Wednesday, 2 September 2020

ম্যান্ডেলার দেশে - পর্ব ১৭

 



পৃথিবীর প্রথম মানবহৃৎপিন্ড প্রতিস্থাপন

স্টুডেন্ট বা স্টাফদের জন্য ক্যাম্পাস-বাস আইডি দেখানোর নিয়ম আছে। কিন্তু আমরা তো বহিরাগত। এলিজাবেথকে বললাম, ড্রাইভারকে তুমিই জ্ঞিজ্ঞেস করবে আমরা যেতে পারবো কিনা।

     আমি কেন?

     আ বিউটিফুল ফেস ইজ দ্যা বেস্ট রেকমেন্ডেশান।

     কিন্তু সে যদি শ্বেতাঙ্গ পছন্দ না করে?

          "তুমি যদি শ্বেতাঙ্গ পুরুষ হতে তাহলে হয়তো এ সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু শ্বেতাঙ্গ নারী সবাই পছন্দ করে।

          মেডিকেল ক্যাম্পাসে যাবার যাত্রী বেশি ছিল না। 9C বাসের ড্রাইভার বেশ হাসিমুখেই কথা বললেন এলিজাবেথের সাথেমনে হলো ক্যাম্পাস বাসে সবাই চড়তে পারে

          আপার ক্যাম্পাসের চারপাশে ঘুরে হাইওয়েতে কিছুদূর এসে চারটা স্টপ পর গ্রুট ইশকির হাসপাতালের সামনে নামলাম পৌনে তিনটা বাজেহাসপাতালের দুটো উইংপুরনো ভবনটাকে এখন জাদুঘরে পরিণত করা হয়েছে।

          দক্ষিণ আফ্রিকার প্রধান হাসপাতালগুলোর একটি হলো গ্রুট ইশকির হাসপাতালডাচ শব্দ গ্রুট ইশকির (GROOTE SCHUUR) এর অর্থ হলো মহান খামারডাচরা এই অঞ্চলের নাম দিয়েছিলো গ্রুট ইশকির

          ১৯৩৮ সালে এই হাসপাতাল স্থাপিত হয় কেইপ টাউন ইউনিভার্সিটির মেডিসিন ফ্যাকাল্টির টিচিং হাসপাতাল এটা এই হাসপাতাল পৃথিবীবিখ্যাত - কারণ এখানেই পৃথিবীর প্রথম মানুষের-হৃৎপিন্ড প্রতিস্থাপন করা হয়েছিল ১৯৬৭ সালে।

 

গ্রুট ইশকির হাসপাতাল


১৯৮৪ সালে হাসপাতাল ক্যাম্পাসের মধ্যে আরেকটি নতুন বিল্ডিং-এ নিয়ে যাওয়া হয়। পুরনো ভবনকে রেখে দেয়া হয় আগের মতোই। ২০০৭ সালে হার্ট ট্রান্সপ্ল্যান্টের চল্লিশ বছর পূর্তি উপলক্ষে পুরনো হাসপাতাল ভবনের যেখানে অপারেশন হয়েছিল সেই রুমগুলোকে নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় হার্ট অব কেইপটাউন মিউজিয়াম। আমরা এখন সেখানে।

          বিকেল তিনটায় গাইডেড ট্যুর শুরু হলো। আমাদের পরিচয় করিয়ে দেয়া হলো ইতিহাসের নায়ক ডাক্তার ক্রিশ্চিয়ান বার্নার্ডের সাথে।

          বেশ বড় অফিসঘর তাঁর। ১৯৬৭ সালের ৩রা ডিসেম্বর যেভাবে ছিল সেভাবেই রাখা আছে। হুবহু মূর্তি বানিয়ে বসিয়ে রাখা হয়েছে তাঁর চেয়ারে। মনে হচ্ছে এখুনি জ্ঞিজ্ঞেস করবেন, কী সমস্যা হচ্ছে আপনার?

          ক্রিশ্চিয়ান বার্নার্ডের জন্ম ১৯২২ সালের ৮ নভেম্বর, কেইপ টাউনেই লেখাপড়া করেছন এই ইউনিভার্সিটি অব কেইপ টাউনেই এখান থেকেই ডাক্তারি পাস করে গ্রুট ইশকির হাসপাতালের সার্জন হয়েছেন ১৯৫৮ সালে তাঁর ছোটভাই মরিস বার্নার্ডও ডাক্তার জটিল সার্জারিতে ক্রিশ্চিয়ানকে অ্যাসিস্ট করেন মরিস শরীরের অঙ্গ প্রতিস্থাপন করে রোগীকে নবজীবন দান করার মহান প্রচেষ্টা ছিল ক্রিশ্চিয়ানের

          ১৯৫৩ সালে প্রথম সফল কিডনি প্রতিস্থাপনের কাজ হয় আমেরিকায়। তারপর বিভিন্ন দেশে কিডনি প্রতিস্থাপিত হয়েছে সফলভাবে। ক্রিশ্চিয়ান কিডনি প্রতিস্থাপন করেন কেইপ টাউনে ১৯৬৭ সালের অক্টোবরে। কিন্তু তখনো পৃথিবীর কোথাও একজন মানুষের হৃৎপিন্ড খুলে নিয়ে অন্য মানুষের হৃৎপিন্ডের জায়গায় লাগিয়ে দিয়ে মানুষকে বাঁচানোর চেষ্টা কেউই করেননি। অথচ গবেষণা চলছিলো বিশ্বব্যাপী বড় বড় বৈজ্ঞানিক গবেষণাগারে। ক্রিশ্চিয়ান বার্নার্ড ততদিনে ৫০টারও বেশি কুকুরের হৃৎপিন্ড প্রতিস্থাপন করেছেন সাফল্যের সাথে। মানুষের হৃৎপিন্ড প্রতিস্থাপনের জন্য যা যা দক্ষতা, চিকিৎসাসরঞ্জাম ও যন্ত্রপাতি দরকার সবই ছিল তার অপারেশন থিয়েটারে। দক্ষ সহায়কদলও ছিল। কেবল সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন তিনি।

 

 

ডাক্তার ক্রিশ্চিয়ান বার্নার্ড। (ডানে মিউজিয়ামে রাখা তাঁর মূর্তি)


১৯৬৭ সালে ডক্টর বার্নার্ডের একজন মরণাপন্ন রোগী ছিলেন লুইস ওয়াশক্যানস্কি। সিভিয়ার হার্ট ফেইলিওরের কারণে তাঁর হার্টসার্জারির দরকার ছিল। কৃত্রিমভাবে শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যবস্থা করে তাঁকে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছিলো। ডক্টর বার্নার্ড দেখলেন হৃৎপিন্ড দান করার মতো কাউকে পাওয়া গেলে ওয়াশক্যানস্কিকে তিনি বাঁচাতে পারেন। কিন্তু সেরকম দাতা কোথায় পাবেন? এমন হতে হবে যে দাতার শরীরের মৃত্যু হয়েছে অন্য কোন কারণে, কিন্তু হৃৎপিন্ড সুস্থ আছে। তখন সেই হৃৎপিন্ড খুলে নিয়ে - যার হৃৎপিন্ড খারাপ হয়ে গেছে অথচ প্রাণে বেঁচে আছে তাকে বাঁচানো যায় নতুন হৃৎপিন্ড বসিয়ে দিয়ে।

          সেই সময় অন্য একটি পরিবারে একটি দুর্ঘটনা ঘটলো ১৯৬৭ সালের ৩ ডিসেম্বর। পঁচিশ বছর বয়সী উচ্ছল তরুণী ডেনিস ডারভ্যাল তাঁর বাবা-মার সাথে চায়ের নিমন্ত্রণে যাচ্ছিলো এক পারিবারিক বন্ধুর বাসায়। হাসপাতালের কাছের সাবার্বের একটি শপিং এরিয়ায় গাড়ি থামিয়ে কেক কেনার জন্য যাচ্ছিলো ডেনিস ও তার মা। গাড়ি থেকে নেমে দুজনে রাস্তা পার হচ্ছিলো। এমন সময় একটা দ্রুতগামী গাড়ী তাদের দুজনকে চাপা দিয়ে চলে গেলো। ডেনিসের মা মারা গেলেন তৎক্ষণাৎ রাস্তার ওপর। ডেনিস গাড়ির ধাক্কায় শূন্যে উড়ে গিয়ে আছড়ে পড়লেন নিজেদেরই গাড়ির চাকার ওপর। প্রচন্ড আঘাতে মাথার খুলি ফেটে গেলো। দ্রুত নিয়ে যাওয়া হলো গ্রুট ইশকির হাসপাতালে। লাইফ সাপোর্ট দিয়ে বাঁচিয়ে রাখার অনেক চেষ্টা করা হলো। কিন্তু রাত নটার দিকে ডেনিস ব্রেনডেথ হয়ে গেলো।

          তখনকার মেডিকেল এথিক্স অনুযায়ী ডেনিস কিন্তু তখনো শারীরিকভাবে মৃত নয়। তার হৃৎপিন্ড তখনো সচল। কিন্তু মস্তিষ্ক যেহেতু মরে গেছে তাই শরীর অসাড়। এ অবস্থায় ডেনিসের বেঁচে ওঠার কোন সম্ভাবনা নেই।

          ডেনিসের বাবার সাথে কথা বললেন ডক্টর বার্নার্ড। ডেনিসের হৃৎপিন্ড দিয়ে লুইস ওয়াশক্যানস্কির জীবন বাঁচানো যায়। শুধু তাই নয়, ডেনিসের কিডনি দিয়েও বাঁচানো যায় আরো একটি জীবন।

          ডেনিসের বাবা বুঝলেন ব্যাপারটা। তিনি অনুমতি দিলেন। কিন্তু আইন অনুযায়ী ডেনিসের হৃৎপিন্ডের ধুকধুক যতক্ষণ সচল- ততক্ষণ সে মৃত নয়। ক্রিশ্চিয়ানের ভাই ডাক্তার মরিস বার্নার্ডকে পরামর্শ দিলেন। পরামর্শমতো ডেনিসের হৃৎপিন্ডে ইনজেকশানের সাহায্যে পটাশিয়াম ঢুকিয়ে দেয়া হলো। হৃৎপিন্ড অবসাদগ্রস্থ হলো।

          শুরু হলো পাশাপাশি দুটো থিয়েটারে প্রাণ দিয়ে প্রাণ বাঁচানোর কর্মযজ্ঞ।

ডেনিসের সুস্থ হৃৎপিন্ড খুলে নেয়া হলো। অন্য রুমে ওয়াশক্যানস্কির হৃৎপিন্ডও খুলে নেয়া হলো। তারপর দীর্ঘ নয় ঘন্টাব্যাপি অপারেশন করে ডেনিসের হৃৎপিন্ড লুইসের বুকে বসিয়ে দেয়া হলো। পৃথিবীর প্রথম মানব-হৃৎপিন্ড প্রতিস্থাপনের ইতিহাস তৈরি করলেন ডাক্তার ক্রিশ্চিয়ান বার্নার্ড।

          শুধু তাই নয়, ডেনিসের কিডনি প্রতিস্থাপন করে বাঁচানো হলো ১০ বছরের বালক জনাথন ভ্যান ওয়েক-এর জীবন। সেদিনের ঘটনা মানবতার পক্ষে অনেকগুলো মাইলফলক হয়ে থাকলো।

          ডেনিস ছিল খ্রিষ্টান। তার হৃৎপিন্ড নিয়ে বেঁচে উঠলো ইহুদি পুরুষ লুইস ওয়াশক্যানস্কি। থাকলো না কোন ধর্মীয় ভেদাভেদ, রইলো না নারী-পুরুষ বিভাজন। ডেনিস ছিল শ্বেতাঙ্গ। তার কিডনি পেয়ে বেঁচে উঠলো কৃষ্ণাঙ্গ বালক জনাথন। রইলো না কোন বর্ণভেদ।

          কিন্তু মানবই মানবতাবিরোধী কাজকর্ম করে থাকে। তখনকার অ্যাপারর্টেড বা বিচ্ছিন্নকরণ আইন অনুযায়ী কালো মানুষ সাদা মানুষের সাথে কোন সম্পর্ক রাখতে পারে না। তাই বলা হলো সাদা মানুষের কিডনি দিয়ে কালো মানুষ বাঁচিয়ে অপরাধ করেছেন ডাক্তার ক্রিশ্চিয়ান বার্নার্ডের দল।

          কিন্তু শ্বেতাঙ্গ ডাক্তার বার্নার্ড ছিলেন সত্যিকারের মানবতাবাদী। তাঁর কাছে সাদা-কালোর কোন পার্থক্য ছিল না। কেইপটাউনের ডিস্ট্রিক্ট সিক্স থেকে সাদা-কালো আলাদা করা হচ্ছিল যেসময়, সেই সময়েই সাদা-কালো এক করে দিলেন তিনি। ডেনিসের হৃৎপিন্ড আক্ষরিক অর্থে বুকে ধারণ করে ১৮ দিন বেঁচেছিলেন লুইস ওয়াশক্যানস্কি।

 

 

ডেনিস ডারভ্যালের হৃৎপিন্ড নিয়ে প্রাণ পেয়েছিলেন লুইস ওয়াশক্যানস্কি এবং কিডনি নিয়ে বেঁচেছিল জনাথন।


এখন চিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নতির সাথে সাথে অনেক উন্নত মানুষের ওষুধ আবিষ্কৃত হয়েছে। যার ফলে অঙ্গ প্রতিস্থাপনেও সাফল্যের হার বেড়েছে।

          ১৯৬৭ সালের ৩রা ডিসেম্বর ঠিক যেভাবে সেই অপারেশন থিয়েটারে হৃৎপিন্ড প্রতিস্থাপিত হয়েছিল সেখানে ঠিক সেইভাবেই সময়কে ধরে রাখা হয়েছে। সব ডাক্তার, অ্যাসিস্ট্যান্ট, নার্স সবার হুবহু চেহারা ও গেট-আপে মূর্তি বানিয়ে রাখা হয়েছে মিউজিয়ামে। সভ্যতার এত বড় অর্জনের কথা সবার জানা উচিত।

          ফেরার পথে আর বাসে উঠতে ইচ্ছে করলো না। হাসপাতালের ট্যাক্সিস্ট্যান্ড থেকে ট্যাক্সিতে উঠে গেলাম। মিটারচালিত ট্যাক্সি - গন্তব্য বলতেই স্টার্ট। সিটে হেলান দিয়ে আই অ্যাম সো টায়ার্ড" বলেই চোখ বন্ধ করে ফেললো এলিজাবেথ। মনে হলো ঘুমিয়েই পড়লো।

 

হার্ট অব কেইপ টাউন মিউজিয়ামে হার্ট-ট্রান্সপ্লেন্টেশান মডেল


হোটেলের সামনে ট্যাক্সি থামতেই ভাড়ার ব্যাপারে সম্পূর্ণ উদাসীন হয়ে দরজা খুলে চুপচাপ নেমে গেলো এলিজাবেথ। পকেট থেকে ওয়ালেট বের করতে করতে দেখলাম সে হোটেলের সিঁড়ি বেয়ে ভেতরে ঢুকে গেলো।


         
মিনিট খানেক পরে লবিতে এসে দেখি লিফট এর কাছে দাঁড়িয়ে আছে এলিজাবেথ।

     ওয়েটিং ফর ইউ - ক্যাজুয়েলি বললো সে।

     থ্যাংক ইউ

          লিফটে ওঠার পর কয়েক সেকেন্ড নিরবতা।

          হোয়াট অ্যাবাউট ডিনার? সরাসরি প্রশ্ন তার।

     হোয়াট অ্যাবাউট ইট?

     লেটস গো আউট

আমি কোন জবাব দিলাম না। বুঝতে চেষ্টা করছি তার উদ্দেশ্য কী। ফোর্থ ফ্লোর এসে গেছে। লিফটের দরজা খুললো। আমি বের হলাম। সেও। করিডোরে দাঁড়ালাম।

     সেভেন ও ক্লক? আবার প্রশ্ন করলো সে।

     হোয়াট?

     ডিনার

          কিছু কিছু প্রস্তাব আছে না করতে নেই।

     কোথায় যেতে চাও?

     ওয়াটারফ্রন্ট। সাতটায় একটা বাস যায় হোটেল থেকে। ওটাতে যাবো।

     ওকে, সি ইউ দেন।"

          ওয়েট ফর মি হিয়ার। একসাথে যাবো।

     ঠিক আছে

     সি ইউ সুন

 


পর্ব ১৮


ম্যান্ডেলার দেশে - পর্ব ১৬

 



ইউনিভার্সিটি অব কেইপ টাউন

ঘন সবুজ বনের ভেতর বিশাল ক্যাম্পাস ছবির মতো সুন্দর। হাইওয়ের কাছে কেইপ টাউন ইউনিভার্সিটির রাগবি মাঠ। মাঠের ওপারে অসংখ্য বহুতল অ্যাকাডেমিক ভবন। একটা বিল্ডিং থেকে অন্য বিল্ডিং-এর মাঝখানে রাস্তা ছাড়া খালি জায়গা খুব একটা নেই। সব পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। শান্ত স্নিগ্ধ। বিশ্বমানের একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস যেরকম হওয়া উচিত। আফ্রিকা মহাদেশের সবচেয়ে পুরনো সবচেয়ে ভালো বিশ্ববিদ্যালয় এটা।

          ১৮২৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল আফ্রিকা মহাদেশের এই প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়। শুধু বয়সে নয়, মানের দিক থেকেও শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রেখেছে এই বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানে প্রায় ছাব্বিশ হাজার শিক্ষার্থী এই বিশ্ববিদ্যালয়ে।

          এপর্যন্ত এই বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচজন প্রাক্তন ছাত্র নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন। ১৯৫০ সালের নোবেল শান্তি পুরষ্কারবিজয়ী রালফ বানচি, ১৯৫১ সালে চিকিৎসা বিজ্ঞানের নোবেলবিজয়ী ম্যাক্স থেইলার, ১৯৭৯ সালে চিকিৎসা বিজ্ঞানে নোবেলবিজয়ী অ্যালেন ম্যাকলয়েড, ১৯৮২ সালের রসায়নে নোবেলবিজয়ী অ্যারন ক্লুং, আর ২০০৩ সালে সাহিত্যে নোবেলবিজয়ী জন কোয়েৎজি- সবাই জীবনের একটা পর্যায়ে পড়াশোনা করেছিলেন এই ক্যাম্পাসে।

          ক্যাম্পাসে প্রচুর শ্বেতাঙ্গ ও ভারতীয় শিক্ষার্থী চোখে পড়ছে। পরিসংখ্যান বলছে মোট শিক্ষার্থীর তিনভাগের একভাগ শ্বেতাঙ্গ। প্রায় ১৮% ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্ট। অধ্যাপকদের মধ্যে এখনো তিনভাগের দুই ভাগ ইউরোপিয়ান বংশদ্ভূত শ্বেতাঙ্গ। দক্ষিণ আফ্রিকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কৃষ্ণাঙ্গদের নিয়োগ বাড়ানোর বিভিন্ন পরিকল্পনা নেয়া হচ্ছে।

          আপার ক্যাম্পাসে সায়েন্স, ইঞ্জিনিয়ারিং, কমার্স সব ফ্যাকাল্টি। পুরো আপার ক্যাম্পাসের চারদিক ঘিরে যে রাস্তা - তার নাম মাদিবা সার্কেল। নেলসন ম্যান্ডেলার নাম মাদিবা। তার মানে এই রাস্তার নামকরণ হয়েছে বেশি বছর হয়নি।

 

ইউনিভার্সিটি অব কেইপ টাউনের জেইমসন হল


জেইমসন হল আপার ক্যাম্পাসের কেন্দ্রবিন্দু। দূর থেকে দেখতে আমেরিকার সুপ্রিম কোর্টের মতো লাগছে। খুবই সুন্দর ভবন। এর প্রশস্ত উঁচু সিঁড়িতে শিক্ষার্থীদের আড্ডা চলছে এখানে ওখানে। সামনের সবুজ চত্বরে স্টুডেন্টদের মিলনমেলা। আনন্দে হাসিতে বিক্ষোভে ভরে ওঠে এই প্রাঙ্গন যখন দরকার হয়।

          কাছেই ফুডকোর্ট। লাঞ্চ করা যেতে পারে। একটা বেজে গেছে। এলিজাবেথের পছন্দ ইন্ডিয়ান ফুড। রাইস অ্যান্ড চিকেন কারি উইথ চিলি। আমি নিলাম মাটন।

     তোমার প্ল্যানটা বলবে? যেতে যেতে প্রশ্ন এলিজাবেথের।

 

লাঞ্চটাইম


     এখান থেকে রোডস মেমোরিয়েলে উঠবো। সেখান থেকে গ্রুট ইশকির মিউজিয়াম দেখতে যাবো।

     সেই মিউজিয়ামে কী আছে?

     মেডিকেল স্টাফ। পৃথিবীর প্রথম হার্ট ট্রান্সপ্লেন্টেশান হয়েছিল সেখানে। সেটা কীভাবে করা হয়েছিল তা দেখায়।

     তুমি কি ডাক্তার?"

     না, আমি ফিজিসিস্ট। তুমি কী?

     আমি হেয়ার ডিজাইনার।"

          "সেলুনে কাজ করো?"

          "না না। আমি হেয়ার স্টাইলিস্ট নই, হেয়ার ডিজাইনার।"

     মানে?"

          চুলের ডিজাইন করি। পরচুলা বানানোর কারখানায় কাজ করি।

তার নিজের চুলের যে অবস্থা তাতে সে কীরকম ডিজাইনার কে জানে অবশ্য দর্জির নিজের জামাকাপড় দেখে তো আর বিচার করা যায় না সে কেমন সেলাই করে

     তোমার প্ল্যান কী?

     নিজে একটা দোকান দেবো চুলের দোকান।

     দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার কথা জানতে চাচ্ছি না এখনকার প্ল্যান বলো আমার সঙ্গে যাবে, নাকি নিজের পথ দেখবে?

     রোডস মেমোরিয়েল দেখার প্ল্যান আছে। মিউজিয়ামেরটা জানি না এখনো।

     কখন জানবে?

     রোডস মেমোরিয়েলে যাবার পর।

     তাহলে চলো। পাহাড়ে উঠতে হবে।

          হাঁটতে হাঁটতে রাগবি মাঠের দিকে এলাম। সেখান থেকে সুড়ঙ্গ পথে মিডল ও লোয়ার ক্যাম্পাসে যাওয়া যায়। রোডস মেমোরিয়েল আপার ক্যাম্পাসেরও উপরে।

          রাগবি মাঠের একপাড়ে একটা উঁচু পাথরের বেদি। বেদিটা এখন খালি। এটাতে সিসিল রোডের বিশাল আকৃতির এক মূর্তি ছিল গতবছর পর্যন্ত। দক্ষিণ আফ্রিকার অনেক জায়গায় সিসিল রোডের মূর্তি আছে। সিটিতে, পার্লামেন্টের কাছে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে, পার্কে।


 

রোডসের মূর্তি সরানো হচ্ছে (ছবি: ইন্টারনেট)


হাইওয়ের নাম রোডস ড্রাইভ, একটা বিশ্ববিদ্যালয়ও আছে তার নামে আফ্রিকায়- রোডস ইউনিভার্সিটি। তার স্মরণে বিশাল এক মেমোরিয়েল- যা আমরা দেখতে যাচ্ছি। কে ছিলেন এই সিসিল রোডস?

     হি ওয়াজ আ ফাউন্ডার অব সাউথ আফ্রিকা - এলিজাবেথ বললো।

          আসলেই কি? যতটুকু পড়েছি সিসিল রোড সম্পর্কে তাতে মানুষটাকে ভয় করা যায় - কিন্তু শ্রদ্ধা করা যায় না কিছুতেই।

          সিসিল জন রোডস-এর জন্ম ইংল্যান্ডের হার্টফোর্ডশায়ারে ১৮৫৩ সালের ৫ জুলাই। তার বাবা ছিলেন একজন সাধারণ পাদ্রী। সিসিল ছিলেন চিররুগ্ন। লেখাপড়াও তেমন করতে পারেননি স্বাস্থ্যগত কারণে। ১৭ বছর বয়সে তাঁর বাবা-মা তাঁকে দক্ষিণ আফ্রিকায় পাঠিয়ে দেন। সিসিলের বড় ভাই হারবার্ট আগে থেকেই আফ্রিকায় থাকতেন।

          সিসিলের স্বাস্থ্য খারাপ, মেজাজ খিটখিটে হলেও ব্যবসায়িক বুদ্ধি ছিল ভালো। ১৮ বছর বয়সে ভাইয়ের সাথে তুলার ব্যবসা শুরু করেন। কিন্তু ২ বছরের মধ্যে ব্যবসা ফেল করে। ইংল্যান্ড ফিরে গিয়ে অক্সফোর্ডে পড়াশোনার চেষ্টা করেন সিসিল কিছুদিন। কিন্তু এক সেমিস্টার না যেতেই বুঝতে পারেন যে পড়াশোনা তার জন্য নয়।

          সিসিল ফিরে এলেন দক্ষিণ আফ্রিকায়। হীরার খনি আবিষ্কৃত হয়েছে ততদিনে। অনেক ক্ষুদ্রব্যবসায়ীও তখন হীরার ব্যবসা করছেন। সিসিলও শুরু করলেন। ১৮৯০ সালের মধ্যে পৃথিবীর হীরা ব্যবসায়ীদের মধ্যে একচ্ছত্র অধিপতি হয়ে ওঠেন সিসিল রোডস। তারপর শুরু করেন ফলের ব্যবসা। ১৮৯২ সালের মধ্যেই আফ্রিকার সব ফলের ব্যবসা চলে আসে তাঁর হাতে।

          আফ্রিকান কালো মানুষদের তিনি মানুষ বলে মনে করতেন না। তিনি প্রকাশ্যেই বলতেন কালোদের কাজ হলো কুলিগিরি করা বা বড়জোর ক্ষেতখামারে কাজ করা। অন্যকিছু করতে চাইলে তাদের বাধা দেয়া উচিত।

          ১৮৭৭ সালে তিনি রাজনীতিতে যোগ দিয়ে পার্লামেন্টের মেম্বার হন। ১৮৯০ সালে সিসিল রোড কেইপ কলোনির (দক্ষিণ আফ্রিকা ও নামিবিয়ার পুরোটা) প্রধানমন্ত্রী হন। আফ্রিকান অশ্বেতাঙ্গদের সম্পর্কে তাঁর নীতি ছিলো, তারা হলো বর্বর। তাদেরকে পায়ের তলায় দাবিয়ে রাখতে হবে। তাদের হাতে কোন জমির মালিকানা দেয়া যাবে না।

          সিসিল রোডস বিশ্বাস করতেন যে ইংরেজরাই হলো পৃথিবীর সবচেয়ে উন্নত জাতি (First nation in the World)

          ১৮৭৭ সালে তিনি একটা উইল করেছিলেন সেখানে তিনি ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন একটা গোপন সংগঠন গড়ে তোলার যে সংগঠন পুরো পৃথিবীকে ব্রিটিশ রাজত্বে পরিণত করবে তাঁর শেষ উইলে অবশ্য তিনি টেবল মাউন্টেনের আশেপাশের বিশাল আয়তনের জমি দক্ষিণ আফ্রিকার জনগণের জন্য দিয়ে যান অবশ্য তিনি কখনো চিন্তাও করতে পারেননি যে তাঁর মৃত্যুর একশ বছরেরও কম সময়ের মধ্যে দক্ষিণ আফ্রিকার ভূমির মালিক হবার অধিকার অর্জন করবে কালো মানুষেরা, সরকার পরিচালিত হবে কালো মানুষদের দ্বারা যাঁদের তিনি মানুষ বলে মনে করতেন না।

          সিসিল রোডস পরিকল্পনা করেছিলেন আফ্রিকা মহাদেশের সর্বদক্ষিণের কেইপ টাউন থেকে সর্বউত্তরের মিশর পর্যন্ত ট্রেন লাইন বসানোর। টেলিগ্রাফ লাইন বসানোর কাজ তিনি শুরু করেছিলেন।

          ১৯০২ সালে ৪৮ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর উইল অনুসারে তাঁর সম্পদের কিছু অংশ নিয়ে ট্রাস্ট গঠিত হয়। একটা অংশ থেকে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে বৃত্তি দেয়া হয় প্রতিবছর। রোডস স্কলারশিপ খুবই প্রেস্টিজিয়াস স্কলারশিপ পৃথিবীর স্কলারদের কাছে। কিন্তু সিসিল রোডস এর কথামতো এই স্কলারশিপ শুধুমাত্র ইংরেজিভাষী শ্বেতাঙ্গ পুরুষদের জন্য সংরক্ষিত ১৯৭৭ পর্যন্ত কোন মেয়ে এই স্কলারশিপের জন্য মনোনীত হতো না। দক্ষিণ আফ্রিকায় ২০১২ পর্যন্ত এই নিয়ম চালু ছিল। ১৯৯১ সাল পর্যন্ত কোন কৃষ্ণাঙ্গ আফ্রিকান রোডস স্কলারশিপের জন্য বিবেচিত হতো না।

 

 

রোডস মেমোরিয়েল


আপার ক্যাম্পাস থেকে ছায়াঢাকা একটা রাস্তা ধরে উপরের দিকে ওঠার পর রোডস মেমোরিয়েল। ডেভিলস পিক-এর একটা অংশে এই স্মারক-স্থাপনা। বিখ্যাত স্থপতি হারবার্ট ব্যাকার গ্রিক স্থাপত্যের অনুসরণে ইউ আকৃতির এই স্থাপনা বানান গ্রানাইট পাথর দিয়ে। টেবিল মাউন্টেন থেকে আনা হয় এসব পাথর।

          মূল স্থাপনায় পৌঁছানোর জন্য ৪৯ ধাপের পাথরের সিঁড়ি। সিসিল রোডসের জীবনের একেকটা বছরের জন্য একেকটা সিঁড়ি। নিচের ধাপের সিঁড়িগুলোর মাঝখানে একটা বিশাল অশ্বারোহীর পিতলের মূর্তি। এই মূর্তি শারীরিক শক্তির (Physical Energy) প্রতীক

          উপরের সিঁড়ির প্রশস্ত রেলিং-এর ওপর একপাশে চারটি করে দুপাশে আটটি ব্রোঞ্জের সিংহমূর্তি সিঁড়িতে দাঁড়ালে কেইপ টাউনের অনেকদূর পর্যন্ত দেখা যায় ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাস, গ্রুট ইশকির হাসপাতাল সব দেখা যাচ্ছে।

     দেখেছো, একজন কত বড় মানুষ কত বড় বড় কাজ করে গেছেন? মনে হচ্ছে এলিজাবেথ সিসিলের প্রশংসা করছে।

          এলিজাবেথের সঙ্গে কোন ধরনের তর্কে যাওয়া বৃথা। তার গায়ের চামড়া, চুলের রঙ তাকে এখনো অনেক বেশি সুযোগ সুবিধা দেয় এই পৃথিবীতে। সিসিল রোডসকে তার ভালো লাগতেই পারে।

          নিচের দিকে তাকালে রাগবি মাঠের পাড়ে সিসিলের মূর্তিশূন্য বেদি দেখা যাচ্ছে। অনেকদিন ধরে আন্দোলন সংগ্রাম করে কৃষ্ণাঙ্গ ছাত্রছাত্রীরা এই মূর্তি সরাতে বাধ্য করেছে।

          মেমোরিয়েলের উপরের ধাপে সিসিল রোডস-এর একটা আবক্ষ পিতলের মূর্তি। গায়ে হাত দিয়ে চিন্তা করছেন রোডস। পুরনো পিতলের মূর্তির মুখ থেকে নাকটা কেউ সুন্দর করে কেটে নিয়ে গেছে। সেই জায়গায় পিতলের রঙ উজ্জ্বল।

 

সিসিল রোডসের নাক কেটে নেয়া হয়েছে

 

সিসিল চেয়েছিলেন এই ভূখন্ডে রাজত্ব করবে শুধুই সাদারা। এমন একজন বর্বর, বর্ণবাদী, আধিপত্যবাদী মানুষের নাম এখনো দক্ষিণ আফ্রিকায় যেভাবে ছড়িয়ে আছে - অনেক বছর লাগবে তা সরাতে। সিসিল রোডস এতটাই প্রভাবশালী ছিলেন যে তার নামে ব্রিটিশ কলোনির একটা দেশের নামই ছিল-রোডেশিয়া। যা এখন জিম্বাবুয়ে এবং জাম্বিয়া দুটো স্বাধীন দেশ।

     হি ওয়াজ নট ম্যারিড-এলিজাবেথের কথাগুলো শুনে মনে হচ্ছে খুবই আফসোস করছে সে।

     স্বাধীনচেতা মানুষ বিয়ে করে না।

     ইউ আর রাইট।"

          "তুমি কি স্বাধীনচেতা?"

          "ইয়েস।"

          রহস্যময় হাসি এলিজাবেথের মুখে।

          সোয়া দুটা বেজে গেছে। যেতে হবে গ্রুট ইশকির হাসপাতালে। মিউজিয়ামের তিনটার গাইডেড ট্যুরটা ধরতে হবে।

     কী ঠিক করলে?

          জ্ঞিজ্ঞেস করলাম এলিজাবেথকে। সে মেমোরিয়েলের গায়ে সিসিল রোডসের চৌদ্দগোষ্ঠী উদ্ধার করা দেয়াল লিখনের ছবি তুলছে।

     অ্যাবাউট হোয়াট?

     হার্ট মিউজিয়ামে যাবে?

     পয়সা লাগে?

     লাগে

     কত?

     তিনশ র‍্যান্ড

     এত বেশি?

     বেশি কোথায়? বিশ ইউরো। তোমাদের প্যারিসে ২০ ইউরোতে ঢুকা যায় কোথাও?

          ঠিক বলেছো। আমার তো ক্যাশ নেই।

     ওরা ক্রেডিট নেয়। যাবে কিনা বলো। না গেলে-বাই।

          আমি সিঁড়ি দিয়ে নামতে শুরু করলাম। দেখলাম সেও আসছে পেছনে।

          ইউনিভার্সিটির এত বিশাল ক্যাম্পাসে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাবার, এক ক্যাম্পাস থেকে অন্য ক্যাম্পাসে যাবার, বাস ও ট্রেন স্টেশন থেকে ক্যাম্পাসে যাতায়াত করার সুবন্দোবস্ত আছে। তাহলো জ্যামি শাটল -  ইউনিভার্সিটির নিজস্ব ক্যাম্পাস পরিবহন। আকাশী রঙের ঝকঝকে নতুন অনেকগুলো বাস চলে ক্যাম্পাসে।

          রোডস মেমোরিয়েল থেকে আপার ক্যাম্পাসে ফিরে এসে জ্যামি শাটলের স্টপ খুঁজে পেতে দেরি হলো না। রুটম্যাপ দেখলাম। আমাদের উঠতে হবে 9C বাসে

ম্যান্ডেলার দেশে - পর্ব ১৫

 


কেইপ পয়েন্ট

আটটা থেকে সোয়া আটটার মধ্যে আমাকে হোটেলের লবি থেকে গাড়িতে তুলে নেয়ার কথা। আটটা বাজার পাঁচ মিনিট আগে থেকেই হোটেলের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। দক্ষিণ আফ্রিকানদের সময়ানুবর্তিতা সম্পর্কে এপর্যন্ত ভালো কিছু শুনিনি। এদেশের সবাই ধীরেসুস্থে কাজ করতে পছন্দ করে। সোজাসাপ্টাভাবে বলতে গেলে বলতে হয় আলস্য করতে পছন্দ করে।

          আলস্য করা মনে হয় দক্ষিণ গোলার্ধের মানুষের সাধারণ বৈশিষ্ট্য। অস্ট্রেলিয়ানরাও আলস্য করতে পছন্দ করে। নিউজিল্যান্ডাররাও। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ানরা সময়ের ব্যাপারে খুবই নিয়ম মেনে চলে। অথচ আফ্রিকানদের ব্যাপারে প্রচলিত প্রবাদ হলো- যদি আফ্রিকানরা বলে জাস্টনাউ- বুঝতে হবে আগামী দুসপ্তাহের মধ্যে কোন একসময়। এখন এদের আটটা থেকে সোয়া আটটা কটায় বাজবে জানি না।

          অপেক্ষার সময় আপেক্ষিকভাবে ধীরে চলে। অনন্তকাল অপেক্ষা করার পর ঘড়ি দেখলাম - এখনো আটটা। বিশাল এক ট্যুরবাস হোটেলের সামনে এসে দাঁড়ালো। ভাবলাম অন টাইম। দেখলাম হোটেলের ভেতর থেকে প্রায় দৌড়ে এলো এলোমেলো সোনালী চুলের এক শ্বেতাঙ্গিনী। আমাকে প্রায় ধাক্কা দিয়ে বাসে ওঠার জন্য চলে গেলো বাসের গেটে। আমি তাকে অনুসরণ করলাম।

     এটা কি কেইপ পয়েন্টের বাস?”

     না- বাস ড্রাইভারের সংক্ষিপ্ত উত্তর।

          মেয়েটির হাতে ধরা ট্যুরবাসের ভাউচারের দিকে তাকিয়ে দেখলাম সেও আমার ট্যুরই বুক করেছে।

     কেইপ পয়েন্ট? আট থেকে সোয়া আট? জ্ঞিজ্ঞেস করলাম।

          হ্যাঁ। তুমি?

     আমিও

          বেড়াতে যাচ্ছি একটা ট্যুরে। সারাদিন না হলেও অর্ধেক দিন একই গাড়িতে ঘুরবো। আলাপ পরিচয় হবে এটাই স্বাভাবিক। তাছাড়া নিজের দেশে নিজের পরিচিত পরিবেশ অনেকে খুব গম্ভীর হয়ে থাকলেও দেশের বাইরে এসে অপরিচিত মানুষের সাথে আলাপ করতে আগ্রহী হয়।

     আমার নাম এলিজাবেথ। ফ্রান্স।

          নাম জানার পরেই মানুষ জানতে চায় কোন দেশ থেকে এসেছে। এলিজাবেথ এক বাক্যেই সেরে ফেললো দুটো। আমিও তাই করলাম।

     কয়দিন এসেছো এই দেশে?

     আজ সপ্তম দিন। তুমি?

     কেইপ টাউনে আজ পঞ্চম। দক্ষিণ আফ্রিকায় এসেছি ২৫ দিন আগে। জোহানেসবার্গ, প্রিটোরিয়া, আর সাফারি ক্যাম্প ঘুরে এখানে।

     একা একা ভ্রমণ করছো?

     আমি একা ভ্রমণ করতে পছন্দ করি। স্বাধীনভাবে ঘোরা যায়। তুমি?

     একই, স্বাধীনতা।

          এলিজাবেথের কথাবার্তায় ইউরোপীয় টান আছে। কিন্তু ইংরেজি শব্দ খুঁজতে হয় না তাকে। ফরাসীরা ইংরেজি জানে বেশ ভালোই, কিন্তু বলতে পছন্দ করে না। আর আমরা ইংরেজি জানি বা না জানি, বলতে খুব পছন্দ করি।

          আমাদের কি আবার হোটেলের লবিতে ফিরে যাওয়া উচিত?

          বাস দেখে ফুটপাতে নেমে এসেছিলাম। কিন্তু বিশাল বাস এখন হোটেলের সামনের কিছু অংশ ব্লক করে রেখেছে। লবিতে ফিরে গেলে ট্যুরগাইডের কাজ বাড়বে। বললাম, গাড়ি তো এখানেই আসবে।

          ব্যাগ খুলে ক্যামেরা বের করলো এলিজাবেথ। দেখলাম অলিম্পাস এস-এল-আর। বাসস্টপের যাত্রীছাউনির দেয়ালে স্কেচ-পেন দিয়ে অনেকেই ভালোবাসার চিহ্ন এঁকে রেখেছে। হার্ট সাইন এঁকে তার ওপর মুদিবা+কিঞ্জে ইত্যাদি। এই ব্যাপারটাও কোন ভৌগোলিক সীমারেখা মেনে চলে না। এলিজাবেথ এসব লেখার ছবি তুলছে একের পর এক।

     প্র্যাডিব?

     ইয়েস

     আই অ্যাম গারথ। ইওর ট্যুরগাইড

          দেখলাম হিলটন রস কোম্পানির একটা মাইক্রোবাস এসে দাঁড়িয়েছে। গারথের বয়স পঁচিশ-ছাব্বিশের বেশি হবে না। খুব ছোট করে ছাটা চুল, চটপটে স্বাস্থ্যবান। গায়ের রঙ বাদামী, আফ্রিকানদের মতো কালো নয়। আবার চেহারা ভারতীয়ও নয়। ব্রিটিশরা নাম দিয়েছিলো আফ্রিকান কালারড পিপল

     আরো একজনের যাবার কথা

          এলিজাবেথ তখনো দেয়াললিখনের ছবি তুলতে ব্যস্ত। ডাক দিলাম, হেই এলিজাবেথ, আওয়ার কার ইজ হিয়ার।

          দৌড়ে চলে এলো। গারথ মাইক্রোবাসের দরজা খুলে দিলো, এলিজাবেথ প্রায় দৌড়ে গিয়ে জানালার পাশে বসে পড়লো।

          সামনের সিটে গারথের পাশে বসে আছেন একজন প্রৌঢ় ভদ্রলোক। পেছন ফিরে হাত বাড়িয়ে দিলেন- মাই নেম ইজ দোমিনিক। ফ্রম আর্জেন্টিনা।

          দোমিনিকের কাঁচাপাকা গোঁফ, মাথাভর্তি টাক। হাসিখুশি মানুষ। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই বোঝা গেল ননস্টপ কথা বলেন ডোমেনিক। পেটে বিদ্যা থাকলে অনেকেই চুপ করে থাকতে পারেন না, একটু পরপরই জ্ঞান উগলে দিতে পছন্দ করেন। ডোমেনিক সেরকমই একজন।

     আর দুজন যাত্রী উঠবেন ওয়াটারফ্রন্ট থেকে। তারপর সোজা চলে যাবো কেইপ পয়েন্টে - ওয়াটারফ্রন্টে ঢুকতে ঢুকতে বললো গারথ।

          হোটেল রেডিসন ব্লু থেকে উঠলেন এক প্রৌঢ় দম্পতি। সৌজন্যমূলক পরিচয় হলো। ডন ও ডোনা। কানাডার হ্যালিফ্যাক্সের বাসিন্দা। অবসর কাটাচ্ছেন বিশ্বভ্রমণ করতে করতে। মাইক্রোবাসে এখন পাঁচ মহাদেশের অধিবাসী।

          ওয়াটারফ্রন্ট থেকে বেরিয়ে বিচ রোড ধরে চলছে গাড়ি। হাউট বে পর্যন্ত এসেছিলাম আগে। হাউট বে থেকে গাড়ি চললো টেবল মাউন্টেনের অন্যপাশে চ্যাপম্যানস পিক ড্রাইভ ধরে। এটা টোলওয়ে। টোল প্লাজা পার হয়ে যে রাস্তায় এলাম তা পৃথিবীর আশ্চর্য সুন্দর রাস্তাগুলোর একটি। চ্যাপম্যানস পিক ড্রাইভ।

          টেবিল মাউন্টেনের চ্যাপম্যান চূড়ার উচ্চতা ৬০০ মিটার। এর নিচে পর্বতমালার পায়ের কাছে আছড়ে পড়ছে সাগরের পানি। পাহাড়ের ঢাল কেটে সরু রাস্তা এঁকে বেঁকে চলে গেছে হাউট বে থেকে প্রায় দশ কিলোমিটার।

          শক্ত গ্রানাইটের স্তর কেটে কেটে এই রাস্তা বানানো হয়েছিল ১৯২২ সালে। কিন্তু বৃষ্টির সময় পাহাড় থেকে পাথর পড়ে রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়। দুর্ঘটনা ঘটে অনেকবার। ২০০০ সালে এই রাস্তা বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। তারপর আধুনিক উপায়ে রাস্তায় পাথরপড়া বন্ধ করে রাস্তা খুলে দেয়া হয়েছে। তবে এখনো ঝড় বৃষ্টি হলে এই রাস্তা বন্ধ করে দেয়া হয়।

          কিছুদূর এসে ডানদিকে তাকিয়ে চোখ জুড়িয়ে গেলো। পাহাড় ঘেরা একটি হৃদের মতো লাগছে একটা জায়গায়। হৃদের ওপারে আটলান্টিক। মনে হচ্ছে গলায় পর্বতের মালা পরে অপরূপা হয়েছে সাগরকন্যা। পাহাড় চূড়ার মেঘ সেতু তৈরি করেছে পানির সাথে।

          রাস্তা এখানে একটু বড় আছে। রাস্তার পাশে গাড়ি দাঁড় করালো গারথ। গাড়ি থেকে নেমে মিনিট পাঁচেক তাকিয়ে রইলাম অপরূপ প্রকৃতির দিকে। সবাই মিলে কয়েকটা ছবি তুলে আবার যাত্রা শুরু।

          একটু পরপরই রাস্তার বাঁক। বামে পাহাড় আর প্রায় তিন চারশ মিটার নিচে সাগর। একটু অসতর্ক হলে গাড়ি চলে যাবে আটলান্টিকের কোলে।

 

চ্যাপমান পিক্‌স ড্রাইভ


ডোমিনিক সামনের সিটে বসে অনবরত বক বক করছেন। তিনি জানেন না এমন কোন বিষয় আছে বলে মনে হয় না। গাইড গারথ কিছু দেখালে বা কোন তথ্য দিলে সেই প্রসঙ্গেও কয়েক পৃষ্ঠা বক্তৃতা দিয়ে ফেলেন তিনি। ডন এবং ডোনা দম্পতি মাঝে মাঝে ডোমিনিকের কথায় অংশগ্রহণ করেন। কিন্তু এলিজাবেথ ও আমি একেবারে চুপ।

          চ্যাপম্যান্‌স পিক ড্রাইভ পার হয়ে ছুটে চলেছি স্টেলেনবশ শহরের ভেতর দিয়ে। স্টেলেনবশ দক্ষিণ আফ্রিকার সবচেয়ে পুরনো শহরগুলোর একটি, ওয়াইনের জন্য বিখ্যাত।

          রাস্তার পাশে মাঝে মাঝে আফ্রিকান লোক-শিল্পের মেলা। সেখানে মাঝে মাঝেই দেখা যাচ্ছে বিশাল আকৃতির জিরাফ দাঁড়িয়ে আছে। একেবারে আসল জিরাফের সাইজ। এগুলো কেউ কিনলে কীভাবে নিয়ে যাবে জানি না।

          ডোমিনিক বলে চলেছেন স্টেলেনবশ কেন কী কারণে বিখ্যাত ইত্যাদি। আপাতত গাড়ি চালানো ছাড়া ট্যুরগাইড গারথের আর কোন কাজ নেই। ইতিহাস বর্ণনা করার কাজটা মিস্টার আর্জেন্টিনা নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন।

          কিন্তু রাস্তার পাশে দরিদ্র আফ্রিকানদের দেখে ডোমিনিক যেভাবে দক্ষিণ আফ্রিকা সরকারের ঠিক কী কী করা উচিত বলে যাচ্ছেন। তাতে মনে হচ্ছে ডোমিনিক সাহেবের উচিত দক্ষিণ আফ্রিকা সরকারের বিরোধী দলে যোগ দেয়া।

  

ডোমিনিক, প্রদীপ, এলিজাবেথ, ডন ও ডোনা। ছবি তুলেছে গার্‌থ।


কেইপ অব গুড হোপ- টেবল মাউন্টেন ন্যাশনাল পার্কের কেইপ পয়েন্ট এরিয়া। ন্যাশনাল রিজার্ভ। বিশাল এলাকা নিয়ে পাহাড় আর সমতল ঘেরা এই পার্ক। পার্কে ঢোকার আগে একটা প্রাইভেট আস্ট্রিচ ফার্ম দেখেছি। উটপাখির ডিম খুবই জনপ্রিয় এখানে।

          বনভূমিতে কিছু জেব্রা আর সাদা-কালো হরিণ ছাড়া আর কোন বড়  প্রাণী দেখলাম না। আফ্রিকান বন্যপ্রাণী দেখার জন্য অনেক দূরে সাফারি পার্কে যেতে হয়। কিংবা কেনিয়ার জঙ্গলে। দক্ষিণ আফ্রিকার এই অংশে যত প্রাণী আছে সবই অহিংস।

          কেইপ পয়েন্টে পৌঁছলাম। গাড়িপার্ক করার পর গারথ জানালো পাহাড়ের উপর বাতিঘরে উঠার জন্য ফিউনিকুলার ট্রেনে উঠতে হবে। ওঠানামার জন্য ট্রেনের ভাড়া ৫৮ র‍্যান্ড। এই টাকা নিজের পকেট থেকে দিতে হবে শুনে নিচুস্বরে গজ গজ করতে শুরু করলো এলিজাবেথ। মেয়েটা কি কৃপণ নাকি?

 

ফিউনিকুলার ট্রেন


একটা রেস্টুরেন্ট আর স্যুভেনির শপ, তার পাশে টিকেট ঘর। ছোট্ট ট্রামের মতো এক কামরার একটা বগি। পাহাড়ি পথে ট্রেনলাইন বেয়ে আস্তে আস্তে উঠে গেলো উপরে। চারপাশ কী যে সুন্দর। পাহাড়ের একপাশে আটলান্টিক, অন্যপাশে ভারত মহাসাগর পরস্পর মিশে গেছে দক্ষিণে এসে।

          উপরের স্টেশনে একটা ছোট্ট স্যুভেনির শপ। সেখান থেকে প্রশস্ত সিঁড়ি এঁকেবেঁকে উঠে গেছে লাইট হাউজে। বাতিঘরে ওঠার পর চারদিকে ঘুরে ঘুরে দেখা যায়। এই সকালেই বেশ ভিড় হয়ে গেছে এখানে। সবাই ছবি তোলায় ব্যস্ত। দূরে চারপাশে পাহাড় নিচে দুটো মহাসাগর পাশাপাশি এসে মিশে গেছে। এমন জায়গায় আসার স্মৃতি ধরে রাখছে সবাই। বেগুনি রঙের কিছু পাখি উড়ে এসে বসছে কাছাকাছি। ২৫০ প্রজাতির পাখি আছে এখানে।

          এখনকার পাথরের দেয়ালেও অনেকে পাথর দিয়ে ঘষে ঘষে লিখেছে নিজের নাম আর তার প্রেমিকার নাম। এলিজাবেথ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে ছবি তুলছে সেগুলোরও।


আফ্রিকা মহাদেশের সবচেয়ে দক্ষিণের বাতিঘর


কেইপ পয়েন্টে ছবিটা তুলেছে এলিজাবেথ


গারথ আমাদের সময় দিয়েছিলো বিশ মিনিট। ডন আর ডোনা তার অনেক আগেই নেমে গেছেন। ডোমিনিক এলিজাবেথের কাছে কাছে ঘুরছেন। কেইপ পয়েন্টকে আফ্রিকার সবচেয়ে দক্ষিণ বিন্দু বলা হলেও আসল দক্ষিণ বিন্দু যে আরো ১৫০ কিলোমিটার দক্ষিণে কেইপ আগালহাস - তা বিস্তারিত বলতে না পেরে শান্তি পাচ্ছেন না ডোমিনিক।

 



ফেরার পথে কিছুদূর আসার পর গাড়ি থামাতে হলো। রাস্তা দখল করে বসে আছে দলে দলে বেবুন। এই পার্কে হাজার হাজার বেবুন। হর্ন বাজানোর পরেও রাস্তা ছাড়ে না তারা। অন্য দিক থেকেও আসতে পারছে না গাড়ি। গারথ গাড়ি থেকে নেমে অনেক কষ্টে দলের সর্দারকে বসা থেকে উঠিয়ে দিলো। সাথে সাথে অন্যরাও উঠে গেলো। দলপতির প্রতি এমন আনুগত্য আর কোন্‌ কোন্‌ পশুর মধ্যে আছে জানি না।

          যা ভেবেছিলাম তাই, ডোমিনিক আফ্রিকার সর্বদক্ষিণ পয়েন্ট কোনটা তা নিয়ে লেকচার শুরু করলেন। ভদ্রলোক মনে হয় গাইডবুক মুখস্ত করে ফেলেছেন।

          গারথ জানালো এবার আমরা যাবো বুল্ডার্স পেঙ্গুইন কলোনিতে। আফ্রিকান পেঙ্গুইনের সবচেয়ে নিরাপদ কলোনি। মেইন রোড থেকে অনেক ভেতরে আবাসিক এলাকার মধ্যে যে এরকম একটা স্থাপনা আছে তা বাইরে থেকে বোঝার উপায় নেই। পার্কিং এরিয়ার চারপাশে অনেক ফুলের গাছ। বেশিরভাগই জবা জাতীয় ফুল। বিভিন্ন রঙের জবা। একপাশের রাস্তায় খোলা বাজার। জামাকাপড়, খেলনা, পুঁতির মালা, বালা, ব্যাগ ইত্যাদি হস্তশিল্পের বাজার।

          এখান থেকে প্রায় একশ মিটার হেঁটে ছোট্ট রাস্তার শেষ মাথায় বুল্ডারস পেঙ্গুইন কলোনিতে ঢুকার পথ। ৬৫ র‍্যান্ড টিকেটের দাম। এলিজাবেথের প্রতিক্রিয়া দেখার জন্য তার দিকে তাকালাম। সে গজগজ করতে করতে ব্যাগ খুললো। সিকিউরিটি স্ক্যানারের ভেতর দিয়ে ঢুকতে হলো।


আফ্রিকান হস্তশিল্পের বাজার  


ভেতরে একশ মিটারের মধ্যে বিচ। কাঠের সেতু এঁকে বেঁকে চলে গেছে অনেক দূর। চারপাশে সাদা বালির স্তূপ, তার ওপর কিছু সামুদ্রিক লতা-গুল্ম। তার ভেতরে যেদিকে তাকাই পেঙ্গুইন আর পেঙ্গুইন। এখনকার পেঙ্গুইন অ্যাকোয়ারিয়ামের পেঙ্গুইনের চেয়ে অনেক বেশি হৃষ্টপুষ্ট।

          ১৯৮২ সালে মাত্র একজোড়া পেঙ্গুইন নিয়ে শুরু করা হয়েছিল এই কলোনি। এখন প্রায় আড়াই হাজার পেঙ্গুইন আছে এখানে।

          চারদিকে একটা দুর্গন্ধ ভাসছে। পেঙ্গুইনদের সাথে ছবি তোলা ছাড়া আর কোন কাজ নেই

          আধঘন্টার মধ্যে আবার গাড়িতে। এবার কেইপ টাউনে ফেরার পথ। যেদিক দিয়ে এসেছিলাম ফিরছি অন্যপথে।

          একটু পরই সাইমনস টাউন। সেই ১৭৪৩ সালে এই শহর গড়ে উঠেছিল নৌবাহিনীর শহর হিসেবে। রয়েল নেভির অনেক পুরনো ভবন এখন মিউজিয়ামে রূপান্তরিত হয়েছে।

 

 

বুল্ডার্স পেঙ্গুইন কলোনি


মেইন রোডের দুপাশে দেড়শো বছর আগের ঘরবাড়ি-দোকানপাট এখনো চলছে।

        রাস্তা থেকেই দেখা গেলো জুবিলি স্কোয়ার। সাইমনস টাউনের কেন্দ্রবিন্দু। এখানে রাস্তার পাশে পার্কে একটা কুকুরের মূর্তি। এই কুকুর খুব বিখ্যাত এখানে। কুকুরটি নৌবাহিনীর সৈনিকের মর্যাদা পেয়েছিল ১৯৩৯ সালে। তার নাম ছিল জাস্ট নুইসেন্সনামের অর্থ যাই হোক ১৯৪৩ সালে জাস্ট নুইসেন্স যখন মারা যায় তখন তাকে নৌবাহিনীর সামরিক মর্যাদায় দাফন করা হয়। তার মূর্তি প্রতিষ্ঠা করা হয় সাইমনস টাউনের প্রধান পার্কে। জাস্ট নুইসেন্সই বটে।

          গাড়ি চলছে কেইপ টাউনের দিকে।

          ইউনিভার্সিটির কোন ক্যাম্পাসে যেতে চান? গাড়ি চালাতে চালাতে প্রশ্ন করলো গারথ।

     কয়টা ক্যাম্পাস আছে?

     ইউ-সি-টির চারটা ক্যাম্পাস, এখানে তিনটা, একটা সিটিতে ওয়াটারফ্রন্টের কাছে। রনডেবশ-এ গ্রুট ইশকির ক্যাম্পাস, অবজারভেটরিতে মেডিকেল ক্যাম্পাস, হিডিন ক্যাম্পাস সিটিতে। গ্রুট ইশিকির ক্যাম্পাস আবার তিনভাগ, আপার, মিডল, লোয়ার। পাহাড়ী এলাকা তো।

     রোডস মেমোরিয়েলের কাছে কোনটা?

          আপার ক্যাম্পাস। হাইওয়ের কাছেই। এটা এম-থ্রি রোডস ড্রাইভ। ইউনিভার্সিটির কাছে একটা ট্রাফিক লাইট পাবো। সেখান থেকে আপার ক্যাম্পাস কয়েক মিনিটের হাঁটা পথ।

          ঝড়ের বেগে গাড়ি চালাচ্ছে গারথ। হাইওয়েতে স্পিড লিমিট ১১০ কিলোমিটার। সে মনে হচ্ছে ১২০এ চালাচ্ছে। কেউই খুব একটা মাইন্ড করছে বলে মনে হচ্ছে না। সামনের সিটে ডোমিনিক হা করে ঘুমাচ্ছেন। পেছনের সিটে ডন ও ডোনা দম্পতি না ঘুমালেও নিস্তেজ হয়ে এলিয়ে পড়েছেন। আমি রেডি নেমে যাবার জন্য। এলিজাবেথের দিকে তাকালাম সে তার ছোট্টব্যাগটা কোলের উপর নিয়ে পিট পিট করে তাকাচ্ছে আমার দিকে।

          মিনিট পনেরো আগে গারথকে জ্ঞিজ্ঞেস করেছিলাম ইউনিভার্সিটির কাছ দিয়ে যখন যাবে, আমাকে ইউনিভার্সিটির কাছে নামিয়ে দিতে পারবে কি না। ইউনিভার্সিটি এরিয়ায় অনেক কিছু দেখার আছে। দক্ষিণ আফ্রিকার অবজারভেটরি আছে এখানেসিসিল রোড মেমোরিয়েলটাও দেখার ইচ্ছা আছে। আর সময়মতো পৌঁছাতে পারলে গ্রুট ইশকির হাসপাতালের হার্ট অব কেইপ টাউন মিউজিয়াম দেখবো।

          গারথ সেই সময় বলেছিল, কোন সমস্যা নেই।

          এলিজাবেথ জানতে চাইলো, ইউনিভার্সিটিতে যাবে তুমি?

     হ্যাঁ-এসেছি যখন ক্যাম্পাসটা দেখে যাই।

     তারপর হোটেলে ফিরবে কীভাবে?

     বাস বা ট্যাক্সি নিয়ে।

          তারপর আর কোন কথাবার্তা নেই। তার পনেরো মিনিট পরে গারথ জানতে চাইলো- কোন ক্যাম্পাস।

          এম-থ্রি হাইওয়ের রোডস ড্রাইভ যেখান থকে ডি-ওয়াল ড্রাইভ হয়ে গেছে তার কাছাকাছি গাড়ি থামালো গারথ। দ্রুত নেমে এসে দরজা খুলে দিলো গারথ।

     থ্যাংক ইউ এভরিবডি। বাই বলে নেমে গেলাম।

          গারথের হাতে কিছু টিপস গুঁজে দিয়ে ঘুরতেই দেখি এলিজাবেথও নেমে গেছে গাড়ি থেকে।

     তুমি কোথায় যাচ্ছো? জ্ঞিজ্ঞেস করলাম।

     আমিও যাবো রোডস মেমোরিয়েল দেখতে।

          গারথ বলেছিল কয়েক মিনিটের পথ কিন্তু হাঁটতে হলো প্রায় পনেরো মিনিট। সময়ের ব্যাপারে যেমন জাস্ট নাউ বললে কয়েকদিন বোঝায় সেরকমই কয়েক মিনিটের পথ মানে কয়েক ঘন্টার পথও হতে পারে আফ্রিকায়।

 




Latest Post

September 11

  Beams of light at the site of the Twin Towers in New York City, in memory of those who were killed. Photo: pxfuel.com September 11, 2001 -...

Popular Posts