Saturday 17 July 2021

স্বপ্নলোকের চাবি - পর্ব ২৯

 



স্বপ্নলোকের চাবি – ২৯

“আবেগটা একটু বেশি হয়ে গেল না? ছন্দেও তো গন্ডগোল আছে।“ 

আমার টেবিলের কাছে দাঁড়িয়ে প্রায় চার ফুট দূর থেকে আমার খাতায় লেখা কবিতার লাইনদুটো বিড়বিড় করে পড়ে এই গম্ভীর মন্তব্যটুকু করলেন মুকিতভাই। আশ্চর্য দৃষ্টি তাঁর। যে দূরত্বে আমার চশমা লাগে, তিনি খালি চোখেই এত ছোট ছোট অক্ষরের লেখাগুলি পড়ে ফেললেন। আমি তাঁর মুখের দিকে তাকালাম। মুখে লম্বা দাড়ি থাকলে তাঁকে এই মুহূর্তে সৈয়দ আলি আহসানের মতো লাগতো। এখলাসের কাছে শুনেছি মুকিতভাই আগে তাবলিগ করতেন। প্রায় এক ফুট লম্বা দাড়ি ছিল তাঁর। সালোয়ার-কামিজ আর পাগড়ি পরে ফিজিক্সের ক্লাস করতেন তিনি। তারপর কী যে হলো – মতবাদ, পোশাক, সাবজেক্ট সব বদলে বাংলায় গিয়ে ভর্তি হলেন। এখন তিনি সাহিত্যের এমন গভীর গম্ভীর পাঠক হয়েছেন যে ভাষা-ছন্দ এসবের গন্ডগোলটাই চোখে পড়ে আগে। 

আমিও যথাসম্ভব গম্ভীর এবং কিছুতেই কিছু যায় আসে না ধরনের উদাস ভাব নিয়ে বললাম, “ছন্দে গন্ডগোল হলে সেটা পূর্ণেন্দু পত্রীর হয়েছে।“ 

ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি মানুষ অন্যের লেখা চুরি করে নিজের নামে চালায়। আর আমি সমালোচনার ভয়ে নিজের লেখা অন্যের নামে চালাতে চেষ্টা করছি। মুকিতভাই এবার শব্দ করে পড়লেন - যদি ছন্দের ভেতর পূর্ণেন্দু পত্রীর ভাবটা ধরতে পারেন - 

এ কেমন ভালোবাসা 
সর্বনাশা 
কেউ জানে না।
যে আমার 
সব সাধনার
আমি তার কেউ না।। 

কয়েকবার পড়ার পরেও তিনি সন্তুষ্ট হতে পারলেন না। বললেন, “আমার মনে হচ্ছে না এটা পূর্ণেন্দু পত্রীর লেখা। তিনি এত সোজাসুজি শব্দ ব্যবহার করেন না, আর এমন তরলও নয় তাঁর কবিতার আবেগ। কোন্‌ বইতে পড়েছেন দেখান আমাকে।“ 

প্রাক্তন-তাবলিগ কবিতার ব্যাপারে এত কট্টর কেন হলেন বুঝতে পারছি না। আর আমিও কেন যে ইলেকট্রিসিটি অ্যান্ড ম্যাগনেটিজম খাতায় কার্শপের সূত্র না লিখে ভালোবাসার পংক্তি রচনা করেছি জানি না। 

মুকিতভাইকে ফাঁকি দেয়ার সুযোগ নেই। এই মানুষটা বলেন কম, জানেন বেশি, পড়েন আরো বেশি। তসলিমা নাসরিন নামে কোন একজন লেখকের আত্মপ্রকাশ ঘটেছে তা আমি প্রথম জেনেছি মুকিতভাইয়ের কাছে। তসলিমা নাসরিনের কোনো লেখা কোথাও প্রকাশিত হলেই তা জোগাড় করে পড়ে ফেলতে শুরু করেছেন মুকিতভাই। আর তাঁর পড়া হয়ে গেলেই আমাকে বাধ্য করেন পড়তে। একইভাবে হুমায়ূন আহমেদেরও কোন নতুন বই বের হলেই মুকিতভাই তা কিনে এনে দ্রুত পড়ে ফেলেন। তারপর আমাকে পড়তে দেন। পড়ার পরে বই ফেরত দিতে গেলে জানতে চান কেমন লাগলো। আমি উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করি, কিংবা নিন্দা। কিন্তু মুকিতভাই এব্যাপারে অনেকটা নির্লিপ্ত ধরনের; কারো লেখা নিয়েই খুব একটা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন না। নিন্দা তো প্রায় করেনই না, প্রশংসাও করেন মেপে মেপে। যে বই পড়ে আমি উচ্ছ্বাসের বন্যা বইয়ে দিচ্ছি যেখানে – তিনি সেখানে ‘ভালো’ কিংবা ‘খুব ভালো’র চেয়ে বেশি কিছু বলেন না। আবার আমি যখন বইয়ের নিন্দা করতে গিয়ে লেখককে তুলোধুনো করতে শুরু করি -তখন তিনি আমাকে থামিয়ে দেন। আমাকে বোঝান – যে কোনো লেখাই লেখকের কাছে সন্তানের মতো। সৃষ্টিশীল লেখার ভালো-মন্দ পাঠকের ব্যক্তিগত রুচিনির্ভর। আমার যা ভালো লাগেনি, তা অন্য পাঠকের ভালো লাগতে পারে। আবার উল্টোটাও হতে পারে। সৃষ্টিশীলতার ব্যাপারটাকে ঠিকভাবে মাপার কোন উপায় নেই, ইত্যাদি। 

এতকিছু বোঝেন যে মুকিতভাই – তিনি আমার নিজের লেখার ব্যাপারে খুব কট্টর। আমি যে খুব কিছু লিখেছি তা নয়। চট্টগ্রাম কলেজের অর্থনীতি বিভাগের ম্যাগাজিনে আমার একটা গল্প ছাপানো হয়েছিল। বন্ধু যদি সম্পাদক হয়, তাহলে অখাদ্যও ছাপানো হয়। এবং মজার বিষয় হলো – পরিচিত মানুষ অখাদ্য লেখারও প্রশংসা করে। আমার গল্পটারও অনেকে প্রশংসা করেছিল। কিন্তু অন্যায্য প্রশংসা যে সৃষ্টিশীল লেখকের মৃত্যুফাঁদ তা আমি বুঝতে চাইনি। আমি ব্যাপক প্রশংসার বাতাসে ফুলে গিয়ে সেই ম্যাগাজিনটি আমার টেবিলে এমনভাবে রেখেছিলাম যেন মুকিতভাইয়ের চোখে পড়ে। তিনি দেখেও দেখছেন না দেখে প্রচন্ড শীতকালেও আমি ওটা নিয়ে ‘কী গরম’ বলে বাতাস করেছি। তারপর মুকিতভাই ম্যাগাজিনটা নিয়ে গিয়ে পরের দিন বলেছিলেন, “আপনার লেখায় ব্যর্থ প্রেমের কাহিনি আছে – কিন্তু গল্প খুঁজে পাইনি।“ 

শুনে আমার ফুলানো বেলুন চুপসে গিয়েছিল। কাহিনি আর গল্পের মধ্যে একটা শৈল্পিক পার্থক্য আছে। সেই পার্থক্যটাই গল্পের মূল সুর। অনেকসময় চমৎকার গীতিকবিতাও যেমন খারাপ সুরের কারণে ব্যর্থ হয়, সেরকম অনেক ভালো কাহিনিও ভালো গল্প হয়ে উঠতে পারে না। এখানেই ফুটে উঠে লেখকের স্বাতন্ত্র্য। কিন্তু মুকিতভাইয়ের তত্ত্বকথা আমার ভালো লাগলো না। 

নিখাঁদ বন্ধুত্বে কোদালকে কোদাল বলা যায়, বলাই উচিত। কিন্তু ভদ্রতার পরিচয়টাই যেখানে একমাত্র সম্পর্ক – সেখানে অনেকসময় অন্যায্য প্রশংসার উপরেই সম্পর্ক বেঁচে থাকে। তাই হয়তো মুখের উপর কেউ বলে না – গল্প নামে যে বস্তুটা লেখা হয়েছে – সেটা আসলে কিছুই হয়নি। অন্যের মুখের উপর অপ্রিয় সত্য কথা অনেকেই বলতে পারে। কিন্তু নিজের মুখের উপর অন্য কেউ অপ্রিয় সত্য কথা বললে তা অপ্রিয়-সত্যবাদীর পক্ষেও সহ্য করা কঠিন হয়ে ওঠে। মুকিতভাইয়ের কথায় আমারো শুরুতে বেশ কষ্টই লেগেছিল। কিন্তু পরে বুঝতে পেরেছি – তিনি আমার বন্ধু বলেই সরাসরি বলে ফেলেছেন। কিন্তু তারপরেও কেমন যেন একটা লজ্জা চলে এসেছে। পারতপক্ষে আমার রচনা আমি আর মুকিতভাইয়ের সামনে রাখি না। 

কিন্তু আজ তিনি আমার খাতার লাইনগুলি দেখে ফেলেছেন। পরীক্ষার আগে আমার  পড়াশোনায় বিঘ্ন ঘটবে ভেবে তিনি গত এক সপ্তাহ আমার রুমে আসেননি। কিন্তু আমি যে একেবারে দরজা বন্ধ করে সারাসপ্তাহ পড়াশোনা করেছি তা মোটেও নয়। শিল্পকলা একাডেমিতে গিয়ে গ্রুপ থিয়েটারের প্রাথমিক কাজ হিসেবে স্টেজ ঝাড় দিয়ে এসেছি। পরীক্ষার তিন দিন আগে হলে গিয়ে প্রবেশপত্র নিয়ে এসেছি। ফাইনাল রিভিশান দেয়ার জন্য প্রদীপ নাথ সেই রাতে আমার রুমেই ছিল। আমরা সারারাত জেগে ক্লাসিক্যাল মেকানিক্সের বদলে এমন কোন বিষয় নেই যা নিয়ে গল্প করিনি। আর কাব্যচর্চা তো ছিলই। মুকিতভাইকে এসব বললে এখলাসের মতো নিচু গলায় বলবেন, আরেকটু সিরিয়াস হওয়া মনে হয় দরকার।  

হকারকে সাপ্তাহিক বিচিত্রা দিতে বলেছিলাম। মুকিতভাই আজ গত দুই সপ্তাহের দুটি বিচিত্রা নিয়ে এসেছেন। এতদিন তাঁর কাছেই রেখে দিয়েছিলেন। আমি বিচিত্রার পাতা উল্টাচ্ছি। আর মুকিতভাই আমার কবিতার ছন্দের ব্যবচ্ছেদ করছেন। 

“কী ব্যাপার? ভালোবাসা তরল হয়ে যাচ্ছে! কেউ এসেছে নাকি – স্বপ্নে কিংবা জীবনে?” – মুকিতভাই কাব্যের সাথে বাস্তবের যোগসূত্র আছে কি না দেখতে চাচ্ছেন। 

কৈশোরে-তারুণ্যে কত স্বপ্ন উঁকি দেয় যখন তখন। কিন্তু জীবনটা তো আরতি মুখার্জির গানের মতো নয় যে আমার একুশ বছর হলেই লজ্জা জড়ানো ছন্দে কাঁপতে শুরু করবে সেই অষ্টাদশীর হৃদয়! 

কিছু কিছু ব্যাপার থাকে – যা বোঝানো যায় না, এড়ানো যায়। আমিও তাই করলাম। জিজ্ঞেস করলাম, “প্রেসিডেন্ট এরশাদ যে মরণোত্তর চক্ষুদানের ঘোষণা দিয়েছেন দেখেছেন?”
“ফার্স্ট লেডিও দিয়েছেন তো। এরশাদের দু’দিন পর রওশন এরশাদও ঘোষণা করেছেন মরণোত্তর চক্ষুদান করবেন।“
“আচ্ছা বাংলায় চক্ষুদান-এর আরেকটা অর্থ আছে না?”
“চুরি করা?” 
“হাহাহা। সারাদেশকে চক্ষুদান করে চক্ষুদানের অঙ্গীকারটা ভালোই করেছেন।“
“তাঁদের মৃত্যুর পরেই জানা যাবে – তাদের চোখ আসলেই দান করা হয়েছে কি না।“ 

প্রেসিডেন্ট এরশাদ এবং ফার্স্ট লেডি মরণোত্তর চক্ষুদানের ঘোষণা করে খুব ভালো একটি কাজ করেছেন। আমাদের দেশের মানুষের ভেতর শরীর নিয়ে অনেক ধরনের কুসংস্কার আছে। মৃত্যুর পর আমাদের শরীর যার যার ধর্মমতে কবর দেয়া হয়, কিংবা দাহ করা হয়। কিন্তু মৃত শরীরের কিছু অঙ্গ দিয়েই অনেক অসহায় মানুষের সেবা করা যায়। চোখ দান করা অর্থাৎ কর্নিয়া দান করলে মৃত ব্যক্তির কর্নিয়া অন্ধ চোখের দৃষ্টি ফিরিয়ে দিতে পারে। অথচ অনেকে ধর্মের দোহাই দিয়ে এরকম ভালো কাজে বাধা দেন। 

একটু পর দরজায় খান সাহেবের গলা শোনা গেল – “প্রদীপবাবু, প্রদীপবাবু”

“আজকে ভাড়া নিতে দেরি করে এসেছেন মনে হয়। আমি যাই।“ দরজা খুলে মুকিতভাই প্রস্থান করলেন আর খান সাহেব প্রবেশ করলেন। 

আজ ফেব্রুয়ারি মাসের এক তারিখ। মাসের প্রথম দিনে খান সাহেব খুব ভোরে উঠে চলে আসেন ঘরভাড়া আদায় করতে। কিন্তু আজ অনেকটাই দেরি করে এসেছেন। ১৮০ টাকা ঘরভাড়া আমি আলাদা করে রেখে দিয়েছিলাম। তিনি টাকা নিয়ে খাতায় স্বাক্ষর করতে করতে বললেন, “আপনি কি হিটার জ্বালান?” 

এই বিল্ডিং-এ যারা রান্না করে খায়, তাদের অনেকেই কেরোসিনের স্টোভ আর ইলেকট্রিক হিটার দুটোই ব্যবহার করে। আমিও করি মাঝে মাঝে – যখন তাড়া থাকে স্টোভ আর হিটার একসাথে ব্যবহার করি। কিন্তু গতকাল আমার হিটারের কয়েল ছিঁড়ে গেছে। 

গতকাল সন্ধ্যায় আমার দাদা এসেছিল টাকা দিতে। প্রতি মাসের শেষে আমার বাবা টাকা পাঠিয়ে দেন। দাদাই টাকা নিয়ে আসে। তার কাছে আমার রুমের একটা চাবি আছে। আমি রুমে না থাকলে ড্রয়ারে টাকা রেখে চিঠি লিখে যায়। সে জানতো ৩০ তারিখ আমার পরীক্ষা। ৩১ তারিখ সন্ধ্যায় এসেছিল। রান্না করে খেতে আমার যে কোন অসুবিধাই হচ্ছে না, এবং কত তাড়াতাড়ি আমার রান্না হয়ে যায় – তা তাকে দেখাতে গিয়ে বিপদে পড়েছি। দুইটা মাত্র ডিম ছিল – সেগুলি ধোয়ার জন্য পানিতে দিতেই পিংপং বলের মতো ভেসে উঠলো। শীতকালে ডিম এত তাড়াতাড়ি নষ্ট হবার কথা ছিল না। সিদ্ধ না করে মামলেট করা যায়। বাটিতে ডিম ভাঙার পর সামান্য একটু হাইড্রোজেন সালফাইডের গন্ধ পাওয়া গেল। এরকম ডিম পেঁয়াজ আর কাঁচামরিচের সাথে মিশিয়ে গরম তেলে দিলে খুব চমৎকার খাদ্য হয়। হাইড্রোজেন সালফাইডের গন্ধ তখন আর থাকে না। এ ব্যাপারে আমার পূর্ব-অভিজ্ঞতা আছে। কিন্তু দাদা খুব জোর দিয়ে বললো – ডিমগুলি পচে গেছে, পচা জিনিস খেতে হয় না। আলুভর্তা আর ডাল চলতে পারে। স্টোভে ডাল বসিয়ে হিটারে ভাত বসিয়ে দিলে পনেরো মিনিটের মধ্যে হয়ে যাবার কথা। কিন্তু হিটার কিছুতেই জ্বললো না। দেখলাম কয়েল ছিঁড়ে গেছে তিন চার জায়গায়। অনেক সময় কয়েল জোড়া লাগিয়ে চালিয়েছি। কিন্তু এটা আর জোড়া লাগানোর মতো অবস্থায় নেই। দোকানে গিয়ে কিনে আনতে বেশিক্ষণ লাগার কথা নয়। কিন্তু দাদা আমার পারদর্শিতা পুরোটা না দেখেই চলে গেলো। হিটারটা কাল রাত থেকে ছেঁড়া কয়েল নিয়ে পড়ে আছে ঘরের কোণে। 

খান সাহেবের প্রশ্নের উত্তরে বললাম, “জ্বি। মাঝে মাঝে জ্বালাই। এখন কয়েল নষ্ট হয়ে গেছে।“ 
“আর জ্বালাবেন না।“
“জ্বি আচ্ছা।“  
“হিটারটা আমাকে দিয়ে দেন।“
“ঠিক আছে, নিয়ে যান।“ 

খান সাহেব আমার ভাঙা হিটারটা নিয়ে চলে গেলেন। ওটা নিয়ে কী করবেন জানি না। তবে  আমি যে আর জ্বালাবো না বলেছি, তা যে তিনি বিশ্বাস করেননি সেটা বুঝিয়ে দিয়ে গেলেন। তিনি মনে করেছেন আমি চুরি করে হিটার জ্বালাবো। শুরুতেই হিটার জ্বালানো যাবে না বলে দিলে আমি হিটার কিনতামও না। এসব হয়তো খুবই ছোটখাট ব্যাপার, কিন্তু এই ব্যাপারগুলি আমার খুবই গায়ে লাগে। কেমন যেন  একটু অপমান লাগছে। কিছুটা অভিমানও। আমি তো শুধু তাঁর বাসায় ভাড়া থাকি না, তাঁর কন্যাদের শিক্ষকও। আমার সাথে তাঁর এরকম না করলেও চলতো। মনে মনে ঠিক করলাম আমি আর পড়াতে যাবো না। 

বিচিত্রার পাতা উল্টাতে শুরু করলাম। দুর্ঘটনা যেন আমাদের পিছু ছাড়ছে না। টঙ্গির ট্রেন দুর্ঘটনার এক সপ্তাহ না যেতেই বরিশালে ফেরিঘাটে একটি যাত্রীবাহী বাস নদীতে পড়ে গেছে। একুশজন মানুষ মারা গেছেন কয়েক মিনিটের মধ্যেই। তার দুদিন পরেই নগরবাড়ি ফেরিঘাটে চিত্রপরিচালক আলমগীর কবীবের গাড়িকে ধাক্কা দিয়ে নদীর পানিতে ফেলে দিয়েছে একটি ট্রাক। আলমগীর কবীর ও অভিনেত্রী টিনা খান মারা গেছেন। আলমগীর কবীরের মতো একজন চিত্রনির্মাতা আমাদের দেশের জন্য কত বড় সম্পদ। অথচ কী মর্মান্তিকভাবে মৃত্যু হলো তাঁর। এ কেমন ফেরি? আমি ফেরিতে নদী পার হইনি কখনো। কিন্তু যতটুকু জানি – ফেরির চারপাশে তো রেলিং থাকার কথা। দুর্ঘটনা না ঘটার জন্য যেসব ব্যবস্থা নিতে হয়, তা না নিয়ে কিংবা দায়িত্বে অবহেলা করে দুর্ঘটনা না হবার জন্য প্রার্থনা করলেই কি দুর্ঘটনা বন্ধ হয়ে যাবে? 

আলমগীর কবীরের মৃত্যুসংবাদ পড়ে মনটা বেশ খারাপ হয়ে গেল। মাত্র কিছুদিন আগেই তাঁর ‘সীমানা পেরিয়ে’ দেখেছি দিনার সিনেমায়। এরকম ব্যতিক্রমী সিনেমা আমি আর দেখিনি। কত পরিশ্রম, অধ্যবসায় আর চর্চার ফসল এরকম একজন মেধাবী সৃষ্টিশীল মানুষ। অথচ এক মুহূর্তেই সব শেষ। এরকম অনিশ্চয়তা আছে বলেই কি জীবন এত প্রিয় আমাদের? আলমগীর কবীর যদি জানতেন তিনি ওভাবে মারা যাবেন – তাহলে কি তিনি সেখানে যেতেন? ফেরির উপর গাড়ির ভেতর বসে থাকতেন? নাকি মৃত্যু এড়ানোর চেষ্টা করতেন? ট্রাক ড্রাইভার কি ইচ্ছে করে ধাক্কাটা দিয়েছে? নাকি ট্রাকের ব্রেক-ফেল করেছিল? কেউ কি তদন্ত করে দেখবে এসব? এধরনের দুর্ঘটনা বন্ধের কি কোন জোরালো পদক্ষেপ নেয়া হবে? জানি না। 

রান্না করা দরকার, কিন্তু ইচ্ছে করছে না। কাল রাতের কিছু ভাত আর ডাল ছিল। সকালে সেগুলি খেয়েছি। দুপুরে রান্না করতে হলে দোকানেও যেতে হবে। কিন্তু কিছুই ইচ্ছে করছে না এখন। শেখ ইসতিয়াকের একটা ক্যাসেট দিয়েছিল প্রদীপ নাথ। সেটা বাজছিল এতক্ষণ – ‘লেখাপড়া শেষ করে বেকারত্বে ধুকে মরা এ কেমন অভিশাপ বলো’র মাঝখানে হঠাৎ থেমে গেছে। কারেন্ট চলে গেছে। 
লেখাপড়া শেষ করার ব্যাপারটা যে কখন ঘটবে জানি না। পরীক্ষা ব্যাপারটা অসহ্য লাগছে। ফার্স্ট পেপার পরীক্ষা দিয়েছি মোটামুটি। পরীক্ষার পর থেকে এখনো বই ধরিনি। গতকাল সারাদিন বাইরে কাটিয়ে সন্ধ্যায় ফিরেছিলাম দাদা আসার একটু আগে। আজ বিকেলেও বের হবো। সেকেন্ড পেপার পরীক্ষা ১১ তারিখ। আজকের দিন বাদ দিলে আর মাত্র নয় দিন আছে মাঝখানে। এই নয় দিনে কয়দিন পড়াশোনা করতে পারি জানি না। প্রদীপনাথ আর যীশু আসবে বলেছিল। দুপুরের আগেই আসার কথা। সেকেন্ড পেপারের জন্য কী কী পড়বো ইত্যাদি নিয়ে ফাইনাল মিটিং হবে। যীশু ইলেকট্রিসিটি খুব ভালো বোঝে, আমার তেমন একটা ভালো লাগে না। আমার অবশ্য এখন গ্রুপ থিয়েটারের পোকা মাথায় ঢুকে গেছে।  

পরীক্ষার আগে ভেবেছিলাম পরীক্ষা চলাকালীন আর গ্রুপ থিয়েটারের কাজে যাবো না। কিন্তু কয়েকবার গিয়েই কেমন যেন একটা ভালো লাগা তৈরি হয়ে গেছে। আগে আমার ধারণা ছিল থিয়েটারে অভিনয়টাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এখন কয়েকটা রিহার্সাল দেখে বুঝতে পারছি – থিয়েটারের প্রাণশক্তি হচ্ছে টিম-ওয়ার্ক। টিমের একজনের কাজ খারাপ হলে বাকিদের কাজও খারাপ হয়ে যায়। কিছুদিনের মধ্যে গ্রুপের নাটক ‘সমাধান’ এর শো হবে। পুরনো নাটক – নতুন করে মঞ্চে আসছে। আমাকে নাটকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা কাজ দেয়া হয়েছে – বিভিন্ন দৃশ্যে সেট পরিবর্তনে সাহায্য করা। ফার্স্ট পেপার পরীক্ষার দুদিন আগে একটা ফুল রিহার্সাল দিয়ে এসেছি। চেয়ার-টেবিল বাক্স-প্যাটরা টানতে টানতে এক রিহার্সালেই কাহিল হয়ে গিয়েছি। নাটকের রাম একটা দড়ি ধরতে বলেছিল বলে শরৎচন্দ্রের শ্রীকান্ত খুশিতে আটখানা হয়ে গিয়েছিল। সে হিসেবে আমার তো হাজারখানা হয়ে যাওয়া উচিত। 

পরীক্ষার মাঝখানের দিনগুলি দ্রুত চলে যায়। মনে হচ্ছে এক তারিখ থেকে আট তারিখ চলে এলো এক লাফেই। ফেব্রুয়ারির আট তারিখের জন্য খুব আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছিলাম। ১৯৮২ সালে এরশাদ মার্শাল ল দিয়ে ক্ষমতা দখল করার পর থেকে গত সাত বছর ধরে দেশের কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রসংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। এত বছর পর ডাকসু নির্বাচন খুবই সুষ্ঠভাবে হয়ে গেল ফেব্রুয়ারির আট তারিখে। নয় তারিখ ফলাফল ঘোষণা করা হলো। ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ ডাকসু ও ১৩টি হলের প্রত্যেকটিতে পূর্ণ প্যানেলে জয়লাভ করেছে।  সুলতান মনসুর ভিপি, মুস্তাক হোসেন জিএস নির্বাচিত হয়েছেন। কিন্তু কয়েক ঘন্টার মধ্যেই ছাত্রীদের বিজয়মিছিলে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে পরাজিত ছাত্রদলের গুন্ডারা। তাদের গুলিতে একজন ছাত্র মারা যায়, মারাত্মকভাবে আহত হয় অসংখ্য ছাত্রী। শিক্ষার্থীদের নির্বাচনের ফলাফলই যদি মেনে নিতে না পারে – কেমন গণতন্ত্রের চর্চা করে এরা? শোনা যাচ্ছে চাকসু নির্বাচনও হবে কিছুদিনের মধ্যে। এখানে কী হয় কে জানে। 

No comments:

Post a Comment

Latest Post

Hendrik Lorentz: Einstein's Mentor

  Speaking about Professor Hendrik Lorentz, Einstein unhesitatingly said, "He meant more to me personally than anybody else I have met ...

Popular Posts