Thursday, 15 June 2023

রিচার্ড ডকিন্সের সাথে একটি সন্ধ্যা


 [শুক্রবার ১৭/২/২০২৩ সন্ধ্যে ৭টা ৩০]


আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় – বিজ্ঞানের মতো সস্তা জিনিস আর নেই। এতটাই সস্তা যে পরীক্ষায় পাসের জন্য কোচিং সেন্টার ছাড়া বিজ্ঞানের জন্য আর কোথাও এক পয়সাও খরচ করতে রাজি নয় বেশিরভাগ মানুষ। নোরাহ ফাতেহির পনের মিনিট নাচ দেখার জন্য পনের হাজার টাকার টিকেট কেনার লোকের অভাব নেই, কিন্তু  বিনামূল্যেও বিজ্ঞান-বক্তৃতা শোনার জন্য লোক পাওয়া যায় না আমাদের দেশে।

তবে কিছু কিছু দেশে কিছু কিছু মানুষের ক্ষেত্রে এই কথা প্রযোজ্য নয়। যেমন ব্রিটিশ পদার্থবিজ্ঞানী ও জনপ্রিয় লেখক ব্রায়ান কক্স-এর এক ঘন্টার একটি বিজ্ঞান বক্তৃতার টিকেটের দাম দু’শ থেকে পাঁচশ ডলার।  জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় এরকম জনপ্রিয় বাগ্মী আছেন, যেমন রিচার্ড ডকিন্স, বিল ব্রাইসন, নীল টাইসন – যাদের কথা শোনার জন্য অনেক টাকার টিকেট কিনে জ্ঞানপিপাসু লোক ভীড় জমায়, বিশাল বিশাল কনভেনশান সেন্টার কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। এরকম দৃশ্য দেখে আনন্দ হয়, পাশাপাশি কষ্টও হয়। কষ্ট হয় এই কারণে যে জামাল নজরুল ইসলাম স্যার যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে সেমিনার বক্তৃতা দিতেন – তখন সায়েন্স ফ্যাকাল্টির গ্যালারির তিন ভাগের একভাগও পূর্ণ হতো না। অথচ সায়েন্স ফ্যাকাল্টির যেকোনো একটা সাবজেক্টে ভর্তি হবার জন্য কী পরিমাণ যুদ্ধ সবাই করে। 

সে যাই হোক, মূল কথায় আসি। রিচার্ড ডকিন্সের বক্তৃতা শুনতে গিয়েছিলাম। টিকেট কেনার সময় বেশ মজাই লাগছিল এই কারণে যে মেলবোর্নে অমিতাভ বচ্চনের বক্তৃতা শোনার জন্য যত ডলারের টিকেট লেগেছিল – রিচার্ড ডকিন্সের জন্য লাগলো তার দ্বিগুণেরও বেশি। 

রিচার্ড ডকিন্সকে পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় বিবর্তন-জীববিজ্ঞানী বলা যায়। এই বিরাশি বছর বয়সেও পৃথিবীর এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে – লন্ডন – কানাডা – আমেরিকা – অস্ট্রেলিয়া - নিউজিল্যান্ড – দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। প্রায় প্রতি সপ্তাহেই বিশ্বের কোনো না কোনো শহরে তাঁর বিজ্ঞানবক্তৃতা থাকে। প্রতিটি বক্তৃতার জন্য তিনি পঞ্চাশ হাজার থেকে এক লাখ ডলার পর্যন্ত সম্মানী নেন। টিকেটের মূল্য থেকে এত আয় হয় যে আয়োজকদের গায়েই লাগে না। সাম্প্রদায়িকতামুক্ত যুক্তিবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে রিচার্ড  ডকিন্স একটি ফাউন্ডেশান প্রতিষ্ঠা করেছেন। তাঁর প্রকাশিত বইগুলির রয়্যালটি এবং বিজ্ঞান-বক্তৃতা থেকে তিনি প্রতি বছর যে কয়েক মিলিয়ন ডলারের উপরে উপার্জন করেন তার পুরোটাই এই ফাউন্ডেশানে দিয়ে দেন। 




ভেবেছিলাম তাঁর স্বভাবসিদ্ধ ঝাঁঝালো ধর্মবিরোধী বক্তৃতা দেবেন তিনি। কিন্তু প্রোগ্রামের ফরম্যাট ছিল কথোপকথন। অস্ট্রেলিয়ান বংশোদ্ভূত আরেকজন পৃথিবীবিখ্যাত দার্শনিক প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োএথিক্সের অধ্যাপক পিটার সিঙ্গার এবং রিচার্ড ডকিন্সের কথোপকথন। পিটার সিঙ্গারের দর্শনের সবকিছুর সাথে আমি পুরোপুরি একমত না হলেও কিছু কিছু ব্যাপারে ভীষণ একমত। তিনি কম কাজে বেশি ইমপ্যাক্টে বিশ্বাসী। যেমন একজন অন্ধ মানুষকে একটি গাইড ডগ দিতে  – গাইড ডগের ট্রেনিংসহ সবকিছু মিলিয়ে কমপক্ষে চল্লিশ হাজার ডলার খরচ হয়। সেক্ষেত্রে চল্লিশ হাজার ডলার দিয়ে শুধুমাত্র একজন অন্ধ মানুষকে সহায়তা করা যায়। অথচ যদি অন্ধদের চোখ পরীক্ষা করে বোঝা যায় যে অপারেশান করলে চোখ ভালো হয়ে যাবার সম্ভাবনা আছে তাহলে চল্লিশ হাজার ডলার দিয়ে এরকম বিশ জন মানুষের চোখ ভালো করে দেয়া যায়। সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও মানুষের জন্য করতে চাইলে অনেক কিছু করা যায়। অথচ আমরা এরকমও দেখি – আর্তজনকে দশ হাজার টাকা দেয়ার জন্য লাখ টাকা খরচ করে অনুষ্ঠান করা হয়, অতিথিদের বহুমূল্য ক্রেস্ট দেয়া হয়, লম্বা লম্বা বক্তৃতা দেয়া হয়। 

পিটার সিঙ্গার আর রিচার্ড ডকিন্স ঘন্টাখানেক কথা বললেন মানুষের বিভিন্ন মানবিক গুণাবলির উৎকর্ষ সাধনে কী কী করা যায় সেসব নিয়ে। দর্শকদের মধ্যে তরুণদের সংখ্যা বেশি। জ্ঞানভিত্তিক সমাজ তৈরি করতে পারা যে সভ্যতার লক্ষণ, এবং সেক্ষেত্রে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের যে একটা বিরাট দায়িত্ব থাকে – তা অনস্বীকার্য। 

আমাদের দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলি কি সেই দায়িত্ব পালন করতে পারছে? মোসায়েবি করা কি জ্ঞানের পর্যায়ে পড়ে? 


Sunday, 11 June 2023

I Hate Men – সদম্ভ ঘৃণার চাষ

 



বই: I Hate Men

লেখক: Pauline Harmange

ফরাসি থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ: Natasha Lehrer

প্রকাশক: 4th State London

প্রকাশকাল: 2020, 2022. 

পৃষ্ঠাসংখ্যা: 99

পলিন হামাঞ্জের জন্ম ১৯৯৪ সালে ফ্রান্সে


তরুণ ফরাসী উগ্র নারীবাদী লেখক পলিন হামঞ্জ (Pauline Harmange – ফরাসি উচ্চারণ আমার আসে না, অনলাইনে কয়েকবার শুনে মনে হলো এরকমই কিছু বলা হয়েছে) কিংবা ইংরেজি উচ্চারণে পলিন হারমান্‌জ-এর নাম আমি আগে কখনো শুনিনি। অবশ্য শোনার কথাও নয়। নারীবিজ্ঞানীদের ব্যাপারে সামান্য খোঁজখবর রাখলেও, উগ্র নারীবাদীদের ব্যাপারে আমার কোন আগ্রহ নেই। কোনো নির্দিষ্ট আদর্শ কিংবা নীতি প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে প্রবর্তিত সমাজবাদ, ভক্তিবাদ, যুক্তিবাদের মতোই নারীবাদেও অনেক ভালো ভালো ব্যাপার আছে। কিন্তু যখনই কোন মতবাদে উগ্রতা যুক্ত হয় – তখন তা যত বড় আদর্শই হোক – বাদ দিতে ইচ্ছে করে। 

বইয়ের নাম “I Hate Men” দেখে বেশ অবাক হয়েই বইটি কিনেছি। নারীবাদীরা পুরুষদের ইচ্ছেমতো গালাগালি দিয়ে অনেক বইপত্র লিখে থাকেন। ডেইল ডিয়ানা সোয়ার্জ-এর চূড়ান্ত গালিময় একটি বই আছে “All Men Are Jerks” অবশ্য সেখানেও একটি স্টারমার্ক দিয়ে কিছুটা নমনীয় ভাব দেখানো হয়েছে “until proven otherwise” বলে। কিন্তু একেবারে সরাসরি সমগ্র পুরুষজাতিকে ঘৃণা করে “I Hate Men” নাম দিয়ে আর কোনো বই আগে লেখা হয়নি। পুরো  অ্যামাজন ঘেঁটেও এরকম কোনো বই পাইনি। পুরুষরা নারীদের উপর একটা তীব্র যন্ত্রণাময় ব্যবস্থা চাপিয়ে দিয়েছে সেটা বহুল প্রচারিত এবং প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু পুরুষরা এখনো “I Hate Women” নামে কোন বই লেখেনি। সেক্ষেত্রে “I Hate Men” নিসন্দেহে অগ্রদূত। 

 সব ঘৃণার উল্টোপিঠেই ভালোবাসা থাকে এরকম একটা আপ্তবাক্য ঘুরে বেড়ায় প্রেমিক-মনের অন্দরে। আমারও বিশ্বাস ছিল এই বইটিতে ঠাঁসবুনোট ঘৃণার পাশাপাশি না হোক, কোনো এক কোণায় হলেও কিঞ্চিৎ ভালোবাসার আভাস থাকবে ভালোবাসা পাবার যোগ্য মানুষদের জন্য। কিন্তু না, লেখক বইয়ের তৃতীয় পৃষ্ঠাতেই পরিষ্কার বলে দিয়েছেন, “I hate men. All of them, really? Yes, the whole lot of them. By default, I have very little respect for any of them.” 

লেখক নিজেই স্বীকার করেছেন, তিনি উভয়কামী,এবং একজন পুরুষকে বিয়ে করে বিবাহিত স্বামী-স্ত্রী হিসেবে ঘরও করছেন। তাঁর নিজের স্বীকারোক্তিতেই পরিষ্কার যে তিনি তাঁর পুরুষ স্বামীকেও ঘৃণা করেন। ঘৃণা করেন, অথচ ছেড়ে দিচ্ছেন না। আবার এক বা একাধিক নারীর সাথেও তাঁর প্রেম কিংবা কামের সম্পর্ক। এরকম সম্পর্কের জোড়াতালি নিয়ে তিনি এত জোরের সাথে পৃথিবীর সমস্ত পুরুষের প্রতি ঘৃণা উগরে দিচ্ছেন। যুক্তি কী? পুরো বইতে কোনও একটা নতুন যুক্তি নেই – যা গত শত বছর ধরে নারীবাদীরা পুরুষদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করেননি। 

বইটি খুব একটা বড় নয়। মাত্র নব্বই পৃষ্ঠা – তাও ছোট্ট পুস্তিকার আকারে ছাপানো হয়েছে লন্ডনের বিখ্যাত প্রকাশনী ফোর্থ স্টেট থেকে। স্বাভাবিক বইয়ের আকারে ছাপানো হলে পঞ্চাশ পৃষ্টার বেশি হবে না। 

এই বইতে লেখক মিসোজিনি বা নারীবিদ্বেষ এর অনুকরণে মিস্যানড্রি (misandry) বা পুরুষবিদ্বেষ প্রতিষ্ঠা করার উপর খুব বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। পুরুষদের ঘৃণা করলেও তিনি পরিষ্কারভাবে বলেছেন, “We don’t injure or kill men, we don’t prevent them from getting a job or following whatever their passion is, or dressing as they wish, or walking down the street after dark, or expressing themselves however they see fit.” (পৃষ্ঠা ৩৮)। অর্থাৎ পুরুষদের প্রতি এই ঘৃণা পুরোপুরি অহিংস। এই ঘৃণার বশবর্তী হয়ে তিনি পুরুষদের আহত কিংবা নিহত করছেন না, চাকরি পেতে বাধা দিচ্ছেন না, স্বপ্নপূরণে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছেন না, পোশাক কিংবা চলন কিংবা বচন - কোথাও কোনো স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করছেন না। কেবল নির্ভেজাল ঘৃণাই করছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো তাতে কী অর্জিত হবে? পুরুষরা তাতে বদলে যাবে? বদলালেও তো ঘৃণ্য পুরুষই থাকবে! 

চাকরিক্ষেত্রে নারীদের প্রতি বৈষম্য এখনো অনেক ক্ষেত্রেই রয়ে গেছে। কিন্তু অনেক দেশেই এই বৈষম্য কমানোর ব্যাপারে কাজ চলছে। লেখকের নিজের দেশ ফ্রান্সে এই বৈষম্য উন্নয়নশীল অনেক দেশের পুরুষতান্ত্রিক সমাজ থেকে কম। তবুও তিনি তেমন কোন পরিসংখ্যানের উল্লেখ ছাড়াই দাবি করেছেন চাকরিক্ষেত্রে সব অযোগ্য মাঝারি মেধার শ্বেতাঙ্গ পুরুষরাই দখল করে আছে সবগুলি পদ। মেয়েরা যেখানে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে যোগ্য মনে না করলে দরখাস্তই করে না কোন চাকরিতে – সেখানে শ্বেতাঙ্গ পুরুষরা নিজের অযোগ্যতা নিয়েই নির্লজ্জভাবে চাকরি দখল করছে। এই ব্যাপারটা প্রমাণ করতে হলে নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান দরকার। যা এই বইয়ের কোথাও নেই। 


পলিন হামাঞ্জ


লেখক মনে করছেন নারী যে পুরুষকে ভালোবাসে, বিয়ে করে, পারস্পরিক শারীরিক আকর্ষণ – সবকিছুই একটা ফাঁদ। কিন্তু এই ফাঁদটি কে পেতেছে সে ব্যাপারে লেখক কোন প্রশ্ন করেন না। প্রকৃতি যদি এই ফাঁদ পেতে থাকে – প্রকৃতিও কি পুরুষ? পল ডোলানের ‘হ্যাপি এভার আফটার’ বইয়ের সূত্র ধরে লেখক দাবি করছেন যে নিসন্তান একা নারীরাই পৃথিবীতে সবচেয়ে সুখি। পৃথিবীর সব নারী কি এই কথা মেনে নেবেন? লেখক নিজের ব্যক্তিগত বিশ্বাস প্রায়ই অন্যদের নামে চালিয়ে দিয়েছেন বইয়ের সর্বত্র। এই বইটি নারীবাদকে কোনোভাবেই সাহায্য করবে বলে আমার মনে হয় না। 

ভালোবাসার চেয়ে ঘৃণার কাটতি যে বেশি তা আমরা সবাই জানি। কিন্তু এটা কোন সভ্য সমাজের কাঙ্খিত প্রতিফলন হতে পারে না। তবুও মেনে নিতে নিতে অবস্থা এমন হয়েছে যে এই অনাকাঙ্খিত ফলাফল দেখে আমাদের সভ্য-ভ্রু যতটা কুঞ্চিত হবার কথা, ততটা এখন আর হয় না। ভালোবাসা-ঘৃণা-আনন্দ-বেদনা-প্রেম-ঈর্ষা-মিলন-বিরহ এরকম যত মানবিক বোধ আছে সেগুলি নিয়েই মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্কের বীজ-চারা-বৃক্ষ-ডালপালা। সাহিত্যের মূল উপাদানই হলো মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্ক। সেখানে ঘৃণার স্থান যে একেবারে নেই – তা নয়। যে কোনো মানুষিক সমাজে যেখানে ভালোবাসায় বসতি – সেখানে নানা টানাপোড়েনে ঘৃণাও উঁকিঝুঁকি দেয়। কিন্তু প্রকাশ্যে কোনো একটি নির্দিষ্ট জাতির প্রতি উদ্যত ঘৃণার ঘোষণা – শিল্প-সাহিত্য কিংবা সভ্য সমাজের কোথাও গ্রহণযোগ্য নয়। নির্দ্বিধায় একটি জাতির সবাইকে ঘৃণা করার সদম্ভ-ঘোষণাকে মেনে নেয়াকে আর যাই হোক – সহনশীলতা বলা চলে না। কিন্তু বাকস্বাধীনতার সুযোগ নিয়ে যখন কেউ সরাসরি “I Hate Men” নামে বই লিখে পরিষ্কার ভাবে জানিয়ে দেন যে শুধুমাত্র পুরুষ হয়ে জন্ম নেয়ার কারণেই সব পুরুষই ঘৃণ্য – তখন কি মেনে নেয়া যায়? যদি মেনে নিতে হয় – তাহলে কাল কেউ যদি সরাসরি ধর্মভিত্তিক, বর্ণভিত্তিক ঘৃণা প্রকাশ করে তাও মেনে নিতে হবে। 

এই বইটির ঘৃণানির্দেশক নামই হলো এর বাণিজ্যিক সাফল্যের মাপকাঠি। ২০২০ সালে ফ্রান্সের ছোট্ট একটা প্রকাশনী থেকে বইটি যখন বের হয় ফরাসি ভাষায়, সাড়ে চারশ কপি ছাপানো হয়েছিল। ওগুলি বিক্রি করতে পারলেই প্রকাশক খুশি হয়ে যেতেন। কিন্তু কলকাঠি নড়লো অন্য জায়গা থেকে। বইয়ের আপত্তিকর শিরোনাম দেখে ফরাসি সরকারের লিঙ্গ-সমতা বিভাগ থেকে আপত্তি জানানো হলো। প্রকাশককে নোটিশ পাঠানো হলো যে এই বইয়ের নাম গ্রহণযোগ্য নয়। ফ্রান্সে সহজে কোন বই নিষিদ্ধ করা যায় না। কিন্তু প্রকাশক জানেন নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতিই মানুষের আকর্ষণ বেশি। তিনি প্রচার করে দিলেন যে বইটি নিষিদ্ধ হতে পারে। তাতেই বইয়ের কাটতি বেড়ে গেল। ধাঁই করে তিনি আড়াই হাজার কপি ছাপিয়ে ফেললেন। বিক্রি হয়ে গেল হু হু করে। ছোট্ট প্রকাশক এবার বইটি বড় প্রকাশককে দিয়ে দিলেন। ইংরেজিসহ আরো আঠারোটি ভাষায় অনুবাদ করা হলো। বিখ্যাত হয়ে গেলেন লেখক পলিন হামাঞ্জ। বক্তব্য সারবস্তু থাকুক না থাকুক, অন্তসারশূন্য বিতর্কের ঝড় তুলতে পারলেই তো হয়ে গেলো। এখানেও তাই হয়েছে। 

১১/৬/২০২৩


Wednesday, 24 May 2023

ট্রানজিস্টরের মহাগুরু - উইলিয়াম শকলি

 



একবিংশ শতাব্দীতে আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে রয়েছে প্রযুক্তি। যে আধুনিক প্রযুক্তি আমরা সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করছি – তা হলো তথ্যপ্রযুক্তি। আমাদের প্রায় সব কাজই এখন কোনো না কোনোভাবে কম্পিউটারনির্ভর। ১৯৪৫ সালে যখন প্রথম কম্পিউটার এনিয়াক (ENIAC – Electronic Numerical Integrator and Computer) তৈরি হয় – তখন তাতে ব্যবহার করা হয়েছিল হাজার হাজার ভ্যাকুয়াম টিউব। তখন একটি কম্পিউটারের জন্য জায়গা লাগতো কমপক্ষে ৫০ ফুট বাই ৩০ ফুট। সেই সময় কেউ ভাবতেও পারেনি যে একদিন কম্পিউটার চলে আসবে আক্ষরিক অর্থেই মানুষের হাতের মুঠোয়। আজ এই ২০২৩ সালে পৃথিবীর আট শ কোটি মানুষের হাতে রয়েছে চৌদ্দ শ কোটি স্মার্ট ফোন। ইলেকট্রনিকসের যে উদ্ভাবনের ফলে বিশাল শিল্প-বিপ্লব ঘটে গেছে পৃথিবীজুড়ে – তার মূলে আছে ট্রানজিস্টরের উদ্ভাবন। প্রযুক্তির ইতিহাসের সবচেয়ে উজ্জ্বল দিন হিসেবে চিহ্নিত করা হয় ১৯৪৭ সালের ১৬ ডিসেম্বর – যেদিন আমেরিকার বেল টেলিফোন ল্যাবরেটরিতে তৈরি হয়েছিল প্রথম ট্রানজিস্টর। 

এই ট্রানজিস্টর আবিষ্কারের জন্য ১৯৫৬ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার পান বেল ল্যাবরেটরির তিনজন বিজ্ঞানী – জন বার্ডিন, ওয়াল্টার ব্র্যাটেইন এবং উইলিয়াম শকলি। ট্রানজিস্টরের উদ্ভাবনকে বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভাবন হিসেবে চিহ্নিত করা হয় – কারণ তথ্যপ্রযুক্তির যে বিপুল উন্নতি আজ ঘটেছে পৃথিবীতে তার মূলে রয়েছে ট্রানজিস্টর। ট্রানজিস্টরকে ইলেকট্রনিক যুগের “নার্ভ সেল” বা স্নায়ুকোষের সাথে তুলনা করা হয় । উইলিয়াম শকলি বেল ল্যাবরেটরির রিসার্চ গ্রুপের প্রধান হওয়া সত্ত্বেও বার্ডিন ও ব্র্যাটেইনের কাজের সাথে সরাসরি যুক্ত ছিলেন না। ফলে বেল ল্যাবরেটরির প্রথম ট্রানজিস্টরের প্যাটেন্ট নেয়া হয়েছিল জন বার্ডিন ও ওয়াল্টার ব্র্যাটেইনের নামে। কিন্তু তাতে ভীষণ রেগে যান উইলিয়াম শকলি। তিনি নিজেই আরো উন্নত একটি ট্রানজিস্টরের প্যাটেন্ট নিয়ে প্রমাণ করেন যে বার্ডিন ও র‍্যাটেইন যদি ট্রানজিস্টরের গুরু হন, তাহলে শকলি হলেন ট্রানজিস্টরের মহাগুরু। এই উইলিয়াম শকলির হাতেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ট্রানজিস্টর তৈরির প্রথম কারখানা – যা পরবর্তীতে পথ দেখায় সিলিকন ভ্যালির। বিংশ শতাব্দীর প্রযুক্তির ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভাবকদের একজন হিসেবে উইলিয়াম শকলি একদিকে ছিলেন ভীষণ নন্দিত, আবার অন্যদিকে তাঁর ব্যক্তিগত উন্নাসিক স্বভাব আর সাম্প্রদায়িক বর্ণবাদী মনোভাবের কারণে হয়ে পড়েছিলেন ভীষণ নিন্দিত। আজকের কাহিনি উইলিয়াম শকলির কাহিনি। 

উইলিয়াম ব্র্যাডফোর্ড শকলির জন্ম ১৯১০ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাজ্যের লন্ডনে। তাঁর আমেরিকান বাবা-মা তখন কাজের সূত্রে লন্ডনে বাস করছিলেন। বাবা উইলিয়াম হিলম্যান শকলি ছিলেন মাইনিং ইঞ্জিনিয়ার, আর মা মে শকলি ছিলেন খনিজসম্পদ জরিপের প্রধান। মা-বাবা দু’জনই উচ্চশিক্ষিত এবং উচ্চপদে কর্মরত থাকার সুবাদে এবং একমাত্র সন্তান হওয়াতে ছোটবেলা থেকেই বিশেষ জ্ঞান এবং আভিজাত্যের ভেতর দিয়ে মানুষ হয়েছেন উইলিয়াম শকলি। তাঁর তিন বছর বয়সে ১৯১৩ সালে তিনি মা-বাবার সাথে ফিরে আসেন আমেরিকায় - ক্যালিফোর্নিয়ার পালো আল্টোয়। তাঁদের প্রতিবেশী ছিলেন স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির ফিজিক্সের প্রফেসর পার্লি রস। প্রফেসর রস শকলিকে খুবই স্নেহ করতেন। তাঁর প্রভাবেই শকলি ছোটবেলা থেকেই পদার্থবিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেন। 

শকলির মা-বাবা নিজেরাই বাড়িতে প্রাথমিক শিক্ষা দেন শকলিকে। তারপর তাকে ভর্তি করানো হয় পালো আল্টো মিলিটারি একাডেমিতে। এরপর হলিউড হাইস্কুলে। ১৯২৭ সালে স্কুল শেষ করে ভর্তি হলেন ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া লস এঞ্জেলেসে। এক বছর এখানে পড়ার পর চলে গেলেন ক্যালিফোর্নিয়া ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজি – ক্যালটেকে। সেখান থেকে পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন ১৯৩২ সালে। স্নাতকের রেজাল্টের ভিত্তিতে এমআইটির টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্টশিপ লাভ করেন শকলি। সোডিয়াম ক্লোরাইডের কৃস্টালে ইলেকট্রনের ওয়েভ ফাংশান সংক্রান্ত গবেষণা করে এমআইটি থেকে পদার্থবিজ্ঞানে পিএইচডি অর্জন করেন ১৯৩৬ সালে।

সলিড স্টেট ফিজিক্সে ভীষণ দক্ষতা ছিল শকলির। পিএইচডি লাভের সঙ্গে সঙ্গেই চাকরি পেয়ে গেলেন বেল টেলিফোন ল্যাবরেটরিতে। সেই সময় টেলিফোন প্রযুক্তি খুব একটা শক্তিশালী ছিল না। ট্রান্সমিটার ও রিসিভারে ব্যবহার করা হতো বড় বড় ভ্যাকুয়াম টিউব। টেলিফোনের তার দিয়ে হাজার দেড় হাজার কিলোমিটারের বেশি দূরত্বে শব্দ পাঠাতে গেলে শব্দের মান খুব কমে যেতো, নয়েজ বেড়ে গিয়ে আসল শব্দের কিছুই শোনা যেতো না। বেল টেলিফোন ল্যাবরেটরিতে উইলিয়াম শকলির প্রথম গবেষণা প্রকল্প হলো – আরো উন্নত মানের ভ্যাকুয়াম টিউব উদ্ভাবন করা যাদের সাহায্যে শব্দের প্রাবল্য বাড়ানো সম্ভব হবে।

সলিড স্টেট সেমিকন্ডাক্টরের তত্ত্বকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করলেন শকলি। কিন্তু তখনো জার্মেনিয়াম কিংবা সিলিকনের মতো সেমিকন্ডাক্টর সহজে ব্যবহারযোগ্য হয়ে ওঠেনি। ১৯৩৯ সালে শকলি ফিল্ড ইফেক্ট ট্রানজিস্টরের তত্ত্ব দেন এবং ল্যাবরেটরিতে তৈরি করার চেষ্টা করেন। তাঁর পরিকল্পনা ছিল ভ্যাকুয়াম টিউবের বদলে ট্রানজিস্টর ব্যবহার করে টেলিফোন সিস্টেমের ব্যাপক উন্নতি ঘটানো। কিন্তু সে পরিকল্পনা কার্যকর হবার আগেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বেল ল্যাবরেটরি আমেরিকান মিলিটারির হয়ে অনেকগুলি প্রজেক্টে গবেষণা করে। রাডারের যন্ত্রপাতির ইলেকট্রনিক ডিজাইনের দায়িত্ব পড়ে উইলিয়াম শকলির উপর। ১৯৪২ সালে তিনি আমেরিকান নৌবাহিনীর অ্যান্টিসাবমেরিন অপারেশান রিসার্চ গ্রুপের ডিরেক্টর নিযুক্ত হন। তাঁর তত্ত্বাবধানে আমেরিকান নৌবাহিনী সাবমেরিন ধ্বংস করার অনেক কার্যকর পদ্ধতি উদ্ভাবন করে। ১৯৪৪ থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়া পর্যন্ত তিনি আমেরিকান সরকারের যুদ্ধ বিশেষজ্ঞ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। উইলিয়াম শকলি নতুন নতুন যুদ্ধকৌশল উদ্ভাবন করে খুব আনন্দ পেতেন। 

যুদ্ধশেষে আবার বেল ল্যাবে ফিরে এলেন উইলিয়াম শকলি। ল্যাবের প্রেসিডেন্ট মারভিন কেলি সেমিকন্ডাক্টর ফিজিক্স ভালোভাবে বোঝার জন্য একটি রিসার্চ গ্রুপ তৈরি করলেন। ইলেকট্রনিক্সে সেমিকন্ডাক্টরের ব্যবহারের সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছিল তখন। সিলিকন ক্রিস্টালের অদ্ভুত কিছু ধর্ম সেই সময় আবিষ্কৃত হয়েছে। সেগুলির তত্ত্ব তখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। উইলিয়াম শকলি রিসার্চ গ্রুপের সুপারভাইজার নিযুক্ত হলেন। তিনি বেছে বেছে উদীয়মান পদার্থবিজ্ঞানীদের নিয়ে এলেন নিজের গ্রুপে। জন বার্ডিন, ওয়াল্টার ব্র্যাটেইন , জেরাল্ড পিয়ারসন, মরগান স্পার্কস – প্রমুখ তরুণ বিজ্ঞানীদের নিয়ে এসেছিলেন তিনি তাঁর রিসার্চ গ্রুপে। 

সলিড স্টেট ফিজিক্সে কোয়ান্টাম তত্ত্বের প্রয়োগ তখন শুরু হচ্ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় উইলিয়াম শকলি রাডারের ডিটেক্টর হিসেবে জার্মেনিয়াম ও সিলিকন পয়েন্ট কন্টাক্ট ডিটেক্টর ব্যবহার করেছিলেন। এবার তিনি একইভাবে ফিল্ড ইফেক্ট ট্রানজিস্টর উদ্ভাবন করার চেষ্টা করলেন। কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের হিসেব অনুসারে জার্মেনিয়াম ফিলামেন্টে বিদ্যুৎপ্রবাহ চালনা করলে ভ্যাকুয়াম টিউবের গ্রিডের মতো বিদ্যুৎ প্রবাহ নিয়ন্ত্রিত হবার কথা। কিন্তু উইলিয়াম শকলি পরীক্ষাগারে আশানুরূপ ফল পেলেন না। শুধু তাই নয়, কেন আশানুরূপ ফল পাচ্ছেন না তার কোন বিশ্বাসযোগ্য কারণও খুঁজে পেলেন না। 
 
শকলির পরীক্ষণের ব্যর্থতা থেকে  নতুন ধারণা পেলেন জন বার্ডিন। বার্ডিনের ব্যাখ্যা ছিল এরকম – জার্মেনিয়াম সেমিকন্ডাক্টরে বিদ্যুৎপ্রবাহ চালনা করলে এর উপরিতলে কিছু ইলেকট্রন আটকে থাকে। এই আটকে থাকা ইলেকট্রনের কারণে বিদ্যুৎক্ষেত্রের মধ্যে রাখলেও ইলেকট্রন আর সেমিকন্ডাক্টর ক্রিস্টালে প্রবেশ করতে পারে না। এই ধারণার সত্যতা পরীক্ষা করে দেখার জন্য অনেকগুলি পরীক্ষণ ডিজাইন করা হলো বেল ল্যাবে। জন বার্ডিন আর ওয়াল্টার ব্র্যাটেইন এই পরীক্ষণগুলি করলেও উইলিয়াম শকলি সরাসরি যুক্ত ছিলেন না। বার্ডিন ও ব্র্যাটেইন উদ্ভাবন করলেন প্রথম পয়েন্ট কন্টাক্ট ট্রানজিস্টর। 

উইলিয়াম শকলি যেমন প্রতিভাবান ছিলেন, তেমনি ভীষণ রকমের প্রশংসাপ্রিয় ছিলেন। যে কোনো কিছুতেই তিনি নিজের কৃতিত্ব দাবি করতেন। তাঁর রিসার্চ গ্রুপ থেকে প্রথম ট্রানজিস্টর উদ্ভাবিত হয়েছে – অথচ তার কৃতিত্বের ভাগ তিনি পাবেন না তা তিনি মেনে নিতে পারছিলেন না। ট্রানজিস্টরের প্যাটেন্ট বার্ডিন ও ব্র্যাটেইনের নামে হবার পর সেটার পরীক্ষামূলক ব্যবহার যখন শুরু হলো তখন উইলিয়াম শকলি উদ্ভাবন করলেন জাংশান ট্রানজিস্টর। সেই ট্রানজিস্টরের প্যাটেন্ট পেলেন তিনি। 

১৯৫০ সালে উইলিয়াম শকলি লিখলেন তাঁর প্রথম বই ‘ইলেকট্রনস অ্যান্ড হোল্‌স ইন সেমিকন্ডাক্টরস’। এই বইটি সেই সময়ের সলিড স্টেট গবেষকরা বাইবেলের মতো ব্যবহার করতেন। ১৯৫১ সাল থেকে শুরু হলো ট্রানজিস্টরের উৎপাদন। ইলেকট্রনিক্সের জগতে বিপ্লব শুরু হয়ে গেল। 

এই বিপ্লবের অন্যতম নায়ক উইলিয়াম শকলি তাতে সন্দেহ ছিল না কারোরই। নিত্যনতুন বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানী ধারণায় ভরপুর ছিলেন শকলি। প্রতি সপ্তাহে তিনি মিটিং ডেকে নতুন নতুন গবেষণার ফলাফল ঘোষণা করতেন। তিনি উৎসাহে টইটুম্বুর থাকতেন সবসময়।  উদ্ভাবক হিসেবে তিনি ছিলেন অসাধারণ। নব্বইটির বেশি প্যাটেন্ট লাভ করেছিলেন তিনি। ১৯৫১ সালে মাত্র ৪১ বছর বয়সে তিনি আমেরিকার ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্সের ফেলো মনোনীত হয়েছিলেন। তিনি ছিলেন সেই সময়ের সর্বকনিষ্ঠ ফেলো। 

গবেষণার বাইরে আরো অনেক বিষয়ে উৎসাহ ছিল তাঁর। জাদু দেখাতে পছন্দ করতেন, খাড়া দেয়াল বেয়ে উঠার নেশা ছিল তাঁর। প্রচন্ড বেগে গাড়ি চালাতেন। গাড়িতে পিস্তল রাখতেন। সিনেমা দেখতেন এবং নিজেকে সিনেমার নায়ক ভাবতেন। নিজের ব্যাপারে এতটাই উচ্চধারণা পোষণ করতেন যে, বেশিরভাগ সময়েই তিনি তাঁর অধীনস্তদের কোন মতামতের দাম দিতেন না। এ নিয়ে বেল ল্যাবের বিজ্ঞানীদের সাথে মনোমালিন্য শুরু হয়ে গেলে তাঁর পক্ষে আর বেল ল্যাবে থাকা সহজ হলো না। 

১৯৫৫ সালে উইলিয়াম শকলি স্ট্যানফোর্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কে স্থাপন করলেন নিজের কোম্পানি ‘শকলি সেমিকন্ডাক্টর ল্যাবরেটরিজ’। বেকম্যান ইন্সট্রমেন্ট কোম্পানি তাঁকে কারখানা স্থাপনের অর্থ জুগিয়েছিল। শকলির কোম্পানি ছিল পৃথিবীর প্রথম সেমিকন্ডাক্টর কোম্পানি। সেদিন কেউই ভাবতে পারেনি যে একদিন এই পথেই ঘটে যাবে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শিল্প-বিপ্লব, এখানেই গড়ে উঠবে সিলিকন ভ্যালি। শকলির পরিকল্পনা ছিল উন্নতমানের গবেষণার পাশাপাশি প্রচুর সিলিকন ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী উৎপাদন করা। ১৯৫৬ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার পাবার পর একেবারে প্রথম সারির বিজ্ঞানীদের দলে উঠে এলেন শকলি। তবুও শেষরক্ষা হলো না। 

শকলি যতটা দক্ষ বিজ্ঞানী ছিলেন, ততটাই অদক্ষ ব্যবসায়ী ছিলেন। তাঁর ব্যক্তিগত দুর্ব্যবহার ও অদক্ষতার কারণে কয়েক বছরের মধ্যেই তাঁর কোম্পানি থেকে তাঁর বেশিরভাগ বিজ্ঞানী বের হয়ে গেলেন। শকলির কোম্পানি থেকে বের হয়ে তাঁরা নিজেরা প্রতিষ্ঠা করলেন ফেয়ারচাইল্ড সেমিকন্ডাক্টর কোম্পানি। পরবর্তী বিশ বছরের মধ্যে এখান থেকেই তৈরি হয় ইন্টেল কর্পোরেশন, এডভান্সড মাইক্রো ডিভাইসেস (এ এম ডি) ইত্যাদি বিশাল শিল্পগোষ্ঠী। 

দক্ষ ইঞ্জিনিয়ারদের হারিয়ে উইলিয়াম শকলির পক্ষে আর কারখানা চালানো সম্ভব হলো না। কয়েক বছরের মধ্যেই কোম্পানি বন্ধ হয়ে গেল। ১৯৬৩ সালে উইলিয়াম শকলি স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে যোগ দিলেন ইঞ্জিনিয়ারিং-এর প্রফেসর হিসেবে। ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত তিনি সেখানে অধ্যাপনা করেছেন। 
কিন্তু তাঁর পেশাগত জীবনের শেষের দিকে তিনি বৈজ্ঞানিক গবেষণার বদলে তাঁর নিজস্ব কিছু উগ্র সাম্প্রদায়িক মতবাদ প্রতিষ্ঠার দিকে ঝুঁকে পড়লেন। তিনি বিশ্বাস করতেন মানুষের মেধা এবং সক্ষমতার জন্য পরিবেশ ও সুযোগের চেয়েও বেশি দায়ী জন্মগত উত্তরাধিকার। তিনি প্রকাশ্যে বলতে শুরু করেন – কৃষ্ণাঙ্গদের আই-কিউ অনেক কম, তারা আরো কম আই-কিউ সম্পন্ন শিশুর জন্ম দিচ্ছে। তাদেরকে সুযোগ সুবিধা দিলে সমাজের কোন উন্নতি হবে না, বরং সমাজ দ্রুত মেধাহীন হয়ে যাবে। 

তাঁর এরকম স্বভাবের কারণে দ্রুতই তিনি বন্ধুহীন হয়ে যেতে শুরু করলেন। তাঁর বৈজ্ঞানিক স্বীকৃতিগুলি ম্লান হয়ে যেতে লাগলো। ১৯৩৩ সালে তিনি বিয়ে করেছিলেন জিন বেইলিকে। দুই ছেলে ও এক মেয়ে তাঁদের। ১৯৫৫ সালে জিনকে ডিভোর্স দিয়ে তিনি আবার বিয়ে করেছিলেন এমি ল্যানিং-কে। জীবনের শেষের দিকে তাঁর ছেলেমেয়েরাও তাঁর সাথে ছিল না। কিন্তু যতই তিনি সমালোচিত হচ্ছিলেন ততই বেপরোয়া হয়ে উঠছিলেন। তাঁর সাম্প্রদায়িক মতবাদকে নাৎসিদের মতবাদের সাথে তুলনা করে ১৯৮০ সালে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল ‘আটলান্টা কনস্টিটিউশন’। শকলি এই পত্রিকার বিরুদ্ধে আদালতে সোয়া মিলিয়ন ডলারের ক্ষতিপূরণ দাবি করে মানহানির মামলা করেছিলেন। আদালত শকলির পক্ষে রায় দিয়ে মাত্র এক ডলার ক্ষতিপূরণ দেয়ার আদেশ দিয়েছিল। ১৯৮২ সালে তিনি ক্যালিফোর্নিয়ার সিনেটর হবার জন্য নির্বাচনে দাঁড়িয়ে আটজনের মধ্যে অষ্টম হয়েছিলেন। ১৯৮৯ সালের ১২ আগস্ট তাঁর মৃত্যু হয় ক্যালিফোর্নিয়ায় নিজের বাড়িতে একা। 


তথ্যসূত্র
১। জোয়েল এন শুরকিন, ব্রোকেন জিনিয়াস, পলগ্রেভ ম্যাকমিলান, লন্ডন ২০০৮।
২। বো লোজেক, হিস্ট্রি অব সেমিকন্ডাক্টর ইঞ্জিনিয়ারিং, স্প্রিঙ্গার, জার্মানি ২০০৭।
৩। রজার পিয়ারসন, শকলি অন ইউজেনিক্স অ্যান্ড রেইস, স্কট-টাউনসেন্ড পাবলিশার্স, ওয়াশিংটন ডিসি, ১৯৯২। 
৪। ওয়ার্ল্ড বুক্‌স বায়োগ্রাফিক্যাল এনসাইক্লোপিডিয়া অব সায়েন্টিস্টস, সপ্তম খন্ড, ওয়ার্ল্ড বুক, শিকাগো, ২০০৩। 
৫। www.nobelprize.org

--------------------

বিজ্ঞানচিন্তা মার্চ ২০২৩ সংখ্যায় প্রকাশিত





Saturday, 20 May 2023

বাবা - ৪

 


আমার বাবার সাথে তোলা এটাই আমার প্রথম ছবি। তখন আমি ক্লাস নাইনে উঠে গিয়েছি, দিদি অনার্সে পড়ে, দাদা এসএসসি দিয়েছে। চকবাজারে গুলজার সিনেমার পাশে স্টুডিও আলেয়ায় গিয়ে এই ছবি তোলা হয়েছিল। 

এর আগে আমি মোট তিনবার স্টুডিওতে ঢোকার সুযোগ পেয়েছিলাম। ক্লাস থ্রিতে ওঠার পর প্রথম শহরে এসেছিলাম। বাবা আমাদের তিন ভাইবোনকে নিয়ে গিয়েছিলেন শহর দেখাতে। লালদীঘির কাছে মুকুল স্টুডিওতে নিয়ে গিয়ে একটি ছবি তোলা হয়েছিল আমাদের তিন ভাইবোনের। ওটা ছিল আমার জীবনের প্রথম ছবি, কিন্তু আমার দাদা ও দিদির দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয়। তারা মা-বাবার সাথে প্রথম যে ছবিটি তুলেছিল তাতে আমি অদৃশ্য ছিলাম। তখন আমি ছিলাম আমার মায়ের গর্ভে। বলা বাহুল্য ওটা ছিল মায়ের সাথে তাদের প্রথম এবং শেষ ছবি। মায়ের সাথে ছবি তোলার কোন সুযোগ আমার হয়নি। মুকুল স্টুডিওতে আমরা তিন ভাইবোনের একটি ছবি তোলা হয়েছিল, কিন্তু বাবা কেন সেই ছবিতে যোগ দেননি আমি জানি না। পরে এটা বুঝতে পেরেছি যে একাধিক ছবি তোলাবার অর্থনৈতিক সামর্থ্য সেদিন আমার বাবার ছিল না। 

আমার দ্বিতীয়বার ছবি তোলা হয়েছিল ক্লাস সিক্সে ওঠার পর। ওটা ছিল একটা হাফ-ছবি, যেখানে শুধু মুখটা দেখা যায়। ক্লাস ফাইভে বৃত্তি পাওয়ার পর আমার বাবার শখ হয়েছিল ছেলের ছবি পত্রিকায় ছাপাবেন। তাই ছবি তোলা হয়েছিল। কিন্তু পত্রিকা অফিসে যাওয়ার পর ওরা যে পরিমাণ টাকা লাগবে বলেছিল – সেই পরিমাণ টাকা খরচ করার সামর্থ্য ছিল না মানুষটার। আমি বাবার সাথে ছিলাম। মাথা নিচু করে তিনি যখন আন্দরকিল্লার আজাদী অফিস থেকে বের হচ্ছিলেন, ক্লাস সিক্সে ওঠা আমি কেমন যেন নিজেকেই দায়ী ভাবছিলাম। সাধ আর সামর্থ্যের মধ্যে যে দ্বন্দ্ব চলে নিম্নবিত্ত সৎ মানুষদের – সেই দ্বন্দ্ব কোনদিনই ঘোচেনি আমার বাবার। 

আমার তৃতীয় ছবিটি তোলা হয় পটিয়ার একটি স্টুডিওতে। ক্লাস এইটের বৃত্তি পরীক্ষার পর। তখন দক্ষিণ চট্টগ্রামের সবগুলি স্কুলের বৃত্তিপরীক্ষার একটি মাত্র সেন্টার ছিল পটিয়া আবদুস সোবহান রাহাত আলি হাই স্কুলে। সেবারও বাবার সাথে আমার একটি ছবি তোলা যেতে পারতো। কিন্তু তোলা হয়নি। তার মাস ছয়েক পর তোলা হলো এই ছবিটি - আমরা তিনভাইবোনের সাথে বাবার প্রথম ছবি। 

এই ছবিটি চিকন একটি কাঠের ফ্রেমে বাঁধাই করে বাড়ির কার্ডবোর্ডের দেয়ালে টাঙানো হয়েছিল। সময়ের বিবর্তনে আমরা কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার জন্য বাড়ি ছেড়ে নানা জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছি। ছবিটি দেয়ালে থাকতে থাকতেই ঝাপসা থেকে ঝাপসাতর হয়ে গেছে। বাবার মৃত্যুর পর খেয়াল হলো ছবিটির আর কোন কপি নেই। বেশ কয়েকবছর পর বাবার অগোছানো কাগজপত্রের ভেতর পাওয়া গেল পুরনো ছবির নেগেটিভ।  তখন স্টুডিও থেকে নেগেটিভ দিয়ে দেয়া হতো, নাকি বাবা চেয়ে নিয়েছিলেন ঠিক জানি না। তবে নেগেটিভ পাওয়া গেল। যদিও বিভিন্ন জায়গায় কেমিক্যাল নষ্ট হয়ে গেছে। ডিজিটাল স্ক্যানারে নেগেটিভ থেকে ছবি প্রিন্ট করা কোন ব্যাপারই না এখন। 

আমার বাবা এই প্রযুক্তি দেখার সুযোগ পাননি। কিন্তু তাঁর নাতি-নাতনিরা ডিজিটাল যুগে জন্মেছে। এই ছবি তারা যতবারই দেখে, মন খারাপ করে ফেলে। একজন আবার বেশি নরম - “তোমাদের তো ভালো কোন জামাকাপড়ও ছিল না কাকু। ঠাকুরদার স্যান্ডেলও ছেঁড়া।“

একথা আমার কোনদিনই মনে হয়নি যে আমাদের ভালো জামাকাপড় ছিল না। সেদিন আমরা আমাদের সর্বোত্তম পোশাকে ছবি তুলতে গিয়েছিলাম স্টুডিওতে। আমার গায়ের শার্টটি স্কুল ড্রেসের শার্ট। ওটা ছাড়া আমার আরো একটি শার্ট ছিল। বাবার স্যান্ডেল কয়েক জায়গায় ছিঁড়ে গেলেও, বাবা বলতেন,এখন নতুন স্যান্ডেল কেনার দরকার নেই। টাকার টানাটানির কথা তিনি কোনদিনই স্বীকার করতেন না। মুচির কাছ থেকে সেলাই করিয়ে নিয়ে বাবা আরো কয় বছর সেগুলি পরেছিলেন এখন ঠিক মনে পড়ছে না। 


Tuesday, 16 May 2023

ন্যান্সি গ্রেস রোমান – মাদার অব হাবল

 




জেমস ওয়েব টেলিস্কোপের পর নাসার পরবর্তী বৃহৎ এবং উন্নততর স্পেস টেলিস্কোপ যা ২০২৭ সালে মহাকাশে প্রেরণ করা হবে ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জির খোঁজে – তার নাম রাখা হয়েছে ন্যান্সি গ্রেস রোমান স্পেস টেলিস্কোপ। ‘মাদার অব হাবল’ বা হাবলের মা হিসেবে পরিচিত ন্যান্সি রোমান ছিলেন নাসার প্রথম উচ্চপদস্থ নারী কর্মকর্তা। তিনি ছিলেন নাসার অ্যাস্ট্রোনমি প্রোগ্রামের প্রথম পরিচালক। তাঁর নেতৃ্ত্বেই হাবল টেলিস্কোপ কল্পনা থেকে বাস্তবে পরিণত হয়। 


হাবল টেলিস্কোপের প্রাথমিক মডেল হাতে ন্যান্সি রোমান


ন্যান্সি রোমানের জন্ম ১৯২৫ সালের ১৬মে আমেরিকার টেনেসি রাজ্যের ন্যাশভিলে। তাঁর বাবা ইরভিন রোমান ছিলেন পদার্থবিজ্ঞানী, এবং মা জর্জিয়া রোমান ছিলেন সঙ্গীত শিক্ষক। ছোটবেলা থেকেই গণিত আর পদার্থবিজ্ঞানের প্রতি ন্যান্সির আকর্ষণ জন্মানোর পেছনে তাঁর বাবার ভূমিকা স্পষ্ট। ন্যান্সি এগারো বছর বয়সেই জ্যোতির্বিজ্ঞানী হবার লক্ষ্য স্থির করে ফেলেছিলেন। এগারো বছর বয়সেই সহপাঠীদের নিয়ে অ্যাস্ট্রোনমি ক্লাব গঠন করে প্রতি সপ্তাহে নিয়মিত বিজ্ঞানসভা করতো ন্যান্সি। ১৯৪৬ সালে পেনসিল্ভেনিয়ার সোয়ার্থমোর কলেজ থেকে অ্যাস্ট্রোনমিতে বিএ ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৪৯ সালে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অ্যাস্ট্রোনমিতে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন ন্যান্সি। এরপর শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের পোস্টডক্টরেট ফেলো হিসেবে পরবর্তী ছয় বছর কাজ করেন উইসকনসিনের ইয়ার্কিজ অবজারভেটরিতে। এই সময় তিনি বাইনারি স্টার – এজি ড্রাকোনিস পর্যবেক্ষণ করেন এবং লক্ষ্য করেন যে এই নক্ষত্রের আগের পর্যবেক্ষণে যে বর্ণালী পাওয়া গিয়েছিল – সেই বর্ণালীর ধরন বদলে গেছে। এই পর্যবেক্ষণ থেকে বাইনারি নক্ষত্রের ধর্মাবলী নিরূপণ অনেক নির্ভুল হয়েছে। 

১৯৫৫ থেকে ১৯৫৯ পর্যন্ত তিনি ন্যাভাল রিসার্চ ল্যাবরেটরিতে গবেষণা করার সময় রেডিও- অ্যাস্ট্রোনমি সংক্রান্ত কাজে দক্ষতা অর্জন করেন। ১৯৫৮ সালের মাঝামাঝি আমেরিকান মহাকাশসংস্থা নাসা প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৫৯ সালের শুরুতে নাসায় যোগ দেন ন্যান্সি রোমান।  অ্যাস্ট্রোনমি প্রোগ্রামের প্রধানের দায়িত্ব নেয়ার মাধ্যমে তিনি হলেন নাসার প্রথম নারী এক্সিকিউটিভ। পরবর্তীতে তিনি নাসার সোলার ফিজিক্স প্রোগ্রামের চিফ এবং রিলেটিভিটি প্রোগ্রামেরও চিফ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। 


নাসায় চিফ ন্যান্সি রোমান


ইউএস কংগ্রেস থেকে হাবল স্পেস টেলিস্কোপের অনুমোদন আদায় করার কৃতিত্ব ন্যান্সি রোমানের। তাঁর হাত দিয়েই হাবল টেলিস্কোপ প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। সেজন্যই তাঁকে মাদার অব হাবল বিশেষণে সম্মানিত করা হয়। 

মহাকাশের কোন আবিষ্কারকে সবচেয়ে গুরুত্ব দেবেন – এই প্রশ্নের উত্তরে ন্যান্সি বলেছিলেন – ডার্ক এনার্জি। জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের পর নাসার পরবর্তী বৃহৎ টেলিস্কোপের নাম দেয়া হয়েছে ন্যান্সি রোমান স্পেস টেলিস্কোপ যা মহাবিশ্বের ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জির খোঁজ করবে। 


ন্যান্সি রোমান (২০১৫)


২০১৮ সালের ২৫ ডিসেম্বর ৯৩ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন ন্যান্সি রোমান। 


ইনজি লেমান – পৃথিবীর প্রথম ভূপদার্থবিজ্ঞানী

 


ভূমিকম্পের পূর্বাভাস এখনো সঠিকভাবে দেয়া সম্ভব না হলেও, কী কারণে ভূমিকম্প হয় তা আজ আমরা জানি। পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ গঠন সঠিকভাবে জানার পর ভূমিকম্পের সঠিক কারণ খুঁজে বের করা সহজ হয়েছে। পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ পদার্থবিজ্ঞানিক কাজকর্ম নিয়ে জিওফিজিক্স বা ভূপদার্থবিজ্ঞান নামে পদার্থবিজ্ঞানের যে আলাদা একটি শাখা তৈরি হয়েছে, তার প্রধান স্থপতি ছিলেন একজন নারী পদার্থবিজ্ঞানী – ইন্‌জি লেমান (Inge Lehmann)। তিনি ছিলেন পৃথিবীর প্রথম ভূপদার্থবিজ্ঞানী। পৃথিবীর কেন্দ্রে যে কঠিন ধাতব গোলক আছে তার বাইরে একটি তরল স্তরের অস্তিত্ব যে থাকতেই হবে – সেটা প্রথম দাবি করেছিলেন ইন্‌জি লেমান। তাঁর নামানুসারে সেই স্তরের নাম দেয়া হয়েছে লেমান ডিসকন্টিনিউটি। 

ইন্‌জি লেমানের জন্ম ১৮৮৮ সালের ১৩মে ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে। ইন্‌জির বাবা আলফ্রেড জর্জ লুদভিগ লেমান ছিলেন মনোবিজ্ঞানী, মা আইডা ছিলেন গৃহবধু। সেইসময় পৃথিবীজুড়ে মেয়েদের লেখাপড়াকে তেমন কোন উৎসাহ বা গুরুত্ব দেয়া না হলেও ইওরোপের কিছু কিছু স্কুলে মেয়েদের শিক্ষাকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হতো। ডেনমার্কে এরকম একটি স্কুলে লেখাপড়া করেছিলেন ইন্‌জি। সেই স্কুলের প্রধান ছিলেন হানা এডলার – যিনি ছিলেন পদার্থবিজ্ঞানী নিল্‌স বোরের খালা। ইন্‌জির লেখাপড়া এবং গবেষণায় সবচেয়ে বেশি প্রভাব রেখেছিলেন যে দু’জন মানুষ তাঁরা ছিলেন - তাঁর বাবা এবং শিক্ষক হানা এডলার। 

স্কুলের পরীক্ষায় সর্বোচ্চ র‍্যাংক নিয়ে ১৯০৭ সালে  কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেন ইন্‌জি। গণিত, রসায়ন ও পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে স্নাতক পর্যায়ের পড়াশোনা শুরু করলেও – তাঁর শারীরিক অবস্থা ছিল খুবই দুর্বল। কেমব্রিজে গেলে কিছুটা ভালো থাকবেন এই আশায় ১৯১০ সালে কেমব্রিজের নিউন্যাম কলেজে গেলেন গণিত নিয়ে পড়তে। কিন্তু বছরখানেক পরেই তাঁকে ফিরে আসতে হলো শারীরিক দুর্বলতার কারণে। কোপেনহেগেনে ফিরে এসেও লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হলো না। একটা ইন্সুরেন্স কোম্পানিতে কেরানির চাকরি নিলেন। সেখানে কাজ করলেন ১৯১৮ সাল পর্যন্ত। এই সাত বছরে তিনি ইন্সুরেন্সের কাজ করতে করতে গাণিতিক হিসেবে বেশ দক্ষতা অর্জন করেছেন। শরীর কিছুটা সুস্থ হলে ত্রিশ বছর বয়সে আবার লেখাপড়া শুরু করলেন কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ে। বত্রিশ বছর বয়সে গণিত ও ভৌতবিজ্ঞানে স্নাতক পর্যায়ের একটি ডিগ্রি লাভ করলেন। 

এরপর পাঁচ বছর কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত ও পরিসংখ্যানের অধ্যাপক জোহান স্টিফেনসেনের সহকারি হিসেবে কাজ করার পর ডেনিশ গণিতজ্ঞ নিলস এরিক নুরলুন্ডের সহকারি হিসেবে কাজ শুরু করলেন ১৯২৫ সালে। প্রফেসর নুরলুন্ড মাধ্যাকর্ষণের সাথে পৃথিবীর ঘূর্ণন এবং অন্যান্য জ্যামিতিক হিসেবের গবেষণা করছিলেন – যাকে বলা হয় জিওডেসি। ভূমিকম্পের ডাটা বিশ্লেষণ করে তাদের সাথে পৃথিবীর অন্যান্য আনুসঙ্গিক পরিবর্তনের ডাটার সম্পর্ক নির্ণয় ছিল ইন্‌জির প্রধান কাজ। এই কাজ করতে করতেই ১৯২৮ সালে চল্লিশ বছর বয়সে ইন্‌জি স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করলেন। প্রফেসর নুরলুন্ডের নেতৃত্বে ডেনমার্কে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে জিওডেসিক ইন্সটিটিউট। ইন্‌জি সেই প্রতিষ্ঠানে ভূমিকম্পবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান হিসেবে যোগ দিলেন। 

১৯৩৬ সালে ইন্‌জি লেমান সর্বপ্রথম ভূমিকম্পের প্রাইমারি ওয়েভ বা পি-ওয়েভের সঠিক বৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যা করেন। তিনি সঠিকভাবে প্রমাণ দেন যে পৃথিবীর কেন্দ্রের কঠিন ধাতব গোলকের বাইরে একটি নমনীয় স্তর আছে। ১৯২৯ সালে নিউজিল্যান্ডে ৭ দশমিক ৩ মাত্রার ভয়াবহ ভূমিকম্প হয়েছিল। সেই ভূমিকম্পের হাজার হাজার ডাটা বিশ্লেষণ করে পি-ওয়েভের বৈশিষ্ট্য এবং সেখান থেকে পৃথিবীর গঠনের অভ্রান্ত প্রমাণ দিয়েছিলেন ইন্‌জি কোন ধরনের কম্পিউটারের সাহায্য ছাড়াই। সে সময় কম্পিউটারের অস্তিত্ব ছিল না। ১৯৭১ সালে সর্বপ্রথম কম্পিউটারের সাহায্যে আধুনিক পদ্ধতিতে ডাটা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে ইন্‌জির হিসেব ছিল নির্ভুল। 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানি ডেনমার্ক দখল করে নেয়। ইন্‌জির গবেষণা ধরতে গেলে বন্ধই ছিল সেই সময়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তিনি আবার গবেষণা শুরু করেন। একটি ইন্সটিটিউটের প্রধান হওয়া সত্ত্বেও, জিওফিজিক্যাল সোসাইটির দু’বার নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হওয়া সত্ত্বেও ইউনিভার্সিটির প্রফেসর হতে পারেননি ইন্‌জি লেমান শুধুমাত্র নারী হবার কারণে। 

১৯৫৩ সালে ৬৫ বছর বয়সে ইন্সটিটিউট থেকে অবসর গ্রহণ করলেন ইন্‌জি। তারপর বেশ কয়েক বছর তিনি আমেরিকায় গিয়ে গবেষণা করেছেন। ১৯৬৯ সালে তিনি রয়েল সোসাইটির ফেলোশিপ পান। 

ছোটবেলা থেকে শুরু করে সারাজীবনই ইন্‌জি ছিলেন প্রচন্ড লাজুক, নিজের মনে একা থাকতেই পছন্দ করতেন। প্রাতিষ্ঠানিক সহকর্মী ছাড়া ব্যক্তিগত কোন বন্ধুত্ব তিনি তৈরি করেননি কারো সাথে। ১০৪ বছর বেঁচেছিলেন তিনি – মূলত একাই। ১৯৯৩ সালের ২১ফেব্রুয়ারি তাঁর মৃত্যু হয়। 


নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী ডরোথি হজকিন

 


ছবির মানুষটির হাতের আঙুলগুলির দিকে তাকান। বয়সের কারণে তাঁর হাত-পায়ের আঙুল এভাবে বেঁকে যায়নি, একুশ-বাইশ বছর বয়সেই তিনি আক্রান্ত হয়েছেন ক্রনিক রিউম্যাটয়েড আর্থাইটিসে। তখন থেকেই হাত-পায়ের আঙুলে প্রচন্ডরকমের ব্যথা ও ক্রমশ বেঁকে যাওয়াকে সহ্য করতে হয়েছে তাঁকে আমৃত্যু। এরকম ব্যথা আর কুঁকড়ে যাওয়া হাত-পা নিয়েই তিনি ক্রমাগত গবেষণা করেছেন। এই মানুষটি ডরোথি ক্রোফুট হজকিন। যিনি এক্স-রে কৃস্টালোগ্রাফি প্রয়োগ করে আবিষ্কার করেছেন

Thursday, 11 May 2023

রিচার্ড ফাইনম্যান

 


১১মে রিচার্ড ফাইনম্যানের জন্মদিন। ১৯১৮ সালের ১১ মে নিউ ইয়র্কে জন্মগ্রহণ করেন বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে ডায়নামিক পদার্থবিজ্ঞানী রিচার্ড ফাইনম্যান। এম-আই-টি থেকে বিএসসি ডিগ্রি পান ১৯৩৯ সালে। প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি ১৯৪২ সালে। কর্নেল ইউনিভার্সিটিতে তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক ছিলেন ১৯৪৫ থেকে ১৯৫০ পর্যন্ত। তারপর ১৯৫০ থেকে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ক্যালটেকে অধ্যাপনা করেছেন। কোয়ান্টাম ইলেকট্রো-ডায়নামিক্স এর অন্যতম জনক তিনি। ১৯৬৫ সালে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন যে কাজের জন্য - মাত্র তেইশ বছর বয়সেই সে কাজের সূত্রপাত। পৃথিবীর প্রথম পারমাণবিক প্রকল্প - ম্যানহাটান প্রজেক্টের হিউম্যান-কম্পিউটার হিসেবে কাজ করেছেন ফাইনম্যান। যে ন্যানো-টেকনোলজির প্রয়োগ এখন ওষুধ থেকে শুরু করে জীবনের হাজারো ক্ষেত্রে সেই ন্যানো-টেকনোলজির প্রাথমিক ধারণার উৎপত্তি ফাইনম্যানের হাতে। মৌলিক কণার কার্যকলাপ বোঝার জন্য ফাইনম্যান-ডায়াগ্রাম সবচেয়ে কার্যকরী পদ্ধতি। পদার্থবিজ্ঞানের এমন কোন শাখা নেই যেখানে ফাইনম্যান উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেননি। পদার্থবিজ্ঞানের জগতে ফাইনম্যানের মত এমন ভালো শিক্ষক আর কখনো পাওয়া যাবে কি না সন্দেহ। পদার্থবিজ্ঞানের সবচেয়ে ক্লাসিক টেক্সট বইয়ের নাম ‘ফাইনম্যান লেকচার অন ফিজিক্স’ যা রচিত হয়েছে তাঁর ক্যালটেকের ক্লাসরুমে দেয়া লেকচারগুলো থেকে। আইনস্টাইনের পরে ফাইনম্যানই ছিলেন বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে সৃষ্টিশীল বহুমাত্রিক পদার্থবিজ্ঞানী। ১৯৮৮ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি মৃত্যু হয় ফাইনম্যানের।

রিচার্ড ফাইনম্যানের এই সংক্ষিপ্ত জীবনকথা আজ আমরা সবাই জানি। এখন যারা বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞান পড়ছে, আমি জানি তাদের মধ্যে রিচার্ড ফাইনম্যানের নাম শোনেনি এমন একজনও নেই। তাদের মধ্যে অনেকেই ‘ফাইনম্যান লেকচার অন ফিজিক্স’ পড়ে ফিজিক্স শিখছে। আমার অনুজা সতীর্থ আশরাফি নিতু রিচার্ড ফাইনম্যানের ‘সিক্স ইজি পিসেস’ অনুবাদ করে প্রকাশ করেছে তার ছাত্রাবস্থায়। আরেক অনুজ উচ্ছ্বাস তৌসিফও স্বতন্ত্রভাবে অনুবাদ করেছে এই বই। অনেকগুলি মুদ্রণ হয়েছে এই বইয়ের। বাংলা ভাষায় রিচার্ড ফাইনম্যানের অন্যান্য বইও অনুদিত হচ্ছে। রিচার্ড ফাইনম্যান বাংলাদেশেও এখন খুবই জনপ্রিয়। 

কিন্তু আমার অনুজ সতীর্থদের কাছে এখন অবিশ্বাস্য শোনালেও সত্যি যে আমাদের সময়ে আমাদের শিক্ষকরা একবারও রিচার্ড ফাইনম্যানের নাম উচ্চারণ করেননি আমাদের ক্লাসে। রিচার্ড ফাইনম্যানের বই এবং কাজের সাথে আমার প্রথম পরিচয় ঘটে দেশের বাইরে পড়তে এসে। ফাইনম্যানের আশ্চর্য বিজ্ঞান ও ব্যক্তিত্বে যতই মুগ্ধ হয়েছি – ততই আফসোস হয়েছে – আগে কেন জানিনি তাঁর সম্পর্কে। কেমন যেন একটা ক্ষোভ জন্মেছিল। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা সেই সময় সিলেবাসের বাইরে অনেক কথা বলতেন – সেগুলির বেশিরভাগই ছিল হয় রাজনীতি, নয় ধর্ম সম্পর্কে। অথচ বিজ্ঞানীদের কাজকর্ম সম্পর্কে ধরতে গেলে কিছুই থাকতো না। সবচেয়ে আক্ষেপের বিষয় হচ্ছে – আমরা যখন ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হই, ফাইনম্যান তখনো বেঁচে ছিলেন। সেকেন্ড ইয়ারে ওঠার আগেই তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যুর খবরও কোন গুরুত্ব পায়নি আমাদের ডিপার্টমেন্টের কারো কাছে। তখন হয়তো যোগাযোগের এত সুবিধা ছিল না। তাই এখনকার শিক্ষার্থীদের প্রতি আমার কিছুটা ঈর্ষাও কাজ করে – কত্তো বেশি জানার সুযোগ এখন তাদের আছে!

কিন্তু এখন যখন দেখি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার পুরোটাই তথ্য এবং তত্ত্ব মুখস্থ করার শিকলে আবদ্ধ হয়ে গেছে খুবই কষ্ট লাগে। আধুনিক প্রযুক্তির কী সাংঘাতিক অপচয় ঘটছে সেখানে। পদার্থবিজ্ঞানের জটিল সমীকরণগুলি, ধ্রুবকগুলির মান এখনো পরীক্ষায় মুখস্থ লিখতে হয়। অথচ তথ্য মুখস্থ করার মধ্যে যে কোন বিজ্ঞান তো দূরের কথা – জ্ঞানই অর্জিত হয় না – তা ফাইনম্যান নিজের ছোটবেলার অভিজ্ঞতার উদাহরণ দিয়ে লিখে গেছেন। 

The making of a scientist প্রবন্ধে তিনি লিখেছেন, “আমার বাবা পাখি সম্পর্কে আমাকে অনেক কিছু শিখিয়েছেন। তিনি বলেছেন- “দেখেছো পাখিটা? এটা হলো স্পেন্সার’স ওয়ার্বলার”। আমি জানতাম যে পাখিটার আসল নাম তিনি জানেন না। বাবা বললেন- “ইতালিয়ান ভাষায় এটা হলো ছুট্টু ল্যাপিটিডা। পর্তুগিজ ভাষায় বম ডা পেইডা। চায়নিজরা বলে চুং-লং-তা। জাপানিরা বলে কাতানো তেকেদা। এভাবে পৃথিবীর সবগুলো ভাষায় তুমি এই পাখিটার নাম জানতে পারো। কিন্তু এই নাম মুখস্ত করা যখন শেষ হবে - তখন? দেখবে পাখিটা সম্পর্কে তুমি কিছুই জানো না। তুমি আসলে জেনেছো পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মানুষ পাখিটাকে কী নামে ডাকে।“

আজ ফাইনম্যানের জন্মদিনে আশা করছি – অদূর ভবিষ্যতে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার খোলনলচে বদলে যাবে। আমাদের দেশেও ফাইনম্যানের মতো বিজ্ঞানী তৈরি হবার পরিবেশ সৃষ্টি হবে। 


প্রকৃতিবিদ ডেভিড অ্যাটেনবরো

 


প্রকৃতি এবং প্রকৃতির প্রাণিদের বিচিত্র জগতের সাথে আমাদের পরিচয় ঘটানোর ক্ষেত্রে স্যার ডেভিড অ্যাটেনবরো শুধু পথিকৃতই নন, এই ৯৭ বছর বয়সেও এক্ষেত্রে তাঁর সমকক্ষ কেউ নেই। ব্রিটিশ প্রকৃতিবিদ এবং টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব ডেভিড অ্যাটেনবরোর জন্ম ১৯২৬ সালের ৮মে লন্ডনে। তাঁর বাবা ফ্রেডেরিক অ্যাটেনবরো ছিলেন লেস্টার ইউনিভার্সিটি কলেজের প্রিন্সিপাল। ফ্রেডেরিক ও মেরি আটেনবরোর তিন পুত্রের মধ্যে দ্বিতীয় পুত্র ডেভিড। ডেভিডের বড়ভাই রিচার্ড অ্যাটেনবরো ছিলেন নামকরা চিত্রাভিনেতা এবং পরিচালক। ছোটভাই জন অ্যাটেনবরো ছিলেন ইতালিয়ান আলফা রোমিও গাড়িপ্রস্তুতকারক সংস্থার ব্রিটিশ অফিসের হেড। 

ডেভিড অ্যাটেনবরো কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লেয়ার কলেজ থেকে প্রাণিবিজ্ঞান ও ভূতত্ত্ববিজ্ঞানে মাস্টার্স ডিগ্রি লাভ করেন ১৯৪৭ সালে। ১৯৪৭ থেকে ১৯৪৯ পর্যন্ত তিনি ব্রিটিশ রয়েল নেভিতে ছিলেন এবং ল্যাফটেন্যান্ট র‍্যাংক পাবার পর নৌবাহিনী থেকে চলে আসেন। ১৯৪৯ থেকে ১৯৫২ পর্যন্ত তিনি কাজ করেন একটি প্রকাশনা সংস্থায় সহকারি সম্পাদক হিসেবে। ১৯৫২ সালে তিনি বিবিসি টেলিভিশনে যোগ দেন শিক্ষানবিস প্রযোজক হিসেবে। 

১৯৫৪ সালে তিনি শুরু করেন বন্য প্রাণিদের নিয়ে প্রথম তথ্যচিত্র ‘জু কোয়েস্ট’। পশ্চিম আফ্রিকার বন্যপ্রাণিদের নিয়ে কাজ শুরু। তারপর একের পর এক তথ্যচিত্র নির্মাণ করে গেছেন পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে নিরলসভাবে। ১৯৫৪ থেকে ১৯৬৪ পর্যন্ত দশ বছরে ৪৮টি পর্ব প্রচারিত হয় – জু কোয়েস্টের। ১৯৬৫ থেকে ১৯৭২ পর্যন্ত বিবিসি টেলিভিশনের উচ্চপর্যায়ের প্রশাসনের দায়িত্বে ছিলেন ডেভিড অ্যাটেনবরো। তারপর তিনি বিবিসি থেকে পদত্যাগ করে স্বাধীনভাবে তথ্যচিত্র তৈরি এবং লেখায় মনোনিবেশ করেন। ১৯৭৫ সালে তিনি আদিবাসিদের নিয়ে সাত পর্বের তথ্যচিত্র ‘দ্য ট্রাইবাল আই’ তৈরি করে। ১৯৭৬ থেকে ১৯৭৯ সালের মধ্যে তিনি তৈরি করেন ‘লাইফ অন আর্থ’। পৃথিবীর উদ্ভবের পর থেকে উদ্ভিদ, প্রাণিকুল, মানুষ কীভাবে বিবর্তিত হতে হতে বর্তমান রূপ লাভ করেছে – তার চাক্ষুষ প্রমাণ তিনি হাজির করেন তেরো পর্বের এই তথ্যচিত্রে। এরপর ১৯৮৪ সালে ‘দ্য লিভিং প্ল্যানেট’, ১৯৯০ সালে ‘দ্য ট্রায়ালস অব লাইফ’, ১৯৯৫ সালে ‘দ্য প্রাইভেট লাইফ অব প্ল্যান্টস’, ১৯৯৮ সালে ‘দ্য লাইফ অব বার্ডস’, ২০০২ সালে ‘দ্য লাইফ ব ম্যামালস’, ২০০৫ সালে ‘লাইফ ইন দি আন্ডারগ্রাউন্ড’, ২০০৭ সালে ‘লাইফ ইন কোল্ড ব্লাড’। শুধু তথ্যচিত্র নয়, অনেকগুলি প্রামাণ্য বই তিনি লিখেছেন – যেগুলি পরিবেশ ও প্রাণিবিজ্ঞানকে এগিয়ে নিয়ে গেছে অনেকদূর। 


এই ছবিটি ২০১৫ সালের মার্চ মাসে তোলা। ইউনিভার্সিটি অব অক্সফোর্ড স্টিফেন হকিং ও ডেভিড অ্যাটেনবরোকে ‘বডলি মেডেল’ প্রদান করে বিজ্ঞান ও সাহিত্যে অসাধারণ অবদানের জন্য। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির লাইব্রেরিয়ান রিচার্ড ওভেনডেন হকিং ও অ্যাটেনবরোর হাতে এই পুরষ্কার তুলে দিয়েছিলেন। 


এই সাতানব্বই বছর বয়সেও তিনি সক্রিয়। আজীবন কাজ করে গেছেন এই পৃথিবীর পরিবেশ রক্ষায় এবং পৃথিবীকে কীভাবে আরো সুন্দর করা যায় এই চেষ্টায়। সাধারণ মানুষকে বিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহী করে তুলতে অবদান রাখার জন্য ২০০৩ সালে তিনি পেয়েছেন রয়েল সোসাইটির ‘মাইকেল ফ্যারাডে পুরষ্কার’। ডেভিড অ্যাটেনবরো হলেন এখনো পর্যন্ত একমাত্র ব্যক্তি যিনি ব্রিটিশ একাডেমির টেলিভিশন পুরষ্কার পেয়েছেন টেলিভিশন মাধ্যমের শুরু থেকে এপর্যন্ত কারিগরি উন্নতির সবগুলি ধাপে – সাদা-কালো, রঙিন, হাই-ডেফিনেশান, থ্রি-ডি এবং ফোর-কে সব রেজ্যুলেশনে। তিন বার ‘এমি অ্যাওয়ার্ড’ তিনি তথ্যচিত্রে অতুলনীয় ধারাবর্ণনার জন্য। 

আজ ৮মে এই মানুষটির ৯৭তম জন্মদিন। 

শুভ জন্মদিন স্যার ডেভিড অ্যাটেনবরো। 


Latest Post

চাঁদের নাম লুনা - দ্বিতীয় পর্ব

  প্রাচীন চাঁদ প্রাচীন বিশ্বাস আমার দাদুর কাছে ছোটবেলায় চাঁদের যে গল্প শুনেছি তোমরাও হয়তো শুনেছো। অনেক অনেক বছর আগে এক বুড়ি ছিল। বুড়ির একটি ...

Popular Posts