Friday 10 April 2020

জগদীশচন্দ্র বসু - পর্ব ২


আমাদের জগদীশ

উনিশ শতক পর্যন্ত ভারতীয় ইতিহাসে রাজনৈতিক উত্থান পতন ঘটেছে অনেক। এই সময়ে মুষ্টিমেয় কয়েকজন রাজা বাদশার পৃষ্ঠপোষকতায় সঙ্গীত ও শিল্প-সাহিত্যের কিছু উন্নতি হলেও পুরো দুই শ' বছরের মধ্যে ভারতীয় উপমহাদেশে বিজ্ঞান সাধনার কোন উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। জগদীশ বসুই প্রথম ভারতীয় বিজ্ঞানী যিনি ভারতে আধুনিক বিজ্ঞানের গবেষণায় ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন। জগদীশ বসুর হাত দিয়েই ভারতীয় উপমহাদেশে আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের গবেষণা শুরু হয়েছিল।
          উনিশ শতকের শেষের কয়েক বছরে পদার্থবিজ্ঞানের জগতে অনেকগুলো যুগান্তকারী আবিষ্কারের ঘটনা ঘটে যেগুলোর ভিত্তিতে বিংশ শতাব্দী হয়ে ওঠে বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার ও প্রযুক্তির স্বর্ণযুগ। ১৮৮৮ সালে হেনরিখ হার্টজ সর্বপ্রথম বেতার তরঙ্গ তৈরি করেন এবং তা সনাক্ত করার পদ্ধতি (ডিটেক্টর) আবিষ্কার করেন। ১৮৯৫ সালে উইলহেল্‌ম রন্টগেন এক্স-রে আবিষ্কার করেন। ১৮৯৬ সালে হেন্‌রি বেকোয়ারেল আবিষ্কার করেন রেডিও-অ্যাক্টিভিটি বা তেজষ্ক্রিয়তা। ১৮৯৭ সালে জেমস থমসন ইলেকট্রন আবিষ্কার করেন। সূত্রপাত হয় আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের এক নতুন যুগের। ইওরোপ আমেরিকার উন্নত গবেষণাগারে যখন ব্যাপক গবেষণা-যজ্ঞ চলছে সেই সময় ভারতের বিজ্ঞান-মরুতে গবেষণার ফল ফলানোর জন্য একাই লড়ে চলেছেন জগদীশচন্দ্র।
          এক্স-রে আবিষ্কারের পরপরই জগদীশচন্দ্র তাঁর নিজের পরীক্ষাগারে এক্স-রে উৎপাদন করেন। শুধু তাই নয়, এক্স-রে'র সাহায্যে যে শরীরের রোগ নির্ণয় করা যায় তার সফল প্রয়োগ উপমহাদেশে সর্বপ্রথম শুরু করেন জগদীশচন্দ্র। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে আহত সৈনিকদের শরীরে এক্স-রে প্রয়োগ করে বিশ্বের প্রথম চিকিৎসা-পদার্থবিজ্ঞানী (Medical Physicist) হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন মেরি কুরি। মেরি কুরির জন্মদিন ৭ই নভেম্বরকে 'ইন্টারন্যাশনাল মেডিক্যাল ফিজিক্স ডে' ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু মেরি কুরিরও অনেক আগে জগদীশচন্দ্র কলকাতায় এক্স-রে দিয়ে রোগীর শরীরের ছবি তুলতে শুরু করেছিলেন। ডাক্তার নীলরতন সরকার তাঁর রোগীদের জগদীশচন্দ্রের কাছে পাঠাতেন এক্স-রে করার জন্য। ১৮৯৯ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে লেখা জগদীশচন্দ্রের এক চিঠিতে তার প্রমাণ মেলে:
          "যদি পারেন তাহা হইলে সকালে ৮টার সময় প্রেসিডেন্সি কলেজ হইয়া আসিবেন। রঞ্জেন কলে একজন রোগী দেখিতে হইবে। তাহার পৃষ্ঠভঙ্গ হইয়াছে। ডাক্তার নীলরতন সরকারের কথা এড়াইতে পারিলাম না।"[1]
          নতুন যন্ত্র প্রস্তুত করার ব্যাপারে আশ্চর্য দক্ষতা ছিল জগদীশচন্দ্রের। বিজ্ঞানের সঠিক ব্যবহার তিনি যে কোন ব্যাপারেই করতে পারতেন। ১৯০৩ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মেজ মেয়ে রেণুকা খুব অসুস্থ। অক্সিজেন দেয়া দরকার। তখন অক্সিজেন সহজলভ্য ছিল না। জগদীশচন্দ্র ভাবলেন আবেশ-কুন্ডলির (induction coil) সাহায্যে অক্সিজেনের মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ-চালনা করলে অক্সিজেন আংশিকভাবে ওজোনে (O3) পরিণত হয়। ওজোন মিশ্রিত অক্সিজেন থেকে আয়নিত অবস্থায় যে অক্সিজেন পাওয়া যায় তা শ্বাসকষ্ট দূর করার পক্ষে সহায়ক। জগদীশচন্দ্র এই কাজের জন্য একটা যন্ত্র বানিয়ে রবীন্দ্রনাথকে পাঠিয়েছিলেন।
          ধরতে গেলে তাঁর হাতেই সলিড স্টেট ফিজিক্সের সূত্রপাত হয়েছে সময়ের অনেক আগেই। সলিড স্টেট ফিজিক্সের প্রথম পেপার লিখেছিলেন তিনি। যদিও পরবর্তীতে যখন সেমিকন্ডাক্টর ফিজিক্সের দ্রুত উন্নয়ন ঘটেছে জগদীশচন্দ্র আর সেদিকে যাননি। তবুও আমরা গর্ব করি এটুকু জেনে যে একশ' বছর আগেই সলিড স্টেটের প্রথম গবেষণাপত্রটি রচিত হয়েছিল কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে জগদীশচন্দ্র বসুর হাতে।
            আধুনিক ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতিতে 'ওয়েভ-গাইড' একটি অতিপরিচিত শব্দ। কিন্তু এক শ' বছর আগে এই ওয়েভ-গাইড বলে কিছু ছিল না। ১৮৯৭ সালে জগদীশচন্দ্র রয়্যাল ইন্সটিটিউশানে পোলারাইজেশান অব ইলেকট্রিক রে বিষয়ক যে বক্তৃতা দিয়েছিলেন সেখানে যে যন্ত্র ব্যবহার করেছিলেন সেই যন্ত্র ছিল সময়ের তুলনায় খুবই আধুনিক। সেখানে তিনি একটি শক্তি বিকিরণকারী নলের ব্যবহার করেছিলেন। সেই নলটিই আজ মাইক্রোওয়েভ বিজ্ঞানীদের কাছে পৃথিবীর প্রথম "ওভারমোডেড ওয়েভগাইড" হিসেবে স্বীকৃত।[2]
          জগদীশচন্দ্র বসু তাঁর গবেষণায় যে ফলাফল পেয়েছিলেন এবং যেসব যন্ত্রপাতি আবিষ্কার করেছিলেন আজ তার শতাধিক বছর পর আমরা সেখান থেকে নতুন নতুন বৈজ্ঞানিক ক্ষেত্র আবিষ্কার করতে পেরেছি। প্ল্যান্ট নিউরোবায়োলজি, ক্রোনোবায়োলজি, ভেজিটেবল ইলেকট্রিসিটি ইত্যাদি সবকিছুরই পথিকৃৎ ছিলেন জগদীশচন্দ্র।[3] 'Integrative Biophysics Biophotonics'[4]-এ বায়োফিজিক্সের অগ্রদূতদের মধ্যে সবচেয়ে প্রথমে স্থান দেয়া হয়েছে জগদীশচন্দ্র বসুকে।
          ক্রোনোবায়োলজি হলো জীববিজ্ঞানের সেই শাখা যেখানে জীবনের পর্যায়ক্রমিক ছন্দকে পর্যবেক্ষণ করে। যেমন সূর্য ও পৃথিবীর মধ্যে পর্যায়ক্রমিক ছন্দে দিন-রাত মাস বৎসর হয়। এটা তুলনামূলকভাবে খুবই নতুন বিষয়। ১৯৬০ সালের আগে এই বিষয়ের আলাদা কোন অস্তিত্বই ছিলো না। কিন্তু জগদীশচন্দ্র বসু উদ্ভিদের পর্যায়ক্রমিক ছন্দ পর্যবেক্ষণ করে অনেক তথ্য আবিষ্কার করেছিলেন তারও পঞ্চাশ বছর আগে। আলো এবং অন্ধকারে উদ্ভিদের দৈনিক পরিবর্তন, তাপমাত্রার পরিবর্তনের সাথে উদ্ভিদের বৃদ্ধির পরিবর্তন ইত্যাদিতে একটি চমৎকার জীবন-ছন্দ আছে। জগদীশচন্দ্র সেই ছন্দ আবিষ্কার করেছিলেন।[5]
            Dictionary of Scientific Biography-তে Charles Susskind বিজ্ঞান-ইতিহাসের তথ্য-প্রমাণ সহ দেখিয়েছেন যে জগদীশচন্দ্র বসুই ছিলেন পৃথিবীর প্রথম জীবপদার্থবিজ্ঞানী বা বায়োফিজিসিস্ট।
            ভারতে প্রথম একটি পূর্ণাঙ্গ রিসার্চ-ইনস্টিটিউট 'বসু-বিজ্ঞান-মন্দির' প্রতিষ্ঠা করেছেন জগদীশচন্দ্র বসু। ভারতবর্ষ থেকে প্রথম সায়েন্টিফিক জার্নাল প্রকাশিত হয়েছে তাঁর উদ্যোগে, তার সম্পাদনায়।
          আমরা আজ যে বিজ্ঞান-গবেষণার পথে খুব আস্তে আস্তে হলেও হাঁটতে শুরু করেছি, সেই পথ অর্ধ-শত বছরের কঠিন পরিশ্রমে তৈরি করেছিলেন জগদীশচন্দ্র বসু - আমাদের জগদীশ।



[1] রবীন্দ্রনাথকে লেখা চিঠি। ১৮৯৯ ফেব্রুয়ারি।
[2]  দিবাকর সেন, দেশ, ডিসেম্বর ১৩, ১৯৯৭।
[3] Arunima Chaudhuri and Amitabha Chattopadhyay, Aian Agri-History, Vol. 13, No. 4, 2009, pp 315-319.
[4] Marco Bischof, Introduction to Integrative Biophysics, F. A. Popp and L. Beloussov (eds.), Kluwer Academic Publishers, 2003, pp 1-115.
[5]  M. K. Chandrashekaran, J C Bose's Contributions to Chronobiology, Resonance, February 1998.

2 comments:

Latest Post

Memories of My Father - Part 6

  The habit of reading books was instilled in us from a young age, almost unknowingly. There was no specific encouragement or pressure for t...

Popular Posts