পৃথিবীর বাইরে অন্য কোনো গ্রহ বা উপগ্রহে প্রাণের অস্তিত্বের প্রমাণ এখনো নিশ্চিতভাবে পাওয়া না গেলেও, অনেকেই বিশ্বাস করেন যে ভিন গ্রহেও প্রাণী আছে এবং সেই প্রাণীরা পৃথিবীর মানুষের চেয়েও উন্নত। প্রাচীন লোককাহিনিতে অন্যান্য গ্রহ নক্ষত্র থেকে বিভিন্ন ধরনের প্রাণীর পৃথিবীতে আনাগোনা খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। সেই কল্পকাহিনিগুলো বৈজ্ঞানিক উপাদানে নতুনভাবে সেজে উঠেছে কল্পবিজ্ঞানের গল্পে। তবে অনেকেই কল্পবিজ্ঞানের এলিয়েনকে সত্যি বলে মনে করেন। এলিয়েন শব্দের আক্ষরিক অর্থ ‘ভিনদেশের মানুষ’ হলেও এর প্রায়োগিক অর্থ দাঁড়িয়ে গেছে ভিনগ্রহের প্রাণী হিসেবে।
২০১৭ সালের ডিসেম্বরে 'নিউইয়র্ক পোস্ট' পত্রিকা পৃথিবীর চব্বিশটি দেশের ছাব্বিশ হাজার মানুষের মতামতের ভিত্তিতে একটি প্রতিবেদনে দেখায় যে পৃথিবীর অর্ধেক মানুষ বিশ্বাস করে এলিয়েন আছে। আমেরিকাসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের অনেক মানুষ মাঝে মাঝে দাবি করেন যে তাদের সাথে এলিয়েনের দেখা হয়েছে, কিংবা এলিয়েনরা এসে তাদেরকে কোথাও ধরে নিয়ে গেছে। এলিয়েনের সাথে মানুষের সাক্ষাৎ ঘটার ব্যাপারটা যে পুরোপুরি বানানোও হতে পারে, সেটা মানতে রাজি নন অনেকে। এই অনেকের মধ্যে অনেক বিখ্যাত ব্যক্তিও আছেন। হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের সাইকিয়াট্রির প্রফেসর জন ম্যাক বিশ্বাস করতেন যে এলিয়েন আছে এবং তারা মানুষের সাথে দুর্ব্যবহারও করে। এ নিয়ে "অ্যাবডাকশান: হিউম্যান এনকাউন্টার উইথ এলিয়েনস" নামে একটা ঢাউস বইও লিখেছিলেন তিনি [১]। বইটিতে তিনি যেসব ঘটনা উল্লেখ করেছেন - সেগুলো সবই মানুষের সাথে এলিয়েনের সংযোগ, সংঘাত ইত্যাদি নিয়ে। এবং তিনি বিশ্বাস করেন যে এগুলো সব সত্য ঘটনা।
কিন্তু এলিয়েন কি আসলেই আছে? এত বড় মহাবিশ্বের
এত কোটি কোটি নক্ষত্রের আরো কোটি কোটি গ্রহের কোনোটাতেই কোনো প্রাণের অস্তিত্ব নেই
– সেকথা জোর দিয়ে বলার পক্ষে যথেষ্ট জোরালো প্রমাণ এখনো নেই। খুব কম সময়ের মধ্যে পুরো
মহাবিশ্ব খুঁজে দেখার মতো প্রযুক্তি এখনো মানুষের নেই। তাই মহাবিশ্বের কোথাও না কোথাও
এলিয়েন থাকার সম্ভাবনাকে এখন বৈজ্ঞানিকভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এলিয়েন: কল্পনা থেকে বৈজ্ঞানিক প্রশ্ন
“এলিয়েন” এর ধারণা প্রাচীন, কিন্তু এর বৈজ্ঞানিক প্রশ্ন আধুনিক। এখনো পর্যন্ত পৃথিবী ছাড়া মহাবিশ্বের আর কোথাও জীবনের সন্ধান পাওয়া না যাওয়ার ঘটনাকে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধিৎসায় প্রশ্ন করা যায় - জীবন কি মহাবিশ্বের একটি সাধারণ ঘটনা, নাকি পৃথিবী জীববৈজ্ঞানিকভাবে ব্যতিক্রমী?
আজ এই কৌতূহলকে অনুসন্ধান
করা হচ্ছে জ্যোতির্বিজ্ঞান, অণুজীববিজ্ঞান, বায়ুমণ্ডলীয় বর্ণালীবীক্ষণ, তড়িৎচুম্বক তরঙ্গ বিশ্লেষণ,
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং মহাকাশ অনুসন্ধানের
মাধ্যমে। এখন
বিজ্ঞানীরা সরাসরি এলিয়েনের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন করার বদলে গুচ্ছ গুচ্ছ প্রশ্ন করছেন।
এখন তাঁরা জানতে চাইছেন: পৃথিবীর বাইরে
কি অণুজীব আছে? জটিল জীবন
আছে? বুদ্ধিমান প্রযুক্তিনির্ভর সভ্যতা আছে? তারা কি
কখনো পৃথিবীতে এসেছে? এলিয়েন জীবন কি পৃথিবীর
জীবনের থেকে এতটাই ভিন্ন
হতে পারে যে আমরা
তাকে চিনতেই পারব না?
আধুনিক
বিজ্ঞান এসব সম্ভাবনার ক্ষেত্রে
ভিন্ন ভিন্ন মাত্রার নির্ণায়ক (প্যারামিটার) ব্যবহার করছে। পৃথিবীর বাইরে অণুজীব থাকার সম্ভাবনা বৈজ্ঞানিকভাবে স্বীকৃত। মানুষের মতো জটিল জীবনের উদ্ভবও সম্ভব, তবে এখনো অনিশ্চিত। প্রযুক্তিনির্ভর
সভ্যতাও সম্ভব, কিন্তু এখনো তা নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত
নয়। আর
এলিয়েনদের পৃথিবীতে আগমনের দাবির পক্ষে এখনো নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক
প্রমাণ নেই।
২০২৬
সালের মে মাস পর্যন্ত
মার্কিন মহাকাশ সংস্থা নাসার এক্সোপ্ল্যানেট
আর্কাইভে ৬,২০০-এর বেশি নিশ্চিত
এক্সোপ্ল্যানেট তালিকাভুক্ত হয়েছে [২]। এর ফলে আমাদের বৈজ্ঞানিক চিন্তাধারায় বড় পরিবর্তন এসেছে। বিংশ
শতকের শুরুতেও আমরা জানতাম না
সৌরজগতের
গ্রহগুলি অতি সাধারণ নাকি
বিরল। অর্থাৎ
সব নক্ষত্রেরই গ্রহ-উপগ্রহ আছে কি না আমরা জানতাম না। এখন আমরা জানি গ্রহমণ্ডল
খুবই ব্যাপক। প্রশ্নটি
তাই “অন্য গ্রহ আছে
কি?” থেকে সরে এসে
দাঁড়িয়েছে: “এর মধ্যে কতগুলো
গ্রহ বাসযোগ্য, জীবনসমৃদ্ধ,
অথবা প্রযুক্তিনির্ভর সভ্যতার আবাস?” এই প্রশ্নগুলির নিশ্চিত উত্তর পাওয়া গেলে
আমরা জানতে পারবো এলিয়েন আসলেই আছে কি নেই।
ইউ-এফ-ও থেকে ইউ-এ-পি
এলিয়েনের অস্তিত্বের প্রমাণ হিসেবে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত উদাহরণ হলো ইউ-এফ-ও। এলিয়েন প্রসঙ্গে অশনাক্ত উড়ন্ত বস্তু বা Unidentified Flying Object, সংক্ষেপে ইউ-এফ-ও খুবই জনপ্রিয় শব্দবন্ধ। অনেকেই ইউ-এফ-ও দেখেছেন বলে দাবি করেন। দীর্ঘদিন ধরে উড়ন্ত চাকতি বা ফ্লাইং সসারকে এলিয়েনদের মহাকাশযান বলে প্রমাণ করার চেষ্টা চলছে বিভিন্ন মহল থেকে। যদিও এদের কোনো সত্যিকারের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। ইউ-এফ-ও সংক্রান্ত অনেক ঘটনা মার্কিন তদন্তকারী সংস্থায় নথিভুক্ত করা হয়েছে। সম্প্রতি সেই নথিগুলি সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেয়ার পর এ ব্যাপারে কৌতুহল নতুন মাত্রা পেয়েছে।
আধুনিক
UFO যুগের সূচনা সাধারণত ধরা হয় ১৯৪৭
সাল থেকে। সে
বছর মার্কিন পাইলট কেনেথ আর্নল্ড ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের মাউন্ট রেইনিয়ারের কাছে কয়েকটি দ্রুতগতির
বস্তু দেখার দাবি করেন।
সংবাদপত্রগুলো এই ঘটনার পর
“flying saucers” বা “উড়ন্ত চাকতি” শব্দবন্ধ জনপ্রিয় করে তোলে, এবং
জনসাধারণের কৌতূহল দ্রুত বেড়ে যায়। একই
বছরে নিউ মেক্সিকোতে কথিত
রসওয়েল ঘটনা ঘটে।
রসওয়েল ঘটনা ছিল রসওয়েলের কাছে অস্বাভাবিক ধ্বংসাবশেষ উদ্ধার করার একটি ঘটনা। যুক্তরাষ্ট্রের
সামরিক বাহিনী প্রথমে একটি “flying disc” উদ্ধারের কথা জানালেও পরে
সেটিকে আবহাওয়া বেলুন বলে ব্যাখ্যা করে। কয়েক
দশক পরে রসওয়েল UFO ষড়যন্ত্রতত্ত্বের
কেন্দ্রে চলে আসে, যদিও
সরকারি ব্যাখ্যায় ঘটনাটিকে বহির্জাগতিক মহাকাশযানের বদলে গোপন বেলুন
প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত করা হয়।
তদানীন্তন সোভিয়েত
ইউনিয়ন এবং আমেরিকার মধ্যে শীতল যুদ্ধের
সময় UFO রিপোর্ট আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্রের
বিমানবাহিনী ‘প্রজেক্ট
সাইন’, প্রজেক্ট গ্রাজ এবং পরে প্রজেক্ট ‘ব্লু বুক’-এর মাধ্যমে বিভিন্ন
UFO দেখার ঘটনা তদন্ত করে। ১৯৫২
থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত
প্রজেক্ট ব্লু বুক চলেছিল
এবং হাজার হাজার রিপোর্ট পরীক্ষা করেছিল। অধিকাংশ
ঘটনাকে বিমান, বেলুন, স্বাভাবিক প্রাকৃতিক জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক,
অথবা আবহাওয়া-জনিত ঘটনা বা
ভুল শনাক্তকরণ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়।
অল্প কিছু ঘটনা ব্যাখ্যাতীত
থেকে যায়। তবে
“ব্যাখ্যাতীত” মানেই “এলিয়েন” নয়; সাধারণত এর
অর্থ হলো নির্দিষ্টভাবে শনাক্ত
করার মতো যথেষ্ট প্রমাণ
ছিল না।
১৯৭০-এর দশক থেকে
UFO জনপ্রিয় সংস্কৃতির গভীরে প্রবেশ করে। বই,
চলচ্চিত্র, টেলিভিশন অনুষ্ঠান এবং কথিত এলিয়েন
অপহরণের গল্প জনমানসে UFO-কে
আরও রহস্যময় করে তোলে।
একই সময়ে বিজ্ঞানীরা সাধারণত সতর্ক অবস্থান বজায় রাখেন, কারণ অধিকাংশ UFO প্রমাণ
ছিল প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য, অস্পষ্ট ছবি, অসম্পূর্ণ রাডার
তথ্য বা ব্যক্তিগত দাবির
ওপর নির্ভরশীল। বৈজ্ঞানিক
প্রমাণের অভাবে UFO মূলধারার বিজ্ঞানের বাইরে থেকে যায়।
সাম্প্রতিক
বছরগুলোতে বিষয়টি নতুন নামে আবার
সরকারি আলোচনায় ফিরে এসেছে।
বিজ্ঞানী এবং সরকারি সংস্থাগুলো
এখন ক্রমশ ইউ-এ-পি শব্দটি ব্যবহার করছে, যার অর্থ Unidentified Anomalous Phenomena বা “অশনাক্ত অস্বাভাবিক
ঘটনা”। এই
পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ। “UFO” শব্দটি শুধুমাত্র
আকাশে উড়ন্ত কোনো বস্তুর ইঙ্গিত
দেয়। “UAP” শব্দটি বিস্তৃত
এবং সাংস্কৃতিকভাবে কম পক্ষপাতদুষ্ট।
অশনাক্ত মানেই বহির্জাগতিক নয়। এর
অর্থ হলো উপলব্ধ প্রমাণের
ভিত্তিতে ঘটনাটি শনাক্ত করা যায়নি।
অনেক UAP ঘটনা পরে বিমান,
বেলুন, স্যাটেলাইট, বায়ুমণ্ডলীয় প্রভাব, সামরিক প্রযুক্তি, সেন্সর ত্রুটি, দৃষ্টিবিভ্রম, ক্যামেরার আর্টিফ্যাক্ট বা ইচ্ছাকৃত প্রতারণা
হিসেবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। অল্প
কিছু ঘটনা ব্যাখ্যাতীত থাকতে
পারে, কিন্তু ব্যাখ্যাতীত মানেই এলিয়েন নয়।
২০২১ সালে আমেরিকান
সরকারের অফিস অব দ্য ডিরেক্টর অব ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স (ODNI) ইউ-এ-পির প্রাথমিক মূল্যায়ন
প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এটি ছিল
আধুনিক যুগের অন্যতম প্রথম বড় সরকারী রিপোর্ট,
যেখানে UAP-কে কেবল প্রান্তিক
বা কল্পনাপ্রসূত বিষয় হিসেবে নয়,
বরং জাতীয় নিরাপত্তা এবং ফ্লাইট সেফটি-র বিষয় হিসেবে
বিবেচনা করা হয়। এই রিপোর্টে সামরিক
বাহিনীর পর্যবেক্ষণে ধরা পড়া অনেক UAP ঘটনার পর্যালোচনা করা হয়।
বিশ্লেষণে উঠে আসে – ইউএপি ঘটনাগুলির
তথ্যের মান অনেক ক্ষেত্রে দুর্বল,
রিপোর্টিং-এ পদ্ধতিগত অসংলগ্নতা আছে, উপাত্ত বা ডেটা
অসম্পূর্ণ এবং বিশ্লেষণও অনেক ক্ষেত্রে ত্রুটিপূর্ণ।
২০২১ সালে ন্যাশনাল
ডিফেন্স অথরাইজেশান অ্যাক্ট (NDAA) গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। এই আইনের ভিত্তিতে ২০২২
সালে গঠিত হয় অল-ডোমেইন অ্যানোমেলি রেজলিউশান অফিস (AARO)। প্রতিষ্ঠা সংক্রান্ত নির্দেশনায় বলা হয়, AARO-এর
কাজ হলো সামরিক স্থাপনা,
অপারেশন এলাকা, প্রশিক্ষণ এলাকা, বিশেষ আকাশসীমা এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ
এলাকার কাছাকাছি অজ্ঞাত বা অস্বাভাবিক বস্তু
শনাক্ত করা, চিহ্নিত করা
এবং তার উৎস নির্ধারণ
করা। ২০২৩
সালের শেষে আমেরিকার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন NDAA স্বাক্ষর করেন। এই আইনের ভিত্তিতে
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল
আর্কাইভ একটি সরকারি
ইউ-এ-পি রেকর্ডস কালেকশান তৈরি
করেছে। আমেরিকান
মহাকাশ সংস্থা নাসা ইউ-এ-পি গবেষণাকে
বৈজ্ঞানিক সুযোগ হিসেবে দেখছে। তবে উন্নত ডেটা,
মানসম্মত রিপোর্টিং এবং কঠোর বিশ্লেষণের
প্রয়োজনীয়তার ওপরও তারা জোর দিচ্ছে।
আমেরিকার বর্তমান
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউ-এ-পি ঘটনার ফাইলগুলি সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেয়ার
নির্দেশনা দেন – যা প্রেসিডেন্সিয়াল আনসিলিং অ্যান্ড রিপোর্টিং সিস্টেম ফর ইউ-এ-পি
এনকাউন্টারস বা সংক্ষেপে পারসু (PURSUE) ব্যবস্থা নামে পরিচিতি পেয়েছে। পারসু ব্যবস্থায়
২০২৬ সালের ৮ মে প্রকাশিত হয় ইউ-এ-পি ফাইলগুলির একটি বড় অংশ, ২২ মে প্রকাশিত হয় আরো
বড় একটি অংশ। এর আগে ২০২৪ সালেও AARO ইউ-এ-পি সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করে
প্রতিবেদন দিয়েছিল। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছ ইউ-এ-পি ফাইলগুলির কোনটিতেই এলিয়েনের
অস্তিত্বের কোনো প্রমাণ মেলেনি [৩]।
নাসা এখনো
এই সিদ্ধান্তেও পৌঁছায়নি যে ইউ-এ-পি হলো
বহির্জাগতিক। বরং
তারা বলেছে, ভবিষ্যতের ঘটনাগুলো শ্রেণিবদ্ধ করতে উন্নত তথ্য,
মানসম্মত রিপোর্টিং, উন্নত সেন্সর, উন্মুক্ত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
সহায়ক হতে পারে [৪]।
এলিয়েন এখনো
খুঁজে পাওয়া যায়নি। এবার দেখা যাক তাদের খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু।
এলিয়েনের
অস্তিত্বের সম্ভাবনা
এলিয়েন
জীবনের সম্ভাবনা নির্ভর করে আমরা কোন
ধরনের জীবন বোঝাচ্ছি তার
ওপর। আমরা
বেশিরভাগই এলিয়েন বলতে কল্পনা করে বসি মানুষেরই কোন উন্নততর প্রতিলিপি। কিন্তু বৈজ্ঞানিক
নিয়মে সরল অণুজীব থেকে জটিল প্রযুক্তি নির্ভর - কত বিচিত্র ধরনের জীবনই তো হতে পারে।
দেখা যাক কোন্টির সম্ভাবনা কেমন।
(১) অণুজীব
জীবন: অণুজীব জীবন সবচেয়ে সম্ভাব্য। পৃথিবীতে
জীবনের আবির্ভাব ঘটে
থাকতে পারে পৃথিবীর উদ্ভবের খুব প্রাথমিক
পর্যায়েই, সম্ভবত প্রথম এক বিলিয়ন বছরের
মধ্যেই। অণুজীব
বিপাকীয়ভাবে অত্যন্ত বহুমুখী। তারা
অত্যন্ত অসহনীয় পরিবেশেও টিকে থাকতে
পারে। উষ্ণ প্রস্রবণ,
গভীর সমুদ্রের হাইড্রোথার্মাল ভেন্ট, এসিডিক হ্রদ, অ্যান্টার্কটিকার পাথর, তেজস্ক্রিয় পরিবেশ এবং ভূগর্ভস্থ গভীর
প্রতিকুল পরিবেশের বাস
করতে পারে। এটি
নির্দেশ করে যে জীবন
একবার শুরু হলে চরম
পরিবেশেও অভিযোজিত হতে পারে।
সৌরজগতে অণুজীবের
সম্ভাব্য আবাসস্থল হিসেবে অনেকগুলি জায়গা বিবেচিত হচ্ছে।
মঙ্গল গ্রহের মাটি, বৃহস্পতির উপগ্রহ ইউরোপার মহাসাগর, শনির বরফ আচ্ছন্ন উপগ্রহ এনসেলাডাসের
মহাসাগর, শনির
সবচেয়ে বড় উপগ্রহ টাইটানের হাইড্রোকার্বন-সমৃদ্ধ পরিবেশ, এবং সম্ভবত অন্যান্য
গ্রহ-উপগ্রহের যেখানে ভূগর্ভস্থ
তরল পানির ভাণ্ডার আছে বলে ধারণা করা হচ্ছে – সবখানেই অণুজীব
থাকার সম্ভাবনা আছে। সৌরজগতের বাইরে, বাসযোগ্য অঞ্চলের এক্সোপ্ল্যানেটগুলোতে তরল পানি, বায়ুমণ্ডল
এবং জীবনের উপযোগী রাসায়নিক শক্তির উৎস থাকতে পারে। সেখানেও
অণুজীব থাকার সম্ভাবনা আছে।
জীবনের
একটি সর্বজনস্বীকৃত সংজ্ঞা এখনো নেই।
তবে আমরা বায়োসিগনেচার বা জীবনের সম্ভাব্য চিহ্ন
খুঁজতে পারি। যেমন বায়ুমণ্ডলীয় রাসায়নিক ভারসাম্যহীনতাও হতে পারে জীবনের চিহ্ন
[৫]। শুধু
অক্সিজেন বা মিথেন জীবনের
নিশ্চিত প্রমাণ নয়। কিন্তু
অক্সিজেনের সঙ্গে মিথেন, অথবা ঋতুভিত্তিক বায়ুমণ্ডলীয়
পরিবর্তনের মতো সমন্বয় যদি খুঁজে পাওয়া যায় , তাও হতে পারে জীবনের
সম্ভাব্য ইঙ্গিত।
(২) জটিল
জীবন: মহাবিশ্বে পৃথিবীর বাইরে জটিল
জীবন আরও অনিশ্চিত।
পৃথিবীতে অণুজীব জীবন বিলিয়ন বছর
ধরে ছিল, তারপর ক্রমশ বিবর্তনের ফলে বিকশিত হয়েছে জটিল প্রাণী।
জটিল জীবনের জন্য দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ুর
স্থিতিশীলতা, প্লেট টেকটনিকস, চৌম্বকীয় সুরক্ষা, উপযুক্ত সামুদ্রিক পরিবেশ, অক্সিজেনের উপস্থিতি, বড় চাঁদ, স্থিতিশীল
কক্ষপথ এবং অতিরিক্ত
বিকিরণ থেকে সুরক্ষার দরকার
হতে পারে। জটিল
জীবন ধারণের জন্য এগুলোর
কোন্টি অপরিহার্য আর কোন্টি শুধুমাত্র আমাদের পৃথিবীর বিশেষ ঘটনা—আমরা এখনো
জানি না। আমরা
এখনো মহাবিশ্বে পৃথিবীর মতো বাসযোগ্য গ্রহ খুঁজে বেড়াচ্ছি যেখানে জটিল প্রাণ বাঁচতে
পারবে। সেরকম গ্রহ এখনো পাওয়া যায়নি।
(৩) বুদ্ধিমান
প্রযুক্তিনির্ভর জীবন: কল্পবিজ্ঞানের যেসব এলিয়েনের সাথে আমরা
পরিচিত, তারা মানুষের চেয়ে অনেক বেশি উন্নত। কিন্তু বাস্তবতা হলো - পৃথিবীর বাইরে
প্রযুক্তিনির্ভর সভ্যতা আরও বেশি অনিশ্চিত। পৃথিবীতে
প্রাকৃতিক বুদ্ধিমত্তা
বহু রূপে বিবর্তিত হয়েছে—প্রাইমেট, ডলফিন, কাকজাতীয় পাখি, অক্টোপাস, এরকম
অনেক প্রাণীর মধ্যে বিভিন্ন ধরনের বুদ্ধিমত্তার বিবর্তনের প্রমাণ আমরা পেয়েছি। কিন্তু
সেগুলি প্রযুক্তি নয়। আধুনিক
প্রযুক্তি – যেমন রেডিও অ্যাস্ট্রোনমি বা বেতার জ্যোতির্বিজ্ঞান, মহাকাশযান,
গণিত এবং শিল্পপ্রযুক্তি একবারই
উদ্ভূত হয়েছে। প্রযুক্তিনির্ভর
সভ্যতা বিবর্তনের স্বয়ংক্রিয় ফল নয়, বরং বুদ্ধিমত্তার ক্রমাগত সামষ্টিক অনুশীলনের
ফল।
তাই
এলিয়েনের অস্তিত্বের ব্যাপারে একটি
যুক্তিসংগত বৈজ্ঞানিক অবস্থান হলো: পৃথিবীর বাইরে অণুজীব জীবন থাকতে পারে। জটিল
জীবন তুলনামূলকভাবে কম হলেও একেবারে অসম্ভব নয়। কিন্তু প্রযুক্তিনির্ভর সভ্যতা বিরল। এই সভ্যতা
যদি দূরবর্তী কোণ গ্রহে খুবই নিরবে অবস্থান করে তবে আমাদের পক্ষে সেই সভ্যতা শনাক্ত করা অত্যন্ত কঠিন কাজ। কতটুকু কঠিন কাজ – সেটা গাণিতিকভাবে বোঝার
জন্য আমাদের ড্রেকের সমীকরণ বিবেচনা করতে হবে।
ড্রেক
সমীকরণ
১৯৬১ সালে আমেরিকান জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফ্রাঙ্ক ড্রেক মহাবিশ্বে পৃথিবী ছাড়া অন্য কোথাও প্রাণের অস্তিত্ব খুঁজের পাবার সম্ভাবনার একটি যুগান্তকারী সমীকরণ দেন - যা ড্রেক ইকুয়েশান নামে প্রসিদ্ধ। ড্রেক ধারণা দেন যে বিশাল এই মহাবিশ্বের অন্য কোথাও প্রাণের অস্তিত্ব থাকলেই যে আমরা তা খুঁজে পাবো এমন কোন কথা নেই। খুঁজে পেতে হলে তাদেরকে আমাদের সমান বা আমাদের চেয়েও উন্নত হতে হবে। তাই আমাদের দেখতে হবে আমাদের মত সভ্যতা গড়ে ওঠার সম্ভাবনা মহাবিশ্বের আর কোথায় আছে।
ড্রেকের সমীকরণটি লেখা হয় এভাবে: N = R* x fp
x ne x fl x fi x fc x L - অর্থাৎ মহাবিশ্বে সভ্যতার সম্ভাবনাময় জায়গার সংখ্যা (N) হলো নক্ষত্র সৃষ্টির হার (R*), সেই নক্ষত্রগুলোর মধ্যে গ্রহ থাকার সম্ভাবনা (fp), গ্রহগুলোর মধ্যে প্রাণ সৃষ্টির সম্ভাবনা (fl), প্রাণসম্পন্ন গ্রহগুলোর মধ্যে সভ্যতা গড়ে ওঠার সম্ভাবনা (fc), এবং সেই সভ্যতা কত বছর টিকে থাকবে (L) তার সংখ্যার গুণফলের সমান।
ড্রেকের
সময়ের তুলনায় কিছু উপাদান এখন
ভালোভাবে জানা। আমরা
জানি গ্রহগুলির প্রকৃতি। এক্সোপ্ল্যানেট জরিপ দেখিয়েছে গ্রহমণ্ডল
বিরল নয়। কিন্তু
জৈবিক ও সমাজতাত্ত্বিক উপাদান—fₗ,
fᵢ, f꜀ এবং L—এখনো অত্যন্ত অনিশ্চিত। এসব
মানের সামান্য পরিবর্তনও সম্পূর্ণ ভিন্ন ফল দিতে পারে।
এই সমীকরণ অনুযায়ী সহজভাবে হিসেব করে দেখা গেলো মহাবিশ্বে প্রাণের অস্তিত্ব খুঁজে পাবার মত সভ্যতাসম্পন্ন গ্রহের সংখ্যা দশ হাজারেরও বেশি। কিন্তু সমস্যা হলো সমীকরণের প্রত্যেকটি উপাদানই অনুমাননির্ভর। যদি
জীবন সহজে শুরু হয়
এবং প্রযুক্তিনির্ভর সভ্যতা লক্ষ লক্ষ বছর
টিকে থাকে, তবে গ্যালাক্সিতে বহু
শনাক্তযোগ্য সভ্যতা থাকতে পারে। কিন্তু
যদি জীবন বিরল হয়,
বুদ্ধিমত্তা অত্যন্ত বিরল হয়, অথবা
প্রযুক্তিনির্ভর সভ্যতা দ্রুত আত্মধ্বংস করে, তবে আমাদের
শনাক্তযোগ্য পরিসরের মধ্যে আমরা কার্যত একা
হতে পারি।
ড্রেক
সমীকরণের গুরুত্ব সুনির্দিষ্ট ভবিষ্যদ্বাণীতে নয়। এর
গুরুত্ব হলো এটি অজানাগুলোকে
চিহ্নিত করে। এক্সোপ্ল্যানেট
পরিসংখ্যান, জীবনের উৎপত্তি গবেষণা, জৈবস্বাক্ষর শনাক্তকরণ, প্রযুক্তির স্বাক্ষর অনুসন্ধান এবং গ্রহগুলোর দীর্ঘমেয়াদি বাসযোগ্যতা
– এর প্রত্যেকটিতে আমাদের
আরো উন্নত প্রক্রিয়ার দরকার আছে এলিয়েন শনাক্ত করতে গেলে।
সেই পুরনো প্রশ্ন
এখনো নতুন: এলিয়েন যদি থেকে থাকে তাহলে কোথায়? কল্পকাহিনি ছাড়া বাস্তবে তাদের প্রমাণ নেই কেন? নোবেলবিজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী এনরিকো ফার্মি এই প্রশ্ন করেছিলেন ১৯৫০সালে। এলিয়েনের অস্তিত্ব সম্পর্কে ফার্মি'র মন্তব্য "তারা সব কোথায়?" ক্রমে পরিণত হয় প্যারাডক্স বা কূটাভাসে - যা 'ফার্মি প্যারাডক্স' নামে পরিচিতি লাভ করে।
![]() |
| এনরিকো ফার্মি |
ফার্মি
প্যারাডক্স: সবাই কোথায়?
ফার্মি
প্যারাডক্স হলো দুটি ধারণার
মধ্যে টানাপোড়েন। প্রথম
ধারণা গ্যালাক্সি
প্রাচীন ও বিশাল, যেখানে
শত শত কোটি নক্ষত্র
রয়েছে। অথচ
আমরা কোনো বহির্জাগতিক সভ্যতার নিশ্চিত প্রমাণ দেখিনি। যদি
উন্নত সভ্যতা সহজলভ্য হয় এবং আন্তঃনাক্ষত্রিক
ভ্রমণে সক্ষম হয়, তবে তারা
গ্যালাক্সি জুড়ে ছড়িয়ে পড়েনি কেন? আলোর গতির
অনেক নিচের গতিতেও যদি তারা চলে তাহলে ধাপে
ধাপে উপনিবেশ বিস্তারের মাধ্যমে একটি সভ্যতা তাত্ত্বিকভাবে
কয়েক মিলিয়ন থেকে কয়েকশ মিলিয়ন
বছরে গ্যালাক্সি অনুসন্ধান করতে পারে—যা
মিল্কিওয়ের বয়সের তুলনায় কম। তাহলে
তারা আমাদের বা আমরা তাদের খুঁজে পাইনি কেন?
এই প্রশ্নের
উত্তরে অনেকগুলি সম্ভাবনার কথা ভাবা যায়। (১) মহাবিশ্বে পৃথিবীর বাইরে জীবন বিরল। হতে
পারে জীবনের উৎপত্তি সেখানে ভীষণ কঠিন। (২) হতে পারে অণুজীব আছে। কিন্তু বুদ্ধিমান
জটিল জীবন সেখানে বিরল। হতে পারে সেখানকার প্রাণী ও বুদ্ধিমত্তা আমাদের তুলনায় অস্বাভাবিক।
(৩) হতে পারে সেখানে প্রযুক্তিনির্ভর সভ্যতা স্বল্পস্থায়ী। যুদ্ধ, পরিবেশগত পতন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার
ব্যর্থতা, জৈবপ্রযুক্তি, জলবায়ুর অস্থিরতা বা সম্পদ সংকটে
ওখানকার সভ্যতা নিজেদের ধ্বংস করে ফেলতে পারে। হয়তো তাদের সভ্যতা ধ্বংস
হয়ে গেছে আমাদের সভ্যতা তৈরি হবার অনেক আগেই। (৪) হতে পারে তাদের সভ্যতা নিরব। হতে
পারে তারা ইচ্ছাকৃতভাবে
সম্প্রচার এড়িয়ে চলছে। ফলে তারা এমন ব্যবস্থা করেছে
যেন তাদেরকে কিছুতেই খুঁজে পাওয়া না যায়। (৫) হতে পারে আমরা খুব আগে এসে
গেছি। আমাদের
মতো প্রযুক্তিনির্ভর
সভ্যতা ভবিষ্যতে বেশি প্রকাশ্য হতে পারে। (৬) আরো কারণ হতে পারে আন্তঃনাক্ষত্রিক
ভ্রমণ অত্যন্ত কঠিন। পদার্থবিজ্ঞান,
শক্তি ব্যয়, বিকিরণ, জীববৈজ্ঞানিক ভঙ্গুরতা এবং সময়ের আপেক্ষিকতা বাস্তব
গ্যালাক্টিক বিস্তারকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
(৭) হতে পারে তারা আমাদের
ব্যাপারে আগ্রহী
নয়। উন্নত
সভ্যতা মানুষের মতো অনুসন্ধানকারী বা
সাম্রাজ্যবাদী আচরণ নাও করতে
পারে। (৮)
আরো একটি সম্ভাব্য কারণ হতে পারে হয়তো তারা এখানে
আছে, কিন্তু আমরা চিনতে পারছি
না। এটি
কল্পবিজ্ঞান ও UFO সংস্কৃতিতে জনপ্রিয়, কিন্তু এর পক্ষে যাচাইযোগ্য
বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
ফার্মি
প্যারাডক্স শক্তিশালী, কারণ এটি অতিরিক্ত
আশাবাদী অনুমানকে চ্যালেঞ্জ করে। জীবনসমৃদ্ধ
গ্যালাক্সিও নীরব হতে পারে,
যদি বুদ্ধিমান জীবন বিরল হয়,
প্রযুক্তিনির্ভর পর্যায় সংক্ষিপ্ত হয়, অথবা সভ্যতাগুলো
যোগাযোগ না করতে চায় তাহলে
এলিয়েন থাকলেও তাদের খুঁজে পাওয়া অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে।
নিরব সভ্যতার
অনুমান থেকে আরেকটি তত্ত্ব জনপ্রিয় হয়েছে – সেটি হলো ডার্ক ফরেস্ট তত্ত্ব।
ডার্ক
ফরেস্ট তত্ত্ব
চীনা লেখক লিউ
সিশিন-এর কল্পবৈজ্ঞানিক উপন্যাস দ্য ডার্ক ফরেস্ট চীনা ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে ২০০৮ সালে।
২০১৫ সালে আমেরিকান অনুবাদ জোয়েল মার্টিনসেন দ্য ডার্ক ফরেস্ট ইংরেজিতে অনুবাদ করার
পর ডার্ক ফরেস্ট তত্ত্ব এলিয়েনদের কল্পনায় নতুন বাতাস জোগায়। এই ধারণা অনুযায়ী, সভ্যতাগুলো নীরব থাকে কারণ
মহাবিশ্ব বিপজ্জনক। প্রতিটি
সভ্যতা যেন অন্ধকার বনের
একেকজন শিকারি। নিজের
অবস্থান প্রকাশ করলে অন্য কোনো
সভ্যতা ভবিষ্যৎ হুমকির ভয়ে ধ্বংসাত্মক পদক্ষেপ
নিতে পারে। আন্তঃনাক্ষত্রিক
দূরত্বে উদ্দেশ্য যাচাই করা কঠিন হওয়ায়
নিরাপদ কৌশল হলো নীরব
থাকা বা আগেই আঘাত
করা।
বৈজ্ঞানিকভাবে ডার্ক
ফরেস্ট তত্ত্ব অনুমাননির্ভর। এটি
ধরে নেয় যে সভ্যতাগুলো
সম্প্রসারণবাদী, ভীত, দূরপাল্লার আক্রমণে
সক্ষম এবং পারস্পরিক বিশ্বাস
প্রতিষ্ঠায় অক্ষম। এসব
অনুমান সত্য নাও হতে
পারে। উন্নত
সভ্যতার প্রাথমিক সমাজকে ক্ষতি করার কোনো আগ্রহ
নাও থাকতে পারে। আন্তঃনাক্ষত্রিক
আক্রমণ বাস্তবে অকার্যকর হতে পারে।
অথবা শনাক্তযোগ্য সভ্যতাগুলো নৈতিক নীতি অনুসরণ করতে
পারে।
তবু
ডার্ক ফরেস্ট তত্ত্বটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ
এটি একটি গুরুতর প্রশ্ন
তোলে: মানবজাতির কি ইচ্ছাকৃতভাবে বহির্জাগতিক
সভ্যতার উদ্দেশ্যে বার্তা পাঠানো উচিত? আমরা পৃথিবী থেকে মহাবিশ্বের অজ্ঞাত সভ্যতার
উদ্দেশ্যে বার্তা পাঠানো শুরু করেছি সেই ভয়েজারের যুগ থেকে। কিছু কিছু বিজ্ঞানী মনে করেন, ইচ্ছাকৃত সম্প্রচার আন্তর্জাতিক আলোচনার বিষয় হওয়া উচিত। কারণ
এটি শুধু কোনো এক
পর্যবেক্ষণাগার বা জাতির নয়,
সমগ্র মানবজাতির বিষয়। এলিয়েন
যদি থাকে, তাহলে তারা আমাদের উচ্চকন্ঠ পছন্দ নাও করতে পারে।
এই ধারণা আমাদের
নতুন করে ভাবতে শেখায় এলিয়েন যদি থাকে – কেমন হতে পারে তাদের জীবন?
এলিয়েনের
সম্ভাব্য জীবন
জনপ্রিয়
সংস্কৃতিতে এলিয়েনকে বড় মাথা, বড়
চোখ, হাত-পা-যুক্ত
মানবসদৃশ প্রাণী হিসেবে কল্পনা করা হয়। কিন্তু বাস্তব জীববিজ্ঞান বিবেচনা করলে আমরা অনেক
বিস্তৃত সম্ভাবনা দেখতে পাবো। দেখা যাক এলিয়েনের জীবনের
সম্ভাব্য গঠন কী কী হতে পারে।
(১) কার্বন-পানি-ভিত্তিক জীবন:
বর্তমান বিজ্ঞানের
আলোকে সবচেয়ে সম্ভাব্য জীবন হলো কার্বনভিত্তিক
এবং তরল পানিনির্ভর জীবন। কার্বন
জটিল অণু তৈরি করতে
পারে; পানি একটি উৎকৃষ্ট
দ্রাবক। পৃথিবীর
অভিজ্ঞতা থেকে আমরা জানি যে
কার্বন-পানির রসায়ন জীবন তৈরি করতে
পারে। এর
অর্থ এই নয় যে
এলিয়েন দেখতে মানুষের মতো হবে।
পৃথিবীতেই জীবন রয়েছে ব্যাকটেরিয়া,
ছত্রাক, উদ্ভিদ, কীটপতঙ্গ, মলাস্ক, মাছ, স্তন্যপায়ী এবং
অন্যান্য সব আকারে। এলিয়েন
জীব হতে পারে অণুজীবীয়
স্তর, মহাসাগরীয় পরিবেশে, বায়ুমণ্ডলে ভাসমান জীবন, ভূগর্ভস্থ জীব, অথবা ভিন্ন
নক্ষত্রের আলোতে অভিযোজিত আলোকসংশ্লেষী জীব।
(২) সিলিকনভিত্তিক
জীবন: সিলিকন প্রায়ই আলোচিত হয়, কারণ পর্যায়
সারণিতে এটি কার্বনের নিচে
অবস্থিত। তবে
পানিতে সিলিকনের রসায়ন কম নমনীয় এবং
এটি কার্বনের মতো বৈচিত্র্যময় জৈব
অণু তৈরির বদলে স্থিতিশীল খনিজ
কাঠামো তৈরি করতে বেশি
প্রবণ। তবে
কি এলিয়েনদের জীবন সিলিকনভিত্তিক সেমিকন্ডাক্টর জাতীয়? সিলিকনজীবন তাত্ত্বিকভাবে অসম্ভব নয়, তবে কার্বনভিত্তিক
জীবনের সম্ভাবনাই বেশি।
(৩) অ্যামোনিয়া,
মিথেন বা অন্যান্য দ্রাবকভিত্তিক
জীবন: অত্যন্ত শীতল জগতে তরল অ্যামোনিয়া,
মিথেন বা ইথেন দ্রাবক
হিসেবে কাজ করতে পারে। শনি
গ্রহের উপগ্রহ টাইটানে মিথেন ও ইথেনের হ্রদ
আছে। সেখানে
জীবন থাকলে তা পৃথিবীর জীবনের
থেকে রাসায়নিকভাবে অত্যন্ত ভিন্ন হবে। নিম্ন
তাপমাত্রায় তাদের বিপাক ধীর হতে পারে
এবং তারা পানি-নির্ভর
নয় এমন জৈবরসায়ন ব্যবহার
করতে পারে।
(৪) যান্ত্রিক
জীবন: এলিয়েনরা যদি আমাদের তুলনায় প্রযুক্তিতে অনেক বেশি অগ্রসর হয়, তবে তাদের
প্রযুক্তিনির্ভর সভ্যতা হয়তো জৈবিক অবস্থায় থাকবে না। তারা
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তৈরি করতে পারে,
মস্তিষ্কের তথ্য আপলোড করতে
পারে, রোবোটিক প্রোব পাঠাতে পারে, অথবা মেশিনভিত্তিক জীবনে
রূপান্তরিত হতে পারে।
সে ক্ষেত্রে এলিয়েন “জীবন”-এর অক্সিজেন, খাদ্য,
ঘুম বা পৃথিবীসদৃশ গ্রহের
প্রয়োজন নাও থাকতে পারে। তারা
ঠান্ডা সৌরজগতের বাইরের অঞ্চল, গ্রহাণুপুঞ্জ, অথবা শক্তিসমৃদ্ধ অঞ্চলে
থাকতে পছন্দ করতে পারে।
(৫) প্লাজমা
বা চৌম্বকক্ষেত্রের জীবন: আরও
অনুমাননির্ভর ধারণার মধ্যে রয়েছে প্লাজমাভিত্তিক জীবন, নক্ষত্রের বায়ুমণ্ডলে জীবন, আন্তঃনাক্ষত্রিক মেঘে জীবন, অথবা
স্ব-সংগঠিত তড়িৎচৌম্বকীয় ব্যবস্থা। এগুলো
নিশ্চিত জীববিজ্ঞানের বাইরে, কিন্তু এগুলো মনে করিয়ে দেয়
যে পৃথিবীর জীবন সব সম্ভাব্য
জটিলতার শেষ কথা নয়।
যে কোনো জীবনই
এলিয়েনের হোক, তারা কি পৃথিবীতে আসতে পারে?
এলিয়েনদের
পৃথিবীতে আসতে কি মহাকাশযান দরকার?
যদি
“এলিয়েন” বলতে আমরা অন্য
নক্ষত্র থেকে শারীরিকভাবে ভ্রমণকারী
জৈবিক প্রাণী বুঝি, তবে কোনো না
কোনো ধরনের মহাকাশযান বা সুরক্ষিত পরিবহন
সম্ভবত প্রয়োজন হবে যদি তারা
পৃথিবীতে আসতে চায়। আন্তঃনাক্ষত্রিক মহাশূন্য
অত্যন্ত প্রতিকূল: শূন্যতা, বিকিরণ, অতিক্ষুদ্র উল্কাকণা, চরম ঠান্ডা এবং
বিরাট দূরত্ব। সৌরজগতের
নিকটতম নক্ষত্রমণ্ডল আলফা সেন্টুরি প্রায় ৪.৩৭ আলোকবর্ষ
দূরে। বর্তমান
মানব মহাকাশযানের গতিতে সেখানে পৌঁছাতে লাগবে দশ হাজারের বছরেরও বেশি সময়। নিশ্চয়
এলিয়েনদের এর চেয়ে বেশি গতি এবং শক্তি সম্পন্ন নভোযান দরকার হবে। তবে “পৃথিবীতে আসা” মানেই কোনো
মানববাহী মহাকাশযানের মাঠে অবতরণ নয়।
সম্ভাব্য কী
কী বিকল্প পদ্ধতিতে এলিয়েনরা
পৃথিবীতে আসতে পারে? কয়েকটি সম্ভাবনার কথা ধরা যাক।
(১) রোবোটিক
প্রোব: জৈবিক দেহের তুলনায় বেশি সহনশীল
যান্ত্রিক রোবট পাঠাতে পারে
তারা। (২) ভন নিউম্যান প্রোব: হাঙ্গেরিয়ান আমেরিকান গাণিতিক পদার্থবিজ্ঞানী জন ভন নিউম্যান
শক্তি থেকে স্থানীয় উপাদান ব্যবহার করে নিজেদের প্রতিলিপি তৈরি করার গাণিতিক তত্ত্ব
দিয়েছেন। সে অনুসারে শক্তি আকারে এসে স্ব-প্রতিলিপিকারী
প্রোব স্থানীয় উপাদান ব্যবহার করে নিজেদের কপি
তৈরি করতে পারে। কিন্তু এটি
পুরোপুরি তাত্ত্বিক
এবং খুবই ঝুঁকিপূর্ণ ধারণা। (৩) অণুজীবীয়
স্থানান্তর: মহাবিশ্বের
বিভিন্ন মহাজাগতিক সংঘর্ষে উৎক্ষিপ্ত
পাথরের ভেতরে অণুজীব ভ্রমণ করতে পারে।
এটি সভ্যতার ভ্রমণ নয়, বরং প্রাকৃতিক
জৈব স্থানান্তর। এলিয়েনরা
এই পদ্ধতিতে নিজের ইচ্ছেয় নয়, বরং দৈবক্রমে পৃথিবীতে চলে আসতে পারে। (৪) দেহ
নয়, সংকেত: এলিয়েনদের
কোনো সভ্যতা থেকে নিজেরা
না এসে তাদের সংকেত আসতে পারে। রেডিও
সংকেত, লেজার পালস, গাণিতিক বার্তা অথবা এনকোডেড কৃত্রিম
বুদ্ধিমত্তা হিসেবে “আসতে” পারে। (৫) কৃত্রিম
বস্তু: এলিয়েন প্রযুক্তি জীবন্ত দর্শনার্থী নয়, বরং প্রোব,
স্যাটেলাইট, বা প্রকৌশলগতভাবে পরিবর্তিত
গ্রহাণু হিসেবে পৃথিবীতে
আসতে পারে। (৬) ভ্রমণ নয়,
দূরবর্তী শনাক্তকরণ: কোনো
শারীরিক যোগাযোগ ছাড়াই আমরা এলিয়েনকে তাদের
বায়ুমণ্ডলীয় জৈবস্বাক্ষর বা প্রযুক্তিস্বাক্ষর দেখে শনাক্ত করতে
পারি। অর্থাৎ
এলিয়েন না এসেও প্রযুক্তির মাধ্যমে উপস্থিতি নিশ্চিত করতে পারে। প্রযুক্তিগত দক্ষতা
থাকলে কোয়ান্টাম টেলিপোর্টেশানও সম্ভব তাদের পক্ষে।
তাই
এলিয়েনদের হলিউড-ধাঁচের মহাকাশযান দরকার এমন নয়।
তবে জটিল জৈবিক প্রাণী
যদি সত্যিই অন্য নক্ষত্র থেকে
পৃথিবীতে আসে, তাদের বর্তমান
মানব প্রযুক্তির চেয়ে অনেক বেশি উন্নত প্রযুক্তি এবং
দীর্ঘমেয়াদি ভ্রমণ প্রযুক্তি দরকার হবে।
যদি ধরেও নিই
এলিয়েনরা পৃথিবীতে এলো, কিংবা পৃথিবীর বাইরে মহাবিশ্বের কোথাও বাস করলো, তাদেরকে আমরা
শনাক্ত করবো কীভাবে?
আমরা
কীভাবে এলিয়েন জীবন শনাক্ত করতে পারি?
এলিয়েন শনাক্তকরণ
নির্ভর করবে তাদের জীবনের ধরন অনুযায়ী।
কয়েকটি প্রধান শনাক্তকরণ
পদ্ধতি আলোচনা করা যাক।
(১) সৌরজগতের
জৈবস্বাক্ষর: আমাদের সৌরজগতের মধ্যে সরাসরি অনুসন্ধান করা যায়।
মঙ্গল মিশনগুলো অতীতের বাসযোগ্যতা, জৈব অণু এবং
সম্ভাব্য প্রাচীন জৈবস্বাক্ষর খোঁজে। ভবিষ্যতের
মিশনগুলি যেসব নমুনা নিয়ে আসবে
সেগুলি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
ইউরোপা এবং এনসেলাডাস বিশেষভাবে
আকর্ষণীয়, কারণ উভয়েরই ভূগর্ভস্থ
মহাসাগর থাকতে পারে। এনসেলাডাস
থেকে নিয়মিত উপাদান মহাশূন্যে
উৎক্ষিপ্ত হচ্ছে। সেগুলি সংগ্রহ
করে মহাকাশযান পরোক্ষভাবে তার মহাসাগরের উপাদান
নমুনা নিতে পারে। এরপর দেখা যেতে পারে সেখানে কোনো অণুজীবের
লক্ষণ খুঁজে পাওয়া যায় কি না।
(২) এক্সোপ্ল্যানেট
জৈবস্বাক্ষর: দূরবর্তী গ্রহের ক্ষেত্রে আমরা নমুনা সংগ্রহ
করতে পারি না।
সেক্ষেত্রে আমরা সেখান থেকে আসা
আলো বিশ্লেষণ করি। কোনো
গ্রহ তার নক্ষত্রের সামনে
দিয়ে গেলে কিছু নক্ষত্রালোক
গ্রহের বায়ুমণ্ডল ভেদ করে আসে। বর্ণালী
বিশ্লেষণ করে সেই
বায়ুমণ্ডলের উপাদান ও পরিবেশ সম্পর্কে জানা যায়। অক্সিজেন,
ওজোন, মিথেন, কার্বন ডাই অক্সাইড, জলীয়
বাষ্প এবং নাইট্রাস অক্সাইড
গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ এবং
ভবিষ্যতের পর্যবেক্ষণাগারগুলো বায়ুমণ্ডলীয় গঠন নির্ণয়ে সহায়তা
করতে পারে। জৈবস্বাক্ষর
বেশ সতর্কতার সাথে বিশ্লেষণ
করতে হয়। অক্সিজেন
অজৈবভাবেও তৈরি হতে পারে। মিথেন
ভূতাত্ত্বিক উৎস থেকেও আসতে
পারে। প্রকৃত
শনাক্তকরণের জন্য অজৈব প্রক্রিয়া
বাদ দিতে হবে এবং
গ্রহীয় প্রেক্ষাপট বিবেচনা করতে হবে।
(৩) প্রযুক্তিগত
স্বাক্ষর: উন্নত সভ্যতার শনাক্তযোগ্য সূচক হলো তার প্রযুক্তিগত স্বাক্ষর। অর্থাৎ কতটা
উন্নতমানের প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে সেগুলির চিহ্ন শনাক্ত করতে পারলেই বোঝা যাবে। নাসা
জীবন অনুসন্ধানের বৃহত্তর কাঠামোর মধ্যে গুরুত্ব সহকারে রেখেছে এই প্রযুক্তিগত স্বাক্ষরকে
[৬]। প্রযুক্তির স্বাক্ষর হিসেবে অনেক কিছুকেই ধরা যেতে পারে। যেমন, বেতার সংকেত, লেজার পালস, শিল্পজাত বায়ুমণ্ডলীয় গ্যাস, দৃশ্যমান আলোর চিহ্ন, নির্গত তাপ,
বৃহৎ কক্ষপথীয় কাঠামো, কৃত্রিম উপগ্রহ, নক্ষত্রের অস্বাভাবিক আলোর বৈষম্য ইত্যাদি।
সার্চ ফর এক্সট্রাটেরেস্ট্রিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা SETI প্রকল্পে ঐতিহ্যগতভাবে ন্যারোব্যান্ড রেডিও সিগন্যালের ওপর জোর দিয়েছে, কারণ
প্রাকৃতিক জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক উৎস সাধারণত অত্যন্ত
সংকীর্ণ, কৃত্রিমসদৃশ রেডিও সম্প্রচার তৈরি করে না। তবে
আধুনিক SETI আরও বিস্তৃত।
অপটিক্যাল, ইনফ্রারেড, অ্যাটমোস্ফেরিক
এবং ডাটা-মাইনিং পদ্ধতি এতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
(৪) অস্বাভাবিকতা
অনুসন্ধান: আরেক সম্ভাবনা
হলো আমাদের সৌরজগতেই এলিয়েনের চিহ্ন খোঁজা। আমাদের
সৌরজগতের স্বাভাবিক কাজকর্ম যদি কোনো ধরনের কারণ ছাড়াই অস্বাভাবিক আচরণ করে, তখন হয়তো
এলিয়েনের দোষ দেয়া যাবে। কিন্তু এই ক্ষেত্র
বৈজ্ঞানিকভাবে কঠিন, কারণ অনুসন্ধানের ক্ষেত্র
বিপুল এবং ভুলভাবে এলিয়েন শনাক্ত করার সম্ভাবনা বেশি।
এখন স্বাভাবিকভাবেই
প্রশ্ন আসে, এলিয়েন শনাক্ত করা যাচ্ছে না কেন? আমাদের বর্তমান বিজ্ঞানের সীমাবদ্ধতা
কোথায়?
![]() |
| স্টিফেন হকিং |
পৃথিবীতে
এলিয়েন থাকার প্রশ্নে বর্তমান বিজ্ঞানের সীমাবদ্ধতা
স্টিফেন হকিং
রসিকতা করে বলেছিলেন এলিয়েনরা ইতোমধ্যেই পৃথিবীতে আছে, কিন্তু আমরা তাদের চিনতে পারছি
না। জনপ্রিয় ধারায় এসব বলা যায়। কিন্তু পৃথিবীতে এলিয়েন থাকার
বৈজ্ঞানিক দাবি দুর্বল।
কারণ অসাধারণ দাবির জন্য অসাধারণ প্রমাণ
দরকার। বর্তমান
বিজ্ঞানে এলিয়েন শনাক্তকরণের বেশ
কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। যেমন: (১) শারীরিক প্রমাণের
অভাব: কোনো
প্রকাশ্যে যাচাইযোগ্য এলিয়েনের জৈব নমুনা, যন্ত্র,
যন্ত্রাংশ, মহাকাশযানের
টুকরা বা জিনগত উপাদান
পাওয়া যায়নি। যেগুলি পাওয়া গেছে
সেগুলির কোনোটাই এলিয়েনের নয়। (২) নিম্নমানের পর্যবেক্ষণ:
অনেক UFO/UAP ছবি অস্পষ্ট, দূরবর্তী,
মাননিয়ন্ত্রণহীন, এবং ডেটা দ্বারা
প্রমাণিত নয়। (৩) সেন্সর বিভ্রান্তি: ইনফ্রারেড
ক্যামেরা, রাডার, অপটিক্যাল সিস্টেম এবং মানবদৃষ্টি—সবই
ভুল ব্যাখ্যা তৈরি করতে পারে। (৪)
পুনরুৎপাদনযোগ্যতার অভাব:
স্বাধীন পর্যবেক্ষক কোনকিছু
পর্যবেক্ষণ করার পর, সেই ঘটনা যদি অন্য কেউ আবার দেখতে পায় এবং পুনরায় একই রকম উপাত্ত সংগ্রহ করতে পারলে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ শক্তিশালী হয়। UAP ঘটনা
সাধারণত ক্ষণস্থায়ী। (৫)
মানব ভ্রম: মানুষ যদি শুধুমাত্র নিজেদের ইন্দ্রীয়ের উপর নির্ভর করে উপাত্ত সংগ্রহ করে
তাতে ভুল হবার সম্ভাবনা বেশি থাকে। মানুষ দূরত্ব,
গতি, আকার ও উচ্চতা
ভুলভাবে বিচার করতে পারে, বিশেষত
রাতের স্বল্প আলোকে, কিংবা মানসিক
চাপের মধ্যে। (৬) গোপন
সামরিক প্রযুক্তি: কিছু
কিছু ঘটনা সামরিক বিমান, ড্রোন বা সেন্সর সিস্টেম
হতে পারে, যা প্রকাশ্যে ব্যাখ্যা
করা যায় না। এগুলির অনেকটাকেই ইউ-এ-পির ঘটনা হিসেবে
নথিভুক্ত হয়েছে। (৭) জৈবিক পদচিহ্নের
অনুপস্থিতি: যদি এলিয়েন জৈবিক
এবং পৃথিবীতে উপস্থিত হয়, তাহলে কোনো
না কোনো ইকোলজি, বায়োকেমিস্ট্রি বা জিনেটিক প্রমাণ পাওয়া
প্রত্যাশিত ছিল।
(৮) আন্তঃনাক্ষত্রিক ভ্রমণের
সীমাবদ্ধতা: শক্তি,
সময়, বিকিরণ এবং প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতার প্রয়োজনীয়তা পরিচিত পদার্থবিজ্ঞানের আলোকে ঘন ঘন জৈবিক
ভ্রমণকে অসম্ভাব্য করে তোলে।
এই সীমাবদ্ধতাগুলি
প্রমাণ করে না যে এলিয়েনের
আগমন অসম্ভব। এগুলো
শুধু দেখায় যে বর্তমান প্রমাণ
বৈজ্ঞানিক মানদণ্ড পূরণ করে না। তাই
বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর বাইরে জীবন অনুসন্ধানের বেশ কিছু প্রকল্প চালাচ্ছে অনেক বছর থেকে।
সংক্ষেপে দেখা যাক সেগুলির কয়েকটি।
মহাবিশ্বে
জীবন অনুসন্ধানকারী
প্রকল্প
(১)SETI:
Search for Extraterrestrial Intelligence বা
SETI কোনো একক টেলিস্কোপ নয়;
বরং প্রযুক্তিনির্ভর জীবনের প্রমাণ শনাক্ত করার বিস্তৃত বৈজ্ঞানিক
প্রচেষ্টা। ১৯৮৪ সালে ক্যালিফোর্নিয়ায় গঠিত হয় SETI ইন্সটিটিউট। SETI ইন্সটিটিউট SETI-কে অন্য নক্ষত্রমণ্ডলে
বুদ্ধিমান জীবের প্রমাণ অনুসন্ধান হিসেবে বর্ণনা করে [৭]।
SETI অনুসন্ধান সাধারণত রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি, optical flash
বা এমন অস্বাভাবিক সংকেত
বিশ্লেষণ করে, যা প্রযুক্তির
ইঙ্গিত দিতে পারে।
(২) ব্রেকথ্রো
লিসেন: আধুনিক SETI-এর
অন্যতম বৃহত্তম কর্মসূচি। এটি
নিকটবর্তী এক মিলিয়ন নক্ষত্র,
গ্যালাক্টিক কেন্দ্র, গ্যালাক্টিক সমতল এবং নিকটবর্তী
গ্যালাক্সি পর্যবেক্ষণের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে [৮]। এটি
বড় বড় ডেটাসেট বৈজ্ঞানিক ও জনসাধারণের বিশ্লেষণের
জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছে।
(৩) বার্কলে
SETI এবং মেশিন লার্নিং: SETI ইন্সটিটিউটের
বার্কলে ক্যাম্পাসের গবেষকেরা
বৃহৎ রেডিও ডেটাসেট বিশ্লেষণে মেশিন লার্নিং ব্যবহার করেছেন। ৮২০টি
নিকটবর্তী নক্ষত্রের ডিপ-লার্নিং প্রযুক্তিস্বাক্ষর অনুসন্ধানে
কিছু আকর্ষণীয় সংকেত পাওয়া যায়। কিন্তু পরে তা সম্ভবত মানবসৃষ্ট
ইন্টারফিয়ারেন্স হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়।
তবুও এই পদ্ধতি থেকে
দেখা গেছে প্রচলিত পদ্ধতিতে
বাদ পড়া অস্বাভাবিক সংকেতগুলি
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে শনাক্ত
করা যেতে পারে [৯]।
(৪) অ্যাস্ট্রোবায়োলজি ও এক্সোপ্ল্যানেট প্রকল্প: মহাবিশ্বে
পৃথিবীর বাইরে জীবনের উৎপত্তি,
বিবর্তন এবং মহাবিশ্বে তার
বিস্তার নিয়ে গবেষণা করছে নাসার অ্যস্ট্রোবায়োলজি প্রকল্প। সৌরজগতের
বাইরের গ্রহ শনাক্ত ও
বৈশিষ্ট্য নির্ধারণে সহায়তা করছে এক্সোপ্লানেট প্রকল্প। বর্তমানে
৬,২০০-এর বেশি
নিশ্চিত এক্সোপ্ল্যানেট তালিকাভুক্ত হওয়ায় জীবন অনুসন্ধান ক্রমশ
তথ্যসমৃদ্ধ হচ্ছে [২]।
(৫) মঙ্গল,
ইউরোপা ও এনসেলাডাস মিশন:
সৌরজগতের বিভিন্ন গ্রহ ও উপগ্রহে বাসযোগ্যতা এবং জৈবস্বাক্ষর
অনুসন্ধানের লক্ষ্যে বিভিন্ন প্রকল্পে
কাজ করছেন বিজ্ঞানীরা। মার্স রোভার মঙ্গল গ্রহে প্রাণের অনুসন্ধান চালাচ্ছে। বৃহস্পতির
বরফাবৃত উপগ্রহ ইউরোপায় অনুসন্ধান চালাচ্ছে ইউরোপা ক্লিপার।
শনির উপগ্রহ এনসেলাডাসে অ্যাস্ট্রোবায়োলজির
অনুসন্ধানও
শুরু হয়েছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার
ক্রমশ উন্নতির সাথে সাথে এলিয়েন গবেষণায় নতুন সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে।
এলিয়েনের
সন্ধানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এলিয়েন-জীবন গবেষণাকে নতুনভাবে রূপান্তর করতে পারে, কিন্তু ডেটা ছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এলিয়েন খুঁজে পাবে না কিছুতেই। এলিয়েন গবেষণায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রধান ভূমিকা হবে: (১) সিগনাল ক্লাসিফিকেশান: মানবসৃষ্ট বেতার তরঙ্গ এবং এলিয়েনের প্রযুক্তি স্বাক্ষর আলাদা করা। (২) অস্বাভাবিকতা নির্ণয়: মেশিন লার্নিং মহাকাশের টেলিস্কোপ থেকে প্রাপ্ত কোটি কোটি সিগনাল থেকে অস্বাভাবিক প্যাটার্ন শনাক্ত করতে পারে, যা মানুষ প্রচলিত পদ্ধতিতে মিস করতে পারে। (৩) এক্সোপ্ল্যানেট আবিষ্কারে বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে এআই। (৪) এআই মহাকাশের গ্রহগুলির বায়ুমন্ডলের মডেল তৈরি করতে পারে। এক্সোপ্ল্যানেটের বর্ণালী বিশ্লেষণ করে এদের রাসায়নিক মডেলের সঙ্গে তুলনা করতে সাহায্য করতে পারে। (৫) ভিনগ্রহের ভবিষ্যত মিশনগুলি স্বয়ংক্রিয় রোবটের মাধ্যমে পরিচালনায় এআই বিশেষ ভূমিকা রাখবে। অনুসন্ধানকারী মহাকাশযান এআই ব্যবহার করে নমুনা সংগ্রহের স্থান নির্বাচন এবং অস্বাভাবিক রসায়ন শনাক্ত করতে পারে। (৬) ইউএপি/ইউএফও রিপোর্ট এবং ডেটা বিশ্লেষণ করে অস্বাভাবিক কার্যক্রমের শ্রেণিবিন্যাসে সহায়তা করছে এআই। (৭) বিজ্ঞানের সবগুলি শাখার ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করে একযোগে এলিয়েন শনাক্তকরণে ভূমিকা রাখতে পারে এআই। জ্যোতির্বিজ্ঞান, রসায়ন, ভূবিজ্ঞান, বায়ুমণ্ডলীয় বিজ্ঞান এবং জীববিজ্ঞান একত্র করে কোনো সংকেত জৈবিক, প্রযুক্তিগত নাকি প্রাকৃতিক—তা মূল্যায়নে সহায়তা করতে পারে।
এলিয়েন
বিষয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য কল্পনা ও
শৃঙ্খলা দুটোই দরকার। কল্পনা
দরকার কারণ এলিয়েন জীবন
পৃথিবীর জীবন, মানব বুদ্ধিমত্তা বা
কল্পবিজ্ঞানের মতো নাও হতে
পারে। শৃঙ্খলা
দরকার কারণ ইউএফও দাবির
ইতিহাস দেখায় অনিশ্চয়তা কত সহজে বিশ্বাসে
পরিণত হয়। ইউএপি
পর্যবেক্ষণ হিসেবে বাস্তব, কিন্তু নির্ভরযোগ্য, পুনরুৎপাদনযোগ্য এবং স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য
তথ্য ছাড়া এগুলো এলিয়েনের প্রমাণ নয়। গ্রহের
প্রাচুর্য এবং পৃথিবীতে জীবনের
অভিযোজনক্ষমতা বিবেচনায় পৃথিবীর বাইরে অণুজীব জীবনের সম্ভাবনা বৈজ্ঞানিকভাবে যুক্তিযুক্ত। কিন্তু
বুদ্ধিমান প্রযুক্তিনির্ভর
সভ্যতার সম্ভাবনা এখনো অজানা। ড্রেক
সমীকরণ আমাদের অজ্ঞতাকে সংগঠিত করে। ফার্মি
প্যারাডক্স আমাদের আশাবাদকে প্রশ্ন করে। ডার্ক
ফরেস্ট তত্ত্ব সতর্ক করে যে মহাজাগতিক
সমাজতত্ত্ব সরল যোগাযোগ-কাহিনির
চেয়ে অনেক বেশি জটিল
হতে পারে। এলিয়েন
হতে পারে অণুজীব, মহাসাগরীয়
জীব, যান্ত্রিক বুদ্ধিমত্তা, বায়ুমণ্ডলীয় কিংবা পৃথিবীতে অজানা কোনো রাসায়নিক জীবনব্যবস্থা। তারা
হয়তো কখনো পৃথিবীতে আসবে
না। আমরা
তাদের শনাক্ত করতে পারি আলো,
রসায়ন, রেডিও সংকেত, কিংবা সূক্ষ্ম পরিসংখ্যানগত অস্বাভাবিকতার মাধ্যমে। এলিয়েন
বিজ্ঞানের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে উন্নত টেলিস্কোপ,
উন্নত মহাকাশযান, উন্নত জীববিজ্ঞান, উন্নত এআই এবং উন্নত
বৈজ্ঞানিক সংশয়বাদের ওপর।
এলিয়েন আছে
কি? এই প্রশ্নের আজকের সবচেয়ে
বৈজ্ঞানিক উত্তর হবে মহাবিশ্ব এত বিশাল ও
সমৃদ্ধ যে পৃথিবীর বাইরে
জীবন একটি গুরুতর বৈজ্ঞানিক
সম্ভাবনা, কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো যথেষ্ট প্রমাণ
এখনো আমাদের হাতে আসেনি।
তথ্যসূত্র
১। জন ম্যাক,
অ্যাবডাকশান: হিউম্যান এনকাউন্টারস উইথ এলিয়েনস, স্ক্রিবনার, নিউইয়র্ক, ১৯৯৪।
২। নাসা এক্সোপ্ল্যানেট
আর্কাইভ, এক্সোপ্ল্যানেট কাউন্টস, ক্যালটেক/আই-পি-এ-সি, মে ২০২৬।
৩। All-domain
Anomaly Resolution Office, Report on the Historical Record of U.S.
Government Involvement with Unidentified Anomalous Phenomena, Volume 1,
U.S. Department of Defense, 2024.
৪। NASA
Independent Study Team, Unidentified Anomalous Phenomena Independent Study
Team Report, NASA, 2023.
৫।
NASA Exoplanet Exploration Program, “Can We Find Life?” NASA Science.
৬।
NASA Astrobiology, “Technosignatures and the Search for Extraterrestrial
Intelligence,” NASA, 2018.
৭। SETI
Institute, “A Primer on SETI at the SETI Institute.”
৮। Breakthrough
Initiatives, “Breakthrough Listen.”
৯। Ma,
P. X. et al., “A deep-learning search for technosignatures of 820 nearby
stars,” Nature Astronomy, 2023.
বিজ্ঞানচিন্তা জুন ২০২৬ সংখ্যায় প্রকাশিত
















No comments:
Post a Comment