Thursday, 9 June 2022

আবহাওয়ার গাণিতিক মডেল

 



অনেকেই বলেন -  আজকাল সবকিছু অনিশ্চিত হয়ে উঠছে, কখন কী হবে তা আগে থেকে কিছুই বলা যাচ্ছে না – ইত্যাদি। কিন্তু একটু ভেবে দেখলেই বোঝা যাবে যে আধুনিক বিজ্ঞানের কল্যাণে এখন অনেক কিছুরই পূর্বাভাস এত সঠিকভাবে দেয়া সম্ভব হচ্ছে – যা বিশ বছর আগেও এতটা নিখুঁতভাবে দেয়া সম্ভব হতো না। আবহাওয়ার কথা ধরা যাক। কোথায় কখন ঝড় উঠবে, বৃষ্টি হবে, রোদ থাকবে কি মেঘ – সবই আগে থেকে সঠিকভাবে বলে দেয়া সম্ভব হচ্ছে। বর্তমান যুগে উন্নত দেশে আবহাওয়ার পূর্বাভাস প্রায় অক্ষরে অক্ষরে মিলে যায়। কীভাবে সম্ভব হচ্ছে আবহাওয়ার পরিবর্তন সম্পর্কে এরকম ভবিষ্যতবাণী করা?

শিল্পযুগ শুরু হবার পর গত একশ বছরে পৃথিবীর বায়ুমন্ডলে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বেড়ে গেছে শতকরা চল্লিশ ভাগ। পৃথিবীর যে গড় তাপমাত্রা গত এক হাজার বছর ধরে প্রায় স্থির ছিল – সেই গড় তাপমাত্রা হঠাৎ এক ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে গেছে। যেভাবে এগোচ্ছে তাতে বিজ্ঞানীরা হিসেব করে দেখেছেন যে এই একবিংশ শতাব্দীর মধ্যেই পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা আরো দুই থেকে তিন ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে যাবে। ফলে পৃথিবীর জলবায়ুতে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটবে। যেখানে প্রচুর পানি আছে – সেখানে বন্যার প্রাবল্য বেড়ে যাবে, অন্যদিকে যেখানে পানির অভাব, সেখানে আরো খরা হবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ বেড়ে যাবে ব্যাপক হারে। পরিবর্তনের এই যে পূর্বাভাস দেয়া হচ্ছে – তা কীভাবে সম্ভব হচ্ছে?

এর মূলে রয়েছে আধুনিক বিজ্ঞান। আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেয়ার জন্য আবহাওয়াবিদ্‌রা যে তিনটি প্রধান বিষয়ের উপর নির্ভর করেন – সেগুলি হলো পর্যবেক্ষণ, কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত আবহাওয়া মডেল, এবং আবহাওয়ার বিজ্ঞান ও বৈজ্ঞানিক অভিজ্ঞতা। বায়ুমন্ডলের চাপ, তাপ, জলীয় বাষ্পের পরিমাণ, বায়ু-প্রবাহের গতিপথ ও বেগ ইত্যাদি একেক জায়গায় একেক রকম হয়ে থাকে। এগুলির পরিবর্তনও হয় দ্রুত। তাই একেক জায়গার আবহাওয়া একেক রকম। বর্তমানে অনেকগুলি আধুনিক স্যাটেলাইট পৃথিবীর চারপাশে অনবরত ঘুরে ঘুরে আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ করছে এবং পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের আবহাওয়া-দপ্তরে অনবরত তথ্য পাঠাচ্ছে। এই তথ্যগুলিকে কম্পিউটার মডেলের মধ্যে প্রবেশ করিয়ে আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেয়া হয়।

আবহাওয়ার কম্পিউটার মডেল হলো আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেয়ার প্রধান অবলম্বন। আবহাওয়ার পরিবর্তনে পদার্থবিজ্ঞানের যতগুলি নিয়ম কাজ করে তার সবগুলি গাণিতিক সমীকরণের মিশ্রণে তৈরি হয়েছে এই মডেল। বায়ুমন্ডলের তাপ, চাপ, আর্দ্রতা, বায়ুপ্রবাহ, তাপের বিকিরণ, শোষণ, আপেক্ষিক তাপ, আপেক্ষিক আর্দ্রতা ইত্যাদি হাজারো প্যারামিটারের যে কোনোটারই পরিবর্তনে বদলে যেতে পারে স্থানীয় আবহাওয়া। তবে কতটুকু বদল হবে তা হিসেব করার জন্য পৃথিবীর জলবায়ুর গাণিতিক মডেল দরকার হয়। সেই মডেলে কোটি কোটি উপাত্ত বিশ্লেষণ করা হয় খুবই কম সময়ের মধ্যে। এই কাজের জন্য সুপার-কম্পিউটার ব্যবহার করা হচ্ছে এখন। অস্ট্রেলিয়ার আবহাওয়ার গাণিতিক মডেল হিসেব করার জন্য যে সুপার-কম্পিউটার ব্যবহার করা হয় সেটা প্রতি সেকেন্ডে ১৬০০ ট্রিলিয়ন হিসেব করতে পারে।

পদার্থবিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠিত নিয়ম কাজে লাগিয়ে বিজ্ঞানীরা জলবায়ু পরিবর্তনের গাণিতিক মডেল তৈরি করেছেন। ষাটের দশকের সরল একমাত্রিক মডেল থেকে শুরু হয়ে ক্রমাগত উন্নত হতে হতে সেগুলি বর্তমানের সুপার কম্পিউটার প্রযুক্তির যুগে প্রায়-নিঁখুত বহুমাত্রিক মডেলে পরিণত হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের পূর্বাভাস দেয়ার কার্যকর মডেল তৈরিতে যুগান্তকারী ভূমিকা রেখেছেন আমেরিকার প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটির প্রফেসর সুকুরু মানাবে এবং জার্মানির ম্যাক্স প্লাংক ইন্সটিটিউট অব মেটিওরলজির প্রফেসর ক্লাউস হাসেলমান। এজন্য তাঁদেরকে ২০২১ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার দেয়া হয়েছে। কিন্তু এই পথে বিজ্ঞানীদের পদচারণা শুরু হয়েছিল অনেক অনেক বছর আগে।

আবহাওয়া কিংবা জলবায়ুর পূর্বাভাস দেয়ার কাজ প্রথম শুরু হয়েছিল প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে। খ্রিস্টপূর্ব ৫৮০ সালে গ্রিক দার্শনিক থেলিস পূর্ববর্তী বছরগুলির ফসলের পরিমাণ হিসেব করে আবহাওয়ার পূর্বাভাস দিয়েছিলেন। তবে সেই পূর্বাভাস ছিল অনেকটাই অভিজ্ঞতানির্ভর। এরপর খ্রিস্টপূর্ব ৩৫০ সালে অ্যারিস্টটল প্রথম বিজ্ঞানভিত্তিক আবহাওয়া-মডেল তৈরি করার চেষ্টা করেছিলেন। তিনি সূর্যের তাপে পানি বাষ্প হয়ে মেঘ তৈরি করার ব্যাপারে সঠিক ধারণা দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি বিশ্বাস করতেন যে পৃথিবীকে কেন্দ্র করে সূর্য ঘুরছে, এবং মহাবিশ্বের সবকিছুই আগুন, পানি, বাতাস আর মাটি দিয়ে তৈরি। ফলে তাঁর দেয়া ধারণাগুলি পরবর্তীতে পরিত্যক্ত হয়। কিন্তু অ্যারিস্টটলের হাতেই আবহাওয়াবিজ্ঞানের নামকরণ হয় ‘মেটিওরলজি’ যা এখনো ব্যবহৃত হচ্ছে। গ্রিক শব্দ ‘মেটিওরস’-এর অর্থ হলো আকাশের উপরে। সেই সময় আকাশ থেকে যা কিছু আকাশে থাকে বা আকাশ থেকে নেমে আসে – যেমন মেঘ, বৃষ্টি – সবকিছুকেই বলা হতো মেটিওর।

ফরাসি পদার্থবিজ্ঞানী জোসেফ ফুরিয়ার পৃথিবীর বায়ুমন্ডল উত্তপ্ত হওয়ার কারণ আবিষ্কার করেন আজ থেকে প্রায় দু’শ বছর আগে। তিনিই প্রথম ব্যাখ্যা করেছিলেন গ্রিনহাউজ ইফেক্টের ব্যাপারটা। সূর্যের আলো পৃথিবীর বায়ুমন্ডল ভেদ করে পৃথিবীতে এসে পৌঁছায়। এই আলোর বেশিরভাগ পৃথিবীপৃষ্ঠ শোষণ করে নেয়। এই শক্তি শোষণ করার পর পৃথিবীপৃষ্ঠ উত্তপ্ত হয়ে অতিরিক্ত শক্তি বিকিরণ পদ্ধতিতে বের করে দেয়। পৃথিবীপৃষ্ঠ থেকে যে শক্তি বেরিয়ে আসে – পৃথিবীর বায়ুমন্ডল সেটা শোষণ করে নেয়। ফলে বায়ুমন্ডলের তাপমাত্রা বেড়ে যায়। শক্তির আদান-প্রদানের এই পদ্ধতিতে একটা সূক্ষ্ম পরিবর্তন ঘটে। সূর্যের যে আলো পৃথিবীতে আসে – তার শক্তি অনেক বেশি। আলোর কোয়ান্টাম তত্ত্ব অনুযায়ী সেই আলোর কম্পাঙ্ক বেশি, তরঙ্গদৈর্ঘ্য কম। কম তরঙ্গদৈর্ঘ্যের কারণে আলো সহজেই পৃথিবীর বায়ুমন্ডল ভেদ করে পৃথিবীতে চলে আসতে পারে। কিন্তু ভূপৃষ্ঠ থেকে যে শক্তি নির্গত হয় – তা হয় তাপের আকারে। এই শক্তির তরঙ্গদৈর্ঘ্য বেশি, কম্পাঙ্ক কম। ফলে এগুলি পৃথিবীর বায়ুমন্ডল ভেদ করে মহাশূন্যের দিকে চলে যেতে পারে না, বায়ুমন্ডলে বাধা পেয়ে আবার পৃথিবীতেই ফিরে আসে। ফলে পৃথিবীর বায়ুমন্ডলের তাপমাত্রা বাড়তে থাকে। এই ব্যাপারটাই গ্রিনহাউজ ইফেক্ট। এই প্রক্রিয়াটি খুবই জটিল। অসংখ্য প্যারামিটার বা সূচক এখানে জড়িত। তার সবগুলিকে হিসেব করে একটা মডেলের আওতায় নিয়ে আসা সহজ নয়। বিজ্ঞানীরা বছরের পর বছর ধরে এই জটিল কাজটি করার চেষ্টা করছেন।

আবহাওয়ার গতিপ্রকৃতি বোঝার জন্য একমাত্রিক গাণিতিক মডেলে বাতাসের তাপমাত্রার পরিবর্তন, আর্দ্রতার পরিমাণ, বাতাসের বেগ, মেঘের ঘনত্ব ইত্যাদি প্যারামিটার যুক্ত করে পৃথিবীর জলভাগ ও স্থলভাগের সাথে এসবের পরিবর্তন কীভাবে ঘটে তার পদার্থবৈজ্ঞানিক হিসেবগুলি বিবেচনায় নেয়া হয়। এরকম একমাত্রিক মডেলে আবহাওয়া পরিবর্তনের সম্ভাবনার কথা বলা যায়, কিন্তু তাতে ফাঁক থেকে যায় অনেকখানি।

বাতাসে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার কারণে পৃথিবীর তাপমাত্রা বেড়ে যাচ্ছে – এরকম কথা আমরা প্রায়ই শুনি আজকাল। কথাটি সত্য। বাতাসে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পরিমাণের সাথে যে তাপমাত্রার পরিবর্তনের সরাসরি সম্পর্ক আছে তা প্রথম আবিষ্কার করেছিলেন সুইডেনের পদার্থবিজ্ঞানী সান্তে আরহেনিয়াস – একশ বছরেরও বেশি আগে উনিশ শতকের শেষের দিকে। ১৮৯৪ সালে আরহেনিয়াসের মডেল ছিল জলবায়ু পরিবর্তনের সর্বপ্রথম গাণিতিক মডেল। আরহেনিয়াস ১৯০৩ সালে রসায়নে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছিলেন। স্বাভাবিক বাতাসে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ শতকরা মাত্র ০.০৪৬ ভাগ, আর জলীয় বাষ্পের পরিমাণ শতকরা এক ভাগের মতো। ভূ-পৃষ্ঠ থেকে যে তাপ বের হয় তা বাতাসের এই জলীয় বাষ্প ও কার্বন-ডাই-অক্সাইড মিলে শোষণ করে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেয়। পৃথিবীতে প্রাণের উদ্ভব এবং জীবন ধারণের জন্য এই তাপ শোষণ প্রক্রিয়া খুবই দরকারি। কার্বন-ডাই-অক্সাইড ও জলীয়বাষ্প যদি তাপ শোষণ না করতো তাহলে পৃথিবীপৃষ্ঠের গড় তাপমাত্রা হতো মাইনাস আঠারো ডিগ্রি সেলসিয়াস। হিমাঙ্কের নিচে সেই তাপমাত্রায় প্রাণের উদ্ভব হয়তো হতোই না। আরহেনিয়াস তাঁর গাণিতিক মডেলের সাহায্যে হিসেব করে দেখিয়েছেন যে বাতাসের কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ যদি কমে গিয়ে অর্ধেক হয়ে যায়, তাতে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা পাঁচ থেকে ছয় ডিগ্রি কমে যেতে পারে। ফলে পৃথিবীতে আবার বরফ যুগ নেমে আসতে পারে। আবার কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বেড়ে গেলেও পৃথিবীর জলবায়ুর ব্যাপক পরিবর্তন ঘটবে। যার কিছু কিছু আমরা এখন দেখতে পাচ্ছি।

আমেরিকার ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোস্ফেরিক  অ্যাডমিনিস্ট্রেশানের আগের নাম ছিল ইউনাইটেড স্টেটস ওয়েদার ব্যুরো। এই ব্যুরোর জিওফিজিক্যাল ফ্লুইড ডায়নামিক্স ল্যাবোরেটরি (জিএফডিএল) জলবায়ুর একমাত্রিক মডেল উদ্ভাবন করেছিল ১৯৬০ সালের শুরুর দিকে। এই মডেল ছিল বিকিরণ ও পরিচলনের সাম্যাবস্থার সমীকরণের উপর ভিত্তি করে উদ্ভাবিত। জলবায়ুর পরিবর্তনে মূল ভূমিকা রাখে চার ধরনের তাপ বিনিময় প্রক্রিয়া। (১) সূর্য থেকে আলোর বিকিরণ পৃথিবীতে এসে পৌঁছায়। এই স্বল্প তরঙ্গদৈর্ঘ্যের বিকিরণ পৃথিবীপৃষ্ঠে শোষিত হয়। (২) এরপর তাপ আকারে সেই বিকিরণ পৃথিবী থেকে উপরের দিকে চলে যায়। তখন তার তরঙ্গদৈর্ঘ্য বেড়ে যায়। এই দীর্ঘ তরঙ্গদৈর্ঘ্যের বিকিরণ অনেকটুকুই বায়ুমন্ডলের নিচের স্তরের তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেয়। (৩) এরপর দেখা হয় পৃথিবীপৃষ্ঠ থেকে কতটুকু তাপ নির্গত হয়, এবং (৪) বাতাসের পরিচলন প্রক্রিয়ায় কতটুকু তাপ বায়ুমন্ডলে ছড়িয়ে পড়ে।

এই একমাত্রিক মডেলের প্যারামিটারের সাথে বাতাসের কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পরিবর্তনের ব্যাপারটা যোগ করে পদার্থবিজ্ঞানী স্যুকুরো মানাবে ১৯৬৭ সালে জলবায়ু পরিবর্তনের একমাত্রিক মডেলের একটি সরল পরীক্ষা বেশ সফলভাবে সম্পন্ন করেছিলেন। তিনি ভূপৃষ্ঠ থেকে চল্লিশ কিলোমিটার উঁচু একটি বায়ুস্তম্ভ ধরে এই পরীক্ষা চালিয়েছিলেন। পৃথিবীপৃষ্ঠ থেকে এই উচ্চতায় ওজোনস্তর। পৃথিবীপৃষ্ঠ থেকে যে তাপ বিকীর্ণ হয় তা এই স্তরেই শোষিত হয়ে বায়ুমন্ডলের উষ্ণতা বাড়িয়ে দেয়। স্যুকুরো মানাবে হিসেব করে দেখতে চাইলেন বাতাসে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পরিমাণের তারতম্য ঘটলে বায়ুমন্ডলের তাপমাত্রার কী পরিবর্তন ঘটে। সেই সময়ের কম্পিউটারের কয়েক শ ঘন্টা সময় লাগলো তাঁর মডেল দিয়ে পৃথিবীর বায়ুমন্ডলের তাপমাত্রার পরিবর্তন হিসেব করতে। কিন্তু হিসেবে যা দেখা গেলো তা অত্যন্ত দরকারি একটি হিসেব। বাতাসে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ যদি দ্বিগুণ হয়ে যায় – তাহলে পৃথিবীর বায়ুমন্ডলের গড় তাপমাত্রা দুই ডিগ্রি বেড়ে যাবে। ১৯৬৭ সালে মানাবে এই মডেল প্রকাশ করেন। এটা ছিল তাঁর একমাত্রিক মডেলের পরীক্ষা। পরবর্তী কয়েক বছরে তিনি তাঁর একমাত্রিক মডেলকে ত্রিমাত্রিক মডেলে রূপান্তরিত করে আরো অনেকগুলি পরীক্ষা করলেন। তাঁর ত্রিমাত্রিক মডেল প্রকাশিত হয় ১৯৭৫ সালে।

আমাদের প্রতিদিনের আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেয়ার জন্য যে মডেলটি অপরিহার্য সেটা হলো জেনারেল সার্কুলেশান মডেল বা জিসিএম। ১৯৫৬ সালে আমেরিকান পদার্থবিজ্ঞানী নরমান ফিলিপ্‌স প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্সটিটিউট ফর এডভান্সড স্টাডিজ-এ এই মডেলের সূচনা করেন। পদার্থবিজ্ঞানের মৌলিক সূত্র কাজে লাগিয়ে বায়ুমন্ডলের উপরের স্তর ও নিচের স্তরে বাতাসের গতিবেগ এবং তাপমাত্রার স্থানীয় পরিবর্তন হিসেব করা হয় এই মডেলে। ছোট ছোট ভৌগোলিক এলাকা ধরে নিয়ে সেখানে সৌরবিকিরণের পরিমাপ হিসেব করা হয় বিকিরণের সূত্র প্রয়োগ করে। বাতাসের গতিপ্রকৃতি হিসেব করার জন্য ব্যবহার করা হয় গতির সমীকরণ। তাপের বিকিরণ ও সঞ্চালন হিসেব করা হয় তাপগতিবিদ্যার সমীকরণ অনুসারে। বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিচলন হিসেব করা হয় তরল বা বায়বীয় পদার্থের ইকোয়েশান অব কন্টিনিউটি বা ধারাবাহিকতার সমীকরণ প্রয়োগে।

প্রথম জিসিএম-এর সাফল্যের পর পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের গবেষণাগারে এই মডেলকে স্থানীয়ভাবে আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেয়ার উপযোগী করে তোলা হয় নিজ নিজে দেশের আঞ্চলিক উপাত্তগুলি মডেলে প্রয়োগ করার পর। বর্তমানে কম্পিউটারের ব্যাপক শক্তিবৃদ্ধির সুযোগে এবং স্যাটেলাইটসহ অন্যান্য প্রযুক্তির সমন্বয়ে আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেয়ার মডেলগুলি এতটাই উন্নত হয়ে উঠেছে যে এখন আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনেক ক্ষেত্রেই অক্ষরে অক্ষরে ফলে যাচ্ছে।

 

তথ্যসূত্র:

১। সুকুরু মানাবে ও অ্যান্থনি ব্রকোলি, বিয়ন্ড গ্লোবাল ওয়ার্মিং হাউ নিউমেরিক্যাল মডেলস রিভিল্ড দ্য সিক্রেটস অব ক্লাইমেট চেঞ্জ’, প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটি প্রেস, ২০২০।

২। ক্যাথলিন সিয়ার্স, ওয়েদার ১০১, আদমস মিডিয়া, ২০০৮।

_________________

বিজ্ঞানচিন্তা এপ্রিল ২০২২ সংখ্যায় প্রকাশিত




Saturday, 21 May 2022

অস্ট্রেলিয়ার নির্বাচন ২০২২

 



অস্ট্রেলিয়ার ফেডারেল ইলেকশান হয়ে গেল একটু আগে। এখন ভোট গণনা শুরু হয়েছে। এ নিয়ে বেশ কয়েকটি নির্বাচনে ভোট দেয়া হয়ে গেলো এই দেশে। অস্ট্রেলিয়ার বেশির ভাগ নাগরিকের  মতোই আমারও রাজনীতির ব্যাপারে তেমন কোন আগ্রহ নেই। কিন্তু ভোট দেয়া এখানে বাধ্যতামূলক। তাই দিতে হয়। কিন্তু এদেশে নির্বাচনের ব্যাপারটা আমার কাছে খুবই খুশির ব্যাপার বলে মনে হয়। নাগরিক অধিকার বলে উচ্চকন্ঠ হতে দেখা যায় প্রায় সব দেশেই। কিন্তু নাগরিক দায়িত্বের ব্যাপারটা সেভাবে গুরুত্ব পায় না। এখানে নাগরিক দায়িত্বের ব্যাপারটাতে গুরুত্ব দেয়া হয়। এই দায়িত্ব পালন করা বাধ্যতামূলক।

এখানে ভোট দিতে গেলে যেসব ব্যাপার দেখে আমার আনন্দ লাগে সেগুলির মধ্যে আছে – ভোট কেন্দ্রের কোথাও কোন পুলিশ নেই, নির্বাচন কমিশননিযুক্ত নিরস্ত্র কর্মীরাই ভোট পরিচালনা করে, নির্বাচনী সহিংসতা নামক কোন ব্যাপার এখানে ঘটে না, ভোট দিয়েছি কি না প্রমাণ করার জন্য আঙুলে কোন কালি লাগানো হয় না –– একবার ভোট দিয়ে আরেকবার যে দিতে যাবে না সেই বিশ্বাসে নাগরিকের সততা ও দায়িত্বকে সম্মান করা হয় সবখানে, বেশিরভাগ কেন্দ্রেই কোন পরিচয়পত্রও দেখাতে হয় না; কেবল নাম-ঠিকানা বললেই হয়, এমপি পদে যে আসনে যতজন প্রার্থী হন – তাদের সবাইকেই ভোট দিতে হয় পছন্দ অনুসারে ১, ২, ৩ ইত্যাদি লিখে। অর্থাৎ প্রত্যেক প্রার্থীই ভোট পান – শুধু যিনি সবচেয়ে বেশি মানুষের প্রথম পছন্দ তিনিই জিতেন।

আর কয়েক ঘন্টা পরেই চূড়ান্ত হয়ে যাবে – বর্তমান প্রধানমন্ত্রী আবার দায়িত্বে আসবেন, নাকি লেবার পার্টি সরকার গঠন করবে। যেই করুক, অন্যদল তাকে অভিনন্দন জানিয়ে হাসিমুখে সরে যাবে।

ইন্টারন্যাশনাল বেস্ট প্র্যাকটিস বলে একটা ব্যাপার আছে। পৃথিবীর উন্নত ব্যবস্থাগুলিকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের ব্যবস্থাকে আরো উন্নত করার অবিরাম চেষ্টার নামই সত্যিকারের উন্নতি। অস্ট্রেলিয়ায় সরকারের মেয়াদ তিন বছর নির্ধারণ করা হয়েছে এজন্য যে দীর্ঘদিন দায়িত্বে থাকলে দায়িত্বে অবহেলার ভাব চলে আসে, দায়িত্বকে ক্ষমতা বলে ভাবতে শুরু করে। দুর্নীতিও হতে পারে। কম মেয়াদী হলে নির্বাচিতদের ভয় থাকে – কিছুদিন পরেই দায়িত্ব হারানোর। এদেশের রাজনীতিকরা জনগণকে সমীহ করেন, কারণ জনগণের ভোটেই আছে তাঁদের রাজনৈতিক ভবিষ্যত। এদেশে ক্ষমতার অপব্যবহার করলে, দুর্নীতি করলে – রাজনৈতিক দলগুলি তাদেরকে বহিস্কার করতে বাধ্য হয়। না হলে তাদের আবার নির্বাচিত হবার সম্ভাবনা শূন্য হয়ে যায়। দুর্নীতিবাজকে ভোটের মাধ্যমে উপড়ে ফেলার দায়িত্বটা তখন নাগরিকরাই নেয়।

আমার প্রশ্ন হলো এরকম একটা কল্যাণকর সমাজব্যবস্থা যদি অস্ট্রেলিয়া তৈরি করতে পারে, কানাডা পারে, ইওরোপের অনেক দেশ পারে – পৃথিবীর অনেকগুলি দেশ পারে না কেন?


Tuesday, 17 May 2022

নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী ভেঙ্কি রামকৃষ্ণন

 



আমাদের শরীরের মূল নক্‌শা বা ব্লু-প্রিন্ট থাকে আমাদের ডিএনএ-তে। বলা চলে শারীরিক কার্যাবলির সবকিছু নিয়ন্ত্রিত হয় মূলত ডিএনএ দ্বারা। এই ডিএনএ’র আণবিক গঠন আবিষ্কৃত হয়েছে বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি। ১৯৬২ সালে ফ্রান্সিস ক্রিক, জেম্‌স ওয়াটসন এবং মরিস উইলকিন্‌স চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন ডিএনএর গঠন আবিষ্কারের জন্য। ডিএনএর গঠন আবিষ্কারের পর জীবের শারীরবৃত্তিক কাজকর্মের গতিপ্রকৃতি নিঁখুতভাবে জানার অনেকগুলি পথ খুলে গেল।

শরীরের তথ্যনির্দেশ জমা থাকে জিনে। এই তথ্যনির্দেশ কার্যকর করার জন্য তথ্যগুলি কপি করে কোষের বাইরের অংশে পাঠানো হয়। সেখানে এগুলি প্রয়োজনীয় প্রোটিন তৈরির নির্দেশ দেয়। মূলত বিভিন্ন ধরনের প্রোটিন মিলে আমাদের শারীরিক কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ করে। এই তথ্য কপি করার ব্যাপারটাকে বলা হয় ট্রান্সক্রিপশান। ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জীবকোষ থেকে শুরু করে অতিকায়  ডায়নোসর – সব রকমের জীবনের জন্যই এই ট্রান্সক্রিপশান অপরিহার্য। ট্রান্সক্রিপশান বা তথ্যনির্দেশ যদি কোষের বাইরে আসতে না পারে বা কপি করা না হয়, তাহলে কোষগুলি বুঝতে পারে না কী করতে হবে। ফলে দেহের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে জীবকোষের মৃত্যু হয়। এই ট্রান্সক্রিপশানের সময় যদি কোন গন্ডগোল হয়, তবে কোষগুলির বাইরে ভুল তথ্যনির্দেশ চলে আসে। ফলে নানারকম রোগের উৎপত্তি হতে পারে, বিশেষ করে কোষঘটিত রোগ – যেমন ক্যান্সার।

এই ট্রান্সমিশান কীভাবে ঘটে তার পারমাণবিক পর্যায়ের নিখুঁত পদ্ধতি আবিষ্কার করে ২০০৬ সালে রসায়নে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন বিজ্ঞানী রজার কর্নবার্গ। ডিএনএর পাশাপাশি আমরা জেনেছি আরএনএর কথা। ডিএনএ-তে যেমন সিঁড়ির মতো পাশাপাশি দুটো স্ট্র্যান্ড থাকে, আরএনএতে থাকে একটি স্ট্র্যান্ড। প্রধানত তিন ধরনের আরএনএ পাওয়া যায় – ম্যাসেঞ্জার আরএনএ (এমআরএনএ), রাইবোজোমাল আরএনএ (আরআরএনএ), এবং ট্রান্সফার আরএনএ (টিআরএনএ)। রজার কর্নবার্গ আবিষ্কার করেছিলেন ডিএনএর তথ্যনির্দেশ কীভাবে এমআরএনএ-তে যায় যেখান থেকে কোষগুলি দরকারি প্রোটিন তৈরির নির্দেশ পায়।

তখনো পর্যন্ত আরআরএনএগুলি কীভাবে কাজ করে – অর্থাৎ রাইবোজোমের আণবিক গঠন নিঁখুতভাবে জানা সম্ভব হয়নি। রাইবোজোমকে বলা হয় জীবকোষের প্রোটিন তৈরির কারখানা। এই রাইবোজোমের কার্যপদ্ধতি হলো কোষের কাজগুলির মধ্যে সবচেয়ে জটিল কাজ। রাইবোজোম এই জটিল কাজগুলি কীভাবে করে তা আবিষ্কার করেছেন যে তিনজন বিজ্ঞানী – তাঁদের একজন হলেন ভেঙ্কটরামন রামকৃষ্ণন – যাকে পরিচিতরা সবাই ভেঙ্কি বলে ডাকেন।

রাইবোজোমের কার্যপ্রণালী আবিষ্কার করার জন্য ২০০৯ সালে রসায়নে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন অ্যাডা ইওনাথ, থমাস স্টিজ এবং ভেঙ্কটরামন রামকৃষ্ণন। তাঁদের আবিষ্কারের ফলেই শরীরের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম কাজকর্মের অনেক অজানা জটিল রহস্য উন্মোচিত হয়েছে। আমরা এখন জানি কীভাবে ডিএনএ/আরএনএ থেকে প্রোটিন তৈরির নির্দেশ আসে, এবং রাইবোজোম কীভাবে যথাসময়ে যথামাত্রায় যথাযথ প্রোটিন তৈরি করে। একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে আবিষ্কৃত এসব তথ্য কাজে লাগিয়ে তৈরি করা সম্ভব হয়েছে অনেক নতুন অ্যান্টি-বায়োটিক। সাম্প্রতিক করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে অতিদ্রুত ভ্যাক্সিন তৈরি করা সম্ভব হয়েছে রাইবোজোমের কাজকর্ম ভালোভাবে জানা ছিল বলেই।

পারমাণবিক পর্যায়ে গেলে পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, জীববিজ্ঞান – বিজ্ঞানের এরকম শাখাপ্রশাখার মধ্যে খুব বেশি বিভেদ থাকে না। রসায়নে নোবেলজয়ী এই বিজ্ঞানী ভেঙ্কি রামকৃষ্ণন ছিলেন তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞানী। পদার্থবিজ্ঞানে পিএইচডি করার পর তিনি জীববিজ্ঞানে গবেষণা শুরু করেছিলেন। সেখান থেকেই তিনি সাফল্যের চূড়ায় উঠেছেন, নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন। শুধু তাই নয়, তিনিই ছিলেন রয়েল সোসাইটির সাড়ে তিন শ বছরের ইতিহাসে প্রথম অশ্বেতাঙ্গ প্রেসিডেন্ট। 

বিজ্ঞানীদের সবচেয়ে বনেদী আর গৌরবজনক সংগঠন হলো লন্ডনের রয়েল সোসাইটি। ১৬৬২ সালে প্রতিষ্ঠিত এই সংগঠনের ফেলোশিপ পাওয়াটা বিজ্ঞানীদের জন্য খুবই গৌরবজনক ব্যাপার। স্যার আইজাক নিউটন, স্যার হামফ্রে ড্যাভি, থমাস হাক্সলি, লর্ড কেলভিন, লর্ড রেলে, আর্নেস্ট রাদারফোর্ড, উইলিয়াম ব্র্যাগ, প্যাট্রিক ব্ল্যাকেট প্রমুখ বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী যারা রয়েল সোসাইটির প্রেসিডেন্ট মনোনীত হয়েছিলেন, তাঁদের পাশে রয়েল সোসাইটির এপর্যন্ত একমাত্র প্রেসিডেন্ট স্যার ভেঙ্কটরামন রামকৃষ্ণন যার জন্ম আমাদের উপমহাদেশে।

ভেঙ্কটরামন রামকৃষ্ণন - ভেঙ্কির জন্ম তামিলনাড়ুর চিদাম্বরমে ১৯৫২ সালে। তাঁর বাবা সিভি রামকৃষ্ণন এবং মা রাজলক্ষ্মী – দু’জনই ছিলেন জীববিজ্ঞানের অধ্যাপক। ছোটবেলা থেকেই বিজ্ঞানের পরিমন্ডলে বড় হয়েছেন ভেঙ্কি। তাঁর জন্মের সময় তার বাবা আমেরিকার উইসকনসিনে পোস্টডক্টরেট গবেষণা করছিলেন। আর্থিক সামর্থ্যের অভাবে তিনি সন্তানসম্ভবা স্ত্রীকে তামিলনাড়ুতে রেখে গিয়েছিলেন। রাজলক্ষ্মীকে সাথে নিয়ে গেলে ভেঙ্কি জন্মসূত্রে আমেরিকান হতে পারতেন। বাবা পোস্টডক্টরেট করে ফিরে আসার পর মা গেলেন কানাডায় পিএইচডি করার জন্য। তখন বাবাও সাথে গেলেন দেড় বছরের ভেঙ্কিকে নানা-নানীর জিম্মায় রেখে। ফিরে আসার পর তারা চিদাম্বরম থেকে বরোদায় চলে গেলেন সেখানকার বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিয়ে।

বরোদায় ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলে লেখাপড়া শুরু হলো ভেঙ্কির। ১৯৫৯ সালে ভেঙ্কির ছোটবোন ললিতার জন্ম হয়। ১৯৬০-৬১ সালে বাবা-মায়ের অস্ট্রেলিয়ায় ফেলোশিপ নিয়ে আসার সুবাদে এক বছর অস্ট্রেলিয়ার এডেলেইডের স্কুলে পড়াশোনা করে ভেঙ্কি। আবার ভারতে ফিরে গিয়ে স্কুলের পড়াশোনা শেষ করলো। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে কী নিয়ে পড়াশোনা করবে স্থির করতে পারছিলেন না ভেঙ্কি। তাঁর বাবা চাচ্ছিলেন ছেলে ডাক্তার হোক। ডাক্তারিতে ভর্তির জন্য প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় টিকেছিল ভেঙ্কি। ইঞ্জিনিয়ারিং-এর চরম প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় টিকে আই-আই-টিতে ভর্তির জন্য মনোনীত হয়েছিলেন তিনি। কিন্তু মেডিকেল কলেজে পড়াশোনাটাকে খুব একটা আকর্ষণীয় মনে হলো না ভেঙ্কির কাছে- কারণ সেখানে অনেক জিনিস মুখস্থ করতে হয়। তাঁর কাছে মৌলিক বিজ্ঞানের পড়াশোনাকেই অনেক বেশি আকর্ষণীয় মনে হলো। সেইসময় মৌলিক বিজ্ঞানে পড়াশোনায় উৎসাহিত করার জন্য ভারত সরকার একটা আকর্ষণীয় বৃত্তি দিচ্ছিলো মেধাবী শিক্ষার্থীদের। ভেঙ্কি সেই বৃত্তি নিয়ে বরোদা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হলেন বিএসসি কোর্সে।

বিএসসি পাস করার পর তিনি আমেরিকার ওহাইও ইউনিভার্সিটিতে পদার্থবিজ্ঞানে পিএইচডি গবেষণা শুরু করলেন। দুই বছর কোর্সওয়ার্ক করার পর  অধ্যাপক তমোইয়াসু তানাকার তত্ত্বাবধানে সলিড-স্টেট ফিজিক্সের তত্ত্বীয় গবেষণা শুরু করলেন। কিন্তু গবেষণা শুরুর কিছুদিন পরেই মনে হলো তিনি ভুল বিষয়ে ভর্তি হয়েছেন। সায়েন্টিফিক আমেরিকানে জীববিজ্ঞানের নিত্যনতুন আবিষ্কারের কাহিনি পড়তে পড়তে ভেঙ্কির মনে হলো পদার্থবিজ্ঞানের আবিষ্কার হচ্ছে শামুকের গতিতে, কিন্তু জীববিজ্ঞানের নতুন নতুন আবিষ্কার হচ্ছে ব্যাঙের মতো লাফিয়ে লাফিয়ে। পদার্থবিজ্ঞানে কোন উত্তেজনাই পাচ্ছেন না তিনি। তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞানের দীর্ঘ জটিল সমীকরণ ও গাণিতিক হিসেবে তিনি কোন আনন্দ পাচ্ছিলেন না। কিন্তু অন্য কোন বিষয়ে যে চলে যাবেন সেই সুযোগও নেই। এই বিষয়ে তিন বছরের বেশি সময় ব্যয় করেছেন তিনি। যে জীববিজ্ঞানকে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার সময় অযৌক্তিক মুখস্থ করার বিষয় বলে মনে করেছিলেন, এখন মনে হচ্ছে সেখানেই আছে অনেক বেশি উত্তেজনার খোরাক।

গবেষণায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলার পর ভেঙ্কি পড়াশোনা বাদ দিয়ে হাইকিং করতে লাগলেন, গান শুনতে লাগলেন, দাবা খেলতে শুরু করলেন। ইচ্ছেমতো ঘুরে বেড়ানোর সময় তাঁর সাথে পরিচয় হলো ভেরা রোজেনবারির সাথে। ভেরা ফাইন আর্টসের ছাত্রী। পেইন্টিংস নিয়ে পড়াশোনা করছিলেন। সত্তরের দশকের শুরুতে ওহাইও বিশ্ববিদ্যালয়ে খুব বেশি নিরামিষভোজী ছিল না। ভেরা ছিলেন নিরামিষাশী, ভেঙ্কিও। তাঁদের মধ্যে বন্ধুত্ব হয়ে গেল। ক্রমে বন্ধুত্ব থেকে প্রেম। ভেরা ছিলেন ডিভোর্সি। তাঁর পাঁচ বছর বয়সী একটা মেয়েও আছে। ১৯৭৫ সালে তেইশ বছর বয়সী ভেঙ্কি তাঁর চেয়ে বয়সে বড় ভেরাকে বিয়ে করে ঘরসংসার শুরু করলেন। ভেঙ্কির পিএইচডি তখনো শেষ হয়নি। কোন উপার্জন নেই। ভেরা নিজের পড়াশোনার পাশাপাশি ছোটদের জন্য বই লিখতে শুরু করলেন। তাঁর ভেরা সিরিজের বইগুলি শিশুরা খুবই পছন্দ করে।

ঘরসংসার, স্ত্রী এবং সৎকন্যার দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে তিনি ইচ্ছের বিরুদ্ধেই পদার্থবিজ্ঞানে পিএইচডি শেষ করলেন। সেই সময় তাঁদের সন্তান রামনের জন্ম হয়। তিনি জীববিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করার ব্যাপারে মনস্থির করে ফেললেন। জীববিজ্ঞানের যেসব খুঁটিনাটি ব্যাপার নিয়ে তিনি জানতে আগ্রহী, তারজন্য সবচেয়ে ভালো হয় যদি ডাক্তারিতে ভর্তি হতে পারেন। ভারতে ডাক্তারি পড়ার সুযোগ পেয়েও পড়েননি। এখন আমেরিকায় পিএইচডি শেষ করার পর ডাক্তারি পড়ার জন্য ভর্তি পরীক্ষা দিলেন। এম-ক্যাটে অনেক ভালো ফলাফল করার পরেও তিনি কোন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডাক পেলেন না। ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয় মৌখিক সাক্ষাৎকারের জন্য ডেকেছিল। কিন্তু ভেঙ্কি যখন বললেন যে তিনি ডাক্তারি করবেন না, শুধুমাত্র শরীরের বিজ্ঞান সম্পর্কে ভালোভাবে জানার জন্য ডাক্তারি পড়তে চান, তাকে ভর্তি হবার সুযোগ দেয়া হলো না।

ডাক্তারিতে ভর্তি হতে ব্যর্থ হয়ে তিনি জীববিজ্ঞানে পিএইচডি করার জন্য দরখাস্ত করতে শুরু করলেন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিন্তু বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ই ফিজিক্সে পিএইচডি করা একজনকে আরেকটি পিএইচডি করার জন্য অনুমতি দিলো না। মাত্র তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় তাকে পিএইচডি কোর্সে ভর্তির অফার দিলো। তিনি ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া সান দিয়েগোতে ভর্তি হলেন। জীববিজ্ঞানের গবেষণার কোন নিয়মকানুন তিনি জানতেন না। সবকিছু একেবারে গোড়া থেকে শিখতে শুরু করলেন। পরের বছর গবেষণাগারে কীভাবে গবেষণা করতে হয় তা শিখে ফেলার পর তাঁর মনে হলো এবার তাঁর পিএইচডি থিসিস লেখার কোন দরকার নেই। তিনি সরাসরি জীববিজ্ঞানের গবেষণাই শুরু করতে পারেন।

ইয়েল ইউনিভার্সিটিতে অধ্যাপক পিটার মুরের সাথে রাইবোজোম সংক্রান্ত গবেষণা করার জন্য পোস্টডক্টরেট শুরু করলেন। বছরখানেক পোস্টডক গবেষণার পর তাঁর একটা স্থায়ী পদের দরকার হলো। কিন্তু পঞ্চাশটির অধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে দরখাস্ত করার পরেও কোন সাড়া পেলেন না। পদার্থবিজ্ঞান থেকে পিএইচডি করে জীববিজ্ঞানে গবেষণা করছেন এরকম কাউকে নিয়োগ দেবার ব্যাপারে কোন বিশ্ববিদ্যালয়ই খুব একটা আগ্রহী হলো না। শুধুমাত্র ওক রিজ ন্যাশনাল ল্যাবে একটি টেকনিশিয়ানের পদ পাওয়া গেল। সেখানে যোগ দিয়ে দেখলেন স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ খুব বেশি নেই সেখানে। কিছুদিন পরেই তাঁকে আবার চাকরি খোঁজায় মন দিতে হলো। ইয়েলে নিউট্রন স্ক্যাটারিং-এর মাধ্যমে রাইবোজোম সংক্রান্ত গবেষণা করছিলেন তিনি। সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ব্রুকহ্যাভেন ন্যাশনাল ল্যাবে তাঁর চাকরি হলো। ব্রুকহ্যাভেনে তিনি গবেষণার স্বাধীনতা পেলেন। রাইবোজোম সংক্রান্ত গবেষণার ফলাফলও পেতে শুরু করলো।

ব্রুকহ্যাভেনে স্থায়ী গবেষক পদে নিয়োগ পেলেন তিনি। পদার্থবিজ্ঞানের এক্স-রে ক্রিস্টালোগ্রাফির প্রয়োগে রাইবোজোমের আণবিক গঠন সম্পর্কে অনেক নতুন ফলাফল পাওয়া গেল। ভেঙ্কি এই ব্যাপারে আরো গভীরভাবে জানার জন্য তিনি ব্রুকহ্যাভেন থেকে ছুটি নিয়ে ১৯৯১ সালে ইংল্যান্ডের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের মলিকিউলার বায়োলজি ল্যাবে গেলেন। সেখানে তিনি বিজ্ঞানী জন ফিঞ্চের তত্ত্বাবধানে কাজ শুরু করলেন। এক বছর সেখানে গবেষণা করে তিনি রাইবোজোমাল প্রোটিনের ক্রিস্টালোগ্রাফির অনেক নতুন কিছু শিখলেন। ব্রুকহ্যাভেনে ফিরে তিনি শুধুমাত্র ক্রিস্টালোগ্রাফি ও রাইবোজোম নিয়ে গবেষণা করতে চাইলেন। কিন্তু আকাঙ্খিত স্বাধীনতা পেলেন না। তিনি অন্য জায়গায় চলে যাবার সিদ্ধান্ত নিলেন।

ভেঙ্কি যোগ দিলেন উটাহ্‌ ইউনিভার্সিটির বায়োকেমিস্ট্রি ডিপার্টমেন্টে। সেখানেই তিনি রাইবোজোমের বেশ কয়েকটি প্রোটিনের গঠন আবিষ্কার করলেন। তিনি দেখলেন এ কাজে প্রচুর ফান্ডিং দরকার। উটাহ বিশ্ববিদ্যালয়ে সেটা অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা ক্ষীণ। ভবিষ্যত চিন্তা করে তিনি ইংল্যান্ডের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করার সিদ্ধান্ত নিলেন। আমেরিকান ভেঙ্কি চলে এলেন ইংল্যান্ডে। সেখানেই তিনি রাইবোজোমের সাবইউনিট 30S এর আণবিক গঠন নির্ণয়ের মূল গবেষণা শুরু করেন।

সেই সময় একই বিষয়ে ইসরায়েলে গবেষণা করছিলেন অ্যাডা ইয়োনাথ। এক ধরনের প্রতিযোগিতা শুরু হলো ভেঙ্কি ও অ্যাডার মধ্যে। ভেঙ্কি ক্রিস্টালোগ্রাফির সবচেয়ে সূক্ষ্ম পরীক্ষা করার জন্য চলে গেলেন আমেরিকার আর্গন ন্যাশনাল ল্যাবের এডভান্সড ফোটন সোর্স ফ্যাসিলিটিতে। ভেঙ্কি তাঁর গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করলেন ২০০০ সালে। এই কাজের জন্য ২০০৯ সালের রসায়নে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন ভেঙ্কি। রাইবোজোমের আণবিক গঠন আবিষ্কারের জন্য ভেঙ্কির সাথে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন অ্যাডা ইয়োনাথ এবং ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্ট্রাকচারাল বায়োলজিস্ট থমাস স্টিজ।

এপর্যন্ত মাত্র পাঁচজন বিজ্ঞানী নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন আমাদের উপমহাদেশ থেকে। সিভি রামন, হরগোবিন্দ খোরানা, আবদুস সালাম, চন্দ্রশেখর সুব্রাহ্মনিয়ানের পর  ভেঙ্কি রামকৃষ্ণন। ভেঙ্কির আবিষ্কারের প্রয়োগ সুদুরপ্রসারী। তাঁর আবিষ্কারের ফলে এখন আরো অনেক শক্তিশালী এবং কার্যকর অ্যান্টিবায়োটিক তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে।

ভেঙ্কি রামকৃষ্ণনকে ব্রিটিশ নাগরিকত্বও দেয়া হয়। ব্রিটিশ সরকার তাঁকে নাইট উপাধি দেয় ২০১২ সালে। যদিও ভেঙ্কি কখনো ‘স্যার’ উপাধি ব্যবহার করেননি। ২০১০ সালে তাঁকে ভারত সরকার পদ্মবিভূষণ উপাধিতে সম্মানিত করে। ২০১৫ সালে ভেঙ্কি রয়েল সোসাইটির প্রেসিডেন্ট মনোনীত হন। ২০২০ সাল পর্যন্ত তিনি সম্মানের সাথে এই দায়িত্ব পালন করেন। করোনা মহামারির সময়ে কোভিড ভ্যাক্সিন উদ্ভাবন ও উদ্বুদ্ধকরণে ভেঙ্কি রামকৃষ্ণন উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন।

তথ্যসূত্র:

ভেঙ্কটরামন রামকৃষ্ণন, ফ্রম চিদাম্বরম টু কেমব্রিজ – এ লাইফ ইন সায়েন্স ২০০৯; পিএনএএস সেপ্টেম্বর ২০, ২০১১।

_______________

বিজ্ঞানচিন্তা মার্চ ২০২২ সংখ্যায় প্রকাশিত







চেতন ভগতের 400 Days

 



ইংরেজি ভাষায় যে ক’জন ভারতীয় লেখক উপন্যাস লিখে জনপ্রিয়তা পেয়েছেন – চেতন ভগত তাঁদের অন্যতম। শুধুমাত্র অন্যতম বললে কম বলা হবে, চেতন ভগতের লেখা সবগুলি উপন্যাস খুবই পাঠকপ্রিয় হয়েছে। কোন্‌ বই কতটা ভালো লেগেছে পাঠকের – তা বিচারের প্রধান মাপকাঠি হলো সেই বইয়ের কত কপি বিক্রি হয়েছে। চেতন ভগতের প্রতিটি বই বিক্রি হয় দশ লক্ষ কপিরও বেশি। সে তো গেলো মূল ইংরেজিতে। অন্যান্য ভাষাতেও তাঁর বইয়ের বৈধ-অবৈধ অনেক অনুবাদ হচ্ছে। বৈধ অনুবাদ হচ্ছে মূল লেখক এবং/অথবা মূল প্রকাশকের অনুমোদিত অনুবাদ, আর অবৈধ অনুবাদ হচ্ছে – যে অনুবাদের কথা লেখক/প্রকাশক জানেনও না।

চেতন ভগতের লেখা কেন এত মানুষের ভালো লাগছে? তাঁর লেখার সাহিত্যমূল্য কোন স্তরের? এই প্রশ্নের উত্তর দেয়া সহজ নয়। কারণ গল্প-উপন্যাসের মান বিচার করার ব্যাপারটা বস্তুনিষ্ঠ নয়। একেকজনের ভালো লাগার কারণ একেক রকম। নোবেল পুরষ্কার প্রাপ্ত সাহিত্যিকের লেখাও যে সবার ভালো লাগবে তার কোন নিশ্চয়তা নেই।

আর কে নারায়ণের প্রত্যেকটি উপন্যাস কালোত্তীর্ণ, কিন্তু সেভাবে জনপ্রিয় নয়। জনপ্রিয় হবার উপাদান চেতন ভগত খুব ভালো করেই জানেন কীভাবে পাঠকপ্রিয় হওয়া যায়। তাঁর লেখার ভাষা, ঘটনার বর্ণনা, সংলাপ পড়ার সময় মনে হয় বই নয়, সিনেমা পড়ছি। সিনেমার বিজ্ঞাপনের মতো করেই তিনি তাঁর বই প্রকাশের আগে বইয়ের বিজ্ঞাপন প্রচার করেন।

চেতন ভগতের সবগুলি বই থেকেই সিনেমা তৈরি হয়েছে এবং হচ্ছে। তিনি নিজেও সিনেমার চিত্রনাট্য লেখেন। তাঁর প্রথম বই Five Point Someone অবলম্বনে আমির খানের বিখ্যাত সিনেমা Three Idiots তৈরি হলেও সেই সিনেমাতে চেতন ভগতকে সেভাবে স্বীকৃতি দেয়া হয়নি। তারপর থেকে তিনি অনেক বেশি সতর্ক। নিজে সরাসরি যুক্ত থাকেন চিত্রনাট্য তৈরিতে।

তার উপন্যাসগুলির লক্ষ্য থাকে ইংরেজিপড়ুয়া তরুণ উচ্চমধ্যবিত্ত এবং উচ্চবিত্ত পাঠকদের মন জয় করা। আধুনিক প্রেম, যৌনতা, এবং ভারতীয় তরুণরা যেসব  সমস্যার সামনে প্রায় প্রতিদিন পড়ে – সেগুলিকেই তুলে আনেন কাহিনি-বিন্যাসে, বর্ণনায় এবং সংলাপে।

তাঁর সাম্প্রতিক বইগুলি সরাসরি থ্রিলার। The girl in room 105, One arranged murder, এবং 400 days  - রোমাঞ্চকর থ্রিলার গোত্রের। কেশব আর সৌরভ – দুই বন্ধু – গোয়েন্দা। অপেশাদার গোয়েন্দা। এদেরকে দিয়েই জটিল রহস্যের সমাধান করিয়ে নিচ্ছেন চেতন ভগত। কেশবের জবানীতেই ঘটনা এগোয়।

400 days এর কাহিনি আবর্তিত হয়েছে একটি বারো বছরের মেয়ের অপহরণের ঘটনাকে কেন্দ্র করে। দাদাবাড়ির নিরাপদ বাড়ি থেকে রাতের বেলা উধাও হয়ে যায় আলিয়া-মনীশ দম্পতির বারো বছর বয়সী কন্যা সিয়া। রাতের বেলা নিজের ছোট বোন সুহানা আর চাচাতো ভাইদের সাথে এক রুমে ঘুমিয়েছিল সিয়া। কিন্তু সকালে দেখা গেলো সিয়া উধাও। কেউ জানে না সে কোথায়। কেবল সুহানা বললো রাতে কেউ একজন এসে ছুরি দেখিয়ে সিয়াকে নিয়ে গেছে। সুহানার বয়স মাত্র পাঁচ। সে ঘুমের ঘোরে কী দেখেছে ঠিকমতো বলতেও পারে না। আলিয়া-মনীশ অত্যন্ত ধনী ব্যবসায়ী। টাকা-পয়সা প্রভাব-প্রতিপত্তির অভাব নেই। কিন্তু পুলিশ-গোয়েন্দা কেউই কিছু করতে পারলো না। ধরে নেয়া হয় যে সিয়াকে মেরে ফেলা হয়েছে। সবাই হাল ছেড়ে দিলেও সিয়ার মা আলিয়া হাল ছেড়ে দেয় না। আলিয়া মেয়ের খোঁজ করার জন্য কেশব আর সৌরভের সাহায্য চায়। মূলত কেশবেরই সাহায্য চায়। কেশব সৌরভকেও কাজে লাগায়।

প্রচলিত গোয়েন্দা-কাহিনীর চেয়ে চেতন ভগতের স্টাইল কিছুটা ভিন্ন। এখানে আলিয়া ও মনীশের প্রেম-কাহিনীর বিশদ বিবরণ আছে। আবার কেশব আর আলিয়াও পরস্পর প্রেমে পড়ে যায়। এই প্রেম ভারতীয় রক্ষণশীল টাইপের প্রেম নয়। উদ্দাম ইওরোপিয়ান স্টাইলের প্রেম – যেখানে মনের সাথে, অনেকটা মনের আগেও শরীর এগোয়। শরীরের ব্যাপারে কোন ধরনের জড়তা দেখা যায় না চেতন ভগতের নায়ক-নায়িকাদের। সে রক্ষণশীল মধ্যবিত্ত সতেরো বছরের মেয়ে আলিয়া হোক – কিংবা ত্রিশ বছরের গৃহবধূ আলিয়া হোক।

তবে এখানেও আছে প্রচলিত পদ্ধতি – কেউই সন্দেহের উর্ধ্বে নয়, আবার শেষপর্যন্ত দেখা যায় – যার দিকে সন্দেহের তীর কম ছোড়া হয়েছে সে-ই দোষী। তবে ভারতীয় পুলিশকে যেরকম অদক্ষ প্রমাণ করা হয়েছে – জানি না এত বাস্তব সমস্যার সমাধান তারা কীভাবে করেন।

চেতন ভগতের লেখা পাঠককে টেনে রাখে এটাই সবচেয়ে বড় গুণ তাঁর লেখার। আর কোন নতুন কারণ খুঁজে পাচ্ছি না। 400 Days স্বতন্ত্র কিছু নয়, রহস্যও আহামরি রকমের কোন বৈশিষ্ট্যপূর্ণ নয়। কিন্তু তাঁর ভাষা চমৎকার। অহেতুক বর্ণনার বাহুল্য নেই। সেন্স অব হিউমার অসাধারণ।

কিন্তু গল্পের বিচার করলে বলতে হয় - আজকাল ভালো গোয়েন্দা গল্পের অভাব দেখা দিয়েছে, নাকি গোয়েন্দাগল্প বেশি পড়ার কুফল বুঝতে পারছি না। 



Wednesday, 11 May 2022

মন্ত্রীত্ব এবং সারমেয় সমাচার

 


আচ্ছা, আপনি কাসুন্দি চিনেন? খেয়েছেন কখনো? আমি খাইনি, চিনিও না। বাংলা একাডেমির ব্যবহারিক বাংলা অভিধানে দেখলাম কাসুন্দি হলো সরিষার তৈরি আচার বিশেষ। কাসুন্দি পুরনো হলে কী হয়? ঝাঁজ কমে যায়? নাকি স্বাদ চলে যায়? নিশ্চয় কিছু একটা হয়, নইলে পুরনো কাসুন্দির কথা আসতো কোত্থেকে। পুরনো কাসুন্দি বলতে কী বোঝায় তা আমরা জানি।

তাহলে একটু পুরনো কাসুন্দি ঘাঁটা যাক। পাঁচ-ছয় বছরের পুরনো কথা। অস্ট্রেলিয়া দেশের ভিক্টোরিয়া রাজ্যের প্রভাবশালী মন্ত্রী ছিলেন স্টিভ হারবার্ট। ট্রেনিং অ্যান্ড স্কিলস মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব ছিল তাঁর। বড়ই সুখে-শান্তিতে-মন্ত্রীত্বে দিন কাটছিলো তাঁর। কিন্তু একদিন তাঁর মন্ত্রীত্ব চলে গেল। কী অপরাধ? তিনি তাঁর সরকারি গাড়িতে তাঁর দুটো পোষা কুকুরকে চড়িয়েছেন। জি, এটাই অপরাধ। আপনি হাসছেন? সে আপনি হাসতে পারেন, কিন্তু অস্ট্রেলিয়ানদের কাছে এই ব্যাপারটি হাস্যকর ছিল না মোটেও। তারা বিশ্বাস করে মন্ত্রীদের সরকারি গাড়ি দেয়া হয় সরকারি কাজে ব্যবহারের জন্য। নিজের পরিবারের লোকজন কিংবা পোষা সারমেয়কে চড়াবার জন্য নয়।


এই কুকুরদুটোকে গাড়িতে চড়াবার কারণেই স্টিভ হারবার্টের মন্ত্রীত্ব চলে যায়



সাংবাদিকরা এই খবর হৈ হৈ করে প্রচার করলো। বিরোধীদল সংসদে ঝড় তুললো এই ইস্যুতে। মন্ত্রীর বাড়ি হলো পার্কডেলে। সেখান থেকে ট্রেনথাম-এ তার ছুটি কাটানোর বাড়ির দূরত্ব প্রায় এক শ কিলোমিটার। এই এক শ কিলোমিটার ভ্রমণের জন্য সারমেয়দের পেছনে জনগণের ট্যাক্সের পয়সা খরচ হয়েছে ১৯২ ডলার ৮০ সেন্ট। মন্ত্রী সেই পরিমাণ ডলার নিজের পকেট থেকে সরকারি কোষাগারে জমা দিয়ে অসংখ্যবার ক্ষমা চাওয়ার পরেও ক্ষমা পাননি। তাঁকে পদত্যাগ করতে হয়েছে। কারণ তিনি সরকারি সম্পদের অপব্যবহার করেছেন।

মন্ত্রী বললেই আমরা যেরকম এলাহী ব্যাপার, অফুরন্ত ক্ষমতা বলে মনে করি – অস্ট্রেলিয়ার মন্ত্রীদের কিংবা তাঁদের আত্মীয়স্বজনের সেই সুখ নেই। ক্ষমতার আসল মজা তো তার অবৈধ ব্যবহারে। ক্ষমতার অপব্যবহারই যদি করা না যায়, তাহলে ক্ষমতার আর মূল্য কী??

এই পুরনো কাসুন্দির সাথে অন্য কোন দেশের মন্ত্রীর কিংবা তাদের স্ত্রীর কিংবা তাদের আত্মীয়স্বজনের কিংবা তাদের সারমেয়দের পুরনো কিংবা নতুন কোন কাসুন্দিরই কোন সম্পর্ক নেই।

অস্ট্রেলিয়ান সংবাদপত্রে প্রকাশিত লিংক:

দ্য এজ



Monday, 25 April 2022

নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী হরগোবিন্দ খোরানা



রোগনির্ণয় ও চিকিৎসার বিজ্ঞান যে মূলত পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন ও জীববিজ্ঞানের সমন্বিত রূপ তা এখন আমরা সবাই জানি। আমাদের জীবনের মূলসুর ডিএনএ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এই ডিএনএ’র কার্যকলাপ বিষদভাবে গবেষণা করা হয় বিজ্ঞানের যে শাখায় – তার নাম মলিকিউলার বায়োলজি বা আণবিক জীববিজ্ঞান। এই আণবিক জীববিজ্ঞানের অগ্রদূত ছিলেন আমাদের উপমহাদেশের সন্তান হরগোবিন্দ খোরানা।

জীবকোষের রসায়ন খুবই জটিল। প্রাণ রসায়ন বা বায়োকেমিস্ট্রি বিজ্ঞানের আলাদা শাখা হিসেবে দ্রুত প্রসারিত হতে শুরু করেছে বিংশ শতাব্দীর শেষার্ধ থেকে। কিন্তু তার মূলে যে রাসায়নিক জীববিজ্ঞান বা কেমিক্যাল বায়োলজি, সেই কেমিক্যাল বায়োলজির প্রধান স্থপতি ছিলেন হরগোবিন্দ খোরানা। তিনিই প্রথম ডিএনএর জিনেটিক কোড সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করার পদ্ধতি আবিষ্কার করেছিলেন। এই আবিষ্কারের ফলে চিকিৎসাবিজ্ঞানের নতুন দিগন্ত খুলে গিয়েছে। এই আবিষ্কারের হাত ধরেই পরবর্তীতে আবিষ্কৃত হয়েছে অসংখ্য জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসাপদ্ধতি, ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়ার শনাক্তকরণ পদ্ধতি, বংশগতিবিদ্যা, জিনঘটিত রোগনির্ণয় ও চিকিৎসা এবং এসংক্রান্ত অসংখ্য কারিগরি পদ্ধতি - বায়োটেকনোলজি। ডিএনএর কোড ব্যাখ্যা করার সঠিক পদ্ধতি আবিষ্কারের জন্য ১৯৬৮ সালে চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন বিজ্ঞানী হরগোবিন্দ খোরানা, যার জন্ম এবং বেড়ে ওঠা তদানীন্তন ব্রিটিশ ভারতের এমন একটি প্রত্যন্ত গ্রামে – যেখানে একটি প্রাইমারি স্কুল পর্যন্ত ছিল না, শৈশবে গাছতলায় বসে যাকে শিখতে হয়েছিল বর্ণমালা।

ব্রিটিশ ভারতের অধীনে পাঞ্জাবের ছোট্ট একটি গ্রাম রায়পুর। এই গ্রামটি এতই ছোট যে তখনকার ভারতীয় ম্যাপে এর কোন অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া যেতো না। মাত্র শ খানেক মানুষের বাস ছিল এই গ্রামে। গ্রামের সবাই নিরক্ষর কৃষিজীবী। শুধুমাত্র একজন ব্যক্তি ছিলেন কিছুটা অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন, সাধারণ যোগ-বিয়োগের হিসাব যিনি জানতেন। ব্রিটিশ সরকার এই মানুষটিকে গ্রামের চাষীদের কাছ থেকে খাজনা আদায় করার জন্য জমি রেজিস্ট্রি করার কাজে নিয়োগ করেছিলেন। এই পেশাটার নাম ছিল পাটোয়ারি। খোরানা পদবির এই দরিদ্র পাটোয়ারির এক মেয়ে ও চার ছেলের মধ্যে সবচেয়ে ছোট হরগোবিন্দ খোরানা। অক্ষরজ্ঞান ছিল বলে বলা চলে খোরানা পরিবারই ছিল সেই গ্রামের একমাত্র শিক্ষিত পরিবার।

গ্রামে কোন স্কুল ছিল না। তবুও হরগোবিন্দর বাবা চেয়েছিলেন তাঁর ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া শিখুক। লেখাপড়া না শিখে হালচাষ করে জীবননির্বাহ করা ভীষণ কষ্টের তা তিনি প্রতিদিনই দেখছেন চাষীদের কাছ থেকে খাজনা আদায় করতে গিয়ে। ইংরেজের রাজত্বে লেখাপড়া জানলে কেরানির চাকরি হলেও জুটবে। এই বিশ্বাসে তিনি নিজেই ছেলেমেয়েদের হাতেখড়ি দিলেন, অক্ষরজ্ঞান দিলেন গ্রামের এক গাছতলায় বসে নিজের কাজের ফাঁকে ফাঁকে।

সেই সময় জন্মনিবন্ধনের কোন ব্যবস্থা ছিল না। কোন প্রাতিষ্ঠানিক স্কুলে প্রাথমিক পড়াশোনা শুরু হয়নি বলে সঠিক জন্মতারিখের কোন হিসেব ছিল না হরগোবিন্দর। একটু বড় হতেই গ্রামের গাছতলার পড়াশোনা শেষ হয়ে গেল। সবচেয়ে কাছে যে হাইস্কুলটি আছে সেটা মুলতান শহরে। বাড়ি থেকে অনেক দূরে সেই স্কুল। কয়েক ঘন্টার হাঁটা পথ, গরুর গাড়িতেও লাগে অনেকক্ষণ। দিনের মধ্যে কয়েকঘণ্টা যায় পথে পথে। তবুও লেখাপড়ার প্রতি আকর্ষণের কাছে পথের কষ্ট কিছুই না। মুলতান স্কুলে ভর্তি হবার সময় জন্মতারিখের দরকার পড়লো। অনেক হিসেব করে জন্মতারিখ দেয়া হলো ১৯২২ সালের ৯ জানুয়ারি। তখন থেকে এই তারিখটিই হরগোবিন্দ খোরানার জন্মতারিখ হিসেবে বিবেচিত হলো।

মুলতান স্কুলে কিছুটা হলেও শহুরে ভাব আছে। স্কুলের শিক্ষকরা ভালো ছাত্রদের পেছনে প্রচুর সময় দেন। বিজ্ঞানের শিক্ষক রতনলালের উৎসাহে বিজ্ঞান বিষয়ের প্রতি গভীর আকর্ষণ অনুভব করতে শুরু করলো বালক হরগোবিন্দ। আবার ইংরেজি সাহিত্যের প্রতিও তার সমান আকর্ষণ। স্কুলের লাইব্রেরি থেকে পড়ে ফেলেছে জর্জ বার্নাড শ’র রচনা। মনে মনে ইচ্ছে তৈরি হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যে পড়াশোনা করার।

উচ্চমাধ্যমিকের সমতুল্য ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষা পাস করার পর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য যেতে হলো পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ে। ভর্তির জন্য দুইটি বিভাগে দরখাস্ত করেছিলেন হরগোবিন্দ খোরানা। তাঁর প্রথম পছন্দ ছিল ইংরেজি সাহিত্য, দ্বিতীয় পছন্দ রসায়ন। কিন্তু ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হতে গেলে একটি ইন্টারভিউ দিতে হয়। শিক্ষকদের মুখোমুখি হয়ে মৌখিক পরীক্ষা দেবার ব্যাপারে ভীষণ সংকোচ লাগছিল হরগোবিন্দর। তিনি মৌখিক পরীক্ষা দিতে গেলেন না। রসায়নে ভর্তির জন্য কোন ভর্তিপরীক্ষা দরকার হয়নি বলে তিনি রসায়নেই ভর্তি হলেন। পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়নে এমএসসি ডিগ্রি লাভ করলেন ১৯৪৫ সালে।

পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি যে খুব অস্বাভাবিক ভালো কোন রেজাল্ট করেছিলেন তা নয়। অন্য দশজন স্বাভাবিক ভালো ছাত্রের মতোই ছিল তাঁর রেজাল্ট। তবে সেই সময় উচ্চতর ডিগ্রি লাভের উদ্দেশ্যে ইংল্যান্ডে গিয়ে পড়াশোনা করার জন্য ভারতীয় ছাত্রদের মধ্যে খুব একটা প্রতিযোগিতা ছিল না।  একটু ভালো রেজাল্ট করে আবেদন করলে ব্রিটিশ সরকারের বৃত্তি পাওয়া যেতো। ভারতে তখন স্বাধীনতার আন্দোলন চলছে। ব্রিটিশদের হাত থেকে ভারতকে মুক্ত করার জন্য স্বদেশী আন্দোলন তখন তুঙ্গে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সবে শেষ হয়েছে। যুদ্ধে জয়লাভ করলেই ব্রিটিশ সরকারের অর্থনৈতিক অবস্থা তখন খুব খারাপ। ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে সম্মানজনকভাবে বিদায় নেবার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে ভেতরে ভেতরে। ইংরেজ বিদায় নেবার পর ভারতীয়রা যেন ঠিকমতো দেশ গঠন করতে পারে সেজন্য কিছু প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। ভারতীয় ছাত্রদের জন্য বিজ্ঞান ও কারিগরি ক্ষেত্রে দক্ষতা অর্জনের জন্য কিছু বৃত্তির ব্যবস্থা করা হয়েছে। সেই বৃত্তিপ্রকল্পের আওতায় কৃষি মন্ত্রনালয়ের অধীনে প্রশিক্ষণলাভের বৃত্তির জন্য মনোনীত হলেন হরগোবিন্দ খোরানা। ঠিক হলো তাঁকে ইংল্যান্ডের ইন্সটিটিউট অব বার্কশায়ারে পাঠানো হবে কীটনাশক ও ছত্রাকনাশক বিষয়ে প্রশিক্ষণ লাভ করে ভারতে ফিরে এসে কৃষিউন্নয়নে ভূমিকা রাখার জন্য।

বৃত্তির চিঠি পেয়ে সব ব্যবস্থা সম্পন্ন করে ১৯৪৫ সালে ইংল্যান্ডে পৌঁছালেন হরগোবিন্দ খোরানা। চিঠি নিয়ে লন্ডনের ইন্ডিয়ান হাই কমিশনারের অফিসে যাবার পর জানতে পারলেন বার্কশায়ার ইন্সটিটিউটে তাঁর জন্য যে বৃত্তিটা ঠিক করা হয়েছিল তা বাতিল হয়ে গেছে। তার বদলে তাঁকে অন্য একটি বৃত্তি দেয়া হয়েছে – লিভারপুল বিশ্ববিদ্যালয়ে জৈবরসায়নে পিএইচডি করার জন্য। হরগোবিন্দ খোরানা জানতেনই না যে তিনি জৈবরসায়নে পিএইচডি করবেন। অথচ এখান থেকেই শুরু হলো হরগোবিন্দ খোরানার গবেষণাজীবন।

লিভারপুল বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন বিভাগে সদ্য যোগ দেয়া প্রফেসর রজার বিয়ারের অধীনে পিএইচডি গবেষণা শুরু করলেন খোরানা। ইংরেজরা হরগোবিন্দ উচ্চারণ করতে পারে না বলে হরগোবিন্দ হয়ে গেলেন – গোবিন্দ্‌। অ্যালকালয়েড সিন্থেসিস বা ক্ষারক সংশ্লেষণ এবং মেলানিন সম্পর্কিত গবেষণা করে ১৯৪৮ সালে পিএইচডি অর্জন করলেন খোরানা।

বৃত্তির শর্ত ছিল পিএইচডি শেষ করে তিনি নিজের দেশে ফিরে যাবেন। কিন্তু কোথায় নিজের দেশ? ১৯৪৫ সালে তাঁর গ্রাম রায়পুর থেকে তিনি এসেছিলেন ইংল্যান্ডে। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর সেই রায়পুর পড়েছে পশ্চিম পাকিস্তানে। পাঞ্জাবে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় প্রাণ হারিয়েছে কয়েক হাজার মানুষ। খোরানার পরিবারের সবাই উদ্বাস্তু হয়ে দিল্লিতে উদ্বাস্তু শিবিরে আশ্রয় নিয়েছে। তাঁর অনেক আত্মীয়স্বজন প্রাণ হারিয়েছে দাঙ্গায়। এই অবস্থায় খোরানা কোথায় ফিরবেন? ধর্মের ভিত্তিতে যখন দেশ ভাগ হয়েছে, ফিরতে হলে খোরানাকে ভারতেই ফিরতে হবে। তাঁর জন্মভূমিতে তিনি আর ফিরতে পারবেন না, অন্তত এখন নয়।

ভারতে এখনি ফিরে না গিয়ে ইওরোপের জার্মান ভাষাভাষী কোন দেশে পরবর্তী এক বছর পোস্ট ডক্টরেট করার ইচ্ছে প্রকাশ করে তিনি ভারত সরকারের কাছে চিঠি লিখলেন। ভারতে তখন দেশ গঠনের জন্য লোক দরকার। এই অবস্থায় পোস্টডক্টরেট করার জন্য খরচ দেয়া ভারতের পক্ষে সম্ভব নয়। খোরানার দরখাস্ত মঞ্জুর হলো না। কিন্তু তাতেও খোরানার সিদ্ধান্ত বদলালো না। তিনি সুইজারল্যান্ডের জুরিখে চলে গেলেন প্রফেসর ভ্লাদিমির প্রিলোগের অধীনে গবেষণা করার জন্য।

দেশভাগ ছাড়াও সেই সময় ভারতে ফিরে না আসার আরো একটি কারণ ছিল খোরানার। ১৯৪৭ সালে পিএইচডি ছাত্র হিসেবে খোরানা প্রাগে গিয়েছিলেন যুবছাত্রদের ওয়ার্লড কংগ্রেসে যোগ দেয়ার জন্য। সেখানে তাঁর সাথে পরিচয় সুইশ তরুণী এস্থার সিলবারের সাথে। পরিচয় থেকে ভালো লাগা, ক্রমে ভালোবাসা। এস্থারের কাছাকাছি থাকাটাও তাঁর জুরিখে থাকার অন্যতম কারণ।

সেই সময়টা তাঁর জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ অথচ কষ্টকর ছিল। কোন ধরনের স্কলারশিপ ছাড়া, ভাতা ছাড়া তিনি ভ্লাদিমির প্রিলোগের ল্যাবে কাজ শুরু করলেন। প্রিলোগ তখন প্রতিষ্ঠিত রসায়নবিদ হলেও তাঁর হাতে তেমন কোন ফান্ড ছিল না যেটা দিয়ে খোরানাকে আর্থিক সহায়তা দেয়া যায়। খোরানা এগারো মাস ধরে ল্যাবেই ঘুমাতেন, খাদ্য ছিল ভাত আর রেশনের ফ্রি দুধ। এস্থার মাঝে মাঝে কিছু খাবার দিয়ে যেতেন – এটুকুই।

এস্থারের সাথে দেখা হওয়ার সময়টুকু ছাড়া বাকি সবটুকু সময় খোরনার কাটতো  ল্যাব আর লাইব্রেরিতে। লাইব্রেরিতে জার্মান ভাষায় প্রকাশিত গবেষণাপত্র পড়তে পড়তে অনেক পুরনো একটা পেপার থেকে প্রায়-অজানা একটি সিন্থেটিক রিএজেন্ট কার্বোডিমাইট সম্পর্কে জানতে পারেন। পরবর্তীতে এই কার্বোডিমাইট ব্যবহার করে তিনি প্রাণরসায়নে বিপ্লব ঘটিয়ে দিয়েছেন।

১৯৪৯ সালের শুরুতে বৃত্তির শর্ত পূরণ করার জন্য তিনি ভারতে ফিরে এলেন। শর্ত ছিল তিনি ইংল্যান্ড থেকে ফিরে এসে ভারতে চাকরি করবেন। কিন্তু সদ্যস্বাধীন ভারতে সেরকম কোন চাকরি নেই। লাহোর  বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাঁর অমুসলিম শিক্ষকরা সবাই ভারতে উদ্বাস্তু হয়ে এসে এখন বেকার। খোরানাও তখন কার্যত উদ্বাস্তু। মাসের পর মাস চলে যাচ্ছে চাকরি খুঁজতে খুঁজতে। লিভারপুলের পিএইচডি, জুরিখের পোস্টডক নিয়ে একটা প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকতাও জোটাতে পারছেন না তিনি।

তাঁর হতাশার কথা তিনি চিঠিতে লিখছেন তাঁর ইউরোপের পরিচিত শিক্ষক ও সহবিজ্ঞানীদের কাছে। প্রেমিকা এস্থার দিন গুনছেন জুরিখে। জুরিখে খোরানার পরিচয় হয়েছিল কেমব্রিজের অধ্যাপক কেনারের সাথে। প্রফেসর কেনার কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রফেসর আলেকজান্ডার টডের ল্যাবে একটি ফেলোশিপের বন্দোবস্ত করে দিলেন খোরানাকে। ১৯৪৯ সালের শেষে আবার ইংল্যান্ডে পাড়ি জমালেন খোরানা। যোগ দিলেন কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রফেসর টডের ল্যাবে। এই ল্যাবে শুরু হলো খোরানা, টড এবং কেনারের যৌথগবেষণা। প্রফেসর টড ১৯৫৭ সালে রসায়নে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছিলেন।

খোরানা যখন কেমব্রিজে গবেষণা করছেন তখন তাঁর ল্যাব পরিদর্শনে এসেছিলেন কানাডার ব্রিটিশ কলম্বিয়ার রিসার্চ কাউন্সিলের হেড গর্ডন শ্রাম। তিনি একজন গবেষকের সন্ধান করছিলেন যিনি ভ্যানকুভারে গিয়ে একটি গবেষণাগারের দায়িত্ব নিতে পারবেন। প্রফেসর টড খোরানার নাম প্রস্তাব করলে গর্ডন শ্রাম খোরানাকে ভ্যানকুভারে যাবার আমন্ত্রণ জানালেন। ১৯৫২ সালে সেই গবেষণাগারের দায়িত্ব নিয়ে ভ্যানকুভার চলে গেলেন খোরানা। যাবার সময় এস্থারকে বিয়ে করে সাথে নিয়ে গেলেন।

নতুন দেশে নতুন ল্যাবে নতুন সংসারের পাশাপাশি নতুন জীবন শুরু হলো খোরানার। পরবর্তী আট বছরে তিনটি সন্তানের পিতামাতা হন হরগোবিন্দ ও এস্থার। ২০০১ সালে এস্থারের মৃত্যু পর্যন্ত সুখি দাম্পত্যজীবন যাপন করেছিলেন তাঁরা।

১৯৫৪ সালে খোরানা কার্বোডিমাইট বিক্রিয়া ব্যবহার করে এডিপি ও এটিপির রাসায়নিক সংশ্লেষণ প্রকাশ করেন। খোরানার গবেষণা দ্রুত খ্যাতিলাভ করতে শুরু করেছে আন্তর্জাতিক মহলে। ১৯৬০ সালে তিনি আমেরিকার উইসকনসিন ইউনিভার্সিটির ইন্সটিটিউট অব এনজাইম রিসার্চে যোগ দিলেন। এখানেই তিনি ডিএনএ সিকোয়েন্সিং-এর যথাযথ পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন। তিনি নিউক্লিওটাইডের রাসায়নিক উপাদানগুলি কীভাবে কাজ করে তার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়ে যুগান্তকারী গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। ডিএনএর গাঠনিক উপাদানগুলির মধ্যে ঠিক কোথায় প্রোটিন সংশ্লেষণ শুরু হয়, কোথায় গিয়ে শেষ হয় তা সুনির্দিষ্টভাবে নির্ণয় করতে সক্ষম হন তিনি। তাঁর এই গবেষণার জন্য ১৯৬৮ সালে তিনি রবার্ট হলি ও মার্শাল নিরেনবার্গের সাথে যৌথভাবে চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার অর্জন করেন।

এর পরবর্তী ৪৩ বছর ধরে ২০১১ সালের ৯ নভেম্বর তাঁর মৃত্যুর আগপর্যন্ত তিনি গবেষণা করেছেন আরো বিভিন্ন বিষয়ে।

১৯৭২ সালে তিনি এমআইটিতে যোগ দেন। এরপত আজীবন তিনি সেখানেই ছিলেন। তাঁর আবিষ্কৃত পথ ধরে প্রতিষ্ঠিত হয় কেমিক্যাল বায়োলজি বা রাসায়নিক জীববিজ্ঞান। ১৯৭২ সালের ডিসেম্বরে জার্নাল অব মলিকিউলার বায়োলজি ৩১৩ পৃষ্ঠার পুরো সংখ্যাটির ১৫টি গবেষণাপত্রের সবগুলিই ছিল হরগোবিন্দ খোরানার। আর-এন-এ সংশ্লেষণের গবেষণাসংক্রান্ত এই পেপারগুলি থেকে পরবর্তীতে উদ্ভাবিত হয়েছে পিলিমারেজ চেইন রিঅ্যাকশান বা পিসিআর পদ্ধতি (করোনা ভাইরাস শনাক্ত করার নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি)। এর জন্য খোরানা আরেকটি নোবেল পুরষ্কারের দাবিদার ছিলেন।

দীর্ঘ গবেষণা-জীবনে আড়াই শ’র বেশি গবেষকের সরাসরি তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন বিজ্ঞানী খোরানা। গবেষণার চূড়ায় উঠার পরেও তিনি ছিলেন অসম্ভব বিনয়ী। নিজেকে তিনি চিরদিনের গবেষণাছাত্র হিসেবেই পরিচয় দিতেন।

তথ্যসূত্র

টমাস সাকমার, প্রসিডিংস অব দ্য আমেরিকান ফিলোসফিক্যাল সোসাইটি (২০১৭), হরগোবিন্দ খোরানা, সায়েন্স (২০০০), nobelprize.org. 

______________

বিজ্ঞানচিন্তা ফেব্রুয়ারি ২০২২ সংখ্যায় প্রকাশিত






Wednesday, 13 April 2022

ডার্ক ম্যাটার রহস্য - গুপ্ত মহাবিশ্বের খোঁজে

 



গুপ্ত মহাবিশ্বের খোঁজে – একটি টানটান উত্তেজনাকর রহস্যোপন্যাসের নাম হতে পারে সহজেই। কিন্তু নামের দ্বিতীয় অংশটা পড়েই বোঝা যায় বইটি বিজ্ঞানের। মৌলিক পদার্থবিজ্ঞানে ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জির রহস্য রহস্যোপন্যাসের চেয়েও রোমাঞ্চকর। তবে পার্থক্য হলো – রহস্যোপন্যাসের শেষে রহস্য উদ্ঘাটিত হয়, কিন্তু ডার্ক ম্যাটারের রহস্য এখনো অনেকটাই রহস্য হয়েই রয়ে গেছে।

ডার্কম্যাটারের রহস্যময়তাকে কোন গাণিতিক সমীকরণ ব্যবহার না করে বাংলার সহজিয়া বিজ্ঞানের বইতে তুলে আনার ব্যাপারটা খুব কঠিন। এই কঠিন কাজটিই অবলীলায় করে ফেলেছেন লেখক আবদুল গাফফার। পদার্থবিজ্ঞানের জটিল বিষয়সমূহের সহজীকরণ করেন যাঁরা – তাঁরা বোঝেন কাজটা কতটা কঠিন। তারজন্য প্রচুর পড়তে হয়, খাটতে হয়। এই বইটি লিখতে গিয়ে লেখক যে প্রচুর খেটেছেন, পড়াশোনা করেছেন, সেই পাঠ থেকে সারবস্তু তুলে এনে তাঁর পাঠককে দিয়েছেন তা এই বইয়ের সাতাশটি পরিচ্ছেদের প্রত্যেকটিতেই স্পষ্ট।

বাংলায় লিখতে গেলে সবচেয়ে বেশি যে সমস্যাটা হয় – সেটা হলো যথাশব্দ খুঁজে বের করা। ইংরেজিতে ডার্ক ম্যাটার বললে পদার্থবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে যে ব্যাপারটা সবার কাছে সমানভাবে বোধগম্য -  ‘কৃষ্ণবস্তু’ কিংবা আরো সহজ বাংলায় ‘কালো পদার্থ’ বললে তা সবার কাছে সমান অর্থবোধক হয় না। তাই শব্দ প্রয়োগের সীমাবদ্ধতা একটা বড় সমস্যা বাংলায় বিজ্ঞান লেখার ক্ষেত্রে। গুপ্ত মহাবিশ্বের খোঁজে – বইতে ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জিকে বাংলা নামে না ডেকে লেখক সঠিক কাজই করেছেন।

মহাবিশ্ব খুবই রহস্যময় জায়গা। রহস্যময়তার কারণ এখানে যতটা না দুর্বোধ্যতা – তার চেয়েও বেশি অদৃশ্যতা। পুরো মহাবিশ্বের শতকরা ছিয়ানব্বই ভাগই এখনো মানুষের চেনা-জানার বাইরে রয়ে গেছে যার একুশ ভাগ ডার্ক ম্যাটার আর পঁচাত্তর ভাগ ডার্ক এনার্জি।

মহাবিশ্বের উপাদানের শতকরা মাত্র চারভাগ দৃশ্যমান পদার্থ দ্বারা গঠিত। দৃশ্যমান কথাটা পদার্থবিজ্ঞানের ভাষায় ব্যাখ্যা করলে আমরা যেটা বুঝি সেটা হচ্ছে – মহাবিশ্বের যেসব পদার্থের উপর থেকে আলোর প্রতিফলন ঘটে আমাদের চোখে আসে। যেমন খালি চোখে আমরা আকাশের লক্ষ লক্ষ নক্ষত্রের আলো দেখতে পাই। অথবা তড়িৎচৌম্বক তরঙ্গের মিথষ্ক্রিয়ায় পরোক্ষভাবে যান্ত্রিক উপায়ে দূর মহাকাশ থেকে পদার্থের উপস্থিতি শনাক্ত করি। যেমন এক্স-রে কিংবা গামা-রে’র উপস্থিতি শনাক্ত করে হাজার আলোকবর্ষ দূরের নক্ষত্রের অস্তিস্ত্ব খুঁজে বের করা হচ্ছে। এসব অত্যাধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ব্যবহার করেও এখনো দেখা সম্ভব হয়নি শতকরা ছিয়ানব্বই ভাগ পদার্থ। মহাবিশ্বের এই বিশাল ভর এখনো রয়ে গেছে গুপ্ত। এই গুপ্ত মহাবিশ্বেরই খোঁজখবর দেয়া হয়েছে এই বইতে।

 সাতাশটি অধ্যায়ে ডার্ক ম্যাটারের আদ্যোপান্ত বর্ণনা করা হয়েছে এই বইতে। অধ্যায়গুলি ছোট ছোট – পড়তে পড়তে খেই হারিয়ে যায় না, তথ্যভারাক্রান্তও মনে হয় না। বিজ্ঞানের বই তর তর করে পড়ে ফেলার বই নয়। বিজ্ঞানের বই – সে যে ভাষাতেই লেখা হোক না কেন, সেখানে বিজ্ঞান থাকবে। আর বিজ্ঞান পড়তে হলে মগজে চাপ পড়তেই হবে। এই বইটা পড়তেও পাঠককে সময় নিয়ে পড়তে হবে – সেটাই স্বাভাবিক। আমি বেশ সময় নিয়ে বইটি পড়েছি এবং পড়ে আনন্দ পেয়েছি।

প্রাচীন মহাবিশ্বের ধারণা থেকে শুরু করে আধুনিক মহাবিশ্বের মানচিত্রে ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জির স্থান কোথায় হতে পারে – সে সম্পর্কিত বিস্তারিত তথ্য আমরা পেয়েছি এই বইতে। লেখক এ ব্যাপারে একটা সমন্বিত চিত্র বেশ ভালোভাবেই দিতে পেরেছেন।

প্রথমা প্রকাশন-এর বইগুলির অঙ্গসৌষ্ঠব উন্নত। ব্যবহৃত ছবিগুলি চমৎকারভাবে পরিষ্ফুটিত। কিন্তু সম্পাদনায় কিছুটা ত্রুটি রয়ে গেছে। এটা আমাদের প্রকাশনা জগতের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা বলে মনে হয় আমার। বেশ কিছু বানান ভুল রয়ে গেছে। আমি বইটির প্রথম সংস্করণ পড়েছি। হয়তো পরবর্তী সংস্করণে এসব ত্রুটি সংশোধিত হয়ে গেছে। আরেকটি দুর্বলতা হলো ছবিগুলিতে কোন নম্বর দেয়া নেই, কিন্তু বর্ণনায় বলা হয়েছে “চিত্র-৩ এর মতো” বা ২ নম্বর ছবির মতো ইত্যাদি (পৃষ্ঠা ৬৫)। আবার অধ্যায়গুলির কোন গাণিতিক পরিচয় নেই – অথচ কোন কোন জায়গায় উল্লেখ আছে “চতুর্দশ অধ্যায়ে বলেছিলাম … (পৃষ্ঠা ১৩৯), ১১তম অধ্যায়ে দেখেছি… (পৃষ্ঠা ১০৬) ইত্যাদি। ছবিগুলির লেবেলিং বাংলায় করা হয়েছে – সেটা খুব ভালো হয়েছে। তবে ৯২ পৃষ্ঠার স্ট্যান্ডার্ড মডেলের ছবিটি জার্মান ভাষায় রয়ে গেছে।

কিছু কিছু ইংরেজি শব্দের সঠিক পরিভাষা আমাদের নেই – যেমন নয়েজকে বাংলায় গোলমাল বললে যা বোঝা যায় – তার সাথে পদার্থবিজ্ঞানের নয়েজের কোন মিল নেই। পদার্থবিজ্ঞানে আমরা নয়েজ বলতে বুঝি – আনওয়ান্টেড ইনফরমেশান; অর্থাৎ অনাকাঙ্খিত সিগনাল। সেখানে গোলমাল বললে অর্থটা গোলমেলে হয়ে যায়। একই ভাবে স্লিট (slit) শব্দের অর্থ ‘ছিদ্র’ বললেও অর্থ বদলে যায় (পৃষ্ঠা ৮৩)

আরো টুকটাক কিছু কিছু বিষয় আরেকটু বিস্তৃতভাবে এলে ভালো হতো – যেমন বলা হয়েছে “ফার্মি টেলিস্কোপে সংযুক্ত আছে বিশাল আকারের এক চুম্বক। এই চুম্বক গামা রশ্মিকে ভেঙে ইলেকট্রন আর পজিট্রন জোড়ায় পরিণত করে ফেলতে পারে।“ (পৃষ্ঠা ১৪৩)  কিন্তু এটুকু বললে একটা সমস্যা থেকে যায়। তা হলো গামা রশ্মির উপর চৌম্বকক্ষেত্রের কোন প্রভাব নেই। সেক্ষেত্রে ঘটনাটা কীভাবে ঘটে তা পুরোটা ব্যাখ্যা করা দরকার।

ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জির আদ্যোপান্ত বইটি বাংলায় বিজ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আমি মনে করি।


Tuesday, 12 April 2022

স্বপ্নলোকের চাবি - পর্ব ৬৭ (শেষ পর্ব)

 


#স্বপ্নলোকের_চাবি_৬৭ (শেষ পর্ব)

পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দেখে কমনওয়েলথ স্কলারশিপের জন্য দরখাস্ত করেছিলাম। কমনওয়েলথভুক্ত দেশে গিয়ে গবেষণা করার জন্য ব্রিটিশ সরকারের এই বৃত্তিগুলি থাকে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের হাতে। কমিশনের অফিস থেকে নির্ধারিত ফরম সংগ্রহ করে দরখাস্ত করেছিলাম। ঢাকায় মঞ্জুরি কমিশনের অফিসে স্কলারশিপের ইন্টারভিউ হলো। অনার্স ও মাস্টার্সে ফার্স্ট ক্লাস থাকলেই দরখাস্ত করা যায় বলেই দরখাস্ত করেছিলাম। আগে যদি জানতাম যে এই বৃত্তিগুলি অলিখিতভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্যই সংরক্ষিত, তাহলে দরখাস্তই করতাম না। তবে ইন্টারভিউ দিতে গিয়ে অনেক অভিজ্ঞতা হলো। দেখতে পেলাম বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের হাতে কত ধরনের সুযোগ-সুবিধা দেয়ার ক্ষমতা থাকে। 

ফেইলিওর ইজ দ্য পিলার অব সাকসেস – এই আপ্তবাক্য অনুসারে একের পর এক নতুন পিলার গজাচ্ছে আমার। বুদ্ধিমান মানুষ ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বুঝে ফেলে কোন্‌ বিষয় কীভাবে কাজ করে। আমার সেই ক্ষমতা নেই। তাই আমি পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দেখে দেখে আমাদের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে যেসব বিদেশী বৃত্তির জন্য দরখাস্ত চাওয়া হয় – সেগুলিতে দরখাস্ত করতে থাকি। কোনোটা থেকেই কোন সাড়া পাই না। কিন্তু একদিন হঠাৎ একটা টেলিগ্রাম এলো শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে। ভারত সরকারের বৃত্তির জন্য পদার্থবিজ্ঞান বিষয়ে আমাকে মনোনীত করা হয়েছে। মার্চের ১৮ তারিখের মধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে গিয়ে মূল ফরম জমা দিতে হবে। কিন্তু টেলিগ্রাম আমি পেয়েছি মার্চের ২৪ তারিখ। খামের উপর সিল দেখে বোঝা যাচ্ছে পাঠানো হয়েছে ১৯ তারিখ। এরকম ঝামেলা কি শুধু আমার সাথে হয়, নাকি আরো অনেকের সাথে হয়? কলেজ থেকে ছুটি নিয়ে ঢাকায় গেলাম। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে মন্ত্রণালয়ে ঢুকে দেখতে পেলাম – শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দেয়ালে দেয়ালে অনেক বিদেশী বৃত্তির নোটিশ ঝুলছে। এই সংরক্ষিত এলাকায় যেখানে প্রবেশ করার জন্য বিশেষ অনুমতি লাগে, সেখানে এই বিজ্ঞপ্তিগুলি ঝুলিয়ে রাখার কারণ কী? দেখলাম মন্ত্রণালয়ের পিয়ন, কেরানি সবাই হা করে আছে টাকার জন্য। দেরি করে এসেছি এই কারণ দেখিয়ে একটা ফরমের জন্য তিন শ টাকা নগদ নিলো। মাত্র তিনশ টাকার জন্য আমার পাওয়া বৃত্তি হাতছাড়া হয়ে যাবে! তাই অন্যায় জেনেও আমি তিন শ টাকা দিয়ে ফরম নিলাম। রাত জেগে ফরম পূরণ করে, সমস্ত কাগজপত্র জোগাড় করে পরদিন ফরম জমা দিলাম। এরপর কত আশা নিয়ে অপেক্ষা করে আছি – ফাইনাল রেজাল্ট আসবে। দুই সপ্তাহ পর ভারতীয় হাই কমিশন থেকে চিঠি এলো – মন্ত্রণালয় থেকে আমার নাম পাঠানো হয়েছে, কিন্তু নির্ধারিত ফরমে আমার দরখাস্ত পাঠানো হয়নি। অথচ এই দরখাস্ত আমি নিজে জমা দিয়ে এসেছি মন্ত্রণালয়ে।

চাইলেই চট্টগ্রাম থেকে যখন খুশি ঢাকায় চলে যাওয়া যায় না। কলেজ থেকে ছুটি পাওয়া সহজ নয়। একদিনের ছুটির জন্যও ‘আকুল আবেদন’ করতে হয়। আবার গেলাম মন্ত্রণালয়ে। তারা বললো – দরখাস্ত ভারতীয় হাই কমিশনে পাঠিয়ে দিয়েছে। গেলাম ভারতীয় হাই কমিশনে। তারা জানালো – আমার দরখাস্ত তারা পায়নি। এখন উপায়? হাই কমিশনের একজন ‘দাসবাবু’ উপায় বাতলে দিলেন। আবার সমস্ত কাগজপত্র নতুন করে জোগাড় করে দরখাস্ত জমা দিলাম। এবার নিশ্চয় হয়ে যাবে। কিন্তু দাসবাবুর মৎস্য শিকারের খুব শখ। তিনি জানতে চাইলেন তাঁকে চট্টগ্রামে এনে তাঁর মৎস্য শিকারের শখ মেটাতে আমি কোন ভূমিকা রাখতে পারি কি না। তাঁর শখ মেটানো আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি। আমার সরকারি স্কলারশিপের ওখানেই ইতি।

চতুর্দশ বিসিএস ছিল শিক্ষা ক্যাডারের বিশেষ বিসিএস। ওই বিসিএস আমরা দিতে পারিনি, কারণ আমাদের মাস্টার্স পরীক্ষা হয়নি তখনো। এরপর আমাদের জন্য সুযোগ এলো ষোড়শ বিসিএস। ওটাও শিক্ষা ক্যাডারের বিশেষ বিসিএস। আমি প্রায় নিশ্চিত ছিলাম যে আমার ওই বিসিএস হয়ে যাবে। মৌখিক পরীক্ষায় শুধুমাত্র পাসমার্ক পেলেও আমি মেধাতালিকায় চলে আসবো এরকম আস্থা ছিল নিজের উপর। কিন্তু আস্থা আর বাস্তব এক জিনিস নয়। আমি ষোড়শ বিসিএস ফেল করলাম। আত্মবিশ্বাস তলানিতে এসে ঠেকলো। বছরখানেক পর সপ্তদশ বিসিএসও ফেল করলাম। আত্মবিশ্বাস অবশিষ্ট যা ছিল তাও বাষ্প হয়ে উড়ে গেল।

কলেজে কাজে ব্যস্ত থাকি। ক্লাসে শিক্ষার্থীদের সাথে যতক্ষণ থাকি – আনন্দেই থাকি। ক্লাসরুম আমার প্রিয় জায়গা, শিক্ষার্থীরা আমার প্রিয়জন। কিন্তু তারপরও মনের ভেতর খচখচ করতে থাকে।

যতই অনুভূতি লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করি – কাছের মানুষগুলি ঠিকই বুঝতে পারে। ছুটিতে বাড়িতে গিয়ে বাবার মুখোমুখি হই। এই মানুষটির সাথে আমার এখন যতটা পিতা-পুত্রের সম্পর্ক, তার চেয়েও বেশি বন্ধুত্বের সম্পর্ক। তাঁর বয়স এখন পঁচাত্তর। তাঁর নিজস্ব সংগ্রামের কথাগুলি এখন আমি বুঝতে পারি। তিনিও খুলে বসেন তাঁর অতীত দিনের কথার ঝাঁপি।

আমার বাবার জীবন অনেকটা সাপ-লুড়ুর মতো। কতোবার তাঁর জীবনের পাকা গুটি সাপে খেয়েছে। তিনি শীর্ষ থেকে তলানিতে গিয়ে পৌঁছেছেন, কিন্তু তিনি থেমে যাননি। একটা কথার ভগ্নাংশ তিনি প্রায়ই বলেন – “মা ফলেষু কদাচন – কর্ম করে যাও, ফলের আশা করিও না।” মূল কথাটি অবশ্য এরকম “কর্মণ্যেবাধিকারস্তে মা ফলেষু কদাচন” – অর্থাৎ মানুষের অধিকার শুধু কর্মে, কর্মফলে নয়। তার মানে কী দাঁড়ালো?  ফল যাই হোক, আমার চেষ্টা আমাকে করেই যেতে হবে।

নতুন করে চেষ্টা শুরু হলো। লালদীঘির পাড়ে ব্রিটিশ কাউন্সিল লাইব্রেরি। সেখানে রেফারেন্স সেকশানে কমনওয়েলথ ইউনিভার্সিটিগুলির বিস্তারিত পরিচিতিসহ রেফারেন্স বই আছে। সেখান থেকে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিজিক্স ডিপার্টমেন্টের ঠিকানা জোগাড় করে উচ্চতর ডিগ্রিতে ভর্তির তথ্য চেয়ে চিঠি পাঠাতে শুরু করলাম। প্রতিদিন কলেজ থেকে আসার পর সারা বিকেল এখানেই কাটে। এরপর রাত জেগে চিঠি টাইপ করি। মুসলিম হলের পাশে বিভাগীয় পাবলিক লাইব্রেরির চার তলায় রেফারেন্স রুমে আছে আমেরিকান ইউনিভার্সিটির লিস্ট। ওখান থেকেও ঠিকানা জোগাড় হয়। পরবর্তী কয়েক মাস ধরে প্রায় কয়েক শ’ চিঠি পোস্ট করলাম আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ইংল্যান্ডসহ আরো কিছু দেশে – যেখানে ইংরেজি ভাষায় পড়াশোনা হয়।

মাসখানেক পরে চিঠি আসতে শুরু করলো। বড় বড় খামের ভেতর বড় বড় প্রস্পেক্টাস। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রস্পেক্টাসের পাতা উল্টাতে উল্টাতে ভেঙে যাওয়া স্বপ্নের নতুন চারা গজাতে শুরু করে। কিন্তু স্বপ্নের ডানা ছেটে দিতে হয়। কারণ ভর্তির দরখাস্ত করার জন্য ফি আছে – পঞ্চাশ ডলার থেকে এক শ ডলার পর্যন্ত। ছিয়ানব্বই সালে আমেরিকান ডলারের দাম ছিল প্রায় পঞ্চাশ টাকা। সেই হিসেবে আমার এক মাসের বেতন মাত্র এক শ ডলার। দুইটা ইউনিভার্সিটিতে দরখাস্ত করতে গেলেই আমি ফতুর হয়ে যাবো। তাই কয়েক শ ইউনিভার্সিটিতে চিঠি পাঠিয়ে প্রসপেক্টাস আনা গেলেও – ভর্তির দরখাস্ত করার ব্যাপারে খুব হিসেবী হয়ে উঠতে হলো। প্রথমে দেখলাম ফি ছাড়া দরখাস্ত করা যায় কোন্‌ কোন্‌ ইউনিভার্সিটিতে। আমেরিকার হাতে গোনা কয়েকটি ইউনিভার্সিটিতে দরখাস্ত করতে ফি লাগে না, কিন্তু টোফে্‌ল, জিআরই লাগে।

নতুন যন্ত্রণার নাম টোফেল, জিআরই। বইপত্র কিনে উল্টেপাল্টে দেখে বুঝতে পারলাম – আমার ইংরেজির অবস্থা ভয়াবহ। অরিজিনাল বইপত্রের দামও অনেক। পরীক্ষার ফিও ষাট-সত্তর ডলার। এই ডলারের চেক জোগাড় করতেও অনেক ঝক্কি পোহাতে হয়। আগ্রাবাদে সোনালী ব্যাংকের ফরেন এক্সচেঞ্জ শাখা থেকে অনেক কাগজপত্র জমা দিয়ে ডলারের চেক জোগাড় করতে হয়।

অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির স্কলারশিপের জন্য দরখাস্ত করলাম। দরখাস্ত করার জন্য কোন ফি লাগলো না বলে অনেক খুশি হয়েছি। তবে দরখাস্তে উল্লেখ করা আছে আমার ইউনিভার্সিটি থেকে সরাসরি অ্যাকাডেমিক ট্রান্সক্রিপ্ট পাঠাতে হবে। এই অ্যাকাডেমিক ট্রান্সক্রিপ্ট বস্তুটা যে কী জিনিস – কোন ধারণা নেই। আমাদেরকে মার্কশিট দেয়া হয়েছে, সার্টিফিকেট দেয়া হয়েছে। কিন্তু অ্যাকাডেমিক ট্রান্সক্রিপ্ট নামে কিছুই তো দেয়া হয়নি। অথচ জানতে পেরেছি আন্তর্জাতিক সব বিশ্ববিদ্যালয়েই অ্যাকাডেমিক ট্রান্সক্রিপ্ট দেয়া হয় – যেখানে কী কী সাবজেক্টে পরীক্ষা দিয়ে কত নম্বরের মধ্যে কত পেয়েছি, কী গ্রেডের কী মান, গ্রেড কীভাবে দেয়া হয়, কত নম্বরের মধ্যে কত পেলে ফার্স্ট ক্লাস, ইত্যাদি সব তথ্য থাকে সেই ট্রান্সক্রিপ্টে। ইউনিভার্সিটিগুলি ইউনিভার্সাল হবে এটাই স্বাভাবিক। অথচ আমাদের ইউনিভার্সে অ্যাকাডেমিক ট্রান্সক্রিপ্টই নেই!

ইউনিভার্সিটিতে গেলাম। ডেপুটি রেজিস্ট্রারের অফিসে গিয়ে এই টেবিল থেকে ওই টেবিলে বেশ কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরির পর জানা গেল অ্যাকাডেমিক ট্রান্সক্রিপ্টের জন্য নির্ধারিত ফরমে দরখাস্ত করতে হবে। অনার্সের জন্য একটি দরখাস্ত, মাস্টার্সের জন্য আরেকটি দরখাস্ত। দরখাস্তে আমি কোন্‌ পরীক্ষায় কত পেয়েছি তা লিখে দিতে হবে। সাথে আমার মার্কশিটের সত্যায়িত কপি জমা দিতে হবে। প্রতিটি দরখাস্তের ফি দুইশ টাকা। সেই টাকা আবার অগ্রণী ব্যাংকে জমা দিতে হবে। আমি কোন্‌ পরীক্ষায় কত পেয়েছি সেই রেকর্ড তো বিশ্ববিদ্যালয়েই থাকার কথা। সেখান থেকে তথ্য নিয়েই তো ট্রান্সক্রিপ্ট তৈরি করে দেয়ার কথা। কিন্তু না, আমাকেই সব সরবরাহ করতে হবে। অফিসাররা সেই তথ্য মিলিয়ে দেখবেন ঠিক আছে কী না।

পুরো দুই দিন লাগলো ট্রান্সক্রিপ্ট রেডি হতে। পাতলা ফিনফিনে কাগজে টাইপ করা হলো ট্রান্সক্রিপ্ট। টাইপ করার সময় বেশ কয়েকবার ভুল হলো। সাদা ফ্লুইড দিয়ে সেই ভুল মোছা হলো। তার উপর আবার টাইপ করা হলো। এরকম ছন্নছাড়া ট্রান্সক্রিপ্ট যাবে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে। বলা হয়েছে ইউনিভার্সিটি থেকে সরাসরি পাঠাতে। সেজন্য পোস্টাল স্টাম্পের খরচ নেয়া হয়েছে পঞ্চাশ টাকা। কিন্তু আমাকে ট্রান্সক্রিপ্ট দুটো এবং একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাপ মারা খাম ধরিয়ে দিয়ে বলা হলো – “আপনি পোস্ট করে দিয়েন কোথায় দিতে হয়।“

“তাহলে পোস্টেজ বাবদ যে পঞ্চাশ টাকা নিলেন?”

“হে হে হে।“ মনে হলো এরকম হাস্যকর প্রশ্ন তিনি আর কখনো শোনেননি।

যাই হোক, অক্সফোর্ডে দরখাস্ত পাঠালাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের খামে অ্যাকাডেমিক ট্রান্সক্রিপ্ট পাঠালাম। প্রামাণিকস্যারকে অনুরোধ করেছিলাম একটি রেফারেন্স লেটারের জন্য। তিনি বলেছেন, নিয়ম মোতাবেক তিনি সরাসরি অক্সফোর্ডেই পাঠিয়ে দেবেন।

মাসখানেক পর অক্সফোর্ড থেকে চিঠি এলো। আই-ই-এল-টি-এস করতে হবে। ওভারঅল ব্যান্ড স্কোর কমপক্ষে সেভেন হতে হবে।

ইন্টারন্যাশনাল ইংলিশ ল্যাঙ্গুয়েজ টেস্টিং সিস্টেম বা আই-ই-এল-টি-এস সম্পর্কে আমার কোন ধারণাই ছিল না। ব্রিটিশ কাউন্সিলে খোঁজ নিলাম। চট্টগ্রামে তেমন কোন তথ্য নেই। ব্রিটিশ কাউন্সিল ঢাকায় এই পরীক্ষার আয়োজন করে এবং সেখানে তথ্যও পাওয়া যায়। তবে চট্টগ্রাম ব্রিটিশ কাউন্সিলের তরুণ লাইব্রেরিয়ান আনঅফিশিয়ালি জানালেন – আমি আগ্রহী হলে মিসেস সুতপা বড়ুয়ার সাথে যোগাযোগ করতে পারি। মিসেস বড়ুয়া আগে ব্রিটিশ কাউন্সিলে কাজ করতেন। এখন নিজেই একটি ইংরেজি শেখানোর প্রতিষ্ঠান চালু করেছেন রহমতগঞ্জে।

সুতপা ম্যাডামের সাথে দেখা করলাম। বেশ বড় প্রতিষ্ঠান তাঁর। অনেক ছাত্রছাত্রী ইংরেজিতে কথা বলা শিখছে। আই-ই-এল-টি-এস কোর্সে আপাতত কোন স্টুডেন্ট নেই। কারণ ওই পরীক্ষাটা এখনো খুব একটা পরিচিত হয়নি এখানে। এখনো সবাই টোফেলই করে। সুতপাম্যাডাম আমাকে একাই পড়াবেন। এক ঘন্টা করে মোট দশটি ক্লাস নেবেন, প্রতি ক্লাস ছয় শ টাকা। তবে ব্যান্ড স্কোরের কোন গ্যারান্টি তিনি দিতে পারবেন না। ভর্তি হয়ে গেলাম।

মাস খানেক পরে ঢাকার ব্রিটিশ কাউন্সিলে গিয়ে পরীক্ষা দিয়ে এলাম। ওভারঅল ব্যান্ড স্কোর এলো সাড়ে ছয়। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির রিজেকশান লেটার এলো কয়েক সপ্তাহ পর।

দেখলাম অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটিগুলিতে আই-ই-এল-টি-এস ব্যান্ড স্কোর ছয় হলেই হয়। তাহলে তো অস্ট্রেলিয়ায় দরখাস্ত করতে হয়। কিন্তু দরখাস্তের ফি আছে সেখানে। অস্ট্রেলিয়ান ডলারের দাম আমেরিকান ডলারের চেয়ে কম। সাতানব্বইতে বাংলাদেশী টাকায় অস্ট্রেলিয়ান ডলার ছিল সাতাশ টাকা। এএনজেড গ্রিনলেজ ব্যাংকে অস্ট্রেলিয়ান ডলার পাওয়া যায়। আমার কলেজজীবনের বন্ধু সুরজিত কাজ করে সেখানে। তার সাহায্যে অস্ট্রেলিয়ান ডলার জোগাড় হলো। দরখাস্ত করলাম কয়েকটি অস্ট্রেলিয়ান ইউনিভার্সিটিতে। এখানে অ্যাকাডেমিক ট্রান্সক্রিপ্ট ইউনিভার্সিটি থেকে পাঠাতে হয় না, দরখাস্তের সাথে নিজেই পাঠানো যায়। ইউনিভার্সিটিতে গিয়ে আবার ফরম ও টাকা জমা দিয়ে আরেক সেট ট্রান্সক্রিপ্ট নিয়ে এলাম। এবার ওগুলির ফটোকপি দিয়ে কাজ চালালাম।

প্রথম অফারটা এলো ফ্লিন্ডার্স ইউনিভার্সিটি থেকে। শুধু ভর্তির অফার, কোন স্কলারশিপ নেই। টিউশন ফি বছরে আঠারো হাজার ডলার। অত টাকা দিয়ে পড়াশোনা করার সামর্থ্য নেই। পরের অফার এলো ইউনিভার্সিটি অব নিউ ইংল্যান্ড থেকে। ওখানেও কোন স্কলারশিপ নেই। তৃতীয় অফারটা এলো ইউনিভার্সিটি অব মেলবোর্ন থেকে। প্রথম চিঠিতে কোন স্কলারশিপ নেই, কিন্তু বলা হলো স্কলারশিপের সিদ্ধান্ত কিছুদিন পরে জানানো হবে। এক মাস পর জানানো হলো – আমাকে একটা রিসার্চ স্কলারশিপ দেয়া হচ্ছে।

তারপর অন্য দেশ, অন্য কাহিনি।

<<<<<<<<< আগের পর্ব

Saturday, 2 April 2022

স্বপ্নলোকের চাবি - পর্ব ৬৬

 


#স্বপ্নলোকের_চাবি_৬৬

ইন্টারভিউর চিঠি পাবার পর স্বপ্নটা আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো। ঘুমের ঘোরে দেখা স্বপ্ন জেগে উঠলেই ভেঙে যায়। কিন্তু জেগে জেগে যে স্বপ্ন দেখছি তা পিছু ছাড়ছে না। প্রামাণিকস্যার বলেছিলেন ইন্টারভিউর চিঠি নাও পাঠাতে পারে। কিন্তু ইন্টারভিউর চিঠি তো পেলাম। নভেম্বরের আট তারিখ সকাল দশটায় ভাইস চ্যান্সেলরের অফিসে ইন্টারভিউ। স্বপ্নের ঠেলায় প্রামাণিকস্যারের উপর রাগ হচ্ছে। মনে হচ্ছে বাস্তববাদীর আড়ালে তিনি একজন নৈরাশ্যবাদী মানুষ। সোবহানস্যার যখন বলেছেন আমার আর হারুনের সমান যোগ্যতা, তখন নিশ্চয়ই তিনি আমাদের দু’জনের জন্যই সমানভাবে ভাবছেন। ডিপার্টমেন্টের চেয়ারম্যানের কথার একটা দাম থাকবে না তা কি হয়?

স্বপ্ন দেখার পাশাপাশি নিজের যোগ্যতাও তো প্রমাণ করতে হবে। ইন্টারভিউতে নিশ্চয় পদার্থবিজ্ঞানের গভীর জ্ঞান যাচাই করা হবে। আমার থিসিসের বিষয়বস্তু নিয়ে অনেক খুঁটিনাটি আলোচনা করা হবে। ইতোমধ্যে একটি বেসরকারি কলেজে লেকচারার হবার জন্য ইন্টারভিউ দিয়েছি। সেখানেও লিখিত, মৌখিক, ডেমনস্ট্রেশন – মোট তিন ধাপের পরীক্ষা দিতে হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকচারার হবার জন্য যে ইন্টারভিউ সেখানে নিশ্চয় আরো অনেক গভীর অর্থবহ ধাপ অতিক্রম করতে হবে। পুরো একটা সপ্তাহ ধরে নিজেকে তৈরি করলাম নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করার জন্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে গেলে কী কী যোগ্যতা থাকা চাই – সে ব্যাপারে নিজস্ব কিছু মতামতও তৈরি হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাদানের স্বরূপ কী হওয়া উচিত – তা আমাদের শিক্ষকরা হয়তো ভালো জানেন। কিন্তু তাঁদের আচরণে কিংবা পাঠদানে তার প্রতিফলন পাইনি তেমন একটা। শিক্ষার্থীর চোখ দিয়ে না দেখলে অনেক জিনিস বোঝা যায় না। আমাদের শিক্ষকরা শিক্ষক হয়েই ভুলে যান যে তাঁরাও একসময় শিক্ষার্থী ছিলেন। এই ভুলটা আমি কখনো করবো না। শিক্ষকের কাজ যে শুধু শেখানো নয়, আবার নতুন করে শেখাও – সেটা আমি বুঝতে পেরেছি।

জীবনে প্রথমবার ভাইস চ্যান্সেলরের অফিসে ঢুকার সুযোগ হলো। মূল অফিসে ঢুকার আগে একটা মাঝারি আকারের বসার ঘর। সেখানে চারপাশের দেয়াল ঘেঁষে বেশ কিছু চেয়ার আর ছোট ছোট সোফা রাখা আছে। ভেবেছিলাম আমিই সবার আগে এসে পড়েছি। কিন্তু না, অঞ্জন চৌধুরি মানে অঞ্জনদা আরো আগে এসেছেন। আমাকে দেখে হাসতে হাসতে বললেন, “তুমিও এসে পড়েছো? ইউনিভার্সিটির ইন্টারভিউর হাতেখড়ি হবে আজ তোমার।“ 

মনে হচ্ছে অঞ্জনদা এর আগেও ইন্টারভিউ দিয়েছেন। জামাল নজরুল ইসলাম স্যারের তত্ত্বাবধানে এমফিল করেছেন তিনি। পয়েন্টের দিক থেকে তিনি অনেক এগিয়ে। ইন্টারভিউতে তাঁর সাথেও আমার প্রতিযোগিতা করতে হবে ভেবে একটু অস্বস্তিও লাগছে। একটু পর আরো অনেকে আসতে শুরু করেছেন। অপরিচিত অনেকজন। পরিচিতদের মধ্যে রফিকভাইকে দেখলাম। ডিপার্টমেন্টের সিনিয়রভাই হিসেবে আমি তাঁকে চিনি, তিনি আমাকে চেনেন না। হারুন রুমে ঢুকে আমার সাথে চোখাচোখি হতেই চোখ সরিয়ে বের হয়ে গেল। কিন্তু একটু পরে ফিরে এলো নুরুল ইসলামস্যার আর সোবহানস্যারের সাথে। সোবহানস্যার আর নুরুল ইসলামস্যার রুমের ভেতর দিয়ে হেঁটে মূল অফিসের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে গেলেন।

ভিসিস্যারের রুমে ঢোকার আরো অনেক পথ আছে সম্ভবত। কারণ এখানে আসার পর শুনেছিলাম ভিসিস্যার তখনো আসেননি। একটু আগেই বলতে শুনলাম ভিসিস্যার এসে গেছেন। কোন্‌ দিক দিয়ে এলেন দেখতে পাইনি।

ইন্টারভিউ শুরু হলো। শুরুতেই অঞ্জনদার ডাক পড়লো। তিনি ভেতরে চলে গেলেন।

আমার ধারণা ছিল কমপক্ষে ঘণ্টাখানেক লাগবে একেকজনের ইন্টারভিউ শেষ হতে। কিন্তু পাঁচ-ছয় মিনিটের মধ্যেই বের হয়ে এলেন অঞ্জনদা। ডাক পড়লো আমার।

ভিসিস্যারের অফিসরুমটা বিশাল। আমি রুমে ঢুকেই হাত তুলে সালাম দিয়ে মনে হলো স্যাররা এত দূরে বসে আছেন যে সালাম ঠিকমতো পৌঁছায়নি তাঁদের টেবিলে। চার জনের ইন্টারভিউ বোর্ড। ভিসি রফিকুল ইসলাম চৌধুরিস্যার, আমাদের নুরুল ইসলামস্যার এবং সোবহানস্যার। আর এক্সটার্নাল হিসেবে এসেছেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান প্রফেসর শামসুল হক। বসার আদেশ পেয়ে বসলাম তাঁদের সামনে চেয়ারে। প্রত্যেকের হাতেই আমার দরখাস্তের ফাইল। ভিসিস্যার ফাইল দেখতে দেখতে বললেন, “এসএসসি ফার্স্ট ডিভিশন, এইচএসসি ফার্স্ট ডিভিশন, অনার্সে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট, মাস্টার্সে ফার্স্ট ক্লাস সেকেন্ড – বাহ্‌ ভেরি গুড। তোমাকে তো আমার মনে আছে। তোমাদের ফেয়ারওয়েলে তোমার কথাগুলি আমার খুব ভালো লেগেছিল। তোমার চিন্তাভাবনা খুব পজিটিভ। তোমাকে তো আমাদের দরকার।“

ভিসিস্যারের কথা শুনে আমার মাথার ভেতর স্বপ্নের পায়রাগুলি ডানা মেলে উড়তে শুরু করলো। মনে হলো স্বপ্নলোকের চাবি আমার হাতের মুঠোয় চলে এসেছে। কিন্তু সোবহানস্যারের মুখের দিকে তাকিয়ে দমে গেলাম। সোবহানস্যার গম্ভীরমুখে বললেন, “আমাদের আরো ক্যান্ডিডেট আছে স্যার।“

সোবহানস্যারের কথা শেষ হবার আগেই প্রফেসর শামসুল হক বললেন, “আপনার পোস্ট তো আছে মাত্র দুইটা। দরকার বলে তো সবাইকে আপনি রাখতে পারবেন না।“

ভিসিস্যার আর কোন কথা বললেন না। শামসুল হকস্যার বললেন, “দ্যাখো, এমএসসিটা আসলে তেমন কোন ডিগ্রি নয়। এমফিল করো, পিএইচডি করো – তারপর ট্রাই করো।“

মাথার ভেতর স্বপ্নের পায়রাগুলি ততক্ষণে আর্তনাদ করতে শুরু করেছে। সোবহানস্যার প্রশ্ন করলেন, “এমএসসিতে তোমার কী কী সাবজেক্ট ছিল?” বুঝতে পারছিলাম না স্যার আমার সাথে মজা করছেন কি না। কী কী সাবজেক্ট ছিল তা আমার মার্কশিটে লেখা আছে। স্যার নিজে আমাদের পড়িয়েছেন। কিন্তু যেকোনো প্রশ্নই প্রশ্ন। উত্তর দিলাম। নুরুল ইসলামস্যার একটা শব্দও উচ্চারণ করলেন না। সোবহানস্যার বললেন, “ঠিক আছে, যাও।“

পাঁচ মিনিটেই শেষ বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকচারার হবার ইন্টারভিউ। আমি জানতাম চাকরিপ্রার্থীদের জন্য বিভীষিকার অন্য নাম নিয়োগ পরীক্ষা। সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে কত রকমের পরীক্ষা দেয়ার পর চাকরি জোটে। বিসিএস পরীক্ষার কথাই ধরা যাক – প্রিলিমিনারি, লিখিত, মনস্তাত্ত্বিক, মৌখিক, স্বাস্থ্য, পুলিশ-চেক ইত্যাদি অনেকগুলি ধাপ পার হতে হতে অনেক সময় বছর পেরিয়ে যায়। বেসরকারি চাকরির ক্ষেত্রেও কত রকমের ইন্টারভিউ দিতে হয়। শাহীন কলেজের মতো একটা উচ্চমাধ্যমিক কলেজের লেকচারার হবার জন্যও কত দীর্ঘ ইন্টারভিউ দিতে হয়েছে। আর এখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হবার জন্য ইন্টারভিউতে আমাকে একটি মাত্র প্রশ্ন করা হলো – “এমএসসিতে তোমার কী কী সাবজেক্ট ছিল?” এরকম চরম একটা প্রহসনের ভেতর দিয়ে নিজে না গেলে বিশ্বাসই করতে পারতাম না যে এরকমই হয়।

স্বাধীন বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে স্বায়ত্ত্বশাসন দেয়া হয়েছিল নিশ্চয়ই কোন মহৎ উদ্দেশ্যে। জ্ঞানচর্চার পরিবেশ তৈরিতে যেন অহেতুক আমলাতান্ত্রিক জটিলতার সৃষ্টি না হয় – সেজন্য। কিন্তু তার সুযোগে যে স্বেচ্ছাচারিতা শুরু হয়েছে তার শেষ কোথায় জানি না। স্বপ্নভঙ্গ হবার পরে মনে হচ্ছে প্রামাণিকস্যার ঠিক কথাই বলেছিলেন।

সময় থেমে থাকে না। নতুন দিন আসে। দু’দিন পর শাহীন কলেজ থেকে নিয়োগপত্র পেলাম। জীবনের প্রথম যে চাকরির পরীক্ষা দিয়েছি – সেই চাকরির নিয়োগপত্র পেয়েছি। শাহীন কলেজের নিয়োগকর্তারা আমাকে যোগ্য মনে করেছেন। এবার আমারই দায়িত্ব যোগ্য হয়ে ওঠা। নভেম্বরের চৌদ্দ তারিখ শাহীন কলেজে যোগ দিলাম। শিক্ষক পদে যোগ দিলেই সত্যিকারের শিক্ষক হওয়া যায় না। শিক্ষার্থীদের সাথে নতুন করে শিখতে শিখতেই শিক্ষক হয়ে ওঠার সাধনা করতে হয়। বছর শেষে পরীক্ষায় পাস করলেই শিক্ষার্থীদের কাজ শেষ। একই ক্লাসের পড়া তাদের আর পড়তে হয় না। কিন্তু শিক্ষকদের সেই সুযোগ নেই। তাঁদের প্রতি বছরই নতুন শিক্ষার্থীদের সাথে নতুন করে পড়তে হয়। আমি আবার নতুন করে উচ্চমাধ্যমিকের পদার্থবিজ্ঞান পড়তে শুরু করলাম। তারপর শিক্ষক হয়ে ওঠার চেষ্টা করতে করতে সাড়ে চার বছর কেটে গেছে শাহীন কলেজে। সেই কাহিনি অন্য কোথাও বলা যাবে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কথায় ফিরে আসি। সেবার দুইটি পদে তিনজনকে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ে নাকি নিজেদের লোক থাকলে তাদের জন্য পদ তৈরি করা যায়। ইচ্ছে করলে একটি পদের বিপরীতে একাধিক লোক নিয়োগ দেয়া যায়। হারুনকে নেয়া হয়েছিল সেই সময়। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান শামসুল হকের নিজের একজন প্রার্থী ছিলেন। সেই ওবায়েদ সাহেবকেও নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। শুনেছি তিনি যোগ দিয়েই চলে গিয়েছিলেন জাহাঙ্গীর নগরে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে আমার সম্পর্ক কি একটা ইন্টারভিউতেই শেষ হয়ে যাবে? অরুনস্যার অবশ্য সেরকমই উপদেশ দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, “মাথায় ঘিলু থাকলে আর এইমুখো হবি না। পারলে আমেরিকা চলে যা। ওখানে গিয়ে কুলিগিরি করাও ভালো।“

কিন্তু আমার মাথায় ‘ঘিলু’ খুব একটা নেই। আমি অরুনস্যারের পরামর্শ না মেনে দু’বছর পর  চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকচারার হবার জন্য আবার দরখাস্ত করেছিলাম। তখন নুরুল মোস্তফাস্যার ডিপার্টমেন্টের চেয়ারম্যান। আবারো এক্সটার্নাল হয়ে এসেছিলেন প্রফেসর শামসুল হক। সেবার হারুন আর রফিকভাইয়ের সাথে আবার দেখা হয়েছিল। তাঁরা দু’জনই গিয়েছিলেন সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতির জন্য। আমার ক্ষেত্রে আবারো একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি। বিষয়ভিত্তিক কোন প্রশ্ন নেই। শুধুমাত্র নিয়ম রক্ষার খাতিরে সার্টিফিকেট মার্কশিটে চোখ বুলাতে বুলাতে উপদেশ দেয়া – ‘বিসিএস দাও, চেষ্টা করতে থাকো।‘

চেষ্টা করতেই থাকলাম। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে তৃতীয় এবং শেষবার ইন্টারভিউ দিলাম ১৯৯৬ সালে। তখন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসেছে দীর্ঘ একুশ বছর পর। আশা করেছিলাম পুরনো অনিয়মগুলি দূর হয়ে যাবে। কিন্তু হয়নি। সেবার সিলেকশান কমিটিতে প্রামাণিকস্যার ছিলেন। আমি সত্যিই আশা করেছিলাম ভালো কিছু হবে। হয়নি। পরে প্রামাণিকস্যার বলেছিলেন, "সরকার পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু তোমার ধর্ম তো পরিবর্তন হয়নি।“

দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়েও আমি ইন্টারভিউ দিয়েছি। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইন্টারভিউ দিতে গিয়ে ক্লাসমেটদের কয়েকজনের সাথে দেখা হয়েছিল। আনন্দ আর দীলিপও ইন্টারভিউ দিয়েছিল। কারোরই হয়নি। জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ইন্টারভিউ দিয়েছিলাম। প্রচন্ড বৃষ্টির মধ্যে এতদূর থেকে ইন্টারভিউ দিতে গিয়েছি দেখে ডিপার্টমেন্টের একজন শিক্ষক হাসতে হাসতে বলেছিলেন, “সহজ ব্যাপারগুলি কেন যে আপনারা বোঝেন না! একটু ভেতরের খবর নেবেন না? এসব ইন্টারভিউ হচ্ছে চাকরি রেগুলারাইজ করার জন্য।“

ভেতরের খবর কীভাবে পাওয়া যায় আমি জানি না। খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দেখে দরখাস্ত করেছিলাম। এটাই তো নিয়ম বলে জানতাম। এর ভেতর যে ভেতরের খবর নিতে হয় সেই খবর আমার জানা ছিল না।

আরেকজন তরুণ শিক্ষক আরো জোরে হাসতে হাসতে বলেছিলেন, “চিটাগং থেকে এসেছেন, ডক্টর ইউনুসের সুপারিশ নিয়ে আসেননি তো আবার? তাহলে তো আমাদের কপাল পুড়বে। হাহাহা।“ তখন সেখানে ফিজিক্স ডিপার্টমেন্টের চেয়ারপার্সন ছিলেন প্রফেসর আফরোজি ইউনুস। তিনি যে ডক্টর ইউনুসের স্ত্রী তা আমি জানতাম না। সেই শিক্ষকদের হাসিঠাট্টা আমার কাছে খুবই অপমানজনক মনে হয়েছিল। এই তরুণ লেকচারাররা কয়েক বছর পরেই প্রফেসর হয়ে যাবেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের দন্ডমুন্ডের মালিক হবেন। এখনই তাঁরা যা করছেন, তখন যে কী করবেন ভাবতেই ভয় হচ্ছিল।  

দিন যায়, কিন্তু মাথার ভেতর থেকে প্রফেসর শামসুল হকের কথাগুলি যায় না। কথাগুলি মাথার মধ্যে পেরেকের মতো গেঁথে গেছে – ‘এমএসসিটা আসলে তেমন কোন ডিগ্রি নয়। এমফিল করো, পিএইচডি করো।‘ কিন্তু কীভাবে? দেশের বাইরে গিয়ে পিএইচডি করতে হলে স্কলারশিপ পেতে হবে। কীভাবে পাওয়া যায় স্কলারশিপ, কারা দেয় – কোনো ধারণা নেই। 

পরের পর্ব >>>>>>>>>>>

<<<<<< আগের পর্ব

Latest Post

চিকিৎসাবিজ্ঞানে যান্ত্রিক বুদ্ধিমত্তা

  ধীরে ধীরে চোখের আলো নিভে আসছিলো রিস হিবার্টের। পৃথিবীর আলো দেখার আশা ছেড়েই দিতে হয়েছিল তাঁকে। দু’বছর আগেও বেশ সুস্থ স্বাভাবিক ছিলেন তিনি। ...

Popular Posts