Sunday, 23 October 2022

লুই ডি ব্রগলি: কোয়ান্টাম তত্ত্বের রাজপুত্র

 




আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের জন্য সবচেয়ে দরকারি এবং কার্যকরী তত্ত্ব হলো কোয়ান্টাম তত্ত্ব। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে ম্যাক্স প্ল্যাংক ও নীল্‌স বোর কোয়ান্টাম তত্ত্বের গাণিতিক প্রয়োগ শুরু করেন। এর মাত্র কয়েক বছর আগে উনবিংশ শতাব্দীর একেবারে শেষের দিকে ১৮৯৫ সালে এক্স-রে, ১৮৯৬ সালে তেজষ্ক্রিয়তা এবং ১৮৯৭ সালে ইলেকট্রন আবিষ্কৃত হয়েছে। ১৯০৫ সালে আইনস্টাইন আলোর ফটো-ইলেকট্রিক ইফেক্ট এর কার্যকর ব্যাখ্যা দিয়েছেন। ১৯১১ সালে পরমাণুর নিউক্লিয়াস এবং প্রোটন আবিষ্কার করেছেন আর্নেস্ট রাদারফোর্ড। এসবের ভিত্তিতে নীল্‌স বোর পরমাণুর কোয়ান্টাম মডেল দাঁড় করিয়েছেন। কোয়ান্টাম মেকানিক্সের ভিত্তি তখন দিনে দিনে শক্ত হচ্ছে। আলোর ফোটন কণা হিসেবে যেমন কাজ করে, তেমনি তরঙ্গ হিসেবেও কাজ করতে পারে। অর্থাৎ আলোর দ্বৈতচরিত্র – কণা এবং তরঙ্গ তা ততদিনে প্রমাণিত হয়ে গেছে। আইনস্টাইন তাঁর আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্বের (স্পেশাল থিওরি অব রিলেটিভিটি) সাহায্যে প্রতিষ্ঠা করেছেন সর্বকালের জনপ্রিয় সমীকরণ E = mc2। এই সূত্র থেকে দেখা যায়, পদার্থকে শক্তিতে রূপান্তরিত করা যায়, আবার শক্তিকেও রূপান্তর ঘটিয়ে পদার্থ পাওয়া যায়। আলোর কণা ও তরঙ্গের দ্বৈতসত্ত্বা প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবার পরবর্তী দশ বছরের মধ্যে পদার্থেরও যে কণা ও তরঙ্গের দ্বৈতসত্ত্বা থাকতে পারে – সেই তত্ত্ব সামনে নিয়ে এলেন পদার্থবিজ্ঞানের জগতে প্রায়-নবাগত লুই ডি ব্রগলি। ১৯২৪ সালে লুই ডি ব্রগলি তাঁর পিএইচডি থিসিসে এই তত্ত্ব প্রকাশ করেন যে আলোর যেমন কণা ও তরঙ্গের দ্বৈতধর্ম আছে, অর্থাৎ স্বাভাবিক অবস্থায় আলো তরঙ্গ হলেও কণার ধর্মও প্রদর্শন করে, তেমনি ইলেকট্রনও স্বাভাবিক অবস্থায় কণা হলেও, তরঙ্গের ধর্ম প্রদর্শন করতে পারে। তারপর  মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যেই এই তত্ত্ব পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার অর্জন করে। প্রিন্স লুই ভিক্টর পিয়েরে রেমন্ড ডি ব্রগলি ইলেকট্রনের তরঙ্গধর্ম আবিষ্কার করার জন্য ১৯২৯ সালের পদার্থবিজ্ঞানের নোবেল পুরষ্কার অর্জন করেছেন। অথচ আশ্চর্যের বিষয় হলো লুই ডি ব্রগলি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শুরুর দিকে জেনারেল ফিজিক্স পরীক্ষায় ফেল করে বিজ্ঞান পড়াই ছেড়ে দিয়েছিলেন। তারপর নানা পথ পের হয়ে ফিরে এসেছেন তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞানে। আর তার দশ বছর পরেই তিনি পদার্থবিজ্ঞানে ইতিহাস তৈরি করলেন।

প্রিন্স বা রাজপুত্র বলতে যেরকম কোন রাজ্যের রাজার পুত্রকে বোঝায় – ঠিক সেরকম না হলেও ফ্রান্সের অত্যন্ত ধনী, বনেদী এবং ক্ষমতাশালী পরিবারের সন্তান লুই ডি ব্রগলি। পারিবারিক উত্তরাধিকারসূত্রেই তিনি ছিলেন প্রিন্স। রোমান সাম্রাজ্যের উচ্চপদাধিকারীদের এই উপাধি দেয়া হতো। লুই ডি ব্রগলির প্রপ্রপিতামহ ভিক্টর ফ্রাঁসোয়া ডি ব্রগলি প্রিন্স উপাধি পেয়েছিলেন আস্ট্রিয়ার সম্রাটের কাছ থেকে। ভিক্টর ও পলিন ডি ব্রগলির পাঁচ সন্তানের মধ্যে সবার ছোট লুই ডি ব্রগলির জন্ম ১৮৯২ সালের ১৫ আগস্ট। ভিক্টর ছিলেন ডিউক – ফ্রান্সের অত্যন্ত উচ্চ পদমর্যাদাসম্পন্ন মানুষ। ডিউক পদমর্যাদা উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া। ডিউকের বড় ছেলে ডিউক হবে এটাই নিয়ম। ভিক্টরের মৃত্যুর পর তাঁর বড় ছেলে মরিস ডিউক হলেন। লুইয়ের চেয়ে সতের বছরের বড় মরিস ডি ব্রগলি ছিলেন তখনকার সময়ে ইওরোপের খ্যাতিমান পরীক্ষণপদার্থবিজ্ঞানীদের একজন। নিজের টাকায় নিজের বাড়িতে তিনি বিশাল ল্যাবরেটরি তৈরি করে গবেষণা করতেন।

বাড়িতে খ্যাতিমান অগ্রজ থাকলে অনুজদের যা হয়, লেখাপড়া নিয়ে সারাক্ষণই একটা মানসিক চাপের মধ্যে থাকতে হয়; মরিসের ছোট ভাইবোনদের ক্ষেত্রেও তা হলো। লুইয়ের চেয়ে চার বছরের বড় বোন পলিনের নাম রাখা হয়েছিল মায়ের নামে। পলিন পদার্থবিজ্ঞান পড়তে চেয়েছিল। কিন্তু মরিস তাতে বাধ সাধলেন। ইওরোপে তখনো মেয়েদেরকে বিজ্ঞানশিক্ষায় উৎসাহিত করা হতো না। পলিন বিজ্ঞান পড়তে না পেরে সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করেছেন এবং পরবর্তীতে ফ্রান্সের অত্যন্ত খ্যাতিমান সাহিত্যিক হয়ে উঠেছিলেন। পলিনের সাথে লুইয়ের খুব বন্ধুত্ব ছিল।

বড়ভাই বিজ্ঞানী মরিসের তত্ত্বাবধানে বাড়িতেই প্রাইভেট টিউটরদের কাছে লেখাপড়া শুরু হলো লুইয়ের। ১৯০৬ সালে বাবার মৃত্যুর পর মরিস ডিউক হলেন। মরিস এবার চৌদ্দ বছর বয়সী লুইকে প্যারিসের বিখ্যাত স্কুল লাইসি জ্যানসন দ্য সেইলি-তে ভর্তি করানোর ব্যবস্থা করলেন। তিন বছর পর দর্শন ও গণিতে ভালো নম্বর পেয়ে স্কুল-ফাইনাল পাস করলেন লুই।

১৯১০ সালে আঠারো বছর বয়সে ভর্তি হলেন সরবোন ইউনিভার্সিটিতে। কিন্তু তখনো তিনি জানেন না ঠিক কী হতে চান জীবনে। তার সমবয়সী ভাগনে চার্লসও ভর্তি হয়েছেন সরবোনে। চার্লসের প্রভাবে লুই ইতিহাস বিষয়ে পড়াশোনা শুরু করলেন। কিন্তু  ইতিহাসের গৎবাঁধা গবেষণা-বিশ্লেষণহীন পড়াশোনা তাঁর ভালো লাগলো না। অনেকদিন ইতিহাস পড়ার পর মাঝপথে ছেড়ে দিলেন। পারিবারিক প্রভাব খাটিয়ে তিনি সহজেই বড় আমলা হতে পারতেন, কিংবা রাজনৈতিক নেতা হতে পারতেন। কিন্তু সেসবের কিছুই লুইকে টানে না। কী হতে চান সেটা তখনো না জানলেও আমলা বা নেতা কোনটাই যে হতে চান না সে ব্যাপারে তিনি মনস্থির করে ফেলেছিলেন। ইতিহাসে আনন্দ না পেয়ে তিনি আইন পড়তে শুরু করলেন। এক বছর তিনি আইন পড়লেন। কিন্তু তাতেও কোন আগ্রহ পেলেন না। গণিতের বিশেষ কোর্স করার পর তিনি ক্রমে পদার্থবিজ্ঞান, বিশেষ করে তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠলেন। কিন্তু পদার্থবিজ্ঞানের একটি পরীক্ষায় (জেনারেল ফিজিক্স) তিনি ফেল করলেন। এতে তাঁর মনোবল একেবারেই ভেঙে গেল। শৈশব কৈশোরে যে লুই এত প্রাণবন্ত ছিলেন, তিনি এবার হঠাৎ খুব নিষ্প্রাণ হয়ে গেলেন। কারো সাথেই তেমন মেশেন না, সারাক্ষণ চিন্তিত থাকেন।

১৯১১ সালে ব্রাসেল্‌স এ অনুষ্ঠিত প্রথম সলভে কনফারেন্সের অন্যতম সেক্রেটারি ছিলেম মরিস ডি ব্রগলি। তিনি ব্রাসেলস-এ যাবার সময় ছোটভাই লুইকেও সাথে নিয়ে গেলেন। ইওরোপের প্রথম সারির সব পদার্থবিজ্ঞানীদের মাঝে গিয়ে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের ক্রমবর্ধমান গতিপথ লক্ষ্য করে উনিশ বছরের তরুণ লুই ডি ব্রগলি তাঁর ভবিষ্যতের পথ খুঁজে পেলেন। তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞানের প্রতি সত্যিকারের ভালোবাসা অনুভব করলেন। ১৯১৩ সালে সরবোন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘লাইসেনসিয়েট ইন সায়েন্স’ বা বিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করলেন।

পরবর্তী ধাপের পড়াশোনা কিংবা গবেষণা শুরু করার আগেই ১৯১৩ সালের তাঁর বাধ্যতামূলক মিলিটারি সার্ভিস শুরু হয়ে গেলো। পরের বছরই প্রথম বিশ্বযুদ্ধ লেগে গেলো। যুবকদের যুদ্ধে যোগ দেয়া বাধ্যতামূলক। লুই-এর পোস্টিং হয়ে গেলো মিলিটারির ইঞ্জিনিয়ারিং কোরে। প্রচন্ড বিরক্তিকর কাজ তাঁর জন্য। প্রভাবশালী বড়ভাই থাকলে তখনো কমবেশি কাজ হতো। ডিউক মরিস ডি ব্রগলি সেনাবাহিনীর উঁচুপর্যায়ে তদবির করে লুইকে সম্মুখযুদ্ধে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচিয়ে আইফেল টাওয়ারের নিচে পোস্টিং দেয়ার ব্যবস্থা করলেন – যেখানে একটি রেডিও ট্রান্সমিটার বসানোর কাজ চলছিলো। পরবর্তী ছয় বছর ধরে লুই ডি ব্রগলি এই ট্রান্সমিটারের রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করেছেন ইলেকট্রিসিয়ান হিসেবে। এটাকে পরে তিনি তাঁর হাতেকলমে বেতার যোগাযোগের ইলেকট্রনিক পদ্ধতি সম্পর্কে প্রশিক্ষণের সুযোগ হিসেবে দেখেছেন।

১৯১৯ সালের আগস্ট মাসে মিলিটারি সার্ভিস থেকে অব্যাহতি পেলেন লুই ডি ব্রগলি। ছয় বছরের মিলিটারি সার্ভিসের স্বীকৃতি হিসেবে তাঁকে অ্যাডজুটেন্ট পদবী দেয়া হয়। বাড়িতে ফিরে এসে আবার লেখাপড়া শুরু করলেন লুই ডি ব্রগলি। মরিসের ল্যাবে এক্স-রে সংক্রান্ত পরীক্ষণ-গবেষণায় কিছুদিন হাত লাগালেন। এক্স-রে বর্ণালী এবং ফটোইলেকট্রিক ইফেক্ট সংক্রান্ত অনেকগুলি পরীক্ষণে তিনি অংশ নিলেন। পরীক্ষণ ফলাফলগুলিকে কোয়ান্টাম পরমাণুতত্ত্ব প্রয়োগ করে বিশ্লেষণমূলক অনেকগুলি গবেষণাপত্র প্রকাশ করলেন তিনি।

কোয়ান্টাম মেকানিক্সের অগ্রগতি তিনি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছিলেন। আলোর তরঙ্গ ও কণার দ্বৈতধর্ম প্রমাণিত হয়ে গেছে। লুই ডি ব্রগলি ১৯২৩ সালে পরপর তিনটি ছোট গবেষণাপত্রে প্রমাণ করে দিলেন যে আলো তরঙ্গ হয়েও যেভাবে কণার ধর্ম প্রদর্শন করে, তেমনি ইলেকট্রন কণা হয়েও তরঙ্গের ধর্ম প্রদর্শন করতে পারে। অর্থাৎ যে কোনো বস্তুও কণা ও তরঙ্গের দ্বৈতধর্ম ধারণ করে।

লুই ডি ব্রগলির বস্তু-তরঙ্গের গাণিতিক ভিত্তি কয়েকটি সহজ সমীকরণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। আইনস্টাইনের শক্তি ও পদার্থের সমীকরণ E = mc2, যেখানে E = শক্তি, m = বস্তুর ভর, c = আলোর বেগ। আবার শক্তি ও তরঙ্গের সমীকরণ লেখা যায়, E = hf, যেখানে E = শক্তি, h = প্ল্যাংকের ধ্রুবক = 6.63 x 10-34 Joule-second, এবং f = তরঙ্গের কম্পাঙ্ক। শক্তির উভয় সমীকরণের সাম্যতা বিবেচনা করে লেখা যায়, mc2 = hf. আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য যদি L হয়, কম্পাঙ্ক যদি f হয়, তাহলে আলোর বেগ c = Lf; যা থেকে লেখা যায় f = c/L; কম্পাঙ্কের মান বসানোর পর সমীকরণ দাঁড়ায়, mc2 = hc/L, যেখান থেকে লেখা যায়, L = h/mc, অর্থাৎ বস্তুর তরঙ্গদৈর্ঘ্য = প্ল্যাঙ্কের ধ্রুবক/বস্তুর ভরবেগ।

১৯২৪ সালে লুই ডি ব্রগলি তাঁর পিএইচডি থিসিস প্রকাশ করলেন। ইওরোপের অনেক বিজ্ঞানীর চোখেই পড়েছে তাঁর বস্তু-তরঙ্গের সূত্র, কিন্তু কেউই খুব একটা পাত্তা দিলেন না। কিন্তু আইনস্টাইন আর শ্রোডিঙ্গার খুবই গুরুত্বের সাথে নিলেন তাঁর এই তত্ত্ব। শ্রোডিঙ্গার তাঁর ওয়েভ মেকানিক্সে লুই ডি ব্রগলির বস্তু তরঙ্গ প্রয়োগ করলেন।

পদার্থবিজ্ঞানের তত্ত্ব যতক্ষণ পর্যন্ত পরীক্ষণের সাহায্যে প্রমাণিত নয়, ততক্ষণ পর্যন্ত সেই তত্ত্ব খুব একটা গুরুত্ব পায় না। অনেক বিজ্ঞানীকে বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হয় তাঁদের তত্ত্ব প্রমাণিত হবার জন্য। পিটার হিগ্‌স ১৯৬৫ সালে যে হিগ্‌স বোসনের তত্ত্ব দিয়েছিলেন, তার ৪৭ বছর পর হিগ্‌স বোসন পাওয়া গেছে। লুই ডি ব্রগলিকে বেশিদিন অপেক্ষা করতে হয়নি। মাত্র তিন বছরের মধ্যেই তাঁর তত্ত্ব প্রমাণিত হয়ে গেল। ১৯২৭ সালে আমেরিকার পদার্থবিজ্ঞানী ক্লিনটন ডেভিডসন ও লেস্টার জারমার, এবং ব্রিটিশ পদার্থবিজ্ঞানী জর্জ থমসন পরীক্ষণের সাহায্যে প্রমাণ করেন যে ইলেকট্রনও তরঙ্গের ধর্ম প্রদর্শন করে। পরবর্তীতে ইলেকট্রনের ধর্মাবলী বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে লুই ডি ব্রগলির তত্ত্ব বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। ডি ব্রগলির তত্ত্ব থেকেই পাওয়া গেছে ম্যাগনেটিক লেন্স – যা কাজে লাগিয়ে উদ্ভাবিত হয়েছে ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপ।

১৯২৪ সালের নভেম্বর মাসে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করার পর সরবোন বিশ্ববিদ্যালয়ে দুই বছর অবৈতনিক শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করার পর নিয়মিত শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। সরবোন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার সময়েই ১৯২৯ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার অর্জন করলেন লুই ডি ব্রগলি। ১৯৩২ সালে তিনি ইউনিভার্সিটি অব প্যারিসে যোগ দেন। সেই সময় হেনরি পয়েনকেয়ার ইন্সটিটিউটে তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ খোলা হয় এবং লুই ডি ব্রগলির জন্যই ইন্সটিটিউটের চেয়ারম্যান পদ সৃষ্টি করা হয়। ১৯৩২ সালের শেষের দিকে তিনি সেই পদে যোগ দেন এবং পরবর্তী তিরিশ বছর সেখানেই ছিলেন। ১৯৬২ সালে তিনি অবসর গ্রহণ করেন।

১৯৩৩ সালে ফ্রান্সের একাডেমি অব সায়েন্সের সদস্যপদ লাভ করেন। ১৯৪২ সালে তিনি একাডেমির পার্মানেন্ট সেক্রেটারি নির্বাচিত হন। ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত তিনি সেই পদে ছিলেন। ১৯৪৮ সালে তিনি আমেরিকান একাডেমি অব সায়েন্স এবং ১৯৫৩ সালে রয়েল সোসাইটির সদস্য মনোনীত হন।

পদার্থবিজ্ঞানীরা সাধারণত ঠোঁটকাটা হয়ে থাকেন। নম্রতা ও ভদ্রতার প্রচলিত সামাজিক সংজ্ঞাগুলি নিয়ে তাঁরা খুব একটা মাথা ঘামান না। কিন্তু লুই ডি ব্রগলি ছিলেন খুবই ব্যতিক্রমী একজন। কয়েক প্রজন্মের উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত পারিবারিক ঐশ্বর্য, খ্যাতি এবং ক্ষমতার কোনকিছুই তিনি ব্যক্তিগত অর্জনের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করেননি। সবার সাথেই খুব নম্রভাবে কথা বলতেন লুই ডি ব্রগলি।

এত ক্ষমতা ও  ঐশ্বর্যের মালিক হওয়া সত্ত্বেও তিনি খুব সাধারণ জীবনযাপন করতেন। বড়ভাই মরিসের মৃত্যুর পর – মরিসের ছেলে সন্তান না থাকাতে লুই ডি ব্রগলি ডিউক হলেন। তাতেও তাঁর জীবনযাপনে কোন পরিবর্তন আসেনি। জগতসংসারের প্রতি এক ধরণের বৈরাগ্যই ছিল তাঁর। ব্যক্তিগত কোন গাড়ি তিনি ব্যবহার করতেন না। দীর্ঘ জীবন লাভ করেছিলেন। কখনো বিয়ে করেননি। শেষ বয়সে দেখাশোনার জন্য দু’জন বিশ্বস্ত কাজের লোক ছিল। অনেকটা ঘরকুনো স্বভাবের মানুষ ছিলেন তিনি। কয়েকবার সলভে কনফারেন্স আর একবার নোবেল পুরষ্কার নেয়ার জন্য স্টকহোমে ছাড়া আর কোন দেশে ভ্রমণও করেননি। অদ্ভুত নির্লিপ্ত নিস্তরঙ্গ জীবন যাপন করেছেন রাজপুত্র লুই ডি ব্রগলি। ১৯৮৭ সালের ১৯ মার্চ ৯৫ বছর বয়সে তাঁর জীবনাবসান হয়।

 

তথ্যসূত্র: (1) Ioan James, Remarkable Physicist, Cambridge University Press, UK, 2004; (2) Biographical Encyclopedia of Scientists, World Book Chicago, 2003; (3) Heinrich A. Medicus, Fifty years of matter waves, Physics Today, February 1974; Mary Jo Nye, Aristocratic culture and the pursuit of science: the De Broglies in Modern France, JSTOR Vol 88, No 3, (1997).

_____________

বিজ্ঞানচিন্তা সেপ্টেম্বর ২০২২ সংখ্যায় প্রকাশিত







Monday, 3 October 2022

বিশ্ববীণা বাজে যেথায় - ৬

 



পরীক্ষার হলে বসে বই দেখে দেখে উত্তর লিখলে সেটাকে কি পরীক্ষা বলা চলে? বাংলাদেশে স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত হিসেব করলে কয়েক শ পরীক্ষা আমাদের দিতে হয়েছে। সেখানের কোন পরীক্ষায় সবচেয়ে সাহসী নকলবাজও প্রকাশ্যে বই খুলে লেখার মতো চরম অপরাধ করার সাহস পায় না। অথচ এখানে মেলবোর্ন ইউনিভার্সিটির ফিজিক্স ডিপার্টমেন্টের সাত তলার এই ছোট্ট পরীক্ষার হলের আটজন পরীক্ষার্থীর সবাই এখন বই খুলে পরীক্ষা দিচ্ছে। এর নাম ওপেন বুক এক্সাম।

ওপেন বুক এক্সাম সম্পর্কে আমার কোন ধারণাই ছিল না। প্রফেসর অ্যালেন যখন বলেছিলেন স্ক্যাটারিং থিওরির পরীক্ষাটি ওপেন বুক এক্সাম হবে – আমি শুরুতে ব্যাপারটা বুঝতে পারিনি। একে ওকে জিজ্ঞেস করে যা জানতে পারলাম তাতে বেশ অবাক হলাম। এখানে কত ধরনের পরীক্ষা যে আছে! ওপেন বুক এক্সামে যত খুশি বই খুলে প্রশ্নের উত্তর লেখা যায়। কিছু কিছু পরীক্ষা নাকি ঘরে বসেও দেয়া যায়। ম্যাথমেটিক্স ডিপার্টমেন্টে নাকি কয়েকটি টুয়েন্টি ফোর আওয়ার এক্সাম আছে -  ডিপার্টমেন্ট থেকে প্রশ্ন আর খাতা নিয়ে যে কোনো জায়গায় বসে চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে প্রশ্নের উত্তর লিখে আবার ডিপার্টমেন্টে জমা দিতে হয়। আমি জানি না এ কেমন ধরনের পরীক্ষা! এরকম পরীক্ষা হলে পরীক্ষার্থী তো মাস্টার ভাড়া করে এনে পরীক্ষা দিতে পারে। কিন্তু ব্যাপারটি যে মোটেও সহজ নয় তা বুঝতে পারলাম ক’দিন পরেই।

ওপেন বুক এক্সাম দিতে এসে যে জিনিসটি আবারো উপলব্ধি করলাম – সেটা অনেকটাই দার্শনিক। দর্শনটা হলো - নিজেকে বুদ্ধিমান ভাবার মধ্যে কোন দোষ নেই, কিন্তু অন্যকে বোকা ভাবা মারাত্মক দূষনীয়। আমি ভেবেছিলাম বই দেখে দেখে যখন লেখা যাবে, তখন পরীক্ষা দেয়া তো কোন ব্যাপারই নয়। কিন্তু এটা ভাবিনি - যে বুড়ো প্রফেসর এই প্রশ্নটি তৈরি করেছেন, তিনিও ভালো করেই জানেন যে প্রশ্নে যা দিয়েছেন তার উত্তর বই দেখে পাওয়া যাবে না।

পরীক্ষার হলে বেশ দূরে দূরে ছোট ছোট টেবিলে আমরা বসেছি। আমি স্ক্যাটারিং থিওরির তিন-চারটি বই নিয়ে এসেছি। অন্যরা দেখলাম ট্রলি ভর্তি করে বই নিয়ে এসেছে। প্রফেসর অ্যালেন এলেন আটটা বাজার ঠিক পাঁচ মিনিট আগে হাতে একগাদা খাতাপত্র নিয়ে।

মাত্র এক পাতার প্রশ্নপত্র। তাতে গুটি গুটি অক্ষরে ছাপানো আপাতনিরীহ স্ক্যাটারিং থিওরির আটটি প্রশ্ন। আটটি প্রশ্নের উত্তর লেখার জন্য মোটা মোটা তিনটি উত্তরপত্র দেয়া হয়েছে, আর সময় দেয়া হয়েছে আট ঘন্টা। সকাল আটটায় শুরু হয়ে এই পরীক্ষা শেষ হবে বিকেল পাঁচটায়। মাঝখানে বারোটা থেকে একটা পর্যন্ত এক ঘন্টার বিরতি।

শুরুতে প্রশ্ন হাতে নিয়ে মনে হয়েছিল – মশা মারতে কামান দাগার কথা। কিন্তু আধঘন্টা পরেও যখন প্রশ্নই বুঝতে পারছিলাম না, মনে হলো কামান কেন, পারমাণবিক বোমা মেরেও স্ক্যাটারিং মশা মারা সম্ভব নয় আমার পক্ষে।

পরীক্ষা শুরু করে দিয়ে প্রফেসর অ্যালেন চলে গেলেন নিজের অফিসে। আবার আসবেন বারোটায়। পরীক্ষার হলে শিক্ষক না থাকলে কয়েক মিনিটের মধ্যেই  কথায় কথায় তা বাজার হয়ে যাবার কথা। কিন্তু সেরকম কিছুই হচ্ছে না। বইয়ের পাতা ওল্টানোর খচখচ শব্দ ছাড়া আর কিছুই শোনা যাচ্ছে না। আমি ঘাড় ঘুরিয়ে মাথা তুলে একে একে সবার দিকে তাকালাম। অন্যরা কেউ কারো দিকে তাকাচ্ছেও না।

স্কুলে থাকতে সব বইয়েরই আবার নোটবই ছিল। সেখানে কোনো কোনো প্রশ্নের উত্তরে লেখা থাকতো – সারমর্ম দেখো। আমার অবস্থা এখন অনেকটাই সেরকম। সব প্রশ্নের উত্তরেই আমাকে বইয়ের চ্যাপ্টার খুলে খুলে সারমর্ম লিখতে হবে। সারমর্ম লিখতে হবে চ্যাপ্টারের মর্ম বুঝতে হবে। কী ঝামেলায় পড়া গেল।

প্রফেসর অ্যালেন ক্লাসে যে নোটগুলি দিয়েছিলেন – সেখান থেকে সরাসরি কোন প্রশ্নই করেননি। আমি যে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে এসেছি – সেখানে নিয়মই ছিল – যা পড়ানো হবে সেখান থেকেই প্রশ্ন করা হবে। এখানে মনে হয় সেই নিয়ম চলে না। প্রশ্ন কমন না এলে টিচারের রুম ভাঙচুর করার রীতিও সম্ভবত নেই।

পরবর্তী চার ঘন্টা বসে থেকে আর জি নিউটনের স্ক্যাটারিং থিওরি অব ওয়েভস অ্যান্ড পার্টিকলস উল্টাতে উল্টাতে উত্তরপত্রের অনেকগুলি পৃষ্ঠা ভরিয়ে ফেললাম। বারোটায় রুমের দরজা খুলে প্রফেসর অ্যালেন ঢুকলেন।

“ওয়েল গাইস, আই হোপ ইউ আর হ্যাভিং আ গুড টাইম। নাউ টাইম টু হ্যাভ আ ব্রেক।“

একঘন্টার বাধ্যতামূলক বিরতি। খাতাপত্র সবকিছু ভেতরে রেখে আমাদের সবাইকে রুম থেকে বের করে রুমে তালা লাগিয়ে দিলেন প্রফেসর অ্যালেন। একটায় আবার খোলা হবে। এই এক ঘন্টার ভেতর খাওয়া-দাওয়া ইত্যাদি সেরে সময় থাকলে অন্য কারো সাথে আলাপও করা যাবে প্রশ্ন নিয়ে – যদি প্রশ্ন মনে থাকে।

ছয়তলায় নেমে নিজের ডেস্কে এলাম। জিনেট, ক্যামরুন আর নিকোল আড্ডা মারছে। আমাকে ঢুকতে দেখে তিনজনই ফিরে তাকালো। নি্কোল আমার চেয়ার টেনে নিয়ে বসেছিল রুমের মাঝখানে। উঠে দাঁড়িয়ে আমার চেয়ার ঠেলে দিল আমার ডেস্কের দিকে। নিকোল সাধারণত খুবই কম কথা বলে। আড্ডায় সে হচ্ছে একনিষ্ঠ শ্রোতা, আর জিনেট প্রচন্ড রকমের বক্তা। যেকোনো বিষয়েই তার বক্তব্য থাকে।

“পরীক্ষা কেমন হচ্ছে?” – ক্যামরুন জানতে চাইলো।

এই ব্যাটা পরীক্ষার কথা জানলো ক্যামনে? আমি যে পরীক্ষা দিচ্ছি তা তো এদের কারো জানার কথা নয়। হয়তো প্রফেসর অ্যালেনই বলেছেন। এখানে প্রফেসররা  স্টুডেন্টদের সাথে দূরত্ব মেনে চলার নিয়ম জানেন না।

ক্যামেরুনের প্রশ্নের উত্তর দেয়ার আগেই রুমের ফোন বেজে উঠলো। ক্যামেরুন ফোনের সবচেয়ে কাছে ছিল। সে রিসিভার তুলতেই আমি আবার বের হয়ে গেলাম।

কেনের অফিস এখনো বন্ধ। এখনো ফেরেননি ইওরোপ থেকে। ফিরলেই আমাকে নিয়ে বসবেন বলেছেন। বলেছেন যা জানি তার ওপর একটা বক্তৃতা দিতে হবে। নিউক্লিয়ার মডেল সম্পর্কে পরীক্ষায় পাসের জন্য যা পড়েছিলাম তা সব ভুলে গিয়েছি। এখন শুধু এটুকুই বুঝতে পারছি – আমি কিছুই জানি না।

একটায় আবার গেলাম সাততলার পরীক্ষার হলে। আরো চারঘন্টা থাকতে হবে এখানে? পরীক্ষার প্রশ্নগুলি কোনোটাই ঠিক প্রশ্ন নয়। বরং বলা চলে নিউক্লিয়ার স্ক্যাটারিং-এর প্রসঙ্গ এবং প্রাসঙ্গিক সমস্যা। এই সমস্যাগুলির সমাধান খুঁজে বের করতে বলা হয়েছে। সমাধানগুলির বেশিরভাগই গাণিতিক। কোয়ান্টাম মেকানিক্স দিয়ে তার সমাধান করতে হয়। অনার্স ও মাস্টার্স মিলিয়ে দু’বছর কোয়ান্টাম মেকানিক্স পড়ার পরেও এরজন্য যতটুকু গাণিতিক দক্ষতা লাগে  তার কিছুই অর্জন করতে পারিনি। প্রামাণিকস্যার যখন বিভিন্ন গাণিতিক ফাংশান জানার প্রয়োজনীয়তার কথা বলতেন, তখন রাগে গা জ্বলতো। এখন কেন সেই সময় ঠিকমতো শিখিনি বলে নিজের মাথার চুল খাবলে তুলে নিতে ইচ্ছে করছে।

দুটোর দিকে বের হয়ে গেল মার্ক। উত্তরপত্রগুলি সামনের একটি খালি টেবিলে রেখে ট্রলিতে বইপত্র গুছিয়ে ট্রলি ঠেলতে ঠেলতে বের হয়ে গেল। আমার আটটি প্রশ্নের উত্তরই আমি সারমর্ম জাতীয় কিছু লিখে দিয়েছি। এখন আর বসে থাকতে ইচ্ছে করছে না। বের হয়ে যাবার জন্য উশখুশ করছি। অপেক্ষা করছি আরো কেউ বের হয় কি না। দেখলাম মার্ক ফিরে এসেছে আবার। এসেই র‍্যাচেলের টেবিলের কাছে গিয়ে তার বইপত্র গোছাতে শুরু করেছে। র‍্যাচেলকে সে পটানোর চেষ্টা করছে কয়েক বছর থেকে। সম্ভবত কিছুটা পটেছে। খাতাপত্র গুছিয়ে বের হয়ে গেল মার্কের সাথে।

একটু পরে আমিও বের হয়ে গেলাম। মনে হচ্ছে একটা ফাঁড়া কাটলো। এই পরীক্ষাটা আমার না দিলেও চলতো। কেমন পরীক্ষা হয় দেখার কৌতূহল হচ্ছিলো। এখন কৌতূহল মিটে গেছে।

কিন্তু এক সপ্তাহ পরেই বুঝতে পারলাম বইখোলা পরীক্ষার কিছু সুফলও আছে। এধরনের পরীক্ষায় সম্ভবত ফেল করা সম্ভব নয়। সারমর্ম লিখলেও সেগুলি বই থেকে লেখার কারণে কিছুটা শুদ্ধ হয়েছে। অন্যান্যদের সাথে আমিও পাস করে ফেলেছি। প্রফেসর অ্যালেন উত্তরপত্র দিয়ে দিয়েছেন তাঁর মন্তব্যসহ। মনে হচ্ছে এদেশের প্রফেসররাও পুরো উত্তরের একটা নির্দিষ্ট অংশ ছাড়া বাকিটা পড়েনও না। 


Friday, 30 September 2022

জান বাটিস্ট পাহ্‌রান - নোবেলজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী

 


জান বাটিস্ট পাহ্‌রান (Jean Baptiste Perrin) ছিলেন খ্যাতনামা ফরাসী পদার্থবিজ্ঞানী। উনবিংশ শতাব্দীর শেষের দশক থেকে শুরু করে বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে পদার্থবিজ্ঞানের অনেক যুগান্তকারী আবিষ্কারের সাথে তিনি প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন। ১৯০৫ সালে আইনস্টাইন ব্রাউনিয়ান গতির যে তত্ত্বীয় ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন, তা পরীক্ষামূলকভাবে প্রমাণ করেছিলেন তিনি। সেজন্য ১৯২৬ সালের পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছিলেন তিনি।

১৮৭০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর ফ্রান্সের লিলে শহরে জন্ম হয়েছিল জান বাটিস্ট পাহরানের। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে পড়াশোনা করেছেন ফ্রান্সের বিখ্যাত ইকল নরমাল সুপেরিয়র ইউনিভার্সিটিতে। ১৮৯৪ থেকে ১৮৯৭ পর্যন্ত তিনি সেখানে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে গবেষণাসহকারী হিসেবে কাজ করেন। সেই সময় জার্মানিতে রন্টগেন এক্স-রে আবিষ্কার করেছেন। পুরো ইওরোপজুড়ে তখন এক্স-রে নিয়ে মাতামাতি শুরু হয়ে গেছে। পাহ্‌রানের ল্যাবেও তখন এক্স-রে ও ক্যাথোড রে নিয়ে চলছে তুমুল গবেষণা। এই গবেষণার ভিত্তিতে ১৮৯৭ সালে থিসিস লিখে ডক্টর অব সায়েন্স ডিগ্রি অর্জন করেন পাহ্‌রান।

ডিএসসি অর্জন করার পর পরই তিনি সরবোন বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিজিক্যাল কেমিস্ট্রি বিভাগে যোগ দেন। ১৯১০ সালে তিনি সরবোন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পদে উন্নীত হন। এই পদে তিনি ছিলেন ১৯৪০ সাল পর্যন্ত।

পাহ্‌রানের প্রথম দিকের গবেষণা ছিল ক্যাথোড রশ্মি সংক্রান্ত। তিনিই প্রথম প্রমাণ করেন যে ক্যাথোড় রশ্মিগুলি মূলত নেগেটিভ চার্জবিশিষ্ট কণা –  আমরা এখন জানি যে ওগুলি আসলে ইলেকট্রনের প্রবাহ। ১৮৯৭ সালের আগে ইলেকট্রন আবিষ্কৃত হয়নি। এক্স-রে নিয়ে অনেক গবেষণা করেছেন তিনি। গ্যাসের ভেতর এক্স-রে চালনা করলে  প্রবাহে কী ধরনের পরিবর্তন হয়, তা তিনি বের করেন। শব্দের পরিচলন নিয়েও গবেষণা করেছিলেন তিনি।

কিন্তু তাঁর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য গবেষণা হলো ব্রাউনিয়ান গতি সংক্রান্ত গবেষণা। ১৯০৫ সালে আইনস্টাইন তাঁর একটি গবেষণাপত্রে [On the Motion of small Particles Suspended in Liquids at Rest Required by the Molecular-Kinetic Theory of Heat, Annalen der Physik, সংখ্যা ১৭(১৯০৫), পৃষ্ঠা ৫৪৯-৫৬০] ব্রাউনিয়ান গতি (Brownian Motion) সম্পর্কে আলোচনা করলেন। কোন তরল পদার্থের ওপর খালি চোখে দেখা যায় না এরকম ছোট ছোট পদার্থের কণা ভাসতে থাকলে কণাগুলোর গতি কোন নির্দিষ্ট নিয়মে ব্যাখ্যা করা যায় না। তাদের গতি হয় অত্যন্ত অনিয়মিত। আঠারো শতকে স্কটিশ উদ্ভিদবিজ্ঞানী  ব্রাউন এ গতি প্রথম পর্যবেক্ষণ করেন বলে এ গতির নাম দেয়া হয়েছে ব্রাউনিয়ান গতি। আইনস্টাইন এই গবেষণাপত্রে প্রমাণ করেন যে এক মিলিমিটারের এক হাজার ভাগের একভাগের সমান বা তার চেয়েও ছোট কণাগুলো তরল পদার্থে ওরকম বিশৃঙ্খলভাবে চলাফেরা করার কারণ হলো তাদের থার্মাল ডায়নামিক্স। বোল্টজম্যানের সূত্র ব্যবহার করে আইনস্টাইন ব্রাউনিয়ান গতির গাণিতিক ব্যাখ্যা দেন এবং গ্যাসের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অণুগুলোর গতির গাণিতিক সূত্র প্রতিষ্ঠা করেন।

পাহ্‌রান আইনস্টাইনের এই তত্ত্বীয় গবেষণার ভিত্তিতে পরীক্ষাগারে ব্রাউনিয়ান গতির পরীক্ষা করে দেখেন। তাঁর পরীক্ষার ফলাফল থেকে তিনি সঠিকভাবে এভোগাড্রো সংখ্যার মান নির্ণয় করতে সক্ষম হন। এই গবেষণার জন্য তিনি ১৯২৬ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার পান।

বিজ্ঞানী পাহ্‌রানের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ফ্রান্সের ন্যাশনাল সেন্টার ফর সায়েন্টিফিক রিসার্চ। পরবর্তীতে সেখানে গবেষণা করে ফ্রান্সের অনেক বিজ্ঞানী নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন।

১৯৩৮ সালে ফ্রান্সের একাডেমি অব সায়েন্স-এর প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন প্রফেসর জান পাহ্‌রান।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ফ্রান্সের হয়ে জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন জান পাহ্‌রান। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হবার পর ১৯৪০ সালে যখন হিটলার ফ্রান্স আক্রমণ করলো, সত্তর বছরের বৃদ্ধ পাহ্‌রানের আমেরিকায় পালিয়ে যাওয়া ছাড়া আর কোন উপায় ছিল না।

১৯৪২ সালের ১৭ এপ্রিল নিউইয়র্কেই মৃত্যু হয় বিজ্ঞানী জান পাহ্‌রানের। ১৯৪৮ সালে ফরাসি সরকার জান পাহ্‌রানের দেহাবশেষ নিউইয়র্ক থেকে প্যারিসে নিয়ে এসে দেশের মাটিতে সসম্মানে সমাহিত করার ব্যবস্থা করে।



এনরিকো ফার্মি - পদার্থবিজ্ঞানের পোপ

 



মহাবিশ্বে যতগুলি কণা (particle) আছে, তাদের সবগুলিকে প্রধানত দুটো ভাগে ভাগ করা যায়। একভাগের নাম বোসন, অন্যভাগের নাম ফার্মিয়ন। বাঙালি হিসেবে আমরা গর্বের সাথে জানি – এই বোসন নামটা এসেছে সত্যেন বসুর নাম থেকে। বোস থেকে বোসন। তেমনিভাবে, অন্যভাগের নামটা এসেছে এনরিকো ফার্মির নাম থেকে। বোসন কণাগুলি পাউলির বর্জননীতি (Pauli’s exclusion principle) মেনে চলে না। অর্থাৎ একই পরমাণুর মধ্যে তাদের প্রত্যেককে স্বতন্ত্র হতে হয় না। যেমন আলোর কণা ফোটন; একই শক্তিসম্পন্ন হলে, একটি ফোটন থেকে অন্য ফোটনকে আলাদা করে চেনার উপায় থাকে না। কিন্তু ফার্মিয়নের ব্যাপার আলাদা। ফার্মিয়ন কণাগুলি খুবই শ্রেণিবিভাজন মেনে চলে। যেমন ইলেকট্রন, প্রোটন কিংবা নিউট্রন। একই পরমাণুর একই শক্তিস্তরে থাকলেও, তাদের প্রত্যেকের কোয়ান্টাম সংখ্যায় কোনো না কোনোভাবে পার্থক্য থাকতে হয়। কণার এই বিভাজনের ব্যাপারটা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৯২৭ সালে ইতালিয়ান পদার্থবিজ্ঞানী এনরিকো ফার্মি এবং ব্রিটিশ পদার্থবিজ্ঞানী পল ডিরাক যখন কণাগুলির জন্য ফার্মি-ডিরাক স্ট্যাটিসটিক্স প্রতিষ্ঠা করেন। এর তিন বছর আগে ১৯২৪ সালে আমাদের সত্যেন বসু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বসে স্বয়ং আইনস্টাইনের সাথে মিলে আবিষ্কার করেন বোস-আইনস্টাইন স্ট্যাটিসটিক্স।

ইতালিয়ান বিজ্ঞানী এনরিকো ফার্মিকে তাঁর সমসাময়িক পদার্থবিজ্ঞানীরা বলতেন “পোপ অব ফিজিক্স”। রোমান ক্যাথলিকরা যেমন তাঁদের পোপকে সকল ধর্মীয় সমস্যার সমাধান মনে করেন, তেমনি পদার্থবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে মনে করা হতো – এনরিকো ফার্মির কাছেই আছে সকল সমস্যার সমাধান।

পদার্থবিজ্ঞানের – বিশেষ করে নিউক্লিয়ার ফিজিক্সের ধারাবাহিক উন্নতি হয়েছে এনরিকো ফার্মির হাতে। আজ আমরা নিউক্লিয়াসের ব্যাসার্ধ মাপতে দৈর্ঘ্যের খুব ছোট একটা একক ব্যবহার করি – যার নাম ফার্মি ( ১ মিটারের ১০০০০০০০০০০০০০০০ ভাগের এক ভাগ; ১ এর পর পনেরটা শূন্য)। নিউক্লিয়াসের ফিশান প্রক্রিয়া আবিষ্কার করেছেন ফার্মি। তিনিই সঠিকভাবে ব্যাখ্যা দিয়েছেন বিটাক্ষয়ের (beta decay)। প্রথম পারমাণবিক বোমার অন্যতম কারিগর ছিলেন এনরিকো ফার্মি। তাঁর হাতেই তৈরি হয়েছে পৃথিবীর প্রথম নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টর। আজ পৃথিবীর প্রয়োজনীয় জ্বালানির একটি বড় অংশের জোগান আসছে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে। এরজন্য যে মানুষটাকে আমাদের প্রতিদিন স্মরণ করা উচিত তিনি – এনরিকো ফার্মি।

১৯৩৮ সালে তিনি পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন।

ইতালিতে মুসোলিনির ফ্যাসিজম থেকে বাঁচতে দেশ ছেড়ে আমেরিকায় চলে যেতে হয়েছিল এনরিকো ফার্মিকে। শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন, গবেষণা করেছেন লস আলামোস ন্যাশনাল ল্যাবরেটরিতে।

খুব বেশিদিন বাঁচেননি এই বিজ্ঞানী। ১৯০১ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর ইতালির রোমে জন্ম হয়েছিল তাঁর। ১৯৫৪ সালের ২৮ নভেম্বর মাত্র ৫৩ বছর বয়সে মারা গিয়েছেন পাকস্থলীর ক্যান্সারে। পারমাণবিক বিকিরণ নিয়ে গবেষণা করতে করতে নিজেই শিকার হয়েছেন তার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায়।

তাঁর মৃত্যুর পর আমেরিকার ডিপার্টমেন্ট অব এনার্জি তাঁর নামে আন্তর্জাতিক পুরষ্কার প্রবর্তন করে – এনরিকো ফার্মি পুরষ্কার। প্রথম পুরষ্কারটি এনরিকো ফার্মিকেই দেয়া হয় মরণোত্তর। একশতম মৌলিক পদার্থের নামকরণ করা হয় – ফার্মিয়াম। আমেরিকার প্রধান একটি জাতীয় গবেষণাগারের নাম রাখা হয় – ফার্মি ন্যাশনাল ল্যাবরেটরি।


তথ্যসূত্র:

1. World Book's Biographical Encyclopedia of Scientists, World Book, Chicago, 2003. 

2. Gino Segre and Bettina Hoerlin, The Pope of Physics Enrico Fermi and the birth of the atomic age, Henry Holt and Company, New York, 2016. 



Tuesday, 20 September 2022

মহাবিশ্বের রহস্য এবং জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ

 




‘আকাশভরা সূর্যতারা’ দেখেনি পৃথিবীতে এমন মানুষ মেলা ভার। সূর্যাস্তের পর অন্ধকার নেমে এলেই মেঘহীন আকাশে তারা ঝকমক করতে শুরু করে। বুদ্ধিমান মানুষ, কৌতূহলী মানুষ প্রাচীনকাল থেকেই অপার বিস্ময়ে আকাশের প্রাকৃতিক ঘটনাগুলি যেমন দেখছে, তেমনি গভীর পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে অনেক প্রাকৃতিক ঘটনারই রহস্য উন্মোচন করে ফেলেছে। মহাবিশ্বের মহাজাগতিক ঘটনাবলি বৈজ্ঞানিক উপায়ে পর্যবেক্ষণ এবং বিশ্লেষণ করার যে জ্যোতির্বিজ্ঞান – তার ইতিহাস অনেক পুরনো। খালি চোখে মকাকাশ পর্যবেক্ষণ করার আদি সময় আমরা পার হয়ে এসেছি গ্যালিলিওর টেলিস্কোপের ভেতর দিয়ে। ১৬১০ সালে গ্যালিলিও যখন আকাশের দিকে টেলিস্কোপ তাক করে বৃহস্পতি গ্রহের উপগ্রহ আবিষ্কার করে ফেললেন, জ্যোতির্বিজ্ঞানের আকাশে নতুন সূর্যোদয় হলো। এর আগের প্রায় আড়াই হাজার বছরের জ্যোতির্বিজ্ঞান গবেষণার ধরন বদলে গেল গ্যালিলিওর টেলিস্কোপের মাধ্যমে।

পরবর্তী কয়েক শ বছরের মধ্যে একের পর এক তৈরি হতে থাকলো আরো অনেক শক্তিশালী টেলিস্কোপ। টেলিস্কোপ দিয়ে মহাকাশ পর্যবেক্ষণ করার জন্য তৈরি হলো অবজারভেটরি বা মানমন্দির। পৃথিবী থেকেই এসব টেলিস্কোপ দিয়ে মহাকাশ পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। কিন্তু পৃথিবীতে বসানো টেলিস্কোপ যত শক্তিশালীই হোক, তাদের কিছু গুণগত সীমাবদ্ধতা কিছুতেই দূর করা সম্ভব হয়নি। যেকোনো টেলিস্কোপের প্রধান কাজ হলো মহাকাশ থেকে আসা আলো অনুসন্ধান করে শনাক্ত করা এবং সেই আলো সঠিকভাবে বিশ্লেষণ করা। সুদূর মহাকাশ থেকে আলো পৃথিবীতে আসার সময় পৃথিবীর বায়ুমন্ডলের সাথে বিভিন্ন ধরনের মিথস্ক্রিয়ায় অংশ নেয়। পৃথিবীর বায়ুমন্ডল মহাকাশের আলোর কিছু অংশ শোষণ করে ফেলে। আবার কিছু অংশ পৃথিবীর ধূলিকণার গায়ে লেগে বিক্ষিপ্ত হয়। আলোর স্ক্যাটারিং থিওরি বা আলোর বিক্ষেপণের তত্ত্ব থেকে আমরা জানি যে আলোর বিক্ষেপণের ফলেই দিনের বেলায় পৃথিবীর আকাশ নীল দেখায়। পৃথিবীর বায়ুমন্ডলের কারণে মহাকাশের মহাজাগতিক ঘটনাগুলি নির্বিঘ্নে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। কোটি আলোকবর্ষ দূরের উজ্জ্বল নক্ষত্রের আলো পৃথিবীতে আসতে আসতে উজ্জ্বলতা হারায়। পৃথিবীর বায়ুমন্ডলের কারণে দীপ্তমান তারাগুলিও মিটমিট করতে থাকে পৃথিবীর আকাশে। ফলে মহাকাশের অনেক রহস্যই অধরা থেকে যায় পৃথিবীতে স্থাপিত সবচেয়ে শক্তিশালী টেলিস্কোপগুলিতেও। অনেক উঁচু পাহাড়ের উপর মানমন্দির প্রতিষ্ঠা করে সেখানে টেলিস্কোপ স্থাপন করেও এই সমস্যার পুরোপুরি সমাধান করা সম্ভব হয়নি।

এতসব অসুবিধা থাকা সত্ত্বেও জ্যোতির্বিজ্ঞানের অসংখ্য আবিষ্কার, মহাবিশ্বের অসংখ্য রহস্যের সমাধান পৃথিবীতে স্থাপিত টেলিস্কোপের মাধ্যমেই বিজ্ঞানীরা করে ফেলেছেন। তাতে আনন্দ যেমন আছে, অতৃপ্তিও আছে। অতৃপ্তি হলো যেকোনো বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের মূল প্রেরণা। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় থেকে শুরু হয়েছে স্যাটেলাইট যুগ। বিজ্ঞানীরা মহাকাশে কৃত্রিম স্যাটেলাইট পাঠাতে শুরু করে। শুরু হয় মহাকাশকে জানার নতুন পদ্ধতি। ১৯৯০ সালের ২৪ এপ্রিল মহাকাশে পাঠানো হয় হাবল স্পেস টেলিস্কোপ। এর মাধ্যমে স্থাপিত হয় জ্যোতির্বিজ্ঞানের আরেকটি নতুন যুগ – স্যাটেলাইট টেলিস্কোপের যুগ।

প্রায় ১৩ মিটার লম্বা ও ৪.৩ মিটার চওড়া এগারো টন ভরের হাবল স্পেস টেলিস্কোপ পৃথিবীপৃষ্ঠ থেকে ৫৪৭ কিলোমিটার উচ্চতায় ঘন্টায় প্রায় সাতাশ হাজার কিলোমিটার বেগে পৃথিবীর চারপাশে ঘুরছে গত বত্রিশ বছর ধরে। প্রতি সপ্তাহে হাবল টেলিস্কোপ প্রায় ১৫০ গিগাবিট ডাটা পৃথিবীতে পাঠাচ্ছে। হাবল টেলিস্কোপের পাঠানো ডাটা থেকেই আমরা জেনেছি মহাবিশ্ব সম্প্রসারিত হচ্ছে। আমরা প্রমাণ পেয়েছি মহাবিশ্বের উৎপত্তি হয়েছে কমপক্ষে ১৩৮০ কোটি বছর আগে। হাবল টেলিস্কোপের ডাটার সাহায্যে আমরা প্রমাণ পেয়েছি ব্ল্যাকহোলের। বিজ্ঞানীরা খুঁজে পেয়েছেন বিশালাকৃতির ব্ল্যাকহোল। হাবল আমাদের খুঁজে দিয়েছে অনেকগুলি নতুন গ্রহ, উপগ্রহ, নক্ষত্র, নীহারিকা। হাবল টেলিস্কোপ জ্যোতির্বিজ্ঞানের গবেষণায় দিয়েছে আশ্চর্য গতি। এপর্যন্ত প্রায় ১৮ হাজার বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে হাবলের সাহায্যে প্রাপ্ত উপাত্তের ভিত্তিতে।

কিন্তু এটুকুতে খুশি হয়ে বসে থাকা বিজ্ঞানীদের কাজ নয়। হাবল টেলিস্কোপের যেটুকু দুর্বলতা আছে – সেটুকু দূর করে মহাকাশে আরো শক্তিশালী টেলিস্কোপ স্থাপনের পরিকল্পনা বিজ্ঞানীরা করছেন অনেক বছর থেকে। যেমন হাবল টেলিস্কোপ পৃথিবীর কক্ষপথের কাছাকাছি ঘুরছে বলে অনেক সময় পৃথিবী নিজেই বাধা হয়ে দাঁড়ায় হাবল টেলিস্কোপের দৃষ্টিপথে। আবার হাবল টেলিস্কোপ পৃথিবীর চারপাশে ঘোরার সময়ে ভ্যান অ্যালেন রেডিয়েশান বেল্টের একটা অংশের কাছ দিয়ে যায়। তখন পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্রের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে হাবল টেলিস্কোপের যন্ত্রপাতিতে ব্যাকগ্রাউন্ড নয়েজ সৃষ্টি করে যা ডাটা সংগ্রহে বিঘ্ন ঘটায়। হাবল টেলিস্কোপের ফেইন্ট অবজেক্ট ক্যামেরা এবং ফেইন্ট অবজেক্ট স্পেকট্রোমিটার অতিদূর নক্ষত্র থেকে আসা ক্ষীণতম আলো থেকে যে ছবি নির্মাণ করে – তা খুবই অনুজ্জ্বল আর অস্পষ্ট। এসব ত্রুটি দূর করে সম্পূর্ণ নতুন একটি স্যাটেলাইট নির্মাণ করে মহাকাশে পাঠানো হয়েছে যার নাম জেমস ওয়েব।

২০২১ সালের ২৫ ডিসেম্বর জ্যোতির্বিজ্ঞানে শুরু হয়েছে নতুন বিপ্লব। সেদিন পৃথিবী থেকে মহাকাশে পাঠানো হয়েছে হাবল টেলিস্কোপের চেয়েও অনেক গুণ শক্তিশালী নতুন টেলিস্কোপ জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ। হাবল টেলিস্কোপের সাথে জেমস ওয়েবের গঠনে বেশ কিছু পার্থক্য আছে। হাবল টেলিস্কোপের আকার যদি একটি পঞ্চাশ সিটের বাসের সমান হয়, জেমস ওয়েব টেলিস্কোপের আকার একটি টেনিস কোর্টের সমান। হাবলের দর্পনের ব্যাস  ২.৪ মিটার, জেমস ওয়েবের দর্পণের ব্যাস ৬.৫ মিটার। হাবলে যে ক্যামেরাগুলি আছে সেগুলি অতিবেগুনি আলো, দৃশ্যমান আলো এবং নিয়ার-ইনফ্রারেড বা কাছের অবলোহিত আলোর তরঙ্গ শনাক্ত করে ছবি তুলতে পারে। জেমস ওয়েবের ক্যামেরাগুলি কাজ করে ইনফ্রারেড বা অবলোহিত আলোকতরঙ্গে। হাবল টেলিস্কোপ যেখানে পৃথিবী থেকে ৫৪৭ কিলোমিটার দূরে থেকে পৃথিবীর চারপাশে ঘুরছে, সেখানে জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ স্থাপন করা হয়েছে পৃথিবী থেকে ১৫ লক্ষ কিলোমিটার দূরে – চাঁদের অক্ষের কাছাকাছি দূরত্বে। এর ফলে মহাকাশের অনেক ভেতরে চোখ রাখা সম্ভব হচ্ছে জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের।

মহাকাশে পূর্বনির্দিষ্ট কক্ষপথে স্থাপন করার পর গত ছয় মাস ধরে চলছিল প্রস্তুতিমূলক পরীক্ষাগুলোর বিভিন্ন ধাপ। এখন সেসব ধাপ সফলভাবে পার হয়ে মূল বৈজ্ঞানিক কাজকর্ম শুরু করে দিয়েছে জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ। শুরুতেই বিশ্বব্যাপী হৈ চৈ ফেলে দিয়েছে। ত্রিশ বছর আগে হাবল টেলিস্কোপ যেরকম হৈ চৈ ফেলে দিয়েছিল মহাকাশের নতুন নতুন তথ্য ও ছবি দিয়ে – সেরকম আরো অনেক বেশি ক্ষমতাসম্পন্ন টেলিস্কোপ জেমস ওয়েব বিশ্ববাসীকে উত্তেজনায় টান টান করে দিয়েছে তার প্রথম কয়েকটি ছবি প্রকাশিত হতে না হতেই।

এবছরের ১২ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে প্রথম চারটি ছবি প্রকাশ করা হয়েছে। প্রায় এক দশক ধরে প্রস্তুতির পর এক হাজার কোটি ডলারের টেলিস্কোপ – জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ মহাকাশে পাঠানো হয়েছে যে উদ্দেশ্যে – সেই উদ্দেশ্য সাফল্যের মুখ দেখতে শুরু করেছে। প্রথম প্রকাশিত ছবিগুলি থেকেই পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে এতদিন আগের সবচেয়ে শক্তিশালী হাবল টেলিস্কোপের সাহায্যে মহাকাশের যেসব চিত্র আবছা দেখা গিয়েছিল – এবার তা স্পষ্ট হলো। জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের ছবিগুলি হাবল টেলিস্কোপের ছবিগুলি থেকে দুই থেকে তিন গুন বেশি স্পষ্ট।

ঠিক কী কী বৈজ্ঞানিক লক্ষ্য ঠিক করে জেমস ওয়েব টেলিস্কোপকে মহাকাশে পাঠানো হয়েছে? বৈজ্ঞানিক লক্ষ্য বা উদ্দেশ্যগুলিকে চারটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথম লক্ষ্য হলো একেবারে শৈশবের মহাবিশ্বের স্বরূপ উদ্ঘাটন। বিগ ব্যাং এর পর থেকে প্রথম যুগের গ্যালাক্সিগুলির আলোর সন্ধান করতে পারলে বোঝা যাবে কীভাবে এই গ্যালাক্সিগুলির উৎপত্তি হয়েছিল। দ্বিতীয় লক্ষ্য হলো গ্যালাক্সিগুলির বিবর্তন অনুসন্ধান। প্রথম যুগের গ্যালাক্সিগুলি থেকে বর্তমান যুগের গ্যালাক্সিগুলির মধ্যে কী কী বিবর্তন হয়েছে, এবং কীভাবে হয়েছে। তৃতীয় লক্ষ্য হলো নক্ষত্রগুলি কীভাবে সৃষ্টি হয়েছে  – একেবারে প্রথম পর্যায় থেকে শুরু করে তাদের গ্রহ-উপগ্রহসহ নক্ষত্রজগতের সৃষ্টি কীভাবে হয়েছে তা খুঁজে বের করা। আর চতুর্থ লক্ষ্য হলো আমাদের সৌরজগতসহ অন্যান্য গ্রহ-উপগ্রহগুলির বিভিন্ন ভৌত এবং রাসায়নিক ধর্মাবলি পরীক্ষা করে দেখা। এবং আমাদের পৃথিবী ছাড়া অন্য কোন গ্রহ বা উপগ্রহে প্রাণের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা।

পৃথিবীর কাছাকাছি হওয়াতে  হাবল টেলিস্কোপ সরাসরি আমাদের সূর্যের দিকে তাকাতে পারে না। ফলে সূর্যের কাছের গ্রহ বুধ, ও শুক্রের খুব বেশি তথ্য হাবল সরাসরি সংগ্রহ করতে পারেনি। জেমস ওয়েবের সেই সীমাবদ্ধতা নেই। আমাদের সৌরজগতের গ্রহগুলিকে আরো গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করার বৈজ্ঞানিক উদ্দেশ্যও জেমস ওয়েব টেলিস্কোপের আছে।

জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের শক্তিশালী ক্যামেরাগুলির প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এগুলি ইনফ্রারেড রে বা অবলোহিত আলোকরশ্মি শনাক্ত করতে পারে এবং সেই আলোতে ছবি তুলতে পারে। এখন প্রশ্ন হলো অবলোহিত আলোকরশ্মি শনাক্ত করার দরকার কী? এই প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে আমাদের আলোর পদার্থবিজ্ঞান কিছুটা বুঝতে হবে। আলোর গতিবেগ  শূন্য মাধ্যমে যে সেকেন্ডে এক লক্ষ ছিয়াশি হাজার মাইল বা তিন লক্ষ কিলোমিটার তা আমরা জানি। আলোর কোয়ান্টাম তত্ত্ব অনুসারে – আলোর শক্তি তার কম্পাঙ্কের সমানুপাতিক। আলো যখন কোন উৎস থেকে উৎপন্ন হয়ে একই মাধ্যমে চলতে থাকে, তখন এর গতিবেগের কোন পরিবর্তন ঘটে না। কিন্তু আলোক তরঙ্গ হলো তড়িৎচূম্বক তরঙ্গ, যার কম্পাঙ্ক এবং তরঙ্গদৈর্ঘ্য একে অপরের বিপরীত অনুপাতিক। অর্থাৎ তরঙ্গদৈর্ঘ্য যদি বেড়ে যায়, কম্পাঙ্ক কমে যায়। হাবল টেলিস্কোপ থেকে আমরা জেনেছি মহাবিশ্ব ক্রমাগত সম্প্রসারিত হচ্ছে। মহাবিশ্ব যখন প্রসারিত হচ্ছে, একই সাথে আলোর তরঙ্গও প্রসারিত হচ্ছে। তার মানে সময়ের সাথে তরঙ্গদৈর্ঘ্য বেড়ে যাচ্ছে। দৃশ্যমান আলোর বর্ণালীর সবচেয়ে বড় তরঙ্গদৈর্ঘ্য হচ্ছে লাল আলোর, আর সবচেয়ে কম তরঙ্গদৈর্ঘ্য হচ্ছে বেগুনি আলোর। লাল আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য বেড়ে গেলে তা হয়ে পড়ে ইনফ্রারেড বা অবলোহিত আলো। এটি আমাদের দৃষ্টিশক্তির সীমানার বাইরে। অর্থাৎ অবলোহিত আলো আমরা দেখতে পাই না।

জ্যোতির্বিজ্ঞানে আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য বেড়ে গিয়ে লাল বর্ণের দিকে সরে যাওয়াকে বলা হয় রেড শিফ্‌ট। আবার তরঙ্গদৈর্ঘ্য কমে গিয়ে বেগুনি বা নীল বর্ণের দিকে সরে যাওয়াকে বলা হয় ব্লু শিফ্‌ট। এই রেড শিফ্‌টের পরিমাণ হিসেব করে জানা যায় মহাবিশ্ব কতটুকু সম্প্রসারিত হয়েছে, এবং সেই সময়ে আলো কতটুকু দূরত্ব অতিক্রম করেছে। সেই দূরত্বের হিসেব থেকে সময়ের হিসেব বের করা যায়। আলো এক সেকেন্ডে তিন লক্ষ কিলোমিটার যায়। সে হিসেবে আলো এক বছরে যতটুকু দূরত্ব অতিক্রম করে সেই দূরত্বকে বলা হয় এক আলোকবর্ষ। এখন কোন একটি নক্ষত্র যদি পৃথিবী থেকে এক আলোকবর্ষ দূরে থাকে, সেখান থেকে আলো পৃথিবীতে আসতে সময় লাগবে এক বছর। যেমন সূর্য থেকে আমাদের পৃথিবীতে আলো আসতে সময় লাগে আট মিনিট বিশ সেকেন্ড। এই সময়কে আলোর গতি দিয়ে গুণ করলে আমরা সূর্য থেকে পৃথিবীর দূরত্ব বের করতে পারি। একই ভাবে আমরা বলতে পারি – পৃথিবী থেকে যখন আমরা সূর্যকে দেখি তখন আসলে দেখি আট মিনিট বিশ সেকেন্ড অতীতের সূর্য। অনুরূপভাবে আমরা বলতে পারি আকাশভর্তি যেসব সূর্য-তারা আমরা দেখি সেগুলি থেকে আলো পৃথিবীতে এসে পৌঁছাতে যদি কোটি বছর লাগে – তাহলে সেগুলি কোটি বছর আগের নক্ষত্র আমরা দেখছি।

জেমস ওয়েব টেলিস্কোপের ইনফ্রারেড ক্যামেরা কোটি আলোকবর্ষ দূরের গ্যালাক্সি থেকে ভেসে আসা অবলোহিত আলো শনাক্ত করতে পারে। কোটি বছরের সফর শেষে এই আলো জেমস ওয়েব টেলিস্কোপের আয়নায় এসে প্রতিফলিত হয়। ইনফ্রারেড ওয়েভ ডিটেকটর সেই আলো শনাক্ত করে। সেখান থেকে তৈরি হয় গভীর মহাকাশের ছবি। শুধু তাই নয়, ইনফ্রারেড স্পেকট্রোগ্রাফ থেকে মহাবিশ্বে ভাসমান সব ধরনের অণুর ধর্মাবলি বিশ্লেষণ করে দেখতে পারবে পৃথিবীর অন্য কোনো সৌরজগতের অন্য কোন গ্রহে প্রাণী আছে কি না।

এই টেলিস্কোপের প্রোগ্রাম ডিজাইনের সাথে সরাসরি যুক্ত আমেরিকান মহাকাশ সংস্থা – নাসা (NASA), ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সি – ইসা (ESA), ক্যানাডিয়ান স্পেস এজেন্সি – সিসা (CSA)। টেলিস্কোপের সায়েন্স অপারেশান সেন্টার – যেখান থেকে মহাকাশের বৈজ্ঞানিক গবেষণাগুলি নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে – সেটা হলো আমেরিকার বাল্টিমোরে স্থাপিত স্পেস টেলিস্কোপ সায়েন্স ইন্সটিটিউট। এখান থেকে হাবল স্পেস টেলিস্কোপের বৈজ্ঞানিক পরীক্ষাগুলিও নিয়ন্ত্রণ করা হয়। গত ১২ জুলাই জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের যে কয়টি ছবি আনুষ্ঠানিকভাবে সবার জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে  – সেগুলি বাছাই করেছেন স্পেস টেলিস্কোপ সায়েন্স ইন্সটিটিউটের বিজ্ঞানীরা। জ্যোতির্বিজ্ঞানের নতুন একটি জগতের পর্দা সরে গেলো এই ছবিগুলির মাধ্যমে।

 

চারটি ছবির একটি হলো SMACS 0723


এই ছবিটি তোলা হয়েছে টেলিস্কোপের নিয়ার ইনফ্রারেড ক্যামেরা দিয়ে। এই ছবিতে দেখা যাচ্ছে হাজার হাজার গ্যালাক্সি। সামনের উজ্জ্বল গ্যালাক্সির দল পেছনের গ্যলাক্সির আলোকে কিছুটা ম্লান করে দিয়েছে। সামনের গ্যালাক্সির বয়স আমাদের পৃথিবীর বয়সের কাছাকাছি চার দশমিক ছয় বিলিয়ন বছর বা ৪৬০ কোটি বছর। পেছনের গ্যালাক্সিদল তৈরি হয়েছিল প্রায় তের বিলিয়ন বছর আগে, অর্থাৎ ১৩০০ কোটি বছর আগে। জেমস ওয়েব এই গ্যালাক্সিগুলোর অনেক ডাটা সংগ্রহ করতে শুরু করেছে। এই ডাটা থেকে আমরা বুঝতে পারবো – কীভাবে প্রথম প্রজন্মের গ্যালাক্সিগুলি গঠিত হয়েছিল। এই গ্যালাক্সিগুলির মধ্যেই থাকতে পারে সবচেয়ে দূরের গ্যালাক্সি – যেগুলি তৈরি হয়েছিল বিগ ব্যাং এর পাচ শ মিলিয়ন বা পঞ্চাশ কোটি বছরের মধ্যে – মহাবিশ্বের একেবারে শুরুর দিকে। জেমস ওয়েবের এই ছবির ডাটা থেকে আমরা এতদিনের অনেক প্রশ্নের উত্তর পেতে পারি।

সবচেয়ে প্রথম নক্ষত্র ও গ্যালাক্সির উৎপত্তি কীভাবে হয়েছিল? বিগ ব্যাং-এর পর প্রথম কিছুক্ষণ (সময় তখনো শুরু হয়নি) সবকিছু অন্ধকার ছিল। পদার্থ যদি কিছু থেকে থাকে – তা ছিল সব ডার্ক ম্যাটার। ডার্ক ম্যাটার কোন আলো নির্গমন করে না, প্রতিফলন করে না। অথবা ছিল নিউট্রাল হাইড্রোজেন কিংবা হিলিয়াম। তারপর কয়েক শত মিলিয়ন বছর পর (প্রায় দশ কোটি বছর) পর গ্যাসগুলি আস্তে আস্তে জোট বাঁধতে বাঁধতে গ্যাসীয় নক্ষত্রের সৃষ্টি হলো। প্রথম আলোর আবির্ভাব হলো। এই আলোর বিকিরণের ফলে নিউট্রাল গ্যাস আয়নিত হলো। মহাবিশ্ব আস্তে আস্তে গ্যাস থেকে ফুটন্ত তরল তারপর গ্যালাক্সি, নক্ষত্র, গ্রহ উপগ্রহের স্ট্রাকচার পেলো। এগুলি আমরা নির্ভরযোগ্য তত্ত্ব থেকে জানি। কিন্তু সরাসরি তেমন জোরালো প্রমাণ এখনো আমাদের হাতে নেই। জেমস ওয়েব আমাদের সেই প্রমাণ জোগাবে বলে বিজ্ঞানীদের বিশ্বাস।

প্রকাশিত দ্বিতীয় ছবিটি স্টিফেন্স কুইনটেট (Stephan’s Quintet)। এই ছবিটি হলো এপর্যন্ত জেমস ওয়েবের তোলা সবচেয়ে বড় ছবি। এর ব্যাস চাঁদের ব্যাসের এক পঞ্চমাংশ। পনেরো কোটি পিক্সেলের এই ছবিতে আছে পাঁচটি গ্যালাক্সির একটি গ্রুপ – পরস্পরের কাছাকাছি আসছে ২৯০ মিলিয়ন আলোক-বর্ষ দূরের পেগাসাস নক্ষত্রপুঞ্জে। এই ছবি থেকে প্রতীয়মান হচ্ছে – এর কেন্দ্রে আছে একটি সুপারম্যাসিভ – প্রচন্ড ভরসম্পন্ন ব্ল্যাকহোল – যেখান থেকে একটি নক্ষত্রের জন্ম হচ্ছে। এখান থেকে যে ডাটা পাওয়া গেছে সেখান থেকে জানা যাবে নক্ষত্রের জন্ম কীভাবে হয়, সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহোলের জন্মও কীভাবে হয়।

 


তৃতীয় ছবিটি  ক্যারিনা নেবুলা (CARINA NEBULA)


সবচেয়ে উজ্জ্বল এবং বৃহত্তম নেবুলা হচ্ছে ক্যারিনা নেবুলা। নেবুলা হচ্ছে নক্ষত্রের জন্মভূমি – গ্যাস ও ধুলিকণা যেখান থেকে নক্ষত্রের জন্ম হয়। নক্ষত্রের উপাদানগুলির ভেতরের অনেক তথ্য জানা যাবে এখান থেকে – কারণ ইনফ্রারেড রে শনাক্ত করে বিশ্লেষণ করার উপায় আছে জেমস ওয়েবে। এথেকে নক্ষত্র কীভাবে সৃষ্টি হয় তা আরো ভালোভাবে জানা যাবে। ক্যারিনা নেবুলা সাউদার্থ কনস্টেলেশান ক্যারিনা থেকে ৭৬০০ আলোক-বর্ষ দূরে। এই ছবিতে যতগুলি ছোট ছোট উজ্জ্বল বিন্দু দেখা যাচ্ছে সেগুলি সবই নতুন নক্ষত্র। শত শত নতুন নক্ষত্র দেখা যাচ্ছে এই ছবিতে। আরো অনেক পরিষ্কার ঘটনা দেখা যাচ্ছে যেগুলি নতুন তথ্য দেবে আমাদের।

 চতুর্থ ছবি  

সাউদার্ন রিং নেবুলা (SOUTHERN RING NEBULA)


সাউদার্ন রিং নেবুলা হলো – প্লেনেটারি নেবুলা – যেখানে আছে গ্যাসের মেঘ যা সম্প্রসারিত হচ্ছে চারদিকে। গ্যাসগুলি মৃতপ্রায় নক্ষত্রের চারপাশে ঘুরছে, অথবা দুটো মৃতপ্রায় নক্ষত্র – একে অপরের চার পাশে ঘুরছে । এর ব্যাস প্রায় অর্ধ-আলোকবর্ষ (এক আলোকবর্ষের অর্ধেক)। পৃথিবী থেকে এর দূরত্ব প্রায় দুই হাজার আলোকবর্ষ। ফেনার মতো কমলা রঙের যে কোষগুলি দেখা যাচ্ছে – ওগুলি হাইড্রোজেন অণু। দুটো হাইড্রোজেন পরমাণু মিলে হাইড্রোজেন অণু তৈরি হয়েছে। কেন্দ্রে যে নীল রঙের অংশ দেখা যাচ্ছে – সেগুলি আয়নিত গ্যাস। ডান পাশের চিত্রে দেখা যাচ্ছে দুটো নক্ষত্র ধীরে ধীরে মরে যাচ্ছে কেন্দ্রে। এখান থেকে যে ডাটা সংগ্রহ করা হচ্ছে সেখান থেকে জানা যাবে নক্ষত্রের মৃত্যু কীভাবে হয়। নক্ষত্রের জন্ম-মৃত্যু এত কাছ থেকে দেখার সুযোগ এর আগে কখনো হয়নি।

জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ তার বৈজ্ঞানিক লক্ষ্য অনুসারে মহাবিশ্বের বিভিন্ন গ্রহে অনুসন্ধান চালাচ্ছে সেখানে কোথাও কোন প্রাণ ধারণের উপাদান পাওয়া যায় কি না। প্রাথমিক ছবিগুলির মধ্যে আমাদের সৌরজগতের বাইরের এক বিশাল গ্যাসীয় গ্রহ WASP-96 b তে পানির অস্ত্বিত্বের প্রমাণ প্রকাশ করেছে। আমাদের সূর্যের মতো একটি নক্ষত্রের চারপাশে ঘুরছে এই বিশাল গ্যাসীয় গ্রহ। শত শত আলোকবর্ষ দূরের গ্রহের গ্যাসীয় উপাদান বিশ্লেষণ করার বৈজ্ঞানিক দক্ষতা আছে জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের – এই ছবি তারই প্রমাণ। 



মহাকাশ দেখার এতদিনের শক্তিশালী মাধ্যম হাবল টেলিস্কোপ মহাকাশ সম্পর্কে আমাদের যে ধারণা দিয়েছিল – সেই ধারণার সরাসরি প্রত্যক্ষ করার জন্য আরো শক্তিশালী টেলিস্কোপ – জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ – আমাদের চোখের সামনে এনে দিচ্ছে মহাকাশের গভীর থেকে গভীরের চিত্র। আগে যা আমাদের কল্পনা করে নিতে হয়েছে এখন সেগুলি বাস্তবে চলে আসতে শুরু করেছে। আগামী দশ বছর ধরে জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ আমাদের মহাবিশ্বের অনেক নতুন রহস্য উদ্ঘাটন করতে সক্ষম হবে তাতে কোন সন্দেহ নেই।

 

তথ্যসূত্র:

১। মারিয়া আরিয়াস, দ্য কসমস অ্যাজ উই হ্যাভ নেভার সিন বিফোর, নিউ সায়েন্টিস্ট, ৯ জুলাই ২০২২।

২। মার্টিন বারস্টো, দ্য কনভারসেশান ১৩ জুলাই, ২০২২।

৩।  কার্ল গ্ল্যাজারব্রুক ও সাইমন ড্রাইভার, দ্য কনভারসেশান, ১৩ জুলাই ২০২২।

৪। বিজ্ঞানচিন্তা নভেম্বর ২০২১।

৫। webb.nasa.gov

_____________
বিজ্ঞানচিন্তা আগস্ট ২০২২ সংখ্যায় প্রকাশিত










Sunday, 4 September 2022

রোজালিন ইয়ালো: নোবেলজয়ী চিকিৎসা-পদার্থবিজ্ঞানী

 




আমাদের শরীরের মতো এত জটিল স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র আর একটিও নেই। শরীরের ছোটখাট সমস্যাগুলির সমাধান শরীর নিজে নিজেই করে ফেলে। অনেক সময় আমরা জানতেও পারি না শরীরের স্বাভাবিক রাসায়নিক উপাদানের কী পরিবর্তন ঘটছে। কিন্তু যখনই শরীরের কোন সমস্যা শরীর নিজে নিজে ঠিক করে ফেলতে পারে না, তখন বিভিন্ন উপসর্গের মাধ্যমে শরীর সংকেত দিতে থাকে যে কোথাও কোন সমস্যা দেখা দিয়েছে। তখন দরকার হয় চিকিৎসার। বৈজ্ঞানিক চিকিৎসার জন্য সবচেয়ে জরুরি হলো সঠিকভাবে রোগ নির্ণয়। রোগনির্ণয়ের জন্য বর্তমানে যেসব উন্নত বৈজ্ঞানিক রাসায়নিক পদ্ধতি ব্যবহার করা হয় তার একটি হলো রেডিওইমিউনোএসে (radioimmunoassay) বা আর-আই-এ (RIA)। এই পদ্ধতির মাধ্যমে আমাদের শরীরের রক্ত এবং অন্যান্য তরল পদার্থের মধ্য অন্য কোন পদার্থ ঢুকে গেলে – তা যত সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম পরিমাণেই হোক না কেন – তা শনাক্ত করা সম্ভব হয়। শ্বাস-প্রশ্বাসে, খাবারের সাথে, এবং আরো বিভিন্নভাবে আমাদের শরীরে অনবরত ঢুকছে রোগজীবাণু, ভাইরাসছাড়াও আরো অসংখ্য ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান। রক্ত এবং অন্যান্য তরলের সাথে মিশে গিয়ে এগুলি সারা শরীরে ছড়িয়ে যায়। আর-আই-এ পদ্ধতিতে এই উপাদানগুলির উপস্থিতি এবং পরিমাণ সঠিকভাবে নির্ণয় করা যায়। আর-আই-এ পদ্ধতি উদ্ভাবনের ফলে চিকিৎসাবিজ্ঞানের একটি নতুন দিগন্ত খুলে যায়। সম্ভব হয় শরীরের বিভিন্ন হরমোনের মাত্রা মেপে দেখার। কোন ওষুধ রোগীর শরীরে কাজ করছে কী না, ভিটামিন শরীরের উপাদানের সাথে মিশতে পারছে কি না, কিংবা ভাইরাস আক্রান্ত হলে তা কোন্‌ মাত্রায় কতটুকু ক্ষতি করছে এবং তার প্রতিষেধক দিলে তা কার্যকর হচ্ছে কি না সবকিছুই মেপে দেখা সম্ভব হয়েছে এই আর-আই-এ উদ্ভাবনের ফলে। ওষুধের সঠিক মাত্রা নির্ধারণে অগ্রদূতের ভূমিকা পালন করেছে এই পদ্ধতি। ১৯৫৯ সালে এই পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন পদার্থবিজ্ঞানী রোজালিন ইয়ালো এবং ডাক্তার সোলোমন বারসন। চিকিৎসাবিজ্ঞানের এই যুগান্তকারী আবিষ্কারের জন্য রোজালিন ইয়ালো পেয়েছেন ১৯৭৭ সালের চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার। অথচ কর্মজীবনের শুরুতে হতদরিদ্র মা-বাবার সন্তান রোজালিন একটি শিক্ষকতার চাকরি চেয়েও পাননি। কাজ শুরু করেছিলেন স্টেনোগ্রাফার হিসেবে। একাগ্রতা, অধ্যবসায় এবং কঠোর পরিশ্রমের ফলে রোজালিন হয়ে উঠেছেন বিশ্বের প্রথম সারির চিকিৎসা-পদার্থবিজ্ঞানী। 

ইহুদি মা-বাবার সন্তান রোজালিনের জন্ম নিউইয়র্ক শহরে ১৯২১ সালের ১৯ জুলাই। তাঁর মা-বাবা পূর্ব ইওরোপ থেকে আমেরিকায় এসেছিলেন অভিবাসী হয়ে। সীমিত সামর্থ্যের মধ্যে কোনো রকমে খেয়ে পরে বেঁচে থাকার জন্য সংগ্রাম করছিলেন রোজালিনের মা-বাবা। বড় কোন স্বপ্ন দেখার সাহসও তাঁরা দিতে পারেননি তাঁদের সন্তানদের। নিজেরা বেশিদূর পড়াশোনা করতে পারেননি। কিন্তু বুঝতে পেরেছেন সন্তানদের লেখাপড়া শেখাতে পারলে জীবনসংগ্রামে তারা হেরে যাবে না। 

আমেরিকার শিক্ষাব্যবস্থায় ভালো ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য বিনামূল্যে পড়াশোনা করার অনেক স্কুল আছে। নিউইয়র্কের ব্রংকস-এর সাধারণ সরকারি স্কুলেই পড়াশোনা রোজালিনের। হাইস্কুলে রসায়নের প্রতি আকৃষ্ট হন রোজালিন। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের পড়াশোনার জন্যও তাঁকে খুঁজতে হয়েছিল বিনাবেতনে পড়াশোনা কোথায় করা যায়। নিউইয়র্কের হান্টার কলেজ ছিল নিউইয়র্ক সিটির মিউনিসিপালিটি পরিচালিত বিনাবেতনে পড়ার কলেজ, যেখানে দরিদ্র পরিবারের মেয়েদের পড়াশোনা করার সুযোগ দেয়া হতো। হান্টার কলেজে স্নাতক পর্যায়ের পড়াশোনা করতে এসে রোজালিনের ভালো লেগে যায় পদার্থবিজ্ঞান। মেরি কুরির সন্তান ইভ কুরির লেখা মেরি কুরির জীবনী তখন প্রকাশিত হয়েছে। সেই বই পড়ে রোজালিন নিজেকে মেরি কুরির আদর্শে তৈরি করার অনুপ্রেরণা পেলেন। তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ডামাডোল শুরু হয়ে গেছে। নিউক্লিয়ার ফিজিক্সের রমরমা তখন শুরু হয়ে গেছে। সেই সময় নিউক্লিয়ার ফিশানের জনক এনরিকো ফার্মির লেকচার শোনার সুযোগ হলো রোজালিনের। পদার্থবিজ্ঞান,  বিশেষ করে নিউক্লিয়ার ফিজিক্সের প্রতি গভীর ভালোবাসা তৈরি হলো রোজালিনের। মা-বাবা যতই বলুন যে একটা শিক্ষকতার চাকরি পেলেই চলবে, রোজালিন মনস্থির মনস্থির করে ফেলেছেন সুযোগ পেলে পদার্থবিজ্ঞানের গবেষণাই করবেন জীবনে। ১৯৪১ সালে রসায়ন ও পদার্থবিজ্ঞান মেজর নিয়ে স্নাতক পাশ করলেন হান্টার কলেজ থেকে। 

কিন্তু পদার্থবিজ্ঞানের গবেষণা করতে গেলে তো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাগবে, পদার্থবিজ্ঞানে পিএইচডি করতে হবে। পড়াশোনার খরচ চালানোর জন্য বৃত্তি লাগবে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করলেন রোজালিন। কিন্তু সব বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই সরাসরি প্রত্যাখ্যানপত্র পেলেন তিনি। স্নাতকে এত ভালো রেজাল্ট করার পরও কোন বিশ্ববিদ্যালয় তাকে ভর্তির সুযোগ দিচ্ছে না কেন জানতে গিয়ে উত্তর পেলেন – একে তো মেয়ে, তার উপর ইহুদি। শুধুমাত্র একারণেই তাঁর দরখাস্ত বাতিল করে দেয়া হচ্ছিল। 

তাঁর মা-বাবা চেয়েছিলেন মেয়ে যদি কোনোভাবে লেখাপড়া শিখে কোনো একটা স্কুলে শিক্ষকতার চাকরি পায় তাহলে কোনোরকমে খেয়ে পরে বেঁচে থাকতে পারবে। কিন্তু স্কুলের শিক্ষকতার জন্য দরখাস্ত করেও কোন ফল হলো না। অনেকে পরামর্শ দিলেন স্টেনোগ্রাফি শিখে নিলে স্টেনোগ্রাফার হিসেবে কেরানির চাকরি পাওয়া যেতে পারে। রোজালিন বাধ্য হয়ে তাই শুরু করলেন। কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োকেমিস্ট্রির প্রফেসর রুডলফ শোয়েনহেইমারের স্টেনোগ্রাফার হিসেবে কাজ শুরু করলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে না পারলেও সান্তনা এই যে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকের অফিসে বসে কাজ করছেন। 

অবশেষে একটা সুযোগ এলো রোজালিনের জন্য। তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়, আমেরিকা যুদ্ধে জড়িয়ে গেছে। আমেরিকার ছেলেদের অনেকেই যুদ্ধে যোগ দেয়ার কারণে অনেক সিট খালি থেকে যাচ্ছিল। তখন শূন্যতা পূরণ করার জন্য মেয়েদেরকে সুযোগ দেয়া হয়। সেই সুযোগে ইলিনয় ইউনিভার্সিটির আরবানা-শ্যামপেইন ক্যাম্পাসে গ্রাজুয়েট স্কুলে ভর্তির সুযোগ পান রোজালিন। ১৯১৭ সালে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হবার পর থেকে রোজালিনের আগে আর কোন মেয়ে পদার্থবিজ্ঞানে ভর্তি হয়নি সেখানে। রোজালিন ছিলেন পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের প্রথম মেয়ে শিক্ষার্থী। একটা অ্যাসিস্ট্যান্টশিপও পেয়েছিলেন তিনি। স্নাতক পর্যায়ের ফিজিক্সের ক্লাস নিতেন তিনি। তখন ফিজিক্স ডিপার্টমেন্ট ছিল ইঞ্জিনিয়ারিং ফ্যাকাল্টির অধীনে। ফ্যাকাল্টির চারশ’র অধিক অধ্যাপক ও শিক্ষা-সহকারীর মধ্যে রোজালিনই ছিলেন একমাত্র মেয়ে। 

এখানে তাঁর সাথে পরিচয় হয় আরন ইয়ালোর সাথে। আরনও ছিলেন ইহুদি পরিবারের সন্তান। আরনের বাবা ছিলেন নিউইয়র্কের ইহুদি ধর্মযাজক। ১৯৪৩ সালে আরন ও রোজালিনের বিয়ে হয়। পরের চার বছরের মধ্যে তাঁদের দুই সন্তান – বেনজামিন ও ইলানার জন্ম হয়। অন্যান্য সব কাজের মতোই ঘরসংসারও খুব মনযোগ দিয়ে ভালোবেসে করতেন রোজালিন। 

১৯৪৫ সালে নিউক্লিয়ার ফিজিক্সে পিএইচডি সম্পন্ন করেন রোজালিন। দুর্দান্ত ভালো রেজাল্ট করার পরও তিনি কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের কোথাও কোন চাকরি পেলেন না। অনেক দরখাস্ত ব্যর্থ হবার পর প্রথম কাজ শুরু করলেন নিউইয়র্ক সিটির ফেডারেল টেলিকমিউনিকেশান কোম্পানিতে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে। তারপর হান্টার কলেজে যোগ দেন পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষক হিসেবে। এরপর ব্রোংক্‌স এর ভ্যাটেরান্স অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (ভিএ) হাসপাতালের নিউক্লিয়ার মেডিসিনের গবেষক হিসেবে ১৯৪৭ সালে। এখানেই তিনি গবেষণা শুরু করলেন চিকিৎসাবিজ্ঞানে রেডিও-আইসোটোপের ব্যবহার সম্পর্কে। 

চিকিৎসাবিজ্ঞানে রেডিও-আইসোটোপের ব্যবহার তখন মাত্র শুরু হয়েছে। রোজালিন দেখতে পাচ্ছেন নিউক্লিয়ার মেডিসিনের বিপুল সম্ভাবনাময় ভবিষ্যত। কিন্তু তাঁর একজন গবেষণা-সহযোগী দরকার যিনি চিকিৎসাবিজ্ঞান সম্পর্কে জানেন। এই কাজের জন্য তিনি বেছে নেন ভিএ হাসপাতালে সদ্য যোগ দেয়া ইন্টার্নি ডাক্তার সোলোমন বারসনকে। ডাক্তার সোলোমন বারসনের সাথে রোজালিনের অচ্ছেদ্য গবেষণা-বন্ধন তৈরি হয়। পরবর্তী বিশ বছরেরও বেশি সময় তাঁরা একসাথে গবেষণা করেছেন। ১৯৭২ সালে ডাক্তার সোলোমন হার্ট অ্যাটাকে মারা যান। 

১৯৫০ এর দশকের শুরুতে রোজালিন ও সোলোমন রক্তে আয়োডিন ও এলবুমিনের বিপাক প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করার পদ্ধতি উদ্ভাবন করলেন। রোগীর শরীরে রেডিও-আইসোটোপ সংযুক্ত রাসায়নিক (রেডিওফার্মাসিউটিক্যাল) ইনজেকশানের মাধ্যমে প্রয়োগ করার পর রোগীর রক্তের তেজস্ক্রিয়তা পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায় সময়ের সাথে তেজস্ক্রিয় বিকিরণের মাত্রা কীভাবে ক্রমশ কমে আসে। অতিদ্রুত কমে এলে বুঝতে হবে বিপাক প্রক্রিয়া দ্রুত হচ্ছে, আর বিকিরণের হার যদি কম হয়, বুঝতে হবে বিপাক ধীরগতিতে হচ্ছে। 

ডায়াবেটিসের মূল কারণ যে ইনসুলিনের দ্রুত বিপাক – সেই ধারণা চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মনে এলেও তখনো তা প্রমাণ করার উপায় জানা ছিল না। রোজালিন ডায়াবেটিক রোগীদের নিয়ে গবেষণা শুরু করলেন। তিনি ডায়াবেটিক রোগীর শরীরে রেডিও-আইসোটোপের বিকিরণের হার পর্যবেক্ষণ করে দেখলেন যে ডায়াবেটিক রোগীদের মধ্যে ইনসুলিনের বিপাকের হার অনেক বেশি। অর্থাৎ ডায়াবেটিক রোগীর শরীর থেকে ইনসুলিন দ্রুত ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে যাচ্ছে। তিনি এবার রোগীদের দুভাগে ভাগ করলেন। একভাগকে ইনসুলিন ইনজেকশান দেয়া হলো। অন্যভাগকে ইনসুলিন দেয়া হলো না। দেখা গেলো যাদেরকে ইতোমধ্যে ইনসুলিন দেয়া হয়েছে তাদের রক্তের ইনসুলিন বিপাকের হার, যাদেরকে আগে ইনসুলিন দেয়া হয়নি তাদের রক্তের ইনসুলিন বিপাকের হারের চেয়ে অনেক কম। তার মানে দাঁড়ালো শরীরে ইনসুলিন দেয়া হলে সেই ইনসুলিন রোগীর শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি করে যা ইনসুলিনের বিপাক-প্রক্রিয়ার হার কমিয়ে দিয়ে শরীর থেকে ইনসুলিন ক্ষয়ের অস্বাভাবিক মাত্রাকে স্বাভাবিক করতে সাহায্য করে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই আবিষ্কার একটি যুগান্তকারী আবিষ্কার। কিন্তু রোজালিন ও সোলোমন যখন তাঁদের গবেষণালব্ধ ফলাফল দ্য জার্নাল অব ক্লিনিক্যাল ইনভেস্টিগেশন-এ প্রকাশের জন্য পাঠালেন, জার্নালের রিভিউয়াররা তা সরাসরি বাতিল করে দেন। এই প্রত্যাখ্যানে একটুও দমে গেলেন না রোজালিন। বরং আরো উৎসাহ নিয়ে আরো অনেক বিস্তারিত গবেষণা তিনি করলেন। সেখান থেকেই আবিষ্কার করলেন আর-আই-এ পদ্ধতি। সেই প্রত্যাখ্যানের চিঠি তিনি যত্ন করে রেখে দিয়েছিলেন সারাজীবন। বিশ বছর পর ১৯৭৭ সালে তিনি যখন তাঁর এই গবেষণার জন্য চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার পেলেন, তাঁর নোবেল বক্তৃতায় তিনি সেই প্রত্যাখ্যানপত্র দেখিয়েছিলেন। 

রোজালিন শিক্ষাজীবনে রসায়ন পড়েছেন, নিউক্লিয়ার ফিজিক্সে পিএইচডি করেছেন, কিন্তু  জীববিজ্ঞানের কোন কোর্স করেননি। অথচ তিনি নিজে নিজে পড়াশোনা করে এত বেশি ফিজিওলজি এবং মেডিসিনের জ্ঞান অর্জন করেছিলেন যে তাঁর সমসাময়িককালের কোন ডাক্তারেরও এত জ্ঞান ছিল না। 

নোবেলজয়ী রোজালিনের গবেষণাগারটি ছিল অত্যন্ত সাধারণ। শুরু করেছিলেন হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতাকর্মীর ঝাড়ু-বালতি ইত্যাদি পরিচ্ছন্নতা কাজের সরঞ্জাম রাখার একটা ছোট্ট ঘরকে গবেষণাগারে রূপান্তরের মাধ্যমে। পরবর্তীতে তার কিছুটা উন্নতি হলেও খুব দরকারি যন্ত্রপাতি ছাড়া আর কোন বাহুল্য সেখানে ছিল না। সেরকম রোজালিনও ছিলেন সারাজীবন সাদামাটা। নোবেল পুরষ্কার পাবার আগেও যা ছিলেন, পরেও তাঁর সহজ-সরল সাদামাটা জীবনযাপনের কোন পরিবর্তন হয়নি। সপ্তাহে সবাই যেখানে চল্লিশ ঘন্টার বেশি কাজ করেন না, রোজালিন সপ্তাহে আশি ঘন্টা কাজ করতেন। তাঁর ল্যাবের কাছেই ছোট্ট একটা বাড়িতে স্বামী আর দুই সন্তানকে নিয়ে তিনি থাকতেন। এত গবেষণার ফাঁকেও তিনি বাড়ির কাজ করতেন। প্রথম সন্তানের বয়স এক মাস হবার আগেই তিনি সন্তান কোলে নিয়ে ল্যাবের কাজে যোগ দিয়েছেন। দ্বিতীয় সন্তানের বেলাতেও তাই করেছেন। দুপুরে ল্যাব থেকে বের হয়ে বাসায় গিয়ে শিশু সন্তানদের জন্য খাবার তৈরি করে খাইয়ে আবার ল্যাবে এসেছেন। তিনি নারী-পুরুষের সমান অধিকারে বিশ্বাস করতেন। তিনি বলতেন, নারী ও পুরুষের মধ্যে শুধুমাত্র একটাই পার্থক্য আছে – সেটা হলো নারী সন্তান জন্ম দিতে পারে, পুরুষ পারে না। এছাড়া অধিকারের ক্ষেত্রে আর কোন পার্থক্য থাকা উচিত নয়। 

১৯৯১ সালে সত্তর বছর বয়সে হাসপাতালের গবেষকের চাকরি থেকে অবসর নিতে হয় তাঁকে। তারপর বেঁচে ছিলেন আরো বিশ বছর। তখনো তাঁর পড়াশোনা, গবেষণা থেমে থাকেনি। ২০১১ সালের ৩০ মে তাঁর জীবনাবসান হয়। 


তথ্যসূত্র – সিমন গ্লিক, ন্যাচার, সংখ্যা ৪৭৪, ২০১১; সিয়াং ইয়ং ট্যান, সিঙ্গাপুর মেডিক্যাল জার্নাল, সংখ্যা ৬০, ২০১৯; নোবেল পুরষ্কার ওয়েবসাইট। 

___________
বিজ্ঞানচিন্তা জুলাই ২০২২ সংখ্যায় প্রকাশিত






Friday, 26 August 2022

সাম্প্রদায়িকতার শাস্তি

 


ছবির এই মানুষটির নাম ব্রিজিড হেইউড। দু’সপ্তাহ আগেও তিনি অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব নিউ ইংল্যান্ডের ভাইস চ্যান্সেলর ছিলেন। আগস্টের পাঁচ তারিখ তাঁর চাকরি চলে গেছে। এত বড় পদের চাকরি থেকে বরখাস্ত করার কিছুটা সম্মানজনক উপায় হলো – পদত্যাগপত্র জমা নেয়া। আগস্টের পাঁচ তারিখ তাঁর পদত্যাগপত্র গৃহীত হয়েছে। তাঁর অপরাধ কী? না, কিছু কিছু দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের মতো তিনি কোন দুর্নীতি করেননি, স্বজনপোষণ করে স্ত্রী-পুত্র-কন্যা-জামাতা-ভাইপো-ভাইজিকে নিয়োগ দেননি। তিনি যেটা করেছেন, সেটা আমাদের দেশে হয়তো কোন অপরাধই নয়। তিনি নিজের মুখ থেকে থুতু আঙুলে লাগিয়ে একটি বাদামী মেয়ের কপালে ডলতে ডলতে বলেছিলেন, দ্যাখো তোমার গায়ের চামড়ার রঙ কত ময়লা!

ঘটনাটি ঘটেছিল এবছর ৮ মার্চ – আন্তর্জাতিক নারী দিবসে। আর্মিডেলে – যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়টি অবস্থিত – একটি ক্লাবে আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালন করা হচ্ছিলো। ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর ব্রিজিড হেইউড সেই অনুষ্ঠানে আলোচকদের প্যানেলে ছিলেন। স্থানীয় স্কুলগুলি থেকে অনেক মেয়েকেও আনা হয়েছিল সেই অনুষ্ঠানে। ষোল বছর বয়সী স্কুলছাত্রীটি অভিবাসী মা-বাবার সন্তান, জন্মসূত্রে অস্ট্রেলিয়ান। জন্মসূত্রেই গায়ের বাদামী রঙ পেয়েছে। সেটা তার অপরাধ – শ্বেত চামড়ার অধিকারী ব্রিজিড হেইউইয়ের কাছে? অথচ ব্রিজিডের গায়ের বর্ণ সাদা হবার জন্য তাঁর নিজের কি কোন কৃতিত্ব আছে? বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ভিসি হবার পরেও তাঁর সেই সামান্য যুক্তিবোধ কাজ করলো না?

তিনি হয়তো ভেবেছিলেন এটা নিয়ে কেউ কোন আপত্তি করবে না। কিন্তু সেই ব্রিটিশ যুগ কি আছে – যেই যুগে ব্রিটিশরা লাথি মারলে ভারতীয়রা জিভ দিয়ে তাদের জুতো পরিষ্কার করে দিতো বাধ্য হয়ে? অস্ট্রেলিয়া শত বছর অস্ট্রেলিয়ান অশ্বেতাঙ্গ আদিবাসীদের উপর অত্যাচারের চূড়ান্ত করার পর এখন ক্রমশ সভ্য হচ্ছে। সাম্প্রদায়িকতা প্রদর্শনের বিরুদ্ধে এখানে আইনকানুন খুব কড়া। অভিবাসীরা এসব আইনকানুনের খবর রাখেন, বাধ্য হয়েই রাখেন। মেয়েটির স্কুলেও পড়ানো হয় সব মানুষের সমান অধিকারের কথা। সে চুপ করে রইলো না। সে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ করেছে ভাইস চ্যান্সেলর ব্রিজিড হেইউডের কাছে।

এদেশে যে যত বড় ক্ষমতাশালী – আইনকানুন তাকে তত বেশি মেনে চলতে হয়। মিডিয়াগুলি স্বাধীন। ফলে একজন সাধারণ মানুষ আইন ভাঙলে মিডিয়া দেখেও না দেখার ভান করতে পারে নিউজভ্যালু কম হবার কারণে। কিন্তু একজন প্রভাবশালী যদি আইন ভাঙে – তাহলে আর রক্ষা নেই। সেজন্যই দেখা যায় কোভিড-১৯ এর লকডাউনের সময় মুখে মাস্ক ছাড়া পেট্রোল পাম্প থেকে তেল নেয়ার কারণে উপপ্রধানমন্ত্রীকে ফাইন করা হয়।

যেহেতু এধরনের সাম্প্রদায়িকতার অভিযোগ আনা হয়েছে ভাইস-চ্যান্সেলরের বিরুদ্ধে, এবং ভিডিও ফুটেজও আছে – শেষ রক্ষা হলো না কোনভাবেই। ভিসি ব্রিজিড হেইউড পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। আদালতের বিচারে তিনি দোষী সাব্যস্ত হতে এখনো অনেক দেরি আছে। কিন্তু ভাইস-চ্যান্সেলরের মতো একটি পদের বিরুদ্ধে এধরনের অভিযোগ উঠলে তা প্রাথমিক তদন্তে যদি দেখা যায় একেবারে ভিত্তিহীন নয়, তখন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ চুপ করে থাকতে পারে না। এখানে বলে রাখা ভালো, অস্ট্রেলিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলি চলে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব পরিচালনা বোর্ডের মাধ্যমে। সরকার সেখানে মাথা গলাতে পারে না। সুতরাং এদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিদের সরকারি লেজুড়বৃত্তি করতে হয় না। আসলে লেজুড়বৃত্তি করে লাভ হলে হয়তো এখানেও করতো।

এরকম শাস্তির নজির থাকলেই কি মানুষের মন থেকে সাম্প্রদায়িক মনোভাব মুছে যাবে? সম্প্রদায়ভুক্ত মানুষ পুরোপুরি সাম্প্রদায়িকতামুক্ত হতে পারে না। কোনো না কোনোভাবে যত সামান্য পরিমাণেই হোক না কেন তা প্রকাশিত হয়ে পড়ে। সাম্প্রদায়িকতা বলতে যদিও আমরা শুধুমাত্র ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা বুঝি, কারণ ওটা নিয়েই সবচেয়ে বেশি গন্ডগোল দেখতে আমরা অভ্যস্ত, কিন্তু বর্ণসাম্প্রদায়িকতা আরো মারাত্মক। বাংলাদেশের কথা যদি ধরি – আমাদের গায়ের বর্ণ মোটামুটিভাবে সবারই একই রকম। সেখানে গাত্রবর্ণ দেখে ধর্মনির্ণয় অসম্ভব। ধর্মীয় পরিচয় আমি ইচ্ছে করলে প্রকাশ নাও করতে পারি। কিন্তু আমার গাত্রবর্ণ লুকানোর তো কোন ব্যবস্থা নেই। আমেরিকায় বর্ণসাম্প্রদায়িকতার ফলে সংঘর্ষ প্রায়ই ঘটে, এই একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়েও। আফ্রিকান-আমেরিকান জাতিগোষ্ঠী কয়েক প্রজন্ম ধরে আমেরিকায় জন্ম নেয়ার পরেও, একজন কৃষ্ণাঙ্গ আটবছর ধরে সেই দেশের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করলেও – বর্ণবিদ্বেষ মুছে যায়নি। বিশ্বায়নের ফলে ভারতীয় উপমহাদেশের বাদামী বর্ণের মানুষগুলি যখন পৃথিবীময় ছড়িয়ে পড়েছে – তখন তাদেরকেও এখন প্রায়ই বর্ণসাম্প্রদায়িকতার কদর্য অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যেতে হচ্ছে। আমেরিকা কানাডা ইওরোপ অস্ট্রেলিয়ার মতো শ্বেতাঙ্গশাসিত দেশে তো বটেই, আফ্রিকার মতো কৃষ্ণাঙ্গ শাসিত দেশেও বাদামীরা বর্ণবাদের শিকার হচ্ছে যথেষ্ট কালো নয় বলে।

আবার বাদামীরা যে নিজেদের ভেতর কী পরিমাণ বর্ণসাম্প্রদায়িক তা আর নতুন করে বলার দরকার আছে বলে মনে হয় না। চট্টগ্রাম কলেজে উচ্চমাধ্যমিক পড়ার সময় একজন প্রভাবশালী স্যার আমাকে প্রত্যেক ক্লাসেই সম্বোধন করতেন “এই কালাইয়া” বলে। অনেক বছর আগের সেই পরিস্থিতির কি এখন কোন উন্নতি হয়েছে?


Saturday, 13 August 2022

মহাজাগতিক রশ্মি

 


১৮৯৫ সালে এক্স-রে আবিষ্কৃত হবার পরবর্তী এক দশকের মধ্যেই পদার্থবিজ্ঞানের জগৎ নতুন নতুন তথ্য, তত্ত্ব, কণা এবং রশ্মিতে ভরে উঠতে লাগলো। পরের বছরই আবিষ্কৃত হলো তেজস্ক্রিয় বিকিরণ বা রেডিওঅ্যাকটিভিটি। ঠিক তার পরের বছর ১৮৯৭ সালে জানা গেলো ইলেকট্রন হলো পদার্থের সবচেয়ে মৌলিক কণা। যদিও ইলেকট্রন যে নেগেটিভ চার্জ বহন করে তা কয়েক শ বছর আগে থেকেই জানা ছিল, কিন্তু তার অন্যান্য ধর্মগুলি সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ তখন মাত্র হাতে এলো। দৃশ্যমান আলো সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের ধারণা কয়েক হাজার বছর আগে থেকে আছে। সেই ধারণাকে সুনির্দিষ্ট পদার্থবিজ্ঞানের সূত্রে রূপ দেয়া হয়ে গেছে ততদিনে। দৃশ্যমান আলো যে বিদ্যুৎচুম্বকীয় তরঙ্গ বা ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ওয়েভ তা বিজ্ঞানী জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েলের সমীকরণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এক্স-রে আবিষ্কারেরও ত্রিশ বছর আগে। কিন্তু অদৃশ্য এক্স-রে কিংবা গামা-রে’র শক্তি এবং গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে জানার তখনো শুরু। বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকেই পদার্থবিজ্ঞানের জগৎ অজানা রশ্মি ও কণাময় হয়ে উঠলো। এই অদৃশ্য রশ্মিগুলির শক্তি বিকিরণের তীব্রতা এবং যে পদ্ধতিতে এরা বিভিন্ন পদার্থের দেয়াল ভেদ করে অনায়াসে চলে যাচ্ছে তার অন্তর্গত বৈজ্ঞানিক রহস্য আবিষ্কারের জন্য অধীর হয়ে উঠলেন সারাপৃথিবীর পদার্থবিজ্ঞানীরা। আমাদের উপমহাদেশের বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসুও ছিলেন সেই বিজ্ঞানীদের দলে।

তখন নতুন নতুন রশ্মি এবং কণা আবিষ্কারের ধুম লেগে গেছে। কিছুদিন পর পরই বিজ্ঞানীদের মনে হচ্ছে আরো নতুন কোন রশ্মির সন্ধান পাওয়া গেছে। কিন্তু কেউ একজন ঘোষণা দিলেই তো আর আবিষ্কার হয়ে যায় না। একজন কোন কিছু আবিষ্কার করলে, কী পদ্ধতিতে আবিষ্কার করেছেন তা জানাতে হয়। একই পদ্ধতিতে অন্যরাও যদি সেই আবিষ্কারের ফল পায় – তবেই বলা যায় যে আবিষ্কারটি সঠিক আবিষ্কার। ১৯০৩ সালে ফরাসি পদার্থবিজ্ঞানী প্রসপার ব্লন্ডলট ঘোষণা দিলেন তিনি নতুন এক ধরনের রশ্মি আবিষ্কার করেছেন। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তিনি বেশ কয়েকটি পেপার লিখে ফেললেন কীভাবে তিনি এই নতুন রশ্মির বিকিরণ আবিষ্কার করেছেন। পাঁচ বছর আগে মেরি কুরি নতুন তেজস্ক্রিয় মৌল আবিষ্কার করে নিজের জন্মভূমির নামে নামকরণ করেছিলেন পোলোনিয়াম। প্রসপার ব্লন্ডলটও সেভাবে ফ্রান্সের যে শহরে তিনি জন্মেছেন সেই শহরের নামে তাঁর রশ্মির নাম দিলেন ন্যান্সি রশ্মি বা এন-রে। তাঁর শহরে হৈ চৈ পড়ে গেল। ফ্রেন্স একাডেমি অব সায়েন্স তাঁকে পঞ্চাশ হাজার ফ্রাঙ্ক পুরষ্কার দিয়ে ফেললো। দ্রুত বিখ্যাত হয়ে গেলেন তিনি। কিন্তু সমস্যা হয়ে গেল যখন এন-রশ্মি নিয়ে পৃথিবীর অন্যান্য জায়গার বিজ্ঞানীরাও কাজ শুরু করলেন। ব্লন্ডলট যে পদ্ধতিতে এন-রশ্মি আবিষ্কার করেছেন বলে দাবি করেছেন তাঁর গবেষণাপত্রে, অন্যান্য বিজ্ঞানীরা একই পদ্ধতি বার বার ব্যবহার করেও এন-রশ্মির অস্তিত্ব খুঁজে পেলেন না। স্বাভাবিকভাবেই এন-রশ্মির দাবি বাতিল হয়ে গেল। তবুও ন্যান্সি শহরের অনেকেই বিশ্বাস করতে থাকলেন যে তাঁদের বিজ্ঞানী আবিষ্কার ঠিকই করেছেন, অন্যান্য বিজ্ঞানীরা ষড়যন্ত্র করে তার স্বীকৃতি দিতে চাচ্ছে না।

সে যাই হোক, এক্স-রে গামা-রে নিয়ে তখন প্রচুর গবেষণা চলছে পৃথিবীজুড়ে। গোল্ড-লিফ ইলেকট্রোস্কোপ বা স্বর্ণপাত তড়িৎবীক্ষণ যন্ত্র ব্যবহার করে চার্জিত কণার অস্তিত্ব এবং পরিমাণ নির্ণয় করা তখন নিয়মিত ব্যাপার। স্কটিশ বিজ্ঞানী চার্লস উইলসন তখন প্রচুর গবেষণা করছেন কীভাবে অদৃশ্য বিকিরণ ও চার্জ শনাক্ত করা যায়। উইলসন ছিলেন ইলেকট্রন আবিষ্কারক জোসেফ জন থমসনের (জে জে থমসন) ছাত্র। ক্যাভেন্ডিস ল্যাবে কাজ করার সময় তিনি খেয়াল করলেন তাঁর স্বর্ণপাত তড়িৎবীক্ষণ যন্ত্র মাঝে মাঝে কিছু চার্জ শনাক্ত করছে যখন আশেপাশে কোন চার্জিত বস্তু কিংবা তেজস্ক্রিয় পদার্থ নেই যেখান থেকে চার্জ কিংবা বিকিরণ নির্গত হতে পারে। অনেক খুঁজে পেতেও এর কারণ বের করতে পারলেন না উইলসন। এই ঘটনা আরো অনেক ল্যাবেই দেখা গেল। বৈদ্যুতিক চার্জগুলি যে কুলম্বের সূত্র মেনে চলে সেই চার্লস কুলম্বও শতাধিক বছর আগে এরকম রহস্যময় কিছু লক্ষ্য করেছিলেন। তিনি দেখেছিলেন তাঁর চার্জিত গোলক – কোন কারণ ছাড়াই চার্জ হারাচ্ছে। এই রহস্যময় ঘটনার কোন সুনির্দিষ্ট সমাধান করা যায়নি। তবে বিজ্ঞানীরা মোটামুটি ধরে নিয়েছেন যে আমাদের পৃথিবী নিজেই যেহেতু তেজস্ক্রিয় নক্ষত্র থেকে উৎপন্ন হয়েছে, বিগত সাড়ে চারশ কোটি বছর ধরে বিকিরণের পরেও এখনো কিছুটা তেজস্ক্রিয়তা রয়ে গেছে এর ভেতর। সেই বিকিরণই মাঝে মাঝে ধরা দিচ্ছে তড়িৎবীক্ষণ যন্ত্রে।

কিন্তু ধোঁয়াশে ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট থাকা বিজ্ঞানীদের ধর্ম নয়। এই রহস্য উন্মোচনে কাজ করছিলেন অনেকেই। ততদিনে তেজস্ক্রিয় বিকিরণের মৌলিক ধর্ম সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা জেনে গেছেন। তেজস্ক্রিয় পদার্থ থেকে দূরে গিয়ে তেজস্ক্রিয়তা মাপলে তেজস্ক্রিয়তার পরিমাণ কমে যায়। কোন জায়গায় তেজস্ক্রিয় বস্তু রেখে তার এক মিটার দূরে ডিটেক্টর রাখলে যে পরিমাণ তেজস্ক্রিয়তা পাওয়া যাবে, দুই মিটার দূরে রেখে মাপলে তেজস্ক্রিয়তার পরিমাণ হবে চার ভাগের একভাগ। তেজস্ক্রিয়তার পরিমাণ দূরত্বের বর্গফলের বিপিরীত অনুপাত। পৃথিবীর ভেতরের তেজস্ক্রিয়তার অস্তিত্বই যদি বিদ্যুৎবীক্ষণ যন্ত্রে ধরা পড়ছে হবে – তাহলে পৃথিবীপৃষ্ঠ থেকে যত উপরের দিকে এই বিদ্যুৎবীক্ষণ যন্ত্র নিয়ে যাওয়া হবে, তেজস্ক্রিয়তা তত কমে যাবে। বিদ্যুৎবীক্ষণ যন্ত্র ভূমির সমতলে যে পাঠ দেবে, ভূমি থেকে উপরে তার চেয়ে কম পাঠ দেবে। বিভিন্নভাবে এই পরীক্ষা করে দেখা হলো – কিন্তু উচ্চতার কারণে পাঠের কোন পার্থক্য দেখা গেলো না। তখন ভাবা হলো সামান্য দূরত্বের পার্থক্যে কিছু হবে না। দূরত্ব বাড়াতে হবে। ১৯১০ সালে জার্মান পদার্থবিজ্ঞানী থিওডর বুল্‌ফ আইফেল টাওয়ারের উপরে উঠে পরীক্ষা চালালেন। ফল হলো উল্টো। দেখা গেলো আইফেল টাওয়ারের নিচে তড়িৎবীক্ষণ যন্ত্রে যে পাঠ পাওয়া গেল, তিন শ মিটার উপরে আইফেল টাওয়ারের চূড়ায় সেই বিকিরণ শনাক্তের সেই পাঠ অনেক বেশি। তাহলে এটা নিশ্চিত হলো যে এই তেজস্ক্রিয়তার উৎপত্তি পৃথিবীতে নয়, পৃথিবীর বাইরে। কিন্তু কোথায়?


ভিক্টর হেস


অস্ট্রিয়ান পদার্থবিজ্ঞানী ভিক্টর হেস তখন ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ গবেষক। তিনি ঠিক করলেন আরো অনেক উঁচুতে উঠে পরীক্ষা চালাবেন। ১৯১১ সালে আকাশের দিকে উপরে উঠার তখনকার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা ছিল বেলুন। তিনি বেশ কয়েক বছর ধরে অনেকগুলি পরীক্ষা করলেন বেলুনে চড়ে। সাড়ে চারশ মিটার উচ্চতা থেকে শুরু করে পাঠ নিতে নিতে তিনি উঠলেন পাঁচ কিলোমিটারেরও বেশি উচ্চতায়। দেখলেন যতই উপরের দিকে উঠছেন, তেজস্ক্রিয়তার পরিমাণ ততই বাড়ছে। তার মানে এই তেজস্ক্রিয়তা পৃথিবীর বায়ুমন্ডল ভেদ করে আসছে পৃথিবীর বাইরে থেকে। তবে কি সূর্য থেকে আসছে? তাহলে দিনের বেলার পাঠ আর রাতের বেলার পাঠে পার্থক্য থাকবে। ভিক্টর হেস রাতের বেলায়ও পরীক্ষা চালালেন। অন্ধকারে যখন সূর্যের আলো বেলুনের আশেপাশে কোথাও নেই, তখনো দেখা গেলো তেজস্ক্রিয়তার পরিমাণ একটুও কমছে না। ঘটনা কী? তবে কি সূর্যও নয়, আরো দূরের কোন নক্ষত্র থেকে আসছে এই তেজস্ক্রিয়তা? সূর্যগ্রহণের ফলে কোন তারতম্য দেখা যায় কিনা পরীক্ষা করার জন্য ১৯১২ সালের ১৭ এপ্রিল পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণের সময় বেলুনে চড়ে তড়িৎবীক্ষণ যন্ত্রের পাঠ নিলেন ভিক্টর হেস। কিন্তু ফলাফলে কোন তারতম্য দেখা গেল না। ১৯১৩ সাল নাগাদ বিজ্ঞানীরা মেনে নিলেন যে পৃথিবীর বাইরে এমনকি সূর্যের থেকেও দূরে মহাকাশের গভীর নক্ষত্রপুঞ্জ থেকে পৃথিবীর বায়ুমন্ডলের বর্ম ভেদ করে চলে আসছে এই আশ্চর্য রশ্মি। আরো প্রায় বারো বছর পরে ১৯২৫ সালে বিজ্ঞানী রবার্ট মিলিক্যান এই রশ্মির নাম দিলেন কসমিক রে – বাংলায় আমরা যাকে মহাজাগতিক রশ্মি বলছি। ১৯৩৬ সালে মহাজাগতিক রশ্মির আবিষ্কারক হিসেবে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার পেলেন ভিক্টর হেস।

রবার্ট মিলিক্যান যতই বলুন যে কসমিক রে আসলেই রে – মানে আলোকরশ্মির মতো তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গের অংশ – বিজ্ঞানীরা সম্পূর্ণরূপে সন্তুষ্ট হতে পারলেন না। কসমিক রে এক্স-রে কিংবা গামা-রে’র চেয়েও বেশি শক্তিশালী এবং এদের পেনিট্রেটিং পাওয়ার বা ভেদ করে যাওয়ার ক্ষমতাও অনেক বেশি। মিলিক্যান বললেন কসমিক রে তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গেরই বড়ভাই – যাদের কম্পাঙ্ক এক্স-রে ও গামা-রের কম্পাঙ্কের চেয়ে বেশি, আর তরঙ্গদৈর্ঘ্য এক্স-রে ও গামা-রে’র তরঙ্গদৈর্ঘ্যের চেয়ে কম। মিলিক্যান বিশ্বখ্যাত আমেরিকান বিজ্ঞানী, ইলেকট্রনের চার্জ সঠিকভাবে মেপে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন ১৯২৩ সালে। তাঁর কথা অনেকেই মেনে নেবেন এটা ঠিক। কিন্তু বিজ্ঞানে প্রমাণ ছাড়া কারো কথাই কেউ মেনে নেয় না। মিলিক্যানের কথাও অনেক বিজ্ঞানীর বিশ্বাস হলো না। তাঁরা পরীক্ষা করে দেখতে চাইলেন কসমিক রে আসলেই রে, নাকি মহাকাশ থেকে ছুটে আসা কোন চার্জিত কণা।

ততদিনে ইলেকট্রন ও প্রোটন সম্পর্কে সবাই জেনে গেছেন। নিউট্রন তখনো স্বীকৃতি পায়নি। কসমিক রে যদি মহাকাশ থেকে ছুটে আসা রশ্মি হয়, আলোকের অংশ হয়, তাহলে সেই ফোটন পৃথিবীর সবজায়গায় সমানভাবে ছড়িয়ে পড়ার কথা। কারণ ফোটন যেহেতু চার্জহীন, সেহেতু তারা কোন ধরনের বিদ্যুৎক্ষেত্র কিংবা চুম্বকক্ষেত্র দ্বারা বিক্ষিপ্ত হবে না। কিন্তু যদি তারা চার্জিত কণা হয়, তাহলে পৃথিবীর চুম্বকক্ষেত্রের প্রভাব তাদের গতির উপর অবশ্যই পড়বে। তাহলে দেখা যাবে পৃথিবীর মেরুর দিকে কসমিক রে বেশি ধরা পড়বে।   

ঠিক তাই হলো। অনেক বিজ্ঞানীই এই পরীক্ষা করলেন। নোবেলজয়ী আমেরিকান পদার্থবিজ্ঞানী আর্থার কম্পটন প্রমাণ করলেন যে কসমিক রে আসলে রে নয়, পার্টিক্যাল। ১৯৩০ থেকে ১৯৪৫ সালের মধ্যে প্রচুর গবেষণা হয়েছে কসমিক রে’র বিকিরণ নিয়ে। প্রমাণিত হয়েছে কসমিক রে’র শতকরা নব্বই ভাগ কণাই হলো প্রোটন, আর সাথে কিছু (৯%) আলফা পার্টিক্যাল বা হিলিয়াম নিউক্লিয়াস। বাকি এক ভাগ বিটা পার্টিক্যাল বা ইলেকট্রন। সুতরাং এদেরকে মহাজাগতিক রশ্মি না বলে মহাজাগতিক কণা বলা উচিত। কিন্তু কসমিক রে নামটা ততদিনে প্রচলিত হয়ে গেছে বলে তা আর বদলানো হলো না।

কিন্তু এত বিপুল পরিমাণ চার্জিত কণার উৎস কোথায়? আমাদের কাছের নক্ষত্র সূর্যই যে একমাত্র উৎস নয়, তা প্রমাণিত হয়ে গেছে অনেক আগেই। এই মহাজাগতিক কণাগুলির উৎস সন্ধান করতে গিয়ে খুলে গেছে মহাকাশ গবেষণার আরো অনেক নতুন নতুন দিক। মহাকাশের অতল গহ্বরে কোটি আলোকর্ষ দূরে ঘটে যাওয়া সুপারনোভা বিস্ফোরণ, ব্ল্যাকহোলের উৎপত্তি এসব মহাজাগতিক ঘটনা থেকে উৎপন্ন মহাজাগতিক কণাগুলির অংশবিশেষ আমাদের পৃথিবীতে এসে পৌঁছাচ্ছে। এদের কিছু কিছু কণার শক্তি লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডারে উৎপন্ন সবচেয়ে শক্তিশালী কণার চেয়েও বেশি শক্তিসম্পন্ন। এদের উৎপত্তির রহস্যের কিনারা এখনো করা যায়নি। কসমিক রে’ আবিষ্কারের এক শ বছরেরও বেশি অতিক্রান্ত হয়ে গেছে, এখনো এর আদ্যোপান্ত জানা যায়নি।

২০১৭ সালে নাসা ইন্টারন্যাশনাল স্পেস স্টেশনে আইস-ক্রিম (ISS-CREAM International Space Station – Cosmic Ray Energies and Mass) পরীক্ষা চালিয়েছে তিন বছর ধরে। মহাকাশ স্টেশন থেকে চালানো এই পরীক্ষায় দেখতে চেয়েছে সুপারনোভা বিস্ফোরণ থেকেই বেশিরভাগ কসমিক রে’র উৎপত্তি কিনা, আর কসমিক রে’র সব শক্তির বর্ণালী কোন একটি নির্দিষ্ট নিয়মে ব্যাখ্যা করা যায় কিনা। তথ্য এবং উপাত্ত বিশ্লেষণ এখনো চলমান। মহাকাশের রহস্য উন্মোচনে কসমিক রে’র ভূমিকা ক্রমশ বাড়ছে।

কিন্তু পৃথিবীতে যেসব কসমিক রে প্রতিনিয়ত আসছে তাদের ফলে আমাদের শরীরের কি ক্ষতি হচ্ছে? পৃথিবীতে আমরা প্রতি বছর গড়ে প্রায় পাঁচ মিলিসিভার্ট বিকিরণ শোষণ করি। তার মধ্যে মাত্র দশমিক চার মিলিসিভার্ট আসে মহাজাগতিক কণা থেকে। আলাদাভাবে এই কণাগুলি আমাদের শরীরের তেমন কোন ক্ষতি করে না, কারণ এই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কণাগুলির শক্তি অত্যন্ত বেশি বলে এরা আমাদের শরীরের একদিক দিয়ে ঢুকে অন্যদিক দিয়ে বের হয়ে যায় প্রায়-আলোর গতিতে। তাই পৃথিবীপৃষ্ঠে এগুলি থেকে ক্ষতির সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে।

তথ্যসূত্র: টুডুর স্টানেভ, হাই এনার্জি কসমিক রেজ, স্প্রিংগার (২০১০); বব বারম্যান, ঝ্যাপ্‌ড, লিটল ব্রাউন কোম্পানি (২০১৭); আইজাক আসিমভ, আন্ডারস্ট্যান্ডিং ফিজিক্স, বার্নিস অ্যান্ড নোবল (১৯৬৬)।

_______________

বিজ্ঞানচিন্তা জুন ২০২২ সংখ্যায় প্রকাশিত






Wednesday, 10 August 2022

শারমিন আক্তার সাথীর 'কিছু সাদা টিউলিপ'

 



ইয়ামিন আর প্রকৃতির ভালোবাসার গল্প ‘কিছু সাদা টিউলিপ’। দু’জন দুই পথের, দুই ধর্মের, দুই প্রকৃতির মানুষ – কিন্তু ভালোবাসার টানে মিলে যায় এক পথের মোহনায়; ভালোবাসার পথ। দোর্দন্ডপ্রতাপ ক্ষমতাসীন দুর্নীতিবাজ এমপি মজিবর শাহ – চোরাচালানসহ যাবতীয় দুষ্কর্ম করে থাকেন। এসব কাজে তার ভাগনে ইয়ামিন তার ডানহাত। ক্ষমতাশালী মামা থাকলে যা হয় – তা বুঝে নিতে আমাদের সমস্যা হয় না। এই ইয়ামিনের প্রেমে পড়ে যায় একটি বিউটি পার্লারের মালিক খ্রিস্টান তরুণী প্রকৃতি। শুরুতে এক তরফা। ইয়ামিন এসে প্রকৃতির বিউটি পার্লারে ভাঙচুর চালায়। পরে তার ক্ষতিপূরণ দেয়। এতেই হয়তো ইয়ামিনের একটা কোমল মনের পরিচয় পায় প্রকৃতি। তাতেই ভালো লাগা। কাহিনিতে এমপি সাহেবের জীবন আছে। এমপি সাহেব তার আপন শালীকে একা পেয়ে ধর্ষণ করে। সেই ঘটনা চাপা দিতে এমপির স্ত্রী তার বোনের সাথে স্বামীর বিয়ে পড়িয়ে দেয়। সে নিয়ে দুই বোনের টানাপোড়েন আছে। ওদিকে প্রকৃতির মা-বাবা, ভাই-বোনের কথা আছে। সব মিলিয়ে কাহিনি এগিয়ে চলে চূড়ান্ত পরিণতির দিকে। মিলনাত্মক পরিণতি আকাঙ্খিত থাকলেও শেষ পর্যন্ত বিরহে পরিণত হয়।

বইটি প্রকাশিত হয়েছে ২০২১ সালের বইমেলায়। অনেকে নতুন লেখক পুরনো লেখক এভাবে ভাগ করে ফেলেন। আমি মনে করি লেখকদের মধ্যে নতুন পুরনোতে ভাগ হয় না। যে কোনো লেখকই যখন নতুন কোন লেখা নিয়ে আসেন, তখন তো তিনি নতুনই। শারমিন আক্তার সাথীর আর কোনো লেখা আগে পড়িনি। 

শারমিন আক্তার সাথীর এই উপন্যাসের কাহিনি সোজাসাপ্টা। সংলাপগুলি মাঝে মাঝে অহেতুক দার্শনিকতায় আক্রান্ত হলেও খুব বেশি ঝামেলা করে না। কিছু কিছু দার্শনিক উক্তি বেশ জোরালো। যেমন, ‘পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় স্বার্থ হচ্ছে ভালোবাসা। আর আমরা আমাদের জীবনে বহু মানুষ, প্রাণী বা বস্তুকে ভালোবাসি, তারাও আমাদের ভালোবাসে। সে হিসেবে আমরা সবাই স্বার্থপর।‘

বইটি প্রকাশ করেছে তাম্রলিপি। কিন্তু বানান কেন নির্ভুল করা যাচ্ছে না, বুঝতে পারছি না। প্রুফ রিডার এবং সম্পাদকরা কেন এগুলি দেখেন না? একটা জায়গায় লেখক হয়তো পান্ডুলিপিতে নোট লিখে রেখেছিলেন, “এখানের একটা অংশ বাড়তি কাগজে লিখে দিলাম”। সেটাই ছাপানো হয়ে গেছে বইয়ের অংশ হিসেবে (পৃ ৭৫)!

প্রকৃতির স্বপ্ন ছিল নেদারল্যান্ডে গিয়ে সাদা টিউলিপের বাগান দেখে আসার। ইয়ামিন তার সেই স্বপ্নপূরণের স্বপ্ন দেখেছিল। স্বপ্ন পূরণ হয়নি বলেই এই কাহিনির সমাপ্তি যুক্তিযুক্ত মনে হয়েছে। 


Latest Post

চিকিৎসাবিজ্ঞানে যান্ত্রিক বুদ্ধিমত্তা

  ধীরে ধীরে চোখের আলো নিভে আসছিলো রিস হিবার্টের। পৃথিবীর আলো দেখার আশা ছেড়েই দিতে হয়েছিল তাঁকে। দু’বছর আগেও বেশ সুস্থ স্বাভাবিক ছিলেন তিনি। ...

Popular Posts