Sunday 12 April 2020

জগদীশচন্দ্র বসু - পর্ব ১১




বৈজ্ঞানিক সফর - ২

১৯০০ সালের আগস্টে প্যারিসে পৌঁছেন জগদীশচন্দ্র ও অবলা বসু। বাংলা ও ভারত সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে তিনি প্যারিসে পদার্থবিজ্ঞান কংগ্রেসে যোগ দেন এবং জড়বস্তুর সংবেদনশীলতা বিষয়ে তাঁর পরীক্ষালব্ধ ফলাফল ব্যাখ্যা করেন। তিনি তাঁর On the similarity of effect of electrical stimulus on inorganic and living substanceপ্রবন্ধে ম্যাগনেটিক আয়রন অক্সাইডের ওপর বিদ্যুৎ-চৌম্বকীয় তরঙ্গ ফেললে সময়ের সঙ্গে তার পরিবাহিতার পরিবর্তনের গ্রাফ দেখিয়ে জীবদেহের মাংসপেশীর সাড়া দেয়ার গ্রাফের সাথে তার সাদৃশ্য ব্যাখ্যা করেন।
          প্যারিসের এই সম্মেলন ছিল আন্তর্জাতিক পদার্থবিজ্ঞানীদের প্রথম কংগ্রেস। সারা পৃথিবীর বিশিষ্ট পদার্থবিজ্ঞানীদের মধ্যে ভারতবর্ষ থেকে শুধুমাত্র জগদীশচন্দ্রই আমন্ত্রণ পেয়েছিলেন।
          কিন্তু প্যারিসে এসে প্রায় এক বছর দুই মাস পর জগদীশচন্দ্রের সাথে নিবেদিতার আবার দেখা হলো এক অদ্ভুত যোগাযোগের মাধ্যমে প্যারিসে অনুষ্ঠিতব্য আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী সম্মেলনের সংগঠক প্যাট্রিক গ্যাডিস নিবেদিতাকে অনুরোধ রেছিলেন সম্মেলনের সেক্রেটারি হবার জন্য সম্মেলনেরধর্ম ইতিহাসশাখায় আমন্ত্রিত হয়েছেন স্বামী বিবেকানন্দ নিবেদিতা তাতেও উৎসাহী হননি আমেরিকা থেকে প্যারিসে যেতে তিনি ঠিক করে রেখেছিলেন স্বামীজি প্যারিসে চলে গেলে তিনি আমেরিকা থেকে সরাসরি কলকাতায় চলে যাবেন কিন্তু যখন শুনলেন যে সম্মেলনের আরেকটি অংশ হলোইন্টারন্যাশনাল কংগ্রেস অব ফিজিসিস্টএবং সেখানে জগদীশচন্দ্র বসুকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে-  নিবেদিতা খুশি মনে রাজি হয়ে গেলেন সম্মেলনের সেক্রেটারি হতে
          প্যারিসের আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী চলছিলো এপ্রিল থেকে নভেম্বর পর্যন্ত এবং বিজ্ঞান ধর্ম শিল্প সাহিত্য দর্শন ইতিহাস সব বিষয়েরই প্রদর্শনী ও সম্মেলন চলছিলো বিভিন্ন সময়ে। ইতিহাস ও ধর্ম বিষয়ে বক্তৃতা দেয়ার জন্য আমন্ত্রিত হয়েছিলেন স্বামী বিবেকানন্দ। কিন্তু শারীরিক অসুস্থতার কারণে তিনি বক্তৃতা দিতে পারেননি, তবে তাঁর উপস্থিতিই ছিল বেশ গুরুত্বপূর্ণ। তিনি আমেরিকা থেকে নিবেদিতাকে সাথে নিয়ে প্যারিসে গিয়েছিলেন। জগদীশচন্দ্রের বক্তৃতায় উপস্থিত ছিলেন বিবেকানন্দ এবং জগদীশচন্দ্রের বক্তৃতা ও প্রশংসা শুনে ভীষণ আনন্দিত হন। জগদীশচন্দ্র ও অবলা বসুর সাথে দেখা করে অভিনন্দন জানান বিবেকানন্দ। জীব জড়ের সাড়ার অভিন্নতার মধ্যে তিনি সনাতন ধর্মের উপনিষদের মিল খুঁজে পেলেন শুধু তাই নয়, একজন ভারতীয় বিজ্ঞানী ইওরোপের বিশ্বসভায় বৈজ্ঞানিক বক্তৃতা দিয়েছেন এটাও তাঁকে খুব উদ্বেলিত করলো এ প্রসঙ্গে তিনি তাঁর ডায়েরিতে লিখেছেন:
          আজ ২৩ শে অক্টোবর; কাল সন্ধ্যার সময় প্যারিস হতে বিদায় বৎসর প্যারিস সভ্যজগতে এক কেন্দ্র, বৎসর মহাপ্রদর্শনী নানা দিগদেশ-সমাগত অর্জুনসঙ্গম দেশ-দেশান্তরের মনীষিগণ নিজ নিজ প্রতিভা প্রকাশে স্বদেশের মহিমা বিস্তার করছেন আজ প্যারিসে মহাকেন্দ্রের ভেরীধ্বনি আজ যাঁর নাম উচ্চারণ করবে, সে নাদ-তরঙ্গ সঙ্গে সঙ্গে তাঁর স্বদেশকে সর্বজন সমক্ষে গৌরবান্বিত করবে আর আমার জন্মভূমি- জার্মান ফরাসী ইংরেজ ইতালী প্রভৃতি বুধ-মন্ডলী-মন্ডিত মহা রাজধানীতে তুমি কোথায়, বাসভূমি? কে তোমার নাম নেয়? কে তোমার অস্তিত্ব ঘোষণা করে? সে বহু গৌরবর্ণ প্রতিভামন্ডলীর মধ্য হতে এক যুগ যশস্বী বীর বঙ্গভূমির আমাদের মাতৃভূমির নাম ঘোষণা করলেন, সে বীর জগৎপ্রসিদ্ধ বৈজ্ঞানিক ডক্টর জে সি বোস এক যুবা বাঙালী বৈজ্ঞানিক আজ বিদ্যুবেগে পাশ্চাত্য-মন্ডলীকে নিজের প্রতিভা মহিমায় মুগ্ধ করলেন- সে বিদ্যুৎসম্ভার মাতৃভূমির মৃতপ্রায় শরীরে নবজীবন-তরঙ্গ সঞ্চার করলে! সমগ্র বৈদ্যুতিকমন্ডলীর শীর্ষস্থানীয় আজ জগদীশ বসু- ভারতীয় বঙ্গবাসী, ধন্যবীর বসুজ তাঁর সতী সাধ্বী সর্বগুণাসম্পন্না গেহিনী যে দেশে যান, সেথায়ই ভারতের মুখ উজ্জ্বল করেন, বাঙালীর গৌরব বর্ধন করেন! ধন্য দম্পতি[1]
          প্যারিসের সম্মেলনে বক্তৃতার পর সরবোঁ বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং প্যারিসের পদার্থবিজ্ঞান ও প্রাণিবিজ্ঞান সমিতিতেও বক্তৃতা দেন জগদীশচন্দ্র। তাঁর 'জীব ও জড়ের সাড়া দেয়ার প্রকৃতি অভিন্ন' এই মতবাদের পক্ষে-বিপক্ষে মতামত গড়ে উঠতে শুরু করে আন্তর্জাতিক মহলে। প্যারিস থেকে লন্ডনে এলেন জগদীশ ও অবলা। নিবেদিতা তখনও প্যারিসে বিবেকানন্দের সাথে। ২৪ অক্টোবর বিবেকানন্দ প্যারিস থেকে ভারতে চলে গেলে নিবেদিতা চলে আসেন লন্ডনে।
          ফরাসী ও ব্রিটিশ বিজ্ঞানীদের মধ্যে জগদীশচন্দ্রের নতুন বৈজ্ঞানিক তত্ত্বে কী কী প্রতিক্রিয়া হলো সে বিষয়ে নিয়মিত চিঠি লেখালেখি চলছে জগদীশচন্দ্র ও রবীন্দ্রনাথের মধ্যে।
          ৩১ আগস্ট ১৯০০, জগদীশচন্দ্র লিখলেন রবীন্দ্রনাথকে:
            "একদিন congress-এর president আমাকে বলিবার জন্য অনুরোধ করিলেন। আমি কিছু কিছু বলিয়াছিলাম। তাহাতে অনেকে অতিশয় আশ্চর্য হইলেন। তারপর congress-এর secretary আমার সহিত দেখা করিতে আইসেন, এবং আমার কাজ লইয়া discussion করেন। এক ঘন্টা পর হঠাৎ বলিয়া উঠিলেন - But, monsieur, this is very beautiful (but-এর অর্থ আমি প্রথমে বিশ্বাস করি নাই)। তারপর আরও তিন দিন এ-সম্বন্ধে আলোচনা হয়, প্রত্যহই more and more excited- শেষ দিন আর নিজেকে সম্বরণ করিতে পারিলেন না। Congress-এর অন্যান্য secretary এবং president-এর নিকট অনর্গল ফরাসী ভাষায় আমার কার্য সম্বন্ধে বলিতে লাগিলেন।
          এই গেল প্যারিসের পালা। তাহার পর লন্ডনে আসিয়াছি। এখানে একজন physiologist আমার কার্যের জনরব শুনিয়াই বলিলেন যে, সে কখনও হইতে পারে না, there is nothing common between the living and non-living। আর একজন বৈজ্ঞানিকের সঙ্গে ৪ ঘন্টা কথা হইয়াছিল। প্রথম ঘন্টায় ভয়ানক বাদানুবাদ, তারপর কথা না বলিয়া কেবল শুনিতেছিলেন, এবং ক্রমাগত বলিতেছিলেন, this is magic! this is magic! তারপর বলিলেন, এখন তাঁহার নিকট সমস্তই নুতন, সমস্তই আলোক। আরও বলিলেন, এইসব সময়ে accepted হইবে; এখন অনেক বাধা আছে। আমার theory পূর্ব সংস্কারের সম্পূর্ণ বিরোধী, সুতরাং কোন-কোন physicists, কোন কোন chemists এবং অধিকাংশ physiologists আমার মতের বিরুদ্ধে দন্ডায়মান হইবেন। কোন-কোন মহামান্য বৈজ্ঞানিকের  theroy আমার মত গ্রাহ্য হইলে মিথ্যা হইবে; সুতরাং তাঁহারা বিশেষ প্রতিবাদ করিবেন। এবার সপ্তরথীর হস্তে অভিমন্যু বধ হইবে; আপনারা আমোদে দেখিবেন। কিন্তু আপনাদের প্রতিনিধি রণে পৃষ্ঠভঙ্গ দিবে না। সে মনশ্চক্ষুতে দেখিবে যে, তাহার উপর অনেক স্নেহদৃষ্টি আপতিত রহিয়াছে।"
          উত্তরে শিলাইদহ থেকে ১৭ সেপ্টেম্বর ১৯০০, রবীন্দ্রনাথ লিখলেন:
            "যুদ্ধ ঘোষণা করে দিন। কাউকে রেয়াৎ করবেন না - যে হতভাগ্য surrender না করবে, লর্ড রবার্টসের মত নির্মম চিত্তে তাদের পুরাতন ঘর-দুয়ার তর্কানলে জ্বালিয়ে দেবেন। তারপরে আপনি জয় করে এলে আপনার সেই বিজয় গৌরব আমরা বাঙ্গালীরা ভাগ করে নেব।"
          সেপ্টেম্বরে (১৯০০) ব্রাডফোর্ডে ব্রিটিশ আস্যোসিয়েশনে জগদীশচন্দ্র প্যারিসের মতো আরেকটি বক্তৃতা দেন বৈদ্যুতিক তরঙ্গের গ্রাহক যন্ত্র কীভাবে কাজ করে সে সম্পর্কে জগদীশচন্দ্র ও অলিভার লজের মধ্যে মতভেদ দেখা দিয়েছিল। অলিভার লজ কোহেরার যন্ত্রের আবিষ্কারক এবং প্যাটেন্টও পেয়েছেন। কোহেরারের ধাতুচূর্ণের মধ্যে বিদ্যুৎ-স্ফুলিঙ্গ ঘটালে রেজিস্ট্যান্স যে হঠাৎ কমে যায়, অলিভার লজ তার কারণ হিসেবে ধারণা করেছিলেন যে ধাতু-চূর্ণ গলে গিয়ে সেরকম হয়। কিন্তু জগদীশচন্দ্র ধারণা দিয়েছিলেন যে স্পর্শ-রোধ বা কনট্যান্ট রেজিস্ট্যান্সের কারণে এটা হয়। মানে হলো ধাতুচূর্ণগুলো খুব কাছাকাছি এলে বা স্পর্শ করে থাকলে বিদ্যুৎ প্রবাহ বেড়ে যায় এবং রোধ কমে যায়। কিন্তু যখন তাদের ঝাঁকানি দিয়ে আলাদা করে দেয়া হয়, তারা আলাদা হয়ে যায় এবং বিদ্যুৎ-প্রবাহ কমে যায়, রোধ বেড়ে যায়। যদি অলিভার লজের যুক্তিমতো ধাতু গলে যেতো, তাহলে ঝাঁকুনি দিলেও তারা আলাদা হতো না। 
          ব্র্যাডফোর্ড সম্মেলনে জগদীশচন্দ্রের বক্তৃতার পর প্রফেসর লজের ধারণা পাল্টে যায় এবং জগদীশচন্দ্রকে অভিনন্দন জানান তিনি। ১০ই সেপ্টেম্বর ব্রিটিশ অ্যাসোসিয়েশানের রিসেপশান রুমে বসে রবীন্দ্রনাথকে লিখলেন জগদীশচন্দ্র:
          "আমার পূর্ব research সম্বন্ধে কোন বৈজ্ঞানিক পত্রে অতি প্রশংসাবাদ ছিল এবং সেই সঙ্গে Prof. Lodge-এর theory সম্বন্ধে অপ্রশংসা ছিল। ইহাতে Prof. Lodge অতিশয় মনঃক্ষুণ্ণ ছিলেন এবং আমার theroryর প্রতিবাদ করিবার জন্য বদ্ধপরিকর হইয়া আসিয়াছিলেন। আমার প্রবন্ধের মুখবন্ধেই দুই theory লইয়া বাদানুবাদ, আর আমার সম্মুখেই Lodge! সকলেই Lodge-এর মুখের দিকে তাকাইতেছিল, আমিও এক একবার দেখিতেছিলাম। জন বুলের মনের ভাব প্রকাশ পায় না। তবে যখন শেষ হইল, বহু প্রশংসাধ্বনি শুনিলাম। Lodge উঠিয়াও প্রশংসা করিলেন এবং বসু-জায়ার নিকট যাইয়া বলিলেন, "Let me heartily congratulate you on your husband's splendid work." আমাকে বলিলেন, "You have a very fine research in hand, go on with it." হঠাৎ জিজ্ঞাসা করিলেন, "Are you a man with plenty of means? All these are very expensive and you have many years before you, your work will give rise to many others - all very important."
          ক'দিন আগে অধ্যাপক ব্যারেটের কাছ থেকে একটা চিঠি পেয়েছেন জগদীশচন্দ্র। ব্যারেট লিখেছেন:
            "কাল রাতে আমাদের মধ্যে আলোচনা হলো। অধ্যাপক লজও উপস্থিত ছিলেন সেখানে। আমরা ভেবে দেখলাম, ভারতবর্ষে আপনার সময়ের অনেক অপচয় হচ্ছে। আপনার কি স্থায়ীভাবে ইংল্যান্ডে থাকতে কোন আপত্তি আছে? উপযুক্ত অধ্যাপকের পদ কদাচিৎ শূন্য হয়, তার প্রার্থীও থাকে অসংখ্য। বর্তমানে একটি ভাল পদ শূন্য আছে। প্রসিদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন অধ্যাপকের পদ। এই চাকরি আপনার জন্য সুনিশ্চিত, কেবল আপনার সম্মতির অপেক্ষা।"
          ইংল্যান্ডের ইউনিভার্সিটিতে পড়ানোর সুযোগ মানে গবেষণার ব্যাপক সুযোগ হাতে পাওয়া। কিন্তু স্বদেশের সাথে, প্রেসিডেন্সি কলেজের সাথে সব সম্পর্ক ছিন্ন করে বিদেশের মাটিতে পড়ে থাকা জগদীশ বসুর পক্ষে সম্ভব হলো না। তিনি তাঁর দেশকে হয়তো তাঁর বিজ্ঞান গবেষণার চেয়েও বেশি ভালবাসতেন। এ প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন:
            "জড়বস্তুর সংবেদনশীলতার যে আভাস আমি পেয়েছি তাকে তথ্যের উপর স্থায়ী ভাবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য বিজ্ঞানের বিস্তীর্ণ ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের অন্বেষণ দরকার। ইংল্যান্ডের বিজ্ঞানী-মহলের ধারণা ছিল, বহু বছরের অনুসন্ধানে আমার কাছে এই নতুন সত্য ধরা পড়েছে। আমি নিঃসঙ্কোচে বলেছিলাম, বিদ্যুৎ-তরঙ্গের আঘাতে পদার্থের আণবিক পরিবর্তন নিয়ে গবেষণা করবার সময় কীভাবে মুহূর্তের মধ্যে আমি জড়দেহে প্রাণস্পন্দন লক্ষ্য করেছি। ক্ষণকালের উপলব্ধি থেকে আমার গবেষণাধারায় যে বিরাট সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে, তাকে রূপায়িত করবার পক্ষে ইংল্যান্ড প্রবাসই শ্রেয়। কিন্তু প্রেসিডেন্সি কলেজের সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন করা আমার পক্ষে কিছুতেই সম্ভব নয়। ব্যারেটের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করতে হলো। অক্ষয় হয়ে রইলো তাঁদের স্মৃতি, যাঁদের অকৃত্রিম বন্ধুত্ব আমাকে কৃতার্থ করেছে।"
          কিন্তু মনের দোলাচল সহজে যায় না। বন্ধু রবীন্দ্রনাথকে জানান নিজের মানসিক দ্বন্দ্বের কথা:
            "এখন বলুন কী করি? একদিকে আমি যে কাজ আরম্ভ করিয়াছি - যাহার কেবল outskirts লইয়া এখন ব্যাপৃত আছি এবং যাহার পরিণাম অদ্ভুত মনে করি, সেই কাজ amateurish রকমে চলিবে না। তাহার জন্য অসীম পরিশ্রম ও বহু অনুকূল অবস্থার প্রয়োজন। অন্যদিকে আমার সমস্ত মনপ্রাণ দুঃখিনী মাতৃভূমির আকর্ষণ ছেদন করিতে পারে না। আমি কী করিব, কিছুই স্থির করিতে পারিতেছি না। আমার সমস্ত inspiration এর মূলে আমার স্বদেশীয় লোকের স্নেহ। সেই স্নেহবন্ধন ছিন্ন হইলে আমার আর কী রহিল?"[2]
          আরেকটি চিঠিতে লিখেছেন:
            আমাদের হৃদয়ের মূল ভারতবর্ষে। যদি সেখানে থাকিয়া কিছু করিতে পারি, তাহা হইলেই জীবন ধন্য হইবে। দেশে ফিরিয়া আসিলে যেসব বাধা পড়িবে তাহা বুঝিতে পারিতেছি না। যদি আমার অভীষ্ট অপূর্ণ থাকিয়া যায়, তাহাও সহ্য করিব।[3]         
          ব্রিটিশ অ্যাসোসিয়েশানে জগদীশচন্দ্র জীব ও জড়ের সংবেদনশীলতার যে তথ্য দিয়েছেন তা পদার্থবিজ্ঞানীরা যতটা সহজে মেনে নিয়েছেন, জীববিজ্ঞানীরা তত সহজে মেনে নিতে চাইলেন না। সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণের জন্য তাঁরা জগদীশচন্দ্রের পরীক্ষাগুলো আবার করে দেখার পক্ষপাতি। জগদীশচন্দ্রকে নানারকম তর্ক ও বিতর্কে জড়িয়ে পড়তে হচ্ছে প্রতিদিন। এ প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথকে লেখা এক চিঠিতে উল্লেখ করেছেন জগদীশচন্দ্র:
            "Chemist and physicist-এর মধ্যে ঘোরতর সংগ্রাম, Physiologist-রাও সেইরূপ। সেদিন আমাদের physical section-chemist-দিগকে অতি সমাদরে অভ্যর্থনা করা হইয়াছিল। আমাদের president তাহাদিগের মন আকর্ষণ করিবার জন্য তাহাদিগের বিশেষ স্তুতিগান করিলেন। তাহার উত্তরে এক chemistপ্রবর উঠিয়া বলিলেন, আমাদের ঝগড়া করিবার ইচ্ছা নাই; কিন্তু আপনাদের J. J. Thompson সেদিন বলিয়াছেন যে, atom অবিভাজ্য নহে। যাহারা আমাদের atom-এর উপর হাত তোলে, তাহাদিগের সহিত আমাদের চিরসংগ্রাম।
          ...  তারপর একজন Physiologist-এর সহিত দেখা হয়। তিনি আমার কার্যের বিশেষ প্রশংসা করিলেন এবং বলিলেন, 'আশা করি আপনি অন্যান্য physicist-এর ন্যায় আমাদের সুবৃহৎ Physiology-কে Physics-এর শাখা বলিয়া উড়াইয়া দিতে চাহেন না। একটা formula দিয়া সব explain করা, একি চালাকি?'
          ... আমার দু'একজন Physicist বন্ধু বলেন যে, Psychology Science নহে, সুতরাং ও বিষয়টা বাদ দিবেন। অর্থাৎ মনে হয়ত সন্দেহ হইয়াছে যে, এ লোকটা Oriental,  যদি ওদিকে একবার বেঁকে যায়, তাহা হইলে Physics ছাড়িয়া ওদিকে চলিয়া যাইবে।"[4]
          জীববিজ্ঞানীদের সাথে বিরোধের টেনশান এবং অধিক পরিশ্রমের কারণে হঠাৎ খুব অসুস্থ হয়ে পড়লেন জগদীশচন্দ্র। অসুস্থ জগদীশকে নিয়ে কী করবেন, কোথায় চিকিৎসা করাবেন - প্রায় দিশেহারা হয়ে পড়লেন অবলা। কিন্তু নিয়মিত খবর রাখেন নিবেদিতা। জগদীশচন্দ্রের অসুখের খবর পেয়ে ছুটে এলেন তিনি। সারা বুলও সেই সময় ইওরোপে ছিলেন। তাঁরা দু'জনে জগদীশ ও অবলাকে আগলে রাখলেন। লন্ডনের ভালো ডাক্তার দিয়ে পরীক্ষা করানো হলো। ডাক্তার বললেন জগদীশের পেটে অপারেশান করতে হবে। অপারেশানের আগে ও পরে মিলিয়ে দু'মাসের বেশি সময় পূর্ণ-বিশ্রামে থাকতে হবে জগদীশকে। নিরিবিলিতে বিশ্রামের জন্য নিবেদিতা জগদীশচন্দ্র ও অবলাকে নিয়ে যান উইম্বলডনে তাঁর মায়ের বাড়িতে। নিবেদিতার মা তখন ছিলেন না সেখানে। নিবেদিতা ও অবলা পালা করে রাত জেগে সেবা করেন অসুস্থ জগদীশকে।
          জগদীশচন্দ্রের অসুখের খবর যায় রবীন্দ্রনাথের কাছেও। তিনি লিখলেন:
            "সীজার যে নৌকায় চড়েন সে নৌকা কি কখনও ডুবিতে পারে? মহৎ কর্ম আপনাকে আশ্রয় করিয়া আছে। আপনাকে অতি শীঘ্র সারিয়া উঠিতে হইবে।"
          শরীর পুরোপুরি সেরে ওঠার আগে জগদীশকে নতুন কোন গবেষণায় হাত দিতে দিচ্ছেন না নিবেদিতা। মানসিক বিশ্রামের জন্য জগদীশ তখন তাঁর বন্ধু রবীন্দ্রনাথের গল্প পড়েন। তিনি আসার সময় রবীন্দ্রনাথের প্রকাশিত গল্প ও কবিতা নিয়ে এসেছিলেন কিছু। সে বছর ১৭ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত হয়েছে রবীন্দ্রনাথের গল্পগুচ্ছের প্রথম খন্ড। রবীন্দ্রনাথ গল্পগুচ্ছের এক কপি জগদীশকে পাঠিয়েছেন পড়তে পড়তে জগদীশ ভাবলেন রবীন্দ্রনাথের এত চমৎকার সব গল্প বাংলা ভাষাভাষী ছাড়া আর কেউ বে না- তা তো হয় না তিনি ভাবলেন গল্পগুলোর ইংরেজি অনুবাদ করলে কেমন হয়?
          ১৯০০ সালের নভেম্বর তিনি রবীন্দ্রনাথকে লিখলেন:
          তুমি পল্লীগ্রামে লুক্কায়িত থাকিবে, আমি তাহা হইতে দিব না তোমার গল্পগুলি আমি এদেশে প্রকাশ করিব লোকে তাহা হইলে কত বুঝিতে পারিবে আর ভাবিয়া দেখিও, তুমি সার্বভৌমিক এদেশের অনেকের সহিত তোমার লেখা লইয়া কথা হইয়াছিল একজনের সহিত কথা আছে (শীঘ্রই তিনি চলিয়া যাইবেন) যদি তোমার গল্প ইতিমধ্যে আসে তাহা প্রকাশ করিব Mrs. Knight-কে অন্য একটি দিব প্রথমোক্ত বন্ধুর দ্বারা লিখাইতে পারিলে অতি সুন্দর হইবে
          শুধু জগদীশের সেবা করাই নয়- জগদীশের লেখার কাজও হাতে তুলে নিয়েছেন নিবেদিতা জগদীশচন্দ্রপ্রথমোক্ত বন্ধুবলতে নিবেদিতাকে বুঝিয়েছেন কিন্তু নিবেদিতার নাম সরাসরি লিখলেন না কেন? নিবেদিতাকে তো রবীন্দ্রনাথ ভালো করেই চেনেন। তবে কি নিবেদিতার সাথে ঘনিষ্ঠতার কথা রবীন্দ্রনাথকে জানাতে চাননি জগদীশ?
          নিবেদিতাকে দিয়ে জগদীশচন্দ্র রবীন্দ্রনাথের গল্প ইংরেজিতে অনুবাদ করিয়ে নিতে শুরু করেছেন এর আগে থেকেই নিবেদিতার কাজের অন্ত নেই জগদীশচন্দ্রের পেপার লেখা, চিকিৎসা-সেবা, নিজের ইন্ডিয়া ফিরে আসার তাড়া কিন্তু সবকিছুকে তুচ্ছ করে তিনি জগদীশের কথামতো রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পের অনুবাদ করতেও শুরু করলেন
          নিবেদিতার ব্যস্ততার কিছু বিবরণ ধরা আছে মিস ম্যাকলাউডকে লেখা তাঁর চিঠিতে ২২/১১/১৯০০ তারিখে লিখলেন:
          চিঠি লেখার সময়ও পাই না গোটা দিন কেটে যায় বিজ্ঞান লেখা আর অনুবাদের কাজে, আর ভারতবর্ষ সম্পর্কে কথাবার্তায় আজ বেশি কিছু লিখতে পারবো না কারণকাবুলিওয়ালাশেষ করেছি আজ রাতের মধ্যে তার ভূমিকা লিখতে হবে
          নিবেদিতা রবীন্দ্রনাথের গল্প অনুবাদ খুব দ্রুত করছিলেন ১৯০০ সালে নভেম্বরের মধ্যে তিনটি গল্প কাবুলিওয়ালা (The Cabuliwalah), ছুটি (Leave of Absence) আর দেনাপাওনা (Giving and Giving in Return) শেষ করে ফেললেন জগদীশ মহাউৎসাহে তাঁর ইওরোপীয় বন্ধুদের শোনাতে লাগলেন তাঁর বাঙালী বন্ধুর লেখা গল্প
          ২৩ নভেম্বর ১৯০০ সালে রবীন্দ্রনাথকে চিঠি লিখে জানাচ্ছেন জগদীশ:
          তোমার লেখা তরজমা করিয়া এদেশীয় বন্ধুদিগকে শুনাইয়া থাকি তাঁহারা অশ্রু সংবরণ করিতে পারেন না তবে কী করিয়া publish করিতে হইবে এখনো জানি না এবার যদি তোমার নাম প্রতিষ্ঠিত করিতে পারি, তাহা হইলে যথেষ্ট মনে করিব ৬টি গল্প বাহির করিতে চাই শীঘ্র তোমার অন্যান্য গল্প পাঠাইবে Mrs. Knight কে দিই নাই
          জগদীশ এবারও নিবেদিতার নাম উল্লেখ করলেন না শুধু তাই নয়, এত শ্রম দিয়ে যে গল্পগুলো অনুবাদ করেছিলেন নিবেদিতা জগদীশচন্দ্র তা প্রকাশ তো দূরের কথা রবীন্দ্রনাথকেও পাঠাননি অনুবাদগুলো।
          এর নয় বছর পর ১৯০৯ সালে Modern Review পত্রিকা রবীন্দ্রনাথের গল্পগুচ্ছের ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশ করতে শুরু করে তখন নিবেদিতার করা অনুবাদগুলোর খোঁজ পড়ে। ১৯১১ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি রবীন্দ্রনাথ রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়কে লেখেন- ডাক্তার বসু বলিতেছিলেন সিস্টার নিবেদিতা আমার দুইটি ছোটগল্প ইংরেজি অনুবাদ করিয়াছেন- তাহা বিশেষ উপাদেয় হইয়াছে
          এত বছর ধরে জগদীশ রবীন্দ্রনাথকে জানাননি কেন নিবেদিতার অনুবাদের কথা? শুধু তাই নয়- জগদীশ গল্প তিনটি খুঁজেও পাচ্ছিলেন না শেষে নিবেদিতার মৃত্যুর পর একটা মাত্র গল্পকাবুলিওয়ালাখুঁজে পান এই ব্যাপারটা কি খামখেয়ালের বশে ঘটেছে নাকি নিবেদিতার প্রতি কোন অভিমানবশত ঘটেছে? জগদীশচন্দ্র নিবেদিতার উপর অভিমানটা একটু বেশিই করেছেন মাঝে মাঝে
          সে যাই হোক। ইংল্যান্ডের বিখ্যাত ডাক্তার ক্রমবির (৩১, নিউ ক্যাভেন্ডিস স্ট্রিট)-এর হাসপাতালে জগদীশচন্দ্রের পেটের অপারেশন হয় ১১ ডিসেম্বর ১৯০০ তারিখে নিবেদিতা অবলা পালা করে জগদীশের সেবা করেছেন তখন দিনের পর দিন, রাতের পর রাত
          অসুস্থ জগদীশের সেবা করার সময় নিবেদিতা তাঁর সাথে ঘন্টার পর ঘন্টা আলোচনা করেছেন ধর্ম দর্শন বিষয়ে ব্রাহ্মধর্ম সম্পর্কে বিশদ জানার একটা কৌতূহল তাঁর অনেক আগে থেকেই ছিল জগদীশ শুরুতে খুব একটা উৎসাহী ছিলেন না নিবেদিতার সাথে ব্যাপারে আলোচনা করতে কারণ তিনি এর আগে শুনেছেন বিষয়ে মতের মিল না হলে কেমন রেগে যান নিবেদিতা কিন্তু আস্তে আস্তে দেখা গেলো নিবেদিতা ব্রাহ্মসমাজের ব্যাপারে বেশ নরম হয়ে উঠছেন ব্রাহ্মধর্ম সম্পর্কে জগদীশের ব্যাখ্যা বেশ ভালো লাগে নিবেদিতার
          ১৯০১ সালের জানুয়ারি মিস ম্যাকলাউডকে চিঠিতে জানান:
          আমি আমার মনের দরজা খুলে দিয়েছি বিশ্বাস করতে শুরু করেছি যে আমার ভগবানকে পাবার জন্য শ্রী রামকৃষ্ণদেবও যেন আমাকে এই পথেই চালাতে চাচ্ছেন তোমার হয়তো মনে আছে শুরুতে আমরা শিব বা কালীকেও মেনে নিতে পারিনি
          নিবেদিতা ক্রমে মনের দোলাচল কাটিয়ে উঠেছেন মনকে সান্ত্বনা দিয়েছেন এই বলে যে মূর্তিপূজা আর নিরাকার ব্রাহ্মধর্মের মধ্যে মৌলিক কোন পার্থক্য নেই নিবেদিতার এই মানসিক পরিবর্তনে সবচেয়ে বেশি যেটা কাজ করেছে সেটা হলো জগদীশের প্রতি তাঁর অন্যরকম টান জগদীশের বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার নিজের কলমে বিশ্বের কাছে উপস্থাপিত হচ্ছে দেখে নিজেকে জগদীশেরই কর্মসঙ্গী হিসেবে দেখার যে টান সেটাই নিবেদিতাকে বদলে দিয়েছে অনেকখানি
          তবে শুধু ধর্ম দর্শন বিজ্ঞান আলোচনা নিয়েই দিন কাটতো না তাদের খেলাধূলা, বেড়ানো সবই চলছিলো প্রতি রবিবার বাড়ির কাছে বনের ভেতর দিয়ে সাইকেল চালিয়ে যেতেন নিবেদিতা জগদীশ সারা বুলও সাইকেল চালানো শিখে নেন সেসময়
          জগদীশচন্দ্র যখন ধীরে ধীরে সেরে উঠছেন তখন স্যার উইলিয়াম ক্রুক্‌সের কাছ থেকে আমন্ত্রণ পেলেন রয়্যাল ইন্সটিটিউটে বক্তৃতা দেয়ার। চিঠিতে স্যার ক্রুক্‌স লিখেছেন:
          "I have read the most interesting account of your researches with extreme interest. I wonder whether I could induce you to deliver a lecture on these or kindred subjects of research before the Royal Institution. If you could do so, I shall be very glad to put your name down for a Friday Evening Discourse after Easter of 1901. I have a vivid recollection of the great pleasure you gave us all on the occasion when you lectured a few years ago."
     রয়্যাল সোসাইটি অব আর্টস থেকেও আমন্ত্রণ পেলেন জগদীশচন্দ্র। 'ভারতবর্ষে বিজ্ঞানচর্চা' সম্পর্কিত বক্তৃতা দেন তিনি সেখানে কয়েক মাস পর।
          রয়্যাল ইন্সটিটিউটের বক্তৃতার জন্য প্রস্তুতি দরকার। কিছু পরীক্ষারও দরকার আছে। নিবেদিতা উইম্বলডনে মায়ের বাড়ির খাবার ঘরটি জগদীশকে ছেড়ে দেন গবেষণাগার হিসেবে ব্যবহারের জন্য জগদীশ সেটাকে ল্যাবরেটরি বানিয়ে ফেলেন রয়েল ন্সটিটিউশনে বক্তৃতার দিন যতই ঘনিয়ে আসছে ততই দ্রুত নিজেকে তৈরি করছেন জগদীশ
          ১৯০১ সালের ইস্টারের পরে ১০ মে তারিখে জগদীশচন্দ্র রয়্যাল ইন্সটিটিউতে বক্তৃতা দেবেন বলে ঠিক হলো। কিন্তু তার আগেই প্রেসিডেন্সি কলেজে তাঁর ছুটি শেষ হয়ে যাচ্ছে। তাই ছুটি বাড়ানোর জন্য ভারত অফিসে আবেদন করলেন জগদীশচন্দ্র। আরো ছয় মাসের ছুটি মঞ্জুর হলো ভারত সরকারের পক্ষ থেকে।
          ১৯০১ সালের জানুয়ারি থেকেই নিবেদিতার মায়ের বাড়ির খাবার ঘরে গবেষণার কাজ শুরু করলেন জগদীশচন্দ্র। লর্ড র‍্যালে ও স্যার জেম্‌স ডেওয়ার তাঁকে বিখ্যাত ডেভি-ফ্যারাডে ল্যাবে কাজ করার জন্য আমন্ত্রণ জানান। ডেভি ও মাইকেল ফ্যারাডের মত বিজ্ঞানী যেখানে কাজ করেছিলেন সেখানে গবেষণা করার সুযোগ পাওয়া জগদীশচন্দ্রের জন্য বিরাট সম্মানের। সেই ল্যাবের সহকারি টেকনিশিয়ান মিস্টার বুল জগদীশকে যন্ত্রপাতি দিয়ে সহযোগিতা করেন।
          জীব ও জড়ের সাড়ার ঐক্য লক্ষ্য করেছিলেন জগদীশচন্দ্র। এবার তাঁর মনে হলো উদ্ভিদ কীভাবে সাড়া দেয় উত্তেজনায়? উদ্ভিদেও যদি জীব ও জড়ের মতো সাড়া পাওয়া যায় তাহলে তাঁর কাজ আরো পাকাপোক্ত হবে। তিনি উদ্ভিদের মধ্যে বিভিন্ন উত্তেজনা সৃষ্টি করে তার সাড়া পর্যবেক্ষণ করতে শুরু করলেন। এপ্রিল মাসের মধ্যে তিনি যে ফলাফল পেলেন তাতে আশ্চর্য হয়ে দেখলেন উদ্ভিদ, জীব, ও জড়ের মধ্যে উত্তেজনার প্রতিক্রিয়ার যে গ্রাফ পাওয়া গেলো তাতে মৌলিক সাদৃশ্য আছে। কয়েকটি গ্রাফ তিনি রয়্যাল সোসাইটির তৎকালীন সেক্রেটারি স্যার মাইকেল ফস্টারকে দেখালেন। ফস্টার গ্রাফগুলো দেখে জগদীশচন্দ্রকে বললেন, "এতে নতুনত্ব কী আছে? পেশীর সাড়া তো এরকমই হবে। এটা তো অনেকেই পরীক্ষা করে দেখেছেন।"
          "কিন্তু এটা তো পেশীর সাড়া নয়।"
          "তবে কিসের সাড়া এটা?"
          "টিনের টুকরোয় আঘাতের সাড়া।"
          "কী বললেন? টিনের!" ভীষণ অবাক হয়ে গেলেন স্যার ফস্টার।
          ১৯০১ সালের মে মাসের ১০ তারিখ রয়েল ইনস্টিটিউটের শুক্রবারের সান্ধ্য অধিবেশনে জগদীশচন্দ্র The response of inorganic matter to mechanical and electrical stimulus শীর্ষক প্রবন্ধে যান্ত্রিক ও তড়িৎ উদ্দীপনার প্রতি জড় ও প্রাণীর সাড়া সংক্রান্ত বিভিন্ন পরীক্ষণের বর্ণনা দেন। সেই বক্তৃতায় তিনি বিভিন্ন পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণ করে দেন যে বাইরের আঘাতে প্রাণী ও জড়ের যে অনুভূতি জাগে তার রেখচিত্র প্রায় একই রকম। ক্লান্তি, উত্তেজনা ও বিষক্রিয়ায় প্রাণী ও জড়ের সাড়া প্রায় একই রকমের।
          জগদীশচন্দ্র চৌম্বক-লিভার রেকর্ডার তৈরি করেছিলেন বিভিন্ন বস্তুর বৈদ্যুতিক-সাড়া মাপার জন্য। যন্ত্রটির সরল চিত্র নিচে দেয়া হলো:


       
ছবিতে পেশির টুকুরার (প) দুপ্রান্তে দুটি ইলেকট্রোড (দ) লাগিয়ে তা একটি গ্যালভানোমিটারের (গ) সাথে লাগিয়ে দেয়া হয়েছে। গ্যালভানোমিটারের কাঁটার সাথে একটি লেখনি সংযুক্ত করে দেয়া হয়েছে। এখন পেশির একদিকে আঘাত করলে অন্যদিকের সাথে তার বৈদ্যুতিক চাপের পার্থক্য দেখা যায়। ফলে গ্যালভানোমিটারে কাঁটা সরে যায়। লেখনিতে এই সাড়ার লেখচিত্র তৈরি হয়। উত্তেজনার হারের সাথে গ্যালভালোমিটারের রিডিং-এর পরিবর্তন ঘটে। এবং সেটাকেই সাড়ার তারতম্য হিসেবে লিপিবদ্ধ করা হয়।
          জগদীশচন্দ্র মাংসপেশীর বদলে একখন্ড টিনের ওপর পরীক্ষা চালিয়ে যে সাড়া পেয়েছেন তা পেশির উত্তেজনায় সাড়ার অনুরূপ।



ক্রমাগত আঘাতের ফলে সাড়ার আড়ষ্টতা। a b, বৈদ্যুতিক সাড়ালিপি যন্ত্রে টিনের তারের রেখাচিত্র। a'  b' হলো পেশির সাড়ার রেখাচিত্র। উভয়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য মিল।

জীবদেহে যেমন ক্রমাগত আঘাত করতে থাকলে একসময় ক্লান্তিতে সাড়ার পরিমাণ কমে আসে, ঠিক সেরকম টিনের ওপর ক্রমাগত আঘাতের ফলেও টিনের সাড়ার অবসাদ লক্ষ্য করলেন জগদীশ। নিচের চিত্রে তা দেখানো হলো।


          জীবদেহের ক্লান্তি যেমন ওষুধ দিয়ে কাটানো যায়, সেরকম টিনের ওপরও ওষুধ দিয়ে দেখলেন কী হয়। উত্তেজক সোডিয়াম কার্বনেট প্রয়োগ করে দেখা গেলো টিনের সাড়া বহুগুণ বেড়ে গেছে। নিচের চিত্রে তা দেখানো হলো।



জীবকোষের মৃত্যু হলে কোন উত্তেজনায় আর সাড়া দিতে পারে না। সেরকম জড়বস্তুর ক্ষেত্রেই কি হয়? পরীক্ষা করে দেখার জন্য টিনের ওপর অক্সালিক অ্যাসিড (বিষ) ঢেলে দিয়ে আঘাত করার পর সাড়া মেপে দেখা গেলো - কোন সাড়া নেই। নিচের চিত্রে তা দেখানো হলো।
         


একটা ব্যাপার এখানে উল্লেখ্য যে বর্তমানে এই ধরনের সাড়ার স্বাভাবিক ব্যাখ্যা হচ্ছে রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফলে বস্তুর ইলেকট্রনের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া। কিন্তু জগদীশচন্দ্র যখন এই পরীক্ষা করেন তখন ইলেকট্রন সবেমাত্র আবিষ্কৃত হয়েছে। নিউক্লিয়াসের কোন ধারণাও তখন ছিল না। আর পরমাণু তখনো অবিভাজ্য বলেই মনে করতেন অনেক রসায়নিবিদ।
          এর আগে সম্পূর্ণ নিজস্ব পদ্ধতিতে এবং দেশীয় উপাদানে তৈরি যন্ত্রপাতি দিয়ে জগদীশ বসু একটা বৈদ্যুতিক সংবেদনশীল যন্ত্রের মডেল তৈরি করেছিলেন। গ্যালেনা বা লেড সালফাইড ব্যবহার করে তিনি তড়িৎ-তরঙ্গ নির্ণায়ক যন্ত্র (ডিটেক্টর) তৈরি করেছিলেন। যন্ত্রটির নাম দিয়েছেন গ্যালেনা ডিটেক্টর। গ্যালেনা ক্রিস্টালের সঙ্গে দুটি ইলেকট্রোড ও একটি গ্যালভানোমিটার লাগিয়ে তিনি এই ডিটেক্টর তৈরি করেছিলেন। ক্রিস্টালের উপর সূক্ষ্মভাবে ছুঁয়ে থাকা তারের সংযোগ হলো সংবেদনশীল বিন্দু। এখানে কোন বিদ্যুৎ তরঙ্গ বা আলোকতরঙ্গ পড়লে বিন্দুটির বিদ্যুৎ-প্রবাহ বেড়ে যায়।
          জগদীশচন্দ্র তাঁর পরীক্ষালব্ধ ফলাফলে দেখালেন যে দীর্ঘস্থায়ী উত্তেজনায় বস্তুর সাড়া দেওয়া ক্ষীণ হয়ে যায় - যাকে বস্তুর অবসাদ বলা যায়। এ অবস্থায় আলো বা বিদ্যৎ-চৌম্বকীয় তরঙ্গ প্রয়োগ করলে বস্তু পূর্বের অবস্থায় ফিরে আসে, কিন্তু পরিবাহিতা সহ আরো কিছু বৈশিষ্টের মান কিছুক্ষণ ওঠানামা করে। তিনি প্রস্তাব করলেন যে কোন অত্যুজ্জ্বল বস্তু থেকে চোখ সরিয়ে নিয়ে চোখ বন্ধ করলে কিছুক্ষণ যাবৎ যে উজ্জ্বল বস্তুটি একবার দেখা যায়, আবার অদৃশ্য হয়ে যায় বলে মনে হয় - তার কারণ চোখের রেটিনার পরিবাহিতা ধর্মের স্পন্দন। জগদীশবসুর আগে এরকম করে কেউ চিন্তা করেননি।
          নিবেদিতা, অবলা সারা বুলও উপস্থিত ছিলেন সেই বক্তৃতায় নিবেদিতা খুব আবেগময় ভাষায় সভার বিবরণ, বিশেষ করে জগদীশের সাফল্যের কথা লিখে রবীন্দ্রনাথকে জানান নিবেদিতার চিঠি পেয়ে রবীন্দ্রনাথআচার্য জগদীশের জয়বার্তানামে প্রবন্ধ লিখেবঙ্গদর্শনএর আষাঢ় ১৩০৮ সংখ্যায় প্রকাশ করেন
          "সন্ধ্যা নয়টা বাজিলে দ্বার উন্মুক্ত হইল এবং বসু-জায়াকে লইয়া সভাপতি সভায় প্রবেশ করিলেন। সমস্ত শ্রোতৃমন্ডলী অধ্যাপক-পত্নীকে সাদরে অভ্যর্থনা করিল। তিনি অবগুন্ঠনাবৃতা এবং শাড়ী ও ভারতীয় অলঙ্কারে সুশোভিতা। তাঁহাদের পশ্চাতে যশস্বী লোকের দল এবং সর্বপশ্চাতে আচার্য বসু নিজে। তিনি শান্ত নেত্রে একবার সমস্ত সভার প্রতি দৃষ্টিপাত করিলেন এবং অতি স্বচ্ছন্দ সমাহিতভাবে বলিতে প্রবৃত্ত হইলেন।
          তাঁহার পশ্চাতে রেখাঙ্কণ-চিত্রিত বড় বড় পট টাঙান রহিয়াছে। তাহাতে বিষপ্রয়োগে, শ্রান্তির অবস্থায়। ধনুষ্টঙ্কার প্রভৃতি আক্ষেপে, উত্তাপের ভিন্ন ভিন্ন মাত্রায় স্নায়ুর ও পেশীর এবং তাহার সহিত তুলনীয় ধাতু-পদার্থের স্পন্দন রেখা অঙ্কিত রহিয়াছে। তাঁহার সম্মুখে টেবিলে যন্ত্রোপকরণ সজ্জিত।
          ... ... আচার্য বসু বাগ্মী নহেন। বাক্য রচনা তাঁহার পক্ষে সহজসাধ্য নহে; এবং তাঁহার বলিবার ধরনও আবেগে পূর্ণ। কিন্তু সে রাত্রে তাঁহার বাক্যের বাধা কোথায় অন্তর্ধান করিল। এত সহজে তাঁহাকে বলিতে আমি শুনি নাই।"
          লেখাটি রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন নিবেদিতার বর্ণনার ভিত্তিতে শুধু তাই নয় মাঝে মাঝে নিবেদিতার বর্ণনার হুবহু বাংলা অনুবাদ কিন্তু রবীন্দ্রনাথ লেখার কোথাও নিবেদিতার নাম উল্লেখ করেননি কেবল প্রবন্ধের এক জায়গায় শুধু এটুকু লিখেছেন যে, "সভায় উপস্থিত কোন বিদূষী ইংরেজ মহিলার প্রেরিত বিবরণ" তিনি স্থানে স্থানে অনুবাদ করে দিচ্ছেন
          জগদীশের বক্তৃতা সম্পর্কে নিবেদিতার চিঠিতে আশ্চর্য পরিমাণের উচ্ছ্বাস, এবং তা রবীন্দ্রনাথের হাতে বাংলা অনুবাদ হয়ে প্রকাশিত হয়েছে:
          মাঝে মাঝে তাঁহার পদবিন্যাস গাম্ভীর্যে সৌন্দর্যে পরিপূর্ণ হইয়া উঠিতে লাগিল এবং মাঝে মাঝে তিনি সহাস্যে সুনিপুণ পরিহাস সহকারে অত্যন্ত উজ্জ্বল সরলভাবে বৈজ্ঞানিকবুহ্যের মধ্যে অস্ত্রের পর অস্ত্র নিক্ষেপ করিতে লাগিলেন তিনি রসায়ন, পদার্থতত্ত্ব বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখা-প্রশাখার ভেদ অত্যন্ত সহজে উপহাসেই যেন মিটাইয়া দিলেন
          তাহার পরে বিজ্ঞান শাস্ত্রে জীব অজীবের মধ্যে যে সকল ভেদ-নিরূপক-সংজ্ঞা ছিল, তাহা তিনি মাকড়সার জালের মত ঝাড়িয়া ফেলিলেন যাহার মৃত্যু সম্ভব, তাহাকেই তো জীবিত বলে। অধ্যাপক বসু একখন্ড টিনকে মৃত্যুর পথে দাঁড় করাইয়া আমাদিগকে তাহার মরণাক্ষেপ দেখাইতে প্রস্তুত আছেন এবং বিষপ্রয়োগে যখন তাহার অন্তিম দশা উপস্থিত হয়, তখন ঔষধ প্রয়োগে পুনরায় তাহাকে সুস্থ করিয়া তুলিতে পারেন।
          ... ... অবশেষে অধ্যাপক যখন তাঁহার স্বনির্মিত কৃত্রিম চক্ষু সভার সম্মুখে উপস্থিত করিলেন এবং দেখাইলেন যে, আমাদের চক্ষু অপেক্ষা তাহার শক্তি অধিক, তখন সকলের বিস্ময়ের অন্ত রহিল না।
          ভারতবর্ষ যুগে যুগে যে মহৎ ঐক্য অকুণ্ঠচিত্তে ঘোষণা করিয়া আসিয়াছে আজ যখন সেই ঐক্যসংবাদ আধুনিককালের ভাষায় উচ্চারিত হইল, তখন আমাদের কি রূপ পুলকসঞ্চার হইল, তাহা আমি বর্ণনা করিতে পারি না মনে হইল, যেন বক্তা নিজের নিজত্ব, আবরণ পরিত্যাগ করিলেন, যেন তিনি অন্ধকারের মধ্যে অর্ন্তহিত হইলেন- কেবল তাঁহার দেশ এবং তাঁহার জাতি আমাদের সম্মুখে উত্থিত হইলআমরা অনুভব করিলাম যে, এতদিন পরে ভারতবর্ষ- শিষ্যভাবে নহে, সমকক্ষভাবেও নহে, গুরুভাবে পাশ্চাত্য বৈজ্ঞানিকসভায় উত্থিত হইয়া আপনার জ্ঞানশ্রেষ্ঠতা প্রমাণ করিল পদার্থতত্ত্বসন্ধানী ব্রহ্মজ্ঞানীর মধ্যে যে প্রভেদ, তাহা পরিস্ফুট করিয়া দিল।"[5]
          জগদীশচন্দ্রের দুই কাছের মানুষ নিবেদিতা রবীন্দ্রনাথের হাতে পড়ে আবেগের আতিশয্যে মনে হচ্ছে এই একটা বক্তৃতা দিয়েই যেন ভারতকে একেবারে পাশ্চাত্যবিজ্ঞানের গুরুর আসনে বসিয়ে দিয়েছেন তিনি কিন্তু মূল-বিজ্ঞানের তেমন কিছুই উঠে আসেনি এই প্রবন্ধে তাছাড়া বিজ্ঞান না বুঝে শুধুমাত্র আবেগ দিয়ে বিজ্ঞান-সভার ধারাবিবরণী লিখতে গিয়ে বিজ্ঞানের প্রতি অবিচারই করেছেন রবীন্দ্রনাথ। আরো অনেক প্রবন্ধ ও কবিতা রচনা করে বাঙালিদের কাছে জগদীশচন্দ্রের বিজয়-ঢাক বাজিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ।[6]
          তাছাড়াও সেইসময় রবীন্দ্রনাথের অনুরোধে বিভিন্ন সাময়িক পত্রে আরো অনেক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে জগদীশচন্দ্রের জয়গাথা প্রচার করার উদ্দেশ্যে। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো - জগদানন্দ রায়ের "অধ্যাপক বসুর আবিষ্কার" (ভারতী - আষাঢ়, শ্রাবণ, কার্তিক, ১৩০৭), সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুরের "বিলাতে অধ্যাপক বসু" (ভারতী - আষাঢ় ১৩০৮), রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদীর "অধ্যাপক বসুর নবাবিষ্কার" (বঙ্গদর্শন - আশ্বিন ১৩০৮) এবং "অধ্যাপক জগদীশচন্দ্রের বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার" (সাহিত্য - ভাদ্র ১৩০৮)।
          রবীন্দ্রনাথের প্রবন্ধ পড়ে জগদীশচন্দ্র খুব খুশি হয়ে ১৯০১ সালের ২৫ জুলাই তারিখে লিখেছেন:
          "তুমি যে গত মাসে আমার কার্যের আভাস বঙ্গদর্শনে লিখিয়াছিলে তাহা অতি সুন্দর হইয়াছে তুমি যে এত সহজে বৈজ্ঞানিক সত্য স্থির রাখিয়া এরূপ সুন্দর করিয়া লিখিতে পার, ইহাতে আমি আশ্চর্য হইয়াছি[7]
          নিবেদিতাও যে এই প্রশংসার কিছুটা দাবিদার সেটা স্বয়ং রবীন্দ্রনাথও কোনদিন সরাসরি জানাননি জগদীশচন্দ্রকে
          ১৯০১ সালে রয়েল সোসাইটির প্রসিডিংস-এ তিনটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয় জগদীশচন্দ্রের। সেগুলো যথাক্রমে: (১) On the continuity of effect of light and electric radiation in matter, (২) On the similarities between radiation and mechanical strains, (৩) On the strain theory of photographic action.
            প্রবন্ধগুলোতে আলোক ও অদৃশ্য বেতার-তরঙ্গের সদৃশ-ধর্ম নিয়ে পরীক্ষালব্ধ ফলাফল আলোচিত হয়েছে।
          রয়্যাল ইন্সটিটিউটে যে গবেষণাপত্র উপস্থাপন করেছিলেন তা রয়েল সোসাইটি থেকে প্রকাশের চেষ্টা করলেন জগদীশচন্দ্র। কিন্তু রয়েল সোসাইটির নিয়ম হলো তাদের প্রসিডিংস-এ প্রকাশ করতে হলে তাদের সোসাইটির মিটিং-এ প্রবন্ধ উপস্থাপন করতে হবে। তাই ১৯০১ সালের ৬ই জুন রয়্যাল সোসাইটিতে On the electrical response of inorganic substances শীর্ষক বক্তৃতা দেন জগদীশচন্দ্র। কথা ছিল শারীরবিজ্ঞানীদের পক্ষ থেকে কোন আপত্তি না থাকলে জীব ও জড়ের সাড়া বিষয়ক গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হবে রয়েল সোসাইটি থেকে। কিন্তু রয়্যাল সোসাইটির অধিবেশনে শারীরবিজ্ঞানীদের পক্ষ থেকে ব্যাপক বিরোধিতার সম্মুখীন হলেন জগদীশচন্দ্র।
          তখন ইওরোপের সবচেয়ে বিজ্ঞ ফিজিওলজিস্ট বা শারীরবিজ্ঞানী হিসেবে যাঁকে মনে করা হতো তিনি ছিলেন স্যার জন বার্ডন স্যানডারসন। তিনি আলেকজান্ডার ফ্লেমিং এর আগেই পেনিসিলিয়াম নিয়ে গবেষণা করেছিলেন। ১৯০১ সালে তাঁর বয়স ছিল ৭৩ বছর।


জন স্যানডারসন

আর তাঁর পরেই ফিজিওলজিস্ট হিসেবে যাঁর স্থান তিনি ছিলেন অগাস্টাস ওয়ালার। তাঁর বাবা অগাস্টাস ভলিনি ওয়ালারও বিখ্যাত শারীরবিজ্ঞানী ছিলেন। অগাস্টাস ওয়ালার ছিলেন জগদীশচন্দ্রের চেয়ে বয়সে মাত্র দু'বছরের বড়। ইলেকট্রোকার্ডিওগ্রাফির পথিকৃৎ ছিলেন অগাস্টাস ওয়ালার। প্যারিস কংগ্রেসের সময়েই জগদীশচন্দ্রের সাথে ওয়ালারের পরিচয়। জগদীশচন্দ্রের গবেষণাধারার সাথে ওয়ালারের ধারার বেশ মিল আছে। ওয়ালার সম্পর্কে জগদীশচন্দ্র লিখেছেন:

           
"তিনিও জীবনের অনুভূতিরেখা প্রসারিত করিতে প্রয়াসী। তিনি প্রমাণ করিতেছেন যে, বৃক্ষেও অনুভূতি আছে, বীজেও রোপণ করিবার কয়দিন পর হইতে অনুভূতি শক্তি বিকাশ পায়। এই স্থানেই জীবন ও মরণের প্রভেদ-রেখা। এ-স্থলে বলা আবশ্যক, অন্যান্য physiologist-রা এই সামান্য বিষয়টি গলাধঃকরণ করিতে পারিতেছেন না। Waller-কে বাতুল শ্রেণীর মধ্যে গণ্য করেন। এই সব কারণে উক্ত Waller-এর স্বভাব অতিশয় কোপন হইয়াছে। কাহারও সঙ্গে তর্ক হইলেই হাতাহাতির কাছাকাছি। উক্ত Waller-এর একজন সহকর্মীর সহিত আমার একজন ভক্তের অল্পদিন হইল ঘোরতর সংগ্রাম হইয়াছে। বন্ধুরা বলিলেন যে, অন্তঃত কয়েকমাস পর্যন্ত Waller কিংবা তাঁহার ভক্তের সংস্পর্শে আসা আমার পক্ষে অস্বাস্থ্যকর হইবে।"


অগাস্টাস ওয়ালার
 ওয়ালারের সাথে জগদীশচন্দ্রের তত্ত্বের মূল পার্থক্য ছিল জীব ও জড়ের মধ্যে পার্থক্য সংক্রান্ত। ওয়ালার বিশ্বাস করতেন যে জীবন ও মৃত্যুর মধ্যে একটা সীমারেখা আছে। আর জগদীশচন্দ্র প্রমাণ করার চেষ্টা করছিলেন যে জীবন ও মৃত্যুর মধ্যে কোন সীমারেখা নেই। তাঁর মতে অনুভূতির সীমা জীব থেকে জড়ের মধ্যে অবিচ্ছিন্নভাবে প্রসারিত। চিন্তা ও বিশ্বাসের পার্থক্য থাকলেও জগদীশচন্দ্র যেভাবে বর্ণনা করেছেন ওয়ালারের সেরকম স্বভাবের কোন প্রত্যক্ষ প্রমাণ তিনি তখনো পাননি। বরং জগদীশচন্দ্রের সাথে তিনি খুব বন্ধুত্বপূর্ণ ব্যবহারই করেছেন।
          জগদীশচন্দ্র ওয়ালারের ল্যাবোরেটরি দেখতেও গিয়েছিলেন। ওয়ালার জগদীশচন্দ্রকে বলেছিলেন, "It appears that your work will probably upset mine. Truth is truth and I don't care, if I am proved to be in the wrong. So come and work; I will place my laboratory at your disposal. Teach me or let us work together."
            রয়েল সোসাইটিতে জগদীশচন্দ্রের বক্তৃতা শুনতে এসেছিলেন প্রফেসর ওয়ালার। সাথে নিয়ে এসেছিলেন তাঁর গুরু অক্সফোর্ডের স্যার স্যানডারসনকে। শারীরবিদ্যায় এই দু'জনের কথার বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস তখন কারো হতো না। জগদীশচন্দ্রের বক্তৃতার পর স্যানডারসন বললেন - পদার্থের অনুভূতি সম্পর্কে গবেষণা শারীরবিজ্ঞানীদের কাজ, পদার্থবিজ্ঞানীর নয়। সুতরাং জগদীশচন্দ্র অনধিকারচর্চা করছেন। বৈদ্যুতিক উত্তেজনায় উদ্ভিদের সাড়া সম্পর্কে জগদীশচন্দ্র যা বলেছেন তা অবিশ্বাস্য। সাড়ার বদলে প্রতিক্রিয়া বললে হয়তো ঠিক আছে, কিন্তু সাড়া কিছুতেই নয় - reaction  হয়তো হতে পারে, কিন্তু response কিছুতেই নয়। কিন্তু জগদীশচন্দ্র কিছুতেই একমত হলেন না স্যানডারসনের সাথে। স্যানডারসন এরকম সরাসরি বিরোধিতায় অভ্যস্ত নন, ভীষণ ক্ষুব্ধ হলেন জগদীশচন্দ্রের ওপর। আর ওয়ালার তো জড় ও জীবের মধ্যে সাড়ার যে সাদৃশ্য আছে তা মানতেই নারাজ।
          এ প্রসঙ্গে পরে জগদীশচন্দ্র লিখেছেন:
            "উচ্ছ্বসিত প্রশংসাধ্বনির মধ্যে আমার নিবন্ধ পাঠ ও পরীক্ষা প্রদর্শন শেষ হলো। স্যানডারসন উঠে ভূয়সী প্রশংসা করে বললেন - পদার্থবিদের কাছে নিঃসন্দেহে আমার কাজের যথেষ্ঠ মূল্য আছে। তবে জড়পদার্থের চেতনার সমর্থনে আমি যে পরীক্ষাগুলো প্রদর্শন করেছি, জৈব প্রক্রিয়ার সঙ্গে তাদের কিছুটা বাহ্যিক মিল আছে মাত্র। এরপর ডক্টর ওয়ালারের বিরূপ সমালোচনার উত্তর দিতে গিয়ে আমি মৃদু বিরক্তির সুরেই বললাম - জড় ও জৈব প্রকৃতির মধ্যে কিছুমাত্র সাদৃশ্য থাকতে পারে না - একে ধ্রুবসত্য বলে মেনে নেওয়ার অন্ধ প্রবৃত্তির কোনও জবাব দেওয়া নিষ্প্রয়োজন। আমি নিশ্চিত বুঝতে পারলাম, আজ থেকে দু'জন লব্ধপ্রতিষ্ঠ শারীরবিজ্ঞানী আমার ঘোর শত্রু হয়ে দাঁড়ালেন। কিন্তু আমি তাতে মোটেই বিচলিত নই।"
          'বিচলিত নই' বললেও বিচলিত হবার অনেক কারণ ঘটলো জগদীশচন্দ্রের। রয়্যাল সোসাইটি তাঁর পেপার প্রকাশ করছে না। শারীরবিজ্ঞানীদের বিরোধিতা বাড়ছে। এদিকে ছুটিও শেষ হয়ে আসছে। এ অবস্থায় দেশে ফিরে গেলে ইংল্যান্ডে প্রচারিত হবে যে জগদীশচন্দ্র হেরে যাবার ভয়ে পালিয়ে গেছেন। তার প্রতিক্রিয়া দেশে গিয়েও পৌঁছাবে। ফলে বর্তমানে দেশ থেকে যে সুযোগ সুবিধা পাচ্ছেন তাও বন্ধ হয়ে যাবে। তখন তাঁর বিজ্ঞানসাধনার বিলুপ্তি ঘটবে। আবার দেশের চাকরি ছেড়ে দিয়ে এদেশে থেকে যাবার দরকার হয়ে পড়ে যদি! তবে কি তাঁর আগের অবস্থান থেকে সরে আসা হবে না?
          জগদীশচন্দ্রের জন্য বন্ধু রবীন্দ্রনাথও বিচলিত। জগদীশ নিজের দেশেই কাজ করতে চান জেনে ১৯০০ সালের ২০ নভেম্বর রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন:
          "তুমি এদেশে থেকেই যদি কাজ করতে চাও তোমাকে কি আমরা সকলে মিলে স্বাধীন করে দিতে পারিনে? কিন্তু তুমি সাহস করে এ প্রস্তাব কি গ্রহণ করবে? পায়ে বন্ধন জড়িয়ে পদে পদে লাঞ্ছনা সহ্য করে তুমি কাজ করতে পারবে কেন? আমরা তোমাকে মুক্তি দিতে ইচ্ছা করি- সেটা সাধন করা আমাদের পক্ষে যে দুরূহ হবে তা আমি মনে করিনে।"
          কিন্তু জগদীশ সেদিন রবীন্দ্রনাথের প্রস্তাবে সাড়া দেননি। এখন জগদীশের আরো কিছুদিন বিদেশে থেকে যাওয়ার প্রয়োজন শুনে ২১/৫/১৯০১ তারিখে রবীন্দ্রনাথ লিখলেন:
          "যদি পাঁচ-ছ'বছর তোমাকে বিলাতে থাকতে হয় তুমি তারই জন্য প্রস্তুত হোয়ো, অনর্থক ভারতবর্ষের ঝঞ্ঝাটের মধ্যে এসে কাজ নষ্ট কোরো না। ... ... আমার কাছে লেশমাত্র সংকোচ কোরো না। বৎসরে তোমাকে কত পরিমাণে দিলে তুমি বিনা বেতনে দীর্ঘ ছুটি নিতে পার আমাকে লিখো।"
          ৪/৬/১৯০১ তারিখে আবার লিখলেন রবীন্দ্রনাথ:
          "তোমাকে বারম্বার মিনতি করিতেছি - অসময়ে ভারতবর্ষে আসিবার চেষ্টা করিও না। তুমি তোমার তপস্যা শেষ কর - দৈত্যের সহিত লড়াই করিয়া অশোকবন হইতে সীতা-উদ্ধার তুমিই করিবে, আমি যদি কিঞ্চিৎ টাকা আহরণ করিয়া সেতু বাঁধিয়া দিতে পারি, তবে আমিও ফাঁকি দিয়া স্বদেশের কৃতজ্ঞতা অর্জন করিব।"
          জগদীশচন্দ্র ডেপুটেশানের মেয়াদ বাড়ানোর জন্য আবেদন করলেন ভারত সরকারের কাছে। কিন্তু রয়্যাল সোসাইটি যে জগদীশচন্দ্রের গবেষণাপত্র প্রত্যাখ্যান করেছে তার খবর ভারতে পৌঁছে গেছে। ডেপুটেশান বাড়ানোর দরখাস্ত না-মঞ্জুর হলো। তারপর জগদীশচন্দ্র ছুটির দরখাস্ত করলেন। স্যার উডবার্ন তখনো তাঁকে সমর্থন করে যাচ্ছেন। উডবার্নের সুপারিশে জগদীশচন্দ্র বিনা বেতনে ছুটি পেলেন।
          অর্থকষ্টে পড়লেন জগদীশচন্দ্র। বিদেশে সঞ্চিত অর্থে আর ক'দিন চলা যায়। রবীন্দ্রনাথ চেষ্টা করছেন জগদীশচন্দ্রের জন্য অর্থ সংগ্রহ করতে। এসময় ত্রিপুরার মহারাজার কান-ভারী করেছেন অনেকেই রবীন্দ্রনাথ ও জগদীশচন্দ্র সম্পর্কে। রবীন্দ্রনাথ তারপরও অনেকটা আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে "ইহা কেবল বন্ধুত্বের কার্য নহে, স্বদেশের কার্য" এই বলে আবার হাত পাতলেন ত্রিপুরার মহারাজের কাছে। তিনি মহারাজাকে লিখলেন:
          "জগদীশবাবুর জন্য কিছু করবার সময় অগ্রসর হইতেছে। তাঁহার বিজ্ঞানালোচনার সঙ্কটকাল উপস্থিত হইয়াছে। তিনি যে উচ্চের দিকে উঠিতেছিলেন পরাধীনতা ও বাহিরের বাধায় তাঁহাকে হঠাৎ নিরস্ত করিলে আমাদের পক্ষে ক্ষোভ ও লজ্জার সীমা থাকিবে না। ... আমার একান্ত আন্তরিক মঙ্গল উদ্দেশ্যের প্রতি প্রসন্ন দৃষ্টি রক্ষা করিবেন।"[8]
          রবীন্দ্রনাথের উদ্যোগে সাড়া দিয়ে ত্রিপুরার মহারাজ জগদীশচন্দ্রের জন্য ১৯০১ সালের অক্টোবর-নভেম্বর মাসে দশহাজার টাকা পাঠাতে প্রতিশ্রুতি দেন
          এদিকে নিবেদিতা জগদীশকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন বিদেশ জগদীশের জন্য চাকরি চেষ্টা করছেন নিবেদিতা- যেন নিরূপদ্রবে গবেষণা করতে পারেন তিনি ইওরোপের যে কোন জায়গায় এমনকি আমেরিকাতেও! তিনি বিশ্বাস করেছিলেন চাকরিসূত্রে বা অন্যভাবে ইওরোপে বা আমেরিকায় কিছুকাল বাস করলে . বসুর গবেষণা স্বীকৃতিলাভের পক্ষে সুবিধাজনক হতো জগদীশচন্দ্র নিজের দেশে থেকে কাজ করতে চান এটা তিনি জানেন। জগদীশের এই দেশপ্রেমকে খুব শ্রদ্ধা করতেন নিবেদিতা তিনি বুঝতে পারছিলেন ভারতের বাইরে মন টিকবে না জগদীশের নিবেদিতা চেষ্টা শুরু করলেন দেশের ভিতর যদি কোন ব্যবস্থা করা যায় জগদীশের জন্য দেশীয় রাজাদের মধ্যে কেউ যদি জগদীশের গবেষণার খরচ যোগানের দায়িত্ব নেন তাহলে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যায় নিবেদিতা চাচ্ছিলেন যে, কোনভাবে ভারতে যদি জগদীশচন্দ্রকে ধারণ করতে পারার মতো একটা স্থায়ী প্রতিষ্ঠান গড়ে ঠে তাহলে জগদীশ অর্থের চিন্তা না করে বিজ্ঞানচর্চাটা করতে পারবেন নির্বিঘ্নে
          ভারতের শিল্পপতি জামশেদজি টাটা ভারতীয়দের জন্য ভারতীয় মূলধনে এবং মূলত ভারতীয়দের নিয়ন্ত্রণে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করার প্রস্তাব দিয়েছেন ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় অনুমতি লাভের জন্য তখন তিনি লন্ডনে এসেছেন নিবেদিতা তখন জামসেদজির সাথে দেখা করে জগদীশচন্দ্র সম্পর্কে তাঁকে বলেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ব্যাপারে কোন সহায়তা করতে পারলে করার চেষ্টা করেন
          তখন ব্রিটিশ সরকারের ভারতীয় শিক্ষা সংক্রান্ত নীতি নির্ধারক ছিলেন স্যার জর্জ বার্ডউড উচ্চপদস্থ আমলাদের সাথে কথা বলতে হলে সবচেয়ে কার্যকরী ব্যবস্থা হলো কোন প্রভাবশালীর বাড়িতে পার্টি দেয়া নিবেদিতা সারা বুলকে ধরে পার্টির ব্যবস্থা করলেন সারা বুল পার্টির আয়োজন করে নিমন্ত্রণ করলেন স্যার বার্ডউডকে এদিকে নিবেদিতা জামশেদজী টাটাও উপস্থিত বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের ব্যাপারে অনেকদূর কথাবার্তা হলো কিন্তু ব্রিটিশ সরকার চায় বিশ্ববিদ্যালয়ের খরচ ভারতীয়রা অর্থাৎ টাটা কোম্পানি দেবে, কিন্তু কর্তৃত্ব থাকবে ব্রিটিশ সরকারের হাতে নিবেদিতা যুক্তি দেখালেন- বোম্বে, মাদ্রাজ, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় যে সরকারের হাতে আছে সেখানে তো গবেষণা করার কোন সুযোগই তৈরি হচ্ছে না শেষ পর্যন্ত আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় টাটার বিশ্ববিদ্যালয় প্রকল্প ফলপ্রসু হয়নি তখন [আরো অনেকবছর পরে অবশ্য টাটা ফান্ডামেন্টাল রিসার্চ সেন্টার প্রতিষ্ঠা করেছে হোমি ভাবার নেতৃত্বে সেটা ভারত স্বাধীন হবার পর]
          নিবেদিতা জগদীশচন্দ্রকে বোঝাতে শুরু করলেন বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের প্যাটেন্ট থাকার গুরুত্ব। অর্থকষ্টে পড়ে জগদীশচন্দ্রও বুঝতে পারেন তাঁর আবিষ্কারগুলোর প্যাটেন্ট থাকলে সেখান থেকেই এখন কত অর্থ আসার সম্ভাবনা ছিল। তাঁর মনে পড়ে প্যাটেন্ট করার ব্যাপারে তাঁর কঠিন মনোভাবের কথা।
          বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারকে অর্থ উপার্জনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করার ঘোর বিরোধী ছিলেন তিনি। ১৮৯৫-৯৬ সালে তাঁর মাইক্রোওয়েভ ও কোহেরারের প্যাটেন্ট তিনি নিতে পারতেন। কিন্তু তিনি কোন আগ্রহ দেখাননি। রয়েল ইনস্টিটিউটের বক্তৃতার পর লন্ডনের দি ইলেকট্রিক ইঞ্জিনিয়ার পত্রিকায় জগদীশচন্দ্রের প্রশংসার পাশাপাশি এই মন্তব্যও প্রকাশিত হয়েছিল:
           Surprise that no secret was at anytime made as to its construction, so that it has been open to all the world to adopt it for practical and possibly money making purposes
          শুধু তাই নয় লন্ডনের বিখ্যাত টেলিগ্রাফ কোম্পানির মালিক নিজে প্যাটেন্ট ফরম নিয়ে এসে জগদীশচন্দ্রের সাথে দেখা করে অনুরোধ করেছিলেন প্যাটেন্ট করানোর জন্য। তিনি এমনও বলেছিলেন:
          There is money in it - let me take our patent for you. You do not know what money you are throwing away. I will only take half share in the profit - I will finance it.
          এ প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথকে লেখা চিঠিতে জগদীশচন্দ্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন:
            এই ক্রোড়পতি, আর কিছু লাভ করিবার জন্য আমার নিকট ভিক্ষুকের ন্যায় আসিয়াছে। বন্ধু, তুমি যদি এ দেশের টাকার উপর মায়া দেখিতে- টাকা, টাকা, কি ভয়ানক সর্বগ্রাসী লোভ। আমি যদি এই যাঁতাকলে একবার পড়ি তাহা হইলে উদ্ধার নাই। দেখ, আমি যে কাজ লইয়া আছি তাহা বাণিজ্যের লাভালাভের উপরে মনে করি। আমার জীবনের দিন কমিয়া আসিতেছে, আমার যাহা বলিবার তাহারও সময় পাই না, আমি অসম্মত হইলাম।
          নিবেদিতা এক প্রকার জোর করেই জগদীশচন্দ্রকে প্যাটেন্টের দরখাস্ত করার জন্য রাজি করালেন। মিসেস সারা বুলই সব কাজ করলেন জগদীশের হয়ে। আমেরিকান প্যাটেন্ট অফিসে একটি এবং ইংল্যান্ড প্যাটেন্ট অফিসে দুটো দরখাস্ত পাঠানো হলো। আমেরিকার প্যাটেন্ট অফিস থেকে পাওয়া প্যাটেন্টের কথা সবাই জানতেন, কিন্তু ইংল্যান্ডের অফিস থেকে করানো প্যাটেন্ট দুটোর কথা গোপনই ছিল প্রায়। ২০০৮ সালে প্রবীর বন্দ্যোপাধ্যায় ও সুচন্দা ব্যানার্জি ইন্ডিয়ান জার্নাল অব হিস্ট্রি অব সায়েন্স জার্নালে প্রথম এই প্যাটেন্টদুটোর কথা জানান।[9]
          জগদীশচন্দ্রের প্রথম প্যাটন্ট ছিল গ্যালেনা ডিটেক্টরের। এটা ছিল মূলত ডায়োড ডিটেক্টর। অথচ সেমিকন্ডাক্টরের ডায়োড শব্দটিই তখনো চালু হয়নি। প্যাটেন্টটির জন্য ইউ এস প্যাটেন্ট অফিসে দরখাস্ত করা হয়েছিল ১৯০১ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর। ইউ এস প্যাটেন্ট নম্বর: 755,840. ১৯০৪ সালের ২৯ মার্চ "Detector for Electrical Disturbances"-এর প্যাটেন্ট পান জগদীশচন্দ্র। তাঁর এই প্যাটেন্ট ছিল পৃথিবীতে সলিড স্টেট ফিজিক্সের প্রথম পেপার। আইনি কারণে প্যাটেন্টের অর্ধেক অধিকার দেয়া হয় আমেরিকান নাগরিক সারা বুলকে।



গ্যালেনা ডিটেক্টরের প্যাটেন্টের সার্টিফিকেট ও চিত্র


          সারা বুল ইংল্যান্ড থেকে জগদীশচন্দ্রকে যে দুটো প্যাটেন্ট নিয়ে দিয়েছিলেন সে সেদুটো হলো:
            (1) J. C. Bose, "Improvements in and connected with wireless telegraphy and other signaling", British Patent No. 15,467. Date of Application: 30th July, 1901. Complete specification left: 31st May, 1902. Accepted: 30th July 1902.
            (2) J. C. Bose, "Improved means or apparatus for detecting or indicating light waves, Hertzian waves and other radiations". British Patent No. 18,430. Date of application:14th September, 1901. Complete specification left: 16th June 1902. Accepted: 7th August 1902.






দুটো প্যাটেন্টই ছিল সলিড স্টেট ডায়োড ডিটেক্টরের। যদিও 'ডায়োড' শব্দটি তখনো চালুই হয়নি। প্যাটেন্টদুটোর মেধাস্বত্ব (Intellectual Property Rights - IPR) দেয়া হয়েছে মিসেস সারা বুলের নামে, আর ইনভেন্টর হিসেবে নাম আছে জগদীশচন্দ্রের। ব্রিটিশ প্যাটেন্ট অফিস থেকে জানা যায় প্রফেসর বোস ও মিসেস বুল একসাথে দরখাস্ত করেছেন মোট পাঁচবার।[10] প্রথম দরখাস্ত (No. 9697) করা হয় ১৯০১ সালের ৯ মে, ২য় দরখাস্ত (No. 15467) করা হয় ৩০ জুলাই, ৩য় দরখাস্ত (No. 18267), ৪র্থ দরখাস্ত (No. 18268) ও ৫ম দরখাস্ত (No. 18430) করা হয় যথাক্রমে ১২, ১৪ ও ১৮ সেপ্টেম্বর ১৯০১। এই পাঁচটি দরখাস্ত থেকে দুটো প্যাটেন্ট রেজিস্ট্রেশান হয় জগদীশচন্দ্র ও সারা বুলের নামে।
          এই দুটো প্যাটেন্টের কথা জগদীশ কেন সেই সময় কাউকে জানতে দেননি তা এখনো অজানা। বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারকে বাণিজ্যিক পণ্যে রূপান্তরিত করতে চাননি বলেই হয়তো কাউকে জানাননি কিছু। আগ্রহের অভাবে পরে তাঁর কোন প্যাটেন্টই আর নবায়ন করা হয়নি।
          পরপর কয়েকটা পেপার রয়েল সোসাইটি কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হবার পর জগদীশ সিদ্ধান্ত নেন বিদেশী জার্নালের মুখাপেক্ষী না থেকে বই লিখে নিজের বইতেই সবকিছু প্রকাশ করবেন প্রথম বইResponse in the living and Non-livingলেখার প্রস্তুতি শুরু হলো
          জগদীশ তাঁর বক্তব্য নিবেদিতাকে বলেন, নিবেদিতা নিজের জোরালো ইংরেজিতে তা লিখতে থাকেন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত খেটে চলেছেন নিবেদিতা জগদীশের বই রচনায় 
          এদিকে ভারতে অনেক কাজ পড়ে রয়েছে নিবেদিতার শারীরিকভাবে অসুস্থ বিবেকানন্দের তখন দরকার নিবেদিতাকে কিন্তু জগদীশের প্রথম বই লিখে দেয়ার জন্য নিবেদিতাকে ইংল্যান্ডে থেকে যেতে হচ্ছে জগদীশচন্দ্র কিছুতেই নিবেদিতাকে সেই সময় ভারতে ফিরতে দিতে রাজি নন
          বিবেকানন্দকে কীভাবে বোঝাবেন নিবেদিতা? বিবেকানন্দের এক আত্মীয় রমেশচন্দ্র দত্ত ছিলেন জগদীশের বিশেষ বন্ধু তিনি বিবেকানন্দকে এই বলে চিঠি লিখলেন যে ভারতের মঙ্গলের জন্যই নিবেদিতার আরো কিছুদিন ইংল্যান্ডে থেকে যাওয়া দরকার
          নিবেদিতা দ্রুত লিখে চলেছেন জগদীশের প্রথম বই ‘Response in the Living and Non-Living’. বইটি সম্পর্কে এবং জগদীশের কাজ সম্পর্কেও ফিচার লিখেছেন নিবেদিতা এই সময়ে ইংল্যান্ডের বিখ্যাতReview of Reviews’ এও নিবেদিতা লেখেন জগদীশ সম্পর্কে
          বইটির সব কাজ শেষ করে প্রকাশকের হাতে দিয়ে নিবেদিতাকে তড়িঘড়ি করে ভারতে ফিরতে হয় ১৯০২ সালের জানুয়ারি কিন্তু জগদীশচন্দ্র নিবেদিতার উপর অভিমান করে বসেন তাঁর মনে হতে থাকে, “আমার সাফল্যের চেয়ে ভারতই তোমার বড় হল?” অভিমানে নিবেদিতার সাথে সমস্ত যোগাযোগ বন্ধ করে দেন জগদীশ[11]
         
নিবেদিতার উপর জগদীশের অভিমান বড়ই অযৌক্তিক অথচ নিবেদিতা ভারতে ফিরে এসে যেখানেই যাচ্ছেন সুযোগ পেলেই জগদীশের কথা বলছেন ১৯০২ সালের ফেব্রুয়ারি মাদ্রাজে নিবেদিতা রমেশচন্দ্র দত্তকে একটা সম্বর্ধনা দেয়া হয় নিবেদিতা সেখানে বলেনআসুন, মাতৃভূমির অপর এক বিশ্বস্ত সন্তানের কথা বলি, যিনি বহুদূরে একাকী কাজ করে যাচ্ছেন, যাঁকে সমগ্র দেশবাসীর পক্ষ থেকে স্মরণ করা প্রয়োজন প্রতিদিনের প্রেম প্রার্থনায় আমি অধ্যাপক জগদীশচন্দ্র বসুর কথাই বলছি এরপর ১৯০২ সালের ২১ মার্চ কলকাতার ক্লাসিক থিয়েটারে দেয়া তাঁরবিজ্ঞানে হিন্দু মনশীর্ষক বক্তৃতাতেও তিনি জগদীশের কথাই বলেন এমনকি জুলাই মাসে বিবেকানন্দের মৃত্যুর পরেও নিবেদিতা যেখানেই গেছেন সুযোগ পেলেই জগদীশের কথাই বলেছেন
          বিশিষ্ট উদ্ভিদবিজ্ঞানী প্রফেসর সিডনি ভাইন্‌স ছিলেন জগদীশচন্দ্রের শিক্ষক। কেমব্রিজে পড়ার সময় তাঁর সংস্পর্শে এসেছিলেন জগদীশ। ১৯০০ সালে তিনি লিনিয়ান সোসাইটির সভাপতি হয়েছেন। বইয়ের পান্ডুলিপি তৈরি হয়ে যাবার পর নিবেদিতা যখন দেশে ফিরে গেছেন, তখন জগদীশচন্দ্র ভাইন্‌সের সাথে দেখা করে তাঁর গবেষণার কথা বললেন। একদিন ভাইন্‌স তাঁর কয়েকজন সহকর্মী সহ জগদীশচন্দ্রের গবেষণা দেখে গেলেন। ভাইন্‌স জানেন শারীরবিজ্ঞানীদের সাথে জগদীশের বিরোধের কথা। তিনি জগদীশচন্দ্রকে আমন্ত্রণ করলেন লিনিয়ান সোসাইটিতে একটি বক্তৃতা দেয়ার জন্য। তিনি এও বললেন যে জগদীশের প্রতিপক্ষকেও সেই বক্তৃতা শোনার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হবে।

প্রফেসর সিডনি ভাইন্‌স


১৯০২ সালের ২০ মার্চ লিনিয়ান সোসাইটিতে "On the electric response in ordinary plants under mechanical stimulus" শীর্ষক বক্তৃতা দেন জগদীশচন্দ্র। খুবই সাড়া ফেলে তাঁর সেই বক্তৃতা। জগদীশচন্দ্র নিজের বর্ণনায় লিখেছেন:
          "গত রাত্রির বক্তৃতার তুলনায় রয়্যাল ইন্সটিটিউশনের বক্তৃতা কিছুই নয়। আমি যেন সংগ্রামের নেশায় মেতে উঠেছিলাম। একটা প্রচন্ড বন্যাবেগের মত আমার তথ্য-বিশ্লেষণ ও পরীক্ষণ-সূক্ষ্মতা শ্রোতৃমন্ডলীকে নির্বাক করে দিল। আমি একা, প্রতিপক্ষ প্রবল, কিন্তু মহান সত্যকে রোধ করবার মত কতটুকু শক্তি আছে তাদের? পনেরো মিনিট ধরে বক্তৃতাকক্ষ উচ্ছ্বসিত প্রশংসাধ্বনিতে মুখরিত হয়ে রইলো। আমি নির্বিকার চিত্তে পরীক্ষা-সহযোগে তথ্যের পর তথ্য পরিবেশন করে গেলাম। সভাপতি শ্রোতৃমন্ডলীকে আহ্বান করলেন, আমার মতবাদ ও পরীক্ষা সম্পর্কে যদি কারও মনে সংশয় থাকে তা ব্যক্ত করতে; কিন্তু কেউ উঠে এলেন না।"
          প্রফেসর ওয়ালারের দলকে আমন্ত্রণ জানানো হলেও তাঁদের কেউ আসেননি লিনিয়ান সোসাইটিতে জগদীশচন্দ্রের বক্তৃতা শুনতে। প্রফেসর ভাইন্‌স লিনিয়ান সোসাইটির জার্নালে জগদীশচন্দ্রের গবেষণাপত্র প্রকাশের ব্যাপারে সম্মত হলেন। কিন্তু সেখানেও সমস্যা দেখা দিলো। কিছুদিন পরে জার্নাল রিভিউয়ারের পক্ষ থেকে জগদীশচন্দ্রকে জানানো হলো যে তাঁর পেপারটি প্রফেসর ওয়ালারের একটা পেপারের সাথে মিলে যাচ্ছে। ভীষণ অবাক হলেন জগদীশচন্দ্র। তিনি বুঝতে পারলেন কোথাও ষড়যন্ত্র চলছে তাঁর বিরুদ্ধে।
          ওয়ালারের পেপারটি পড়ে আরো অবাক হয়ে গেলেন জগদীশচন্দ্র। পেপারে প্রকাশিত বেশির ভাগ ফলাফলই যে তাঁর নিজের। কীভাবে সম্ভব হলো? রয়্যাল সোসাইটিতে তিনি যে পেপারটি জমা দিয়েছিলেন সেই পেপারটি থেকে জগদীশের ফলাফল নিয়ে পেপার লিখে প্রকাশ করেছেন ওয়ালার। পেপারটি প্রকাশিত হয়েছে রয়্যাল সোসাইটিতে জগদীশের বক্তৃতার প্রায় আট মাস পরে, আর লিনিয়ান সোসাইটিতে বক্তৃতা দেয়ার চার মাস আগে। এখন কিনা নিজের পেপারকেই অন্যের পেপার বলে মেনে নিতে হচ্ছে জগদীশচন্দ্রকে!
          জগদীশচন্দ্রের কাছে তাঁর পেপার ও রয়্যাল ইন্সটিটিউশানে বক্তৃতার কপি ছিল। লিনিয়ান সোসাইটির কাছে তা জমা দিয়ে জগদীশচন্দ্রকে প্রমাণ করতে হলো যে তিনি ওয়ালারের পেপার চুরি করেননি, বরং ওয়ালারই তাঁর পেপার চুরি করেছেন। মনটা খুবই খারাপ হয়ে গেলো জগদীশচন্দ্রের। এদিকে ওয়ালারও অভিযোগ করলেন যে জগদীশচন্দ্র যখন তাঁর ল্যাবোরেটরি দেখতে গিয়েছিলেন তখন তাঁর কাজ দেখে আইডিয়া চুরি করেছেন জগদীশ।
          তা সত্ত্বেও জগদীশচন্দ্রের কাজ থেমে নেই। তাঁর নতুন গবেষণার ফলাফল রয়্যাল সোসাইটি গ্রহণ করে প্রকাশ  করেছে। ১৯০২ সালের মে মাসে রয়েল সোসাইটির প্রসিডিংস-এ প্রকাশিত হলো জগদীশচন্দ্রের পরীক্ষামূলক পদার্থবিজ্ঞান সংক্রান্ত শেষ গবেষণাপত্র On electromotive wave accompanying mechanical disturbance in metals in contact with electrolyte
          এর পর থেকে তাঁর গবেষণা পুরোপুরি উদ্ভিদ ও প্রাণির শারীরবৃত্তীয় ধর্মাবলী পরীক্ষার দিকে মোড় নেয়। এরপর থেকে পদার্থবীজ্ঞানী জগদীশ বসুকে আমরা পেলাম পৃথিবীর প্রথম বায়োফিজিসিস্ট হিসেবে। তিনি উদ্ভিদের শারীরবৃত্ত সম্পর্কে গবেষণা করেছেন পদার্থবিদ্যার প্রয়োগ ঘটিয়ে। এই পদ্ধতির বিস্তৃত প্রয়োগে উদ্ভিদের প্রাণচক্র ও শারীরবৃত্তীয় প্রতিক্রিয়া সংক্রান্ত গবেষণার স্বীকৃতিস্বরূপ আমরা জগদীশ বসুকে চিনলাম উদ্ভিদবিজ্ঞানী হিসেবে।
          জুন মাসের দিকে লিনিয়ান সোসাইটিও তাঁর পেপার প্রকাশ করে। জগদীশচন্দ্র বেলফাস্ট বিশ্ববিদ্যালয়, হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়, ও ফটোগ্রাফিক সোসাইটিতে বক্তৃতা দেন। ফরাসী পদার্থবিজ্ঞান সমিতি তাঁকে সম্মানিত সদস্যপদ প্রদান করে।
          এত সব ভালো খবর তিনি রবীন্দ্রনাথকে লিখে জানান ২৭/৬/১৯০২ তারিখে: "এতদিন সংগ্রামে বিক্ষুব্ধ ছিলাম। তুমি শুনিয়া সুখী হইবে সর্বত্রই জয় সংবাদ। তোমার নিকট তিন খানা পুস্তিকা পাঠাই। তারিখ দেখিলে বুঝিবে ইহা এক বৎসর পূর্বে পঠিত হয়, এক বৎসর পরে গৃহীত হইল। জড়ের স্পন্দন সম্বন্ধে গত বৎসরের ঘটনা জান। পুনরায় এ-বৎসর Royal Societyতে আসিয়াছিলাম। এবার অনেক তর্কের পর আমার মতেরই জয় হইয়াছে।"
          প্রথম বই প্রকাশের কাজ প্রায় শেষ। ১৮/৭/১৯০২ তারিখে রবীন্দ্রনাথকে এ বিষয়ে খবর দিচ্ছেন জগদীশচন্দ্র:
          "রৌদ্র ও মেঘের ছায়া ক্রমাগত আমাদের হৃদয়পটে একে অন্যের অনুধাবন করিতেছে। আমার পুস্তকের শেষ প্রুফ লইয়া ব্যস্ত আছি। আর ৩/৪ সপ্তাহে পুস্তক মুদ্রিত হইবে। প্রুফ দেখিবার সময় গত দুই বৎসরের দারুণ সংগ্রামের কথা মনে হইয়া একান্ত ক্লিষ্ট হই। আমার এই দীর্ঘ যন্ত্রণার ফল যেন তোমাদের গ্রহণীয় হয়।"
          'আমার পুস্তক' বলার সময় জগদীশচন্দ্রের কি একবারও মনে হয়নি যে সেই পুস্তকের প্রতিটি লাইন নিবেদিতার লেখা? তিনি তাঁর বন্ধু রবীন্দ্রনাথকেও জানতে দেননি যে নিবেদিতা তাঁর বই লিখে দিয়েছেন।
     বার ইংল্যান্ড থেকে দেশে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন জগদীশচন্দ্র একটা নতুন খুশিতে তিনি আচ্ছন্ন। বিয়ের ১৫ বছর পর তিনি বাবা হতে চলেছেন। অবলা বসু সন্তানসম্ভবা ৩৮ বছর বয়সে প্রথম মা হতে গিয়ে বেশ কিছু শারীরিক জটিলতা দেখা দিয়েছে অবলার।
          জগদীশচন্দ্র দেশে ফেরার ব্যাপারে নিবেদিতাকে কিছু না জানালেও নিবেদিতা জানতে পেরেছেন মিসেস বুলের কাছ থেকে নিবেদিতা অপেক্ষা করে আছেন কখন জগদীশ অবলা ফিরবেন কত কথা জমা হয়ে গেছে তাঁর জগদীশকে বলার। কত ঘটনা ঘটে গেছে। স্বামী বিবেকানন্দের মৃত্যু হয়েছে  জুলাই মাসে। ১০ সেপ্টেম্বর ১৯০২ তারিখে মিস ম্যাকলাউডকে লিখেছেন নিবেদিতা, “Only I hope to stand on the Bombay pear and watch his ship come in.[12]
          ১৯০২ সালের ১২ অক্টোবর জগদীশচন্দ্র অবলা বসু বোম্বাই পৌঁছলেন খারাপ আবহাওয়ার কারণে জাহাজ আসতে দেরি হয়েছে নিবেদিতা আশা করেছিলেন তিনি জাহাজঘাটে তাঁদের অভ্যর্থনা করতে পারবেন কিন্তু জাহাজের দেরি হওয়াতে নিবেদিতাকে চলে যেতে হলো পূর্বনির্ধারিত বক্তৃতা দিতে নাগপুরে জগদীশ কলকাতায় ফেরার জন্য যদি নাগপুরের ট্রেনটি ধরেন- তাহলে নিবেদিতা নাগপুরে দেখা করতে পারেন তাঁদের সাথে কিন্তু জগদীশের ভেতর নিবেদিতার উপর রাগ তিনি কলকাতা যাবার জন্য এমন ট্রেন ধরলেন যেটা নাগপুর থামে না



[1] পরিব্রাজক; বিবেকানন্দ
[2] চিঠপত্র ষষ্ঠ খন্ড, ১০ সেপ্টেম্বর ১৯০০
[3] ২ নভেম্বর ১৯০০
[4] ৫ অক্টোবর ১৯০০
[5] রবীন্দ্ররচনাবলী, ১৫শ খন্ড, পশ্চিমবঙ্গ সরকার, ২০০০, পৃ; ৮০৪
[6] বঙ্গদর্শন, আষাঢ়, ও শ্রাবণ, ১৩০৮।
[7] চিঠিপত্র- ৬ষ্ঠ খন্ড, পৃ ১৯৬
[8] চিঠিপত্র ষষ্ঠ খন্ড পৃ ১৩৩-৩৪
[9] Probir K Bondyopadhyay and Suchanda Banerjee, Indian Journal of History of Science, 43, 1 (2008), p 57-72.
[10] British Patent Office, Illustrated Official Journal (Patents), May 15, 1901 Issue, pp 590, August 8, 1901 Issue, pp 976, September 18, 1901 Issue, pp 1164 & 1169.
[11] লোকমাতা ১ম খন্ড ২য় পর্ব, পৃঃ ২৮৯
[12] Letters of sister Nivedita, Vol. I., editor Sankari Prasad Basu, Nobabharot publishers, Calcutta, 1982. page 1503

No comments:

Post a Comment

Latest Post

Memories of My Father - Part 4

  This is my first photo taken with my father. At that time, I had just moved up to ninth grade, my sister was studying for her honors, and ...

Popular Posts