Friday 14 February 2020

বুধ - পর্ব ২৬


বুধে তৃতীয় অভিযান: বেপি-কলম্বো

 বুধ গ্রহের প্রথম ও দ্বিতীয় মিশন সফলভাবে শেষ করেছে আমেরিকান মহাকাশ সংস্থা নাসা। বুধে আরেকটি অভিযান চালনার প্রস্তুতি চলছে অনেক বছর ধরে। এটা হবে বুধের তৃতীয় অভিযান। এই মিশনের নাম দেয়া হয়েছে বেপি-কলম্বো।
            ইতালির পাদুয়া ইউনিভার্সিটির অ্যাপ্লাইড মেকানিক্সের অধ্যাপক ছিলেন গিসপি কলম্বো (Giuseppe Colombo) ওরফে বেপি-কলম্বো। ম্যারিনার-১০ মিশনে বেপি-কলম্বোর বৈজ্ঞানিক অবদান ছিল যুগান্তকারী। তাঁর গাণিতিক হিসেব অনুসরণ করেই ম্যারিনার-১০ নভোযান বুধের কক্ষপথে প্রবেশ করতে পেরেছিল। ১৯৮৪ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি বেপি-কলম্বো মারা যান। তাঁর সম্মানে ইওরোপিয়ান মহাকাশ সংস্থা তাদের প্রথম বুধ মিশনের নাম রেখেছে বেপি-কলম্বো।
            ইওরোপ ও জাপানের মহাকাশ গবেষণা সংস্থার যৌথ উদ্যোগে এই মিশনের প্রস্তুতি চলছে। সবকিছু ঠিক থাকলে ২০১৮ সালেই বুধের উদ্দেশ্যে তৃতীয় নভোযান পৃথিবী থেকে যাত্রা করবে।
        বেপি-কলম্বো মিশনে দুটো মহাকাশযান ব্যবহার করা হবে যারা বুধের চারপাশে ঘুরবে এবং বুধ গ্রহকে সুবিধাজনক অবস্থান থেকে খুব ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করবে।
          ইওরোপিয়ান বিজ্ঞানীদের জন্য এই মিশন একটা বিরাট চ্যালেঞ্জ স্বরূপ। বেপি-কলম্বো একটি বিশাল প্রকল্প। খুবই ব্যয়বহুলইওরোপিয়ান স্পেস এজেন্সির দীর্ঘমেয়াদী বিজ্ঞান প্রোগ্রামের অংশ।  ইওরোপিয়ান স্পেস এজেন্সির আগের সব প্রকল্প ছিল ঠান্ডা গ্রহের উপর - অর্থাৎ সূর্যের বাইরের দিকের গ্রহগুলোর ওপর। বেপি-কলম্বো হলো এজেন্সির প্রথম মিশন যেটা সৌরজগতের উত্তপ্ত গ্রহগুলোর উপর গবেষণা করবে। 
            এই মিশনের কারিগরি দক্ষতা মেসেঞ্জার মিশনের দক্ষতাকেও ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। কারণ সূর্যের এত কাছের প্রচন্ড উত্তপ্ত গ্রহে দীর্ঘমেয়াদী গবেষণা প্রকল্প চালানো সাংঘাতিক জটিল কাজ। কোন নভোযান সেখানে পৌঁছানোই দুরূহ। এ ধরনের মিশন বুধ গ্রহের উৎপত্তিসহ আরো সব ব্যাপার-স্যাপার বোঝার জন্য খুবই জরুরি। তাছাড়া আমাদের সৌরজগৎ কীভাবে উৎপন্ন হয়েছে সেটা সম্পর্কেও আরো পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে। পৃথিবীপৃষ্ঠে বসে এরকম পরীক্ষা চালানো সম্ভব নয়। ম্যারিনার-১০ ও মেসেঞ্জার মিশন দুটো বুধ গ্রহ সম্পর্কে এখনো যেসব প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট উত্তর দিতে সক্ষম হয়নি, বেপি-কলম্বো মিশন সেই সব প্রশ্নেরও উত্তর খুঁজবে।

কারিগরি দিক

বেপি-কলম্বো মিশনে দুটো অংশ থাকবে। একটার বদলে দুটো নভোযান বুধের কক্ষপথে ঘুরবে। ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সি তৈরি করছে মূল নভোযান - মার্কারি প্ল্যানেটারি অরবিটার (Mercury Planetary Orbiter- MPO), এবং জাপানিজ স্পেস এজেন্সি (ISAS/JAXA) বানাচ্ছে অন্য নভোযান - মার্কারি ম্যাগনেটোস্ফেরিক অরবিটার (Mercury Magnetospheric Orbiter MMO) মার্কারি প্ল্যানেটারি অরবিটার বুধের উপরিতল এবং ভেতরের গঠন সম্পর্কে তথ্য ও উপাত্ত সংগ্রহ করবে। আর ম্যাগনেটোস্ফেরিক অরবিটার বুধের চৌম্বকক্ষেত্রের উৎপত্তি ও ধর্ম পরীক্ষা করবে।
            জ্বালানিসহ পুরো নভোযানের ভর দাঁড়াবে ৪,১০০ কিলোগ্রাম যা মেসেঞ্জার নভোযানের প্রায় চার গুণ।
২০১৮ সালে পৃথিবী থেকে বেপি-কলম্বো উৎক্ষেপণ করা হবে অ্যারিয়ান ফাইভ রকেটের মাধ্যমে। ২০২৬ সাল নাগাদ বুধের কক্ষপথে পৌঁছে যাবে বেপি-কলম্বো নভোযান। তখন থেকেই শুরু হবে বৈজ্ঞানিক তথ্যের বিশ্লেষণ ও অন্যান্য পরীক্ষানিরীক্ষা। বুধের চারপাশে এক বছর ধরে প্রদক্ষিণ করার প্রাথমিক পরিকল্পনা আছে। পরে এই প্রকল্পের সময় আরো এক বছর বাড়ানোর সম্ভাবনা আছে।   
                বেপি-কলম্বো মিশনের দুটো অরবিটার MPO এবং MMO-কে  বুধের কক্ষপথে পৌঁছে দেবে মার্কারি ট্রান্সফার মডিউল। রকেট থেকে বিচ্ছিন্ন হবার পর মার্কারি ট্রান্সফার মডিউল সানশেড এবং দুটো অরবিটারসহ চাঁদের পাশ দিয়ে উড়ে যাবে। সেখান থেকে চাঁদের অভিকর্ষ বল কাজে লাগিয়ে সূর্যের আলোর চাপে পৌঁছে যাবে শুক্র ও বুধের মাঝামাঝি। পৃথিবী, শুক্র ও বুধের অভিকর্ষ বল কাজে লাগিয়ে এটা পৌঁছাবে বুধের কক্ষপথে। MMO কে বুধের কক্ষপথের উপরের দিকে ছেড়ে দেয়া হবে। তারপর সানশেড ও MPO-কে স্থাপন করা হবে বুধের অক্ষের নিচের দিকে।

বেপি-কলম্বো নভোযানের চারটি প্রধান অংশ

মহাকাশে এসব কাজ পৃথিবী থেকে সমন্বয় করা হবে ইওরোপ ও জাপান থেকে। ইওরোপিয়ান স্পেস অপারেশন্‌স সেন্টার হলো জার্মানিতে এবং নভোযান থেকে ডাটা ট্রান্সমিট করার জন্য ৩৫ মিটার ব্যাসের অ্যান্টেনা স্থাপন করা হয়েছে স্পেনে। MMO-এর নিয়ন্ত্রণ করা হবে জাপানের সাগামিহারা স্পেস অপারেশান সেন্টার থেকে। সেজন্য ৬৪ মিটার ব্যাসের একটি অ্যান্টেনা স্থাপন করা হয়েছে।


মার্কারি প্ল্যানেটারি অরবিটার (MPO)

মার্কারি প্ল্যানেটারি অরবিটার দেখতে একটা বাক্সের মতো যার দৈর্ঘ্য.৯ মিটার, প্রস্থ ১.৮ মিটার এবং পুরুত্ব ১.৬ মিটার। এর ভর ১১৪৭ কিলোগ্রাম। তার ওপর এটা আরো ৬৫০ কিলোগ্রাম ভরের জ্বালানি বহন করবে। এর সাথে লাগানো সোলার প্যানেল সৌরশক্তি থেকে ১০০০ ওয়াট ক্ষমতা উৎপাদন করতে পারবে।
            মার্কারি প্ল্যানেটারি অরবিটারে প্রায় ৮০ কিলোগ্রাম ভরের বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতির ব্যবস্থা আছে। নিচের সারণিতে বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতিগুলোর বর্ণনা দেয়া হলো:

সারণি: মার্কারি প্ল্যানেটারি অরবিটারের বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার যন্ত্রপাতি
যন্ত্র
কাজ
বেপি-কলম্বো লেসার অল্‌টিমিটার (BepiColombo Laser Altimeter, BELA)
ইনফ্রারেড লেসার সিস্টেম। বুধের উপরিতলের জরিপ করার জন্য নির্ভুল স্থানাঙ্ক নির্ধারক।
ইতালিয়ান স্প্রিং অ্যাক্সিলারোমিটার
(Italian Spring Accelerometer, ISA)
আইনস্টাইনের জেনারেল থিওরি অব রিলেটিভিটি পরীক্ষা করবে।
মার্কারি পোলার অরবিটার ম্যাগনেটোমিটার
Mercury Polar Orbiter Magnetometer, MPO/MAG (MERMAG)
বুধের চৌম্বকক্ষেত্রের মান ও দিক নির্ণয় করবে।
মার্কারি রেডিওমিটার অ্যান্ড থার্মাল ইনফ্রারেড স্পেকট্রোমিটার
Mercury Radiometer and Thermal Infrared
Spectrometer, MERTIS
বুধের গ্লোবাল ম্যাপিং করবে অনেক সূক্ষ্মভাবে।
মার্কারি গামা রে অ্যান্ড নিউট্রন স্পেকট্রোমিটার
Mercury Gamma ray and Neutron Spectrometer, MGNS
চারটি নিউট্রন সেন্সর দিয়ে বুধে সব ধরনের নিউট্রন শনাক্ত করবে।
মার্কারি ইমেজিং এক্স-রে স্পেকট্রোমিটার
Mercury Imaging X-ray Spectrometer, MIXS
বুধের উপরিতলে এক্স-রে বর্ণালীবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে বিভিন্ন মৌলিক পদার্থের উপস্থিতি শনাক্ত করবে।
মার্কারি অরবিটার রেডিও সায়েন্স এক্সপেরিমেন্ট
Mercury Orbiter Radio science Experiment, MORE
অরবিটারের গতিপথ পূঙ্খানুপূঙ্খভাবে পর্যবেক্ষণ করবে।
প্রোবিং দি হারমিন এক্সোস্ফিয়ার বাই আলট্রাভায়োলেট স্পেকট্রোস্কোপি
Probing the Hermean Exosphere by Ultraviolet Spectroscopy, PHEBUS
বিভিন্ন শক্তি তরঙ্গের অতিবেগুনি বর্ণালীবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে বুধের জলবায়ুর উপাদানগুলোর পরিমাণ ও গতিপ্রকৃতি নির্ণয় করবে।
সার্চ ফর এক্সোস্ফিয়ার রিফিলিং অ্যান্ড এমিটেড নিউট্রাল অ্যাবান্ড্যান্স
Search for Exosphere Refilling and Emitted Neutral Abundance, SERENA
বুধে চার্জ নিরপেক্ষ পরমাণু ও অন্যান্য কণা শনাক্ত করবে এবং তাদের শক্তি মাপবে।
স্পেকট্রোমিটারস অ্যান্ড ইমেজারস
Spectrometers and Imagers for MPO BepiColombo Integrated Observatory System,
SYMBIO-SYS
বুধ গ্রহের পুরো উপরিতলের উচ্চমানের ছবি তুলবে।
সোলার ইনটেনসিটি এক্স-রে অ্যান্ড পার্টিক্যল স্পেকট্রোমিটার
Solar Intensity X-ray and particle Spectrometer, SIXS

সূর্য থেকে আসা এক্স-রে এবং অন্যান্য শক্তিশালী কণা পরিমাপ করবে।




মার্কারি ম্যাগনেটোস্ফেরিক অরবিটার (MMO)
  
মার্কারি ম্যাগনেটোস্ফেরিক অরবিটার একটি অষ্টকোণি প্রিজমের আকারে তৈরি। এর উচ্চতা ৯০ সেন্টিমিটার। এর আট তলের একটা থেকে অন্যটার দূরত্ব ১.৮ মিটার। এই অরবিটার মিনিটে ১৫ বার ঘুরবে নিজের অক্ষের উপর। এভাবে তার আটটি তলে লাগানো সোলার প্যানেল থেকে ৩৫০ ওয়াট ক্ষমতা উৎপাদন করতে পারবে। আকারে ছোট হওয়ায় এর ভর প্রায় ২৭৫ কিলোগ্রাম - যা প্ল্যানেটারি অরবিটারের মাত্র চার ভাগের এক ভাগ। এর অ্যান্টেনার দৈর্ঘ্য ৮০ সেন্টিমিটার। বুধের চারপাশে ঘুরতে ঘুরতে এটা বছরে প্রায় ১৬০ গিগাবাইট ডাটা সংগ্রহ করে পৃথিবীতে পাঠাবে। এই অরবিটারের নিয়ন্ত্রণ থাকবে জাপানে।
            ম্যাগনেটোস্ফেরিক অরবিটারে ৪৫ কিলোগ্রাম ভরের পাঁচ ধরনের বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতির ব্যবস্থা আছে। নিচের সারণিতে যন্ত্রপাতিগুলোর সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দেয়া হলো।
           
সারণি: মার্কারি ম্যাগনেটোস্ফেরিক অরবিটারের বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি
যন্ত্র

কাজ
মার্কারি ম্যাগনেটোস্ফিয়ার অরবিটার ম্যাগনেটোমিটার
Mercury Magnetospheric Orbiter Magnetometer,
MMO/MGF (MERMAG)

বুধের চৌম্বকক্ষেত্রের শক্তি ও গতিপথ নির্ণয় করবে।
মার্কারি প্লাজমা পার্টিক্যল এক্সপেরিমেন্ট
Mercury Plasma Particle Experiment, MPPE

বুধ গ্রহে প্লাজমা ও মৌলিক কণার উপস্থিতি শনাক্ত করবে।
মার্কারি প্লাজমা ওয়েভ ইন্সট্রুমেন্ট
Mercury Plasma Wave Instrument, PWI

বুধের বৈদ্যুতিক ক্ষেত্র ও চৌম্বক ক্ষেত্রের শক্তি, তরঙ্গ-দৈর্ঘ্য ও কম্পাঙ্ক পরিমাপ করবে।
মার্কারি সোডিয়াম অ্যাটমোস্ফেরিক স্পেকট্রাল ইমেজার
Mercury Sodium Atmospheric Spectral Imager, MSASI

বুধের উপরিস্তর থেকে সোডিয়াম নির্গমন পরিমাপ ও বিশ্লেষণ করবে।
মার্কারি ডাস্ট মনিটর
Mercury Dust Monitor, MDM

বুধ গ্রহে ধুলিকণার প্রভাব পরিমাপ করবে।


বেপি-কলম্বো মিশন থেকে বুধ গ্রহ সম্পর্কে আরো অনেক নতুন তথ্য পাওয়া যাবে আশা করা যায়। এই নতুন তথ্যের জন্য অপেক্ষা করতে হবে ২০২৬ সাল পর্যন্ত। 



No comments:

Post a Comment

Latest Post

Hendrik Lorentz: Einstein's Mentor

  Speaking about Professor Hendrik Lorentz, Einstein unhesitatingly said, "He meant more to me personally than anybody else I have met ...

Popular Posts