Saturday, 11 February 2023

কক্ষতাপমাত্রায় অদৃষ্টপূর্ব কোয়ান্টাম দশা

 




বিংশ শতাব্দীর শুরুতে যখন কোয়ান্টাম মেকানিক্সের জটিল গাণিতিক সমীকরণগুলি ক্রমশ বিকশিত হচ্ছিল, তখন বেশিরভাগ বিজ্ঞানী ধারণাই করতে পারেননি যে কোয়ান্টাম মেকানিক্স ব্যবহারিক জীবনে কোনো কাজে লাগবে। কোয়ান্টাম মেকানিক্সের ব্যবহার তো দূরের কথা, তখন কোয়ান্টাম মেকানিক্সের কলকব্জা বুঝতে পারাটাই দুরুহ ছিল অনেকের পক্ষে। রিচার্ড ফাইনম্যানের মতো বিজ্ঞানীও বলেছেন  – যদি কেউ দাবি করেন যে তিনি কোয়ান্টাম মেকানিক্স বুঝেছেন, তাহলে বুঝতে হবে তিনি কোয়ান্টাম মেকানিক্স আসলে বোঝেন না। তবুও এই দুর্বোধ্য বিষয়টার অন্তর্নিহিত শক্তিকে ব্যবহারযোগ্য প্রযুক্তিতে কাজে লাগাতে অবিরাম গবেষণা করে চলেছেন বিজ্ঞানীরা। তার সুফল আমরা এই একবিংশ শতাব্দীতে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে ভোগ করছি। একবিংশ শতাব্দীর প্রযুক্তি ক্রমশ হয়ে উঠছে কোয়ান্টাম-প্রযুক্তি নির্ভর। আর এই কোয়ান্টাম প্রযুক্তিকে সহজে ব্যবহারযোগ্য করে তোলার জন্য যে বিজ্ঞানীরা নিরলস গবেষণা করছেন এবং ক্রমাগত সাফল্য লাভ করছেন তাঁদের অন্যতম প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের ইউজিন হিগিন্স প্রফেসর জাহিদ হাসান। তাঁর নেতৃত্বে তাঁর গবেষণাগারে অতি সম্প্রতি আবিষ্কৃত হয়েছে স্বাভাবিক কক্ষতাপমাত্রায় কোয়ান্টাম দশা। যে কোয়ান্টাম দশা এতদিন শুধুমাত্র পরম শূন্য তাপমাত্রার কাছাকাছিই পাওয়া গেছে, সেখানে তা বিশেষ কিছু পদার্থে স্বাভাবিক কক্ষতাপমাত্রায় পর্যবেক্ষণ করার ঘটনা অদৃষ্টপূর্ব অর্থাৎ আগে কখনো দেখা যায়নি। এই আবিষ্কার এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে পৃথিবীবিখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী ন্যাচার ম্যাটেরিয়েলস এর অক্টোবর সংখ্যা্র মলাটকাহিনি হয়েছে এই ঘটনা। পদার্থবিজ্ঞানের জগতে হৈচৈ ফেলে দিয়েছে প্রফেসর জাহিদ হাসানের এই আবিষ্কার। এই আবিষ্কার খুলে দিয়েছে কোয়ান্টাম ন্যানোপ্রযুক্তির বিপুল সম্ভাবনার দ্বার। অচিরেই প্রচলিত ইলেকট্রনিক্সের জগতে বিপ্লব ঘটিয়ে দেবে এই আবিষ্কার।

কোনো বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারই হঠাৎ একদিনে হয়ে যায় না। প্রফেসর জাহিদ হাসানের দীর্ঘ সতেরো বছরের ধারবাহিক গবেষণার ফসল এই আবিষ্কার। বাংলাদেশি-আমেরিকান প্রফেসর জাহিদ হাসান এক্সপেরিমেন্টাল কোয়ান্টাম টপোলজিক্যাল ম্যাটেরিয়ালের গবেষণায় অগ্রদূত। ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করার পর উচ্চশিক্ষার্থে তিনি পাড়ি জমিয়েছিলেন আমেরিকায়। ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাস থেকে স্নাতক শেষ করে স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি করেছেন ২০০২ সালে। কোয়ান্টাম টপোলজি নিয়ে গবেষণা করতে করতে ২০০৫ থেকে ২০০৭ সালের মধ্যেই তিনি ত্রিমাত্রিক বিসমাথ-অ্যান্টিমনির কেলাসে আবিষ্কার করেছেন টপোলজিক্যাল বিন্যাস।

টপোলজি গাণিতিকভাবে খুবই জটিল জ্যামিতিক বিজ্ঞান। কোনো জ্যামিতিক আকার যদি ক্রমশ পরিবর্তিত হতে থাকে, যতই পরিবর্তন হোক না কেন, যদি মূল অংশ থেকে একেবারে বিচ্ছিন্ন হয়ে না যায়, তাহলে তাদেরকে একই টপোলজিক্যাল সেটের অংশ হিসেবে প্রকাশ করা যায়। মোটা দাগের উদাহরণ হিসেবে মৃৎশিল্পের কথা বিবেচনা করা যেতে পারে। একতাল মাটি থেকে যখন ধাপে ধাপে আকার পরিবর্তনের মাধ্যমে একটি পাত্র তৈরি হয়, তখন প্রত্যেকটি ধাপের আকার একেকটি টপোলজিক্যাল স্তর। কিন্তু মূল কাঠামো থেকে যদি কোনো অংশ একেবারে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় – সেটা আর প্রথম টপোলজির অংশ থাকে না। সেটা থেকে আরেকটি নতুন টপোলজির সূচনা করা যায়। আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে টপোলজির ব্যাপক ব্যবহার শুরু হয়েছে। জীববিজ্ঞানে টপোলজি ব্যবহারের বিশাল ক্ষেত্র অপেক্ষা করে আছে। জীবকোষগুলি আণুবীক্ষনিকভাবে প্রতিক্ষণে আকার বদলাচ্ছে। সেগুলির গঠন পর্যবেক্ষণে তো বটেই – শরীরের প্রোটিন ও নিউক্লিকিক এসিডের প্রতিটি মোচড় ব্যাখ্যা করা যায় টপোলজি দিয়ে।

প্রফেসর জাহিদ হাসান টপোলজি প্রয়োগ করে চলেছেন পদার্থবিজ্ঞানের কনডেন্সড ম্যাটার ফিজিক্স, কোয়ান্টাম ফিল্ড থিওরি এবং ম্যাটেরিয়েল সায়েন্সে। তিনি আবিষ্কার করেছেন টপোলজিক্যাল ডিরাক ম্যাটেরিয়েল বা ডিরাক সেমিমেটাল যা সেমিকন্ডাক্টরের জগতে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটাবে। তারপর তাঁর হাতেই আবিষ্কৃত হয়েছে টপোলজিক্যাল ম্যাগনেটিক ম্যাটেরিয়েল। ২০১৪-১৫ সালে তিনি আবিষ্কার করেছেন সম্পূর্ণ নতুন এক ধরনের টপোলজিক্যাল ম্যাটেরিয়েল যার নাম দেয়া হয়েছে ম্যাগনেটিক ভেইল সেমিমেটাল। জার্মান তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞানী হারমান ভেইল (Weyl), যিনি প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটিতেও কাজ করেছিলেন, এধরনের সেমিমেটাল পাওয়ার সম্ভাবনার তত্ত্ব প্রকাশ করেছিলেন বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে। প্রফেসর জাহিদ হাসান সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে পরিণত করেছেন গবেষণাগারে এই সেমিমেটাল আবিষ্কারের মাধ্যমে। আমেরিকান প্যাটেন্ট অফিস থেকে এই সেমিমেটাল আবিষ্কারের প্যাটেন্ট (স্বত্ব) পেয়েছেন প্রফেসর জাহিদ হাসান।

এই কোয়ান্টাম টপোলজিক্যাল ম্যাটেরিয়েলগুলির আবিষ্কারের সূচনা হয়েছে ১৯৮০-৮৫ সালে কোয়ান্টাম হল ইফেক্ট আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে। কিন্তু মূল হল-ইফেক্ট আবিষ্কৃত হয়েছিল প্রায় শতাধিক বছর আগে। কোন একটি পরিবাহীর ভেতর দিয়ে যখন বিদ্যুৎ চালনা করা হয় – তখন বিদ্যুৎপ্রবাহের সাথে লম্বভাবে যদি ভোল্টেজ মাপা হয় – তাহলে ঐ পরিবাহীর মধ্যে ভোল্টেজের কোন পার্থক্য দেখা যায় না। কিন্তু যদি বিদ্যুৎপ্রবাহের সাথে লম্বভাবে কোন চৌম্বক-প্রবাহ প্রয়োগ করা হয়, তখন পরিবাহীর ভেতর দিয়ে প্রবাহিত ইলেকট্রনগুলি চৌম্বকক্ষেত্রের প্রভাবে কিছুটা বিচ্যুত হয়ে যায়। ফলে পরিবাহীর ভেতর ভোল্টেজের পার্থক্য দেখা যায়। আমেরিকান পদার্থবিজ্ঞানী এডউইন হল (Hall) এই ব্যাপারটি আবিষ্কার করেছিলেন। এরপর শুধু পরিবাহী নয়, অর্ধপরিবাহী বা সেমিকন্ডাক্টরের ক্ষেত্রেও হল ইফেক্ট পাওয়া গেছে। কিন্তু কোয়ান্টাইজড হল ইফেক্ট আবিষ্কৃত হয়েছে ১৯৮০ সালে। ১৯৮৫ সালে জার্মান প্রফেসর ক্লাউস ফন ক্লিটজিং পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন কোয়ান্টাইজড হল ইফেক্ট আবিষ্কারের জন্য।

কোয়ান্টাইজড হল ইফেক্ট সবচেয়ে ভালো বোঝা যায় কোয়ান্টাম টপোলজির মাধ্যমে। এরপর থেকে পৃথিবীর বিভিন্ন গবেষণাগারে বিজ্ঞানীরা কোয়ান্টাম টপোলজি নিয়ে গবেষণা করছেন। আবিষ্কৃত হয়েছে টপোলজিক্যাল ইনসুলেটর বা অপরিবাহী, টপোলজিক্যাল সুপারকন্ডাক্টর, টপোলজিক্যাল ম্যাগনেট এবং প্রফেসর জাহিদ হাসান আবিষ্কার করেছেন ভেইল সেমিমেটাল।

এই আবিষ্কারগুলি ধারাবাহিকভাবে নোবেল পুরষ্কার পেয়ে আসছে। ১৯৯৮ সালে ফ্র্যাকশানাল কোয়ান্টাম হল ইফেক্ট আবিষ্কারের জন্য পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির প্রফেসর রবার্ট লাভলিন, কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির হোর্স্ট স্টুর্মার, এবং প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটির প্রফেসর ড্যানিয়েল সুই (Tsui)। এরপর ২০১৬ সালে টপোলজিক্যাল ফেইজ ট্রানজিশান এবং টপোলজিক্যাল ফেইজেজ অব ম্যাটারের তাত্ত্বিক গবেষণার জন্য পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ডেভিড থাউলেস, প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ডানকান হ্যালডেন, এবং ব্রাউন ইউনিভার্সিটির প্রফেসর মাইকেল কস্টারলিৎজ। এরই ধারাবাহিকতায় প্রফেসর জাহিদ হাসানের নোবেল পুরষ্কার পাওয়া এখন শুধুমাত্র সময়ের অপেক্ষা।

টপোলজিক্যাল কোয়ান্টাম ম্যাটেরিয়েল এবং সেমিমেটাল এপর্যন্ত যতগুলি আবিষ্কৃত হয়েছে তার সবগুলিই কাজ করে শুধুমাত্র পরম শূন্য তাপমাত্রার কাছাকাছি পরিবেশে। এরকম পরিবেশ তৈরি করা প্রচুর খরচসাপেক্ষ এবং শুধুমাত্র উন্নত গবেষণাগারেই তা করা সম্ভব। তাই এদের বাস্তবিক প্রয়োগের সবচেয়ে বড় বাধা হলো তাপমাত্রা। কক্ষতাপমাত্রায় কাজ না করলে – এসব পদার্থকে কাজে লাগানো সহজ নয়।

পদার্থের ক্ষেত্রে তাপমাত্রার ব্যাপারটা অত্যন্ত দরকারি। পদার্থের কঠিন, তরল এবং বায়বীয় এই তিন অবস্থার কথা আমরা জানি। কক্ষতাপমাত্রায় পদার্থের এই তিন অবস্থা খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। এর বাইরে পদার্থের আরো দুটো অবস্থা আছে – প্লাজমা ও কোয়ান্টাম কনডেনসেট – যেদুটো পদার্থের বিশেষ অবস্থা। অত্যন্ত উচ্চতাপমাত্রায় পদার্থের পরমাণুর গতি এত বেশি বেড়ে যায় যে ইলেকট্রনগুলি পরমাণু থেকে আলাদা হয়ে আয়নিত গ্যাসে পরিণত হয়। দৃশ্যমান মহাবিশ্বের মোট পদার্থের প্রায় শতকরা ৯৯ ভাগ প্লাজমা অবস্থায় আছে। আমাদের সূর্যসহ সবগুলি নক্ষত্রে পদার্থগুলি প্লাজমা অবস্থায় টগবগ করে ফুটছে ভীষণ উত্তপ্ত অবস্থায়। অন্যদিকে পদার্থের কোয়ান্টাম ঘনীভবন বা কোয়ান্টাম কনডেনসেট পাওয়া যায় তাপমাত্রা কমতে কমতে পরম শূন্য তাপমাত্রার কাছাকাছি পৌঁছে গেলে। সত্যেন বসু এবং আইনস্টাইনের গবেষণা থেকে পাওয়া গেছে পদার্থের বোস-আইনস্টাইন কনডেনসেট।

সূক্ষ্মভাবে হিসেব করলে দেখা যায়, পদার্থের সবগুলি ধর্মই কোয়ান্টাম মেকানিক্স দিয়ে সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। কিন্তু স্বাভাবিক তাপমাত্রায় পদার্থের কঠিন, তরল ও বায়বীয় দশায় কোয়ান্টাম মেকানিক্সের ধর্মগুলি অদৃশ্য থেকে যায়। কিন্তু তাপমাত্রা যখন কমানো হয়, পরমাণুর গতি ক্রমশ কমতে শুরু করে, এবং কণাগুলির কম্পন আস্তে আস্তে থেমে যায়। এই অবস্থায় তাদের নিয়ন্ত্রণ করা সহজ। কিন্তু এরকম শীতল পরিবেশ তৈরি করে গবেষণা করা আর প্রযুক্তিগতভাবে কাজে লাগিয়ে সাধারণের ব্যবহার উপযোগী বস্তুতে রূপান্তর করা ভিন্ন বিষয়। তাই এক্ষেত্রে যাঁরা কাজ করছেন সেইসব বিজ্ঞানীদের সবাই প্রাণপন চেষ্টা করছেন কক্ষতাপমাত্রায় যদি কোয়ান্টাম ইফেক্ট দেখার মতো কোন পদার্থ পাওয়া যেতো। এই অসাধ্য সাধন করেছেন প্রফেসর জাহিদ হাসান এবং তাঁর গবেষণাদল। তাঁরা বিসমাথ-ব্রোমাইড শংকরের টপোলজিক্যাল ইনসুলেটরে কোয়ান্টাম হল ইফেক্ট আবিষ্কার করেছেন কক্ষতাপমাত্রায়।

পদার্থের ভেতর দিয়ে বিদ্যুৎ প্রবাহিত হওয়ার ভিত্তিতে আমরা পদার্থকে পরিবাহী, অপরিবাহী এবং অর্ধপরিবাহীতে ভাগ করি। তবে পদার্থের কোয়ান্টাম শক্তিস্তরের ভিত্তিতে এদেরকে আরো সূক্ষ্মভাবে সংজ্ঞায়িত করা যায়। পরিবাহীর মধ্যে কন্ডাকশন এবং ভ্যালেন্স ব্যান্ডের মধ্যে কোন ফাঁক থাকে না। সেখানে ইলেকট্রনের প্রবাহে তাই কোন সমস্যা হয় না। অপরিবাহী পদার্থের ভেতর কন্ডাকশন ব্যান্ড ও ভ্যালেন্স ব্যান্ডের মধ্যে শক্তির পার্থক্য প্রায় ১০ ইলেকট্রন-ভোল্ট। অর্ধপরিবাহীর ভেতর শক্তিস্তরের পার্থক্য পদার্থভেদে ভিন্নভিন্ন হতে পারে। ইনসুলেটর বা অপরিবাহী পদার্থ বললেই আমরা যেমন ধরে নিই যে তার ভেতর দিয়ে কোন ইলেকট্রনই প্রবাহিত হবে না, কোয়ান্টাম টপোলজির গবেষণায় যে টপোলজিক্যাল ইনসুলেটর ব্যবহৃত হয় – তার ক্ষেত্রে তা খাটে না। টপোলজিক্যাল ইনসুলেটর কাজ করে ভিন্নভাবে। এই অপরিবাহীর ভেতরে কোন ইলেকট্রন-প্রবাহ থাকে না, কিন্তু এর প্রান্ত ঘেঁষে যেসব ইলেকট্রন থাকে তারা মুক্তভাবে চলাচল করতে পারে, ফলে প্রান্তে ইলেকট্রন-প্রবাহ থাকে। আকারের পরিবর্তন হলেও এই ইলেকট্রন-প্রবাহে তার কোন প্রভাব পড়ে না।

টপোলজিক্যাল কোয়ান্টাম দশার পরীক্ষায়  টপোলজিক্যাল ইনসুলেটর ব্যবহার করেছেন প্রফেসর জাহিদ হাসানের দল। শুরুতে পরিকল্পনা ছিল বিসমাথ-ব্রোমাইডের সংকর পদার্থে ভাইল কণার ধর্ম পরিলক্ষিত হয় কি না দেখা। কিন্তু তাঁরা এই সংকরে ভাইল কণার ধর্ম খুঁজে পাননি। তবে তাঁদের আগের গবেষণা বিসমাথ-অ্যান্টিমনির সংকরের টপোলজিক্যাল ইনসুলেটরে প্রাপ্ত গবেষণার ফলাফলের সাথে তুলনা করে দেখলেন যে বিসমাথ-ব্রোমাইডের সংকরে কক্ষতাপমাত্রায় কোয়ান্টাম স্পিন হল ইফেক্ট পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব এবং তা তাঁরা করে দেখিয়েছেন। এই আবিষ্কারের প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী। কোয়ান্টাম-স্পিন কাজে লাগিয়ে তৈরি হবে আরো শক্তিশালী ইলেকট্রনিক্স। ন্যানোটেকনোলজি এবং পুরো ম্যাটেরিয়েল ইন্ডাস্ট্রিই এগিয়ে যাবে কোয়ান্টাম মেটেরিয়েলের দিকে। দুর্বোধ্য কোয়ান্টাম মেকানিক্স থেকে বিরাট উত্তরণ ঘটিয়ে সবার ব্যবহার উপযোগী কোয়ান্টাম পদার্থের নতুন জগত তৈরি করার পথপ্রদর্শকের ভূমিকা পালন করছেন আমাদের বাংলাদেশের সন্তান জাহিদ হাসান।

 

তথ্যসূত্র: www.nobelprize.org, Tom Garlinghouse, Princeton University; Nature Materials, October 2022; https://phy.princeton.edu/people/m-zahid-hasan                                        

_________________

বিজ্ঞানচিন্তা ডিসেম্বর ২০২২ সংখ্যায় প্রকাশিত।

বিজ্ঞানচিন্তা অনলাইনের লিংক










ফাল্গুনী অমনিবাস কিংবা কিছুই না

 



লেখক ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়কে আমি এই সেদিনও লেখিকা মনে করতাম। এখন অবশ্য লেখক শিক্ষক পরিচালক এরকম সব পেশাগত পরিচয়ের আর লৈঙ্গিক বিভাজন হয় না। এখন তসলিমা রুদ্র দুজনই লেখক। লেখিকা, শিক্ষিকা, পরিচালিকা এরকম শব্দগুলির ব্যবহার এখন খুবই অনাধুনিক। ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়ের প্রথম বই কখন পড়েছিলাম হুবহু দিন-তারিখ মনে নেই। তখন এমন একটা সময়, যখন পরীক্ষার জন্য ‘সময়ের মূল্য’ রচনা মুখস্থ করতে হতো, কিন্তু সময়ের আলাদা কোন মূল্যই সেই সময় ছিল না আমার কাছে। সুনীলের ‘সেই সময়’ তখনো প্রকাশিত হয়নি, পড়া তো আরো অনেক পরের ব্যাপার।

বাড়িতে একজন ইঁচড়ে পাকা খুড়তুতো বড়ভাই ছিলেন। তার অনেকগুলি শখের একটি ছিল বইপড়া। নানান জায়গা থেকে নানান রকমের বই জোগাড় করে আনতেন তিনি। তক্কে তক্কে থাকতাম কখন হাত ঘুরে আমার হাতে আসবে। ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়ের প্রথম বই যেটা আমার হাতে এসেছিল – মধুমিলন টাইপের কিছু একটা নাম ছিল তার। তখন সবে গোঁফ গজাতে শুরু করেছে, শরীরে গোলমেলে নতুন হরমোনের প্রভাব প্রকট। মাথার ভেতর যখন তখন উঁকি মারে নানান নিষিদ্ধ কৌতুহল। নামের কারণেই বইটির প্রতি আকৃষ্ট হওয়া। পড়ার পর মনে হয়েছিল বইটির নামকরণের স্বার্থকতা নেই।

পরে ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়ের আরো অনেক বই পড়া হয়েছিল বিভিন্ন সময়ে। তাঁর কাহিনি থেকে তৈরি ভারতীয় সিনেমা ‘শাপমোচন’ও দেখেছিলাম। তখন চট্টগ্রাম শহরে অনেকগুলি বইয়ের দোকান ছিল, বইয়ের ক্রেতাও ছিল অনেক। ফুটপাতেও বই বিক্রি হতো অনেক। বেশিরভাগই পাইরেটেড বই। তখন অবশ্য পাইরেসি সম্পর্কে কোন ধারণাই ছিল না। তিন-চার টাকা দিয়ে ফালগুনী, আশুতোষ, নীহাররঞ্জন, নিমাই ভট্টাচার্যের বই কিনতে পেরেই আমি খুশি ছিলাম। ফুটপাত থেকে কিনেই পড়েছিলাম ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়ের ‘চিতা বহ্নিমান’। বইটি পড়ে তখন কেমন লেগেছিল এখন আর মনে নেই। মানব-মানবীর মানসিক জটিলতার পুরোটা বোঝার মতো বয়স কিংবা অভিজ্ঞতা কোনটাই ছিল না তখন। তাই সেই সময়ের অনুভূতির বিস্মরণ ঘটেছিল।

এতদিন পরে এই ফাল্গুনের প্রাক্কালে আবার নতুন করে ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায় পড়তে হলো। বাংলাদেশে হাতেগোনা যে ক’টা বইয়ের দোকান এখনো টিকে আছে, দেখলাম সেখানে ‘ফাল্গুনী অমনিবাস’ নামে ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়ের তিনটি বইয়ের একটি সংকলন বেশ প্রকটভাবেই শোভিত হচ্ছে। আমার এক বন্ধু সেই বইটি আমাকে পাঠানো কর্তব্য মনে করে পাঠিয়ে দিয়েছে। হাতে পেয়েই পড়তে বসে যেতো যে পাঠক – সেই পাঠক এখন আর নেই। আমার বন্ধুটিও তা জানে বলেই বারবার জিজ্ঞেস করে বইটি পড়েছি কি না।

‘অনেক আগে পড়েছি’ – বিরক্তি চেপে বলি।

‘অনেক আগে পড়েছিস সেটা তো জানি। এখন পড়ে বল – আগের মতো লেগেছে কি না।‘ কন্ঠ থেকে বিরক্তির ভাব চাপা দেয়ার ভদ্রতা আমি দেখালেও সে দেখায় না।

না পড়েই পড়েছি বলে ফেলতে পারতাম। শুনেছি অনেকে নাকি ফ্ল্যাপের দশ লাইন পড়েই বইয়ের রিভিউ করে ফেলে। কিন্তু প্যাথোলজিক্যাল লায়ারও কারো কারো কাছে মিথ্যা বলে না। বইটি – মানে ফাল্গুনীর তিনটি উপন্যাস আবার পড়তে হলো। চিতা বহ্নিমান, চরণ দিলাম রাঙায়ে, এবং স্বাক্ষর। এই বইগুলি প্রথম পড়ার কী অনুভূতি ছিল তা এখন মনে নেই। কিন্ত এখনকার পাঠে আগের যদি কোন ভালো লাগা থেকেও থাকে তা উধাও হয়ে গেছে। ঘটনা, বর্ণনা, পরিণতি – কোনটাই যুতসই মনে হলো না। তার চেয়েও বেশি যেটা খচখচ করছে সেটা হলো ঘটনা তৈরির পেছনের দর্শন। যুক্তিহীন দর্শন মেনে নিতে হলে মানসিক স্বাধীনতা বিপন্ন হয়।

চিরায়ত সাহিত্য আমরা তাদেরকেই বলি – যারা বহুবার পাঠেও পুরনো হয়ে যায় না, ভালো লাগা একটুও কমে না। ফাল্গুনীর এই বইগুলি সেরকম নয়। তবে অনেক দিন আগের পড়া বই আবার পড়তে গেলে – ফেলে আসা দিনগুলির কথা মনে পড়ে যায়, সেটাই লাভ। ফাল্গুনী অমনিবাস উসকে দিয়েছে কিছু পুরনো দিনের স্মৃতি। এখন মনে পড়লো ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়ের দুইটি বই আমার বুকশেলফ থেকে কে নিয়ে গিয়ে আর ফেরত দেয়নি।


Tuesday, 31 January 2023

সুদূরতমা ভয়েজার

 




আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগে ১৯৭২ সালে যখন ‘ম্যারিনার জুপিটার/স্যাটার্ন ১৯৭৭’ প্রকল্পের কাজ শুরু হয় – তখন বিজ্ঞানীদের লক্ষ্য ছিল মাত্র পাঁচ বছর কাজ করার সামর্থ্যযুক্ত একটি নভোযান মহাকাশে পাঠানো যা বৃহস্পতি ও শনিগ্রহের কাছাকাছি গিয়ে গ্রহদুটো সম্পর্কে তথ্য উপাত্ত এবং ছবি তুলে পাঠাবে, যেখান থেকে ওই দূরের গ্রহ দুটোর অজানা দিকের কিছুটা হলেও জানা যাবে। এর বেশি কিছু আশা সেদিন কেউই করেনি এই মিশন থেকে। সেদিন কেউ স্বপ্নেও ভাবতে পারেননি যে এই আপাত সাদামাটা মিশনটিই একদিন মহাকাশ গবেষণার ইতিহাস রচনা করবে, পৌছে যাবে সৌরজগতের সীমানা পেরিয়ে অন্তনাক্ষত্রিক স্থানের (interstellar space) শূন্যতায়। ১৯৭৭ সালে মহাকাশে পাঠানো ভয়েজার পয়তাল্লিশ বছর কেটে যাবার পরেও এখনো সক্রিয়। এই ২০২২ সালের আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে মহাকাশে  কেটে গেছে ভয়েজারের ৪৫ বছর। এই অক্টোবরের শেষে (২৯/১০/২০২২ বাংলাদেশ সময় সকাল ১১:২২) ভয়েজার-১ পৃথিবী থেকে ১৪,৭৪৪,৮০৪,৩২৮ মাইল এবং সূর্য থেকে ১৪,৬৮৮,১৩৬,০৯১ মাইল দূরে অবস্থান করছিল। ভয়েজার-২ পৃথিবী থেকে ১২,২৫৫,৫৫৫,৪৮৭ মাইল এবং সূর্য থেকে ১২,২৩৭,১১৬,৯৭৯ মাইল দূরে ছিল। চলতে চলতে ক্রমশ আরো দূরে চলে যাচ্ছে এরা। বলা চলে মহাকাশের আরো গভীর থেকে গভীরে চলে যাচ্ছে। [ পাঠক নাসার জেট প্রপালসান ল্যাবরেটরির ওয়েবসাইট https://voyager.jpl.nasa.gov/mission/status/ থেকে ভয়েজারের বর্তমান অবস্থান এবং যন্ত্রপাতির অবস্থা সম্পর্কে জেনে নিতে পারেন।]

আমাদের সৌরজগতের আটটি গ্রহের প্রথম চারটি গ্রহ – বুধ, শুক্র, পৃথিবী ও মঙ্গল – আয়তনে খুব বেশি বড় নয়, কিন্তু ঘনত্ব এমন যে এদেরকে কঠিন গ্রহ বলা হয়। এরা তুলনামূলকভাবে সূর্যের কাছের গ্রহ। বাকি চারটি গ্রহ – বৃহস্পতি, শনি, ইউরেনাস ও নেপচুন – আয়তনে বিশাল। কিন্তু তাদের শরীরের বেশিরভাগই গ্যাসীয় পদার্থে তৈরি বলে তাদের ঘনত্ব খুব কম। পৃথিবী থেকে এদের দূরত্ব অনেক বেশি।

পৃথিবীর কাছের গ্রহগুলিকে যথাসম্ভব কাছ থেকে দেখার জন্য মহাকাশযান পাঠানো শুরু হয়েছে ১৯৫৭ সাল থেকে তদানীন্তন সোভিয়েত ইউনিয়নের স্পুটনিক-১ উৎক্ষেপণের মধ্য দিয়ে। বুধ, শুক্র ও মঙ্গল – সৌরজগতের এই তিন কঠিন গ্রহে মহাকাশযান পাঠানো শুরু হয়েছিল ১৯৬২ সালে ম্যারিনার-১ মিশনের মাধ্যমে। পরবর্তী দশ বছরের মধ্যে ম্যারিনার-১ থেকে ম্যারিনার-১০ – দশটি মহাকাশযান পাঠানো হয়েছে বুধ, শুক্র ও মঙ্গলের তথ্যানুসন্ধানে।

দূরবর্তী গ্রহগুলিতে মহাকাশযান পাঠানো অত্যন্ত খরচসাপেক্ষ এবং সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। কিন্তু বিজ্ঞানীরা মহাকাশের মহাজাগতিক ঘটনাগুলি কাজে লাগিয়ে অনেক কঠিন ব্যাপার সহজ করে তোলার পদ্ধতি আবিষ্কার করে চলেছেন। এক গ্রহের কাছাকাছি পৌঁছানোর জন্য অন্য গ্রহের মহাকর্ষ বল কীভাবে কাজে লাগাতে হয় তার হিসেবনিকেশ বিজ্ঞানীদের জানা। এর জন্য খেয়াল রাখতে হয় সৌরজগতের গ্রহগুলির পারস্পরিক অবস্থান কখন কোথায় হবে।

সৌরজগতের গ্রহগুলি নিজেদের কক্ষপথে নির্দিষ্টগতিতে সূর্যের চারপাশে ঘুরতে ঘুরতে অনেক বছর পর পর পরস্পরের খুব কাছাকাছি চলে আসে। ১৯৬৫ সালের মাঝামাঝি জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা হিসেব করে দেখলেন যে বারো-তেরো বছর পর অর্থাৎ ১৯৭৯ থেকে ১৯৮৯ সালের মধ্যে বৃহস্পতি, শনি, ইউরেনাস ও নেপচুন – এই বিশাল চারটি গ্যাসীয় গ্রহের পারস্পরিক অবস্থান এমন হবে যে কোনো নভোযান যদি সেখানে পাঠানো যায়, তাহলে গ্রহগুলির পারস্পরিক মহাকর্ষ বল কাজে লাগিয়ে এক গ্রহ থেকে অন্য গ্রহে সেই মহাকাশযানকে পাঠাতে সময় এবং জ্বালানি দুটোই খুব কম লাগবে। এই গ্রহগুলির আবার এরকম সুবিধাজনক অবস্থানে আসতে সময় লাগবে আরো ১৭৫ বছর। তাহলে এটাই সুবর্ণ সুযোগ বৃহস্পতি ও শনিগ্রহের উদ্দেশে নভোযান পাঠানোর।

তখনো চলমান প্রকল্প ম্যারিনারেরই অংশ হিসেবে ১৯৭৭ সালে বৃহস্পতি ও শনির কাছাকাছি পৌঁছানোর লক্ষ্যে হাতে নেয়া হলো ‘ম্যারিনার জুপিটার/স্যাটার্ন ১৯৭৭’ প্রকল্প। ১৯৭২ সাল থেকে প্রকল্পের কাজ শুরু হলো। ১৯৭৭ সালের মার্চ মাসে এই প্রকল্পের নতুন নামকরণ করা হলো – ভয়েজার। একই ডিজাইনের দুটো নভোযান ভয়েজার-১ ও ভয়েজার-২ তৈরি করা হলো।

২০ আগস্ট ১৯৭৭ আমেরিকার মহাকাশ সংস্থা নাসার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে  বৃহস্পতি ও শনির উদ্দেশে যাত্রা শুরু করলো মহাকাশযান – ভয়েজার-২। এর দু’সপ্তাহ পর ৫ সেপ্টেম্বর ১৯৭৭ ভয়েজার-২ কে অনুসরণ করলো তারই যমজ সহোদরা ভয়েজার-১। দুটো মহাকাশযান জমজ এবং একই নামের হলেও তাদের গতি এবং গতিপথের ভিন্নতা ছিল সামান্য। যেটা আগে যাত্রা করেছে তার নাম ভয়েজার-২, আর যেটা পরে গেছে সেটা ভয়েজার-১ হবার কারণ সেখানেই। ভয়েজার-১ পৃথিবীর সাপেক্ষে দক্ষিণ মেরু দিয়ে চলে গেছে, আর ভয়েজার-২ গেছে উত্তর মেরু দিয়ে।  বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা অনুযায়ী ভয়েজার-১ বৃহস্পতি ও শনিগ্রহে পৌঁছে গেছে ভয়েজার-২ এর আগে।


ভয়েজার এর গতিপথ



ভয়েজার-এর গঠন ও যন্ত্রপাতি




ভয়েজারের কমান্ড কম্পিউটার সাবসিস্টেম (সিসিএস) দ্বারা নভোযানের কন্ট্রোল ফাংশান নিয়ন্ত্রিত হয়। নভোযান কোন্‌ কাজের পর কোন্‌ কাজ করবে, অ্যান্টেনার দিক কীভাবে পরিবর্তিত হবে তাও নিয়ন্ত্রিত হয় সিসিএস এর মাধ্যমে। নভোযানের গতিপথ নিয়ন্ত্রণ ও সমন্বয় করার জন্য আছে অ্যাটিচিউড অ্যান্ড আর্টিকুলেশান কন্ট্রোল সাবসিস্টেম। পৃথিবীর কন্ট্রোল স্টেশন থেকে তথ্য গ্রহণ এবং নভোযান থেকে পৃথিবীতে তথ্য প্রেরণের জন্য আপলিংক ও ডাউনলিংক ট্রান্সমিটার সিস্টেম কাজ করে তিন দশমিক সাত মিটার লম্বা হাই-গেইন অ্যান্টেনার মাধ্যমে। বৈদ্যুতিক শক্তি সরবরাহের জন্য সংযুক্ত করা হয়েছে তিনটি রেডিও-আইসোটোপ থার্মোইলেকট্রিক জেনারেটর।

পরিকল্পনা করা হয়েছিল ভয়েজার বৃহস্পতি ও শনিগ্রহকে খুব কাছ থেকে দেখবে। শনির বলয়গুলি দেখবে আর দেখবে দুইটি গ্রহের যে ক’টি উপগ্রহ দেখা যায় তাদের। দুইটি ভয়েজার গ্রহগুলির দুই দিক থেকে ছবি তুলবে – তাই একটা সামগ্রিক চিত্র পাওয়া যাবে। এই লক্ষ্যে মাত্র পাঁচ বছর কাজ করার জন্য তৈরি করা হয়েছিল নভোযানদুটো।

১৯৭৭ সালের ২০ আগস্ট কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে উৎক্ষেপণ করা হয় ভয়েজার-২, ৫ সেপ্টেম্বর উৎক্ষেপণ করা হয় ভয়েজার-১। উৎক্ষেপণের পরদিনই ৬ সেপ্টেম্বর ভয়েজার-১ পৃথিবী ও চাঁদের ছবি পাঠায়।

১৯৭৯ সালের ৫ মার্চ – ভয়েজার-১ বৃহস্পতির কাছাকাছি পৌঁছে যায়। ১৬১০ সালে গ্যালিলিও তাঁর নিজের তৈরি দূরবীক্ষণের সাহায্যে আবিষ্কার করেছিলেন বৃহস্পতির চারটি চাঁদ – আইও, ইওরোপা, গ্যানিমিড, ও ক্যালিস্টো। এই উপগ্রহগুলির অবস্থান এবং আকার ছাড়া আর কোনো বিশেষ তথ্য জানা ছিল না এতদিন। বৃহস্পতির কাছে গিয়েই ভয়েজার-১ মার্চের নয় তারিখে অপটিক্যাল ন্যাভিগেশান ইমেজের মাধ্যমে বৃহস্পতির চাঁদ আইও-র বুকে জীবন্ত আগ্নেয়গিরি শনাক্ত করে।  গ্যানিমিড উপগ্রহে দেখা গেলো ভূমিকম্পের ফলে সৃষ্ট লম্বা গভীর খাদ। বৃহস্পতির আরো দুটো চাঁদ থিবি (Thebe) ও মেটিস (Metis) আবিষ্কৃত হয়। আমরা এখন অবশ্য বৃহস্পতির মোট আশিটি চাঁদের সন্ধান পেয়েছি। ভয়েজার-১ বৃহস্পতিগ্রহে বিদ্যুৎচমকের ছবি তোলে। পৃথিবীর বাইরে এই প্রথম অন্য কোন গ্রহে বিজলি চমকানো শনাক্ত করা হলো।

ভয়েজার-১ এর পাঠানো উপাত্ত বিশ্লেষণ করে জানা গেলো বৃহস্পতির গ্রহ আইও-র উপরিতল থেকে বৈদ্যুতিক আয়ন আলাদা হয়ে বৃহস্পতির চৌম্বকক্ষেত্রকে অনেকগুণ বাড়িয়ে দেয়। ফলে এটা বৃহস্পতির চুম্বকক্ষেত্রে প্রায় পঞ্চাশ লক্ষ অ্যাম্পিয়ার বিদ্যুৎপ্রবাহ সরবরাহ করছে।

১৯৭৯ সালের ৯ জুলাই – ভয়েজার-২ বৃহস্পতির কাছাকাছি পৌঁছায়। বৃহস্পতিরও যে বলয় আছে তা সর্বপ্রথম ধরা পড়ে ভয়েজার-২ এর ক্যামেরায়। বৃহস্পতির তৃতীয় চাঁদ আড্রাস্টিয়া আবিষ্কৃত হয় – যেখানে শুকিয়ে যাওয়া সাগরের চিহ্ন স্পষ্ট। আইও-র বুকে তখনো ছয়টি আগ্নেয়গিরি জীবন্ত। ভয়েজার-১ এর চার মাস পর ভয়েজার-২ পৌঁছেছে বৃহস্পতির কাছে। ভয়েজার-১ চার মাস আগে যে আগ্নেয়গিরি দেখেছিল আইও-তে তা তখনো সক্রিয়। তার মানে বৃহস্পতির আগ্নেয়গিরি বেশ কয়েক মাস পর্যন্ত সক্রিয় থাকে।

১৯৮০ সালের ৯ নভেম্বর ভয়েজার-১ শনির উপগ্রহ টাইটান এবং শনির কাছাকাছি পৌঁছে যায়। শনির কয়েকটি বড় বড় চাঁদ সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল আগেই। ভয়েজার-১ এর মাধ্যমে শনির আরো তিনটি চাঁদ অ্যাটলাস, প্রমিথিউস, প্যানডোরা আবিষ্কৃত হয়। টাইটানের ডাটা থেকে প্রমাণিত হয় যে সেখানে নাইট্রোজেন-সমৃদ্ধ বায়ুমন্ডল আছে। পৃথিবীর বাইরে অন্য কোন গ্রহে এই প্রথম এরকম বায়ুমন্ডলের সন্ধান পাওয়া গেল। টাইটানের ভূমিতে মিথেন ও ইথেন পাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিলো।

এরপর ভয়েজার-১ শনিগ্রহের সীমানা ছাড়িয়ে ক্রমশ সৌরজগতের বাইরের দিকে চলে যেতে শুরু করলো। ভয়েজার-১ এর যে লক্ষ্য ছিল তা পূরণ হয়ে গেছে।

১৯৮১ সালের ২৫ আগস্ট ভয়েজার-২ শনির কাছাকাছি পৌঁছালো। শনির আরো অনেকগুলি বরফাচ্ছাদিত উপগ্রহের সন্ধান পাওয়া গেলো।

বৃহস্পতি ও শনি গ্রহ সম্পর্কে জানার জন্য পাঁচ বছরের যে পরিকল্পনা নেয়া হয়েছিল – চার বছরের মধ্যেই সে লক্ষ্যপূরণ হয়ে গেছে। কিন্তু ভয়েজার-এর দুটো নভোযানই তখনো পুরোমাত্রায় সক্রিয়। ভয়েজার-১ তখন ইউরেনাস ও নেপচুন থেকে দূরে সরে সৌরজগতের বাইরের সীমানার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। বিজ্ঞানীরা ভয়েজার-২ এর গতিপথ বদলে পাঠিয়ে দিলেন ইউরেনাস ও নেপচুনের দিকে।

১৯৮৬ সালের ২৪ জানুয়ারি ভয়েজার-২ ইউরেনাসের কাছাকাছি পৌঁছে গেল। এই প্রথম সৌরজগতের সপ্তম গ্রহকে এত কাছ থেকে দেখা গেলো। ইউরেনাসের এগারটি নতুন উপগ্রহের সন্ধান দিলো ভয়েজার-২। ইউরেনাসের চৌম্বকমেরুদ্বয় গ্রহটির বিষুবরেখার কাছাকাছি। ভয়েজার-২ সর্বপ্রথম ইউরেনাসের তাপমাত্রা মাপলো।  এই গ্রহের তাপমাত্রা মাইনাস ২১৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস  (৫৯ ডিগ্রি কেলভিন)। প্রমাণিত হলো সৌরজগতের গ্রহগুলির মধ্যে সবচেয়ে ঠান্ডা গ্রহ ইউরেনাস।

ইউরেনাস ও নেপচুন পৃথিবী থেকে এত বেশি দূরে যে ওখান থেকে পাঠানো সিগনাল এতই ক্ষীণ যে তা পৃথিবীতে স্থাপিত সবচেয়ে বড় ডিশ অ্যান্টেনাগুলির পক্ষেও শনাক্ত করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ালো। এর আগে পৃথিবী থেকে এত দূরের কোন মহাকাশযানের সাথে যোগাযোগ করতে হয়নি। ভয়েজার-২ নেপচুনে গিয়ে পৌঁছানোর আগেই নাসা পৃথিবীর ডিশ অ্যান্টেনা উন্নত করার ব্যবস্থা করলো। ১৯৮৭ সালের আগস্ট মাসে নাসার ডিপ স্পেস নেটওয়ার্কের আওতায় তার তিনটি কমিউনিকেশান ডিশ অ্যান্টেনার (ক্যালিফোর্নিয়ার গোল্ডস্টোন, স্পেনের মাদ্রিদ, এবং অস্ট্রেলিয়ার ক্যানবেরা) ব্যাস ৬৪ মিটার থেকে ৭০ মিটারে উন্নীত করলো। ফলে নেপচুন থেকে পাঠানো ক্ষীণমাত্রার রেডিওওয়েভ সিগনালও শনাক্ত করতে পারার সক্ষমতা অর্জিত হলো।

১৯৮৯ সালের ২৫ আগস্ট ভয়েজার-২ নেপচুনের কাছাকাছি পৌঁছে যায়। এই প্রথম কোন মহাকাশযান নেপচুনের কাছাকাছি পৌঁছালো। নেপচুনের ছয়টি নতুন চাঁদ আবিষ্কৃত হলো। নেপচুনের বলয়ের ছবি প্রথমবারের মতো দেখা গেলো।  এরপর ভয়েজার-২ সৌরজগতের সীমানার বাইরে রওনা দিলো।

ভয়েজার মিশন লক্ষ্যপূরণ করার পরেও আশাতীত সাফল্য দেখিয়ে ফেলেছে ইতোমধ্যে। জ্যোতির্বিজ্ঞানের খোলনলচে পাল্টে দেয়ার মতো তথ্যের জোগান দিয়েছে এই ভয়েজার। গ্রহগুলির উৎপত্তি এবং বিবর্তন সংক্রান্ত এত তথ্য আমরা পেয়েছি যে সৌরজগতের সবগুলি গ্রহ সম্পর্কে আমাদের এতদিনের ধারণা পাল্টে গেছে। 

মাত্র পাঁচ বছর কাজ করার জন্য যে নভোযান পাঠানো হয়েছিল তা বারো বছর পরেও যখন সক্রিয়ভাবে কাজ করছে – বিজ্ঞানীরা ভয়েজারদ্বয়কে দিয়ে আরো কিছু কাজ করিয়ে নেয়া যায় কি না দেখলেন। জ্বালানি এবং কম্পিউটারের মেমোরি সংরক্ষণ করার লক্ষ্যে ভয়েজার-২ এর দুটো ক্যামেরা – ওয়াইড আঙ্গেল ও ন্যারো আঙ্গেল ক্যামেরা বন্ধ করে দেয়া হলো।

১৯৯০ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি সূর্য থেকে ছয় বিলিয়ন কিলোমিটার দূরে গিয়ে ভয়েজার-১ সৌরজগতের সবগুলি গ্রহ ও উপগ্রহের একসাথে ছবি নিলো। সেই ছবি পৃথিবীতে এসে পৌঁছানোর পর বিজ্ঞানীরা ভয়েজার-১ এর ক্যামেরা অফ করে দিলেন। জ্বালানি শক্তি এবং কম্পিউটারের মেমোরি সংরক্ষণ করা হলো সৌরজগতের সর্বশেষ সীমানার তথ্য সংগ্রহ করার জন্য।

১৯৯৮ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি ভয়েজার-১ পৌঁছে গেল পৃথিবী থেকে দূরতম দূরত্বে যেখানে এপর্যন্ত আর কোন মানুষের তৈরি বস্তু কোনদিন পৌঁছায়নি।

কোনো নক্ষত্রের সীমানা নির্ধারিত হয় সেই নক্ষত্র থেকে নির্গত শক্তিতরঙ্গ এবং চৌম্বকক্ষেত্র সর্বোচ্চ যতদূর পর্যন্ত বলবৎ থাকে ততদূর পর্যন্ত। সে হিসেবে আমাদের সৌরজগতের সীমানা নির্ধারিত হয়েছে ততদূর পর্যন্ত যতদূর পর্যন্ত সূর্যের শক্তি থেকে উৎপন্ন তরঙ্গ পৌঁছায়। সূর্যের চারপাশে এই তরঙ্গের সীমানা ধরে একটা বিশালাকার কাল্পনিক বুদবুদ (bubble) ধরে নেয়া হয়। এই বুদবুদের বাইরে ইন্টারস্টেলার স্পেস বা অন্তনাক্ষত্রিক শূন্যতা – যেখানে অন্য কোন নক্ষত্রের সীমানা তখনো শুরু হয়নি।

২০০৪ সালের ১৬ ডিসেম্বর – ভয়েজার-১ আমাদের সৌরজগতের সীমানা পেরিয়ে গেল। ২০০৭ সালের ৩০ আগস্ট ভয়েজার-২ সৌরজগতের সীমানা অতিক্রম করে গেলো। কিন্তু ডাটা পাঠানো বন্ধ হয়নি কারোরই।

২০১২ সালের ২৫ আগস্ট ভয়েজার-১ ইন্টারস্টেলার স্পেসে প্রবেশ করলো। হেলিওপজের বাইরে এই প্রথম মানুষের তৈরি কোন বস্তু এত দূরে গিয়ে পৌঁছালো। ভয়েজার-১ তখনো ডাটা পাঠাচ্ছে। এই ডাটা থেকে ইন্টারস্টেলার ম্যাগনেটিক ফিল্ডের পরিমাপ করা সম্ভব হলো প্রথম বারের মতো। ২০১৮ সালের ৫ নভেম্বর ভয়েজার-২ ইন্টারস্টেলার স্পেসে প্রবেশ করলো।

বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন ২০২৫ সাল পর্যন্ত কোনো না কোনোভাবে ডাটা পাঠাতে সক্ষম থাকবে ভয়েজার। এরপর পৃথিবীর সাথে ভয়েজারের যোগাযোগ হয়তো বন্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু নভোযানদুটো অন্তনাক্ষত্রিক স্থানে ভাসতে ভাসতে চলে যাবে আমাদের প্রতিবেশি নক্ষত্রের সীমানায়। অবশ্য সবচেয়ে কাছের নক্ষত্র আলফা সেন্টোরির কাছাকাছি পৌঁছাতে ভয়েজারের সময় লাগবে আরো চল্লিশ হাজার বছর।

ভয়েজার মিশন আরো একটি কারণে স্মরণীয় হয়ে থাকবে – সেটা হলো মহাবিশ্বের আর কোথাও মানুষের মতো বুদ্ধিমান প্রাণি আছে কি না দেখার জন্য  এই মিশনে পাঠানো হয়েছিল একটি গোল্ডেন রেকর্ড। শুধুমাত্র বুদ্ধিমান প্রাণির সংস্পর্শে এলেই সেই রেকর্ড চালু হবে। বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী কার্ল সাগান ছিলেন এই গোল্ডেন রেকর্ড কমিটির চেয়ারম্যান। পৃথিবী থেকে বাছাই করা ১১৫টি ছবি, প্রাকৃতিক কাজকর্মের বাছাই করা শব্দ – যেমন বাতাস ও বজ্রপাতের শব্দ, পশুপাখির ডাক, বিভিন্ন ভাষা এবং সময়ের বিখ্যাত কিছু সঙ্গীত, এবং পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় রেকর্ড করা শুভেচ্ছা-বাণী যার মধ্যে বাংলা ভাষায়ও একটি শুভেচ্ছা বাণী আছে – “বিশ্বের শান্তি হোক”। এই ভয়েজার গোল্ডেন রেকর্ড মহাকাশে এখনো একবারও বাজেনি। বাজার সম্ভাবনা কি আছে?


তথ্যসূত্র: (১) লিন্ডা এলকিন্স-ট্যানটন, জুপিটার অ্যান্ড স্যাটার্ন, চেলসি হাউজ পাবলিশার্স, নিউইয়র্ক, ২০০৬; (২) প্রদীপ দেব, সবার জন্য স্যাটেলাইট, তাম্রলিপি, ঢাকা, ২০১৯; (৩) বেন ইভান্স, নাসা’জ ভয়েজার মিশানস, দ্বিতীয় সংস্করণ, স্প্রিঙ্গার, ইউ কে, ২০২২; (৪) voyager.jpl.nasa.gov

____________

বিজ্ঞানচিন্তা নভেম্বর ২০২২ সংখ্যায় প্রকাশিত









Sunday, 27 November 2022

অ্যান্ডার্স সেলসিয়াস

 



সেলসিয়াস শব্দটির সাথে আমরা খুব পরিচিত। তাপমাত্রার যে একক পৃথিবীর বেশিরভাগ দেশে ব্যবহৃত হয় – তার নাম সেলসিয়াস। কিন্তু এই শব্দটি কোত্থেকে এসেছে সে ব্যাপারে হয়তো আমরা খুব একটা খোঁজখবর রাখি না। হিট অ্যান্ড টেম্পারেচার – অর্থাৎ তাপ এবং তাপমাত্রা যে এক জিনিস নয় সে জ্ঞান মানুষের হয়েছে হাজার বছর আগে। আজ থেকে প্রায় ১৮৫০বছর আগে গ্রিক বিজ্ঞানী গ্যালেন তাপমাত্রা মাপার জন্য যন্ত্র তৈরি করার চেষ্টা করেছিলেন ১৭০ খ্রিস্টাব্দে। এরপর বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক বিবর্তনের মধ্য দিয়ে আমরা পেয়েছি তাপমাত্রা মাপার সেন্টিগ্রেড স্কেল। 

১৭৪২ সালে সুইডেনের বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী অ্যান্ডার্স সেলসিয়াস পানির হিমাঙ্ককে ১০০ ডিগ্রি আর ফুটনাঙ্ককে ০ ডিগ্রি ধরে সেন্টিগ্রেড স্কেলের প্রবর্তন করেন। এর আগে ১৭১৪ সালে জার্মান পদার্থবিজ্ঞানী ড্যানিয়েল ফারেনহাইট চালু করেছিলেন ফারেনহাইট স্কেল। ফারেনহাইট স্কেলে ৩২ ডিগ্রিকে পানির হিমাঙ্ক এবং ২১২ ডিগ্রিকে পানির ফুটনাঙ্ক ধরে নিয়ে মধ্যবর্তী পার্থক্যকে ১৮০ ভাগে ভাগ করে এক ডিগ্রি ফারেনহাইট তাপমাত্রার হিসেব করা হয়েছে। এই হিসেবটা বড্ড গোলমেলে হিসেব বলে সেলিসিয়াসের প্রবর্তিত সেন্টিগ্রেড স্কেলটাকে অনেক বেশি সহজ এবং গ্রহণযোগ্য মনে হলো সবার। কিন্তু একটু গোলমাল রয়ে গিয়েছিল গিয়েছিল। তাপমাত্রা বাড়ার সাথে সাথে ডিগ্রির পরিমাণ বাড়া উচিত। সেক্ষেত্রে ১০০ থেকে ০ -তে না গিয়ে ০ থেকে ১০০ ডিগ্রিতে যাওয়া উচিত। কিন্তু প্রস্তাবিত উল্টো স্কেলকে সোজা করার সময় পাননি অ্যান্ডার্স সেলসিয়াস। ১৭৪৪ সালে মাত্র ৪৩ বছর বয়সে মারা যান তিনি। 

সেলসিয়াসের মৃত্যুর পর উদ্ভিদবিজ্ঞানী কার্ল লিনিয়াস সেলসিয়াস স্কেলকে উল্টে দিয়ে ঠিক করে দেন। নতুন স্কেলে শূন্য ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় পানি জমে বরফ হয়ে যায়, আর ১০০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় পানি ফুটতে শুরু করে। 

সেলসিয়াসের প্রবর্তিত সেন্টিগ্রেড স্কেল এরপর প্রায় দু’শ বছর ওভাবেই ছিল। কিন্তু বিজ্ঞানের উন্নতির সাথে সাথে জ্যামিতিক মাপজোকের পরিমাণ ক্রমশ বেড়ে যাচ্ছিল। কোণের পরিমাণও ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড হিসেবে মাপা হয় বলে তাপমাত্রা আর কোণের পরিমাপের মাপ আলাদা করতে ঝামেলা হচ্ছিল। তাই ১৯৪৭ সালে তাপমাত্রা মাপার একককে 'ডিগ্রি সেলসিয়াস' হিসেবে প্রচলন করা হয়।

সুইডিশ জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানী অ্যান্ডার্স সেলসিয়াসের জন্ম ১৭০১ সালের ২৭ নভেম্বর, সুইডেনের উপসালায়। যে পরিবারে তাঁর জন্ম হয়েছিল – সেই পরিবারের বৈজ্ঞানিক ঐতিহ্য প্রায় দু’শ বছরের। তাঁর পিতা, পিতামহ, প্রপিতামহ সবাই ছিলেন বিজ্ঞানী। তাঁর বাবা নিলস সেলসিয়াস ছিলেন জ্যোতির্বিজ্ঞানের অধ্যাপক। জ্যোতির্বিজ্ঞান, গণিত আর পদার্থবিজ্ঞানের গবেষণায় দক্ষতা অর্জন করে অ্যান্ডার্স সেলসিয়াস উপসালা ইউনিভার্সিটিতে জ্যোতির্বিজ্ঞানের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন ১৭৩০ সালে। ১৭৪৪ সালের ২৫ এপ্রিল তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত তিনি সেখানেই অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ১৭৪০ সালে তাঁর তত্ত্বাবধানে উপসালা ইউনিভার্সিটিতে তৈরি হয় মানমন্দির।

সেলসিয়াসের বৈজ্ঞানিক জীবনে সবচেয়ে বেশি অবদান জ্যোতির্বিজ্ঞানে হলেও – তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে রয়েছেন তাঁর তাপমাত্রা পরিমাপের স্কেলের মধ্যে।


Saturday, 19 November 2022

কোয়ান্টামের জটাজাল - পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার ২০২২

 




“আচ্ছা, তুমি কি বিশ্বাস করো যে যখন তুমি চাঁদের দিকে তাকাও তখনি শুধু চাঁদের অস্তিত্ব আছে, আর অন্য সময়ে নেই?” এ কেমন প্রশ্ন? আমরা তো জানি যে চাঁদ আছে গত সাড়ে চারশ কোটি বছর থেকে পৃথিবীর আকাশে। থাকবে আরো কয়েক শ কোটি বছর। কিন্তু সেখানে চাঁদের অস্তিত্ব কেন নির্ভর করবে তার দর্শকের উপর? প্রশ্নটাকে এলেবেলে প্রশ্ন বলে উড়িয়ে দেয়ার কোন উপায় নেই যখন স্বয়ং আইনস্টাইন এই প্রশ্ন করেন। আইনস্টাইন তাঁর জীবনীকার পদার্থবিজ্ঞানী আব্রাহাম পেইজকে এই প্রশ্নটি করেছিলেন কোয়ান্টাম মেকানিক্সের রহস্যময়তার প্রতি তাঁর অস্বীকৃতির সমর্থনে। এটা ঠিক যে চাঁদের মতো বড় আকারের বস্তুর প্রসঙ্গে এরকম প্রশ্ন খাটে না। কিন্তু ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কণার যে ধর্ম কোয়ান্টাম মেকানিক্স দিয়ে ব্যাখ্যা করতে হয় – সেখানে দেখা যায় – কোন একটি কণা কীরকম আচরণ করবে তা নির্ভর করে তার দর্শকের উপর। কোয়ান্টাম মেকানিক্স কণার আচরণের সম্ভাবনার কথা বলতে পারে, কিন্তু সুনির্দিষ্টভাবে কী হবে তা বলতে পারে না। সুনির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে কণাটিকে দেখতে হবে।

পরমাণুর ভেতর তার উপাদান – ইলেকট্রন, প্রোটন, নিউট্রন – এগুলি কীভাবে বিন্যস্ত হয়ে থাকবে তার সবচেয়ে ভালো ব্যাখ্যা দেয়া যায় কোয়ান্টাম তত্ত্বের মাধ্যমে। ধরা যাক হাইড্রোজেন পরমাণুর কথা। এর একটিমাত্র ইলেকট্রন। এই ইলেকট্রনের অন্তঃঘূর্ণন বা স্পিন হতে পারে +১/২ কিংবা -১/২। দেখার আগ পর্যন্ত কিছুতেই সুনির্দিষ্টভাবে বলা সম্ভব নয় যে কোন একটি হাইড্রোজেন পরমাণুর ইলেকট্রনের স্পিন +১/২ হবে কি -১/২ হবে। হাইড্রোজেন পরমাণুর বদলে যদি হিলিয়াম পরমাণুর কথা বিবেচনা করি – দেখা যাবে ব্যাপারটা আরো রহস্যময়। হিলিয়াম পরমাণুতে দুটো ইলেকট্রন আছে। তারা একই কক্ষপথে থাকে। পাউলির বর্জননীতি মেনে চলতে হয় তাদের। সেই নীতি অনুযায়ী একটি ইলেকট্রনের স্পিন যদি +১/২ হয়, অন্য ইলেকট্রনের স্পিন অবশ্যই -১/২ হবে। কোন ইলেকট্রনের স্পিন কী হবে তা না দেখে সুনির্দিষ্টভাবে বলার উপায় নেই। তবে এক্ষেত্রে একটি ইলেকট্রনের স্পিন যদি জানতে পারি, অন্যটির স্পিন কী হবে তা না দেখেই বলে দেয়া যায়। কিন্তু একটাও না দেখা পর্যন্ত কোনটারই স্পিন কী হবে তা বলা যাচ্ছে না। তার মানে কি এই দাঁড়ায় যে ফলাফল নির্ভর করছে দর্শকের উপর? কোয়ান্টাম মেকানিক্স বলে - ঠিক তাই । যতক্ষণ দেখা না হচ্ছে – ততক্ষণ সম্ভাবনার সুপারপজিশান স্টেটেই থাকছে ইলেকট্রনের স্পিন।

এরকম ব্যাপার আমরা কয়েন টস করার সাথেও তুলনা করতে পারি। একটি কয়েন শূন্যে ছুঁড়ে দিলে তা নিচে পড়ার পর হেড অথবা টেল উঠবে তা আমরা জানি। কিন্তু ঠিক কী উঠবে তা দেখার আগপর্যন্ত বলতে পারি না। তাহলে কয়েন যতক্ষণ শূন্যে থাকে – ততক্ষণ কি তার হেড কিংবা টেল কোনোটাই থাকবে না? এই গোলমেলে প্রশ্নের উত্তর কোয়ান্টাম মেকানিক্সের বিজ্ঞানীদের দিতে হয়েছে অনেক বছর। আইনস্টাইন কোয়ান্টাম মেকানিক্সের সম্ভাবনার নিয়ম মেনে নিতে পারেননি। তাই কোয়ান্টাম মেকানিক্সের ধারণার প্রতি তিনি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছিলেন বার বার। এবং বলা যায় তা থেকেই পথ খুলে গেছে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের বিশাল ব্যবহারিক দিকের।

কোয়ান্টাম কম্পিউটার, কোয়ান্টাম তথ্যপ্রবাহসহ কোয়ান্টাম প্রযুক্তির অসংখ্য নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে গেছে আজ। এই সম্ভাবনার দরজা যাঁরা খুলে দিয়েছেন, তাঁদেরই তিনজন পদার্থবিজ্ঞানী এবছরের নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন।

কোয়ান্টাম মেকানিক্সের যে তিনজন পরীক্ষণ-বিজ্ঞানী ২০২২ সালের পদার্থবিজ্ঞানের নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন – তাঁরা হলেন ফ্রান্সের ইকোল পলিটেকনিকের অধ্যাপক আলান এসপেক্ট (Alan Aspect), ক্যালিফোর্নিয়া জে এফ ক্লাউসার অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস এর প্রধান বিজ্ঞানী জন এফ ক্লাউসার (John F Clauser), এবং অস্ট্রিয়ার ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আন্তন সাইলিঙ্গার (Anton Zeilinger)। ২০১০ সালে যখন এই ত্রয়ী পদার্থবিজ্ঞানে উল্‌ফ পুরষ্কার পেয়েছিলেন, তখন থেকেই বিজ্ঞানীরা আশা করে আসছিলেন যে এই তিনজনকে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার দেয়া হবে যেকোনো বছর। তাই এবছর যখন নোবেল কমিটি এই তিনজনের নাম ঘোষণা করলো, তখন পদার্থবিজ্ঞানের সবাই খুব খুশি হয়েছেন, কিন্তু আশ্চর্য হননি। এই তিনজন বিজ্ঞানীরই কোয়ান্টাম মেকানিক্সের পরীক্ষণ কাজের প্রতি আগ্রহের মূল কারণ ছিল আইনস্টাইনের কোয়ান্টাম মেকানিক্সের বিরোধিতা।

আজ থেকে ঠিক একশ বছর আগে ১৯২২ সালের পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছিলেন কোয়ান্টাম মেকানিক্সের অন্যতম স্থপতি নীলস বোর। কোয়ান্টাম মেকানিক্সের স্থপতিদের মধ্যে ম্যাক্স প্ল্যাংক, নীলস বোর, লুই ডি ব্রগলি, ম্যাক্স বর্ন, পল ডিরাক, ভার্নার হাইজেনবার্গ, উলফগং পাউলি, এরভিন শ্রোডিঙ্গার, রিচার্ড ফাইনম্যান – সবাই নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন। আইনস্টাইন কোয়ান্টাম মেকানিক্সের অনিশ্চয়তার নীতিকে সমর্থন করেননি। কিন্তু তাঁর আপেক্ষিকতার সূত্র প্রয়োগে কোয়ান্টাম মেকানিক্স হয়ে উঠেছে আরো বেশি শক্তিশালী। আইনস্টাইন নিজের অজান্তেই শক্ত ভিত্তি দিয়ে গেছেন কোয়ান্টাম মেকানিক্সের। বলা চলে আইনস্টাইনের বিরোধিতার কারণেই আবিষ্কৃত হয়েছে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের অনেক কিছু।

হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তার নীতি কোয়ান্টাম মেকানিক্সের একটি অন্যতম প্রধান ভিত্তি। এই নীতি অনুসারে কোন কণার শক্তি এবং সময় একই সাথে সঠিকভাবে মাপা যায় না। মাপতে গেলে সেখানে কিছুটা অনিশ্চয়তা থাকবেই। একই ব্যাপার ঘটে কোন কণার অবস্থান এবং ভরবেগ মাপার ক্ষেত্রেও। আমরা যদি কোন কণার সঠিক অবস্থান মাপতে যাই, সেই সময়ে তার ভরবেগ কত তা সঠিকভাবে জানি না। যখন ভরবেগ মাপতে যাই, তখন কণার অবস্থানের পরিবর্তন ঘটে। আইনস্টাইন এই ব্যাপারটি মেনে নিতে পারছিলেন না। তিনি বলতেন, কোন নিয়মের মধ্যে যদি অনিশ্চয়তার সম্ভাবনা থাকে তাহলে সেই নিয়ম অসম্পূর্ণ।

১৯৩০ সালের ব্রাসেলস এ অনুষ্ঠিত সলভে কনফারেন্সে আইনস্টাইন নীল্‌স বোরকে একটি কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি করে দিলেন। আইনস্টাইন একটি থট-এক্সপেরিমেন্ট বা মানস-পরীক্ষার বর্ণনা দিলেন। ধরা যাক একটি আলোভর্তি বাক্সের কথা। বাক্সের ভেতর আলোর ফোটন রয়েছে। বাক্সটি ওজন করা হলো। সঠিকভাবে বাক্সের ওজন নেয়া সম্ভব। এরপর বাক্স থেকে সুনির্দিষ্টপদ্ধতিতে একটি সুনির্দিষ্ট সময়ে একটিমাত্র ফোটন বের করে দেয়ার ব্যবস্থা করা হলো। ফোটনটি ঠিক কোন্‌ সময়ে বের হয়েছে তা বাক্সের ভেতর রাখা ঘড়ির সাহায্যে সঠিকভাবে মাপা সম্ভব। এখন ফোটনটি বের হয়ে যাবার পর বাক্সটির আবার ওজন নেয়া হলো। ফোটন বের হবার আগের এবং পরের ওজনের পার্থক্য থেকে E = mc2 সূত্র প্রয়োগ করে জানা যাবে বের হয়ে যাওয়া ফোটনটির শক্তি। তাহলে তো দেখা যাচ্ছে একই সময়ে কণার শক্তি এবং সময় দুটোই মাপা যাচ্ছে। তা যদি যায়, তাহলে হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তার সূত্র আর খাটছে না।

নীলস বোর বিপদে পড়ে গেলেন। আইনস্টাইনের এই মানস-পরীক্ষায় আপাত কোন ভুল তিনি বের করতে পারলেন না। কিন্তু কোন ভুল যদি সেখানে না থাকে, তাহলে পুরো কোয়ান্টাম মেকানিক্সের ভিত নড়বড়ে হয়ে যাবে। নীলস বোর ব্রাসেলস এর হোটেলরুমে বসে আইনস্টাইনের মানস-পরীক্ষা নিয়ে ভাবলেন সারা রাত। ভাবতে ভাবতে পেয়ে গেলেন সমাধান। আইনস্টাইনের মানস-পরীক্ষায় আইনস্টাইন নিজের তত্ত্বই প্রয়োগ করতে ভুলে গেছেন!

পরদিন নীলস বোর আইনস্টাইনকে বললেন কোথায় ভুলটা করেছেন আইনস্টাইন। বাক্স থেকে ফোটন যখন বের হচ্ছে তখন ফোটনের স্থান পরিবর্তন হচ্ছে। এই স্থান পরিবর্তনের ফলে ঘড়ির স্থান-কালের (স্পেস-টাইম) পরিবর্তন ঘটবে। আইনস্টাইনের জেনারেল থিওরি অব রিলেটিভি বা আপেক্ষিকতার সার্বিক তত্ত্ব অনুসারে তখন সময়ের মাপে অনিশ্চয়তা দেখা যাবে – তা যত ছোটই হোক। সুতরাং ফোটনের শক্তি ঠিকমতো মাপা গেলেও সময়ের মাপে অনিশ্চয়তা রয়েই যাবে। আইনস্টাইন মেনে নিতে বাধ্য হলেন।

এরপর কয়েক বছর মোটামুটি চুপ করে থাকলেও আইনস্টাইন মন থেকে মানতে পারছিলেন না যে এত অনিশ্চয়তা নিয়েই কোয়ান্টাম মেকানিক্স এতটা সাফল্য লাভ করছে। ১৯৩৫ সালে তিনি তাঁর দুজন নবীন সহকর্মী রাশিয়ান-আমেরিকান বরিস পডলস্কি এবং ইসরায়েলি-আমেরিকান নাথান রোজেনের সাথে যৌথভাবে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করলেন ফিজিক্যাল রিভিউতে। তাঁদের তিনজনের নামানুসারে এই গবেষণাপত্রটি ইপিআর পেপার নামে খ্যাতিলাভ করেছে। বিশেষ করে আমেরিকার প্রচারমাধ্যমগুলির কল্যাণে। এই পেপারটি প্রকাশিত হবার পর নিউইয়র্ক টাইমস “আইনস্টাইন কোয়ান্টাম মেকানিক্সকে আক্রমণ করেছেন” শিরোনামে মুখরোচক সংবাদ প্রকাশ করেছিল।

কী ছিল এই গবেষণাপত্রে? এই গবেষণাপত্রে আইনস্টাইন আক্রমণ করেছিলেন কোয়ান্টাম এনটেঙ্গেলমেন্টকে। কোয়ান্টাম মেকানিক্সের একটা বিশেষ ধর্ম হলো – কোয়ান্টাম এনটেঙ্গেলমেন্ট বা কোয়ান্টামের জটাজাল। একই উৎস থেকে উৎপন্ন দুটো কোয়ান্টাম কণা এমন যুগলভাবে কাজ করে যেন কোন অদৃশ্য সূতার টানে একটি অপরটির সাথে যোগাযোগ করতে থাকে – তাদের মাঝখানের বাস্তব দূরত্ব যাই হোক না কেন। সেই অবস্থায় একটি কণাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে অন্য কণাকেও আপনাআপনি  নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। এই ব্যাপারটা কীভাবে ঘটে তা সহজে বোঝা যায় না।

কোয়ান্টাম মেকানিক্সের গোড়া থেকেই কোয়ান্টাম-কণার পারস্পরিক সম্পর্কের ব্যাপারটাকে খুবই গুরুত্বের সাথে দেখা হয়েছে। পরমাণুর কোয়ান্টাম মডেলের ভিত্তিই হলো কোয়ান্টাম নাম্বার  – যা কণাগুলির পারস্পরিক সম্পর্কের ভিত্তিতেই পাওয়া যায়। যেমন হিলিয়াম পরমাণুর দুটো ইলেকট্রনের স্পিনের কথা আমরা আগেই বলেছি। কোয়ান্টাম তত্ত্ব অনুসারে কোয়ান্টাম-কণা তরঙ্গ আকারেও থাকতে পারে।

তরঙ্গের ক্ষেত্রে দুটো তরঙ্গের পারস্পরিক সম্পর্কের ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করা যায় আরো সহজে। দুটো তরঙ্গ যখন একটি আরেকটিকে কোনো না কোনোভাবে স্পর্শ করে তখন তারা পরস্পরের সাথে জড়িয়ে পড়ে। এরপর তাদের অবস্থা আর আগের মতো থাকে না। এরপর তারা যদি পরস্পরের কাছ থেকে অনেক দূরেও চলে যায়, তাদেরকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করা যায় না। তখন একটি তরঙ্গের গতিপ্রকৃতি দেখে অন্য তরঙ্গের গতিপ্রকৃতি অনুমান করা যায়।




আইনস্টাইন এই ব্যাপারটা মেনে নিতে পারছিলেন না। একই উৎস থেকে উৎপন্ন দুটি কণা পরস্পরের কাছ থেকে যত দূরেই যাক না কেন, একটির সাথে অন্যটি এনটেঙ্গেল্ড হয়ে থাকবে বা জটাজালে যুক্ত থাকবে তা স্বাভাবিক চিন্তায় কিছুতেই মেনে নেয়া যায় না। অবশ্য কোয়ান্টাম এনটেঙ্গেলমেন্ট কথাটি প্রথম চালু করেছিলেন এরভিন শ্রোডিঙ্গার, আইনস্টাইনের ইপিআর গবেষণাপত্র প্রকাশের পর তার জবাব দিতে গিয়ে।

১৯৩৫ সালের ফিজিক্যাল রিভিউর ৪৭ সংখ্যায় প্রকাশিত Can quantum mechanical description be considered complete? প্রবন্ধ – যা ইপিআর পেপার নামে খ্যাত, আইনস্টাইন, পডলস্কি এবং রোজেন একটি মানস-পরীক্ষণ বিশ্লেষণ করেছেন। একই উৎস থেকে দুটো কোয়ান্টাম-কণা উৎপন্ন হয়ে পরস্পরের বিপরীত দিকে চলে গেছে অনেকদূর। এই দুটো কণা পারস্পরিক অদৃশ্য জটাজালে আবদ্ধ। কোয়ান্টাম মেকানিক্সের নিয়ম অনুযায়ী একজন পর্যবেক্ষণকারী যতক্ষণ কণাগুলির স্পিন না দেখছে ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের কোনটারই স্পিন সুনির্দিষ্ট নয়। তারা তখনো কোয়ান্টাম সুপারপজিশান স্টেটে আছে। এখন কোন দর্শক যদি একটি কণার স্পিন +১/২ বা স্পিন-আপ দেখে, তাহলে অন্য কণাটির স্পিন সাথে সাথে -১/২ বা ডাউন হতে বাধ্য। কারণ পদার্থবিজ্ঞানের নিয়ম অনুযায়ী মোট স্পিন সংরক্ষিত। অর্থাৎ কোন সিস্টেমের শুরুতে যদি মোট স্পিন শূন্য হয়, শেষেও মোট স্পিন হবে শূন্য। সেক্ষেত্রে একটি কণার স্পিন +১/২ হলে অন্যটির স্পিন -১/২ হতে বাধ্য। সেক্ষেত্রে যে কোনো একটি কণা দেখে অন্য কণাটি যেখানে যত দূরেই থাকুক না কেন তার ধর্ম বলে দেয়া সম্ভব। আইনস্টাইনের ভাষায় এটা এক ধরনের স্পুকি অর্থাৎ ভুতুড়ে ব্যাপার। মনে হচ্ছে অনেক দূর থেকে একটি কণা আরেকটি কণাকে নিয়ন্ত্রণ করছে তাৎক্ষণিকভাবে। কণাগুলি যদি পরস্পরের কাছ থেকে আলোকবর্ষ দূরেও থাকে, তাহলেও তৎক্ষণাৎ নিয়ন্ত্রণ ঘটে যাচ্ছে। এরকম কাজের যে গতি তা আলোর গতির চেয়েও দ্রুত। কিন্তু তা তো অসম্ভব। এরকম ভুতুড়ে ব্যাপার বিজ্ঞানে চলতে পারে না। কোয়ান্টাম মেকানিক্স যদি সত্যিই এভাবে কাজ করে তাহলে এখানে এমন কিছু হিডেন ভ্যারিয়েবল বা গুপ্ত চলক আছে যা আমরা এখনো জানতে পারিনি। এই যুক্তি দেখিয়ে ইপিআর পেপারে কোয়ান্টাম মেকানিক্সকে অসম্পূর্ণ বিজ্ঞান বলে অভিহিত করেছেন আইনস্টাইন এবং তাঁর সহযোগীরা।

এই প্রবন্ধের উত্তরে আরভিন শ্রোডিঙ্গার Mathematical Proceedings of the Cambridge Philosophical Society’র জার্নালে প্রকাশিত ‘Discussion of probability relations between separated system’ প্রবন্ধে লেখেন যে দুটো কোয়ান্টাম কণা পরস্পরের সান্নিধ্যে এলে পরস্পর এনটেঙ্গেল্ড বা জটাজালে আবদ্ধ হয়ে যায়। কোয়ান্টাম জটাজাল বুঝতেও জটিল, তার কাজকর্মও জটিল, কিন্তু সত্য।

এরপর কোয়ান্টাম মেকানিক্সের সাফল্য অনেকদূর এগিয়ে গেছে। ইপিআর পেপার নিয়ে অনেক বছর কেউ আর মাথা ঘামায়নি। বিশেষ করে গাণিতিক পদার্থবিজ্ঞানী জন ফন নিউম্যান তত্ত্বীয়ভাবে প্রমাণ করে দিয়েছেন যে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের কাজ করার জন্য কোন গুপ্ত চলকের দরকার নেই।

কিন্তু আইনস্টাইনের মৃত্যুর প্রায় এক দশক পরে ইপিআর পেপারের সমর্থনে ১৯৬৪ সালে একটি নতুন গবেষণাপত্র প্রকাশ করলেন আইরিশ পদার্থবিজ্ঞানী জন স্টুয়ার্ট বেল। বেল কাজ করতেন জেনিভার সার্ন গবেষণাকেন্দ্রে। এক বছরের ছুটিতে তিনি এই পেপার লিখেছিলেন যা পরে ‘বেলস ইনইকুয়েলিটি’ নামে খ্যাতিলাভ করে। আইনস্টাইনের মতো বেলও একটি মানস-পরীক্ষণের মাধ্যমে প্রমাণ করতে চেষ্টা করলেন যে কোয়ান্টাম এনটেঙ্গেলমেন্টে হিডেন ভ্যারিয়েবলগুলি তথ্য জোগান দেয়। যাদের উপস্থিতি দেখা যায় না, কিন্তু গুপ্তভাবেই তারা কাজ করে। তিনি তাঁর সহকর্মী গবেষক প্রফেসর বার্টলম্যানের উদাহরণ দিলেন – যিনি দুই পায়ে দুই রঙের মোজা পরেন। এখন এই তথ্য যদি কারো জানা থাকে, তাহলে তাঁর এক পায়ের মোজার রঙ দেখেই অন্য পায়ের মোজার রঙ জেনে যাবেন যে কেউই। এখানে গুপ্ত তথ্য দেয়াই আছে। একই রকম ভাবে স্পিনের ক্ষেত্রেও হচ্ছে। কিন্তু সবগুলি গুপ্ত চলকের মান জানা না থাকলে কোয়ান্টাম-কণার একটিকে জানার পর অন্যটির সব ধর্ম জানা যাবে এমন কোন কথা নেই। সেখানে ফলাফলের অসমানতা থাকবে। এটাই বেলের অসমানতা বা বেলস ইনইকুয়েলিটি। জন বেল তাঁর প্রবন্ধে পরীক্ষণ পদার্থবিজ্ঞানীদের আহ্বান করেছিলেন কোয়ান্টাম এনটেঙ্গেলমেন্ট পরীক্ষণের মাধ্যমে প্রমাণ করার জন্য।

জন বেলের তত্ত্ব পরীক্ষা করার জন্য প্রথম এগিয়ে এলেন আমেরিকান পদার্থবিজ্ঞানী জন ক্লাউজার – যিনি এবার পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন।

জন ফ্রান্সিস ক্লাউজারের জন্ম ১৯৪২ সালের ১ ডিসেম্বর, ক্যালিফোর্নিয়ার প্যাসাডেনায়। ক্যালিফোর্নিয়া ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজি থেকে পদার্থবিজ্ঞানে বিএসসি করেন ১৯৬৪ সালে। এরপর কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৬৪ সালে এমএ এবং ১৯৬৯ সালে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। তাঁর পিএইচডি গবেষণার বিষয় ছিল মলিকিউলার অ্যাস্ট্রোফিজিক্স। কিন্তু ছাত্রাবস্থা থেকেই তিনি জ্যোতির্বিজ্ঞানের পাশাপাশি কোয়ান্টাম মেকানিক্সের প্রতিও খুব আগ্রহী ছিলেন।

১৯৭২ সালে জন ক্লাউজার  ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ায় পোস্টডক্টরেট করার সময় তাঁর পিএইচডি গবেষক-ছাত্র স্টুয়ার্ড ফ্রিডম্যানের সাথে মিলে বেলের অসমানতা পরীক্ষা করার প্রস্তুতি নিলেন। তিনি ইলেকট্রনের স্পিনের বদলে আলোর কণা ফোটনের পোলারাইজেশানের মাধ্যমে ফলাফল মাপার চেষ্টা করলেন। বিজ্ঞানী রিচার্ড ফাইনম্যানসহ অনেকেই তখন ক্লাউজারকে নিরুৎসাহিত করে বলেছিলেন কোয়ান্টাম মেকানিক্সকে আর পরীক্ষা দেয়ার দরকার নেই। কিন্তু জন বেল ক্লাউজারকে খুব উৎসাহ দিয়েছিলেন পরীক্ষাটি করে দেখার জন্য। জন বেল দুই ডলার বাজি ধরেছিলেন আইনস্টাইনের পক্ষে। অর্থাৎ বেলস ইনইকুয়েলিটি সত্য প্রমাণিত হবে।


 



ক্লাউজার ক্যালসিয়াম পরমাণুর উপর বিশেষ আলো ফেলে ক্যালসিয়াম থেকে ফোটন নির্গমনের ব্যবস্থা করলেন। ফোটনগুলি একই জায়গা থেকে উৎপন্ন হচ্ছে – ফলে কোয়ান্টাম জটাজালে আবদ্ধ। দুইটি বিপরীত পাশে ফিল্টার স্থাপন করে ফোটনের পোলারাইজেশান মেপে দেখলেন। ফিল্টারের দিক অনেকবার পরিবর্তন করে তিনি দেখলেন যে একটি ফোটনের পোলারাইজেশান থেকে অন্য ফোটনের পোলারাইজেশান যেরকম হবার কথা ঠিক সেরকমই হচ্ছে। তার মানে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের জন্য কোন হিডেন ভ্যারিয়েবলের দরকার নেই। বেলস ইনইকুয়েলিটি ভুল। জন বেল বাজিতে হেরে গেলেন, কোয়ান্টাম মেকানিক্সের জয় হলো।


 

জন ক্লাউজার তাঁর পরীক্ষা করছেন (ফিজিক্স টু ডে’র সৌজন্যে প্রাপ্ত ছবি)



জন ক্লাউজারের পরীক্ষণে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের জটাজাল সঠিক প্রমাণিত হলেও সেখানে কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল। ফিল্টারগুলিকে আগে থেকে নির্দিষ্ট জায়গায় বসানো হয়েছিল। হতে পারে এই ফিল্টারের অবস্থান ফোটনগুলির গতিতে কোনভাবে প্রভাব বিস্তার করেছে। এই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে আরো নিখুঁতভাবে পরীক্ষা করে দেখার জন্য এগিয়ে এলেন ফ্রান্সের পদার্থবিজ্ঞানী আলান অ্যাসপেক্ট যিনি এবছরের আরেকজন নোবেলজয়ী।

অ্যলান অ্যাসপেক্ট এর জন্ম ১৯৪৭ সালের ১৫ জুন ফ্রান্সের আজান (Agen) শহরে। ১৯৬৯ সালে তিনি পদার্থবিজ্ঞানে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন প্যারিস-সুদ থেকে। এরপর তিনি তিন বছর ক্যামেরুনে গিয়ে শিক্ষকতা করেছেন। ১৯৮৩ সালে তিনি পিএইচডি অর্জন করেন। পিএইচডি গবেষণা করার সময়েই তিনি বেলস ইনইকুয়েলিটির পরীক্ষাটি করেন।

 



জন ক্লাউজারের পরীক্ষণে যেসব সীমাবদ্ধতা ছিল – যেমন ফিল্টারের অবস্থান আগে থেকে জানা, এসব দূর করার ব্যবস্থা করেন অ্যালান অ্যাসপেক্ট। তিনি ফোটন নির্গমনের হার বাড়ানোর পাশাপাশি ট্রান্সডিউসার ব্যবহার করে ফিল্টারের অবস্থান প্রতি সেকেন্ডে কয়েক লক্ষবারের বেশি পরিবর্তন করার ব্যবস্থা করলেন। আলোর দিক পরিবর্তন করার ব্যবস্থা করলেন সেকেন্ড আড়াই কোটি বার। এই পরিবর্তনের ফলে ফোটনগুলি আলোর গতিতে চললেও একটি থেকে অন্যটিতে তথ্য আদান-প্রদান করতে পারবে না। ফলে কোন গুপ্ত চলক থাকলেও তা কাজে লাগবে না। এবারেও দেখা গেল – কোয়ান্টামের জটাজালে আবদ্ধ ফোটনগুলি কোয়ান্টাম মেকানিক্সের নিয়ম মেনেই চলছে।

অ্যালান অ্যাসপেক্টের পরীক্ষা থেকে প্রমাণিত হয়ে গেছে যে কোয়ান্টাম এন্টেঙ্গেলমেন্টে কোন ধরনের গুপ্ত চলকের মাধ্যমে কণাগুলি আগে থেকে কোন তথ্য পেয়ে যায় না। কিন্তু তারপরেও বিজ্ঞানীদের সন্দেহ যায় না। এমনও তো হতে পারে কণাগুলি আগে থেকেই বুঝে ফেলছে কীভাবে ডিটেক্টরগুলি কিংবা ফিল্টারগুলির দিক পরিবর্তন হবে! এই সন্দেহও দূর করার জন্য এগিয়ে এলেন অস্ট্রিয়ার পদার্থবিজ্ঞানী আন্তন সাইলিঙ্গার – যিনিও এবার নোবেল পুরষ্কার পেলেন।

আন্তন সাইলিঙ্গারের জন্ম অস্ট্রিয়ায় ১৯৪৫ সালের ২০ মে। ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি পিএইচডি অর্জন করেছেন ১৯৭১ সালে। বর্তমানে তিনি ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস প্রফেসর।

২০১৭ সালে প্রফেসর সাইলিঙ্গারের গবেষকদল মহাকাশের তারার আলো থেকে ভেসে আসা ফোটনকে কাজে লাগিয়ে বেলস ইনইকুইলিটি পরীক্ষাটি আবার করেন।



 

প্রফেসর সাইলিঙ্গার বিশেষ ধরনের কৃস্টালের উপর লেজার আলো প্রয়োগ করে ফোটন তৈরি করেন। আবার একই সাথে মহাকাশের দূর নক্ষত্র থেকে ভেসে আসা আলো ফেলার ব্যবস্থাও করেন কৃস্টালের উপর। মহাকাশ থেকে ভেসে আসা ফোটনগুলিও কোয়ান্টাম এনটেঙ্গেলমেন্ট মেনে চলেছে। তার মানে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের জন্য কোন ধরনের গুপ্ত চলকের দরকার নেই। কিন্তু কোয়ান্টাম এন্টেঙ্গেলমেন্ট কীভাবে কাজ করে তা এখনো রহস্যই রয়ে গেছে।

এই পরীক্ষা করার বিশ বছর আগে থেকেই কোয়ান্টামের জটাজাল কাজে লাগিয়ে কোয়ান্টাম টেলিপোর্টেশান পরীক্ষা করা শুরু করেছেন। যেহেতু কোয়ান্টামের জটাজালে আবদ্ধ কণার একটিকে জানতে পারলে অন্যটিকেও জানা হয়ে যায়, সেহেতু একপ্রান্তের কণার পর কণা সাজিয়ে অন্যপ্রান্তে হুবহু কপি করে ফেলা সম্ভব। প্রফেসর সাইলিঙ্গারের দল কোয়ান্টাম টেলিপোর্টেশানে কিছুটা সাফল্য অর্জন করেছেন।

কোয়ান্টামের জটাজালের সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হবে কোয়ান্টাম কম্পিউটারে এবং কোয়ান্টাম এনক্রিপশানে। তথ্যপ্রযুক্তির এই দুর্বার গতির যুগে সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে পড়তে হয় তথ্যচুরি হয়ে যাবার সম্ভাবনার কারণে। প্রচলিত ডিজিটাল কম্পিউটারের তথ্যপ্রবাহে তথ্যচুরির হাত থেকে বাঁচতে এবং গোপনীয়তা রক্ষায় যে কৌশল অবলম্বন করা হয় – তাতে একই তথ্যের অনেকগুলি কপি করে গুপ্ত সংকেতের মাধ্যমে তা সুরক্ষিত রাখা হয়। কিন্তু কোয়ান্টাম এনক্রিপশানে কোয়ান্টামের জটাজাল অত্যন্ত জটিল গুপ্ত সংকেত তাৎক্ষণিকভাবে তৈরি করবে যা চুরি করার কোন উপায় থাকবে না।

আমাদের ভবিষ্যত প্রযুক্তি হবে কোয়ান্টাম প্রযুক্তি – যার অনেক প্রয়োগ আমরা ইতোমধ্যেই দেখতে পাচ্ছি। এই সময় এবছরের পদার্থবিজ্ঞানে নোবেলপুরষ্কার কোয়ান্টাম তত্ত্বের ব্যবহারিক সাফল্যের উজ্জ্বল স্বীকৃতি।

 

তথ্যসূত্র:

১। এ এম হারুন অর রশীদ, একবিংশ শতাব্দীর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির নতুন দিগন্ত, (বিজ্ঞান সমগ্র), অনুপম প্রকাশনী, ঢাকা ২০১০।

২। Brian Clegg, Cracking Quantum Physics, Cassell, London, 2017.

৩।  www.nobelprize.org

৪। Louisa Gilder, The age of entanglement, Vintage Books, New York, 2008. 

____________

বিজ্ঞানচিন্তা অক্টোবর ২০২২ সংখ্যায় প্রকাশিত











Sunday, 23 October 2022

লুই ডি ব্রগলি: কোয়ান্টাম তত্ত্বের রাজপুত্র

 




আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের জন্য সবচেয়ে দরকারি এবং কার্যকরী তত্ত্ব হলো কোয়ান্টাম তত্ত্ব। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে ম্যাক্স প্ল্যাংক ও নীল্‌স বোর কোয়ান্টাম তত্ত্বের গাণিতিক প্রয়োগ শুরু করেন। এর মাত্র কয়েক বছর আগে উনবিংশ শতাব্দীর একেবারে শেষের দিকে ১৮৯৫ সালে এক্স-রে, ১৮৯৬ সালে তেজষ্ক্রিয়তা এবং ১৮৯৭ সালে ইলেকট্রন আবিষ্কৃত হয়েছে। ১৯০৫ সালে আইনস্টাইন আলোর ফটো-ইলেকট্রিক ইফেক্ট এর কার্যকর ব্যাখ্যা দিয়েছেন। ১৯১১ সালে পরমাণুর নিউক্লিয়াস এবং প্রোটন আবিষ্কার করেছেন আর্নেস্ট রাদারফোর্ড। এসবের ভিত্তিতে নীল্‌স বোর পরমাণুর কোয়ান্টাম মডেল দাঁড় করিয়েছেন। কোয়ান্টাম মেকানিক্সের ভিত্তি তখন দিনে দিনে শক্ত হচ্ছে। আলোর ফোটন কণা হিসেবে যেমন কাজ করে, তেমনি তরঙ্গ হিসেবেও কাজ করতে পারে। অর্থাৎ আলোর দ্বৈতচরিত্র – কণা এবং তরঙ্গ তা ততদিনে প্রমাণিত হয়ে গেছে। আইনস্টাইন তাঁর আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্বের (স্পেশাল থিওরি অব রিলেটিভিটি) সাহায্যে প্রতিষ্ঠা করেছেন সর্বকালের জনপ্রিয় সমীকরণ E = mc2। এই সূত্র থেকে দেখা যায়, পদার্থকে শক্তিতে রূপান্তরিত করা যায়, আবার শক্তিকেও রূপান্তর ঘটিয়ে পদার্থ পাওয়া যায়। আলোর কণা ও তরঙ্গের দ্বৈতসত্ত্বা প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবার পরবর্তী দশ বছরের মধ্যে পদার্থেরও যে কণা ও তরঙ্গের দ্বৈতসত্ত্বা থাকতে পারে – সেই তত্ত্ব সামনে নিয়ে এলেন পদার্থবিজ্ঞানের জগতে প্রায়-নবাগত লুই ডি ব্রগলি। ১৯২৪ সালে লুই ডি ব্রগলি তাঁর পিএইচডি থিসিসে এই তত্ত্ব প্রকাশ করেন যে আলোর যেমন কণা ও তরঙ্গের দ্বৈতধর্ম আছে, অর্থাৎ স্বাভাবিক অবস্থায় আলো তরঙ্গ হলেও কণার ধর্মও প্রদর্শন করে, তেমনি ইলেকট্রনও স্বাভাবিক অবস্থায় কণা হলেও, তরঙ্গের ধর্ম প্রদর্শন করতে পারে। তারপর  মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যেই এই তত্ত্ব পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার অর্জন করে। প্রিন্স লুই ভিক্টর পিয়েরে রেমন্ড ডি ব্রগলি ইলেকট্রনের তরঙ্গধর্ম আবিষ্কার করার জন্য ১৯২৯ সালের পদার্থবিজ্ঞানের নোবেল পুরষ্কার অর্জন করেছেন। অথচ আশ্চর্যের বিষয় হলো লুই ডি ব্রগলি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শুরুর দিকে জেনারেল ফিজিক্স পরীক্ষায় ফেল করে বিজ্ঞান পড়াই ছেড়ে দিয়েছিলেন। তারপর নানা পথ পের হয়ে ফিরে এসেছেন তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞানে। আর তার দশ বছর পরেই তিনি পদার্থবিজ্ঞানে ইতিহাস তৈরি করলেন।

প্রিন্স বা রাজপুত্র বলতে যেরকম কোন রাজ্যের রাজার পুত্রকে বোঝায় – ঠিক সেরকম না হলেও ফ্রান্সের অত্যন্ত ধনী, বনেদী এবং ক্ষমতাশালী পরিবারের সন্তান লুই ডি ব্রগলি। পারিবারিক উত্তরাধিকারসূত্রেই তিনি ছিলেন প্রিন্স। রোমান সাম্রাজ্যের উচ্চপদাধিকারীদের এই উপাধি দেয়া হতো। লুই ডি ব্রগলির প্রপ্রপিতামহ ভিক্টর ফ্রাঁসোয়া ডি ব্রগলি প্রিন্স উপাধি পেয়েছিলেন আস্ট্রিয়ার সম্রাটের কাছ থেকে। ভিক্টর ও পলিন ডি ব্রগলির পাঁচ সন্তানের মধ্যে সবার ছোট লুই ডি ব্রগলির জন্ম ১৮৯২ সালের ১৫ আগস্ট। ভিক্টর ছিলেন ডিউক – ফ্রান্সের অত্যন্ত উচ্চ পদমর্যাদাসম্পন্ন মানুষ। ডিউক পদমর্যাদা উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া। ডিউকের বড় ছেলে ডিউক হবে এটাই নিয়ম। ভিক্টরের মৃত্যুর পর তাঁর বড় ছেলে মরিস ডিউক হলেন। লুইয়ের চেয়ে সতের বছরের বড় মরিস ডি ব্রগলি ছিলেন তখনকার সময়ে ইওরোপের খ্যাতিমান পরীক্ষণপদার্থবিজ্ঞানীদের একজন। নিজের টাকায় নিজের বাড়িতে তিনি বিশাল ল্যাবরেটরি তৈরি করে গবেষণা করতেন।

বাড়িতে খ্যাতিমান অগ্রজ থাকলে অনুজদের যা হয়, লেখাপড়া নিয়ে সারাক্ষণই একটা মানসিক চাপের মধ্যে থাকতে হয়; মরিসের ছোট ভাইবোনদের ক্ষেত্রেও তা হলো। লুইয়ের চেয়ে চার বছরের বড় বোন পলিনের নাম রাখা হয়েছিল মায়ের নামে। পলিন পদার্থবিজ্ঞান পড়তে চেয়েছিল। কিন্তু মরিস তাতে বাধ সাধলেন। ইওরোপে তখনো মেয়েদেরকে বিজ্ঞানশিক্ষায় উৎসাহিত করা হতো না। পলিন বিজ্ঞান পড়তে না পেরে সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করেছেন এবং পরবর্তীতে ফ্রান্সের অত্যন্ত খ্যাতিমান সাহিত্যিক হয়ে উঠেছিলেন। পলিনের সাথে লুইয়ের খুব বন্ধুত্ব ছিল।

বড়ভাই বিজ্ঞানী মরিসের তত্ত্বাবধানে বাড়িতেই প্রাইভেট টিউটরদের কাছে লেখাপড়া শুরু হলো লুইয়ের। ১৯০৬ সালে বাবার মৃত্যুর পর মরিস ডিউক হলেন। মরিস এবার চৌদ্দ বছর বয়সী লুইকে প্যারিসের বিখ্যাত স্কুল লাইসি জ্যানসন দ্য সেইলি-তে ভর্তি করানোর ব্যবস্থা করলেন। তিন বছর পর দর্শন ও গণিতে ভালো নম্বর পেয়ে স্কুল-ফাইনাল পাস করলেন লুই।

১৯১০ সালে আঠারো বছর বয়সে ভর্তি হলেন সরবোন ইউনিভার্সিটিতে। কিন্তু তখনো তিনি জানেন না ঠিক কী হতে চান জীবনে। তার সমবয়সী ভাগনে চার্লসও ভর্তি হয়েছেন সরবোনে। চার্লসের প্রভাবে লুই ইতিহাস বিষয়ে পড়াশোনা শুরু করলেন। কিন্তু  ইতিহাসের গৎবাঁধা গবেষণা-বিশ্লেষণহীন পড়াশোনা তাঁর ভালো লাগলো না। অনেকদিন ইতিহাস পড়ার পর মাঝপথে ছেড়ে দিলেন। পারিবারিক প্রভাব খাটিয়ে তিনি সহজেই বড় আমলা হতে পারতেন, কিংবা রাজনৈতিক নেতা হতে পারতেন। কিন্তু সেসবের কিছুই লুইকে টানে না। কী হতে চান সেটা তখনো না জানলেও আমলা বা নেতা কোনটাই যে হতে চান না সে ব্যাপারে তিনি মনস্থির করে ফেলেছিলেন। ইতিহাসে আনন্দ না পেয়ে তিনি আইন পড়তে শুরু করলেন। এক বছর তিনি আইন পড়লেন। কিন্তু তাতেও কোন আগ্রহ পেলেন না। গণিতের বিশেষ কোর্স করার পর তিনি ক্রমে পদার্থবিজ্ঞান, বিশেষ করে তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠলেন। কিন্তু পদার্থবিজ্ঞানের একটি পরীক্ষায় (জেনারেল ফিজিক্স) তিনি ফেল করলেন। এতে তাঁর মনোবল একেবারেই ভেঙে গেল। শৈশব কৈশোরে যে লুই এত প্রাণবন্ত ছিলেন, তিনি এবার হঠাৎ খুব নিষ্প্রাণ হয়ে গেলেন। কারো সাথেই তেমন মেশেন না, সারাক্ষণ চিন্তিত থাকেন।

১৯১১ সালে ব্রাসেল্‌স এ অনুষ্ঠিত প্রথম সলভে কনফারেন্সের অন্যতম সেক্রেটারি ছিলেম মরিস ডি ব্রগলি। তিনি ব্রাসেলস-এ যাবার সময় ছোটভাই লুইকেও সাথে নিয়ে গেলেন। ইওরোপের প্রথম সারির সব পদার্থবিজ্ঞানীদের মাঝে গিয়ে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের ক্রমবর্ধমান গতিপথ লক্ষ্য করে উনিশ বছরের তরুণ লুই ডি ব্রগলি তাঁর ভবিষ্যতের পথ খুঁজে পেলেন। তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞানের প্রতি সত্যিকারের ভালোবাসা অনুভব করলেন। ১৯১৩ সালে সরবোন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘লাইসেনসিয়েট ইন সায়েন্স’ বা বিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করলেন।

পরবর্তী ধাপের পড়াশোনা কিংবা গবেষণা শুরু করার আগেই ১৯১৩ সালের তাঁর বাধ্যতামূলক মিলিটারি সার্ভিস শুরু হয়ে গেলো। পরের বছরই প্রথম বিশ্বযুদ্ধ লেগে গেলো। যুবকদের যুদ্ধে যোগ দেয়া বাধ্যতামূলক। লুই-এর পোস্টিং হয়ে গেলো মিলিটারির ইঞ্জিনিয়ারিং কোরে। প্রচন্ড বিরক্তিকর কাজ তাঁর জন্য। প্রভাবশালী বড়ভাই থাকলে তখনো কমবেশি কাজ হতো। ডিউক মরিস ডি ব্রগলি সেনাবাহিনীর উঁচুপর্যায়ে তদবির করে লুইকে সম্মুখযুদ্ধে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচিয়ে আইফেল টাওয়ারের নিচে পোস্টিং দেয়ার ব্যবস্থা করলেন – যেখানে একটি রেডিও ট্রান্সমিটার বসানোর কাজ চলছিলো। পরবর্তী ছয় বছর ধরে লুই ডি ব্রগলি এই ট্রান্সমিটারের রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করেছেন ইলেকট্রিসিয়ান হিসেবে। এটাকে পরে তিনি তাঁর হাতেকলমে বেতার যোগাযোগের ইলেকট্রনিক পদ্ধতি সম্পর্কে প্রশিক্ষণের সুযোগ হিসেবে দেখেছেন।

১৯১৯ সালের আগস্ট মাসে মিলিটারি সার্ভিস থেকে অব্যাহতি পেলেন লুই ডি ব্রগলি। ছয় বছরের মিলিটারি সার্ভিসের স্বীকৃতি হিসেবে তাঁকে অ্যাডজুটেন্ট পদবী দেয়া হয়। বাড়িতে ফিরে এসে আবার লেখাপড়া শুরু করলেন লুই ডি ব্রগলি। মরিসের ল্যাবে এক্স-রে সংক্রান্ত পরীক্ষণ-গবেষণায় কিছুদিন হাত লাগালেন। এক্স-রে বর্ণালী এবং ফটোইলেকট্রিক ইফেক্ট সংক্রান্ত অনেকগুলি পরীক্ষণে তিনি অংশ নিলেন। পরীক্ষণ ফলাফলগুলিকে কোয়ান্টাম পরমাণুতত্ত্ব প্রয়োগ করে বিশ্লেষণমূলক অনেকগুলি গবেষণাপত্র প্রকাশ করলেন তিনি।

কোয়ান্টাম মেকানিক্সের অগ্রগতি তিনি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছিলেন। আলোর তরঙ্গ ও কণার দ্বৈতধর্ম প্রমাণিত হয়ে গেছে। লুই ডি ব্রগলি ১৯২৩ সালে পরপর তিনটি ছোট গবেষণাপত্রে প্রমাণ করে দিলেন যে আলো তরঙ্গ হয়েও যেভাবে কণার ধর্ম প্রদর্শন করে, তেমনি ইলেকট্রন কণা হয়েও তরঙ্গের ধর্ম প্রদর্শন করতে পারে। অর্থাৎ যে কোনো বস্তুও কণা ও তরঙ্গের দ্বৈতধর্ম ধারণ করে।

লুই ডি ব্রগলির বস্তু-তরঙ্গের গাণিতিক ভিত্তি কয়েকটি সহজ সমীকরণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। আইনস্টাইনের শক্তি ও পদার্থের সমীকরণ E = mc2, যেখানে E = শক্তি, m = বস্তুর ভর, c = আলোর বেগ। আবার শক্তি ও তরঙ্গের সমীকরণ লেখা যায়, E = hf, যেখানে E = শক্তি, h = প্ল্যাংকের ধ্রুবক = 6.63 x 10-34 Joule-second, এবং f = তরঙ্গের কম্পাঙ্ক। শক্তির উভয় সমীকরণের সাম্যতা বিবেচনা করে লেখা যায়, mc2 = hf. আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য যদি L হয়, কম্পাঙ্ক যদি f হয়, তাহলে আলোর বেগ c = Lf; যা থেকে লেখা যায় f = c/L; কম্পাঙ্কের মান বসানোর পর সমীকরণ দাঁড়ায়, mc2 = hc/L, যেখান থেকে লেখা যায়, L = h/mc, অর্থাৎ বস্তুর তরঙ্গদৈর্ঘ্য = প্ল্যাঙ্কের ধ্রুবক/বস্তুর ভরবেগ।

১৯২৪ সালে লুই ডি ব্রগলি তাঁর পিএইচডি থিসিস প্রকাশ করলেন। ইওরোপের অনেক বিজ্ঞানীর চোখেই পড়েছে তাঁর বস্তু-তরঙ্গের সূত্র, কিন্তু কেউই খুব একটা পাত্তা দিলেন না। কিন্তু আইনস্টাইন আর শ্রোডিঙ্গার খুবই গুরুত্বের সাথে নিলেন তাঁর এই তত্ত্ব। শ্রোডিঙ্গার তাঁর ওয়েভ মেকানিক্সে লুই ডি ব্রগলির বস্তু তরঙ্গ প্রয়োগ করলেন।

পদার্থবিজ্ঞানের তত্ত্ব যতক্ষণ পর্যন্ত পরীক্ষণের সাহায্যে প্রমাণিত নয়, ততক্ষণ পর্যন্ত সেই তত্ত্ব খুব একটা গুরুত্ব পায় না। অনেক বিজ্ঞানীকে বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হয় তাঁদের তত্ত্ব প্রমাণিত হবার জন্য। পিটার হিগ্‌স ১৯৬৫ সালে যে হিগ্‌স বোসনের তত্ত্ব দিয়েছিলেন, তার ৪৭ বছর পর হিগ্‌স বোসন পাওয়া গেছে। লুই ডি ব্রগলিকে বেশিদিন অপেক্ষা করতে হয়নি। মাত্র তিন বছরের মধ্যেই তাঁর তত্ত্ব প্রমাণিত হয়ে গেল। ১৯২৭ সালে আমেরিকার পদার্থবিজ্ঞানী ক্লিনটন ডেভিডসন ও লেস্টার জারমার, এবং ব্রিটিশ পদার্থবিজ্ঞানী জর্জ থমসন পরীক্ষণের সাহায্যে প্রমাণ করেন যে ইলেকট্রনও তরঙ্গের ধর্ম প্রদর্শন করে। পরবর্তীতে ইলেকট্রনের ধর্মাবলী বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে লুই ডি ব্রগলির তত্ত্ব বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। ডি ব্রগলির তত্ত্ব থেকেই পাওয়া গেছে ম্যাগনেটিক লেন্স – যা কাজে লাগিয়ে উদ্ভাবিত হয়েছে ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপ।

১৯২৪ সালের নভেম্বর মাসে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করার পর সরবোন বিশ্ববিদ্যালয়ে দুই বছর অবৈতনিক শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করার পর নিয়মিত শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। সরবোন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার সময়েই ১৯২৯ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার অর্জন করলেন লুই ডি ব্রগলি। ১৯৩২ সালে তিনি ইউনিভার্সিটি অব প্যারিসে যোগ দেন। সেই সময় হেনরি পয়েনকেয়ার ইন্সটিটিউটে তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ খোলা হয় এবং লুই ডি ব্রগলির জন্যই ইন্সটিটিউটের চেয়ারম্যান পদ সৃষ্টি করা হয়। ১৯৩২ সালের শেষের দিকে তিনি সেই পদে যোগ দেন এবং পরবর্তী তিরিশ বছর সেখানেই ছিলেন। ১৯৬২ সালে তিনি অবসর গ্রহণ করেন।

১৯৩৩ সালে ফ্রান্সের একাডেমি অব সায়েন্সের সদস্যপদ লাভ করেন। ১৯৪২ সালে তিনি একাডেমির পার্মানেন্ট সেক্রেটারি নির্বাচিত হন। ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত তিনি সেই পদে ছিলেন। ১৯৪৮ সালে তিনি আমেরিকান একাডেমি অব সায়েন্স এবং ১৯৫৩ সালে রয়েল সোসাইটির সদস্য মনোনীত হন।

পদার্থবিজ্ঞানীরা সাধারণত ঠোঁটকাটা হয়ে থাকেন। নম্রতা ও ভদ্রতার প্রচলিত সামাজিক সংজ্ঞাগুলি নিয়ে তাঁরা খুব একটা মাথা ঘামান না। কিন্তু লুই ডি ব্রগলি ছিলেন খুবই ব্যতিক্রমী একজন। কয়েক প্রজন্মের উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত পারিবারিক ঐশ্বর্য, খ্যাতি এবং ক্ষমতার কোনকিছুই তিনি ব্যক্তিগত অর্জনের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করেননি। সবার সাথেই খুব নম্রভাবে কথা বলতেন লুই ডি ব্রগলি।

এত ক্ষমতা ও  ঐশ্বর্যের মালিক হওয়া সত্ত্বেও তিনি খুব সাধারণ জীবনযাপন করতেন। বড়ভাই মরিসের মৃত্যুর পর – মরিসের ছেলে সন্তান না থাকাতে লুই ডি ব্রগলি ডিউক হলেন। তাতেও তাঁর জীবনযাপনে কোন পরিবর্তন আসেনি। জগতসংসারের প্রতি এক ধরণের বৈরাগ্যই ছিল তাঁর। ব্যক্তিগত কোন গাড়ি তিনি ব্যবহার করতেন না। দীর্ঘ জীবন লাভ করেছিলেন। কখনো বিয়ে করেননি। শেষ বয়সে দেখাশোনার জন্য দু’জন বিশ্বস্ত কাজের লোক ছিল। অনেকটা ঘরকুনো স্বভাবের মানুষ ছিলেন তিনি। কয়েকবার সলভে কনফারেন্স আর একবার নোবেল পুরষ্কার নেয়ার জন্য স্টকহোমে ছাড়া আর কোন দেশে ভ্রমণও করেননি। অদ্ভুত নির্লিপ্ত নিস্তরঙ্গ জীবন যাপন করেছেন রাজপুত্র লুই ডি ব্রগলি। ১৯৮৭ সালের ১৯ মার্চ ৯৫ বছর বয়সে তাঁর জীবনাবসান হয়।

 

তথ্যসূত্র: (1) Ioan James, Remarkable Physicist, Cambridge University Press, UK, 2004; (2) Biographical Encyclopedia of Scientists, World Book Chicago, 2003; (3) Heinrich A. Medicus, Fifty years of matter waves, Physics Today, February 1974; Mary Jo Nye, Aristocratic culture and the pursuit of science: the De Broglies in Modern France, JSTOR Vol 88, No 3, (1997).

_____________

বিজ্ঞানচিন্তা সেপ্টেম্বর ২০২২ সংখ্যায় প্রকাশিত







Latest Post

চাঁদের নাম লুনা - প্রথম পর্ব

চাঁদের নাম লুনা ক্লাসে ঢুকে আমাকে দেখেই হৈ চৈ করে উঠলো ফারজানা, স্বাতী আর চিত্রা। তিনজনই আজ এক সাথে এসেছে।             "ওয়াও নয়ন, তোকে ...

Popular Posts