Saturday 24 July 2021

স্বপ্নলোকের চাবি - পর্ব ৩০

 



স্বপ্নলোকের চাবি – ৩০

ফার্স্ট ইয়ারের সাউন্ড ক্লাসে ডপ্‌লার ইফেক্ট পড়িয়েছিলেন নুরুল মোস্তফা স্যার। তখন সেই থিওরি কতটুকু বুঝেছিলাম জানি না, কিন্তু আজ প্রদীপ নাথের সাইকেলের ক্যারিয়ারে বসে তার প্র্যাকটিক্যাল দিকটা হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারছি। বাসট্রাক পেছন থেকে যখন হর্ন বাজাতে বাজাতে এগোচ্ছে বুঝতে পারছি শব্দের কম্পাঙ্ক কত দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে। একইভাবে সামনে থেকেও আসছে। রাঙ্গামাটির বাসগুলি এত জোরে হর্ন বাজাতে বাজাতে গা ঘেঁষে চলে যাচ্ছে যে মনে হচ্ছে একটু এদিক-ওদিক হলেই সাইকেলসহ বাসের চাকায় থেঁতলে যাবো। 

আমি সাইকেলের পেছনে বসেই এত ভয় পাচ্ছি, অথচ প্রদীপ নাথ ঠান্ডা মাথায় সবকিছু উপেক্ষা করে নির্বিকারভাবে সাইকেল চালাচ্ছে। অবশ্য সম্পূর্ণ নির্বিকারভাবে চালাচ্ছে বলা যাবে না। আমি ভয়ে কেঁপে উঠলেই সে আমাকে ধমক দিচ্ছে – “বাইন মাছর নান্‌ কইছালি কিল্লা গরদ্দে?” 
বাইন মাছ কানে শুনে কি না জানি না। পানিতে শব্দের বেগ বাতাসের চেয়ে অনেক বেশি। বাইন মাছের কানের কাছে রাঙামাটির বাসের হর্ন বাজালে বাইন মাছ কেমন ‘কইছালি’ করতো তা চিন্তা করে আবারো কেঁপে উঠে বললাম, “চাইস্‌, চাক্কার নিচে ঢুকাই দিবি।“
“গেলে যাবি দে এরি, ছ-আইন্না জীবন!”

প্রদীপ নাথের হাসির শব্দে আমি শিউরে উঠি। ছয় আনার জীবন হলেও জীবনের প্রতি একটা মায়া তো আছে! 

ন্যায্য হিসেব অনুযায়ীই আমার জীবনের মূল্য ছয় আনা ধার্য করা হয়েছে। সুকুমার রায়ের ‘ষোল আনাই মিছে’ কবিতা অনুসারে সাঁতার না জানলে জীবনের ষোল আনাই মিছে। সাঁতার একবার শিখতে পারলে সেই শিক্ষা সারাজীবন থেকে যায়। সেরকম সাইকেল চালানোও – একবার শিখতে পারলেই হলো। সাঁতার এবং সাইকেল চালানোর মতোই চিরকালীন আরো এক ‘স’-যুক্ত ক্রিয়া আছে যেটা সম্পর্কে প্রকাশ্যে আলোচনা করাটা অশালীন, অথচ জীবন সৃষ্টির জন্য ওটাকে অস্বীকার করার উপায় নেই।  
এই তিন ‘স’ সংক্রান্ত দীর্ঘ আলোচনার পর আমার বন্ধুরা আমার জীবনের মূল্য ধার্য করেছে ছয় আনা। সাঁতারটা কোন রকমে শিখেছিলাম বলেই এই ছয় আনা দাম পেয়েছি। নইলে জীবন ‘ষোল আনাই মিছে’ হয়ে যেতো। 

সাইকেল চালানোটা শিখে নিতে পারলে আরো পাঁচ আনা দাবি করতে পারতাম। কিন্তু একবার চেষ্টা করেও আমার শরীরে সাইকেল চালানোর ভারসাম্য আসেনি বলে আমি আর চেষ্টা করিনি। ‘একবার না পারিলে দেখো শতবার’ আমার জন্য নয়। আমি অনেকটা ‘একবার না পারিলে দেখিও না আর’ টাইপের। তবুও অন্যের ইচ্ছেকে মূল্য দিতে গিয়ে নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধেও অনেক কিছু একবারের বেশি চেষ্টা করেছি। 

প্রদীপ নাথও একবার রাতের বেলা মেইন রোডে আমাকে সাইকেল চালানো শেখানোর চেষ্টা করেছে। ধবল জোছনায় সে সাইকেলের পেছনে ধরে দৌড়াতে দৌড়াতে কখন ছেড়ে দিয়েছে আমি খেয়াল করিনি। অনেকদূর যাওয়ার পর মনে হলো সাইকেলের সাথে দুজনের বদলে শুধু একজনের ছায়া দেখতে পাচ্ছি। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই কিছু একটা হলো। আমি চোখ বন্ধ করে ফেললাম। বুঝতে পারলাম প্রশস্ত উঁচু রাস্তার প্রতি সীমাহীন বিরক্তিজনিত বিকর্ষণে সাইকেল আমাকে নিয়ে প্রায় পনেরো ফুট নিচে জমিতে পড়ে যাচ্ছে। কাদা-পানির পুরু আস্তরণ সাইকেলসহ আমাকে সাদরে বরণ করে নিলো। কতক্ষণ ওভাবে ছিলাম জানি না। রাস্তার উপর থেকে খিলখিল করে হাসির শব্দ শুনে সম্বিত ফিরে পেলাম। প্রদীপ নাথের লাফিং অ্যাটাক হয়েছে – হাসি থামছে না কিছুতেই। অনেকক্ষণ লাগলো সাইকেল নিয়ে রাস্তার উপরে উঠে আসতে। মসজিদের পুকুরের ঘাটে এসে সাইকেল আর নিজেকে ধোয়ার সময় প্রদীপ নাথ রায় দিলো – “তোর দ্বারা আর সাইকেল চালানো হবে না।“ 

সাইকেল চালানোর পাঁচ আনা গেলো। অন্য ‘স’ এর পাঁচ আনা পেতে হলে কার ক’বছর লাগবে কেউ জানে না। আপাতত আমার ছয় আনা, আর প্রদীপ নাথের এগারো আনা জীবন চলছে। 

চট্টগ্রাম থেকে নাজিরহাটের রাস্তাটা মোটেও সরলরৈখিক নয়। ছরার কুল থেকে নন্দীর হাট পর্যন্ত গিয়ে রাস্তা অনেকটা বেঁকে গিয়ে মদনহাট পর্যন্ত পৌঁছেছে। সেখানে আরো একটা বড় বাঁক নিয়ে এক নম্বর গেট। রেললাইনের পাশে সাইকেল চালানোর মতো রাস্তা থাকলে এতক্ষণে ক্যাম্পাসে পৌঁছে যেতাম। 
মার্চ মাসের গরমে সাইকেল চালাতে গিয়ে ঘেমে যাচ্ছে প্রদীপ নাথ। আমাকে সে নিয়ে যাচ্ছে ক্যাম্পাসে পৌঁছে দিতে। 

আজ আমার প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষা। ক্যাম্পাসে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেও শান্তি পাচ্ছে না ছাত্রশিবির। কোথাও কিছু হলেই তারা ক্যাম্পাসে তালা লাগিয়ে দেয়। ফেব্রুয়ারির ২০ তারিখ আমাদের থিওরি পরীক্ষা শেষ হয়েছে। তারপর থেকে কয়েকদিন প্র্যাকটিক্যাল প্র্যাকটিস করার কথা ছিল। কিন্তু শিবিরের যখন তখন অবরোধ ডাকার ফলে ঠিকমতো প্র্যাকটিস করাও হয়নি আমাদের।

মার্চের চার তারিখ থেকে প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষা হবার কথা। আমাদের পরীক্ষার রোল নম্বর দেয়া হয়েছে হলভিত্তিক। আলাওল হলের রোলনম্বর সবার আগে। চার তারিখ প্রদীপ নাথের প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষা ছিল। কিন্তু সেদিন চট্টগ্রামে অর্ধদিবস হরতাল পালন করেছে জামায়াতে ইসলাম। ছাত্রশিবির সেদিন ক্যাম্পাসে ক্লাস তো দূরের কথা, কোন পরীক্ষাও হতে দেয়নি। একটা রিকশা পর্যন্ত কোথাও চলতে দেয়নি জামাত-শিবিরের কর্মীরা। প্রদীপ নাথ সাইকেল চালিয়ে ক্যাম্পাসে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু তাকে এক নম্বর গেট থেকে ফিরে আসতে হয়েছে। শিবিরের কর্মীরা হাতে সুঁচালো পেরেক নিয়ে সাইকেল-রিক্সার চাকা ফুটো করে দিচ্ছিল। 

অর্পণেরও পরীক্ষা ছিল সেদিন। দুপুর সাড়ে বারোটার দিকে সে আমার রুমে এসে হাজির হয়েছিল। আন্দরকিল্লা থেকে একটানা হাঁটতে হাঁটতে সে ছরার কুল চলে এসেছে। একটার পর থেকে বাস চলতে শুরু করেছিল। প্রদীপ নাথ ও অর্পণের সাথে ক্যাম্পাসে গেলাম। চার তারিখের পরীক্ষা কয় তারিখে হবে, আমার পরীক্ষা ছয় তারিখে হবে কি না জেনে আসার জন্য। অর্ধদিবস হরতাল হলেও ক্যাম্পাসে গিয়ে মনে হলো চিরকালীন হরতাল। ডিপার্টমেন্টে কেউ নেই। সবকিছু বন্ধ। কোথাও কোন নোটিশ নেই।

 আমরা পরীক্ষার্থীরা অসহায়ের মতো ডিপার্টমেন্টের বারান্দায় হাঁটাহাঁটি করলাম। ল্যাবোরেটরির সামনে গিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়ালাম। কোথাও কিছু নেই। ছাত্রলীগ অবরোধ ডাকলে ডিপার্টমেন্টে ক্লাস হয়, আর জামায়াত-শিবিরের হরতালে সবকিছু এভাবে বন্ধ হয়ে গেল? আমাদের ডিপার্টমেন্ট কি পুরোটাই জামায়াত-শিবির হয়ে গেল? অবশ্য আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশিরভাগ ডিপার্টমেন্টেই কাজকর্ম দুপুর একটার পর বন্ধ হয়ে যায়। শ্রমঘন্টার এত অপচয় আর কোন সেক্টরে হয় কি না আমার জানা নেই। 

তিন তলায় উঠলাম। যা ভেবেছিলাম তাই, প্রামাণিকস্যারের অফিস খোলা। কিন্তু স্যার তো আমাদের কোন ক্লাস নেননি এবার। আমাদের পরীক্ষা সম্পর্কে তিনি কি কিছু জানবেন? স্যারের অফিসের দরজা খোলা। বিছানার চাদরের মতো ডোরা কাটা পর্দা ঝুলছে দরজায়। অর্পণকে বললাম, “তুই স্যারকে জিজ্ঞেস কর।“

আমরা এই ডিপার্টমেন্টের ছাত্র, অথচ ডিপার্টমেন্টের স্যারদের সাথে কথা বলার সাহস অর্জন করতে পারিনি এখনো। এটা কি আমাদের দোষ, নাকি স্যারদের – জানি না। স্যাররা কি পারতেন না আমাদের সাথে আরেকটু সহজ হতে? একে অপরকে ঠেলাঠেলি করলেও – কেউই সাহস করে স্যারের দরজার পর্দা সরিয়ে ভেতরে ঢোকার সাহস পাচ্ছি না। স্যার সম্ভবত ভেতর থেকে আমাদের কথাবার্তা শুনতে পেয়েছেন। অফিস থেকে নিজেই বের হয়ে এলেন। 

“তোমরা কি আমার কাছে এসেছো?” – স্যার গম্ভীর, অথচ আন্তরিক। 
আমরা হড়বড় করে বললাম আমাদের প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষার কথা। স্যার বললেন, “নিয়ম অনুযায়ী তো আজকের পরীক্ষাটা হতে না পারলে আজকেরটা পরে হবে। আগামী কাল থেকে রুটিন অনুযায়ীই পরীক্ষা হবে। তবুও তোমরা চেয়ারম্যানের কাছ থেকে জেনে নাও। আমি টেলিফোন করে দেখি – তিনি ডিপার্টমেন্টে আসছেন কি না।“

প্রামাণিকস্যার রুমে ঢুকে গেলেন। আমরা বারান্দায় দাঁড়িয়ে শুনতে পেলাম স্যার টেলিফোনে কথা বলছেন। মিনিটখানেক পরে তিনি ডাকলেন আমাদের। আমরা গুটিশুটি মেরে স্যারের দরজার পর্দা সরিয়ে ভেতরে ঢুকলাম। স্যারের টেবিলভর্তি খোলা বইপত্র। স্যার পড়াশোনা করছিলেন। 

“তোমরা চেয়ারম্যান সাহেবের অফিসের সামনে অপেক্ষা করো। তিনি আসছেন।“

এরপর আমরা চেয়ারম্যান স্যারের অফিসের সামনে অপেক্ষা করলাম অনেকক্ষণ। রশীদুন্নবী স্যার আসার আগেই সেকশান অফিসার ফরিদভাই আর তাঁর সহকারী এসে চেয়ারম্যান স্যারের অফিস খুলে দিলেন। একটু পর রশীদুন্নবী স্যার এলেন। প্রামাণিক স্যারের কথাই ঠিক।

কিন্তু ৫ তারিখ থেকে নতুন ঝামেলা শুরু হয়েছে। হরতাল না থাকলেও শিবির ক্যাম্পাসে অবরোধ ডেকেছে। তারা কী চায় – আমরা ঠিক জানি না। কিন্তু ভেতরের খবর যতটুকু কানে আসে – তাতে বোঝা যাচ্ছে ভিসি আলমগীর মোহাম্মদ সিরাজুদ্দিনের উদারপন্থী নীতি জামায়াত শিবিরের পছন্দ হচ্ছে না। ক্যাম্পাসে প্রগতিশীল ছাত্ররাজনীতির উত্থান হোক – এটা কিছুতেই চায় না তারা। 

পাঁচ তারিখ – অর্থাৎ গতকাল যীশুর পরীক্ষা ছিল। আমাদের ক্লাসেও শিবিরের নেতাকর্মী অনেকেই আছে। হয়তো তাদের কারণেই – অবরোধের মধ্যেও প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষা হতে দিয়েছে তারা। কিন্তু শহর থেকে শাটল ট্রেন ছাড়তে দেয়নি। যীশু বাসে এসে এক নম্বর গেট থেকে হেঁটে হেঁটে ক্যাম্পাসে গিয়ে পরীক্ষা দিয়েছে। পরীক্ষা শেষে আমার রুমে এসেছিল সে কাল বিকেলে। এক নম্বর গেট থেকে হেঁটে গিয়ে পরীক্ষা দিয়ে আসা তেমন কোন কঠিন ব্যাপার নয়। কিন্তু প্রদীপ নাথ আমার দায়িত্ব নিয়েছে সাইকেলে করে ক্যাম্পাসে পৌঁছে দেবার। কিন্তু শর্ত একটাই – শিবিরের লোকরা যদি টায়ার ফুটো করে দিতে চায় -সে সাইকেল নিয়ে পালাবে। আমাকে ওখান থেকে নিজের ব্যবস্থা নিজেকেই করতে হবে। 
এক নম্বর গেটে আজও অবরোধকারীদের জটলা; সাইকেলকে বাধা দিলো না। প্রদীপ নাথ আমাকে সায়েন্স ফ্যাকাল্টির সিঁড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দিলো। তার পরীক্ষার নতুন ডেট জেনে সে চলে যাবে। আমার ছয় ঘন্টার পরীক্ষা শেষ হবে বিকেল চারটায়। রিকশা চলতে না দিলে আমি হেঁটেই চলে যেতে পারবো এক নম্বর গেট পর্যন্ত। 

আমাদের প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষার সিস্টেমটা অদ্ভুত। সারাবছর এতগুলি প্র্যাকটিক্যাল করলাম, প্র্যাকটিক্যাল খাতা লিখলাম প্রত্যেকটি এক্সপেরিমেন্টের, স্যারদের সাইন নিলাম – এগুলির কোন দামই নেই। পরীক্ষার সময় লটারি করে একটা এক্সপেরিমেন্ট করতে দেয়া হবে। সেটার উপরই পরীক্ষার নম্বর দেয়া হবে। কোন কারণে সেই এক্সপেরিমেন্টের ডাটা ঠিক না হলে, রেজাল্ট ঠিক না হলে আমি প্র্যাকটিকেলে ফেলও করতে পারি। এটা কোন কথা হলো? অবশ্য শুধু প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষা কেন – ভাইভাতেও যদি ১০ নম্বরে সাড়ে তিন এর কম পাই – আমি ফেল। আমাকে পুরো ইয়ারের সবগুলি পরীক্ষা আবার পরের বছর দিতে হবে। স্যাররা কি এসব বোঝেন না? অবশ্যই বোঝেন। স্যাররাও নিশ্চয় এই পদ্ধতিতে পরীক্ষা দিয়ে স্যার হয়েছেন। স্যার হয়েই ছাত্রজীবনের সবকিছু হয়তো ভুলেই গেছেন। 
লটারিতে পড়লো ডিটারমিনেশান অব প্লাটিনাম রেজিস্ট্যান্স থার্মোমিটার কো-ইফিসিয়েন্ট। সোজা এক্সপেরিমেন্ট। কিন্তু পুরোটাই নির্ভর করে যন্ত্রপাতির মেজাজমর্জির উপর। কোন কারণে যদি থার্মোমিটার খারাপ হয় – সারাদিন চেষ্টা করলেও কিছু হবে না। আর স্যাররা তো কোন কথাই শুনতে চাইবেন না। সারা বছর প্র্যাকটিক্যালের সময় যে স্যারদের কোনদিনই প্র্যাকটিক্যাল রুমে দেখিনি – তাঁরা এসে পরীক্ষা নেন। 

মোবাশ্বের স্যারকে দেখেই কেমন যেন লাগছে। স্যার আমার টেবিলের কাছে আসার সাথে সাথেই আমি আমার জ্যামিতি বাক্স খুলে ফেললাম। ক্যালকুলেটরের কভার খুলে ফেললাম। কিন্তু তারপরেও স্যার খুশি হলেন না। স্যারের যে কথা শোনার ভয়ে এসব করলাম স্যার কপাল কুঁচকে সেই কথাই বললেন – “এই ছেলে, নকল নিয়ে এসেছো না কি? পকেটে কী?” – বলেই আমার প্যান্টের পকেটে হাত ঢোকাতে চাইলেন। আমি প্যান্টের দুই পকেটই ভেতর থেকে টেনে বের করে দিলাম। 

স্যার কেন মনে করেন সবাই পরীক্ষায় নকল নিয়ে আসে – আমি জানি না। আত্মসম্মানবোধ যে ছাত্রদেরও থাকতে পারে – তা কি শিক্ষকদের বোঝা উচিত নয়? কিন্তু স্যারদের তো একথা বলার কোন সুযোগ নেই। প্র্যাকটিক্যালে পঞ্চাশে ১৬ দিলেই ফেল, ভাইভাতে দশের মধ্যে তিন দিলেই ফেল। 

ছয় ঘন্টার পরীক্ষা আমার পাঁচ ঘন্টাতেই শেষ হয়ে গেল। খাতা জমা নেয়ার সময় আহমদ হোসেনস্যার বললেন, “জেনারেল ভাইভা দিয়ে যেয়ো।“

প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষার পাশাপাশি জেনারেল ভাইভাও হয়ে যাচ্ছে। ফরায়জি কামালস্যারের রুমে হচ্ছে জেনারেল ভাইভা। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর অরুন বসাক এসেছেন এক্সটার্নাল হিসেবে। এ অবরোধের সময় স্যাররা কীভাবে চলাচল করছেন জানি না। হয়তো ক্যাম্পাসের ভেতরই এক্সটার্নাল স্যারের থাকার ব্যবস্থা হয়েছে। শুনেছি বসাকস্যার প্রামাণিকস্যারেরও শিক্ষক ছিলেন। 

শিবিরের অবরোধের ফলে লাভ হয়ে গেল বলা চলে। জেনারেল ভাইভার জন্য আলাদা করে আরেকদিন আসতে হলো না। ফরায়জি কামালস্যারের রুমের সামনে কাউকে দেখতে পাচ্ছি না। মনে হচ্ছে ডেকে ডেকে ভাইভা নেয়া হচ্ছে। দরজার পর্দা সরানো। ফরায়জি কামালস্যার ডাক দিলেন – “অ্যাই ছেলে, তুমি কি সেকেন্ড ইয়ারের পরীক্ষার্থী?” গত তিন বছর ধরে স্যারের ক্লাস করছি – অথচ স্যার আমাকে চিনেনও না। স্যাররা না চিনলেই ভালো। তাতে ভাইভাতে প্রশ্নের উত্তর ঠিকমতো দিতে না পারলে মনের উপর আলাদা কোন চাপ থাকে না। বললাম, “জ্বি স্যার।“
“ভাইভা দিয়েছো?”
“না স্যার।“
“চলে আসো।“

রুমে ঢুকলাম। প্রামাণিকস্যারের পাশে ছিপছিপে গড়নের একজন অপরিচিত স্যার হাসিমুখে বসে আছেন। ইনিই নিশ্চয় এক্সটার্নাল বসাকস্যার। ভাইভা বোর্ড হচ্ছে আমার কাছে গিলোটিনে মাথা দেয়ার মতো। স্যাররা প্রশ্ন করার আগেই হৃৎপিন্ডের গতি বেড়ে যায়, গলা শুকিয়ে যায়, আর কেমন যেন গরম লাগতে শুরু করে। জানা প্রশ্নের উওরও ঠিকমতো দিতে পারি না। 

প্রথমেই জিজ্ঞেস করা হলো কী প্র্যাকটিক্যাল করলাম আজকে। প্লাটিনাম রেজিস্ট্যান্স থার্মোমিটারের কো-এফিসিয়েন্ট বের করে এসেছি একটু আগে – অথচ আমি প্লাটিনাম শব্দটিই ভুলে গেলাম। কয়েকবার রেজিস্ট্যান্স রেজিস্ট্যান্স বলে তোতলালাম। 

এবার বসাকস্যার জিজ্ঞেস করলেন তাপ দিলে রেজিস্ট্যান্স বাড়ে না কমে? 

তাপমাত্রা বাড়লে রেজিস্ট্যান্স বাড়ে সেটা জানি। বললাম। কিন্তু স্যাররা তো প্রশ্ন করেন আটকানোর জন্য। যতক্ষণ আটকাতে না পারবেন – ততক্ষণ তাঁরা শান্তি পান না। 

“তাপমাত্রা বাড়লে তো পদার্থের আয়তন বেড়ে যায়। আয়তন বেড়ে গেলে তো রেজিস্ট্যান্স কমে যাবার কথা। কিন্তু রেজিস্ট্যান্স বেড়ে যায় কেন?”

আটকে গেলাম। প্রামাণিক স্যার খুশি হলেন কি রেগে গেলেন বুঝতে পারলাম না। তিনি হঠাৎ জিজ্ঞেস করলেন, “রেয়াজুদ্দিন বাজারে গিয়েছ কখনো?”
“জ্বি স্যার, গিয়েছি।“
“সেখানে কী দেখেছো?”

আমি ঠিক বুঝতে পারছিলাম না – স্যার রেয়াজুদ্দিন বাজারে আমার আনাগোনার হিসেব কেন নিতে চাচ্ছেন? আমি তো প্রায় সময়ই রেয়াজুদ্দিন বাজারের আমতলা দিয়ে ঢুকে নুপুর সিনেমার টিকেট ঘরের সামনে গিয়ে বের হই। এই চোরাগলি তো স্যারের চেনার কথা নয়। স্যার কি তবে আমাকে নুপুর সিনেমার টিকেটের লাইনে দেখেছেন? কিন্তু স্যার তো আমাকে চেনেন না। স্যাররা না চিনলে কত ধরনের সুবিধা। কিন্তু প্রশ্নের উত্তর তো দিতে হবে। বললাম, “স্যার, জিনিসপত্র, দোকানপাট।“
“মানুষের কথা বল। সেখানে যে মানুষের ভীড় – সেই ভীড় ঠেলে কি তুমি দ্রুত যেতে পারবে?” 

ভীড়ের মধ্যে কীভাবে দৌড়াতে হয় – তা তো জানি। কিন্তু এখানে স্যার নিশ্চয় আমার দৌড়ানোর কৌশল জানতে চাচ্ছেন না। আমি কী বলবো বুঝতে না পেরে চুপ করে আছি দেখে স্যার আবার বললেন, “ভীড়ের ভেতর ব্যস্ততার ভেতর দিয়ে যেমন তুমি দ্রুত যেতে পারবে না, সেরকম ইলেকট্রনগুলিও তাপমাত্রা বাড়ার সাথে সাথে ছুটাছুটি করতে থাকে – ফলে সেগুলির ভেতর দিয়ে …” 

এবার বুঝতে অসুবিধা হলো না। তাপমাত্রা বাড়লে পদার্থের ইলেকট্রনের র‍্যানডম মুভমেন্ট বেড়ে যাবার ফলে রেজিস্ট্যান্স বেড়ে যায়। 

বসাকস্যারের প্রশ্ন করার মধ্যে কেমন যেন একটা কৌতুকবোধ আছে। স্যার হাসিমুখে কথা বলেন দেখে প্রশ্নের উত্তর না পারলেও খুব একটা খারাপ লাগে না। 

এক ধরনের ভালো লাগা নিয়েই বের হয়ে এলাম ভাইভা দিয়ে। সেকেন্ড ইয়ার শেষ বলা চলে। কিন্তু সাবসিডিয়ারি কখন শেষ হবে জানি না। 

প্রায় দৌড়ে চলে এলাম এক নম্বর গেটে। যীশু যেভাবে দৌড়ে গিয়ে বাসে উঠে – আমিও সেভাবেই দৌড়ে বাসে উঠে গেলাম। অবশ্য না দৌড়ালেও চলতো। অবরোধের কারণে আজ ছাত্রদের ভীড় নেই। 

এতদিন পরীক্ষার মধ্যেও আমি নাটকের রিহার্সালে গিয়েছি অনেকবার। কিন্তু পরীক্ষার কারণে মাঝে মাঝে বিরতি দিতে হয়েছে। এবার পরীক্ষা শেষ হবার পর থেকে প্রায় প্রতিদিনই বিকেল বেলা হাজির হচ্ছি শিল্পকলা একাডেমিতে। মনে হচ্ছে পদার্থবিজ্ঞানের চেয়েও নাটক আমার কাছে বেশি প্রিয় হয়ে উঠছে। এখন পুরনো নাটকের সেট টানছি – মনে মনে আশা করছি নতুন নাটকের কাজ শুরু হলে হয়তো অভিনয় করার সুযোগ পেতেও পারি। 

দিন চলে যাচ্ছে দ্রুত। এর মধ্যে মুকিতভাইয়ের উৎসাহে চৌধুরিহাটের পি-জে টাইপরাইটার্সে ভর্তি হয়ে গেলাম ইংরেজি টাইপ করা শেখার জন্য। প্রতিদিন সকালে গিয়ে মুকিতভাইসহ টাইপ রাইটারের সামনে বসে টাইপ করতে থাকি – the quick brown fox jumps over the lazy dog.  আমি এক লাইন টাইপ করতে করতে মুকিতভাইয়ের দশ লাইন টাইপ করা হয়ে যায়। 

প্রশিক্ষক ভদ্রলোক আমার হাতের আঙুলের দিকে তাকিয়ে খুবই বিরক্ত হয়ে বলেন, “কুইক ব্রাউন ফক্স হতে হবে, লেজি ডগ হলে চলবে না। দশ আঙুলে টাইপ করতে হবে। এভাবে এক আঙুলে টাইপ করতে থাকলে এক পৃষ্ঠা টাইপ করতে সারাদিন লাগবে। টাইপিস্টের চাকরি এত সোজা নয়।“ 

রুমের ভেতর আরো সাত-আটজন তরুণ-তরুণী ছিল। দেখলাম তারা টাইপ করা বন্ধ করে হা করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি অক্ষর খুঁজে খুঁজে এক আঙুলে টাইপ করছি – এরকম দৃশ্য তারা আগে কখনো দেখেনি। 

No comments:

Post a Comment

Latest Post

Memories of My Father - Part 4

  This is my first photo taken with my father. At that time, I had just moved up to ninth grade, my sister was studying for her honors, and ...

Popular Posts