Monday, 8 March 2021

সবার জন্য স্যাটেলাইট - পর্ব ২

 



দ্বিতীয় অধ্যায়

স্যাটেলাইট যুগ 

বর্তমান যুগ স্যাটেলাইট যুগ। যখন থেকে আমরা আমাদের দৈনন্দিন কাজের সুবিধার জন্য স্যাটেলাইটের ব্যবহার শুরু করেছি তখন থেকেই শুরু হয়েছে স্যাটেলাইট যুগ। সারাপৃথিবীর সাথে আমাদের যে যোগাযোগের মাধ্যম - সেই দূরযোগযোগ বা টেলিকমিউনিকেশানের জন্য আজ আমরা ধরতে গেলে পুরোপুরি স্যাটেলাইটের উপর নির্ভরশীল। এই যে ২০১৮ সালের বিশ্বকাপ ফুটবলের সবগুলো ম্যাচ আমরা বাংলাদেশে বসে রাশিয়ার স্টেডিয়াম থেকে সরাসরি দেখতে পেয়েছি সেটা সম্ভব হয়েছে স্যাটেলাইটের কারণে। ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানার কয়েকদিন আগে থেকেই আমরা জানতে পারছি, প্রস্তুতি নিতে পারছি, সময়মতো ব্যবস্থা নিয়ে প্রাণহানি ও সম্পদহানি কমাতে পারছি - তার মূলে আছে আবহাওয়া স্যাটেলাইট। বৈজ্ঞানিক গবেষণার স্যাটেলাইটগুলো সারাক্ষণ তথ্য সংগ্রহ করছে পৃথিবী ও পৃথিবীর বাইরে মহাকাশ থেকে। আমরা জানতে পারছি মহাবিশ্বের কোথায় কী হচ্ছে। পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ সম্পদ সংগ্রহে কাজে লাগানো হচ্ছে স্যাটেলাইটকে। খনির দুর্ঘটনায় বা ভূমিকম্পের ধ্বংসস্তূপের ভেতর কেউ জীবিত আছে কি না তা জানার জন্য স্যাটেলাইটের সাহায্য নেয়া হচ্ছে। এখন উড়োজাহাজে বসেও টেলিফোন ও ইন্টারনেট সংযোগ পাওয়া যাচ্ছে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে। সত্যিকারের স্যাটেলাইট যুগে বাস করছি আমরা।

          এই অধ্যায়ে আমরা দেখবো কী কী ধরনের স্যাটেলাইট আছে এবং তাদের প্রধান কাজ কী কী।

          পৃথিবী থেকে মহাকাশে পাঠানো কৃত্রিম উপগ্রহ বা স্যাটেলাইটগুলোকে প্রধানত দুইটি শ্রেণিতে ভাগ করা যায়:

 

          (১) বৈজ্ঞানিক স্যাটেলাইট (Scientific Satellite) ও

          (২) ব্যবহারিক স্যাটেলাইট (Application Satellite)।

         

 

বৈজ্ঞানিক স্যাটেলাইট

 

বৈজ্ঞানিক স্যাটেলাইটগুলোর প্রধান কাজ হলো মহাবিশ্ব সম্পর্কে  আমাদের নতুন জ্ঞানের সন্ধান দেয়া। আমাদের পৃথিবী, সৌরজগৎ, গ্যালাক্সির দিকে চোখ রাখছে বৈজ্ঞানিক স্যাটেলাইটগুলো মহাকাশে ভাসতে ভাসতে। মহাজাগতিক বিকিরণ থেকে শুরু করে ব্ল্যাক-হোল ও গ্যালাক্সির উৎপত্তি সম্পর্কে নতুন উপাত্ত সংগ্রহ করছে স্যাটেলাইটগুলো। পৃথিবীর গতিপথ ও টেকটোনিক প্লেটগুলোর গতিবিধির ওপর নজর রাখছে বৈজ্ঞানিক স্যাটেলাইটগুলো। মহাকাশের গ্যালাক্সি, নক্ষত্র, গ্রহ-উপগ্রহগুলোর কাজকর্মের ওপর নিয়মিত নজরদারি করছে আমাদের বৈজ্ঞানিক স্যাটেলাইটগুলো। পৃথিবী থেকে সৌরজগতের সবগুলো গ্রহে পাঠানো হয়েছে বিভিন্ন আকারের ও বিভিন্ন প্রকৃতির বৈজ্ঞানিক স্যাটেলাইট। সেই স্যাটেলাইটগুলো যে উপাত্ত পাঠিয়েছে সেখান থেকেই আমরা জানতে পেরেছি সেই গ্রহ কিংবা উপগ্রহ সম্পর্কে। মহাকাশ স্টেশনগুলো বিরাট আকৃতির বৈজ্ঞানিক স্যাটেলাইট। বৈজ্ঞানিক স্যাটেলাইটগুলো থেকে প্রাপ্ত সিগনাল বা উপাত্তগুলোকে আমরা সাধারণ মানুষ সরাসরি ব্যবহার করতে পারি না বলেই সেগুলোকে আমরা ব্যবহারিক স্যাটেলাইট বা অ্যাপ্লিকেশান স্যাটেলাইট বলছি না।

          এবার কয়েকটি বৈজ্ঞানিক স্যাটেলাইট সম্পর্কে আলোচনা করা যাক।

 

স্পুটনিক-২

 

সোভিয়েত ইউনিয়ন বিশ্বের প্রথম স্যাটেলাইট স্পুটনিক-১ মহাশূন্যে পাঠিয়েছিল। কিন্তু স্পুটনিক-১ ছিল মূলত একটি সামরিক বার্তাবাহী স্যাটেলাইট। সোভিয়েত ইউনিয়নের সামরিক শক্তি আমেরিকার সামরিক শক্তির চেয়েও অগ্রসর - এই বার্তা দেয়ার জন্যই স্পুটনিক-১ পাঠানো হয়েছিল। স্পুটনিক-১ পাঠানোর এক মাসের মধ্যেই ১৯৫৭ সালের ৩ নভেম্বর সোভিয়েত ইউনিয়ন তাদের দ্বিতীয় স্যাটেলাইট স্পুটনিক-২ মহাকাশে পাঠায়। স্পুটনিক-২কে বলা চলে পৃথিবীর প্রথম বৈজ্ঞানিক স্যাটেলাইট।

 

চিত্র ১০: সোভিয়েত ইউনিয়নের দ্বিতীয় স্যাটেলাইট স্পুটনিক-২

          

স্পুটনিক-২ ছিল বিশ্বের প্রথম স্যাটেলাইট যার মাধ্যমে মহাশূন্যে জীবন্ত প্রাণী পাঠানো হয়েছিল। উৎক্ষেপণের সময় এই স্যাটেলাইটের ভর ছিল ৫০৮ কেজি। ১.২ মিটার লম্বা এই স্যাটেলাইটের একটি প্রকোষ্টে একটি কুকুর (নাম লাইকা) রাখার ব্যবস্থা ছিল। লাইকার শরীরে ইলেকট্রোড লাগানো ছিল যেন মহাকাশে ওজনহীনতা ও অন্যান্য অনুষঙ্গের পরিবর্তনের ফলে প্রাণীর শরীরে কী কী পরিবর্তন হয় তা পর্যবেক্ষণ করার জন্য। এই স্যাটেলাইটের বৈজ্ঞানিক উদ্দেশ্য ছিল ভবিষ্যতে মহাকাশে মানুষ পাঠাতে হলে কী কী প্রস্তুতি নিতে হবে সে সংক্রান্ত জ্ঞান আহরণ। এর যন্ত্রপাতির মধ্যে ছিল গেইগার-মুলার কাউন্টার - যার সাহায্যে মহাজাগতিক তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা মাপা যায়, এবং দুটো আলট্রা-ভায়োলেট ও এক্স-রে স্পেকট্রা-ফটোমিটার।

          স্পুটনিক-২ এর কক্ষপথ ছিল উপবৃত্তাকার। যার কাছের বিন্দুর দূরত্ব ছিল পৃথিবী থেকে ২২৫ কিলোমিটার, আর সবচেয়ে দূরের বিন্দুর দূরত্ব ছিল ১৬৭১ কিলোমিটার। পৃথিবীর চারপাশে একবার ঘুরে আসতে স্পুটনিক-২ এর লাগতো মাত্র দেড় ঘন্টার মতো। উৎক্ষেপণের ৫ থেকে ৭ ঘন্টার মধ্যে লাইকার মৃত্যু হয়। ১৫৩ দিন কক্ষপথে থেকে পৃথিবীকে মোট ২৫৭০ বার প্রদক্ষিণ করার পর পৃথিবীর বায়ুমন্ডলে ফিরে আসে স্পুটনিক-২।

 

 

এক্সপ্লোরার-১

 

আমেরিকার জেট প্রপালশান ল্যাবোরেটরিতে নির্মিত এক্সপ্লোরার-১ স্যাটেলাইট মহাশূন্যে প্রেরিত হয়েছিল ১৯৫৮ সালের ৩১ জানুয়ারি। এক্সপ্লোরার-১ তৈরি করা হয়েছিল মহাজাগতিক রশ্মি, গ্রহাণু এবং মহাকাশের তাপমাত্রা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের উদ্দেশ্যে।

          এই স্যাটেলাইটের যন্ত্রপাতির ভর ছিল মাত্র ৮ কেজি। যার মধ্যে ছিল একটি গেইগার-মুলার কাউন্টার - যার সাহায্যে মহাজাগতিক রশ্মির তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা মাপা যায়। ছিল মাইক্রো-মেটিওরাইট ডিটেক্টর - যার সাহায্যে আণুবীক্ষণিক গ্রহাণু শনাক্ত করা যায়। আর ছিল স্যাটেলাইটের বাইরের ও ভেতরের তাপমাত্রার পার্থক্য মাপার যন্ত্র - যার সাহায্যে মহাকাশের তাপমাত্রা জানা যায়।

          এক্সপ্লোরার-১ স্যাটেলাইটটির দৈর্ঘ্য ছিল মাত্র দুই মিটার এবং ব্যাস ছিল মাত্র ১৫.৯ সেন্টিমিটার। এর কক্ষপথ ছিল উপবৃত্তাকার; যার কাছের বিন্দুর দূরত্ব ছিল পৃথিবী থেকে ৩৬০ কিলোমিটার, আর সবচেয়ে দূরের বিন্দুর দূরত্ব ছিল ২৫৩২ কিলোমিটার। পৃথিবীর চারপাশে ঘুরতে এর সময় লাগতো দুই ঘন্টারও কম (১১৪.৮ মিনিট)।


চিত্র ১০: স্যাটেলাইট এক্সপ্লোরার-১ এর গঠন

 

এই স্যাটেলাইটটি কর্মক্ষম ছিল মাত্র চার মাস। ১৯৫৮ সালের ২৩ মে'র পর আর কোন সিগনাল আসেনি এক্সপ্লোরার-১ থেকে। মৃত স্যাটেলাইট হিসেবে তারপর আরো বারো বছর এটা পৃথিবীর চারপাশে ঘুরেছে মোট ৫৮ হাজার বার। ১৯৭০ সালের ৩১ মে পৃথিবীর বায়ুমন্ডলে প্রবেশের সময় পুড়ে ছাই হয়ে যায় এক্সপ্লোরার-১।

         

ব্যবহারিক স্যাটেলাইট

অ্যাপ্লিকেশান স্যাটেলাইট বা ব্যবহারিক স্যাটেলাইটগুলো আমরা সরাসরি ব্যবহার করি। এই স্যাটেলাইটগুলো আমাদের দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন রকমের কাজে লাগে। ব্যাবহারিক স্যাটেলাইটগুলোর মধ্যে প্রধানত আছে যোগাযোগ স্যাটেলাইট বা কমিনিকেশান স্যাটেলাইট, দূর অনুধাবন বা রিমোট সেন্সিং স্যাটেলাইট, স্পেস নেভিগেশান অ্যান্ড পজিশানিং স্যাটেলাইট বা জিপিএস স্যাটেলাইট, এবং মেটিওরলজিক্যাল স্যাটেলাইট বা আবহাওয়া স্যাটেলাইট।

          গত পঞ্চাশ-ষাট বছরে প্রায় কয়েক হাজার স্যাটেলাইট পৃথিবী থেকে মহাকাশে পাঠানো হয়েছে। এই স্যাটেলাইটগুলো আমাদের দৈনন্দিন জীবনের নানা কাজের সঙ্গী হয়ে উঠেছে অনেকসময় আমাদের অজান্তেই। যেমন আবহাওয়ার নির্ভুল পূর্বাভাস আমরা এখন পাচ্ছি। এর পেছনে আবহাওয়া স্যাটেলাইটের যে কাজ জড়িত আছে সে সম্পর্কে আমাদের অনেকের ধারণাও নেই। আপনার মোবাইল ফোনের লোকেশন অ্যাপ্‌স ব্যবহার করে আপনি জেনে নিতে পারছেন আপনার বন্ধু কোথায় আছে, কিংবা আপনি নজর রাখতে পারছেন আপনার গাড়ি কোথায় আছে - এগুলো সম্ভব হচ্ছে জিপিএস স্যাটেলাইটের মাধ্যমে। উন্নত দেশের চাষীরা এখন স্যাটেলাইটের মাধ্যমে জেনে নিচ্ছেন জমিতে কখন সার দিতে হবে, মাটিতে পানি ঠিকমত আছে কি না, কিংবা কোন ফসলে পোকার আক্রমণ ঘটছে কি না। উন্নত দেশের মৎস্যচাষীরা এখন নদীতে বা সমুদ্রের কোথায় মাছ আছে, কিংবা ঠিক কোন জায়গায় জাল ফেললে মাছ পাওয়া যাবে - সেই হিসেবও নির্ভুলভাবে জেনে নিচ্ছেন স্যাটেলাইটের মাধ্যমে। খনিজ সম্পদ আহরণকারীরা স্যাটেলাইটের মাধ্যমে জেনে নিচ্ছেন পৃথিবীর ঠিক কোথায় কোথায় খনিজ সম্পদ রয়েছে।

          ব্যবহারিক স্যাটেলাইটগুলোর সাহায্য ছাড়া আমাদের আধুনিক জীবনযাত্রা প্রায় অসম্ভব।  ব্যবহারিক স্যাটেলাইটগুলো আমাদের কী কী কাজে লাগে তার একটা তালিকা নিচে দেয়া হলো।

 

অডিও, ভিডিও, মাল্টিমিডিয়া ও ডাটা কমিউনিকেশান

 

Ø  প্রত্যন্ত অঞ্চলে যেখানে টেলিফোন নেটওয়ার্ক নেই সেখানে স্যাটেলাইট টেলিফোনের সাহায্যে যোগাযোগ করা সম্ভব।

Ø  খবর সংগ্রহ ও সরবরাহ

Ø  ইন্টারনেট ট্রাংকিং (internet trunking)[1]

Ø  ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট

Ø  ভিস্যাট (VSAT - very small aperture terminal) নেটওয়ার্ক

Ø  টেলি-হেল্‌থ, টেলিমেডিসিন

Ø  ভিডিও কনফারেন্সিং

Ø  ক্যাবল টেলিভিশন সম্প্রচার

Ø  ভিওআইপি (VOIP - voice over internet protocol) টেলিফোন

Ø  মিলিটারি সার্ভিস

Ø  সরকারি সেবাসমূহ

Ø  ডিজিটাল রেডিও


চিত্র ১১: স্যাটেলাইট থেকে VSAT নেটওয়ার্ক

 

 

গ্লোবাল পজিশানিং সার্ভিস (GPS) 

Ø  স্থান, অবস্থান, সময় নির্ণয় - বর্তমানে যে কোন আধুনিক যানবাহন চালনায় জিপিএস-এর সহায়তায় রাস্তার দিকনির্দেশনা ও ঠিকানা খুঁজে নেয়া খুবই সাধারণ ব্যাপার।

Ø  সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ - বিমান দুর্ঘটনা, জাহাজডুবি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ইত্যাদিতে যেখানে মানুষ যেতে পারে না সেখানে স্যাটেলাইটের সাহায্যে পৃথিবীর সব জায়গায় খুঁজে দেখা যায়।

Ø  জরিপের কাজে

Ø  ফ্লিট ম্যানেজমেন্ট (fleet management) -  সামুদ্রিক জাহাজের গতিবিধির ওপর নজর রাখা, উড়োজাহাজের গতিবিধির ওপর নজর রাখা থেকে শুরু করে রাস্তায় গাড়ির গতিবেগ নিয়ন্ত্রণ, ট্রাফিক কন্ট্রোল ইত্যাদি।

Ø  সামুদ্রিক জাহাজ, উড়োজাহাজ, দ্রুতগামী ট্রেন প্রভৃতিতে ইন্টারনেট, টেলিফোনসহ অন্যান্য ডাটা সার্ভিস।

Ø  সাবমেরিনের গতিপথ পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ

Ø  সামরিক ও গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক

Ø  স্বয়ংক্রিয় ড্রোনের ব্যবহার


চিত্র ১২: জিপিএস স্যাটেলাইটের সহায়তায় সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ মিশন

 

 

দূর অনুধাবন ও আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ

 

Ø  সুপারভাইজারি কন্ট্রোল অ্যান্ড ডাটা  অ্যাকুইজিশান (SCADA) - উচ্চপর্যায়ের নেটওয়ার্ক কন্ট্রোল।

Ø  পাইপলাইন মনিটরিং

Ø  অবকাঠামো পরিকল্পনা

Ø  দাবানল নিয়ন্ত্রণ

Ø  বন্যা, সাইক্লোন ইত্যাদি প্রাকৃতিক দুর্যোগের পূর্বাভাস ও পর্যবেক্ষণ

Ø  বায়ুদূষণ ব্যবস্থাপনা

Ø  কৃষি ও বনায়ন পর্যবেক্ষণ

Ø  পৃথিবীর জলবায়ুর পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ

Ø  ঘূর্ণিঝড় ও হারিক্যান অনুসরণ

Ø  আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ

Ø  সমুদ্রতলের উচ্চতা, লবণাক্ততা, ও জলজ শৈবালের হ্রাস-বৃদ্ধি পর্যবেক্ষণ


চিত্র ১৩: সাইক্লোনের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছে আবহাওয়া স্যাটেলাইট

 

মহাকাশে বর্তমানে সহস্রাধিক স্যাটেলাইট বিভিন্ন রকম কাজে নিয়োজিত। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ ও সংস্থা এই স্যাটেলাইটগুলোর মালিক। স্যাটেলাইটগুলো পরিচালনা করার জন্য কঠোর আন্তর্জাতিক নীতিমালা আছে। ইন্টারন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশান ইউনিয়ন বা আই-টি-ইউ স্যাটেলাইট নিয়ন্ত্রণের প্রধান সংস্থা। স্যাটেলাইটের কার্যক্রমগুলোকে আই-টি-ইউ কয়েকটি প্রধান ভাগে সংজ্ঞায়িত করেছে।

          আই-টি-ইউ'র সংজ্ঞা অনুযায়ী স্যাটেলাইটের প্রধান সেবাগুলো হলো:

  • ফিক্সড স্যাটেলাইট সার্ভিস (FSS)
  • ইন্টার-স্যাটেলাইট সার্ভিস (ISS)
  • ব্রডকাস্ট স্যাটেলাইট সার্ভিস (BSS)
  • ব্রডকাস্ট স্যাটেলাইট সার্ভিস ফর রেডিও (BSSR)
  • রেডিও ডিটারমিনেশান স্যাটেলাইট সার্ভিস (RDSS)
  • রেডিও ন্যাভিগেশান স্যাটেলাইট সার্ভিস (RNSS)
  • মোবাইল স্যাটেলাইট সার্ভিস (MSS)
  • অ্যারোনটিক্যাল মোবাইল স্যাটেলাইট সার্ভিস (AMSS)
  • ম্যারিটাইম মোবাইল স্যাটেলাইট সার্ভিস (MMSS)
  • ম্যারিটাইম রেডিও ন্যাভিগেশান স্যাটেলাইট সার্ভিস (MRNSS)
  • ল্যান্ড মোবাইল স্যাটেলাইট সার্ভিস (LMSS)
  • স্পেস অপারেশানস স্যাটেলাইট সার্ভিস (SOSS)
  • স্পেস রিসার্চ স্যাটেলাইট সার্ভিস (SRSS)
  • আর্থ এক্সপ্লোরেশান স্যাটেলাইট সার্ভিস (EESS)
  • অ্যামেচার স্যাটেলাইট সার্ভিস (ASS)
  • রেডিও অ্যাস্ট্রোনমি স্যাটেলাইট সার্ভিস (RASS)
  • স্ট্যান্ডার্ড ফ্রিকোয়েন্সি স্যাটেলাইট সার্ভিস (SFSS)
  • টাইম সিগনাল স্যাটেলাইট সার্ভিস (TSSS)

 

এই স্যাটেলাইট সার্ভিসগুলোর মধ্যে আমরা সাধারণ মানুষ যে তিনটি সার্ভিস সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করি সেগুলো হলো: (১) ফিক্সড স্যাটেলাইট সার্ভিস (২) ব্রডকাস্ট স্যাটেলাইট সার্ভিস, এবং (৩) মোবাইল স্যাটেলাইট সার্ভিস।

 

          ফিক্সড স্যাটেলাইট সার্ভিস: এই রেডিও কমিউনিকেশান সার্ভিস হলো পৃথিবীর নির্দিষ্ট আর্থ স্টেশন বা উপগ্রহ ভূ-কেন্দ্রের সাথে কমিউনিকেশান স্যাটেলাইটের মধ্যে যোগাযোগের মাধ্যমে যে সার্ভিস দেয়া হয়।[2]

 

চিত্র ১৪: ফিক্সড স্যাটেলাইট সার্ভিস

          

এই সার্ভিসগুলো আমরা সবসময়েই ব্যবহার করি। বাণিজ্যিকভাবে স্যাটেলাইটের ব্যবহার শুরু হয়েছিল এই ফিক্সড স্যাটেলাইট সার্ভিসের মাধ্যমে। আজ এই সার্ভিসের মাধ্যমে টেলিফোন, ফ্যাক্স, ডাটা সার্ভিস, অডিও-ভিডিও ডিস্ট্রিবিউশান, ভিডিও-কনফারেন্সিং ইত্যাদি করা হচ্ছে। ভি-ও-আই-পি এবং ব্রডব্যান্ড আই-পি ডাটা সার্ভিস সাপোর্ট করে ফিক্সড স্যাটেলাইট সার্ভিস। এর মাধ্যমে বড় বড় শহরের মধ্যে বা এক দেশ থেকে অন্য দেশের মধ্যে  ব্রডব্যান্ড ডাটা ট্রান্সমিশান সহজ হয়। ফিক্সড স্যাটেলাইট সার্ভিসের জন্য স্যাটেলাইটগুলো সাধারণত C-ব্যান্ড (৪ - ৬ গিগাহার্টজ), Ku-ব্যান্ড (১২ - ১৪ গিগাহার্টজ), এবং Ka-ব্যান্ডে (২০-৩০ গিগাহার্টজ) কাজ করে।

          টেলিভিশন স্টেশন থেকে সম্প্রচারিত অনুষ্ঠানগুলো ক্যাবল টেলিভিশন ডিস্ট্রিবিউশান সিস্টেমে পাঠানো হয় উচ্চ-ক্ষমতাসম্পন্ন ফিক্সড স্যাটেলাইট সার্ভিস সিস্টেমের মাধ্যমে। ক্যাবল টেলিভিশন সিস্টেমকে অনেক সময় ডি-টি-এইচ (DTH) বা 'ডিরেক্ট টু হোম' সার্ভিসও বলা হয়।

          ১৯৭৫ সালে HBO বা হোম বক্স অফিস সিস্টেম ফিক্সড স্যাটেলাইট সার্ভিস ব্যবহার করে মানুষের বাড়িতে বাড়িতে ক্যাবল টেলিভিশনের অনুষ্ঠান এবং সিনেমা সম্প্রচার শুরু করে। মানুষের বাড়ির ছাদে বড় বড় ডিশ অ্যান্টেনা বসানো শুরু হয় তখন। ইওরোপেও ক্যাবল টেলিভিশন এবং ডি-টি-এইচ শুরু হয়েছিল ফিক্সড স্যাটেলাইট সার্ভিসের মাধ্যমে।

          পৃথিবীর আনাচে-কানাচে টেলিকমিউনিকেশানের জন্য ফিক্সড স্যাটেলাইট সার্ভিস হলো সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা। পৃথিবীর যে সব জায়গায় টেলিকমিউনিকেশানের অবকাঠামো স্থাপন করা অসম্ভব, সেসব জায়গায় স্যাটেলাইটের মাধ্যমে সহজেই টেলিকমিউনিকেশান ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়। প্রত্যন্ত অঞ্চলে যেখানে খুব কম মানুষ থাকে - সেখানে মোবাইল ফোন টাওয়ার বসানো কিংবা অপটিক্যাল ফাইবার অথবা কো-অ্যাক্সিয়েল ক্যাবলের মাধ্যমে ডাটা ট্রান্সফার করা ভীষণ খরচসাপেক্ষ। সেসব জায়গায় ফিক্সড স্যাটেলাইট সার্ভিস খুবই উপযোগী। একইভাবে অনেক দেশের খুব ছোট ছোট দ্বীপে যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে।

          বিশেষ কোন অনুষ্ঠানের সরাসরি টেলিভিশন কভারেজের জন্য, কিংবা প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে টেলিভিশন সংবাদ ও অনুষ্ঠান সম্প্রচার করার জন্য ফিক্সড স্যাটেলাইট সার্ভিস সবচেয়ে উপযোগী।  

 

       ব্রডকাস্ট স্যাটেলাইট সার্ভিস: টেলিকমিউনিকেশান বা দূর-যোগাযোগের স্যাটেলাইটগুলোর সাহায্যে আজ আমাদের ঘরে ঘরে অসংখ্য টেলিভিশন চ্যানেলের অনুষ্ঠান দেখা যাচ্ছে। ডিরেক্ট টু হোম টেলিভিশন কিংবা ডিজিটাল রেডিও প্রভৃতি সম্প্রচারমূলক সেবাগুলোকে আই-টি-ইউ সংজ্ঞায়িত করেছে ব্রডকাস্ট স্যাটেলাইট সার্ভিস হিসেবে।

          এই রেডিও-কমিউনিকেশান সার্ভিসগুলো স্যাটেলাইট থেকে সরাসরি সাধারণ ব্যবহারকারীর কাছে চলে যায়। স্যাটেলাইট স্টেশন থেকে যে সিগনালগুলো সম্প্রচার করা হয় তা সরাসরি জনসাধারণের কাছে চলে যায়।[3] যেমন ব্রডকাস্ট স্যাটেলাইট সার্ভিস রেডিও -  স্যাটেলাইট থেকে সরাসরি বেতার তরঙ্গ প্রচার করে। স্যাটেলাইট ডিজিটাল রেডিও সার্ভিসও এই ধরনের সার্ভিস।

 

 

চিত্র ১৫: ব্রডকাস্ট স্যাটেলাইট সার্ভিস

      

মোবাইল স্যাটেলাইট সার্ভিস: এই রেডিও-কমিউনিকেশান সার্ভিসগুলো হলো এক বা একাধিক স্যাটেলাইটের সাথে পৃথিবীর মোবাইল বা চলমান স্টেশনগুলোর যোগাযোগ ব্যবস্থা, অথবা মহাকাশের চলমান স্পেস স্টেশনগুলোর একটির সাথে অন্যটির যোগাযোগ ব্যবস্থা।[4]

 

চিত্র ১৬: উড়োজাহাজে মোবাইল স্যাটেলাইট সার্ভিস

 

অনেক ধরনের মোবাইল স্যাটেলাইট সার্ভিস আছে - ল্যান্ড মোবাইল স্যাটেলাইট সার্ভিস, অ্যারোনটিক্যাল মোবাইল স্যাটেলাইট সার্ভিস, ম্যারিটাইম মোবাইল স্যাটেলাইট সার্ভিস ইত্যাদি। স্যাটেলাইট মোবাইল ফোন সার্ভিসগুলো এই সার্ভিসের অন্তর্ভুক্ত। বিমানের ইন-ফ্লাইট ইন্টারনেট বা মোবাইল ফোন সংযোগের জন্য মোবাইল স্যাটেলাইট সার্ভিস ব্যবহার করা হয়।

     বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ক্রমাগত উন্নতির সাথে সাথে স্যাটেলাইটের ব্যবহার ক্রমশ বাড়ছে। সেই সাথে বাড়ছে সেগুলোর অপব্যবহার নিয়ন্ত্রণের জন্য আই-টি-ইউ'র কার্যক্রম। এই বইয়ের তৃতীয় অধ্যায়ে আই-টি-ইউ'র কার্যক্রম সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।



[1] একই লাইন ব্যবহার করে অনেক গ্রাহককে এক সাথে ইন্টারনেট সংযোগ দেয়ার ব্যবস্থা।

[2] "A radio-communication service between earth stations at given positions, when one or more satellites are used; the given position may be a specified fixed point or any fixed point within specified areas; the fixed satellite service may also include feeder links for other space radio-communication services." - ITU Radio Regulations, Article 1, Definition of Radio Service, Section 1.21.

[3] "A radio-communication service in which signals transmitted or retransmitted by space stations are intended for direct reception by the general public. In the boradcasting -satellite service, the term "direct reception" shall encompass both individual reception and community reception." - ITU Radio Regulations, Article 1, Definition of Radio Service, Section 1.25.

[4] "A radio-communication service (a) between mobile earth stations and one or more space stations, or between space stations used by this service; or (b) between mobile earth stations by means of one or more space stations. " - ITU Radio Regulations, Article 1, Definition of Radio Service, Section 1.XX.


Wednesday, 3 March 2021

সবার জন্য স্যাটেলাইট - পর্ব ১

 



প্রথম অধ্যায়

স্যাটেলাইটের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

 

পৃথিবী এখন মানুষের হাতের মুঠোয়। পৃথিবীর কোথায় কী হচ্ছে তা ইচ্ছে করলে আমরা সরাসরি দেখতে পারি বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে। ইচ্ছে করলে ঘটনাস্থল থেকে যে কেউ ছবি তুলে বা ভিডিও করে মুহূর্তেই তা ছড়িয়ে দিতে পারে বিশ্বব্যাপী। পৃথিবীর যেখানে কোন মানুষের পক্ষে যাওয়া সম্ভব নয় সেখানে কী হচ্ছে তাও আমরা ঘরে বসেই দেখতে পারি স্যাটেলাইটের সাহায্যে। আমাজনের মতো বড় বড় প্রতিষ্ঠান এখন ড্রোনের মাধ্যমে মানুষের ঠিকানায় জিনিসপত্র পৌঁছে দিচ্ছে কোন মানুষ ছাড়াই। বারো হাজারের বেশি স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেল প্রতি মুহূর্তে যা সম্প্রচার করছে তা আমাদের টেলিভিশন সেটে এসে পৌঁছাবার আগে প্রায় ৮০ হাজার কিলোমিটার পথ ঘুরে আসে পৃথিবীর চারপাশে। পৃথিবীর যে কোন প্রান্তে বসে পৃথিবীর যে কোন জায়গার খবর যে আমরা পাচ্ছি তার কোন না কোন অংশ স্যাটেলাইটের মাধ্যমে প্রচারিত। পৃথিবীর পুরো যোগাযোগ ব্যবস্থা বদলে দিয়েছে স্যাটেলাইট। বর্তমান পৃথিবীর তথ্য আদান প্রদানের জন্য, মানুষের আধুনিক জীবনযাপনের জন্য যা কিছু দরকার হয় তার বেশিরভাগের সাথেই কোন না কোনভাবে স্যাটেলাইট জড়িত। গতিশীল পৃথিবীর গতিশীল মানুষকে সত্যিকারের আধুনিক করে দিয়েছে স্যাটেলাইট যোগাযোগ ব্যবস্থা।

          স্যাটেলাইট যোগাযোগ এখন একটি বিরাট শিল্প ও ব্যবসা। এর সাথে জড়িত আছে আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলো। কোটি কোটি ডলার এখন বিনিয়োগ করা হচ্ছে স্যাটেলাইট ইন্ডাস্ট্রিতে। বিভিন্ন দেশের সরকারি ও বেসরকারি অনেক প্রতিষ্ঠান এর সাথে জড়িত। এর জন্য তৈরি হয়েছে সুনির্দিষ্ট বিধিমালা। বাণিজ্যিক স্যাটেলাইটের পাশাপাশি শক্তিশালী দেশগুলো গড়ে তুলছে আধুনিক থেকে অত্যাধুনিক প্রতিরক্ষা স্যাটেলাইট। বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য আছে বিভিন্ন ধরনের অত্যন্ত শক্তিশালী স্যাটেলাইট। মানুষ মহাকাশে স্থাপন করেছে স্পেস স্টেশান।

          পৃথিবীর বাইরে স্যাটেলাইট স্থাপন করার ধারণা তৈরি হতে মানুষের লেগেছে কয়েক হাজার বছর। আমাদের সৌরজগতের গ্রহগুলো এবং তাদের উপগ্রহগুলোর গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে সঠিক ধারণা পাওয়ার আগপর্যন্ত মানুষের পক্ষে কৃত্রিম উপগ্রহ বা স্যাটেলাইট সম্পর্কে ভাবার কোন উপায় ছিল না। পৃথিবী সূর্যের চারপাশে ঘুরে, আবার চাঁদ পৃথিবীর চারপাশে ঘুরে - মহাকাশের গ্রহ উপগ্রহগুলোর এসব তথ্য জানার পরেই মানুষ পৃথিবীর বাইরে থেকে পৃথিবীকে পর্যবেক্ষণ করার কথা ভাবতে পেরেছে। চলুন দেখি এই ভাবনাগুলো কীভাবে বিবর্তিত হয়ে আধুনিক রূপ ধারণ করেছে।

          প্রায় ২৪০০ বছর আগে গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিস বলেছিলেন, "মানুষ যদি বায়ুমন্ডল ভেদ করে আরো অনেক উপরে উঠে পৃথিবীকে ভালোভাবে দেখতে পারে, তবেই পৃথিবীকে ভালোভাবে বুঝতে পারবে।"

          গ্রিক দার্শনিকরা পৃথিবীর বাইরে গিয়ে পৃথিবীকে দেখার প্রয়োজনীয়তা তথা মহাকাশ পরিক্রমার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলেও খালি চোখে আকাশ দেখা ছাড়া সে ব্যাপারে তেমন বেশি কিছু করতে পারেননি পরবর্তী দুই হাজার বছর। তারপর দৃশ্যপট দ্রুত বদলে যায় যখন ইতালিয়ান বিজ্ঞানী গ্যালিলিও আকাশের দিকে টেলিস্কোপ তাক করলেন।

          ১৬১০ সালে গ্যালিলিও তাঁর নিজের তৈরি টেলিস্কোপ দিয়ে বৃহস্পতি গ্রহের চারপাশে ঘূর্ণনরত চারটি উপগ্রহ আবিষ্কার করলেন। তাঁর টেলিস্কোপটি আরেকটু উন্নত হলে তিনি দেখতে পেতেন বৃহস্পতি গ্রহের আরো অনেকগুলো উপগ্রহ আছে। বৃহস্পতি গ্রহের চাঁদগুলোর গতিপথ দেখার পর গ্যালিলিওর মনে হলো এই উপগ্রহগুলো যেন তাদের মনিব-গ্রহের আদেশে একটি কক্ষপথে থেকে চাকরের মতো ঘুরছে মনিবের চার পাশে। ল্যাটিন ভাষায় তিনি উপগ্রহগুলোর নাম দিলেন 'satelles' (স্যাটেলিস) - যার অর্থ হলো servant বা চাকর। satelles থেকে ইংরেজিতে স্যাটেলাইট (satellite) কথাটি এসেছে।

          আজ মানুষের হাতে ল্যাবোরেটরিতে বানানো এই স্যাটেলাইটগুলো মানুষের যান্ত্রিক চাকর ছাড়া আর কিছুই নয়। মানুষ এদেরকে বানায় তাদের কাজে লাগানোর জন্য। যোগাযোগ (communication), সম্প্রচার (broadcasting), দূর অনুধাবন (remote sensing), মহাকাশ পরিক্রমণ (space navigation), আবহাওয়াবিদ্যা (meteorology), বৈজ্ঞানিক গবেষণা - ইত্যাদি নানারকম কাজের জন্য এখন নানারকম স্যাটেলাইট তৈরি করে মহাকাশে পাঠাচ্ছে মানুষ। কিন্তু সেটা শুরু হয়েছে বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় থেকে।

 

 

চিত্র ১: গ্যালিলিও টেলিস্কোপের সাহায্যে বৃহস্পতির চারটি উপগ্রহ আবিষ্কার করেন

 

গ্যালিলিও স্যাটেলাইট শব্দের প্রচলন করলেও তিনি কিন্তু তখনো জানতেন না মহাকাশের নক্ষত্র, এবং গ্রহ-উপগ্রহগুলো কিসের টানে ঘুরছে। অর্থাৎ মাধ্যাকর্ষণ বল সম্পর্কে তখনো কোন ধারণাই ছিল না কারো।

          গ্যালিলিওর বৃহস্পতির স্যাটেলাইট আবিষ্কারের প্রায় আশি বছর পরে ১৬৮৭ সালে স্যার আইজাক নিউটন মাধ্যাকর্ষণ বল এবং তার সূত্র আবিষ্কার করেন। নিউটনের কিছু আগে জোহানেস কেপলার গ্রহগুলোর গতিপথ ব্যাখ্যা করে তিনটি সূত্র প্রকাশ করেছিলেন। কপার্নিকাস সৌরজগতের গ্রহ ও উপগ্রহগুলোর গতিপথের গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। নিউটন সেগুলোকেও কাজে লাগিয়ে তাঁর  প্রিঙ্কিপিয়া ম্যাথাম্যাটিকা (Principia Mathematica) বইতে ব্যাখ্যা করেছেন মাধ্যাকর্ষণ বলের কারণে কীভাবে বস্তু পৃথিবীর কেন্দ্রের দিকে আকৃষ্ট হয়। কোন কিছু উপরে ছুঁড়ে দিলে তা ভূমিতে ফিরে আসে। কিন্তু কত বেগে ছুড়লে কোন বস্তু পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণের টান অতিক্রম করে চলে যাবে তার হিসেবও তিনি প্রকাশ করেছিলেন একটি উদাহরণের মাধ্যমে।

          নিউটন একটি কাল্পনিক পরীক্ষণের (thought experiment) বর্ণনা দিয়েছিলেন। অনেক উঁচু একটি পাহাড়ের উপর থেকে যদি কামানের গোলা নিক্ষেপ করা হয় তবে গতির প্রথম সূত্র অনুযায়ী গোলাটির সোজাপথে সমান বেগে চলে যাওয়ার কথা। কিন্তু মাধ্যাকর্ষণের ফলে গোলাটি পৃথিবীর কেন্দ্রের দিকে আকৃষ্ট হয়ে পাহাড়ের কাছাকাছি মাটিতে পড়ে যাবে (চিত্র ২: A)।

 

 

চিত্র ২: নিউটনের ক্যানন-বল পরীক্ষা

 

এখন গোলাটির বেগ যদি আরেকটু বাড়ানো হয়, তখন দেখা যাবে গোলাটি আরেকটু দূরে গিয়ে পড়ছে (চিত্র ২: B)। এভাবে কামানের গোলার বেগ বাড়াতে বাড়াতে এমন একটা পর্যায় আসবে যখন গোলাটি পৃথিবী থেকে অনেক উপরে গিয়ে মাধ্যাকর্ষণের টানে পৃথিবীর চারপাশে বৃত্তাকার পথে ঘুরতে থাকবে, কিন্তু পৃথিবীতে আর ফিরে আসবে না (চিত্র ২: C)। এই বৃত্তাকার কক্ষপথটিই হলো আমাদের ভূ-স্থির কক্ষপথ বা Geostationary orbit। এই অরবিট বা কক্ষপথ সম্পর্কে পঞ্চম অধ্যায়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। কামানের গোলার বেগ যদি আরো বাড়ানো হয় দেখা যাবে গোলাটি পৃথিবী থেকে আরো দূরে গিয়ে পৃথিবীর চারপাশে ঘুরতে থাকবে (চিত্র ২: D)। পৃথিবী থেকে স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের মূল ধারণাটি আমরা এখান থেকেই পেয়েছি। কিন্তু তা আসলে ঘটার আগে ঘটেছে বিভিন্ন কল্পবিজ্ঞানে লেখকের কল্পনায়।

          বাস্তব স্যাটেলাইট তৈরির আগেই আমরা কাল্পনিক স্যাটেলাইট সম্পর্কে জেনেছি science fiction বা বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি থেকে। উনবিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগে বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনির মূল বিষয় ছিল পৃথিবীর মানুষের মহাকাশে অভিযান। ১৮৬৩ সালে ফরাসি নাট্যকার আকিলে ইরাউদ (Achille Eyraud) লিখলেন 'ভয়েজ টু ভেনাস' (Voyage to Venus), ১৮৬৫ সালে আরেকজন ফরাসি লেখক জুল ভার্ন (Jules Verne) লিখলেন 'ফ্রম আর্থ টু মুন' (From Earth to Moon), ১৮৬৯ সালে আমেরিকান লেখক এডোয়ার্ড হেইল (Edward Everette Hale) লিখলেন 'দি ব্রিক মুন' (The Brick Moon), ১৮৯৭ সালে ইংরেজ লেখক হার্বাট জর্জ ওয়েলস (এইচ জি ওয়েলস) লিখলেন 'দি ফার্স্ট মেন ইন দি মুন' (The First Men in the Moon)।

 

চিত্র ৩: বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনিতে স্যাটেলাইটের কথা

 

সবগুলো বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনিতেই মানুষের মহাশূন্যে - বিশেষ করে চাঁদে অভিযানের কথা থাকলেও এডোয়ার্ড হেইলের দি ব্রিক মুনে যে স্যাটেলাইট যোগাযোগের বর্ণনা ছিল তার সাথে বর্তমান স্যাটেলাইট যোগাযোগের অনেক মিল আছে। তাঁর বইয়ের ঘটনায় একটি কৃত্রিম চাঁদ পৃথিবীর পোলার অরবিটে (polar orbit) স্থাপন করা হয় পৃথিবীর আবহাওয়া ও অন্যান্য বিষয়ের দিকে নজর রাখার জন্য। যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে স্যাটেলাইটকে কাজে লাগানোর এমন চমৎকার ধারণা এর আগে পাওয়া যায়নি। হেইলের বইতে পোলার অরবিটে স্থাপিত স্যাটেলাইটটি ছিল ইটের তৈরি। ১৭ জন পুরুষ ও ২ জন মহিলা ছিল সেই স্যাটেলাইটে। পৃথিবীর সাথে যোগাযোগের জন্য তারা মোর্স কোড ব্যবহার করতেন। এখন আমাদের ইলেকট্রনিক প্রযুক্তি আছে। মানুষবিহীন স্যাটেলাইটে আমাদের মোর্স কোড ব্যবহার করতে হয় না। কিন্তু মূল ধারণার জন্য কল্পবিজ্ঞানের অবদানকে আমরা কিছুতেই অস্বীকার করতে পারি না।

          বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকেই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির স্বর্ণযুগ শুরু হয়ে গিয়েছিল। নিউটনের গতিসূত্র এবং মাধ্যাকর্ষণ বলের সূত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তারও কয়েক শ' বছর আগে। কোয়ান্টাম মেকানিক্স ও আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার সূত্র আমাদের মহাকাশ অভিযানের সমস্ত হিসেবনিকাশ নিখুঁত করে তুলতে সাহায্য করেছে। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে (১৯০৩) উড়োজাহাজ উদ্ভাবিত হয়ে গেছে। উড়োজাহাজ চলে বাতাসের প্রবাহকে কাজে লাগিয়ে। বায়ুমন্ডলের খুব বেশি উপরে উড়োজাহাজ উঠে না। কিন্তু মহাকাশের গ্রহ উপগ্রহগুলোতে যেতে হলে পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ অতিক্রম করে যেতে হবে। তার জন্য অত্যন্ত উচ্চগতিসম্পন্ন আকাশযানের দরকার। উচ্চগতিসম্পন্ন রকেটের সম্ভাবনা নিয়ে সর্বপ্রথম গবেষণা করেছিলেন রাশিয়ান বিজ্ঞানী কনস্টান্টিন জিওল্কভস্কি (konstantin Tsiolkovsky)।

 

চিত্র ৪:  রাশিয়ান বিজ্ঞানী কনস্টান্টিন জিওল্কভস্কি

 

কনস্টান্টিন জিওল্কভস্কি ছিলেন রাশিয়ার একটি স্কুলের বিজ্ঞান শিক্ষক। তেমন কোন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তাঁর ছিল না। নিজে নিজে শিখেছিলেন পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, গণিত। শেষের দিকে কানেও শুনতে পেতেন না তিনি। ১৮৯৫ সাল থেকেই তিনি গবেষণা শুরু করেছিলেন মহাকাশে কীভাবে রকেট পাঠানো যায় সে ব্যাপারে। হিসেব নিকেশ করে বের করেছিলেন পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ বল অতিক্রম করে যেতে রকেটের মুক্তিবেগ (escape velocity) হতে হবে সেকেন্ডে প্রায় ৮ কিলোমিটার। [মুক্তিবেগ হিসেব করার পদ্ধতি দেখানো হয়েছে চতুর্থ অধ্যায়ে]। মহাকাশযান পাঠানোর জন্য কতটুকু জ্বালানি লাগবে তার তত্ত্বীয় হিসেবও অনেকটুকু করে ফেলেছিলেন কনস্টান্টিন জিওল্কভস্কি।

 

চিত্র ৫: আমেরিকান বিজ্ঞানী রবার্ট গডার্ড

 

অন্যদিকে আমেরিকান পদার্থবিজ্ঞানী রবার্ট গডার্ড পরীক্ষানিরীক্ষা শুরু করেছিলেন মহাকাশে রকেট উৎক্ষেপণের বৈজ্ঞানিক সম্ভাবনা সম্পর্কে। শুরুতে তাঁর কার্যকলাপকে সবাই পাগলামী ভেবে হাসাহাসি করেছিল। কিন্তু ১৯২৬ সালের ১৬ মার্চ তিনি সফলভাবে পৃথিবীর সর্বপ্রথম মডেল রকেট উৎক্ষেপণ করেছিলেন। ১৯২৬ থেকে ১৯৪১ সালের মধ্যে প্রফেসর গডার্ড ৩৪টি বিভিন্ন ধরনের রকেট উৎক্ষেপণ করেছিলেন। সেই রকেটগুলোর কোন কোনটা সর্বোচ্চ ২.৬ কিলোমিটার পর্যন্ত উঁচুতে উঠেছিল এবং ঘন্টায় ৮৮৫ কিলোমিটার পর্যন্ত বেগপ্রাপ্ত হয়েছিল। ধরতে গেলে রবার্ট গডার্ডের হাতেই রকেট প্রযুক্তির গোড়াপত্তন হয়েছিল। এই রকেট ছাড়া মহাকাশে স্যাটেলাইট স্থাপন করা অসম্ভব।

          রকেট সায়েন্সে প্রফেসর গডার্ডের আবিষ্কারের ২১৪টি মেধাস্বত্ব থাকা সত্বেও জীবদ্দশায় তিনি খুব একটা পাত্তা পাননি। সবার কাছে উপেক্ষিত হয়ে তিনি নিজেকে খুব গুটিয়ে নিয়েছিলেন। নিজের গবেষণা সম্পর্কে কাউকে কিছু বলতেনও না। অথচ তাঁর মৃত্যুর পর সবাই মেনে নিতে বাধ্য হন যে তাঁর আবিষ্কৃত মাল্টিস্টেজ রকেট ও তরল-জ্বালানির রকেটই পথ দেখিয়েছে আধুনিক রকেট বিজ্ঞানের। তাঁর ১৯১৯ সালে লেখা বই A Method of Reaching Extreme Altitudes রকেট সায়েন্সের ক্ল্যাসিক বই হিসেবে স্বীকৃতি পায়।  

          দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হিটলার পৃথিবীজুড়ে তান্ডব চালিয়েছে। শুধুমাত্র যুদ্ধে জেতার জন্য বিজ্ঞানীদের বাধ্য করেছে নতুন নতুন বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি আবিষ্কার করতে। আকাশপথে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের জন্য সেই সময় জার্মান বিজ্ঞানীরা রকেট সায়েন্সে অনেকদূর অগ্রসর হয়। যুদ্ধের পর সেই সব বিজ্ঞানীদের একটি দলকে নিয়ে যায় আমেরিকা। আমেরিকান রকেট সায়েন্সে তাঁরা অবদান রাখতে শুরু করে। এদিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন নিয়ে যায় আরেকটি দলকে। শুরু হয় আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে ঠান্ডাযুদ্ধ। বৈজ্ঞানিক শক্তিমত্তা প্রদর্শনের একটি প্রধান ক্ষেত্র হয়ে ওঠে মহাকাশ।

 

চিত্র ৬: স্যার আর্থার সি ক্লার্ক

 

১৯৪৫ সালে স্যার আর্থার সি ক্লার্ক (Arthur C Clarke) কমিউনিকেশান স্যাটেলাইটের ধারণা দেন একটি বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি ছিলেন ব্রিটিশ রাডার কেন্দ্রের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা। তখন থেকেই তিনি মহাকাশের জিওসিন্‌ক্রোনাস অরবিট (Geosynchronous orbit) বা ভূ-সমন্বিত কক্ষপথে যোগাযোগ উপগ্রহ বা কমিউনিকেশান স্যাটেলাইট স্থাপন করলে কী কী সুবিধা হবে সে ব্যাপারে গবেষণা করছিলেন। ১৯৪৫ সালের জুন মাসে তিনি একটা চিঠিতে এ ব্যাপারে বিস্তারিত লিখে জানান তাঁর সহকর্মীদের। এর চার মাস পরে অক্টোবর মাসে তিনি Wireless World জার্নালে দীর্ঘ প্রবন্ধ লেখেন। যোগাযোগ উপগ্রহের উপযোগিতা, কীভাবে তা কক্ষপথে পাঠানো হবে, সেখান থেকে কীভাবে পৃথিবীর সাথে যোগাযোগ রক্ষা করা হবে ইত্যাদি সব বিস্তারিত ভাবে প্রকাশ করেন সেই প্রবন্ধে। কিন্তু সেই সময় তাঁর প্রবন্ধটি কারো কাছেই তেমন কোন গুরুত্ব পায়নি।

          স্যার আর্থার ক্লার্ক ৯০ বছর বেঁচেছিলেন। তিনি দেখে যেতে পেরেছিলেন তাঁর বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং কল্পকাহিনিতে বর্ণিত মহাকাশের স্যাটেলাইট যোগাযোগ ব্যবস্থা কীভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে। তাঁর সম্মানে মহাকাশের ভূ-স্থির কক্ষপথের (Geostationary orbit) নাম রাখা হয়েছে ক্লার্ক অরবিট।

 

চিত্র ৭: পৃথিবীর প্রথম স্যাটেলাইট স্পুটনিক-১

         

সত্যিকারের মহাকাশ যুগের শুরু হয় ১৯৫৭ সালের ৭ অক্টোবর। সেদিন সোভিয়েত ইউনিয়নের বিজ্ঞানীদের তৈরি পৃথিবীর প্রথম স্যাটেলাইট স্পুটনিক-১ (Sputnik-1) সফলভাবে মহাকাশে উৎক্ষেপণ করা হয় এবং কক্ষপথে স্থাপন করা হয়।

          অনেক বছর থেকেই আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়ন আলাদা আলাদাভাবে চেষ্টা করে যাচ্ছিলো স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের। সোভিয়েত ইউনিয়নের স্পুটনিক-১ এর সাফল্যে আমেরিকা ভীষণ ঈর্ষান্বিত হয়ে ওঠে এবং মরিয়া হয়ে ওঠে সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে পাল্লা দিয়ে মহাকাশে আধিপত্য বিস্তার করতে। মহাকাশ গবেষণার কাজে গতি আনার জন্য ১৯৫৮ সালে আমেরিকান কংগ্রেসে নতুন আইন পাস করা হয় এবং গঠিত হয় National Aeronautical and Space Administration সংক্ষেপে NASA.

            পরবর্তী চার মাসে সোভিয়েত ইউনিয়ন আরো উন্নত এবং আরো বড় কয়েকটি স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করতে সফল হয়। কিন্তু আমেরিকা বার বার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হতে থাকে। শেষ পর্যন্ত ১৯৫৮ সালের ১ ফেব্রুয়ারি আমেরিকা তাদের প্রথম স্যাটেলাইট এক্সপ্লোরার-১ (Explorer-1) উৎক্ষেপণ করতে সক্ষম হয়।

 

চিত্র ৮: আমেরিকার প্রথম স্যাটেলাইট এক্সপ্লোরার-১

         

মনে হতে পারে যে প্রথম দিকের স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণে আমেরিকা যতবার ব্যর্থ হয়েছে সোভিয়েত ইউনিয়ন ততবার ব্যর্থ হয়নি। কিন্তু আসলে ব্যাপারটা সেরকম নয়। সেই সময় সোভিয়েত ইউনিয়নে প্রচারমাধ্যমের স্বাধীনতা ছিল না। সরকারিভাবে যতটুকু জানতে দেয়া হতো তার বাইরে সোভিয়েত ইউনিয়ন সম্পর্কে তেমন কিছুই জানতে পারতো না বহির্বিশ্ব। সোভিয়েত ইউনিয়ন তাদের ব্যর্থতার কোন খবরই প্রচার করতে দিতো না। অন্যদিকে আমেরিকায় প্রচারমাধ্যমের স্বাধীনতার কারণে তাদের সাফল্য কিংবা ব্যর্থতা সবই জানতে পারতো সারা পৃথিবী। যে কোন গবেষণা এবং বৈজ্ঞানিক প্রকল্পে সাফল্য এবং ব্যর্থতা দুটোই আছে। মহাকাশ গবেষণাও এর ব্যতিক্রম নয়। তবে এটা আমাদের স্বীকার করতেই হবে যে সেই সময় আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে ঠান্ডাযুদ্ধের ফলে মহাকাশবিজ্ঞানের অনেক উন্নতি হয়েছে।

 

চিত্র ৯: প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে ভাষণ দিচ্ছেন

         

১৯৬০ সালে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জন এফ কেনেডির প্রধান নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে মহাকাশ প্রতিযোগিতায় জেতা। নির্বাচনে জেতার পর প্রেসিডেন্ট কেনেডি ঘোষণা করেছিলেন ষাটের দশক শেষ হবার আগেই চাঁদে মানুষ পাঠাতে সক্ষম হবে আমেরিকা । সারাপৃথিবীতে ছড়িয়ে গিয়েছিল সেই উন্মাদনা। মানুষের চাঁদে অভিযানের আয়োজন, প্রস্তুতি এবং সাফল্য ছিল বিংশ শতাব্দীর ষাটের দশকের সবচেয়ে বড় বৈজ্ঞানিক ঘটনা।[1]

          প্রেসিডেন্ট কেনেডি সেই সময় পুরো পৃথিবীর জন্য একটি গ্লোবাল কমিউনিকেশান স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার ব্যাপারেও গুরুত্ব দিয়েছিলেন। ১৯৬১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে পৃথিবীর সব দেশের সব মানুষের জন্য স্যাটেলাইটের মাধ্যমে যোগাযোগের অধিকার নিশ্চিত করার ব্যাপারে উদ্যোগ নিতে জাতিসংঘকে আহ্বান জানিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট কেনেডি। ফলে জাতিসংঘ পৃথিবীর সব দেশের জন্য স্যাটেলাইট যোগাযোগের নিশ্চয়তা বিধান করে রেজ্যুলেশন পাস করে। জাতিসংঘের রেজ্যুলেশন ১৭২১ এর সেকশান-পি সবার জন্য স্যাটেলাইট যোগাযোগের নিশ্চয়তা বিধান করেছে: "communications by means of satellite should be available to the millions of the world as soon as possible on a global and non-discriminatory basis".[2]

          আমেরিকান কংগ্রেস 'কমিউনিকেশন স্যাটেলাইট অ্যাক্ট ১৯৬২' পাস করার পর আমেরিকান স্যাটেলাইট করপোরেশন কমস্যাট (Comsat) গঠিত হয়। এর দু'বছর পরেই ১৯৬৪ সালে আমেরিকার নেতৃত্বে গঠিত হয় আন্তর্জাতিক টেলিকমিউনিকেশান্স স্যাটেলাইট কনসোর্টিয়াম ইন্টেলস্যাট (Intelsat)। শুরুতে আমেরিকান বলয়ের মাত্র কয়েকটি দেশ - আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, জাপান এবং ইওরোপের দেশগুলো ইন্টেলস্যাটের সদস্য ছিল। পরে বিশ্বের শতাধিক দেশ  ইন্টেলস্যাটের সদস্য হয়।

          এদিকে সোভিয়েত শিবিরও বসে ছিল না। পরবর্তী সাত বছরের মধ্যে তারাও সমাজতান্ত্রিক বলয়ের আটটি দেশ - বুলগেরিয়া, কিউবা, চেকোস্লোভাকিয়া, পূর্ব জার্মানি, হাঙ্গেরি, মঙ্গোলিয়া, পোলান্ড এবং রুমানিয়াকে সাথে নিয়ে গঠন করে 'ইন্টারস্পুটনিক ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশান অব স্পেস কমিউনিকেশান্স, সংক্ষেপে 'ইন্টারস্পুটনিক' (Intersputnik)।[3]

     স্যাটেলাইটের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি যত উন্নত হয়েছে, স্যাটেলাইটের বাণিজ্যিক সম্ভাবনাও ততই বেড়ে গেছে। এই বাণিজ্যের অধিকার যাতে কোন দেশের একচেটিয়া হয়ে না পড়ে সেই লক্ষ্যে মহাকাশের স্যাটেলাইট যোগাযোগের জন্য বেশ জটিল এবং কঠোর নিয়মনীতি তৈরি করা হয় ইন্টারন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন্স ইউনিয়নের উদ্যোগে। পৃথিবীব্যাপী বেতার তরঙ্গের মাধ্যমে যত ধরনের যোগযোগ ব্যবস্থা চালু হয়েছে তার সবগুলোর আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রক সংস্থা হলো ইন্টারন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন্স ইউনিয়ন বা আই-টি-ইউ (ITU)। বেতার তরঙ্গ বন্টন থেকে শুরু করে মহাকাশে স্যাটেলাইটের স্থান নির্ধারণ পর্যন্ত সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে আই-টি-ইউ। এই বইয়ের তৃতীয় অধ্যায়ে আই-টি-ইউ সম্পর্কে  বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।



[1] মানুষের চাঁদে অভিযান সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে ইচ্ছে হলে পড়তে পারেন মীরা প্রকাশন থেকে প্রকাশিত আমার 'চাঁদের নাম লুনা'।

[2] United nations General Assembly Resolution of Satellite Communications 1961.

[3] এই ইন্টারস্পুটনিকের কাছ থেকে বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইটের জন্য কক্ষপথের স্থান ভাড়া নেয়া হয়েছে।


Latest Post

চিকিৎসাবিজ্ঞানে যান্ত্রিক বুদ্ধিমত্তা

  ধীরে ধীরে চোখের আলো নিভে আসছিলো রিস হিবার্টের। পৃথিবীর আলো দেখার আশা ছেড়েই দিতে হয়েছিল তাঁকে। দু’বছর আগেও বেশ সুস্থ স্বাভাবিক ছিলেন তিনি। ...

Popular Posts