রের বিস্ফোরণ ঘটলে যে তরঙ্গের সৃষ্টি হয় সেই তরঙ্গের প্রভাবে ভাসমান গ্যাস ও অন্যান্য যৌগ পরস্পরের কাছে চলে আসে। মহাকর্ষ বলের প্রভাবে তারা একে অপরের সাথে মিশে গ্যাসপিন্ডে পরিণত হয়।

          অভিকর্ষজ বলের প্রভাবে পদার্থগুলো কেন্দ্রের দিকে আকৃষ্ট হয়। ফলে পিন্ডের ভেতরের চাপ বেড়ে যায়। চাপ বাড়লে তাপও বাড়তে থাকে। এই চাপ ও তাপের ফলে ভেতরের হাইড্রোজেন পরমাণুগুলো এমনভাবে একে অপরের সাথে বিক্রিয়ায় লিপ্ত হয় যে তারা পরস্পর মিশে গিয়ে হিলিয়ামে পরিণত হয়। এই পারমাণবিক প্রক্রিয়াকে নিউক্লিয়ার ফিউশান বলে। প্রচুর তাপ ও শক্তি উৎপন্ন হয় ফিউশান প্রক্রিয়ায়। এই শক্তির ফলে পিন্ড থেকে গ্যাসগুলো বাইরের দিকে চলে যেতে চায়। কিন্তু অভিকর্ষজ বল সেগুলোকে পিন্ডের কেন্দ্রের দিকে টেনে রাখে। ফলে গ্যাসপিন্ড সংকুচিত হতেও পারে না আবার বাইরের দিকে বেরিয়ে ফেটে যেতেও পারে না। এভাবে নক্ষত্র টিকে যায়। তাদের ভেতরের পারমাণবিক চুল্লি তাপ ও আলো তৈরি করতে থাকে।

          নক্ষত্রের জ্বালানি যখন শেষ হয়ে যায় - তখন ভেতরের অভিকর্ষজ বলের টানে নক্ষত্রটি ভেতরের দিকে এমন জোরে চুপসে যায় যে ফাটা বেলুনের মতো ভেতরের উপাদানগুলো বাইরে ছিটকে পড়ে। ওগুলো তখন মিল্কিওয়েতে ভাসতে থাকে। পরে কোন এক সময় এগুলো থেকে আবার নতুন নক্ষত্রের জন্ম হয়। সেই নতুন নক্ষত্রের ভেতর শুধু হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম থাকে না, তাদের চেয়ে কিছুটা ভারী পদার্থও থাকে। নক্ষত্র যত বড় হয় তত দ্রুত শেষ হয়ে যায় তাদের ভেতরের জ্বালানি এবং তত দ্রুত ধ্বংস হয়ে যায় তারা। তাদের ধ্বংস হয়ে যাবার সময় বিরাট বিস্ফোরণ ঘটে। তাতে আরো কিছু নতুন পদার্থ মিল্কিওয়েতে ছিটকে পড়ে। পরের প্রজন্মের নক্ষত্রে এই নতুন পদার্থগুলো পাওয়া যায়।

          এভাবে নক্ষত্রের সৃষ্টি ও ধ্বংসের মাধ্যমে মহাবিশ্বে তৈরি হয়েছে প্রচুর হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম। হাইড্রোজেনের রাসায়নিক ক্রিয়ায় তৈরি হয়েছে আরো কিছু মৌলিক পদার্থ - কার্বন, অক্সিজেন, সিলিকন ইত্যাদি। আমাদের সৌরজগৎ তৈরি হবার আগে অসংখ্য নক্ষত্রের সৃষ্টি ও ধ্বংস হয়েছে। মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিতে বছরে গড়ে দশ থেকে বিশটি নক্ষত্রের জন্ম ও মৃত্যু হয়। আমাদের সূর্যের জন্মের আগের আট শ' কোটি বছরে কমপক্ষে আট হাজার কোটি নক্ষত্রের সৃষ্টি ও ধ্বংস হয়েছে। এগুলো থেকে তৈরি হয়েছে বিপুল পরিমাণ নক্ষত্র-নির্মাণ-সামগ্রী যেখানে রয়েছে অনেক ভারী তেজষ্ক্রিয় মৌল। তবে বেশির ভাগ নক্ষত্রে হাইড্রোজেন ও হিলিয়ামের প্রাধান্যই বেশি দেখা যায়। কারণ হাইড্রোজেন ও হিলিয়ামের মধ্যেই নিউক্লিয়ার ফিউশান তুলনামূলকভাবে বেশি ঘটে।

          সাড়ে চারশো কোটি বছর আগে মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির একপাশে ভাসমান নক্ষত্র-নির্মাণ-সামগ্রীগুলোর মধ্যে আলোড়ন সৃষ্টি হলো। অন্য নক্ষত্রের বিস্ফোরণের ফলে যে তরঙ্গ তৈরি হয়েছে তার মাধ্যমে এবং মহাকর্ষ বলের প্রভাবে পদার্থগুলো পরস্পর কাছে এসে আস্তে আস্তে ঘুরতে ঘুরতে একটা পিন্ড তৈরি হলো। এই পিন্ড ক্রমশ বড় হতে হতে তৈরি হলো আমাদের সূর্য। সূর্য তৈরি হতে এক শ' কোটি বছর পর্যন্ত সময় লেগে যায়।[3] আমাদের সূর্য যেখানে তৈরি হয়েছে সেই জায়গাটা মিল্কিওয়ের কেন্দ্র থেকে চাকতির প্রান্তের দূরত্বের তিন ভাগের দুই ভাগ দূরত্বে গ্যালাক্সির পুরুত্বের মাঝামাঝি অবস্থিত।

          আমাদের পুরো সৌরজগতের উপাদানগুলোর শতকরা 70.1 ভাগ হাইড্রোজেন, 27.9 ভাগ হিলিয়াম এবং 0.9 ভাগ অক্সিজেন। বাকি 1.1 ভাগ হলো অন্যান্য ভারী মৌলিক পদার্থ। হাইড্রোজেন ও হিলিয়ামের পরিমাণের তুলনায় এগুলোর পরিমাণ এত কম যে এদেরকে সরাসরি হিসেব না করে একটু অন্যভাবে হিসেব করা হয়। এখানে প্রতি 70টি অক্সিজেন পরমাণুর বিপরীতে আছে মাত্র 40টি কার্বন, 5টি সিলিকন, 4টি ম্যাগনেসিয়াম, 4টি নিয়ন, 3টি লোহা ও 2টি সালফার পরমাণু। অন্যান্য উপাদানগুলোর পরিমাণ আরো কম। এক কোটি সালফারের পরমাণুর তুলনায় সোনার পরমাণু আছে মাত্র তিনটি। সৌরজগতে সোনার পরিমাণ এত কম বলেই হয়তো সোনার এত দাম। সূর্য ও অন্যান্য গ্রহগুলোর মধ্যে পদার্থের পরিমাণের গড় হিসেব এরকম। কিন্তু আমাদের পৃথিবীতে পদার্থের পরিমাণের ব্যাপারটা একটু ভিন্ন।      

          সূর্য মিল্কিওয়ের চারপাশে ঘুরছে। একবার ঘুরে আসতে তার সাড়ে বাইশ কোটি বছর সময় লাগে। মিল্কিওয়ের চারপাশে সূর্যের বেগ সেকেন্ডে প্রায় 220 কিলোমিটার। তার মানে সূর্য ঘন্টায় 7 লক্ষ 92 হাজার কিলোমিটার বেগে ছুটছে। সূর্য নিজের অক্ষের ওপর নিজের চারপাশেও ঘুরছে। নিজের চারপাশে একবার ঘুরতে সূর্যের সময় লাগে 27 থেকে 35 দিন।

 

চিত্র 1: সূর্য ও তার গ্রহগুলোর উৎপত্তি

 

সূর্য তৈরি হবার সময়েই তার ঘূর্ণনের ফলে চারপাশে গ্যাস ও মহাজাগতিক ধুলোর একটা বিশাল চাকতির মতো তৈরি হয়েছে। এর উপাদানগুলোর শতকরা 98 ভাগ হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম এবং বাকি সব পদার্থ মিলিয়ে শতকরা মাত্র দুই ভাগ। হিলিয়াম নিষ্ক্রিয় গ্যাস বলে অন্য কোন পদার্থের সাথে তার কোন ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া নেই। তাই সব হিলিয়াম গ্যাস হিসেবে রয়ে গেছে। হাইড্রোজেন অন্য মৌলের সাথে রাসায়নিক ক্রিয়া করে। ফলে তৈরি হলো পানি, মিথেন, অ্যামোনিয়া ইত্যাদি। কিন্তু আশেপাশে কার্বন, অক্সিজেন ইত্যাদি খুব বেশি নেই। ফলে বেশিরভাগ হাইড্রোজেনও গ্যাস হিসেবেই রয়ে গেলো। সূর্য তৈরি হবার সময় বেশিরভাগ হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম সূর্যের ভেতর ঢুকে গেলো। তারপরও কিছু অবশিষ্ট রয়ে গিয়েছিল। সেই অবশিষ্ট উপাদান থেকে তৈরি হয়েছে সূর্যের গ্রহগুলো।

          নতুন সূর্য তৈরি হবার পর আস্তে আস্তে উত্তপ্ত হতে শুরু করেছে। অভিকর্ষ বলের পরিমাণ বাড়তে শুরু করেছে। তার ঘূর্ণনের বেগও বাড়তে শুরু করেছে। ফলে সূর্যের চারপাশে সৌরতরঙ্গের সৃষ্টি হয়েছে। এই তরঙ্গের ঝড়ে সূর্যের চারপাশের হালকা গ্যাসগুলো উড়ে চলে গেলো অনেক দূরে - বলয়ের বাইরের দিকে। অপেক্ষাকৃত ভারি পদার্থগুলো রয়ে গেলো কাছাকাছি বলয়ে। সেখানে অক্সিজেন, কার্বন, নাইট্রোজেন ইত্যাদি সামান্য পরিমাণে যেগুলো আছে সেগুলো নিজেদের সাথে ক্রিয়া-বিক্রিয়া করে বিভিন্ন রকমের ছোট ছোট যৌগে পরিণত হয়েছে। কিন্তু সূর্য যখন ক্রমশ উত্তপ্ত হচ্ছিলো ভেতরের গ্যাসগুলো গরম হয়ে ক্রমশ বাইরের দিকে চলে যাচ্ছিলো এবং একটা পদার্থের স্রোত বয়ে যাচ্ছিলো সুর্যের কেন্দ্র থেকে পরিধির দিকে। বাইরের দিকে গিয়ে এই গ্যাসগুলো বড় বড় গ্যাসপিন্ডে পরিণত হলো। যার ফলে তৈরি হলো বিশাল গ্যাসীয় গ্রহগুলো - বৃহস্পতি, শনি, ইউরেনাস, নেপচুন।

          একটু ভারী কণাগুলো যেগুলো ভেতরের বলয়ে রয়ে গিয়েছিল তারা একে অপরের গায়ে লেগে গিয়ে এবং নিজেদের মধ্যে মহাকর্ষ বলের প্রভাবে ছোট ছোট পিন্ডে পরিণত হলো। ক্রমশ এগুলো একে অপরের সাথে মিশে বড় হতে থাকলো এবং ভারী হতে থাকলো। প্রায় এক লক্ষ বছর লাগলো এই ছোট ছোট পিন্ডগুলো মিলে এক কিলোমিটার ব্যাসের পিন্ডে পরিণত হতে। এগুলোকে গ্রহের কণা বা প্ল্যানেটেসিম্যাল (planetesimal) বলা হয়। এগুলো ঘুরতে ঘুরতে ক্রমশ বড় হয়ে গ্রহে পরিণত হয়েছে।

          সূর্যের আটটি গ্রহকে কঠিন এবং গ্যাসীয় - এই দু'ভাগে ভাগ করা যায়। সূর্যের চারটি কঠিন গ্রহ হলো বুধ, শুক্র, পৃথিবী ও মঙ্গল। আর চারটি গ্যাসীয় গ্রহ হলো - বৃহস্পতি, শনি, ইউরেনাস ও নেপচুন। আগে প্লুটোকেও সূর্যের গ্রহ হিসেবে ধরা হতো। কিন্তু প্লুটো এখন আর গ্রহের মর্যাদা পাচ্ছে না।

 

     


  চিত্র 2: সৌরজগৎ ও কুইপার বেল্ট

 

গ্যাসীয় গ্রহগুলোর পরে সূর্যের চারদিকে আরেকটি বলয় দেখা যায়। খুবই ঠান্ডা একটা বলয়। এই বলয় বা বেল্টের নাম কুইপার বেল্ট (Kuiper belt)। আমেরিকান জ্যোতির্বিজ্ঞানী জেরার্ড কুইপারের নাম অনুসারে এই বেল্টের নাম রাখা হয়েছে 1990 সালে।  এই কুইপার বেল্টে গ্রহের মতো অনেক জমাট ঠান্ডা বস্তুপিন্ড ঘুরে বেড়াচ্ছে সৌরজগতের চারপাশে।

          1930 সালে প্লুটো আবিষ্কৃত হবার পর প্লুটোকে সূর্যের নবম গ্রহ বলে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছিল। কিন্তু 1992 সালে কুইপার বেল্টে প্লুটোর মতো অসংখ্য ছোট ছোট বস্তুপিন্ড দেখা যায়। তখন বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন যে এতগুলো গ্রহ একই জায়গায় একসাথে তো থাকতে পারে না। প্রশ্ন ওঠে - প্লুটোকে গ্রহ বলা হবে কিনা। 2005 সালে কুইপার বেল্টে আবিষ্কৃত হয় আরেকটি বস্তুপিন্ড - যার নাম এরিস। এরিস আয়তনে প্লুটোর চেয়ে বড়। প্লুটো গ্রহ হলে এরিসকেও তো গ্রহ বলতে হয়। 2006 সালে ইন্টারন্যাশনাল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটি বা আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিজ্ঞান সমিতি প্রাগে একটা জরুরি মিটিং ডাকে। সেই মিটিং-এ সিদ্ধান্ত হয় - গ্রহ হিসেবে স্বীকৃতি পাবার প্রধান শর্ত কী কী হবে। বিজ্ঞানীরা ঠিক করলেন যে গ্রহ আমরা তাদেরই বলবো:

  • যারা সূর্যের চারপাশে নিজ নিজ কক্ষপথে অবিরাম ঘুরছে।
  • যাদের কমপক্ষে এমন ভর আছে যার ফলে তাদের আকার হবে গোলকের মতো।
  • যাদের আলাদা কক্ষপথ আছে - অর্থাৎ সূর্যের চারপাশে তারা যে পথে ঘুরবে সেই পথে আর কোনকিছু থাকবে না। 

দেখা গেলো প্লুটো শেষের শর্তটি মোটেও পূরণ করতে পারছে না। ফলে প্লুটো গ্রহের মর্যাদা হারিয়ে এখন কুইপার বেল্টের অন্যান্য বস্তুপিন্ডের মতো একটা বস্তুপিন্ড মাত্র। প্লুটোকে এখন ডোয়ার্ফ প্ল্যানেট বা বামন গ্রহও বলা হয়। 

 

 

চিত্র 3: বুধ, শুক্র, পৃথিবী ও মঙ্গলের তুলনামূলক অবস্থান ও আয়তন


সৌরজগতের গ্রহগুলোর আকার, আয়তন, সূর্য থেকে দূরত্ব, ভর ইত্যাদি একেক গ্রহের একেক রকম। এদের তৈরি হতেও সময় লেগেছে সর্বনিম্ন চল্লিশ হাজার বছর থেকে সর্বোচ্চ এক শ' কোটি বছর পর্যন্ত। আমরা যেহেতু পৃথিবীতে বাস করি তাই অন্যান্য গ্রহগুলোকে পৃথিবীর সাথে তুলনা করলে আমাদের বুঝতে সুবিধা হয়। নিচের সারণিতে সবগুলো গ্রহের একটা তুলনামূলক তথ্যচিত্র দেয়া হলো।

 

সারণি 1: সৌরজগতের গ্রহগুলোর তুলনামূলক তথ্য

 

বুধ

শুক্র

পৃথিবী

মঙ্গল

বৃহস্পতি

শনি

ইউরেনাস

নেপচুন

 

সূর্য থেকে দূরত্ব (কোটি কি.মি)

 

 

5.8

 

 

10.8

 

 

15.0

 

 

22.8

 

 

77.8

 

 

143.0

 

 

287.0

 

 

449.7

তৈরি হতে সময় লেগেছে (বছর)

 

80 হাজার

 

40 হাজার

 

1 লাখ 10 হাজার

 

2 লাখ

 

10 লাখ

 

90 লাখ

 

30 কোটি

 

100 কোটি

পৃথিবীর তুলনায় ভর

 

0.055

 

0.82

 

1

 

0.11

 

317.94

 

95.18

 

14.53

 

17.14

ঘনত্ব (g/cm3)

5.43

5.25

5.52

3.95

1.33

0.69

1.29

1.64

পৃথিবীর তুলনায় ব্যাস

 

0.38

 

0.95

 

1

 

0.53

 

11.2

 

9.45

 

4.01

 

3.88

পৃথিবীর তুলনায় আয়তন

 

0.056

 

0.86

 

1

 

0.95

 

1236

 

689

 

63.1

 

57.7

পৃথিবীর তুলনায় g এর মান *

 

0.28

 

0.88

 

1

 

0.38

 

2.34

 

0.93

 

0.79

 

1.12

চাঁদের সংখ্যা

0

0

1

2

67

62

27

14

পৃথিবীর তুলনায় দিনের দৈর্ঘ্য

 

176 দিন

 

243 দিন

 

1 দিন

 

1 দিন

 

9.92 ঘন্টা

 

10.77 ঘন্টা

 

17.24 ঘন্টা

 

16.1 ঘন্টা

গড় তাপ-

মাত্রা (C)

170

470

22

-63

-130

-130

-205

-220

*g= অভিকর্ষজ ত্বরণ


[1] মহাকর্ষ বলের সূত্র আবিষ্কার করেন স্যার আইজাক নিউটন ১৬৮৭ সালে। মহাবিশ্বের সব গ্রহ-নক্ষত্র একে অপরকে একটা বল দ্বারা পরস্পরের কেন্দ্রের দিকে আকর্ষণ করে। এই বলের নাম মহাকর্ষ বল। দুটো বস্তুর মধ্যে এই বলের পরিমাণ বস্তু দুটোর ভরের গুণফলের সমানুপাতিক এবং তাদের মধ্যকার দূরত্বের বর্গের বিপরীত অনুপাতিক। তার মানে বস্তু যত ভারী হবে তাদের মধ্যে মহাকর্ষ বলের পরিমাণ তত বেশি হবে। আর বস্তু দুটোর দূরত্ব যত বেশি হবে তাদের মধ্যে আকর্ষণের পরিমাণ তত কম হবে। আবার গ্রহ-উপগ্রহগুলোর সব পদার্থকে তারা তাদের অভিকর্ষজ বল দ্বারা তাদের কেন্দ্রের দিকে টেনে রাখে। সে কারণেই কোন কিছু উপর দিকে ছুঁড়ে দিলে তা কেন্দ্রের দিকে অর্থাৎ নিচের দিকে নেমে আসে।

[2] আলো এক সেকেন্ডে তিন লক্ষ কিলোমিটার হিসেবে এক বছর সময়ে যতদূর যেতে পারে সেই দূরত্বকে এক আলোকবর্ষ বলা হয়। এক আলোকবর্ষ = ৯৪,৬০৮ কোটি কিলোমিটার।

[3] সূর্য সম্পর্কে বিস্তারিত জানার জন্য পড়ো প্রদীপ দেবের 'অর্ক ও সূর্যমামা' মীরা প্রকাশন, ঢাকা, ২০১৫।

পর্ব - ৩

Sunday, 18 October 2020

যে গ্রহে সূর্য উঠে পশ্চিম দিকে - পর্ব ১


শুকতারা তারা নয়

ক্লাসের ফার্স্টবয় হওয়ার বেশ কিছু সুবিধা আছে। যেমন ক্লাসের মনিটর হয়ে সবার ওপর দাপট দেখানো যায়, প্রতিদিন ফার্স্টবেঞ্চে বসা যায়, টিচারদের কাছে গুরুত্ব পাওয়া যায়, ইচ্ছে করলেই যখন যাকে খুশি তার নামে নালিশ করা যায়, সহপাঠীদের ধমক দেয়া যায়, যখনখুশি টিচার্স রুমে যাওয়া যায়। এই সবগুলো সুবিধাই আমি ভোগ করে আসছি গত সাত বছর ধরে। শিশুশ্রেণি থেকে শুরু করে এপর্যন্ত কোন ক্লাসেই আমি সেকেন্ড হইনি। ফারজানা যতই চেষ্টা করুক, পরীক্ষায় আমার চেয়ে বেশি নম্বর পাওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়। এটা আমি চ্যালেঞ্জ করে বলতে পারি। কিন্তু বলছি না, কারণ তাতে তোমরা মনে করবে আমি অহংকারী। অনেকেই আমাকে অহংকারী বলে মনে করে। কিন্তু কী করা যাবে বলো, ভালো স্টুডেন্টদের এই অপবাদ সহ্য করতেই হয়। আমি যেটাকে আমার আত্মবিশ্বাস বলে মনে করি, অন্যরা ভাবে সেটা আমার অহংকার। এক্সট্রাঅর্ডিনারি ভালো স্টুডেন্টদের কোন সত্যিকারের বন্ধু থাকে না। আমারও নেই। যারা আমার কাছাকাছি থাকতে চায় তারা আমার মোসাহেবি করে। সেটা আমার ক্ষমতার কারণে। ক্লাসে আমার অনেক ক্ষমতা। ক্ষমতাশালীরা যেভাবে ক্ষমতার স্বাদ উপভোগ করে, আমিও করে আসছিলাম এতদিন। কিন্তু আফতাব স্যার ক্লাসটিচার হয়ে আসার পর আমার ক্ষমতা কেমন যেন বিস্বাদ হয়ে উঠতে শুরু করেছে।

          ক্লাস সেভেনের শুরুতে ক্লাসটিচার ছিলেন সবিতা ম্যাডাম। কত আনন্দের দিন ছিল তখন আমার জন্য। সবাইকে 'বদমাইশ' বলে ধমক দিয়ে ঠান্ডা করে দিতেন ম্যাডাম, কিন্তু আমার সাথে কথা বলতেন কত মিষ্টি করে। শুধু সবিতা ম্যাডাম কেন, যে হালিমা ম্যাডামকে সবাই বাঘের মত ভয় পায়, সেই হালিমা ম্যাডামও কত মিষ্টি করে আমাকে বলেন, "সুব্রত, অংকটা বোর্ডে লিখে দাও তো বাবা।" বুঝতেই পারছো, হালিমা ম্যাডামের অংকের ক্লাসে আমিও অংক করাই মাঝে মাঝে। আর আফতাব স্যার আমার এতদিনের জমানো প্রেস্টিজ পাংকচার করে দিচ্ছেন।

          আফতাব স্যার ক্লাসটিচার হবার কয়েকদিনের মধ্যেই ক্লাসের সবাই কেমন যেন স্বেচ্ছাচারী হয়ে উঠেছে। আগে আমি কত সহজেই সবাইকে দমিয়ে রাখতে পারতাম। পুরো ক্লাসে আমার একটা কমান্ড ছিল। হাতে স্কেল নিয়ে উঠে দাঁড়ালেই চুপ হয়ে যেতো সবাই। অভিযোগ খাতায় নাম লিখে সবিতা ম্যাডামকে দিলে গন্ডগোলকারীদের শাস্তি অবধারিত ছিল। কিন্তু আফতাব স্যার শাস্তি দেয়া তো দূরের কথা, অভিযোগ খাতা দেখালে হা হা করে হাসেন। নিজে ক্লাউনের মতো হাসুন - তাতে আমার তেমন কোন সমস্যা নেই। কিন্তু আমাকে সবার কাছে ঠাট্টার পাত্র করে তোলাটা কতটুকু যুক্তিযুক্ত? আফতাব স্যারের প্রশ্রয়ে নয়ন ক্লাসে সবার সামনে আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করার সাহস পায়। আমিই নাকি গন্ডগোলকারী! ফাজিলটা বলেছে আমি নাকি সারাক্ষণ গন্ড গোল করে রাখি, তাই আমি গন্ডগোলকারী! এটা শুনে নয়নকে কষে একটা ধমক লাগানো উচিত ছিল না আফতাব স্যারের? কিন্তু না, তিনি এই উচিত কাজটা না করে হা হা করে হেসে বললেন, "নুসরাত নীলিমা, তোমার কথায় যুক্তি আছে।"

          আফতাব স্যারের প্রিয় শব্দ হচ্ছে 'যুক্তি'। তিনি বলেন, 'অযৌক্তিক কোন কিছুই গ্রহণযোগ্য নয়। শক্ত বৈজ্ঞানিক যুক্তির উপরেই দাঁড়িয়ে আছে বিশ্বব্রহ্মান্ডের সবকিছু'। হা হা করে হাসতে হাসতে আফতাব স্যার মাঝে মাঝে অনেক দার্শনিক কথাবার্তা বলেন। অভ্যাসবশত সেগুলো খাতায় লিখে নিতে গেলে স্যার বলেন, 'লিখতে হবে না, এসব কথা বুঝতে পারলে এমনিতেই মনে থাকবে।'

          মনে তো থাকবেই। অপমানের কথা কি কেউ ভুলতে পারে? আমার সারাজীবন মনে থাকবে এসব। যেসব বিষয় নিয়ে এরা সব হাসাহাসি করে, কোন বুদ্ধিমান প্রাণী সেগুলো নিয়ে হাসতে পারে? যেমন একদিন শুনলাম নয়ন বলছে, 'আফতাব স্যারের মনে হয় চল্লিশটা দাঁত'। শুনেই সবাই হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ার অবস্থা। আচ্ছা, এটা কোন হাসির কথা হলো? আফতাব স্যার কথায় কথায় হাসেন সেটা সত্যি। হাসলে আফতাব স্যারের অনেকগুলো প্রকট দাঁত বের হয়ে আসে সেটাও সত্যি। কিন্তু তাই বলে কি তাঁর চল্লিশটা দাঁত থাকবে? মানুষের কি ৩২টার বেশি দাঁত থাকে? এরকম অবস্থায় গন্ড গোল করে না রেখে কি আমি স্টুপিডের মত গন্ড লম্বা করে দেবো? ফাজিল কোথাকার।

          শুধু নয়ন নয়, তাদের চার জনের গ্রুপটাই ফাজিলের গ্রুপ। সারাক্ষণ এত হৈ চৈ হাসিতামাশা করার পরেও এরা যে কীভাবে সব পরীক্ষায় পাস করে ফেলে কে জানে। শুধু পাস তো নয় - সেকেন্ড থার্ড ফোর্থ ফিফ্‌থ হয়ে যায়। সিক্সের বার্ষিক পরীক্ষায় ফারজানা আমার চেয়ে মাত্র পাঁচ নম্বর কম পেয়েছে।  সেকেন্ড হয়ে ক্লাসে সেকেন্ড মনিটর হয়েছে সে। তার তো কিছুটা হলেও আমার মতো গাম্ভীর্য থাকা উচিত। কিন্তু না - সারাক্ষণ শুধু হিহি হাহা করছে সবার সাথে। গত মাসে তাদের সাথে এসে জুটেছে আরেকজন - লুনা। মেড ইন চায়না। এসেই সবার সাথে কী ভাব কী ভাব! কয়েক বছর চীন দেশে থেকে এসেছে বলে নিজেকে চীনা ভাষার পন্ডিত মনে করছে। চীনা ভাষা শিখানোর স্কুল খুলে বসেছে ক্লাসে। সবাই তার কাছ থেকে চীনা শব্দ শিখতে চাচ্ছে।

          'নি হাউ সুব্রত'

          যে ছেলেটা এই মাত্র ক্লাসে ঢুকে আমাকে চৈনিক ভাষায় সম্ভাষণ জানালো তার নাম বিদ্যুৎ - জয়নাল আবেদীন বিদ্যুৎ। আমাদের ক্লাসের সবচেয়ে বড় ঝামেলা হলো সে। বাংলা ভাষাটাও ঠিকমত বলতে পারে না, অথচ চীনা ভাষায় 'হ্যালো' বলে। এর মূলে আছে ইলোরা ইসলাম লুনা। আফতাব স্যার লুনাকে চাঁদের সাথে তুলনা করে শুধু মাথায় নয়, চাঁদে তুলে দিয়েছেন।

          'নি হাউ অর্ক, নি হাউ আব্‌স'

আবদুর রহিম কখন থেকে আব্‌স হলো জানি না।

          'নি হাউ বিদ্যুৎ'

          ওরে বাপ্‌রে, আবদুর রহিমও চায়নিজ বলছে। তাকিয়ে দেখলাম বিদ্যুৎ পেছনের বেঞ্চে অর্ক আর আবদুর রহিমের কাছে গিয়ে বসেছে। অর্ক সবসময় পেছনের বেঞ্চে বসে আর আবদুর রহিম তার পাশে পাশে থাকে।

          বিশাল দৈত্যের মত শরীর বিদ্যুতের। সাইজে আমাদের ভোলানাথ স্যারের চেয়ে বড় হবে। তার এতদিনে ইউনিভার্সিটিতে পড়া উচিত ছিল, অথচ পড়ে ক্লাস সেভেনে। আমাদের স্কুলে এসে ভর্তি হয়েছে গত বছর। গাড়ি নিয়ে স্কুলে আসে। দু'হাতে টাকা-পয়সা খরচ করে প্রচুর বন্ধুবান্ধব জুটিয়ে ফেলেছে। কলেজের ভাইয়াদের সাথেও তার ওঠাবসা। টিচারদের অনেকে ছুটির পরে তার গাড়িতে লিফ্‌ট নেন বলে বিদ্যুৎ নিজেকে বিরাট কিছু মনে করে।  ক্লাস সিক্সে তার কোন ডাকনাম ছিল না। ক্লাস সেভেনে ওঠার পর বিদ্যুৎ নামটা সে নিজে নিজেই নিয়েছে। কিছুদিন আগে আফতাব স্যার যখন বললেন বুধ গ্রহে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের নামে একটা ক্রেটার বা গহ্বর আছে, বিদ্যুৎ তখন থেকে নিজের নাম জয়নাল আবেদীনের বদলে জয়নুল আবেদীন লিখতে শুরু করেছে।

          বিদ্যুৎ সুযোগ পেলেই গান গায়। বেশিরভাগই চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার গান। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষা এমনিতেই খুব কর্কশ, তার ওপর বিদ্যুতের গলায় এমন বেসুরো লাগে যে খুব নিরীহ ভদ্রলোকেরও রাগ উঠে যাবে তার গান শুনলে। ক্লাস সিক্সে তার গানের উপদ্রব এত বেশি ছিল না। আফতাব স্যার  শাস্তি দেন না বলেই দিনের পর দিন তার গানের উপদ্রব বেড়ে চলেছে। আফতাব স্যারকে বলে কোন লাভ নেই। কারণ আফতাব স্যারের গানের গলা বিদ্যুতের চেয়েও বেসুরো। আমাদের ক্লাস-অ্যাসেম্বলিতে আফতাব স্যার যখন জাতীয় সঙ্গীতে গলা মেলান তখন কানে আঙুল দিতে ইচ্ছে করে। নেহায়েত জাতীয় সঙ্গীত বলে সহ্য করতে হয়।  

          আমাদের ক্লাস-অ্যাসেম্বলি শুরু হয় সকাল আটটায়। ক্লাস শুরুর আগে আমরা ক্লাসে দাঁড়িয়েই জাতীয় সঙ্গীত গাই। আমি সাধারণত আটটা বাজার পাঁচ দশ মিনিট আগে আসি। সকালে আমাকে বাসা থেকে বের হতে হয় সাড়ে ছ'টায়। স্কুলে আসার আগে যেতে হয় প্রাইভেট পড়তে। ক্লাসে যে টিচার যে সাবজেক্ট পড়ান সেই টিচারের কাছে সেই সাবজেক্টের প্রাইভেট পড়লে অনেক সুবিধা পাওয়া যায়। আমাকে প্রতিদিন তিন-চার জন টিচারের কাছে যেতে হয়। স্কুল ছুটির পর সব সাবজেক্ট ম্যানেজ করা যায় না বলে সকালে স্কুল শুরুর আগেও যেতে হয়। সপ্তাহে তিন দিন মোতালেব স্যারের কাছে ইংরেজি, আর তিন দিন খাইরুল স্যারের কাছে বিজ্ঞান। আফতাব স্যার প্রাইভেট পড়ান না বলেই খাইরুল স্যারের কাছে যেতে হচ্ছে। স্কুলে খাইরুল স্যারের অনেক ক্ষমতা - ভাইস প্রিন্সিপালের আশেপাশে ঘুরতে দেখা যায় তাঁকে। তাঁর বাসায় এত ছেলেমেয়ে পড়তে যায় যে মাঝে মাঝে আমাদের ফ্লোরে বসে নোট নিতে হয়। আজ সকালে গিয়ে শুনলাম স্যারের বাসায় স্যারের শ্বশুরবাড়ির মেহমান এসেছে। পড়ানোর জায়গা নেই তাই আজ ছুটি। তাই আজ অনেক আগেই স্কুলে এসে বসে আছি।

          আমাদের টিচারদের মধ্যে আফতাব স্যার ছাড়া আর সব টিচারই প্রাইভেট পড়ান। আর ক্লাসের মধ্যে মনে হয় অর্ক আর আবদুর রহিম ছাড়া আর সবাই কারো না কারো কাছে প্রাইভেট পড়ে। আবদুর রহিম প্রাইভেট পড়ে না - কারণ তার মা-বাবার টাকা নেই। টাকা ছাড়া কোন্‌ টিচার প্রাইভেট পড়াতে রাজি হবে? আর অর্ক প্রাইভেট পড়ে না - কারণ অর্ক আফতাব স্যারের মুরিদ হয়েছে। আফতাব স্যার বলেন, কোন শিশুকে যদি নিজে নিজে হাঁটতে না দিয়ে সারাক্ষণ কোলে করে রাখা হয় তাহলে সে শিশু কোনদিন হাঁটতে শিখবে না। সেরকম কেউ যদি কোন কিছু নিজে নিজে বুঝতে চেষ্টা না করে সবসময় প্রাইভেট টিচারের উপর নির্ভর করে তাহলে সে কিছুই শিখতে পারবে না।

          অর্ক আফতাব স্যারের এই কথাগুলো বিশ্বাস করে বসে আছে। বোকা একটা। অর্ক যে সারাক্ষণ এত এত বই পড়ে তাতে লাভ হয় কিছু? পরীক্ষাতে তো সে কোন সাবজেক্টেই এ-প্লাস পায় না। নিজেকে আইনস্টাইন মনে করে, অথচ ক্লাস সিক্সে বিজ্ঞানে পেয়েছে ৪১। সেটা নিয়ে তার কোন মাথাব্যথাই নেই। সবাইকে সে বলে বেড়ায় - আইনস্টাইনও নাকি স্কুলের পরীক্ষায় ফেল করতেন। এবছরও সে খুব একটা ভালো করতে পারবে বলে মনে হয় না। ক্লাসটেস্টের কোনটাতেই সে ৫০% এর বেশি পায়নি। হালিমা ম্যাডামের অংকে পেয়েছে দশের মধ্যে দুই। টিচার্স রুম থেকে খাতা নিয়ে আসার সময় আমি তার খাতা দেখেছি। তার দুটো অংকই ধরতে গেলে শুদ্ধ হয়েছে। কিন্তু হালিমা ম্যাডাম যেভাবে উত্তর লেখা পছন্দ করেন - সেভাবে লিখেনি সে। প্রাইভেট না পড়ার মজা বোঝ এবার!

          "এভাবে সারাক্ষণ পড়তে তোর ভালো লাগে?"

          অর্ককে প্রশ্ন করলো বিদ্যুৎ। আমি কান খাড়া করে আছি অর্ক কী বলে শোনার জন্য। কিন্তু উত্তর দেয়া তো দূরের কথা, বইয়ের পৃষ্ঠা থেকে চোখও সরালো না অর্ক। এত মনযোগ দিয়ে কী পড়ছে সে? আফতাব স্যার কি ক্লাসটেস্ট নেবেন আজ? নিতেও পারেন। আমাদের সব সাবজেক্টের ক্লাসটেস্ট হয়ে গেছে - শুধু বিজ্ঞান বাকি। অর্ক কী পড়ছে দেখা দরকার।

          "অ্যাই অর্ক, কী বই পড়ছিস?"

          হাতের হলুদ মলাটের বইটা উঁচু করে দেখালো অর্ক। তারপর আরেকটি পৃষ্ঠা উল্টাতে উল্টাতে অর্ক আমার দিকে তাকালো একটু, তারপর আবার পড়ায় মন দিল। ভেনাস - প্যাট্রিক মুর। ইংরেজিতে লেখা বইও পড়তে শুরু করেছে সে। শুক্র গ্রহ সম্পর্কে পড়ছে - তার মানে আরেকটি বিজ্ঞান প্রজেক্ট।

          আফতাব স্যার আমাদের বিজ্ঞান পড়ানো শুরু করার পর কীভাবে যেন আমাদের ক্লাসটা বিজ্ঞানময় হয়ে উঠেছে। অন্য সব টিচারের ক্লাসে যারা ভয়ে মাথা নিচু করে থাকে, তারাও আফতাব স্যারের ক্লাসে বিজ্ঞান নিয়ে প্রশ্ন করে। আর আফতাব স্যার বিজ্ঞান বই থেকে ধারাবাহিকভাবে না পড়িয়ে কখনো বইয়ের পেছন থেকে, কখনো মাঝখান থেকে পড়াতে শুরু করেন। যেকোনো প্রসঙ্গ থেকেই কীভাবে যেন বিজ্ঞান খুঁজে বের করে ফেলেন তিনি। প্রথম দিন এসে আমাদের 'আকাশ ভরা সূর্য-তারা' গান থেকে কীভাবে যেন সূর্যের প্রসঙ্গ নিয়ে এলেন। আর কী আশ্চর্য - সবাই সূর্য সম্পর্কে জানতে আগ্রহী হয়ে উঠলো। অনেকগুলো সায়েন্টিফিক পোস্টার তৈরি হয়ে গেলো কয়েক সপ্তাহের মধ্যে। তারপর পৃথিবী, চাঁদ ও বুধ প্রকল্প শেষ করার পর এখন শুক্র প্রকল্প শুরু হচ্ছে। আমাদের বিজ্ঞান বইতে এসব কিছুই নেই। অথচ আফতাব স্যার আমাদের উৎসাহ দিচ্ছেন লাইব্রেরিতে গিয়ে বিজ্ঞানের বই পড়তে। কত রকমের বিজ্ঞান বই এনে লাইব্রেরি ভর্তি করে ফেলতে শুরু করেছেন তিনি। আমাদের সময় কোথায় এত বই পড়ার?

          টেক্সট বই আর গাইড বই ছাড়া আর কোন বই পড়ার প্রতি আমার কোন আগ্রহ নেই। আমি পড়াশোনা করি পরীক্ষায় ফার্স্ট হওয়ার জন্য। অর্ক কী কারণে এত পড়াশোনা করে আমি বুঝতে পারি না। যে কারণেই পড়াশোনা করুক, অর্ককে দেখে বুঝতে পারি বেশি বই পড়লে মানুষ একটু ভ্যাদা টাইপের হয়ে যায়। অর্ক খুব যুক্তি দিয়ে সুন্দর করে কথা বলতে পারে, কিন্তু ঝগড়া করতে পারে না। ক্লাসের কারো সাথেই তার শত্রুতা নেই, আবার সেরকম বন্ধুত্বও নেই কারো সাথে। বিজ্ঞানী হতে গেলে নাকি সবকিছুতে নির্বিকার হওয়া শিখতে হয়। বন্ধুত্বে নাকি আবেগ জড়িত থাকে, তাই নির্বিকার থাকা যায় না। এরকম হলে তো গৌতম বুদ্ধকে বিরাট বিজ্ঞানী বলতে হয়!

          অবশ্য একদম কারো সাথেই যে অর্কের বন্ধুত্ব নেই তা বলা যায় না। আবদুর রহিমের সাথে তার সবচেয়ে বেশি বন্ধুত্ব। আবদুর রহিম সারাক্ষণ অর্কের পাশেই থাকে। তাকে অর্কের বডিগার্ড বলা চলে। আবদুর রহিম অর্ককে এত পছন্দ করে - কারণ অর্ক আবদুর রহিমকে লেখাপড়ায় সাহায্য করে। দেখলে হাসি পায় আমার। এক কাণা আরেক কাণাকে সূর্য দেখায়! দেখলাম আবদুর রহিম অর্কের খাতা দেখে দেখে হালিমা ম্যাডামের হোমওয়ার্ক করছে।

          হালিমা ম্যাডামের হোমওয়ার্ক না আনলে খবর আছে। হালিমা ম্যাডাম দেখতে হালকাপাতলা হলে কি হবে, বকা দেয়ার সময় বাঘের মত হালুম করে কানের পর্দা ফাটিয়ে দেন। স্কুলে বেতের বাড়ি আইন করে বন্ধ করে দেয়া না হলে অনেকেরই পিঠের চামড়া তুলে ফেলতেন হালিমা ম্যাডাম। হালিমা ম্যাডাম গাদা গাদা হোমওয়ার্ক দেন। ক্লাসে দুইটা অংক করান, আর দশটা অংক হোমওয়ার্ক দেন। এতগুলো অংক বাসায় বসে করা যায় নাকি? আমরা করিও না। যে অংকগুলো হোমওয়ার্ক করতে দেন, সেগুলোই আমরা তাঁর কাছে প্রাইভেট পড়তে গিয়ে করে নিই। হোমওয়ার্ক হোম-এ বসে করার সময় কোথায় আমাদের?

          ক্লাসের অনেকেই এসে গেছে এখন। আটটা বাজার সাথে সাথে আমাকে আমার ক্লাসের ডিসিপ্লিনের দিকে নজর দিতে হবে। ক্লাসের শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য আমাকে মাঝে মাঝে মৃদু লাঠিচার্জের মতো করে মৃদু স্কেলচার্জ করতে হয়। বলাবাহুল্য তুলনামূলকভাবে দুর্বলরাই হয় আমার টার্গেট।

          ক্লাস শুরুর আগে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আড্ডা মারা অনেকের অনেক দিনের অভ্যাস। আমাদের ক্লাসরুমটা তিন তলার একেবারে কোণায় হওয়াতে অনেকেই আটটা বাজার এক মিনিট আগেও বারান্দা থেকে ক্লাসরুমে ঢুকতে চায় না। আজও বারান্দা ভর্তি। হঠাৎ কে যেন বলে উঠলো, "অ্যাই দ্যাখ দ্যাখ, ভোলানাথ স্যার আফতাব স্যারকে মারছে!"

          এক দৌড়ে বারান্দায় বের হয়ে এলাম। পাশের ক্লাস থেকেও সবাই বের হয়ে গ্রিল ধরে নিচের মাঠের দিকে তাকিয়ে আছে। আমাদের স্কুলে ছাত্রদের মধ্যেই তেমন কোন মারপিটের রেকর্ড নেই - সেখানে কিনা শিক্ষকদের মধ্যে মারপিট লেগে গেলো? তাও আবার ভোলানাথ স্যার আর আফতাব স্যারের মধ্যে? এই ঘটনা তো শতাব্দীর সেরা ঘটনা।

          ভোলানাথ স্যার আমাদের শরীরচর্চা শিক্ষক। তিনি ধমক না দিয়ে কথা বলতে পারেন না। নিচের মাঠে দাঁড়িয়েই এমন হুংকার দেন যে আমরা ভয় পেয়ে তিন তলার বারান্দা থেকে দ্রুত ক্লাসে ঢুকে যাই। শারীরিক শিক্ষা দেয়ার নামে শারীরিক শাস্তি দিতে ওস্তাদ ভোলানাথ স্যার। এই শাস্তি দেয়া নিয়েই আফতাব স্যারের সাথে একবার কথা কাটাকাটি হয়েছিল ভোলানাথ স্যারের। আফতাব স্যার শাস্তিবিরোধী মানুষ। ভোলানাথ স্যার আফতাব স্যারের ওপর রেগে আছেন এটা আমরা জানি। তাই ভোলানাথ স্যার আফতাব স্যারকে সুযোগ পেলে ধরে মারতে শুরু করবেন এটা অবিশ্বাস্য মনে হয়নি।

          ক্লাসরুম থেকে বের হয়ে বারান্দার গ্রিলের কাছে যেতে কয়েক সেকেন্ডও লাগার কথা নয়। এর মধ্যেই আমি কল্পনায় দেখে ফেলছি মাঠে ভোলানাথ স্যার আফতাব স্যারকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিচ্ছেন। ভোলানাথ স্যারের যে শরীর এবং শক্তি তাতে আফতাব স্যারের মত লিকলিকে পাতলা মানুষকে মাথায় তুলে আছাড় দেয়া কোন ব্যাপারই না। কিন্তু না, তেমন কিছুই ঘটলো না। সবাইকে খুব হতাশ হতে হলো - কারণ মারপিটের কোন ঘটনাই ঘটেনি। দেখলাম মাঠে ভোলানাথ স্যার আর আফতাব স্যার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে হা হা করে হাসছেন। ভোলানাথ স্যার যে হাসতে পারেন এটাই আমার জানা ছিল না। আফতাব স্যারকে দেখে আমাদের সবারই হাসি পাচ্ছে - কারণ আফতাব স্যার টাই পরেছেন।

          মারপিট লাগার গুজবটা কে ছড়িয়েছিল জানা যায়নি। আসল ব্যাপারটা জানা গেলো বিদ্যুতের কাছ থেকে। তার সোর্সের অভাব নেই। একেক দিন একেক শিক্ষককে স্কুলের ডিউটি অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে হয়। যে স্যারের ডিউটি তাকে অবশ্যই টাই পরতে হবে। কোন ম্যাডামের ডিউটি হলে সেই ম্যাডাম সেদিন সাদা শাড়ি পরে আসবেন। আজ আফতাব স্যার ডিউটি অফিসার। কিন্তু তিনি টাই পরতে জানেন না। ভোলানাথ স্যার আফতাব স্যারের গলা ধরে টাই পরিয়ে দিচ্ছিলেন। এই মুহূর্তটা দেখেই কোন একজন চিৎকার করে বলে ফেলেছে ভোলানাথ স্যার আফতাব স্যারকে ধরে মারছে। তারপর গুজবের ডালপালা গজিয়ে গেছে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে। আমি নিজেও তো কতকিছু কল্পনা করে ফেললাম। আমি হয়তো মনে মনে চাচ্ছিলাম যে আফতাব স্যারকে ধরে একটা আছাড় দেয়া হোক। এর পেছনে যুক্তি কী?

          বিভিন্ন কারণে আফতাব স্যারের উপর আমি কিছুটা বিরক্ত। অথচ ক্লাসের সবাই পারলে আফতাব স্যারকে মাথায় তুলে নাচে! সবাইকে এত লাই দিলে খুশি তো হবেই। আচ্ছা, তুমিই বলো - ক্লাসে সবার কি সমান গুরুত্ব পাওয়ার কথা? ভালো স্টুডেন্টদের দাম একটু বেশি হবে না? ক্লাসে আমার গুরুত্ব আর আবদুর রহিমের গুরুত্ব কি এক? আফতাব স্যার ক্লাসের ভেতর ভালো স্টুডেন্ট আর খারাপ স্টুডেন্টদের মধ্যে কোন পার্থক্যই রাখছেন না। আবদুর রহিমের এটা ভালো লাগতে পারে, আমার তো ভালো লাগার কথা নয়। কিন্তু ভালো না লাগলেও আমি আমার কর্তব্যে কোন অবহেলা করছি না। আফতাব স্যার ছাড়াও আমাদের আরো দশ সাবজেক্টের দশ জন টিচার আছেন। তাঁদের কাছে আমার আলাদা মর্যাদা আছে। আমাকে তো সেই মর্যাদা ধরে রাখতে হবে। মর্যাদা অর্জন করার চেয়ে রক্ষা করাই কঠিন। কঠিন কাজের প্রধান কাজ হলো ক্লাসে নিজের কমান্ড বজায় রাখা। কমান্ডারের কমান্ড যদি কেউ না মানে তাহলে কমান্ডার হওয়া আর না হওয়া সমান কথা।

          আফতাব স্যার ক্লাসে ঢুকতেই হাসির রোল পড়ে গেল। স্মার্টনেস বাড়ানোর জন্য মানুষ টাই পরে। অথচ আফতাব স্যারকে দেখাচ্ছে কাকতাড়ুয়ার মত। এই মানুষটার চেহারাটা এমন যে - কোন পোশাকেই তাকে মানায় না। কুচকুচে কালো শরীরে জড়ানো ঢলঢলে একটা সাদা অ্যাপ্রোন। কালো প্যান্ট আর কুচকানো সাদা সার্টের সাথে ক্যাটক্যাটে সবুজ একটা টাই। এই রঙের টাই যে কোম্পানি বানিয়েছে সেই কোম্পানির সাজা হওয়া উচিত।

          নয়ন তো বলেই ফেললো, "স্যার, আপনার টাইটা বিশ্রী।"

          আফতাব স্যার হাসতে হাসতে বললেন, "তাই নাকি? ভোলানাথ স্যার যে বললেন খুব সুন্দর টাই! আমার তো টাই নেই। আজ আবার আমি ডিউটি অফিসার। টাই ছাড়া নাকি ডিউটি অফিসার হওয়া যায় না। ভোলানাথ স্যার টাইটা ধার দিলেন। হাহাহা।"

          "না স্যার, বিশ্রী না স্যার, সুন্দর টাই, আপনাকে সুন্দর লাগছে স্যার।"            সবাই বুঝতে পারছে বিদ্যুৎ স্যারকে তেল দেয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু বিদ্যুতের তো জানা উচিত - আফতাব স্যারকে তেল দেয়া আর তেল মাটিতে ফেলে দেয়া সমান কথা।

          আফতাব স্যার হাসিমুখে বললেন, "খুবই ইন্টারেস্টিং। নুসরাত নীলিমা বলছে টাইটা বিশ্রী। জয়নাল আবেদীন বলছে টাইটা সুন্দর। দ্যাখো, দুজনই কিন্তু ঠিক বলছে নিজ নিজ দৃষ্টিকোণ থেকে। এই ব্যাপারটাকে কি পুরোপুরি বিজ্ঞান বলা যায়? সুন্দর লাগা, বিশ্রী লাগা? ভালো লাগা, ভালো না লাগা?"

          "না যায় না স্যার। এই ব্যাপারটা নৈর্ব্যক্তিক নয়। বিজ্ঞান হতে হবে সবার কাছে সমান। ব্যক্তিগত পছন্দের উপর বিজ্ঞান নির্ভর করে না।" - পন্ডিতি ফলানোর সুযোগ হাতছাড়া করলো না অর্ক।

          এই কথাগুলো আমিও জানি। অর্কের মত লোকদেখানো ব্যাপার আমার মধ্যে নেই বলেই আমি এসবের উত্তর দিই না। আফতাব স্যার তাঁর ক্যাটক্যাটে সবুজ টাই থেকেও বিজ্ঞানের প্রসঙ্গ বের করে ফেলেছেন। এখন এটা নিয়ে আবার কোন্‌দিকে চলে যাবেন। তার আগেই স্যারকে মনে করিয়ে দিতে হবে যে আমাদের ক্লাসটেস্ট এখনো নেননি তিনি। বললাম, "স্যার, আমাদের ক্লাসটেস্ট কোন্‌দিন নেবেন?"

          "এখন নেব।"

          হঠাৎ পুরো ক্লাস চুপ হয়ে গেলো। আমরা বুঝতে পারছি না স্যার কি সিরিয়াস, নাকি মজা করছেন। স্যারের মুখ যথারীতি হাসি হাসি।

          "স্যার সত্যি?"

          "হ্যাঁ। বই-খাতা বন্ধ কর।"

          "খাতা বন্ধ করলে লিখব কোথায় স্যার?" - ফারজানা জানতে চাইলো।

          আসলেই তো। ক্লাসটেস্টের নিয়ম হলো স্যার বোর্ডে প্রশ্ন লিখে দেবেন। অথবা আমাকে বলবেন লিখে দিতে। আমরা ক্লাস-টেস্টের খাতায় সেই প্রশ্নের উত্তর লিখবো। ক্লাসটেস্টের খাতা আমাদের ব্যাগেই রাখতে হয় সারাবছর। প্রতিদিন সাত পিরিয়ডের জন্য হোমওয়ার্ক, ক্লাসওয়ার্ক আর ক্লাসটেস্টের খাতা মিলিয়ে আমাদের একুশটা খাতা ব্যাগে রাখতে হয়। তার উপর আছে দিনে তিন-চারটা প্রাইভেটের খাতা। অনেকে তো স্কুল থেকেই চলে যায় কোচিং সেন্টারে। আমার স্কুলব্যাগের ভর দশ কেজির বেশি।

          আফতাব স্যার বললেন, "একটু পরেই দেখতে পাবে কোথায় লিখবে। আমি তোমাদের প্রশ্নপত্র দেবো। সেখানে উত্তর লেখার জন্য জায়গা আছে। যতটুকু জায়গা আছে ততটুকু জায়গাতে উত্তর লিখবে।"

          আফতাব স্যার হলুদ রঙের একটা প্যাকেট থেকে প্রশ্ন বের করলেন। চার পৃষ্ঠার ছাপানো প্রশ্নপত্র। এই প্রথম ছাপানো প্রশ্নপত্রে ক্লাসটেস্ট দিচ্ছি। কিন্তু প্রশ্ন দেখে আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার অবস্থা। এই প্রশ্নগুলো তো গাইড বইতে নেই। স্যার ক্লাসে বিষয়গুলো নিয়ে অনেক আলোচনা করেছেন। কিন্তু আমি তো নির্দিষ্ট প্রশ্নের জন্য নির্দিষ্ট উত্তর মুখস্থ করে এসেছি এতদিন। দেখলাম সবাই নিরবে লিখতে শুরু করেছে। তার মানে মুখস্থ বিদ্যার দিন শেষ? তিন নম্বর প্রশ্নটার বিষয়বস্তু বইতেই নেই। প্রশ্নটা এরকম: তোমার সহপাঠীদের নিয়ে তুমি একটি বিজ্ঞান ক্লাব করতে চাও। বাংলাদেশের কোন বিজ্ঞানীর নামে সেই বিজ্ঞান ক্লাবের নাম দিতে হলে কী নাম দেবে? তোমাদের বিজ্ঞান ক্লাবের তিনটি প্রধান কাজ কী হবে?

          মেজাজটাই খারাপ হয়ে গেলো। এই প্রথম একটা পরীক্ষা দিয়ে কোন তৃপ্তি পেলাম না। কেমন পরীক্ষা দিলাম সেটাই বুঝতে পারছি না। একবার মনে হচ্ছে সব ঠিকমত লিখেছি। আবার মনে হচ্ছে শুদ্ধ লিখেছি তো? বেশি কিছু লিখতে হয়নি, কিন্তু অনেক ভেবেচিন্তে লিখতে হয়েছে। ক্লাসের বেশিরভাগেরই এই অবস্থা।  রেজাল্ট দেবার আগে কিছুই বলা যাচ্ছে না। আফতাব স্যার বলেছেন আগামী রবিবারে দিয়ে দেবেন। স্যার পাগল টাইপের হলেও কথার নড়চড় হয় না। কিন্তু রবিবার আসতে আরো চারদিন বাকি।

          বৃহস্পতিবার আমাদের হাফ ডে। সেদিন থার্ড ও ফোর্থ পিরিয়ড বিবিধ ক্লাস হবার পর আমাদের ছুটি হয়ে যায়। বিবিধ ক্লাস মানে এক্সট্রা-একাডেমিক ক্লাস। এই ক্লাসে আগে আমরা গান-কবিতা ইত্যাদি করতাম। আফতাব স্যার সেই ক্লাসকে বিজ্ঞান-চর্চার ক্লাসে পরিণত করে ফেলেছেন। সেখানে জ্যোতির্বিজ্ঞানের গল্প  করতে করতে মহাকাশের সূর্য ও তার গ্রহ-উপগ্রহ নিয়ে অনেক কিছু জানা হয়ে গেছে আমাদের। অর্কসহ অনেকেই প্রস্তাব করেছিল বিজ্ঞান ক্লাব গঠন করার। অর্কের প্রস্তাব ছিল বিজ্ঞান ক্লাবের সদস্যরা স্কুল ছুটির পর কিংবা ছুটির দিনে বিজ্ঞান প্রজেক্টের কাজ করবে। কিন্তু অর্ক তো প্রাইভেট পড়ে না, তাই জানে না যে আমাদের ছুটির দিন বলে কোন দিন নেই। স্কুলে আমরা যত সময় কাটাই তার চেয়ে বেশি সময় কাটাই কোচিং সেন্টারে বা টিচারদের বাসায় বাসায়।

          সেকেন্ড পিরিয়ড শেষে অরুন্ধতী ম্যাডাম ক্লাস থেকে বের হতে না হতেই ষাঁড়ের গলায় চেঁচিয়ে উঠলো বিদ্যুৎ, "বুধবারে শুভযাত্রা বিষ্যুদবারে মানা, শুক্কুরবারে প্রেম পিরিতি হয় না ষোল আনা..." এসব গান সে কোত্থেকে পায় কে জানে। সবাই হো হো করে হেসে ওঠার প্রায় সাথে সাথে শোনা গেল হুজুর স্যারের হুংকার, "হেই জয়নাইল্লা। থাপ্পড় মারি কান ছিরি ফেলব এক্কেবারে।"

          আমাদের স্কুলে সবচেয়ে বড় আতঙ্কের নাম হুজুর স্যার। ধর্মের ক্লাসে পিটিয়ে সোজা করে ফেলেন সবাইকে। শারীরিক শাস্তি দেয়া যাবে না জাতীয় আইন হুজুর স্যারের ক্লাসে খাটে না। তিনি যেন ওঁৎ পেতে থাকেন বিদ্যুৎকে ধমক দেয়ার জন্য। কিছুদিন আগেও হুজুর স্যারের ধমক খেয়েছে বিদ্যুৎ। আমরা সবাই নিঃশ্বাস বন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছি। হুজুর স্যার বিদ্যুৎকে বকেই চলেছেন, "কিশোর কুমার হইয়স দে নে?"

          "ওটা কিশোর কুমারের গান নয় স্যার, রুনা লায়লার গান।" - খুব স্বাভাবিক গলায় বললো লুনা। দেখলাম নয়নরা মুখে হাত দিয়ে হাসি চাপার চেষ্টা করছে। এই মেয়েগুলো কি বেকুব নাকি? পরিস্থিতি বুঝে না কোথায় কী বলতে হবে? মানুষ অধিক শোকে যেমন পাথর হয়ে যায়, তেমনি অধিক রাগেও পাথর হয়ে যায়। হুজুর স্যার লুনার দিকে চোখ লাল করে তাকিয়ে রইলেন, কিন্তু কিছু বললেন না। মনে হয় কী বলবেন বুঝতে পারছিলেন না।

          এমন সময় হাতে অনেক খাতাপত্র নিয়ে আফতাব স্যার এলেন। হুজুর স্যার আফতাব স্যারকে দেখে তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলেন, "পোলাপাইনদের তো লাই দিয়া দিয়া মাথাত তুলি দিছেন।"

          আফতাব স্যার হেহেহে করে হাসার মত একটা কিছু করলেন। আমি জানি ইংরেজিতে এটাকে বলে স্মার্ক (smirk)। বাংলায় এর সঠিক প্রতিশব্দ কী জানি না। গা জ্বালানো হাসি বলা চলে। হুজুর স্যার চোখ গোল করে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে গট গট করে চলে গেলেন।

          আফতাব স্যার ক্লাসে ঢুকার সাথে সাথে বিদ্যুৎ বললো, 'নি হাউ স্যার'। সে যে একটু আগে হুজুর স্যারের কাছে ধমক খেয়েছে তার কোন প্রতিক্রিয়াই নেই তার মধ্যে। এমন বেহায়া কীভাবে হয় মানুষ?

          শিক্ষকসুলভ গাম্ভীর্য আফতাব স্যারের মধ্যে নেই। তিনি হাসিমুখে বললেন, 'নি হাউ টাউ বুঝি না। তোমরা আমার লাই ফেরত দাও।'

          সবাই হো হো করে হেসে উঠল। আমি বুঝি না এতে হাসির কী আছে। আর লাই ফেরত দাও মানে কী? বললাম, "মানে কী স্যার?"

          "মানে খুব পরিষ্কার। হুজুর স্যার বলেছেন আমি তোমাদের লাই দিয়েছি। তোমরা মাথায় উঠেছ। এবার দয়া করে আমার লাই ফেরত দাও, আর মাথা থেকে নামো।"

          আবার সারা ক্লাস হো হো করে হেসে উঠলো। পাশের ক্লাস থেকে হুজুর স্যার আবার এসে ধমক দিতে পারে ভেবে আফতাব স্যার ক্লাসের দরজা বন্ধ করে দিলেন। সেটা দেখেও হেসে উঠলো আবার সবাই।

          "তোমাদের বর্তমান প্রজেক্ট কী?"

          "স্যার শুক্র গ্রহ" - অর্ক উত্তর দিলো।

          "তার আগে কিছু দরকারি কথা বলে নিই। তোমরা সবাই বিজ্ঞান ক্লাব গঠন করার প্রস্তাব করেছো। বিজ্ঞান ক্লাবের উদ্দেশ্যও বর্ণনা করেছো।"

          "ওটা তো স্যার পরীক্ষার প্রশ্ন ছিল।"

          "ওখানে তো তোমরা তোমাদের মনের কথাই লিখেছো, তাই না? তোমরা প্রত্যেকে তোমাদের বিজ্ঞান ক্লাবের একটি করে নাম দিয়েছো। তোমাদের দেয়া নামগুলো থেকে হিসেব করে দেখেছি - ২৯ জন লিখেছো জগদীশ বসু, ১৫ জন লিখেছো আইনস্টাইন, ৮ জন লিখেছো নিউটন, ৬ জন লিখেছো কুদরাত এ খুদা, ১ জন লিখেছো স্টিফেন হকিং, ১ জন লিখেছো সত্যেন বসু, ১ জন লিখেছো মেঘনাদ সাহা, ১ জন লিখেছো কাজী নজরুল ইসলাম। কিন্তু আমরা তো জানি কাজী নজরুল ইসলাম কবি ছিলেন - বিদ্রোহী কবি, বিজ্ঞানী তো ছিলেন না।"

          ক্লাসের সবাই হেসে উঠতেই আবদুর রহিম বললো, "স্যার, এই নামে একজন বিজ্ঞানী আছেন না? সঠিক নামটা মনে করতে পারছিলাম না, তাই..."

          আবার হাসির পালা। আফতাব স্যার বললেন, "তাঁর নাম জামাল নজরুল ইসলাম। তিনি বাংলাদেশের অনেক বড় বিজ্ঞানী। মহাকাশের ব্ল্যাকহোল সম্পর্কে তিনি চমৎকার বই লিখেছেন। তাঁর বই কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো হয়। তাঁর নামে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিত ও ভৌতবিজ্ঞান গবেষণাকেন্দ্র আছে। তুমি যে তাঁর নাম লিখতে চেষ্টা করেছো তার জন্য আমি খুশি। ভেরি গুড।"

          আবদুর রহিম বেশ খুশি হয়ে গেলো।

          "সবশেষে আরেকজন একটা নাম লিখেছে - বিজ্ঞানী আহো সূমা। এই নামে কোন বিজ্ঞানী আছেন বলে তো আমি শুনিনি। গুগলে সার্চ করেও কিছু পেলাম না। জাপানী নাম মনে হচ্ছে। তোমরা কেউ শুনেছো এই বিজ্ঞানীর কথা?"

          ক্লাসে আবার হাসির ঢেউ উঠলো। নয়ন বললো, "ওটা স্যার আপনার নাম।"

          "আমার নাম? আহো - আফতাব হোসেন! হাহাহা। কিন্তু সূমা কী জিনিস?"

          "সূর্য মামা স্যার।"

          অর্ক আর আবদুর রহিম আফতাব স্যারের নাম দিয়েছে সূর্যমামা। সেটা ক্লাসের সবাই জানে। ফারজানারা তো সারাক্ষণ সূর্যমামা সূর্যমামা করে। আফতাব শব্দের অর্থ সূর্য ঠিক আছে। কিন্তু মামা লাগাতে হবে কেন? এদের ন্যাকামি দেখলে গা জ্বলে যায় আমার। কিন্তু স্যারের নাম কে লিখলো? স্যারকে তেল দেয়ার জন্যই লিখেছে। কিন্তু আফতাব স্যারকে তেল দিয়ে লাভ আছে কোনো?

          "কিন্তু আমি তো বিজ্ঞানী নই। আমি বিজ্ঞানের ছাত্র এটা ঠিক। তোমাদের বিজ্ঞান পড়াচ্ছি - সে হিসেবে আমি বড়জোর বিজ্ঞানের শিক্ষক। কিন্তু বিজ্ঞানী নই। বিজ্ঞানী হতে গেলে নতুন কিছু আবিষ্কার করতে হবে, দিনরাত গবেষণা করতে হবে। সৃষ্টি করতে হবে নতুন জ্ঞান, নতুন তত্ত্ব, কিংবা নতুন প্রযুক্তি। সব বিজ্ঞানীই বিজ্ঞান-শিক্ষক, কিন্তু সব বিজ্ঞান-শিক্ষকই বিজ্ঞানী নন। হাহাহা।"

          আফতাব স্যার হলেন বাংলা সিনেমার ভিলেনের মত। ভিলেনরা যেমন - এবার কোথায় পালাবে সুন্দরী - বলে হাহাহা করে অট্টহাসি দেয়, আফতাব স্যারও সেরকম। খুব দরকারি কথা বলার পরেও হাহাহা করে একটা হাসি দেবেন।

          "সংখ্যাগরিষ্ঠের ইচ্ছানুসারে তোমাদের বিজ্ঞান ক্লাবের নাম হলো জগদীশ বসু বিজ্ঞান ক্লাব।"

          অর্কসহ অনেকেই হাততালি দিলো। বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসুকে আমিও খুব পছন্দ করি। তিনি ছিলেন পৃথিবীর প্রথম জীবপদার্থবিজ্ঞানী। কিন্তু আমি লিখেছিলাম স্টিফেন হকিং। এই বিজ্ঞানী হাঁটতে পারেন না, নড়াচড়া করতে পারেন না, কথা বলতে পারেন না, অথচ কম্পিউটারের সাহায্যে মহাবিশ্বের কত গভীর বিষয়ে জ্ঞানের অনুসন্ধান করেছেন। অতি সম্প্রতি মারা গেছেন।

          "তোমাদের মধ্যে যারা আইনস্টাইন, নিউটন এবং স্টিফেন হকিং-লিখেছো - তারা সম্ভবত প্রশ্নটা ভালো করে পড়নি। বলা হয়েছিল বাংলাদেশের বিজ্ঞানীর নাম লিখতে। এরা কেউই বাংলাদেশের বিজ্ঞানী নন।"

          আত্মপক্ষ সমর্থন করার জন্য বললাম, 'স্যার বিজ্ঞানীরা তো সারা বিশ্বের। সে হিসেবে বাংলাদেশ যেহেতু বিশ্বের মধ্যে আছে..."

          নিজের যুক্তি নিজের কাছেই কেমন যেন দুর্বল শোনালো। তাই আর কথা বাড়ালাম না।

          "শোন, বিজ্ঞান ক্লাবের উদ্দেশ্য হলো বিজ্ঞানচর্চা করা। তোমরা বিজ্ঞান প্রকল্প চালিয়ে যাবে। বিজ্ঞান মেলায় অংশ নেবে। আর বিজ্ঞানমনস্ক হবার চেষ্টা করে যাবে। বৃহস্পতিবার থার্ড আর ফোর্থ পিরিয়ডে তোমরা বিজ্ঞান ক্লাবের কাজ করবে। এর জন্য অন্যান্য পড়ালেখার যেন কোন ক্ষতি না হয়। বিজ্ঞান নিয়ে অনেক অনেক আলোচনা হওয়া উচিত। তোমাদেরকেই দায়িত্ব নিতে হবে তোমাদের বিজ্ঞান ক্লাবের। সভাপতি কে হতে চাও হাত তোল।"

          এক সেকেন্ডও লাগলো না আমার হাত তুলতে। আশেপাশে তাকিয়ে দেখি ক্লাসের সবাই হাত তুলে বসে আছে। বিদ্যুৎ দুই হাত উপরে তুলে বসে আছে। আবদুর রহিমও হাত তুলেছে!

          "তোমরা সবাই সভাপতি হতে চাও? সমস্যায় ফেলে দিলে। দু তিন জন প্রার্থী থাকলে নির্বাচন করা যেতো। এখন সবাই প্রার্থী হলে তো নির্বাচন করা যায় না। ঠিক আছে মেধার ভিত্তিতেই হোক। সুব্রত চৌধুরি - তুমি হবে বিজ্ঞান ক্লাবের সভাপতি, ফারজানা সহ-সভাপতি, ইয়াসমিন সাধারণ সম্পাদক, চিত্রলেখা সহ-সম্পাদক। অন্যরা সবাই সদস্য। আর সবাই মিলে ঠিক করে নেবে কে কী করবে।  হাহাহা।"

          খুশিতে আমার লাফ দিতে ইচ্ছে করছে। এই প্রথম আফতাব স্যার  পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করাকে কিছুটা গুরুত্ব দিলেন। ক্লাসের ফার্স্টবয় হবার আরো একটি সুবিধা আজ পেয়ে গেলাম। আফতাব স্যারকে আজ আর বিরক্তিকর বলে মনে হচ্ছে না। তাঁর হাহাহা হাসিটাকেও আর ভিলেনের হাসি মনে হচ্ছে না। তাঁর লাল লাল দাঁতগুলোকেও ততটা লাল মনে হচ্ছে না। এটাও এক ধরনের থিওরি অব রিলেটিভিটি। কেউ আমাকে সাহায্য করলে তার দোষগুলোকে আর ততটা দোষের বলে মনে হয় না। বিজ্ঞান প্রকল্পের সব কাজ অর্ক করলেও আমিই হলাম বিজ্ঞান ক্লাবের সভাপতি। কী আনন্দ!

          "তোমাদের নেক্সট প্রজেক্ট কী?"

          "শুক্র গ্রহ স্যার। অর্ক অনেক কাজ এগিয়ে রেখেছে স্যার।" - আমার নিজের উৎসাহ দেখে আমি নিজেই অবাক হয়ে যাচ্ছি।

          "ঠিক আছে। এবার একটা ধাঁধা জিজ্ঞেস করি তোমাদের। বলো দেখি, কোন্‌ তারা তারা নয়?"

          "স্যার একতারা, দোতারা" - স্বাতী বললো।

          "নয়নতারা" - ফারজানা বললো।

আমার কিছুই মনে আসছে না। কেবলই মনে হচ্ছে বিজ্ঞান ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে আমার কিছু বলা দরকার। কিন্তু কোন তারা খুঁজে পাচ্ছি না।

          "শুকতারা তারা নয় স্যার, শুকতারা একটি গ্রহ।" - অর্ক বললো। কতদিন থেকে সে শুক্রগ্রহের উপর বই পড়ছে। সে তো জানবেই।

          "দ্যাটস্‌ ইট! দ্য ভেনাস ইজ আ প্লানেট, নট আ স্টার।" আফতাব স্যার মাঝে মাঝে খুশিতে ইংরেজি বলে ফেলেন। কিন্তু তাঁর ইংরেজি উচ্চারণ বাংলার মতোই আঞ্চলিকতায় ভরপুর।

          "ভোরে সূর্য উঠার আগে যে শুকতারা দেখা যায় - সেটা আসলে গ্রহ। সূর্যের দ্বিতীয় গ্রহ। সবচেয়ে গরম গ্রহ। সূর্যের সবচেয়ে কাছের গ্রহ বুধের চেয়েও শুক্রের তাপমাত্রা বেশি। আর শুক্রগ্রহে সূর্য উঠে পশ্চিম দিকে।"

          "আর কোন গ্রহে সূর্য পশ্চিম দিকে উঠে না স্যার?"

          "বিজ্ঞানীদের জানামতে সৌরজগতের আর একটি গ্রহে সূর্য পশ্চিম দিকে উঠে। সেটা হলো ইউরেনাস।"

          "তাহলে তো স্যার শুক্র একটা দোজখ।"

          "অনেকটা তাই। শুক্র গ্রহকে বলা হয় পৃথিবীর সিস্টার ফ্রম হেল।"

          "সিস্টার? শুক্র গ্রহ কি মহিলা গ্রহ স্যার?"

          "গ্রহদের তো আর পুরুষ-নারী থাকে না। তবে প্রাচীনকালের মানুষেরা শুক্র গ্রহ অর্থাৎ ভেনাস - নামটা দিয়েছে সেই যুগের সবচেয়ে সুন্দর দেবী ভেনাসের নামে। অনেকে এটাকে আফ্রোদিতিও বলে থাকে। আর শুক্র গ্রহের যে প্রতীক - নারীর প্রতীকের সাথে তার হুবহু মিল আছে। তোমরা পড়তে পড়তে আরো অনেক কিছু জানতে পারবে। হাহাহা।"

          পরবর্তী দুই সপ্তাহের মধ্যে জগদীশ বসু বিজ্ঞান ক্লাবে আমরা শুক্র গ্রহ সম্পর্কে অনেক তথ্য সংগ্রহ করলাম। অনেক বই পড়লাম। এতদিন বই পড়েছি শুধুমাত্র পরীক্ষায় ফার্স্ট হবার জন্য। সেই পড়ায় সবসময় একটা আতঙ্ক কাজ করে। ভুলে যাবার ভয় কাজ করে। কিন্তু যখন অজানা জিনিস জানার জন্য পড়তে শুরু করলাম - কী যে আনন্দ পেলাম তা বলে বোঝাতে পারব না।  ইন্টারনেট থেকে অনেক ছবি সংগ্রহ করলাম। বেশিরভাগ কাজ অর্ক, ফারজানা, নয়ন, চিত্রা, ইয়াসমিন, লুনা আর স্বাতী করেছে। কিন্তু বিজ্ঞান ক্লাবের সভাপতি হিসেবে কিছুটা কৃতিত্ব তো আমি নিতেই পারি। চলো দেখি সূর্যের দ্বিতীয় গ্রহ - শুক্র; যার কোন উপগ্রহ নেই।

পর্ব - ২

Friday, 2 October 2020

ছিন্নপাতার সাজাই তরণী - পর্ব ৫০

 50

কোয়ান্টাম মেকানিক্সের অন্যতম স্থপতি পল ডিরাক ঠিক কথাই বলেছেন – কবিতার কাজ হলো সহজ জিনিসকে জটিল ভাবে প্রকাশ করা, আর বিজ্ঞানের কাজ হলো জটিল জিনিসকে সহজ করা। পঠিত বিজ্ঞানের কিছু কিছু ব্যাপার আমি চেষ্টা করলে বুঝতে পারি, কিন্তু কবিতার মতিগতি আমি ঠিক বুঝি না। সে আমার কাছে চিররহস্যময়ী। পদে পংক্তিতে সে যতটুকু ভাব ব্যক্ত করে, অব্যক্ত রেখে দেয় তার চেয়ে বেশি। এই অব্যক্ত ভাব যে যত বেশি বুঝতে পারে, সে তত বেশি কবিতাপ্রেমিক। কবিতার সাথে প্রেম আমার সে কারণেই জমছে না। আমার কয়েকজন কবিতাপ্রেমিক বন্ধু আমাকে এ ব্যাপারে সাবধান করে দিয়েছে। আমি নাকি কবিতাকে বুঝতে গিয়ে কবিতার ব্যবচ্ছেদ করে ফেলি। অধরা কবিতাকে নাকি না ধরেই বুঝতে হয়। কিন্তু সেটা কীভাবে সম্ভব? ‘যেতে নাহি দিব’ কবিতাটির কথা ধরা যাক। আমার মনে হয়েছে এটা একটি পারিবারিক কবিতা। যেখানে পরিবারের কর্তা দূরদেশে চাকরি করেন। পূজার ছুটি শেষে এক দুপুরে ফিরে যাচ্ছেন কর্মক্ষেত্রে। কবিতাটি শুরু হচ্ছে এভাবে: “দুয়ারে প্রস্তুত গাড়ি; বেলা দ্বিপ্রহর; হেমন্তের রৌদ্র ক্রমে হতেছে প্রখর।“ গৃহিনী ঘট পট হাঁড়ি সরা ভান্ড বোতল বিছানা বাক্স – রাজ্যের বোঝাই দিচ্ছেন সাথে:

“সোনামুগ সরু চাল সুপারি ও পান;

ও হাঁড়িতে ঢাকা আছে দুই-চারিখান

গুড়ের পাটালি; কিছু ঝুনা নারিকেল;

দুই ভান্ড ভালো রাই-সরিষার তেল;

আমসত্ত্ব আমচুর; সের দুই দুধ-

এই-সব শিশি কৌটা ওষুধবিষুধ।

মিষ্টান্ন রহিল কিছু হাঁড়ির ভিতরে,

মাথা খাও, ভুলিয়ো না, খেয়ো মনে করে।“

এতো লটবহর নিয়ে কর্মক্ষেত্রে ফিরে যাবার সময় কর্তার চার বছর বয়সী আদরের কন্যা বলে, “যেতে আমি দিব না তোমায়।“ - সেখান থেকেই পারিবারিক কবিতা হঠাৎ হয়ে ওঠে দর্শনের আধার। কবিতার ছত্রে ছত্রে ব্যক্ত হতে থাকে বিশ্বব্রহ্মান্ডব্যাপী যেতে নাহি দিতে চাওয়ার আকাঙ্খা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই কবিতাটি লিখেছিলেন ১৮৯২ সালে। তারপর এই শতাধিক বছর ধরে যে কোন বিদায় অনুষ্ঠানেই এই কবিতার মাঝখান থেকে কয়েকটি নির্দিষ্ট লাইন উচ্চারিত হয়। আজও হচ্ছে। ফারাহ শারমিন গলায় বেশ আবেগ ঢেলে আবৃত্তি করছে:

“এ অনন্ত চরাচরে স্বর্গমর্ত্য ছেয়ে,

সবচেয়ে পুরাতন কথা, সবচেয়ে

গভীর ক্রন্দন ‘যেতে নাহি দিব’। হায়,

তবু যেতে দিতে হয়, তবু চলে যায়।“

 

ফারাহ’র বাচনভঙ্গি বেশ সুন্দর। চমৎকার আবৃত্তি করছে সে। অবশ্য এখানে আবৃত্তি ঠিক নয়। ১৯৯৮ সালের এসএসসি পরীক্ষার্থীদের বিদায় অনুষ্ঠানের উপস্থাপনা করছে সে। এবার এসএসসি পরীক্ষা শুরু হবে ১৬ এপ্রিল থেকে। প্রতিবছর এসএসসি পরীক্ষার কয়েকদিন আগে পরীক্ষার্থীদের আনুষ্ঠানিক বিদায় দেয়া হয়। ক্লাস টেনের শিক্ষার্থীদের উপর থাকে আয়োজনের ভার। এই আয়োজনের জন্য মনে হয় তারা প্রস্তুত হতে থাকে অনেকদিন আগে থেকে। ক্লাস টেনের সব মেয়ে আজ সাজগোজ করে শাড়ি পরে এসেছে, ছেলেরা পরেছে লম্বা পাঞ্জাবী। বিদায়ের গাম্ভীর্যের চেয়েও আনন্দের উৎসব উৎসব মেজাজ সবার। অবশ্য পরীক্ষার্থীরা দেখলাম সবাই মন খারাপ করে বসে আছে। পুরনো বিল্ডিং-এর বারান্দায় বিদায়ী মঞ্চ। তার একপাশে কয়েক সারি চেয়ারে বসেছি আমরা শিক্ষকরা। বিদায়ী শিক্ষার্থীরা বসে আছে তার পরে সারি সারি বেঞ্চে। চৌকোণা চত্বরে বেঞ্চের উপর বসেছে ক্লাস নাইন আর টেনের শিক্ষার্থীরা। অন্যান্য ক্লাস আজ ছুটি। কলেজের ছেলে-মেয়েরা এই অনুষ্ঠানে আসতে আগ্রহী হয় না।

 

এবার যে ব্যাচটা বিদায় নিচ্ছে - এই প্রতিষ্ঠানের স্কুল সেকশানে তারা আমার প্রথম ব্যাচ। ক্লাস সেভেনে আমি তাদের ক্লাসটিচার ছিলাম। শিক্ষক আর শিক্ষার্থীর মধ্যে যে টান – সে টান যে কত গভীর তা বোঝা যায় বিদায়ের সময়। আমি ঘাড় ফিরিয়ে তাদের দিকে তাকালাম। তারা সবাই স্কুল ড্রেস পরে পরিপাটি গম্ভীর হয়ে বসে আছে। রেহনুমা - কাবুলিওয়ালার মিনির মতো যে ‘একদন্ড কথা না কহিয়া থাকিতে পারে না’ – সেও আজ চুপচাপ গম্ভীর। ফেরদৌসী – যে কথায় কথায় হাসে – তার মুখে আজ হাসি নেই। সুলতানা ইয়াসমিন, কানিজ নাইমা, পার্সা লোহানী, সুব্রত, করিম মোহাম্মদ, আবদুল আলীম, হুমায়ূন কবির, ওমর হাম্মাদ আলী, সরফরাজ, আবদুল্লাহ আল মামুন, সবাইকে দেখতে পাচ্ছি। এসএসসি পরীক্ষার পরেই সবাই কলেজে উঠে যাবে। ভাবতেই পারছি না এই ছেলে-মেয়েগুলি বড় হয়ে যাচ্ছে। বিদায় অনুষ্ঠানে শিক্ষকরা উপদেশমূলক বক্তৃতা দেন। যথারীতি রিফাৎ আরা ম্যাডাম বললেন, তৃপ্তি ম্যাডাম বললেন। ছাত্রদের মধ্যে সুব্রত বললো। সে এমনিতেই গম্ভীর থাকে, আজ আরো গম্ভীর মনে হচ্ছে। কিঞ্চিৎ গোঁফের রেখা উঁকি দিচ্ছে তার মুখে। তার স্মৃতিচারণে বিষাদের সুর। এদের মধ্যে অনেকে দশ বছর ধরে পড়াশোনা করছে এই প্রতিষ্ঠানে। বিদায়কালে তাদের অনেক বেশি খারাপ লাগছে বুঝতে পারছি। শিক্ষকদেরও তো খারাপ লাগছে। কলেজের শিক্ষার্থীদের বিদায় দিতে এত খারাপ লাগে না। একাদশ-দ্বাদশ দুই বছর বলা হলেও বড় জোর ১৩-১৪ মাস সময় পাওয়া যায় কলেজে। কর্তব্য করতে করতেই সময় চলে যায়। কিন্তু স্কুলের ক্ষেত্রে শেঁকড়টা অনেক বেশি গভীর। আমি এদের দেখেছি মাত্র চার বছর। আর যারা এদেরকে ক্লাস ওয়ান থেকে এপর্যন্ত আদরে স্নেহে শাসনে ভালোবাসায় ঘিরে রেখেছেন তাদের কেমন লাগছে? হয়তো এখানেই কবিতার দর্শন কাজ করে:

“ব্যথিত হৃদয় হতে বহু ভয়ে লাজে

মর্মের প্রার্থনা শুধু ব্যক্ত করা সাজে

এ জগতে। শুধু বলে রাখা, ‘যেতে দিতে

ইচ্ছা নাহি’। হেন কথা কে পারে বলিতে

‘যেতে নাহি দিব’।“

>>>>>>>> 

 

কলেজের পুরনো বিল্ডিং-এ এসএসসি পরীক্ষার সেন্টার। এপ্রিলের ১৬ তারিখ থেকে পরীক্ষা শুরু হয়েছে। কিন্তু পরের দিনই খবর পাওয়া গেল চট্টগ্রামে প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে। আমাদের শিক্ষার্থীদের কারোরই ফাঁস হওয়া প্রশ্ন নিয়ে পরীক্ষা দেয়ার দরকার নেই। কিন্তু শোনা যাচ্ছে কোন কোন পত্রিকা নাকি সেই ফাঁস হওয়া প্রশ্ন ছাপিয়ে দিয়েছে। ১৯ তারিখ চট্টগ্রামের দৈনিক কর্ণফুলি ও কুমিল্লার দৈনিক কুমিল্লা বার্তার তিন জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে পত্রিকায় প্রশ্ন প্রকাশ করার অপরাধে। সরকার প্রশ্নপত্র ফাঁসকারীকে ধরিয়ে দেয়ার জন্য পাঁচ লাখ টাকা পুরষ্কার ঘোষণা করেছে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দেয়ার চক্রান্তে লিপ্ত আছে অনেকেই। প্রশ্নফাঁস করে চলেছে সেই চক্র। মুষ্টিমেয় কয়েকজন এই চক্রে পড়লেও বেশিরভাগ শিক্ষার্থীই পড়াশোনা করে সুষ্ঠুভাবে পরীক্ষা দিচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন ফাঁসের মানসিক চাপ তো থেকেই যায়।

 

বোর্ড থেকে ঘোষণা করা হয়েছে প্রথম দুইটি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে সেজন্য সেই দুটি পরীক্ষা আবার দিতে হবে। পরীক্ষার্থীরা কেউই আবার পরীক্ষা দিতে রাজি নয়। কেন দেবে আবার পরীক্ষা? তারা তো প্রশ্ন দেখেওনি। তত্ত্বীয় পরীক্ষা শেষ হবার পর আবার পরীক্ষা নেবার বিরুদ্ধে আন্দোলনে যেতে হলো এসএসসি পরীক্ষার্থীদের। শেষপর্যন্ত বোর্ড আবার পরীক্ষা নেয়ার সিদ্ধান্ত বাতিল করলো। আমাদের এসএসসি পরীক্ষার্থীরা তত্ত্বীয় পরীক্ষা শেষে পিকনিকের আয়োজন করে ফেললো।

 

শাহীন কলেজ থেকে শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে এই প্রথম কোন পিকনিকে গেলাম। মুহুরি প্রজেক্টে। এদের আয়োজন দেখে মনে হচ্ছে এসএসসি পরীক্ষা দিয়েই এরা সবাই বেশ করিৎকর্মা হয়ে উঠেছে। শিক্ষার্থীদের আয়োজনে যেসব পিকনিক হয়, সেখানে তারা যখন শিক্ষকদের নিয়ে যায় – তখন শিক্ষকদের অবস্থা হয় ছোটখাট রাজা-বাদশার মতো। আপ্যায়নের ত্রুটি নেই। নিখুঁত আয়োজন তাদের।

 

চট্টগ্রাম থেকে মুহুরি প্রজেক্টের দূরত্ব প্রায় ৭০ কিলোমিটারের মতো। আড়াই ঘন্টার মতো লাগলো বাসে যেতে। আনন্দ-কোলাহল নাচ-গানের মধ্যে সময় কোন দিক দিয়ে চলে গেলো বোঝাই গেল না। সুব্রত আর মৌসুমী যে এত ভালো নাচতে পারে তা না দেখলে জানতেই পারতাম না।

মুহুরি প্রজেক্ট রোডের দুপাশে যতদূর চোখ যায় সবুজ আর সবুজ। ফেনী নদীকে শাসন করে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি করে চমৎকার সেচ প্রকল্প গড়ে তোলা হয়েছে। সরকারি রেস্ট হাউজ আছে একটি। সেখানেই আমরা নামলাম। নদীর পাড়ে সবুজ ঘাস আর বড় বড় গাছের ফাঁকে চমৎকার জায়গা। এখানেই পিকনিক স্পট। পাশেই নদী। ভ্রমনের জন্য নৌকা উপস্থিত সেখানে। স্যার-ম্যাডামরা অনেকেই হৈচৈ করতে করতে নৌকা-ভ্রমণে চলে গেলেন। রিফাৎ আরা ম্যাডাম ফেনীর কন্যা। তাঁর শৈশবের অনেক স্মৃতি হয়তো আছে এই নদী ঘিরে। এরকম খোলামেলা প্রাকৃতিক পরিবেশে এলে তাজা অক্সিজেন পেয়ে সবার মনই ভালো হয়ে যায়। ভীষণ ভালো কাটলো একটা দিন।

 

গাছের নিচে খোলা জায়গায় বসে লাঞ্চ। অনেক গান, অনেক মজা। আমাদের ছেলে-মেয়েগুলিকে এতদিন স্কুল-ইউনিফর্মে দেখতে অভ্যস্ত ছিলাম। যে কোন ইউনিফর্মই একটা অদৃশ্য ফর্মাল দূরত্ব তৈরি করে রাখে। আজ সবাইকে নানা রকমের পোশাকে দেখে একেবারে নিজের বাড়ির ছেলে-মেয়ে বলে মনে হচ্ছে। সবার ভেতর আনন্দ।

 

কিন্তু আনন্দযজ্ঞ থামিয়ে দিতে হলো মাঝপথে। রাস্তায় প্রথমে একটা মোটরসাইকেল দেখা গেল তিনজন যুবককে নিয়ে চক্কর দিচ্ছে। একটু পরে আরো দুটি মোটরসাইকেলে আরো কিছু যুবককে দেখা গেলো। তাদের দৃষ্টি ভালো নয়। যে কোন উন্নয়নের জমিতেই প্রচুর আগাছা জন্মায়। এই আগাছাগুলিকে সময়মতো নিয়মিত উপড়ে ফেলতে হয়। নইলে উন্নয়ন চাপা পড়ে আগাছার নিচে। এই মোটরসাইকেল আরোহীদের সম্পর্কে অনেক খবর প্রকাশিত হচ্ছে ইদানীং যেগুলি মোটেও ভালো খবর নয়। এই আগাছাগুলিকে যারা পরিষ্কার করতে পারে, তারা করে না। রাজনৈতিক প্রশ্রয় পেয়ে এরা মানুষকে উত্যক্ত করে। এখন মোটর সাইকেলের সংখ্যা ক্রমে বাড়ছে।

 

দ্রুত সব গুটিয়ে আমাদের ছেলে-মেয়েদের যথাসম্ভব কিছু বুঝতে না দিয়েই তাড়াতাড়ি ফিরে যেতে হবে বলে বাসে ওঠানো হলো। তারা মন খারাপ করে অনিচ্ছাসত্ত্বেও বাসে উঠলো। আমাদের বাস ছাড়ার পর দেখা গেল অনেকগুলি মোটরসাইকেল আমাদের বাসকে তাড়া করছে। মোটরসাইকেল আরোহীরা আমাদের মেয়েদের উদ্দেশ্যে কিছু কথাবার্তাও ছুঁড়ে দিচ্ছিল বলে মনে হলো। মনটাই খারাপ হয়ে গেল। আমাদের তরুণদের মনোজগত তো অনেক ভালো হবার কথা। সেই ভালোদের চেয়ে এই মোটরসাইকেলওয়ালাদের দাপট এত বেশি কেন?

 

হঠাৎ আমাদের কাশেম স্যার রেগে উঠলেন, “অ্যাই, হাত দেখাচ্ছো কেন তাদের দিকে?” কাশেম স্যারকে এভাবে রেগে উঠতে আগে দেখিনি কখনো। কে কার দিকে হাত দেখাচ্ছে বুঝতে পারলাম না। কীভাবে যেন কাশেম স্যারের ধারণা হয়েছে আমাদের মেয়েদের কেউ সেই ছেলেদের উদ্দেশ্যে হাত নেড়েছে। আমরা তো শুধু এটুকুই পারি। আমাদের ঘরের মেয়েদের উপর রেগে যেতে পারি। বাইরের অনাচার বন্ধ করতে পারি না। তাই নিজের মেয়েদের ধমক দিয়ে ঘরের ভেতর আটকে রাখতে চাই। আমাদের রেগে যাওয়া আসলে আমাদের অসহায়তারই পরিচয়।

>>>>>>>>>> 

 

শাহীন কলেজে পদত্যাগের হিড়িক পড়েছে। পরপর তিন জনের পদত্যাগের খবর পেলাম। সংযুক্তা ম্যাডাম পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন। শাহীনের সাথে তাঁর অনেক বছরের সম্পর্ক শেষ হয়ে যাবে জুনের শুরুতে। আইভী ম্যাডামও চলে যাচ্ছেন জুনের শুরুতে। তিনিও শাহীনে এসেছিলেন আমার আগে। ইংরেজির ওয়াহিদা হাসনাত ম্যাডামও পদত্যাগ করেছেন। সবাই নিয়ম অনুযায়ী দু’মাস আগে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন। আমিও যাচ্ছি। কিন্তু দু’মাস আগে পদত্যাগপত্র জমা দিতে পারিনি। কারণ আমার অস্ট্রেলিয়ান ভিসা কনফার্ম হবার আগে রিজাইন করি কীভাবে?

 

স্কলারশিপের চিঠি পাওয়ার পর অনেককিছু করতে হয়েছে। স্কলারশিপ একসেপ্ট করে মেলবোর্ন ইউনিভার্সিটিতে ইমেইল পাঠানো, ফার্স্ট সেমিস্টারের বদলে সেকেন্ড সেমিস্টারে যাওয়ার জন্য আবেদন করা, অস্ট্রেলিয়ান হাই কমিশনে গিয়ে ভিসার দরখাস্ত জমা দেয়া, মেডিকেল টেস্ট, ইউনিভার্সিটিতে ভর্তির কনফার্মেশান লেটার – সবকিছু ঠিক হতে জুনের প্রথম সপ্তাহ চলে গেলো। ইতোমধ্যে আরো একটি ঘটনা ঘটেছে। আমি ইন্ডিয়ান গর্ভমেন্টের একটা স্কলারশিপ পেয়েছি পিএইচডি করার জন্য। এর আগেও একবার ইন্ডিয়ান স্কলারশিপ পেয়েছিলাম। কিন্তু তখন সিলেক্টেড হবার পরেও নানারকম তদবির করতে হতো। আমি করিনি। তাই ফাইনালি হয়নি আমার। এবার সরকার বদলের পর শুনেছি স্কলারশিপ প্রক্রিয়া অনেক স্বচ্ছ হয়েছে।

 

পদত্যাগপত্র লিখে জমা দেয়ার আগে অ্যাকাউন্ট্যান্ট কাদের সাহেবকে জিজ্ঞেস করলাম, “আমি কত বেতন পাই কাদের ভাই?”

“সব মিলিয়ে পাঁচ হাজার এক শ টাকা। কেন স্যার?”

“রিজাইন করলে দুই মাসের বেতনের চেক দিতে হয় না? চেক কার নামে লিখবো?”

কাদের ভাই অবাক হয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন আমার দিকে। তারপর জিজ্ঞেস করলেন, “কোথায় যাচ্ছেন স্যার?”

“অস্ট্রেলিয়া।“

 

প্রিন্সিপাল স্যার ছুটিতে। ভাইস-প্রিন্সিপাল ম্যাডামের হাতে দিলাম পদত্যাগপত্র ও দশ হাজার দুই শ টাকার চেক। ম্যাডাম কিছুক্ষণ কোন কথা বললেন না। ওটা বাড়িয়ে দিলেন পাশের টেবিলে নাসির স্যারের দিকে। নাসির স্যার একটু দেখেই বললেন, “কোথায় যাচ্ছো?”

“স্যার, অস্ট্রেলিয়া। একটা স্কলারশিপ পেয়েছি।“

নাসির স্যার উঠে দাঁড়িয়ে আমার সাথে কোলাকুলি করলেন।

“আমি খুব খুশি হয়েছি প্রদীপ। কনগ্র্যাচুলেশানস।“

 

খবর প্রচারিত হতে সময় লাগলো না। সহকর্মীদের সবাই জেনে গেলেন। আমার ডেস্ক পরিষ্কারের কাজ শুরু হয়ে গেল। প্রথম মেয়াদী পরীক্ষা হয়ে গেছে। ক্লাস টেনের ফিজিক্স খাতা কেটে রেজাল্ট জমা দিয়ে দিয়েছি ক্লাস টিচারের কাছে। ক্লাস ফাইভের খাতাও কেটে রেজাল্ট জমা দিয়ে দিয়েছি। কলেজের সেকেন্ড ইয়ার এখন নেই। এইচএসসি পরীক্ষা সামনে। ফার্স্ট ইয়ারের ফাইনাল পরীক্ষার প্রশ্নও তৈরি করে দিয়েছি। মহিউদ্দিন স্যারের মেয়ে পড়ে ফার্স্ট ইয়ারে। বইপত্র নোট যা ছিল সবই তাকে দিয়ে দিলাম যদি তার কোন কাজে লাগে।

 

জুনের ২০ তারিখ এসে গেল। শনিবার। ক্লাস এইট পর্যন্ত ছুটি। ক্লাস টেনের ক্লাস ছিল। ক্লাস শেষ করার পর বললাম, “কাল থেকে আমি আর আসবো না। তোমরা সবাই ভালো থেকো।“ মনে হলো তারা ঠিক বুঝতে পারলো না আমি কী বললাম। আমি ক্লাস থেকে বের হয়ে ফার্স্ট ইয়ারের ক্লাসে চলে গেলাম। তাদেরকেও ক্লাস শেষ করে জানালাম – চলে যাচ্ছি।

 

এগারোটায় ছুটি হয়ে গেল। কলেজের ছেলেমেয়েরা এসে ভীড় করলো আমার জানালার কাছে বারান্দায়। আদনান, রুবায়েত, সায়মা, মুশতারি সবাই। আমি কী বলবো বুঝতে পারছিলাম না। শুধু বললাম, “আবার দেখা হবে কোথাও না কোথাও। তোমরা অনেক বড় হবে জীবনে।“

 

তিন তলায় বড় ক্লাসরুমে বসেছেন সব শিক্ষক। আইভী ম্যাডাম এসেছেন আজ। লাইলুন নাহার ম্যাডাম অবসরে যাচ্ছেন। তাঁকেও বিদায় জানানো হবে আজ। সংযুক্তা ম্যাডাম আর ওয়াহিদা ম্যাডামকেও আজ আনুষ্ঠানিক বিদায় জানানোর কথা ছিল। কিন্তু তাঁরা আসেননি। সবার সাথে বেঞ্চেই বসতে স্বাচ্ছন্দ্য আমার। কিন্তু আজ সবার সামনে ডায়াসে বসতে হলো প্রিন্সিপাল স্যার, আইভী ম্যাডাম আর লাইলুন্নাহার ম্যাডামের সাথে। বিদায় অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দিতে হয়। শিক্ষকদের সামনে আমি এপর্যন্ত কোনদিন ফর্মাল কিছু বলিনি। আজ যাবার সময় বলতে হলো। আসলে কী বলবো বুঝতে পারছিলাম না। সাঈদ স্যার প্রায়ই বলেন, তুমি যত বেশি কষ্ট দেবে, ততবেশি মনে রাখবে তোমাকে। এখন আমি যদি বলি আপনারা আমাকে মনে রাখবেন, তাহলে তো বুঝতে হবে আমি অনেক কষ্ট দিয়েছি। তার চেয়ে ভুলে যেতে বলাই ভালো।

 

শিক্ষকরা চাঁদা দিয়ে উপহারসামগ্রী কিনে এনেছেন। ভাইস-প্রিন্সিপাল ম্যাডাম নিজের হাতে প্যাকেট খুলে পরিয়ে দিলেন টাইটান ঘড়ি। আনুষ্ঠানিকতার পরে অনানুষ্ঠানিকভাবে স্যার-ম্যাডামরা যখন একে একে এসে বিদায় জানাচ্ছিলেন, ভেতরে এক ধরনের যন্ত্রণা হচ্ছিলো, শেকড় ছেঁড়ার যন্ত্রণা।

 

টিচার্স রুমে এসে দেখি রুবায়েৎ আর ফারাহ দাঁড়িয়ে আছে। বোঝাই যাচ্ছে বাসায় গিয়ে আবার এসেছে।

“স্যার এগুলি আপনার জন্য।“ – একটা সুন্দর র‍্যাপিং পেপারে মোড়ানো প্যাকেট এগিয়ে দিলো ফারাহ। তার চোখ ভেজা।

“তুমি কাঁদছো কেন?”

“জানি না স্যার।“

“স্যার এটা আমার ইমেইল অ্যাড্রেস। প্লিজ ইমেইল মি হোয়েন ইউ রিচ দেয়ার।“ রুবায়েত চমৎকার ইংরেজি বলে। সে তার বোনের মতো কাঁদছে না, তবে বেশ বিষন্ন মনে হচ্ছে।

একটু পরে দেখা গেলো অঞ্জন স্যার আর একজন ভদ্রলোক এগিয়ে আসছেন আমাদের দিকে। তাদের পেছনে ক্লাস সিক্সের ক্রিস্টিন। রুবায়েত আর ফারাহ চলে গেলো।

 

“প্রদীপ, দেখো তোমার সাথে দেখা করতে এসেছেন অধিকারী স্যার। পর্ণার বাবা।“

 

 ক্রিস্টিনের ডাক নাম পর্ণা।  আজ তাদের ছুটি। কিন্তু কীভাবে খবর পেয়েছে কে জানে। তার বাবার সাথে আমার আগে কখনো পরিচয় হয়নি। এয়ারফোর্স অফিসার, অথচ মনে হচ্ছে একটুও অহংকার নেই। কিছুক্ষণ কথাবার্তা হলো।

“অস্ট্রেলিয়ার কোথায় যাচ্ছেন?”

“মেলবোর্নে।“

“মেলবোর্ন খুব সুন্দর শহর। আমি গিয়েছিলাম কয়েক বছর আগে। খুব ভালো লেগেছে আমার।“

ক্রিস্টিন একটা কথাও বলছে না। ভীষণ ট্যালেন্ট এই মেয়েটি ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেয়েছে। এই ছুটির দিনে তার বাবাকে টেনে নিয়ে এসেছে আমাকে বিদায় জানাতে।

 

অফিসে গিয়ে আয়া-পিয়ন আর অফিস স্টাফদের সাথে শেষ বারের মতো দেখা করে এলাম।

 

সময় শেষ হয়ে গেল। শাহীন কলেজে আমার চার বছর সাত মাস ছয় দিনের জমানো স্মৃতি নিয়ে বের হয়ে গেলাম কলেজ কম্পাউন্ড থেকে।

 

শাহীন কলেজ আমার জীবনের প্রথম কর্মক্ষেত্র। এই প্রতিষ্ঠানই আমাকে দিয়েছে আমার যোগ্যতার প্রথম স্বীকৃতি। এখানে আমার সহকর্মীদের কাছ থেকে পেয়েছি আদর স্নেহ। এই প্রতিষ্ঠানেই আমি অর্জন করেছি শত শত শিক্ষার্থীর ভালোবাসা। এই অফুরান ভালোবাসার ঋণ শোধ করার সাধ্য আমার নেই।

 

 

শেষ

Latest Post

রাজকন্যে সবিতা

  আমার মা ছিলেন নিরক্ষর, বাবার পড়ালেখা চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত। লেখাপড়া করতে পারেননি বলে লেখাপড়ার প্রতি প্রচন্ড ভালোবাসা ছিল বাবার। তাই নিজের ...

Popular Posts