Saturday 13 March 2021

স্বপ্নলোকের চাবি - পর্ব ১১

 



১১

“এর চেয়ে পাস কোর্সে ডিগ্রি পড়লেও তো এতদিনে সেকেন্ড ইয়ারে উঠে যেতি।“ – খুব নিচুস্বরে অনেকটা স্বগতোক্তির মতো করে বললেও, বাবার কথাগুলি আমার কানের ভেতর দিয়ে মগজে হানা দিলো। এমনিতে শুনলে মনে হবে এটা সাধারণ একটি বাক্য। কিন্তু এর ভেতরে যে ক্ষোভটা আছে তা আমি বুঝতে পেরেছি বলেই না শোনার ভান করে মনযোগ দিয়ে “সংবাদ” এর উপসম্পাদকীয় পড়তে শুরু করলাম। মধ্যবিত্তের সংকট সম্পর্কে অনেক তাত্ত্বিক কথাবার্তা আছে সেখানে– কিন্তু বুঝতে কষ্ট হচ্ছে না। কারণ সেই সংকটের ভেতরেই তো আমাদের বসবাস।

 

মধ্যবিত্তের সমস্যার শেষ নেই। তাদের সংকট শুধু বিত্তের সংকট নয়, চিত্তেরও সংকট। মধ্যবিত্তের সবকিছুই মাপা মাপা। তাদের বিত্ত যেমন সীমিত, তেমনি তাদের চিত্তের আনন্দও সীমিত। খুব আনন্দের সময়ও তারা মেপে মেপে আনন্দ করে। ভাবে বেশি আনন্দ করলে লোকে বলবে অহংকার করছে। আবার খুব দুঃখের সময়ও প্রাণখুলে কাঁদতে পারে না। প্রকাশ্যে কাঁদতেও মধ্যবিত্তের ভদ্রতায় বাধে - পাছে লোকে কিছু বলে। মধ্যবিত্ত নিজের চিন্তা যতটা করে, সম্ভবত তার চেয়েও বেশি ভাবে – লোকে কী বলবে। মধ্যবিত্ত শূন্যবিত্তের কাছ থেকে তো বটেই, নিম্নবিত্তের কাছ থেকেও প্রাণপন চেষ্টায় নিজেদেরকে আলাদা রাখতে চায়। আবার সর্বশক্তি দিয়ে চেষ্টা করে উচ্চবিত্তের দলে নাম লেখাতে। কিন্তু বিত্ত দিয়ে উচ্চবিত্তের সাথে প্রতিযোগিতার সাধ থাকলেও সাধ্য নেই মধ্যবিত্তের। তাই তারা মেধার উপর জোর দেয় বেশি। মধ্যবিত্ত তাদের মধ্যমেধার ছেলেমেয়ের কাছ থেকেও উচ্চমেধার ফলাফল আশা করে। নিজেদের অপূর্ণ যত আশা-আকাঙ্খা – সব বংশানুক্রমিকভাবে পরবর্তী প্রজন্মের ঘাড়ে তুলে দিয়ে সুদখোর মহাজনের মতো বার বার তাগাদা দিতে থাকে – কখন প্রত্যাশিত ফল ফলবে। যখন প্রত্যাশিত ফল ফলে না, তখন ভীষণভাবে হতাশ হয়, কপাল চাপড়ায়। এ ব্যাপারে মধ্যবিত্তের আবেগ অত্যন্ত বেশি। সেই আবেগ আবার সরাসরি প্রকাশ করে না, অন্যকাজের ভেতর দিয়ে তা প্রকাশিত হয়। যেমন একটু আগে আমার বাবা খুব ঠান্ডা গলায় বলেছেন, “এর চেয়ে পাস কোর্সে ডিগ্রি পড়লেও তো এতদিনে সেকেন্ড ইয়ারে উঠে যেতি।“ আমি মধ্যবিত্তের দায়িত্ব এড়ানোর প্রবৃত্তির ধারক হয়ে নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করছি – এই ক্ষোভ পুরোপুরি আমার উপর নয়। তাহলে কার উপর?

 

মধ্যবিত্তের ছোট্ট বাসার বসার ঘরেও খাট বসাতে হয়। দিদির বাসাতেও তাই। খাটের সামনে যেটুকু খালি জায়গা – তাতে দেড়খানা বেতের সোফা, একটি নিচু টেবিল, আর এক কোণায় সাদা-কালো টেলিভিশন। শুক্রবার। বিকেল থেকে টিভিতে পূর্ণদৈর্ঘ্য ছায়াছবি চলছে, আর একটু পর পর বিজ্ঞাপন। দিদির শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়স্বজন খাটের উপর শুয়ে-বসে সিনেমা দেখছেন।

 

বাবা এসেছেন ঘন্টাখানেক হলো। আমি সোফায় তার কাছাকাছি বসেছি। বাবা শুনেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবিরের ভয়ংকর উত্থানের কথা। হল থেকে আমাকে যেভাবে আসতে হয়েছে তার বিবরণ শুনেছেন দিদির কাছে। শুনে বাবা বলেছেন, “আমি তো আগেই বলেছিলাম এরকম হবে। আমার কথা তো তোদের কানে যায় না। চিটাগং কলেজে পড়ছিলি, সেখান থেকে একটা বছর নষ্ট করে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবার কী দরকার ছিল?”

 

খুব চাপাস্বরে কথা বললেও ছোট্ট ঘরে সবার কানে যায় সব কথা। বাবা তা বোঝেন। তাই আর কিছু বলেননি। দিদির শ্বশুরবাড়ির একজন আত্মীয়া দিদিকে বললেন, “তোমার বাবাকে চা-নাস্তা কিছু দিলা না? চা দাও, আমাদেরকেও দাও।“

 

এরপর দিদি বাবার সামনে চানাচুর আর বিস্কুটের প্লেট রেখে রান্নাঘরে গেছে চা বানাতে। মাসখানেকের মধ্যে তার প্রথম সন্তান আসবে পৃথিবীতে। এ অবস্থায় তাদের বাসায় লোকজন অনেক, কিন্তু তাকে সাহায্য করার কেউ নেই।

খাটে বসে আত্মীয়া অনেকটা উচ্চস্বরে দার্শনিক উক্তি করলেন, “ঘরের বউ জজ ব্যারিস্টার হলেও তাদের প্রধান পরিচয় তারা ঘরের বউ। ঘরের কাজ, রান্নাবান্না সবকিছু করার পর হলো জজ-ব্যারিস্টারি।“

দিদি জজ-ব্যারিস্টার না হলেও বিসিএস অফিসার। মেয়েরা বিসিএস অফিসার হলেও যে শ্বশুরবাড়িতে তাদের আলাদা কোন মর্যাদা নেই তা তো দেখতেই পাচ্ছি। কিন্তু বাবার সামনে একথা বলার কারণ কী? আমার বাবা অনেক কষ্ট করে মেয়েকে লেখাপড়া শিখিয়েছেন। মধ্যবিত্তের স্বপ্নের একটি প্রধান স্বপ্ন হলো – ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া শিখে মানুষ হবে। তাঁর একটি স্বপ্ন কিছুটা সফল হয়েছে। মেয়ে সরকারি অফিসার হয়েছে।

 

আমার বাবার টাকা-পয়সা যা আছে তার সবটুকু হিসেব করলে টেনেটুনেও তাঁকে মধ্যবিত্ত বলা যায় কিনা সন্দেহ। অন্যের কাছ থেকে চড়াসুদে টাকা ধার করে তার ছোট্ট দোকান চালাতে হয়। একসাথে বেশি মালামাল কেনার সামর্থ্য নেই বলে মাসের মধ্যে কয়েকবার শহরে আসতে হয়। ১৯৭১ এর আগে অনেক কষ্টে যা কিছু সঞ্চয় করেছিলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় সব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে যান তিনি। রাজাকাররা তার ঘরবাড়ি দোকানপাট লুট করে পুড়িয়ে দেয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় সবকিছু ফেলে শুধুমাত্র সন্তানদের প্রাণ বাঁচাতে তাকে বনে-বাদাড়ে পালিয়ে বেড়াতে হয়েছে। স্বাধীনতার পর আমরা অন্যের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলাম বেশ কয়েক বছর। বাবা নিজে পড়াশোনা তেমন করতে পারেননি। কিন্তু লেখাপড়ার প্রতি তাঁর ভীষণ আগ্রহ ছিল। দিদি যখন প্রথম বিভাগে এসএসসি পাস করলো, তখন গ্রামের অনেকেই বাবাকে বলেছিলেন – মেয়েকে আর পড়ানোর দরকার নেই। বাবা তাদের কারো কোন কথা না শুনে দিদিকে শহরের সরকারি কলেজে পড়িয়েছেন। মনের ভেতর ইচ্ছে ছিল মেয়ে ডাক্তার হবে। কিন্তু মেয়ে ডাক্তার হয়নি। কেমিস্ট্রি পড়েছে। বাবার মনে কে যেন ভয় ঢুকিয়ে দিয়েছিল যে বিশ্ববিদ্যালয়ে মারামারি হয়। তিনি দিদিকে ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি না করিয়ে চিটাগং কলেজে অনার্স পড়িয়েছেন। ওখানে মাস্টার্স ছিল না বলে দিদি ইউনিভার্সিটিতে মাস্টার্স করতে পেরেছে। দিদির বিসিএস পরীক্ষার ভাইভা হয়েছে তার বিয়ের পর। বাবা তাকে সাথে করে ঢাকায় নিয়ে গেছে পিএসসিতে ভাইভা দেয়ার জন্য। মেয়ে বিসিএস পাস করে অফিসার হয়েছে – এর জন্য আমার মধ্যবিত্ত বাবার মনে আনন্দ নিশ্চয় হয়েছে। কিন্তু ছেলে-মেয়েদের কেউ একজন ডাক্তার হবে এই স্বপ্নের কী হবে? সেই স্বপ্নপূরণের দায়িত্ব এসে পড়লো আমার দাদার উপর। কিন্তু সে মেডিকেলে ভর্তিপরীক্ষাও দিলো না। ডাক্তার হয়ে বাবার স্বপ্নপূরণের দায়িত্ব এসে পড়লো আমার মাথায়। কিন্তু আমার মাথার ক্ষমতা সীমাবদ্ধ, আমার মগজ মধ্যমেধার।

 

মধ্যবিত্তের সংকটের মতো মধ্যমেধার সংকটও অনেক জটিল। গ্রামের স্কুলে যেখানে মেধার প্রতিযোগিতা তেমন নেই সেখানে মধ্যমেধাকেও উচ্চমেধা বলে ধরে নেয়া হয়, বিড়ালকেও বাঘ মনে হয় তখন। আইনস্টাইন নাকি বলেছেন – সাফল্যের জন্য যা দরকার তার শতকরা এক ভাগ মাত্র মেধা, বাকি নিরানব্বই ভাগই হলো পরিশ্রম। কিন্তু আমার তো সেরকম পরিশ্রম করতেও ভালো লাগে না।  চট্টগ্রাম কলেজে উচ্চমাধ্যমিকে ভর্তি হবার পর দেখলাম লেখাপড়ার বদলে শহরের অলিতে গলিতে ঘুরে বেড়াতে ভালো লাগছে বেশি। চট্টগ্রাম শহরের প্রত্যেকটা সিনেমা হলে গিয়ে সিনেমা দেখা আমার নিয়মিত ব্যাপার হয়ে দাঁড়ালো। সিনেমা যদি পাঠ্যবিষয় হতো – তাহলে হয়তো সিনেমার প্রতি এরকম আগ্রহ থাকতো না। হোস্টেলের বন্ধুরা যখন সন্ধ্যাবেলা পড়ার টেবিলে, আমি হয়তো তখন গুলজার, কিংবা জলসা, কিংবা বনানী সিনেমায়। পরীক্ষার আগে সিলেক্টিভ কিছু পড়ে কোনরকমে একটা ফার্স্ট ডিভিশন। এখানেই মধ্যমেধার বিপত্তি। সেকেন্ড ডিভিশন পেলে অনার্স পড়াটাকে মূল উদ্দেশ্য করে ফেলা যায়। কিন্তু দুইটা ফার্স্ট ডিভিশন হলেই সবাই মনে করে মেডিকেলে চান্স পাওয়া উচিত। পড়াশোনা করলে চান্স যে পাওয়া যায় না তা নয়। আমার চেয়ে কম নম্বর পেয়েও অনেকে চান্স পেয়েছে। কিন্তু তারা তো পড়াশোনা করেছে। আমি যে পড়াশোনা একেবারেই করিনি তা নয়, তবে কেমিস্ট্রি আমার কাছে বিষবৎ। আমার কিছুই মনে থাকে না। বায়োলজির খটমটে নামগুলি আমার চোখের বিষ। আমি পদার্থবিজ্ঞানের যেটুকু মুখস্থ করতে হয় না, সেটুকু পারি। তাই আমার মনে হলো – ফিজিক্স পড়লে মোটামুটি ঝুলে থাকতে পারবো, কিন্তু অন্য কিছু হলে হাত ফসকে পড়ে যাবো।

 

১৯৮৪তে এইচএসসি পাস করলাম। উৎসাহ নিয়ে মেডিকেলে ভর্তি পরীক্ষা দিলাম। মৌখিক পরীক্ষায় ফিজিক্স ছাড়া আর কোন প্রশ্নের উত্তরই তেমন দিতে পারলাম না। জিজ্ঞেস করা হলো – ভাইরাস আর ব্যাকটেরিয়ার পার্থক্য কী? আমি বললাম, “ব্যাকটেরিয়া দই বানায়, ভাইরাস দই বানায় না।“ স্যার ক্ষেপে গিয়ে বললেন, “সেই দই তুমি খাও?” আমি নিরীহ গলায় বললাম, “না স্যার, আমি দই খাই না। গন্ধ লাগে।“ স্যার আমাকে প্রায় ঘাড় ধরে বের করে দিলেন। বাবাকে তো এসব বলা যায় না। বললাম, দারুণ পরীক্ষা দিয়েছি। তিনি আশা করেছিলেন মেডিকেলে টিকবো। বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিজিক্সে ভর্তি হবার ইচ্ছে শুনে তিনি বললেন ওখানে পড়ার দরকার নেই। চট্টগ্রাম কলেজে ভর্তি হলেই ভালো। মেডিকেলে তো হয়েই যাচ্ছে। মেডিকেলে কী হতে যাচ্ছে সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত ছিলাম না, কিন্তু যখন দেখলাম আমার বেস্ট ফ্রেন্ড সুমন চট্টগ্রাম কলেজে ভর্তি হয়েছে, তখন আমিও ভর্তি হয়ে গেলাম। হোস্টেলে এক সাথে থাকবো, ভাবনা-চিন্তা বেশি করতে হবে না। তাছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ে তো কোন সিনেমা হল নেই।

 

মেডিকেলে যখন টিকলাম না, বাবা খুব কষ্ট পেলেন। বললেন, দ্বিতীয়বারের জন্য প্রস্তুতি নিতে। মধ্যমেধার আবার সংকট। পদার্থবিজ্ঞানে ভর্তি হয়েছি, কিন্তু সেখানে মন নেই। মনে হচ্ছে মেডিকেলে পড়তে হবে। সেখানে পড়ার জন্য বিশালাকৃতির রেটিনা মেডিকেল ভর্তি গাইড পড়তে হবে। মহাকাব্য মহাভারতের সাথে রেটিনার আকৃতিগত কোন পার্থক্য নেই, কিন্তু গুণগত পার্থক্য হলো – মহাভারত পড়লে ঘটনাগুলি মনে থাকে, কিন্তু রেটিনার কোন কিছুই মনে থাকে না। তখন মনে হয় মেডিকেল কলেজে না পড়লে আমার কী এমন অসুবিধা হবে? কিন্তু আমার উচ্চমাধ্যমিকের সহপাঠীরা যখন কাঁধে সাদা অ্যাপ্রন ঝুলিয়ে মেডিকেল কলেজ থেকে চট্টগ্রাম কলেজে আসে, আমি না দেখার ভান করে চলে যেতে চাইলেও ডাক দিয়ে জিজ্ঞেস করে – কি রে প্রদীপ, কেমন আছিস – তখন কেমন যেন লাগে।

 

চট্টগ্রাম কলেজে ফিজিক্সের অনার্সে ভর্তি হয়ে আমার অনেক লাভ হয়েছে। আমি একসাথে প্রায় বিশজন বন্ধু পেয়ে গেছি। উচ্চমাধ্যমিকে সময় কম, ক্লাস বেশি, হোস্টেলের বাইরে তেমন কারো সাথে বন্ধুত্ব হয়নি। কিন্তু অনার্সে ছোট্ট ক্লাস, অনেক সময়। অজিত, মহিউদ্দিন, শওকত, দেবাশিস, সেলিম, কাঞ্চন, টিপু, হেলাল, মোরশেদ, বেবি, শাহীন, রীতা, নাসরিন – সবাই খুব বন্ধু হয়ে গেলাম। স্যার-ম্যাডামরা খুব যত্ন করে পড়ান। কিন্তু উচ্চমাধ্যমিক ক্লাস থাকাতে স্যার-ম্যাডামদের বেশিরভাগ সময় চলে যায় তাদের পেছনে। অনার্সের সিলেবাস, পরীক্ষা সবকিছু নিয়ন্ত্রিত হয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্যার-ম্যাডামরা ক্লাসে যা পড়ান, পরীক্ষায় মোটামুটি সেগুলিই আসে, কারণ তাঁরাই প্রশ্ন করেন। সেখানে কলেজে অনার্স পড়লে পড়াশোনা করতে হয় অনেক বেশি, কিন্তু সে অনুযায়ী রেজাল্ট খুব একটা ভালো হয় না। আর কলেজের দু’একজন শিক্ষক ছাড়া বেশিরভাগ শিক্ষক অনার্সের ক্লাস করাতে তেমন স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন না।  ফাতেমা নার্গিস ম্যাডাম – কানাডা থেকে পিএইচডি করে এসে কলেজে পড়াচ্ছেন, তপন স্যার ইন্ডিয়া থেকে পিএইচডি করেছেন। এঁরা অত্যন্ত ভালো শিক্ষক। চমৎকার পড়ান, প্রচুর জানেন। কিন্তু অন্যান্য স্যাররা উচ্চমাধ্যমিকের জন্য হয়তো ভালো শিক্ষক, কিন্তু অনার্সের ক্লাসের জন্য উপযুক্ত নন। আমি কিছুদিনের মধ্যেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম – ইউনিভার্সিটিতে গিয়ে ভর্তি হবো। ট্রান্সফার নিতে চাইলে ছাড়বে না। অজিত চেষ্টা করেছে ট্রান্সফার নেয়ার। কিন্তু ফিজিক্সের ডিপার্টমেন্টের হেড মোজাম্মেল হক স্যার – তাকে ছাড়েননি। তাই আমাকে আবার নতুন করে ভর্তিপরীক্ষা দিতে হবে।

 

মেডিকেলে দ্বিতীয়বার পরীক্ষা দিয়েও টিকিনি। কিন্তু কাউকে কিছু না বলে ইউনিভার্সিটিতে গিয়ে আবার ফিজিক্সে ভর্তি হয়েছি। এটা জানার পর বাবা খুবই বিরক্ত হয়েছেন। আমার সাথে আমার লেখাপড়া সংক্রান্ত সব ধরনের আলোচনা চুপচাপ বন্ধ করে দিয়েছেন। আমি কিছুদিন চিটাগং কলেজের হোস্টেল থেকে ক্লাস করেছি, এরপর হলে উঠেছি – তিনি জানতেও চাননি কখন কী করছি। স্বপ্নভঙ্গের অভিমান। শিবিরের আক্রমণের পর হল থেকে চলে আসতে হয়েছে জেনে আজ সেই অভিমানেই বললেন, এর চেয়ে পাস কোর্সে ডিগ্রি পড়লেও সেকেন্ড ইয়ারে উঠে যেতাম। আমি শুনেও না শোনার ভান করে রইলাম। বাবা আর কিছু বললেন না। চুপচাপ টিভির দিকে তাকিয়ে রইলেন। এই টিভিটাও তিনি অনেক যত্ন করে কিনেছিলেন মেয়ের বিয়েতে দেয়ার জন্য।

 

আমি ‘সংবাদ’ এর ফাঁকে বাবার দিকে তাকালাম। মনে হলো এই মানুষটা খুব বেশি কিছু তো আশা করেননি। ছেলেমেয়েদের কাউকে ডাক্তারি পড়ানোর স্বপ্ন থাকতেই পারে মানুষের। কিন্তু আমি যে ভর্তি পরীক্ষায় পাস করতে পারছি না। হয়তো সেভাবে চেষ্টা করছি না। শুনেছি ১৯৮৪-তে যারা এইচএসসি পাস করেছে – তারা এবারও মেডিকেলে ভর্তিপরীক্ষা দিতে পারবে। মৌখিক পরীক্ষায় দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া গেছে, তাই এবার মৌখিক পরীক্ষা উঠিয়ে দেয়া হয়েছে। এবার শুধু লিখিত পরীক্ষার ভিত্তিতে ভর্তি করানো হবে। বাবাকে খুশি করার জন্য বললাম, “এবার আবার পরীক্ষা দেবো। এবার মৌখিক পরীক্ষা নেই।“

 

দেখলাম বাবার মুখ কিছুটা প্রসন্ন হলো। কত সহজেই বাবারা সন্তানের ব্যাপারে আশান্বিত হয়ে ওঠেন। একটু পরেই তিনি উঠে বের হয়ে গেলেন নিজের কাজে। আমিও বের হলাম। মেডিকেলে ভর্তিপরীক্ষার চেয়েও দরকারি হলো - আমার এখন একটা থাকার জায়গা খুঁজে বের করতে হবে। 


No comments:

Post a Comment

Latest Post

Hendrik Lorentz: Einstein's Mentor

  Speaking about Professor Hendrik Lorentz, Einstein unhesitatingly said, "He meant more to me personally than anybody else I have met ...

Popular Posts