শেন ইউন শো দেখে এলাম। লক্ষ লক্ষ ডলার খরচ করে এরা দিনরাত চোখের সামনে যেসব বিজ্ঞাপন ঠুসে দিয়েছে – কিছুটা তাতে প্রলুব্ধ হয়ে তো বটেই – তবে অনেকটা দীর্ঘদিনের লালিত কৌতূহল থেকেও। পাঁচ হাজার বছরের চৈনিক সভ্যতার ধারাবাহিক প্রতিফলন দেখা যাবে, আধুনিক চীনে এই শো নিষিদ্ধ করার কারণ জানা যাবে, আর কী এমন জাদুবলে তারা এসব চোখ ধাঁধানো নৃত্যকলা মঞ্চে প্রদর্শন করে – চাক্ষুষ করার ইচ্ছে – সব মিলিয়ে গগনচুম্বী উচ্চাশা নিয়ে হাজির হলাম প্লেনারি থিয়েটারে।
ইয়ারা নদীর দক্ষিণ তীর মেলবোর্নের সাংস্কৃতিক পাড়া। শনিবার বিকেলের কনভেনশান সেন্টার জনারণ্যে গমগম। কত ধরনের প্রদর্শনী, জাঁক জমকের অনুষ্ঠান চলছে তো চলছেই। সেন্টারের ভেতরই প্রায় হাজার কদম হাঁটার পর পৌঁছলাম প্লেনারি থিয়েটারের গেটে। এখানে চলছে নিরাপত্তা তল্লাশী। ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টের সিকিউরিটি চেকিং-এর কায়দায় ব্যাগ চেক করে ভরা পানির বোতল খালি করে দিচ্ছে। গেট পার হয়ে বোতল আবার ভরে নিতে হবে। এখানে কে এমন শত্রুতা করে বোতল ভরে তরল গরল নিয়ে আসবে! কীসের এত ভয়!
এর আগে আরো কত অনুষ্ঠানে এসেছি এখানে। রিচার্ড ডকিন্স, নীল ডিগ্রাস টাইসন, ব্রায়ান কক্সসহ আরো অনেকের বিজ্ঞান-অনুষ্ঠান দেখেছি এখানে। কিন্তু এরকম বাড়াবাড়ি রকমের নিরাপত্তা তল্লাশি দেখিনি আগে। কী এমন নিষিদ্ধ জিনিস এখানে দেখাবে ভেবে কৌতূহল বাড়লো আরো কয়েক ধাপ।
ঝকঝকে ছাপানো শেন ইউন শো’র ম্যাগাজিন হাতে পেয়ে দ্রুত চোখ বুলিয়ে নিলাম। শেন ইউন পারফর্মিং আর্টস – সংগীত ও নৃত্য দলটি গঠিত হয়েছে ২০০৬ সালে নিউইয়র্কে। আমেরিকান অভিবাসী দ্বিতীয়, তৃতীয় কিংবা আরো পরের প্রজন্মের বৃহত্তর চীনা বংশোদ্ভূতদের নিয়েই মূলত এই দল। জাপান, তাইওয়ান এবং কোরিয়ান বংশদ্ভূত কয়েকজন শিল্পীর নাম-পরিচয়ও দেখলাম।
পৃথিবীর সব বড় বড় শহরে এরা প্রদর্শনী করে প্রতি বছর। প্রতিবছরই তাদের অনুষ্ঠানের স্ক্রিপ্ট, উপাদান – এবং কুশীলবও বদলে যায়। এবছর অস্ট্রেলিয়ায় তারা চারটি শহরে তিরিশটি প্রদর্শনী করছে। গোল্ডকোস্টে ফেব্রুয়ারির ২৫ তারিখ থেকে মার্চের এক তারিখ পর্যন্ত প্রদর্শনী করে মেলবোর্নে প্রদর্শনী শুরু করেছে ৬ মার্চ থেকে। ৬ থেকে ১৫ মার্চের মধ্যে ১১টি প্রদর্শনী। টিকেট বিক্রি শুরু হবার ক’দিনের মধ্যেই প্রায় সব টিকেট শেষ। টিকেটের দামও এমন যে আড়াই ঘন্টার একটি শো’র টিকেটের দাম দিয়ে মেলবোর্ন থেকে পার্থ শহরে আসা-যাওয়ার প্লেন টিকেট কেনা যায়।
তিন হাজারের বেশি সিটের প্লেনারি থিয়েটার দ্রুত ভর্তি হয়ে গেল। বেশিরভাগ দর্শক চৈনিক-অস্ট্রেলিয়ান হলেও অস্ট্রেলিয়ান-অস্ট্রেলিয়ানও অনেকেই আছেন। আমাদের উপমহাদেশের দর্শকের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম। বিদেশের মাটিতে নিজস্ব সংস্কৃতির জন্য হাহাকার করে মানুষ। তাই শ্রেয়া ঘোষাল কিংবা রুনা লায়লার অনুষ্ঠানের দর্শক তো এখানে আসবেন না। একইভাবে এখানকার দর্শকরা তো আর হরিহরণের গজল শুনতে যাবেন না।
এই অনুষ্ঠানে ছবি তোলা সম্পূর্ণভাবে নিষেধ। আমাদের সামনের সারিতে একজন স্বল্পদৃষ্টিসম্পন্ন দর্শক ছোট্ট দূরবীক্ষণ যন্ত্র চোখে লাগানোর সাথে সাথে অনুষ্ঠান-প্রহরী এসে তাকে একপাশে ডেকে নিয়ে গিয়ে তার যন্ত্র পরীক্ষা করে দেখলো চিত্রগ্রহণ হয়েছে কি না।
এদেশের মানুষ কিংবা এদেশে আসা মানুষ – নিয়ম মেনে চলে। সবার হাতে স্মার্ট ফোন – কারণ ফোনেই টিকেট। কিন্তু দেখে ভালো লাগলো যে প্রত্যেকে তাদের ফোন নিঃশব্দ করে দিয়ে চুপচাপ ঘুম পাড়িয়ে রাখলেন। কেউই গোপনে চিত্রগ্রহণ করলেন না – সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বাহবা নেয়ার জন্য।
সময়ের সাথে সাথে মঞ্চের সামনের সারিতে এসে বসলেন অর্ধ শতাধিক তরুণ যন্ত্রশিল্পী। অনেকে এখনো তারুণ্যেও পৌঁছেনি, বড়জোর কৈশোরে পা পড়েছে। অনেকের বাদ্যযন্ত্র তাদের শরীরের চেয়েও বড়।
বিশাল মঞ্চের পেছনের ফ্লোর থেকে সিলিং পর্যন্ত বিশাল ডিজিটাল ব্যাকড্রপ। অনুষ্ঠান শুরু হচ্ছে সেই প্রাচীন চীনদেশের রাজ দরবারে নৃত্যগীতের মধ্য দিয়ে। সর্বাধুনিক ডিজিটাল প্রযুক্তি আর মানব তরুণ-তরুণীর শারীরিক নৃত্যনৈপুন্য মিলেমিশে এমন এক জাদুময় পরিবেশ তৈরি হলো মুহূর্তেই।
সরাসরি সংগীত-আবহ আর শব্দ সঞ্চালনের সাথে কী নিপুণ নৃত্যসঙ্গত! ইংরেজি ও চীনা ভাষায় উপস্থাপকরা মাঝে মাঝে বর্ণনা করেছেন – অনুষ্ঠানমালা এবং শেন ইউন-এর ইতিহাস। ছয়-সাত মিনিটের ছোট ছোট আঠারোটি দৃশ্যকল্পের নৃত্যগীত ও অভিনয় সমৃদ্ধ পুরো অনুষ্ঠানই সমান উপভোগ্য।
চায়নিজ ক্লাসিক ড্যান্স ও মিউজিকের ওপর অসামান্য দক্ষতা ছাড়া এধরনের নির্ভুল অনুষ্ঠান করা অসম্ভব। শিল্পীদের সবাই ছিপছিপে লম্বা আর অসম্ভব সুদর্শন। বোঝাই যাচ্ছে লক্ষ্মী-সরস্বতী-মেনকার সুসমন্বয় না ঘটলে এখানে সুযোগ নেই।
দুটো ব্যাপার আমার মোটেও ভালো লাগেনি। এক – অন্ধবিশ্বাসের পক্ষে প্রচার। ফালুন গং-এর সরাসরি প্রচার করা হয় এই অনুষ্ঠানে। এই কোম্পানি মূলত ফালুন গং-এর। অন্ধবিশ্বাস আর অপবিজ্ঞান প্রচার করে বলে ফালুন গং – মূল চীনা ভূখন্ডে নিষিদ্ধ। এই অনুষ্ঠানে চীনা কমিউনিস্ট পার্টিকে সরাসরি অসুর হিসেবে দেখানো হয়েছে – যারা ভালো মানুষের উপর অত্যাচার করছে! শো-তে এক নাট্যাংশে দেখানো হয়েছে অলৌকিকভাবে দেবতার আশীর্বাদে অন্ধ মানুষ দৃষ্টি ফিরে পাচ্ছে, ভাঙা হাত ভালো হয়ে যাচ্ছে ফালুন গং শরীরচর্চা করার ফলে।
প্রাচীন বৌদ্ধধর্ম ও অন্যান্য কিছু লোককাহিনীভিত্তিক দর্শনের ভিত্তিতে ১৯৯২ সালে চীনে গঠিত হয়েছিল ফালুন গং। দ্রুত জনপ্রিয়তা পেয়েছিল ফালুন গং। দশ বছরের মধ্যে প্রায় দশ কোটি ফালুন গং অনুসারী চীনের বিভিন্ন শহরে তাদের প্রকাশ্য শরীরচর্চা শুরু করে দেয়। স্বাভাবিকভাবেই চীনের শাসক গোষ্ঠী এটাকে ভালো ভাবে নেয়নি। তাদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায় ১৯৯৯ সালের ২৫ এপ্রিল – যেদিন দশ হাজারেরও বেশি ফালুন গং সদস্য বেইজিং-এর সরকারি দপ্তর দখল করে দাবি জানায় ফালুন গং-কে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি দিতে হবে।
ফলে যা হবার তাই হল। ১৯৯৯ সালের জুলাই মাসে ফালুন গং নিষিদ্ধ হলো চীনে। নিষিদ্ধ হলো এর প্রকাশ্য চর্চা। অনেকেই এই সুযোগে আমেরিকা, ইওরোপে গিয়ে রাজনৈতিক আশ্রয় খুঁজে নিয়ে সেখানেই কার্যক্রম শুরু করলো। তারই বিগত পঁচিশ বছরের ফলাফলের একটি হলো এই শেন ইউন।
দ্বিতীয় যে ব্যাপারটি মোটেও ভালো লাগেনি – সেটি হলো একটি গানের ভেতর বলা হয়েছে নাস্তিক ও বিবর্তনবাদীরা নরাধম। গানটি চীনা ভাষায়। কিন্তু আমাদের বোঝার সুবিধার্থে পর্দায় গানটির কথার ইংরেজি অনুবাদ দেখানো হয়েছে। তোমরা অলৌকিকে বিশ্বাস করো – তাতে নিজেদের ক্ষতি নিজেরা করছো। কিন্তু যারা অবিশ্বাসী – তাদেরকে অবমূল্যায়ন করার অধিকার তোমাদের কে দিয়েছে!
অস্ট্রেলিয়া উদারনৈতিক দেশ। যতক্ষণ তুমি আইন না ভাঙছো – ততক্ষণ তোমার বাকস্বাধীনতায় কেউই হস্তক্ষেপ করবে না। কিন্তু আইনের বাইরেও নীতি-নৈতিকতা বলে একটি ব্যাপার থাকে। শেন ইউনের এই গানটি আমার অনৈতিক বলে মনে হয়েছে।
এটুকু বাদ দিলে এই অনুষ্ঠানটি ভীষণ উপভোগ্য। তবে বিজ্ঞাপনে যেভাবে অতি-মুল্যায়ন করা হয়েছে তাতে কিছুটা যে আশাহত হয়েছি তা স্বীকার করতেই হচ্ছে।
____________



No comments:
Post a Comment