Thursday, 9 June 2022

আবহাওয়ার গাণিতিক মডেল

 



অনেকেই বলেন -  আজকাল সবকিছু অনিশ্চিত হয়ে উঠছে, কখন কী হবে তা আগে থেকে কিছুই বলা যাচ্ছে না – ইত্যাদি। কিন্তু একটু ভেবে দেখলেই বোঝা যাবে যে আধুনিক বিজ্ঞানের কল্যাণে এখন অনেক কিছুরই পূর্বাভাস এত সঠিকভাবে দেয়া সম্ভব হচ্ছে – যা বিশ বছর আগেও এতটা নিখুঁতভাবে দেয়া সম্ভব হতো না। আবহাওয়ার কথা ধরা যাক। কোথায় কখন ঝড় উঠবে, বৃষ্টি হবে, রোদ থাকবে কি মেঘ – সবই আগে থেকে সঠিকভাবে বলে দেয়া সম্ভব হচ্ছে। বর্তমান যুগে উন্নত দেশে আবহাওয়ার পূর্বাভাস প্রায় অক্ষরে অক্ষরে মিলে যায়। কীভাবে সম্ভব হচ্ছে আবহাওয়ার পরিবর্তন সম্পর্কে এরকম ভবিষ্যতবাণী করা?

শিল্পযুগ শুরু হবার পর গত একশ বছরে পৃথিবীর বায়ুমন্ডলে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বেড়ে গেছে শতকরা চল্লিশ ভাগ। পৃথিবীর যে গড় তাপমাত্রা গত এক হাজার বছর ধরে প্রায় স্থির ছিল – সেই গড় তাপমাত্রা হঠাৎ এক ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে গেছে। যেভাবে এগোচ্ছে তাতে বিজ্ঞানীরা হিসেব করে দেখেছেন যে এই একবিংশ শতাব্দীর মধ্যেই পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা আরো দুই থেকে তিন ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে যাবে। ফলে পৃথিবীর জলবায়ুতে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটবে। যেখানে প্রচুর পানি আছে – সেখানে বন্যার প্রাবল্য বেড়ে যাবে, অন্যদিকে যেখানে পানির অভাব, সেখানে আরো খরা হবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ বেড়ে যাবে ব্যাপক হারে। পরিবর্তনের এই যে পূর্বাভাস দেয়া হচ্ছে – তা কীভাবে সম্ভব হচ্ছে?

এর মূলে রয়েছে আধুনিক বিজ্ঞান। আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেয়ার জন্য আবহাওয়াবিদ্‌রা যে তিনটি প্রধান বিষয়ের উপর নির্ভর করেন – সেগুলি হলো পর্যবেক্ষণ, কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত আবহাওয়া মডেল, এবং আবহাওয়ার বিজ্ঞান ও বৈজ্ঞানিক অভিজ্ঞতা। বায়ুমন্ডলের চাপ, তাপ, জলীয় বাষ্পের পরিমাণ, বায়ু-প্রবাহের গতিপথ ও বেগ ইত্যাদি একেক জায়গায় একেক রকম হয়ে থাকে। এগুলির পরিবর্তনও হয় দ্রুত। তাই একেক জায়গার আবহাওয়া একেক রকম। বর্তমানে অনেকগুলি আধুনিক স্যাটেলাইট পৃথিবীর চারপাশে অনবরত ঘুরে ঘুরে আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ করছে এবং পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের আবহাওয়া-দপ্তরে অনবরত তথ্য পাঠাচ্ছে। এই তথ্যগুলিকে কম্পিউটার মডেলের মধ্যে প্রবেশ করিয়ে আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেয়া হয়।

আবহাওয়ার কম্পিউটার মডেল হলো আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেয়ার প্রধান অবলম্বন। আবহাওয়ার পরিবর্তনে পদার্থবিজ্ঞানের যতগুলি নিয়ম কাজ করে তার সবগুলি গাণিতিক সমীকরণের মিশ্রণে তৈরি হয়েছে এই মডেল। বায়ুমন্ডলের তাপ, চাপ, আর্দ্রতা, বায়ুপ্রবাহ, তাপের বিকিরণ, শোষণ, আপেক্ষিক তাপ, আপেক্ষিক আর্দ্রতা ইত্যাদি হাজারো প্যারামিটারের যে কোনোটারই পরিবর্তনে বদলে যেতে পারে স্থানীয় আবহাওয়া। তবে কতটুকু বদল হবে তা হিসেব করার জন্য পৃথিবীর জলবায়ুর গাণিতিক মডেল দরকার হয়। সেই মডেলে কোটি কোটি উপাত্ত বিশ্লেষণ করা হয় খুবই কম সময়ের মধ্যে। এই কাজের জন্য সুপার-কম্পিউটার ব্যবহার করা হচ্ছে এখন। অস্ট্রেলিয়ার আবহাওয়ার গাণিতিক মডেল হিসেব করার জন্য যে সুপার-কম্পিউটার ব্যবহার করা হয় সেটা প্রতি সেকেন্ডে ১৬০০ ট্রিলিয়ন হিসেব করতে পারে।

পদার্থবিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠিত নিয়ম কাজে লাগিয়ে বিজ্ঞানীরা জলবায়ু পরিবর্তনের গাণিতিক মডেল তৈরি করেছেন। ষাটের দশকের সরল একমাত্রিক মডেল থেকে শুরু হয়ে ক্রমাগত উন্নত হতে হতে সেগুলি বর্তমানের সুপার কম্পিউটার প্রযুক্তির যুগে প্রায়-নিঁখুত বহুমাত্রিক মডেলে পরিণত হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের পূর্বাভাস দেয়ার কার্যকর মডেল তৈরিতে যুগান্তকারী ভূমিকা রেখেছেন আমেরিকার প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটির প্রফেসর সুকুরু মানাবে এবং জার্মানির ম্যাক্স প্লাংক ইন্সটিটিউট অব মেটিওরলজির প্রফেসর ক্লাউস হাসেলমান। এজন্য তাঁদেরকে ২০২১ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার দেয়া হয়েছে। কিন্তু এই পথে বিজ্ঞানীদের পদচারণা শুরু হয়েছিল অনেক অনেক বছর আগে।

আবহাওয়া কিংবা জলবায়ুর পূর্বাভাস দেয়ার কাজ প্রথম শুরু হয়েছিল প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে। খ্রিস্টপূর্ব ৫৮০ সালে গ্রিক দার্শনিক থেলিস পূর্ববর্তী বছরগুলির ফসলের পরিমাণ হিসেব করে আবহাওয়ার পূর্বাভাস দিয়েছিলেন। তবে সেই পূর্বাভাস ছিল অনেকটাই অভিজ্ঞতানির্ভর। এরপর খ্রিস্টপূর্ব ৩৫০ সালে অ্যারিস্টটল প্রথম বিজ্ঞানভিত্তিক আবহাওয়া-মডেল তৈরি করার চেষ্টা করেছিলেন। তিনি সূর্যের তাপে পানি বাষ্প হয়ে মেঘ তৈরি করার ব্যাপারে সঠিক ধারণা দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি বিশ্বাস করতেন যে পৃথিবীকে কেন্দ্র করে সূর্য ঘুরছে, এবং মহাবিশ্বের সবকিছুই আগুন, পানি, বাতাস আর মাটি দিয়ে তৈরি। ফলে তাঁর দেয়া ধারণাগুলি পরবর্তীতে পরিত্যক্ত হয়। কিন্তু অ্যারিস্টটলের হাতেই আবহাওয়াবিজ্ঞানের নামকরণ হয় ‘মেটিওরলজি’ যা এখনো ব্যবহৃত হচ্ছে। গ্রিক শব্দ ‘মেটিওরস’-এর অর্থ হলো আকাশের উপরে। সেই সময় আকাশ থেকে যা কিছু আকাশে থাকে বা আকাশ থেকে নেমে আসে – যেমন মেঘ, বৃষ্টি – সবকিছুকেই বলা হতো মেটিওর।

ফরাসি পদার্থবিজ্ঞানী জোসেফ ফুরিয়ার পৃথিবীর বায়ুমন্ডল উত্তপ্ত হওয়ার কারণ আবিষ্কার করেন আজ থেকে প্রায় দু’শ বছর আগে। তিনিই প্রথম ব্যাখ্যা করেছিলেন গ্রিনহাউজ ইফেক্টের ব্যাপারটা। সূর্যের আলো পৃথিবীর বায়ুমন্ডল ভেদ করে পৃথিবীতে এসে পৌঁছায়। এই আলোর বেশিরভাগ পৃথিবীপৃষ্ঠ শোষণ করে নেয়। এই শক্তি শোষণ করার পর পৃথিবীপৃষ্ঠ উত্তপ্ত হয়ে অতিরিক্ত শক্তি বিকিরণ পদ্ধতিতে বের করে দেয়। পৃথিবীপৃষ্ঠ থেকে যে শক্তি বেরিয়ে আসে – পৃথিবীর বায়ুমন্ডল সেটা শোষণ করে নেয়। ফলে বায়ুমন্ডলের তাপমাত্রা বেড়ে যায়। শক্তির আদান-প্রদানের এই পদ্ধতিতে একটা সূক্ষ্ম পরিবর্তন ঘটে। সূর্যের যে আলো পৃথিবীতে আসে – তার শক্তি অনেক বেশি। আলোর কোয়ান্টাম তত্ত্ব অনুযায়ী সেই আলোর কম্পাঙ্ক বেশি, তরঙ্গদৈর্ঘ্য কম। কম তরঙ্গদৈর্ঘ্যের কারণে আলো সহজেই পৃথিবীর বায়ুমন্ডল ভেদ করে পৃথিবীতে চলে আসতে পারে। কিন্তু ভূপৃষ্ঠ থেকে যে শক্তি নির্গত হয় – তা হয় তাপের আকারে। এই শক্তির তরঙ্গদৈর্ঘ্য বেশি, কম্পাঙ্ক কম। ফলে এগুলি পৃথিবীর বায়ুমন্ডল ভেদ করে মহাশূন্যের দিকে চলে যেতে পারে না, বায়ুমন্ডলে বাধা পেয়ে আবার পৃথিবীতেই ফিরে আসে। ফলে পৃথিবীর বায়ুমন্ডলের তাপমাত্রা বাড়তে থাকে। এই ব্যাপারটাই গ্রিনহাউজ ইফেক্ট। এই প্রক্রিয়াটি খুবই জটিল। অসংখ্য প্যারামিটার বা সূচক এখানে জড়িত। তার সবগুলিকে হিসেব করে একটা মডেলের আওতায় নিয়ে আসা সহজ নয়। বিজ্ঞানীরা বছরের পর বছর ধরে এই জটিল কাজটি করার চেষ্টা করছেন।

আবহাওয়ার গতিপ্রকৃতি বোঝার জন্য একমাত্রিক গাণিতিক মডেলে বাতাসের তাপমাত্রার পরিবর্তন, আর্দ্রতার পরিমাণ, বাতাসের বেগ, মেঘের ঘনত্ব ইত্যাদি প্যারামিটার যুক্ত করে পৃথিবীর জলভাগ ও স্থলভাগের সাথে এসবের পরিবর্তন কীভাবে ঘটে তার পদার্থবৈজ্ঞানিক হিসেবগুলি বিবেচনায় নেয়া হয়। এরকম একমাত্রিক মডেলে আবহাওয়া পরিবর্তনের সম্ভাবনার কথা বলা যায়, কিন্তু তাতে ফাঁক থেকে যায় অনেকখানি।

বাতাসে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার কারণে পৃথিবীর তাপমাত্রা বেড়ে যাচ্ছে – এরকম কথা আমরা প্রায়ই শুনি আজকাল। কথাটি সত্য। বাতাসে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পরিমাণের সাথে যে তাপমাত্রার পরিবর্তনের সরাসরি সম্পর্ক আছে তা প্রথম আবিষ্কার করেছিলেন সুইডেনের পদার্থবিজ্ঞানী সান্তে আরহেনিয়াস – একশ বছরেরও বেশি আগে উনিশ শতকের শেষের দিকে। ১৮৯৪ সালে আরহেনিয়াসের মডেল ছিল জলবায়ু পরিবর্তনের সর্বপ্রথম গাণিতিক মডেল। আরহেনিয়াস ১৯০৩ সালে রসায়নে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছিলেন। স্বাভাবিক বাতাসে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ শতকরা মাত্র ০.০৪৬ ভাগ, আর জলীয় বাষ্পের পরিমাণ শতকরা এক ভাগের মতো। ভূ-পৃষ্ঠ থেকে যে তাপ বের হয় তা বাতাসের এই জলীয় বাষ্প ও কার্বন-ডাই-অক্সাইড মিলে শোষণ করে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেয়। পৃথিবীতে প্রাণের উদ্ভব এবং জীবন ধারণের জন্য এই তাপ শোষণ প্রক্রিয়া খুবই দরকারি। কার্বন-ডাই-অক্সাইড ও জলীয়বাষ্প যদি তাপ শোষণ না করতো তাহলে পৃথিবীপৃষ্ঠের গড় তাপমাত্রা হতো মাইনাস আঠারো ডিগ্রি সেলসিয়াস। হিমাঙ্কের নিচে সেই তাপমাত্রায় প্রাণের উদ্ভব হয়তো হতোই না। আরহেনিয়াস তাঁর গাণিতিক মডেলের সাহায্যে হিসেব করে দেখিয়েছেন যে বাতাসের কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ যদি কমে গিয়ে অর্ধেক হয়ে যায়, তাতে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা পাঁচ থেকে ছয় ডিগ্রি কমে যেতে পারে। ফলে পৃথিবীতে আবার বরফ যুগ নেমে আসতে পারে। আবার কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বেড়ে গেলেও পৃথিবীর জলবায়ুর ব্যাপক পরিবর্তন ঘটবে। যার কিছু কিছু আমরা এখন দেখতে পাচ্ছি।

আমেরিকার ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোস্ফেরিক  অ্যাডমিনিস্ট্রেশানের আগের নাম ছিল ইউনাইটেড স্টেটস ওয়েদার ব্যুরো। এই ব্যুরোর জিওফিজিক্যাল ফ্লুইড ডায়নামিক্স ল্যাবোরেটরি (জিএফডিএল) জলবায়ুর একমাত্রিক মডেল উদ্ভাবন করেছিল ১৯৬০ সালের শুরুর দিকে। এই মডেল ছিল বিকিরণ ও পরিচলনের সাম্যাবস্থার সমীকরণের উপর ভিত্তি করে উদ্ভাবিত। জলবায়ুর পরিবর্তনে মূল ভূমিকা রাখে চার ধরনের তাপ বিনিময় প্রক্রিয়া। (১) সূর্য থেকে আলোর বিকিরণ পৃথিবীতে এসে পৌঁছায়। এই স্বল্প তরঙ্গদৈর্ঘ্যের বিকিরণ পৃথিবীপৃষ্ঠে শোষিত হয়। (২) এরপর তাপ আকারে সেই বিকিরণ পৃথিবী থেকে উপরের দিকে চলে যায়। তখন তার তরঙ্গদৈর্ঘ্য বেড়ে যায়। এই দীর্ঘ তরঙ্গদৈর্ঘ্যের বিকিরণ অনেকটুকুই বায়ুমন্ডলের নিচের স্তরের তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেয়। (৩) এরপর দেখা হয় পৃথিবীপৃষ্ঠ থেকে কতটুকু তাপ নির্গত হয়, এবং (৪) বাতাসের পরিচলন প্রক্রিয়ায় কতটুকু তাপ বায়ুমন্ডলে ছড়িয়ে পড়ে।

এই একমাত্রিক মডেলের প্যারামিটারের সাথে বাতাসের কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পরিবর্তনের ব্যাপারটা যোগ করে পদার্থবিজ্ঞানী স্যুকুরো মানাবে ১৯৬৭ সালে জলবায়ু পরিবর্তনের একমাত্রিক মডেলের একটি সরল পরীক্ষা বেশ সফলভাবে সম্পন্ন করেছিলেন। তিনি ভূপৃষ্ঠ থেকে চল্লিশ কিলোমিটার উঁচু একটি বায়ুস্তম্ভ ধরে এই পরীক্ষা চালিয়েছিলেন। পৃথিবীপৃষ্ঠ থেকে এই উচ্চতায় ওজোনস্তর। পৃথিবীপৃষ্ঠ থেকে যে তাপ বিকীর্ণ হয় তা এই স্তরেই শোষিত হয়ে বায়ুমন্ডলের উষ্ণতা বাড়িয়ে দেয়। স্যুকুরো মানাবে হিসেব করে দেখতে চাইলেন বাতাসে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পরিমাণের তারতম্য ঘটলে বায়ুমন্ডলের তাপমাত্রার কী পরিবর্তন ঘটে। সেই সময়ের কম্পিউটারের কয়েক শ ঘন্টা সময় লাগলো তাঁর মডেল দিয়ে পৃথিবীর বায়ুমন্ডলের তাপমাত্রার পরিবর্তন হিসেব করতে। কিন্তু হিসেবে যা দেখা গেলো তা অত্যন্ত দরকারি একটি হিসেব। বাতাসে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ যদি দ্বিগুণ হয়ে যায় – তাহলে পৃথিবীর বায়ুমন্ডলের গড় তাপমাত্রা দুই ডিগ্রি বেড়ে যাবে। ১৯৬৭ সালে মানাবে এই মডেল প্রকাশ করেন। এটা ছিল তাঁর একমাত্রিক মডেলের পরীক্ষা। পরবর্তী কয়েক বছরে তিনি তাঁর একমাত্রিক মডেলকে ত্রিমাত্রিক মডেলে রূপান্তরিত করে আরো অনেকগুলি পরীক্ষা করলেন। তাঁর ত্রিমাত্রিক মডেল প্রকাশিত হয় ১৯৭৫ সালে।

আমাদের প্রতিদিনের আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেয়ার জন্য যে মডেলটি অপরিহার্য সেটা হলো জেনারেল সার্কুলেশান মডেল বা জিসিএম। ১৯৫৬ সালে আমেরিকান পদার্থবিজ্ঞানী নরমান ফিলিপ্‌স প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্সটিটিউট ফর এডভান্সড স্টাডিজ-এ এই মডেলের সূচনা করেন। পদার্থবিজ্ঞানের মৌলিক সূত্র কাজে লাগিয়ে বায়ুমন্ডলের উপরের স্তর ও নিচের স্তরে বাতাসের গতিবেগ এবং তাপমাত্রার স্থানীয় পরিবর্তন হিসেব করা হয় এই মডেলে। ছোট ছোট ভৌগোলিক এলাকা ধরে নিয়ে সেখানে সৌরবিকিরণের পরিমাপ হিসেব করা হয় বিকিরণের সূত্র প্রয়োগ করে। বাতাসের গতিপ্রকৃতি হিসেব করার জন্য ব্যবহার করা হয় গতির সমীকরণ। তাপের বিকিরণ ও সঞ্চালন হিসেব করা হয় তাপগতিবিদ্যার সমীকরণ অনুসারে। বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিচলন হিসেব করা হয় তরল বা বায়বীয় পদার্থের ইকোয়েশান অব কন্টিনিউটি বা ধারাবাহিকতার সমীকরণ প্রয়োগে।

প্রথম জিসিএম-এর সাফল্যের পর পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের গবেষণাগারে এই মডেলকে স্থানীয়ভাবে আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেয়ার উপযোগী করে তোলা হয় নিজ নিজে দেশের আঞ্চলিক উপাত্তগুলি মডেলে প্রয়োগ করার পর। বর্তমানে কম্পিউটারের ব্যাপক শক্তিবৃদ্ধির সুযোগে এবং স্যাটেলাইটসহ অন্যান্য প্রযুক্তির সমন্বয়ে আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেয়ার মডেলগুলি এতটাই উন্নত হয়ে উঠেছে যে এখন আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনেক ক্ষেত্রেই অক্ষরে অক্ষরে ফলে যাচ্ছে।

 

তথ্যসূত্র:

১। সুকুরু মানাবে ও অ্যান্থনি ব্রকোলি, বিয়ন্ড গ্লোবাল ওয়ার্মিং হাউ নিউমেরিক্যাল মডেলস রিভিল্ড দ্য সিক্রেটস অব ক্লাইমেট চেঞ্জ’, প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটি প্রেস, ২০২০।

২। ক্যাথলিন সিয়ার্স, ওয়েদার ১০১, আদমস মিডিয়া, ২০০৮।

_________________

বিজ্ঞানচিন্তা এপ্রিল ২০২২ সংখ্যায় প্রকাশিত




Saturday, 21 May 2022

অস্ট্রেলিয়ার নির্বাচন ২০২২

 



অস্ট্রেলিয়ার ফেডারেল ইলেকশান হয়ে গেল একটু আগে। এখন ভোট গণনা শুরু হয়েছে। এ নিয়ে বেশ কয়েকটি নির্বাচনে ভোট দেয়া হয়ে গেলো এই দেশে। অস্ট্রেলিয়ার বেশির ভাগ নাগরিকের  মতোই আমারও রাজনীতির ব্যাপারে তেমন কোন আগ্রহ নেই। কিন্তু ভোট দেয়া এখানে বাধ্যতামূলক। তাই দিতে হয়। কিন্তু এদেশে নির্বাচনের ব্যাপারটা আমার কাছে খুবই খুশির ব্যাপার বলে মনে হয়। নাগরিক অধিকার বলে উচ্চকন্ঠ হতে দেখা যায় প্রায় সব দেশেই। কিন্তু নাগরিক দায়িত্বের ব্যাপারটা সেভাবে গুরুত্ব পায় না। এখানে নাগরিক দায়িত্বের ব্যাপারটাতে গুরুত্ব দেয়া হয়। এই দায়িত্ব পালন করা বাধ্যতামূলক।

এখানে ভোট দিতে গেলে যেসব ব্যাপার দেখে আমার আনন্দ লাগে সেগুলির মধ্যে আছে – ভোট কেন্দ্রের কোথাও কোন পুলিশ নেই, নির্বাচন কমিশননিযুক্ত নিরস্ত্র কর্মীরাই ভোট পরিচালনা করে, নির্বাচনী সহিংসতা নামক কোন ব্যাপার এখানে ঘটে না, ভোট দিয়েছি কি না প্রমাণ করার জন্য আঙুলে কোন কালি লাগানো হয় না –– একবার ভোট দিয়ে আরেকবার যে দিতে যাবে না সেই বিশ্বাসে নাগরিকের সততা ও দায়িত্বকে সম্মান করা হয় সবখানে, বেশিরভাগ কেন্দ্রেই কোন পরিচয়পত্রও দেখাতে হয় না; কেবল নাম-ঠিকানা বললেই হয়, এমপি পদে যে আসনে যতজন প্রার্থী হন – তাদের সবাইকেই ভোট দিতে হয় পছন্দ অনুসারে ১, ২, ৩ ইত্যাদি লিখে। অর্থাৎ প্রত্যেক প্রার্থীই ভোট পান – শুধু যিনি সবচেয়ে বেশি মানুষের প্রথম পছন্দ তিনিই জিতেন।

আর কয়েক ঘন্টা পরেই চূড়ান্ত হয়ে যাবে – বর্তমান প্রধানমন্ত্রী আবার দায়িত্বে আসবেন, নাকি লেবার পার্টি সরকার গঠন করবে। যেই করুক, অন্যদল তাকে অভিনন্দন জানিয়ে হাসিমুখে সরে যাবে।

ইন্টারন্যাশনাল বেস্ট প্র্যাকটিস বলে একটা ব্যাপার আছে। পৃথিবীর উন্নত ব্যবস্থাগুলিকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের ব্যবস্থাকে আরো উন্নত করার অবিরাম চেষ্টার নামই সত্যিকারের উন্নতি। অস্ট্রেলিয়ায় সরকারের মেয়াদ তিন বছর নির্ধারণ করা হয়েছে এজন্য যে দীর্ঘদিন দায়িত্বে থাকলে দায়িত্বে অবহেলার ভাব চলে আসে, দায়িত্বকে ক্ষমতা বলে ভাবতে শুরু করে। দুর্নীতিও হতে পারে। কম মেয়াদী হলে নির্বাচিতদের ভয় থাকে – কিছুদিন পরেই দায়িত্ব হারানোর। এদেশের রাজনীতিকরা জনগণকে সমীহ করেন, কারণ জনগণের ভোটেই আছে তাঁদের রাজনৈতিক ভবিষ্যত। এদেশে ক্ষমতার অপব্যবহার করলে, দুর্নীতি করলে – রাজনৈতিক দলগুলি তাদেরকে বহিস্কার করতে বাধ্য হয়। না হলে তাদের আবার নির্বাচিত হবার সম্ভাবনা শূন্য হয়ে যায়। দুর্নীতিবাজকে ভোটের মাধ্যমে উপড়ে ফেলার দায়িত্বটা তখন নাগরিকরাই নেয়।

আমার প্রশ্ন হলো এরকম একটা কল্যাণকর সমাজব্যবস্থা যদি অস্ট্রেলিয়া তৈরি করতে পারে, কানাডা পারে, ইওরোপের অনেক দেশ পারে – পৃথিবীর অনেকগুলি দেশ পারে না কেন?


Tuesday, 17 May 2022

নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী ভেঙ্কি রামকৃষ্ণন

 



আমাদের শরীরের মূল নক্‌শা বা ব্লু-প্রিন্ট থাকে আমাদের ডিএনএ-তে। বলা চলে শারীরিক কার্যাবলির সবকিছু নিয়ন্ত্রিত হয় মূলত ডিএনএ দ্বারা। এই ডিএনএ’র আণবিক গঠন আবিষ্কৃত হয়েছে বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি। ১৯৬২ সালে ফ্রান্সিস ক্রিক, জেম্‌স ওয়াটসন এবং মরিস উইলকিন্‌স চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন ডিএনএর গঠন আবিষ্কারের জন্য। ডিএনএর গঠন আবিষ্কারের পর জীবের শারীরবৃত্তিক কাজকর্মের গতিপ্রকৃতি নিঁখুতভাবে জানার অনেকগুলি পথ খুলে গেল।

শরীরের তথ্যনির্দেশ জমা থাকে জিনে। এই তথ্যনির্দেশ কার্যকর করার জন্য তথ্যগুলি কপি করে কোষের বাইরের অংশে পাঠানো হয়। সেখানে এগুলি প্রয়োজনীয় প্রোটিন তৈরির নির্দেশ দেয়। মূলত বিভিন্ন ধরনের প্রোটিন মিলে আমাদের শারীরিক কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ করে। এই তথ্য কপি করার ব্যাপারটাকে বলা হয় ট্রান্সক্রিপশান। ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জীবকোষ থেকে শুরু করে অতিকায়  ডায়নোসর – সব রকমের জীবনের জন্যই এই ট্রান্সক্রিপশান অপরিহার্য। ট্রান্সক্রিপশান বা তথ্যনির্দেশ যদি কোষের বাইরে আসতে না পারে বা কপি করা না হয়, তাহলে কোষগুলি বুঝতে পারে না কী করতে হবে। ফলে দেহের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে জীবকোষের মৃত্যু হয়। এই ট্রান্সক্রিপশানের সময় যদি কোন গন্ডগোল হয়, তবে কোষগুলির বাইরে ভুল তথ্যনির্দেশ চলে আসে। ফলে নানারকম রোগের উৎপত্তি হতে পারে, বিশেষ করে কোষঘটিত রোগ – যেমন ক্যান্সার।

এই ট্রান্সমিশান কীভাবে ঘটে তার পারমাণবিক পর্যায়ের নিখুঁত পদ্ধতি আবিষ্কার করে ২০০৬ সালে রসায়নে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন বিজ্ঞানী রজার কর্নবার্গ। ডিএনএর পাশাপাশি আমরা জেনেছি আরএনএর কথা। ডিএনএ-তে যেমন সিঁড়ির মতো পাশাপাশি দুটো স্ট্র্যান্ড থাকে, আরএনএতে থাকে একটি স্ট্র্যান্ড। প্রধানত তিন ধরনের আরএনএ পাওয়া যায় – ম্যাসেঞ্জার আরএনএ (এমআরএনএ), রাইবোজোমাল আরএনএ (আরআরএনএ), এবং ট্রান্সফার আরএনএ (টিআরএনএ)। রজার কর্নবার্গ আবিষ্কার করেছিলেন ডিএনএর তথ্যনির্দেশ কীভাবে এমআরএনএ-তে যায় যেখান থেকে কোষগুলি দরকারি প্রোটিন তৈরির নির্দেশ পায়।

তখনো পর্যন্ত আরআরএনএগুলি কীভাবে কাজ করে – অর্থাৎ রাইবোজোমের আণবিক গঠন নিঁখুতভাবে জানা সম্ভব হয়নি। রাইবোজোমকে বলা হয় জীবকোষের প্রোটিন তৈরির কারখানা। এই রাইবোজোমের কার্যপদ্ধতি হলো কোষের কাজগুলির মধ্যে সবচেয়ে জটিল কাজ। রাইবোজোম এই জটিল কাজগুলি কীভাবে করে তা আবিষ্কার করেছেন যে তিনজন বিজ্ঞানী – তাঁদের একজন হলেন ভেঙ্কটরামন রামকৃষ্ণন – যাকে পরিচিতরা সবাই ভেঙ্কি বলে ডাকেন।

রাইবোজোমের কার্যপ্রণালী আবিষ্কার করার জন্য ২০০৯ সালে রসায়নে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন অ্যাডা ইওনাথ, থমাস স্টিজ এবং ভেঙ্কটরামন রামকৃষ্ণন। তাঁদের আবিষ্কারের ফলেই শরীরের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম কাজকর্মের অনেক অজানা জটিল রহস্য উন্মোচিত হয়েছে। আমরা এখন জানি কীভাবে ডিএনএ/আরএনএ থেকে প্রোটিন তৈরির নির্দেশ আসে, এবং রাইবোজোম কীভাবে যথাসময়ে যথামাত্রায় যথাযথ প্রোটিন তৈরি করে। একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে আবিষ্কৃত এসব তথ্য কাজে লাগিয়ে তৈরি করা সম্ভব হয়েছে অনেক নতুন অ্যান্টি-বায়োটিক। সাম্প্রতিক করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে অতিদ্রুত ভ্যাক্সিন তৈরি করা সম্ভব হয়েছে রাইবোজোমের কাজকর্ম ভালোভাবে জানা ছিল বলেই।

পারমাণবিক পর্যায়ে গেলে পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, জীববিজ্ঞান – বিজ্ঞানের এরকম শাখাপ্রশাখার মধ্যে খুব বেশি বিভেদ থাকে না। রসায়নে নোবেলজয়ী এই বিজ্ঞানী ভেঙ্কি রামকৃষ্ণন ছিলেন তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞানী। পদার্থবিজ্ঞানে পিএইচডি করার পর তিনি জীববিজ্ঞানে গবেষণা শুরু করেছিলেন। সেখান থেকেই তিনি সাফল্যের চূড়ায় উঠেছেন, নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন। শুধু তাই নয়, তিনিই ছিলেন রয়েল সোসাইটির সাড়ে তিন শ বছরের ইতিহাসে প্রথম অশ্বেতাঙ্গ প্রেসিডেন্ট। 

বিজ্ঞানীদের সবচেয়ে বনেদী আর গৌরবজনক সংগঠন হলো লন্ডনের রয়েল সোসাইটি। ১৬৬২ সালে প্রতিষ্ঠিত এই সংগঠনের ফেলোশিপ পাওয়াটা বিজ্ঞানীদের জন্য খুবই গৌরবজনক ব্যাপার। স্যার আইজাক নিউটন, স্যার হামফ্রে ড্যাভি, থমাস হাক্সলি, লর্ড কেলভিন, লর্ড রেলে, আর্নেস্ট রাদারফোর্ড, উইলিয়াম ব্র্যাগ, প্যাট্রিক ব্ল্যাকেট প্রমুখ বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী যারা রয়েল সোসাইটির প্রেসিডেন্ট মনোনীত হয়েছিলেন, তাঁদের পাশে রয়েল সোসাইটির এপর্যন্ত একমাত্র প্রেসিডেন্ট স্যার ভেঙ্কটরামন রামকৃষ্ণন যার জন্ম আমাদের উপমহাদেশে।

ভেঙ্কটরামন রামকৃষ্ণন - ভেঙ্কির জন্ম তামিলনাড়ুর চিদাম্বরমে ১৯৫২ সালে। তাঁর বাবা সিভি রামকৃষ্ণন এবং মা রাজলক্ষ্মী – দু’জনই ছিলেন জীববিজ্ঞানের অধ্যাপক। ছোটবেলা থেকেই বিজ্ঞানের পরিমন্ডলে বড় হয়েছেন ভেঙ্কি। তাঁর জন্মের সময় তার বাবা আমেরিকার উইসকনসিনে পোস্টডক্টরেট গবেষণা করছিলেন। আর্থিক সামর্থ্যের অভাবে তিনি সন্তানসম্ভবা স্ত্রীকে তামিলনাড়ুতে রেখে গিয়েছিলেন। রাজলক্ষ্মীকে সাথে নিয়ে গেলে ভেঙ্কি জন্মসূত্রে আমেরিকান হতে পারতেন। বাবা পোস্টডক্টরেট করে ফিরে আসার পর মা গেলেন কানাডায় পিএইচডি করার জন্য। তখন বাবাও সাথে গেলেন দেড় বছরের ভেঙ্কিকে নানা-নানীর জিম্মায় রেখে। ফিরে আসার পর তারা চিদাম্বরম থেকে বরোদায় চলে গেলেন সেখানকার বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিয়ে।

বরোদায় ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলে লেখাপড়া শুরু হলো ভেঙ্কির। ১৯৫৯ সালে ভেঙ্কির ছোটবোন ললিতার জন্ম হয়। ১৯৬০-৬১ সালে বাবা-মায়ের অস্ট্রেলিয়ায় ফেলোশিপ নিয়ে আসার সুবাদে এক বছর অস্ট্রেলিয়ার এডেলেইডের স্কুলে পড়াশোনা করে ভেঙ্কি। আবার ভারতে ফিরে গিয়ে স্কুলের পড়াশোনা শেষ করলো। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে কী নিয়ে পড়াশোনা করবে স্থির করতে পারছিলেন না ভেঙ্কি। তাঁর বাবা চাচ্ছিলেন ছেলে ডাক্তার হোক। ডাক্তারিতে ভর্তির জন্য প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় টিকেছিল ভেঙ্কি। ইঞ্জিনিয়ারিং-এর চরম প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় টিকে আই-আই-টিতে ভর্তির জন্য মনোনীত হয়েছিলেন তিনি। কিন্তু মেডিকেল কলেজে পড়াশোনাটাকে খুব একটা আকর্ষণীয় মনে হলো না ভেঙ্কির কাছে- কারণ সেখানে অনেক জিনিস মুখস্থ করতে হয়। তাঁর কাছে মৌলিক বিজ্ঞানের পড়াশোনাকেই অনেক বেশি আকর্ষণীয় মনে হলো। সেইসময় মৌলিক বিজ্ঞানে পড়াশোনায় উৎসাহিত করার জন্য ভারত সরকার একটা আকর্ষণীয় বৃত্তি দিচ্ছিলো মেধাবী শিক্ষার্থীদের। ভেঙ্কি সেই বৃত্তি নিয়ে বরোদা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হলেন বিএসসি কোর্সে।

বিএসসি পাস করার পর তিনি আমেরিকার ওহাইও ইউনিভার্সিটিতে পদার্থবিজ্ঞানে পিএইচডি গবেষণা শুরু করলেন। দুই বছর কোর্সওয়ার্ক করার পর  অধ্যাপক তমোইয়াসু তানাকার তত্ত্বাবধানে সলিড-স্টেট ফিজিক্সের তত্ত্বীয় গবেষণা শুরু করলেন। কিন্তু গবেষণা শুরুর কিছুদিন পরেই মনে হলো তিনি ভুল বিষয়ে ভর্তি হয়েছেন। সায়েন্টিফিক আমেরিকানে জীববিজ্ঞানের নিত্যনতুন আবিষ্কারের কাহিনি পড়তে পড়তে ভেঙ্কির মনে হলো পদার্থবিজ্ঞানের আবিষ্কার হচ্ছে শামুকের গতিতে, কিন্তু জীববিজ্ঞানের নতুন নতুন আবিষ্কার হচ্ছে ব্যাঙের মতো লাফিয়ে লাফিয়ে। পদার্থবিজ্ঞানে কোন উত্তেজনাই পাচ্ছেন না তিনি। তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞানের দীর্ঘ জটিল সমীকরণ ও গাণিতিক হিসেবে তিনি কোন আনন্দ পাচ্ছিলেন না। কিন্তু অন্য কোন বিষয়ে যে চলে যাবেন সেই সুযোগও নেই। এই বিষয়ে তিন বছরের বেশি সময় ব্যয় করেছেন তিনি। যে জীববিজ্ঞানকে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার সময় অযৌক্তিক মুখস্থ করার বিষয় বলে মনে করেছিলেন, এখন মনে হচ্ছে সেখানেই আছে অনেক বেশি উত্তেজনার খোরাক।

গবেষণায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলার পর ভেঙ্কি পড়াশোনা বাদ দিয়ে হাইকিং করতে লাগলেন, গান শুনতে লাগলেন, দাবা খেলতে শুরু করলেন। ইচ্ছেমতো ঘুরে বেড়ানোর সময় তাঁর সাথে পরিচয় হলো ভেরা রোজেনবারির সাথে। ভেরা ফাইন আর্টসের ছাত্রী। পেইন্টিংস নিয়ে পড়াশোনা করছিলেন। সত্তরের দশকের শুরুতে ওহাইও বিশ্ববিদ্যালয়ে খুব বেশি নিরামিষভোজী ছিল না। ভেরা ছিলেন নিরামিষাশী, ভেঙ্কিও। তাঁদের মধ্যে বন্ধুত্ব হয়ে গেল। ক্রমে বন্ধুত্ব থেকে প্রেম। ভেরা ছিলেন ডিভোর্সি। তাঁর পাঁচ বছর বয়সী একটা মেয়েও আছে। ১৯৭৫ সালে তেইশ বছর বয়সী ভেঙ্কি তাঁর চেয়ে বয়সে বড় ভেরাকে বিয়ে করে ঘরসংসার শুরু করলেন। ভেঙ্কির পিএইচডি তখনো শেষ হয়নি। কোন উপার্জন নেই। ভেরা নিজের পড়াশোনার পাশাপাশি ছোটদের জন্য বই লিখতে শুরু করলেন। তাঁর ভেরা সিরিজের বইগুলি শিশুরা খুবই পছন্দ করে।

ঘরসংসার, স্ত্রী এবং সৎকন্যার দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে তিনি ইচ্ছের বিরুদ্ধেই পদার্থবিজ্ঞানে পিএইচডি শেষ করলেন। সেই সময় তাঁদের সন্তান রামনের জন্ম হয়। তিনি জীববিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করার ব্যাপারে মনস্থির করে ফেললেন। জীববিজ্ঞানের যেসব খুঁটিনাটি ব্যাপার নিয়ে তিনি জানতে আগ্রহী, তারজন্য সবচেয়ে ভালো হয় যদি ডাক্তারিতে ভর্তি হতে পারেন। ভারতে ডাক্তারি পড়ার সুযোগ পেয়েও পড়েননি। এখন আমেরিকায় পিএইচডি শেষ করার পর ডাক্তারি পড়ার জন্য ভর্তি পরীক্ষা দিলেন। এম-ক্যাটে অনেক ভালো ফলাফল করার পরেও তিনি কোন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডাক পেলেন না। ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয় মৌখিক সাক্ষাৎকারের জন্য ডেকেছিল। কিন্তু ভেঙ্কি যখন বললেন যে তিনি ডাক্তারি করবেন না, শুধুমাত্র শরীরের বিজ্ঞান সম্পর্কে ভালোভাবে জানার জন্য ডাক্তারি পড়তে চান, তাকে ভর্তি হবার সুযোগ দেয়া হলো না।

ডাক্তারিতে ভর্তি হতে ব্যর্থ হয়ে তিনি জীববিজ্ঞানে পিএইচডি করার জন্য দরখাস্ত করতে শুরু করলেন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিন্তু বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ই ফিজিক্সে পিএইচডি করা একজনকে আরেকটি পিএইচডি করার জন্য অনুমতি দিলো না। মাত্র তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় তাকে পিএইচডি কোর্সে ভর্তির অফার দিলো। তিনি ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া সান দিয়েগোতে ভর্তি হলেন। জীববিজ্ঞানের গবেষণার কোন নিয়মকানুন তিনি জানতেন না। সবকিছু একেবারে গোড়া থেকে শিখতে শুরু করলেন। পরের বছর গবেষণাগারে কীভাবে গবেষণা করতে হয় তা শিখে ফেলার পর তাঁর মনে হলো এবার তাঁর পিএইচডি থিসিস লেখার কোন দরকার নেই। তিনি সরাসরি জীববিজ্ঞানের গবেষণাই শুরু করতে পারেন।

ইয়েল ইউনিভার্সিটিতে অধ্যাপক পিটার মুরের সাথে রাইবোজোম সংক্রান্ত গবেষণা করার জন্য পোস্টডক্টরেট শুরু করলেন। বছরখানেক পোস্টডক গবেষণার পর তাঁর একটা স্থায়ী পদের দরকার হলো। কিন্তু পঞ্চাশটির অধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে দরখাস্ত করার পরেও কোন সাড়া পেলেন না। পদার্থবিজ্ঞান থেকে পিএইচডি করে জীববিজ্ঞানে গবেষণা করছেন এরকম কাউকে নিয়োগ দেবার ব্যাপারে কোন বিশ্ববিদ্যালয়ই খুব একটা আগ্রহী হলো না। শুধুমাত্র ওক রিজ ন্যাশনাল ল্যাবে একটি টেকনিশিয়ানের পদ পাওয়া গেল। সেখানে যোগ দিয়ে দেখলেন স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ খুব বেশি নেই সেখানে। কিছুদিন পরেই তাঁকে আবার চাকরি খোঁজায় মন দিতে হলো। ইয়েলে নিউট্রন স্ক্যাটারিং-এর মাধ্যমে রাইবোজোম সংক্রান্ত গবেষণা করছিলেন তিনি। সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ব্রুকহ্যাভেন ন্যাশনাল ল্যাবে তাঁর চাকরি হলো। ব্রুকহ্যাভেনে তিনি গবেষণার স্বাধীনতা পেলেন। রাইবোজোম সংক্রান্ত গবেষণার ফলাফলও পেতে শুরু করলো।

ব্রুকহ্যাভেনে স্থায়ী গবেষক পদে নিয়োগ পেলেন তিনি। পদার্থবিজ্ঞানের এক্স-রে ক্রিস্টালোগ্রাফির প্রয়োগে রাইবোজোমের আণবিক গঠন সম্পর্কে অনেক নতুন ফলাফল পাওয়া গেল। ভেঙ্কি এই ব্যাপারে আরো গভীরভাবে জানার জন্য তিনি ব্রুকহ্যাভেন থেকে ছুটি নিয়ে ১৯৯১ সালে ইংল্যান্ডের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের মলিকিউলার বায়োলজি ল্যাবে গেলেন। সেখানে তিনি বিজ্ঞানী জন ফিঞ্চের তত্ত্বাবধানে কাজ শুরু করলেন। এক বছর সেখানে গবেষণা করে তিনি রাইবোজোমাল প্রোটিনের ক্রিস্টালোগ্রাফির অনেক নতুন কিছু শিখলেন। ব্রুকহ্যাভেনে ফিরে তিনি শুধুমাত্র ক্রিস্টালোগ্রাফি ও রাইবোজোম নিয়ে গবেষণা করতে চাইলেন। কিন্তু আকাঙ্খিত স্বাধীনতা পেলেন না। তিনি অন্য জায়গায় চলে যাবার সিদ্ধান্ত নিলেন।

ভেঙ্কি যোগ দিলেন উটাহ্‌ ইউনিভার্সিটির বায়োকেমিস্ট্রি ডিপার্টমেন্টে। সেখানেই তিনি রাইবোজোমের বেশ কয়েকটি প্রোটিনের গঠন আবিষ্কার করলেন। তিনি দেখলেন এ কাজে প্রচুর ফান্ডিং দরকার। উটাহ বিশ্ববিদ্যালয়ে সেটা অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা ক্ষীণ। ভবিষ্যত চিন্তা করে তিনি ইংল্যান্ডের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করার সিদ্ধান্ত নিলেন। আমেরিকান ভেঙ্কি চলে এলেন ইংল্যান্ডে। সেখানেই তিনি রাইবোজোমের সাবইউনিট 30S এর আণবিক গঠন নির্ণয়ের মূল গবেষণা শুরু করেন।

সেই সময় একই বিষয়ে ইসরায়েলে গবেষণা করছিলেন অ্যাডা ইয়োনাথ। এক ধরনের প্রতিযোগিতা শুরু হলো ভেঙ্কি ও অ্যাডার মধ্যে। ভেঙ্কি ক্রিস্টালোগ্রাফির সবচেয়ে সূক্ষ্ম পরীক্ষা করার জন্য চলে গেলেন আমেরিকার আর্গন ন্যাশনাল ল্যাবের এডভান্সড ফোটন সোর্স ফ্যাসিলিটিতে। ভেঙ্কি তাঁর গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করলেন ২০০০ সালে। এই কাজের জন্য ২০০৯ সালের রসায়নে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন ভেঙ্কি। রাইবোজোমের আণবিক গঠন আবিষ্কারের জন্য ভেঙ্কির সাথে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন অ্যাডা ইয়োনাথ এবং ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্ট্রাকচারাল বায়োলজিস্ট থমাস স্টিজ।

এপর্যন্ত মাত্র পাঁচজন বিজ্ঞানী নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন আমাদের উপমহাদেশ থেকে। সিভি রামন, হরগোবিন্দ খোরানা, আবদুস সালাম, চন্দ্রশেখর সুব্রাহ্মনিয়ানের পর  ভেঙ্কি রামকৃষ্ণন। ভেঙ্কির আবিষ্কারের প্রয়োগ সুদুরপ্রসারী। তাঁর আবিষ্কারের ফলে এখন আরো অনেক শক্তিশালী এবং কার্যকর অ্যান্টিবায়োটিক তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে।

ভেঙ্কি রামকৃষ্ণনকে ব্রিটিশ নাগরিকত্বও দেয়া হয়। ব্রিটিশ সরকার তাঁকে নাইট উপাধি দেয় ২০১২ সালে। যদিও ভেঙ্কি কখনো ‘স্যার’ উপাধি ব্যবহার করেননি। ২০১০ সালে তাঁকে ভারত সরকার পদ্মবিভূষণ উপাধিতে সম্মানিত করে। ২০১৫ সালে ভেঙ্কি রয়েল সোসাইটির প্রেসিডেন্ট মনোনীত হন। ২০২০ সাল পর্যন্ত তিনি সম্মানের সাথে এই দায়িত্ব পালন করেন। করোনা মহামারির সময়ে কোভিড ভ্যাক্সিন উদ্ভাবন ও উদ্বুদ্ধকরণে ভেঙ্কি রামকৃষ্ণন উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন।

তথ্যসূত্র:

ভেঙ্কটরামন রামকৃষ্ণন, ফ্রম চিদাম্বরম টু কেমব্রিজ – এ লাইফ ইন সায়েন্স ২০০৯; পিএনএএস সেপ্টেম্বর ২০, ২০১১।

_______________

বিজ্ঞানচিন্তা মার্চ ২০২২ সংখ্যায় প্রকাশিত







চেতন ভগতের 400 Days

 



ইংরেজি ভাষায় যে ক’জন ভারতীয় লেখক উপন্যাস লিখে জনপ্রিয়তা পেয়েছেন – চেতন ভগত তাঁদের অন্যতম। শুধুমাত্র অন্যতম বললে কম বলা হবে, চেতন ভগতের লেখা সবগুলি উপন্যাস খুবই পাঠকপ্রিয় হয়েছে। কোন্‌ বই কতটা ভালো লেগেছে পাঠকের – তা বিচারের প্রধান মাপকাঠি হলো সেই বইয়ের কত কপি বিক্রি হয়েছে। চেতন ভগতের প্রতিটি বই বিক্রি হয় দশ লক্ষ কপিরও বেশি। সে তো গেলো মূল ইংরেজিতে। অন্যান্য ভাষাতেও তাঁর বইয়ের বৈধ-অবৈধ অনেক অনুবাদ হচ্ছে। বৈধ অনুবাদ হচ্ছে মূল লেখক এবং/অথবা মূল প্রকাশকের অনুমোদিত অনুবাদ, আর অবৈধ অনুবাদ হচ্ছে – যে অনুবাদের কথা লেখক/প্রকাশক জানেনও না।

চেতন ভগতের লেখা কেন এত মানুষের ভালো লাগছে? তাঁর লেখার সাহিত্যমূল্য কোন স্তরের? এই প্রশ্নের উত্তর দেয়া সহজ নয়। কারণ গল্প-উপন্যাসের মান বিচার করার ব্যাপারটা বস্তুনিষ্ঠ নয়। একেকজনের ভালো লাগার কারণ একেক রকম। নোবেল পুরষ্কার প্রাপ্ত সাহিত্যিকের লেখাও যে সবার ভালো লাগবে তার কোন নিশ্চয়তা নেই।

আর কে নারায়ণের প্রত্যেকটি উপন্যাস কালোত্তীর্ণ, কিন্তু সেভাবে জনপ্রিয় নয়। জনপ্রিয় হবার উপাদান চেতন ভগত খুব ভালো করেই জানেন কীভাবে পাঠকপ্রিয় হওয়া যায়। তাঁর লেখার ভাষা, ঘটনার বর্ণনা, সংলাপ পড়ার সময় মনে হয় বই নয়, সিনেমা পড়ছি। সিনেমার বিজ্ঞাপনের মতো করেই তিনি তাঁর বই প্রকাশের আগে বইয়ের বিজ্ঞাপন প্রচার করেন।

চেতন ভগতের সবগুলি বই থেকেই সিনেমা তৈরি হয়েছে এবং হচ্ছে। তিনি নিজেও সিনেমার চিত্রনাট্য লেখেন। তাঁর প্রথম বই Five Point Someone অবলম্বনে আমির খানের বিখ্যাত সিনেমা Three Idiots তৈরি হলেও সেই সিনেমাতে চেতন ভগতকে সেভাবে স্বীকৃতি দেয়া হয়নি। তারপর থেকে তিনি অনেক বেশি সতর্ক। নিজে সরাসরি যুক্ত থাকেন চিত্রনাট্য তৈরিতে।

তার উপন্যাসগুলির লক্ষ্য থাকে ইংরেজিপড়ুয়া তরুণ উচ্চমধ্যবিত্ত এবং উচ্চবিত্ত পাঠকদের মন জয় করা। আধুনিক প্রেম, যৌনতা, এবং ভারতীয় তরুণরা যেসব  সমস্যার সামনে প্রায় প্রতিদিন পড়ে – সেগুলিকেই তুলে আনেন কাহিনি-বিন্যাসে, বর্ণনায় এবং সংলাপে।

তাঁর সাম্প্রতিক বইগুলি সরাসরি থ্রিলার। The girl in room 105, One arranged murder, এবং 400 days  - রোমাঞ্চকর থ্রিলার গোত্রের। কেশব আর সৌরভ – দুই বন্ধু – গোয়েন্দা। অপেশাদার গোয়েন্দা। এদেরকে দিয়েই জটিল রহস্যের সমাধান করিয়ে নিচ্ছেন চেতন ভগত। কেশবের জবানীতেই ঘটনা এগোয়।

400 days এর কাহিনি আবর্তিত হয়েছে একটি বারো বছরের মেয়ের অপহরণের ঘটনাকে কেন্দ্র করে। দাদাবাড়ির নিরাপদ বাড়ি থেকে রাতের বেলা উধাও হয়ে যায় আলিয়া-মনীশ দম্পতির বারো বছর বয়সী কন্যা সিয়া। রাতের বেলা নিজের ছোট বোন সুহানা আর চাচাতো ভাইদের সাথে এক রুমে ঘুমিয়েছিল সিয়া। কিন্তু সকালে দেখা গেলো সিয়া উধাও। কেউ জানে না সে কোথায়। কেবল সুহানা বললো রাতে কেউ একজন এসে ছুরি দেখিয়ে সিয়াকে নিয়ে গেছে। সুহানার বয়স মাত্র পাঁচ। সে ঘুমের ঘোরে কী দেখেছে ঠিকমতো বলতেও পারে না। আলিয়া-মনীশ অত্যন্ত ধনী ব্যবসায়ী। টাকা-পয়সা প্রভাব-প্রতিপত্তির অভাব নেই। কিন্তু পুলিশ-গোয়েন্দা কেউই কিছু করতে পারলো না। ধরে নেয়া হয় যে সিয়াকে মেরে ফেলা হয়েছে। সবাই হাল ছেড়ে দিলেও সিয়ার মা আলিয়া হাল ছেড়ে দেয় না। আলিয়া মেয়ের খোঁজ করার জন্য কেশব আর সৌরভের সাহায্য চায়। মূলত কেশবেরই সাহায্য চায়। কেশব সৌরভকেও কাজে লাগায়।

প্রচলিত গোয়েন্দা-কাহিনীর চেয়ে চেতন ভগতের স্টাইল কিছুটা ভিন্ন। এখানে আলিয়া ও মনীশের প্রেম-কাহিনীর বিশদ বিবরণ আছে। আবার কেশব আর আলিয়াও পরস্পর প্রেমে পড়ে যায়। এই প্রেম ভারতীয় রক্ষণশীল টাইপের প্রেম নয়। উদ্দাম ইওরোপিয়ান স্টাইলের প্রেম – যেখানে মনের সাথে, অনেকটা মনের আগেও শরীর এগোয়। শরীরের ব্যাপারে কোন ধরনের জড়তা দেখা যায় না চেতন ভগতের নায়ক-নায়িকাদের। সে রক্ষণশীল মধ্যবিত্ত সতেরো বছরের মেয়ে আলিয়া হোক – কিংবা ত্রিশ বছরের গৃহবধূ আলিয়া হোক।

তবে এখানেও আছে প্রচলিত পদ্ধতি – কেউই সন্দেহের উর্ধ্বে নয়, আবার শেষপর্যন্ত দেখা যায় – যার দিকে সন্দেহের তীর কম ছোড়া হয়েছে সে-ই দোষী। তবে ভারতীয় পুলিশকে যেরকম অদক্ষ প্রমাণ করা হয়েছে – জানি না এত বাস্তব সমস্যার সমাধান তারা কীভাবে করেন।

চেতন ভগতের লেখা পাঠককে টেনে রাখে এটাই সবচেয়ে বড় গুণ তাঁর লেখার। আর কোন নতুন কারণ খুঁজে পাচ্ছি না। 400 Days স্বতন্ত্র কিছু নয়, রহস্যও আহামরি রকমের কোন বৈশিষ্ট্যপূর্ণ নয়। কিন্তু তাঁর ভাষা চমৎকার। অহেতুক বর্ণনার বাহুল্য নেই। সেন্স অব হিউমার অসাধারণ।

কিন্তু গল্পের বিচার করলে বলতে হয় - আজকাল ভালো গোয়েন্দা গল্পের অভাব দেখা দিয়েছে, নাকি গোয়েন্দাগল্প বেশি পড়ার কুফল বুঝতে পারছি না। 



Wednesday, 11 May 2022

মন্ত্রীত্ব এবং সারমেয় সমাচার

 


আচ্ছা, আপনি কাসুন্দি চিনেন? খেয়েছেন কখনো? আমি খাইনি, চিনিও না। বাংলা একাডেমির ব্যবহারিক বাংলা অভিধানে দেখলাম কাসুন্দি হলো সরিষার তৈরি আচার বিশেষ। কাসুন্দি পুরনো হলে কী হয়? ঝাঁজ কমে যায়? নাকি স্বাদ চলে যায়? নিশ্চয় কিছু একটা হয়, নইলে পুরনো কাসুন্দির কথা আসতো কোত্থেকে। পুরনো কাসুন্দি বলতে কী বোঝায় তা আমরা জানি।

তাহলে একটু পুরনো কাসুন্দি ঘাঁটা যাক। পাঁচ-ছয় বছরের পুরনো কথা। অস্ট্রেলিয়া দেশের ভিক্টোরিয়া রাজ্যের প্রভাবশালী মন্ত্রী ছিলেন স্টিভ হারবার্ট। ট্রেনিং অ্যান্ড স্কিলস মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব ছিল তাঁর। বড়ই সুখে-শান্তিতে-মন্ত্রীত্বে দিন কাটছিলো তাঁর। কিন্তু একদিন তাঁর মন্ত্রীত্ব চলে গেল। কী অপরাধ? তিনি তাঁর সরকারি গাড়িতে তাঁর দুটো পোষা কুকুরকে চড়িয়েছেন। জি, এটাই অপরাধ। আপনি হাসছেন? সে আপনি হাসতে পারেন, কিন্তু অস্ট্রেলিয়ানদের কাছে এই ব্যাপারটি হাস্যকর ছিল না মোটেও। তারা বিশ্বাস করে মন্ত্রীদের সরকারি গাড়ি দেয়া হয় সরকারি কাজে ব্যবহারের জন্য। নিজের পরিবারের লোকজন কিংবা পোষা সারমেয়কে চড়াবার জন্য নয়।


এই কুকুরদুটোকে গাড়িতে চড়াবার কারণেই স্টিভ হারবার্টের মন্ত্রীত্ব চলে যায়



সাংবাদিকরা এই খবর হৈ হৈ করে প্রচার করলো। বিরোধীদল সংসদে ঝড় তুললো এই ইস্যুতে। মন্ত্রীর বাড়ি হলো পার্কডেলে। সেখান থেকে ট্রেনথাম-এ তার ছুটি কাটানোর বাড়ির দূরত্ব প্রায় এক শ কিলোমিটার। এই এক শ কিলোমিটার ভ্রমণের জন্য সারমেয়দের পেছনে জনগণের ট্যাক্সের পয়সা খরচ হয়েছে ১৯২ ডলার ৮০ সেন্ট। মন্ত্রী সেই পরিমাণ ডলার নিজের পকেট থেকে সরকারি কোষাগারে জমা দিয়ে অসংখ্যবার ক্ষমা চাওয়ার পরেও ক্ষমা পাননি। তাঁকে পদত্যাগ করতে হয়েছে। কারণ তিনি সরকারি সম্পদের অপব্যবহার করেছেন।

মন্ত্রী বললেই আমরা যেরকম এলাহী ব্যাপার, অফুরন্ত ক্ষমতা বলে মনে করি – অস্ট্রেলিয়ার মন্ত্রীদের কিংবা তাঁদের আত্মীয়স্বজনের সেই সুখ নেই। ক্ষমতার আসল মজা তো তার অবৈধ ব্যবহারে। ক্ষমতার অপব্যবহারই যদি করা না যায়, তাহলে ক্ষমতার আর মূল্য কী??

এই পুরনো কাসুন্দির সাথে অন্য কোন দেশের মন্ত্রীর কিংবা তাদের স্ত্রীর কিংবা তাদের আত্মীয়স্বজনের কিংবা তাদের সারমেয়দের পুরনো কিংবা নতুন কোন কাসুন্দিরই কোন সম্পর্ক নেই।

অস্ট্রেলিয়ান সংবাদপত্রে প্রকাশিত লিংক:

দ্য এজ



Latest Post

Cinderella’s Feet

  A Fairy-Tale Mystery Nobody Thought to Investigate “Bhaiya, did Cinderella have some serious problem with her feet ?” I looked at Otho...

Popular Posts