Monday, 15 March 2021

সবার জন্য স্যাটেলাইট - পর্ব ৩

 



তৃতীয় অধ্যায়

ইন্টারন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশান ইউনিয়ন

 

মানুষের বিবর্তনের সাথে সাথে যোগাযোগ ব্যবস্থারও বিবর্তন ঘটছে যুগে যুগে। মাত্র দু'শ বছর আগেও এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় কোন খবর পাঠানোর দ্রুততম মাধ্যম ছিল অশ্বারোহী দূত। উনবিংশ শতাব্দীতে বিদ্যুৎ নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা যখন শুরু হলো - তখন বৈদ্যুতিক উপায়ে সংকেত পাঠানোর ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে উঠেছিলেন ইওরোপের বিজ্ঞানীরা।

          ১৮৩৯ সালে লন্ডনে পৃথিবীর সর্বপ্রথম বাণিজ্যিক টেলিগ্রাফ সার্ভিস চালু হয়। ১৮৪৪ সালে আমেরিকার স্যামুয়েল মোর্স নিজের উদ্ভাবিত কোডের সাহায্যে প্রথম টেলিগ্রাফ ম্যাসেজ পাঠান। ক্রমেই টেলিগ্রাফ হয়ে ওঠে যোগাযোগের দ্রুততম মাধ্যম। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে তখন টেলিগ্রাফের তার লাগানো শুরু হয়। ১৮৫০ সালে ব্রিটেন ও ফ্রান্সের মধ্যে সাগরের নিচ দিয়ে টেলিগ্রাফের তার সংযোগ স্থাপিত হয়। ১৮৫৮ সালে ইংল্যান্ড ও আমেরিকার মধ্যে প্রথম ট্রান্স-আটলান্টিক টেলিগ্রাফ তার সংযোগ দেয়া হয়। এক মহাদেশ থেকে অন্য মহাদেশে টেলিগ্রাফ পাঠানো সহজ হয়ে যায়। কিন্তু তাতে কিছু রাজনৈতিক সমস্যা শুরু হয়।

          এক দেশ থেকে অন্য দেশে টেলিগ্রাফ যাওয়ার সময় কোন গোপনীয় তথ্য পাচার করা হচ্ছে কি না দেখার জন্য নিয়ম করা হয় যে যখন যে দেশের উপর দিয়ে টেলিগ্রাফ যাবে - সেই দেশে টেলিগ্রাফের তথ্যগুলো অনুবাদ করা হবে এবং তারপর যাচাই করার পর টেলিগ্রাফ যেতে দেয়া হবে পরবর্তী গন্তব্যে। এতে টেলিগ্রাফ পৌঁছাতে অনেক দেরি হয়ে যায়। এই সমস্যা থেকে মুক্তি পাবার লক্ষ্যে সমমনা দেশগুলোর মধ্যে সমঝোতা চুক্তি করা হয়। ইওরোপের বিশটি দেশ ১৮৬৫ সালের ১৭ মে প্যারিসে ইন্টারন্যাশনাল টেলিগ্রাফ কনফারেন্সে মিলিত হয়ে সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর করে। সেদিনই গঠিত হয় ইন্টারন্যাশনাল টেলিগ্রাফ ইউনিয়ন (আই-টি-ইউ)।[1] ১৮৬৮ সালে সিদ্ধান্ত নেয়া হয় যে আই-টি-ইউ'র সদর দপ্তর হবে সুইজারল্যান্ডের বার্ন শহরে।

          ১৮৭৬ সালে আলেক্সান্ডার গ্রাহাম বেল টেলিফোন আবিষ্কার করার পর যোগাযোগ ব্যবস্থার দ্রুত উন্নতি ঘটতে থাকে। ১৮৮৫ সালে বার্লিনে ইন্টারন্যাশনাল টেলিগ্রাফ কনফারেন্সে টেলিফোনের আন্তর্জাতিক নিয়মনীতি ঠিক করে আইন পাস করা হয়। টেলিফোনের তার বসানো হয় দেশে দেশে। কিন্তু বিজ্ঞানীরা গবেষণা করতে থাকেন - তারহীন যোগাযোগ ব্যবস্থা আবিষ্কারের জন্য।

          সেই সময় ব্রিটেনের বিজ্ঞানী ডেভিড হিউজ (David Hughes), আমেরিকার নিকোলা টেসলা, আমাদের জগদীশচন্দ্র বসু, রাশিয়ার আলেক্সান্ডার পোপোভ, ইতালির গুগলিয়েলমো মার্কনি আলাদা আলাদাভাবে বেতার যোগাযোগের জন্য গবেষণা করে সফল হয়েছেন।

 

চিত্র ১৭: আই-টি-ইউ বেতার যোগাযোগের অন্যতম আবিষ্কারক হিসেবে বিজ্ঞানী ডেভিড হিউজ, নিকোলা টেসলা, আলেকজান্ডার পোপোভ, মার্কনি ও জগদীশচন্দ্র বসুকে স্থান দিয়েছে তাদের ইতিহাসের পাতায়।

          

বেতার যোগাযোগ শুরু হওয়ার পর ১৯০৬ সালে বিশ্বের প্রথম রেডিও ব্রডকাস্টিং বা বেতার সম্প্রচার শুরু হয়। এ ব্যাপারে আন্তর্জাতিক নিয়ম নির্ধারণ করার জন্য সেবছরই প্রথম আন্তর্জাতিক রেডিওটেলিগ্রাফ কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয় বার্লিনে। পৃথিবীর ২৯টি দেশের প্রতিনিধিরা যোগ দেন সেই কনফারেন্সে। রেডিওটেলিগ্রাফ সংক্রান্ত একটি নতুন বিভাগ চালু হলো আই-টি-ইউ'তে। বেতার সম্প্রচারসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক নীতিমালা তৈরি করা হয়। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে বেতারযন্ত্র এবং বেতার অনুষ্ঠান।

          ১৯২৭ সালে ওয়াশিংটনে আই-টি-ইউ'র কনফারেন্সে বিভিন্ন ধরনের বেতার সম্প্রচারের জন্য ভিন্ন ভিন্ন ফ্রিকোয়েন্সি ব্যান্ড নির্ধারণ করে দেয়া হয়। স্থায়ী সম্প্রচার কেন্দ্রের জন্য এক ধরনের ফ্রিকোয়েন্সি ব্যান্ড, সামুদ্রিক জলযানের জন্য এক ধরনের ব্যান্ড, উড়োজাহাজের জন্য এক ধরনের, পরীক্ষামূলক কেন্দ্রের জন্য এক ধরনের, আবার বাণিজ্যিক বেতার কেন্দ্রের জন্য এক ধরনের।

          বেতার যোগাযোগব্যবস্থা এত বেশি এবং এত দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছিল যে ইন্টারন্যাশনাল টেলিগ্রাফ ইউনিয়নের নাম বদলে ১৯৩২ সালে মাদ্রিদ কনফারেন্সে ইন্টারন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশান ইউনিয়ন রাখা হয়। ১৯৩৪ সালের ১ জানুয়ারি থেকে এই নতুন নাম কার্যকর হয়।

          ১৯৪৫ সালে জাতিসংঘ (United Nations) প্রতিষ্ঠিত হবার পর ১৯৪৭ সালে আই-টি-ইউ'র সাথে জাতিসংঘের চুক্তি হয় যে আই-টি-ইউ বিশ্বের টেলিকমিউনিকেশান বিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ এজেন্সি হিসেবে কাজ করবে। ১৯৪৯ সালের ১লা জানুয়ারি থেকে আই-টি-ইউ জাতিসংঘের এজেন্সি হিসেবে কাজ শুরু করে। প্রতিষ্ঠার বছর হিসেব করলে আই-টি-ইউ হলো জাতিসংঘের সবচেয়ে পুরনো এজেন্সি।

          স্কটিশ ইঞ্জিনিয়ার জন বেয়ার্ড টেলিভিশন উদ্ভাবন করেন ১৯২৫ সালে। ১৯২৬ সালে লন্ডনে তিনি তাঁর মেকানিক্যাল টেলিভিশন কীভাবে কাজ করে তা প্রদর্শন করেন। তারপর থেকে শুরু হয় টেলিভিশন প্রযুক্তি ও সম্প্রচারের যাত্রা। ১৯২৮ সালে তাঁর প্রতিষ্ঠিত টেলিভিশন কোম্পানি সর্বপ্রথম ট্রান্স-আটলান্টিক টেলিভিশন সম্প্রচারে সমর্থ হয়।

          ইলেকট্রনিক্স প্রযুক্তির উন্নতির সাথে সাথে টেলিভিশন প্রযুক্তির উন্নতিও হচ্ছিলো দ্রুত। জন বেয়ার্ডের মেকানিক্যাল টেলিভিশন সিস্টেমের জায়গা নিয়ে নেয় আমেরিকান ক্যাথোড রে টিউব প্রযুক্তির টেলিভিশন। তারপর কালার পিকচার টিউব, তারপর সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তি, অ্যানালগ টেলিভিশন সম্প্রচার থেকে ডিজিটাল টেলিভিশন সম্প্রচারে বিবর্তন। আই-টি-ইউ টেলিভিশন সম্প্রচারের নীতিমালা গ্রহণ করে ১৯৪৯ সালে। বর্তমানে আই-টি-ইউ পৃথিবীর সব ধরনের টেলিভিশন সম্প্রচারের নিয়ম-নীতি নিয়ন্ত্রণ করে।

          ১৯৫৭ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের স্পুটনিক-১ স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের মধ্যদিয়ে স্যাটেলাইট যুগের সূচনা হয়। টেলিকমিউনিকেশানে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে শুরু করে স্যাটেলাইট। ১৯৬২ সালে আমেরিকা-ফ্রান্স-ব্রিটেনের টেলস্টার-১ (Telstar-1) স্যাটেলাইটের মাধ্যমে ইওরোপ ও আমেরিকার মানুষ একই সাথে টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচারিত অনুষ্ঠান দেখতে পায়।

 

 

চিত্র ১৮: বিশ্বের প্রথম টেলিভিশন সম্প্রচার স্যাটেলাইট - টেলস্টার-১

   

কমিউনিকেশান স্যাটেলাইটগুলোকে মহাকাশের যে কক্ষপথে স্থাপন করা হয় সেই কক্ষপথের স্থান সীমিত। কক্ষপথের স্থান বন্টনের সুনির্দিষ্ট নীতিমালা না থাকলে আন্তর্জাতিক বিরোধ সৃষ্টি হতে পারে। আবার বিভিন্ন টেলিভিশন স্টেশন অনুষ্ঠান সম্প্রচারের জন্য একই স্যাটেলাইট ব্যবহার করে। সেক্ষেত্রে প্রত্যেকটি স্টেশনের জন্য আলাদা আলাদা তরঙ্গ না থাকলে সম্প্রচারে বিরাট কারিগরী সমস্যা দেখা দেবে। এই সমস্যা যেন না হয় সেজন্য স্যাটেলাইট সম্প্রচারের নিয়মনীতি প্রবর্তন এবং  কঠোরভাবে প্রয়োগ করার দায়িত্ব নেয় আই-টি-ইউ।

         

স্যাটেলাইটের কক্ষপথে স্থান ও কম্পাঙ্ক বন্টনে আই-টি-ইউ'র ভূমিকা

স্যাটেলাইট যোগাযোগব্যবস্থার দুটো অপরিহার্য বিষয় হলো: কক্ষপথে স্যাটেলাইটের অবস্থান (orbital position) এবং সুনির্দিষ্ট বেতার তরঙ্গ (radio frequency)। কমিউনিকেশান স্যাটেলাইটগুলোর জন্য নির্দিষ্ট কক্ষপথ হলো জিও-স্টেশনারি আর্থ অরবিট বা ভূ-স্থির কক্ষপথ।[2] এই কক্ষপথে প্রায় হাজারখানেক কমিউনিকেশান স্যাটেলাইট আছে। কক্ষপথে এই স্যাটেলাইটগুলোর একটির সাথে আরেকটির সংঘর্ষ যেন না ঘটতে পারে সেজন্য কক্ষপথে স্যাটেলাইট পাঠানোর আগেই তার জন্য জায়গা নির্দিষ্ট করতে হয়। আর কক্ষপথে স্থাপনের পর স্যাটেলাইট থেকে যে বেতার তরঙ্গ পৃথিবীতে পাঠানো হবে এবং পৃথিবীর গ্রাউন্ড স্টেশন থেকে যে তরঙ্গ স্যাটেলাইটে পাঠানো হবে সেগুলো হতে হবে সুনির্দিষ্ট। এক স্টেশনের তরঙ্গের সাথে অন্য স্টেশনের তরঙ্গ মিলে গেলে সিগনাল কোয়ালিটি খারাপ হয়ে যায়, সম্প্রচারে বিঘ্ন ঘটে। তাই বেতার কম্পাঙ্ক বন্টনে খুবই সতর্ক থাকতে হয়। সেজন্য স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের অনেক আগে থেকেই আই-টি-ইউ'র কাছ থেকে অবস্থান ও কম্পাঙ্কের অনুমোদন নিতে হয়। এই অনুমোদন নেয়ার প্রক্রিয়া বেশ জটিল। স্যাটেলাইট সংক্রান্ত যে কোন অনুমোদনের জন্য প্রথমেই প্রয়োজন হয় আই-টি-ইউ'র সদস্য হওয়া।

 

আই-টি-ইউর সদস্যপদ

মহাকাশে স্যাটেলাইট স্থাপন করার প্রাথমিক শর্ত হচ্ছে ইন্টারন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশান ইউনিয়ন বা আই-টি-ইউ'র সদস্য হওয়া। দুই ধরনের সদস্যপদ আছে: স্টেট মেম্বারশিপ বা রাষ্ট্রীয় সদস্যপদ এবং সেক্টর মেম্বারশিপ। জাতিসংঘের যে কোন সদস্যরাষ্ট্র আই-টি-ইউ'র স্টেট মেম্বার হতে পারে। আর যে কোন সদস্যদেশের টেলিকমিউনিকেশান কোম্পানি প্রয়োজনীয় শর্তপূরণ সাপেক্ষে আই-টি-ইউ'র সেক্টর মেম্বার হতে পারে। ২০১৮ সাল পর্যন্ত পৃথিবীর ১৯৩টি দেশ আই-টি-ইউ'র স্টেট মেম্বার হয়েছে এবং ৭০০ কোম্পানি সেক্টর মেম্বার হয়েছে। বাংলাদেশ আই-টি-ইউ'র সদস্য হয়েছে ১৯৭৩ সালে। আই-টি-ইউ'র সদস্যপদ চিরকালীন। একবার সদস্যপদ পাওয়ার পর সেই সদস্যপদ কখনোই স্থগিত করা বা বাতিল করা যায় না। তবে আই-টি-ইউ'র শর্ত ভঙ্গ করলে আই-টি-ইউ'র কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কোন দেশ বা কোম্পানিকে আই-টি-ইউ'র মিটিং ও কনফারেন্সে যোগদানের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা দিতে পারে।

 

আই-টি-ইউ'র উদ্দেশ্য ও মূল কাজ 

আই-টি-ইউ'র স্যাটেলাইট সংক্রান্ত বিভাগের মূল উদ্দেশ্য হলো:

  • টেলিকমিউনিকেশান বা বেতারযোগাযোগ সংক্রান্ত সব ধরনের কার্যকলাপে সদস্যদেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা রক্ষা করা এবং বাড়ানো।
  • উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য টেলিকমিউনিকেশানে প্রযুক্তি-সহযোগিতা বাড়ানো।
  • টেলিকমিউনিকেশানের কারিগরি উন্নয়ন ও দক্ষতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করা।
  • আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ ও সংস্থার মধ্যে টেলিকমিউনিকেশান সংক্রান্ত তথ্য-অর্থনীতিক (information economy) সহযোগিতা বাড়ানো।

 

এই উদ্দেশ্যগুলো পূরণের জন্য আই-টি-ইউ'র মূল কাজ হলো:

  • বেতার তরঙ্গের কম্পাঙ্ক ব্যান্ড বন্টন করা
  • বেতার তরঙ্গের কম্পাঙ্ক রেজিস্ট্রেশন করা
  • জিও-স্যাটেলাইট অরবিট বা ভূ-স্থির উপগ্রহের কক্ষপথের স্থান বন্টন করা এবং রেজিস্ট্রেশন করা
  • বেতার তরঙ্গের ইন্টারফিয়ারেন্স (interference) বা ব্যতিচার ঘটলে তার প্রতিকার করা
  • বিশ্বব্যাপী টেলিকমিউনিকেশানের মানের উন্নয়ন ও সমন্বয় করা
  • উন্নয়নশীল দেশেও টেকিকমিউনিকেশানের উন্নত প্রযুক্তি সরবরাহে সহযোগিতা করা

 

কক্ষপথে স্যাটেলাইটের স্থান ও বেতার তরঙ্গের কম্পাঙ্ক বন্টন করা হয় কীভাবে

কমিউনিকেশান স্যাটেলাইট সংক্রান্ত আই-টি-ইউ'র আন্তর্জাতিক নিয়মের উদ্দেশ্য হলো পৃথিবীর সকল জাতির জন্য কক্ষপথে স্যাটেলাইট বসানোর সমান অধিকার নিশ্চিত করা এবং সেই স্যাটেলাইটের সিগনাল সম্প্রচারে যেন কোন অসুবিধা না হয় তা নিশ্চিত করা। সেজন্য প্রত্যেক স্যাটেলাইটের জন্য কক্ষপথে জায়গা নির্দিষ্ট করা যেমন জরুরি তেমনি তাদের জন্য বেতার তরঙ্গের আলাদা আলাদা কম্পাঙ্ক বন্টন করাও জরুরি।

          আই-টি-ইউ'র বিধিমালার অনুচ্ছেদ-৪৫ অনুযায়ী:

  • সকল রেডিওস্টেশন এমনভাবে স্থাপন করতে হবে এবং তাদের কার্যপদ্ধতি এমন হতে হবে যেন এক স্টেশনের বেতার তরঙ্গ কোনভাবেই অন্য স্টেশনের বেতার তরঙ্গের সাথে ব্যতিচার না ঘটাতে পারে।
  • আই-টি-ইউ'র প্রত্যেক সদস্যকে টেলিকমিউনিকেশানে যেন কোন ধরনের ব্যতিচার না ঘটতে পারে তার জন্য যা যা যান্ত্রিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হয় সবই করতে হবে।
  • আই-টি-ইউ'র প্রত্যেক সদস্য এই নিয়মগুলো মানতে বাধ্য থাকবে।

 

বেতার তরঙ্গের কম্পাঙ্কগুলোর মধ্যে যেন ব্যতিচার না ঘটতে পারে সেজন্য আই-টি-ইউ'র কাছ থেকে রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি বা বেতার তরঙ্গের কম্পাঙ্ক অনুমোদন করিয়ে নিতে হয়। কক্ষপথের একটি স্যাটেলাইটের সাথে অন্য স্যাটেলাইটের যেন সংঘর্ষ না ঘটতে পারে সেজন্য কক্ষপথের অক্ষাংশ রেজিস্ট্রেশন করিয়ে নিতে হয় আই-টি-ইউ'র কাছ থেকে।

          পৃথিবীব্যাপী অবিচ্ছিন্নভাবে ব্যতিচারহীন বেতারতরঙ্গের কম্পাঙ্ক বন্টনের জন্য আই-টি-ইউ পৃথিবীর দেশগুলোকে মোট তিনটি অঞ্চলে ভাগ করেছে।

  • অঞ্চল-১: ইওরোপ, রাশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য
  • অঞ্চল-২: আমেরিকা ও গ্রিনল্যান্ড
  • অঞ্চল-৩: অস্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়া, জাপান, নিউ জিল্যান্ড, দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসগরীয় অঞ্চল, ও এশিয়া

 

চিত্র ১৯: রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি বন্টনের জন্য পৃথিবীর ভৌগোলিক অঞ্চল

 

আই-টি-ইউ সংজ্ঞায়িত বেতার তরঙ্গের ব্যান্ড ও কম্পাঙ্কের বিন্যাস

বেতার তরঙ্গ ইলেকট্রো-ম্যাগনেটিক ওয়েভ বা তড়িৎচৌম্বক তরঙ্গের অদৃশ্যমান অংশ। বেতার তরঙ্গের কম্পাঙ্ক দৃশ্যমান আলোক তরঙ্গের কম্পাঙ্কের চেয়ে কম। সাধারণত মানুষের শরীরের ওপর বেতার তরঙ্গের সরাসরি কোন প্রভাব নেই, তাই পৃথিবীর বায়ুমন্ডলে বেতার তরঙ্গের সম্প্রচারে মানুষ বা অন্যান্য প্রাণির শারীরিক স্বাস্থ্যের কোন ক্ষতি হয় না। সবচেয়ে উচ্চ কম্পাঙ্কের বেতার তরঙ্গও আমাদের দৃশ্যমান আলোর চেয়ে কম শক্তিশালী। তড়িৎচৌম্বক তরঙ্গের কমাঙ্ক ও তরঙ্গদৈর্ঘ্যের একটি চিত্র নিচে দেয়া হলো।

 

চিত্র ২০: তড়িৎচৌম্বক তরঙ্গের বিভিন্ন অংশের কম্পাঙ্ক ও তরঙ্গদৈর্ঘ্য

 

বেতার তরঙ্গের কম্পাঙ্কগুলোকে আই-টি-ইউ মোট বারোটি ব্যান্ডে বিন্যস্ত করেছে। নিচের সারণি-১এ রেডিও-ব্যান্ডগুলো এবং তাদের ব্যবহারের বর্ণনা দেয়া হলো।

 

সারনি ১: ITU বেতার তরঙ্গের কম্পাঙ্ক বন্টন

ITU ব্যান্ড

ব্যান্ডের নাম

কম্পাঙ্ক

তরঙ্গদৈর্ঘ্য

ব্যবহার

1

Extremely Low Frequency (ELF)

 3 - 30 Hz

99,930.8 - 9,993.1 km

সাবমেরিন যোগাযোগ

2

Super Low Frequency (SLF)

30 - 300 Hz

9,931.1 - 999.3 km

সাবমেরিন যোগাযোগ

3

Ultra Low Frequency (ULF)

300 - 3,000 Hz

999.3 - 99.9 km

সাবমেরিন যোগাযোগ, খনির ভেতর যোগাযোগ

4

Very Low Frequency (VLF)

3-30 kHz

99.9 - 10.0 km

ভৌগোলিক অবস্থান নির্ণয়, পারমাণবিক ঘড়ির সময় সঙ্কেত, সাবমেরিন যোগাযোগ, হার্ট-রেট মনিটর, ভূ-পদার্থবিজ্ঞান

5

Low Frequency (LF)

30 - 300 kHz

10.0 - 1.0 km

ভৌগোলিক অবস্থান নির্ণয়, পারমাণবিক ঘড়ির সময় সঙ্কেত, AM রেডিও, অপেশাদার রেডিওস্টেশন

6

Medium Frequency (MF)

300 - 3,000 kHz

1.0 - 0.1 km

AM  রেডিও, অপেশাদার রেডিওস্টেশন, অ্যাভ্যালাঞ্চ বিকন্‌স (বরফের ভেতর চাপা পড়া মানুষ বা যন্ত্রপাতি খুঁজে বের করার জন্য ব্যবহার করার জন্য যে রেডিও সিগনাল ব্যবহার করা হয়)।

7

High Frequency (HF)

3 - 30 MHz

99.9 - 10.0 m

শর্টওয়েভ রেডিও, সিটিজেন ব্যান্ড রেডিও, অ্যামেচার রেডিও, মেরিন রেডিও, মোবাইল রেডিও

8

Very High Frequency (VHF)

30 - 300 MHz

10.0 - 1.0 m

FM রেডিও, টেলিভিশন সম্প্রচার, বিমানবন্দরের গ্রাউন্ড কন্ট্রোল থেকে  বিমানে যোগাযোগ, বিমান থেকে বিমানে যোগাযোগ, ল্যান্ড মোবাইল থেকে জাহাজের মোবাইলে যোগাযোগ, অপেশাদার রেডিও, আবহাওয়া রেডিও

9

Ultra High Frequency (UHF)

300 - 3,000 MHz

1.0 - 0.1 m

টেলিভিশন সম্প্রচার, মাইক্রোওয়েভ ওভেন, রেডিও অ্যাস্ট্রোনমি, মোবাইল ফোন, ব্লুটুথ, জিপিএস, রিমোট কন্ট্রোল সিস্টেম, স্যাটেলাইট রেডিও

10

Super High Frequency (SHF)

3 - 30 GHz

99.9 - 10.0 mm

রেডিও অ্যাস্ট্রোনমি, মাইক্রোওয়েভ কমিউনিকেশান, রাডার, কমিউনিকেশান স্যাটেলাইট, ক্যাবল ও স্যাটেলাইট টেলিভিশন, অ্যামেচার রেডিও, স্যাটেলাইট রেডিও

11

Extremely High Frequency (EHF)

30 - 300 GHz

10.0 - 1.0 mm

রেডিও অ্যাস্ট্রোনমি, হাই ফ্রিকোয়েন্সি মাইক্রোওয়েভ রেডিও, মাইক্রোওয়েভ রিমোট সেনসিং, ওয়ারলেস লোকাল এরিয়া নেটওয়ার্ক (LAN)

12

Tremendously High Frequency (THF)

300 - 3000 GHz

1.0 - 0.1 mm

ফিজিক্স রিসার্চ, কম্পিউটিং, রিমোট সেনসিং

         

স্যাটেলাইট যোগাযোগের মাধ্যম হলো বেতার-তরঙ্গ। আই-টি-ইউ নির্দেশিত বেতার-তরঙ্গের ব্যান্ড 9 থেকে 12 পর্যন্ত কম্পাঙ্ক (300 MHz - 1 THz) স্যাটেলাইট যোগাযোগের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের কমিউনিকেশান স্যাটেলাইটগুলো অনেকসময় একই ব্যান্ড ব্যাবহার করলেও তাদের কম্পাঙ্কে পার্থক্য থাকে। ফলে সিগনালে ইন্টারফিয়ারেন্স ঘটে না।

          আই-টি-ইউ নির্দেশিত ফ্রিকোয়েন্সি ব্যান্ডগুলোকে ইন্সটিটিউট অব ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ার্স (IEEE) এবং ইওরোপিয়ান ইউনিয়ন (EU) ও ন্যাটোভুক্ত (NATO) দেশগুলো আরো কয়েকটি উপব্যান্ডে বিন্যস্ত করেছে। নিচের সারণি-২তে সেই কম্পাঙ্ক বিন্যাস দেখানো হলো।

 

সারণি ২: বেতার তরঙ্গের কম্পাঙ্ক বিন্যাস

ITU ব্যান্ড

IEEE ব্যান্ড

EU/NATO ব্যান্ড

কম্পাঙ্ক[3]

1

 

 

 

 

 

A

3 Hz - 30 Hz

2

 

30 Hz - 300 Hz

3

 

300 Hz - 3 kHz[4]

4

 

3 kHz - 30 kHz

5

 

30 kHz - 300 kHz

6

 

300 kHz - 3 MHz[5]

7

HF

3 MHz - 30 MHz

8

VHF

30 MHz - 250 MHz

B

250 MHz - 300 MHz

 

 

9

UHF

300 MHz - 500 MHz

C

500 MHz - 1 GHz[6]

L

D

1 GHz - 2 GHz

S

E

2 GHz - 3 GHz

 

10

F

3 GHz - 4 GHz

C

G

4 GHz - 6 GHz

H

6 GHz - 8 GHz

 

X

I

8 GHz - 10 GHz

 

J

10 GHz - 12 GHz

Ku

12 GHz - 18 GHz

K

18 GHz - 20 GHz

 

K

20 GHz - 27 GHz

Ka

27 GHz - 30 GHz

 

 

 

11

30 GHz - 40 GHz

V

L

40 GHz - 60 GHz

M

60 GHz - 75 GHz

W

75 GHz - 100 GHz

 

100 GHz - 110 GHz

mm

 

110 GHz - 300 GHz

12

 

 

300 GHz - 3 THz[7]

 

কমিউনিকেশান স্যাটেলাইটের ক্ষেত্রে সবচেয়ে প্রচলিত কম্পাঙ্ক বা ফ্রিকোয়েন্সি ব্যান্ড হলো C ব্যান্ড ও Ku ব্যান্ড। সারণি-২ থেকে আমরা দেখতে পাচ্ছি C  ব্যান্ডের কম্পাঙ্ক হচ্ছে ৫০০ মেগাহার্টজ থেকে ১ গিগা হার্টজ পর্যন্ত। K ব্যান্ডের নামকরণ করা হয়েছে জার্মান শব্দ কুর্জ (Kurz) থেকে, যার অর্থ হলো শর্ট বা হ্রস্ব। সারণি-২ থেকে দেখতে পাচ্ছি ১২ গিগাহার্টজ থেকে ৪০ গিগাহার্টজ পর্যন্ত কম্পাঙ্ক K  ব্যান্ডের অন্তর্ভুক্ত। K ব্যান্ডের নিচের দিকের কম্পাঙ্ক অর্থাৎ ১২ থেকে ১৮ গিগাহার্টজ পর্যন্ত কম্পাঙ্কের ব্যান্ডকে বলা হচ্ছে Ku মানে Kurz-under,  আর K ব্যান্ডের উপরের দিকের কম্পাঙ্ক অর্থাৎ ২৭ থেকে ৪০ গিগাহার্টজ পর্যন্ত কম্পাঙ্কের ব্যান্ডকে বলা হচ্ছে Ka অর্থাৎ Kurz-above। আই-টি-ইউ থেকে স্যাটেলাইটের কম্পাঙ্ক ব্যবহার করার জন্য রেজিস্ট্রেশন নিতে হয়।

 

কক্ষপথে স্যাটেলাইটের স্থানের জন্য রেজিস্ট্রেশন করার পদ্ধতি

আই-টি-ইউ'র কোন সদস্যরাষ্ট্র বা সেক্টর মেম্বার যদি কোন স্যাটেলাইট স্থাপন করতে চায় তাহলে অনেক আগে থেকেই তার বিস্তারিত পরিকল্পনা করতে হয়। স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের সর্বোচ্চ সাত বছর আগে এবং সর্বনিম্ন দু'বছর আগে আই-টি-ইউতে বিস্তারিত তথ্য-প্রমাণসহ রেজিস্ট্রেশনের জন্য আবেদন করতে হয়। আবেদনের জন্য দু'ধরনের পদ্ধতি আছে - সাধারণ পদ্ধতি ও বিশেষ পদ্ধতি।

          সাধারণ পদ্ধতি হলো - ফার্স্ট কাম ফার্স্ট সার্ভড অর্থাৎ আগে এলে আগে পাবেন পদ্ধতি। তার মানে হলো যে দেশ আগে আবেদন করবে সে দেশ আগে রেজিস্ট্রেশন পাবে। আর বিশেষ পদ্ধতি হলো বিশেষ বিশেষ স্যাটেলাইটের সুবিধার জন্য পরিকল্পিত পদ্ধতিতে দরখাস্ত করা।

          মহাকাশের কক্ষপথ আন্তর্জাতিক। পৃথিবীর সব দেশেরই সমান অধিকার আছে মহাকাশে। কিন্তু সেই অধিকার কাজে লাগানোর জন্য যে অর্থনৈতিক সামর্থ্য দরকার হয় সেটা সব দেশের থাকে না। মহাকাশে আমাদের বাংলাদেশের প্রথম স্যাটেলাইট বঙ্গবন্ধু-১ পাঠাতে খরচ হয়েছে প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা। আমেরিকা এক হাজারেরও বেশি স্যাটেলাইটের মালিক। আমাদের সামর্থ্য থাকলে আমরাও পাঠাতে পারতাম যত খুশি - তাতে আইনগত কোন বাধা নেই। তবে কিছু কারিগরি বাধা আছে। যেমন, কমিউনিকেশন স্যাটেলাইটগুলো সাধারণত পাঠানো হয় ভূ-স্থির কক্ষপথে। সেই কক্ষপথ পৃথিবী থেকে প্রায় ৩৬,০০০ কিলোমিটার দূরে। সেই কক্ষপথে যত খুশি স্যাটেলাইট রাখার সুযোগ নেই। মাত্র ১৮০০ স্যাটেলাইট সেই বৃত্তাকার কক্ষপথে স্থাপন করা যাবে একটার পর একটা; যেন একটার সাথে আরেকটার সংঘর্ষ না ঘটে। কিন্তু এর বেশি একটিরও জায়গা নেই।

 

 

চিত্র ২১: ভূ-স্থির কক্ষপথে কমিউনিকেশন স্যাটেলাইটগুলোর অবস্থান

           

আগে এলে আগে পাবেন ভিত্তির সুযোগে পৃথিবীর বড় বড় দেশগুলো এবং স্যাটেলাইট বাণিজ্য-সংস্থাগুলো কক্ষপথের স্যাটেলাইটের দরকারি অরবিটাল স্পটগুলো নিজেদের নামে রেজিস্ট্রেশন করিয়ে নিয়েছে। এখন তারা নিজেদের স্পটগুলো আমাদের মতো দেশের কাছে ভাড়া দিচ্ছে টাকার বিনিময়ে। আমাদের বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইটের জন্য কক্ষপথের স্পট ভাড়া নিতে হয়েছে ইন্টারস্পুটনিক ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশান অব স্পেস কমিউনিকেশান্স বা সংক্ষেপে 'ইন্টারস্পুটনিক' (Intersputnik) সংস্থার কাছ থেকে। সেজন্য আমাদের খরচ হয়েছে ২১৯ কোটি টাকা। অথচ এই কক্ষপথের জন্য কোন ভাড়া দিতে হতো না যদি কক্ষপথের জায়গা খালি থাকতো।

          চিত্র-২১ যদি ভালো করে লক্ষ্য করে দেখেন - দেখতে পাবেন কক্ষপথের বাম দিকে কিছু জায়গা এখনো খালি আছে, কোন স্যাটেলাইট সেখানে নেই। সেখানে স্যাটেলাইট নেই - কারণ পৃথিবীর সেদিকে তেমন কোন দেশ নেই, এবং থাকলেও জনসংখ্যার ঘনত্ব খুব কম সেখানে। সেদিকে স্যাটেলাইট বসালে তা তেমন কোন কাজে আসবে না, অথবা ব্যবহারকারীর সংখ্যা এত কম হবে যে স্যাটেলাইটের খরচ উঠে আসবে না।

          স্যাটেলাইটের অরবিটাল স্পটের বিস্তারিত তথ্য অর্থাৎ স্যাটেলাইটটি ঠিক কোথায় স্থাপন করা হবে দরখাস্তের সাথে সরবরাহ করতে হয়। দরখাস্ত জমা হওয়ার পর সমস্ত নিয়মকানুন ঠিক আছে কি না চেক করে দেখে আই-টি-ইউ'র রেগুলেশন বোর্ড সাপ্তাহিক বুলেটিনে স্যাটেলাইটের তথ্যগুলো প্রকাশ করে। এই নতুন প্রস্তাবিত স্যাটেলাইটটির আগে যেসব স্যাটেলাইট স্থাপিত হয়েছে বা স্থাপনের জন্য দরখাস্ত জমা দিয়েছে সেইসব দেশ বা সংস্থা ভালো করে হিসেব করে দেখবে নতুন স্যাটেলাইটটি উৎক্ষিপ্ত হয়ে কক্ষপথের প্রস্তাবিত স্থানে স্থাপিত হয়ে কাজ শুরু করলে তাদের স্যাটেলাইটের সম্প্রচারের কোন অসুবিধা হবে কি না। যদি কোন ইন্টারফিয়ারেন্স হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয় তাহলে চার মাসের মধ্যে তারা আপত্তি জানাতে পারে। যদি কেউ আপত্তি জানায় তাহলে আপত্তিকারী দেশ বা সংস্থার সাথে আবেদনকারী দেশ বা সংস্থা আলোচনা করে প্রয়োজনীয় কারিগরী পরিবর্তন ঘটিয়ে আপত্তির নিষ্পত্তি করে ফেলে। তারপর সবকিছু ঠিক থাকলে স্যাটেলাইটের রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন হয় মাস্টার ইন্টারন্যাশনাল ফ্রিকোয়েন্সি রেজিস্টার (MIFR)-এ অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে।

          বেতার তরঙ্গের কম্পাঙ্ক ও ভূ-স্থির কক্ষপথে স্থান অসীম নয়। এগুলো কোন দেশের একচেটিয়া সম্পত্তি নয়। পৃথিবীর উন্নয়নশীল দেশগুলোও যেন এই স্যাটেলাইটসুবিধা পেতে পারে - সেজন্য বিশেষ বিশেষ স্যাটেলাইটের সুবিধার জন্য পরিকল্পিত পদ্ধতিতে দরখাস্ত করার নিয়ম আছে। যেমন, বিমানের মোবাইল সার্ভিসের জন্য কম্পাঙ্ক বন্টন, যেসব ব্রডকাস্টিং স্যাটেলাইট সার্ভিসে ১২ গিগাহার্টজের বেশি কম্পাঙ্ক ব্যবহার করা হয় - তাদের রেজিস্ট্রেশন করার জন্য 'আগে এলে আগে পাবেন' ভিত্তির বদলে বিশেষ প্রক্রিয়ায় দরখাস্ত করতে হয়। দরখাস্তের অন্যান্য সব শর্ত প্রায় একই। অর্থাৎ স্যাটেলাইট পাঠানোর কমপক্ষে দুই বছর আগে এবং সর্বোচ্চ সাত বছর আগে দরখাস্ত জমা দিতে হয়। দরখাস্ত পরীক্ষা ও অনুমোদনের পদ্ধতিও প্রায় একই। মাস্টার ইন্টারন্যাশনাল ফ্রিকোয়েন্সি রেজিস্টার-এ অন্তর্ভুক্তির আগপর্যন্ত রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন হয়েছে বলা যায় না।

          পৃথিবীর সব জায়গাতেই যে কোন নিয়ম এবং সুযোগের অপব্যবহার করে মানুষ। অনেক বছর ধরে অনেক দেশ ও সংস্থা অনেকগুলো স্যাটেলাইটের স্থান ও কম্পাঙ্ক নিজেদের নামে রেজিস্ট্রেশন করে রাখতো। এতে যারা পরে আসতো তারা ভালো জায়গা পেতো না। এখানে ভালো জায়গা মানে কক্ষপথে ভৌগোলিক অবস্থান বরাবর জায়গা। যেমন বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান হলো ৮৮ ডিগ্রি থেকে ৯৪ ডিগ্রি পূর্ব অক্ষাংশে। আমাদের বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইটটি যদি আমরা এই অক্ষাংশের ভেতর স্থাপন করতে পারতাম তাহলে ওটা সরাসরি আমাদের দেশের উপর থাকতো। কিন্তু সেই অক্ষাংশের উপর কোন স্পট খালি ছিল না। আমাদের কাছাকাছি যে স্পট আমরা পেয়েছি তা হলো ১১৯.১ ডিগ্রি পূর্ব অক্ষাংশে। তাও আমাদের ভাড়া নিতে হয়েছে। কোন কোন দেশ বা সংস্থা ভবিষ্যতে বেশি দামে স্পট বিক্রি করার জন্য বা ভাড়া দেয়ার জন্য নিজেদের নামে স্পট রেজিস্ট্রেশন করিয়ে নিলে কী করা যাবে?

          আই-টি-ইউ স্যাটেলাইটের ভুয়া রেজিস্ট্রেশন বন্ধ করার জন্য কিছু কঠোর আইন পাস করেছে। কোন দেশ বা সংস্থা রেজিস্ট্রেশন পাওয়ার সাত বছরের মধ্যে যদি স্যাটেলাইট স্থাপন করতে ব্যর্থ হয় তাহলে তাদের রেজিস্ট্রেশন বাতিল করে সেই স্পট নতুন দরখাস্তকারীকে বন্টন করে দেবে। আর দরখাস্ত যে ভুয়া নয়, সেটা প্রমাণের জন্য দরখাস্ত করার সময়েই স্যাটেলাইটের বিস্তারিত বিবরণ দাখিল করতে হয়। যে সব তথ্য ও প্রমাণ দাখিল করতে হয় তাদের মধ্যে আছে:

  • স্যাটেলাইট নেটওয়ার্কের পরিচিতি
  • দেশ বা সংস্থার বিস্তারিত তথ্য
  • দেশের প্রতীক
  • সম্প্রচার কম্পাঙ্কের বিস্তারিত তথ্য
  • কক্ষপথের বর্ণনা
  • স্যাটেলাইট প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের বিস্তারিত বিবরণ
  • স্যাটেলাইট প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের সাথে চুক্তির বিস্তারিত বিবরণ
  • স্যাটেলাইট সরবরাহের আনুমানিক তারিখ
  • স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণকারী প্রতিষ্ঠানের বিস্তারিত বিবরণ
  • স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণকারী প্রতিষ্ঠানের সাথে চুক্তির বিস্তারিত বিবরণ
  • স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের আনুমানিক তারিখ
  • স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণকারী রকেটের বিবরণ
  • স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের স্থান

সদস্যদেশ ও সংস্থার দায়িত্ব

কক্ষপথে স্থাপিত প্রত্যেকটি স্যাটেলাইটের সম্প্রচার যেন নির্বিঘ্নে ঘটতে পারে সেজন্য স্যাটেলাইটের মালিক দেশ ও সংস্থাগুলোকে আই-টি-ইউ'র  স্যাটেলাইট সম্প্রচার বিধিমালা কঠোরভাবে মেনে চলতে হয়।

          স্যাটেলাইটের তরঙ্গের সম্প্রচার এমনভাবে হওয়া উচিত যেন অন্য স্যাটেলাইটের তরঙ্গের সাথে ইন্টারফিয়ারেন্স না ঘটে। অপ্রয়োজনীয় তরঙ্গের সম্প্রচার থেকে বিরত থাকতে হবে। প্রয়োজনের চেয়ে বেশি শক্তির বিকিরণ যেন না ঘটে। কোন ভাবেই অন্য স্যাটেলাইটের সম্প্রচার তরঙ্গ আটকে দেয়া যাবে না, মানে অন্য স্যাটেলাইট জ্যাম করে দেয়া সম্পূর্ণ বে-আইনি।

          কিন্তু তারপরেও দেখা যায় অনেক দেশ ও সংস্থা এসব বে-আইনি কাজ করে। বিভিন্ন দেশ অন্যদেশের গোয়েন্দা-স্যাটেলাইটগুলো জ্যাম করে দেয়ার চেষ্টা করে। ২০০৯ সালে ইরান ইচ্ছাকৃতভাবে ইউরোপের ইউটেলস্যাট স্যাটেলাইট জ্যাম করে দেয় - ফলে ইওরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের অনেক টেলিভিশন সম্প্রচার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এরকম ঘটলে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিনষ্ট হয় এবং সংশ্লিষ্ট দেশের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে তার সমাধান করতে হয়।


ইউনুসা (UNOOSA)

শান্তিপূর্ণভাবে মহাকাশ গবেষণা চালানো এবং বিশ্বের সকল দেশের মধ্যে মহাকাশ-গবেষণা সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে কাজ করছে ইউনাইটেড ন্যাশন্‌স অফিস ফর আউটার স্পেস অ্যাফেয়ার্স (United Nations Office for Outer Space Affairs) বা ইউনুসা। উন্নয়নশীল দেশের জন্য মহাকাশ কার্যক্রমের আইনগত ও কারিগরী সহায়তা প্রদান করা হয় জাতিসংঘের এই সংগঠনটির পক্ষ থেকে। ১৯৫৮ সালের ১৩ ডিসেম্বর এই প্রতিষ্ঠান গঠিত হয়। শুরুতে এটা জাতিসংঘ সচিবালয়ের অধীনে কাজ করছিল। ১৯৬২ সালে এটা জাতিসংঘের ডিপার্টমেন্ট অব পলিটিক্যাল অ্যান্ড সিকিউরিটি কাউন্সিলের অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৯৬৮ সালে আউটার স্পেস অ্যাফেয়ার্স ডিভিশন গঠিত হয়। ১৯৯২ সালে এই ডিভিশন জাতিসংঘের পলিটিক্যাল অ্যাফেয়ার্স ডিভিশনের অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৯৯৩ সালে ইউনুসার সদর দপ্তর নিউ ইয়র্ক থেকে ভিয়েনায় স্থানান্তরিত হয়।

          ইউনুসার হিসেব অনুযায়ী বর্তমানে প্রায় ৪,৭০০ স্যাটেলাইট পৃথিবীর চারপাশে ঘুরছে। এদের মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি স্যাটেলাইট অকেজো। প্রায় হাজার খানেক কার্যকর কমিউনিকেশান স্যাটেলাইট পৃথিবীতে টেলিভিশন সম্প্রচার ও অন্যান্য যোগাযোগ ব্যবস্থায় অবদান রাখছে। প্রায় ছয় শ' স্যাটেলাইট পৃথিবী পর্যবেক্ষণ করছে। শতাধিক জিপিএস স্যাটেলাইট কাজ করে যাচ্ছে মোবাইল টেলিফোন ও ন্যাভিগেশানের কাজে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মালিকানাধীন স্যাটেলাইটের সংখ্যার তালিকা নিচের সারণিতে দেয়া হলো।


সারণি ৩: বিভিন্ন দেশ ও প্রতিষ্ঠানের স্যাটেলাইটের সংখ্যা

দেশ

স্যাটেলাইটের সংখ্যা

দেশ

স্যাটেলাইটের সংখ্যা

আলজেরিয়া

৬

আরব স্যাটেলাইট কমিউনিকেশন অর্গানাইজেশন 

১৩

আর্জেন্টিনা

১৮

এশিয়া স্যাটেলাইট কমিউনিকেশন কোম্পানি (ASIASAT)

৮

অস্ট্রেলিয়া

২১

আজারবাইজান

১

বাংলাদেশ

১

বেলারুশ

২

বলিভিয়া

১

ব্রাজিল

১৭

বুলগেরিয়া

১

কানাডা

৪৮

চিলি

৩

চীন ও ব্রাজিল যৌথ

৩

কমনওয়েলথ অব ইন্ডেপেন্ডেন্ট স্টেটস (ভূতপূর্ব সোভিয়েত ইউনিয়ন)

১৫০৪

চেক রিপাবলিক (ভূতপূর্ব চেকোস্লোভাকিয়া)

২

ডেনমার্ক

৯

ইকুয়েডর

২

মিশর

৫

এস্টোনিয়া

১

ইউরোপিয়ান মেটিওরোলজিক্যাল স্যাটেলাইট

৮

ইওরোপিয়ান স্পেস এজেন্সি

৮২

ফ্রান্স

৬৮

ফ্রান্স/জার্মানি যৌথ

২

ফ্রান্স/ইতালি যৌথ

২

জার্মানি

৫২

গ্লোবালস্টার

৮৪

গ্রিস

৪

ভারত

৮৮

ইন্দোনেশিয়া

১৬

ইন্টারন্যাশনাল মোবাইল স্যাটেলাইট অর্গানাইজেশান (INMARSAT)

১৭

ইন্টারন্যাশনাল স্পেস স্টেশন

৫

ইন্টারন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন স্যাটেলাইট অর্গানাইজেশান

৮৫

ইরাক

১

ইরান

১

ইজরায়েল

১৭

ইতালি

২৭

জাপান

১৭২

কাজাকিস্তান

৬

লাওস

১

লাটভিয়া

১

লিথুয়ানিয়া

১

লুক্সেমবার্গ

৪

মালয়েশিয়া

৭

মেক্সিকো

১২

মরক্কো

১

নেদারল্যান্ডস

৬

নাইজেরিয়া

৬

ন্যাটো

৮

উত্তর কোরিয়া

২

নরওয়ে

৮

O3B নেটওয়ার্ক

১৬

ORBCOMM

৪১

পাকিস্তান

৩

চীন

২৯৭

পেরু

১

ফিলিপাইন

২

পোলান্ড

২

পর্তুগাল

২

আফ্রিকান স্যাটেলাইট কমিউনিকেশান অর্গানাইজেশান

২

সৌদি আরব

১৩

সিঙ্গাপুর

৯

সিঙ্গাপুর/তাইওয়ান যৌথ

২

স্লোভাকিয়া

১

ইওরোপিয়ান সোসাইটি (SES)

৫৫

দক্ষিণ আফ্রিকা

৬

দক্ষিণ কোরিয়া

২৪

স্পেন

২৩

সুইডেন

১২

তাইওয়ান

৯

থাইল্যান্ড

৯

তুরস্ক

১৪

তুর্কমেনিস্তান/মোনাকো

১

আরব আমিরাত

৯

যুক্তরাজ্য

৪২

যুক্তরাষ্ট্র

১৬১৬

উরুগুয়ে

১

ভেনেজুয়েলা

৩

ভিয়েতনাম

৩

আমেরিকা/ব্রাজিল যৌথ

১

উৎস: www.n2yo.com

 

এবার দেখা যাক এই স্যাটেলাইটগুলোর মূল বিজ্ঞান কী, মহাকাশে কীভাবে পাঠানো হয়, কীভাবে কাজ করে, কোন্‌ কক্ষপথে থাকে ইত্যাদি।



[1] এই দিনের স্মরণে প্রতিবছর ১৭ মে পালিত হয় বিশ্ব টেলিযোগাযোগ ও তথ্য সমিতি দিবস (World Telecommunication and Information Society Day)।

[2] স্যাটেলাইটের কক্ষপথ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে এই বইয়ের পঞ্চম অধ্যায়ে।

[3] কম্পাঙ্ক বা ফ্রিকোয়েন্সি হলো প্রতি সেকেন্ডে কয়টি তরঙ্গ অতিক্রম করে তার সংখ্যা। তরঙ্গের একক হার্টজ (Hz)। 30 Hz  মানে এক সেকেন্ডে তিরিশটি বেতার তরঙ্গ। শূন্য মাধ্যমে বেতার তরঙ্গের বেগ আলোর বেগের সমান, অর্থাৎ সেকেন্ডে তিন লক্ষ কিলোমিটার। যেহেতু সব কম্পাঙ্কের জন্যই এই বেগ সমান, সেহেতু তরঙ্গের কম্পাঙ্ক যত বেশি হয়, তরঙ্গের দৈর্ঘ্য তত ছোট হয়। আবার কম্পাঙ্ক যত বেশি হয়, অর্থাৎ এক সেকেন্ডে যত বেশি তরঙ্গ, সেই তরঙ্গের শক্তি তত বেশি। সোজা কথায় বলা চলে, তরঙ্গের কম্পাঙ্ক যত বেশি, তার দৈর্ঘ্য তত ছোট, এবং তার শক্তি তত বেশি।

[4]  1000 Hz = 1 kHz (kilo Hertz)

[5] 1000 kHz = 1 MHz (Mega Hertz)

[6] 1000 MHz = 1 GHz (Giga Hertz)

[7]  1000 GHz = 1 THz (Tera Hertz)


Saturday, 13 March 2021

স্বপ্নলোকের চাবি - পর্ব ১১

 



১১

“এর চেয়ে পাস কোর্সে ডিগ্রি পড়লেও তো এতদিনে সেকেন্ড ইয়ারে উঠে যেতি।“ – খুব নিচুস্বরে অনেকটা স্বগতোক্তির মতো করে বললেও, বাবার কথাগুলি আমার কানের ভেতর দিয়ে মগজে হানা দিলো। এমনিতে শুনলে মনে হবে এটা সাধারণ একটি বাক্য। কিন্তু এর ভেতরে যে ক্ষোভটা আছে তা আমি বুঝতে পেরেছি বলেই না শোনার ভান করে মনযোগ দিয়ে “সংবাদ” এর উপসম্পাদকীয় পড়তে শুরু করলাম। মধ্যবিত্তের সংকট সম্পর্কে অনেক তাত্ত্বিক কথাবার্তা আছে সেখানে– কিন্তু বুঝতে কষ্ট হচ্ছে না। কারণ সেই সংকটের ভেতরেই তো আমাদের বসবাস।

 

মধ্যবিত্তের সমস্যার শেষ নেই। তাদের সংকট শুধু বিত্তের সংকট নয়, চিত্তেরও সংকট। মধ্যবিত্তের সবকিছুই মাপা মাপা। তাদের বিত্ত যেমন সীমিত, তেমনি তাদের চিত্তের আনন্দও সীমিত। খুব আনন্দের সময়ও তারা মেপে মেপে আনন্দ করে। ভাবে বেশি আনন্দ করলে লোকে বলবে অহংকার করছে। আবার খুব দুঃখের সময়ও প্রাণখুলে কাঁদতে পারে না। প্রকাশ্যে কাঁদতেও মধ্যবিত্তের ভদ্রতায় বাধে - পাছে লোকে কিছু বলে। মধ্যবিত্ত নিজের চিন্তা যতটা করে, সম্ভবত তার চেয়েও বেশি ভাবে – লোকে কী বলবে। মধ্যবিত্ত শূন্যবিত্তের কাছ থেকে তো বটেই, নিম্নবিত্তের কাছ থেকেও প্রাণপন চেষ্টায় নিজেদেরকে আলাদা রাখতে চায়। আবার সর্বশক্তি দিয়ে চেষ্টা করে উচ্চবিত্তের দলে নাম লেখাতে। কিন্তু বিত্ত দিয়ে উচ্চবিত্তের সাথে প্রতিযোগিতার সাধ থাকলেও সাধ্য নেই মধ্যবিত্তের। তাই তারা মেধার উপর জোর দেয় বেশি। মধ্যবিত্ত তাদের মধ্যমেধার ছেলেমেয়ের কাছ থেকেও উচ্চমেধার ফলাফল আশা করে। নিজেদের অপূর্ণ যত আশা-আকাঙ্খা – সব বংশানুক্রমিকভাবে পরবর্তী প্রজন্মের ঘাড়ে তুলে দিয়ে সুদখোর মহাজনের মতো বার বার তাগাদা দিতে থাকে – কখন প্রত্যাশিত ফল ফলবে। যখন প্রত্যাশিত ফল ফলে না, তখন ভীষণভাবে হতাশ হয়, কপাল চাপড়ায়। এ ব্যাপারে মধ্যবিত্তের আবেগ অত্যন্ত বেশি। সেই আবেগ আবার সরাসরি প্রকাশ করে না, অন্যকাজের ভেতর দিয়ে তা প্রকাশিত হয়। যেমন একটু আগে আমার বাবা খুব ঠান্ডা গলায় বলেছেন, “এর চেয়ে পাস কোর্সে ডিগ্রি পড়লেও তো এতদিনে সেকেন্ড ইয়ারে উঠে যেতি।“ আমি মধ্যবিত্তের দায়িত্ব এড়ানোর প্রবৃত্তির ধারক হয়ে নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করছি – এই ক্ষোভ পুরোপুরি আমার উপর নয়। তাহলে কার উপর?

 

মধ্যবিত্তের ছোট্ট বাসার বসার ঘরেও খাট বসাতে হয়। দিদির বাসাতেও তাই। খাটের সামনে যেটুকু খালি জায়গা – তাতে দেড়খানা বেতের সোফা, একটি নিচু টেবিল, আর এক কোণায় সাদা-কালো টেলিভিশন। শুক্রবার। বিকেল থেকে টিভিতে পূর্ণদৈর্ঘ্য ছায়াছবি চলছে, আর একটু পর পর বিজ্ঞাপন। দিদির শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়স্বজন খাটের উপর শুয়ে-বসে সিনেমা দেখছেন।

 

বাবা এসেছেন ঘন্টাখানেক হলো। আমি সোফায় তার কাছাকাছি বসেছি। বাবা শুনেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবিরের ভয়ংকর উত্থানের কথা। হল থেকে আমাকে যেভাবে আসতে হয়েছে তার বিবরণ শুনেছেন দিদির কাছে। শুনে বাবা বলেছেন, “আমি তো আগেই বলেছিলাম এরকম হবে। আমার কথা তো তোদের কানে যায় না। চিটাগং কলেজে পড়ছিলি, সেখান থেকে একটা বছর নষ্ট করে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবার কী দরকার ছিল?”

 

খুব চাপাস্বরে কথা বললেও ছোট্ট ঘরে সবার কানে যায় সব কথা। বাবা তা বোঝেন। তাই আর কিছু বলেননি। দিদির শ্বশুরবাড়ির একজন আত্মীয়া দিদিকে বললেন, “তোমার বাবাকে চা-নাস্তা কিছু দিলা না? চা দাও, আমাদেরকেও দাও।“

 

এরপর দিদি বাবার সামনে চানাচুর আর বিস্কুটের প্লেট রেখে রান্নাঘরে গেছে চা বানাতে। মাসখানেকের মধ্যে তার প্রথম সন্তান আসবে পৃথিবীতে। এ অবস্থায় তাদের বাসায় লোকজন অনেক, কিন্তু তাকে সাহায্য করার কেউ নেই।

খাটে বসে আত্মীয়া অনেকটা উচ্চস্বরে দার্শনিক উক্তি করলেন, “ঘরের বউ জজ ব্যারিস্টার হলেও তাদের প্রধান পরিচয় তারা ঘরের বউ। ঘরের কাজ, রান্নাবান্না সবকিছু করার পর হলো জজ-ব্যারিস্টারি।“

দিদি জজ-ব্যারিস্টার না হলেও বিসিএস অফিসার। মেয়েরা বিসিএস অফিসার হলেও যে শ্বশুরবাড়িতে তাদের আলাদা কোন মর্যাদা নেই তা তো দেখতেই পাচ্ছি। কিন্তু বাবার সামনে একথা বলার কারণ কী? আমার বাবা অনেক কষ্ট করে মেয়েকে লেখাপড়া শিখিয়েছেন। মধ্যবিত্তের স্বপ্নের একটি প্রধান স্বপ্ন হলো – ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া শিখে মানুষ হবে। তাঁর একটি স্বপ্ন কিছুটা সফল হয়েছে। মেয়ে সরকারি অফিসার হয়েছে।

 

আমার বাবার টাকা-পয়সা যা আছে তার সবটুকু হিসেব করলে টেনেটুনেও তাঁকে মধ্যবিত্ত বলা যায় কিনা সন্দেহ। অন্যের কাছ থেকে চড়াসুদে টাকা ধার করে তার ছোট্ট দোকান চালাতে হয়। একসাথে বেশি মালামাল কেনার সামর্থ্য নেই বলে মাসের মধ্যে কয়েকবার শহরে আসতে হয়। ১৯৭১ এর আগে অনেক কষ্টে যা কিছু সঞ্চয় করেছিলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় সব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে যান তিনি। রাজাকাররা তার ঘরবাড়ি দোকানপাট লুট করে পুড়িয়ে দেয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় সবকিছু ফেলে শুধুমাত্র সন্তানদের প্রাণ বাঁচাতে তাকে বনে-বাদাড়ে পালিয়ে বেড়াতে হয়েছে। স্বাধীনতার পর আমরা অন্যের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলাম বেশ কয়েক বছর। বাবা নিজে পড়াশোনা তেমন করতে পারেননি। কিন্তু লেখাপড়ার প্রতি তাঁর ভীষণ আগ্রহ ছিল। দিদি যখন প্রথম বিভাগে এসএসসি পাস করলো, তখন গ্রামের অনেকেই বাবাকে বলেছিলেন – মেয়েকে আর পড়ানোর দরকার নেই। বাবা তাদের কারো কোন কথা না শুনে দিদিকে শহরের সরকারি কলেজে পড়িয়েছেন। মনের ভেতর ইচ্ছে ছিল মেয়ে ডাক্তার হবে। কিন্তু মেয়ে ডাক্তার হয়নি। কেমিস্ট্রি পড়েছে। বাবার মনে কে যেন ভয় ঢুকিয়ে দিয়েছিল যে বিশ্ববিদ্যালয়ে মারামারি হয়। তিনি দিদিকে ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি না করিয়ে চিটাগং কলেজে অনার্স পড়িয়েছেন। ওখানে মাস্টার্স ছিল না বলে দিদি ইউনিভার্সিটিতে মাস্টার্স করতে পেরেছে। দিদির বিসিএস পরীক্ষার ভাইভা হয়েছে তার বিয়ের পর। বাবা তাকে সাথে করে ঢাকায় নিয়ে গেছে পিএসসিতে ভাইভা দেয়ার জন্য। মেয়ে বিসিএস পাস করে অফিসার হয়েছে – এর জন্য আমার মধ্যবিত্ত বাবার মনে আনন্দ নিশ্চয় হয়েছে। কিন্তু ছেলে-মেয়েদের কেউ একজন ডাক্তার হবে এই স্বপ্নের কী হবে? সেই স্বপ্নপূরণের দায়িত্ব এসে পড়লো আমার দাদার উপর। কিন্তু সে মেডিকেলে ভর্তিপরীক্ষাও দিলো না। ডাক্তার হয়ে বাবার স্বপ্নপূরণের দায়িত্ব এসে পড়লো আমার মাথায়। কিন্তু আমার মাথার ক্ষমতা সীমাবদ্ধ, আমার মগজ মধ্যমেধার।

 

মধ্যবিত্তের সংকটের মতো মধ্যমেধার সংকটও অনেক জটিল। গ্রামের স্কুলে যেখানে মেধার প্রতিযোগিতা তেমন নেই সেখানে মধ্যমেধাকেও উচ্চমেধা বলে ধরে নেয়া হয়, বিড়ালকেও বাঘ মনে হয় তখন। আইনস্টাইন নাকি বলেছেন – সাফল্যের জন্য যা দরকার তার শতকরা এক ভাগ মাত্র মেধা, বাকি নিরানব্বই ভাগই হলো পরিশ্রম। কিন্তু আমার তো সেরকম পরিশ্রম করতেও ভালো লাগে না।  চট্টগ্রাম কলেজে উচ্চমাধ্যমিকে ভর্তি হবার পর দেখলাম লেখাপড়ার বদলে শহরের অলিতে গলিতে ঘুরে বেড়াতে ভালো লাগছে বেশি। চট্টগ্রাম শহরের প্রত্যেকটা সিনেমা হলে গিয়ে সিনেমা দেখা আমার নিয়মিত ব্যাপার হয়ে দাঁড়ালো। সিনেমা যদি পাঠ্যবিষয় হতো – তাহলে হয়তো সিনেমার প্রতি এরকম আগ্রহ থাকতো না। হোস্টেলের বন্ধুরা যখন সন্ধ্যাবেলা পড়ার টেবিলে, আমি হয়তো তখন গুলজার, কিংবা জলসা, কিংবা বনানী সিনেমায়। পরীক্ষার আগে সিলেক্টিভ কিছু পড়ে কোনরকমে একটা ফার্স্ট ডিভিশন। এখানেই মধ্যমেধার বিপত্তি। সেকেন্ড ডিভিশন পেলে অনার্স পড়াটাকে মূল উদ্দেশ্য করে ফেলা যায়। কিন্তু দুইটা ফার্স্ট ডিভিশন হলেই সবাই মনে করে মেডিকেলে চান্স পাওয়া উচিত। পড়াশোনা করলে চান্স যে পাওয়া যায় না তা নয়। আমার চেয়ে কম নম্বর পেয়েও অনেকে চান্স পেয়েছে। কিন্তু তারা তো পড়াশোনা করেছে। আমি যে পড়াশোনা একেবারেই করিনি তা নয়, তবে কেমিস্ট্রি আমার কাছে বিষবৎ। আমার কিছুই মনে থাকে না। বায়োলজির খটমটে নামগুলি আমার চোখের বিষ। আমি পদার্থবিজ্ঞানের যেটুকু মুখস্থ করতে হয় না, সেটুকু পারি। তাই আমার মনে হলো – ফিজিক্স পড়লে মোটামুটি ঝুলে থাকতে পারবো, কিন্তু অন্য কিছু হলে হাত ফসকে পড়ে যাবো।

 

১৯৮৪তে এইচএসসি পাস করলাম। উৎসাহ নিয়ে মেডিকেলে ভর্তি পরীক্ষা দিলাম। মৌখিক পরীক্ষায় ফিজিক্স ছাড়া আর কোন প্রশ্নের উত্তরই তেমন দিতে পারলাম না। জিজ্ঞেস করা হলো – ভাইরাস আর ব্যাকটেরিয়ার পার্থক্য কী? আমি বললাম, “ব্যাকটেরিয়া দই বানায়, ভাইরাস দই বানায় না।“ স্যার ক্ষেপে গিয়ে বললেন, “সেই দই তুমি খাও?” আমি নিরীহ গলায় বললাম, “না স্যার, আমি দই খাই না। গন্ধ লাগে।“ স্যার আমাকে প্রায় ঘাড় ধরে বের করে দিলেন। বাবাকে তো এসব বলা যায় না। বললাম, দারুণ পরীক্ষা দিয়েছি। তিনি আশা করেছিলেন মেডিকেলে টিকবো। বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিজিক্সে ভর্তি হবার ইচ্ছে শুনে তিনি বললেন ওখানে পড়ার দরকার নেই। চট্টগ্রাম কলেজে ভর্তি হলেই ভালো। মেডিকেলে তো হয়েই যাচ্ছে। মেডিকেলে কী হতে যাচ্ছে সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত ছিলাম না, কিন্তু যখন দেখলাম আমার বেস্ট ফ্রেন্ড সুমন চট্টগ্রাম কলেজে ভর্তি হয়েছে, তখন আমিও ভর্তি হয়ে গেলাম। হোস্টেলে এক সাথে থাকবো, ভাবনা-চিন্তা বেশি করতে হবে না। তাছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ে তো কোন সিনেমা হল নেই।

 

মেডিকেলে যখন টিকলাম না, বাবা খুব কষ্ট পেলেন। বললেন, দ্বিতীয়বারের জন্য প্রস্তুতি নিতে। মধ্যমেধার আবার সংকট। পদার্থবিজ্ঞানে ভর্তি হয়েছি, কিন্তু সেখানে মন নেই। মনে হচ্ছে মেডিকেলে পড়তে হবে। সেখানে পড়ার জন্য বিশালাকৃতির রেটিনা মেডিকেল ভর্তি গাইড পড়তে হবে। মহাকাব্য মহাভারতের সাথে রেটিনার আকৃতিগত কোন পার্থক্য নেই, কিন্তু গুণগত পার্থক্য হলো – মহাভারত পড়লে ঘটনাগুলি মনে থাকে, কিন্তু রেটিনার কোন কিছুই মনে থাকে না। তখন মনে হয় মেডিকেল কলেজে না পড়লে আমার কী এমন অসুবিধা হবে? কিন্তু আমার উচ্চমাধ্যমিকের সহপাঠীরা যখন কাঁধে সাদা অ্যাপ্রন ঝুলিয়ে মেডিকেল কলেজ থেকে চট্টগ্রাম কলেজে আসে, আমি না দেখার ভান করে চলে যেতে চাইলেও ডাক দিয়ে জিজ্ঞেস করে – কি রে প্রদীপ, কেমন আছিস – তখন কেমন যেন লাগে।

 

চট্টগ্রাম কলেজে ফিজিক্সের অনার্সে ভর্তি হয়ে আমার অনেক লাভ হয়েছে। আমি একসাথে প্রায় বিশজন বন্ধু পেয়ে গেছি। উচ্চমাধ্যমিকে সময় কম, ক্লাস বেশি, হোস্টেলের বাইরে তেমন কারো সাথে বন্ধুত্ব হয়নি। কিন্তু অনার্সে ছোট্ট ক্লাস, অনেক সময়। অজিত, মহিউদ্দিন, শওকত, দেবাশিস, সেলিম, কাঞ্চন, টিপু, হেলাল, মোরশেদ, বেবি, শাহীন, রীতা, নাসরিন – সবাই খুব বন্ধু হয়ে গেলাম। স্যার-ম্যাডামরা খুব যত্ন করে পড়ান। কিন্তু উচ্চমাধ্যমিক ক্লাস থাকাতে স্যার-ম্যাডামদের বেশিরভাগ সময় চলে যায় তাদের পেছনে। অনার্সের সিলেবাস, পরীক্ষা সবকিছু নিয়ন্ত্রিত হয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্যার-ম্যাডামরা ক্লাসে যা পড়ান, পরীক্ষায় মোটামুটি সেগুলিই আসে, কারণ তাঁরাই প্রশ্ন করেন। সেখানে কলেজে অনার্স পড়লে পড়াশোনা করতে হয় অনেক বেশি, কিন্তু সে অনুযায়ী রেজাল্ট খুব একটা ভালো হয় না। আর কলেজের দু’একজন শিক্ষক ছাড়া বেশিরভাগ শিক্ষক অনার্সের ক্লাস করাতে তেমন স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন না।  ফাতেমা নার্গিস ম্যাডাম – কানাডা থেকে পিএইচডি করে এসে কলেজে পড়াচ্ছেন, তপন স্যার ইন্ডিয়া থেকে পিএইচডি করেছেন। এঁরা অত্যন্ত ভালো শিক্ষক। চমৎকার পড়ান, প্রচুর জানেন। কিন্তু অন্যান্য স্যাররা উচ্চমাধ্যমিকের জন্য হয়তো ভালো শিক্ষক, কিন্তু অনার্সের ক্লাসের জন্য উপযুক্ত নন। আমি কিছুদিনের মধ্যেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম – ইউনিভার্সিটিতে গিয়ে ভর্তি হবো। ট্রান্সফার নিতে চাইলে ছাড়বে না। অজিত চেষ্টা করেছে ট্রান্সফার নেয়ার। কিন্তু ফিজিক্সের ডিপার্টমেন্টের হেড মোজাম্মেল হক স্যার – তাকে ছাড়েননি। তাই আমাকে আবার নতুন করে ভর্তিপরীক্ষা দিতে হবে।

 

মেডিকেলে দ্বিতীয়বার পরীক্ষা দিয়েও টিকিনি। কিন্তু কাউকে কিছু না বলে ইউনিভার্সিটিতে গিয়ে আবার ফিজিক্সে ভর্তি হয়েছি। এটা জানার পর বাবা খুবই বিরক্ত হয়েছেন। আমার সাথে আমার লেখাপড়া সংক্রান্ত সব ধরনের আলোচনা চুপচাপ বন্ধ করে দিয়েছেন। আমি কিছুদিন চিটাগং কলেজের হোস্টেল থেকে ক্লাস করেছি, এরপর হলে উঠেছি – তিনি জানতেও চাননি কখন কী করছি। স্বপ্নভঙ্গের অভিমান। শিবিরের আক্রমণের পর হল থেকে চলে আসতে হয়েছে জেনে আজ সেই অভিমানেই বললেন, এর চেয়ে পাস কোর্সে ডিগ্রি পড়লেও সেকেন্ড ইয়ারে উঠে যেতাম। আমি শুনেও না শোনার ভান করে রইলাম। বাবা আর কিছু বললেন না। চুপচাপ টিভির দিকে তাকিয়ে রইলেন। এই টিভিটাও তিনি অনেক যত্ন করে কিনেছিলেন মেয়ের বিয়েতে দেয়ার জন্য।

 

আমি ‘সংবাদ’ এর ফাঁকে বাবার দিকে তাকালাম। মনে হলো এই মানুষটা খুব বেশি কিছু তো আশা করেননি। ছেলেমেয়েদের কাউকে ডাক্তারি পড়ানোর স্বপ্ন থাকতেই পারে মানুষের। কিন্তু আমি যে ভর্তি পরীক্ষায় পাস করতে পারছি না। হয়তো সেভাবে চেষ্টা করছি না। শুনেছি ১৯৮৪-তে যারা এইচএসসি পাস করেছে – তারা এবারও মেডিকেলে ভর্তিপরীক্ষা দিতে পারবে। মৌখিক পরীক্ষায় দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া গেছে, তাই এবার মৌখিক পরীক্ষা উঠিয়ে দেয়া হয়েছে। এবার শুধু লিখিত পরীক্ষার ভিত্তিতে ভর্তি করানো হবে। বাবাকে খুশি করার জন্য বললাম, “এবার আবার পরীক্ষা দেবো। এবার মৌখিক পরীক্ষা নেই।“

 

দেখলাম বাবার মুখ কিছুটা প্রসন্ন হলো। কত সহজেই বাবারা সন্তানের ব্যাপারে আশান্বিত হয়ে ওঠেন। একটু পরেই তিনি উঠে বের হয়ে গেলেন নিজের কাজে। আমিও বের হলাম। মেডিকেলে ভর্তিপরীক্ষার চেয়েও দরকারি হলো - আমার এখন একটা থাকার জায়গা খুঁজে বের করতে হবে। 


Friday, 12 March 2021

স্বপ্নলোকের চাবি - পর্ব ১০

 


১০

 

তারস্বরে কাক ডাকছে। ক্যাম্পাসে এত কাক আজ কোত্থেকে এলো বুঝতে পারছি না। হয়তো এখানেই ছিল গাছে গাছে, এতদিন নিত্যদিনের কোলাহলে  আলাদা করে কানে যায়নি তাদের ডাক। আজ এই স্তব্ধ সন্ধ্যায় বড় বেশি কর্কশ মনে হচ্ছে তাদের। হলের গেটের সামনে রাস্তার উপর কাৎ হয়ে পড়ে আছে একটা দুমড়ানো-মোচড়ানো রিকশা। মনে হচ্ছে এর উপর দিয়ে ট্রাক চালিয়ে দেয়া হয়েছে। রিকশার কাছেই চ্যাপ্টা হয়ে শুয়ে আছে একটা মাইকের চতুষ্কোণ বাদামী অ্যামপ্লিফায়ার। আজ সকালেও এই মেশিন সচল ছিল, সাবিনা ইয়াসমিনের শ্রেষ্ঠ সঙ্গীতের শব্দ বহুগুণ বিবর্ধিত হচ্ছিলো এর ভেতরের ইলেকট্রনিক্সের মধ্য দিয়ে। সাইক্লোন থেমে যাবার পর প্রকৃতি যেমন কিছু সময়ের জন্য অপ্রকৃতিস্থ রকমের শান্ত হয়ে যায়, হলের সামনে এখন সেরকম পরিস্থিতি। মানুষের চলাচল আছে, কিন্তু মনে হচ্ছে সেই চলায় ছন্দ নেই। এ ওর সাথে কথা বলছে, কিন্তু মনে হচ্ছে সেরকম শব্দ নেই। অদ্ভুত এক ভয় ঢুকে গেছে আমার ভেতর। হল ছাড়তে হবে কাল সকাল ন’টার মধ্যে। কিন্তু তার আগে তো রুমে যেতে হবে। রুমের অবস্থা কী হয়েছে জানি না এখনো।

 

সোহরাওয়ার্দী হলের অফিসের সামনে, বারান্দায় বীরদর্পে হাঁটছে অনেকে। এদের মধ্যে মুখচেনা কয়েকজন কয়েকদিন আগেও মাথা অনেকটা নিচু করে ধীর পায়ে হাঁটতো। তাদের চলন কয়েক ঘন্টার ব্যবধানেই এখন পশুরাজের মতো হয়ে গেছে। ছাত্রশিবিরের এই রূপ আরো একবার দেখেছিলাম আড়াই বছর আগে ১৯৮৪’র এপ্রিলে চট্টগ্রাম কলেজের সোহরাওয়ার্দী হোস্টেলে। হোস্টেলের রুমের ভেতরই তারা ছুরি দিয়ে জবাই করে ফেলেছিল আমার সহপাঠী বন্ধু শাহাদাতকে। শাহাদাত প্রগতিশীল কথাবার্তা বলতো, যুক্তিবাদী ছিল। ভোরে যখন খবর পেলাম, ছুটে গিয়েছিলাম সোহরাওয়ার্দী হোস্টেলে। তখন দেখেছিলাম হোস্টেলের বারান্দায় শিবিরের দাপুটে তৎপরতা। আজ এখানেও।

 

আস্তে আস্তে হেঁটে গিয়ে দেবাশিসদার রুমে টোকা দিলাম। আলো নিভিয়ে অন্ধকারে বসে আছেন তিনি। রুমে ঢুকার পর দেখলাম আরো চার-পাঁচজন আছেন সেখানে। ফিসফিস করে কথা বলছেন সবাই। চুপচাপ বসে তাঁদের কথাবার্তা শুনতে শুনতে আজ ক্যাম্পাসে কী কী হয়েছে,  তার একটা মোটামুটি ঘটনাচিত্র জানা গেল। ক্যাম্পাসে জাতীয় ছাত্রসমাজের নেতা হামিদ বাহিনীর ভয়ে এতদিন টু শব্দ করতে পারেনি ছাত্রশিবির। বিএনপি, ছাত্রলীগ কিংবা ছাত্রইউনিয়নকে বিভিন্ন হলে কিছুটা ছাড় দিলেও ছাত্রশিবিরকে প্রকাশ্যে কোন ছাড় দেয়নি হামিদ এবং তার ক্যাডাররা। আমানত হলে নাকি ছাত্রশিবিরের সভাপতিকে শিবিরের কর্মীদের সামনে চড় মেরেছিল হামিদ। সেদিনই নাকি হামিদের নাম লেখা হয়ে গেছে শিবিরের হিটলিস্টে। এরশাদ রাষ্ট্রের ক্ষমতা দখল করার পর রাজনৈতিক দল করেছেন বেশিদিন হয়নি। এর মধ্যেই ছাত্রসমাজের এত দাপট তো কোন আদর্শের বলে গড়ে ওঠেনি। বাংলাদেশের স্বাধীনতা্র জন্য যাদের ত্যাগ ও আদর্শের সংগ্রাম সর্বজনস্বীকৃত, সেই ঐতিহ্যবাহী ছাত্রলীগের চেয়েও বেশি নেতা-কর্মী এরা জোগাড় করে ফেললো এত সহজেই! এর পেছনে যে কোন আদর্শ কাজ করেনি – তা তো সবাই বোঝে। ছাত্রসমাজ গায়ের জোরে প্রত্যেক হলেই বেশ কিছু রুম দখল করেছে। সেইসব রুমে থাকার জন্য অন্য পার্টির আদর্শে বিশ্বাসীও অনেকে প্রকাশ্যে ছাত্রসমাজের বিরোধিতা করেনি। সুবিধালোভীদের উপর নির্ভর করে কি বেশিদিন টিকে থাকা যায়? জাতীয় ছাত্রসমাজের কোন আদর্শ ছিল না, লক্ষ্য ছিল না। ছিল শুধু ক্ষমতা দেখানো, পেশীর দাপট দেখানো। কিন্তু মাংসপেশীতে টান পড়লে পেশীশক্তির দাপট চলে যায়। ছাত্রশিবিরের পেশীশক্তিও আছে, আবার তাদের আদর্শে বিশ্বাসী বিপুল কর্মীও আছে। গত এক মাস ধরে হামিদ বাহিনী ক্যাম্পাসে নবীনবরণ করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলো, এ উপলক্ষে বিরাট অংকের চাঁদাবাজি করতে ব্যস্ত ছিল। এর মধ্যে সারাদেশ থেকে শিবিরের ক্যাডাররা যে এসে ক্যাম্পাসের আশেপাশে জড়ো হয়েছে, তা কেউ সেভাবে খেয়ালই করেনি। খেয়াল করবে কীভাবে? জামায়াত-শিবির যেভাবে নিরবে প্রস্তুতি নিতে পারে, অন্যরা কি সেরকম পারে? অন্যরা তো যতটুকু কাজ করে, চিৎকার করে তার চেয়ে বেশি।

 

সবগুলি হলে একযোগে একই সাথে আক্রমণ করা হয়েছে। ছাত্রসমাজের একটা রুমও অক্ষত নেই, একজন নেতাও অক্ষত নেই। হামিদকে ধরেছে সোহরাওয়ার্দীর মোড়ে। ইট দিয়ে মেরে মাটিতে ফেলে ইটের উপর ডান হাত রেখে তলোয়ার দিয়ে এক কোপে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়েছে কনুইয়ের উপর থেকে। একটা একটা করে কেটে ফেলা হয়েছে বাম হাতের প্রত্যেকটি আঙুল। যে হাত দিয়ে হামিদ একদিন ছাত্রশিবিরের সভাপতির গালে চড় মেরেছিল, সেই হাত কেটে তলোয়ারের আগায় গেঁথে হলের সামনে মিছিল করেছে ছাত্রশিবির। শুনে আমার মাথা থেকে পা পর্যন্ত ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে ভয়ে। অবশ্য এদের নিষ্ঠুরতা নতুন কিছু নয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় এরা যেভাবে আমাদের দেশের স্বর্ণসন্তানদের হত্যা করেছিল তার মতো নিষ্ঠুরতা পৃথিবী খুব বেশি দেখেনি।

 

“আমি কি রুমে যেতে পারবো দাদা?” – ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলাম। দেবাশিসদা বললেন, “কেন পারবে না? জানালা দিয়ে দেখো, তোমাদের ব্লকে অনেকেই গেছে তো।“

দেবাশিসদার রুমের জানালা থেকে আমাদের ব্লকের দোতলার বারান্দার কিছুটা অংশ দেখা যায়। বারান্দায় সুসানভাইকে দেখলাম শুকনো মুখে রেলিং-এ ঝুঁকে কিছু একটা দেখছেন। শুনেছি ছাত্রসমাজের সব নেতাই আজ মার খেয়েছে। তবে কি সুসানভাই এখনো মার-খাওয়ার-যোগ্য-নেতা হতে পারেননি? অবশ্য ঘটনার সময় রুমে থাকলে আমিও কি রেহাই পেতাম? জাতীয় ছাত্রসমাজের রুমে থাকি, অথচ আমি তাদের পার্টি সমর্থন করি না এসব বলার সুযোগ পেতাম তলোয়ারের কোপ খাওয়ার অনেক পরে।

 

রুমে ঢুকে কী দেখবো তার একটা মানসিক প্রস্তুতি নিয়েছিলাম দেবাশিসদার রুম থেকে বের হয়ে আমাদের ব্লকের সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠার সময়। কিন্তু রুমে ঢুকে যা দেখলাম তার তুলনায় আমার মানসিক প্রস্তুতি ছিল নগণ্য। মেঝেতে ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়ে আছে আমার ম্যাথমেটিক্যাল ফিজিক্সের বই, খাতাপত্র। টেবিলঘড়িটাকে মনে হয় আছড়ে ভাঙা হয়েছে। পেছনের ডালা খুলে কালো ধাতব স্প্রিং বের হয়ে আছে। মাত্র কয়েকদিন আগে বানানো নতুন তোষক ফালাফালা করে ফেলা হয়েছে। তোষকের ভেতর কী খুঁজেছে তারা? খাটের নিচে আমার বাক্সটা ছিল। আমার মাথায় চড়ে এসেছিল এই বাক্স এই ক্যাম্পাসে। বাক্সটার তালা ভাঙেনি, তালাশুদ্ধ পুরো হুকটাই কেটে ফেলা হয়েছে। ভেতরের সব জিনিস লন্ডভন্ড। সব টাকা-পয়সা রেখেছিলাম বাক্সে। নিয়ে গেছে। ছাত্রশিবির নাকি আদর্শের জন্য সবকিছু করে। হল আক্রমণ করে টাকা চুরি করার মধ্যে কী আদর্শ কাজ করেছে কে জানে। রুমের একটা জানালার কাচও আস্ত নেই। দেয়ালে টাঙানো এরশাদের ছবিটাকে তলোয়ার দিয়ে যতটা খুঁচিয়েছে তার চেয়ে বেশি খোঁচা মেরেছে শ্রীদেবীর ছবিতে। টেবিলে, মশারির স্ট্যান্ডে, চেয়ারের হাতলে তলোয়ারের কোপের দাগ স্পষ্ট। কতক্ষণ ধরে এই তান্ডব চালিয়েছিল তারা?

 

সুসানভাই আমাকে দেখে একটা কথাও বললেন না, চোখ ফিরিয়ে নিলেন অন্যদিকে। এতদিন আমার সামনে যেরকম উদ্ধত নেতৃত্বের একটা ভাব দেখাতেন, আজ সেটা নেই বলেই হয়তো খারাপ লাগছে। আমিও কিছু জিজ্ঞেস করলাম না। একটু পরে চার-পাঁচজন টিচার এলেন। হয়তো প্রক্টরের দলবল। কিন্তু তাদের সাথে তো শিবিরের নেতাও আছে বলে মনে হচ্ছে। বারান্দা থেকে উঁকি দিলেন খোলা দরজা দিয়ে। দরজার যা হাল হয়েছে – ওটা আর বন্ধ করা যাবে না। দলের একজন বললেন, “তোমরা সকাল আটটার মধ্যে চলে যেও। হলের সামনে বাস থাকবে। শহর পর্যন্ত পৌঁছে দেবে।“

 

যাক, সকালে কীভাবে শহরে যাবো সেটা নিয়ে আর ভাবতে হবে না। আপাতত জিনিসপত্র যতটুকু পারি গুছিয়ে রাখি। হলের পাট তো চুকলো। একটু পরে শ্যামলদা এলেন। তাঁর জিনিসপত্র খুব বেশি নেই। ছোট্ট একটা প্যাকেট হলো। সেটা নিয়ে তিনি রাতেই চলে গেলেন। আমার সাথে আবার কখনো দেখা হবে কি না জানি না। একটু পরে অনেক জিনিসপত্র নিয়ে রুমে ঢুকলেন অপরিচিত একজন।

 

“সুসান, আজিয়া আঁত্তু এঁন্ডে থাগা পরিবো। আলাওলর অবস্থা ব্যাশি খারাপ। হেন্ডে স্ট্যানগান দি ব্রাশফায়র গরি চদরভদর গরি ফালাইয়ে।“ – আগন্তুক রুমে ঢুকে হাত থেকে ব্যাগ-বিছানা নামাতে নামাতে হড়বড় করে বলছেন। সুসানভাইয়ের পরিচিত কেউ হবেন। আলাওল হলে কী কী হয়েছে তার বর্ণনা দিচ্ছেন আগন্তুক। ছাত্রসমাজের মূল ঘাঁটি ছিল আলাওল হলে। হামিদ এবং তার ক্যাডাররা থাকতো সেখানে। স্ট্যানগান দিয়ে ব্রাশফায়ার করে ছিন্নভিন্ন করে ফেলা হয়েছে সেসব রুম। আমরা তো শুনেছিলাম ক্যান্টনমেন্ট থেকে স্ট্যানগান সরবরাহ করা হয়েছিল হামিদের ক্যাডারদের। সেসব অস্ত্রও কি এখন শিবিরের হাতে চলে গেছে?

 

সুসানভাইয়ের পরিচিত আগন্তুক টিপু-ভাইয়ের বিছানায় শুয়ে শুয়ে অনবরত কথা বলছেন। সুসানভাই তেমন কোন কথাবার্তা বলছেন না। আমি আমার বইপত্র গোছাতে গোছাতে আগন্তুকের কথা শুনছি। জানা গেলো টিপুভাইও প্রচন্ড মার খেয়েছেন। মাথায় আর চোখে তো আগে থেকেই চোট ছিল, আজ নাকি তার হাত-পাও গেছে। হাত ও পায়ের রগ কেটে দিয়েছে সম্ভবত।

 

ঘুমাতে গিয়ে তোষকের অবস্থা দেখে কেমন যেন লাগছে। শামসুন্নাহার হল থেকে এই তোষক আমার হাতে এসেছিল তোষকাস্ম হয়ে। তারপর তাকে তোষক বানানো হলো। কয়েকদিনের মধ্যেই শিবিরের হাতে এই তোষক ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল। তবুও ভালো যে তোষকের উপর আমি ছিলাম না সেই সময়। রুমের ভেতর প্রচন্ড ঠান্ডা। নভেম্বরের শেষে এমনিতেই শীত। কিন্তু আজ রুমের সব জানালার কাচ ভাঙা। দরজা বন্ধ করা যাচ্ছে না। দরজার পাল্লায় একটা চেয়ার দিয়ে কোন রকমে ঠেকিয়ে রাখা হয়েছে। পাল্লার কাঠের একটা অংশ ভেঙে পড়ে গেছে, সেদিক দিয়ে বাতাস ঢুকছে। দরজা ভাঙার জন্য এরা কী এনেছিল কে জানে।

 

ভীষণ ক্লান্তি লাগছে, কিন্তু ঘুম আসছে না। আগন্তুক দরজা খুলে বাইরে গেলেন, হয়তো বাথরুমে। একটু পর সুসানভাই ফিসফিস করে বললেন, “এই ব্যাটা কিন্তু শিবির করে। সাবধান। শিবির সম্পর্কে কোন মন্তব্য করবে না।“

বলে কী? আমি ভাবতে চেষ্টা করলাম আগন্তুক রুমে ঢুকার পর শিবির সম্পর্কে আমি কিছু বলেছি কি না। মনে করতে পারলাম না।

 

পরদিন সকাল আটটার আগেই বাসে উঠে পড়েছি। টিচার্স বাসে এই প্রথম উঠলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য কী সুন্দর বাসের ব্যবস্থা আছে। ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের জন্য প্রতিদিন যতগুলি বাস ভাড়া করে আনে, সেই ভাড়া দিয়ে অনেক বাস কিনে ফেলা যেতো। বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হয়ে গেছে, বিছানা-বালিশসহ সবকিছু নিয়ে হল ত্যাগ করছি, আর এসময় আমি ভাবছি বিশ্ববিদ্যালয় বাস কিনতে পারতো কি না। মানুষের চিন্তাভাবনার কোন আগামাথা যে থাকে না, তা বুঝতে পারছি।

 

আমার চারটি লাগেজ হয়েছে। তোষকটার তুলা বের হয়ে যাচ্ছে, কাঁথা দিয়ে প্যাঁচাতে হয়েছে। বইপত্র রশি দিয়ে বেঁধেছি। সবচেয়ে ঝামেলা করেছে টিনের বাক্সটি। ওটাকে এমনভাবে কেটে ফেলেছে যে ডালা বন্ধ করা যাচ্ছে না। রশি দিয়ে বাঁধতে হয়েছে ওটাকেও। সব জিনিস একবারে তোলা যায়নি, রুম থেকে বাস পর্যন্ত কয়েকবার আসা-যাওয়া করতে হয়েছে। সব জিনিস বাসে তুলে প্রায় বিধ্বস্ত হয়ে সিটে বসলাম। অনেকগুলি বাস দেয়া হয়েছে, সুতরাং ঠাসাঠাসি ভিড় না করলেও চলে। কিন্তু মনে হচ্ছে সবাই এই বাসেই উঠবে বলে ঠিক করেছে। একটু পরেই বাসে আর জায়গা নেই। আমার মতো ট্রাংক ও বিছানাপত্র নিয়ে যাওয়া লোকের সংখ্যা বেশি নেই। ব্যাগ আর বইপত্র নিয়ে যাচ্ছে সবাই। হল খুললে হয়তো সবাই আবার চলে আসবে হলে। কিন্তু আমার আর হলে ওঠার ইচ্ছে নেই। আমার ভয় হচ্ছে বাবাকে কী বলবো। বিশ্ববিদ্যালয়ে মারামারি হয় – এই কারণ দেখিয়ে তিনি আমাকে বারবার মানা করেছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে।

 

“ও, প্রদীপ তুমি এখানে বসেছো?”

চোখ তুলে দেখি হাতে-কাঁধে দুটো ব্যাগ, গুটানো একটা পাটি, আর একটা বেতের ঝুড়ি নিয়ে আমার সিটের কাছে দাঁড়িয়ে আছেন শিবু চৌধুরি – আমাদের শিবুদা। কেমিস্ট্রির অনেক সিনিয়র দাদা। কয়েক মিনিটের মধ্যেই তাঁর সব জিনিস এখানে ওখানে সিটের নিচে, উপরের তাকে ঢুকিয়ে দিয়ে আমার পাশে বসে পড়লেন।

“কী একটা ঝামেলা করে ফেললো বল তো।“ – শিবুদা এমনভাবে কথাটা বললেন ঠিক বুঝতে পারলাম না কোন্‌ ঝামেলার কথা তিনি বোঝাচ্ছেন। শিবিরের আক্রমণ, বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দেয়া, নাকি এত সকালে হল ত্যাগ করা?

“হায় হায়, পান খাইনি।“ – বলে মুখে এমন একটা হতাশার শব্দ করলেন যেন পরীক্ষার হলে চলে গেছেন প্রবেশপত্র না নিয়ে।

“না, একটু পান খেয়ে আসি। তুমি আমার জিনিসপত্রগুলি একটু দেখিও।“ – বলেই ভীড় ঠেলে বাস থেকে নেমে গেলেন। পাঁচ দশ মিনিট কেটে গেলো। বাসের ড্রাইভারকে গাড়ি ছাড়ার নির্দেশ দেয়া হলো। শিবুদার দেখা নেই। মনে হচ্ছে তিনি পান খাওয়ার জন্য পানের বরজে চলে গেছেন হাটহাজারির দিকে। শিবুদাকে ছাড়াই বাস চলে এলো ক্যাম্পাস ছেড়ে। এখন আমার নতুন ঝামেলা হলো। নিজের এতগুলি লাগেজের সাথে শিবুদার লাগেজও যোগ হলো। কিন্তু তিনি আমাকে কোথায় খুঁজবেন? আমি কোথায় যাবো তা কি তাকে বলেছি?

 

আন্দরকিল্লার মোড়ে আজাদী পত্রিকার অফিসের সামনে বাস থেকে নামলাম। ছাত্রদের কয়েকজন সাহায্য করলেন সবগুলি বোঝা নামাতে। একজন ছাত্রের এতগুলি পোটলা দেখে এই সিরিয়াস সময়েও হাসছে কয়েকজন। একটা রিকশায় সব জিনিস তোলার পর আর আমার বসার জায়গা নেই। দড়ি ছিঁড়ে শিবুদার গুটানো পাটি খুলে লম্বা হয়ে গেছে। রিক্সায় কোনভাবে রাখা যাচ্ছে না ওটা, হাতে নিতে হলো। কাটা-পাহাড় লেন দিয়ে রিকশা টেনে উঠাতে হয়। রিকশার পাশাপাশি হেঁটে হেঁটে এলাম ঘাট ফরহাদবেগ – দিদির বাসায়। দরজা খুলেই আমার মাথায় দড়িবাঁধা ট্রাংক, গলায় একটা শীতলপাটি ঝুলে আছে দেখে দিদি বুঝতে পারছে না ঘটনা কী। সকালের পেপার তারা তখনো পড়েনি। বিশ্ববিদ্যালয়ে এত ঘটনা ঘটে গেছে তা তখনো জানে না তারা।


Latest Post

চিকিৎসাবিজ্ঞানে যান্ত্রিক বুদ্ধিমত্তা

  ধীরে ধীরে চোখের আলো নিভে আসছিলো রিস হিবার্টের। পৃথিবীর আলো দেখার আশা ছেড়েই দিতে হয়েছিল তাঁকে। দু’বছর আগেও বেশ সুস্থ স্বাভাবিক ছিলেন তিনি। ...

Popular Posts