Wednesday, 3 February 2021

স্বপ্নলোকের চাবি - পর্ব ৪

 



০৪

সাহা স্যারের ক্লাস করতে করতে ‘প্রোপার্টিজ অব হিট’  যতটুকু বুঝতে পেরেছি তাতে জানি - তাপ দিলে পদার্থের পরমাণুগুলির কম্পন বেড়ে যায়। তারা তখন স্বাভাবিক তাপমাত্রায় যতটা ছটফট করতো তার চেয়ে বেশি ছটফট করতে থাকে। সেই তত্ত্ব শুধু মানুষের পরমাণু নয় – সম্পূর্ণ মানুষের উপরও যে কাজ করে তা চোখের সামনেই দেখতে পাচ্ছি। ট্রেনের বগিতে লোকসংখ্যা যত বাড়ছে, বগির ভেতর আগস্ট মাসের ভ্যাপসা গরমও ততোই বাড়ছে। আর এই গরমের মধ্যেই পারস্পরিক দূরত্ব কমাতে হচ্ছে বলে যীশু আর অর্পণের ছটফটানিও তত বাড়ছে। অর্পণ হাতের রুমাল দিয়ে মুখের ঘাম মুছতে মুছতে রাগে থমথম করছে। আর যীশু একটু পর পর দাঁত্মুখ খিঁচে নিজের মাথার ছোট ছোট চুলধরে টানার চেষ্টা করছে। মনে হচ্ছে চুলগুলি আর একটু লম্বা হলে গোছাশুদ্ধ উপড়ে ফেলতো।

 

এই দু’জনের কেউই ট্রেনে যাতায়াত পছন্দ করে না। ট্রেনে যাবার কথা শুনে যীশু দু’দিন আগেই বলেছিল, “না না, ট্রেনে আমি যাচ্ছি না। যে রকম ‘হাম্বুরি হাম্বুরি’ যায় তাতে ‘বেইন্নাই’ মেজাজ গরম হয়ে যায়। তার চেয়ে বাস অনেক ভালো আমার জন্য।“ অর্পণ দুই হাত শূন্যে তুলে নৃত্যসহকারে যীশুকে সমর্থন করেছিল। কিন্তু আজ তাদের দুজনকেই ঠাসাঠাসি ভীড়ের মধ্যে ট্রেনে যেতে হচ্ছে।

 

আজ অবশ্য অন্য কোন উপায় নেই। বাসের ভাড়া বৃদ্ধির দাবিতে পরিবহন ধর্মঘট আজ। অর্পণ-যীশুর মতো আরো অনেক ট্রেন-বিদ্বেষীকেও আজ ট্রেনে যেতে হচ্ছে। তাই এত ভীড়। আমি সকালে ষোলশহরের বদলে বটতলি স্টেশনে গিয়েও সিট পেলাম না। অর্পণ আর যীশুও বটতলি স্টেশনে গিয়েছে আমার একটু পর।

 

শুরুতে বগির ভেতর কিছুটা হাঁটাচলার জায়গা ছিল। ষোলশহর স্টেশনে এসে থামার পর থেকে যে যেভাবে পারে ঠেসে ঢুকে যাচ্ছে। বগির দুপাশের দরজাই খোলা। আমরা যথাসম্ভব দরজার কাছে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছি যেন কিছুটা বাতাস গায়ে লাগে। ট্রেনের একদিকে প্লাটফরম – সেদিক থেকে তো উঠছেই, অন্যদিকে রেললাইন ধরে হেঁটে এসেও ট্রেনে উঠছে অনেকে। হঠাৎ “অ্যাই প্রদীপ, অ্যাই” – মনে হচ্ছে অত্যন্ত ক্ষীণকন্ঠে আমার নাম ধরে ডাকছে কেউ। দেখলাম সিঁড়ির কাছে নিচে দাঁড়িয়ে আছে আমাদের ক্লাসের সবচেয়ে লম্বা সবচেয়ে চিকন মেয়ে শবনম।

 

“উঠে এসো।“ বললাম বটে, কিন্তু সিঁড়িতে যে দুজন ছাত্রী বসে আছেন তাঁরা উঠে শবনমকে ট্রেনে ওঠার সুযোগ করে দেয়ার ব্যাপারে কোন ইচ্ছা প্রকাশ করলেন না।

 

“আমার ব্যাগটা ধরো” – শবনম চিঁচিঁ করে বললো আবার। সিঁড়িতে উপবিষ্টাদের মাথার উপর দিয়ে হাত বাড়িয়ে শবনমের ব্যাগটা হাতে নিতেই সেটা ঠাস করে লাগলো একজনের মাথায়। ব্যাগটা যে এত ভারী হবে তা আমি চিন্তাও করিনি। তাই হঠাৎ গ্রাভিটি বেশি কাজ করে ফেলেছে। তাতে অবশ্য ভালোই হয়েছে। মাথায় বাড়ি খেয়ে তিনি উঠে দাঁড়িয়েছেন, শবনমও সেই সুযোগে উঠে এলো। ট্রেন ছেড়ে দিলো।

 

“তুমি এদিক দিয়ে কীভাবে এলে?” – শবনমকে প্রশ্ন করলাম।

“আমার বাসা এদিকে। ফরেস্ট কলোনি।“

“ও”

তারপর সে কী বললো তা আর শুনতে পেলাম না। মনে হচ্ছে তার কথার কম্পাঙ্ক ২০ হার্টজের কম, যা আমার শ্রবণ-ক্ষমতার বাইরে। কিন্তু দেখলাম - যে যীশু এতক্ষণ ধরে ট্রেনের বেশি ভীড় আর কম গতির কারণে বিরক্ত ছিল – সে খুব হেসে হেসে গল্প শুরু করে দিয়েছে শবনমের সাথে। শবনমের ইনফ্রাসোনিক সাউন্ড সে কীভাবে শুনছে কে জানে।

 

ইউনিভার্সিটির শাটল ট্রেনে যাতায়াত আমার বেশ ভালোই লাগে। যীশু যেটাকে ‘হাম্বুরি হাম্বুরি’ বা হামাগুড়ি দিয়ে চলা বলছে – সেই আস্তে আস্তে থামতে থামতে ঢিমেতালে চলতে চলতে  দু’পাশের দৃশ্যগুলি মুখস্থ করতে করতে যাওয়া বেশ লাগে আমার। তাছাড়া ট্রেনের ভেতর কত রকমের মজা হয়, তাস খেলা হয়, সুরে-বেসুরে গান চলে, মাঝে মাঝে হাতাহাতি ঠিক না হলেও হাতাহাতির উপক্রম হয়, আর জনতার মাঝেই নির্জনতার সুযোগে মান-অভিমান, রাগ-অনুরাগের পালাও চোখে পড়ে। আর বন্ধুদের সাথে গল্প তো আছেই। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো পুরো ট্রেনটা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীতে ভর্তি – সব যাত্রীই কোন না কোনভাবে সতীর্থ।

 

চৌধুরি হাট স্টেশন থেকে প্রদীপ উঠে। অন্যদিন দরজায় দাঁড়িয়ে তাকে হাত দেখাই। আজ ঠাসাঠাসি ভিড়ে সেই সুযোগ নেই। কিন্তু হাত না দেখালেও সে জানে আমি ইঞ্জিনের পরের বগিতে উঠি। সেখানেই উঠবে সে। গলা উঁচু করে দেখলাম প্লাটফরমে সে সেই দূরত্বেই দাঁড়িয়ে আছে। ভেবেছিলাম সে সম্ভবত উঠতে পারবে না। কিন্তু না, শাটল ট্রেনে যত ভীড়ই হোক – কীভাবে যেন সবার জায়গা হয়ে যায়। শিক্ষার্থীদের ভেতর এই যে একটা পারস্পরিক সহযোগিতা কাজ করে তা দেখলে বেশ ভালো লাগে। অথচ ক্যাম্পাসে বা হলে রাজনৈতিক মতভিন্নতার ব্যাপারে এক চুলও ছাড় দেয় না কেউ কাউকে।

 

ট্রেন থেকে নেমে দেখলাম একটা বাসও নেই আজ। পরিবহন ধর্মঘটের কারণে সমিতিভুক্ত কোন যানবাহন আজ চলছে না। আমরা হাঁটতে শুরু করলাম।

 

আমাদের ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসটি যে কত বিশাল তার সামান্য একটু ধারণা পেয়েছি ক্লাস শুরু হবার পর এই এক মাসে। প্রদীপ ইউনিভার্সিটি কলেজের স্টুডেন্ট ছিল। এই ক্যাম্পাসে টিচারদের ছেলেমেয়েদের অনেকেই তার বন্ধু। তার কাছ থেকে ক্যাম্পাসের অনেক কিছু চিনতে পেরেছি। এক নম্বর গেট থেকে কয়েক কিলোমিটার ভিতরে বিশ্ববিদ্যালয় ট্রেন স্টেশন। স্টেশনসহ গেটের ভেতরের সবুজ-পাহাড়পর্বতসহ প্রায় সতের শ একর জায়গা নিয়ে এই ক্যাম্পাস। বাংলাদেশের আর কোন ইউনিভার্সিটির এত বড় ক্যাম্পাস নেই। কিন্তু এত বড় ক্যাম্পাসের সামান্য কিছু অংশেই শুধু আমাদের যাতায়াত।

 

রেলস্টেশন থেকে বের হয়ে ইউনিভার্সিটির মেইন গেট দিয়ে ঢুকে রাস্তা চলে গেছে ডানদিকে। কিন্তু বামদিকেও একটি সরু পিচঢালা রাস্তা আছে। ওদিকে অনেক স্যার-ম্যাডামের বাসা। সোজাসুজি পাহাড়ের মাঝখানে ছোট্ট পায়ে চলা পাহাড়ি পথ। ওই পথ দিয়ে হেঁটে গেলে বাসের আগেই ফ্যাকাল্টিতে পৌঁছে যাওয়া যায়। আমরা আজ হাঁটছি এই পথে। বৃষ্টির পানিতে রাস্তা ভিজে গেছে। কিছু কিছু জায়গায় কাদা জমে গেছে।  এদিকে এখনো প্রপার কোন রাস্তা হয়নি। তবে ইউনিভার্সিটির মাস্টার প্ল্যানে নাকি এদিকে একটি সংযোগ সড়ক হবার কথা আছে।

 

যেপথে এখন বাস চলে সেই সড়ক ডানদিকে। স্টেশনের কয়েক শ মিটার পরেই শাহজালাল হল। লাল ইটের তৈরি এই হলটি অনেক বড়। শাহজালালের পাশেই শাহ আমানত হল। এই হলটিও অনেক বড়। পাঁচ তলা আধুনিক বিল্ডিং-এর একটা অংশ একেবারে রাস্তার পাশে এসে পৌঁছেছে। হলের সামনে রাস্তার অন্যপাশে গড়ে উঠেছে সারি সারি দোকান। বেশিরভাগই রেস্টুরেন্ট। হলের ছাত্রদের আনাগোনা এখানে লেগেই থাকে। সকালে বাসে যাবার সময় দেখা যায় সারি সারি টুল-টেবিলের কোনটাই খালি নেই। খাবারের প্লেট সামনে নিয়ে অনেকেই তাকিয়ে থাকে চলন্ত বাসের জানালার দিকে।

 

আমানত হলের পর রাস্তার বামপাশে অনেকটা খালি জায়গা। সেখানে সবুজ ঘাস, মাঝে মাঝে কয়েকটা ছোট্ট গাছ – মনে হয় কিছুদিন আগেই মাত্র লাগানো হয়েছে। এখানে রাস্তা ঘুরে গেছে বামে। ডানপাশে সোহরাওয়ার্দী হল। বেশ কয়েকটি সাদা রঙের দোতলা বিল্ডিং পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে। হলগুলির মধ্যে মনে হয় এই হলটিই সবচেয়ে ছোট। ইউনিভার্সিটির সব শিক্ষার্থীকেই কোন না কোন হলের সাথে সংযুক্ত থাকতে হয়। আমি কেন সোহরাওয়ার্দী হলের সাথে সংযুক্ত হয়েছি জানি না।

 

সোহরাওয়ার্দী হলের সামনে দিয়ে রাস্তা চলে গেছে আরো ভেতরের দিকে। সেদিকে  এ এফ রহমান হল, এবং আলাওল হল এবং ইউনিভার্সিটি কলেজ, খেলার মাঠ, মেডিক্যাল সেন্টার এবং ভিসির কার্যালয় ও প্রশাসনিক ভবন। ক্যাম্পাসের যেসব বাসে আমরা চড়ি – সেই বাসগুলির কোনটাই এদিকে যায় না। সেগুলি সোহরাওয়ার্দী হলের সামনে এসে বামে মোড় নিয়ে সোজা চলে যায়। দুপাশে খালি সবুজ মাঠ পেরিয়ে পৌঁছে যায় শহীদ মিনারের সামনে।

 

আজ আমরা পাহাড়ের ভেতর দিয়ে হেঁটে চলে এলাম শহীদ মিনার চত্বরে। শহীদ মিনারের চত্বরটা বেশ সুন্দর। লাল ইটের তৈরি শহীদ স্তম্ভ দেখলে মনে হয় ছোপ ছোপ রক্ত লেগে আছে সেখানে – যে রক্তের উত্তরাধিকার আমরা বহন করছি। শহীদ মিনার থেকে বাম দিকের রাস্তা চলে গেছে শামসুন্নাহার হলের দিকে। তারও পরে বোটানিক্যাল গার্ডেন। একদিন যেতে হবে বোটানিক্যাল গার্ডেনে।

 

শহীদ মিনার থেকে সোজা হেঁটে চলে এলাম চাকসু ভবনে। সায়েন্স ফ্যাকাল্টিতে যাবার রাস্তায় তিন তলা সাদা ভবনটি বেশ সুন্দর। চাকসু ভবন, কিন্তু চাকসুর নির্বাচন হচ্ছে না অনেক বছর ধরে। ক্যাম্পাসের প্রায় সবকিছুই এখন জাতীয় ছাত্রসমাজের দখলে। নিচের তলায় ডানদিকে ক্যাফেটরিয়া, বামদিকে অনেকগুলি টেবিল চেয়ার নিয়ে বসার জায়গা, আর ছাত্রদের টয়লেট।

 

ক্যাফেটরিয়ায় ঢুকলাম সবাই মিলে। আজ বাস নেই বলে এখনো তেমন ভীড় হয়নি। অন্যদিন এতক্ষণে লম্বা লাইন হয়ে যায়। এখানে খাবারের দাম তুলনামূলকভাবে কম। সকালে সিঙাড়া আর কেক পাওয়া যায়। দুপুরে ভাত আর মাংস অথবা মাছ। খাবারের মান হলের খাবারের মতোই। তবে খাবার বেশ গরম গরম পাওয়া যায়, কোন বাসী খাবার থাকে না। একটা নির্দিষ্ট পরিমাণে তৈরি করা হয়, এবং আগে এলে আগে পাবেন ভিত্তিতে ঐটুকুই বিক্রি করা হয়। কাউন্টার থেকে দাম দিয়ে সিঙাড়ার টিকেট নিয়ে ডেলিভারি কাউন্টার থেকে ট্রে-তে সিঙাড়া নিয়ে গিয়ে বসলাম বাম দিকের রুমে। টয়লেটে যেতে হবে।

 

আজ টয়লেটেও তেমন ভীড় নেই। কিন্তু এত সকালেও তীব্র ঝাঁজালো দুর্গন্ধে বমি আসার জোগাড়। এত বড় বিশ্ববিদ্যালয়, অথচ এখানে ছাত্রদের একটা টয়লেটও ঠিকমতো পরিষ্কার করা হয় না। ছাত্রীদের টয়লেটগুলির কী অবস্থা জানি না। তবে সেগুলির অবস্থাও যে খুব একটা ভালো হবে তা আশা করা যায় না। ইউনিভার্সিটিতে যতজন শিক্ষক আছেন, তার তিনগুণ আছেন কর্মচারী। তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের শক্তিশালী সংগঠন আছে তাঁদের স্বার্থ দেখার জন্য। কিন্তু তাঁদের কাজ দেখার জন্য কেউ আছেন বলে মনে হয় না। ফ্যাকাল্টির টয়লেটগুলিতে ঢুকলে মনে হয় এগুলি তৈরি হবার পর থেকে একবারও কেউ পরিষ্কার করেনি। অথচ ইউনিভার্সিটিতে যতগুলি টয়লেট আছে, সুইপার পদে লোক আছে  তার চেয়েও বেশি।

 

মোবাশ্বের স্যারের ক্লাস-টেস্ট আছে আজ। তিনি বলেছেন যে কোনদিন যে কোন ক্লাসে তিনি পরীক্ষা নিতে পারেন। পরীক্ষার ফরম্যাট লিখিত কিংবা মৌখিক যে কোনটাই হতে পারে। মোবাশ্বের স্যারের ক্লাসে খুব ভয়ে ভয়ে থাকি আমি। এর আগে দু’দিন তাঁর প্রশ্নের উত্তর দিতে পারিনি। উত্তর দিতে না পারলে তিনি ক্লাসের এক কোণায় দাঁড় করিয়ে রাখেন। এরকম শাস্তি মনে হয় এখন স্কুলেও দেয়া হয় না। আজ কী অবস্থা হবে কে জানে। রেজনিক হ্যালিডে’র বই থেকে থার্মোডায়নামিক্স পড়াচ্ছেন তিনি। আর্টস ফ্যাকাল্টির কোণায় অগ্রণী ব্যাংকের সামনে একটা ছোট্ট বইয়ের দোকান আছে। বেশিরভাগই পুরনো বই। সম্ভবত তিনি পুরনো বইয়ের বেচা-কেনা দুটোই করেন। সময় পেলেই ওখানে ঢু মেরে আসি – যদি কোন দরকারি বই পাওয়া যায়। রেজনিক হ্যালিডে পার্ট-ওয়ান পেয়েছি কয়েকদিন আগে। বই কিনতে যেরকম উৎসাহ থাকে, বই খুলে পড়তে গেলে সেই উৎসাহ কোথায় যেন পালিয়ে যায়। ফিজিক্স তো এমনিতেই জটিল, ইংরেজিতে লেখা ফিজিক্স আরো জটিল মনে হয়। আর যখন মনে হয় মোবাশ্বের স্যার প্রশ্ন জিজ্ঞেস করবেন – তখন পুরো ব্যাপারটা আরো জটিল হয়ে ওঠে।

 

“কী রে, পকেটে কী? সিগারেট নাকি?”

মোবাশ্বের স্যার ক্লাসে ঢুকেই  সবার পকেট চেক করতে শুরু করেছেন।

“পড়াশোনার নাম নেই, সুযোগ পেলেই বিড়ি ফোক” বলতে বলতে ফারুকের শার্টের পকেটে হাত ঢুকিয়ে “ইউরেকা” টাইপের উল্লসিত হয়ে কিছু একটা বের করে এনে চোখের সামনে ধরলেন। একটা সাদা বেলী ফুল। নিউট্রন জেনারেটর বিল্ডিং-এর সামনে অনেক বেলী ফুটে আছে। ফারুক ওখান থেকে একটা তুলে পকেটে রেখেছিল। বেলীর গন্ধটা খুব ভালো লাগে। আমার পকেটেও একটা আছে। বিড়ির বদলে বেলী দেখে মনে হলো খুব হতাশ হয়ে গেছেন মোবাশ্বের স্যার। বিরক্ত স্বরে বললেন, “পকেটে ফুল নিয়ে ঘুরছো মেয়েদেরকে দেয়ার জন্য? কোন লাভ নেই। ফুল দিয়ে লাভ হয় না আজকাল।“ আমি শুনলাম ফুল দিয়ে LOVE হয় না আজকাল। পকেটের ফুলটাকে এখন কোথায় লুকাই?

স্বপ্নলোকের চাবি - পর্ব ৩

 



০৩

“হায় চিল, সোনালী ডানার চিল, এই ভিজে মেঘের দুপুরে…”

দল বেঁধে ক্লাসে ঢুকেই কবিতা পেয়ে গেলো ফারুকের। অনেক কবিতা তার মুখস্থ। যখন তখন কবিতা বের হয় তার মুখ দিয়ে।  তার মাথাভর্তি ঝাঁকড়া চুল, বিশাল শরীর, আর উচ্চস্বরের হাসির সাথে পদার্থবিজ্ঞান ঠিক মেলে না। পদার্থবিজ্ঞানের আদর্শ ছাত্রদের যে গাম্ভীর্য আমরা মোবাশ্বের স্যারের বর্ণনায় পাই, তার একটুও দেখা যায় না ফারুকের মধ্যে। অবশ্য এ ক’দিনে আমরা যারা সহপাঠী থেকে বন্ধু হয়ে গিয়েছি তাদের কারো মধ্যেই কি আছে সেই ‘আদর্শ গাম্ভীর্য’? যীশু, মৃণাল, আরিফ, হাবিব, আশফাক, মামুন, স্বপন, শাকিল, মিজান, হাফিজ, ইকবাল – কেউই গম্ভীর নয়। ক্লাসে আরো একজন প্রদীপ আছে –গম্ভীর তো নয়ই, বরং আমার মতোই হাসির রোগ আছে তারও। প্রচন্ড ভাবগম্ভীর পরিবেশেও হাসি পেয়ে যায় আমাদের। এই যেমন - ফারুকের উদাত্ত গলায় “হায় চিল, সোনালী ডানার চিল, এই ভেজা মেঘের দুপুরে” বলার সাথে সাথেই যীশু চেঁচিয়ে উঠলো “হায় কাক, কালো পাখনার কাক, কা কা করো রে।” আর আমরা হেসে উঠলাম উচ্চস্বরে। সেই হাসি থামলো বেশ কিছুক্ষণ পর – যখন ক্লাসে একজন নতুন স্যার ঢুকলেন।

 

প্রায় ছয় ফুট লম্বা, নীল জিন্‌স আর কালো টি-শার্টে নুরুল ইসলাম স্যারকে ‘লাভ ইন সিঙ্গাপুর’ সিনেমার নায়ক মাহমুদ কলির মতো লাগছে। মোবাশ্বের স্যার যে কথাগুলি বলেছিলেন - ফিজিক্স এমন একটা সাবজেক্ট যা শরীরের রসকষ সব নিংড়ে নিয়ে তোমাকে ছোবড়া করে দেবে – তার কোন প্রমাণ পাচ্ছি না নুরুল ইসলাম স্যারকে দেখে। প্রামাণিক স্যার প্রথম ক্লাসেই যেরকম ঝড়ের বেগে সমীকরণের পর সমীকরণ লিখে খটমট ম্যাথম্যাটিক্যাল ফিজিক্সকে যেরকম ভয়াবহ করে তুলেছিলেন, নুরুল ইসলাম স্যার এসে আমাদের সেই ভয় অনেকটাই কাটিয়ে দিলেন। শুরু করলেন ভেক্টর অ্যান্ড টেনসর এনালাইসিস দিয়ে।

 

পদার্থবিজ্ঞানের ভাষা হলো গণিত। কিন্তু বড় বড় গাণিতিক সমীকরণের মূল পদার্থবিজ্ঞানের নীতি যদি বোঝা না যায়, তাহলে সমীকরণগুলি হয়ে পড়ে অর্থহীন। ফিজিক্স আর ম্যাথম্যাটিক্সের মূল সংযোগটা ধরিয়ে দেয়াই ম্যাথম্যাটিক্যাল ফিজিক্সের মূল উদ্দেশ্য। কিন্তু এই মূল কাজটি আমার জন্য মোটেও সহজ ছিল না। নুরুল ইসলাম স্যারের পড়ানোর স্টাইল এই জটিল কাজটি অনেক সহজ করে দিলো। অ্যাঙ্গুলার মোমেন্টাম, টর্ক, ক্রস প্রডাক্ট ইত্যাদি বোঝানোর জন্য শুধু বোর্ডে বড় বড় সমীকরণ লিখেই দায়িত্ব শেষ করলেন না, বোঝানোর  সময় এক পায়ে দাঁড়িয়ে লাটিমের মতো ঘুরে গেলেন। স্যারের কাজকর্ম দেখে মনে হলো – কিছু কিছু ব্যাপার যেন বুঝতে পারছি। স্যার যখন চট্টগ্রামের আঞ্চলিক উচ্চারণে জিজ্ঞেস করলেন, “বুঝিত ফাইজ্জো?” – আমরা হেসে উঠলাম। স্যারও হেসে উঠলেন। আমরা নুরুল ইসলাম স্যারের ভক্ত হয়ে গেলাম।

 

আমাদের ফার্স্ট ইয়ারের তিনটি পেপারের জন্য সপ্তাহে তিনটি করে মোট নয়টি অনার্স ক্লাস। ফার্স্ট পেপার – ম্যাথম্যাটিক্যাল ফিজিক্সের দুটো ক্লাস নিচ্ছেন নুরুল ইসলাম স্যার, অন্য একটি ক্লাস প্রামাণিক স্যারের। সেকেন্ড পেপার - প্রোপার্টিজ অব ম্যাটার অ্যান্ড সাউন্ড।  প্রোপার্টিজ অব ম্যাটারের দুটো ক্লাস আর সাউন্ডের একটি। থার্ড পেপার - হিট অ্যান্ড থার্মোডায়নামিক্স। থার্মোডায়নামিক্সের দুটো ক্লাস, আর হিট সপ্তাহে একটি ক্লাস। বেশ নিয়মিত ক্লাস হচ্ছে। একেক স্যারের ব্যক্তিত্ব, পড়ানোর স্টাইল একেক রকম।

 

প্রপার্টিজ অব ম্যাটারের একটি টপিক পড়িয়েছিলেন দেবপ্রসাদ পাল স্যার। বেশ হাসিখুশি স্নিগ্ধ ব্যক্তিত্বের তরুণ দেবপ্রসাদ স্যারের পড়ানোর পদ্ধতি খুব ইফেক্টিভ এবং আকর্ষণীয় ছিল। কিন্তু কয়েকদিন পরেই স্যার বিদেশে চলে যান পিএইচডি করার জন্য। তাঁর পরে প্রপার্টিজ অব ম্যাটার পড়ানোর জন্য এলেন ফরাজী কামাল স্যার। প্রথম ক্লাসেই আমরা বুঝে গেলাম এমন প্রাণবন্ত শিক্ষক খুবই দুর্লভ। বোঝানোর কী দুর্দান্ত স্টাইল। যে টপিক পড়াচ্ছেন, সেটা বোঝার জন্য আমাদের যা যা জানা দরকার তার সবই বুঝিয়ে দিচ্ছেন। স্যারের হাতের চক-ডাস্টার ব্ল্যাকবোর্ডের উপর যেন জাদু দেখাচ্ছে। প্রতিটি সমীকরণ যেন জীবন্ত হয়ে উঠছে স্যারের বিশ্লেষণে। স্যারের ক্লাসে আমরা এতটাই মনোযোগী হয়ে গেলাম যে পঁয়তাল্লিশ মিনিট সময় কীভাবে চলে গেল টেরই পেলাম না।

 

বিভিন্ন স্যারের ক্লাস করার পর বুঝতে পারছি কোন সাবজেক্ট ভালোলাগা কিংবা খারাপলাগার অনেকটুকুই নির্ভর করে সেই সাবজেক্ট কীভাবে পড়ানো হচ্ছে তার উপর। একজন মানুষ অন্য একজন মানুষকে না বুঝেই হয়তো ভালোবাসতে পারে, কিন্তু ফিজিক্সের কিছু না বুঝেই ফিজিক্স ভালোবাসবে এমন সম্ভাবনা একেবারেই নেই বলা চলে। মনে হচ্ছে ফিজিক্সের কিছু কিছু টপিক ভালো লাগতে শুরু করেছে।

 

থার্ড পেপারের হিট পড়াচ্ছেন এস কে সাহা স্যার। তাঁর পুরো নাম  যে সরিৎ কুমার সাহা, তা বের করতে দু’দিন সময় লেগেছে আমাদের। প্রেমাংকর সরকার এ ব্যাপারে খুব দক্ষ।  স্যারদের ব্যাপারে তথ্য জোগাড় করতে ওস্তাদ লোক সে। প্রেমাংকরের কল্যাণে আমরা স্যারের পুরো নাম শুধু নয়, স্যার সম্পর্কে আরো অনেক কিছু জানলাম। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সনৎ কুমার সাহা স্যারের বড় ভাই। আমাদের প্রামাণিক স্যারের স্যার হলেন এস কে সাহা স্যার। ডিপার্টমেন্টের শুরুতে যে চার জন স্যার যোগ দিয়েছিলেন, সাহা স্যার তাঁদের একজন।

 

সাহা স্যারের সবকিছুই খুব পরিপাটি । স্যারের পোশাক পরিপাটি, পড়ানোর স্টাইল পরিপাটি। স্যার নিজে যেমন সুদর্শন, তাঁর উচ্চারণ আর বাচনভঙ্গিও সেরকম সুন্দর। স্যারের ব্যক্তিত্ব এত প্রখর যে স্যারের চোখের দিকে তাকাতে কেমন যেন অস্বস্তি লাগে। স্যারের হাতে হাতেলেখা নোট। ক্লাসের বিশাল ব্ল্যাকবোর্ডের প্রায় পুরোটাই ভরে উঠে ছোট ছোট অক্ষরে স্যারের সুন্দর হস্তাক্ষরে। ব্ল্যাকবোর্ডে এত ডিটেইল লিখতে আর কোন স্যার-ম্যাডামকে আমি দেখিনি। হাতের পুরো নোটই বোর্ডে লিখতেন সাহা স্যার। আমরা বোর্ড থেকে কপি করতে করতে অনেক সময়ই স্যারের কথার দিকে মন দিতে পারতাম না। ফলে ক্লাসের পড়া ক্লাসেই বোঝা হয়ে যেতো না। বরং জমতে জমতে পরে অনেক বড় বোঝা হয়ে দাঁড়াতো আমাদের জন্য।

 

এপর্যন্ত মোবাশ্বের স্যার ছাড়া আর কোন স্যারই নিজেদের লেখাপড়া কিংবা গবেষণা সম্পর্কে কোন কিছুই বলেননি ক্লাসে। আমরা স্যারদের সম্পর্কে যেটুকু জেনেছি তা কোন সুনির্দিষ্ট উৎস থেকে নয়, বরং ক্যাম্পাসে প্রচলিত বিভিন্ন গুজব কিংবা ধারণা থেকে। মোবাশ্বের স্যারও নিজের সম্পর্কে যেটুকু বলেছেন তাও খুব একটা উৎসাহজনক নয়। তিনি বলেছেন সোভিয়েত ইউনিয়নের তাসকন্দ বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করতে গিয়ে তাঁকে এত বেশি পরিশ্রম করতে হয়েছে যে তাঁর ভেতরের সব ‘রসকষ নিংড়ে ছোবড়া করে ছেড়ে দিয়েছে’। এটুকুই। এসব শুনলে পদার্থবিজ্ঞানের প্রতি কারো ভালোবাসা জন্মাবে? কিন্তু ফিজিক্সের প্রতি আমাদের ভালোবাসা জন্মালো কি জন্মালো না তাতে কোন স্যারেরই কিছু যায় আসে বলে মনে হচ্ছে না। বরং মনে হচ্ছে, আমরা নিজেদের ইচ্ছেয় ফিজিক্স পড়তে এসেছি, এখানে টিকে থাকার দায়িত্ব আমাদের নিজেদের। অথচ আমরা যে ফিজিক্স সম্পর্কে অনেক কিছু জেনে এবং বুঝে ফিজিক্সে ভর্তি হয়েছি তা নয়। অনেকে ভর্তি হয়েছি এখানে চান্স পেয়েছি বলে। আমাদের বেশিরভাগেরই ফিজিক্সে ভর্তির ঘটনা যতটুকু বাই চয়েজ, তার চেয়েও বেশি বাই চান্স।

 

“আচ্ছা, সাহা স্যার যে বইটার রেফারেন্স দিয়েছেন, সেটা কি স্যারের নিজের লেখা?” – সরোজের প্রশ্নে একটু অবাক হলাম। আমরা এসেছি দুপুরের খাবার খেতে সোহরাওয়ার্দীর মোড়ের ক্যান্টিনে। প্র্যাকটিক্যাল শুরু হচ্ছে আজ থেকে। আমাদের প্র্যাকটিক্যাল ক্লাস বিকেলে। সায়েন্স ফ্যাকাল্টির স্টুডেন্টদের সাথে আর্টস বা কমার্স ফ্যাকাল্টির প্রধান পার্থক্য হলো – সায়েন্সের স্টুডেন্টরা ক্যাম্পাসেই সূর্যাস্ত দেখে, আর বাকিরা দেখে না। থিওরি ক্লাসের পর ঘন্টাখানেক সময় পাওয়া যায় প্র্যাকটিক্যাল ক্লাসের আগে। সেই সময়ের মধ্যে দুপুরের ভাত খেয়ে আবার ডিপার্টমেন্টে হাজির হওয়া। যারা হলে থাকে – তাদের অনেক সুবিধা। রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে আসতে পারে। আমাদের এখনো সেই সুযোগ নেই। হলগুলির সামনের রাস্তায় অনেকগুলি রেস্টুরেন্ট আছে পাশাপাশি। কিছু প্রাইভেট ক্যান্টিনও আছে। সোহরাওয়ার্দী হলের কাছে রাস্তায় এই ক্যান্টিনটি বেশ বড় এবং পরিচ্ছন্ন। আলো-বাতাস প্রচুর বলে এখানেই আসি আমরা। যীশু, প্রদীপ, সরোজ, শিমুল, মুরাদ, কফিল আর আমি এসেছি।

 

“কোন্‌ বই?” – প্রদীপ প্রশ্ন করলো। আমি আর প্রদীপ একে অপরকে যখন নাম ধরে ডাকি – তখন মনে হয় নিজেই নিজেকে ডাকছি। বেশ মজাই লাগে। ক্লাসে আমাদেরকে আলাদাভাবে চেনার জন্য নাম দেয়া হয়েছে ‘লম্বা প্রদীপ’ আর ‘বেঁটে প্রদীপ’।

“হিট এর বই? সাহা অ্যান্ড শ্রীবাস্তব?”

“হ্যাঁ, এটা কি সাহা স্যারের নিজের লেখা বই?”

সরোজের এ প্রশ্ন করার সঙ্গত কারণ আছে। সাহা স্যার এই বইয়ের রেফারেন্স দিয়েছেন। কিন্তু বলে দিতে পারতেন এই বইয়ের লেখক এম এন সাহা কে। এই বইটি আমি কিছুদিন আগে কিনেছি অমর বইঘর থেকে। রেলওয়ে স্টেশনের সামনে উজালা সিনেমার পাশেই পুরনো বইয়ের দোকান অমর বইঘর – আমার নিয়মিত গন্তব্যের একটি। এম এন সাহা সম্পর্কে আমি কিছুটা জেনেছি এই বইয়ের লেখক পরিচিতি পড়ে। এম এন সাহা – মেঘনাদ সাহা আমাদের বাংলাদেশের সন্তান, কত বড় পদার্থবিজ্ঞানী – সে সম্পর্কে আমাদের জানানো কি স্যারদের দায়িত্ব নয়? শুধু সিলেবাসে যা আছে তার বাইরে কি কিছুই বলার নিয়ম নেই?

 

ক্যাম্পাসের বেশিরভাগ ছেলেমেয়ে যখন দেড়টার ট্রেনে শহরে চলে যাবার জন্য স্টেশনের দিকে যাচ্ছে, তখন আমরা প্র্যাকটিক্যাল করার জন্য ক্যাম্পাসে যাচ্ছি। সোহরাওয়ার্দীর মোড়ের শিরীষ গাছগুলি অনেক বড় হয়েছে। জুলাই মাসের গরমেও তাদের নিচে ছায়া, কিছু আরামদায়ক বাতাস। এসময় ক্যাম্পাসের দিকের বাসগুলি প্রায় খালিই থাকে। বাস আসতে একটু দেরি হচ্ছে। কফিল হঠাৎ বললো, “তোরা যা, আমি চলে যাচ্ছি।“

“প্র্যাকটিক্যাল করবি না?“

“না দোস্ত। তোদের সাথে আর ক্লাস করা হবে না।“

“ফিজিক্স ছেড়ে দিচ্ছিস?”

“হুঁ। ইঞ্জিনিয়ারিং-এ চান্স পেয়েছি।“

“খাওয়াদাওয়ার পরে বললি শয়তান?”

 

হাসতে হাসতে চলে গেল কফিল। তার সাথে আমার আর দেখা হয়নি কোনদিন। ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ সবেমাত্র বি-আই-টি হয়েছে। ভর্তিপরীক্ষা আমিও দিয়েছিলাম। ওয়েটিং লিস্টেও আসিনি। কফিলকে সারাদিন ক্লাস করতে দেখে ভেবেছিলাম সেও টিকেনি। কিন্তু সে ইউনিভার্সিটিতে এসে বলে গেলো, বিদায় নিয়ে গেলো, তাতেই বেশ ভালো লাগছে।

 

আমাদের প্র্যাকটিক্যাল ক্লাস তিনতলায়। রুম খোলার পর সবাই হুড়মুড় করে রুমে ঢুকলাম। কী করতে হবে কোন ধারণা নেই। বেশ বড় বড় উঁচু প্র্যাকটিক্যাল টেবিল। দুইটি পাশাপাশি রুমের মাঝখানের দরজা দিয়ে আসাযাওয়া করা যায়। রুমের সাথে লাগানো একটি ছোট রুমে টেবিল নিয়ে বসে আছেন একজন। ভাবলাম ডেমন্সট্রেটর। কিন্তু না, তিনি যন্ত্রপাতি দেবেন। কিন্তু আগে প্র্যাকটিক্যাল গ্রুপ তোইরি করতে হবে পাঁচ ছয় জনের।

 

যীশু, প্রদীপ, হাবিব, সাইদ, অর্পণ আর আমি এক গ্রুপে। সিলেবাসে ২২টি প্র্যাকটিক্যাল আছে ফার্স্ট ইয়ারে। তার মধ্যে আঠারোটির যন্ত্রপাতি আছে। আমাদেরকে এই আঠারোটি প্র্যাকটিক্যালের সবগুলিই করতে হবে। এক সপ্তাহে একটি করে। একেক সপ্তাহে একেক গ্রুপ একেকটি প্র্যাকটিক্যাল করবে। তার মানে ১৮টি গ্রুপ করা যাবে পুরো ক্লাসে। সিস্টেমটা ভালো। কিন্তু সবকিছু বুঝতে এবং গ্রুপ করতে এবং যন্ত্রপাতি নিতে নিতে আমরা এতই হৈ চৈ করতে শুরু করলাম যে একটু পরে চিৎকার চেঁচামেচির মধ্যে কেউ কারো কথা শুনতে পাচ্ছিলাম না। ফলে আরো জোরে জোরে কথা বলতে শুরু করলাম। বদ্ধ রুমের ভেতর মনে হচ্ছে সার্কাস চলছে। হঠাৎ প্রচন্ড গর্জন শোনা গেল – “শাট আপ”। আমার হাতে একটি তামার ক্যালরিমিটার ছিল। গর্জনের চোটে সেটা হাত থেকে মেঝেতে পড়ে তাম্রনাদ করে উঠলো। আরো জোরে আরেকটি গর্জন শোনা গেল – “শাট আপ আই সে।“

এভাবেই আমাদের প্রথম পরিচয় হলো ফিজিক্স ডিপার্টমেন্টের রাফ অ্যান্ড টাফ আদম শফিউল্লাহ স্যারের সাথে।

স্বপ্নলোকের চাবি - পর্ব ২




০২


আজ ফিজিক্সের প্রথম ক্লাস হচ্ছে। ফার্স্ট ইয়ারের ক্লাস শুরু হয়েছে দু’দিন আগে। প্রথম দিন অনার্সের ক্লাস ছিল না, সাবসিডিয়ারি ক্লাস হয়েছিল একটা।

 

দ্বিতীয় দিন ছিল ছাত্র-ধর্মঘট। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন এরশাদপন্থী জাতীয় ছাত্রসমাজের রাজত্ব চলছে। শুনেছি হলগুলি সব তাদের দখলে। ক্যাম্পাসে অন্য কোন দলের টুঁ শব্দ করার উপায় নেই। লীগ, দল, ইউনিয়ন, শিবির সবার দৌড় শহরের রেলস্টেশন পর্যন্ত। তাদের ডাকা ধর্মঘটের সর্বোচ্চ ফল হলো শাটল ট্রেন বন্ধ। তাই কাল আসতে পারিনি।

 

সায়েন্স ফ্যাকাল্টির দোতলা ও তিন তলায় ফিজিক্স ডিপার্টমেন্ট। কিন্তু ফার্স্ট ইয়ারের ক্লাস হচ্ছে সায়েন্স ফ্যাকাল্টি পার হয়ে রীতিমতো জঙ্গলের মধ্যে একটা একতলা ভবনে। এই ভবনের নাম নিউট্রন জেনারেটর বিল্ডিং। এই বিল্ডিং-এর পরেও ইউনিভার্সিটির আরো বিল্ডিং আছে।  ফরেস্ট্রি ডিপার্টমেন্ট আরো ভেতরে, আরো গভীর অরণ্যে। ফরেস্ট্রির পাশেই মেরিন সায়েন্স। সে হিসেবে মনে হচ্ছে নিউট্রন জেনারেটর বিল্ডিং-এর ভৌগোলিক অবস্থানকে খুব একটা গভীর জঙ্গল বলা চলে না।

 

লাল ইটের তৈরি একতলা নিউট্রন জেনারেটর বিল্ডিং-এর ঠিক কোথায় নিউট্রন জেনারেট করা হয় জানি না। নিউট্রন জেনারেট করতে গেলে কী ধরনের জেনারেটর লাগে সে সম্পর্কেও কোন ধারণা নেই। ফিজিক্সের কোন্‌ ইয়ারে এই ধারণা পাবো তাও জানি না। তবে ফার্স্ট ইয়ারেই এরকম একটা বিল্ডিং-এ ক্লাস করতে এসে বেশ অন্যরকম লাগছে। বিল্ডিং-এর সামনে ছোট্ট ইট বিছানো পথ। তার দুপাশে ফুলের বাগান। সেখানে বেশ কিছু নীলচে নয়নতারা দেখা যাচ্ছে। বিল্ডিং-এর মাঝখানে প্রশস্ত করিডোর কিছুটা অন্ধকার ছায়াময়। করিডোরের ডানদিকের প্রথম রুমেই আমাদের ক্লাস।

 

ক্লাসরুমটা বেশ বড়, অনেকটা বর্গাকার। দু’পাশে জানালাহীন দেয়াল, আর অন্য দু’পাশে বেশ বড় বড় শিকওয়ালা জানালা। পেছনের দিকের জানালা দিয়ে তাকালেই চোখে পড়ে সবুজ বুনোঝোপে ভর্তি পাহাড়। মনে হয় পাহাড় কেটে তৈরি করা হয়েছে এই বিল্ডিং। এই সকালের রোদ পাহাড়ের গায়ে লেগে ফিরে যাচ্ছে বাইরে, রুমের জানালা দিয়ে খুব বেশি ঢোকার সুযোগ পাচ্ছে না। অন্যদিকের জানালা বারান্দার সাথে লাগানো। সেদিকে ঘঁষা কাচের মতো বিক্ষিপ্ত রোদ।

 

রুমে ঢুকে দেখলাম সাত আটজন মেয়ে বসে আছে দেয়ালের পাশের কয়েকটা বেঞ্চে। ফিজিক্সের এক শ শিক্ষার্থীর মধ্যে কতজন মেয়ে ভর্তি হয়েছে এখনো জানি না। তবে কেমিস্ট্রি, বোটানি কিংবা জুলজি’র চেয়ে ফিজিক্সে মেয়েদের সংখ্যা অনেক কম। গণিতে আরো কম। আমাদের ব্যাচে মাত্র তিনজন মেয়ে ভর্তি হয়েছে গণিতে।

 

ছেলেরা রুমের ভেতর বিক্ষিপ্তভাবে চলাফেরা করছে। টিচার আসার আগে ক্লাসের ভেতর উদ্দেশ্যহীন মুক্তচলাচল এবং মুক্তআলোচনা উভয়ই চলে। এখানেও তার ব্যতিক্রম নেই। আমি পারতপক্ষে ফার্স্ট বেঞ্চে বসি না। ক্লাসের ফার্স্ট বেঞ্চ এবং লাস্ট বেঞ্চের দিকে টিচারদের নজর বেশি থাকে বলে আমার ধারণা। এই দুই অঞ্চলকে বলা চলে টিচারদের টার্গেট জোন। এই টার্গেট জোনের বাইরে ক্লাসরুমের মাঝামাঝি একটা নিরপেক্ষ অঞ্চল বেছে নিয়ে বসলাম। আশেপাশে পারস্পরিক পরিচয়ের আদানপ্রদান সংক্রান্ত মিথস্ক্রিয়া চলছে। এই প্রক্রিয়ায় অংশ না নিয়ে আমি পর্যায় সারণির সর্বডানের কলামের নিষ্ক্রিয় গ্যাসগুলির মতো বসে রইলাম। অনেকক্ষণ পর - এপর্যন্ত ক্লাসের যে দু’জনের সাথে আমার পরিচয় হয়েছে – কফিল এবং অর্পণ – তারা রুমে ঢুকলো আরো অনেকের সাথে। কফিল আমার বেঞ্চে বসতে বসতে বললো, “তুই কি বাসে এসেছিস? ভালো করেছিস। ট্রেন অনেক লেট করেছে আজ। তুই কি জানতি যে ট্রেন লেট করবে?”

“আরে না। আমি ঘুম থেকে উঠতে দেরি করেছি। ট্রেন মিস করবো ভেবেই ষোলশহর না গিয়ে সরাসরি মুরাদপুর চলে গিয়েছিলাম। হাটহাজারির বাসে এসেছি।“

 

বাসে এলে ট্রেনের আগে আসা যায়। হাটহাজারির বাসে না উঠে রাউজান বা রাঙ্গামাটির বাসে উঠতে পারলে আরো আগে আসা যায়। তবে রাঙ্গামাটির বাসে সিট পাওয়া যায় না, দাঁড়িয়ে আসতে হয়।

 

“এখন কোন্‌ স্যারের ক্লাস জানো?” – প্রশ্নকর্তা আমার সামনের বেঞ্চে বসে ঘাড় ফিরিয়ে প্রশ্ন করেছে। একটু পরেই তার সাথে পরিচয় হলো – আরিফ সাঈদ সুমন। একটু পরেই বারান্দায় যারা ঘুরাঘুরি করছিলো তারা সবাই দ্রুত রুমে ঢুকে গেলো। স্যার আসছেন।

 

এক হাতে ক্লাস রেজিস্টার ও চক-ডাস্টার, এবং অন্য হাতে লম্বা ছাতা নিয়ে প্রবেশ করলেন একজন মধ্যবয়স্ক অধ্যাপক। সাদা চিকন চেকের হাফশার্ট আর ধূসর ঢোলা প্যান্ট। গম্ভীর মুখ - চৌকো ও নির্মেদ। প্রশস্ত কপাল, ব্যাকব্রাশ করা পাতলা চুল। আপাতদৃষ্টিতে নিতান্তই সাধারণ একজন মানুষ। কিন্তু সোনালী ফ্রেমের চশমার ভেতর দিয়ে তাঁর চোখের দৃষ্টি গভীর এবং স্বচ্ছ।

 

“ফার্স্ট ইয়ারের ক্লাস তো? – গলার স্বর খুব একটা স্পষ্ট নয়। মনযোগ দিয়ে না শুনলে বুঝতে সমস্যা হতে পারে। সামনের বেঞ্চের অনেকেই এক সাথে উত্তর দিলো, জ্বি স্যার।

 

স্যার আর কোন কথা না বলে রেজিস্টার খুলে রোল কল করতে শুরু করলেন। শুনেছি ক্লাসে উপস্থিতি খুব দরকারি বিষয়। কলেজেও খুব দরকারি বিষয় ছিল। নন কলেজিয়েট, ডিস-কলেজিয়েট ব্যাপারগুলি সেখানেও ছিল। পরীক্ষার ফরম পূরণের সময় সেগুলি দেখা হতো। দেখেছি অনেকে সারাবছর কোন ক্লাস না করেও ফরম পূরণের সময় বিশেষ বিশেষ ব্যক্তিকে টাকা দিয়ে সব ঠিক করে নেয়। ইউনিভার্সিটিতে এসেও দেখি একই ব্যবস্থা। একজন শিক্ষার্থী সবগুলি ক্লাস করলেই যে সবকিছু বুঝতে পারবে, পরীক্ষায় পাস করতে পারবে এমন কোন নিশ্চয়তা কি আছে? আবার কেউ কোন ক্লাস না করেও নিজে নিজে পড়ে সিলেবাস কভার করে পাস করতে পারবে না, এমন নিয়মও নেই। তাহলে শুধু শুধু ক্লাসে উপস্থিতির হিসেবের পেছনে প্রত্যেক ক্লাসে দশ পনেরো মিনিট সময় নষ্ট করার কোন দরকার আছে? পয়ঁতাল্লিশ মিনিটের একটি ক্লাস থেকে পনেরো মিনিট চলে যাওয়া মানে তিন ভাগের এক ভাগ সময় নষ্ট হওয়া।

 

“আমি প্রফেসর হুজ্জোত আলি প্রামাণিক। আমি বর্তমানে ফিজিক্স ডিপার্টমেন্টের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে আছি। ডিপার্টমেন্টের চেয়ারম্যান হিসেবে তোমাদেরকে ওয়েলকাম জানাচ্ছি। তোমরা বাংলাদেশের বিভিন্ন কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে এখানে ভর্তি হয়েছো। ইউনিভার্সিটির মানে কী তোমরা জানো? ইউনিভার্স যেমন একেবারে মাইক্রোস্কোপিক লেভেল থেকে কসমিক লেভেলের সবকিছুকে নিয়েই ইউনিভার্স, তেমনি জ্ঞানের জগতের সবকিছু নিয়েই হলো ইউনিভার্সিটি। ঠিকমতো লেখাপড়া করলে তোমরা শিক্ষিত হবে, জাতি শিক্ষিত হবে। কিন্তু বর্তমান সরকার চায় না তোমরা শিক্ষিত হও। কারণ মানুষ যত শিক্ষিত হবে, মিলিটারি সরকারের ততই অসুবিধা হবে। শিক্ষিত মানুষের ব্রেইন ওয়াশ করা যায় না। কিন্তু জানো তো রেজিমেন্টাল সিস্টেমে ব্রেইনের ব্যবহার নেই। সেখানে শুধু অর্ডার দেবে এবং অর্ডার মানবে। কিন্তু সত্যিকারের শিক্ষিত মানুষ ব্রেইন ব্যবহার করবে, বুদ্ধি ব্যবহার করবে। যে শাসন করতে চায়, সে চাইবে না তুমি ব্রেইন ব্যবহার করো। তাই তোমাকেই বেছে নিতে হবে তুমি কী চাও। শিক্ষিত হতে চাইলে নিজের চেষ্টায় শিক্ষিত হতে হবে।“

 

স্যারের চিন্তাভাবনার সাহসিকতা দেখে আমি অবাক হয়ে যাচ্ছি। ক্লাসরুমে সামরিক সরকারের এরকম সরাসরি সমালোচনা করতে পারা সহজ কথা নয়। ফিজিসিস্টরা সম্ভবত এরকম সাহসী হয়। আর্কিমেডিস নাকি সশস্ত্র সৈনিককে ভর্ৎসনা করে বলেছিলেন তাঁর জ্যামিতিক চিত্রের উপর ছায়া না ফেলতে। অবশ্য সেই সাহসের মূল্য আর্কিমেডিসকে দিতে হয়েছিল নিজের জীবন দিয়ে। প্রামাণিক স্যারকেও কী মূল্য দিতে হয় জানি না। তবে স্যারের কথাগুলি খুব ভালো লেগে গেল।

 

“ইন্টারমিডিয়েট ক্লাসে কে কী পড়েছো আমাদের জানার কথা নয়। এখানে ইউনিভার্সিটি লেভেলের ফিজিক্স পড়তে এসে অনেক জিনিস নিজেকেই করতে হবে।  আগে না পড়ে থাকলে পড়ে নেবে, না বুঝে থাকলে বুঝে নেবে।“ – স্যারের কথা বলার স্টাইল মনোটোনাস। একটু টেনে টেনে কথা বলার কারণে মনে হচ্ছে এক্ শব্দের সাথে পরের শব্দ লেগে যাচ্ছে। কিন্তু শেষের কথাগুলির অর্থ তো খুব একটা পরিষ্কার হচ্ছে না। বলছেন, না বুঝে থাকলে বুঝে নিতে। কার কাছ থেকে বুঝে নিতে? যিনি পড়াবেন তাঁর কাছ থেকে? তবে কি তিনি কোন কিছু না বুঝলে স্যারকে প্রশ্ন করে জেনে নেয়ার কথা বলছেন?

 

“আমি তোমাদের পড়াবো ম্যাথমেটিক্যাল ফিজিক্স” – বলেই ব্ল্যাকবোর্ডে খসখস করে লিখলেন – “গাউস থিওরম”। তারপরের বিশ-পঁচিশ মিনিট একটা ঝড় বয়ে গেলো ব্ল্যাকবোর্ডের উপর দিয়ে। স্যারের হাত আর মুখ একসাথে চললো। একের পর এক জটিল সমীকরণ লিখছেন – যার গ্রিক নোটেশানগুলি উচ্চারণ করতে পারি, কিন্তু সেগুলি দিয়ে আসলে কী বোঝায় তার বিন্দুবিসর্গও বুঝতে পারছি না। স্যারের হাতের লেখাও সমীকরণের মতোই দুর্বোধ্য। স্যার বলেছেন, না বুঝলে বুঝে নিতে। কিন্তু কীভাবে বুঝে নেবো? স্যার যে গতিতে এগোচ্ছেন তাতে ক্লাস শেষ হওয়ার আগে একবারও থামবেন বলে তো মনে হচ্ছে না। মাছি মারা কেরানির মতো ব্ল্যাকবোর্ড কপি করলাম। টর্নেডো থেমে যাবার পর যেরকম চারদিকে স্তব্ধ-লন্ডভন্ড অবস্থা দেখা যায়, প্রামাণিক স্যার ক্লাস শেষ করে চলে যাবার পর আমাদের অবস্থা হলো সেরকম। এই দুর্বোধ্য গাণিতিক পদার্থবিজ্ঞানের সাগর কীভাবে সাতরাবো জানি না।

 

বুকভরে শ্বাস নেবার আগেই ক্লাসে ঢুকলেন আরেকজন স্যার - ইনিও গম্ভীর, কাঁচাপাকা কোঁকড়ানো চুল, আর কুঁচকানো কপাল। স্যারকে দেখেই আমার হৃৎপিন্ডের গতি বেড়ে গেল। এই স্যার ফিজিক্সের! ক্লাসের ভেতর যে ক’জন ক্লাস-শেষে ফ্রি পার্টিক্যালের মতো র‍্যান্ডমলি ঘুরাঘুরি করার ইচ্ছেয় সিট ছেড়েছিল – তাদেরকে ধমক দিয়ে বাধ্য করলেন সিটে ফিরে যেতে। এই স্যার যে অসম্ভব বদমেজাজি তার পরিচয় আগেও পেয়েছিলাম। এই পিরিয়ডে আমাদের থার্ড পেপার – হিট অ্যান্ড থার্মোডায়নামিক্স। স্যার ব্ল্যাকবোর্ডে নিজের নাম লিখলেন – মোবাশ্বের আহমদ।

 

রোল কল শেষ করে স্যার কুঁচকানো কপাল আরো কুঁচকে অনেকটা শ্লেষভরে জিজ্ঞেস করলেন, “পৃথিবীতে এত বিষয় থাকতে তোমরা ফিজিক্স  পড়তে এসেছ কী কারণে? ফিজিক্স এমন একটা সাবজেক্ট যা শরীরের রসকষ সব নিংড়ে নিয়ে তোমাকে ছোবড়া করে দেবে। পঁচিশ বছর বয়সেই তোমাকে মনে হবে পঞ্চাশ বছরের বুড়ো।“

 

স্যারের দিকে আবার তাকালাম। যতটুকু সম্ভব ভালোভাবে তাকালাম। স্যারকে দেখতে পঞ্চাশ বছরের বুড়োদের মতো লাগছে। তবে কি তাঁর  আসল বয়স পঁচিশ?

 

“যদি ভেবে থাকো সারাবছর আর্টস ফ্যাকাল্টিতে ঘুরে ঘুরে ফিজিক্সে অনার্স পাস করে ফেলবে, তাহলে ভুল করছো। এখনও সময় আছে, ফিজিক্স ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যাও। শুধুমাত্র সিরিয়াস স্টুডেন্টদের জন্য ফিজিক্স।“

 

ক্লাসে পায়চারি করতে করতে ফিজিক্স বিষয়ের পরিচিতি দিচ্ছেন মোবাশ্বের স্যার। শরীরের কোথাও একচিলতে মেদ তো দূরের কথা প্রয়োজনীয় মাংসও ঠিকমতো নেই। তাঁর শরীর যেমন কাঠখোট্টা, মেজাজও তেমন। কথা বলতে বলতে ক্লাসের বেঞ্চের সারির মাঝখানে যে পথ আছে সেই পথ ধরে তিনি প্রত্যেক বেঞ্চের কাছে যাচ্ছেন। স্যারের দিকে তাকাতে গিয়ে আমাদের ঘাড়ের ব্যায়াম হয়ে যাচ্ছে। তবে আমি স্যারের চোখের দিকে তাকাচ্ছি না। কারণ আমি জানি না স্যার এখনো আমার চেহারা মনে রেখেছেন কি না। ফরেস্ট্রির লিখিত পরীক্ষায় আমার পাশে বসেছিল আমার স্কুল জীবনের এক বন্ধু। উচ্চ মাধ্যমিকে দুর্দান্ত রেজাল্ট তার। ইঞ্জিনিয়ারিং পড়াই ছিল তার লক্ষ্য। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিচ্ছিল নিজের মেধার একাধিক স্বীকৃতির জন্য। যতগুলি ডিপার্টমেন্টে সম্ভব সবখানেই পরীক্ষা দিয়েছিল সে – কয়টা ডিপার্টমেন্টে টিকে তা দেখার জন্য। ফরেস্ট্রির প্রশ্ন অনেক জটিল ছিল। মাত্র ২০% প্রশ্নের উত্তর আমার জানা ছিল, আমার বন্ধুটির প্রায় ৭০% জানা ছিল। কিন্তু যেহেতু তার সব পরীক্ষাতেই টিকতে হবে, সে একটু পরপর আমার খাতার দিকে ঝুঁকছিল আমি কী লিখেছি দেখার জন্য। এরকম কয়েকবার ঘটার পর স্যার এসে আমাদের দু’জনের খাতাই কেড়ে নিলেন। আমি খুশি মনে হল থেকে বের হয়ে গিয়েছিলাম। পেছন ফিরে দেখলাম আমার বন্ধুটি স্যারের পায়ে ধরে ফেলেছে খাতা ফেরত পাবার জন্য। সেই স্যার ছিলেন মোবাশ্বের স্যার। এতদিন পরেও আমার কেন যেন লজ্জা লাগছে – যদি স্যার চিনে ফেলেন!

 

“ইন্টারমিডিয়েট ক্লাসে কে কত নম্বর পেয়েছ, কয়টাতে লেটার পেয়েছ, স্টার মার্ক পেয়েছ, স্ট্যান্ড করেছো – ওসব ভুলে যাও। ওগুলি এখানে কোন কাজে আসবে না। অনেক স্টারমার্ক এখানে এসে থার্ড ক্লাস পায়। এখানে তুমি লেখাপড়া করলে টিকে থাকবে, নইলে ছিটকে পড়ে যাবে।“

 

স্যারের কথা শুনে মনে হচ্ছে ফিজিক্সে পড়তে এসে আমরা ভুল করেছি। অথচ পরিসংখ্যান ক্লাসে ম্যাকস্যার আমাদের বোঝাতে চেষ্টা করেছেন যে দৈনন্দিন জীবনে পরিসংখ্যানের প্রয়োজনীয়তা কী অপরিসীম। পরিসংখ্যান সম্পর্কে কত সুন্দর সুন্দর কথা। ম্যাকস্যারের কথা শুনে মনে হচ্ছিলো ফিজিক্সের বদলে পরিসংখ্যানে ভর্তি হলেই মোক্ষলাভ করা যেত। অথচ আজ ফিজিক্সের ক্লাসে স্যারের কথা শুনে মনে হচ্ছে ফিজিক্সের মতো জটিল রসকষহীন বিষয় পৃথিবীতে আর একটিও নেই।

 

“হোয়াট ইজ থার্মোডায়নামিক্স? কে বলতে পারবে? এনিবডি? নো ওয়ান ইন দি ক্লাস? এত এত স্টারমার্ক কোথায় গেলো? কে বলতে পারবে?”

 

স্যারের সামনে মুখ খোলার মতো সাহস মনে হয় কারোরই নেই। কেউই কোন সাড়াশব্দ করছে না। স্যার বিরক্ত হয়ে “শেম অন ইউ” বলতেই সামনের বেঞ্চ থেকে একটি নাতিদীর্ঘ হাত উত্তোলিত হলো।

“বলো”

একটি শ্যামলা পাতলা ছেলে উঠে দাঁড়িয়ে ইংরেজিতে উত্তর দিলো, “থার্মোডায়নামিক্স ইজ দি স্টাডি অব দি ডায়নামিক্স অব হিট এনার্জি।“

“ভেরি গুড়। তোমার নাম কী?”

“স্যার তাজুল ইসলাম।“

তাজুল ইসলাম আমাদের থার্মোডায়নামিক্স ক্লাসের হিরো হয়ে গেলো।

Monday, 1 February 2021

স্বপ্নলোকের চাবি - পর্ব ১

 


০০

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার ছাত্রজীবন শুরু হয়েছিল ১৯৮৬ সালের জুলাই মাসে, শেষ হয়েছে ১৯৯৩ সালের সেপ্টেম্বরে; আজ থেকে প্রায় সাতাশ বছর আগে। আমরা ছিলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ২১তম ব্যাচ। আমাদের অনার্সের শিক্ষাবর্ষ ছিল ১৯৮৫-৮৬। সেশনজট না থাকলে আমাদের অনার্স পাস করার কথা ছিল ১৯৮৮ সালে। কিন্তু শেষ হতে হতে ১৯৯০ শেষ হয়ে গিয়েছিল। তারপর দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে  বিশ্ববিদ্যালয় ছিল প্রতিক্রিয়াশীলদের হাতে অবরুদ্ধ। এক বছরের মাস্টার্স শেষ হতে লাগলো আরো তিন বছর।  সাত বছরের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের অনেক ঘটনাই এখন  কালের নিয়মে স্মৃতি থেকে মুছে গেছে একেবারে। কিছু কিছু অপ্রিয় স্মৃতি জোর করে মুছে ফেলেছি। কিন্তু আরো অনেক ছোট-বড় স্মৃতি ছড়িয়ে আছে মগজের কোষে কোষে, যারা এখনো মাঝে মধ্যেই উঁকি দিয়ে আমাকে স্মৃতিকাতর করে তোলে। যেসব দিনগুলিকে একসময় মনে হতো দুঃস্বপ্নের মতো, আজ কালের পরশে মনে হচ্ছে সেইসব দিনগুলিও কত মধুর ছিল। এখনো কী উজ্জ্বল সেইসব দিনগুলি। মনে হচ্ছে এই তো সেদিনের কথা।

 

০১

ষোলশহর স্টেশন গিজগিজ করছে এই সকালে।  প্লাটফরমে পা ফেলার জায়গা নেই। জুলাই মাসের প্রচন্ড গরম। প্লাটফরমের কিছু অংশে টিনের ছাউনি আছে। রোদের তেজে এর মধ্যেই তাপ ছড়াচ্ছে। এই ভীড়ের মধ্যে আমার চোখ ঘুরছে পরিচিত কাউকে দেখার আশায়। অসংখ্য ছাত্রছাত্রীর মধ্যে কারা ফার্স্ট ইয়ার – সেটা একটু চেষ্টা করলেই মনে হয় বোঝা যায়। পরিচিত কাউকে দেখলে তারা একটু বেশি রকমের উচ্ছ্বাস দেখাচ্ছে। কান খুলে রাখলেই শোনা যাচ্ছে, “তুইও কেমিস্ট্রিতে, দোস্ত!” “তুমি ইকোনমিক্সে? শৈবাল কোথায়? ফাইনার্টসে? হাহাহা।“ শৈবাল ফাইন আর্টস-এ পড়ে শুনে হাসছে তা কিন্তু নয়। হাসার জন্যই এই হাসি। আমি কান খাড়া করে আছি কোথাও ফিজিক্স শব্দটি উচ্চারিত হয় কি না শোনার জন্য। না, মনে হচ্ছে কেউই এখানে ফিজিক্সে ভর্তি হয়নি, কিংবা যারা ফিজিক্সে ভর্তি হয়েছে তারা এখন থেকেই গম্ভীর হয়ে গেছে।

“ফার্স্ট ইয়ার?”

কানের কাছে প্রশ্নবোধক বাক্য শুনে ফিরে তাকালাম। আমারই উচ্চতার একজন ছেলে হাসিমুখে প্রশ্নটা করেছে আমাকেই।

“জি, আপনি?“

“এত আপনি আজ্ঞে করতে হবে না। আমিও ফার্স্ট ইয়ার। ফিজিক্সে।“

“ফি-জি-ক্স” – মনে হচ্ছে অঘটন আজো ঘটে।

“আমিও ফিজিক্সে। আমার নাম প্রদীপ।“

“আমি কফিল। তুমি চিটাগং কলেজ না? তোমাকে হোস্টেলে দেখেছি মনে হচ্ছে।“

“তুমি কি হোস্টেলে থাকতে?”

“না, আমার বাসা তোমাদের হোস্টেলের কাছে। তুমি শেরে বাংলা বি ব্লকে থাকতে না? আমি রঘুর রুমে গিয়েছিলাম কয়েকবার।“

কফিলের সাথে বন্ধুত্ব হতে দেরি হলো না। ট্রেন প্লাটফরমে ঢুকতেই ছুটোছুটি শুরু হয়ে গেল। বটতলি আর ঝাউতলা স্টেশন থেকেই শাটল ট্রেনের প্রায় সব কম্পার্টমেন্ট ভর্তি হয়ে আসে। ষোলশহর স্টেশন থেকে উঠে সিট পাওয়া অনেকটা লটারি পাওয়ার মতো। কফিল এ ব্যাপারে হোমওয়ার্ক করে এসেছে। সে বললো, “চলো, ইঞ্জিনে গিয়ে উঠি।“

দৌড়তে দৌড়তে ইঞ্জিনের কাছে। তেলতেলে কালো চিটচিটে ছোট্ট ধাতব সিঁড়ি বেয়ে ইঞ্জিনে উঠে গেলো কফিল। আমি একটু ইতস্তত করছি দেখে দিলো এক ধমক। তুমি থেকে সরাসরি তুই-তে চলে এলো, “খাউপ্পাঅরদে কিল্লাই? খাউপ্পাইলে আর আজিয়া যাইতে পারবি না।“ ইতস্তত করার প্রতিশব্দ যে খাউপ্পানো তার বিশুদ্ধ ব্যবহার থেকেই বোঝা যায় কফিল চট্টগ্রামের ধুলো-মাটি-কাদা-ভাষায় মানুষ। ট্রেনের ইঞ্জিনের পাশে ছোট্ট জায়গায় বিপজ্জনকভাবে দাঁড়িয়ে হাওয়া খেতে খেতে দুপাশের প্রকৃতি দেখতে দেখতে প্রথম  ইউনিভার্সিটিতে যাওয়া একটা অন্যরকম অনুভূতি। একটাই অসুবিধা, কথা বলার সময় অনেক জোরে বলতে হয়, নইলে বাতাস আর ইঞ্জিনের শব্দে কিছু শোনা যায় না।

স্টেশন বললে ষোলশহরের কিছুটা মানহানি হয়। কারণ মানের দিক থেকে ষোলশহর একটি জংশন। এখান থেকে দুটি রেললাইন চলে গেছে দু’দিকে। একটি দোহাজারির দিকে, অন্যটি নাজিরহাটের দিকে। ইউনিভার্সিটির শাটল ট্রেন যায় নাজিরহাট লাইনে। ট্রেনের চালকের সিটের পাশেও দাঁড়িয়ে আছে অনেক ছাত্র। আমরা দাঁড়িয়েছি ইঞ্জিনের পাশে। আমাদের কারণে চালকের পথ দেখতে অসুবিধা হবার কথা। কিন্তু মনে হচ্ছে তাতে কিছুই যায় আসে না। রেলপথ যেদিকে গেছে ট্রেন সেদিকেই যাবে, তাতে অন্যকিছু দেখার দরকার নেই। শুধু সিগনাল ঠিকমতো দেখা গেলেই হলো। অবশ্য ট্রেনের গতিবেগ ঘন্টায় তিরিশ কিলোমিটারের বেশি হবে বলে মনে হচ্ছে না।

ষোলশহর স্টেশনের পরে ট্রেন থামলো ক্যান্টনমেন্ট স্টেশনে। এখান থেকেও অনেক ছাত্র-ছাত্রী উঠলো। বাম পাশে ক্যান্টনমেন্টের মাঠে সৈনিকদের অনুশীলন চলছে। মাঠজুড়ে ছুটে বেড়াচ্ছে খাঁকি হাফ প্যান্ট আর সাদা গেঞ্জি। স্টেশনের কাছে অনেক নারকেল গাছ দেখা যাচ্ছে। সব গাছের গোড়া থেকে কয়েকফুট পর্যন্ত সাদা রঙ করা। শুনেছি ক্যান্টনমেন্টের গাছের জন্যেও নাকি প্রতিবছর অনেকটাকা বরাদ্দ করা হয় জাতীয় বাজেটে।

ক্যান্টনমেন্টের পরের স্টেশন চৌধুরি হাট। এখান থেকেও উঠলো কয়েকজন। স্টেশনের বাম পাশে শ্যাওলা জমা পুকুর। পুকুরঘাটে একজন আধবুড়ো মানুষ ভেজালুঙ্গি হাঁটুর উপর তুলে বিরক্ত মুখে তাকিয়ে আছেন ট্রেনের দিকে। দুপাশে ধানক্ষেত, রেললাইন ঘেঁষে পায়ে চলে পথ; ছবির মতো সুন্দর প্রকৃতি এদিকে। চৌধুরি হাটের পরের স্টেশন ফতেয়াবাদ। না, স্টেশন বলা ঠিক হচ্ছে না। খুব ছোট হলেও ফতেয়াবাদ জংশন। এখান থেকে একটা লাইন চলে গেছে নাজিরহাটের দিকে। অন্য লাইন চলে গেছে ইউনিভার্সিটির দিকে। পরের স্টেশনই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

 

ট্রেন প্লাটফরমে ঢুকে থামতে না থামতেই হুড়মুড় করে নামতে শুরু করেছে সবাই। নেমেই কেমন যেন ছুটছে সবাই। কফিল তাড়া দিলো, “দৌড় লাগা। নইলে বাসে সিট পাবি না।“

রাস্তায় সারি সারি বাস দাঁড়িয়ে আছে। একটার পর একটা বাস ভর্তি হয়ে যাচ্ছে। এই বাসে চড়ে যেতে হবে ক্যাম্পাসে। স্টেশনের সামনে বেশ কিছু ছোট ছোট টুকটাক খাবারের দোকান।  হাটহাজারি রুটের ঝরঝরে সব বাস ইউনিভার্সিটির ভেতরে চলছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ প্রতিদিন ভাড়া দেয় এসব বাসের। কিছু বাস এখানে স্টেশনে থাকে, আবার কিছু বাস থাকে ১নম্বর গেটে। শহর থেকে যারা বাসে আসে, তারা এক নম্বর গেটে নামে। সেখান থেকে ক্যাম্পাসের দূরত্ব প্রায় দুই কিলোমিটার হবে। এই বাসে চড়ে ক্যাম্পাসে আসতে হয়। ভর্তি হতে এসে এই বাসে চড়েছিলাম।

 

রেলস্টেশনের সামনে থেকে বাস রওনা হয়ে বামে শাহজালাল ও শাহ আমানত হল এবং ডানে সোহরাওয়ার্দী হল পার হয়ে একটানে চলে এলো ক্যাম্পাসে। ডানপাশে চারতলা প্রশাসনিক ভবন ও লাইব্রেরি। তার পাশেই আর্টস ফ্যাকাল্টি। এখানেই বাস প্রায় খালি হয়ে গেলো। আমরা নামলাম চাকসু ভবনের সামনে। এখান থেকে কিছুদূর হেঁটেই সায়েন্স ফ্যাকাল্টি। সামনে খোলা সবুজ মাঠ। ছোট ছোট কিছু সুপারি গাছের মতো গাছ লাগানো হয়েছে পথের দুপাশে।

 

‘চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়’ লেখা ঝকঝকে নতুন বাস এসে থামলো ফ্যাকাল্টির সামনের রাস্তায়। শিক্ষকদের জন্য নির্ধারিত এই বাস। বাস থেকে নেমে স্যার-ম্যাডামরা গম্ভীরভাবে চলেছেন ফ্যাকাল্টির দিকে। শুনেছি বিশ্ববিদ্যালয়ের  স্যার-ম্যাডামরা হলেন রাজা-বাদশাহ টাইপের। মেজাজ ভালো থাকলে দিলদরিয়া, আবার মেজাজ খারাপ হলে শূলে চড়াবার আদেশ দিতে পারেন। শূলে চড়াবার আদেশ অবশ্য এ যুগে দেয়া যায় না, কিন্তু মৌখিক পরীক্ষায় ফেল করানো যায়। সবকিছুতে পাস করার পরেও যদি কেউ মৌখিক পরীক্ষায় ফেল করে – তাহলে পরের বছর আবার সব পরীক্ষা দিতে হবে। তাই মনে হচ্ছে স্যার-ম্যাডামদের কাছ থেকে যত দূরে থাকা যায় ততোই ভালো। আমি দাঁড়িয়ে গেলাম। কিন্তু কফিল তাড়া দিলো। তার ভেতর একটা ড্যামকেয়ার ভাব আছে। সারাক্ষণ ছটফট করছে, সবকিছু নিয়ে মজা করছে।

 

দোতলায় ফিজিক্স ডিপার্টমেন্টের চেয়ারম্যানের অফিসের সামনের বারান্দায় একটা ব্ল্যাকবোর্ডে টাইপ করা ক্লাসরুটিন টাঙানো আছে। সাবসিডিয়ারির রুটিনও একসাথে দেয়া আছে। গণিত আর পরিসংখ্যান সাবসিডিয়ারি নিয়েছি। আজ ফিজিক্সের কোন ক্লাস নেই। পরিসংখ্যানের সাবসিডিয়ারি আছে ফার্স্ট পিরিয়ডে। কফিল পরিসংখ্যান নেয়নি, কেমিস্ট্রি নিয়েছে। সে চলে গেলো কেমিস্ট্রি ডিপার্টমেন্টের দিকে। আমাকে যেতে হবে চার তলায় পরিসংখ্যান বিভাগে।

 

বেশ বড় ক্লাসরুম। বেঞ্চগুলি অদ্ভুত ধরনের। বেশ ভারী কাঠের তৈরি বেঞ্চ আর টেবিল একসাথে লাগানো। ফিজিক্স আর ম্যাথের স্টুডেন্টরা ছাড়াও ইকোনমিক্সেরও অনেকে পরিসংখ্যান নিয়েছে সাবসিডিয়ারি হিসেবে। প্রথম দিনের ক্লাসে যে যার পাশে বসেছে কিছুটা আলাপ-পরিচয় করে নিচ্ছে। আমি বসেছি একেবারে পেছনের দিকের একটা বেঞ্চে। এখান থেকে সামনের ব্ল্যাকবোর্ডকে মনে হচ্ছে অনেক দূরে দিগন্তের কাছাকাছি কোথাও। সেখানে কিছু লেখা হলে এখান থেকে দেখতে পাবো বলে মনে হয় না। চশমার পাওয়ার বদলাতে হবে মনে হচ্ছে। পরেরদিন থেকে সামনে গিয়ে বসতে হবে।

“একটু স-স-স-সরে বসো তো।“

ফর্সা, লিকলিকে ছেলেটি এখনো হাফাচ্ছে। মনে হচ্ছে ছুটতে ছুটতে এসেছে। ক্লাসের ব্যাপারে খুব সিরিয়াস বলে মনে হচ্ছে তাকে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই পরিচয় হয়ে গেলো অর্পণের সাথে।

 

“গুড মর্নিং এভরিওয়ান। আমার নাম মোহাম্মদ আবদুল করিম – সংক্ষেপে ম্যাক। তোমরা আমার কাছে শিখবে ব্যাসিক স্টাটিসটিক্‌স।“

সরু পা-লেপ্টা নীল জিন্‌স আর লাল টি-শার্টে স্যারকে বাংলা সিনেমার প্রতিনায়কের মতো লাগছিলো – যারা নায়িকার দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করে যায়, কিন্তু নায়িকার দৃষ্টি থাকে অন্যদিকে। ম্যাক স্যারের বাম হাতে মোটা ধাতব শিকল – মনে হয় এটা সাম্প্রতিক ফ্যাশন। টি-শার্টের ফাঁক দিয়ে গলার সোনালী চেনও উঁকি মারছে। হাতের আঙুলে আংটিও দেখা যাচ্ছে কয়েকটা। এরকম সালংকার সুবেশ শিক্ষক আগে বেশি দেখিনি।

পরের পর্ব >>>>>>>>>>>

Wednesday, 20 January 2021

লাল গ্রহ মঙ্গল - পর্ব ১২

 



সপ্তম অধ্যায়

মঙ্গলে বসতি

 

স্পেস-এক্স এর প্রতিষ্ঠাতা ইলন মাস্ক ঘোষণা দিয়েছেন আগামী কয়েক দশকের মধ্যে তিনি মঙ্গল গ্রহে গিয়ে বাস করবেন। শুধু তাই নয়, তিনি পৃথিবী থেকে অন্য যারা মঙ্গল গ্রহে গিয়ে বাস করতে ইচ্ছুক, তাদেরকেও নিয়ে যাবার ব্যবস্থা করবেন।  তার জন্য আপাতত খরচ ধরা হচ্ছে জনপ্রতি পাঁচ লক্ষ ডলার বা চার কোটি টাকা। নিসন্দেহে এটা একটি উচ্চাভিলাসী প্রকল্প। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হবার পথে এখনো অনেক বাস্তব বাধা আছে। যদি ধরেও নেয়া যায় যে মঙ্গলে যাওয়ার জন্য মঙ্গল-যান তৈরি সম্পন্ন হয়েছে, এবং মানুষ মঙ্গলে পৌঁছে গেছে, কিন্তু মঙ্গলে যাওয়ার পর প্রথম বাধা হলো মঙ্গল গ্রহের বর্তমান পরিবেশ। মঙ্গল গ্রহের বর্তমান বায়ুচাপ মাত্র ৬০০ প্যাসকেল, আর গড় তাপমাত্রা -৬৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। মঙ্গল গ্রহের বায়ুচাপ আর্মস্ট্রং লিমিটের অনেক নিচে। আর্মস্ট্রং লিমিট হলো বায়ুচাপের সেই সীমা - যার কম হলে মানুষের শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রায় (৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস) পানি ফুটতে শুরু করে। পৃথিবীতে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৮ কিলোমিটার উপরে বায়ুর চাপ ৬.৩ কিলো-প্যাসকেল। এই চাপে পানি ফুটতে শুরু করে। মঙ্গলের বায়ুচাপ আর্মস্ট্রং লিমিটের দশ ভাগের এক ভাগের চেয়েও কম। সেই চাপে কোন মানুষ যদি প্রয়োজনীয় সুরক্ষা ছাড়া মঙ্গলে যায় - তার শরীরের সমস্ত জলীয় অংশ মুহূর্তেই বাষ্প হয়ে যাবে।

          অনেকেই বলছেন মঙ্গল গ্রহে বাস করার জন্য প্রয়োজনীয় কলোনি গড়ে তোলা হবে। পৃথিবীর বাইরে অন্য কোন গ্রহে যদি মানুষ কলোনি গড়ে তুলতে চায় তাহলে মঙ্গল গ্রহই তুলনামূলকভাবে উপযুক্ত গ্রহ। কারণ পৃথিবীর দিনের দৈর্ঘ্য আর মঙ্গলের দিনের দৈর্ঘ্য প্রায় সমান। পৃথিবী ও মঙ্গলের অক্ষের নতিও প্রায় একই ধরনের। ফলে পৃথিবীর মতো মঙ্গলেও ঋতু পরিবর্তন হয়। মঙ্গলের বুকে অনেক সমতল জায়গা আছে যেখানে ঘরবাড়ি তৈরি করা যাবে। কিন্তু প্রয়োজনীয় নির্মাণসামগ্রী কীভাবে নিয়ে যাওয়া হবে - নিয়ে যেতে কী পরিমাণ সময় ও খরচ লাগবে তা এখনো স্পষ্ট নয়।

          সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে পরিবেশ। মঙ্গলের বায়ুমন্ডল পৃথিবীর প্রাণির জন্য উপযুক্ত নয়। বায়ুমন্ডলের ৯৫% কার্বন-ডাই-অক্সাইড, গড় তাপমাত্রা -৬৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস, মাধ্যাকর্ষণ পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণের শতকরা মাত্র ৩৮ ভাগ, সর্বোপরি পানির উৎস সম্পর্কে এখনো কোন নিশ্চয়তা নেই। এ অবস্থায় এ শতাব্দীর মধ্যেই মানুষ মঙ্গলে গিয়ে বসবাস করতে শুরু করবে বলাটা খুব বেশি যুক্তিগ্রাহ্য নয়। অনেকে প্রস্তাব করছেন মঙ্গলে আগে রোবট পাঠানো হবে। তারা ঘরবাড়ি তৈরি করবে, তারপর আস্তে আস্তে মানুষ যাবে।

পৃথিবী থেকে চাঁদের দূরত্ব মাত্র ৩ লক্ষ ৮৪ হাজার ৪০০ কিলোমিটার। এই দূরত্বে পৃথিবী থেকে চার লিটার পানি চাঁদে পাঠাতে খরচ হবে কমপক্ষে ৫০ লক্ষ টাকা। পৃথিবী থেকে মঙ্গলের দূরত্ব চাঁদের দূরত্বের ১৪২ গুণ বেশি। সে হিসেবে মঙ্গলে যদি পৃথিবী থেকে নিয়মিত খাবার ও পানীয় পাঠাতে হয়, তাহলে যে পরিমাণ খরচ হবে তা অকল্পনীয়। যদি মানুষকে মঙ্গলে কলোনি তৈরি করতে হয়, তাহলে প্রথমেই চিন্তা করতে হবে খাদ্য ও পানীয়ের সমস্যার সমাধান কীভাবে করবে। এই সমস্যার সমাধানের জন্য অনেকেই এখন মহাকাশ-বাগান বা অ্যাস্ট্রো-গার্ডেনিং এর কথা বলছেন।

          মানুষ মঙ্গলে যাবার সময় সাথে করে নিয়ে যাবে প্রচুর বীজ ও উদ্ভিদ। উদ্ভিদ বাতাস থেকে কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্রহণ করবে আর অক্সিজেন ত্যাগ করবে। মানুষের বর্জ্য গাছের সার হিসেবে দেয়া যাবে। মঙ্গলের কার্বন-ডাই-অক্সাইড সমৃদ্ধ বাতাসে টিকতে পারে এরকম উদ্ভিদের চাষ করতে হবে। তার জন্য দরকার হবে মঙ্গলে প্রচুর গ্রিন হাউজ গড়ে তোলা। পৃথিবীতে যে গ্রিন হাউজ সমস্যার সৃষ্টি করছে, মঙ্গলে সেই গ্রিন হাউজ হতে পারে খুবই দরকারি একটি উপায়।

 

চিত্র: মঙ্গলে গ্রিন হাউজের কল্পিত চিত্র

 

মঙ্গল গ্রহে জমাট পানি আছে নিশ্চিত। এই পানিকে গলানোর জন্য মঙ্গলের তাপমাত্রা বাড়াতে হবে। পুরো মঙ্গল গ্রহের তাপমাত্রা এক সাথে বাড়ানো সম্ভব নয়। মানুষকে নিজেরা থাকার জন্য মঙ্গল গ্রহের ঘরের ভেতর পৃথিবীর পরিবেশ তৈরি করে নিতে হবে। যেমন আমরা প্লেনে ভ্রমণ করার সময় আকাশে বায়ুচাপ, তাপমাত্রা, অক্সিজেন লেভেল ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণ করে রাখি, সেভাবেই করতে হবে। পৃথিবীর বাইরে ছোট্ট একটা এলাকাতে পৃথিবীর পরিবেশ তৈরি করাকে বলা হয় প্যারা-টেরাফর্মিং (paraterraforming)। এরকম প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে থাকতে থাকতে মানুষ মঙ্গলের সামগ্রিক পরিবেশ বদলে পৃথিবীর মতো করে ফেলার একটা দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা হাতে নেবে। এটাকে বলা হয় টেরাফর্মিং (terraforming) বা পৃথিবীকরণ। লক্ষ লক্ষ বছর লেগে যেতে পারে মঙ্গলের পরিবেশ বদলাতে।

           

চিত্র: মঙ্গলের পৃথিবীকরণের কল্পিত চিত্র

 

মঙ্গলের পরিবেশ বদলে পৃথিবীর মত করতে তিনটি প্রধান পরিবর্তন ঘটাতে হবে - ১) জলবায়ুর পরিবর্তন, ২) তাপমাত্রা বৃদ্ধি - যেন তরল পানির প্রবাহ ঘটে, ৩) জলবায়ু সুরক্ষা - যে অক্সিজেন তৈরি হবে তা যেন হারিয়ে না যায়। এগুলো করার জন্য নির্দিষ্ট কোন পদ্ধতি নেই। জীবনের বিকাশ ঘটলে এগুলো জীবনচক্রের মধ্যেই আস্তে আস্তে গড়ে উঠবে।

          শুরুতেই বায়ুমন্ডলে নাইট্রোজেন ও অক্সিজেনের পরিমাণ বাড়াতে হবে, এবং তার সাথে গ্রহটির সামগ্রিক তাপমাত্রা বাড়াতে হবে। মঙ্গলের মাটি থেকে গ্রিন-হাউজ গ্যাস পারফ্লুরোকার্বন নিসরণ করে বাতাসে ছেড়ে দিতে হবে। মাটিতে অনেক জমাট কার্বন-ডাই-অক্সাইড আছে। ভূস্তরের তাপমাত্রা বাড়লে সেই কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্যাসে পরিণত হবে। সেগুলো বাতাসের সাথে মিশে বায়ুচাপ বাড়তে শুরু করবে। বায়ুচাপ বাড়লে তরল পানির প্রবাহ পাওয়া যাবে। তখন মঙ্গলের লাল পাথরে আটকে পড়া মিথেন গ্যাস বেরিয়ে আসবে বেশি পরিমাণে। তারপর শুরু হবে ব্যাকটেরিয়া ও শ্যাওলার চাষ যেগুলো প্রচন্ড বৈরি পরিবেশে টিকে থাকতে পারে। গাঢ় রঙের উদ্ভিদ ও শৈবালের চাষ করলে মঙ্গলের ভূমিস্তরের রঙ গাঢ় হবে এবং সূর্য থেকে অনেক বেশি তাপ শোষণ করবে। ফলে ভূস্তরের তাপমাত্রা বাড়বে। এভাবে হাজার বছর পরে হয়তো মঙ্গলে উদ্ভিদ জন্মানো শুরু হবে। তাতে বাতাসে অক্সিজেনের পরিমাণ আস্তে আস্তে বাড়তে শুরু করবে।

          এসব পরিকল্পনা অনেক লক্ষ বছর পরে কী হতে পারে তার পরিকল্পনা। কিন্তু আর দশ থেকে পনেরো বছরের মধ্যেই যখন মানুষ মঙ্গল গ্রহে পা রাখবে - আমাদের অনেক চিন্তাভাবনার পরিবর্তন ঘটবে। যে কোন নতুন আবিষ্কার পুরনো অনেক ধারণা বদলে দেয়।

          ২০১০ সালে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ঘোষণা দিয়েছিলেন ২০৩৫ সালের মধ্যে আমেরিকা মঙ্গল গ্রহে নভোচারী পাঠাবে এবং তাদের আবার সুস্থ শরীরে পৃথিবীতে ফিরিয়ে নিয়ে আসবে। সে লক্ষ্যে কাজ করছে নাসা এবং আরো অনেক মহাকাশ সংস্থা। মঙ্গল গ্রহে এপর্যন্ত অনেকগুলো মিশন সাফল্যের সাথে পরিচালিত হয়েছে। মঙ্গল গ্রহের চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে অনেকগুলো বৈজ্ঞানিক স্যাটেলাইট। মঙ্গলের বুকে নেমে পরীক্ষা চালাচ্ছে যান্ত্রিক রোবট - রোভার। রোবট দিয়ে আমরা যে কাজ করিয়ে নিতে পারছি - সেখানে মানুষ পাঠানোর কী দরকার? দরকার হলো - যে যান্ত্রিক রোবটকে পৃথিবী থেকে মঙ্গলে পাঠানো হয় - তা যতই স্বয়ংক্রিয় হোক না কেন, তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে হয় পৃথিবীর কন্ট্রোল রুম থেকে। এক টন ওজনের রোভার মঙ্গলের বুকে এক কিলোমিটার যেতে যে সময় নেয়, তার অনেক কম সময়েই একজন নভোচারী তা করে ফেলতে পারে। মঙ্গলের ক্রেটারের দেয়াল বেয়ে একটি রোভারের নামতে বা উঠতে বছর লেগে যায়, সেখানে একজন মানুষ তা কয়েক মিনিটের মধ্যেই করে ফেলতে পারে। মঙ্গলে যদি নভোচারী পাঠানো যায়, তাহলে তারা খুব সহজেই নমুনা সংগ্রহ করে নিজেদের মহাকাশযানে ফিরে এসে ল্যাবরেটরি টেস্ট করে পৃথিবীতে ফলাফল পাঠিয়ে দিতে পারে। তারপর আবার নমুনা সংগ্রহ করতে পারে। মঙ্গলকে অনেক কম সময়ে অনেক বেশি জানা যাবে, যদি মঙ্গলে মানুষ পাঠানো যায়। মঙ্গল গ্রহে মানুষ পাঠানোর বাধা অনেক। প্রথম বাধা হলো দূরত্ব। পৃথিবী এবং মঙ্গল নিজ নিজ কক্ষপথে ঘুরতে ঘুরতে পরস্পর সবচেয়ে কাছের যে দূরত্বে আসতে পারে - সে দূরত্ব ৫ কোটি ৪৭ লক্ষ কিলোমিটার। পৃথিবী থেকে রকেটে চড়ে সেই দূরত্বে যেতে সময় লাগবে ৫ থেকে ১০ মাস। ফিরে আসতে লাগবে আবার ৫ থেকে ১০ মাস। মঙ্গলে গিয়ে কিছুদিন কাজ করতে হবে। নভোচারীদের জন্য শুধুমাত্র খাবার ও পানীয় নিতে হবে প্রায় দুই বছরের। কী পরিমাণ ওজন হবে এগুলোর? নভোযানের ভর যত বাড়বে, তার জ্বালানিও লাগবে তত বেশি। তাছাড়া আছে মহাজাগতিক তেজস্ক্রিয় বিকিরণ। মঙ্গল গ্রহে নভোচারীদের যাওয়ার সময় তেজস্ক্রিয় বিকিরণ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য কার্যকরী ব্যবস্থা নিয়ে যেতে হবে।

          মঙ্গলে যাওয়া-আসার পুরো সময়টাতে নভোচারীদের থাকতে হবে অনেকটা ওজনহীন অবস্থায়। মহাকাশে মহাকর্ষ বল শূন্য নয়। কিন্তু পৃথিবী থেকে আমরা যতই দূরে যাবো আমাদের মহাকর্ষ বলের মান ততই কমতে থাকবে। আমরা নিজেদের ওজনহীন বলে মনে করবো। দিনের পর দিন এরকম ওজনহীন অবস্থায় থাকার ফলে শারীরিক ও মানসিক অনেক সমস্যা দেখা দিতে পারে। এরজন্য দরকার অনেকদিনের ট্রেনিং। নভোচারীদের সে ট্রেনিং থাকে। তবে মঙ্গলের মত এত দীর্ঘ মহাকাশভ্রমণের ট্রেনিং এখনোপর্যন্ত কোন নভোচারীর নেই, সাধারণ মানুষের থাকার তো প্রশ্নই ওঠে না।

          মহাকাশবিজ্ঞানের উন্নতির সাথে সাথে মঙ্গল গ্রহে যাবার পথ আরো সুগম হয়ে উঠবে। এই শতাব্দীতে না হলেও ভবিষ্যত শতাব্দীতে হয়তো গড়ে উঠবে মঙ্গলে মানুষের বসতি।

 

তথ্যসূত্র 

1.    Clare Gibson, the Solar System, King Books, UK, 2012

2.    Giles Sparrow, Planets and Moons, Hinkler Books, Australia, 2006.

3.    Colin Ronan, The Universe Explained, Ken Fin Books, Australia, 1997.

4.   David A Rothery, Planets a very short introduction, Oxford University Press, Great Britain, 2010.

5.    Chris Cooper, Pam Spence, Carole Stott, Stars + Planets an illustrated guide, Star Fire, London, 2007.

6.    Gerard Cheshire, The Solar System and Beyond, Evans, London, 2006.

7.    Steve Parker, Solar System, Ticktock Media Ltd, Great Britain, 2006.Clare

8.    Heather Couper and Nigel Henbest, Encyclopedia of Space, DK Publishing, UK, 2003.

9.    Robin Kerrod & Carole Stott, Hubble the Mirror on the Universe, Third Edition, David and Charles, London, 2008.

10.  Patrick Moore, Mission to the Planets, Cassell, New York 1995.

11. Linda T. Elkins-Tanton, Mars, Chelsea House Publishers, New York, 2006.

12. Eric Burgess, To The Red Planet, Columbia University Press, New York, 1978.

13.  NSSDC Master Catalog, http://nssdc.gsfc.nasa.gov/nmc/

14.  Oliver De Goursac, Visions of Mars, Harry N. Abrams, Inc., Publishers., 2004.

15.  National Space Science Data Center,

       http://nssdc.gsfc.nasa.gov/

16.  Solar System Log by Andrew Wilson, published 1987 by Jane's Publishing Co. Ltd.

17. Mars Science Fiction to Colonization, Lighting Guides, Berkeley, California, 2015.

18.  Louisa Preston, Goldilocks and the Water Bears, the Serach for Life in the Universe, Louisa Preston, Bloomsbury Sigma, 2016.

19. Donald Rapp, Human Missions to Mars, Springer, Uk, 2008.

20. William K Hartmann, Mars The Mysterious Landscapes of the Red Planet, New York, 2003.

21.  Rod Pyle, Destination Mars New Explorations of the Red Planet, Prometheus Books, New York, 2012.

22.  Andrew Chaikin, A Passion for Mars, HNA Inc., 2008.

23.  To Mars and Beyond Search for the Origins of Life, National Museum of Australia, Canberra, 2001.

24.  Alfred S McEwen, Francis Rocard, Xavier Barral, This is Mars, Aperture, New York, 2013.

25.  Marc Kaufman, Mars Up Close Inside the Curiosity Mission, National Geographic, USA, 2014.

26.  Peter Bond, Space Recognition Guide, Collins, UK, 2008.

 ______


লাল গ্রহ মঙ্গল - পর্ব ১১

 


ষষ্ঠ অধ্যায়

মঙ্গলে প্রাণ 

মঙ্গল গ্রহে সবগুলো অভিযানের মূল উদ্দেশ্য হলো একটা প্রশ্নের সঠিক উত্তর জানা - মঙ্গলে প্রাণের অস্তিত্ব থাকা সম্ভব কি না। নাসার অনেকগুলো সফল মিশন থেকে মঙ্গল গ্রহের বর্তমান পরিবেশ সম্পর্কে যতটুকু জানা গেছে - তাতে বোঝা যাচ্ছে যে বর্তমান অবস্থায় মঙ্গল গ্রহে স্বাভাবিক-প্রাণ থাকা সম্ভব নয়। কিন্তু এই 'স্বাভাবিক-প্রাণ' বলতে আমরা বুঝছি পৃথিবীর প্রাণ-রাসায়নিক ভিত্তির উপর গড়ে ওঠা প্রাণ। পৃথিবীর প্রাণের মূল ভিত্তি তরল পানি। পৃথিবীতে তরল পানির অস্তিত্ব যেখানে আছে - সেখানেই প্রাণের সন্ধান পাওয়া গেছে। তাই বিজ্ঞানীদের ধারণা মঙ্গলেও যদি পানির অস্তিত্ব থাকে - তাহলে প্রাণের অস্তিত্বও থাকতে পারে। বিজ্ঞানীরা মঙ্গলে পানির অস্তিত্বের ব্যাপারে অনেকটাই নিশ্চিন্ত হয়েছেন। কিন্তু শুধুমাত্র পানির আভাস থাকলেই যে প্রাণের উদ্ভব ঘটবে এমন কোন নিশ্চয়তা নেই।

মঙ্গল মিশনগুলো মঙ্গল গ্রহের সবদিক থেকে হাজার হাজার ছবি তুলে পাঠিয়েছে। সাথে পাওয়া গেছে অসংখ্য তথ্য-উপাত্ত। সেগুলো বিশ্লেষণ করে মঙ্গল গ্রহে পানি থাকার সম্ভাবনা আছে কি না সে ব্যাপারে আলোকপাত করেছেন বিজ্ঞানীরা।

          মঙ্গল গ্রহের বায়ুমন্ডলের তাপমাত্রা ও বায়ুচাপ সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত ধারণা পেয়েছেন। মঙ্গলের বায়ুচাপ মাত্র ৬.১ মিলিবার। পৃথিবীর গড় বায়ুচাপ ১০১৩.২৫ মিলিবার। পৃথিবীর গড় বায়ুচাপকে আমরা হিসেবের সুবিধার্থে ১ atm বা ১ অ্যাটমোস্ফেরিক প্রেসার একক ধরে থাকি। সে হিসেবে মঙ্গলের গড় বায়ুচাপ হলো পৃথিবীর বায়ুচাপের এক হাজার ভাগের ছয় ভাগ (6.0 x 10-3) মাত্র। মঙ্গলের গড় তাপমাত্রা -৬৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। শূন্য ডিগ্রি তাপমাত্রায় পানি বরফ হয়ে যায়। সেখানে শূন্য ডিগ্রিরও ৬৩ ডিগ্রি নিচে কোন তরল পানি থাকতে পারে না। তাপমাত্রা ও বায়ুচাপের পরিবর্তনের সাথে পানির যে তিন অবস্থা - তরল, কঠিন, বায়বীয় - তার পরিবর্তন ঘটে। পৃথিবীর এক বায়ুমন্ডলীয় চাপে শূন্য ডিগ্রি থেকে ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় পানি তরল আকারে থাকে, ১০০ ডিগ্রির উপরে গেলে পানি বাষ্পে বা বায়বীয় অবস্থায় চলে যায়, আর শূন্য ডিগ্রির নিচে গেলে পানি বরফ বা কঠিন অবস্থায় চলে যায়।

বায়ুর চাপ কমতে থাকলে পানির স্ফুটনাংকও কমতে থাকে। বায়ুর চাপ কমতে কমতে ৬.১ মিলিবার বা 6.0 x 10-3 atm এর কাছাকাছি এলে ০.০১ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় পানি একই সাথে কঠিন, তরল কিংবা বায়বীয় অবস্থায় থাকতে পারে। এই অবস্থাকে পানির ট্রিপল পয়েন্ট বলা হয়। মঙ্গল গ্রহের বায়ুচাপ পানির ট্রিপল পয়েন্টের বায়ুচাপের সমান। কিন্তু তাপমাত্রায় শূন্য ডিগ্রির অনেক নিচে হওয়াতে মঙ্গলে তরল পানি থাকার সম্ভাবনা প্রায় শূন্য। কিন্তু মঙ্গলের তাপমাত্রা দিনের বেলায় বিষুবীয় অঞ্চলে ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত হতে পারে। তার মানে সেই অঞ্চলে খুব সামান্য পরিমাণে তরল পানি থাকলেও থাকতে পারে। সেই আশায় মঙ্গলে পানির সন্ধান করে চলেছে সবগুলো আধুনিক মঙ্গল মিশন।

মঙ্গল গ্রহের ভূমিতে অসংখ্য নদী নালা হ্রদের চিহ্ন রয়েছে যা কালের আবর্তনে শুকিয়ে গেছে। ভূমির এসব গঠন তরল পানি-প্রবাহের প্রমাণ বহন করছে। মঙ্গল গ্রহের ভূমির উপরিস্তরে এখন কোন তরল পানি নেই। প্রমাণ পাওয়া গেছে যে মঙ্গলের ধূলি বা রেগোলিথের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রচুর বরফ জমে আছে। রেগোলিথের মাঝে মাঝে এই রন্ধ্র বা ছিদ্রগুলো তৈরি হয়েছে জমাট কার্বন-ডাই-অক্সাইড বা ড্রাই আইস থেকে। শীতকালে ড্রাই আইসের উপর সামান্য ধূলি পড়লে তা আটকে যায় সেখানে। শীতের শেষে তাপমাত্রা বাড়ার সাথে সাথে কার্বন ডাই অক্সাইড বাষ্পীভূত হয়ে যায়। তখন অসংখ্য ছিদ্রযুক্ত ধূলো বা রেগোলিথের আস্তরণ ভূমিতে রয়ে যায়। এভাবে বছরের পর বছর ধরে এই প্রক্রিয়া চলতে চলতে এক মিটারেরও বেশি পুরু রেগোলিথের স্তর জমা হয়েছে ভূমির উপর। এই ছিদ্রগুলোর মধ্যে মঙ্গলের বায়ুমন্ডলের জলীয়বাষ্প জমে বরফ হয়ে থাকার সম্ভাবনা আছে।

 

চিত্র: তাপমাত্রা ও বায়ুচাপের সাথে পানির অবস্থার পরিবর্তন

 

মার্স ওডিসি মিশনের ছবি ও ডাটা থেকে প্রমাণ পাওয়া গেছে যে মঙ্গলের ভূমির উপরিস্তরের কাছাকাছি প্রচুর জমাট বরফ আছে। নাসার মঙ্গল মিশন ওডিসি গামা রে স্পেকট্রোমিটারের সাহায্যে এই পানি শনাক্ত করেছে। সূর্য ও অন্যান্য নক্ষত্র থেকে শক্তিশালী মহাজাগতিক রশ্মি মঙ্গলের ভূমিতে আসে। ভূমির রাসায়নিক উপাদানের সাথে মহাজাগতিক রশ্মির বিক্রিয়ায় ভূমি থেকে গামা রশ্মি ও নিউট্রন কণা নির্গত হয়। কী ধরনের মৌলের সাথে মহাজাগতিক রশ্মির বিক্রিয়া ঘটছে তার উপর নির্ভর করে নিউট্রন কণাগুলোর নির্গমনের গতি। নিউট্রন কণাগুলো কত বেগে নির্গত হচ্ছে তা শনাক্ত করা হয় মার্স ওডিসি স্যাটেলাইটের গামা রে স্পেকট্রোমিটারের সাহায্যে। দেখা গেছে মঙ্গলের ভূমির মাত্র এক মিটার নিচেই রয়েছে প্রচুর পরিমাণে হাইড্রোজেনের উপস্থিতি। এই হাইড্রোজেন প্রচুর পানির উপস্থিতির প্রমাণ। ঠিক কী পরিমাণ পানি মঙ্গলের ভূমির নিচে আছে তা সঠিকভাবে বলা এখনো সম্ভব হয়নি। তবে আনুমানিক হিসেবে দেখা গেছে পৃথিবীর মহাসাগরগুলোতে একশ মিটার গভীরতা পর্যন্ত যতটুকু পানি ধরবে তার চেয়ে কম হবে না মঙ্গলের পানির পরিমাণ।

 

চিত্র: ২০১৫ সালে নাসা ঘোষণা করেছে যে মঙ্গলে তরল পানির সন্ধান পাওয়া গেছে। গার্নি ক্রেটারের পাড় থেকে যে সরল রেখাগুলো নিচের দিকে নেমে গেছে সেগুলোর একেকটার দৈর্ঘ্য প্রায় ১০০ মিটার। বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন যে এগুলো সব মঙ্গলের লবণাক্ত পানির ধারা।

         

মঙ্গল গ্রহে প্রাণ থাকার ব্যাপারে বিজ্ঞানীরা খুব বেশি আশাবাদী হয়ে উঠেছিলেন পৃথিবীতে পাওয়া মঙ্গলের উল্কাপিন্ড পরীক্ষা করে। ১৯৮৪ সালে অ্যান্টার্কটিকার অ্যালেন হিল্‌স-এ পাওয়া যায় উল্কাপিন্ড এ-এল-এইচ-৮৪০০১। আইসোটোপিক ডেটিং পদ্ধতিতে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হয়েছেন যে এই উল্কাপিন্ডের বয়স প্রায় ৪০০ কোটি বছর। এই পাথরটি মঙ্গল গ্রহের অংশ। প্রায় দেড় কোটি বছর আগে এটা মঙ্গল গ্রহ থেকে ছিটকে পড়েছিল। তারপর মহাকাশে বিভিন্ন ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে পৃথিবীতে এসে পৌঁছেছে প্রায় ১ কোটি ১০ লক্ষ বছর আগে। ১৯৮৪ সালে এই পাথরটি আবিষ্কৃত হয়। কিন্তু ১৯৯৬ সালে বিজ্ঞানীরা দাবি করেন যে এই পাথরে মঙ্গল গ্রহে প্রাণের অস্তিত্বের প্রমাণ আছে। এই দাবির ভিত্তিতে প্রথম বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয় ১৯৯৬ সালের আগস্ট মাসে। তারপর থেকে এপর্যন্ত কয়েক শ' গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে শুধুমাত্র এই উল্কাপিন্ডের উপর ভিত্তি করে মঙ্গল গ্রহে প্রাণের অস্তিত্বের সপক্ষে।

          এই পাথরটিতে পাওয়া গেছে সিলিকেট ছাড়াও আরো অনেক ধরনের খনিজ কার্বনেট, যাদের মধ্যে আছে ক্যালসাইট, ম্যাগনেসাইট, অ্যানকেরাইট, ও সাইডেরাইট। সাইডেরাইটের মধ্যে আছে ম্যাগনেটাইট ও পাইরোটাইটের কৃস্টাল। দেখা গেছে পাথরের সিলিকেটগুলোর বয়স প্রায় ৪৫০ কোটি বছর। কিন্তু কার্বনেটগুলোর বয়স ৩৯০ থেকে ৪১০ কোটি বছরের মধ্যে। তার মানে মঙ্গল গ্রহ তৈরি হবার সময় যে সিলিকেট ছিল তার উপর কার্বনেট এসেছে আরো ৫০ কোটি বছর পর। খনিজ কার্বনেট তৈরি হয় পানি থেকে। সুতরাং মঙ্গলে কার্বনেট থাকার অর্থ হচ্ছে সেখানে সেই সময় পানি ছিল। ১ কেজি ৯৩১ গ্রাম ভরের পাথরটির মাত্র ১% অর্থাৎ মাত্র ১৯ গ্রাম হলো খনিজ কার্বনেট। তা সত্ত্বেও বিজ্ঞানীরা উৎসাহী হয়ে উঠেন মঙ্গলে প্রাণ থাকার ব্যাপারে।

          মঙ্গলে প্রাণ থাকার ব্যাপারে বড় প্রমাণ হলো এই উল্কাপিন্ডের একটি অংশে অণুজীবের ফসিল পাওয়া যায়। সূক্ষ্ম নলাকৃতি এসব ফসিল ন্যানো-ব্যাকটেরিয়ার বলে ধারণা করা হচ্ছে। যদিও এখনো নিশ্চিন্তভাবে প্রমাণিত হয়নি, কিন্তু বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন যে মঙ্গল গ্রহে এধরনের ফসিল আরো পাওয়া যাবে - যা মঙ্গলে প্রাণের অস্তিত্বের পক্ষে সাক্ষ্য দেবে।

কার্বনেট মিনারেলের মধ্যে সামান্য পরিমাণে ম্যাগনেটাইট পাওয়া গেছে। বিজ্ঞানীদের ধারণা মঙ্গলের ব্যাকটেরিয়াগুলো এই ম্যাগনেটাইট তৈরি করেছে। পৃথিবীতে এক শ্রেণির ব্যাকটেরিয়া নিজেদের শরীরে মাইক্রোস্কোপিক ক্রিস্টাল তৈরি করে, পৃথিবীর চুম্বকত্ব কাজে লাগিয়ে সমুদ্রের গভীরে দিক নির্ণয় করার জন্য। তাই এই ক্রিস্টালগুলোর নাম দেয়া হয়েছে ম্যাগনেটাইট। মঙ্গলের পাথরে পাওয়া ম্যাগনেটাইট ক্রিস্টালগুলোর গঠনের সাথে পৃথিবীতে প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট ম্যাগনেটাইটের ক্রিস্টালের গঠনের মিল নেই। বিজ্ঞানীরা প্রমাণ পেয়েছেন যে এই ক্রিস্টালের গঠনের সাথে পৃথিবীর ব্যাকটেরিয়ার সৃষ্ট ম্যাগনেটাইটের ক্রিস্টালের গঠনের মিল আছে। সেসূত্রে বিজ্ঞানীরা দাবি করছেন যে এগুলো মঙ্গলের ব্যাকটেরিয়া দ্বারা তৈরি হয়েছে। এখান থেকে দুটো সিদ্ধান্তে আসা যায়। এক - মঙ্গলে অণুজীব ছিল, দুই - মঙ্গলের চুম্বকত্ব ছিল।

 

চিত্র: এ-এল-এইচ-৮৪০০১ উল্কাপিন্ডে অণুজীবের ফসিল

 

মঙ্গলে এখন কোন চুম্বকত্ব অবশিষ্ট নেই। কোন কোন পাথরে সামান্য চুম্বকত্বের আভাস পাওয়া গেছে, যেখান থেকে প্রমাণিত হয় যে মঙ্গলে এক সময় চুম্বকত্ব ছিল। কিন্তু ঠিক কখন এবং কী কারণে মঙ্গলের চুম্বকত্ব নষ্ট হয়ে গেছে সে ব্যাপারে বিজ্ঞানীরা এখনো নিশ্চিত হতে পারেননি।

          কোন কোন বিজ্ঞানী যুক্তি দিচ্ছেন যে যে প্রচন্ড সংঘর্ষের ফলে মঙ্গল গ্রহের এই পাথরটি ছিটকে বেরিয়ে গেছে - সেই সংঘর্ষের ফলে প্রাণের কোন অস্তিত্বের প্রমাণ টিকে থাকার কথা নয়। কিন্তু মহাকাশ হলো প্রচন্ড ঠান্ডা। এই উল্কাখন্ডগুলো যতদিন মহাকাশে ভ্রমণ করে - একটা বিশাল প্রাকৃতিক ডিপ-ফ্রিজের মধ্যে থাকে। সুতরাং জীবনের কোন চিহ্ন যদি সেখানে থাকে তা মঙ্গল থেকে পৃথিবীতে আসার ফলে নষ্ট হয়ে যেতে পারে না। মঙ্গলের পাথরে কার্বনেটের চিহ্ন - মঙ্গলে জীবনের চিহ্নই নির্দেশ করে।

          মঙ্গল গ্রহের যে পরিবেশ তাতে কোন জীব বা অণুজীব বেঁচে থাকতে পারে কি না - সে প্রশ্নই এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। পৃথিবীতে কিছু অণুজীব আছে যারা অত্যন্ত প্রতিকুল পরিবেশেও বেঁচে থাকতে পারে। কিছু ব্যাকটেরিয়া - যাদের নাম দেয়া হয়েছে কেমোলিথোওঅটোট্রোফস - নিজের শরীর থেকে শক্তি নিয়েই পাথরের মধ্যে বেঁচে থাকতে পারে। এরা কোন ধরনের সূর্যালোক ছাড়া শুধুমাত্র ১% অক্সিজেন লেভেলেও বেঁচে থাকতে পারে। এরা মিথেন, ম্যাঙ্গানিজ, লোহা কিংবা আর্সেনিক থেকেও তাদের দরকারি শক্তি সংগ্রহ করতে পারে। এদের অনেকে খনিজ সালফার খেয়ে সালফিউরিক এসিড তৈরি করে নিজের শরীরে। সাগরের কয়েক কিলোমিটার নিচে পাথরের খাঁজে খাঁজে বাস করছে এসব ব্যাকটেরিয়া। তীব্র এসিডিক পানিতেও বেঁচে থাকতে পারে অনেক ব্যাকটেরিয়া। একধরনের অণুজীব - ফেরোপ্লাজমা - তীব্র এসিডের  (pH = 0) মধ্যেও বেঁচে থাকতে পারে। পৃথিবীতে আরো অণুজীব আছে, যেমন এক্সট্রিমোফিলস, - যারা প্রচন্ড ঠান্ডা কিংবা প্রচন্ড গরমেও বেঁচে থাকে। বিজ্ঞানীরা যুক্তি দিচ্ছেন পৃথিবীতেই যদি এরকম অণুজীব থাকতে পারে - তাহলে মঙ্গলের অণুজীবরাও পারবে। মঙ্গলে প্রাণের অস্তিত্ব আছে কি না সে প্রশ্নের নিশ্চিত উত্তর দেয়ার জন্য মঙ্গলে আরো অনেক অভিযান চালানো দরকার। বিশেষ করে নভোচারীরা যদি মঙ্গলে সশরীরে গিয়ে পরীক্ষা চালাতে পারেন, তাহলে মঙ্গলে জীবনের জীবাশ্ম পাওয়া যেতেও পারে।

Latest Post

চিকিৎসাবিজ্ঞানে যান্ত্রিক বুদ্ধিমত্তা

  ধীরে ধীরে চোখের আলো নিভে আসছিলো রিস হিবার্টের। পৃথিবীর আলো দেখার আশা ছেড়েই দিতে হয়েছিল তাঁকে। দু’বছর আগেও বেশ সুস্থ স্বাভাবিক ছিলেন তিনি। ...

Popular Posts