Monday 8 March 2021

সবার জন্য স্যাটেলাইট - পর্ব ২

 



দ্বিতীয় অধ্যায়

স্যাটেলাইট যুগ 

বর্তমান যুগ স্যাটেলাইট যুগ। যখন থেকে আমরা আমাদের দৈনন্দিন কাজের সুবিধার জন্য স্যাটেলাইটের ব্যবহার শুরু করেছি তখন থেকেই শুরু হয়েছে স্যাটেলাইট যুগ। সারাপৃথিবীর সাথে আমাদের যে যোগাযোগের মাধ্যম - সেই দূরযোগযোগ বা টেলিকমিউনিকেশানের জন্য আজ আমরা ধরতে গেলে পুরোপুরি স্যাটেলাইটের উপর নির্ভরশীল। এই যে ২০১৮ সালের বিশ্বকাপ ফুটবলের সবগুলো ম্যাচ আমরা বাংলাদেশে বসে রাশিয়ার স্টেডিয়াম থেকে সরাসরি দেখতে পেয়েছি সেটা সম্ভব হয়েছে স্যাটেলাইটের কারণে। ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানার কয়েকদিন আগে থেকেই আমরা জানতে পারছি, প্রস্তুতি নিতে পারছি, সময়মতো ব্যবস্থা নিয়ে প্রাণহানি ও সম্পদহানি কমাতে পারছি - তার মূলে আছে আবহাওয়া স্যাটেলাইট। বৈজ্ঞানিক গবেষণার স্যাটেলাইটগুলো সারাক্ষণ তথ্য সংগ্রহ করছে পৃথিবী ও পৃথিবীর বাইরে মহাকাশ থেকে। আমরা জানতে পারছি মহাবিশ্বের কোথায় কী হচ্ছে। পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ সম্পদ সংগ্রহে কাজে লাগানো হচ্ছে স্যাটেলাইটকে। খনির দুর্ঘটনায় বা ভূমিকম্পের ধ্বংসস্তূপের ভেতর কেউ জীবিত আছে কি না তা জানার জন্য স্যাটেলাইটের সাহায্য নেয়া হচ্ছে। এখন উড়োজাহাজে বসেও টেলিফোন ও ইন্টারনেট সংযোগ পাওয়া যাচ্ছে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে। সত্যিকারের স্যাটেলাইট যুগে বাস করছি আমরা।

          এই অধ্যায়ে আমরা দেখবো কী কী ধরনের স্যাটেলাইট আছে এবং তাদের প্রধান কাজ কী কী।

          পৃথিবী থেকে মহাকাশে পাঠানো কৃত্রিম উপগ্রহ বা স্যাটেলাইটগুলোকে প্রধানত দুইটি শ্রেণিতে ভাগ করা যায়:

 

          (১) বৈজ্ঞানিক স্যাটেলাইট (Scientific Satellite) ও

          (২) ব্যবহারিক স্যাটেলাইট (Application Satellite)।

         

 

বৈজ্ঞানিক স্যাটেলাইট

 

বৈজ্ঞানিক স্যাটেলাইটগুলোর প্রধান কাজ হলো মহাবিশ্ব সম্পর্কে  আমাদের নতুন জ্ঞানের সন্ধান দেয়া। আমাদের পৃথিবী, সৌরজগৎ, গ্যালাক্সির দিকে চোখ রাখছে বৈজ্ঞানিক স্যাটেলাইটগুলো মহাকাশে ভাসতে ভাসতে। মহাজাগতিক বিকিরণ থেকে শুরু করে ব্ল্যাক-হোল ও গ্যালাক্সির উৎপত্তি সম্পর্কে নতুন উপাত্ত সংগ্রহ করছে স্যাটেলাইটগুলো। পৃথিবীর গতিপথ ও টেকটোনিক প্লেটগুলোর গতিবিধির ওপর নজর রাখছে বৈজ্ঞানিক স্যাটেলাইটগুলো। মহাকাশের গ্যালাক্সি, নক্ষত্র, গ্রহ-উপগ্রহগুলোর কাজকর্মের ওপর নিয়মিত নজরদারি করছে আমাদের বৈজ্ঞানিক স্যাটেলাইটগুলো। পৃথিবী থেকে সৌরজগতের সবগুলো গ্রহে পাঠানো হয়েছে বিভিন্ন আকারের ও বিভিন্ন প্রকৃতির বৈজ্ঞানিক স্যাটেলাইট। সেই স্যাটেলাইটগুলো যে উপাত্ত পাঠিয়েছে সেখান থেকেই আমরা জানতে পেরেছি সেই গ্রহ কিংবা উপগ্রহ সম্পর্কে। মহাকাশ স্টেশনগুলো বিরাট আকৃতির বৈজ্ঞানিক স্যাটেলাইট। বৈজ্ঞানিক স্যাটেলাইটগুলো থেকে প্রাপ্ত সিগনাল বা উপাত্তগুলোকে আমরা সাধারণ মানুষ সরাসরি ব্যবহার করতে পারি না বলেই সেগুলোকে আমরা ব্যবহারিক স্যাটেলাইট বা অ্যাপ্লিকেশান স্যাটেলাইট বলছি না।

          এবার কয়েকটি বৈজ্ঞানিক স্যাটেলাইট সম্পর্কে আলোচনা করা যাক।

 

স্পুটনিক-২

 

সোভিয়েত ইউনিয়ন বিশ্বের প্রথম স্যাটেলাইট স্পুটনিক-১ মহাশূন্যে পাঠিয়েছিল। কিন্তু স্পুটনিক-১ ছিল মূলত একটি সামরিক বার্তাবাহী স্যাটেলাইট। সোভিয়েত ইউনিয়নের সামরিক শক্তি আমেরিকার সামরিক শক্তির চেয়েও অগ্রসর - এই বার্তা দেয়ার জন্যই স্পুটনিক-১ পাঠানো হয়েছিল। স্পুটনিক-১ পাঠানোর এক মাসের মধ্যেই ১৯৫৭ সালের ৩ নভেম্বর সোভিয়েত ইউনিয়ন তাদের দ্বিতীয় স্যাটেলাইট স্পুটনিক-২ মহাকাশে পাঠায়। স্পুটনিক-২কে বলা চলে পৃথিবীর প্রথম বৈজ্ঞানিক স্যাটেলাইট।

 

চিত্র ১০: সোভিয়েত ইউনিয়নের দ্বিতীয় স্যাটেলাইট স্পুটনিক-২

          

স্পুটনিক-২ ছিল বিশ্বের প্রথম স্যাটেলাইট যার মাধ্যমে মহাশূন্যে জীবন্ত প্রাণী পাঠানো হয়েছিল। উৎক্ষেপণের সময় এই স্যাটেলাইটের ভর ছিল ৫০৮ কেজি। ১.২ মিটার লম্বা এই স্যাটেলাইটের একটি প্রকোষ্টে একটি কুকুর (নাম লাইকা) রাখার ব্যবস্থা ছিল। লাইকার শরীরে ইলেকট্রোড লাগানো ছিল যেন মহাকাশে ওজনহীনতা ও অন্যান্য অনুষঙ্গের পরিবর্তনের ফলে প্রাণীর শরীরে কী কী পরিবর্তন হয় তা পর্যবেক্ষণ করার জন্য। এই স্যাটেলাইটের বৈজ্ঞানিক উদ্দেশ্য ছিল ভবিষ্যতে মহাকাশে মানুষ পাঠাতে হলে কী কী প্রস্তুতি নিতে হবে সে সংক্রান্ত জ্ঞান আহরণ। এর যন্ত্রপাতির মধ্যে ছিল গেইগার-মুলার কাউন্টার - যার সাহায্যে মহাজাগতিক তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা মাপা যায়, এবং দুটো আলট্রা-ভায়োলেট ও এক্স-রে স্পেকট্রা-ফটোমিটার।

          স্পুটনিক-২ এর কক্ষপথ ছিল উপবৃত্তাকার। যার কাছের বিন্দুর দূরত্ব ছিল পৃথিবী থেকে ২২৫ কিলোমিটার, আর সবচেয়ে দূরের বিন্দুর দূরত্ব ছিল ১৬৭১ কিলোমিটার। পৃথিবীর চারপাশে একবার ঘুরে আসতে স্পুটনিক-২ এর লাগতো মাত্র দেড় ঘন্টার মতো। উৎক্ষেপণের ৫ থেকে ৭ ঘন্টার মধ্যে লাইকার মৃত্যু হয়। ১৫৩ দিন কক্ষপথে থেকে পৃথিবীকে মোট ২৫৭০ বার প্রদক্ষিণ করার পর পৃথিবীর বায়ুমন্ডলে ফিরে আসে স্পুটনিক-২।

 

 

এক্সপ্লোরার-১

 

আমেরিকার জেট প্রপালশান ল্যাবোরেটরিতে নির্মিত এক্সপ্লোরার-১ স্যাটেলাইট মহাশূন্যে প্রেরিত হয়েছিল ১৯৫৮ সালের ৩১ জানুয়ারি। এক্সপ্লোরার-১ তৈরি করা হয়েছিল মহাজাগতিক রশ্মি, গ্রহাণু এবং মহাকাশের তাপমাত্রা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের উদ্দেশ্যে।

          এই স্যাটেলাইটের যন্ত্রপাতির ভর ছিল মাত্র ৮ কেজি। যার মধ্যে ছিল একটি গেইগার-মুলার কাউন্টার - যার সাহায্যে মহাজাগতিক রশ্মির তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা মাপা যায়। ছিল মাইক্রো-মেটিওরাইট ডিটেক্টর - যার সাহায্যে আণুবীক্ষণিক গ্রহাণু শনাক্ত করা যায়। আর ছিল স্যাটেলাইটের বাইরের ও ভেতরের তাপমাত্রার পার্থক্য মাপার যন্ত্র - যার সাহায্যে মহাকাশের তাপমাত্রা জানা যায়।

          এক্সপ্লোরার-১ স্যাটেলাইটটির দৈর্ঘ্য ছিল মাত্র দুই মিটার এবং ব্যাস ছিল মাত্র ১৫.৯ সেন্টিমিটার। এর কক্ষপথ ছিল উপবৃত্তাকার; যার কাছের বিন্দুর দূরত্ব ছিল পৃথিবী থেকে ৩৬০ কিলোমিটার, আর সবচেয়ে দূরের বিন্দুর দূরত্ব ছিল ২৫৩২ কিলোমিটার। পৃথিবীর চারপাশে ঘুরতে এর সময় লাগতো দুই ঘন্টারও কম (১১৪.৮ মিনিট)।


চিত্র ১০: স্যাটেলাইট এক্সপ্লোরার-১ এর গঠন

 

এই স্যাটেলাইটটি কর্মক্ষম ছিল মাত্র চার মাস। ১৯৫৮ সালের ২৩ মে'র পর আর কোন সিগনাল আসেনি এক্সপ্লোরার-১ থেকে। মৃত স্যাটেলাইট হিসেবে তারপর আরো বারো বছর এটা পৃথিবীর চারপাশে ঘুরেছে মোট ৫৮ হাজার বার। ১৯৭০ সালের ৩১ মে পৃথিবীর বায়ুমন্ডলে প্রবেশের সময় পুড়ে ছাই হয়ে যায় এক্সপ্লোরার-১।

         

ব্যবহারিক স্যাটেলাইট

অ্যাপ্লিকেশান স্যাটেলাইট বা ব্যবহারিক স্যাটেলাইটগুলো আমরা সরাসরি ব্যবহার করি। এই স্যাটেলাইটগুলো আমাদের দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন রকমের কাজে লাগে। ব্যাবহারিক স্যাটেলাইটগুলোর মধ্যে প্রধানত আছে যোগাযোগ স্যাটেলাইট বা কমিনিকেশান স্যাটেলাইট, দূর অনুধাবন বা রিমোট সেন্সিং স্যাটেলাইট, স্পেস নেভিগেশান অ্যান্ড পজিশানিং স্যাটেলাইট বা জিপিএস স্যাটেলাইট, এবং মেটিওরলজিক্যাল স্যাটেলাইট বা আবহাওয়া স্যাটেলাইট।

          গত পঞ্চাশ-ষাট বছরে প্রায় কয়েক হাজার স্যাটেলাইট পৃথিবী থেকে মহাকাশে পাঠানো হয়েছে। এই স্যাটেলাইটগুলো আমাদের দৈনন্দিন জীবনের নানা কাজের সঙ্গী হয়ে উঠেছে অনেকসময় আমাদের অজান্তেই। যেমন আবহাওয়ার নির্ভুল পূর্বাভাস আমরা এখন পাচ্ছি। এর পেছনে আবহাওয়া স্যাটেলাইটের যে কাজ জড়িত আছে সে সম্পর্কে আমাদের অনেকের ধারণাও নেই। আপনার মোবাইল ফোনের লোকেশন অ্যাপ্‌স ব্যবহার করে আপনি জেনে নিতে পারছেন আপনার বন্ধু কোথায় আছে, কিংবা আপনি নজর রাখতে পারছেন আপনার গাড়ি কোথায় আছে - এগুলো সম্ভব হচ্ছে জিপিএস স্যাটেলাইটের মাধ্যমে। উন্নত দেশের চাষীরা এখন স্যাটেলাইটের মাধ্যমে জেনে নিচ্ছেন জমিতে কখন সার দিতে হবে, মাটিতে পানি ঠিকমত আছে কি না, কিংবা কোন ফসলে পোকার আক্রমণ ঘটছে কি না। উন্নত দেশের মৎস্যচাষীরা এখন নদীতে বা সমুদ্রের কোথায় মাছ আছে, কিংবা ঠিক কোন জায়গায় জাল ফেললে মাছ পাওয়া যাবে - সেই হিসেবও নির্ভুলভাবে জেনে নিচ্ছেন স্যাটেলাইটের মাধ্যমে। খনিজ সম্পদ আহরণকারীরা স্যাটেলাইটের মাধ্যমে জেনে নিচ্ছেন পৃথিবীর ঠিক কোথায় কোথায় খনিজ সম্পদ রয়েছে।

          ব্যবহারিক স্যাটেলাইটগুলোর সাহায্য ছাড়া আমাদের আধুনিক জীবনযাত্রা প্রায় অসম্ভব।  ব্যবহারিক স্যাটেলাইটগুলো আমাদের কী কী কাজে লাগে তার একটা তালিকা নিচে দেয়া হলো।

 

অডিও, ভিডিও, মাল্টিমিডিয়া ও ডাটা কমিউনিকেশান

 

Ø  প্রত্যন্ত অঞ্চলে যেখানে টেলিফোন নেটওয়ার্ক নেই সেখানে স্যাটেলাইট টেলিফোনের সাহায্যে যোগাযোগ করা সম্ভব।

Ø  খবর সংগ্রহ ও সরবরাহ

Ø  ইন্টারনেট ট্রাংকিং (internet trunking)[1]

Ø  ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট

Ø  ভিস্যাট (VSAT - very small aperture terminal) নেটওয়ার্ক

Ø  টেলি-হেল্‌থ, টেলিমেডিসিন

Ø  ভিডিও কনফারেন্সিং

Ø  ক্যাবল টেলিভিশন সম্প্রচার

Ø  ভিওআইপি (VOIP - voice over internet protocol) টেলিফোন

Ø  মিলিটারি সার্ভিস

Ø  সরকারি সেবাসমূহ

Ø  ডিজিটাল রেডিও


চিত্র ১১: স্যাটেলাইট থেকে VSAT নেটওয়ার্ক

 

 

গ্লোবাল পজিশানিং সার্ভিস (GPS) 

Ø  স্থান, অবস্থান, সময় নির্ণয় - বর্তমানে যে কোন আধুনিক যানবাহন চালনায় জিপিএস-এর সহায়তায় রাস্তার দিকনির্দেশনা ও ঠিকানা খুঁজে নেয়া খুবই সাধারণ ব্যাপার।

Ø  সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ - বিমান দুর্ঘটনা, জাহাজডুবি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ইত্যাদিতে যেখানে মানুষ যেতে পারে না সেখানে স্যাটেলাইটের সাহায্যে পৃথিবীর সব জায়গায় খুঁজে দেখা যায়।

Ø  জরিপের কাজে

Ø  ফ্লিট ম্যানেজমেন্ট (fleet management) -  সামুদ্রিক জাহাজের গতিবিধির ওপর নজর রাখা, উড়োজাহাজের গতিবিধির ওপর নজর রাখা থেকে শুরু করে রাস্তায় গাড়ির গতিবেগ নিয়ন্ত্রণ, ট্রাফিক কন্ট্রোল ইত্যাদি।

Ø  সামুদ্রিক জাহাজ, উড়োজাহাজ, দ্রুতগামী ট্রেন প্রভৃতিতে ইন্টারনেট, টেলিফোনসহ অন্যান্য ডাটা সার্ভিস।

Ø  সাবমেরিনের গতিপথ পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ

Ø  সামরিক ও গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক

Ø  স্বয়ংক্রিয় ড্রোনের ব্যবহার


চিত্র ১২: জিপিএস স্যাটেলাইটের সহায়তায় সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ মিশন

 

 

দূর অনুধাবন ও আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ

 

Ø  সুপারভাইজারি কন্ট্রোল অ্যান্ড ডাটা  অ্যাকুইজিশান (SCADA) - উচ্চপর্যায়ের নেটওয়ার্ক কন্ট্রোল।

Ø  পাইপলাইন মনিটরিং

Ø  অবকাঠামো পরিকল্পনা

Ø  দাবানল নিয়ন্ত্রণ

Ø  বন্যা, সাইক্লোন ইত্যাদি প্রাকৃতিক দুর্যোগের পূর্বাভাস ও পর্যবেক্ষণ

Ø  বায়ুদূষণ ব্যবস্থাপনা

Ø  কৃষি ও বনায়ন পর্যবেক্ষণ

Ø  পৃথিবীর জলবায়ুর পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ

Ø  ঘূর্ণিঝড় ও হারিক্যান অনুসরণ

Ø  আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ

Ø  সমুদ্রতলের উচ্চতা, লবণাক্ততা, ও জলজ শৈবালের হ্রাস-বৃদ্ধি পর্যবেক্ষণ


চিত্র ১৩: সাইক্লোনের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছে আবহাওয়া স্যাটেলাইট

 

মহাকাশে বর্তমানে সহস্রাধিক স্যাটেলাইট বিভিন্ন রকম কাজে নিয়োজিত। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ ও সংস্থা এই স্যাটেলাইটগুলোর মালিক। স্যাটেলাইটগুলো পরিচালনা করার জন্য কঠোর আন্তর্জাতিক নীতিমালা আছে। ইন্টারন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশান ইউনিয়ন বা আই-টি-ইউ স্যাটেলাইট নিয়ন্ত্রণের প্রধান সংস্থা। স্যাটেলাইটের কার্যক্রমগুলোকে আই-টি-ইউ কয়েকটি প্রধান ভাগে সংজ্ঞায়িত করেছে।

          আই-টি-ইউ'র সংজ্ঞা অনুযায়ী স্যাটেলাইটের প্রধান সেবাগুলো হলো:

  • ফিক্সড স্যাটেলাইট সার্ভিস (FSS)
  • ইন্টার-স্যাটেলাইট সার্ভিস (ISS)
  • ব্রডকাস্ট স্যাটেলাইট সার্ভিস (BSS)
  • ব্রডকাস্ট স্যাটেলাইট সার্ভিস ফর রেডিও (BSSR)
  • রেডিও ডিটারমিনেশান স্যাটেলাইট সার্ভিস (RDSS)
  • রেডিও ন্যাভিগেশান স্যাটেলাইট সার্ভিস (RNSS)
  • মোবাইল স্যাটেলাইট সার্ভিস (MSS)
  • অ্যারোনটিক্যাল মোবাইল স্যাটেলাইট সার্ভিস (AMSS)
  • ম্যারিটাইম মোবাইল স্যাটেলাইট সার্ভিস (MMSS)
  • ম্যারিটাইম রেডিও ন্যাভিগেশান স্যাটেলাইট সার্ভিস (MRNSS)
  • ল্যান্ড মোবাইল স্যাটেলাইট সার্ভিস (LMSS)
  • স্পেস অপারেশানস স্যাটেলাইট সার্ভিস (SOSS)
  • স্পেস রিসার্চ স্যাটেলাইট সার্ভিস (SRSS)
  • আর্থ এক্সপ্লোরেশান স্যাটেলাইট সার্ভিস (EESS)
  • অ্যামেচার স্যাটেলাইট সার্ভিস (ASS)
  • রেডিও অ্যাস্ট্রোনমি স্যাটেলাইট সার্ভিস (RASS)
  • স্ট্যান্ডার্ড ফ্রিকোয়েন্সি স্যাটেলাইট সার্ভিস (SFSS)
  • টাইম সিগনাল স্যাটেলাইট সার্ভিস (TSSS)

 

এই স্যাটেলাইট সার্ভিসগুলোর মধ্যে আমরা সাধারণ মানুষ যে তিনটি সার্ভিস সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করি সেগুলো হলো: (১) ফিক্সড স্যাটেলাইট সার্ভিস (২) ব্রডকাস্ট স্যাটেলাইট সার্ভিস, এবং (৩) মোবাইল স্যাটেলাইট সার্ভিস।

 

          ফিক্সড স্যাটেলাইট সার্ভিস: এই রেডিও কমিউনিকেশান সার্ভিস হলো পৃথিবীর নির্দিষ্ট আর্থ স্টেশন বা উপগ্রহ ভূ-কেন্দ্রের সাথে কমিউনিকেশান স্যাটেলাইটের মধ্যে যোগাযোগের মাধ্যমে যে সার্ভিস দেয়া হয়।[2]

 

চিত্র ১৪: ফিক্সড স্যাটেলাইট সার্ভিস

          

এই সার্ভিসগুলো আমরা সবসময়েই ব্যবহার করি। বাণিজ্যিকভাবে স্যাটেলাইটের ব্যবহার শুরু হয়েছিল এই ফিক্সড স্যাটেলাইট সার্ভিসের মাধ্যমে। আজ এই সার্ভিসের মাধ্যমে টেলিফোন, ফ্যাক্স, ডাটা সার্ভিস, অডিও-ভিডিও ডিস্ট্রিবিউশান, ভিডিও-কনফারেন্সিং ইত্যাদি করা হচ্ছে। ভি-ও-আই-পি এবং ব্রডব্যান্ড আই-পি ডাটা সার্ভিস সাপোর্ট করে ফিক্সড স্যাটেলাইট সার্ভিস। এর মাধ্যমে বড় বড় শহরের মধ্যে বা এক দেশ থেকে অন্য দেশের মধ্যে  ব্রডব্যান্ড ডাটা ট্রান্সমিশান সহজ হয়। ফিক্সড স্যাটেলাইট সার্ভিসের জন্য স্যাটেলাইটগুলো সাধারণত C-ব্যান্ড (৪ - ৬ গিগাহার্টজ), Ku-ব্যান্ড (১২ - ১৪ গিগাহার্টজ), এবং Ka-ব্যান্ডে (২০-৩০ গিগাহার্টজ) কাজ করে।

          টেলিভিশন স্টেশন থেকে সম্প্রচারিত অনুষ্ঠানগুলো ক্যাবল টেলিভিশন ডিস্ট্রিবিউশান সিস্টেমে পাঠানো হয় উচ্চ-ক্ষমতাসম্পন্ন ফিক্সড স্যাটেলাইট সার্ভিস সিস্টেমের মাধ্যমে। ক্যাবল টেলিভিশন সিস্টেমকে অনেক সময় ডি-টি-এইচ (DTH) বা 'ডিরেক্ট টু হোম' সার্ভিসও বলা হয়।

          ১৯৭৫ সালে HBO বা হোম বক্স অফিস সিস্টেম ফিক্সড স্যাটেলাইট সার্ভিস ব্যবহার করে মানুষের বাড়িতে বাড়িতে ক্যাবল টেলিভিশনের অনুষ্ঠান এবং সিনেমা সম্প্রচার শুরু করে। মানুষের বাড়ির ছাদে বড় বড় ডিশ অ্যান্টেনা বসানো শুরু হয় তখন। ইওরোপেও ক্যাবল টেলিভিশন এবং ডি-টি-এইচ শুরু হয়েছিল ফিক্সড স্যাটেলাইট সার্ভিসের মাধ্যমে।

          পৃথিবীর আনাচে-কানাচে টেলিকমিউনিকেশানের জন্য ফিক্সড স্যাটেলাইট সার্ভিস হলো সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা। পৃথিবীর যে সব জায়গায় টেলিকমিউনিকেশানের অবকাঠামো স্থাপন করা অসম্ভব, সেসব জায়গায় স্যাটেলাইটের মাধ্যমে সহজেই টেলিকমিউনিকেশান ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়। প্রত্যন্ত অঞ্চলে যেখানে খুব কম মানুষ থাকে - সেখানে মোবাইল ফোন টাওয়ার বসানো কিংবা অপটিক্যাল ফাইবার অথবা কো-অ্যাক্সিয়েল ক্যাবলের মাধ্যমে ডাটা ট্রান্সফার করা ভীষণ খরচসাপেক্ষ। সেসব জায়গায় ফিক্সড স্যাটেলাইট সার্ভিস খুবই উপযোগী। একইভাবে অনেক দেশের খুব ছোট ছোট দ্বীপে যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে।

          বিশেষ কোন অনুষ্ঠানের সরাসরি টেলিভিশন কভারেজের জন্য, কিংবা প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে টেলিভিশন সংবাদ ও অনুষ্ঠান সম্প্রচার করার জন্য ফিক্সড স্যাটেলাইট সার্ভিস সবচেয়ে উপযোগী।  

 

       ব্রডকাস্ট স্যাটেলাইট সার্ভিস: টেলিকমিউনিকেশান বা দূর-যোগাযোগের স্যাটেলাইটগুলোর সাহায্যে আজ আমাদের ঘরে ঘরে অসংখ্য টেলিভিশন চ্যানেলের অনুষ্ঠান দেখা যাচ্ছে। ডিরেক্ট টু হোম টেলিভিশন কিংবা ডিজিটাল রেডিও প্রভৃতি সম্প্রচারমূলক সেবাগুলোকে আই-টি-ইউ সংজ্ঞায়িত করেছে ব্রডকাস্ট স্যাটেলাইট সার্ভিস হিসেবে।

          এই রেডিও-কমিউনিকেশান সার্ভিসগুলো স্যাটেলাইট থেকে সরাসরি সাধারণ ব্যবহারকারীর কাছে চলে যায়। স্যাটেলাইট স্টেশন থেকে যে সিগনালগুলো সম্প্রচার করা হয় তা সরাসরি জনসাধারণের কাছে চলে যায়।[3] যেমন ব্রডকাস্ট স্যাটেলাইট সার্ভিস রেডিও -  স্যাটেলাইট থেকে সরাসরি বেতার তরঙ্গ প্রচার করে। স্যাটেলাইট ডিজিটাল রেডিও সার্ভিসও এই ধরনের সার্ভিস।

 

 

চিত্র ১৫: ব্রডকাস্ট স্যাটেলাইট সার্ভিস

      

মোবাইল স্যাটেলাইট সার্ভিস: এই রেডিও-কমিউনিকেশান সার্ভিসগুলো হলো এক বা একাধিক স্যাটেলাইটের সাথে পৃথিবীর মোবাইল বা চলমান স্টেশনগুলোর যোগাযোগ ব্যবস্থা, অথবা মহাকাশের চলমান স্পেস স্টেশনগুলোর একটির সাথে অন্যটির যোগাযোগ ব্যবস্থা।[4]

 

চিত্র ১৬: উড়োজাহাজে মোবাইল স্যাটেলাইট সার্ভিস

 

অনেক ধরনের মোবাইল স্যাটেলাইট সার্ভিস আছে - ল্যান্ড মোবাইল স্যাটেলাইট সার্ভিস, অ্যারোনটিক্যাল মোবাইল স্যাটেলাইট সার্ভিস, ম্যারিটাইম মোবাইল স্যাটেলাইট সার্ভিস ইত্যাদি। স্যাটেলাইট মোবাইল ফোন সার্ভিসগুলো এই সার্ভিসের অন্তর্ভুক্ত। বিমানের ইন-ফ্লাইট ইন্টারনেট বা মোবাইল ফোন সংযোগের জন্য মোবাইল স্যাটেলাইট সার্ভিস ব্যবহার করা হয়।

     বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ক্রমাগত উন্নতির সাথে সাথে স্যাটেলাইটের ব্যবহার ক্রমশ বাড়ছে। সেই সাথে বাড়ছে সেগুলোর অপব্যবহার নিয়ন্ত্রণের জন্য আই-টি-ইউ'র কার্যক্রম। এই বইয়ের তৃতীয় অধ্যায়ে আই-টি-ইউ'র কার্যক্রম সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।



[1] একই লাইন ব্যবহার করে অনেক গ্রাহককে এক সাথে ইন্টারনেট সংযোগ দেয়ার ব্যবস্থা।

[2] "A radio-communication service between earth stations at given positions, when one or more satellites are used; the given position may be a specified fixed point or any fixed point within specified areas; the fixed satellite service may also include feeder links for other space radio-communication services." - ITU Radio Regulations, Article 1, Definition of Radio Service, Section 1.21.

[3] "A radio-communication service in which signals transmitted or retransmitted by space stations are intended for direct reception by the general public. In the boradcasting -satellite service, the term "direct reception" shall encompass both individual reception and community reception." - ITU Radio Regulations, Article 1, Definition of Radio Service, Section 1.25.

[4] "A radio-communication service (a) between mobile earth stations and one or more space stations, or between space stations used by this service; or (b) between mobile earth stations by means of one or more space stations. " - ITU Radio Regulations, Article 1, Definition of Radio Service, Section 1.XX.


No comments:

Post a Comment

Latest Post

Memories of My Father - Part 6

  The habit of reading books was instilled in us from a young age, almost unknowingly. There was no specific encouragement or pressure for t...

Popular Posts