দিন শুরু করার আগেই একটি ম্যাসেজ এলো আমার এক বন্ধুর কাছ থেকে। সাথে প্রথম আলোর ফটোকার্ড “বিশ্বের সেরা ১০ বাসযোগ্য শহরের ৩টিই অস্ট্রেলিয়ার”। বন্ধুটি এজন্য আমাকে অভিনন্দন জানিয়েছে। অভিনন্দন ব্যাপারটি আজকাল খুবই সহজলভ্য – কোনোকিছু না করেও পাওয়া যায়। অস্ট্রেলিয়ার শহরগুলিকে বাসযোগ্য করে তোলার ব্যাপারে আমার কোনো ভূমিকা নেই। শুধুমাত্র এখানকার একটি শহরে উড়ে এসে জুড়ে বসার কারণেই আমার বন্ধুটি মনে করছে ব্যাপারটি
অভিনন্দনযোগ্য। তাকে দোষ দিচ্ছি না। উড়ে এসে জুড়ে বসে অনেকেই তো অনেক কিছুর কৃতিত্ব নিয়েছে। কৃতিত্ব দখল করে রাতারাতি আঙুল ফুলে বটগাছ হয়ে যেতে সে নিজের চোখেই দেখছে অনেককেই – তার নিজের শহরে। এই পরবাসে উড়ে এসেছি ঠিকই, কিন্তু জুড়ে বসা যাকে বলে তার ধারেকাছেও আমি নেই।এদেশের প্রায়
চল্লিশভাগ নাগরিকের জন্ম হয়েছে অন্যদেশে। এদের প্রত্যেকেই নিজেদের মাতৃভূমি ছেড়ে এসে
এদেশকে পরবর্তী প্রজন্মের মাতৃভূমি বানানোর চেষ্টা করছে। এদেশের শহরগুলিকে কয়েকটি বাণিজ্যিক
সংস্থার মাপকাঠিতে বাসযোগ্য করে তোলার ব্যাপারে এদের বেশিরভাগেরই তেমন কোনো ভূমিকা
নেই।
তবে কীভাবে
বছরের পর বছর এদেশের শহরগুলি সূচক তালিকার প্রথম দিকে থাকছে? মেলবোর্ন শহরের কথাই ধরা
যাক। ২০০২ সালে যখন প্রথমবারের মতো বিশ্বের বাসযোগ্য শহরগুলির তালিকা তৈরি হলো – মেলবোর্ন
সেই তালিকায় তৃতীয় স্থান দখল করলো। তারপর আরো ৮বছর সে তার জায়গা ধরে রাখলো। ২০১১ সালে
মেলবোর্ন উঠে এলো তালিকার শীর্ষে। বিশ্বের সবচেয়ে বাসযোগ্য শহর হিসেবে মেলবোর্নের নাম
উচ্চারিত হতে থাকলো পরবর্তী সাত বছর ধরে। ২০১১ থেকে ২০১৭ পর্যন্ত একটানা সাত বছর বিশ্বের
সবচেয়ে বাসযোগ্য শহর হিসেবে স্বীকৃতি মিললো মেলবোর্নের। ২০১৮ এবং ২০১৯ সালে মেলবোর্ন
ছিল বিশ্বের দ্বিতীয় বাসযোগ্য শহর। তারপর কোভিড এলো। মেলবোর্ন হয়ে পড়লো করোনা-কালীন
বিশ্বের সবচেয়ে বড় কারাগার। মাসের পর মাস গৃহবন্দী হয়ে পড়ে রইলো এই শহরের মানুষ। কিন্তু
সেই সময়েও র্যাংকিং থেমে ছিল না। পুরো পৃথিবী যেখানে অনিরাপদ অবাসযোগ্য হয়ে উঠেছিল
– সেখানেও হাস্যকরভাবে বাসযোগ্য শহরের তালিকা প্রকাশ করা হলো। ২০২০ সালে মেলবোর্ন ছিল
বিশ্বের ২৪তম বাসযোগ্য শহর। ২০২১ সালে সে অষ্টম হলো, ২০২২-এ দশম। ২০২৩-এ তৃতীয়, ২০২৪-২৫
দুবছর চতুর্থ, এবং ২০২৬-এ আবার তৃতীয়।
এই শহরের পর্যটন
অফিসগুলির বিজ্ঞাপন এবং কিছু নিউজ মিডিয়া ছাড়া স্থানীয় বা রাষ্ট্রিয় পর্যায়ে এই র্যাংকিং-এর
কোনো গুরুত্ব নেই। এগুলি নিয়ে এই শহরগুলির বেশিরভাগ নাগরিকের তেমন কোনো মাথাব্যথা নেই।
তবুও প্রশ্নটি
থেকে যায় – তালিকার উপরের দিকে ওঠার জন্য, বা উঠে গেলে সেখানে থেকে যাওয়ার জন্য এসব
নগরের কর্তাব্যক্তিরা কি কোনো পদক্ষেপই নেয় না? আলাদাভাবে পদক্ষেপ নেয়ার কোনো সুযোগ
নেই। কারণ যেসব বিষয়ে স্কোরিং করা হয় বলে বলা হয়, সেগুলির কোনটিই তড়িঘড়ি করে করার উপায়
নেই। যেমন শিক্ষা, চিকিৎসা, জনপরিবহন, নাগরিকসুবিধা – এগুলি মৌলিক এবং দীর্ঘমেয়াদী
ব্যবস্থার অংশ। যেসব দেশে দীর্ঘদিন থেকে এসব নাগরিক সুবিধা ধুঁকে ধুঁকে চলছে – সেসব
দেশের শহরগুলি তালিকার নিচের দিকে থাকবে – সেটাই তো স্বাভাবিক।
আরেকটি ব্যাপার
এখানে খুবই দরকারি – সেটা হলো সামাজিক ন্যায়বিচার আর প্রাতিষ্ঠানিক নীতিবোধের প্রতি
শ্রদ্ধা। এসব তড়িঘড়ি করে অর্জিত হয় না। শত বছরের সুনীতির চর্চার মাধ্যমে এগুলি প্রতিষ্ঠিত
হয়। যে সমাজে সুনীতি সুবচন নির্বাসনে, সেখানে ন্যায়বিচারের নামে শোরগোলই সার হবে এটাই
স্বাভাবিক।
মেলবোর্নের
উদাহরণই দেয়া যাক আবার একটু। ২০১১ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত – এই সাত বছর র্যাংকিং মতে মেলবোর্ন
শহর ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে বাসযোগ্য শহর। এই শহরের মেয়র নিশ্চয়ই কৃতিত্ব দাবি করতে পারেন
যে তিনি তাঁর শহরকে সবচেয়ে বাসযোগ্য করে তুলেছেন। নিকট ইতিহাস সেরকমই সাক্ষ্য দেয়।
২০০৮ সালে মেলবোর্ন শহরের মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন রবার্ট ডয়েল। তার পরপর আরো অনেক
মেয়াদে তিনি মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন নিজের কৃতিত্বে, কাজের স্বীকৃতি হিসেবে। ২০১৮ পর্যন্ত
একটানা ১১ বছর তিনি মেলবোর্ন শহরের মেয়র ছিলেন। তাঁর আমলেই সাতবছর একটানা বিশ্বের সবচেয়ে
বাসযোগ্য শহরের স্বীকৃতি পেয়েছিল মেলবোর্ন। কিন্তু এই কৃতিত্বকে তিনি ঢাল হিসেবে ব্যবহার
করতে পারেননি তাঁর অনৈতিকতার দোষ ঢাকার জন্য। না, তিনি কোনো চুরিচামারি করেননি। কিন্তু
মেয়াদ থাকতেও ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তাঁকে পদত্যাগ করতে হয় তাঁর অফিসের এক নারী
কর্মকর্তাকে আপত্তিকরভাবে স্পর্শ করার কারণে। মেলবোর্ন শহরের আইন তার কৃতিমেয়রকে কোন
রকমের দয়া দেখায়নি। এই ন্যায়বিচার এবং বিচারালয়ের প্রতি শ্রদ্ধা এবং প্রাতিষ্ঠানিক
অনৈতিকতার প্রতি অসহিষ্ণুতাই মূলত এদেশের প্রধান শক্তি।
তবে র্যাংকিং-এর
শেষের দিকে আছে যেসব শহর – তাদের এত হাহুতাশ কেন? এই হা-হুতাশও এক ধরনের বাণিজ্যিক
অস্ত্র বলে আমি মনে করি। কারণ প্রায়োগিক দিক থেকে এধরনের র্যাংকিং-এর তেমন কোনো ভূমিকা
নেই পৃথিবীর বেশিরভাগ মানুষের কাছে। তবে র্যাংকিং ব্যাপারটি যখন থেকে চালু হয়েছে তখন
থেকেই বেশ খাচ্ছে লোকে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম যখন থেকে টাকা উপার্জনের
মাধ্যম হয়ে উঠতে শুরু করেছে।
যে দেশে আমাদের শেকড়, যে শহরে আমাদের বেড়ে ওঠা, আমাদের
শৈশব কৈশোর যৌবনের সমস্ত ভালো-লাগা মন্দ-লাগার স্মৃতি – সেই শহর র্যাংকিং-এর তলানিতে
আছে বলে কি আমরা তাকে ছেড়ে চলে যাবো? আমার দেশ যদি আমার মা হয়, আমার শহর তো নিদেনপক্ষে
আমার বোন, আমার আশ্রয়। যে আমার আপন - তার কি কোন র্যাংকিং হয়? মায়ের মায়ার কি র্যাংকিং
হয়? এই যে ওরা বলছে ঢাকা শহর বিশ্বের তৃতীয় অবাসযোগ্য শহর – তাতে যারা ঢাকায় থাকে তাদের
কী এসে যায়? তারা কি সবাই ঢাকা ছেড়ে তালিকার উপরের দিকের কোন শহরের দিকে ছুটে যাবে?
এই যে ডেনমার্ক,
ভিয়েনা বা মেলবোর্ন সিডনি – এসব শহরের নাগরিকত্ব যথেষ্ট টাকা থাকলেই কিনতে পারা যায়।
ঢাকারও অনেকে প্রচুর টাকা নিয়ে এসব শহরে উড়ে এসে জুড়ে বসছে নিত্যই। এসব শহরে বাস করার
আত্মশ্লাঘাও যে তাঁরা অনুভব কিংবা প্রদর্শন করেন না তাও নয়। কিন্তু যে অবাসযোগ্য শহরে
তাঁদের আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধব প্রিয়-অপ্রিয়জনের বাস, যে শহরে একদা রিকশায় বসে কিংবা
মিছিলে হেঁটে বৃষ্টিতে ভিজেছিল – কীভাবে ভুলে যাবে সেই শহর? সেই শহরের আলোছায়া ভালোবাসা?

No comments:
Post a Comment