Saturday 31 July 2021

স্বপ্নলোকের চাবি - পর্ব ৩১

 


স্বপ্নলোকের চাবি – ৩১

সারা ওয়ার্ডে গিজগিজ করছে মানুষ। বেশিরভাগ বেডের চারপাশে ভিড় করে দাঁড়িয়ে আছে কেউ না কেউ। এই ওয়ার্ডের সব রোগীর শরীরের কোথাও না কোথাও ব্যান্ডেজ বাধা। আমার মাথা একবার চক্কর দিয়ে উঠেছে। দেয়ালে হাত দিয়ে কোন রকমে সামলে নিয়েছি। হাসপাতাল আমার প্রিয় জায়গা নয়। এখানে এলে কেমন যেন অস্থির লাগতে থাকে। অসুস্থতার কাছে মানুষ যে কত অসহায় তা বোঝা যায় হাসপাতালে এলে।

দরজার কাছে দেয়ালে লাগানো বেডে সারা গায়ে-মাথায় ব্যান্ডেজ মোড়ানো ছোট্ট একটা শিশুর মাথার কাছে বসে নিঃশব্দে কাঁদছে একজন মা। দেখেই বোঝা যায় অর্থনৈতিক সামর্থ্য খুব একটা নেই। সরকারি হাসপাতালগুলি আছে বলেই গরীব মানুষরা এখনো কিছুটা হলেও চিকিৎসা পায়। মানুষ নিজের অসুস্থতার সাথে কোন রকমে বোঝাপড়া করে নেয়, কিন্তু সন্তান অসুস্থ হলে মায়ের যে কী কষ্ট হয় তা বোঝানো যায় না।

রুমের চারপাশে যতদূর যায় চোখ বুলালাম। এক কোণার বেডে দুমড়ে মুচড়ে পড়ে আছে একটি শুকনো শরীর। নিঃসঙ্গ। তার বেডের কাছে কেউ নেই। একটা পায়ের উরু থেকে নিচেরদিকের পুরোটাই ব্যান্ডেজে মোড়ানো – লোহার স্ট্যান্ডের সাথে বেল্ট দিয়ে উঁচু করে বেঁধে রাখা হয়েছে। অন্য পা মলিন লুঙ্গিতে ঢাকা থাকলেও বোঝা যাচ্ছে হাঁটুর নিচ থেকে বাকি অংশ নেই সেখানে। আস্তে আস্তে কাছে গিয়ে দেখলাম – অঘোরে ঘুমাচ্ছেন ক্লান্ত তরুণ। হয়তো ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়েছে। মুখভর্তি খোঁচাখোঁচা দাড়ি। একপাশ থেকে স্যারের চেহারার সাথে খুব মিল। আমাদের গ্রামের স্কুলের বিএসসি স্যারের ছোটভাই। এখন দেখে কে বলবে মাসখানেক আগেও এই তরুণ এক রাশ স্বপ্ন নিয়ে মাস্টার্স পড়ছিলেন আমাদের ক্যাম্পাসে। আমার সাথে পরিচয় হয়নি তার কোনদিন।

এখানে আসার কোন পরিকল্পনা আমার ছিল না। গতকাল সন্ধ্যায় দিদির বাসার গেট দিয়ে ভেতরে ঢোকার সময় হঠাৎ দেখা হয়ে গিয়েছিল স্যারের সাথে। আমাদের গ্রামের স্কুলের বিজ্ঞানশিক্ষক সৈয়দ বিএসসি স্যার। বছরখানেক আগেও স্যারের সাথে দেখা হয়েছিল একবার। এবার দেখে মনে হলো এক বছরের মধ্যে বিশ বছর বয়স বেড়ে গেছে স্যারের। গেটের কাছে দাঁড়িয়েই স্যার বললেন তাঁর ভাইয়ের দুর্ঘটনার কথা। বাংলা বিভাগের মাস্টার্সের ছাত্র স্যারের ভাই। আলাওল হলে থাকতেন। একদিন দোতলার ছাদের রেলিং-এ বসেছিলেন। সেই রেলিং ভেঙে নিচে পড়ে যান। তারপর থেকেই হাসপাতালে আছেন গত এক মাস। স্যার এখানে এক আত্মীয়ের বাসায় উঠেছেন। এখান থেকেই দিনরাত হাসপাতালে ছোটাছুটি করছেন।

আলাওল হলের অনেক পুরনো ইটের রেলিং ভেঙে নিচে পড়ে গিয়ে একজন ছাত্রের আহত হবার খবর আমরা পেয়েছিলাম। কিন্তু ব্যাস ঐটুকুই। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতর কোন শিক্ষার্থী কোন দুর্ঘটনার শিকার হলে তার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব কতটুকু আছে আমি জানি না। শুরুতে হয়তো কয়েকদিন বন্ধুবান্ধবরা এসে খবর নিয়েছে। তারপর প্রত্যেকেরই তো নিজেদের ব্যস্ততা থাকে। স্যার এসব জানেন বলেই হয়তো আমাকে একবারও বলেননি হাসপাতালে আসতে। অবশ্য আমি এসেও বা কী করতে পারছি। সবার অজান্তে একটু দেখে গেলাম। দেখে গেলাম পঙ্গুত্ব মানুষকে কীভাবে ক্রমশ নিঃসঙ্গ করে দেয়।

সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় অ্যাপ্রোন কাঁধে কয়েকজন তরুণকে দেখলাম পরস্পরের সাথে হাসিঠাট্টা করতে করতে উপরে উঠছে। পাশ কাটিয়ে যাবার সময় হঠাৎ মনে হলো – মানব না? ডাক দিলাম – অ্যাই মানব, মানব!

মানব থমকে দাঁড়িয়ে একটু পেছনে তাকালো। তারপর দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে গেল। হয়তো আমাকে চিনতে পারেনি। সিঁড়িতে আলো কম, অনেক ভীড়, উপর থেকে নিচের দিকে তাকালে হয়তো ঠিকমতো দেখা যায় না। অথবা হাতে সময় নেই, ওয়ার্ডে যেতে হবে – রোগীরা বসে আছে। আমি এখনো অনার্স থার্ড ইয়ারে হলে কী হবে – মেডিকেলে তো ওরা ফিফ্‌থ ইয়ারে উঠে গেছে। অনেক কারণ থাকতে পারে না চেনার। চিটাগং কলেজে আমরা একসাথে পড়েছি। হোস্টেলে সে আমার রুমমেট ছিল। বেশি আলোতে দেখলে অবশ্যই চিনতে পারতো। কিন্তু মন তো এসব যুক্তি মানতে চায় না। ঈর্ষা মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে থাকে -  ডাক্তারদের প্রতি, ডাক্তারি পড়ুয়াদের প্রতি। মেডিকেল সায়েন্সে কষ্ট কমানোর ওষুধ আছে, ঈর্ষা কমানোর ওষুধ আছে কি?

বড় বড় পা ফেলে বের হয়ে এলাম রাস্তায়। নার্সিং হোস্টেলের সামনের গেট দিয়ে বের হয়ে মেহেদিবাগের ভেতরের রাস্তা দিয়ে চলে এলাম শিল্পকলা একাডেমি। নাট্যকলা বিষয়ক তাত্ত্বিক কর্মশালা – শুরু হতে আর বেশিক্ষণ দেরি নেই।

কত কয়েকদিন ধরে চলছে এই অতি উচ্চমার্গের কর্মশালা। আমেরিকান এক মহিলা প্রফেসর ড্যানি প্যাট্রিজ আর নাট্যনির্দেশক জামিল আহমেদ এই ওয়ার্কশপ পরিচালনা করছেন। নাট্যকর্মী হতে গেলে কতটা নিবেদিতপ্রাণ হতে হয়, সমাজসচেতন আর রাজনীতিসচেতন হতে হয় তা অনেকভাবে বোঝানো হলো। প্রচুর পড়াশোনা করতে হবে, চর্চা করতে হবে, আর অনুশীলনের পাশাপাশি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

একাডেমির বড় একটা রিহার্সাল রুমে সবাই গোল করে বসে মনযোগ দিয়ে ড্যানি প্যাট্রিজ আর জামিল আহমেদের কথাবার্তা শুনছি। গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করার কথা বলা হয়েছে – আমি তাও করার চেষ্টা করছি। খুব সিরিয়াস আলোচনা হচ্ছে। ড্যানি প্যাট্রিজ খুব মোটাসোটা মহিলা। তাঁর কথাবার্তা শুনে মনে হচ্ছে তিনি সাচ্চা কমিউনিস্ট। আমেরিকান কমিউনিস্ট খুব একটা দেখা যায় না।

জামিল আহমেদ খুব লম্বা পাতলা কাঠখোট্টা ধরনের মানুষ। প্রথম ওয়ার্কশপেই তিনি নিজের পরিচয় দিয়েছিলেন ফুল টাইম নাটকের ওয়ার্কার হিসেবে। নাটক ছাড়া তিনি নাকি আর কোন চাকরি করেন না। শুনে আশ্চর্য হয়েছি। বাংলাদেশে মঞ্চনাটক করে সংসার চালানো যায়? পরে লিমনভাইয়ের কাছ থেকে শুনেছি – জামিল আহমেদ নাকি শীঘ্রই আমেরিকা চলে যাবেন নাট্যকলা সম্পর্কিত বেশ ভালো একটা স্কলারশিপ নিয়ে।

লিমনভাই আমাদের গ্রুপের বুদ্ধিজীবী। অর্থনীতিতে অনার্স পড়ছেন। ইউনিভার্সিটিতে আমাদের এক ব্যাচ সিনিয়র, কিন্তু কথাবার্তা শুনলে মনে হবে দশ পনেরো বছরের সিনিয়র। আজ দেখলাম তিনি জামিল আহমেদ আর ড্যানি প্যাট্রিজের কাছাকাছি বসেছেন। মনে হচ্ছে খুব মনযোগ দিয়ে শুনছেন নাটকের তত্ত্বকথা।

জামিল আহমেদ খুবই যুক্তিবাদী মানুষ বলে মনে হচ্ছে। তিনি বলছেন – ছোটবেলা থেকে আমরা শিখে এসেছি রিক্সাওয়ালাদের ভাষা অশ্লীল, সমাজ অসভ্য। সুতরাং ওদের সাথে মেশা মানা। কুলিমজুররা অস্পৃশ্য – কারণ তারা ছোট কাজ করে। আমরা মধ্যবিত্তরা চিরদিন উচ্চবিত্তদের করুণা লাভের চেষ্টা করছি। চেষ্টা করছি কী করে উচ্চবিত্ত সমাজে কল্কে পাওয়া যায়। সুতরাং মধ্যবিত্তরা নিম্নবিত্তদের জন্য কিছু করবে – এটা আশা করা যায় না।

রুমের মধ্যে মশার কয়েল জ্বালানো হয়েছে অনেকগুলি। কিন্তু কোন কাজ হচ্ছে না। অনেকগুলি বড় বড় মশা উড়ে বেড়াচ্ছে। মশারাও সম্ভবত উচ্চবিত্ত নিম্নবিত্ত চেনে – তাই আমেরিকান মহিলার ওদিকে বেশি ঘুরঘুর করছে। দেখলাম আমেরিকানরা যুদ্ধ লাগিয়ে মানুষ মারতে যতটা ওস্তাদ – মশা মারতে ততটা নয়। ড্যানি প্যাট্রিজের গায়ে মশা বসলেও তাঁর কোন হেলদোল নেই। এদিকে লিমনভাই হাত দিয়ে মশা ধরতে শুরু করেছেন। মাছ ধরার মতো মশা ধরার মধ্যেও নেশা আছে নিশ্চয়। তিনি মশা মারতে মারতে এতটাই মশগুল হয়ে গেলেন যে জামিল আহমেদ কথা থামিয়ে কয়েক সেকেন্ড যে তাঁর দিকে অগ্নিদৃষ্টি নিক্ষেপ করেছেন তা খেয়াল করেননি। ফলে যা হলো তার জন্য আমরা কেউই প্রস্তুত ছিলাম না। জামিল আহমেদ হঠাৎ রেগে উঠে চিৎকার করে লিমনভাইকে রুম থেকে বের করে দিলেন। বুঝলাম – মঞ্চনাটকের ডিরেক্টর আর ডিক্টেটরে খুব বেশি পার্থক্য নেই। এরপর মশা কামড় দিলেও নড়াচড়া করতেও ভয় পাচ্ছিলাম। এত ভয়ের মধ্যে আমি কিছু শিখতে পারি না।

ওয়ার্কশপের পর আমাদের নাটক ‘সমাধান’– হলের মধ্যে। নাটকের টিকেট বিক্রি করা – যাকে বলে ফোর্সড সেল করা নাট্যকর্মীদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। আমাকে পাঁচটি টিকেট দেয়া হয়েছিল ‘জোর করে বিক্রি করা’র জন্য। অনিচ্ছুক ব্যক্তিকে জোর করে টিকেট গছিয়ে টাকা নেয়া আর চাঁদাবাজি করা একই কথা। আমি পাঁচটি টিকেট আমার পাঁচ বন্ধুকে এমনিতেই দিয়ে দিয়েছিলাম। প্রদীপনাথ সরাসরি বলেছিল আমার ‘তোহফা’ দেয়া টিকেটে শিল্পকলা একাডেমিতে গিয়ে মঞ্চনাটক দেখার কোন ইচ্ছে তার নেই। তারচেয়ে ভিসিআর-এ জিতেন্দ্র-শ্রীদেবীর ‘তোহফা’ দেখা অনেক আনন্দের। যারা আসবে বলেছিল – তাদের মধ্যে যীশু ছাড়া আর কেউ আসেনি। আমি অবশ্য তাতে খুব খুশি। কারণ মঞ্চে আমার  কোন সংলাপ নেই, কেবল সেট টানাটানি করছি – এটা বন্ধুদের ডেকে এনে দেখানোর মতো কিছু নয়।

ব্যাকস্টেজ থেকে বের হয়ে হলের বারান্দায় এসে দেখলাম ড্যানি প্যাট্রিজ, জামিল আহমেদ আর আহমেদ ইকবাল হায়দার দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলছেন। জামিল আহমেদ আমাদের নাটকের মূল নির্দেশক। তিনি ঢাকায় থাকেন বলে প্রত্যেক শো-তে আসা সম্ভব হয় না। তাই হায়দারভাই কার্যনির্বাহী নির্দেশকের দায়িত্ব পালন করেন। আমি পাশ কাটিয়ে চলে আসছিলাম। শুনলাম জামিল আহমেদ বললেন, “আপনার কাজ খুব ভালো হয়েছে।“ আমি বুঝতে পারছিলাম না তিনি কাকে বললেন। আমি একটু পেছন ফিরে তাকালাম। তিনি আবার বললেন, “হ্যাঁ, আপনাকে বলছি। মঞ্চে আপনার কাজ খুব ভালো হয়েছে।“

কর্মশালায় দেখেছি জামিল আহমেদ সবাইকে আপনি করে বলেন। তিনি আমার কাজের প্রশংসা করছেন? আমি পুরোপুরি তাদের দিকে ফিরে বললাম, “থ্যাংক ইউ স্যার। আমি তো তেমন কিছু করিনি।“

ড্যানি প্যাট্রিজ বললেন, “ইন থিয়েটার, এভরি সিঙ্গেল মুভমেন্ট ইজ ইম্পর্ট্যান্ট। ইওর পার্ট ওয়াজ ফ্ললেস।“ হুবহু এরকম বলেছিলেন কি না জানি না। আমেরিকান উচ্চারণ ঠিকমতো বুঝিনি। কিন্তু আমার মনে হলো এরকম কিছুই বলেছেন। আমি তো ফুলে বেলুন হয়ে গেলাম। মনে হচ্ছে জামিল আহমেদের মতো আমিও যদি একটা থিয়েটারের স্কলারশিপ পেয়ে যেতাম – পদার্থবিজ্ঞান পড়া বাদ দিয়ে থিয়েটার নিয়েই পড়ে থাকতাম।

দুই লাইন প্রশংসার বাতাসেই প্রায় উড়তে শুরু করলাম। গরিবুল্লাহ শাহ্‌র মাজার থেকে মুরাদপুরে এসে তিন নম্বর বাসে উঠে ফতেয়াবাদে নেমে হাঁটতে হাঁটতে নিজের রুমে আসতে আসতে সারাক্ষণই ভাবছিলাম – সুযোগ পেলে আমার অভিনেতা হতে আটকায় কে। আরো সিরিয়াসলি নাট্যসাহিত্য পড়তে হবে।

অন্ধকারে রুমের তালা খোলার সময় কিছু চোখে পড়েনি। করিডোরে আলো নেই, বাথরুমের লাইটটা সম্ভবত ফিউজ হয়ে গেছে। রুমের লাইট জ্বালানোর পর চোখে পড়লো – আমার দরজায় চক দিয়ে কেউ বড় বড় অক্ষরে লিখে রেখেছে – সালমান রুশদীর ফাঁসি চাই।

এতক্ষণের ফুরফুরে মেজাজটা মুহূর্তেই খারাপ হয়ে গেল। সালমান রুশদী কে আমি ঠিকমতো জানিও না। তার নাম শুনেছি মাত্র কয়েকদিন আগে। স্যাটানিক ভার্সেস নামে যে বইটি লিখেছে সেটি বাংলাদেশে কেউ পড়েছে কি না জানি না – কিন্তু নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এই বইটি গতবছর সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত হয়েছে ব্রিটেন থেকে। চার-পাঁচ মাস কোন সমস্যা হয়নি। কিন্তু এবছরের শুরু থেকে ঝামেলা শুরু হয়েছে। গত মাসে ইরানে ফতোয়া দেয়া হয়েছে এই বইয়ের বিরুদ্ধে। লেখক সালমান রুশদীকে হত্যা করতে পারলে বেশ মোটা অঙ্কের পুরষ্কার ঘোষণা করা হয়েছে। আগামীকাল ২১ মার্চ সালমান রুশদীর ফাঁসির দাবিতে সারাদেশে অর্ধদিবস হরতাল ডেকেছে জামায়াত-শিবির। সবই বুঝলাম – কিন্তু আমার দরজায় কেন সালমান রুশদীর ফাঁসির দাবি? অন্য কারো দরজায় তো এই দাবির কথা লিখে রাখেনি কেউ! আমাকে ইচ্ছে করে বিরক্ত করা হচ্ছে তা বুঝতে পারছি। কিন্তু তাদের উপর বিরক্ত হয়ে আমি কিছু করতে পারবো না। বড়জোর এখান থেকে চলে যেতে পারবো। কিন্তু যাবো কোথায়? সবখানেই তো এখন এরকম চলছে।

পরদিন খুবই জঙ্গি ধরনের হরতাল হলো। সালমান রুশদীকে যেখানে পাওয়া যাবে সেখানে খুনের ঘোষণা তো দেয়া হলোই – তার সাথে বাংলাদেশের কেউ যদি সালমান রুশদীর পক্ষে কথা বলে – তাকেও খুন করা হবে বলে জানিয়ে দেয়া হলো। এখন খুন করা কত সহজ হয়ে গেলো! কাউকে খুন করে বলে দিলেই হলো যে সে সালমান রুশদীর পক্ষে কথা বলেছিল। আমি খুবই ভয় পেয়ে গেলাম। আমার দরজায় চকের লেখা – ভেজা কাপড় দিয়ে মুছে ফেলা যায়। কিন্ত ভয়ের চোটে আমি কিছুই করলাম না।

থার্ড ইয়ারের ক্লাস শুরু হলো কয়েকদিন পর। আমাদের অনার্সের সিলেবাস যারা তৈরি করেছিলেন তাঁরা নিশ্চয় অনেক ভেবেচিন্তে করেছিলেন। ফার্স্ট ইয়ারে তিন  পেপার অনার্স আর দুই পেপার সাবসিডিয়ারি, সেকেন্ড ইয়ারে তিন পেপার অনার্স আর চার পেপার সাবসিডিয়ারি, আর থার্ড ইয়ারে আট পেপার অনার্স। আর সব বিষয়ের প্র্যাকটিক্যাল তো আছেই। একটা বছরে যে পরিমাণ সময় পাওয়া যায় – সব বছরে তো একই পরিমাণ সময় পাওয়া যাবার কথা। সেক্ষেত্রে তিন বছরে অনার্সের বিষয়ভিত্তিক বন্টনে এত বৈষম্য কেন? আর যেভাবে সিলেবাস করা হয়েছে – বাস্তবে দেখা যাচ্ছে সেরকম হচ্ছে না। ফার্স্ট ইয়ারে তিন পেপারের অনার্স আর প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষার পর সেকেন্ড ইয়ারে উঠে যাচ্ছি। সেকেন্ড ইয়ারে উঠে ফার্স্ট ইয়ারের সাবসিডিয়ারি পরীক্ষা দিতে হচ্ছে, তারপর তিন পেপারের অনার্স ও প্র্যাকটিক্যাল। থার্ড ইয়ারে উঠে সেকেন্ড ইয়ারের চার পেপার সাবসিডিয়ারি, আর থার্ড ইয়ারের আট পেপার অনার্স ও প্র্যাকটিক্যাল। এতকিছু একসাথে কীভাবে করবো?

ক্লাস শুরু হলো খুবই ধীরগতিতে। ফার্স্ট ইয়ার সেকেন্ড ইয়ারে যেসব স্যার আমাদের পড়াননি তাঁদের অনেককেই পেলাম থার্ড ইয়ারে। ফার্স্ট পেপার অপটিক্‌স পড়াচ্ছেন আবদুস সোবহান ভুঁইয়া স্যার। ভুঁইয়া স্যার প্রথমদিন ক্লাস নিতে এলেন প্যান্ট-শার্ট আর মোটা টাই পরে। ফ্রান্স থেকে পিএইচডি করে এসেছেন তিনি, আশা করেছিলাম পদার্থবিজ্ঞানের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার অনেক গুরুত্ব দিয়ে পড়াবেন। কিন্তু সেরকম কিছু হলো না। প্রতি ক্লাসেই তিনি কিছু না কিছু ইসলামিক কথাবার্তা বলতে শুরু করলেন। থার্ড ইয়ারের শুরুতেই বেশ একটা ধাক্কা খেলাম।

সেকেন্ড পেপার রিলেটিভিটি পড়াচ্ছেন নুরুল মোস্তফাস্যার। রিলেটিভিটির সিলেবাস দেখে ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। আইনস্টাইনের স্পেশাল থিওরি অব রিলেটিভিটি তবুও কিছুটা আয়ত্বে আসতে পারে, কিন্তু জেনারেল থিওরি অব রিলেটিভিটির গাণিতিক ব্যাপারগুলি বুঝতে খবর হয়ে যাবে। কিন্তু নুরুল মোস্তফা স্যার খুব সিস্টেমেটিকভাবে পড়াতে শুরু করলেন। তিনি আইনস্টাইন কীভাবে এসব তত্ত্ব আবিষ্কার করলেন সে সংক্রান্ত কোন বিষয়ে কোন কথা না বলে সরাসরি গাণিতিক সমীকরণগুলি লিখতে শুরু করলেন বোর্ডে। আমরাও লিখতে শুরু করলাম।

থার্ড পেপার ইলেকট্রোডায়নামিক্স পড়াচ্ছেন রশীদুন্নবীস্যার। তিনি এখন বিভাগীয় সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। তারপরও আমাদের ক্লাস নিয়মিতই নিচ্ছেন ঠিকমতো।

ফোর্থ পেপার পড়াতে এলেন আহমদ হোসেনস্যার। এই স্যারের ক্লাস আগে কখনো পাইনি। প্রথম দিনের ক্লাসেই বুঝলাম স্যার খুবই সিরিয়াস মানুষ। হাসি কাহাকে বলে তিনি জানেন না। গাম্ভীর্য কী জিনিস সে ব্যাপারে তাঁর জ্ঞান সীমাহীন। প্রথম দিনই বিরাট বিরাট সার্কিট ডায়াগ্রাম এঁকে ব্ল্যাকবোর্ড ভরিয়ে ফেললেন। দাঁত্মুখ খিঁচিয়ে যখন বলেন “বুঝতে পেরেছো?” – তখন আমার বুকের ভেতরের সার্কিট কেঁপে উঠে। তখন কার এমন বুকের পাটা যে বুঝতে না পারলেও সেটা প্রকাশ করবে?

ফিফ্‌থ পেপার হলো থার্ড ইয়ারের সবচেয়ে বড় বিভীষিকা – কোয়ান্টাম মেকানিক্স। ফার্স্ট ইয়ারে প্রামাণিকস্যার ম্যাথমেটিক্যাল ফিজিক্স পড়িয়েছিলেন। তখন থেকেই জানি প্রামাণিকস্যারের ক্লাসে কিছু বোঝার চেষ্টা করা বৃথা। তাই কোয়ান্টাম মেকানিক্সে প্রথম থেকেই আমার লক্ষ্য হচ্ছে অন্তত স্যার বোর্ডে ডান হাতে যা লিখছেন তা বাম হাতে মুছে ফেলার আগেই যেন খাতায় তুলে ফেলতে পারি।

সিক্সথ পেপার অ্যাটমিক অ্যান্ড মলিকিউলার ফিজিক্স পড়াচ্ছেন এস কে সাহাস্যার। স্যারের সবকিছুই খুবই গোছানো। বিশাল ব্ল্যাকবোর্ডের একেবারে বাম দিকের উপরের কোণা থেকে লিখতে শুরু করেন। ক্লাস শেষ হবার আগেই পুরো বোর্ড ভরে যায়। দেখে দেখে লিখতে খুব একটা অসুবিধা হয় না। কিন্তু মনে হচ্ছে শুধু লিখতেই পারছি – বুঝতে পারছি না কিছুই। আমার হলো কী – ক্লাসে কিছু বুঝতে পারছি না কেন? ফারুককে এই প্রশ্ন করার পর সে দার্শনিকভাবে উত্তর দিলো – ‘বৎস, ক্লাসে বসিয়া শুধুই লিখিবে, বুঝিবার চেষ্টা করিবে না। বুঝিবার চেষ্টা করিলে লিখিতে পারিবে না।“

সেভেন্থ পেপার নিউক্লিয়ার ফিজিক্স পড়াচ্ছেন প্রফেসর নুরুল ইসলাম স্যার। এই স্যারের ক্লাস আগে পাইনি। ফিজিক্স ডিপার্টমেন্টের সবচেয়ে ক্ষমতাশালী শিক্ষক তিনি। সায়েন্স ফ্যাকাল্টির ডিন ছিলেন। ফ্যাকাল্টিতে কম্পিউটার নিয়ে এসেছেন তিনি। কম্পিউটার সম্পর্কে একটা বইও লিখেছেন। স্যারের হাতের লেখা খুব সুন্দর। তবে যে নোটগুলি থেকে তিনি পড়াচ্ছেন – সেই নোটগুলির বয়স মনে হয় অনেক বেশি। কিন্তু স্যারের ক্লাসে মনে হচ্ছে কিছু কিছু জিনিস বুঝতে পারছি। এটা আশ্চর্য ঘটনা।

এইটথ পেপার সলিড স্টেট ফিজিক্স পড়াচ্ছেন আদম শফিউল্লাহস্যার। ফার্স্ট ইয়ারে দেখেছি – স্যার ক্লাস নেন খুবই কম। কিন্তু ক্লাসে যা পড়ান – তা হুবহু পরীক্ষায় আসে। এখানেও সেরকম হবে তাতেই আমি খুশি। ফার্স্ট ইয়ারে স্যার ক্লাসের বাইরে সিগারেট টেনে আসতেন। এখন থার্ড ইয়ারে সিগারেট ক্লাসের ভেতরও হাতেই থাকছে। স্যারের স্বাস্থ্য মনে হচ্ছে আরো ভালো হয়েছে। মধ্যপ্রদেশ আরো স্ফিত হয়েছে। প্রথম দিন কীভাবে যেন ফার্স্ট বেঞ্চে বসেছিলাম। চোখ বার বার চলে যাচ্ছিলো স্যারের শার্টের বোতামের দিকে। সারাক্ষণই মনে হচ্ছিলো স্যারের শার্টের বোতাম এখনই ছিঁড়ে বন্দুকের গুলির মতো ছুটে এসে আমার চোখে লাগবে।


পরের পর্ব >>>>>>>>>>>>>>>>>

<<<<<<<<<<<< আগের পর্ব 


No comments:

Post a Comment

Latest Post

Memories of My Father - Part 2

  In our childhood and even in our adulthood, there was no tradition of celebrating birthdays. We didn't even remember when anyone's...

Popular Posts