Sunday 18 October 2020

যে গ্রহে সূর্য উঠে পশ্চিম দিকে - পর্ব ১


শুকতারা তারা নয়

ক্লাসের ফার্স্টবয় হওয়ার বেশ কিছু সুবিধা আছে। যেমন ক্লাসের মনিটর হয়ে সবার ওপর দাপট দেখানো যায়, প্রতিদিন ফার্স্টবেঞ্চে বসা যায়, টিচারদের কাছে গুরুত্ব পাওয়া যায়, ইচ্ছে করলেই যখন যাকে খুশি তার নামে নালিশ করা যায়, সহপাঠীদের ধমক দেয়া যায়, যখনখুশি টিচার্স রুমে যাওয়া যায়। এই সবগুলো সুবিধাই আমি ভোগ করে আসছি গত সাত বছর ধরে। শিশুশ্রেণি থেকে শুরু করে এপর্যন্ত কোন ক্লাসেই আমি সেকেন্ড হইনি। ফারজানা যতই চেষ্টা করুক, পরীক্ষায় আমার চেয়ে বেশি নম্বর পাওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়। এটা আমি চ্যালেঞ্জ করে বলতে পারি। কিন্তু বলছি না, কারণ তাতে তোমরা মনে করবে আমি অহংকারী। অনেকেই আমাকে অহংকারী বলে মনে করে। কিন্তু কী করা যাবে বলো, ভালো স্টুডেন্টদের এই অপবাদ সহ্য করতেই হয়। আমি যেটাকে আমার আত্মবিশ্বাস বলে মনে করি, অন্যরা ভাবে সেটা আমার অহংকার। এক্সট্রাঅর্ডিনারি ভালো স্টুডেন্টদের কোন সত্যিকারের বন্ধু থাকে না। আমারও নেই। যারা আমার কাছাকাছি থাকতে চায় তারা আমার মোসাহেবি করে। সেটা আমার ক্ষমতার কারণে। ক্লাসে আমার অনেক ক্ষমতা। ক্ষমতাশালীরা যেভাবে ক্ষমতার স্বাদ উপভোগ করে, আমিও করে আসছিলাম এতদিন। কিন্তু আফতাব স্যার ক্লাসটিচার হয়ে আসার পর আমার ক্ষমতা কেমন যেন বিস্বাদ হয়ে উঠতে শুরু করেছে।

          ক্লাস সেভেনের শুরুতে ক্লাসটিচার ছিলেন সবিতা ম্যাডাম। কত আনন্দের দিন ছিল তখন আমার জন্য। সবাইকে 'বদমাইশ' বলে ধমক দিয়ে ঠান্ডা করে দিতেন ম্যাডাম, কিন্তু আমার সাথে কথা বলতেন কত মিষ্টি করে। শুধু সবিতা ম্যাডাম কেন, যে হালিমা ম্যাডামকে সবাই বাঘের মত ভয় পায়, সেই হালিমা ম্যাডামও কত মিষ্টি করে আমাকে বলেন, "সুব্রত, অংকটা বোর্ডে লিখে দাও তো বাবা।" বুঝতেই পারছো, হালিমা ম্যাডামের অংকের ক্লাসে আমিও অংক করাই মাঝে মাঝে। আর আফতাব স্যার আমার এতদিনের জমানো প্রেস্টিজ পাংকচার করে দিচ্ছেন।

          আফতাব স্যার ক্লাসটিচার হবার কয়েকদিনের মধ্যেই ক্লাসের সবাই কেমন যেন স্বেচ্ছাচারী হয়ে উঠেছে। আগে আমি কত সহজেই সবাইকে দমিয়ে রাখতে পারতাম। পুরো ক্লাসে আমার একটা কমান্ড ছিল। হাতে স্কেল নিয়ে উঠে দাঁড়ালেই চুপ হয়ে যেতো সবাই। অভিযোগ খাতায় নাম লিখে সবিতা ম্যাডামকে দিলে গন্ডগোলকারীদের শাস্তি অবধারিত ছিল। কিন্তু আফতাব স্যার শাস্তি দেয়া তো দূরের কথা, অভিযোগ খাতা দেখালে হা হা করে হাসেন। নিজে ক্লাউনের মতো হাসুন - তাতে আমার তেমন কোন সমস্যা নেই। কিন্তু আমাকে সবার কাছে ঠাট্টার পাত্র করে তোলাটা কতটুকু যুক্তিযুক্ত? আফতাব স্যারের প্রশ্রয়ে নয়ন ক্লাসে সবার সামনে আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করার সাহস পায়। আমিই নাকি গন্ডগোলকারী! ফাজিলটা বলেছে আমি নাকি সারাক্ষণ গন্ড গোল করে রাখি, তাই আমি গন্ডগোলকারী! এটা শুনে নয়নকে কষে একটা ধমক লাগানো উচিত ছিল না আফতাব স্যারের? কিন্তু না, তিনি এই উচিত কাজটা না করে হা হা করে হেসে বললেন, "নুসরাত নীলিমা, তোমার কথায় যুক্তি আছে।"

          আফতাব স্যারের প্রিয় শব্দ হচ্ছে 'যুক্তি'। তিনি বলেন, 'অযৌক্তিক কোন কিছুই গ্রহণযোগ্য নয়। শক্ত বৈজ্ঞানিক যুক্তির উপরেই দাঁড়িয়ে আছে বিশ্বব্রহ্মান্ডের সবকিছু'। হা হা করে হাসতে হাসতে আফতাব স্যার মাঝে মাঝে অনেক দার্শনিক কথাবার্তা বলেন। অভ্যাসবশত সেগুলো খাতায় লিখে নিতে গেলে স্যার বলেন, 'লিখতে হবে না, এসব কথা বুঝতে পারলে এমনিতেই মনে থাকবে।'

          মনে তো থাকবেই। অপমানের কথা কি কেউ ভুলতে পারে? আমার সারাজীবন মনে থাকবে এসব। যেসব বিষয় নিয়ে এরা সব হাসাহাসি করে, কোন বুদ্ধিমান প্রাণী সেগুলো নিয়ে হাসতে পারে? যেমন একদিন শুনলাম নয়ন বলছে, 'আফতাব স্যারের মনে হয় চল্লিশটা দাঁত'। শুনেই সবাই হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ার অবস্থা। আচ্ছা, এটা কোন হাসির কথা হলো? আফতাব স্যার কথায় কথায় হাসেন সেটা সত্যি। হাসলে আফতাব স্যারের অনেকগুলো প্রকট দাঁত বের হয়ে আসে সেটাও সত্যি। কিন্তু তাই বলে কি তাঁর চল্লিশটা দাঁত থাকবে? মানুষের কি ৩২টার বেশি দাঁত থাকে? এরকম অবস্থায় গন্ড গোল করে না রেখে কি আমি স্টুপিডের মত গন্ড লম্বা করে দেবো? ফাজিল কোথাকার।

          শুধু নয়ন নয়, তাদের চার জনের গ্রুপটাই ফাজিলের গ্রুপ। সারাক্ষণ এত হৈ চৈ হাসিতামাশা করার পরেও এরা যে কীভাবে সব পরীক্ষায় পাস করে ফেলে কে জানে। শুধু পাস তো নয় - সেকেন্ড থার্ড ফোর্থ ফিফ্‌থ হয়ে যায়। সিক্সের বার্ষিক পরীক্ষায় ফারজানা আমার চেয়ে মাত্র পাঁচ নম্বর কম পেয়েছে।  সেকেন্ড হয়ে ক্লাসে সেকেন্ড মনিটর হয়েছে সে। তার তো কিছুটা হলেও আমার মতো গাম্ভীর্য থাকা উচিত। কিন্তু না - সারাক্ষণ শুধু হিহি হাহা করছে সবার সাথে। গত মাসে তাদের সাথে এসে জুটেছে আরেকজন - লুনা। মেড ইন চায়না। এসেই সবার সাথে কী ভাব কী ভাব! কয়েক বছর চীন দেশে থেকে এসেছে বলে নিজেকে চীনা ভাষার পন্ডিত মনে করছে। চীনা ভাষা শিখানোর স্কুল খুলে বসেছে ক্লাসে। সবাই তার কাছ থেকে চীনা শব্দ শিখতে চাচ্ছে।

          'নি হাউ সুব্রত'

          যে ছেলেটা এই মাত্র ক্লাসে ঢুকে আমাকে চৈনিক ভাষায় সম্ভাষণ জানালো তার নাম বিদ্যুৎ - জয়নাল আবেদীন বিদ্যুৎ। আমাদের ক্লাসের সবচেয়ে বড় ঝামেলা হলো সে। বাংলা ভাষাটাও ঠিকমত বলতে পারে না, অথচ চীনা ভাষায় 'হ্যালো' বলে। এর মূলে আছে ইলোরা ইসলাম লুনা। আফতাব স্যার লুনাকে চাঁদের সাথে তুলনা করে শুধু মাথায় নয়, চাঁদে তুলে দিয়েছেন।

          'নি হাউ অর্ক, নি হাউ আব্‌স'

আবদুর রহিম কখন থেকে আব্‌স হলো জানি না।

          'নি হাউ বিদ্যুৎ'

          ওরে বাপ্‌রে, আবদুর রহিমও চায়নিজ বলছে। তাকিয়ে দেখলাম বিদ্যুৎ পেছনের বেঞ্চে অর্ক আর আবদুর রহিমের কাছে গিয়ে বসেছে। অর্ক সবসময় পেছনের বেঞ্চে বসে আর আবদুর রহিম তার পাশে পাশে থাকে।

          বিশাল দৈত্যের মত শরীর বিদ্যুতের। সাইজে আমাদের ভোলানাথ স্যারের চেয়ে বড় হবে। তার এতদিনে ইউনিভার্সিটিতে পড়া উচিত ছিল, অথচ পড়ে ক্লাস সেভেনে। আমাদের স্কুলে এসে ভর্তি হয়েছে গত বছর। গাড়ি নিয়ে স্কুলে আসে। দু'হাতে টাকা-পয়সা খরচ করে প্রচুর বন্ধুবান্ধব জুটিয়ে ফেলেছে। কলেজের ভাইয়াদের সাথেও তার ওঠাবসা। টিচারদের অনেকে ছুটির পরে তার গাড়িতে লিফ্‌ট নেন বলে বিদ্যুৎ নিজেকে বিরাট কিছু মনে করে।  ক্লাস সিক্সে তার কোন ডাকনাম ছিল না। ক্লাস সেভেনে ওঠার পর বিদ্যুৎ নামটা সে নিজে নিজেই নিয়েছে। কিছুদিন আগে আফতাব স্যার যখন বললেন বুধ গ্রহে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের নামে একটা ক্রেটার বা গহ্বর আছে, বিদ্যুৎ তখন থেকে নিজের নাম জয়নাল আবেদীনের বদলে জয়নুল আবেদীন লিখতে শুরু করেছে।

          বিদ্যুৎ সুযোগ পেলেই গান গায়। বেশিরভাগই চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার গান। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষা এমনিতেই খুব কর্কশ, তার ওপর বিদ্যুতের গলায় এমন বেসুরো লাগে যে খুব নিরীহ ভদ্রলোকেরও রাগ উঠে যাবে তার গান শুনলে। ক্লাস সিক্সে তার গানের উপদ্রব এত বেশি ছিল না। আফতাব স্যার  শাস্তি দেন না বলেই দিনের পর দিন তার গানের উপদ্রব বেড়ে চলেছে। আফতাব স্যারকে বলে কোন লাভ নেই। কারণ আফতাব স্যারের গানের গলা বিদ্যুতের চেয়েও বেসুরো। আমাদের ক্লাস-অ্যাসেম্বলিতে আফতাব স্যার যখন জাতীয় সঙ্গীতে গলা মেলান তখন কানে আঙুল দিতে ইচ্ছে করে। নেহায়েত জাতীয় সঙ্গীত বলে সহ্য করতে হয়।  

          আমাদের ক্লাস-অ্যাসেম্বলি শুরু হয় সকাল আটটায়। ক্লাস শুরুর আগে আমরা ক্লাসে দাঁড়িয়েই জাতীয় সঙ্গীত গাই। আমি সাধারণত আটটা বাজার পাঁচ দশ মিনিট আগে আসি। সকালে আমাকে বাসা থেকে বের হতে হয় সাড়ে ছ'টায়। স্কুলে আসার আগে যেতে হয় প্রাইভেট পড়তে। ক্লাসে যে টিচার যে সাবজেক্ট পড়ান সেই টিচারের কাছে সেই সাবজেক্টের প্রাইভেট পড়লে অনেক সুবিধা পাওয়া যায়। আমাকে প্রতিদিন তিন-চার জন টিচারের কাছে যেতে হয়। স্কুল ছুটির পর সব সাবজেক্ট ম্যানেজ করা যায় না বলে সকালে স্কুল শুরুর আগেও যেতে হয়। সপ্তাহে তিন দিন মোতালেব স্যারের কাছে ইংরেজি, আর তিন দিন খাইরুল স্যারের কাছে বিজ্ঞান। আফতাব স্যার প্রাইভেট পড়ান না বলেই খাইরুল স্যারের কাছে যেতে হচ্ছে। স্কুলে খাইরুল স্যারের অনেক ক্ষমতা - ভাইস প্রিন্সিপালের আশেপাশে ঘুরতে দেখা যায় তাঁকে। তাঁর বাসায় এত ছেলেমেয়ে পড়তে যায় যে মাঝে মাঝে আমাদের ফ্লোরে বসে নোট নিতে হয়। আজ সকালে গিয়ে শুনলাম স্যারের বাসায় স্যারের শ্বশুরবাড়ির মেহমান এসেছে। পড়ানোর জায়গা নেই তাই আজ ছুটি। তাই আজ অনেক আগেই স্কুলে এসে বসে আছি।

          আমাদের টিচারদের মধ্যে আফতাব স্যার ছাড়া আর সব টিচারই প্রাইভেট পড়ান। আর ক্লাসের মধ্যে মনে হয় অর্ক আর আবদুর রহিম ছাড়া আর সবাই কারো না কারো কাছে প্রাইভেট পড়ে। আবদুর রহিম প্রাইভেট পড়ে না - কারণ তার মা-বাবার টাকা নেই। টাকা ছাড়া কোন্‌ টিচার প্রাইভেট পড়াতে রাজি হবে? আর অর্ক প্রাইভেট পড়ে না - কারণ অর্ক আফতাব স্যারের মুরিদ হয়েছে। আফতাব স্যার বলেন, কোন শিশুকে যদি নিজে নিজে হাঁটতে না দিয়ে সারাক্ষণ কোলে করে রাখা হয় তাহলে সে শিশু কোনদিন হাঁটতে শিখবে না। সেরকম কেউ যদি কোন কিছু নিজে নিজে বুঝতে চেষ্টা না করে সবসময় প্রাইভেট টিচারের উপর নির্ভর করে তাহলে সে কিছুই শিখতে পারবে না।

          অর্ক আফতাব স্যারের এই কথাগুলো বিশ্বাস করে বসে আছে। বোকা একটা। অর্ক যে সারাক্ষণ এত এত বই পড়ে তাতে লাভ হয় কিছু? পরীক্ষাতে তো সে কোন সাবজেক্টেই এ-প্লাস পায় না। নিজেকে আইনস্টাইন মনে করে, অথচ ক্লাস সিক্সে বিজ্ঞানে পেয়েছে ৪১। সেটা নিয়ে তার কোন মাথাব্যথাই নেই। সবাইকে সে বলে বেড়ায় - আইনস্টাইনও নাকি স্কুলের পরীক্ষায় ফেল করতেন। এবছরও সে খুব একটা ভালো করতে পারবে বলে মনে হয় না। ক্লাসটেস্টের কোনটাতেই সে ৫০% এর বেশি পায়নি। হালিমা ম্যাডামের অংকে পেয়েছে দশের মধ্যে দুই। টিচার্স রুম থেকে খাতা নিয়ে আসার সময় আমি তার খাতা দেখেছি। তার দুটো অংকই ধরতে গেলে শুদ্ধ হয়েছে। কিন্তু হালিমা ম্যাডাম যেভাবে উত্তর লেখা পছন্দ করেন - সেভাবে লিখেনি সে। প্রাইভেট না পড়ার মজা বোঝ এবার!

          "এভাবে সারাক্ষণ পড়তে তোর ভালো লাগে?"

          অর্ককে প্রশ্ন করলো বিদ্যুৎ। আমি কান খাড়া করে আছি অর্ক কী বলে শোনার জন্য। কিন্তু উত্তর দেয়া তো দূরের কথা, বইয়ের পৃষ্ঠা থেকে চোখও সরালো না অর্ক। এত মনযোগ দিয়ে কী পড়ছে সে? আফতাব স্যার কি ক্লাসটেস্ট নেবেন আজ? নিতেও পারেন। আমাদের সব সাবজেক্টের ক্লাসটেস্ট হয়ে গেছে - শুধু বিজ্ঞান বাকি। অর্ক কী পড়ছে দেখা দরকার।

          "অ্যাই অর্ক, কী বই পড়ছিস?"

          হাতের হলুদ মলাটের বইটা উঁচু করে দেখালো অর্ক। তারপর আরেকটি পৃষ্ঠা উল্টাতে উল্টাতে অর্ক আমার দিকে তাকালো একটু, তারপর আবার পড়ায় মন দিল। ভেনাস - প্যাট্রিক মুর। ইংরেজিতে লেখা বইও পড়তে শুরু করেছে সে। শুক্র গ্রহ সম্পর্কে পড়ছে - তার মানে আরেকটি বিজ্ঞান প্রজেক্ট।

          আফতাব স্যার আমাদের বিজ্ঞান পড়ানো শুরু করার পর কীভাবে যেন আমাদের ক্লাসটা বিজ্ঞানময় হয়ে উঠেছে। অন্য সব টিচারের ক্লাসে যারা ভয়ে মাথা নিচু করে থাকে, তারাও আফতাব স্যারের ক্লাসে বিজ্ঞান নিয়ে প্রশ্ন করে। আর আফতাব স্যার বিজ্ঞান বই থেকে ধারাবাহিকভাবে না পড়িয়ে কখনো বইয়ের পেছন থেকে, কখনো মাঝখান থেকে পড়াতে শুরু করেন। যেকোনো প্রসঙ্গ থেকেই কীভাবে যেন বিজ্ঞান খুঁজে বের করে ফেলেন তিনি। প্রথম দিন এসে আমাদের 'আকাশ ভরা সূর্য-তারা' গান থেকে কীভাবে যেন সূর্যের প্রসঙ্গ নিয়ে এলেন। আর কী আশ্চর্য - সবাই সূর্য সম্পর্কে জানতে আগ্রহী হয়ে উঠলো। অনেকগুলো সায়েন্টিফিক পোস্টার তৈরি হয়ে গেলো কয়েক সপ্তাহের মধ্যে। তারপর পৃথিবী, চাঁদ ও বুধ প্রকল্প শেষ করার পর এখন শুক্র প্রকল্প শুরু হচ্ছে। আমাদের বিজ্ঞান বইতে এসব কিছুই নেই। অথচ আফতাব স্যার আমাদের উৎসাহ দিচ্ছেন লাইব্রেরিতে গিয়ে বিজ্ঞানের বই পড়তে। কত রকমের বিজ্ঞান বই এনে লাইব্রেরি ভর্তি করে ফেলতে শুরু করেছেন তিনি। আমাদের সময় কোথায় এত বই পড়ার?

          টেক্সট বই আর গাইড বই ছাড়া আর কোন বই পড়ার প্রতি আমার কোন আগ্রহ নেই। আমি পড়াশোনা করি পরীক্ষায় ফার্স্ট হওয়ার জন্য। অর্ক কী কারণে এত পড়াশোনা করে আমি বুঝতে পারি না। যে কারণেই পড়াশোনা করুক, অর্ককে দেখে বুঝতে পারি বেশি বই পড়লে মানুষ একটু ভ্যাদা টাইপের হয়ে যায়। অর্ক খুব যুক্তি দিয়ে সুন্দর করে কথা বলতে পারে, কিন্তু ঝগড়া করতে পারে না। ক্লাসের কারো সাথেই তার শত্রুতা নেই, আবার সেরকম বন্ধুত্বও নেই কারো সাথে। বিজ্ঞানী হতে গেলে নাকি সবকিছুতে নির্বিকার হওয়া শিখতে হয়। বন্ধুত্বে নাকি আবেগ জড়িত থাকে, তাই নির্বিকার থাকা যায় না। এরকম হলে তো গৌতম বুদ্ধকে বিরাট বিজ্ঞানী বলতে হয়!

          অবশ্য একদম কারো সাথেই যে অর্কের বন্ধুত্ব নেই তা বলা যায় না। আবদুর রহিমের সাথে তার সবচেয়ে বেশি বন্ধুত্ব। আবদুর রহিম সারাক্ষণ অর্কের পাশেই থাকে। তাকে অর্কের বডিগার্ড বলা চলে। আবদুর রহিম অর্ককে এত পছন্দ করে - কারণ অর্ক আবদুর রহিমকে লেখাপড়ায় সাহায্য করে। দেখলে হাসি পায় আমার। এক কাণা আরেক কাণাকে সূর্য দেখায়! দেখলাম আবদুর রহিম অর্কের খাতা দেখে দেখে হালিমা ম্যাডামের হোমওয়ার্ক করছে।

          হালিমা ম্যাডামের হোমওয়ার্ক না আনলে খবর আছে। হালিমা ম্যাডাম দেখতে হালকাপাতলা হলে কি হবে, বকা দেয়ার সময় বাঘের মত হালুম করে কানের পর্দা ফাটিয়ে দেন। স্কুলে বেতের বাড়ি আইন করে বন্ধ করে দেয়া না হলে অনেকেরই পিঠের চামড়া তুলে ফেলতেন হালিমা ম্যাডাম। হালিমা ম্যাডাম গাদা গাদা হোমওয়ার্ক দেন। ক্লাসে দুইটা অংক করান, আর দশটা অংক হোমওয়ার্ক দেন। এতগুলো অংক বাসায় বসে করা যায় নাকি? আমরা করিও না। যে অংকগুলো হোমওয়ার্ক করতে দেন, সেগুলোই আমরা তাঁর কাছে প্রাইভেট পড়তে গিয়ে করে নিই। হোমওয়ার্ক হোম-এ বসে করার সময় কোথায় আমাদের?

          ক্লাসের অনেকেই এসে গেছে এখন। আটটা বাজার সাথে সাথে আমাকে আমার ক্লাসের ডিসিপ্লিনের দিকে নজর দিতে হবে। ক্লাসের শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য আমাকে মাঝে মাঝে মৃদু লাঠিচার্জের মতো করে মৃদু স্কেলচার্জ করতে হয়। বলাবাহুল্য তুলনামূলকভাবে দুর্বলরাই হয় আমার টার্গেট।

          ক্লাস শুরুর আগে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আড্ডা মারা অনেকের অনেক দিনের অভ্যাস। আমাদের ক্লাসরুমটা তিন তলার একেবারে কোণায় হওয়াতে অনেকেই আটটা বাজার এক মিনিট আগেও বারান্দা থেকে ক্লাসরুমে ঢুকতে চায় না। আজও বারান্দা ভর্তি। হঠাৎ কে যেন বলে উঠলো, "অ্যাই দ্যাখ দ্যাখ, ভোলানাথ স্যার আফতাব স্যারকে মারছে!"

          এক দৌড়ে বারান্দায় বের হয়ে এলাম। পাশের ক্লাস থেকেও সবাই বের হয়ে গ্রিল ধরে নিচের মাঠের দিকে তাকিয়ে আছে। আমাদের স্কুলে ছাত্রদের মধ্যেই তেমন কোন মারপিটের রেকর্ড নেই - সেখানে কিনা শিক্ষকদের মধ্যে মারপিট লেগে গেলো? তাও আবার ভোলানাথ স্যার আর আফতাব স্যারের মধ্যে? এই ঘটনা তো শতাব্দীর সেরা ঘটনা।

          ভোলানাথ স্যার আমাদের শরীরচর্চা শিক্ষক। তিনি ধমক না দিয়ে কথা বলতে পারেন না। নিচের মাঠে দাঁড়িয়েই এমন হুংকার দেন যে আমরা ভয় পেয়ে তিন তলার বারান্দা থেকে দ্রুত ক্লাসে ঢুকে যাই। শারীরিক শিক্ষা দেয়ার নামে শারীরিক শাস্তি দিতে ওস্তাদ ভোলানাথ স্যার। এই শাস্তি দেয়া নিয়েই আফতাব স্যারের সাথে একবার কথা কাটাকাটি হয়েছিল ভোলানাথ স্যারের। আফতাব স্যার শাস্তিবিরোধী মানুষ। ভোলানাথ স্যার আফতাব স্যারের ওপর রেগে আছেন এটা আমরা জানি। তাই ভোলানাথ স্যার আফতাব স্যারকে সুযোগ পেলে ধরে মারতে শুরু করবেন এটা অবিশ্বাস্য মনে হয়নি।

          ক্লাসরুম থেকে বের হয়ে বারান্দার গ্রিলের কাছে যেতে কয়েক সেকেন্ডও লাগার কথা নয়। এর মধ্যেই আমি কল্পনায় দেখে ফেলছি মাঠে ভোলানাথ স্যার আফতাব স্যারকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিচ্ছেন। ভোলানাথ স্যারের যে শরীর এবং শক্তি তাতে আফতাব স্যারের মত লিকলিকে পাতলা মানুষকে মাথায় তুলে আছাড় দেয়া কোন ব্যাপারই না। কিন্তু না, তেমন কিছুই ঘটলো না। সবাইকে খুব হতাশ হতে হলো - কারণ মারপিটের কোন ঘটনাই ঘটেনি। দেখলাম মাঠে ভোলানাথ স্যার আর আফতাব স্যার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে হা হা করে হাসছেন। ভোলানাথ স্যার যে হাসতে পারেন এটাই আমার জানা ছিল না। আফতাব স্যারকে দেখে আমাদের সবারই হাসি পাচ্ছে - কারণ আফতাব স্যার টাই পরেছেন।

          মারপিট লাগার গুজবটা কে ছড়িয়েছিল জানা যায়নি। আসল ব্যাপারটা জানা গেলো বিদ্যুতের কাছ থেকে। তার সোর্সের অভাব নেই। একেক দিন একেক শিক্ষককে স্কুলের ডিউটি অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে হয়। যে স্যারের ডিউটি তাকে অবশ্যই টাই পরতে হবে। কোন ম্যাডামের ডিউটি হলে সেই ম্যাডাম সেদিন সাদা শাড়ি পরে আসবেন। আজ আফতাব স্যার ডিউটি অফিসার। কিন্তু তিনি টাই পরতে জানেন না। ভোলানাথ স্যার আফতাব স্যারের গলা ধরে টাই পরিয়ে দিচ্ছিলেন। এই মুহূর্তটা দেখেই কোন একজন চিৎকার করে বলে ফেলেছে ভোলানাথ স্যার আফতাব স্যারকে ধরে মারছে। তারপর গুজবের ডালপালা গজিয়ে গেছে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে। আমি নিজেও তো কতকিছু কল্পনা করে ফেললাম। আমি হয়তো মনে মনে চাচ্ছিলাম যে আফতাব স্যারকে ধরে একটা আছাড় দেয়া হোক। এর পেছনে যুক্তি কী?

          বিভিন্ন কারণে আফতাব স্যারের উপর আমি কিছুটা বিরক্ত। অথচ ক্লাসের সবাই পারলে আফতাব স্যারকে মাথায় তুলে নাচে! সবাইকে এত লাই দিলে খুশি তো হবেই। আচ্ছা, তুমিই বলো - ক্লাসে সবার কি সমান গুরুত্ব পাওয়ার কথা? ভালো স্টুডেন্টদের দাম একটু বেশি হবে না? ক্লাসে আমার গুরুত্ব আর আবদুর রহিমের গুরুত্ব কি এক? আফতাব স্যার ক্লাসের ভেতর ভালো স্টুডেন্ট আর খারাপ স্টুডেন্টদের মধ্যে কোন পার্থক্যই রাখছেন না। আবদুর রহিমের এটা ভালো লাগতে পারে, আমার তো ভালো লাগার কথা নয়। কিন্তু ভালো না লাগলেও আমি আমার কর্তব্যে কোন অবহেলা করছি না। আফতাব স্যার ছাড়াও আমাদের আরো দশ সাবজেক্টের দশ জন টিচার আছেন। তাঁদের কাছে আমার আলাদা মর্যাদা আছে। আমাকে তো সেই মর্যাদা ধরে রাখতে হবে। মর্যাদা অর্জন করার চেয়ে রক্ষা করাই কঠিন। কঠিন কাজের প্রধান কাজ হলো ক্লাসে নিজের কমান্ড বজায় রাখা। কমান্ডারের কমান্ড যদি কেউ না মানে তাহলে কমান্ডার হওয়া আর না হওয়া সমান কথা।

          আফতাব স্যার ক্লাসে ঢুকতেই হাসির রোল পড়ে গেল। স্মার্টনেস বাড়ানোর জন্য মানুষ টাই পরে। অথচ আফতাব স্যারকে দেখাচ্ছে কাকতাড়ুয়ার মত। এই মানুষটার চেহারাটা এমন যে - কোন পোশাকেই তাকে মানায় না। কুচকুচে কালো শরীরে জড়ানো ঢলঢলে একটা সাদা অ্যাপ্রোন। কালো প্যান্ট আর কুচকানো সাদা সার্টের সাথে ক্যাটক্যাটে সবুজ একটা টাই। এই রঙের টাই যে কোম্পানি বানিয়েছে সেই কোম্পানির সাজা হওয়া উচিত।

          নয়ন তো বলেই ফেললো, "স্যার, আপনার টাইটা বিশ্রী।"

          আফতাব স্যার হাসতে হাসতে বললেন, "তাই নাকি? ভোলানাথ স্যার যে বললেন খুব সুন্দর টাই! আমার তো টাই নেই। আজ আবার আমি ডিউটি অফিসার। টাই ছাড়া নাকি ডিউটি অফিসার হওয়া যায় না। ভোলানাথ স্যার টাইটা ধার দিলেন। হাহাহা।"

          "না স্যার, বিশ্রী না স্যার, সুন্দর টাই, আপনাকে সুন্দর লাগছে স্যার।"            সবাই বুঝতে পারছে বিদ্যুৎ স্যারকে তেল দেয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু বিদ্যুতের তো জানা উচিত - আফতাব স্যারকে তেল দেয়া আর তেল মাটিতে ফেলে দেয়া সমান কথা।

          আফতাব স্যার হাসিমুখে বললেন, "খুবই ইন্টারেস্টিং। নুসরাত নীলিমা বলছে টাইটা বিশ্রী। জয়নাল আবেদীন বলছে টাইটা সুন্দর। দ্যাখো, দুজনই কিন্তু ঠিক বলছে নিজ নিজ দৃষ্টিকোণ থেকে। এই ব্যাপারটাকে কি পুরোপুরি বিজ্ঞান বলা যায়? সুন্দর লাগা, বিশ্রী লাগা? ভালো লাগা, ভালো না লাগা?"

          "না যায় না স্যার। এই ব্যাপারটা নৈর্ব্যক্তিক নয়। বিজ্ঞান হতে হবে সবার কাছে সমান। ব্যক্তিগত পছন্দের উপর বিজ্ঞান নির্ভর করে না।" - পন্ডিতি ফলানোর সুযোগ হাতছাড়া করলো না অর্ক।

          এই কথাগুলো আমিও জানি। অর্কের মত লোকদেখানো ব্যাপার আমার মধ্যে নেই বলেই আমি এসবের উত্তর দিই না। আফতাব স্যার তাঁর ক্যাটক্যাটে সবুজ টাই থেকেও বিজ্ঞানের প্রসঙ্গ বের করে ফেলেছেন। এখন এটা নিয়ে আবার কোন্‌দিকে চলে যাবেন। তার আগেই স্যারকে মনে করিয়ে দিতে হবে যে আমাদের ক্লাসটেস্ট এখনো নেননি তিনি। বললাম, "স্যার, আমাদের ক্লাসটেস্ট কোন্‌দিন নেবেন?"

          "এখন নেব।"

          হঠাৎ পুরো ক্লাস চুপ হয়ে গেলো। আমরা বুঝতে পারছি না স্যার কি সিরিয়াস, নাকি মজা করছেন। স্যারের মুখ যথারীতি হাসি হাসি।

          "স্যার সত্যি?"

          "হ্যাঁ। বই-খাতা বন্ধ কর।"

          "খাতা বন্ধ করলে লিখব কোথায় স্যার?" - ফারজানা জানতে চাইলো।

          আসলেই তো। ক্লাসটেস্টের নিয়ম হলো স্যার বোর্ডে প্রশ্ন লিখে দেবেন। অথবা আমাকে বলবেন লিখে দিতে। আমরা ক্লাস-টেস্টের খাতায় সেই প্রশ্নের উত্তর লিখবো। ক্লাসটেস্টের খাতা আমাদের ব্যাগেই রাখতে হয় সারাবছর। প্রতিদিন সাত পিরিয়ডের জন্য হোমওয়ার্ক, ক্লাসওয়ার্ক আর ক্লাসটেস্টের খাতা মিলিয়ে আমাদের একুশটা খাতা ব্যাগে রাখতে হয়। তার উপর আছে দিনে তিন-চারটা প্রাইভেটের খাতা। অনেকে তো স্কুল থেকেই চলে যায় কোচিং সেন্টারে। আমার স্কুলব্যাগের ভর দশ কেজির বেশি।

          আফতাব স্যার বললেন, "একটু পরেই দেখতে পাবে কোথায় লিখবে। আমি তোমাদের প্রশ্নপত্র দেবো। সেখানে উত্তর লেখার জন্য জায়গা আছে। যতটুকু জায়গা আছে ততটুকু জায়গাতে উত্তর লিখবে।"

          আফতাব স্যার হলুদ রঙের একটা প্যাকেট থেকে প্রশ্ন বের করলেন। চার পৃষ্ঠার ছাপানো প্রশ্নপত্র। এই প্রথম ছাপানো প্রশ্নপত্রে ক্লাসটেস্ট দিচ্ছি। কিন্তু প্রশ্ন দেখে আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার অবস্থা। এই প্রশ্নগুলো তো গাইড বইতে নেই। স্যার ক্লাসে বিষয়গুলো নিয়ে অনেক আলোচনা করেছেন। কিন্তু আমি তো নির্দিষ্ট প্রশ্নের জন্য নির্দিষ্ট উত্তর মুখস্থ করে এসেছি এতদিন। দেখলাম সবাই নিরবে লিখতে শুরু করেছে। তার মানে মুখস্থ বিদ্যার দিন শেষ? তিন নম্বর প্রশ্নটার বিষয়বস্তু বইতেই নেই। প্রশ্নটা এরকম: তোমার সহপাঠীদের নিয়ে তুমি একটি বিজ্ঞান ক্লাব করতে চাও। বাংলাদেশের কোন বিজ্ঞানীর নামে সেই বিজ্ঞান ক্লাবের নাম দিতে হলে কী নাম দেবে? তোমাদের বিজ্ঞান ক্লাবের তিনটি প্রধান কাজ কী হবে?

          মেজাজটাই খারাপ হয়ে গেলো। এই প্রথম একটা পরীক্ষা দিয়ে কোন তৃপ্তি পেলাম না। কেমন পরীক্ষা দিলাম সেটাই বুঝতে পারছি না। একবার মনে হচ্ছে সব ঠিকমত লিখেছি। আবার মনে হচ্ছে শুদ্ধ লিখেছি তো? বেশি কিছু লিখতে হয়নি, কিন্তু অনেক ভেবেচিন্তে লিখতে হয়েছে। ক্লাসের বেশিরভাগেরই এই অবস্থা।  রেজাল্ট দেবার আগে কিছুই বলা যাচ্ছে না। আফতাব স্যার বলেছেন আগামী রবিবারে দিয়ে দেবেন। স্যার পাগল টাইপের হলেও কথার নড়চড় হয় না। কিন্তু রবিবার আসতে আরো চারদিন বাকি।

          বৃহস্পতিবার আমাদের হাফ ডে। সেদিন থার্ড ও ফোর্থ পিরিয়ড বিবিধ ক্লাস হবার পর আমাদের ছুটি হয়ে যায়। বিবিধ ক্লাস মানে এক্সট্রা-একাডেমিক ক্লাস। এই ক্লাসে আগে আমরা গান-কবিতা ইত্যাদি করতাম। আফতাব স্যার সেই ক্লাসকে বিজ্ঞান-চর্চার ক্লাসে পরিণত করে ফেলেছেন। সেখানে জ্যোতির্বিজ্ঞানের গল্প  করতে করতে মহাকাশের সূর্য ও তার গ্রহ-উপগ্রহ নিয়ে অনেক কিছু জানা হয়ে গেছে আমাদের। অর্কসহ অনেকেই প্রস্তাব করেছিল বিজ্ঞান ক্লাব গঠন করার। অর্কের প্রস্তাব ছিল বিজ্ঞান ক্লাবের সদস্যরা স্কুল ছুটির পর কিংবা ছুটির দিনে বিজ্ঞান প্রজেক্টের কাজ করবে। কিন্তু অর্ক তো প্রাইভেট পড়ে না, তাই জানে না যে আমাদের ছুটির দিন বলে কোন দিন নেই। স্কুলে আমরা যত সময় কাটাই তার চেয়ে বেশি সময় কাটাই কোচিং সেন্টারে বা টিচারদের বাসায় বাসায়।

          সেকেন্ড পিরিয়ড শেষে অরুন্ধতী ম্যাডাম ক্লাস থেকে বের হতে না হতেই ষাঁড়ের গলায় চেঁচিয়ে উঠলো বিদ্যুৎ, "বুধবারে শুভযাত্রা বিষ্যুদবারে মানা, শুক্কুরবারে প্রেম পিরিতি হয় না ষোল আনা..." এসব গান সে কোত্থেকে পায় কে জানে। সবাই হো হো করে হেসে ওঠার প্রায় সাথে সাথে শোনা গেল হুজুর স্যারের হুংকার, "হেই জয়নাইল্লা। থাপ্পড় মারি কান ছিরি ফেলব এক্কেবারে।"

          আমাদের স্কুলে সবচেয়ে বড় আতঙ্কের নাম হুজুর স্যার। ধর্মের ক্লাসে পিটিয়ে সোজা করে ফেলেন সবাইকে। শারীরিক শাস্তি দেয়া যাবে না জাতীয় আইন হুজুর স্যারের ক্লাসে খাটে না। তিনি যেন ওঁৎ পেতে থাকেন বিদ্যুৎকে ধমক দেয়ার জন্য। কিছুদিন আগেও হুজুর স্যারের ধমক খেয়েছে বিদ্যুৎ। আমরা সবাই নিঃশ্বাস বন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছি। হুজুর স্যার বিদ্যুৎকে বকেই চলেছেন, "কিশোর কুমার হইয়স দে নে?"

          "ওটা কিশোর কুমারের গান নয় স্যার, রুনা লায়লার গান।" - খুব স্বাভাবিক গলায় বললো লুনা। দেখলাম নয়নরা মুখে হাত দিয়ে হাসি চাপার চেষ্টা করছে। এই মেয়েগুলো কি বেকুব নাকি? পরিস্থিতি বুঝে না কোথায় কী বলতে হবে? মানুষ অধিক শোকে যেমন পাথর হয়ে যায়, তেমনি অধিক রাগেও পাথর হয়ে যায়। হুজুর স্যার লুনার দিকে চোখ লাল করে তাকিয়ে রইলেন, কিন্তু কিছু বললেন না। মনে হয় কী বলবেন বুঝতে পারছিলেন না।

          এমন সময় হাতে অনেক খাতাপত্র নিয়ে আফতাব স্যার এলেন। হুজুর স্যার আফতাব স্যারকে দেখে তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলেন, "পোলাপাইনদের তো লাই দিয়া দিয়া মাথাত তুলি দিছেন।"

          আফতাব স্যার হেহেহে করে হাসার মত একটা কিছু করলেন। আমি জানি ইংরেজিতে এটাকে বলে স্মার্ক (smirk)। বাংলায় এর সঠিক প্রতিশব্দ কী জানি না। গা জ্বালানো হাসি বলা চলে। হুজুর স্যার চোখ গোল করে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে গট গট করে চলে গেলেন।

          আফতাব স্যার ক্লাসে ঢুকার সাথে সাথে বিদ্যুৎ বললো, 'নি হাউ স্যার'। সে যে একটু আগে হুজুর স্যারের কাছে ধমক খেয়েছে তার কোন প্রতিক্রিয়াই নেই তার মধ্যে। এমন বেহায়া কীভাবে হয় মানুষ?

          শিক্ষকসুলভ গাম্ভীর্য আফতাব স্যারের মধ্যে নেই। তিনি হাসিমুখে বললেন, 'নি হাউ টাউ বুঝি না। তোমরা আমার লাই ফেরত দাও।'

          সবাই হো হো করে হেসে উঠল। আমি বুঝি না এতে হাসির কী আছে। আর লাই ফেরত দাও মানে কী? বললাম, "মানে কী স্যার?"

          "মানে খুব পরিষ্কার। হুজুর স্যার বলেছেন আমি তোমাদের লাই দিয়েছি। তোমরা মাথায় উঠেছ। এবার দয়া করে আমার লাই ফেরত দাও, আর মাথা থেকে নামো।"

          আবার সারা ক্লাস হো হো করে হেসে উঠলো। পাশের ক্লাস থেকে হুজুর স্যার আবার এসে ধমক দিতে পারে ভেবে আফতাব স্যার ক্লাসের দরজা বন্ধ করে দিলেন। সেটা দেখেও হেসে উঠলো আবার সবাই।

          "তোমাদের বর্তমান প্রজেক্ট কী?"

          "স্যার শুক্র গ্রহ" - অর্ক উত্তর দিলো।

          "তার আগে কিছু দরকারি কথা বলে নিই। তোমরা সবাই বিজ্ঞান ক্লাব গঠন করার প্রস্তাব করেছো। বিজ্ঞান ক্লাবের উদ্দেশ্যও বর্ণনা করেছো।"

          "ওটা তো স্যার পরীক্ষার প্রশ্ন ছিল।"

          "ওখানে তো তোমরা তোমাদের মনের কথাই লিখেছো, তাই না? তোমরা প্রত্যেকে তোমাদের বিজ্ঞান ক্লাবের একটি করে নাম দিয়েছো। তোমাদের দেয়া নামগুলো থেকে হিসেব করে দেখেছি - ২৯ জন লিখেছো জগদীশ বসু, ১৫ জন লিখেছো আইনস্টাইন, ৮ জন লিখেছো নিউটন, ৬ জন লিখেছো কুদরাত এ খুদা, ১ জন লিখেছো স্টিফেন হকিং, ১ জন লিখেছো সত্যেন বসু, ১ জন লিখেছো মেঘনাদ সাহা, ১ জন লিখেছো কাজী নজরুল ইসলাম। কিন্তু আমরা তো জানি কাজী নজরুল ইসলাম কবি ছিলেন - বিদ্রোহী কবি, বিজ্ঞানী তো ছিলেন না।"

          ক্লাসের সবাই হেসে উঠতেই আবদুর রহিম বললো, "স্যার, এই নামে একজন বিজ্ঞানী আছেন না? সঠিক নামটা মনে করতে পারছিলাম না, তাই..."

          আবার হাসির পালা। আফতাব স্যার বললেন, "তাঁর নাম জামাল নজরুল ইসলাম। তিনি বাংলাদেশের অনেক বড় বিজ্ঞানী। মহাকাশের ব্ল্যাকহোল সম্পর্কে তিনি চমৎকার বই লিখেছেন। তাঁর বই কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো হয়। তাঁর নামে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিত ও ভৌতবিজ্ঞান গবেষণাকেন্দ্র আছে। তুমি যে তাঁর নাম লিখতে চেষ্টা করেছো তার জন্য আমি খুশি। ভেরি গুড।"

          আবদুর রহিম বেশ খুশি হয়ে গেলো।

          "সবশেষে আরেকজন একটা নাম লিখেছে - বিজ্ঞানী আহো সূমা। এই নামে কোন বিজ্ঞানী আছেন বলে তো আমি শুনিনি। গুগলে সার্চ করেও কিছু পেলাম না। জাপানী নাম মনে হচ্ছে। তোমরা কেউ শুনেছো এই বিজ্ঞানীর কথা?"

          ক্লাসে আবার হাসির ঢেউ উঠলো। নয়ন বললো, "ওটা স্যার আপনার নাম।"

          "আমার নাম? আহো - আফতাব হোসেন! হাহাহা। কিন্তু সূমা কী জিনিস?"

          "সূর্য মামা স্যার।"

          অর্ক আর আবদুর রহিম আফতাব স্যারের নাম দিয়েছে সূর্যমামা। সেটা ক্লাসের সবাই জানে। ফারজানারা তো সারাক্ষণ সূর্যমামা সূর্যমামা করে। আফতাব শব্দের অর্থ সূর্য ঠিক আছে। কিন্তু মামা লাগাতে হবে কেন? এদের ন্যাকামি দেখলে গা জ্বলে যায় আমার। কিন্তু স্যারের নাম কে লিখলো? স্যারকে তেল দেয়ার জন্যই লিখেছে। কিন্তু আফতাব স্যারকে তেল দিয়ে লাভ আছে কোনো?

          "কিন্তু আমি তো বিজ্ঞানী নই। আমি বিজ্ঞানের ছাত্র এটা ঠিক। তোমাদের বিজ্ঞান পড়াচ্ছি - সে হিসেবে আমি বড়জোর বিজ্ঞানের শিক্ষক। কিন্তু বিজ্ঞানী নই। বিজ্ঞানী হতে গেলে নতুন কিছু আবিষ্কার করতে হবে, দিনরাত গবেষণা করতে হবে। সৃষ্টি করতে হবে নতুন জ্ঞান, নতুন তত্ত্ব, কিংবা নতুন প্রযুক্তি। সব বিজ্ঞানীই বিজ্ঞান-শিক্ষক, কিন্তু সব বিজ্ঞান-শিক্ষকই বিজ্ঞানী নন। হাহাহা।"

          আফতাব স্যার হলেন বাংলা সিনেমার ভিলেনের মত। ভিলেনরা যেমন - এবার কোথায় পালাবে সুন্দরী - বলে হাহাহা করে অট্টহাসি দেয়, আফতাব স্যারও সেরকম। খুব দরকারি কথা বলার পরেও হাহাহা করে একটা হাসি দেবেন।

          "সংখ্যাগরিষ্ঠের ইচ্ছানুসারে তোমাদের বিজ্ঞান ক্লাবের নাম হলো জগদীশ বসু বিজ্ঞান ক্লাব।"

          অর্কসহ অনেকেই হাততালি দিলো। বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসুকে আমিও খুব পছন্দ করি। তিনি ছিলেন পৃথিবীর প্রথম জীবপদার্থবিজ্ঞানী। কিন্তু আমি লিখেছিলাম স্টিফেন হকিং। এই বিজ্ঞানী হাঁটতে পারেন না, নড়াচড়া করতে পারেন না, কথা বলতে পারেন না, অথচ কম্পিউটারের সাহায্যে মহাবিশ্বের কত গভীর বিষয়ে জ্ঞানের অনুসন্ধান করেছেন। অতি সম্প্রতি মারা গেছেন।

          "তোমাদের মধ্যে যারা আইনস্টাইন, নিউটন এবং স্টিফেন হকিং-লিখেছো - তারা সম্ভবত প্রশ্নটা ভালো করে পড়নি। বলা হয়েছিল বাংলাদেশের বিজ্ঞানীর নাম লিখতে। এরা কেউই বাংলাদেশের বিজ্ঞানী নন।"

          আত্মপক্ষ সমর্থন করার জন্য বললাম, 'স্যার বিজ্ঞানীরা তো সারা বিশ্বের। সে হিসেবে বাংলাদেশ যেহেতু বিশ্বের মধ্যে আছে..."

          নিজের যুক্তি নিজের কাছেই কেমন যেন দুর্বল শোনালো। তাই আর কথা বাড়ালাম না।

          "শোন, বিজ্ঞান ক্লাবের উদ্দেশ্য হলো বিজ্ঞানচর্চা করা। তোমরা বিজ্ঞান প্রকল্প চালিয়ে যাবে। বিজ্ঞান মেলায় অংশ নেবে। আর বিজ্ঞানমনস্ক হবার চেষ্টা করে যাবে। বৃহস্পতিবার থার্ড আর ফোর্থ পিরিয়ডে তোমরা বিজ্ঞান ক্লাবের কাজ করবে। এর জন্য অন্যান্য পড়ালেখার যেন কোন ক্ষতি না হয়। বিজ্ঞান নিয়ে অনেক অনেক আলোচনা হওয়া উচিত। তোমাদেরকেই দায়িত্ব নিতে হবে তোমাদের বিজ্ঞান ক্লাবের। সভাপতি কে হতে চাও হাত তোল।"

          এক সেকেন্ডও লাগলো না আমার হাত তুলতে। আশেপাশে তাকিয়ে দেখি ক্লাসের সবাই হাত তুলে বসে আছে। বিদ্যুৎ দুই হাত উপরে তুলে বসে আছে। আবদুর রহিমও হাত তুলেছে!

          "তোমরা সবাই সভাপতি হতে চাও? সমস্যায় ফেলে দিলে। দু তিন জন প্রার্থী থাকলে নির্বাচন করা যেতো। এখন সবাই প্রার্থী হলে তো নির্বাচন করা যায় না। ঠিক আছে মেধার ভিত্তিতেই হোক। সুব্রত চৌধুরি - তুমি হবে বিজ্ঞান ক্লাবের সভাপতি, ফারজানা সহ-সভাপতি, ইয়াসমিন সাধারণ সম্পাদক, চিত্রলেখা সহ-সম্পাদক। অন্যরা সবাই সদস্য। আর সবাই মিলে ঠিক করে নেবে কে কী করবে।  হাহাহা।"

          খুশিতে আমার লাফ দিতে ইচ্ছে করছে। এই প্রথম আফতাব স্যার  পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করাকে কিছুটা গুরুত্ব দিলেন। ক্লাসের ফার্স্টবয় হবার আরো একটি সুবিধা আজ পেয়ে গেলাম। আফতাব স্যারকে আজ আর বিরক্তিকর বলে মনে হচ্ছে না। তাঁর হাহাহা হাসিটাকেও আর ভিলেনের হাসি মনে হচ্ছে না। তাঁর লাল লাল দাঁতগুলোকেও ততটা লাল মনে হচ্ছে না। এটাও এক ধরনের থিওরি অব রিলেটিভিটি। কেউ আমাকে সাহায্য করলে তার দোষগুলোকে আর ততটা দোষের বলে মনে হয় না। বিজ্ঞান প্রকল্পের সব কাজ অর্ক করলেও আমিই হলাম বিজ্ঞান ক্লাবের সভাপতি। কী আনন্দ!

          "তোমাদের নেক্সট প্রজেক্ট কী?"

          "শুক্র গ্রহ স্যার। অর্ক অনেক কাজ এগিয়ে রেখেছে স্যার।" - আমার নিজের উৎসাহ দেখে আমি নিজেই অবাক হয়ে যাচ্ছি।

          "ঠিক আছে। এবার একটা ধাঁধা জিজ্ঞেস করি তোমাদের। বলো দেখি, কোন্‌ তারা তারা নয়?"

          "স্যার একতারা, দোতারা" - স্বাতী বললো।

          "নয়নতারা" - ফারজানা বললো।

আমার কিছুই মনে আসছে না। কেবলই মনে হচ্ছে বিজ্ঞান ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে আমার কিছু বলা দরকার। কিন্তু কোন তারা খুঁজে পাচ্ছি না।

          "শুকতারা তারা নয় স্যার, শুকতারা একটি গ্রহ।" - অর্ক বললো। কতদিন থেকে সে শুক্রগ্রহের উপর বই পড়ছে। সে তো জানবেই।

          "দ্যাটস্‌ ইট! দ্য ভেনাস ইজ আ প্লানেট, নট আ স্টার।" আফতাব স্যার মাঝে মাঝে খুশিতে ইংরেজি বলে ফেলেন। কিন্তু তাঁর ইংরেজি উচ্চারণ বাংলার মতোই আঞ্চলিকতায় ভরপুর।

          "ভোরে সূর্য উঠার আগে যে শুকতারা দেখা যায় - সেটা আসলে গ্রহ। সূর্যের দ্বিতীয় গ্রহ। সবচেয়ে গরম গ্রহ। সূর্যের সবচেয়ে কাছের গ্রহ বুধের চেয়েও শুক্রের তাপমাত্রা বেশি। আর শুক্রগ্রহে সূর্য উঠে পশ্চিম দিকে।"

          "আর কোন গ্রহে সূর্য পশ্চিম দিকে উঠে না স্যার?"

          "বিজ্ঞানীদের জানামতে সৌরজগতের আর একটি গ্রহে সূর্য পশ্চিম দিকে উঠে। সেটা হলো ইউরেনাস।"

          "তাহলে তো স্যার শুক্র একটা দোজখ।"

          "অনেকটা তাই। শুক্র গ্রহকে বলা হয় পৃথিবীর সিস্টার ফ্রম হেল।"

          "সিস্টার? শুক্র গ্রহ কি মহিলা গ্রহ স্যার?"

          "গ্রহদের তো আর পুরুষ-নারী থাকে না। তবে প্রাচীনকালের মানুষেরা শুক্র গ্রহ অর্থাৎ ভেনাস - নামটা দিয়েছে সেই যুগের সবচেয়ে সুন্দর দেবী ভেনাসের নামে। অনেকে এটাকে আফ্রোদিতিও বলে থাকে। আর শুক্র গ্রহের যে প্রতীক - নারীর প্রতীকের সাথে তার হুবহু মিল আছে। তোমরা পড়তে পড়তে আরো অনেক কিছু জানতে পারবে। হাহাহা।"

          পরবর্তী দুই সপ্তাহের মধ্যে জগদীশ বসু বিজ্ঞান ক্লাবে আমরা শুক্র গ্রহ সম্পর্কে অনেক তথ্য সংগ্রহ করলাম। অনেক বই পড়লাম। এতদিন বই পড়েছি শুধুমাত্র পরীক্ষায় ফার্স্ট হবার জন্য। সেই পড়ায় সবসময় একটা আতঙ্ক কাজ করে। ভুলে যাবার ভয় কাজ করে। কিন্তু যখন অজানা জিনিস জানার জন্য পড়তে শুরু করলাম - কী যে আনন্দ পেলাম তা বলে বোঝাতে পারব না।  ইন্টারনেট থেকে অনেক ছবি সংগ্রহ করলাম। বেশিরভাগ কাজ অর্ক, ফারজানা, নয়ন, চিত্রা, ইয়াসমিন, লুনা আর স্বাতী করেছে। কিন্তু বিজ্ঞান ক্লাবের সভাপতি হিসেবে কিছুটা কৃতিত্ব তো আমি নিতেই পারি। চলো দেখি সূর্যের দ্বিতীয় গ্রহ - শুক্র; যার কোন উপগ্রহ নেই।

পর্ব - ২

2 comments:

  1. স্যার গল্পের মাধ্যমে টপিকে প্রবেশ ; বিষয় টা আমার কাছে অসাধারণ লাগছে,

    ReplyDelete

Latest Post

The World of Einstein - Part 2

  ** On March 14, 1955, Einstein celebrated his seventy-sixth birthday. His friends wanted to organize a grand celebration, but Einstein was...

Popular Posts